মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

সাবরিনা নিপু'র গল্প : কুকুর


মাঝরাতে কুকুরের ডাকে ঘুম ভেঙে গেলো ! জানলাটা খুলতেই দূরে একসাথে অনেক আলো দেখতে পেলাম ! মনে হলো মশাল মিছিল যেনো । দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই মানুষের শোরগোল আর চিৎকার ভেসে আসলো । ঘুটঘুটে এ অন্ধকারে যখন মানুষ ঘুমায় , কুকুরগুলো জাগে তখন ! এতো মানুষের শোরগোলে সত্যিই ভয় পেলাম । দরজা ঠেলে পাশের ঘরটায় উঁকি দিয়ে দেখলাম মা ঘুমাচ্ছে।

পা টিপে টিপে বাইরে বেরিয়ে এসে পুকুর পাড়ের বড় তাল গাছটার আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখলাম জেলে পাড়ার সব গুলো ঘর পুড়ে ছাড়খার । কিভাবে লাগলো এ আগুন ? নাকি কেউ শত্রুতা করে আগুন দিলো ওদের ঘরে ?

অন্যমনষ্ক ভাবে ঘাটের দিকে তাকাতেই দেখলাম অন্ধকারে জ্বল জ্বল করছে দুটো চোখ । সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে ঠাহর করতে পারছিলামনা ! মোবাইলের টর্চটা জ্বালতেই দেখলাম ঘাটের কোনায় গুটিশুটি মেরে লুকিয়ে বসে আছে এক যুবক । দুটো হাত দিয়ে ডান পা-টা চেপে ধরে বসে আছে । ফাঁদে পড়া খরগোশের মতো আতঙ্ক চোখে মুখে ! আমাকে দেখে সাংঘাতিক ভয় পেয়েছে বুঝতে পারছিলাম । তবে আমি ভয়ে পা তুলতে পারছিলাম না গলা দিয়ে কোনো আওয়াজ বেরুচ্ছিলোনা । হঠাৎ ছেলেটা কাতর স্বরে বললো – ‘ আমাকে বাঁচান ‘ তখন বুঝতে পারলাম ও কোনো বিপদে পড়েছে ।

তখন সাহস করে বললাম – কে আপনি ? এই গভীর রাতে আমাদের বাড়ির ঘাটেইবা কি করছেন ।
দু হাত জোর করে বললো – আমি সব বলবো । আগে আমাকে একটু বাড়ির ভিতরে নিয়ে চলুন ।

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে বললো – আমি আপনার কোনো ক্ষতি করবোনা । আমার ভীষন বিপদ ! দয়া করে আমাকে বাঁচান ।
কি ভেবে ইশারায় আমার পেছন পেছন আসতে বললাম । দেখলাম পা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে ছেলেটা !

প্রথমে মার ঘরে উঁকি দিলাম । দেখলাম , মা গভীর ঘুমে অচেতন । ভাড়ার ঘরটায় তালা দেয়া থাকেনা কখনও । দুজন মোটে মানুষ । কি আর এমন আছে । কিছু চাল আর বিন্নি ধান একটা চৌকির ওপর রাখা আছে ! চালের ঝুড়িটা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে বসতে বললাম ।

বললো – বড্ড তেষ্টা , একটু জল দেবেন ?
কুঁজো থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে দিতে গেলাম , মনে হলো গ্লাসটা ছোঁ মেরে হাত থেকে নিয়ে ঢক ঢক করে শেষ করলো পানি । পায়ের ওপর টর্চের আলোটা ফেলতেই দেখলাম রক্ত পড়ছে । চালের গুড়ি শুকানোর জন্য মায়ের পুরোনো শাড়ি থাকে এ ঘরে । ওখান থেকে টান দিয়ে একটা শাড়ির আঁচলের কিছু অংশ ছিঁড়ে নিয়ে পা -টা বেঁধে দিতে চাইলে বললো – আমি পারবো।

আমি তাও একরকম জোর করে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে বেঁধে দিলাম শক্ত করে । এখন রক্তটা বন্ধ হলেই হলো । কাল সকালে ডা:শশীনন্দনের দোকান থেকে মলম এনে লাগিয়ে দেবো । শুনেই ও লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো , শশী নন্দনের দোকান কোথায় পাবেন , সেটাওতো জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা । আমাদের সমস্ত বাড়িতে আগুন দিয়েছে ওরা । পালাতে যেয়ে পা আটকে গিয়েছিলো কাঁটার ঝোপে । বহু কষ্টে ওদের চোখ এড়িয়ে পালিয়ে এসেছি । আমাদের অপরাধ চেয়ারম্যানের মেয়ে আমাদের গোত্রের ছেলেকে বিয়ে করে এখন আমাদেরই ধর্মে দীক্ষা নিয়েছে । ওরা ঢাকায় পালিয়ে গ্যাছে । এই অপরাধে রাতের অন্ধকারে সবগুলো ঘরে আগুন দিয়েছে । আমি ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম , চারিদিকে আগুন দেখে পিছনের দরজা দিয়ে বের হয়েছি । ঘুমন্ত মানুষগুলোর কি অবস্থা কে জানে ? আহহ !ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলো আবার । আপনি আমার অনেক উপকার করলেন । আমি আপনার কাছে চির কৃতজ্ঞ হয়ে থাকলাম । এবার যান আপনি ঘুমিয়ে পড়েন । ব্যাথা টা একটু কমলেই আমি আস্তে আস্তে চলে যাবো ।

-এই অবস্থা নিয়ে আপনার কোথাও যাওয়া চলবে না । এ কথা কিসের অধিকারে বললাম জানিনা । ঘরে যেয়ে একটা বালিশ আর কাঁথা এনে দিয়ে দরজাটা বাইরে থেকে তালা দিয়ে দিলাম ।

সাবধানী কালো বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে পেরিয়ে যাওয়া রাতটা দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি নিজেও জানিনা । বিছানা ছেড়ে মুখে চোখে জল দিয়ে দেখলাম পুরো উঠোন জুড়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ । দাগ লক্ষ্য করে মুছতে মুছতে গেট অব্দি আসলাম । গেইট খুলে বাইরেটাও মুছে নিলাম । ছুটলাম ভাড়ার ঘরের দিকে । ধাক্কা মেরে তুলে দিলাম – হাত মুখ ধুয়ে রেডী হন । যে কোনো সময় আপনার খোঁজে আসতে পারে ওরা । বলতে বলতেই বাইরের গেটে কড়া নাড়ার শব্দ শোনা গেলো । সেই শব্দে জেগে উঠলেন মা । বিরক্ত হয়ে বললেন – এ সময় কে আসলো ?
দৌড়ে গিয়ে গেট খুললাম ।দেখলাম চেয়ার ম্যান এর ছেলে আর ওদের এক চ্যালা দাঁড়িয়ে রয়েছে গেটের বাইরে । ওরা বললো – ভেতরটা একটু সার্চ করবো ।

- মাত্র ঘুম থেকে উঠলাম । আপনারা নক করলেন , গেইট খুললাম । এর মাঝে গেইটই খুলিনি ! কেউ ভেতরে ঢুকবে কি করে ?

- সাবধানে থাকবেন । ! কিছু দুর্বৃত্ত রাতে অনেক বাড়িতে আগুন দিয়েছে । যে কোনো সময় আপনাদের বাড়ি ঘরেও হামলা করতে পারে।

- আমরা তাহলে আসি আসসালামুয়ালাইকুম।
ওরা চলে যেতেই মার ঘরে গিয়ে রাতের সমস্ত ঘটনা মাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা করলাম । শুনে মা এসে ভাড়ার ঘরে ঢুকলো। ওখানে গিয়ে দেখলাম ঘরে কেউ নেই । ও বোধ হয় বাইরের গেটে কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে চলে গ্যাছে।

পা -টা অসম্ভব ফুলেছে দেখেছিলাম ভোরে । এই পা নিয়ে কতদূর যেতে পারবে জানিনা । শুধু মনে মনে কামনা করলাম যেনো কোনো ভাবে ওদের কাছে ধরা না পড়ে যায় । অসম্ভব মন খারাপ নিয়ে গরম ভাত আর আলু ভর্তা খেতে বসলাম ।
মা বললেন - শুধু মাখাচ্ছো , মুখে দিচ্ছোনা কেনো ?
বুঝলাম আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না আজ ।
দূরে কুকুর চিৎকার করছে একটানা , সে চিৎকার মনের ভেতর বিঁধছে আর বাড়ির মধ্যে কোথায় যেনো কিট কিট করে কাঠ খাচ্ছে ঘুণ পোকা ।



লেখক পরিচিতি
সাবরিনা নিপু
গল্পকার। কবি।
ঢাকায় থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন