মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

পাঠপ্রতিক্রিয়া : আনিসুজ জামানের ‘ভালবাসা কারে কয়’--একটি পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আখ্যান


নিঝুম শাহ

আমাদের উপমহাদেশের বা একেবারে নির্দিষ্টকরণ করে আমাদের দেশের পারিবারিক কাঠামো বা উপরিকাঠামোর মূল ভিত্তিই কিন্তু আন্তরিকতা বা আভ্যন্তরীণ বন্ধন। এখানে নৈতিকতার চর্চাও তাই পরিবারকেন্দ্রিক। পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা এখানে এখন পর্যন্ত তেমন শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে পাত্তা পায় না, অন্তত সাধারণ মানুষের কাছে। যদিও উচ্চবিত্তের বা একেবারে নিউক্লিয়ার পারিবারিক কাঠামোতে তা অনেকটাই আলগা। মধ্যবিত্তের ঘরেও এখন পালটে যাচ্ছে পরিবারের সেই পুরাতন কাঠামো বা সংস্কার। কিন্তু সাধারণ জনগোষ্ঠীর কাছে তা এখনো মোটাদাগে চর্চিত বা মান্য। আনিসুজ্জামানের এই ‘ভালবাসা কারে কয়’ গল্পটিকে আমি ‘পারিবারিক মনস্তত্ত্বের আখ্যান’ বলতে চাই এ কারণে যে আমাদের পারিবারিক কাঠামোর গঠন বা সংস্কার পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে অধিকাংশক্ষেত্রেই ভিন্ন। এখানে অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র তাত্ত্বিক সংঘর্ষ থাকা সত্তেও শেষপর্যন্ত তা অভ্যেস বা সংস্কার বা কালক্রমে বা সংস্কৃতিতে পর্যবসিত হয়। তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হয়ত যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না বা তাত্ত্বিক দিক থেকে তা হয়ত আসলেই অগ্রহণযোগ্য, কিন্তু আমাদের সংস্কৃতি তাই লালন করে। কিছুদিন আগে শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের যৌথ পরিচালনায় ‘বেলা শেষে’ নামের ওপার বাংলার একটি চলচ্চিত্র বেশ আলোড়ন তুলেছিল। নন্দিতা রায়ের রচিত এই চলচ্চিত্রের সংলাপগুলোও বেশ সাড়া ফেলেছিল। কী ছিল এই চলচ্চিত্রে? আমাদের বাঙালি জীবনের পারিবারিক আটপৌরে জীবন, যেটার মূল্ভিত্তিই মায়া, বন্ধন আর পারস্পারিক সৌহার্দ্য। ৫০বছরের যৌথ জীবনে পৌঢ় যখন স্ত্রীকে বলছেন তাঁর খেয়ে উঠে পরার পর বাসন মুছে খাওয়া তার অভ্যেস, কিংবা আরো সব আচরণ যা তার স্ত্রী করে থাকে তা তার অভ্যেস; ভালবাসা নয়, তখন স্ত্রীর চরিত্রে স্বাতীলেখা সেনগুপ্তের কথাগুলো যে কাউকে আমাদের ভূখণ্ডের মানুষের পারিবারিক যৌথ জীবনকে নতুন করে ভাবাবে। চরিত্রটি বলছেন, ‘চান করে উঠে ভিজে তোয়ালেটা তুমি রেখে দাও, ঐ ভিজে তোয়ালেতে আমি চান করি, তোমার গন্ধটা আমি পাই, এটা আমার অভ্যেস। খাওয়ার পর খেয়ে ওঠার পর মাছের যে অংশগুলো তুমি ফেলে দাও, কনককে আমি বলি ওটা ফেলে না দিতে, ওটা আমি খাই, ওটা আমার অভ্যেস। এখন যখন তুমি বাথরুমে যাও, খুব গন্ধ হয়। বয়সটাও হয়েছে তো, তোমার পুত্রবধু এটা সহ্য করতে পারে না। তুমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলে আমি ঢুকে ভাল করে জল দিয়ে দেই, ঐ গন্ধটাও আমার ভাল লাগে। ওটাও আমার অভ্যেস। আর এই অভ্যেসগুলোই আমার কাছে প্রেম!’ ফলে বাঙালি সংস্কৃতিকে নারীদের এই যে মায়াময় ত্যাগের রূপ, তা যেমন পাশ্চাত্যে নেই, তা কিন্তু আমাদের বাঙালি সমাজেও সময়ের সাথে প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। কিন্তু এই যে পারিবারিক সহাবস্থানে একে-অপরের জন্য মায়া, একে-অপরের জন্য ত্যাগের ইচ্ছা তা একান্তই আমাদের নিজের। চলচ্চিত্রটির একেবারে শেষে কিছুদিন স্ত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পর সৌমিত্র বলছেন- ‘ওখানে তো আমার ঝগড়া করারও কেউ নেই।‘ এই আমাদের সংস্কৃতির মূলকথন। ঝগড়াও এখানে কখনো কখনো ভালবাসার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম। ফলে ‘ভালবাসা কারে কয়’ গল্পে যখন আপা চরিত্র অর্থাৎ কথকের নানী মাঝরাতে নানার পিঠ চুলকে দেবার বিরক্তির জন্য বকাঝকা করেন, সেই ব্যক্তিই আপনজনের সংস্পর্শ পাবার জন্য নানার পিঠ চুলকে দেবার বাঁশের হাতল গায়েব করে দেন। এই প্রচ্ছন্ন মাঝরাতের গালিগালাজই তাদের একধরনের ভালবাসা! অনেকটা চলচ্চিত্রটির সেই ’ওখানে তো আমার ঝগড়া করবারও কেউ নেই’ এর মতোই।

একেবারে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে স্বামীর বা বয়োজেষ্ঠ্য কারো নাম মুখে না আনার এক ধরনের সংস্কৃতি আমাদের ছিল। আপন কারো নাম মুখে নেওয়া যাবে না এটা যুক্তিতে ধোপে টিকে না বলেই আস্তে আস্তে তা বিলোপ হয়ে গেলেও যখন দেখি এখনও কোনো নারী তার স্বামীর নাম মুখে আনতে মৃদু লজ্জা পাচ্ছে, তার সৌন্দর্য আমাদের সরল জীবনযাপনের কথাই মনে করিয়ে দেয়। চোখের সামনে ভেসে ওঠে অন্নদামঙ্গলের মা লক্ষীর স্বামীর নাম মুখে না এনে নাম বলার কৌশল-‘ অতি বড় বৃদ্ধপতি সিদ্ধিতে নিপুণ।/ কোন গুণ নাহি তার কপালে আগুন।।‘ পারিবারিক জীবনযাপনে ডাকার কৌশল বাঙালি আবিষ্কার করেছিল তাই সন্তানের নামের সাথে মা যোগ করে। ফলে আনিসুজ্জামান যখন লিখছেন- ‘আগের মানুষ স্ত্রীকে নাম ধরে না ডেকে প্রিয় সন্তানের মা বলে ডাকত। সাধারণত বড় সন্তানই হত প্রিয়। কিন্তু মা চার নম্বর সন্তান হয়েও কেন যেন নানার প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।‘ কিংবা যখন বলছেন , ‘অভাবের সংসারে আপা প্রতিবার ভাত রান্নার সময় চাল মেপে হাড়িতে ফেলার আগে একমুঠ করে চাল জমিয়ে রাখত গর্তের ভেতর পুতে রাখা কলসিতে। যখন চাল কেনার টাকা থাকত না, তখন হাত যেত সেই কলসিতে। গাঁয়ের প্রায় সব বাড়িতেই তখন সেই ব্যবস্থা ছিল।‘ যেন সেই বধুটির কথাই মনে পরে ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধে-ভাতে।‘ তখন আমাদের শ্বাশত গ্রামীণ পারিবারিক জীবনের কথাই ওঠে আসে।

গল্পটির দাদা চরিত্রটি বেশ সাবলীল ও যুক্তির আঁধার। এই চরিত্রের উপর ভর করেই লেখক নিজের ভাবনা প্রোথিত করেছেন গল্পে। দাদা চরিত্রটি মৌলবি হলেও আশ্চর্যজনক যুক্তির ধারক এবং বিজ্ঞানমনস্ক। অবশ্য তিনি যে উদারপন্থীএবং জ্ঞানী হবেন, তার ইঙ্গিত কিন্তু লেখক আগেই দিয়েছেন। দাদা সম্পর্কে গল্পে বলছেন- ‘দাদা অনেকগুলো ভাষা জানতেন। দূরদূরান্ত থেকে লোক আসত মাজার ব্যথার জন্য জলের কাঠি পড়ে নিতে। দাদা কি কি দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিলে সেটা মাজায় বেধে দাদার শিখিয়ে দেয়া কিছু ব্যায়াম নিয়মিত করলেই দিন কয়েকের মধ্যে ব্যথা উধাও। আমি বলতাম দোয়াটা আমাকে শিখিয়ে দিতে। উনি বলতেন- ‘দাদারে, দোয়া কালাম আসলে উসিলা। সব অইল বিশ্বাস আর ব্যামটা’। তখনই কি উনি প্লাসিবো এফেক্টের বিষয়ে জানতেন।‘ আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের কাছে শিক্ষা এখনো পৌঁছাতে পারেনি বলেই অশিক্ষা, কুসংস্কার থেকে তারা এখনো মুক্ত হতে পারেনি। এখনো গ্রামের অনেক মানুষের ভরসা পানিপড়া বা দোয়া পরে ফুঁ দেওয়া। চিকিৎসার টাকা না থাকলেও শুধু ফুঁ তেই তারা অনেকেই আরোগ্য লাভ করেন। করেন, কারণ প্লাসিবো এফেক্টের মতোই শুধু মানসিক শক্তির বা এই ভরসা থেকে যে, এই ফুঁ এর কারণে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। ফলে আভ্যন্তরীণ কোষের শক্তি ও সাহায্যেই তারা অনেকে সুস্থও হয়ে ওঠে। আমাদের সমাজে শিক্ষার অভাবে ধর্মীয় উম্মাদনা কিরূপ কাজ করে তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ গল্পের এই বাক্যটি হতে পারে ‘মৌলবির নাতি বলে বাংলা পড়ার সাথে সাথে সাত বছর বয়সেই কোরান খতম দিতে হয়েছিল বাংলা অর্থ সহ।‘ অশিক্ষার কারণেই আমাদের এখানে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার সমাহার। সাধারণে্র অন্ধবিশ্বাসকে কাজে লাগিয়েই তাই এখানে একদল ভণ্ড সবসময় নিজের ফায়দা লুটেছে। আর এসব আনুষ্ঠানিকতায় সাধারণ মানুষই বরাবর প্রতারিত হয়েছে, বেড়েছে হানাহানি, সংঘাত। বৃটিশদের বপন করা ডিভাইড এন্ড রুল পলিসির চর্চা পরবর্তীতে এখানে রাজনীতিবিদেরাও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে নিজেদের স্বার্থে। তাই আমাদের এখানে অন্যের ধর্মের প্রতি সহিংসতা বা আ্নুষ্ঠানিকতার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ভয়ানকভাবে। এমন সময়ে দাদার মত একজন উদারপন্থী চরিত্র আমাদের মধ্যে আশা জাগায়; যিনি ধর্মকে ধারণ করেণ যৌক্তিকতায়, অন্ধ অনুকরণে নয়- ‘পাশের গ্রামে মাইকে আযান হলেও আমাদের স্কুলের মসজিদে আযান হত খালি গলায়। দাদাকে কারণ জিজ্ঞেস করলে বলতেন নবী করিম সাঃ যেহেতু বুলহরন ব্যবহার করেন নি তাহলে আমরা কেন করব। আর তা ছাড়া সব ধর্মের মানুষ যদি দিনের বিভিন্ন সময়ে পাঁচবার করে ধর্মের ডাক দেয় তাহলে মানুষের কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। যার নামাজ পড়ার বা সেহরি খাবার যার ইচ্ছে হবে সে আপনা আপনিই জানবে। মানুষের সময় হচ্ছে তার জীবন। যে ঘুমাতে চায় তাঁকে জোর করে উঠানোর অর্থই হচ্ছে তাঁকে আংশিক খুন করা।‘ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ যে মূলমন্ত্রে দীক্ষিত হয়ে আমরা করেছিলাম আমরা দেখেছি স্বাধীন দেশে তার সশব্দ অবমাননা। অসামপ্রদায়িক ভাবনার মূলমন্ত্রে যার সূচনা পুরোনো শকুনের খামচিতে সেখানে নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতার বীজ। ফলে মসজিদে মসজিদে চলে-‘এইতো সেদিন জুমার খুতবায় শুনলাম বাংলায় লেখাপড়া নাকি হারাম।‘

আনিসুজ্জামানের গল্পটি এই অর্থে বিশিষ্ট যে গল্পটিতে প্রশ্নের পর প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন লেখক । তবে শুধু প্রশ্ন তুলে প্রসঙ্গটিকে উসকে দিয়েই ক্ষান্ত হননি বরং অধিকাংশক্ষেত্রেই সমাধান করার পথ বাতলে দিয়েছেন। বাংলায় পড়ালেখা হারাম না হালাল তার উত্তর তিনি দিচ্ছেন দাদার বয়ানে-‘ যদিও জানতাম যে একমাত্র কোরান শরীফে লেখা আছে হারামের কথা। আর কোরানের কোথাও এরকম কিছু নেই। স্বয়ং নবীজী বলেছেন জ্ঞানের জন্য চীনে যেতে। চীনের ভাষা কি আরবী। আর বাংলা হল মাতৃভাষা। হারাম হলে সে ভাষায় এরা কথা বলে কেন?’

শারীরিয় বর্ণনায় লেখকের আচরণ বেশ স্বাভাবিক এবং প্রশংসনীয়ও বটে। ফলে দাদার আঁড়ের আকার বা বর্ণ্না নিয়ে তিনি যেমন কুণ্ঠা করেননি, তেমন নানীর স্তনের বর্ণনাতেও। একটা বয়সের পর দাদা-দাদি স্থানীয় ব্যক্তিদের শারীরিক চাহিদাটি ক্রমশ কমে গেলেও মানসিক স্পর্শ তারা চান। এবং মানসিক সময় কাটানোর সাথে নাতি-নাতনির সাথে মস্করা জাতীয় শারীরিক গল্প করতেও উতসাহবোধ করেন। একটা বয়সে যখন মানুষ শারীরিকভাবে তেমন সক্ষমতা রাখেন না তখন বিভিন্ন শারীরিয় ইঙ্গিত বা কথার মাধ্যমেই তারা তাদের শারীরিক চাহিদার বিষয়টিতে তৃপ্ত হন বলেও বিজ্ঞান সমর্থন করে। ফলে তাদের নানা-নানির সাথে সময় কাটানো বা তাদের অক্ষম উদম শরীর নিয়ে খেলা করাটা নিয়ে লেখক কোনো ভণিতা রাখেননি-‘ বাড়িতে আসলে মাঝে মাঝে আপার কাছেও শুতে হয়। দাদা আর আপাকে আমি আর আমার ছোট বোন ভাগাভাগি করে নিতাম। দুজনের দেহই ছিল আমাদের খেলার বস্তু। আপার ঝোলা কুঁচকে যাওয়া দুই স্তন নিয়েও একই ভাবে ডিম ফেটে ভাজার খেলা খেলেছি। আপাও কিছু বলতেন না। বরঞ্চ প্রায়ই দাদার কাছে বেশী শুলে উনি অভিযোগ করতেন। বলতেন ‘ আমি কিচ্ছা জানিনা দেইখা তোমরা আমার কাছে থাকবার চাও না।‘

চরিত্র অনুযায়ী মুখের ভাষা আর সংলাপধর্মীতা গল্পটির বর্ণ্নে সহায়ক হয়েছে। চিত্রকল্পের ব্যবহারও ঝকঝকে। সহজ ভাষায় কোনো ইজমের ব্যবহার না করে তিনটা পৃথক পৃথক প্যারায় স্বাভাবিক পারবারিক মনস্তত্ত্বের চিত্রায়ণ করেছেন বেশ দক্ষতায়- ‘যখন উনার বুকের কাছে শুয়ে সহস্র এক আরব্য রজনীর শেহেরজাদীর গল্প শুনি, বা বোনের সাথে যখন পেটের ঝুলে পড়া চামড়া নিয়ে ডিম ফেটে ভাঁজির খেলা খেলি তখন প্রায়ই আমার হাঁটু গিয়ে লাগে আড়ার বীচিটার গায়ে। উনি ব্যাথায় আঃ করে উঠেন। আমার কান্না পায়। উনি কিন্তু তারপরও চিত হয়ে শুয়ে থাকেন অনড়। বোন আর আমি উনির নাভীর গর্তটাকে চুল্লি বানিয়ে ভেতরে লাকড়ি ঠেলে দিয়ে উনার চামড়া অনবরত ফেটে যাই। আজ মনে হয় আমাদের এই খেলাতে উনি বাহ্যিক ব্যথা সহ্য করলেও মানসিক আনন্দ পেতেন।‘ এই যে ‘বাহ্যিক ব্যথা সত্তেও মানসিক আনন্দ’ আপাত বিরো্ধাভাস হলেও এইরকম পারিবারিক বন্ধন আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের অংশ। যেখানে আমরা হয়ত কলহে লিপ্ত হই কিন্তু সেই কলহটাও আসলে বন্ধনেরই অংশ বা নিছক জীবনযাপনের বিনোদনের খোরাক। ফলে মধ্যরাতে নানির নানার পিঠ চুলকে দেওয়ার আহবানে নানি বিরক্তির গালিগালাজ বর্ষণ করলেও সে বাঁশের তৈরি পিঠ চুলকানোর কৃত্রিম হাতটা গায়েব করে দিতে ভোলে না। যেমন কথকও পিঠ চুলকানোর ব্যাকচেকারটিকে ডাস্টবিনে ঠেলে দিতে ভোলে না।

আনিসুজ্জামানের লেখায় যে দিকটি ব্যক্তিকভাবে আমার ভাল লেগেছে তা হল গল্পে একটা নির্দিষ্ট প্লটে তিনি আটকে থাকেননি। পারিবারিক আবহের একটা গল্পে তিনি সমাজ এমনকি বৃহৎ পরিসরে দেশকে নিয়ে চলে এসেছেন। সেখানে স্পর্শ করে গেছেন আমাদের গৌরবের অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধকে। গল্পের খ। অংশে লিখছেন- ‘এবারে এসেছি অনেক দিনের জন্যে। এক রাত্রে গোলাগুলির শব্দ। পরের দিন কয়েক হেঁটে রাস্তায় কারও বাড়ির গোয়াল ঘরে ছাতু খেয়ে ঘুমিয়ে শেষে বাড়িতে এসেছিলাম। রাস্তায় আসার সময় অনেক মিলিটারি ছিল। মাঝে মাঝে মা আমার চোখ ঢেকে রাখত হাত দিয়ে আর কোন মেয়েমানুষের বা পুরুষের চিৎকার কানে আসত। আমরা আরও জোরে জোরে পা ফেলতাম।‘ জাতিগতভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হচ্ছে জাতীয় জীবনে তো নয়ই , আমাদের প্রাত্যহিক জীবনেও মুক্তিযুদ্ধকে আমরা লালন করতে পারিনি-এটা আমাদের একটা অন্যতম প্রধান দুর্বলতা। মুক্তিযুদ্ধের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন বলেই আজ আমরা এতটা উন্মূল জীবনযাপন করি। ফলে গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায় সাহিত্যে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে আসাটা এখন সময়ের দাবি বলেই আমি মনে করি। একটা পারিবারিক গল্পে মুক্তিযুদ্ধ তাই ঢুকে গেলে আমরা আপ্লুত হই। তবে হয়ত সেখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে আরেকটু স্পেস দিতে পারতেন বা আরেকটু নির্দিষ্ট করতে পারতেন। শুধু এক’ মিলিটারি’ শব্দ বা না’রী-পুরুষের চিৎকারে’ মূল মুক্তিযুদ্ধকে তো ধরা যায় না, সে সামরিক শাসনের সময়ও হতে পারে। কিন্তু মূল গল্পের প্লট বিবেচনার কারণেই বোধ হয় লেখক মুক্তিযুদ্ধের প্লটটিকে বেশি স্পেস দিতে চাননি অথবা অবচেতনভাবে ততটুকুই খেলা করে গেছে তাঁর মনে।

গল্পটির ভাষাও বেশ প্রাঞ্জল, আর বলার ভঙ্গিটিও খুঁড়িয়ে চলে না, বেশ প্রবাহমান। লেখককে আমি ব্যক্তিকভাবে অনুবাদক হিসেবেই জানতাম। পাঠক হিসেবে এটা অবশ্যই আমার সীমাবদ্ধতা। লেখকের অন্য কোনো মৌলিক গল্প পড়ার সুযোগ আমার হয়নি। আশা করছি গল্পের রাজ্যে তাঁকে আমরা বেশ সাবলীল্ভাবেই পাব।

----------------------------------
'মূল গল্পের লিঙ্ক। ক্লিক পড়ে পড়ুন
ভালোবাসা কারে কয়

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন