মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মৌসুমী কাদেরের গল্প : রেড়ির তেল


মধ্যদুপুর। বেলের তীব্র শব্দে বিরক্ত হয়ে গজ্‌ গজ্‌ করতে করতে দরজা খুলেই শৌনক দেখল বন্ধু গুলবাহার দাঁড়িয়ে। ওঁর ঝাঁকড়া চুলগুলো দিকবিদিক ছড়ানো। পাঁচটা রুদ্রাক্ষের মালা গলায় পেঁচান। চুলগুলো থেকে উড়ে আসছে কড়া মশলার ঘ্রাণ। মেথি, জিরা, এলাচ-দারচিনি, কাজু বাদাম, আমলকি... এ পর্যন্ত ঘ্রাণটা উদ্ধার করা সম্ভব হলো। তার উপর আর কি আছে সেটা আন্দাজ করা মুশকিল।
কোনমতে নিজেকে সামলে রেখে শৌনক জিজ্ঞেস করল, ‘চুলের মধ্যে কি মাখিয়েছিস্‌?’ দাঁত বের করে বিশাল এক হাসি দিয়ে গুলবাহার বলল, ‘রেড়ির তেল।’ এরপর সে ঐ তেলের গুণকীর্তন শুরু করল। কবি রবি ঠাকুর নাকি ছেলেবেলায় নিয়মিত রেড়ির তেল ব্যবহার করতেন। চুল গজাতে রেড়ির তেলের জুড়ি নেই! এসব শুনে শৌনকের রাগ আরও বেড়ে গেল। কিন্তু মুখে কিছু বলল না। গুলবাহার তেল শুধু মেখেই আসেনি, সঙ্গে আবার এক বোতল নিয়েও এসেছে। শৌনক তেলের বিকট গন্ধটা নাকের ভেতর আঁটকে রাখল।

শৌনকের আবার ইদানীং গোছায় গোছায় চুল পড়ছে। ডাক্তার বলেছে, ‘সম্ভবত আপনার মাথায় শিঘ্রীই টাক পড়তে যাচ্ছে।’ কথাটা শোনার পর থেকেই গুলবাহারের রেড়ির তেলটা মাথায় লাগাবার ভাবনাটা মাথায় এলো। বড় বড় কোম্পানিগুলো আজকাল রেড়ির তেল ব্যবহার করে বিউটি প্রোডাক্ট তৈরি করছে। পাশের বাড়ির বৌদিরও ডেলিভারীর সময় ডাক্তার বলেছিল, ডেট ওভার, সিজারিয়ান করতে হবে। ওমনি ওর বর বেঁকে বসল। অবস্থা যখন মর মর, তখন স্বামী উপায় না দেখে কোন এক বন্ধুর পরামর্শে রেড়ির তেল কিনে আনল। খালি পেটে সন্ধ্যায় এক চামচ, আবার রাতে আরেক চামচ। সেদিনই ভোর রাতে শুর শুর করে বাচ্চা বেরিয়ে এলো। ডাক্তার নিজেও খুব অবাক। তারপর থেকে বৌদি সেই যে রেড়ির তেল ব্যবহার শুরু করল আরতো থামেই না। পেটের দাগ দূর করা, নখের গোড়ার চামড়া নরম করা, এমনকি ব্রণ কমাতেও বেলায় বেলায় রেড়ির তেল।

পরের দিন ৭৫০ মিলিলিটারের পুরো বোতলের অর্ধেকটাই মাথায় আর সারা শরীরে ঘষে ঘষে মাখাল শৌনক। কী যে ঘন আর চট্‌চটে... মাখার সাথে সাথে সত্যিই শরীরের চামড়া মসৃণ আর চকচকে হতে শুরু করল। কিন্তু ঝামেলাটা শুরু হলো ঘন্টাখানেক পর। একটা উৎকট গন্ধ সারা বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎই দেখা গেল শৌনকের শরীরের চুলগুলো লম্বা হয়ে মাটির দিকে বেয়ে পড়তে শুরু করেছে। ওমা! কি অস্বস্তি! এ কীভাবে সম্ভব? এমন ঘটনাও কি ঘটে ? না হতে পারে? যতই সময় যাচ্ছে শৌনক যেন হাজার বছর পুরনো পৃথিবীতে ফিরে যাচ্ছে। তিরিশ বছর বয়েসি একজন পুরুষ শরীর হারানোর যন্ত্রণায় হাউমাউ করে কাঁদছে।  পেট, বুক কর্কশ, কালো শক্ত লোমে ভরে গেছে। নিচেও একই অবস্থা। লোকে কী ভাববে তার চেয়েও বড় কথা তাঁকে দেখেতো কেউ চিনতেই পারবে না। বরং কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকবে। যে কেউ ভাববে শিম্পাঞ্জি বা বনমানুষ। কোনরকমে নিজেকে লুকোতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ল সে। খোলা মাঠ বরাবর হাঁটা দিল। মাঠের পাশেই ছোট্ট একটা গাছের ঝোপে লুকিয়ে রাখল নিজেকে। কিন্তু তাতে খুব একটা সুবিধে হল না। পাশের স্কুলের দুয়েকটা ছেলেমেয়ে দেখে ফেলল। ছেলেধরা ভেবে ওরা প্রিন্সিপালকে খবর দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কোটবাড়ির পুলিশ এসে শৌনককে সোজা ধরে নিয়ে গেল থানায়।

একটা অন্ধকার স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে শৌনককে থাকতে দেয়া হলো। দেয়াল থেকে পেশাবের দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। এমনকি সাব-ইন্সপেক্টরের গা থেকেও একই গন্ধ বেরুচ্ছে! লোকটা শৌনকের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল। শৌনকের বর্ণনা অনুযায়ী গুলবাহার এসে তেল দিয়ে গেল আর সব দোষ রেড়ির তেলের একথা এস-আইয়ের বিশ্বাসই হলো না। মনের ভেতর প্রবল সন্দেহ রয়ে গেল। কিন্তু আরেক সহকর্মী জানাল যে থানায় এমন আরেকটা রেকর্ড আছে। তবে সেটা বেশ কয়েক বছর আগের। সেই মেয়েটা নাকি শেষ পর্যন্ত মানসিক চাপ সইতে না পেরে অসুস্থ অবস্থায় মারা গেছে।

কৌতুহলবশত শৌনক এস-আইকে প্রশ্ন করল; ‘মেয়েটার নাম কি ছিল?

খাতা ঘেঁটে দেখা গেল, তারও নাম ছিল ‘গুলবাহার’।

শৌনক চমকে উঠল নামটা শুনে! এ কি করে সম্ভব? কিছুদিন আগেই এক গুলবাহার তার বাড়িতে এসেছিল। তেল উপহার দিয়ে গেছে। একই নামের দুজন মানুষ একই চক্রে কীভাবে ঘুরে? তাছাড়া আগের গুলবাহার যদি মরেই যাবে তবে ওর বাড়িতে যে এসেছিল সে কে ছিল? দুজনের নামই বা এক হবে কেন? শৌনকের মাথায় কিছুই ঢুকছিল না। মনে মনে ভাবল, যা হবার হবে। আপাতত ঘুমিয়ে পড়াই ভাল। থানার ভেতর ঘুমাবার সুখের কথা ভাবাই যায় না। তার উপর এস-আইয়ের শাণ দেয়া চোখের ঐ বিচ্ছি্রি তাকান। সন্দেহ করছে শৌনকের সাথে মৃত ‘গুলবাহার তদন্তের’ কোন যোগসূত্র আছে কিনা। থানার ভেতর বেশ কয়েকটা ধাড়ি ইঁদুর আর বিড়াল আরামে ঘোরাফেরা করছে। ইঁদুর মারার বিষের কৌটাগুলো আশেপাশে রাখা নিষিদ্ধ। সেগুলো আলমারীর ভেতরে লুকান থাকে। সাব-ইন্সপেক্টর ভাবছে, রেড়ির তেলে কি মেশানো ছিল যে ছেলেটার এমন একটা কান্ড ঘটে গেছে?


মধ্যরাতে প্রকট শব্দে এস-আইয়ের টেবিলে রাখা সবুজ এনালগ ফোনটা বেজে উঠল। সাব-ইন্সপেক্টর ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে তীব্র চিৎকার!

- বিষ খাওয়ায় মাইরা ফেল্‌! ইন্সপক্টর চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কে? কে বলছেন আপনি?’

- ওপাশ থেকে ভরাট কন্ঠ শোনা যায়, ‘হারামজাদা, আমি তোর বাপ!’ এস আই থতমত খেয়ে বলে, ‘মুখ সামলে কথা বলেন। এটা থানা। আপনার বাসাবাড়ি না।’

- ওপাশ থেকে হুঙ্কার সহ উত্তর আসে, আমি ‘মামুন ওসমান’, আমারে চিনোস্‌ না! আর একটা কথা কইসশ্‌ তো তোর মাথা শুদ্ধা কাইটা থানার সামনে পুইতা রাখুম।’

- দেখুন, ভদ্রভাবে কথা বলুন। আপনি মামুন ওসমান হলেই আপনাকে আমার চিনতে হবে এমন কোন কথা নেই।

- কথা নাই মানে? নতুন চাকরীতে আইসশ্‌?

- জ্বী। কিন্তু আপনি মামুনই হন আর ওসমানই হন, আমার কিচ্ছু যায় আসে না। এখানে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলার কোন নিয়ম নেই।
 - তোরে নিয়ম মানতে কে বল্‌সে? টাকা লাগব তর? কয় লাখ? নাকি কোটি টাকা? বইলা ফালা? আজকের সন্ধ্যার মধ্যে যদি ঐ শিম্পাঞ্জিটারে না মারসিশ তাইলে তোরেও আমি ঐ একই কেমিক্যাল খাওয়ায়া মাইরা ফালামু ...হা হা হা...শা...লা...নিয়ম শিখাস্‌?
- স্যার...স্যার...বোঝার চেষ্টা করেন। আমি সামান্য একজন সাব ইন্সপেক্টর। ওকে মেরে ফেললে আমার চাকরী চলে যাবে।
- তাইলে আত্মহত্যার একটা ব্যবস্থা কইরা ফালা। তাইলেইতো ল্যাঠা চুইকা যায়।

এক মিনিট স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ইন্সপেক্টর বলল,
- কিন্তু ওঁকে মরতেই বা হবে কেন?
- কারণ, আমরা যে অসুধ কোম্পানী চালাইতাসি তার একটা গিনিপিগ ঐডা, বুজঝস?
- তাহলে স্যার, আরেকটা তেল বানিয়ে ফেলেন যেটা খেলে সমস্ত চুল উঠে যায়।
- চু...প! একদম চুপ। বহুত দিয়া ফালাইতাসিশ। তোরে দুই দিন সময় দিলাম। এর মধ্যে কাম সারবি, বুঝলি? আর শো্ন, তোরে কিন্তু নজরে রাখতেসি...খেয়াল থাকে য্যান...
- আপনি একটু বোঝার চেষ্টা করেন, মানুষতো আর খবরটা নিয়ে বসে থাকবে না। এর ওর মুখে মুখে রটে যাবে যে থানায় এরকম একজন মানুষ এসেছে।
- মানুষ সামলানোর দায়িত্ব তোর।
- স্যার, তুই তুকারি করবেন না। ভদ্র বংশে্র ছেলে আমি। বহু কষ্টে একটা ভাল চাকরী পেয়েছি।
- হা হা হা.....ভাল চাকরী? হা হা হা...তোর প্রমোশন লাগব? ঠিক ঠাক কাজ করলে তুই কোটি টাকার উপ্‌রে বইসা ঘুমাবি। সারাজীবনে কি কোটি টাকা কামাইতে পারবি? ভাইবা দ্যাখ্‌! বলেই মামুন ওসমান ফোনটা ঝপাৎ করে কেটে দেয়।


দূর থেকে ওদের কথাবার্তা উড়ে আসছিল শৌনকের কানে। আসন্ন মৃত্যু ঠেকাবার কোন উপায় ভেবে না পেয়ে শরীরটাকে কোনরকমে বাঁকিয়ে মাটিতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।

সাব ইন্সপেক্টর সারা থানা জুড়ে হাঁটতে থাকে। কি করা যায়! কি করা যায়! তারপর ইন্টারনেট ঘেটে মামুন ওসমানকে খুঁজে বের করে সে। বিশাল ষন্ডা-মার্কা চেহারা। মরচে পরা খয়েরি রঙের মুখ। গাঢ় কালচে খয়েরি ঠোঁট। বিশাল এক নাক। মুখের সাথে নাকের কোন মিল নেই। যেন আল্‌গা নাক লাগিয়ে দিয়েছে কেউ। যেমন কুৎসিত চেহারা তেমনি বিচ্ছিরি তাঁর ভাষা। আরো জানা গেল, মামুন ওসমানের কোম্পানির নাম ‘ওসমান ফার্মাসিউটিক্যালস’ এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত কোম্পানী এটি। এই কোম্পানির অর্থ ও সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এস-আই মুখের ভেতর থেকে এক দলা থুথু গিলে ফেলল। এ জীবনে কোনদিন তাঁর টাকার লোভ হয়নি। কিন্তু এই প্রথম মনে হলো এসব অসভ্য লোকগুলোরই কেবল টাকা থাকবে এটাতো হতে পারে না। তার মত সামান্য একজন মানুষের সারাজীবন খেঁটে মরে গেলেওতো অত টাকা হবে না। সুষমা কতবার যে হানিমুনে যেতে চেয়েছে। টাকা টাকা করে আর যাওয়া হয় নি।
থানার ভেতরে একটাই বাতি টিম টিম করে জ্বলছে। তার নিচে দাঁড়িয়ে সাব-ইন্সপেক্টর মনে মনে ভাবছে, একটা বিশাল চক্রে ফেঁসে গেছে সে। কী করবে? থানার ভেতরে আগুন জ্বালিয়ে দেবে? কুলকিনারা খুঁজে পাচ্ছিল না এস-আই। রাতের পর রাত থানায় কাটাতে হয় বলে স্ত্রী সারাক্ষণ ক্যাট্‌ ক্যাট্‌ করে। তার উপর চাকরী নিয়ে টানাটানি হলে সংসারটাই শেষ হয়ে যাবে।


সারারাত ডিউটি করে বাড়িতে ফিরে ঘুমাতে চেষ্টা করে। কিন্তু ঘুম নেই। ‘মামুন ওসমান’ বিষয়টা মাথায় ঘুরতে থাকে। দুটো সেডিল খেয়ে মাথার উপর বালিশ চাপা দিয়েও ঘুমাতে পারে না। সেই ক্ষুরধার কন্ঠ! সেই মৃত্যুভয় আঁকড়ে ধরে। মাথার ভেতর পরিকল্পনাগুলো ঘুরতে থাকে। শৌনককে এমনভাবে হত্যা করতে হবে যেন তার কোন বিচার হওয়ার সুযোগ না থাকে। সবকিছু মিলিয়ে কয়েকটা পদ্ধতির কথা এস-আই এর মাথায় আসে...
ক. এটি হতে হবে ‘আত্মহত্যা’ অথবা ‘ক্রসফায়ার’।
খ. শৌনক কীভাবে হারিয়ে গেল তার অনেক গুলো ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে।
গ. সাংবাদিকরা যোগাযোগ করলে নাটকীয় কাহিনী বানাতে হবে।
ঘ. আত্মহত্যা হলে মেরুদন্ডের হাঁড় ভাঙা অথবা গলায় দাগটা নিশ্চিত করতে হবে।
ঙ. কাউকে দিয়ে অপহরণ করানো যায় তবে লাশটা কীভাবে গুম করা হবে সে ব্যবস্থাটা আগাম ঠিক করে রাখতে হবে।
চ. রেড়ির তেল আরেক বোতল খাওয়ালে কি শৌনকের মৃত্যু হবে? সে বিষয়ে খোঁজ নিতে হবে।
ছ. সবকিছুর উপর মামুন ওসমানের সাথে দর-দামটা কেমন হবে সেটার উপর নির্ভর করছে কোন্‌ ব্যবস্থাটা কার্যকর হবে।

এপর্যন্ত ভেবে বিছানা ছেড়ে উঠে বসে এস-আই। একটা সিগারেট ধরায়। কয়েক দিন ধরেই ভাবছিল সিগারেটটা ছেড়ে দেবে। সুষমা সিগারেট একেবারেই সহ্য করতে পারে না। এমনিতেই বাড়তি টাকা নেই তার উপর অযথাই ছাইপাশ খেয়ে টাকা নষ্ট। কিন্তু এমন একেকটা কেস হাতে আসে যে সিগারেট খাওয়া বেড়েই চলে। এস-আই ভেবে রেখেছিল থানার এতসব ঝামেলার কথা স্ত্রী’কে আর বলবে না। দাম্পত্য কলহ বেড়েই চলছে। সুষমা যতই বাচ্চা বাচ্চা করে, স্নো, পাউডার মেখে বিছানায় বসে থাকে কিন্তু এস-আইয়ের মন টানে না। থানার দেয়ালের মতই সবকিছুতে তাঁর দুর্গন্ধ লাগে। কিন্তু টাকা বানাবার এইযে একটা সুযোগ সেকথা কি স্ত্রীকে না বলে থাকা যায়?

খুব সকালে থানায় পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই মামুন ওসমানের মোবাইল ফোন বেজে ওঠে...
- এস-আই...তোমার সিমকার্ড বদলায়ে তারপর আমারে ফোন কর
- জ্বি স্যার...হ্যালো...স্যার...(অন্য সিম থেকে)
- কিছু ঠিক করলা?
- জ্বী না স্যার, চেষ্টা করছি কিন্তু কোন কুল কিনারা পাচ্ছি না...
- বাহ! ‘স্যার’ শব্দটা বেশ ভালই লাগতেসে। তোমারতো দেখি বহুত উন্নতি হইসে এস আই। মানুষ মানুষরে সম্মান দিলে তার প্রতিদান দিতে হয়, বুঝলা...বলে হা হা হা করে হাস্‌তে থাকে লোকটা
- জ্বী স্যার...
- বাহ! চমৎকার। তোমার পারফরমেন্সে আমি ফিদা...মনে হইতেসে উপায়টা আমিই তোমারে বাত্‌লায় দিতে পারি.....শুধু আমি যা কমু, তুমি ঠিক তাই করবা......
- জ্বী স্যার, আপনি যা বলবেন..ঠিক তাই করব। একটুও এদিক সেদিক হবে না। কিন্তু স্যার কিছু এডভান্স...বলে আম্‌তা আম্‌তা করতে থাকে এস-আই...
- আরে ধুর...টাকা কোন ব্যাপার না। ঐটা গড় গড় কইরা তোমার একাউন্টে ঢুইকা যাইব। কত লাগবো ?
- স্যার...পাঁচ লাখ?
- হা হা হা...এস আই... এই জমানায় পাঁচ লাখ কোনো টাকা হইল? আমি তোমারে পাঁচ কোটি দিমু। তুমি মানুষ ভাল। খালি কাজটা ঠিকমত করবা...
- স্যার..., আমি বউকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় যেতে চাই। বিয়ের পর তাকে নিয়ে কোথাও যাইনি স্যার...আম্‌তা আম্‌তা করে বলে এস আই। আর ক্যাশ দিলে ভাল হয় স্যার... হঠাৎ একাউন্ট ফেঁপে উঠলে ব্যাংকের লোকেরাও সন্দেহ করবে...
- বাহ! বাহ! এইতো এস-আইয়ের মতন কথা কইলা...ক্যাশ পাঠাইতে পারি,...কিন্তু সাবধান! কেউ যেন টের না পায়। শোন, আমি তোমারে আরো দুইটা তেলের বোতল পাঠামু। সেইটার পুরাটাই পোলাটারে খাবারের সাথে মিশায়া খাওয়ায় দিবা। কেল্লা খতম! মনে হয় না আর কিছু করা লাগব। তারপর লাশটা পুড়ায়া ফেলবা। পারবা না?
- জ্বী স্যার, পারবো। কিন্তু পোড়াতে হবে কেন স্যার?
- তা না হইলেতো ময়নাতদন্তে ধরা পইড়া যাবা। পুড়াইলে একেবারে সবকিছু নিশ্চিত। কিন্তু পুড়াইবা ক্যামনে?
- লাশটা কেটে কেটে টুকরো করে তারপর থানার পেছনের জংগলে নিয়ে পোড়াবো, স্যার।
- থানায় লোকজন আছে না? ধরা পইড়া যাবা তো।
- স্যার, রাতের বেলা সবাই চলে গেলে লাশ বস্তায় ভরে নিয়ে যাবো।
- বলো কি? এইডা একটু কঠিন হয়া যাইব না তোমার জন্য। ছেলেটা কি হাল্‌কা পাতলা? তার চেয়ে বরং থানার লোকজনরে বইলা দিবা ঐ লাশে বিষ আছে। তারপর শ্বশানে নিয়া গিয়া পোড়াইবা।
- কিন্তু স্যার লোকটা তো মুসলমান।
- লাশ তো লাশই, মুসলমান আর হিন্দু কি। পোড়ানো নিয়ে কথা।
- না স্যার। এতে আরও ঝামেলা বাড়বে। থানার লোকজন ময়নাতদন্তে না পাঠালেই বরং সন্দেহ করবে।
- হুম... তাইলে থানাতেই মাইরা ফালায়া বলবা ‘আত্মহত্যা’।
- জ্বী স্যার। এটাও হতে পারে। কিন্তু ময়নাতদন্তে কি আত্মহত্যা ধরা পড়বে না?
- তাইলেতো কোন বুদ্ধিই কাজে দিল না। ময়না তদন্তে পাঠাইতেই হইব। তাইলে তোমারে দিয়া আমার লাভটা কি হইল?
- স্যার...
- হ্যাঁ বলো
- আমি স্যার তদন্তের রিপোর্ট বদলাতে পারবো। আমার লোক আছে।
- সেইটাতো আমিও পারুম। ঠিকাছে, বিশ্বাসী লোক লাগাও।

পরের দিন দুপুরে চারদিক যখন শুনশান, সূর্য যখন ঠিক মাথার ওপরে, আশেপাশের বাড়ির লোকজন দুপুরের খাবারের পর বিশ্রাম নিচ্ছে, ঠিক তখনই মোটর সাইকেলে চড়ে অচেনা একজন লোক হুট করে থানায় ঢুকল। কাগজে মোড়া একটা প্যাকেট এস-আইয়ের হাতে দিয়েই খুব দ্রুত চলে গেল। কোন কথাও জিজ্ঞেস করল না। এস-আই প্যাকেট খুলে বোতল দুটো স্টিলের আলমারীর লকারে ঢুকিয়ে রাখল। সাথে রাখা খামটা খুলে ভেতরে এক নজর দেখল। থরে থরে সাজান হাজার টাকার নোট। এক সঙ্গে এত টাকা জীবনেও দেখেনি সে। তাড়াহুড়ো করেই খামটা ব্যাগে লুকিয়ে ফেলল সে। এই প্রথম অপরাধীর ছাপ তার চোখে মুখে। চাকরীতে ঢোকার আগে শশুর বাড়ি থেকে মোটর সাইকেল উপহার দিতে চেয়েছিল, নেয় নি। আজই প্রথম সে ঘুষ নিয়েছে।

ক’দিন ধরেই সুষমা টের পাচ্ছিল এস-আইয়ের কোন কিছুতেই মন বসছে না। কেমন অস্থির অস্থির করছে। এমনকি ওঁর দিকেও ঠিকমত তাকাচ্ছে না। সংসারে মনই নেই। আয়নার দিকে তাকিয়ে কতবার যে সে নিজের চেহারাটা দেখেছে! এস-আই কতদিন হলো তাকে ছুঁয়েও দেখেনি। শরীরের উত্তাপগুলো নিভে যাচ্ছে দিন দিন । দেখতে কি এতই কুৎসিত সে? মুখটা একটু গোল বটে কিন্তু চোখের গভীর মায়াটা তো টের পাওয়া যায়। বিয়ের আগে ছোট্ট একটা প্রেম ছিল। সেসব কথার কোনটাই সে এস-আইকে লুকোয়নি। সবকিছু ভুলে গিয়েইতো মন দিয়ে সংসার করছিল। আকাশ, মাটি, আধ-পাঁকা ঘর, বেলী ফুল গাছ, পুঁই লতা, সবাইকেই কত কাছের করে নিয়েছিল। অথচ যে মানুষটাকে মন-প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছে সেই ক’দিন ধরে কেমন অচেনা অচেনা!

সেদিন পোলাও আর ডিমের কোরমা রেঁধেছিল সুষমা। এস-আইয়ের খুব পছন্দের। বাড়ির ফেরার পর থেকেই সুষমা লক্ষ করল আজ যেন তার স্বামী এক অন্য মানুষ। খুব ফুরফুরা মন। শিষ দিতে দিতে দরজা বন্ধ করল। চিৎকার করে সুষমাকে টেবিলে খাবার লাগাতে বলল। দ্রুত স্নান সেড়ে নিল। কি যেন একটা বলবার জন্য অস্থির হয়ে ছিল সে। দুজনে খেতে খেতে গল্প করল। সুষমারতো বিস্ময় আর কাটে না।
- শোন সু, তুমি ঠিকই বলেছ। তোমাকে একদমই সময় দেয়া হয় না। আই এম সো সরি।
- কি হয়েছে তোমার? সরি বলছো কেন?
- না মানে, এইযে তুমি রান্না করে বসে থাকো, আমি ফিরি দেরী করে, তোমার মন খারাপ হয়
- হ্যাঁ, তাতো হয়ই। তবে আজ যে স্যারের মেজাজ ভাল? ঘটনা কি?
- ভাবছি তোমাকে নিয়ে মধুচন্দ্রিমায় যাবো...আমাদেরতো বিয়ের পর কোথাও যাওয়া হয়নি...তাই না?

সুষমা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে এস-আই এসব বলছে। ভেতরটা আনন্দে টগবগ করে উঠল। বলল;
- সত্যিই নিয়ে যাবে?
- সত্যি। কোথায় যেতে চাও বলো?
- ঢাকা নিয়ে যাবে?
- আরে ধূর...দেশে না...বিদেশের নাম বলো
- জানো,আমার না খুব সমুদ্র দেখার শখ। যেখানেই নিয়ে যাও সমুদ্র দেখিও, ক্যামন?
- বেশ তবে সমুদ্রের ধারেই নিয়ে যাবো তোমাকে....

সে রাতটা অসম্ভব রোমান্টিক ছিল। দুজনার ভালোবাসা রঙিন হয়ে উপচে পড়ছিল। নকশা-কাটা লেসের ঝালর শাড়ি আজকাল বেশ চলছে। সুষমা ভাবল, এবার এস-আইকে বলবে একটা লেসশাড়ি কিনে দিতে। সাথে ম্যাচ করা চুড়ি আর গয়না। সেই শাড়ি পরে মধুচন্দ্রিমায় যাবে সে। এসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সুষমা।

মধ্য রাতে ঘুমের মধ্যেই এস-আই টের পেল কি যেন একটা ধড়ফড় করছে বিছানায়। কিন্তু স্বপ্নের ঘোর ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। ভোরের দিকে টের পেল পিঠের দিকে চুলের মতন কিছু একটা নড়ছে। পায়ের দিকেও কিছু একটা সুরসুর করছে। চোখ খুলেই দেখতে পেল একটা শীতল লোমশ হাত তাঁর দু পায়ের মাঝখানে ঢুকে আছে। পাশে নেতিয়ে আছে একজন লোমশ মানুষ। আতঙ্কে বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে সোজা ধাক্কা খেল পাশের টেবিলে। আর সাথে সাথেই দুটো তেলের বোতল মেঝেতে পড়ে চুরমার হয়ে গেল।

সুষমা ঠোঁটদুটো হালকা নাড়িয়ে অস্ফুট স্বরে বলল; ‘শোন, বলতে ভুলে গেছি। কাল সন্ধ্যায় তোমার এক বন্ধু এসেছিল, দুই বোতল তেল দিয়ে গেছে। বলেছে ওটা খেলে বাচ্চা হবে।’

এস আই তাকিয়ে দেখল, সুষমার দেহটা নিথর পড়ে আছে।
চোখগুলো স্থির তাকিয়ে ছাঁদ দেখছে।



লেখক পরিচিতিঃ 
মৌসুমী কাদের
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কানাডায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন