মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

সমরেশ বসুর দুনিয়া : মেজদার দোকান-২



অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, মন্বন্তরের বাঙলা, দাঙ্গা তারপর দেশভাগের বাঙলা। যুগ যুগ জিয়ে থেকে খন্ডিতা। এইযে ইতিহাস,তাকে কি আমরা জানি? মেজদার দোকানে আমাদের সন্ধ্যেগুলোতে তখন বুঝতে চাইছিলাম, কাকে বলে ভুলে যাওয়া ইতিহাস। যাকে আমরা আগের আড্ডায় অচর্চিত ইতিহাস বলেছি, তাকে সাধারন মানুষের সামনে নিয়ে আসায় সাহিত্যের ভূমিকা কি রকম হয়?

ঋত্বিক ঘটকের সুবর্নরেখায় সেই যে হরপ্রসাদ বলেছিল,’এরা যুদ্ধ দেখে নাই, মন্বন্তর দেখে নাই, দেশভাগ দেখে নাই’... । মফস্বলের সেই ধুলোধোঁয়ার সন্ধ্যেতে আমাদের চায়ের টেবিলে বারবার ফিরে আসছিল, কিভাবে না দেখা নাতিদূর অতীত ইতিহাসকে, মানুষের ইতিহাসকে বিস্মৃতির পর্দার পেছনে, ভুলে যাওয়ার সিন্দুকে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। দেখতে দেওয়া হয় না। আসলে এই অচর্চিত ইতিহাসকে ভুলিয়ে দেবার চেষ্টা প্রতিনিয়ত চলছে। নেই করে দেবার নিরন্তর প্রয়াস। কখনো রাষ্ট্র, ইতিহাসের ভূগোলের সিলেবাস টেক্সট বইএর মধ্যে দিয়ে ভোলাতে চাইছে। আবার আমরা নিজেরাই কখনো ভুলতে চেষ্টা করি অপ্রিয় সত্য বা ইতিহাসকে। ধীরে ধীরে সেই সত্য, বেশিরভাগ সময়েই নির্মম সত্যকে চেপে যাওয়া বা ভুলে যাওয়ার কসরত চলতেই থাকে। এইভাবে ঘাম রক্তেভেজা ইতিহাস চাপা পড়ে যায় বিস্মৃতির আগাছার তলায়। রাষ্ট্র-স্টেট এবং ওপরতলার পছন্দমতো স্মৃতি আমাদের জগতে রাজত্ব চালায়। কাঁচা বাঙালায় মগজধোলাই সার্থক করতে পারলেই যুদ্ধজয় শেষ হয়।

এসব কথায় যখন আমাদের বন্ধুরা টেবিল গরম করে চলছে, তখন মেজদা খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত ছিল। সেঁকা পাঁউরুটিতে মাখন চিনি কালো মরিচ মাখানো শেষ করে মেজদা আড্ডার টেবিলে এসে প্রথমেই বলেছিল, ‘জটিল এ্যাবস্ট্রাক্ট কথা রাখুন। আসলে সবাই নিজের মত করে সত্যিকে তৈরি করে। আর মেমারিতে সেটাই রাখতে চায়। ‘একমাত্র সত্যি’ বলে চালাতে চায়। দেখুননা, দ্বিতীয় যুদ্ধের পাঁচ মাসে জার্মানি, গোটা ফ্রান্স কিকরে দখল করেছিল? শুধুমাত্র জার্মান অস্ত্রবল? তাই লোকে বিশ্বাস করেছিল। আসলে ফরাসি নেতারা হার আগেই স্বীকার করে নিয়েছিল। সমাজের ওপরতলার ব্যবসায়ীদের জার্মানির সঙ্গে ব্যবসার লোভে্র জিভ লকলক করছিল, একথা কোন কাগজে লেখা হোত? এমনকি স্কুলের বইতেও এখনো থাকে না। আপনাকে আসতে হবে সাহিত্যের কাছে। ইলিয়া এরেনবুর্গের ‘পারির পতন’। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, ফরাসি সমাজের ওপরতলা কেমন করে ভেতর ফাঁপা হয়ে গিয়েছিল।’

‘কিন্তু মেজদা, আমাদের দেশে দাঙ্গা হোল,ভোটাভুটি করে মুসলিম লীগ অনেক ভোট পেল দেশভাগ হোল। এককথায় ঘরবাড়ি ভেঙ্গে দেওয়া চল্লিশের বাঙলা তো সাহিত্যে যথেষ্ট এসেছে?

‘না দাঙ্গা তেমন ভাবে আসেনি। দেখুন ভেবে। দেশভাগ এসেছে। তার যন্ত্রনা, স্মৃতি এসেছে। কিন্তু দাঙ্গা তার হিংস্র ভায়োলেন্ট দৃশ্য বা চরিত্র নিয়ে আসেনি। পাঞ্জাবে এসেছে। পাঙ্গাবি এবং উর্দু সাহিত্যের মধ্যে দিয়ে। ইন্তিজার হুসেন, কৃষ্ণা সোবিত, কৃষনচন্দ্র, রাজেন্দ্র সিংবেদি, মন্টো, ভীষ্ম সাহনি একের পর এক দাঙ্গাকে সামনে রেখে বুকের মধ্যে দাগ বসানো সাহিত্যের জন্ম দিয়েছিলেন। উল্টোদিকে গোটা বাঙলায়, রাজধানী কোলকাতায়, একের পর এক দাঙ্গা হয়েছে। সেই ১৯০৫ সাল থেকে শুরু হয়েছে, কোলকাতাতেই বিশের দশকে অন্তত দুবার বড়রকমের দাঙ্গা হয়েছিল। আর ১৯৪৬ এর দাঙ্গা তো বাঙলার রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছিল। কিন্তু আপনাদের জিজ্ঞাসা করলে সঙ্গে সঙ্গে মন থেকে কোন উপন্যাসের নাম বলতে পারবেন না যাতে সরাসরি দাঙ্গা চরিত্র হিসেবে এসেছে। ’

আমরা সব বন্ধুরাই স্বীকার করেছিলাম যে মেজদা, ফাঁকা জায়গাটা ঠিক লক্ষ্য করেছে। বাঙলায় বিশের দশকে ‘কল্লোল’কে কেন্দ্র করে নতুন ধারার সাহিত্যগোষ্ঠী এসেছিল। অপরদিকে ‘মোসলেম ভারত’, নিজামুদ্দিনের ‘শিখা’ পত্রিকা। ত্রিশ দশকের গোড়াদিক থেকে ‘দেশ’ পত্রিকা-এতসব নতুন সমাজমুখী রিয়ালিস্টিক সাহিত্যের নানা মোড় বা ধারা এসেছে কিন্তু দাঙ্গা জর্জরিত বাঙলায় দাঙ্গাকে সাহিত্যের বিষয় করতে সে যুগে সব ধারাই এড়িয়ে গেছে। অনেকপরে এসেছেন গৌরকিশোর ঘোষ। ‘প্রেম নেই’ এবং ‘প্রতিবেশী’ উপন্যাসে। উনি ট্রিলজি মধ্যে দিয়ে সমস্যাটাকে ধরার চেষ্টা করেছিলেন। অথবা জ্যোতির্ময়ী দেবীর ‘এপার গঙ্গা ওপার গঙ্গা’ কিংবা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। বরঞ্চ শিল্পী প্রকাশ কর্মকার তাঁর স্মৃতিকথা ‘আমি’ তে চোখের সামনে দেখা দাঙ্গার নারকীয় অত্যাচার হত্যার বর্ননা দিয়েছেন।

মেজদা চা খেতে খেতে পেঁয়াজ কুঁচচ্ছিল।মাথা নিচু অবস্থাতেই বলতে লাগল, দাঙ্গা মানে দেশভাগ নয়। দেশভাগের সাহিত্য বলতেই ওয়ালিউল্লাহ, অতীন, সেলিনা জাহান এরকম অনেক নাম মনে আসবে। কিন্তু দাঙ্গা। কোলকাতার ছেচল্লিশের আগস্টের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং। তার বদলায় নোয়াখালি-টিপেরা। আবার পালটা ভাগলপুরে। তার পরেই উত্তর প্রদেশের গড়মুক্তেশর। এসব খবর, ইতিহাস, সাধারন মানুষকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

আমাদের পুরনো বন্ধুরা বলেছিল, ‘তা অবশ্য ঠিক। এসব ইতিহাস জানতে গেলে আমাদের রিসার্চ পেপারের দ্বারস্থ হতে হয়। জয়া চ্যাটার্জি,সুরঞ্জন দাস,সব্যসাচী ভট্টাচার্য্য ইত্যাদি আরো অনেক আধুনিক ঐতিহাসিকদের কাছে যেতে হবে। কিন্তু খুব কম সাধারন মানুষ আলাদা করে এসব চর্চা করে। তাও আবার বেশির ভাগ এসব বই বাংলায় পাওয়াও যায় না। সাধারন মানুষ লোকমুখে একতরফা ইতিহাস শুনে এসেছে। ফলে দাঙ্গার ইতিহাস গল্পকথায় পরিণত হয়ে গেছে। হিন্দুর ইতিহাস, মুসলমানের ইতিহাসের জামা পরে আমাদের মনের মধ্যে তারা ঘুরে বেড়ায়। সাধারন পাঠকের কাছে সাহিত্য তার দায়িত্ব পালন করেনি। সমালোচক সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় ‘দেশভাগঃবাংলা সাহিত্যের দর্পনে’ বইতে এই প্রশ্ন তুলে উত্তর খুঁজেছেন। সোশ্যালসাইকোলজিস্ট আশিস নন্দী তো সরাসরি লিখেছেন, ‘Though half the killing had taken place in that part of the world(বাংলা), the literary imagination there had obstinately refused to rise to the situation.’

মেজদা সেদ্ধ আলুর খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে বলেছিল, ‘ যেসব সাহিত্যিক পূর্ববঙ্গ থেকে চলে এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গে, হয়ত ছেলেবেলায়, তাঁরা সবাই উচ্চবর্ণের মধ্যসত্ত্বভোগী সামাজিক স্তর থেকে এসেছিলেন। ফলে তাঁদের লেখায় ছেড়ে আসা ধানের মরাই, পাকা দালান-কোঠা-ঠাকুর দালান বারবার এসেছে। এইসব লেখকদের পরিবারদের বেশিরভাগকেই সরাসরি দাঙ্গার বীভৎসতার মুখোমুখি হতে হয়নি। আর যারা পশ্চিমবঙ্গ থেকে ওপার বাঙলায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তাঁদের আবার অন্য সমস্যা। অনেকেই উর্দু ঘেঁষা হিন্দিভাষী। উর্দুভাষীদের মত মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানদের বেশিরভাগ অংশ পাকিস্তান চেয়েছিলেন। স্বপ্ন হাতে পাবার তৃপ্তি মিটতে না মিটতেই ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে স্বপ্নভঙ্গের পালা শুরু হয়ে গিয়েছিল। ধরুন না, ছেচল্লিশের ১৬ই আগস্ট, ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডে, পশ্চিম বাংলার সাহিত্যিকরা চোখের সামনে দেখেছিলেন। কিন্তু সহজে কোন সাহিত্যে পাবেন না। আপনাকে সমরেশ বসুর যুগ যুগ জিয়ের কাছে আবার আসতে হবে।’

সেই সন্ধ্যেয় আবার আমরা যুগ যুগ জিয়েতে ফিরে গিয়েহিলুম।

বুঝতে চাইছিলুম কিভাবে এই কোলকাতা রায়ট, নোয়াখালি-টিপেরা এবং ভাগলপুর দাঙ্গা বাঙালিকে দেশভাগের দিকে ঠেলে ছিল।

যুগ যুগ জিয়ে আত্মজৈবনিক উপন্যাস। নায়ক ত্রিদিবেশ শিল্পী মানুষ। সে কমিউনিস্ট পার্টির লোক। তার জীবন আর চোখের মধ্যে দিয়ে চল্লিশের কোলকাতা, তার মফঃস্ব্‌ল, পার্টির আমলাতান্ত্রিক নির্মম নেতৃত্ব সমস্ত কোলাজ দৃশ্য হয়ে এ উপন্যাসে এসেছে।

ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডের বিকেল বেলা, এইভাবে এসেছে, ত্রিদিবেশের চোখ দিয়ে। কমিউনিস্ট পার্টির লোকেরা জিপ গাড়িতে কংগ্রেস, মুসলিম লীগ আর কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা একসঙ্গে লাগিয়ে প্রথমে হিন্দু পাড়ায়। কিছু লাঠি হাতে জনতা আটকে দাঁড়ায়। ‘পুলিশ তো আমাদেরই মারছে। শুয়োরের বাচ্চারা আমাদের মেরে নেড়েদের মহলা পাহারা দিচ্ছে। হিন্দু দারোগা গুলোও শালা বেইমান, চাকরির ভয়ে আমাদের শাসিয়ে গেল। তবে আমরাও তোয়ের হয়ে আছি।’ গর্জিত স্বর শোনা যায়, ‘জিজ্ঞেস কর গাড়িতে দু-চারটে নেড়ে আছে কিনা, টেনে নামিয়ে নে।’

জিপের মধে থেকে একজন বলে ওঠে ‘আমরা মুসলমান এলাকাতেই যাচ্ছি, আটকে পড়া হিন্দুদের জন্য। আমাদের কাজ রেসকিউ করা। দাঙ্গা আজ আছে, কাল থাকবে না। কিন্তু আমরা যদি কারোকে বাঁচাতে পারি সেই চেষ্টাইকরছি।’

পাশ থেকে গলা ভেসে আসে, ‘আরে যার সঙ্গে কথা বলছিস সে হিন্দু না মুসলমান , তা কি জানা আছে?’

‘ আমরা জাতটাত ভেবে বেরোয়নি, আমরা কমিউওনিস্ট। আমরা শান্তির জন্য বেরিয়েছি।’

‘এই মোসাই, বেশি রোয়াব দেখাবেন না। ফুটানি করবেন তো ন্যাংটো করে দেখে নোব, কে হিন্দু কে মুসলমান। ওসব কমিউনিস্ট-টমিউনিস্ট গুলি মারো। আমরা বদলা চাই বদলা।’

গাড়ি এগোয়, পেছন থেকে আওয়াজ আসে, ‘এ শালারাও নেড়েদের দালাল। পাকিস্তানের সাপোরটার।’

গাড়ি এন্টালি পেরিয়ে মুসলমান পাড়ায় যায়। একজন যাত্রী বলে , ‘এন্টালির ভেতর আগুন জ্বলছে। নাকে পোড়া গন্ধ লাগছে। ডানদিকে দুটো ডেডবডী পড়ে আছে।’

জিপ দাঁড়িয়ে পড়ে, ব্যারিকেডের সামনে। চিৎকার শোনা যায়, ‘তুমলোগ কৌন হ্যায়?’

‘আপনি তো আমাদের ঝান্ডা দেখেই বুঝতে পারছেন আমরা কারা।’

‘ভেতর দিয়ে যেতে দেব না।’

একজন হিন্দিতে বলে , ‘এ গাড়ি আমরা যেতে দোব। কিন্তু মহল্লায় রাত্রিতে থাকতে দোব না। ও সব লাল ঝান্ডা মানিনা, কাল খবরের কাগজে যা-তা লিখে দেবে। আপনারা গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে যান, দু পাশে তাকিয়ে দেখবেন না।’ ত্রিদিবেশের মনে পড়ে গিয়েছিল, ধর্মতলা স্ট্রিটে ঢোকার সময় সে দেখেছিল চার-পাঁচজন ব্রিটিশ সাহেব-মেম গলা জড়াজড়ি করে হাওয়া খেতে বেরিয়েছে। ত্রিদিবেশের মাথায় এসেছিল যাদের প্রভুত্ব শেষ হচ্ছে তারা হাসতে হাসতে নির্বিঘ্নে ঘুরছে। ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে পালাচ্ছে আর নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি করছে তারাই, যারা স্বাধীনতা পাচ্ছে।

সে রাতে বাড়ি ফেরার পথে আমাদের নাকে যেন মাংস পোড়ার গন্ধ, পেট থেকে বেরিয়ে আসা রক্তের গন্ধ এসে লাগছিল। মেজদা দোকান বন্ধ করতে করতে বলেছিল, ‘ডাইরেক্ট এ্যাকশন ডের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং হয়েছিল ১৬ই আগস্ট ১৯৪৬ আর দেশভাগ হয়ে স্বাহীন হোল ঠিক একবছর পর ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭। খন্ডিতা উপন্যাস সেখান থেকেই সমরেশ শুরু করেছিলেন।’

(২)

‘উনিশশো সাতচল্লিশ খ্রীস্টাব্দ। চৌদ্দুই আগস্ট। বিকেলবেলা...সাইকেল রিকশায়, মাঝখানে চরকা ছাপা তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে মাইকের ঘোষণা ভেসে আসছে, ‘বন্ধুগন! আগামীকাল সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে...।’ খন্ডিতা উপন্যাস শুরু হয়েছে এইভাবে।

খন্ডিতা পূজাবার্ষিকীর জন্যে ফরমায়েশি উপন্যাস। ফলে নিয়ম মেনে খুবই ছোট উপন্যাস। এককালে যাকে বলা হোত উপন্যাসপম বড় গল্প। এ উপন্যাসের ব্যাপ্তি বিশাল হওয়া উচিত ছিল। কারন যুগ যুগ জিয়ের মত এ আখ্যানের ক্যানভাস বিরাট মাপের। এই ধরনের পটভূমিকে চটজলদি পূজাবার্ষিকী খাপে বেঁধে রাখা আমাদের অস্বস্তির মাঝে ফেলে দেয়। অনেকদিন আগে দেবেশ রায় একবার একথা সমরেশ বসুকে বলেওছিলেন।

এ উপন্যাসে তিনবন্ধু স্বাধীনতার দিন ওপার বাঙলা দেখতে বেরিয়েছে। ‘ওরা’ কিভাবে উৎসবকে সাজাচ্ছে, তাই দেখার ইচ্ছে। তিন বন্ধুর মাথার মধ্যে ঘুরতে থাকে, একবছর আগের দাঙ্গার শুরু, স্বাধীনতা আন্দোলনের অজানা গভীর ক্ষত আর তার থেকে জন্ম নেওয়া মোড় ঘোরানো বাঁক।

উপন্যাসের আরম্ভেই মনসুর মল্লিক বলে এক চরিত্র এসেছে। সে ফজলুল হকের একনিষ্ঠ সমর্থক। তিনি পাকিস্তান চান কিন্তু মিলমিশ আলাপের মধ্যে দিয়ে, কাজিয়ার মধ্যে দিয়ে নয়। ‘...আপনারা ভুলে যাবেন না, কংগ্রেসের নয়া প্রেসিডেন্টের একটা কথা কে, কায়েদে আজম জিন্না সাহেব মেনে নিতে পারেন নি। আমি মনে করি, জওহরলালজীও উচিত কথা বলেন নি। কংগ্রেস ক্যাবিনেট প্ল্যান মেনে নিয়েছে, তারপরেও উনি বললেন, তা বলে সার্বভৌম গণপরিষদের মত কংগ্রেস মেনে চলতে বাধ্য নন। অথচ ষোলই মে ক্যাবিনেট মিশন প্ল্যানে, এক সপ্তাহের মধ্যে কংগ্রেস আর মুসলিম লীগ একমত হওয়াতে সকলের মন নেচে উঠেছিল। আর দশই জুলাই এরকম একটা কথা জহরলালজী বলে দিলেন!! জিন্না সাহেব রেগে আগুন।’

আমরা খন্ডিতা উপন্যাসের শুরুতে এরকম উক্তি পেয়ে বুঝেছিলাম, আবার সমরেশ পাঠককে ভুলে যাওয়া বা না জানা ইতিহাসের দিকে ঠেলে দিলেন। যাকে আমরা অচর্চিত ইতিহাস বলেছিলাম।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অন্যতম বড় অধ্যায় সাম্প্রদায়িক রাজনীতি-দাঙ্গা-দেশভাগ। আর সেই অধ্যায়ের মাইলস্টোনগুলো শুরু হয়েছে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন থেকে। এরপর থেকে পরপর তিলক-জিন্না প্যাক্ট, নেহরু রিপোর্ট, জিন্নার চোদ্দ দফা প্রস্তাব-মুসলিম লিগের পাকিস্তান প্রস্তাব। সবশেষে ক্যাবিনেট মিশন সমঝোতা। সমরেশ, মনসুর মল্লিকের মুখ দিয়ে এই ইতিহাসের দিকে পাঠকের চোখ ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন। এ সেই মেমরি, আমাদের স্কুল টেক্সটবুক ইতিহাসে যে অধ্যায়কে বাদ দেবার চেষ্টা প্রতিনিয়ত চলছে।

তিনবন্ধু যখন সদ্যজন্ম নেওয়া পূর্বপাকিস্তানের মধ্যে ঢোকে তাদের আলাপ হয় জাব্বর বলে এক শিক্ষিত মধ্যবিত্ত আর সৈয়দ মনিরুজ্জমান বলে এক উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীর সঙ্গে।

তিনবন্ধুর একবন্ধু জিজ্ঞেস করে, ‘এই দেশ বিভাগ কি অপরিহার্য ছিল?’ মনিরুজ্জমান বলেন, ‘একটা কথা জিগাই। আপনাদের কোন রাজনৈতিক আদর্শ বা মতামত আছে?’

‘আদর্শ আছে কিনা বলতে পারি না। তবে কমিউনিস্ট পার্টির দিকে সমর্থন আছে।’

‘আমি তো দেখি গোড়ায় গলদ। কমরেড মানবেন্দ্রনাথ রায় ছাড়া, কমিউনিস্ট পার্টি তো অনেক আগেই পাকিস্তানের দাবি ন্যাশনাল মাইনরিটির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বলে মাইনা নিছেন।’

আমরা আবার সেদিন বুঝতে পারছিলাম, খন্ডিতা আমাদের আবার ভুলে যাওয়া ইতিহাস বা ভুলিয়ে দেওয়া ইতিহাসের সামনে নিয়ে আসে। আজকের পাঠকদের খুব কমজনই জানেন যে পাকিস্তানের দাবি কমিউনিস্ট পার্টি সমর্থন করেছিল। কংগ্রেস-মুসলিম লীগ সমঝোতার মধ্যে দিয়ে দুটি ডোমিনিয়নের দাবিকে সমর্থন করেছিলেন। আলাদা সার্বভৌম রাষ্ট্রের দাবি তখনও আসেনি।

কমিউনিস্ট পার্টির তাত্ত্বিক নেতা ডঃগঙ্গাধর অধিকারীর ‘recognition of the right of separation of individual nationalities’ এবং কমিউনিস্ট পার্টির দলিল-Pakistan and National unity। এই দলিল অধিকারী থিসিস বলে পরিচিত ছিল। দেশভাগ হবার পর এই দলিলকে সমালোচনা করে এই অধ্যায়কে ধামা চাপা দেওয়ার চেষ্টা পার্টির নতুন নেতৃত্ব করেছিল। সমরেশ যেন আবার পাঠককে বলেছিলেন ফিরে গিয়ে না দেখা ইতিহাসের সামনে বসতে।

খন্ডিতা শেষ হয় যখন তিনবন্ধু জিপসি ক্যাম্পে মোতি বলে এক মেয়ের সামনে আসে। তার হাত কাটা পড়েছে গুন্ডাদের হাতে। তাকে তিনবন্ধুর এক বন্ধু সতু জিজ্ঞেস করে, ‘তুমি হিন্দু না মুসলমান?’

‘আমরা না হিন্দু না মোছলমান।, মা কালী ভজি, পীরেরও ভজি। রুদ্রাক্ষ পরি, তসবিও পরি। গরু খাই, শুয়োর খাই। আমারে হিন্দুও খায়, মোছলমানও খায়। আমি জমিন। জমিন সবাই চায়। সবাই চষে। জমিন লইয়া খুনোখুনি করে।’

খন্ডিতা পড়তে পড়তে সেদিনও রাত শুনশান হয়ে গিয়েছিল। মেজদা বাড়িমুখো হবার সময় বলেছিল, ‘এই খন্ডিতাতেই আপনারা পাবেন র‍্যাটক্লিফ লাইন তৈরির রাজনীতি আর দাঙ্গা। সমাজতত্ত্বের আঙিনায় যাকে politics of map making বলে।

আমরা কয়েকটা প্রাণী ভারতের ইতিহাস আর ঐতিহ্যর সামনে পা মুড়ে বসব ভেবে বাড়ি ফিরেছিলাম।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন