মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

সেবন্তী ঘোষের গল্প : পক্ষ


মান বড় বালাই! বুঝলা? অত মান থাকলে রাগ বাড়ে, আর রাগ করলে আমার দশা হয়!ঘাস কাটতে কাটতে আপন মনে বলে অবিনাশ। ঘামে ভিজে যাওয়া চোখ মুখ মোছার হুশ থাকে না। কেবল ঘাম যখন ঘন ভুরু পেরিয়ে চোখে এসে পড়ে তখন ঘাস কুচি আর মাটি মেশা চেটো দিয়ে সেটা মুছে নেয়। আবার বলে সে, তুমি যে কাজটা করছো সেটা ঠিক করো নাই। জেনে বুঝে..আমি তো যা করছি সব নেশার ঘোরে, খ্যালই নাই কেমনে হাঁসুয়া চালায়ে দিলাম! তুমিতো নেশার ঘোরে করো নাই, কেমনে যে করলা! পাপ লাগে-

অবিনাশের বকবকানি শেষ হয় না, একটু দূরে কাজ করা নবীন নিড়ানি দিয়ে সমস্ত রাগটা জোরে টান মারতেই উঠে দাঁড়ায় "সে"! তাকে দেখে মুহূর্তে নবীন আর অবিনাশপুতুলের মতো স্থির হয়ে যায়।

‘সে’ তার ঘন কালো মাথা, স্থির চক্ষু গোলক নিয়ে এক হাত বুকের উপর ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দুপুরের প্রখর রোদ তার মসৃন শরীরে কত রঙের ঢেউ ছড়িয়ে দেয় ঠাহর করতে পারেনা নবীন। ফনার মাঝে কালো অংশ কমলা লালে মেশানো, চেরা দু-খানি জিভে স্পর্ধিত যৌবন যেন সংহত হয়ে থাকে। কাঁচের পুঁতির মতো চোখদুটি যে প্রায় কিছুই দেখতে পায় না তা বোঝা যায় না। ভাগ হওয়া জিভ যেন স্নায়ু টান রেখে আততায়ীর অপেক্ষা করে।

খাইসে! স্থির থাক, একদম চুপ, নড়স না এক্কেরে- ফিসফিসকরে বলে অবিনাশ। প্রায় পাশাপাশি কাজ করা দুজনেরসমদূরত্বে থাকা সাপটিকে দুজনে একসঙ্গে দেখে। দীর্ঘদিনঘাসজমি কাটার অভিজ্ঞতায় অবিনাশ ,আর স্বভাবগতচেতনায় নবীন মাটির পুতুলের মতো স্থির হয়ে থাকে।কতক্ষণ কাটে হিসেব থাকে না। বিষধর সাপ শরীরে আঘাতপাওয়ার জন্যই হোক, সামনে আঘাত করার মতোদোদুল্যমান লক্ষ্যবস্তু অনুভব করার কারণেই হোক ঈষৎদুলে যায়। তারপর আক্রমণকারীর সন্ধান না পেয়ে অপেক্ষাকরে কিছুক্ষণ। ঘোড়া নিমের গাছ ছাড়িয়ে দূরে সিমেন্টেরধূসর রংয়ের ইটের আকাশছোঁয়া পাঁচিল। সেন্ট্রি টাওয়ারেরমাথায় উদাসীন রক্ষী আর দীর্ঘ বিস্তৃত ঘাসজমির মাঝেসাপটির ফণায় রামধনুর রং খেলা করে। ঝিম ​​ধরে যাওয়া রোদে কিয়ৎক্ষণ আগে ছায়ায় নেতিয়ে থাকাশরীর উত্তুঙ্গ কামনার মতো স্থির হয়ে থাকে।

নবীন মাটিতে থেবড়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে থাকে।মৃত্যুভয় নয় সাপটির রূপে সে পুরুষাঙ্গের তীব্রতা খুঁজেপায়। সর্প শরীরের পুষ্ট ফুলে ওঠা মাংসপেশিতে যে নমনীয়কাঠিন্য দেখতে পায় তাতে যেন শরীর অবশ হয়ে আসেতার। এক ঝলকের মৃত্যু ভয় কাটিয়ে চারদিকের ভোঁধরানো উষ্ণতা যেন চুল্লির মুখ খুলে দেওয়া তীব্রতায় উঠেআসে ভেতর থেকে। একটা সময় যা এখন গতজন্ম মনে হয়নবীনের ; প্রায় মাঝেমধ্যে বন্ধুদের আড্ডায় বাংলা বা শস্তারামের তৃতীয় পেগের পর যেমন হলকা ছড়াতো শরীরে, ঠিকতেমনই ভাপ উঠে আসে। নবীন এই আমেজ উপভোগকরে।

কিছুক্ষণ স্থির থেকে হঠাৎই ফণা নামিয়ে নেয় সাপটি। জড়োকরা শরীর ছড়িয়ে দিয়ে দ্রুত অপরিস্কৃত ঘাস জমির দিকেঘষটে ঘষটে চলে যায়। এক দীর্ঘ ভারী শরীরের চাপে কিছুক্ষণের জন্য ঘাস মাটিতে মিশে নুয়ে থাকে।

অবিনাশ শ্বাস ছেড়ে স্বাভাবিক গলায় বলে, বাপরে! বাচলাআজ! বুড়বকের মতো হাঁসুয়া চালাও! রাগ দেখাও কারে? মরতা খানে! এইটার জোড়ারেও যেন একবার দেখছিলাম যেন এদিকে-

নবীন অপসৃয়মান সাপটির শেষ বিন্দু অবধি, নুয়ে পড়াসরু ঘাসের পথ আর পুনর্বার উঠে দাঁড়ানো সেই ঘাসগুলিরস্বাভাবিক ভঙ্গি দেখে যায়। ঘোর লাগা গলায় বলে, মরবোকেন? সাপে কাটলে এখানে কেউ মরবে না। দড়ি অব্দিটেনে নিয়ে যেতে হবে না? এখানে মরা এতো ফালতু নাকি! 

নবীনের গলার শ্লেষে অবিনাশ বিরক্ত চোখে তাকায়। আজহোক কাল হোক অর্ডার বেরোবেই। মরবেই ছোকরা। তাওতেজ কমে না! নরকের অধম কাজ করেছে, একটা শোচনানাই? ঠিকই তো সাপে কাটলে কয়েক মিনিটের মধ্যে ওষুধআসবে। নবীনের মতো আপার ক্লাস আসামি মরলে হাজারজবাবদিহি! নিজেরা মারপিট খুনোখুনি বা আত্মহত্যা নাকরলে জেলে কেউ ফালতু মরে না। নবীনের আপাত শান্তস্বভাবের জন্য একটা মায়াও আছে অবিনাশের। আবার
​​​ঘেন্নাও আছে। খারাপ কাজ না করলে কেউ এখানে আসেনা। এই ছেলেটার অপরাধ বিরলতমের মধ্যে বিরল। এতোখটোমটো বাংলা অবিনাশের স্মরণে থাকে না। আজ বেশমনে পড়লো বলে খুশি হল অবিনাশ। নবীনের মতো ছেলেরসঙ্গে তার জানাশোনা হলো বলেই কতো কথা শিখলো!

আবিনাশের ভালো লাগেনা। গোখরোর মুখোমুখি হয়েভয়ে জড়োসড়ো হওয়ার বদলে নবীনের চোখে মুখে মজেথাকার আভাস। ছেলেটা যেন রং দেখছে চারধারে। নবীনেরঅপরাধ এমন নির্ঘিন্নে যে অবিনাশের মতো কয়েদিরা তারসঙ্গে ভালো করে কথা বলে না, আসলেই বিরলতমশব্দটব্দর মতো নবীনের আচরণও দুর্বোধ্য অবিনাশেরকাছে। তাই বোধহয় খানিকটা ঘৃণা ও ভয় জনিত সম্ভ্রমেতাকে আর সে ঘাটায় না। বেশ কিছু দিন একটানা সলিটারিসেলে থাকার পর নবীনকে মাঝে মাঝে ওরা ঘাসজমি কাটার কাজে ছাড় দেয়।

পাঁচিলের কাছাকাছি ঘন ঘাসজমি ছেড়ে অপেক্ষাকৃত ফাঁকাজায়গায় চলে আসে দুজনে। আবিনাশ জানে সেন্ট্রিটাওয়ারের রক্ষী পুরো ঘটনাটা দেখেছে। তার কোনো তাপউত্তাপ নেই। সেও এবারে ওদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়েঅন্যদিকে তাকিয়ে থাকে। বাকি সময়টুকু দুজনে ঘাসজমিকাটার কাজ করে যায় প্রায় নিঃশব্দে। অবিনাশ কাজ করে।নবীন কাজের ভান করে যায় শুধু।


(খ)

জেলের খাবার পরিশ্রম অপমান এসব নিয়ে তেমন সমস্যাহয়নি নবীনের। তেলচিটে কম্বলের গায়ে বমি উল্টানোএকটা ভ্যাপসা গন্ধ আছে। এটা নিতে পারেনা সে। আরমলমূত্র ত্যাগের নারকীয় ব্যবস্থাও সে আজ অবধি সহ্যকরতে পারেনি।

এসব বোধধয় তেমন গায়ে লাগতো না, যদি সে গরমটা সহ্যকরতে পারত! প্রথম প্রথম মনে হতো এসি বন্ধ হয়ে যাওয়াশপিংমলে বসে আছে। মুখ আটকানো একটা জলের ড্রামেভরে ফেলা হয়েছে তাকে। জন্য ভয়াবহ একটা দমবন্ধ করাখাবি খাওয়া অবস্থা। জেলের বাইরে বেরুবার পর কোনএকটা ফুটো অথবা ফাঁক দিয়ে একটানা একটা ফুঁ দেওয়ারমতো বাতাস আসতো, কোনক্রমে সেটুকুই পিঠ পেতে নিতো সে। কিন্তু বাকি সময়টাযে কি করে কাটাতো নিজেও জানেনা। অপেক্ষা করতোচৌবাচ্চা থেকে ড্রাম থেকে জল তুলে গায়ে ঢালবারসময়টুকুর।হাত-পা মুখ মুছতো না। সমস্ত শরীর দিয়ে প্রায়সেই তেতে থাকা জলের ঠান্ডা হয়ে গায়ে মিশে যাওয়াউপভোগ করত আর অপেক্ষা করতো বর্ষাকালের জন্য।

এসময় সেলগুলি স্যাঁতসেঁতে হয়ে উঠতো আরো।চিমসানোবদগন্ধে অতিষ্ঠ হয়ে ওয়ার্ডবয়রা ছিঁচকে আসামিদের দিয়ে জল আনিয়ে ধুইয়ে দেয়। এই ভেজা ঠান্ডা আর পরিছন্নতা দুটোই চায় নবীন। চতুর্দিকে ধূসরতা একঘেয়েমিতে অ্যালুমিনিয়ামের রংহীন বালতির পাশে প্লাস্টিকের রঙিন মগ দেখলে ভালো লাগে তার।রক্তের মতো লাল পাটা মুখটা সে অনেকদিন ধরে সেলে রেখে দিয়েছে। চাইলে মোবাইল সিম থেকে গাঁজা, নেশার ওষুধ যেখানে সহজলভ্য সেখানে একটা ফাটা লাল মগ নিয়ে কেউ মাথা ঘামায়?

ঘুষ দিয়ে পাওয়া মোটামুটি পরিচ্ছন্ন বিছানায় শুয়ে আজওলাল মগটা দেখছিল নবীন। এই রংটা আসলে সে দেখতেচায় না। বোধহয় দশ বছর ধরে দেখে আসছে গলার ধারঘেঁষে শিকলের দাগ কেটে নিয়ে নামছে গাঢ় কালচে লালমেশানো ফিণকি দেওয়া ধারা, ক্রমশ থকথকে ঘন স্রোত।তাদের বস্তির পাশের হাইরাইজ থেকে ঝলমলে মেয়ে আরবৌদিগুলো প্লাস্টিকের প্যাকেটে ঋতুস্রাবের ন্যাপকিন ছুঁড়েমারতো। বস্তির পিছনে ঘোলা নর্দমায় প্যাকেট ছিঁড়ে রক্তগন্ধওয়ালা তুলো, প্যাডের টুকরো ছড়িয়ে যেত ঘরের পিছনে, টালির চালে, টিভির এন্টেনায়। পার্টির পতাকার পাশে ওইরক্ত গন্ধের লাল রং নবীনকে আচ্ছন্ন করে রাখতো। বস্তিরমেয়েদের বাপ মা তুলে গালাগালেও টুক করে প্যাকেট ফেলেসরে পড়া মেয়েদের বিরাম ছিল না কোন। এ.সি মার্কেটেকাজের সময় নবীন দেখেছে রক্ত মোছার জন্য পুঁচকে স্কার্টপরা, জিন্স পরা মেয়ে গুলো কড়কড়ে নোট অবলীলায়এগিয়ে দিচ্ছে। একবারের জন্যও দাম করছে না।

এখন এই অপরিচ্ছন্ন আর্দ্রতায় নিজের বস্তির ঘরের কথাভুলতে চায় নবীন। নিজের হারানো উত্তাপ ফিরিয়ে আনারজন্য নিজেকে চালনা করতে চায়।ক্লান্ত ধ্বস্ত শরীর সাড়াদিতে চায় না। তবু চেষ্টা চালায় সে। নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নেয় দুটি ভাগে।নিজের অনিচ্ছুক শরীরের উপর নিজের হাত নেমে আসে।বিরুক্তি অনিচ্ছা যন্ত্রণায় নিজের শরীর যত নিজের বিরুদ্ধেযায় নিজেই তাকে মিশিয়ে দিতে থাকে জয়ের উন্মাদনায়।তখনই যেন চেনে বাঁধা রক্তাক্ত একটা মুখ গোঙাতে থাকেনবীনের দুই উরুর মাঝে।নবীন যতই সে মুখ শরীর থেকেবিচ্ছিন্ন করতে চায় ততই সে যেন নিবিড় ফাঁসের মতো এঁটেবসতে থাকে।

নবীন গোঙাতে থাকে। সেই আওয়াজ যেন বর্ষায় বহুক্ষণভিজে যাওয়া অসহায় পশুর মতো। আবার কখনোজোড়বদ্ধ কুকুরের পাশে অপেক্ষারত মদ্দা প্রতিপক্ষেরমতো। এই গোঙানি এখানে এমন স্বতঃস্ফূর্ত স্বাভাবিক যেঅন্য টহলদার রক্ষী বা কয়েদিদের কারোর কোনো ব্যাঘাতঘটায় না। কখনো কখনো কেউ অশ্লীল ইঙ্গিত করে হাসতেহাসতে চেঁচায়।

নবীন শান্ত অবসন্ন হতে হতে প্রতিদিনের মতো প্রতিজ্ঞা করেআর এসবের মধ্যে নেই। একা একা আর এই কল্পিত খেলায়অংশ নেবে না সে, যেখানে অন্তিম মুহূর্তে কাটা মুণ্ডের মতোভয় এসে তার শিশ্ন চেপে ধরে, সে চোখ মেলে অবধিতাকাতে পারে না। স্পষ্ট বুঝতে পারে সেই মুণ্ডের গলায়ফুলে ওঠা প্রতিটি ক্ষত থেকে রক্তবিন্দু এসে গলানো মোমেরমতো বীর্যে মিশে যাচ্ছে।

সে জানে এই অপ্রতিরোধ্য যন্ত্রণার নেশা বন্ধ করা দরকার।কোনভাবেই এই প্রতিমুহূর্তে ক্ষয়ে যাওয়া উত্তেজনা প্রশ্রয় দেওয়া উচিত নয়।কিন্তু কোন কোন খেলা সচেতনভাবে শুরু হলেও অন্তিম আর নিয়ন্ত্রণে থাকে না। নিজেকে নিজে প্রতিদিন পতনের দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে হয়।প্রায় সকালেই সে সেলে ঢোকা এক চিলতে আলোয় দেখে রাতের স্খলনের শুকনো দাগ লাল প্লাস্টিকের মগের রঙে প্রতিফলিত হয়েছে।ম্যাড়মেড়ে দাগটা যে অন্তত কড়া গাঢ় লাল নয়, এটাতে স্বস্তি পায় নবীন। ওয়ার্ডারের আনা বিড়ির প্রতীক্ষায় চুপচাপ বসে থাকে, যদিও এই বিড়ি পাওয়া বা না পাওয়ায় তার আজকাল কিছুই যায় আসে না।

(গ)

রীতা বেরোবার সময় ভাবে যতই ব্যস্ততা থাকুক, নাইটি আজ কিনতেই হবে।শুধু কিনলেই হবে না ইস্ত্রি করে মাড় ভাঙতে হবে। আয়ারা বলে অকারণে নতুন নাইটি পরানোর কোন মানে হয় না। রীতা জবা সুলতাদের পুরনো নাইটিগুলো হলেই ভালো। কাপড়টা নরম থাকে, কিন্তু রীতা পারে না। তানিয়া সবসময় উজ্জ্বল রং পছন্দ করতো। মেটে,ধূসর রং ওর একেবারেই পছন্দ ছিল না। বন্ধুরা এই নিয়ে খুব হাসাহাসি করতো। ফ্লুরোসেন্ট গ্রীন, ম্যাজেন্টা, রানি কালার- কি যেসব চড়া রং পছন্দ ছিল তানিয়ার! তাই রীতা কিছুতেই আজ ওকে নিজের ব্যবহৃত বিবর্ণ নাইটি দিতে পারেনা।

রীতা বোঝে বিমান আজকাল মনে মনে বিরক্ত হয়, কিন্তু বাইরে এখনো কিছু বলেনি। তাই সেও না বোঝার ভান করে। এখন সে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে ঝোলানো নাইটি গুলির রং দেখে। মসৃণতা পরখ করে। কাপড় খরখরে। ফুটপাত ছেড়ে দোকানে ঢোকে।সামনে সম্পূর্ণ খোলা নাইটির অপশন বেশি নেই। তারমধ্যে সূর্যমুখী ফুল, পাতাওয়ালা হলুদ সবুজ নাইটিটা কেনে। সঙ্গে গোলাপ সাদা ফুল ছাপের আরেকটা সামনে খোলা টপ। ওডিকোলন আর হালকা রঙের একটা বিছানার চাদরও নেয়। যদিও আয়ারা বলে তানিয়ার জন্য গাঢ় রঙের পোশাক বা চাদর কেনা দরকার। ক্যাথিটার এদিক ওদিক হলেই যে কোন সময় বিছানা নোংরা হয়ে যায়। হ্যা, একটা রুম ফ্রেশনার ও কেনে সে। 

পৌঁছতে পৌঁছতে জোরে বৃষ্টি নেমে যায়। হাসপাতালের একটা পূব দক্ষিণ খোলা দিক নিজেদের উদ্যোগে পরিচ্ছন্ন রেখেছে রীতা, সুলতারা।কেবিনে রাখার কোনো অসুবিধে নেই কিন্তু অন্যান্যদের কাছাকাছি থাকলে যদি কোন উপকার হয় এমন একটা ধারণায় তানিয়াকে এই হলটার এক কোণে চারপাশে পর্দা টেনে রাখা হয়েছে।হালকা প্রতিরোধহীন তানিয়াকে তুলে ধরতে আজাদের কোনো পরিশ্রম হয় না কিন্তু সতর্কতার প্রয়োজন থাকে কাচের খেলনার মতো ভঙ্গুর তানিয়া শরীরে আজকের মারনা ভাঙা নরম তুলতুলে নাইটিটা পরিয়ে দেয় ডিউটির নার্স মিঠু।

রীতা দেখে তানিয়ার মাথার সামনে লোহার বক্স টেবিলে একটা খুব দামি ফুলের বোকে। বিরক্ত হয় সে। দীর্ঘদিন সে এই হাসপাতালে ছিল। এখন মেট্রন হয়ে অন্য হাসপাতলে বদলি হয়েছে। কড়া গলায় মিঠুকে জিজ্ঞাসা করে, বাইরের কে এসেছিল? রীতা সুলতাদের কড়া নির্দেশ আছে ওদের অনুমতি ছাড়া বাইরের কোনো লোক এসে তানিয়াকে দেখতে পাবেনা। সুলতা এখনো এই হাসপাতালেই ডিউটিতে আছে। তবে লোক আসতেই থাকে।মিডিয়ার লোকজন আসে।মাছির মত খবরের জন্য 

​​​​​​​​​​​

ভনভন করে।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন সুস্থ তানিয়া ওদের প্রার্থনীয় নয়।ওরা যেন অপেক্ষা করে গলে খসে পড়া বিকৃত তানিয়ার মৃতদেহের জন্য।রীতা খেয়াল করে ফিনাইলের গন্ধ উপেক্ষা করেও ফুলগুলিতে মাছি এসে বসেছে। সে উঠে তানিয়ার কপাল ঠোঁটের উপর থেকে মাছি তাড়ায়।

মিঠু জানায়, রাত আটটার পর কি ফুল পাঠিয়েছে সে জানেনা।তার ডিউটি সকালে শুরু হয়।

রীতা ভ্রু কুঁচকে দামি ফুলগুলোর সামনে দাঁড়ায়। যা ভেবেছে তাই! ছোট্ট শুভেচ্ছাপত্র মধুর শ্রীবাস্তবের নাম! মহিলা কয়েকটা জঘন্য সাংবাদিকের সঙ্গে যোগসাজশে রীতাদের এতদিনের লড়াই বন্ধ করে দিতে চাইছে। স্পষ্ট মনে আছে ওর সঙ্গে তর্কাতর্কির প্রথম দিনটা। এমন সব কথা বলছিল রীতা আর সুলতা বোকা হয়ে যাচ্ছিল।

খুব নরম সুরে দৃঢ় গলায় বলেছিল, আপনাদের বন্ধুর যদি জ্ঞান থাকতো ও নিজেই বলতো-

মধুরার কথার মাঝখানে রীতা বলেছিল, কি বলতো? আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলা তো সম্ভব নয়, ওই চারতলা থেকে ঠেলে ফেললেই ল্যাঠা চুকে যায় ! তাই ফ্যাল! এই তো? কি ভয়ঙ্কর লোকজন আপনারা? একটা জ্যান্ত মানুষকে এভাবে মেরে ফেলতে বলছেন? ভগবান বলে কিছু নেই নাকি! অ্যা? 

মধুর তেমনি ঠান্ডা গলায় বলেছিল, না বলুক, মনে অন্তত করত যে তার একটা সম্মানের মৃত্যু পাওয়া প্রয়োজন। দেখুন আমার মনে হয় না মৃত্যু তেমন ভয়াবহ, যখন মৃত্যুর আগেই জীবন এমন ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে! আপনারা প্রতি মুহূর্তে ওর মরে যাওয়া দেখতে পাচ্ছেন না? আর ভগবান? তিনি কে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যুরও দেবতা নন? শুধুই জন্ম দেন? 

মধুরার ওই চিবিয়ে চিবিয়ে বলা ন্যাকা কথাগুলি মনে পড়তেই এক মুহূর্তে মাথায় রাগ উঠে যায় রীতার।

ঝটকা মেরে ফুলগুলি তুলে জানলা দিয়ে ফেলার জন্য এগুলো। ব্রিটিশ আমলের বিরাট জানলার শিকহীন উপরের পাল্লা আধখোলা। রীতা দ্রুত আসছে দেখে কাক দুটি নড়ল না এতগুলো বছর তানিয়ার কাছে আসা লোকজনের আনা বিস্কিট পাউরুটি চকোলেট ফলের টুকরো-টাকরা কখনো স্বেচ্ছায় পেয়েছে, কখনো চুরি করে নিয়ে গেছে ওরা। অনড়, জড়, নিস্পন্দ একটা ক্ষণভঙ্গুর শরীর নিয়ে বিছানায় শুয়ে থাকা তানিয়ার গায়ের উপর কখনো কখনো ওরা উঠে এসেছে। ওরা গায়ে বসেছে কিন্তু আঘাত করেনি; যেমন করে না কোন প্রত্যাঘাত হীন কাঠের জানলা বা গাছের ডালে।

রীতা কাক দুটিকে দেখে থমকানো রাগটা কমানোর চেষ্টা করলো। দাঁড়িয়ে থাকলো জানলার ধারে। আজকাল আবহাওয়ার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। বাইরের বাগানে শীতের মৌসুমী ফুল তখনও আছে। গরমের সূর্যমুখীও আছে, তবে সেগুলি মোটেই তানিয়ার জন্য কেনা নাইটির ফুল গুলোর মতো ঝলমলে নয়। কৃত্রিম ফুল সব সময় আসলের চেয়ে উজ্জল।

মধুশ্রী বাস্তবের ফুলগুলি নিয়ে মিঠুর হাতে দিল রীতা। নরমে গরমে বুঝিয়ে দিল কোনোভাবেই তানিয়াকে খোঁচাখুঁচি করা যাবে না। দুনিয়ার লোকের কাছে হতে পারে; তানিয়া তার কাছে কোনো মৃত শবের অবশেষ নয়।

কে বলতে পারে যে কোন মুহূর্তে জড় অবস্থা থেকে ফিরে আসতে পারে জ্ঞানের জগতে? নার্স হিসেবে সে জানে ওষুধের জগতে প্রতিনিয়ত বিপ্লব ঘটে যাচ্ছে। আজ না হোক কাল কেউ তানিয়াকে সারিয়ে তুলতে পারে। মিঠুকে বুঝিয়ে বলে, অন্যান্য বদলি নার্সদের যেন ভালো করে বুঝিয়ে দেয় যেভাবে হোক মধুরদের আটকাতে হবে। নিয়মমাফিক নিউজ বুলেটিন রোজকার অবস্থা জানালেই চলবে। বিস্তারিত জানানোর কোনো প্রয়োজন নেই। জানানো দরকার বেডসোর হয়নি এখনও, হজম শক্তি ঠিক আছে। অনুমতি ব্যতীত ছবি তোলা নিষেধ এটাও যেন জানিয়ে দেওয়া হয়। মনে রাখা দরকার তানিয়া একজন অসুস্থ রোগী মাত্র,কোন প্রদর্শনীর বস্তু নয়।

তানিয়ার পাশে দাঁড়িয় মিঠু দেখায়, হাতের বেঁকে যাওয়া আঙুলগুলোর খোলা-বন্ধের মাসাজ দিনে দিনে কতটা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। সুলতা অন্য ওয়ার্ডে বদলি হয়ে যাবার পর থেকে একা পড়ে গেছে মিঠু। মিঠু মণ্ড পাকানো খাবারের দলায় স্যুপ মিশিয়ে তরল করেছে। নল দিয়ে রোজকার মতো সেটা চালান করে দেয়। 

নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস ছাড়া তানিয়ার মুখের একটা রেখাও কাঁপে না। ইদানীং অকালেই ঋতু বন্ধ হয়ে গেছে বলে আয়াদের সুবিধা হয়েছে। ওই গড়িয়ে যাওয়া রক্তস্রোত দেখলে সুলতা জবারা কাঁদতে বসতো। সে ঝামেলা গেছে।রীতা তানিয়ার চোখেমুখে বারো বছর আগের বন্ধুকে খোঁজে।আচমকা ওর শরীর শিরশির করে ওঠে গলায় ছেলের একটা জায়গায় জায়গায় সেলাই গ্রাফটিং করা হয়েছে। ক্ষত মুখগুলি বন্ধ হয়ে উঁচু হয়ে একটা শেকলের মতো লাইন তৈরি করেছে। তানিয়ার লক্ষ্যহীন, স্থির দৃষ্টিতে সেই ছটফটে প্রাণচঞ্চল মেয়েটির কোন ছায়ামাত্র নেই।

নার্সিং পাঠের শেষ পর্বে এক তরুণ ডাক্তারের সঙ্গে প্রণয়াবদ্ধ সেই উদ্ধত সাহসী মেয়েটির কোন লেশ মাত্র অবশিষ্ট নেই এই জড় পুতুলের মতো বিকৃত চেহারার মধ্যে।কিন্তু প্রাণ আছে। হয়তো লড়াকু জীবন শক্তি তাকে এর পরেও বেঁচে থাকার ধক যুগিয়েছে।কাগজে কোথায় যেন পড়েছিল রীতা, হিরোশিমায় বোমা পড়ার সময় কোথায় একজন সিঁড়িতে বসে ছিল। সব থেমে যাওয়ার পর মানুষটা উবে গিয়েছিল কিন্তু তার ছায়া পড়ে থাকল অবিকল।এও যেন সেই ছায়া ফেলা একসময়ের প্রাণ, যার ফটোগ্রাফটুকুই বেঁচে থাকার প্রমাণ নিয়ে শুয়ে আছে।

রীতার বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে যায়। সে কি কোনভাবে তানিয়ার বেঁচে থাকার অধিকারকে অসম্মান করছে? তাহলে কি মধুর যা বলছে সেটা ঠিক? পরমুহূর্তেই ভাবে তার নার্সিং জীবনে কত পচা-গলা জবাব দেওয়া রোগীকে হেঁটে বাড়ি যেতে দেখেছে। খন তানিয়ার বেলায়হাল ছাড়লে চলবে কেন? বাইরে বেরিয়ে এসে সুলতাকে ফোন করে। ক্যানসার পেশেন্টদের ডিউটিতে আছে। বেরোতে পারবে না। আজ সন্ধ্যায় আবার উকিলের কাছে যেতে হবে। আদালতের রায় কি হবে সেটা মোটামুটি আন্দাজ করা যাচ্ছে কিন্তু তার আগে নবীনের সঙ্গে দেখা করা দরকার। সুলতা কিছুতেই ওর কথায় রাজি হচ্ছে না। কিন্তু মুখোমুখি কথা না বললে রীতা নিশ্চিত হতে পারবেনা প্রায় তার একার মতামতে গড়ে তোলা এই সিদ্ধান্ত কতটা মানবিক বা যুক্তিযুক্ত।ওই লোকটাকে এতো বছরে দেখতে ইচ্ছে করেনি কিন্ত এবারে একবার সে দেখতে চায় নরকের কীটটা এখন কীভাবে বেঁচে আছে?


(ঘ)

'জেন্টল জায়ান্ট' কথাটা মনে মনে কয়েকবার আওড়ায়।কী চমৎকার শব্দ!

‘জেন্টল জায়ান্ট! শব্দ যেন ম্যাজিক! এক মুহূর্তে একটা ছড়ানো ভাবকে ছোট্ট কৌটায় ভরে ফেলে। যতই সাংবাদিকলেখকদের কথায় কথায় গাল পাড়ো, এসব না হলে শিক্ষিত মধ্যবিত্তের চলেনা!লিখিত অক্ষরের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখনো অপরিসীম।

আপন মনে হেসে অ্যান্টি নিকোটিন প্যাচ লাগিয়ে ল্যাপটপ স্ক্রল করে দিব্যরূপ। হ্যাঁ, এইতো নামের তালিকা।অনসূয়া ত্রিবেদী, বয়স চৌষট্টি। রিউম্যাটিক আর্থ্রাইটিসে পঙ্গু। কুড়ি বছর ধরে সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারের জন্য লড়ছেন।

এই, এই যে ঋতিকা চন্দ্র, প্রতিভাময়ী ব্যাডমিন্টন প্লেয়ার। চলন্ত ট্রেন থেকে দুষ্কৃতীরা ঠেলে দেওয়ায় স্পাইনাল কর্ড হিপ বোন চুরচুর। সেরে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই। তার মা লড়ছেন মেয়ের মৃত্যুর অধিকার।

আরো আরো আছে হীরামন দুগার। নিম্নবিত্ত। জন্ম প্রতিবন্ধী। আরোগ্যের অতীত। চিকিৎসা কেবল পেন রিলিফ। কিন্তু এই পরিবারের পক্ষে দামী ওষুধ জোগাড় দুঃসাধ্য। আরো, আরো! অসহ্য! সাংবাদিকের এমন বিকারগ্রস্থ তথ্যনিষ্ঠতা প্রথমদিকে হজম করতে পারতো না দিব্য। এমন চমৎকার একটা রাতে কোথায় হংসিকার সঙ্গে ওদের পছন্দের পাবে যাবে, না হয় পাড়ায় গুলতানি মারবে, নিদেনপক্ষে ঘুম মারবে, তা না এই গাদা গুচ্ছের গা গোলানো পলিটিক্যালি কারেক্ট মরমী আবেদনপত্র ঠুকতে হবে!

হঠাৎ ছ্যাঁত করে উঠলো বুকটা। পলিটিক্যালি কারেক্ট কেন ভাবল সে? হংসিকার মা মধুর শ্রীবাস্তব বলে? তার কাগজ তো কোন গাইডলাইন বা পক্ষ অবলম্বনের কথা বলেনি। স্টোরিটা হাইলাইট করা তার একান্ত মস্তিষ্কপ্রসূত।তার এখন যে ক্ষমতা আর অবস্থান তাতে তার কাগজ অন্তত এই বিষয়ে কোন পক্ষাবলম্বনেই বাধা দিত না। কেননা এইসব স্টোরির কোন দিকটা পাবলিক গ্রহণ করবে তা নৈতিকতা বা জনমনের গতি প্রকৃতির উপর নির্ভর করে না। করে তার মতো ক্ষমতাবান সাংবাদিকের উপর। সে যে পক্ষ নেবে জনগণ তাকে নিজ পক্ষ ভাববে। অন্তত অর্ধেকের বেশি পাঠক তো অবশ্যই!

দিব্য হাসে। আলসেমি আমাদের এত মজ্জাগত যে ভাবতেওআলসেমি লাগে। কেউ ভাবিয়ে দিলে ভালো লাগে। ভাগ্যিসলাগে না হলে দিব্য দু'বছরের মধ্যেই এই কবছরের মধ্যেই দু- হাজার স্কয়ার ফিট ফ্ল্যাট, মধুর শ্রী বাস্তবের মেয়ে আরপছন্দের অ্যাসাইনমেন্ট পায় কি করে? পায় বলেই জানতেপারে, তানিয়া বিশ্বাসের নামে ব্যাংকে গত বারো বছরে এতোখরচের পরেও তিরিশ চল্লিশ লাখ টাকার উপর জমা পড়েছেযার ট্রাস্টি থাকলেও মূল পরিচালক রীতা কর, সঙ্গে সুলতামৃধা।

শুধু একটাই খটকা।এখান থেকে লইয়ার ছাড়া আর মাত্রএকজনের অ্যাকাউন্টে বহুবার টাকা গেছে।সে মামুনি সাহা।রীতা সুলতা জবা তানিয়ার বান্ধবী। এতগুলো বছর ওর হয়েলড়ছে। তানিয়ার বাবা-মা মারা গেছেন। একমাত্র ভাইনিরুদ্দিষ্ট বা যোগাযোগ রাখে না। বুড়ি ঠাকুরমার নামপ্রীতোবালা। তবে মা মামুনি সাহাটা কে? তানিয়ার সেইবিদেশে চলে যাওয়া ভূতপূর্ব ডাক্তার প্রেমিকের যে কেউ নয়সে খবর দিব্যরূপ নিয়েছে। হাতে একদম সময় নেই। ওইনাম যার, সে ট্রাস্টির টাকা পায় কেন এসব জানার আগেইতাকে লেখাটা শেষ করতে হবে। পরে স্ক্যামের বিস্তৃতি বুঝেনতুন লেখা লিখবে।

নিজের লেখায় চোখ বোলায় দিব্য। জেন্টল জায়ান্ট শব্দটাসে বসাতে চাইছিল নবীনের নামের আগে। দুদিন আগেইনবীনের সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তার এমনই একটা কথামনে হচ্ছিল, কিন্তু সেদিন সে শব্দটা খুঁজে পাচ্ছিল না।

প্রশ্নের মাঝে প্রায়ই মাথা নিচু করে ফেলাটা নবীনের স্বভাবদেখা যাচ্ছিল। ওই বিশেষ ঘটনাটি বাদে কোন বিষয়ে ওরতেমন কোন বিশেষত্ব কেউ দেখেনি।ওয়ার্ডার, সহ বন্দীরাওবলেছে কোনো বিশৃঙ্খলা, মারপিট, দল পাকানো বা মারমুখীমেজাজ কিছু নেই নবীনের। আছে অদম্য এক রাগ, অনেককয়েদির মধ্যেই অল্পবিস্তর আছে।অচেনা কেউ আলাপজমাতে গেলে নাকি প্রবল বিরক্ত হয়।' অপরাধী', শব্দটানিয়েও দিব্য কিছুক্ষণ ভাবে। এই যে বারো বছর ধরে মামলাচলছে, হয়তো শেষ পর্যন্ত ফাঁসিই হবে নবীনের, এতদিনঝুলিয়ে রাখার মানে কি! 

যাবজ্জীবন তো প্রায় কাটিয়ে ফেললো।আবার ভাবে ফাঁসিনা দিলেই ছেলেটার গতি কি হবে বাবা সৎ মা ঘেন্নায় সম্পর্কঅস্বীকার করেছে। বুড়ি ঠাকুমা কদাচিৎ এসে কান্নাকাটিকরে। টেনথ স্ট্যান্ডার্ড অবধি পড়া এই ছেলেটিকে এমনচমৎকার অতীত সহ কাজ দেবে কে? বিরলের মধ্যেবিরলতম অপরাধ। দিব্য নবীনের আগে 'জেন্টেল জায়ান্ট' শব্দটা বসালো। এক নোবেল লরিয়েটের নামের আগেবসানো হয়েছে বলে নবীনের নামের আগে বসানো যাবে না? বিশেষত শাস্তি দেওয়া হয় যেখানে সংশোধনের জন্য, সেখানে সহবন্দীদের জেলারের কথায় নবীনের আচরণসংশোধিতই।‌

যদিও এই সংশোধনের জন্য এতগুলো বছর জনগণেরকরের টাকা অনর্থক ব্যয় হয়েছে। নবীনের আচরণ যেমনইহোক ফাঁসি বহাল থাকবেই।

দিব্যরূপ আরো একটু সময় ল্যাপটপের সামনে বসে।কোনভাবেই লেখাটার শেষটা ক্যাচি হয় না। একটু ব্রেকদরকার।

নিকোটিন প্যাচ তুলে, এদিক-ওদিক অল্প খুঁজেই দুটোসিগারেট নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে আসে। বাইরের ভেজাগরমে একরকমের মাদকতা আছে। এই তেরা তলারবারান্দায় দাঁড়ালে আকাশ ও পৃথিবী দুটোই সমান দূরে মনেহয়। মাথা বরাবর সমগ্র আকাশ চিরে বিদ্যুৎ চমকায়।ওদেরহাই রাইজ, সামনে সরকারি আবাসন, তারপর গা লাগানোবস্তি, দক্ষিণের রেললাইন, এত রাতেও লোকালে ভীড়, দীর্ঘসময় ধরে সে স্টেশনসহ ট্রেন লাইন পেরিয়ে ট্রেনের চলনদেখে।

এই একঘেয়ে, সামান্য অথচ চমৎকার দৃশ্যের মাঝেই মানুষমুগ্ধ হতে পারে। সাক্ষাৎকারের দিন নবীন বললো, সে যেসব সহ্য করতে পারে, গরম পারেনা।

নিজেই বললো দিব্যকে, ও চায় ফাঁসিটা তাড়াতাড়ি হোক।একটি দিনের একটি দৃশ্য ও বারো বছর ধরে সহ্য করেছে।ঘুমোতে গেলেই ওর ঘরে নাকি আজকাল কেউ আসে। কাছেআসেনা, নবীনের ভয় আর গোঙানি তারিয়ে তারিয়ে দেখে, উপভোগ করে। নবীনের সন্দেহ হচ্ছে তাকে অকারণে শাস্তিদেয়া হচ্ছে। তানিয়া সুস্থ ভাবে বেঁচে আছে, কারণ প্রত্যহউপস্থিত হওয়া মেয়েটি তানিয়া ছাড়া কেউ নয়। যতদিনএগিয়ে আসবে নবীন আরো দুঃস্বপ্ন দেখবে। আরো দ্রুতমৃত্যু

কামনা করবে। জন্তুর মত আছাড়ি-পিছাড়ি খাবে। না, জন্তুরমতো নয়, মাংসের দোকানের সামনে সার বাঁধা গরু ছাগলছাড়া অন্য পশুরা মৃত্যুর আগে পর্যন্ত উপলব্ধি করতে পারেনা মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা কেমন। তাদের মতো নয় নবীন। সেপ্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে মৃত্যু উপভোগ করে। করতে বাধ্য হয়।

(ঙ)

আজো ওরা ঘাস জমির মধ্যে কাজ করতে করতে কথাবলছিল। নবীন শহরের ছেলে। জীবনে গ্রামে যায়নি। যাবেইবা কোথায়? বাবা বাংলাদেশ থেকে এসে ফুটপাতে আস্তানাগাড়ে। সেখান থেকে পদোন্নতি হয় বস্তিতে। বস্তিটা একেবারেপ্রাইম প্লেসে। ফলে নবীন ফ্রি সরকারি স্কুলেও যায়, আদবকায়দা শেখে। বস্তির পাশেই পার্কে বন্ধুত্ব হয় মধ্যবিত্তবন্ধুদের সঙ্গে। চমকে যায় নবীন যেদিন, ইংরেজি স্কুলেরক্লাস টেনের এক ছাত্র অ্যাসেম্বল করা রিভলবার কদিনেরজন্য রাখতে দেয় ওকে। স্রেফ লুকিয়ে রাখতে হবে তাহলেইনোট।

এভাবে টাকা আসে তবে তা অনিশ্চিত এবং টাকারপরিমাণের তুলনায় রিস্কও বেশি। নবীনের এসব পছন্দ হয়না। তার অন্য নেশা জাগে। বস্তির ওপারেই রেললাইন, ফ্লাইওভার তৈরি হয় মুহূর্তের মধ্যে জায়গাটার দাম বেড়েযায়। প্রায় নাকের ডগায় একটা এ.সি মার্কেট তৈরি হয়।নবীন সেখানে ঘুরঘুর করে। তার চোখ আটকে যায়ঝকঝকে দোকানের সামনে রাখা ম্যানিকুইনের উপর।অনাবশ্যক কোন কিছু থাকেনা এই নারী পুতুলের শরীরে।যেমন কারো ডিমের ছাদের অপরূপ মুখে অনাবশ্যক বলেবর্জন করা হয়েছে চোখ, নাক। কারো আবার উন্নত স্তনযুগলই সব! কারো আবার দুটি হাতই নেই।ব্রা প্যান্টিরদোকানের বাইরে রোজ যখন দুটি নিরাবরণ হস্তপদহীননারীমূর্তিকে দোকানের আধবুড়ো কর্মচারী নির্বিকার ভঙ্গিতেএনে কাঠের ঠেলা দেওয়া কিছুতে দাঁড় করাতো আরনিরাসক্ত ভঙ্গিতে নিত্যনতুন অন্তর্বাস পরাতো, মুগ্ধ দৃষ্টিতেদাঁড়িয়ে দেখতো নবীন।

সেন্ট্রালি এ.সির পরিচ্ছন্ন সমানুপাতিক তাজা ঠান্ডা হাওয়া, বিভিন্ন দোকানের ফ্রেশনারের মিলিত সুগন্ধ মাথা থেকেসমস্ত টেনশন দূর করে দিতো। তাদের বস্তির দমচাপা এঁদোগলি, জানলাহীন কুঠরির মধ্যে সস্তা টেবিল ফ্যানের বদ্ধহাওয়া, গুমোট চামড়ায় জ্বালা ধরানো গরম পিছনের পচা খালের দুর্গন্ধ আরো তীব্র হতো ,আড়াল আবডাল হীন সৎ মা আর বাবার শারীরিক সম্পর্কে।ঘরের পিছনে ছ্যারছ্যার করে ছাড়া কারো পেচ্ছাপে মিশেযেতো ভাতের মাড়। চুলের মুঠি ধরে মাতাল স্বামীর বউকেকুকুরের অধম মার আর চিৎকার কানে আছড়ে পড়তোচাবুকের মতো ।

নবীন ঐ সব দৃশ্য আর গন্ধ থেকে পরিত্রান পাওয়ারজন্যই অন্তর্বাসের দোকানের মালিকের কাজের অফার লুফেনিল। সিকিউরিটি এজেন্সি ছাড়া তখন চাকরি পাওয়াযেতো বলে নবীনের কাজ হল ফ্লোর দেখাশোনার। এইমার্কেটের বড় শেয়ার ছিল অন্তর্বাসের মালিকের।

নবীন বেঁচে গেলো। ওভারটাইমের টাকার লোভে নয় স্রেফএই পরিবেশে থাকবে বলে সে মার্কেট খোলা থেকে বন্ধ হওয়াঅবধি মনোযোগ দিয়ে ঘোরাঘুরি করে, বসে থাকে, লিফটদেখে, ঝাড়ুদারের কাজকর্ম করে, দরকারে ফ্লোর ক্লিনারচালায়। মার্কেটের প্রতি কোন তার চেনা হয়ে যায়।আরশোলা টিকটিকির প্রতিটি বাসস্থান, গতিবিধি অবধিতার নখদর্পণে থাকে।

মার্কেটের পিছনে নার্সিং কলেজ। প্রথমদিকে অস্বস্তিতে দামিমার্কেট ভেবে সেখানকার মেয়েরা আসতো না। পড়ে নাকেরডগায় বলে কেউ কেউ এসে পড়ে। তারপর আসতেই থাকে।দামি মার্কেটে সস্তা জিনিস থাকে এটা বোঝার পর থেকেইওরা নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে প্রায়ই চলে আসতো।এমন ই একদিনঃ চোখে পড়েছিল চারজনের একটা দলেরউপর। দুটি মেয়ের পাশে তৃতীয়জন বেশ ছটফটে। ঝলমলেস্কার্ট আর টপ পরেছে।তবে এতদিনে নবীনের অভিজ্ঞ চোখবলে দেয় ওটা মফস্বলের ফ্যাশন। শহরে চলছে না। মেয়েটাম্যানিকুইনের গায়ে পরানো লাল নেটের একটা ব্রা প্যান্টিরসামনে এসে দাঁড়ায়। অন্য মেয়েগুলি একটু জড়োসড়ো।হয়তো এভাবে সরাসরি কেনার অভিজ্ঞতা নেই। নবীনখেয়াল করেছে অল্প বয়সী মেয়েরা নিজেরা অন্তর্বাস কিনতেএলে লাজুক ভাবে শোকেসের উপর ঝুঁকে, চাপাস্বরে দাম ওসাইজ নিয়ে কথা বলে।

এই মেয়েটি আলাদা। সে বড় বড় চোখে মডেল পুতুলমেয়েটিকে দেখছে।

নবীনের অভিজ্ঞ চোখ বলে এই দামি ব্র্যান্ড আর সাইজকোনটাই মেয়েটার পক্ষে মানানসই নয়। দোকানেরকর্মচারীরাও এদের সাজ দেখে সাধ্য আন্দাজ করে বোধহয়অন্যদের দিক থেকে মনোযোগ ফেরায় না।

নদীর কাছে গিয়ে নরম স্বরে বলে, ভিতরে যান। নানারকমপাবেন। সব রকম দামের মধ্যে পাবেন।

মেয়েটি এক মুহুর্ত সংকুচিত হয়ে গ্রীবা উঁচু করে পরমুহূর্তেবলে, এটাই চাই। কাস্টমার দাঁড়িয়ে আছে আর আপনারাদেখাচ্ছেন না, দোকান চালাবেন কি করে? 

নবীন বিনীত হাসে, বলে, তাইতো বললাম। ভিতরে যানওরা দেখাবেন। তবে এটা নিতে যাবেন না। সাইজ হবে না.. দামটাও বেশি.. অনেকরকম আছে ভিতরে.

নবীনের কথা শেষ হয় না,মেয়েটি চেঁচিয়ে বলে, কিরকমঅসভ্য লোক আপনি! বাজে কথা বলছেন! দামের কথাবলেছি নাকি? এ.সি মার্কেটে দোকান বলে টাকার গরমদেখাচ্ছো? কেন, আমরা কি ফালতু নাকি টাকা দিতেপারবোনা? বলি গটগট করে দোকানের ভিতর ঢুকিয়েএকিভাবে চেঁচিয়ে বলতে থাকে, ওই বাইরে টানানোলালটাই দিন তো। টাকা দেখাচ্ছে! কোন সাইজ টাইজজানার দরকার নেই। যা বলছি শুনুন, ওটাই দেবেন।

মেয়েটির এই উত্তেজনায় বন্ধুরা হতভম্ব ও বিব্রত হয়ে পড়ে।মৃদু গলায় বোঝাতে থাকে। সম্ভবত টাকার কথাও তোলে।কিন্তু সে নাছোড়বান্দা।

নবীন অবাক হয়ে দেখে, মেয়েটির ব্যাগে ওই টাকা নেইবন্ধুদের কাছ থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে খুচরো শুদ্ধ দেয়, তবুভুলভাল সাইজের অন্তর্বাসটি কিনে ছাড়ে! দোকানেরমালিক নবীনকে একেবারেই তিরস্কার করে না বরং পিঠচাপড়ে যায়। এরকম দু- চারটে ঘটনা ঘটবেই, তবু যেন সেকথা বলার সময় একটু সতর্ক থাকে এই মাত্র।

নবীন দুঃখিত হয় এবং সুখী হয়। দুঃখ এই কারণে মেয়েটিফালতু ওই ছোট সাইজের অন্তর্বাসটা কিনলো! সুখ এইকারণে যে মেয়েটির তেজ তাকে অভিভূত করে দিল। রাতেবস্তিতে ফেরাটা কষ্টকর ব্যাপার। এই চাকরি টাকায় ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকাযায়না। বাবা-মাকে ছেড়ে এখন একা একটা ঘর পেয়েছেমাত্র এই যা।

শক্ত তক্তপোশে শুয়ে সে মেয়েটির ঈষৎ ভারী স্তন ছোটসাইজের লাল ব্রাটির অবস্থান কল্পনা করতে লাগলো।য়ক্রমে মেয়েটির পাতলা ঠোঁট, বোঁচা নাক গোলালো ঢুলুঢুলুচোখ প্রধান হয়ে উঠলো। অপ্রয়োজনের কারণে বাদ গেলমাথার চুল, দুটি হাত, হাটু থেকে পা। কেবল জেগে রইললাল ব্রা আর প্যান্টি পরা ম্যানিকুইনের মতো শুধু প্রয়োজনভিত্তিক খন্ড শরীর।

নবীন এবারে সকালের দিকে ছুটি নিতে শুরু করলো।যেহেতু সে ঠান্ডায় থাকার মায়াটা পরিত্যাগ করতে পারে নাতাই কাজের ফাঁকে একমাত্র কাজ হলো নার্সিং কলেজেরপাশে ঘোরাঘুরি।অবশেষে প্রেমপত্র, অনুনয়-বিনয়, সাধাসাধি আত্মহত্যার হুমকি- কোন কিছুতেই সেই দেমাগীমেয়েকে বশে আনা গেলো না।

দিন কাটে। তানিয়া সুলতা জবা রীতাদের ফাইনালের সময়এগিয়ে আসে। আত্মহত্যার অভিমানের বদলে একদিনতানিয়াকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয় নবীন। থানায় রিপোর্টকরে তানিয়া। এবারের রীতা জবারা বারণ করেছিল কিন্তু সেশোনে না।

থানা থেকে বস্তিতে গিয়ে নবীনকে না পেয়ে মার্কেটে খোঁজকরে পুলিশ। এতোদিনের স্বহৃদয় মালিক কড়া গলায় ধমকদেয়

এও জানায়, এ ধরনের অভিযোগ দ্বিতীয়বার এলে তাকেআর রাখা হবে না। 

দুদিন পর নবীন জানতে পারে তাকে দোকানের সামনে থেকেসরিয়ে বেসমেন্টে গাড়ি রাখার জায়গায় লিফটের সামনেতদারকির কাজ দেয়া হয়েছে। মালিক আর তার চোখে চোখরাখে না। আধবুড়ো কর্মচারী জানায় কিছুদিনের জন্য তারএই শাস্তি। উত্তাপ মিটে গেলেই তাকে আবার উপরে ফিরিয়েআনা হবে।

নবীন বারবার আপত্তি জানিয়ে দেখে কোনো তাপ উত্তাপনেই মালিকপক্ষের। সে এবারে শান্তভাবে বেসমেন্টে যায়।টুলেও বসে। এখানে দমচাপা গরম,নিচু ঘাড় গোঁজা সিলিং যেন অবিকল তার বস্তির ঘরের মতো। উত্তপ্ত থমকানো বাতাসযেন মুখ আটকানো কৌটার ভিতরে ভরে রেখেছে তাকে।ডেট ওভার হওয়া ওয়েট টিস্যু ব্যবহার করে নবীন। এখনসেই মৃদু সুঘ্রাণও তাকে তাজা করতে পারে না।

এরমধ্যে একদিন লিফটের মধ্যে তানিয়া আর তার ডাক্তারপ্রেমিককে একসঙ্গে দেখে। নবীন ডাক্তারকে অগ্রাহ্য করে পূর্ণদৃষ্টিতে তানিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে। তানিয়ার লম্বাবাদামি গলা, বোঁচা নাক, গর্বিত ভঙ্গিতে অন্তর্বাস ভেদ করাঅন্যদের তাচ্ছিল্য করা শরীর দেখে ধীরে ধীরে শক্ত হয়েওঠে সে। তানিয়াকে সে কীভাবে চাইছে বুঝতে পারেনা।পারেনা বলে এক ঝটকায় গলার নলি টিপে মুরগির মতোআছড়ে ফেলতে ইচ্ছে করে। এই মার্কেটের টিভির দোকানেইদেখেছে বাঘ সবসময় খাদ্যের জন্যই হত্যা করে এমন নয়।তাকে উত্ত্যক্ত করলে সে স্রেফ বিরক্তির কারণে টুঁটি টিপেশেষ করে দেয়। উৎকট ইচ্ছেটার বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনোশক্তি পায় না নবীন এবং কেন যে ইচ্ছায় রাশ টানতেসেটাও সে বুঝতে পারে না। চরম একটা বিতৃষ্ণা হতাশ করেদেয় তাকে। এই মেয়েটার কারণে তার পরম কাম্য এ.সিরসতেজ আরাম, দামি স্বস্তিদায়ক অনুভূতি থেকে এক মুহূর্তেনেমে যেতে হয়েছে ইঁদুরের গর্তে, বস্তির পিছনে পুঁতিগন্ধময়নর্দমার পেচ্ছাপ পায়খানার রক্ত মাখা ন্যাপকিনেরভাগাড়ে।

নবীন মনে রাখে তানিয়া আবার শনিবার বিকেলে টেলারেরকাছে তার কাপড় নিতে আসবে। শনিবার মানে তারপরদিন ছুটি। তানিয়া যে একবারের জন্যও তার দিকে দৃকপাতকরেনি, তাতে তার কিছু যায় আসে না এখন।

(চ)

রীতার মনটা খচখচ করে। বারীন একমাস হলো টাকাটানিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। সুলতা জানে। বেশি দেরি হলে কথাশোনাতে ছাড়বে না। এটা ঠিক যে টাকার পরিমাণটা বেশিনয় কিন্তু মিডিয়া ছিনে জোঁকের মতো। কোত্থেকে খবর বেরকরবে যে তানিয়ার নামে জোগাড় করার টাকা তার স্বামীব্যবসার খাতে ঢেলেছে। শেষ মুহূর্তে বদনাম কুড়ানোর কোনমানে নেই।আজ সকালেও বারীনকে টাকাটা ফেরত দেয়ারকথা বলায় গা করেনি। কথা শুনিয়েছে।

এতো বছর ধরে পঙ্গু বন্ধুর দেখাশোনা করার জন্য তাদেরসাংসারিক জীবনটাই পাল্টে গেছে, এসব বলেছে। রীতাবেশি তর্ক করেনি। বারীনকে সামলে নেয়া যাবে। মধুর শ্রীবাস্তব আর তার দলবল খবর পেলে সে কীভাবে সামলাবে সে জানেনা।

সাড়ে পাঁচটার লোকালে নামে রীতা। খেয়া পেরিয়ে ওপারেযায় এইট বাঁধানো অসমান পথ পেরিয়ে কিছুটা টালি ওটিনের চালার পাকা দেওয়ালের বাড়িতে পৌঁছায়। গেটেরসামনে মোটরবাইক হেলান দিয়ে রাখা। উঠোনে ধানশুকাতে দেওয়া। বাসক পাতার আড়ালে বাড়িটার দু'পাশেপিছনে ফুলের ঢেউ। এখানকার বেশিরভাগ লোকইফুলচাষী। সারা বছরের পুজোর চ্যাড়া গাঁদা দোপাটি, জবা,রঙ্গন, রজনী ছাড়া ইদানিং জারবেরা, কারনেশনগ্লাডিওলার চাষও চলে। রীতা যেন বহুদিন পর ফুলের গন্ধেশ্বাস ফেলে। নির্মল সুগন্ধ। গ্রামের দিকেও আজকালপলিউশন এমন যে আজকাল দম বন্ধ হয়ে আসে। এখানেফুল চাষের জন্যই ব্যতিক্রম। রীতা বহুদিন পর এলো।আসার প্রয়োজন হয় না। যাদের দরকার তারাই এই শহরেগিয়ে যোগাযোগ করে। আজ হঠাৎ রীতা নিজেই চলেএলো। জানতো যে বাড়ির লোকেরা থাকবে। অন্ততগতকাল ফোনে তেমনি কথা হয়েছে। রীতা ঘরের ভিতরে হাতলওয়ালা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে। আজকের রাতটাএকটা স্টেশন পর সুলতার বাড়ি থাকবে বলে এসেছে; ঘরেফেরার তাড়া নেই। সুমিতা এই অবেলায় জোর করেপাউরুটি অমলেট দুধ চা খাওয়ায়। এতবছরেও সুমিতারচেহারায় বয়সের ছাপ পড়ে নি। বস্তি থেকে উঠে এসেফুলচাষী হয়ে স্বাস্থ্য ও ঔজ্জ্বল্যে বেশ একটা গেরাম ভারীভাব এসেছে।

কিশোর হালদার এখনো মাঠ থেকে ফেরেনি। রীতা খেয়েউঠে গ্রাম ঘুরতে বেরোয়।

বাবা-মা শৈশবেই শহরে চলে যাওয়ার আগে, এক সময় এইগ্রামের প্রতিটি পথঘাট তার চেনা ছিল। যাওয়ার আগে বাবাজমি বাড়ি বেচে গেছিলো তাই ফিরে আসার টান নেইএখানে। এখনকার মতো হাইস্কুল, স্বাস্থ্য কেন্দ্র কিছুই ছিলনা।রাত-বিরেতে অসুস্থ হলে ভরা নদী পেরিয়ে কুড়িকিলোমিটার দূরে সদরে যেতে যেতে সব শেষ।

রীতার একমাত্র দাদা এভাবেই মরে গেছিল। শোক কাতরক্রুদ্ধ বাবা মা রাতারাতি সব বেচে মুকুন্দপুরের দিকে কাঁচাবাড়িতে উঠে এলো। মায়ের ইচ্ছায় না্র্সিং কলেজে ভর্তি হলরীতা। কিশোর হালদারকে শহরের বস্তি থেকে সরাতে এর চেয়ে চেনা ও নিরাপদ জায়গা আর জানা ছিল না রীতার।এখন সেই নদী হেজমজে গেছে।ব্রিজ হয়েছে তার উপর।বাঁশঝাড় পালতে মাদারের বড় গাছগুলি এখনো আছে।ধীরে ধীরে সন্ধ্যা নামছে। ঘরবাড়ি পেরিয়ে ফুলের মাঠে নামেরীতা। উঁচু সুখা জমিতে রজনীর চাষ হয়। বেল জুঁই আবারভেজা মাটিতে। কিশোর হালদারের সঙ্গে এই পথেই দেখাহয়ে যায়। সম্পন্ন চাষির পিছনে দুজন মুনিষ। রীতা বলে,এক চক্কর দিয়ে সে আসছে। কিশোর যায় না। মুনিষদেরইশারায় যেতে বলে রীতার সঙ্গ ধরে।

বস্তির খেদানো জীবন থেকেই কৃষক জীবনে উত্তরণের জন্যরীতার অবদান অনেক তাই খানিক কৃতজ্ঞতার ভাব দেখায়কিশোর হালদার। একটু সময় নিয়ে কথা বলতে পারলেভালো। কথাটা পাড়া কঠিন। সুলতা আর জবাকে বলেছিলতার সঙ্গে আসতে। এলো না। সবারই না না বাহানা। রীতাআজ বলতে এসেছে তানিয়ার অ্যাকাউন্ট থেকে আরকোন টাকা কিশোরের পরিবারকে সে আর দিতে পারবে না।সৎ ছেলে নবীনকে পুলিশের হাতে তুলে দিলে রীতাদেরকাছ থেকে টাকা পাওয়া যাবে এমন একটা পরিকল্পনাসুমিতার মত ঘাঘু মেয়ের মাথায়ই আসতে পারে! না হলেসীমান্ত এলাকায় চেনাশোনা থাকা কিশোর হালদার ঠিককরে ফেলেছিল নবীনকে পার করে ওপারে সুমিতা মানেমামুণির বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেবে। নবীন ধরা পড়ার পরতানিয়া নামে যে টাকা উঠতে থাকে সেখানেও মামুনি নিজেরনাম ঢোকাতে বাধ্য করে। রীতার অবশ্য এতে রাগ ঘৃণাকিছুই হয়না। এদের লোভের ফলে নবীনকে জেলে দেওয়াসম্ভব হয়েছে তাই অনেক। একবার ওপারে বা নেপালে ঢুকেগেলে আর ধরতে পারতো না। যতদিন পেরেছে কিশোরদেরটাকা দিয়েছে। এখন মধুর শ্রীবাস্তবের দলবল পিছনেপড়েছে। উকিলবাবু সাবধান করে দিয়েছেন ক্যাশ ছাড়াবাইরের কেউ যেন টাকা না পায়। এখন আবার মামলারহার-জিতের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। এছাড়া যা দেখা যাচ্ছে কিশোর মামুনির এই টাকাএখন না পেলেও চলবে। যথেষ্ট কিছু গুছিয়ে নিয়েছে তারা।

কিশোর হালদারের সঙ্গে সে দূরত্ব বাঁচিয়ে পথের ধারে চায়েরদোকানে বসে। সূর্য অস্ত যাচ্ছে। গরমে সাদা ফুলের ঘ্রাণ এইসময়টা আনন্দের আর শোকের গন্ধে আচ্ছন্ন করে দেয়।রজনীর গন্ধে হয় বিয়ে, না হয় মৃতজনের বিচ্ছেদ ভেসেথাকে। রীতার হাসি পায়। সকাল-বিকেল মৃতদেহ দেখেও সেএমন ভাবালু হয়ে পড়ছে! 

রীতা শুনলো ভাঙাভাঙা গলায় প্রায়বৃদ্ধ কিশোর বলছে, ছেলেটা এমন পাপ করল, মুখ দেখাবার জো রাখল না, নাহলে এমন বিজন বিভূঁইয়ে বুড়ো বয়সে কাজকারবার- 

রীতার মুখে কোনো অভিব্যক্তি না দেখে বুড়ো কথা পাল্টায়, শোনায়, আজকাল সবই গন্ধহীন ফুল, হাইব্রিড। ওই ডবলরজনীর কোন গন্ধ নেই। দুদিন পর জুঁই বেলের গন্ধটা ছেঁকেছিবড়েটা পাঠাবে মহাজন।

রীতা ফুলে ভরা মাঠের ধারে ডুবন্ত সূর্যের দিকে তাকায়। মনেহয় যেন প্রাণহীন ফুলের ক্ষেত নিস্তব্ধ গুমোট সাদা কাপড়মোড়া শরীর ঢেকে রেখেছে আর দিগন্তের দিকে রক্তের মতোলাল আলো ভাসিয়ে দিচ্ছে।

রীতার একবার মনে হলো এখনি সুলতাকে জানানো দরকারযাই হোক না কেন তানিয়াকে বাঁচানো দরকার। পরমুহূর্তেক্লান্তি লাগলো। যা হবে হোক। এই সময়টুকু সেভাবেই বসেথাকবে। খবর হিসেবে জানলেও এই কিশোর হালদার ও তারদ্বিতীয় পক্ষের বউ সুমিতা ওরফে মামুনির জীবন এমন ভাবেবদলে গেছে দেখে যেন বিশ্বাস হচ্ছেনা। নবীনের জন্য এদেরজীবনটাই সংশোধিত মার্জিত হয়ে গেল আর নবীন থেকেগেলো অপরিবর্তিত সংশোধনের অযোগ্য!

দূর থেকে উন্মাদপ্রায় ছন্নছাড়া চেহারা নবীনকে দেখে এসেছেসে। মনে মনে তার এমন পরিণতিতে খুশি হয়েছে; কিন্তু তারবাপ কিশোর আর সৎমা সুমিতাকে দেখে সেই আনন্দের রেশ ফিকে হয়ে যাচ্ছে। রীতাকে হাতের কাছেপেয়ে কিশোর নানা রকম কথা বলে যায়। রীতা কিছুই শোনেনা। শোনার ভানও করে না।

(ছ)

"এটা কোন কসাইখানা নয়, হাসপাতাল। জানো তো গ্রিকচিকিৎসক হিপোক্রিটসের কথা ?- টু প্লিজ নো ওয়ানআই প্রেসক্রাইব এ ডেডলি ড্রাগ আর গিভ অ্যাডভাইসহুইচ মে কজ হিজ ডেথ।"

ছাড়ো ওসব হিস্ট্ররিক কথা। নেদারল্যান্ড বেলজিয়ামলুক্সেমবার্গ সুইজারল্যান্ড থাইল্যান্ড এরা তো মেনে নিয়েছে।আমরা ওদের চেয়ে বেশি মানবিক। যে দেশগুলোর কথাবলছো তাদের জনসংখ্যার সঙ্গে আমরা? অস্ট্রেলিয়ায়, তাওসব জায়গায় নয়, পাস হয়েছে ঠিকই তবে সেখানে শর্তআছে। "মার্সি কিলিং আন্ডার দ্য সুপারভিশন অফমেডিকেল প্র্যাকটিশনার- এদেশের শর্ত দিলেও লোকেমানবে? যেখানে সম্পত্তির জন্য ডাইনি-হত্যা অবধি হয়সেখানে এই নিয়মের অবমাননা হবে না? কেউ আটকাতেপারছেন? এদেশে আবার ডেথ অফ ডিগনিটি ! বাঁচারকালটাই লাথখোরের মতো তার আবার মৃত্যুর সম্ভ্রম! 

এই রে!লাথখোর চলবে না।‘কীটজন্ম’ টাইপ কিছু লিখতেহবে।

". যাই বলো আইনত আমরা একে হত্যাই বলবো। পেনালকোডে আইপিসি সেকশন ৩০৬ এ একে খুন ছাড়া কিছু বলাযাবে না । আত্মহত্যার অধিকার থাকতে পারে না " 

" ভুল করছো! যে বিছানায় পড়ে আছে, যার আত্মপরবোধই নেই সে আত্মহত্যার অধিকার চাইবে? তানিয়ারগলায় লিফটের দরজা বাঁধার চেন জড়িয়ে যে অত্যাচারকরা হয় তাকে আসলে পাশবিক বলার কোনো অর্থই হয়না। পুরুষ পশুরা সময় বিশেষে ধর্ষণ করে বটে কিন্তু তাতেহত্যার উদ্দেশ্যে থাকেনা। প্রতিহিংসা চরিতার্থ করে না।স্রেফ কামপ্রবৃত্তি পূরণের জন্য মেয়ে প্রসূতির অনুমতিরতোয়াক্কা করে না বলে করে। এক্ষেত্রে শিক্ষানবিশ নার্সতানিয়া বিশ্বাস সবার সামনে চড় মেরেছিল অভিযুক্ত নবীনহালদারকে । নবীন ওর স্বীকারোক্তিতে বলেছিল পরের শনিবার নয়, একমাস পর এক শুক্রবারসন্ধ্যায় টেলারের কাছে একা ডেলিভারি নিতে এসেছিলতানিয়া। লিফট আটকে যাওয়ার অছিলায় সে তানিয়াকে

কোন শারীরিক উত্তেজনায় আক্রমণ করেনি। ঘৃণা আরক্রোধ থেকে এসে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে তানিয়াকেমারতে চায় ও মারে। লিফট থেকে টেনে হিঁচড়ে বেসমেন্টেরদারোয়ানের খুপরিতে নিয়ে যায়। ধর্ষণ নাকি তাকে শিক্ষাদেওয়ার জন্য! জেনারেটরের আওয়াজে কেউ কোন শব্দ শোনে না।" 

"বুঝলাম এসবের মধ্যে পেশেন্টের মৃত্যুর অনুরোধ কোথায়?ডাক্তারের এথিকস কোথায়? 

"পেশেন্ট? পেশেন্ট বলার জায়গা আছে? অন্ধ বধিরপ্যারালাইজড হয়ে গেছে সে! তানিয়ার কষ্ট সহ্যাতীত।অবস্থায চিকিৎসার অযোগ্য। পরিণতি কেবল মৃত্যু।এক্ষেত্রে পরিবার প্রিয়জনেরা তার হয়ে শুধুমাত্র শারীরিক

জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। এতো বেঁচে নরকে থাকা”

". না, ডাক্তাররা এটা পারেন না। ডাক্তার ঈশ্বরতুল্য।শোনেন নি? দেবতার বরে মৃত্যু হয়না, অভিশাপে হয় ? ডাক্তার শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রোগীকে বাঁচাবার জন্যঅঙ্গীকারবদ্ধ থাকে। জীবন গ্রহণ খুনির কাজ "

" ঈশ্বর? ভগবান? চমৎকার! সেই শেষ অবধি ধর্ম যখনটেনে আনলে তখন বলি জৈন বৌদ্ধ হিন্দুরা ইচ্ছা মৃত্যুতেবিশ্বাস করে। কারণ তাদের জন্মান্তরে আস্থা আছে।তোমাদের কথা মতো ভীষ্মকে ইচ্ছামৃত্যুতে সায় না দিলে, প্রাণ না বেরোনো অবধি তাঁকে খোলা ময়দানে শরশয্যায়শুয়ে থাকতে হতো। প্রাকৃতিক মৃত্যুর সঙ্গে হাত মেলাবারজন্যে পচে গলে যাওয়ার অপেক্ষা করতে হতো। আমার বরংনবীনকে ভাগ্যবান মনে হয়। মৃত্যুর অধিকার কতো সহজেপেয়ে গেছে। কোনো কোনো দেশ ওর মতো পাষণ্ডের মৃত্যুরঅধিকারও রদ করেছে। আমরা অন্তত ওর প্রতি জাস্টিসকরেছি। বাঁচাবার কোন চেষ্টা করিনি। ঠিক কিনা বলো? “ 

দিব্যরূপ লেখে। এরপর কি লিখবে ভাবে।এরকম একটাকাল্পনিক তর্ক খাড়া করে পাঠকের মতামত নেওয়ার চেষ্টাকরা যেতে পারে ভাবে। কেন যে এই বিষয়টা নিয়ে এতটা জড়িয়ে পড়লো ভেবে বিরক্ত লাগে।আর নয়, এই রিপোর্টের একটাসাড়া জাগানো চিঠি চালাচালি শুরু হওয়ার পরে অন্যকাজে ঢুকে যেতে হবে। ছোটখাটো হালকা কোনো পজিটিভবিষয়। জেল খুন-ধর্ষণ বিকার এসব নয়। রীতার ছোটবেলার গ্রামকাপাসডাঙ্গার ফুল চাষ দেখে আসতে পারে। লিখতে পারেআদিগন্ত বিস্তৃত ফুলের মাঠে একমনে কাজ করে চলেছেনভাগ্যহত কিশোর হালদার। শান্তভাবে একমাত্র ছেলেরফাঁসির অপেক্ষায় দিন গুনছে সে।

দিব্যরূপ রিপোর্ট শেষ করতে বসে। যেভাবে হোক আজ রাতেএই কাজটা শেষ করবে সে।এই মুহূর্তে এই রাতে একটা পক্ষঅবলম্বন তাকে করতে হবে। নিরপক্ষ বলে কিস্যু হয়না।বাহুতে আবার নিকোটিন প্যাচ সযত্নে লাগায়। ই-সিগারেটধরায়। এই হাই রাইজের খোলা বারান্দায় ইচ্ছে করেই সেগ্রিল বা ফাইবার গ্লাস বসায় নি। এখানে দাঁড়িয়ে বহু নিচেতাকালে ঝকঝকে নির্জন চাতাল চোখে পড়ে। একমুহূর্ত, আলো বা মনের গতির চেয়েও কম সময়ে শুধু প্রবল ইচ্ছায়এখান থেকে লাফ দেবার কথা ভাবে। প্রায়ই ভাবে। নেশারমত মাথা ঝিমঝিম করে। সিদ্ধান্ত নিতে পারে না দিব্যরূপ।পকেট থেকে একটা কয়েন নিয়ে টস করার কথা ভাবে।যেভাবেই হোক আর সে পক্ষ নেবেই। কিন্তু মৃত কে? তানিয়া? নবীন? কার পক্ষ নেবে? রীতার? হংসিকার মা মধুরশ্রীবাস্তবের? দিব্য কয়েনটা ঘষে নেয়। বারবার ঘষতেইথাকে। অন্তত ততক্ষণ, যতক্ষণ না সে একটা সিদ্ধান্তেআসতে পারে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন