মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

কথাসাহিত্যিক বিমল করের দীর্ঘ সাক্ষাৎকার


১৯৯০ সালের ৩ নভেম্বর দেশ পত্রিকায় বিমল করের এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারটি প্রথম মুদ্রিত হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন কবি প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে বিমল করের প্রয়াণের পর ‘বিভাব’ পত্রিকায় ২০০৩ সালে সাক্ষাৎকারটির পুনর্মুদ্রণ করেছিলেন সম্পাদক সমরেন্দ্র সেনগুপ্ত। ছোটগল্পকার বিমল কর’-এর সাহিত্য ও জীবনদর্শন এবং বাংলা ছোটগল্প সম্পর্কিত মূল্যবান আলোচনার একটি চমৎকার উদ্ধার এই সাক্ষাৎকারটি। 
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------

বাংলার ছোটগল্পে বিমল করের একটি স্বমহিম স্থান। গল্পের বিষয় ও ভাবনায়, বুননে ও বর্ণনায়, প্রকরণে ও পরীক্ষায় প্রথম থেকেই তিনি সচেতন ও সন্ধানী এক শিল্পী। বহু স্মরণীয় গল্পের এই স্রষ্টা শুধু নিজের লেখা লিখেই তৃপ্ত থাকেননি, পাশাপাশি অনুজ লেখকগোষ্ঠীর মধ্যেও খুঁজেছেন সত্যিকারের প্রতিভা। তাঁদের উৎসাহিত করতে চেয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করতে প্রয়াসী হয়েছেন। কখনও ছোটগল্পের পত্রিকা প্রকাশ করে, কখনও নব্যরীতির আন্দোলনের সূচনা করে। এখনও তিনি বলতে গেলে সম্পূর্ণ একক প্রচেষ্টায়, ছোটগল্পের একটি দ্বিমাসিক পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করে চলেছেন। এই আশ্বিনে (১৯৯০ নভেম্বর) সত্তর বছর বয়সে পা রাখলেন বিমল কর। ছোটগল্প নিয়ে তাঁর নিজস্ব সাধনা ও সিদ্ধি, তাঁর ভাবনা ও ভালোবাসা – এই নিয়েই কিছু কথা বলব বলে পুজোর ছুটিতে হানা দিয়েছিলাম তাঁর সল্টলেকের বাড়িতে। সঙ্গে একটি টেপ রেকর্ডার ও দুটি ফাঁকা ক্যাসেট। ঘরোয়া ও আন্তরিক সেই কথোপকথনের মধ্যে দিয়ে ‘গল্পকার বিমল কর’-এর যে পরিচয় ফুটে উঠেছে, তারই প্রতিলিখন এখানে প্রায় অবিকৃত অবস্থায় বিধৃত হল।
--প্রণবকুমার মুখোপাধ্যায়
-----------------------------------------------------------------------------------------------------------------------------
প্রণব:
বিমলদা, আজ কোজাগরী পূর্ণিমা। এই কোজাগরী পূর্ণিমার দিনে আপনার একটি গল্পের কথা বারবার মনে পড়ে। ফিনকি-ছোটা জ্যোৎস্নার এক অসামান্য বর্ণনা ছিল সেই গল্পে। আর এই জ্যোৎস্নারাত্রির আনন্দ ও সুধার মধ্যে জন্ম নিয়েছিল একটি ছেলে। তার বাবা ছেলের নাম রাখলেন, সুধাময়। এই ‘সুধাময়’ নামেই আপনার গল্প। মনে আছে আপনার? 

বিমল:
হ্যাঁ, মনে তো আছেই। তুমি ঠিকই বলেছ। সুধাময়ের জন্ম হয়েছিল এমন একটা লক্ষ্মীপূর্ণিমার দিনেই। ওদের বাড়িটা যেখানে ছিল তার সামনেই এক নদী। বিরাট তার চর। সেই বাড়িতে যখন ও জন্মায় তখন ওর মা-র গায়ে ছিল লক্ষ্মীপুজোর নতুন কোরা শাড়ি। তা, সুধাময় জন্মাবার পর, যা হয় আর কি, বাচ্চারা তো কেঁদে ওঠে, ও কেঁদে উঠেছিল। ওর পিসি ছুটতে ছুটতে এসে সুধাময়ের বাবাকে খবর দিয়ে বলল, দাদা, খোকা হয়েছে। জন্মেই খুব কাঁদছে ছেলেটা। ওর বাবা একটু দার্শনিক ধরনের ছিলেন। তিনি বললেন, এত সুন্দর চরাচর, জ্যোৎস্না, বিশ্ব – ছেড়ে ও এসেছে তো এই জগতে, ও হয়তো সে-কথা ভেবেই কাঁদছে। কিন্তু ও একদিন ঠিক বুঝতে পারবে, ও কিছুই ছেড়ে আসেনি। এ সবের মধ্যেই ও রয়েছে। 

প্রণব:
এই গল্পটা সম্পর্কে আপনি পরে এক জায়গায় লিখেছেন, ‘লেখাটা ভালো হোক বা মন্দ হোক – সেই আমি প্রথম অনুভব করলাম, আমার আগের সমস্ত লেখার গণ্ডি আমি ছাড়িয়ে এসেছি।' তো, কথাটা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন। 

বিমল:
হ্যাঁ। আমি ঠিকই লিখেছিলাম। কেননা, এর আগে যে-সব গল্প আমি লিখেছি, সুধাময় গল্পটি সব দিক থেকেই তার চেয়ে আলাদা। অর্থাৎ, ভাবের দিক থেকে, ভঙ্গির দিক থেকে, বক্তব্যের দিক থেকে, আমার কাছে একটি নতুন অভিজ্ঞতা। এ-গল্পে আমি আমার জীবনের কিছু অনুভূতিও প্রকাশ করতে চেয়েছি। তাই গল্পকার হিসেবে আমি মনে করি, এটা আমার একটা পরিবর্তন। 

প্রণব:
এটা যদি পরিবর্তন বিমলদা, তাহলে আমাদের জেনে নিতে হবে, 'সুধাময়’ লেখার আগে আপনি কী ধরনের গল্প লিখতেন? ‘সুধাময়' কী অর্থে আপনার গল্পকার জীবনের একটা টার্নিং পয়েন্ট। 

বিমল:
এর আগে বলতে, আমি ঠিক গল্পলেখক হব বলে গল্প লিখিনি। অনেক আগে, যা হয় আর কী, কম বয়েসে অনেকেই যেমন একটু-আধটু লেখার চেষ্টা করে, সেই রকম – যুদ্ধের সময়; আমার তখন বাইশ-তেইশ বছর বয়স – আমি দুটো গল্প লিখেছিলাম। ছাপাও হয়েছিল 'প্রবর্তক’ মাসিক পত্রিকায়। তার প্রথম গল্পটা কিছুই নয়। দ্বিতীয় গল্পের মধ্যে বোধহয়, পরবর্তীকালে আমি যে-ধরনের লেখা লিখতে চাই, তার একটা ‘নিউক্লিয়াস’ ছিল। গল্পটার নাম ছিল ‘অম্বিকানাথের মৃত্যু' বা মুক্তি – 

প্রণব:
‘অম্বিকানাথের মুক্তি'। 

বিমল: 
হ্যাঁ, যাই হোক, সে-গল্পে ছিল এক ব্রাহ্মণ, নিষ্ঠাবান, শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত, খুব ‘স্টোয়িক' ধরনের, জীবনের সব দুঃখ-বেদনা-আনন্দকে তিনি সমানভাবে নিতে চেয়েছিলেন। তিনি কখনও চোখের জল ফেলতেন না। মৃত্যুতে না, সুখেও না, দুঃখেও না। তিনি যখন মারা যাচ্ছেন নিজে, তখন হঠাৎ তিনি প্রথম কাঁদলেন। কাঁদলেন এই জন্যই যে, তিনি এই-যে বিশ্ব, এই চারপাশের ঘরবাড়ি-গাছপালা-লতা-পশুপাখি, এই সব জাগতিক সম্পর্কের নিবিড়তার বন্ধন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন বলে। সেই প্রথম তিনি অনুভব করলেন জগতের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। যিনি অন্যকে এতকাল বলে এসেছেন, জীবন ও মৃত্যুকে তোমরা একইভাবে গ্রহণ করবে, চোখের জল ফেলবে না, আজ তাঁরই চোখে জল। ... এর পাঁচ-ছ-বছর পরে, সুহৃদ রুদ্র, বিশ্বনাথ ভট্টাচার্য, মুরারি সাহাদের 'দ্বন্দ্ব’ পত্রিকায় আমার দুটি গল্প বেরোয়। আমি তখন বেনারসে থাকি। অরুণ ভট্টাচার্যের কথামতো একটি গল্প লিখে পাঠাই – 

প্রণব: 
কবি অরুণ ভট্টাচার্য তো? বিমলদা, অরুণদা তো আপনার অনেক পুরনো বন্ধু।

বিমল: 
হ্যাঁ, কলেজের বন্ধু। অরুণ, শিশির, সুনীল দত্ত – আমরা সব এক কলেজে পড়তাম। একসময়ে। আমার পড়া মানে ওই কলেজে নাম লেখানো ছিল আর কী। 

প্রণব: 
অরুণদাই আপনাকে 'দ্বন্দ্ব’ পত্রিকায় লিখতে বলেন? 

বিমল: 
হ্যাঁ, ‘দ্বন্দ্ব’ পত্রিকার তখন খুব নামডাক। ওখানে আমি 'পিয়ারীলাল বার্জ’ ও ‘ভয়’ নামে দুটি গল্প লিখি। এরপর কলকাতায় ফিরে এসে ‘পরাগ’ পত্রিকায় যখন চাকরি করি তখন একটা গল্প লিখেছিলাম। তো, সে-গল্পটির কথাও ভুলে গেছি। এর বহুকাল পরে আমরা বন্ধুরা মিলে ‘উত্তরসূরী’ নামে একটা কাগজ বার করি। সেটা ছিল ১৯৫২ সাল। 

প্রণব: 
তখন উত্তরসূরীর সম্পাদক ছিলেন শিবনারায়ণ রায় ও নারায়ণ চৌধুরী। আমার মনে আছে, উত্তরসূরীর প্রথম সংখ্যাতে আপনার একটা গল্প ছাপা হয়। গল্পটির নাম ছিল ‘হঁদুর'। সে-গল্প তো খুবই পরিণত লেখা। 

বিমল: 
হ্যাঁ, গল্পটা অনেকেরই ভালো লেগেছিল। লেখকের ভাগ্য বলে যদি কিছু থাকে, তবে এই গল্পটি আমার সৌভাগ্যের সূচনা করে। সাগরদা, মানে দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষ, উনি তো নানারকম কাগজটাগজ পড়েন, ওঁর হাতে গৌর উত্তরসূরী পৌঁছে দিয়েছিল -- 

প্রণব: 
গৌর মানে গৌরকিশোর ঘোষ?

বিমল: 
হ্যাঁ। আমার গল্পটা সাগরদার ভালো লেগেছিল। তখন উনি গৌরকে বলেন, তুমি এই বিমল করটিকে বলো, আমাকে একটা গল্প লিখে দিতে। আমি খুব খেটেখুটে একটা গল্প লিখে দিই। ‘বরফসাহেবের মেয়ে'। দেশ পত্রিকায় সেটা ছাপা হয়। ১৯৫২ সালে। 

প্রণব: 
এই তো প্রথম বিমলদা, যে, বড় পত্রিকা আপনার কাছ থেকে লেখা চেয়ে নিল? ‘প্রবর্তক’-ও বড় কাগজ, কিন্তু সেখানে নিশ্চয় আপনি নিজে থেকেই লেখা পাঠিয়েছিলেন? 

বিমল:
ঠিকই বলেছ। সত্যি কথা বলতে কি, ১৯৫২ সাল থেকেই আমি প্রফেশনালি গল্পলেখক হবার চেষ্টা করতে শুরু করলাম। তার আগে শখের লেখা লিখেছি। 

প্রণব: 
'বরফসাহেবের মেয়ে’ গল্পের প্রতিক্রিয়া কেমন ছিল বিমলদা? মনে পড়ে? 

বিমল: 
পাঠকদের তো ভালোই লেগেছিল। তবে এখন আমার মনে হয়, সুবোধ ঘোষের কিছু গল্পের সঙ্গে ‘বরফসাহেবের মেয়ে’--র কোনও পার্থক্যই নেই। তখন আমি এত বেশি ইনফ্লুয়েন্সড ছিলাম সুবোধদার লেখায়, যে নামটাম পালটে ও-গল্পটা যদি সুবোধ ঘোষের গল্প বলে কেউ চালিয়ে দিতে চায় – দিতে পারে। 

প্রণব: 
সত্যি বিমলদা, সুবোধ ঘোষের নামটাই আপনার প্রসঙ্গে বারবার যেন আসে, অনেকে বলেন ...। 

বিমল: 
অনেকে কেন, আমি নিজেই তো বলেছি। এর কারণ কী জানো, সুবোধদা প্রবাসী বাঙালি, ওঁর কৈশোর-যৌবনকাল অনেকটা বিহারেই কেটেছে, আর আমিও তো মোটামুটিভাবে বিহারে মানুষ, আমাদের পরিবেশটা একই রকমের ছিল। শুধু পরিবেশ নয়, বাঙলার বাইরে বাঙালিদের যে-ধরনের সামাজিক কাঠামো, আচার-আচরণ, বাঙালি-অবাঙালি সমাজের মিশ্র পরিবেশ ইত্যাদি থাকে, তারও একটা মিল আমাদের দুজনের লেখায়। আর তা ছাড়া, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ও পরবর্তীকালে যদি গল্পকার সুবোধ ঘোষের কথা ভাবা যায়, দেখবে, তিনি এমন একজন শক্তিমান ও প্রভাববিস্তারী লেখক যে, নতুন গল্পকারদের মধ্যে তাঁর প্রভাব কাটিয়ে ওঠা খুব মুশকিল ছিল। কাজেই, আমি মনে করি না, এই প্রভাবে আমার কোনও লজ্জা আছে। 

প্রণব: 
কিন্তু বিমলদা, শুধু সুবোধ ঘোষ তো নন, আপনি যখন গল্প লেখা শুরু করেছেন, তখন আপনার সামনে তো আরও অনেকে ছিলেন। মানে, গল্পকার হিসেবে। 

বিমল: 
গল্পকার হিসেবে তো অনেকেই ছিলেন। তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব বসু, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, প্রেমেন্দ্র মিত্র এঁরা সব আগেকার লেখক। কিন্তু সুবোধ ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, সন্তোষকুমার ঘোষ, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, নরেনদা (নরেন্দ্রনাথ মিত্র) -- এঁরা তো ঠিক আমাদের আগের জেনারেশন। 

প্রণব: 
এঁদের কারও গল্প পড়ে কি আপনার মনে হত যে এঁদের মতো একটা গল্প লিখলে ভালো। হয়? 

বিমল: 
না। এদের মধ্যে একমাত্র সুবোধ ঘোষ ছাড়া অন্য কারও গল্প পড়ে, আমি এঁদের মতো গল্প লিখব – একথা মোটেই কখনও ভাবিনি। আমাকে আরেকটা ব্যাপার খুব ইনফ্লুয়েন্স করেছিল, সেটা হল, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর লেখার ভাষা। আমি খুব মুগ্ধ ছিলাম। 

প্রণব: 
খুব কাব্যময় ভাষা। 

বিমল: 
হ্যাঁ খুব। বিশেষ করে জ্যোতিদা 'পূর্বাশা’ বা ‘চতুরঙ্গে’ যেসব গল্পটল্প লিখেছেন তার ভাষা, তার বর্ণনা, তার কারুকাজ অনেক আগে থেকেই আমাকে মুগ্ধ করেছিল। 

প্রণব: 
কিন্তু ভাষার কাজ তো আপনার লেখার মধ্যে প্রথম থেকে জড়িয়ে রয়েছে। 

বিমল: 
না, আমার ভাষার মধ্যে একটা মেলানো-মেশানো ব্যাপার আছে। কিছু সুবোধ ঘোষ,  কিছু জ্যোতিদা, আর ছিলেন বুদ্ধদেব বসু। আমি বুদ্ধদেববাবুর প্রচণ্ড ভক্ত ছিলাম, কৈশোরকাল থেকেই। বুদ্ধদেবাবুর লেখার ঢঙ, ভাষা, তাঁর মানসিকতার আধুনিক ধর আমার খুব পছন্দ ছিল। 

প্রণব: 
আচ্ছা বিমলদা, ‘বরফসাহেবের মেয়ে’-র পর আপনি কী লিখেছেন? ‘সুধাময়' পর্যন্ত? 

বিমল: 
অনেক লেখাই লিখেছি। তার মধ্যে পনেরো আনা লেখাই দেশ পত্রিকায় আর তার পাশাপাশি ‘আনন্দবাজার' পত্রিকায়। আনন্দবাজারে আমার লেখার উৎসাহদাতা ছিলেন মন্মথনাথ সান্যাল এবং নীরেনদা। গল্প লিখেছিলাম ‘পার্ক রোডের সেই বাড়ি’। গল্পটা পড়ে নীরেনদা খুব প্রশংসা করেছিলেন। বলেছিলেন, খুব সুন্দর লিখেছিস বিমল। 

প্রণব: 
আমার এখনও মনে আছে গল্পটা। দারুণ রোম্যান্টিক গল্প। 

বিমল: 
নীরেনদাই তাড়া দিয়ে লিখিয়েছিলেন গল্পটা। মনে আছে, একদিনে লিখে দিয়েছিলাম। আর কোনও গল্প আমি একদিনে লিখিনি কখনও। 

প্রণব: 
কেন? একদিনে কেন? 

বিমল: 
তা না হলে গল্পটা পুজোসংখ্যায় ছাপা হত না। খুব ছোট্ট গল্প। দেশ পত্রিকায় তিপ্পান্ন সালের মধ্যে আমার অনেকগুলো গল্প বেরিয়ে গেছে। 'মানবপুত্র’, ‘উদ্ভিদ’, কাঁচঘর’। 

প্রণব: 
এই গল্পগুলো নিয়েই তো আপনার প্রথম গল্পগ্রন্থ, 'বরফসাহেবের মেয়ে’? 

বিমল: 
হ্যাঁ। মানবপুত্র’ দেশ পত্রিকায় আমার দ্বিতীয় গল্প। সেই গল্পের সঙ্গে সুবোধ ঘোষের গল্পের আর কোনও মিল নেই।

প্রণব: 
তা নেই। কিন্তু বিমলদা, এই ‘মানবপুত্র থেকে শুরু করে এ-বছর পুজোর যে শেষ গল্প, ‘গল্পপত্র'-পত্রিকার ‘নিশীথসঙ্গী’, এর মধ্যে কোথায় একটা মিল রয়েছে। একটা খ্রিস্টিয় ধর্মবিশ্বাস ফিরে-ফিরে আসে আপনার লেখায়। এমনকী আপনার ‘খড়কুটো পড়েও অনেকে আপনাকে খ্রিস্টান ভাবে, এমনও শুনেছি। কেন বলুন তো? 

বিমল: 
তা যদি বলো, তা হলে তো 'বরফসাহেবের মেয়ে’-ও ধরতে হয়। মেয়েটা তো খ্রিস্টান ছিল। খ্রিস্টিয় ধর্মের আমি কিছু জানি না। তবে ওর মধ্যে সরল কিছু মানবিক গুণের কথা বারবার বলা হয়েছে। আমার ভালো লাগে সেগুলো। 

প্রণব: 
আপনার ‘সুধাময়' বেরিয়েছিল দেশ পত্রিকাতে, ১৯৫৭ সালে। 'মানবপুত্র’ ১৯৫৩-তে। এই পাঁচ বছরে আপনি একটু একটু করে নিজের জায়গাটা করে নিচ্ছিলেন বাংলা গল্পে। 

বিমল: 
তা জানিনা। তবে আমার লেখা পালটে যাচ্ছিল। যেমন ধরো, ‘উদ্ভিদ’ গল্পটা, কি ‘মানবপুত্র’-এর কথাই ধরো, এগুলো থেকে বোঝা যায়, আমি একটা কিছু চেষ্টা করছিলাম। 

প্রণব:
আর সেই বোমাটা করে ফাটল বিমলদা? মানে, আপনার সেই ‘আত্মজা’ গল্পটি দেশ পত্রিকায় কবে বেরুল? 

বিমল:
 বোমা! বেশ বলেছ। ওটা ... 

প্রণব: 
খারাপভাবে নেবেন না কথাটা। আসলে আমি যা বলতে চাই, ওই গল্পটা পড়ে পাঠক হিসেবে আমরা চমকে গিয়েছিলাম একেবারে। ফ্রয়েডিয় মনস্তত্বের উপর ভিত্তি করে বাবা ও মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে একটা গল্প লিখেছিলেন আপনি। সেটা নিয়ে খুব হইচই হয়েছিল। একদিকে প্রশংসার বান, অন্যদিকে নিন্দেমন্দের ঝড়। সেটা আপনি আরও ভালো বলবেন। বলুন না বিমলদা। 

বিমল: 
হ্যাঁ। ‘আত্মজা' আমি লিখেছিলাম ১৯৫৪ সালে; এবং গল্পটা ছাপা হয় মার্চ মাসে। আমার এইজন্য মনে আছে যে, ‘আত্মজা’ যখন দেশ পত্রিকায় বেরুল, তখনই আমি দেশ পত্রিকায় সবে ঢুকেছি। সাগরদারা আমাকে ডেকে চাকরি দিয়েছিলেন। 

প্রণব: 
তার মানে ব্যক্তিজীবনে আপনি একটা জায়গা পেলেন আর সাহিত্যজীবনেও তার সদ্ব্যবহার করলেন। 

বিমল: 
হ্যাঁ। যা করলাম সে আর কী বলব। গল্প তো বেরুল, কিন্তু বোধহয় দুদিনও চাকরি করিনি, চারদিকে লোকে গালমন্দ শুরু করল। যাচ্ছেতাই, এসব কী, অশ্লীল ইত্যাদি চিৎকারচ্যাঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। তার উপর, শনিবারের চিঠি। তুমি তো জানোই, একটা কিছু পেলে ওরা আর ছাড়ত না। 

প্রণব: 
কিন্তু এখন আমাদের মনে হয়, লেখকের মধ্যে কোনও পােটেনশিয়ালিটির পরিচয় না পেলে শনিবারের চিঠি তার বিরুদ্ধে কলম ধরত না। মানে, আপনার বিরুদ্ধে কিছু লেখা মানে আপনার শক্তিমত্তাকেই পরোক্ষে স্বীকৃতি দেওয়া। 

বিমল:
সেটা বলতে পারব না। তবে ওঁরা অনেক কিছু লিখেছিলেন। 'আত্মজা’ থেকে নানারকম ‘কোট’ করে করে। তার মধ্যে একটা কথা মনে আছে, ওঁরা লিখেছিলেন, ‘নির্মল করো বিমল করে, মলিন মর্ম মুছায়ে’। অর্থাৎ আমার মর্ম নাকি এতই মলিন ছিল যে সজনীবাবুরা ভেবেছিলেন, যে এই ছোকরার তো হয়েই গেল, এর মর্মের মালিন্য মোছানো দরকার। 

প্রণব: 
বিমলদা এখন তো এ গল্পের কথা অনেকেই জানেন না। আপনি যদি একটু বলেন, এর সাইকোলজিক্যাল পয়েন্টটা কী ছিল? 

বিমল: 
আপাতভাবে গল্পটা মনে হয়, ফ্রয়েডিয়ান সাইকোলজি নিয়ে লেখা, কিন্তু এর মধ্যে একটা রিজেকশন ছিল। এখানে যে-ভাবনা তা তো সত্যি নয়, জোর করে চাপিয়ে দেওয়া। বাবা তার মেয়েটিকে দারুণ ভালোবাসত, তার স্ত্রী ছিল অসুস্থ। বাচ্চা মেয়েটাকে সে সমস্ত জীবন দিয়ে ভালোবেসেছিল। মেয়েটাও ছিল খুব লিভিং মেয়ে। এ-জিনিসটাকে অন্য লোক এসে একটা খোঁচা দিয়ে গেল। এই খোঁচাটাই আস্তে আস্তে বাড়তে লাগল। কিন্তু বাবা তখন ভাবছে, কই আমি তো এরকম কিছু ভাবিনি, কোনওদিনও ভাবিনি, মেয়ে তো আমার। তো এই-যে রিজেকশন, কমপ্লেক্সের রিজেকশনটা তো আমাদের করা উচিত। যদি আমরা ধরেই নিই যে এটা ছাড়া হয় না, সমাজে সভ্যতায় তো সে-জিনিস চলে না। এই যে দ্বন্দ, এর ফলেই মানুষটার মনে ঢুকে গেল অকারণ পাপবোধ। এই গিল্ট কমপ্লেক্স থেকে লোকটি শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হল। 

প্রণব: 
কিন্তু সত্যিই কি কোনও মালিন্য ছিল ‘আত্মজা’র মধ্যে? 

বিমল: 
আমি তো মনে করি, ছিল না। না হলে আমি গল্পটা লিখব কেন? 

প্রণব: 
কিন্তু আপনি যে পরিণতি দেখিয়েছিলেন তাতে তো আর কমপ্লেক্স তত্ত্বটি সমর্থন পায় না। 

বিমল: 
তা তো পায়ই না। তবে এ কথাও বলব, অনেক পাঠকের আবার এ-গল্প ভালোও লেগেছিল। এমনকী অনেক মহিলার, বয়স্কা মহিলার। যেমন গৌরের মারও, এ-গল্পটি ভালো লেগেছিল। তাঁরা কোনও অশ্লীলতা খুঁজে পাননি। 

প্রণব: 
কিন্তু দেশ পত্রিকার, মানে সাগরদার তখন কী অবস্থা? তিনি কীভাবে নিয়েছিলেন ব্যাপারটা? 

বিমল: 
সাগরদার অবস্থা খুব কাহিল হয়েছিল। এই লেখাটা নিয়ে তখন চারপাশে যেমন নিন্দা হচ্ছিল, প্রশংসাও হচ্ছিল। কিন্তু প্রশংসা তো বেশি ছড়ায় না, নিন্দাটাই বেশি ছড়ায়। যখন মানুষ ‘লাউড’ হয়, তখন অনেক লোকে শুনতে পায়। সুরেশবাবু তখন রয়েছেন, অশোকবাবুও তখন আমাদের পুরনো অফিসে আসা-যাওয়া করেন, বোধহয় ওঁদের কানেও কেউ লাগিয়েছিল। বিশেষ করে শনিবারের চিঠি-র এই ব্যাপারটা। তখন কানাইদা, কানাইলাল সরকার, একদিন দেখি ঘরে ঢুকে সাগরদাকে বলছেন, ‘এই তুমি এসব কী ছেপেছ, জানো এ নিয়ে কী হচ্ছে-টচ্ছে'। সাগরদাও খুব চটে গিয়ে বলছেন, ‘বেশ করেছি ছেপেছি। আমার ভালো লেগেছে আমি ছেপেছি।’ কানাইদা কিন্তু আমার বিরুদ্ধে কোনও বিদ্বেষ বোধ করেননি। কানাইদার হত কী, একটু কিছু কেউ বললেই চট করে চটে যেতেন। উনি হয়তো চারদিকে শুনতে-শুনতে উত্তেজিত হয়ে গেছিলেন। আর সাগরদা তো খুব রিস্ক নিয়ে লেখাটা ছেপেছিলেন। 

প্রণব: 
কিন্তু, বিমলদা, এর পর থেকে আপনি নিশ্চিত অনেক পাঠকও পেয়ে গেলেন আপনার

লেখার? বিমল; তা কী করে বলব!

প্রণব: 
একটা আলোড়ন হলে কী হয়? নজর তো পড়ে সকলের। 

বিমল: 
দ্যাখো, তখনকার পাঠক আর এখনকার পাঠকের মধ্যে অনেক তফাত। আমি যখন দেশ পত্রিকার চাকরিতে ঢুকেছি, কী আর এমন বিরাট বিক্রি ছিল! তবু দেশ পত্রিকার একদল আলাদা রকমের পাঠক ছিলেন, তাঁরা খুব ভালো পাঠক। সব রকমের লেখারই ভালো পাঠক। গল্পেরও। ধরো, ‘আত্মজা’ কেন, এর আগেও আমি দেশ পত্রিকায় যেসব গল্প লিখেছি, তাঁরা সেসব গল্প মন দিয়ে পড়েছেন, ভালোলাগার কথা জানিয়েছেন। এই ধরনের পাঠক, যাঁদের সূক্ষ্ম রুচি আছে, অনুভূতি আছে, এখন তাঁদের সংখ্যা যেন কমে গেছে। তখন হত কী, কোনও লেখক একটু ভালো লিখলেই রসিক পাঠকের স্বীকৃতি পেতেন। 

প্রণব: 
বিমলদা, দেশ পত্রিকাতেই এর পর আপনার দুটো গল্প খুব প্রশংসা পেয়েছিল, ‘পিঙ্গলার প্রেম’ আর ‘আঙুরলতা’। ‘পিঙ্গলার প্রেম দেশ পত্রিকার পুজোসংখ্যায় আপনার দ্বিতীয় গল্প। মনে আছে আপনার? 

বিমল: 
আমি যদি এখন বলি ভালো লিখেছিলাম, তা তো আর হয় না। তবে লোকের বোধহয় ভালো লেগেছিল। অনেকে বলেছিল। পরে বিমলাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ‘পিঙ্গলার প্রেম গল্পগ্রন্থের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন যে, গল্পটার মধ্যে গ্রিক ট্রাজেডির একটা ব্যাপার আছে। আমাকেও বলেছিলেন কথাটা। আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ, তা তো আছেই। নইলে গল্পটা লিখব কেন? 

প্রণব: 
আর ‘আঙুরলতা’? ওটাও তো দেশ পত্রিকার পুজোসংখ্যার গল্প। পিঙ্গলার প্রেমের পরের বছরের। 

বিমল: 
‘আঙুরলতা’-ও হইচই ফেলেছিল। তারাশঙ্করবাবু, আমার মনে আছে, সেবার পুজোর পর গৌরীদার বাড়ি এসেছিলেন। আমিও তখন পাকপাড়াতে থাকতাম। 

প্রণব: 
গৌরীদা মানে, গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য? 

বিমল: 
হ্যাঁ, গৌরীদার বাড়িতে তখন আমরা আডডা মারতাম। তো সেদিন তারাশঙ্করবাবু এসেছিলেন। উনি আবার সেদিন রাগ করে চলে এসেছিলেন বাড়ি থেকে। ফেরবার পথে আমাকে বললেন, ‘চল, তুই আমায় এগিয়ে দে।’ এর আগে ওর গাড়ি এসেছিল ওঁকে নিতে, উনি সেটাকে তাড়িয়ে দিয়েছেন। আমি তখন হাঁটতে শুরু করলাম ওঁর সঙ্গে, টালা পার্কের দিকে। তারাশঙ্করবাবু তখন দেশ পত্রিকার পুজোসংখ্যার একাধিক গল্প পড়ে ফেলেছেন। জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর গল্প, আমার গল্প, নরেনদার গল্প। তুমি ভেবে দ্যাখো, তারাশঙ্করবাবু তখন খুব প্রবীণ লেখক। উনি কিন্তু দেশ পত্রিকার বেশ কিছু গল্প বেশ মন দিয়ে পড়েছেন এবং কোন কোন গল্প ভালো লেগেছে, এ-কথাও আমাকে বলেছিলেন। উনি আমাকে বললেন, ‘দ্যাখ, আঙুরলতা গল্পটা তুই ভালোই লিখেছিস। কিন্তু অনেকটা ছড়িয়ে তুই সোজাসুজি গল্পে চলে আসতে পারতিস।’ আমি বললাম, ‘দেখুন, আমার তো মনে হয়, ওইভাবে গল্পে আসাটা উচিত নয়। কারণ আমি যদি পরিবেশটা সৃষ্টি করতে না পারি, গল্পের একটা লজিক আছে তো, সেটা ভিতরে কাজ করে যায়। উনি তখন বললেন, ‘এ যেন বাঙলাদেশ দেখাতে গিয়ে প্রথমে ভারতবর্ষের ম্যাপ দেখিয়ে তুই বাঙলাদেশ দেখাচ্ছিস। তা না করে শুধু বাংলাদেশে চলে এলে ক্ষতি কী ছিল?’ তখন আমি বললাম, এটা আপনি বলছেন বটে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছে যে আমি যদি পরিবেশ ও পটভূমিটা না দেখাই তাহলে বোধহয় ওই জায়গাটায় আসা যায়না। তা ইট ডিফারস, আর কী! 

প্রণব: 
কিন্তু ওঁর ভালো লেগেছিল আঙুরলতা! 

বিমল: 
হ্যাঁ। ভালো লেগেছিল। উনি জ্যোতিরিন্দ্র নন্দীর ‘গিরগিটি’ গল্পটারও খুব প্রশংসা করলেন। 
প্রণব: 
‘গিরগিটি’ আর ‘আঙুরলতা’ কী একই সংখ্যায় ছিল? 

বিমল: 
মনে পড়ছে না, তবে তারাশঙ্করবাবু একবার ‘গিরগিটি’ গল্পের কথা বলেছিলেন আমাকে। 

প্রণব: 
বিমলদা, আপনি তো সারাজীবনে অজস্র ভালো গল্প লিখেছেন। আমার নিজেরই মনে আছে, সত্তরের গোড়ায় আপনার একটা নির্বাচিত কি শ্রেষ্ঠ-গল্প-সংগ্রহের জন্য আমি একটা কাগজে আমার ভালো লাগা গল্পের একটা তালিকা তৈরি করেছিলাম। হাতের সামনে বইপত্র ছিল না। শুধু স্মৃতি থেকে নামগুলো উদ্ধার। তো, সেখানেই অন্তত তেত্রিশটা গল্পের তালিকা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এরপরও তো আপনি কত গল্প লিখেছেন। তাই, আজ যদি আপনাকে প্রশ্ন করি, আপনি নিজে আপনার সাহিত্যজীবনকে মানে গল্পকার-জীবনকে বিশ্লেষণ করে দেখালে, কোথায় কোথায় বাঁক দেখতে পান, কী বলবেন? 

বিমল: 
ধরো, সেভাবে বলতে গেলে, সব জিনিসেরই তো একটা প্রস্তাবনা পর্ব থাকে। সেটা তুমি ধরতে পারো ‘মানবপুত্র’ পর্যন্ত। একটু সাইকোলজিক্যাল অন্যরকম লেখা। সেগুলোর হয়ত স্ট্রাকচার ভালো, পড়তে ভালো লেগেছে, উতরে গেছে। এইমাত্র। কিন্তু আমার মনোমতো করে লেখা, অর্থাৎ যে-লেখা আমার মন থেকে উঠে আসছে, বা যে লেখা লিখে আমার মনে হয়েছে, এরকম লেখা আমি লিখতে চাই, সে-রকম গল্প আমার প্রথম ‘সুধাময়’। ১৯৫৭ সালে পুজোসংখ্যা দেশ-এ বেরিয়েছিল গল্পটা। 

প্রণব: 
বিমলদা, আপনি যখন সদ্য-যুবা, অর্থাৎ বাইশ-তেইশ বছর বয়স আপনার, তখন লিখেছিলেন ‘অম্বিকানাথের মুক্তি’ গল্পটা। মৃত্যু আর জাগতিক মায়ার দ্বন্দ্ব ছিল সেগল্পের বিষয়। আবার ‘সুধাময়’ গল্পেও যেন এই বিষয়টাই আরও অন্যভাবে, আরও প্রবলভাবে ফিরে এল। মৃত্যু, জীবজগতের যা অবধারিত সত্য, তা হয়ে উঠল এক উদ্যত প্রশ্ন। 

বিমল: 
হ্যাঁ, কিন্তু তার পরেও তো আমি অনেক গল্প লিখেছি যেখানে মৃত্যুই আমার একমাত্র বিষয়। যেমন, ‘অপেক্ষা’। বহুবছর পরে লেখা। 

প্রণব: 
কিন্তু ‘সুধাময়’-এ যেমন তত্ত্ব থাকলেও তা বহুলাংশে বাস্তব, 'অপেক্ষা’তে বোধহয় তা নয়। বাস্তব ও তত্বের একটা মিশেল .. তত্ত্ব ও বাস্তবের মাঝখান দিয়ে আপনি হাঁটছেন। 

বিমল: 
‘সুধাময়' তো একরকমের তত্ত্বই। কিন্তু শুধু শুধু তত্ত্ব নিয়ে তো গল্প হয় না। তা হলে প্রবন্ধ লিখতে হয়। 

প্রণব: 
না বিমলদা, আমি বলতে চাইছি ‘অপেক্ষা' আরও অন্যরকম গল্প। আরও পরিণত। এ-গল্পের মূল চরিত্র শিবতোষ, এক সহকর্মীর হঠাৎ মৃত্যুর পর যার মনে হতে থাকে, কে যেন আসবে বলে গেছে। একটা চিঠি দিয়ে গেছে। চিঠিটা সে খুঁজে পাচ্ছেনা। ভাবছে, কে আসবে। তারপর একদিন রাত্রে স্ত্রীর পাশে শুয়ে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মাথার উপরে পুরনো পাখাটা তাকে মনে করিয়ে দিল মায়ের মৃত্যু, বাবার প্রয়াণ। তারপর এই অনুষঙ্গ থেকে আস্তে-আস্তে সে অনুভব করতে পারে, মানুষের, এই জগতের নশ্বরতার কথা। তারপর হঠাৎই তার মনে পড়ে যায়, চিঠির শেষ ছত্র দুটি: ‘আমি আসব, আমার অপেক্ষা কোরো।’ আসলে যে আসবে সেই অবধারিত হল, নিয়তি বা মৃত্যু। এতটা স্থলভাবে আপনি লেখেননি। কিন্তু ব্যাপারটা বোধহয় তাই। 

বিমল: 
আসলে মৃত্যুচিন্তা আমায় দীর্ঘকাল অধিকার করেছিল। আমি নিজে খুব ‘সিক’ ছিলাম। এবং এই চিন্তাটা আমায় খুব ভুগিয়েছে। এ-নিয়ে আমি অনেক গল্প লিখি। 

প্রণব: 
তা ছাড়া খুব ছেলেবেলায় বোধহয় আপনার এক বোনের আকস্মিক মৃত্যু আপনাকে খুব হন্ট করত। 

বিমল: 
সে তো অনেক ছোটবেলায়। খুব সাডেন ডেথ। সেটা আমি অনেক পরে উপলব্ধি করেছি। আমি যখন ভাবতাম কেন আমি এত ভয় পাই? তখনই আমার কথাটা মনে হয়েছিল। 

প্রণব: 
কিন্তু এই চিন্তা থেকেই কি ‘সুধাময়'? 

বিমল: 
না। সুধাময় তো একটা সংশয়ের ব্যাপার। প্রশ্নের ব্যাপার। জীবনের অস্তিত্ব, স্নেহ, প্রীতি, প্রেম, সৌন্দর্য, দেহ ইত্যাদি নিয়ে সংশয়। 'সুধাময়’-এর পর থেকেই আমি অনেককাল ধরে লিখেছি মানুষের দ্বিধা, সংশয়, ভয়, উদ্বেগ এবং অসহায়তার কথা। তার গ্লানি এবং পাপের কথা। 

প্রণব: 
কিন্তু বিমলদা, মৃত্যু আপনার আরও অনেক গল্পে ফিরে-ফিরে এসেছে। ‘অপেক্ষা’র কথা যেমন বললাম, তেমনি আপনার আরেকটি বিখ্যাত গল্প ‘জননী’। মৃত্যু অবশ্য সেখানে স্টার্টিং পয়েন্ট। মৃত্যু নিয়ে নয়, মৃত্যুকে ঘিরে গল্প গড়ে উঠেছে। 

বিমল: 
হ্যাঁ, মৃত্যু সেখানে অন্যরকম ভাবে এসেছে। আসলে কি হয় জানো, মৃত্যু নিয়ে, শুধু মৃত্যু কেন, যে কোনও বিষয় যখন তোমাকে হন্ট করে তখন সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে একসময় তুমি সেটাকে পেরিয়ে যেতে চাও যাকে আমরা উত্তরণ বলি। আমিও একসময় মৃত্যুকে পেরোবার চেষ্টা করতে লাগলাম। 

প্রণব: 
তো সেটাই কি আপনি পেলেন, ‘জননী’ গল্পে? 

বিমল: 
বছর কয়েক ধরে নিজের সঙ্গে নিজের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব ছিল, তার একটা সান্ত্বনা আমি পেয়েছিলাম 'পূর্ণ অপূর্ণ’ উপন্যাসটি লেখার পর। 

প্রণব: 
বিমলদা, ‘জননী’ তো খুব সম্প্রতি দেশ শারদীয়-গল্প-সংকলনে ছাপা হয়েছে। তো এই গল্পটিকে ধরে নিতে পারি দেশ পুজো সংখ্যায় ছাপা হওয়া আপনার সব কটি গল্পের মধ্যে সেরা গল্প। এ-গল্পটি আপনি কীভাবে লিখলেন? 

বিমল: 
সেরা-ফেরা জানি না। যার যেমন মনে হয়। তবে ‘জননী’ গল্পটা লেখার পেছনে একটা ব্যাপার আছে। তখন আমি দেশ পত্রিকায় চাকরি করি। মাঝে মাঝে এটা-ওটা বইপত্র এনে ঘাটতাম। একদিন ভেরিয়ার এইন – ওই যিনি আদিবাসীদের নিয়ে কাজকর্ম করেছেন – তাঁর একটা বইয়ের পাতা ওলটাতে-ওলটাতে দেখছিলাম, আদিবাসীদের মধ্যে কতরকমের রীতিনীতি, আচার-আচরণ ইত্যাদি রয়েছে। নানা রকমের বিশ্বাস, সংস্কার। তারপর ছবি-টবি আঁকা। এই দেখতে-দেখতে আবার হঠাৎ মনে পড়ল, ছেলেবেলায় আমি যখন বরাকরে থাকতাম, তখন বরাকর নদীর ধারে, দূরে গ্রামে যেসব সাঁওতাল পল্লী-টল্লী ছিল, সেখানে দেওয়ালের গায়ে নানা রকম ছবি-টবি আঁকা দেখতাম। সে ধরো, একটা হনুমানের ছবি, একটা ফুল এঁকে রেখেছে ইত্যাদি। তো, ওই যে ছবিটা, ওটা সদ্যমৃতা একটা বাচ্চার ছবি। মৃত্যুর পর ঘোড়ার পিঠে চড়ে বাচ্চাটা চলেছে যেন অনন্তের কোথাও। হয়তো স্বর্গে। তার এক হাতে লাঠি। মৃত্যুর পর এতটা রাস্তা সে কী করে যাবে সে-কথা ভেবে তাকে চিড়ে আর গুড় দেওয়া হয়েছে পুটুলি বেঁধে আর ঘটতে জল, তেষ্টা মেটানোর জন্য। কি অসামান্য ইমাজিনেশন। ওই ছবিটা আমার মাথায় থাকল। তারপরে ... আই মেড ইট। গল্পটাকে আমি তৈরি করলাম। 

প্রণব: 
কিন্তু আপনার গল্পে তো ছিল যে, মায়ের মৃত্যুর পর ভাইবোনেরা সবাই মিলে ... 

বিমল: 
হ্যাঁ, ওই মেজোছেলে বলল যে, আমি এরকম একটি ছবি দেখেছিলাম, মানুষের মৃত্যুর পর তার যে অন্তর্যাত্রা, তার জন্য সবাই তাকে পাথেয় দিয়ে দেয়। তাইতে সবাই তখন ভাবতে লাগল যে, আমরা ছেলেমেয়ে হিসেবে মাকে কি দিতে পারি। ওদের মা সারাজীবন অত্যন্ত ব্যক্তিত্বপরায়ণ ছিলেন। মার কাছে ওরা সবাই খুব সাবমিট করে থাকত। কিন্তু মার কিছু ডিফেক্ট ছিল। তখন ওরা ভাবছে যে মার যে ডিফেক্টগুলো ছিল, সেগুলো যদি না থাকত, অর্থাৎ আমরা যদি মায়ের জীবনের সেই অপূর্ণতাগুলো শুধরে দিতে পারতাম পূর্ণতা হিসেবে তাহলে আমাদের মা একেবারে পরিপূর্ণ হয়ে উঠতেন। তাই ওরা বলছে, মা যদি এইটে পেতেন, মা যদি ওইটে পেতেন। 

প্রণব: 
অর্থাৎ ছেলেমেয়েরা সেগুলোই মাকে পাথেয় হিসেবে দিতে চাইছে? 

বিমল: 
হ্যাঁ। ধরো আমাদের যে এই বিশ্বসংসার বা পৃথিবী, এই যে জগতটা চলেছে বা সমাজ, আমরা তো অনেক সময় ভাবি যে সমাজে এই সব জিনিস যদি না থাকত, তাহলে কত ভালো হত। এই ডিফেক্টগুলো আমরা বুঝতে পারি। কিন্তু আমরা ক’জন আর ব্যক্তিগতভাবে কিছু দিতে পারি, চেষ্টা করি এইসব অপূর্ণতা দূর করার। যদি দিতে চাই – তবে? তবে কি দেব; সেদিক থেকে জননী এখানে ঠিক ... কি বলব, অন্য একটা সিম্বলিক অর্থ এখানে ‘জননী’র। 

প্রণব: 
‘জননী’তেও, বিমল দা, একটা তত্ত্ব মিশে আছে। আবার গল্প হিসেবেও দারুণ সার্থক। 

বিমল: 
‘সুধাময়' থেকে আমার অধিকাংশ গল্পই তাই। আইডিয়া প্রধান। তত্ত্বগত ব্যাপার ভিতরে একটা রয়ে গেছে। সেটাকে আমি গল্পতে আনবার চেষ্টা করি। 

প্রণব: 
আপনি কি কোনদিনই গল্পের প্লট ভাবেন না? থিমটাই ভাবেন? 

বিমল: 
একেবারে প্রথম দিকে, ধরো, ‘মানবপুত্র’ কি বরফসাহেবের মেয়ে’-টেয়ে লিখেছি। তখন আমি মোটামুটিভাবে একটা গল্পের স্ট্রাকচার ভেবে নিতাম। কিন্তু ‘সুধাময়’-টয় থেকে আর এ নিয়ে ভাবিনি। 

প্রণব: 
তখন কি আপনার মাথার মধ্যে একটা আইডিয়া হঠাৎ ঝলসে উঠত? 

বিমল: 
হ্যাঁ, তখন এমন একটা ব্যাপার হত। ধরো, সৌন্দর্য জিনিসটা কি, ভালোবাসা জিনিসটা কি, হঠাৎ-হঠাৎ এমন একটা প্রশ্ন মনে হত। তখন এটা একটা পয়েন্ট হত। আমি তখন সেই পয়েন্টটা ডিসেকশন করলাম। এটাকে কীভাবে আনা যায়। তারপর গল্পটা লিখলাম। এতে অনেক সময় খুব গোলমাল হয়ে যায়। তত্ত্বকে গল্প করতে গেলে অনেক সময় গল্প হয় না, তত্ত্বও হয় না। কিন্তু যদি ঠিকমতো দুটো মিশে যায়, আমার গল্প বলে বলছি না, তখন শুধু ভালোই হয় না, তার মধ্যে একটা পয়েন্ট থেকে যায়। যা খুব হিউম্যান পয়েন্ট যা তোমার ভালো লাগবে। এমনি গল্পে, অর্থাৎ যা শুধুই গল্প, তার যে লিমিটেশন থাকে, সেটাকে ছাড়িয়ে এসব গল্প তখন একটা বড় জায়গায় চলে যায়। একটা সত্যের মধ্যে চলে যায়। অনুভূতির মধ্যে চলে যায়। 

প্রণব: 
সেটা 'জননী’র মধ্যে আপনি দারুণভাবে পেরেছেন। অর্থাৎ তত্ত্ব ও গল্পকে পুরোপুরি মেশাতে। আবার ‘জননী’র মধ্যে যেমন ছিল যা নেই তার বিশ্লেষণ করছে ছেলেমেয়েরা, তেমনি ‘জননী’র আরেক প্রান্তে বোধহয় 'ভুবনেশ্বরী’। সেখানে যা নেই তাকে আরোপ করা হচ্ছে। মানুষকে ঘিরে কিংবদন্তি তৈরি করা হচ্ছে। ভুবনেশ্বরী’ও আপনার দারুণ লেখা। ওটা একটা গল্পই, মানে বড় গল্প। 

বিমল: 
হ্যাঁ, নভেলেট বলতে পারো। 

প্রণব: 
‘ভুবনেশ্বরী’র এই চিন্তাটাই কি আবার একটু অন্যভাবে ‘সংশয়’ গল্পে এসেছে? সেই যে যেখানে অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধটি সংবর্ধনা সভায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন, সহকর্মীদের ডেকে বলেন, আজ যে-মানুষটি সম্পর্কে আপনারা ভালো ভালো কথা বললেন, উপহারটুপহার দিলেন সে মানুষটি আর আমি এক নই। আপনারা একটা সুধাকান্ত চ্যাটার্জি তৈরি করে নিয়েছেন। 
বিমল:
কিন্তু ‘সংশয়’ গল্প তো অনেক বেশি রিয়েল। ওর মধ্যে সেই গভীরতা তো নেই, যেটা ‘জননী’ বা ‘ভুবনেশ্বরী’তে আছে। 

প্রণব: 
অবশ্য ‘সংশয়’ তো দাঁড়িয়েছে অন্য জায়গায় গিয়ে। সেখানে সুধাকান্ত তাঁর স্ত্রীকে প্রশ্ন করছেন, যাবার বেলায় তুমি আমায় কি দেবে, আমি যদি আগে যাই – 

বিমল: 
হ্যাঁ, আর সকলে তো ওকে বলতে হয় তাই বলে গেল। যার চোদ্দ আনাই মিথ্যে। কিন্তু স্ত্রীর কাছে তো সে সবচেয়ে বেশি উন্মুক্ত। এখন স্ত্রী যদি অন্যদের মতো মিথ্যে বলে বলে স্তোক দেন, তাহলে তো সাংঘাতিক হবে। তাই না? জীবনে এগুলো ভীষণ দুঃখের ব্যাপার। 

প্রণব: 
তো, বিমলদা, এই যে আপনার ‘সংশয়’ বা ‘সুখ’ গল্প, এগুলো তো আপনি জীবনের অনেকগুলো পর্ব পেরিয়ে লিখেছেন। 
বিমল: 
‘সুখ' থেকে আমার গল্পের আলাদা একটা পর্ব শুরু হয়ে গেছে। লেখা অন্যরকম হয়ে গেছে। 

প্রণব: 
তা হলে আরেকবার সাম-আপ করা যাক। 'সুধাময়’ থেকে ‘সুখ’-এর আগে পর্যন্ত কি আপনার একটা পর্ব। যাকে বলা যায় প্রশ্ন বা অন্বেষণ থেকে উত্তরণের পর্ব। এর মধ্যে তো আপনি অনেক রকম গল্প লিখেছেন, ‘সোপান' আছে - 

বিমল: 
‘সোপান’-টোপান কিন্তু অনেকটা ওই ‘সুধাময়’ ফেজের গল্প। 

প্রণব: 
কিন্তু সোপান’-ও আপনার খুব সার্থক গল্প। আমার তো খুবই প্রিয় গল্প। মানুষের উচ্চাশা বা পরিপূর্ণতার দিকে যে যাওয়া তারই প্রতীক বোধহয় ‘সোপান।

বিমল: 
হ্যাঁ, পারছে না মানুষ, পৌঁছতে পারছে না। একজন কিছুদূর গিয়ে থেমে যাচ্ছে, আরেকজন আরো একটু দূরে গিয়ে থেমে যাচ্ছে। একজন শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করছে ওঠবার, কিন্তু সেও কি পারছে? 

প্রণব: 
এর মধ্যেও তো খুব প্রচ্ছন্ন ভাবে একটা তত্ত্ব মিশে আছে। 

বিমল: 
তা তো আছেই। বলতে পারো, 'সুধাময়’-এর পর থেকে আমার সব গল্পই তাই। গল্পের মধ্যে একটা বক্তব্যকে রাখা। 

প্রণব: 
‘নিষাদ’, ‘উদ্বেগ’ – এসব গল্পেও কি তাই? বিমল: ‘নিষাদ’ তো নিশ্চয়। মানুষ যদি একবার কোনও হিংসাকে আশ্রয় করে, সামান্য ছোট হিংসা, আস্তে আস্তে সে ক্রমশ বড় হিংসার দিকে চলে যায়। 

প্রণব: 
‘উদ্বেগ’? বিমল: ‘উদ্বেগ’-ও তো ঠিক তাই। আমাদের যখন কোনও সামাজিক ক্রাইসিস হয়, তখন আমাদের মধ্যে যিনি খুব সেনসিটিভ তিনি তো উদ্বিগ্ন বোধ করবেনই। তিনি চান একটা কিছু করি। আমি অংশ নিই। এই নিয়েই গল্পটা। 

প্রণব: 
বিমলদা, ‘কাঁটালতা’ কি আপনার এই সময়ের গল্প? সত্তর সালের মধ্যে? 

বিমল: 
‘কাটালতা’ কি খুব ভালো গল্প? 

প্রণব: 
কিন্তু শুনেছি, আবু সয়ীদ আইয়ুব সাহেবের খুব ভালো লেগেছিল গল্পটা। 

বিমল: 
হ্যাঁ, আইয়ুবের ভালো লেগেছিল শুনেছি। 

প্রণব: 
আইয়ুব সাহেব তো আপনাকে একটা চিঠিও লিখেছিলেন এ-গল্প পড়ে। এর আগেও আরও কয়েকটা গল্পের জন্য আপনি আইয়ুবের চিঠি পেয়েছেন। কোন কোন গল্প, মনে। আছে আপনার? 

বিমল: 
হ্যাঁ, ওই ‘জননী’-টননী পড়ে। 

প্রণব: 
আছে চিঠিগুলো? 

বিমল: 
চিঠিগুলো আছে দু-একটা। কিন্তু কে এখন খুঁজে বেড়াবে। এগুলো রেখে দিয়েছি, মরে যাওয়ার পর ছাপা হয় যদি। 

প্রণব: 
মনে আছে কিছু? 
বিমল: 
হ্যাঁ, ওই ‘জননী’ গল্পটা গৌরী আইয়ুব ওকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। উনি খুব চমৎকার একটা চিঠি পাঠিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, ‘এ-গল্পটা এমনি লেখা যায় না, আপনি ‘পজেশড়’ হয়ে লিখেছেন। তা আমার মনে হয় যে-কোনও লেখনই বোধহয় ‘পজেশড’ হয়ে লিখতে হয়। তৈরি করে লেখা যায় না। প্রণব: এটা আপনি জানিয়েছেন আইয়ুব সাহেবকে? বিমল: না। আইয়ুব সাহেবের সঙ্গে আমার দেখা-টেখা হত খুবই কম। আসলে উনি আমায় স্নেহ করতেন। তো, এটা শুধু আইয়ুব সাহেব কেন, সাগরদাও তো আমার অনেক গল্প পড়ে আমাকে বলেছেন, বিমলবাবু এ-গল্পটা আপনার খুব ভালো হয়েছে। 

প্রণব: 
সাগরদা তো আপনার শুধুই পাঠক নন, সাগরদাকে দিয়ে তো আপনি আপনার শ্রেষ্ঠ গল্পের ভূমিকাও লিখিয়েছেন। এ থেকে বোঝাই যায়, সাগরদার সঙ্গে আপনার কি সম্পর্ক, আপনি কি চোখে দেখেন সাগরদাকে ... সুখ’ থেকে তো আপনার লেখার আরেকটা পর্ব। বিমলদা, সুখ আপনি কীভাবে লিখেছিলেন? 

বিমল: 
ও, সে এক অদ্ভুত ব্যাপার। আমি যাব বেড়াতে। পাঁচ-ছ-দিন মাত্র পুজোর ছুটি। সাগরদা হঠাৎ বললেন, নতুন বছরের দেশের জন্য একটা গল্প লিখে দিয়ে যান। 

প্রণব: 
নতুন বছর, মানে নভেম্বর মাসের? 

বিমল: 
হ্যাঁ। তা, আমি যত বলি সাগরদা, আমি তো একটু বাইরে যাব, তো, উনি শুনে বললেন, ওসব চলবে না। আপনি গল্পটা লিখে দিয়ে তারপর যান। তখন আমি বাঙ্গরে। থাকি, বুঝলে? তো, কি করব, পঞ্চমী, ষষ্ঠী, সপ্তমী লোকে পুজোর আনন্দ করছে আর আমি বসে বসে লিখে যাচ্ছি। আমি অবশ্য কোথাও বেরোই না পুজোটুজো দেখতে। কিন্তু ওই যে বসে বসে লেখা, সে এক ভীষণ স্ট্রেইন। তো, লিখলাম একটা গল্প, লিখে দিয়ে চলে গেলাম। সেবার কোথায় গিয়েছিলাম আমরা? দীঘায় বোধহয়। সঙ্গে ছিল শিশির (লাহিড়ী), সুধাংশু (ঘোষ) এরা। ওদের গল্পটা বললাম। ওরা বলল, এ তো খুব ভালো গল্প লিখেছিস। কি লিখেছি জানি না। পরে শুনলাম, ভালোই লিখেছি। 

প্রণব: 
‘সুখ’ গল্পটা তো দেশ সুবর্ণজয়ন্তী গল্প সংকলনেও রয়েছে। খুব ভালো গল্প। গল্পটা তো দুটো দম্পতিকে নিয়ে। একজোড়া বুড়ো-বুড়ি, আরেক যুবক স্বামী-স্ত্রী। 

বিমল: 
এক ইয়ং কাপল। খুব কষ্টেসৃষ্টে কলকাতায় একটা চিলেকোঠায় থাকে। বেড়াতে পারে না, কিচ্ছু না। তা, স্বামী বলেছিল স্ত্রীকে, আমি তোমায় বেড়াতে নিয়ে যাব। বেড়াতে নিয়েও গেছে। ওরা ঠিক করেছিল, আমরা কারো সঙ্গে কথা বলব না। বাইরে গিয়ে খুব মজা করে থাকব। যা হয় আর কি। তো, সেখানে গিয়ে দেখে যে, ওদের ঘরের পাশেই এক বুড়োবুড়ি রয়েছে। মনে মনে না চাইলেও কয়েকদিনের মধ্যেই এই বুড়োবুড়ির সঙ্গে ওদের পরিচয় হয়ে যায়। ওরা দেখে যে, এই বুড়োবুড়ির মধ্যে এক আশ্চর্য ভালোবাসা। খুব রসিক বুড়ো। বুড়ির সঙ্গে সারাক্ষণ খুনসুটি করেন। ওষুধ খাওয়ান। বুড়ি ভালো চোখে দেখেন না। তবু স্বামীর জন্য উল বোনেন। তো এইসব দেখে ওই যুবতী মেয়েটি আর ছেলেটির মনে একটা প্রশ্ন জন্মাল। ওরা ভাবতে লাগল, যৌবনের এই যে উচ্ছ্বল ভালোবাসা, এটা কি আমরা এইভাবে এতকাল পর্যন্ত টিকিয়ে রাখতে পারব। তারা তখন বিছানায় শুয়ে। তবু অদ্ভুত এক বেদনাবোধ ছড়িয়ে গেল ওদের মনের মধ্যে। 

প্রণব: 
অসম্ভব ভালো গল্প। এটা কি বিশেষ কোনও প্রজন্মের কথা? মানে, দুটো প্রজন্মের মানসিক ব্যবধান জাতীয়? 

বিমল: 
না, এখনকার-তখনকার কেন বলব? ধরো, আমাদের তো এত বয়স হয়ে গেল, এই বয়সে তো বুঝি, এই যে ইন্টিমেসি, এটা এমন আস্তে-আস্তে গ্রো করে, আর যখন সত্যি সত্যি গ্রো করে যায় একসময় মনে হয়, কেমন যেন আমরা অভিন্ন হয়ে গেছি। সমস্ত ব্যাপারে অভিন্ন। শোকে, দুঃখে। এবং আমার আর কোনও আশ্রয় থাকেনা তখন। মনে হয় না, স্ত্রী ছাড়া আর কোনও আশ্রয় আছে। স্ত্রীও মনে করে আমার আর কোনও শেল্টার নেই। আমার মাকেও দেখেছি। আমার মায়ের বয়স এখন নব্বই। বাবা মারা যাওয়ার পর দেখেছি, বাবার মৃতদেহ আঁকড়ে ধরে মা শুয়ে আছেন। সারারাত ধরে শুয়ে আছেন। পরে মাকে নিয়ে আমার এত বছর কেটে গেল, আমি দেখেছি, আমার মা তো নিরক্ষর মানুষ, সেই কোন বারো বছর বয়সে বিয়ে হয়েছিল, বাবা যখন মারা যান, বাহাত্তর তিয়াত্তর বছর বয়সে, মার তখন আর কত বয়স, চুয়ান্ন ছাপ্পান্না হবে, কিন্তু একটা প্যাটার্ন তৈরি হয়ে গিয়েছিল। সে আমরা বুঝতে পারব না। শুজনির একটা নকশা থেকে তুমি যদি খানিকটা সুতো উঠিয়ে নাও, হঠাৎ ছিড়ে নাও, তাহলে যেমন হয়, প্যাটার্নটা এলোমেলো হয়ে যায়, ডিজাইনটা নষ্ট হয়ে যায়, বাবা মারা যাবার পর মার ঠিক সে রকম অবস্থা হয়ে গেল। আমাদের কাছে মা এতকাল ধরে আছেন বটে, কিন্তু মা আমাদের তেমন নিকট, নিজের ভাবতেই পারলেন না। হওয়ারই কথা। আমরাই এখন বুঝতে পারি তো আমার মা। 

প্রণব: 
‘সুখ তো আপনার ১৯৭৫ সালের লেখা। কিন্তু তখন আপনার লেখায় আবার রিয়েলিটি ফিরে এসেছে। 

বিমল: 
আসছে বটে। কিন্তু অন্য ভাবে। ওর মধ্যে মানুষের খুব গভীর কথাগুলো চলে আসছে। 

প্রণব: 
তো, এই সময়ের পর থেকে যেসব লেখা, যেমন ‘তুচ্ছ’, ‘হেমন্তের সাপ’, ‘সুনীতিমালার উপাখ্যান’ - এইসব গল্প নিয়ে কি আপনার গল্পলেখক জীবনের আরেকটা বাঁক? তা যদি হয়, আগের পর্বের সঙ্গে ঠিক কোথায় তফাত, বিমলদা? 

বিমল: 
ব্যাপারটা কি জানো, যখন আমরা লিখি, তখন আমরা ভাগ করে-করে বলতে পারি যে, এখান থেকে এই একটা নতুন পর্ব শুরু হল, সেভাবে তো বলা যায়না। পরবর্তীকালে যখন কেউ সেগুলো বিচার করে, তখন হয়তো বুঝতে পারে যে, এরকম একটা ধরন ছিল, তারপর সেটা পাল্টে অমুক সময়ে আরেকটা ধরন হল ইত্যাদি। আমার লেখা প্রথম দিকে কি ছিল, তারপর আমি কি চেষ্টা করেছি সে তো তোমায় বলেছি। তবে এটা হয়তো মনে হতে পারে যে, ‘সুখ’ থেকেই আমি একটু নতুনভাবে ভাববার বা লেখবার চেষ্টা করেছি। সেটা কি ধরনের চেষ্টা সেটা যদি আমার দিক থেকে বুঝিয়ে বলতে হয়, আমি তাহলে বলব, আমার আগেকার লেখায় এক ধরনের চাঞ্চল্য ছিল। কী রকম চাঞ্চল্য, আমি বরং তুলনা দিয়ে বলি। যেমন ধরো, পুকুরে একটা ঢিল ফেললে। ঢিলটা যখন পড়ে, তখন চারপাশে একটা জলের কাঁপন ওঠে, একটা ঢেউ-ঢেউ মতন দেখা যায়, সেটা তারপর আস্তে-আস্তে মিলিয়ে যায়। কাজেই ওই সময় আমার যা বয়স ছিল, তাতে যে ধরনের ভাবনা চিন্তা মাথায় এসেছে সেটা ইমোশনাল এক্সপিরিয়েন্সই হোক, কিংবা কোনও ইনটেলেকচুয়াল এক্সপিরিয়েন্সই হোক, বড় বেশি আমাকে চঞ্চল করেছিল। তার ঢেউগুলো, তার রিপলগুলো এমনভাবে লিখেছি যে, বোঝা যায় যে তার মধ্যে একটা চাঞ্চল্য রয়েছে। কিন্তু পরবর্তীকালে, যখন আমার বয়স পঞ্চাশ বাহান্ন হয়ে গেছে, তখন বোধহয় ওই ‘সুখ’ বা ‘তুচ্ছ’ ধরনের গল্প থেকে মোটামুটি ভাবে আমার একটা স্থিরতা এসেছে। আমার বোধ, বা যে অভিজ্ঞতা, বা আমার যা বলার কথা সেগুলো খুব সংযত হয়ে গেছে। শান্ত হয়ে গেছে, স্থির হয়ে গেছে। সুখ’ বা ‘তুচ্ছ - এসব গল্প যদি একটু মন দিয়ে পড়ো, দেখবে এখানে আমাদের জীবনের কথাই আমি বলেছি বটে এবং বেদনার কথা বা দুঃখের কথা – সবই বলেছি, কিন্তু অনেক শান্ত ভাবে বলতে পেরেছি।

প্রণব: 
বিমলদা, সিরিয়াস গল্পের পাশাপাশি আপনি তো অনেক হাসির গল্পও লিখেছেন। তো, এই হাসির গল্পের সূচনা কি ‘বালিকা বধূ’-র থেকে? বিমল: ‘বালিকা বধূ’ কিন্তু সে অর্থে হাসির গল্প নয়। তবে এই লেখাটা নিয়ে খুব একটা মজা আছে। এই গল্পটা আমি পাকপাড়ায় থাকতে লিখেছিলাম। শুরু করেছিলাম হালকা ভাবে। আমার হঠাৎ মনে হল, আচ্ছা, এমন একটা গল্প লিখলে কেমন হয়? প্রণব: সাধু বাংলায় লিখলেন। 

বিমল: 
হ্যাঁ। সাধু বাংলায় না লিখলে পুরনো গল্প এবং মজাটা আসত না। গল্পটা খানিকটা লিখে প্রথম অংশটুকু লিখে আমি সাগরদাকে দিয়ে বললাম, সাগরদা, একটা গল্প পেয়েছি। এটা পড়ে একটু দেখুন তো কেমন চলে? 

প্রণব: 
নিজের নাম না বলে? 

বিমল: না বলেই। কার লেখা?’ 
সাগরদা জিজ্ঞেসও করলেন। আমি বললাম, 'এ একজনের লেখা। আপনি পড়ুন না!' সাগরদা তাকালেন। বোধহয় কিছু অনুমান করলেন। খুব চালাক লোক তো! পড়লেন। পড়ে তারপর বললেন, ‘বিমলবাবু, এটা কার লেখা, সত্যি করে বলুন তো?’ তখন আমি বললাম, ‘সাগরদা এটা আমিই লিখছি। তবে নিজের নামে আমি ছাপতে চাই না। আমার দুর্নাম হয়ে যাবে'। বললেন, ‘কে বলেছে? আমি বলছি, মোটেই দুর্নাম হবে না। আপনি আপনার নামেই গল্পটা লিখুন। লেখাটা শেষ করে দিন'। তা, লিখলাম নিজের নামেই, বুঝলে? ওটা দু-সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। তারপরে বাদল বলল, ‘বিমলদা আমি এটা বই করব। আমি যত বলি ‘দূর, এটা তুমি কি বই করবে?' বলল, না বিমলদা, 'এটা আমি বই করব।’ তারপর বইও হল। সিনেমাও হল। 

প্রণব: 
কিন্তু যাই বলুন, ‘বালিকা বধূ'ও খুব রিফ্রেশিং লেখা। বহু লোকের ভালো লেগেছিল। 

বিমল: 
আমি কিন্তু শুধু মজা করার জন্যই গল্পটা লিখিনি। এর যে শেষ অংশটুকু, সেখানে যখন লোকটা ভাবছে যে, এই যে বিশ্বসংসার, এটা এত বিরাট ও ব্যাপক, আমি তার তুলনায় অতি তুচ্ছ, মূল্যহীন, কিন্তু এই ঘর সংসারের মধ্যে আমি আমার স্ত্রীর কাছে, আমার ছেলেমেয়ের কাছে যে-মূল্যটা পেলাম, এর মূল্যও তো কম নয়। এই অনুভবটার জন্যই গল্পটা লেখা। শেষটুকু লেখার জন্যই আমি কিন্তু গল্পটা লিখেছি। তা না হলে কিন্তু এ-গল্প আমি লিখতে পারতাম না। আমি যদি আমার কথাই না লিখতে পারি, তাহলে শুধু মজা করার জন্য লিখব কেন? তাহলে তো হাসির গল্পই লিখতাম। 

প্রণব: 
কিন্তু নিছক হাসির গল্পও তো আপনি অনেক লিখেছেন বিমলদা। সেকি আরও পরে? 

বিমল: 
আগে আমি আনন্দবাজার পত্রিকার দোল সংখ্যায় এমন গল্পই লিখতাম। 'পলাশ’-টলাস ওখানেই লেখা। 

প্রণব: 
দোল সংখ্যা মানে বার্ষিক সংখ্যা? 
বিমল:
এখন বার্ষিক সংখ্যা বলে, আগে আমরা দোল সংখ্যা বলতাম। পরে আমি ঠিক করলাম, দূর, এখানে আমি হাসির গল্পই লিখব। তখন প্রথমে 'চার তাস’ বলে একটা হাসির গল্প লিখলাম। তারপর ‘বসন্তবিলাপ’। এভাবে পরপর কিছুদিন ওখানে আমি হাসির গল্পই লিখেছি। তবে আমি কখনও যাকে বলে স্থূল হাসির গল্প বা ভাঁড়ামির গল্প লিখিনি। তুমি এ-ব্যাপারে প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের কথা ধরতে পারো, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের কথা বলতে পারো। এঁদের খুব সুন্দর সুন্দর গল্প আছে। কোনও ভাঁড়ামি নেই। এই ট্র্যাডিশনটা আমাদের নষ্ট হয়ে এল। 

প্রণব: 
কিন্তু বিমলদা, আপনি তো আপনার হাসির গল্পগুলোকে বাছাই বা শ্রেষ্ঠ গল্পের সংকলনে দেননি। 

বিমল: 
আছে একটা সংকলন, সরস গল্প নামে। আগেও দু-একটা বেরিয়েছে। সেগুলো এখন পাওয়া যায় না। 

প্রণব: 
কিন্তু আপনি সিরিয়াস গল্পের পাশাপাশি হাসির গল্পকে কখনও জায়গা দেন না কেন? আপনার কি মনে হয়, সুর কেটে যাবে? 

বিমল: 
হ্যাঁ, আমার যদি কখনও সব মিলিয়ে কোনও গল্পের বইটই বেরোয় তাহলে দু-চারটে হাসির গল্প সেখানে দিতেই হবে। 

প্রণব: 
বিমলদা, সমসাময়িক ঘটনা নিশ্চয়ই আপনাকে মানে আপনার মতো সূক্ষ্ম অনুভূতিপ্রবণ লেখককে বিচলিত করে। 

বিমল: করে বইকী। 

প্রণব: 
কিন্তু সে সব নিয়ে আপনি কোনও গল্প লেখার কথা ভাবেননি? 

বিমল: 
সমসাময়িক ঘটনা নিয়ে আমি গল্প লিখিনি তা তো নয়। যেমন ধরো, 'ওরা'। এটা আমি লিখেছিলাম ওই সত্তর-বাহাত্তর সালে। তার মানে এই নয় যে, আমি বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে গল্পটা লিখেছি বা কিছু বলবার চেষ্টা করেছি। এ-লেখার মধ্যে যদি কোনও মতবাদ আমার থেকে থাকে তা হল মানবিক মতবাদ। পুরো গল্পটাই হচ্ছে তাই। রাজনৈতিক স্বার্থপর নেতারা কীভাবে নষ্ট করে দিচ্ছে এই সময়ের ছেলেমেয়েদের। আর একটা গল্প, 'নিগ্রহ’ - এটাও বলতে গেলে সমসাময়িক ঘটনার উপর লেখা। এখানেও তুমি দেখবে আমার কাছে কোনও পার্টি বা কোনও লেবেল কিছু নয়। আমার কাছে মানুষের কথাটাই বড় কথা। 

প্রণব: 
আচ্ছা বিমলদা, এখন কিন্তু আপনি আর বেশি গল্প লেখেন না। কেন? নিজেই কমিয়ে দিয়েছেন। 

বিমল:  
তা দিয়েছি। বয়স যখন কম থাকে, তখন পরিশ্রম ক্ষমতাও তো বেশি থাকে। সে ক্ষমতা এখন আর নেই। আর দ্বিতীয় কারণ – যেটা বড় বলে আমার মনে হয়, তা হল, একসময়ে যত বলার কথা দীর্ঘকাল ধরে নিজের মধ্যে জমে ছিল, কখনও সচেতন ভাবে, কখনও ভেতরে-ভেতরে সে সব তো একে-একে বলা শেষ হয়ে গেল। শুধু গল্পের জন্য গল্প তো আমি লিখতে চাই না। যদি তেমন কোনও কথা আমার নতুন ভাবে না জোটে, অকারণ মামুলি গল্প লিখে কি লাভ? রবীন্দ্রনাথের কথাই ধরো না। এককালে অত গল্প লিখেছিলেন, অথচ তারপর কতকাল আর লেখেন না। সেই একেবারে শেষ বয়সে, তাও বোধহয় তাগাদায় পড়ে - গুটি তিনেক গল্প। তিনি কি ইচ্ছে করলেই লিখতে পারতেন? আমার মনে হয়, মনের দিক থেকে তিনি আর গল্প লেখার সাড়া পেতেন না। অথচ যদি ঐশ্বর্যের কথা ভাবো, সঞ্চয়ের কথা ভাবো, তাঁর চেয়ে মনের সম্পদ আর কার বেশি ছিল? সে-তুলনায় আমাদের জীবনে আর কি এমন সঞ্চয় আছে?

প্রণব: 
কিন্তু এবারও তো আপনার যে-দুটো গল্প পড়েছি দেশ-এ ‘হরিশের বিষাদ’, কি গল্পপত্রের ‘নিশীথ সাথী’, তাতে তো মনে হয় না, আপনার বলার কথা ফুরিয়ে গেছে! 

বিমল: 
দুটো গল্প অবশ্য লিখেছি। সারা বছরে দুটো-একটা হয়তো মাথায় আসে। তা বলে আগের মতো তো আর সম্ভব নয়। 

প্রণব: 
বিমলদা, আপনি তো লেখার ব্যাপারে খুবই খুঁতখুঁতে, বারবার লেখেন, কাটেন, এমনকি লেখা পাতাও ছিড়ে ফেলে দেন, তো আপনার কি ভিতরে সবসময়ই অতৃপ্তি থাকে? 

বিমল: 
আমি বরাবরই লেখার ব্যাপারে খুঁতখুঁতে। ওই যে তুমি 'ইদুর’ গল্পের কথা বলেছিলে, আমার সেই প্রথম দিকের লেখা গল্প, লেখার সময়ে কতবার যে ছিড়েছিলাম আর লিখেছিলাম তার শেষ নেই। আসলে আমার মনে হয়, খুঁতখুঁতেপনা আর অতৃপ্তি থাকলে বোধহয় নিজের মনোমতো করে কোনও লেখাই লেখা যায় না। তাছাড়া যেহেতু আমি আগে থেকে মালমশলা সাজিয়ে নিয়ে গল্প লিখতে বসি না, তাই আমাকে অনেকটাই হাতড়ে হাতড়ে একটা গল্প লিখতে হয়। এখানে আমার পরিশ্রমটা অনেকটা মজুরের মতো। প্রতিভা না থাকলে যা হয় আর কি! 

প্রণব: 
তা বললে চলবে কেন! বিমলদা, আপনার লেখায় তো মজুরের ঘামের চিহ্ন চোখে পড়ে। 

বিমল: 
ঘামটাকে আমি মুছে ফেলি। অবনীন্দ্রনাথের সেই কথাটা জানো তো! পাখি ওড়ার একটা মেকানিজম থাকে। কোনও লেখক যদি মনে করে সেই মেকানিজমটা দেখাবার জন্যই তার কলম ধরা, তবে আমি মনে করি, সেটা ঠিক নয়। পাখি আকাশে উড়ে যায়, আমরা সেই সৌন্দর্যটাই দেখি। সে কেমন করে উড়ে যাচ্ছে, সেই মেকানিজম নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। শিল্পের এটা একটা বড় শর্ত। 

প্রণব: 
কিন্তু ভাষা ব্যবহারে আপনি তো খুব সচেতন। 

বিমল: 
হ্যাঁ, আমার যেটুকু ভাষাজ্ঞান, সেই হিসেব যদি ধরো, তবে আমি অবশ্যই সচেতন। গল্প উপন্যাস লেখার বিপদ হচ্ছে যে, তাকে সরাসরি কমিউনিকেট করতে হয়, যতটা সম্ভব নির্দিষ্ট, যথাযথ ও গভীরভাবে। কবিতার এই দায় নেই। তার প্রাণ রয়েছে ইঙ্গিতময়তায়, অনেক সময় ধূসরতায়। এমনকী, গভীরতম অনুভূতি ও চেতনাকেও কবিতা সাজেশনের মধ্য দিয়েও প্রকাশ করতে পারে। গদ্যে এর সুযােগ আছে বটে, কিন্তু কম। 

প্রণব: 
কিন্তু আপনার অনেক গল্পেও তো এমন ইঙ্গিত বা সাজেশন থাকে। তখন আপনি কীভাবে শব্দ নির্বাচন করেন? 

বিমল: 
ভাষার ব্যবহার এবং শব্দ নির্বাচনে আমি যথাসাধ্য যত্ন নিই। কারণ, আমার বলার কথাটি ঠিক মতো বলতে না পারলে কমিউনিকেট করা হবে না। আর এই কমিউনিকেশনটা শিল্পসম্মত হওয়া দরকার। তাছাড়া যতটা সম্ভব যথার্থ হওয়া প্রয়ােজন। তুমি লক্ষ্য করে দেখবে, আমাদের অনেক লেখাই খুঁটিয়ে পড়লে দেখা যাবে যেমনটি বলা উচিত বা বললে ভালো হত, সেভাবে বলা হয়নি। সমস্ত লেখার মধ্যে, সেটা বর্ণনাই হোক, কি সংলাপ, আমরা যদি সচেতনভাবে শব্দ ব্যবহার না করি, তা হলে লেখার সৌন্দর্য এবং তার ম্যাচিওরিটি ধরা পড়ে না। 

প্রণব: 
আচ্ছা বিমলদা, এ-ধরনের গদ্যের কি কোনও তুলনা মনে পড়ছে। মানে, বাংলা ভাষায়?

বিমল: 
মনে তো পড়ছেই। সহজেই যা মনে পড়ছে, সেটা হল ‘ছিন্নপত্র’-এর গদ্য। এমন স্নিগ্ধ, সজীব এবং চিত্রময় গদ্য খুব কমই দেখা যায়। কত গভীর কথাও কত সহজে বলা যায়। গভীর কথা বলার জন্য গম্ভীর গদ্যের প্রয়ােজন আছে বলে, যদি-না শিল্পগত কোনও প্রয়ােজন থাকে, লেখকের অন্য কোনও উদ্দেশ্য থাকে, আমি মনে করি না। রবীন্দ্রনাথের গানের কথাই ভাবো না কেন! 

প্রণব: 
বিমলদা, এবার একটা অন্য কথায় আসি। আপনি তো শুধু গল্পই লেখেননি, একসময় ছোটগল্প নিয়ে আন্দোলনও করেছেন। তো, সেই আন্দোলনের কথা যদি একটু বলেন। 

বিমল: 
তোমরা বাপু যখন আন্দোলন কথাটা বলো, তখন মনে হয়, আমরা যেন লাঠি কাঁধে মিছিল করে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু তা তো নয়। ইংরেজি মুভমেন্ট শব্দটাকে আমরা বাংলায় সবসময় ‘আন্দোলন' করে নিয়েছি। আমার নিজের ধারণা, সাহিত্যে শিল্পে ‘আন্দোলন’ – এই নামে যা-কিছু হয়েছে, সেটার সঙ্গে মিছিলের কোনও সম্পর্ক নেই। নতুন করে কিছু খোঁজার এবং ভাবার চেষ্টাটাই হল মোটামুটিভাবে সাহিত্যশিল্পের আন্দোলন। আমরা যখন ছোটগল্প নতুন রীতি করেছিলাম, তখন অনেকেই হয়তো আমাদের ভুল বুঝেছিলেন, কিন্তু আমাদের, অন্তত আমার, চেষ্টা ছিল বাংলা ছোটগল্পের মধ্যে আরেকটা 'ডাইমেনশন’ যােগ করা। আমরা যখন ‘নতুন রীতি’ শুরু করি তখন অন্তত চেয়েছিলাম, বাংলা গল্পের মধ্যে আরেকটি মাত্রা যােগ হোক। সেটা আমি চেয়েছিলাম, বোধ এবং চিন্তার দিক থেকে। 

প্রণব: 
এটা কি আপনি লেখকদের উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছিলেন, না পাঠকদের? 

বিমল: 
অবশ্যই লেখকদের। তুমি তো জানো, 'ছোটগল্প : নতুন রীতি’ কোনও পত্রিকা ছিল না। আমরা একটি করে চটি বই ছাপতাম। তাও তো মাত্র চার-পাঁচটি ছাপা হয়েছিল। অর্থাভাবে তাও বন্ধ হয়ে যায়। 

প্রণব:  
কিন্তু বিমলদা, শুধু গল্প নিয়ে পত্রিকা, তাও তো আপনি বার করেছেন। আগে একবার,এখনও তো আবার। তিন বছর ধরে চলছে ‘গল্পপত্র'। 

বিমল: 
শুধু গল্প নিয়ে কাগজ পঞ্চাশের মাঝামাঝি কি শেষের দিকে আমাদের বাংলা ভাষায় দু একটি ছিল। যদিও অনিয়মিত। যেমন, তোমাদের গল্প--  কৃত্তিবাস। সেদিক থেকে আমার আলাদা কোনও কৃতিত্ব নেই। 'নতুন রীতি’র পরে ‘গল্প বিচিত্রা’ নামে একটি পত্রিকা আমরা বার করেছিলাম। তখনকার প্রায় সব গল্পলেখকই তাতে লিখেছেন। তবে তিনচারটি সংখ্যার পর এটিও আর প্রকাশ করা যায়নি। কারণ, সেই অর্থাভাব। আর এতকালপরে যখন আমি কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়েছি, বয়সও যথেষ্ট হয়েছে, তখন ‘গল্পপত্র’ নিয়ে আবার লেগে পড়েছি। এটারও অবস্থা খুব সুবিধের নয়। জানি না কবে বন্ধ করে দিতে হবে।

প্রণব: 
কিন্তু বিমলদা, এতে আপনার সময় যায়, অর্থ যায়, শারীরিক খাটাখাটনি ও উদ্বেগও তো রয়েছে। এ-সত্ত্বেও আপনি বারবার কেন এসব করতে যান? 

বিমল: 
দেখো, নানা জনের নানা নেশা থাকে। সিগারেট ছাড়া আমার অন্য কোনও নেশা নেই। লোকে তো নেশার জন্য কত পয়সা অপব্যয় করে। ধরে নাও, এটা আমার একরকম নেশাই। তাছাড়া অনুরাগ এবং ভালোবাসা তো আছেই। তুমি তো জানো, বুদ্ধদেব বাবু একা কতকাল ধরে কবিতা পত্রিকা চালিয়ে গিয়েছিলেন। সুনীলরা কত কষ্ট করেই না 'কৃত্তিবাস' চালাত।

 প্রণব: 
আচ্ছা বিমলদা, ‘গল্পপত্র' চালাতে গিয়ে কি কোনও নতুন ও প্রতিশ্রুতিমান লেখকের খোঁজ পেয়েছেন? একসময় তো দেশ পত্রিকায় আপনি অনেক গল্পলেখককে পেয়েছিলেন? 

বিমল: 
তোমাকে যদি সত্যি কথা বলতে হয়, তাহলে বলি, আমাদের পত্রিকায় দু-চারজন নতুন লেখককে আমার প্রতিশ্রুতিমান বলে মনে হয়েছে। আজকাল হামেশাই যে সব গল্পলেখকদের তুমি দেখো, এঁদের কথা আমি বলছি না। এরা তো নানা কাগজেই লেখেন। কলকাতার বাইরে থেকে মাঝেমধ্যে দু-একটি অজানা অচেনা লেখকের লেখা। পড়ে আমার ভালোই লেগেছে। তবে, এই পত্রিকার মধ্য দিয়ে আমি যা পেতে চাই, তা এখনও পাইনি। মনে হয়, সাধারণভাবে এখন একটা ভাঁটা চলেছে। কী করা যাবে? 

প্রণব: 
বিমলদা, আজকাল তো আপনার গল্পের বই-টই বেশি দেখতে পাই না। 

বিমল: 
আমি বোধহয় এখন আর একালের পাঠকদের রুচিমতো গল্প লিখতে পারি না। 

প্রণব: 
এটা আপনার ঠাট্টার কথা। 

বিমল: 
তা হয়তো হবে। গত চোদ্দ-পনেরো বছরে আমি গল্পও তো খুব কম লিখেছি। তুমি শুনলে হয়তো অবাক হবে, এই মাসেই আমার একটি গল্পের বই বেরোচ্ছে। এর সব ক-টি গল্পই গত বারো-চোদ্দ বছরের মধ্যে লেখা। এ আমার শেষবেলার গল্প। 

প্রণব: 
শেষবেলা কেন বিমলদা? 

বিমল: 
শেষবেলার গল্প – এই নামেই বইটি আমি দিয়েছি। দেখো ভাই, আমার বয়স তো কম হল না। এই আশ্বিনেই সত্তরে পা দিলাম। এখন তো বেলা শেষই। 

প্রণব:
কিন্তু আপনাকে তো বাহাত্তরে ধরেনি। তাই এ-নামটা আমার অপছন্দ। 

বিমল: 
তুমি আর আমায় কত জ্বালাবে! 

প্রণব: দেশ পত্রিকায় আপনি গল্প দেখতেন একসময়। তখনকার গল্প এখনকার গল্প, ছোটগল্পের ভবিষ্যত এমন আরও বহু প্রশ্ন আছে আমার। 

বিমল: 
ভবিষ্যৎ? তুমি কি আমায় জ্যোতিষী পেয়েছ? তোমার অত প্রশ্নের জবাব আর আমার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তোমাকে একটা কথা বলি, এবারে দেশ পত্রিকায় পুজোসংখ্যায় দেখলাম, সাতটি উপন্যাসের পাশে সাতটি ছোটগল্প ছাপা হয়েছে। দেখে খুব কষ্ট হল। তুমি জানো, একসময় দেশ পত্রিকার পুজো সংখ্যার গল্প ছিল সৎ-পাঠকের কাছে প্রচণ্ড একটা আকর্ষণ। লেখকরাও চেষ্টা করতেন তাঁর লেখা সবচেয়ে ভালো গল্পটি দেশ পত্রিকায় দিতে। সুবোধ ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, সৈয়দ মুজতবা আলী, জ্যোতিরিন্দ্র নন্দী, সন্তোষ কুমার ঘোষ, নরেন্দ্রনাথ মিত্র, রমাপদ চৌধুরী, সমরেশ বসু, গৌরকিশোর এঁরা সকলেই সেই চেষ্টাটাই করতেন। দেশ পত্রিকার সুবর্ণজয়ন্তী কি শারদীয়া গল্প সংকলনের সমাদর দেখেই সেটা তুমি আন্দাজ করতে পারবে। সেদিন সাগরদার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় আমি সাতটি গল্পের কথা না তুলে পারিনি। সাগরদার কথাবার্তা থেকে আমার মনে হল, এ-ব্যাপারে তিনি আমাকে অন্যরকম কিছু বোঝাবার চেষ্টা করছেন। দেখো, আমি প্রায় তিরিশ বছর দেশ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। লেখক এবং সম্পাদকীয় বিভাগের কর্মী হিসেবে আমার যে মায়ামমতা ও দুর্বলতা রয়ে গেছে তা আমি মুছে ফেলতে পারি না। 

প্রণব: 
বিমলদা, একটা প্রশ্ন। শেষ প্রশ্ন। আপনি নতুন কোনও গল্প লেখার কথা ভাবছেন না? 

বিমল: 
দেশ পত্রিকার নতুন বছর শুরু হয় নভেম্বর মাসে। পত্রিকার পক্ষ থেকে আমার কাছে একটি গল্প চাওয়া হয়েছে। সাগরদাও তাগাদা দিয়েছেন। তোমায় বলি, বেশ কিছুদিন ধরে আমি চার-পাঁচটি গল্প লেখার কথা ভাবছি, যেগুলোর ধরন, অ্যালিগরি গোছের। লেখাগুলো পড়লে আপাতত মনে হবে কোনও গ্রাম্য কিংবা লৌকিক কাহিনী। কিন্তু আমি চেষ্টা করব, সেগুলোর মধ্যে আধুনিক মনের একটি পরিচয় এবং একটা চরম বা পরম মানবসত্যের কথা প্রকাশ করতে পারব কিনা জানি না। 

প্রণব: 
এগুলো নিশ্চয় দেশ পত্রিকাতেই লিখবেন? 

বিমল: 
যদি লিখতে পারি, তাহলে দেশ পত্রিকাতেই লিখব।

-----------
১৯৯০, ৩ নভেম্বর

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন