মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

জুবায়ের ইবনে কামালের গল্প : পাঁচশো টাকা



তার মুখে অদ্ভুত এক হাসি ঝুলে ছিলো। যেই হাসির সাথে সাব্বির বহুদিনের পরিচিত। হাসির আশেপাশে কিছু পিঁপড়ে মিথ্যে কিছু খোঁজে। এই মিথ্যে কী তা সাব্বির কিংবা আমরা জানি না।

এই হাসিটা সাব্বির প্রথম দেখেছিলো একটা রেস্তোরায়। সেদিন খুব গরম পড়েছিলো। মনে হচ্ছিলো যেন শহরে কেউ যান্ত্রিক তাবদাহ চালু করে দিয়েছে। সাব্বিরদের গ্রামের মসজিদের ইমাম সাহেব থাকলে হয়তো বলতেন, জাহান্নামের হিটার চালু হইয়া গেছে। জাহান্নামের মুল হিটার তাইলে কত কঠিন ভাবো? এই ইমাম সাহেব খুব সম্ভবত জাহান্নামপ্রেমী। এমনিতে আগ বাড়িয়ে বেশি কথা বলেন না। তবে তিনি সব ধরণের কথায় জাহান্নাম টেনে আনেন। বিয়ে বাড়িতে সবাই টেবিলে বসে খাচ্ছে। ইমাম সাহেবও আছেন। সাব্বিরের চাচা হুট করে বলে উঠলো- ‘রান্ধনটা কিন্তু ভালো হইছে। খাইয়া তৃপ্তি পাইতাসি। কী বলেন ইমাম সাব?’ ইমাম সাহেব মুখের লোকমা পাতে রেখে উত্তর দিলেন, ‘একদম ঠিক বলেছেন জনাব। জাহান্নামে কিন্তু কেউ তৃপ্ত হবে না। সেখানে আর কিসের খানা খাদ্য বলেন?’

জাহান্নাম হিটার হোক আর অন্য কিছুর কারণেই হোক, গরমে সবার যাচ্ছেতাই অবস্থা। তার উপর দুপুরের বেলা সবার মেজাজ খিটখিটে থাকে। এটা সম্ভবত গরমেরই পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। বাসের হেলপারদের সাথে দিনের এই সময়টাতেই প্রচন্ড বাকবিতন্ডা হয় সবার। ফুটো পয়সা নিয়েও বাস মাথায় তুলে ফেলে। কেউ বিকট আওয়াজে কাশি দেয়। বাসের মধ্যে কত কিছু চলে। বাসকে অদ্ভুত বাহন বলেই মনে হয় সাব্বিরের। এই একটা পরিবহন দেশে, যেখানে সব ধরণের মানুষ আসা-যাওয়া করে। কিছু লোক আছে যাদের সবসময় পকেট কাটা যায়। তারা যেই বাসেই উঠুক না কেন তাদের পকেট কেউ না কেউ কেটে সব নিয়ে যাবে। অথবা তারা যদি ভীড়ের মধ্যে থাকে, পকেটমার যেন তাদেরকে টার্গেট করেই আসবে আর তাদের দামী মোবাইল ফোন নিয়ে হাওয়া হয়ে যাবে। এরকম একজন মানুষ হলেন স্বয়ং সাব্বিরের এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়। এমন কখনো ঘটেনি যে, তিনি গ্রাম থেকে ঢাকা এসেছেন অথচ তার পকেট থেকে কিছু হাওয়া হয়ে যায়নি। এরকম ফুটো কপাল নিয়ে কিভাবে তারা ঢাকা শহরে চলে তা সাব্বির ভেবে পায় না।

সেরকম গরমে টিকতে না পেরে সাব্বির ভাবে কোন একটা কফি শপে ঢুঁ মারবে। কিন্তু আশেপাশে কোন কফিশপ নেই। কফিশপওয়ালারা খিলগাঁও আর ধানমন্ডি ছাড়া সম্ভবত কোন জায়গা চেনে না। খিলগাঁর কিছু রাস্তা দেখলে মনে হয় কফিশপওয়ালারা রাস্তার দু’পাশ লিজ নিয়েছে। কী আর করা! অগত্যা তার কোন রেস্তোঁরায় ঢুকতে হয়, ঠান্ডা হওয়ার জন্য। কোন রেস্তোঁরার ভেতরে এসি আছে তা বাইরে থেকে দেখে বলা মুশকিল। অনেকেই চালাকি করে দরজা বন্ধ করে রাখে। অস্বচ্ছ দরজার অপর প্রান্ত থেকে তেমন কিছুই বোঝা যায় না। ভেতরে ঢুকে বসার সাথে সাথেই বোঝা যায় মান্ধাত্বা আমলের টেবিল ফ্যান ঘ্যার ঘ্যার আওয়াজ করে ঘুরছে। মনে হয় শুধু মটরই ঘুরে, বাতাস আর আসে না। অনেক হিসেব নিকেশ করে একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্তোঁরা খুঁজে বের করলো সাব্বির। আর সেখানেই ঝুলে থাকা হাসির সাথে প্রথম দেখা।

অবধারিতভাবেই হাসিটা ঝুলে ছিলো একটা মেয়ের মুখে। জগতের বেশিরভাগ সৌন্দর্য্যই মেয়েদের মাঝে দিয়ে রাখা। মেয়েদের মাথায় চুল যত বড় হয় ততই ঐশ্বরিক সুন্দর্য বৃদ্ধি পায়। জীবনানন্দ বিমুগ্ধ হয়ে বলেই ফেলেছিলেন- ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা।‘ অথচ এই বড় চুল যদি কোন ছেলের মাথায় থাকতো, তবে জীবনানন্দ কিছু লিখতেন কিনা সাব্বির ভেবে পায় না।

মেয়েটার মুখে অদ্ভুত সুন্দর হাসি ঝুলে ছিলো। মেয়েটার চেহারায় স্নিগ্ধতা ছিলো। তার চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছিলো ক্লান্ত চেহারা। কামিজ ঘামে ভিজে লেপ্টে ছিলো শরীরের সাথে। সাব্বির তার সামনের একটি টেবিলে বসে পড়ে। বসে পড়ার পর বুঝতে পারে মেয়েটার মুখোমুখি বসা হয়ে গেছে। এখন কি উঠবে নাকি এখানেই বসে থাকবে তা নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে সে। মিথ্যে কিছুর খোঁজে ভীড় করা পিঁপড়ারা তখনও এই হাসির খোঁজ পায় নি।

পরবর্তীতে সাব্বিরের সাথে বারবার এই হাসির দেখা হয়। শাহবাগে বাসে উঠতে গিয়ে দেখা হয়। হলে সিনেমার টিকেট কাটতে দিয়ে দেখা হয়। এক ফাঁকে জেনে নেয় এই হাসির মালিকের নাম শারমিন। পুরো নাম জানা হয় না। একসময় হয়তো পরিচয় হয়। আড্ডা হয়। ফোন নম্বর চালাচালিও হয়। তাও হয়তোবা সাব্বির পুরো নাম জানে না। একটা মানুষের পুরো নাম সম্ভবত ফর্ম পূরণ করা ছাড়া জীবনে তেমন কাজে লাগে না।

সবার হাসি শারমিনের মত স্নিগ্ধ হয়ে ঝুলে থাকে না। কারও হাসিতে খানিকটা ভয় ভয়ও লাগে, যেমনটা লাগে ইফতেখার আমিনের হাসিতে। সম্পর্কে সাব্বিরের মামা তিনি। বিসিএসের পর পুলিশে ঢোকার পর থেকে দিন দিন তার হাসি ভয়ংকর হয়ে উঠছে। তিনি নিজে একদিন আয়নায় পরখ করে দেখেছেন, তিনি হাসলে অনেকগুলো দাঁত বেড়িয়ে আসে। আর পুলিশের স্পেশাল ফোর্সের কর্মকর্তা ইফতেখার আমিনের দাঁতগুলো অত্যাধিক বড়।

শারমিনের সঙ্গে সাব্বিরের প্রেম হয় কি হয় না তা সাব্বির বোঝে না। তার মনে পরে যায়, কোন এক বর্ষার দুপুরে কালো মেঘ যখন ছেয়ে যাচ্ছে মাথার উপরে, তখন সাব্বির দেখতে পায় কম টাকায় বিক্রি হওয়া হাতের চুড়ি ফুটপাতের যেসব জায়গায় পাওয়া যায় তার পাশ দিয়ে শারমিনকে হেটে যেতে। সাব্বির খানিকটা অবাক হয়। কারণ শারমিন সিএনজি ছাড়া তেমন একটা চলাফেরা করে না। এজন্যই সাব্বিরের প্রতিটা সিএনজিতে মনে হয় চলে যাচ্ছে শারমিন।

সাব্বির অতি উৎসাহী হয়ে এগিয়ে যায়। শারমিন চমকে যায় না। খানিকটা স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সাব্বিরের কাছে ডান হাত বাড়িয়ে বলে, ‘তোমার কাছে পাঁচশো টাকা হবে’? সাব্বির চট করে ভেবে ফেলে টিউশনির টাকা থেকে পাঁচশো টাকা খসালে মাসের মাঝামাঝি সময়ে আবার ধার করার প্রয়োজন পরবে কিনা। সাব্বির যখন আধা চকচকে পাঁচশো টাকার একটি নোট এগিয়ে দেয় শারমিনের দিকে তখন শহরের অন্য প্রান্তে ইফতেখার আমিন সিএনজি থেকে নেমে পাঁচশো টাকার ভাংতির জন্য এদিক ওদিক তাকাতে থাকেন। তার কাছে মনে হয় সিএনজির মিটারে জ্বলজ্বল করতে থাকা তিনশো ত্রিশ টাকার বিল সম্ভবত সে কখনই মেটাতে পারবে না। যদিও তার হাতে রয়েছে পাঁচশো টাকার মুল্যবান নোট। তার মনে পরে, ছোটবেলায় পড়া মার্ক টোয়েনের সেই অদ্ভুত গল্পটি। যেখানে শহরের একজন পকেটে দশলক্ষ পাউন্ডের নোট নিয়ে ঘুরে বেড়ায় কিন্তু এক পয়সাও খরচ করতে পারে না। সঙ্গে সঙ্গে ইফতেখার আমিনের এও মনে পরে, তার লেখক হবার ইচ্ছা থাকলেও পরিবারের চাপে সেসব ছেড়ে মনযোগী হতে হয়েছে সরকারী চাকরিতে। এখন মাঝে মাঝে বই-গল্প এসবের কথা মনে হলেও বই আর পড়া হয় না।

ইফতেখার সাহেব আরেক সিএনজি চালকের কাছ থেকে ভাংতি করে ভাড়া চুকিয়ে যেই না সামনে হেটে যান ঠিক সেসময় তার মনে পরে সাব্বিরের কথা। বোনের ছেলে হওয়ায় খানিকটা খোঁজ খবর রাখতে হয় নিতান্তই অনিচ্ছায়। ভদ্রগোছের ছেলে হলেও সাব্বিরকে তার মনে ধরে না। চাঞ্চল্যতার বয়স পার করতে থাকা সাব্বিরকে তিনি দেখতে পান বেশ খানিকটা আলগোছে। এই বয়সে তিনি কী করতেন সে বিষয়ে স্মৃতি হাতড়ানোর পথ খুঁজে পান ইফতেখার। স্মৃতি হাতড়ানোর মত নেশা, অন্য কোন কিছুতেই নেই। যেন ঘুম গাঢ় থেকে গাঢ় হবার যে পথ, সেই পথের আনন্দ পাওয়া যায় স্মৃতির মধ্যে নিজেকে খুঁজে বেড়াতে। এই বয়সে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস না করে আর্ট-কালচার বোঝার যে ব্যর্থ চেষ্টা করতেন তা এই মুহুর্তে শহরের তীব্র রোদের আলোতে বেশ হালকা মনে হয়। তার কাছে মনে হয়, পুলিশের জীবনে সকাল-বিকাল অফিস করার প্রক্রিয়া হয়তো এরচেয়ে বেশি জটিল। কারণ এখানে মুলত কাজ বলে আসলে তেমন কিছু থাকে না। সবকিছু যেন স্বয়ংক্রিয় ভাবে চলতে থাকে আপনা আপনিই। কোন ঘটনা ঘটলে পুলিশের আর ইদানীং যেতে হয় না। ঘটনা যেন হেটে হেটে চলে আসে পুলিশের দরবারে। বেশ বড়সড় অভিযানগুলো র‍্যাব পরিচালনা করে এবং সেগুলো ক্রমান্বয়ে পিবিআই কিংবা ডিবির হাতে চলে যায়। মাঝেখানে পুলিশ হয়ে থাকে একটি মাধ্যম মাত্র। জাস্ট মিডিয়াম।

নিজেকে মিডিয়াম ভাবতে মোটেও খারাপ লাগে না তার। পৃথিবীতে যতজন অন্যের কিছুকে নিজের মধ্যে বহন করে মাধ্যম হয়েছেন তারা কিন্তু সম্মানিতই হয়েছেন। যেমনটা হয়েছিলেন জিবরাঈল। সৃষ্টিকর্তার কথাগুলো পৌছে দেয়ার জন্য তিনি ছিলেন একজন মাধ্যম মাত্র। কিন্তু প্রায় সব ধর্মমতেই তিনি হয়েছিলেন সম্মানিত। বনানীর একটা সরু রাস্তা দিয়ে ইফতেখার আমিন যখন নিজের সঙ্গে মাধ্যমের আধ্যাত্মিক এক সম্পর্ক নিয়ে ভেবে চলেছেন, ঠিক তখনই একটি তিনতলার ফ্ল্যাটে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন কেউ একজন। সুইসাইড নোট হিসেবে একটি হলুদ খামের উপর বড় বড় অক্ষরে লিখে রাখছেন তারিখ ও সময়। ইফতেখার আমিন যেমন জানেন না তিনি কে? তেমনি আত্মহত্যা করতে যাওয়া ব্যক্তিটিও জানেন না ইফতেখার আমিন কে? কিন্তু তারা খুব দ্রুত একসাথে হতে চলেছেন। হয়তো একটু পর। মাত্র ঘন্টাখানেক। অথবা আরেকটু বেশি।

সাব্বির ছুটে চলছে শহরের ভেতর একটি বিশেষ গন্তব্যে। উবারের একটি দুই চাকার যানে যখন সাব্বির চেপে বসে তখন তার দুনিয়া কেমন যেন অন্ধকার মনে হয়। খানিকটা কালো ধোঁয়া ছেড়ে দু’চাকার মোটর যান দ্রুত বেগে এগিয়ে যায় কিন্তু সাব্বিরের স্মৃতি এক জায়গায় স্থির হয়ে বসে থাকে।

২.

যে কোন যাত্রা নিয়েই খানিকটা দ্বিধাদ্বন্দ আছে। ধরুন এই মুহুর্তে ইফতেখার আমিন যে দুলকি চালে বনানীর গলি দিয়ে হেটে চলেছেন, তার গন্তব্য কিন্তু জানা আছে। কিন্তু তাও তার যাবার তেমন কোন তাড়া নেই। অথচ গন্তব্য জানা আছে সাব্বিরেরও, তবুও সে ছুটছে দ্রুত গতিতে। অর্থাৎ গন্তব্য জানা থাকলেও কেউ দ্রুত গতিতে ছোটে গন্তব্যের দিকে অথবা কেউ কেউ এগিয়ে যায় আস্তে ধীরে। এই ব্যাপারটা কিছুটা মৃত্যুর মত। জীবন যখন দেয়া হলো তখন গন্তব্য নির্ধারণ করে দেয়াই হয়েছে, মৃত্যু। কিন্তু কেউ কেউ ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগোতে গিয়ে শত বছর পার করে দেয়। আবার অনেকে তারুণ্যের ছোঁয়া নেবার আগেই গন্তব্যের দিকে ছুট লাগায়। কিন্তু এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়। কেউ কেউ তো যাত্রা শুরু আগেই গন্তব্যে পৌছে যায়। মাতৃগর্ভ থেকে বের হয়ে যাত্রা শুরু করার মুহুর্তে যদি কেউ গন্তব্যে পৌছেই যায় তবে তার পৃথিবীতে আসার প্রয়োজন কী? যিনি আমাদের গন্তব্যে পৌছে দেন, তার মনোভাব বোঝার সাধ্য পথিকের নেই। এক্ষেত্রে জাপানের লেখক হারুকি মুরাকামির দু’টো গল্পকে সামনে আনা যেতে পারে।

প্রথমটা গল্পটার নাম হলো ‘ইউএফও ইন কুশিরো’। গল্পের প্রধান চরিত্র কমুরা একদিন সকালে উঠে দেখতে পান তার স্ত্রী একটি চিরকুট রেখে চলে গেছেন। চিরকুটে স্পষ্টভাবে লিখে যান তার সঙ্গে সংসার করা সম্ভব নয়। প্রচন্ড মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থায় খানিকটা মনের শান্তির জন্য তিনি ভাবেন জাপানের অন্য আরেকটি শহর কুশিরোতে তিনি ঘুরতে যাবেন। পরিকল্পনার মাঝেই তার একজন সহকর্মী সাঁসাকি তাকে একটি ছোট্ট জিনিস নিয়ে সাঁসাকির বোনকে দিতে বলেন। মাত্র কয়েক ইঞ্চির ক্ষুদ্র চারকোনা অদ্ভুত এক বাক্স। যার ভেতরে কী আছে কমুরা জানেন না। তার জানার মত মানসিক কৌতুহলও থাকে না। এজন্য অবশ্য সাঁসাকি তার পুরো ভ্রমনের আসা যাওয়া সহ এক সপ্তাহের হোটেল ভাড়ার খরচ দিয়ে দেয়। কুশিরোতে গিয়ে সাঁসাকির বোনকে বাক্সটা দিতে গিয়ে ওর বোনের বন্ধু শিমাওর সঙ্গে বেশ ভালো সখ্যতা হয়ে যায় তার। হোটেলের একই রুমে তারা থাকতে শুরু করে। কিন্তু চারকোনা বাক্সতে তিনি কী নিয়ে এলেন, এটি দিয়ে কী হলো এসব কিছুই তিনি জানতে পারেন না। একদিন বিছানায় কমুরা তাকে প্রশ্ন করে বসে, তুমি কি বলতে পারো তোমার বন্ধুর বোন আসলে আমাকে দিয়ে বাক্সের মধ্যে কী পাঠিয়েছে? ‘ওটার মধ্যে এক দলা বাতাস’ বলে হেয়ালি করে শিমাও জানতে চায় আসলেই কি তুমি অনেক দূর থেকে এসেছো? কমুরার ইতিবাচক উত্তরের পর শিমাও এক বাক্য উত্তর দেয়, ‘খেয়াল করে দেখো, তুমি আসলে একদম শুরুতে আছো’।

তার মানে কি টোকিও থেকে কুশিরো যাবার যে বিশাল যাত্রা সেটার গন্তব্য আসলে এক? নাকি যেই গন্তব্যেই যাই না কেন তা আসলে একটি গন্তব্যকে ঘিরেই ঘুরপাক খাওয়া? গল্পটা যাত্রা কিংবা গন্তব্য সম্পর্কে বেশ বিভ্রান্তিকর ধারণা দেয়। দ্বিতীয় গল্পটা হলো ‘বার্থডে গার্ল’। এটা প্রত্যক্ষভাবে যাত্রা কিংবা গন্তব্য বিষয়ক নয়। তবে এর প্রাসঙ্গিকতা আছে। একটি রেঁস্তোরায় কাজ করা মেয়ের বিশতম জন্মদিনে খাবার দিতে গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় রেঁস্তোরাটির মালিকের সঙ্গে। জন্মদিন উপলক্ষে মালিক তাকে উপহারের জন্য কিছু চাইতে বলেন। খানিকটা ইচ্ছাপূরণ দৈত্যের মত তিনি যে কোন একটি ইচ্ছাই পূরণ করতে পারবেন। এবং তা ঘটে। পরবর্তীতে এই গল্পটি মেয়েটি যখন তার বন্ধুকে বলে, তখনও আমরা জানতে পারি না আসলে মেয়েটি জন্মদিনে কী চেয়েছিলো? সে কি আসলে সুখ চেয়েছিলো? কারণ আমরা তখন তাকে সাধারণ সুখী গৃহিনী হিসেবে দেখতে পাই। নাকি অন্য কিছু চেয়েছিলো? তবে সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে মেয়েটির চাওয়া ছিলো আসলে এরকম ‘আমি জীবনে কিছুই চাই না’। যেটি পূরণ করে দেয়া হয়েছে। বরাবরের মত এই গল্পটিও পরোক্ষাভবে কোন কিছু প্রাপ্তির যে যাত্রা বা গন্তব্য তা নিয়ে বেশ বিভ্রান্ততে ফেলে দেয়। এবং খানিকটা এরকম প্রশ্নও চলে আসে, গন্তব্য পর্যন্ত যাত্রাই কি সেখানে পৌছে যাওয়া? নাকি যাত্রা শুরু না করেও সেখানে পৌছে যাওয়া যায়? যেমনটা ইফতেখার আমিন যাত্রা শুরু না করেও একটু একটু করে এগিয়ে যাচ্ছে আত্মহত্যা করা একটি মেয়ের বাসার দিকে।

ততক্ষণে সাব্বির ছুটে যায় তার নিজের গন্তব্যে। উবারের ভাড়া মেটাতে গিয়ে সে দেখতে পায়, রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তায় ট্রাফিক জ্যামে পরার কারণে ভাড়া কিছুটা বেড়ে গেছে। মুঠোফোনের দিকে তাকিয়ে ভেবে নেয় কীভাবে এই বিল মেটানো যায়। তখন সে বিকাশের মত কোন একটি মোবাইল অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল ভাবে বিল পরিশোধ করে ফেলে। এতে করে বাড়তি ভাড়ার জন্য তার বড় কোন নোট ভাংতি করতে হয় না। সাব্বির উদভ্রান্তের মত ছুটে গিয়ে দেখে নিচে ছোটখাটো জটলা। বাড়িটির ঢোকার মুল দরজা বাইরে থেকে আটকে রাখায় কেউ ঢুকতে পারে না। অপেক্ষা করতে হয় পুলিশের। যেই অপেক্ষার অবসান করে খুব দ্রুত এখানে দেখা যাবে ইফতেখার আমিনকে। তিনি একটু পর নিজের দায়িত্ব পালন করতে এসে দেখবেন সাব্বিরকে। এবং বেশ অবাক হবেন যখন তিনি জানতে পারবেন, সাব্বির নিজে এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত। তখন তার আলগোছে সাব্বিরকে একটু অচেনা মনে হবে। আবার সাব্বিরের আসন্ন কিছু বিপদাপদ নিয়েও ইফতেখার খানিকটা ভেবে ফেলবেন। এবার ইফতেখার আমিনের এখানে পৌছাবার অপেক্ষা।

সন্ধ্যা নেমে আসে ধীরে ধীরে। পুলিশের দু’জন সদস্য খানিকটা দূরে গিয়ে সিগারেট ফুঁকতে থাকলেও কেউ এসে দরজা খোলার চেষ্টা করেন না। জনতা পুলিশের সামনে তালা খোলার কথা বললেও এই দুজনের সে বিষয়ে সম্ভবত কোন আগ্রহ নেই। তারা অপেক্ষা করে সিনিয়রদের। এই ভবনে কিছু ভিআইপির আত্মীয়রা থাকেন। তাই এখানে তদন্ত করতে আসবেন পুলিশের বড় কেউ। বাড়ির সামনের জটলা সমানুপাতিক হারে বাড়ে এবং কমে। সাব্বির তার স্মৃতির মত স্থির হয়ে থাকে সেখানেই। সামনের জটলায় কান পাতলে শোনা যায় ভেতরে ঘটা ঘটনার বিভিন্ন ধারণা। কেউ ভেবে বেড়ায় এখানে জোড়া খুন হয়েছে। আবার কেউ কেউ বেশ নিচু গলায় বলেন, খুন একটা হলেও খুনি এখনও বের হতে পারেননি। চিৎকার শুনেই নিচের দরজা আটকে দেয়া হয়েছে। চিৎকারের উৎস সম্পর্কে তাদের অজানা। মনে হয় অনন্তকাল পর একটি অলি গলি কাঁপিয়ে সাইরেন বাজিয়ে একটি পুলিশের গাড়ি বাসার সামনে এসে থামে। সাদা পোশাকে বের হয়ে আসেন বেশ কয়েকজন। পেছনে তাদের সঙ্গে থাকেন একজন উঁচু কর্মকর্তা। যিনি সেখানে সাব্বিরকে দেখে অবাক হয়ে গেলেন।

ভেতরে গমগম অবস্থা। মানুষের উঁকিঝুকি চলছে অনবরত। যতই উপরে উঠছেন তারা ততই মানুষের কথাবার্তা এবং পুলিশের বাঁশির আওয়াজের শব্দ কমে আসছে। একটি লিফটের ভেতর গাদাগাদি করে আছেন ইফতেখার আমিন, সাব্বির, এবং আরও তিনজন সাদা পোশাকের পুলিশ সদস্য। সিড়ি দিয়ে উঠছে আরও কয়েকজন। ভেতরের প্রতি ফ্ল্যাটের মানুষকে বেশ ভীত দেখাচ্ছে। শুধু একজন যিনি কিনা ব্যাচলর থাকেন তিন তলায়, তিনি এখনও জানেন না আদৌ এখানে কিছু ঘটেছে কিনা। সম্ভবত তিনি ফুল স্পিডে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে ঘুমুচ্ছিলেন। কারণ দরজার নক করার পর ঘুম চোখে ট্রাউজার ও খালি গায়ে তাকে দরজা খুলতে দেখা গিয়েছিলো।

লিফট পৌছে যাবার পর সবার পরে এগিয়ে গেলো সাব্বির। ইফতেখার আমিন চোখের ইশারা করে বললো ‘তুই ও আয়’। ভেতরেই ঢুকেই সাব্বির দেখতে পেলো ফ্যানের সঙ্গে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস দিয়ে ঝুলে আছে শারমিন। তার ঠোটের একপাশে লাল পিঁপড়া।

৩.

সুইসাইড!

মুখ খানিকটা প্রসারিত করে ইফতেখার আমিনের উদ্দেশ্যে বললেন একজন। দু’জন ততক্ষণে ধরাধরি করে নামিয়ে এনেছে লাশটিকে। বিছানায় লম্বালম্বি করে শোয়ানোর পর দেখা গেলো গলাভর্তি দাগ। মনে হচ্ছে যেন, গলাভর্তি দড়ি দিয়ে ফাঁস দিয়ে ঝুলিয়েছে কেউ। সেদিকে চোখ যায় সবার। কিন্তু আগের ভদ্রলোক আবারও বলে উঠেন, ‘ঝুলে যাবার পর সম্ভবত হাত দিয়ে খোলার চেষ্টা করেছিলো। এতে করে গলার অন্য জায়গাতেও ঘষা লেগেছে। কিন্তু খোলার মত এনার্জি হাতে ছিলো না’। সাব্বিরের দৃষ্টি চলে যায় মুখের দিকে। সেখানে কয়েকটা লাল পিঁপড়ার আনাগোনা।

স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ঘরের বিভিন্ন আসবাব পত্র অগোছালো করতে থাকে তারা। বাকরুদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে সেসব দেখে সাব্বির। তার চোখের সামনে ফ্লোরে পরে থাকে বেগুনী রঙের কামিজ। যা একদিন দুপুরে ঘামে লেপ্টে ছিলো শারমিনের গায়ে। কিন্তু তখনই পুলিশ সদস্যদের মধ্যে চাঞ্চল্যতা দেখা দেয়। টেবিলে পাওয়া যায় ‘সুইসাইড নোট’ নামের একটি হলুদ খাম। উপরে ‘সুইসাইড নোট’ দুটো শব্দ ছাড়াও আজকের তারিখের নাম লেখা। অন্য ঘর থেকে ছুটে আসেন ইফতেখার কোন একটি অনিশ্চিত কিছুর আশায়। অন্যরা খামটি এগিয়ে দেয় বড় কর্মকর্তার দিকে। হলুদ খামের উপর বলপয়েন্টের কালিয়ে ইংরেজি অক্ষরে সুইসাইড নোট লেখাটি দেখেন তিনি। নিচে ছোট অক্ষরে আজকের দিনের তারিখ।

চরম চাঞ্চল্যকর মুহুর্তকে দীর্ঘায়িত না করতে তিনি খামটি খুলে সজোরে ঝাঁকি দেন। নিচে বাম হাতের উপর এসে পরে অন্য একটা কিছু।

খাম থেকে বেরিয়ে আসে একটা পাঁচশো টাকার নোট। আধা চকচকে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন