মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

কুলদা রায়ের ধারাবাহিক উপন্যাস : কাননবালার শেষ মুজরো অথবা পিপ্পলকুমারীবালা--পর্ব ১-২




বিজয় সিকদার পর্ব:

১.

ঘাট থেকে ইস্টিমার চলে গেছে। আজ বিজয়বাবু নামেননি। বজরার মাঝি হাতেম মোল্লা একটু উদ্বিঘ্ন হয়ে রাজেন সরকারের দিকে তাকাল। রাজেন সরকার বিজয়বাবুর ম্যানেজার। আজ বিকেলে নিলক্ষ্যার বিলের ডাক আছে। বাবু উপিস্থিত না থাকলে ডাক পণ্ড হবে। গেলবার ডাক পেতে ঝামেলা হয়েছে। প্রায় ভিন গাঁয়ের পেলা মুন্সি বিলটি ডেকে নিয়েই গিয়েছিল। অনেক কান্নাকাটি করে বিজয়বাবুর মন গলাতে পেরেছিল। এবারে কান্নাকাটির বদলে লাঠালাঠির আশঙ্কা আছে। ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি চলছে।

সকাল থেকেই শহরে দুদলের মহড়া শুরু হয়েছে। দুদলেরই কাড়া নাকাড়া বাজছে। লাল ফেট্টি বাঁধা লেঠেলরা তেল চকচকে লাঠি নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় চক্কর দিচ্ছে। দুদলের মুখোমুখো হচ্ছে না। ডাকের সময় হলেই তারা বিজয়বাবুর বাড়ির সামনে অবস্থান নেবে। শোনা গেছে পেলা মুন্সি এবারে দুটো বন্দুক ভাড়া করেছে। হাতেম মাঝিদের বন্দুক নাই। তবে চকচকে রামদা আছে। গুলির আগেই ঘাড় থেকে তার লোকজন মাথা নামিয়ে ফেলতে পারবে। থানার দারোগা সাহেব বেশ কয়েকবার ঘুরে গেছে। বলেছে, ঝামেলা হলেই দেরি করবে না। গুলি করে লাশ ফেলে দেবে। এখন ভরসা বিজয়বাবু। তিনিই এসব ঝামেলে বিনা রক্তপাতে থামাতে পারেন। তিনি না আসায় রক্তপাতের আশঙ্কা বেড়ে গেছে।

ম্যানেজার রা. জেন সরকারের এ নিয়ে কোনো উদ্বেগ নেই। তিনি ঘনঘন পান খাচ্ছেন। চোখ বুঝে আর ঘন ঘন মাথা নাড়ছেন। হাতেম মাঝি উদ্বেগ সইতে না পেরে রাজেন সরকারের দিকে ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞেস করল, এখন কী হইবে?

রাজেন সরকার একটু হেসে জবাব দিলেন, ঘাবড়াইও মেয়া। বিজয়বাবু আইবেন।

-- কিন্তু কোলকাতা থেকে আজ তো আর কোনো স্টিমার নাই। বাবু আইবেন ক্যামনে!!

--আইবেন আইবেন। স্টিমার নাই তো বজরায় আইবেন।

--বজরা শুনে হাতেম মাঝির উদ্বেগ আরো বেড়ে গেল। সেতো তিন দিনের ফেরা।

--এ বজরা সে বজরা না। এটা হইল কার্জন সাহেবের বজরা। ভটভটি ইঞ্জিন লাগানো আছে। বাতাসের বেগে চলে। স্টিমারের আগে ধায়। ডাকের সময় আইসা পড়বে।

বেলা তিনটায় ডাক। বিজয় বাবুর বাড়ির সামনে দুদলে অবস্থান নিয়েছে। আর আর সবাই ঘাটের দিকে চেয়ে আছে। পুলিশ নিয়ে মেজো দারোগা বারান্দায় বসে আছেন। ঠিক তিনটায় ঘাটে একটা বজরা ভিড়ল। তার মধ্য থেকে বিজয়বাবু নয়-- বহুদিন পরে নেমেছে পেল্লাদ ঢেড়াদার। আজ তার বিচিত্র সাজ। পরেছে রঙিন ঘাগরা। মাথালে ময়ূর পুচ্ছ লাগানো। ঘাড় বেয়ে কাঁধ অব্দি চুল।

ঘাট থেকেই ঢোল ডগর বাজাতে বাজাতে এলো। কোমর দুলিয়ে গাইতে থাকল--

আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না।
চুল ভিজাবনা আমি বেণী ভিজাব না।

হাতেম মাঝি ছুটে গিয়ে পেল্লাদের কানের মুখ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, হ্যারে বাবুমশাই কই?

-- গানের তাল ঠিক রেখে পেল্লাদ জবাব দিল, আছে আছে, আমার ব্যাগের মইদ্যে।

--ব্যাগের মইদ্যে।

-- ম্যাজিক কইরা রাখছি। গান শ্যাষে বাইর কররা দেবো।

বলে আবার ঢোলে জোরে বাড়ি দিয়ে গেয়ে উঠল--
জলে নামব জল ছড়াব জল তো ছোবনা,
এধার ওধার সাঁতার পাথার করি আনাগোনা,
জলে ডুবব আমি কারো কথা শুনব না।

হাতেম মাঝি বিশ্বাস করতে পারছে না। বিজয়বাবু ব্যাগের মধ্যে থাকে কী করে! গাজাখুরি কথা।

ঢোলের বাদ্যি ঠিক রেখে পেল্লাদ তার ব্যাগে হাত দিল। সেখান থেকে হাত বের করে আনল। আর তার সঙ্গে উছলে পড়ল ঝরনার মতো জল। সেই জলধারা দেখতে দেখতে সবার সামনে নদীর মতো বইতে লাগল। আবার হাত দিয়ে বের করে আনল ছোটো সোনালী রঙের একটা বজরা। সেই বজরাটি নদীর উপরে রাখল। তার রয়েছে একটি পাল। পালে বাতাস লাগলেই বজরাটি দুলে দুলে চলতে লাগল। দেখে সবার তাক লেগে গেল। তাদের দিকে তাকিয়ে ****jujuপেল্লাদ আবার গানে ফিরল--

ভোগ লাগাব ভুখে মরব না (সজনী গো)
আমি রাধিব বাড়িব ব্যঞ্জন বাটিব
তবু আমি হাড়ি ছোবনা।

গান থেমেছে। কিন্তু বাজনা আছে। হাতেম মাঝিকে উস্খুস করতে দেখে এবার বলল, আছে। আছে। এবার ছইয়ের ভেতর থেকে বিজয় বাবুকে আনছি। চাইয়া দেখেন।

পেল্লাদ কিছু তুকতাক জানে। মাঝখানে কুছুদিন কামরূপ কামাখ্যা ঘুরে এসেছে। কামরূপ কামাখ্যার মানুষ বাঘরে বিড়াল বানাতে পারে। বিড়ালরে ইঁদুর। আর মানুষরে ভেড়া-- ইচ্ছা হলে কাঠপুতুল। পেল্লাদের এই ম্যাজিক দেখে তাকে আর হেলা করা যাচ্ছে না। তারও বেশ এলেম হতে পারে।

পেল্লাদ এবারে আরেকটু চড়া সুরে গেয়ে উঠল--

গোঁসাই রসরাজে বলে (নাগরী লো) শোনলো নাগরী,
রূপের যাই বলিহারি,
আমি হবোনা সতী না হবো অসতী
তবু আমি পতি ছাড়বো না।

এই গানের মাঝে বজরার বন্ধ দরোজাটি খুলে গেল। তার ভেতর থেকে বিজয় বাবু নয়। বেরিয়ে এসেছে একটি রমনী সুন্দর। পেল্লাদের গানের সঙ্গে তাল রেখে নেচে চলেছে।

গান শেষ হতে হতে এই ছোট্ট বজরাটি পাল সমেত ধীরে ধীরর হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল সেই নদীটি আর রমনী সুন্দরও। দেখে সবাই হৈ রৈ করে উঠলেও হাতেম মাঝি আঁতকে উঠল। তা দেখে পেল্লা ঢেড়াদার বলল, ডরো মাৎ। এইবার বিজয়বাবুকে বের করছি। বলে ব্যাগের ভেতর থেকে হাত ঢুকিয়ে বের করল-- বিজয়বাবু নয়। একটা ছাওয়া কাগজ। চোখের সামনে ধরে পড়তে শুরু করল--

‘'অত্র এলাকার সর্বসাধারণের জ্ঞাতার্থে জানানো যাইতেছে যে, কল্য রজনীতে কলিকাতার বাগবাজার সংলগ্ন টুনিবাবুর বাগানবাড়িতে নটসম্রাজ্ঞী কাননবালা দেবীর মুজরো হইবে। তা উপভোগ করিবার উদ্দেশ্যে সপ্তদিবস আগে বাবু বিজয়কৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায় স্টিমারযোগ রওনা হইয়াছেন। মুজরো শেষ করিয়া বিজয়বাবু দেশবাটিতে ফিরিবেন।’’

পেল্লাদ ঢেরাদার গান শেষে আর দাঁড়াবে না। তাকে এখন রঘুনাথপুর যেতে হবে। হাতেম মোল্লা এবার তার সামনে এসে দাড়াল। মরিয়া হয়ে শুধালো, তাইলে বিল ডাকের কী হইবে?

--বিল ডাক তো হইয়া গেছে। পেলা মোল্লা পাইছে।

--সেকি?

--সে আর কি নাইরে ভাই। দারোগা সাবে জানে। যদি কোনো আপত্তি থাকে তোমাদের, তাইলে বিজয়বাবু আসলে কইয়ো। তিনি ব্যবস্থা নেবেন।

পেল্লাদ ঢেড়াদার ততক্ষণে চলে গেছে। দারোগা সাব উঠে পড়েছেন। উত্তর পাড়ায় একটা ঝামেলা হয়েছে। তার আর দাঁড়াবার সময় নেই। হাতের কাঠিটি তিনি শক্ত করে ধরলেন। তিনি হন হন করে বেরিয়ে গেলেন। তাকে ধরা গেল না।

মোজাম মাঝির লোকজন কী করবে বুঝতে পারছে না। তারা বাজনা থামিয়ে আছে। লাগলে লাঠি নিয়ে ঝাপিয়ে পড়বে। কিন্তু পেলা মুন্সির লোকজন ডাকের এখানে আসেইনি। কোনো এক ফাঁকে তারা শহর ছেড়ে চলে গেছে। আর পেলা মুন্সি নিজেও আসেনি। এখন বিজয় বাবুর সাক্ষাৎ ছাড়া উপায় নেই। সে পর্যন্ত সবাইকে দাঁতে দাঁত চেপে অপেক্ষা করতে হবে।

গজগজ দেখে রাজেন সরকার বললেন, বিজয়বাবু ঠিক ঠিক রওনা করেছিলেন। তার গাড়ি যখন গড়েরমাঠ পার হয়ে এসেছে, ঠিক তখনি বড়ো বাজার থেকে খবর এলো, কাননবালা তার জন্য মাহফিল খুলে অপেক্ষা করছে। বাবু গেলেই মুজরো গাইবে। না গেলে গঙ্গায় আত্মঘাতি হবে।

--কানলবালা কেডা? একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল হাতেম মোল্লা।

-- সাক্ষাৎ ম্যানোকা।

ম্যানোকা শব্দটা হাতেম মোল্লা বুঝল না। বোঝার দরকার নেই। সে হা করে শুনল, রাজেন সরকার বলছেন, কাননবালা টকিতে এক্টো করে। আর ঝনক ঝনক পায়লা বলে নেত্তো করে। গান করে। রাজাগজা ছাড়া তার দেখা মেলা ভার।

ম্যানোকাকে কোনো দরকার নেই হাতেম মাঝির। বংশপরম্পরায় তারা বিলে মাছ ধরে আসছে। এটাই তাদের পেশা। পেলা মুন্সির রাহি কারবার আছে। তাদের কেউ মাছ ধরে না। নানা ঝামেলা সৃষ্টি করে দেবে। শেষে পরিবার নিয়ে না খাওয়া বাধবে। যে করেই হোক বিজয় বাবুই তাদের বাঁচন মরণ।

দিন তিনেকের মধ্যে বিজয়বাবু এসে পড়েছেন। পায়ে কোলপুরি চটি। আর জরিদার ফিনফিনে রেশমি পাঞ্জাবি। বোতামে সোনার চেন ঝুলছে। কাঁধ থেকে ঝুলছে ঘিয়ে রঙের কাশ্মিরীশাল। তিনি ঘাট থেকে হেটে বাড়িতে উঠেছেন ভোর ভোর। পুরো সাতদিনই সেপথে ফরাসী সৌরভ ভেসে বেড়াচ্ছে। মুখে মিটি মিটি হাসি। চোখ দেখে বোঝার উওয়ায় নেই, তিনি এ জগতে আছেন, নাকি ইডেন গার্ডেনে হেঁটে বেড়াচ্ছেন। শোনা গেল, তিনি খাস কামরায় যাননি। বৌরানীকে বলে দিয়েছেন, তিনদিন এ বাড়িতে থাকলেও সহবাস করবেন না। এ কদিন তিনি যে পরমানন্দ পেয়েছেন তাকে আরো কিছুদিন তারিয়ে তারিয়ে অনুভব করে নিতে চান মাত্র। মাঝে মাঝে টাকিলা নামের বিশেষ মদ পান করছেন।

ম্যানেজার রাজেন সরকার শশব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। বাবুর কাছে কাউকে ভিড়তে দিচ্ছেন না। তার ইচ্ছে বাবু আরো কিছুকাল কাননবালায় মজে থাকুক।

এ উপলক্ষে বরিশাল থেকে নট্ট কম্পানীকে হায়ার করা হলো। তারা রাতে ডেলাইট বেঁধে ভক্ত প্রহ্লাদ পালাটি করবে। স্থানীয় টাউন মাঠে ম্যারাপ টানানো হলো। উলপুরের চৌধুরী বাবুরা এলেন। গৌরনদীর জমিদাররা আসবেন হাতির পিঠে চড়ে। নড়াইলের রায় বাহাদূররা বজরায় রওনা হয়েছেন বেলাবেলি। তার আগে মাগুরার ওয়াটসন সায়েব আসতে পারেন বলে জানা গেছে। শোনা গেল কাননবালাকে আনার যারপরনাই চেষ্টা করা হচ্ছে। নট্ট কম্পানির সঙ্গে ভক্ত প্রহ্লাদের চরিত্রটি তিনি করবেন। গানগুলো গেয়ে শোনাবেন।

মাইফেলের দিনে এলাকার লোক নৌকায় করে দূর দূরান্ত থেকে এলো। ছোট্ট শহরটি গম গম করতে লাগল। দুপুর থেকেই বিশিষ্ট কবিয়াল বিজয় সরকার কবিগান গেয়ে আসর জমিয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে হাতেম মোল্লা এসেছে। তার ইচ্ছে, আজ বিজয়বাবুর সঙ্গে তার দেখা হবে। বিল ডাকের ব্যাপারটি মিমাংসা করে নেবে। বিজয় সরকারের গানের সময়ে বিজয়বাবু

থাকতে পারেন না। এটা নমোশুদ্রদের জন্য আয়োজন। তিনি এলেন সন্ধ্যায়। ঠিক সন্ধায় নয়। গোধূলী লগ্নে। সঙ্গে এ এলাকার বিশিষ্ট জমিদারবাবুরা। তারা আসর গরম করে এসেছেন। গোধূলী লগ্নের অদ্ভুত আলো পড়ে বাবুদের মুখ চকচক করতে লেগেছে। এর মধ্যে কে একজন ছোটোখাটো সোনার মুকুট নিয়ে এসেছে। বাবুর মাথায় আটে না বলে পেছন থেকে একজন সেটাকে ক্লিপ দিয়ে দিয়ে আটকে দিয়েছে। দেখে একজন গ্রাম্যবালা মুচকি হেসে তার সখিকে বলল, ওমা, বাবুরে একদম বিয়াবাড়ির কইন্যা কইন্যা লাগতিছে। চোখে একটু কাজল টাইন্যা দেওন বাকি। বলে তার ছোট্ট খতির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কাজলদানি খুঁজতে লাগল।

হাতেম মোল্লা আসরের কাছে যাওয়ার চেষ্টা করল। সেখানে পিচকারি দিয়ে গোলাপ জল ছিটানো হচ্ছে। রাজেনবাবু হাতেম মোল্লাকে হাকিয়ে দিলেন। মাছের গন্ধ বাবুর সহ্য হয় না। বললেন, এইখানে কী? গঙ্গাজলে চান করে গদিঘরে দেখা যাইস। বাবু থাকলে দেখা হবে।

কিন্তু বাবু কি থাকবে গদি ঘরে? সে সম্ভাবনা অতি ক্ষীণ। হাতেম মোল্লা মাথা শূন্য শূন্য লাগে। বিলের ডাক না পেলে তার মতো জন্ম মাছামারাদের বাঁচনের উপায় নেই।

ম্যানোকা কি লক্ষ্মী সরস্বতী তিনি যে-ই হোন না কেনো লোকজন কাননবালার জন্য উসখুস করছিল। গাঁয়ে গঞ্জে দেবীটেবীর দেখা মেলে না। তাকে দেখেই আজ আশ মেটাবে। এই সুযোগ ছাড়া ঠিক হবে না বলে বালবাচ্চা আর দারাপরিবার নিয়ে সবাই এসেছে।

কিন্তু কাললবালার দেখা এতোক্ষণে মেলে না। যারা একটু বেশি চালাক চতুর, তারা নানা কায়দায় বাবুর বাড়ির চারিদিকে উঁকিঝুঁকিও দিল। নফর নোকরদের শুধালোও। রান্না ঘর থেকে কোলকাতা কি উড়িষ্যা থেকে থেকে আসা বাবুর্চি তাদের সামনে এক প্যাকেট টেন্ডু পাতার বিড়ি ছুড়ে দিল। তার গায়ে লেখা, কাননবালা বিড়ি।

বাবুর্চি একটা বিড়ি ধরিয়ে ফুস ফুস করে ধোঁয়া ছাড়ল। সেই ধোয়া ছেড়ে বলল, কাননবালা আইবে না ক্যান। তুফানমেলের লাহান আইসা পড়বে। চতুরলোকজন কী বুঝল কি বুঝল না সেটা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা করল না। বাবুর্চির হাত থেকে কাননবালা বিড়ি নিয়ে ফসফস করে টানতে লাগল। দেখে বাবুর্চি মুচকি মুচকি হেসে শুধায়, কাননবালারে লাগতিছে কেমন?

একজন লম্বা টান দিয়ে বলে, তোফা। গাজার লাহান।

এই বিড়ির অনুষ্ঠানে উপস্থিত সকলেরই হাতে পৌছে গেল। মাগনা বিড়ি পেয়ে সবাই সুখটান দিতে লাগল। সে ধোয়ায় ভরে গেল সারা আসর। যারা একটু এলেমদার যারা তারা কালকিতে বিড়ির মাল খুলে ভোম ভোলা বলে টান দিল। হাতেম মোল্লা এর কিছু না টানলেও বুঝতে পারল, সে আর ইহ জগতে নেই। উর্ধমার্গে ছুটে চলেছে।

ততক্ষণে আসরের মধ্যে কে একজন চেঁচিয়ে উঠিল, কাননবালা, কাননবালা গো, তুমি দেরি করতিছো ক্যান। এটা শুনে চারিদিকে প্রথমে ফিস ফিস, তারপরে ঘিস ঘিস সব শেষে রৈ রৈ করে সবার গলায় কাননবালার নামটি উচ্চারিত হতে লাগল। এর মধ্যে সহসা ভটভট করে হয়ে উঠতেই সবার গলা থমকে গেল। এই রকম শব্দ এর আগে এরা শোনেনি। আতঙ্কে তারা কি করবে বুঝে উঠতে না উঠতেই একটা আলোর ছটা এসে পড়ল মঞ্চের বাদিকে। সেখানে একটা সাদা পর্দা টানানো আছে। সেই পর্দায় কে একজন নারী নড়ে নড়ে উঠল। আর ভটভট শব্দকে থামিয়ে সেই নারীটি গেয়ে উঠল--

আমি বনফুল গো ।
আমি বনফুল গো
ছন্দে ছন্দে দুলি আনন্দে ।

বাসন্তিকার সঙ্গে আমি (২)
মালিকার ও দুল গো। (২)

এই গান আগে তারা শোনেনি। এই নারীকেও তারা দেখেনি। কে একজন বলে উঠল, কাননবালা। কাননবালা দেবি আইসা পড়ছে। চিন্তা নাই।

কাননবালার পরনে আটপৌড়ে শাড়ি। ঘটি হাতার ব্লাউজ। হালকা খোপায় বনফুলের মালা জড়ানো। হাতে চামরের মতো এক গুচ্ছ পাতা সহ ছোট্ট ডাল। তাম্বুল রসে ঠোঁট লাল। বনের মধ্যে হেঁটে হেঁটে গানটি গাইছে হাসি হাসি মুখ। এই মুখ দেখে প্রাণ উড়ে যায়।

গানটি গাইতে গাইতে সেই নারী বা কাননবালা যেই হোন না কেন তিনি হাওয়ার উপর টানা পর্দার ভেতর থেকে মাটিতে নেমে এলেন। নেমে এসে সোজা মঞ্চের দিকে হেঁটে গেলেন। বিজয়বাবু তখন আলবোলায় গোলাপী তামাকু টানছিলেন। তার কাছে গিয়ে হালকা খোপা থেকে বেনি ফুলের মালাটি খুলে কাননবালা বাবুর গলায় পরিয়ে দিলেন। তারপর বাবুকে ঘিরে ঘিরে গাইতে লাগলেন--

বনের পরী আমার সনে
খেলতে আসে কুঞ্জবনে,
ফুল ফোটানো গান গেয়ে যায়
পাপিয়া বুলবুল গো।

এই গানের সুর ভাষা ও ছন্দ এতো মধুর ও সহজ বলে উপস্থিত লোকজন সবাই গাইতে শুরু করল। গাইতে গাইতে তারা নাচতেও লাগল। তাদের নাচের মধ্যে মাতম এসে পড়ল। সে মাতম যখন তুঙ্গে উঠল তখন লোকজনের হুশজ্ঞান লোপ পেল। স্টেজ থেকে কাননবালা উঠে এসে নাচতে নাচতে লোকজনের ভেতর চলে এলো। দুজন লোক তখন তাকে অনুসরন করছিল। একজন হাতেম মোল্লা। সে বুঝতে পেরেছে এ জগতে এই কাননবালাই পারে বাবুকে রাজি করাতে। তিনি বললেই বাবু না করতে পারবেন না। রাজেন সরকারও বাবুর জানে তুক দিলেও কাজ হবে না। কাননবালা বললে বিলের ডাক তাদের নামে হয়ে যাবে চিরজন্মের জন্য। চাইলে নিস্করও হতে পারে।

ভিড় ঠেলে কাননবালার কাছে পৌছানো সহজ নয়। লোকজন উন্মাদের মতো গায়ে গায়ে লাগিয়ে গানটি গাইছে। কোনো ফাঁক পাওয়া মুশকিল। কাননবালা অতি সহজে চলছে। বাইরের দিকে। কোথাও বাঁধ পাচ্ছে বা। কুয়াশার মতো তার শরীর। কোনোভাবে হেটে তার কাছে যেতে পারছে না বলে হামাগুড়ি দিয়ে যেতে চাইল। উন্মাদপ্রায় মানুষগুলো কেউ বুঝতেও পারল না। তাকে আর উঠতেও দেখা গেল না।

আরেকজন লোক এই ভিড়ভাট্টার মধ্যে না গিয়ে আসরের কাছাকাছি একটি বটগাছে চড়ে বসেছে। সেখান থেকে কাননবালার গতিবিধি লক্ষ্য করছে। দেখতে পেয়েছে, বিজয়বাবু কাননবালার মালা গলায় দিয়ে রাজাধিরাজের মতো দাঁড়িয়ে আছে। তাকে ঘিরে এলাকার সম্ভ্রান্ত জমিদারগণ পুষ্প বর্ষণ করছেন। আর মাগুরার ওয়াটসন সাহেব একটা উত্তরীয় তাঁর গায়ে পরিয়ে দিয়েছেন। সেখানে লেখা কাননাধিপতি।

কাননবালা সাদা হাসের মতো ভাসতে ভাসতে আসর ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তার পেছনে হামাগুড়ি দিয়ে একজন লোক বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন। কাননবালা যখন আলোর মতো হাওয়ার মতো উবে যাচ্ছেন ঠিক তখন লোকটি মরিয়া হয়ে কাননবালার কাছে আসতে চাইছে। যখন এলো তখন কাননবালা মিলিয়ে গেছেন। তাকে আর দেখা গেল না। লোকটির মাথা মাটিতে ঠুন করে পড়ে গেল। তার হাতে কাননবালার পরিহিত শাড়ির আঁচলের এক টুকরো ছিড়ে রয়েছে। আর উন্মাদ লোকজন তার উপর দিয়ে নাচতে নাচতে গাইতে গাইতে চলে এলো।

দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকায় নিম্নোক্ত খবর ছাপা হয়েছিল--

ফরিদপুর জেলাধীন রাজগঞ্জ থানায় টকি শোর আয়োজন করিয়া স্থানীয় জমিদার শ্রী বিজয়কুমার সরকার মহাশয় অযুত প্রশংসা প্রাপ্ত হইয়াছেন। ইতিপূর্বে অত্র এলাকায় কেহ টকি বিষয়টির সহিত পরিচিত ছিল না। কাননবালা অভিনীত শেষ উত্তর বইটির একটি অংশ প্রদর্শন করা হয়। তাহা দেখিয়া ঐ অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিপুল সাড়া পড়িয়া যায়। ভীড়ভাট্টায় এবং আনন্দের আতিশয্যে হাতেম মোল্লা নাম্নী একজন মৎসজীবী হৃদযন্ত্র বিকল হইয়া মৃত্যু বরণ করিয়াছে। উপস্থিত জমিদার ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ টকির আয়োজক শ্রীবিজয় সরকারকে রায়বাহাদুর উপাধী দেওয়ার নিমিত্তে ইংরাজ সরকারের নিকট আবেদন করিয়াছেন।



২.

এই ঘটনার পরে বিজয়বাবুর নামের আগে কাননাধিপতি পদবী যুক্ত হয়ে গেল। আর নিচুপাড়ার নমোশুদ্র বাড়ির বউ বিমলবালা অবাক হয়ে দেখল, তার উনি রাত্রে ঘরে না এসে আসেননি। সাধারণত এরকম হয় না। তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরেন। ফিরে তার আঁচল দিয়ে মুখ মোছেন। কাছে আসেন না। দূর থেকে গলা নামিয়ে একটি কৃষ্ণগীত করেন।

দরোজাটা খোলা। সেদিক দিয়ে বিমলাবালা দেখতে পেল, বাইরে পেঁপে গাছটার নিচে মাথা নিচু করে বসে আছেন বিধু। দেখে তার বুক তড়াস করে উঠল। সে ঘর থেকে ছুটে এসে বিধুবাবুর গায়ে হাত দিল। অবাক হয়ে দেখতে পেল, বিধুবাবুর চোখে জল টলমল করছে। ফুলে ফুলে কাঁদছে। বলল, কী হইছে আপনার?

বিধুবাবু তার সঙ্গে কথা বলে না। এই প্রশ্নের উত্তরও পাওয়া যাবে না। মাথা নিচু করে তার সঙ্গে ঘরে চলে এলো। এসে খাটে শুয়ে পড়ল।

বিধু বিমলাবালার সঙ্গে ঘুমোন না। এটা নিয়ে আগে থাকলেও এখন কোনো খেদ নেই বিমলাবালার। তার দুটি ছেলে মেয়ে নিয়েই খুশি। কপালে থাকলে আবার তিনি আসবেন।

বিধুবাবু বাড়ির ছোটো ছেলে। দুই দাদার সংসারে আজ অব্দি কিছুই করেন না। তার গানের গলা ভালো। মাঝে মাঝে গান বাজনা করেন। চুনখোলার অনাদি সরকারের সঙ্গে তার খুব ভাব। মাঝে মাঝে সখ করে তার সঙ্গে কবিগানের আসরে দাঁড়ারে নিমাই গেয়ে আসেন। এ গানে বিধুবাবুর তুল্য গায়ন এ এলাকায় আর কারো নেই।

অনাদি সরকারের খুব ইচ্ছে বিধুবাবুকে নিয়ে কৃষ্ণপালার দল খুলবেন। কিন্তু কবিগানের বায়না গাইতে গাইতে সে আশা তার পূর্ণ হয় না। দুটো দল চালানো তারপক্ষে সম্ভব নয়। তবে তিনি প্রায়ই বিধুবাবুকে দল খুলতে মাঝে মাঝে উস্কানি দেন।

খুব ভোরবেলা বিমলাবালা উঠে আড়পাড়ার ফেলা পাগলার থানে হত্যে দিয়ে পড়ল। রাত্রি জাগরণের ক্ষণে আজ তার কলকের দম বেশি টানা হয়েছে। শিউলিগাছের গোড়ায় একটু ঝিম দিয়েছিলেন। মৃদু মন্ধ হাওয়া বইছে। অদূরে পুন্যি পুকুরে দুটো রাজহাস পাক পাক করছে। ফেলা পাগলা পায়ের গরম জলের ফোটার স্পর্শে চোখ খুললেন। রক্তজবার মতো টকটকে লাল চোখ। বলিলেন,কে রে বেটি?

বেটির তখন কথা কওনের পরিস্থিতি নেই। হু হু করে শুধু কেঁদে উঠল।

ফেলা পাগলা বুঝলেন কি বুঝলেন না, তা বোঝা গেল না। তিনি আবার চোখ বন্ধ করে শিউলি গাছের গোড়ায় মাথা ঠেকালেন। বললেন, যা, অরে কৃষ্ণপালা গাইতে ক। কোনো বাসনা অপূর্ণ থাকবে না।

হাতের বালা আর সোনার খুলে দিল বিমলামালা। তাতেও ঘাটতি পড়তে পারে ভেবে সে দাদাদের কাছে ধর্ণা দিল। দাদা তো নয়, সব চাষী মানুষ। প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড শরীর। হাইলাদের সঙ্গে যেমন মাঠে নেমে পড়ে, তেমনি লাগলে কাইজা ফ্যাসাদে এরা সাত ভাই দশাসই রামদা নিয়ে পড়ে। তাদের সামনে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। তাদের সামনে এই নম্রভাষী বোনটিকে দেখে তাদের প্রাণ কেঁদে উঠল। এ তাদের চম্পা বোন। গায়ের বর্ণ একটু শ্যামল শ্যামল। কখনো কিছু মুখ ফুটে চায়নি। বড়োই নিরবমতি। তাকে এ এলাকার সবচেয়ে সুদর্শন লোকটির সঙ্গেই বিয়ে দিয়েছিল। আজ তারা বুঝতে পারে, বোনটি মুখটি এতে ফুল্ল হয়নি। সে যেন মরমে মরে থাকে।

বলল, কী হয়েছে রে তোর?

বিমলাবালা বলল, কাননবালা…

অবাক হয়ে শুধালো, কে এই কাননবালা?

--জানি না গো দাদা। তবে….

--তবে কী রে?

মুখটা আরো নিচু করে বলল, শুনছি নাচগান করে। কোলকাতার বাইজি।

-- এত্তো বড়ো সাহস। হুঙ্কার দিয়ে সাত ভাই সাতটি লাঠি নিয়ে লাফ দিয়ে পড়ে। যেন এক্ষুণি ছুটে গিয়ে তার ভগ্নিপতির মাথা ফেলে দেবে।

দেখে বিমলাবালা সাত ভাইয়ের চরণের সামনে শুতে পড়ল। তাদের সে যেতে দেবে না। বিধবা হওয়ার চেয়ে সতীনের সঙ্গে ঘর করা ভালো।

ফলে কিছুদিনের মধ্যে কৃষ্ণপালার দল দাঁড়িয়ে গেল। নানা জায়গায় তারা সেই পালার বায়না হতে লাগল। বরিশালের মাধবপাশার জমিদারবাড়িতে তিনরাত পালা গাইতে হলো। সে পালা শুনে জমিদারের পক্ষাঘাতগ্রস্ত মা বহুদিন পরে কথা কয়ে উঠেছেন। বলেছেন, হা কৃষ্ণ। অনেক ডাক্তারি কবিরাজি হয়েছে। কোনো ফল হয়নি। জিহবা আড়ষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল। কথা বলতে পারতেন না। তিনি এখন কৃষ্ণকথা কইছেন। বাড়িতে একটা হিল্লোল বয়ে গেল।

জমিদার সতীন্দ্রনারায়ণ কৃষ্ণরূপী বিধুবাবুকে পালা শেষে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, বাবা, এ জীবন সার্থক করে দিলে। তারপর জনসমক্ষে ঘোষণা দিলেন,

বাবা, তুমি যা চাও তাই তোমাকে দিতে। বলো কী চাও আমার কাছে?

বিধুবাবু মুখ খোলেন না। চুপ করে থাকেন।

জমিদার বাবু তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমাদের জমিদারি পড়তির দিকে। তবু তোমার মনোস্কাম পুরণে যথাসাধ্য চেষ্টা করব।

বিধুবাবু তার পায়ের দিকে চোখ রেখে বললেন, আমার চাওয়ার কিছু নেই, শুধু--

--শুধু কী? ব্যাকুল হয়ে শুধালেন সতীন্দ্রনারায়ণ।

-- শুধু কাননবালা। কাননবালাকে চাই। আর কিছু নয়।

-- কোন কাননবালা?

-- কোলকাতার কাননবালা। টকিতে প্লে করে। আর মুজরো করে।

শুনে সতীন্দ্রনারায়ণ অবাক হয়ে গেলেন। এই যুবককে তার ব্যতিক্রমী মনে হয়েছিল। কাননবালাকে কামনা করে বসেছে। কাননবালা সিনেমায় অভিনয় করে বটে, কিন্তু তাকে পাওয়া সহজ নয়। অভিনয়ের বাইরে তিনি পুরোদস্তুর রাশভারী গিন্নীবান্নি।

ফলে এরপর এ বিষয়ে তেমন বিস্তারিত কিছু জানা যায় না। কেউ কেউ বলে, জমিদার তাকে বুঝিয়ে শুনিয়ে কিছু টাকা দিয়ে বিদায় করেছেন। কেউ কেউ বলেন, টাকাতে রাজী হয়নি বলে তাকে একটা সোনার মেডেল দিয়েছেন। সঙ্গে সিল্কের পাঞ্জাব, গিলে করা ধুতি, কোলাপুরি চটি। আর কাঁধে রাখার জন্য একখানা কাশ্মিরী শাল।

জমিদার সতীন্দ্রনারায়ণ রায়ের ম্যানেজার একটু খিটখিট করছিলেন। বলতে চেয়েছিলেন, এই নমোশুদ্দুরের পোলাকে জমিদারি পোশাক দিলে বাবুদের আর ইজ্জত থাকে না। তাছাড়া এই অসকালে জমিদারির অবস্থাও বিশেষ সুবিধের নয়। এইরকম খরচপাতি করলে চাপ পিড়ে যাবে।

শুনে, যতদূর জানা যায়, সতীন্দ্রনারায়ণ বলেছেন, দেশকালই বদলে যাচ্ছে। বৃটিশরাও চলে যাবো যাবো করছে। বাবুরা আর এই পূব দেশে থাকতে পারবে না। ফলে বাবুদের মান সম্মান নিয়ে চিন্তা করার আর সময় নেই। তাছাড়া এই সব পোষাক পরিচ্ছদ নতুন কেনা নয়। তার আলমারি থেকে এক সেট দিচ্ছেন। কোনো করিটিয়ার জমিদার পন্নি সাহেব তাকে উপহার দিয়েছিলেন। পরে দেখেননি। পরার বাসনার সুযোগও তার হবে না।

তবে কেউ কেউ বলে, সত্যনারায়ণ রায় কথা যখন দিয়েছেন, সেকথা উনি রক্ষাই করেছেন। বিধুবাবুকে নিজে কোলকাতায় নিয়ে গেছেন। কাননবালার কাছে তাকে পৌঁছে দিয়েছেন। নগদ এক লক্ষ টাকা খরচ করে মুজরোর আয়োজন করেছেন। নিজে অবশ্য সে মুজরোয় থাকেননি। কাননবালা মুজরোটি গেয়েছেন শুধু বিধুবাবুর জন্যই।

এসব শুনে এলাকার কিছু লোক একে উড়ো কথা মনে করে হো হো করে হেসেছে। বিজয়বাবুর ম্যানেজার ঠাট্টা করে বলেছেন, হু হু, কাননবালার কাছে গিয়েছিল বইকি। তবে ঠিক কাছে নয়। তার বাড়ির চৌহদ্দীর কাছে গিয়েছিল। কাননবালার বাড়ির দারোয়ান তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে ছুড়ে ফেলেছে গঙ্গায়। ব্যাটার নমুর আবার বাবু হবার সখ!!

এসব যা-ই হোক না কেনো বহুদিন পরে, মানিকদিয়ার ঘাটে ইস্টিমার থেকে কে একজন সিলকের পাঞ্জাবি, গিলেকরা ধুতি, কাঁধে কাশ্মিরী শাল আর কোলাপুরি চটি পরে নামলেন। চুলে টেরি কাটা। গলায় সোনার চেন। তাতে একটা লকেট ঝুলছে। লকেটে লেখা-- কাননবালা। হাতে একটা লাঠি থাকলে আরো মানানো। কিন্তু লাঠি নেই। কে একজন ঘাট কুলি অথবা চায়ের দোকানের কারিগর ছুটে এসে তার হাতে একটা হাতিমার্কা লাঠি দিয়ে বলল, এইটা নেন বাবু। এ লাঠি যে-সে নয়। এটা কোলকাতার মেয়র শেরে বাংলা ফজলুল হক সাবের লাঠি। সেবার কৃষক প্রজা পার্টির মিটিং করতে এসে ভুল করে ফেলে গেছেন। এ লাঠি দেখলে কোলকাতস্র পুলিশ হল্ট হয়ে যায়।

ঘাট থেকে সবাই সাধারণত টাবুরে নৌকায় ওঠে। সোজা পাঁচ মাইল গেলে পর এ শহরটি দেখা যায়। সে মোতাবেক একটি টাবুরে নৌকাও নব্যবাবুর কাছটিতে এসে দাঁড়ালো। মাঝি গদগদ হয়ে বলল, বিজয়বাবুগো বাড়ি যাবেন বুঝি। বাবুগো বজরা আসে নাই। খবর দিয়ে আসলে তারা নিশ্চয়ই বজরা পাঠাতেন। তাতে অসুবিধে নাই। মাঝি নিজের বজরাটি দেখিয়ে বললেন, এই বজরায় হর্টেজ সাবেও চড়ছেন। চাইলে, এই ঘাট থেকে বাবুর জন্য দুইটা বালিশও যোগাড় করা যাবে। তবে কিনা সেগুলো তাকিয়া বা পাশবালিশ হবে না। হবে সিথান বালিশ। তারপর গলা খাটো করে মাঝি আরো জানালো, বাবু যদি হাউস করেন, তবে দুএকজন জেনানাও পাওয়া যাবে। এ ঘাটে তারা আছে। তারা এ ঘাটের মেনোকা-রম্ভা।

নব্য বাবুটি টাবুরে নৌকায় উঠলেন না। তিনি ঘাট পেরিয়ে পথের দিকে গেলেন। একটা শেওড়া ডাল ভেঙ্গে নিয়ে দাঁতন করতে করতে ঠিক করলেন, তিনি হেঁটেই যাবেন।

খবরটা আগেই পৌঁছে গিয়েছিল। যে মাঝিটি সিথান বালিশের লোভ দেখিয়েছিল সেই দ্রুত দাঁড় টেনে এগিয়ে গেল। সঙ্গে নিয়েছিল তার ভাগিনাকে। সে খুব শক্ত সামর্থ্য। যারা এই ভোর ভোর ফুল তুলতে নেমেছিল, যারা সুবেহ সাদেকের নামাজ পড়বে বলে অজু করে ঘর থেকে বের হয়েছিল আর যারা ধান দাইতে যাবে বলে গামছায় পান্তামরিচ বেঁধে নিয়েছিল অথবা বাওড় থেকে মাছ অথবা শাক সবজি নিয়ে বাজারমুখো হয়েছিল তারা সবাই এই লগ্নে খবরটি পেল।

ভোর ভোর পাড়া মহল্লার লোকজন রাস্তায় নেমে এলো। বুড়োরা এলো। মধ্য বয়স্করাও এলো। যুবকরা একটু উঁচু হয়ে দেখার চেষ্টা করল, সেই নব্যবাবুটিকে দেখা যায় কিনা। এমনকি শিশুরাও বাপের কাঁধে উঠে ঢুলতে লাগল। সবে বিয়ে হয়েছে যে মেয়েটির সেও জানালা খুলে খুব সতর্কভাবে উঁকিঝুঁকি দিতে লাগল। কে একজন শ্বাশুড়িমাতা চুলা ধরাতে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, কে একটা ফল্লা দফনা আইবে, তার জন্যি রান্নাবান্না বন্ধ রাখতি হবে--এয়া আমাগো বাপের জন্মে শুনিনি। এটা শুনে ননদিনী মেয়েটি তাদের বউদিদি কি ভাবিজানকে রান্না ঘরে পাঠাবে বলে ছুটে এসেছে, সেটা ভুলে গিয়ে সেই ননদিনীও জানালার কাছে দাঁড়িয়ে গেল।

আর তক্ষুণি গোহাটার শিসপড়ি বটগাছ থেকে এক ঝাঁক পাখি পাখা ঝাপটে উড়ে গেল মধুমতির ঠোঁটায়। সেখান থেকে দীর্ঘকায় একজন মানুষ বেরিয়ে এলেন। পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি, চোস্ত পাজামা। পায়ে কোলাপুরি স্যান্ডেল। হাতে ছড়ি। মুখটা সামান্য গম্ভীর। ফাঁকে আধখানা ফুল্ল হাসি লুকিয়ে ফুটে আছে। মাথায় পাতার মুকুট। লোকটি এতো দীর্ঘকায় যে তিনি সবাইকে ছাড়িয়ে শহরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে গেলেন। বাকিরা মাথা উঁচু করে তাকে দেখতে লাগল। তিনি বটগাছের শীর্ষপাতা তার বুক ছুয়ে গেল। হেঁটে যেতে যেতে তিনি আকাশ স্পর্শ করলেন। শহরের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পরে তিনি ছায়ার মতো, হাওয়ার মতো মিলিয়ে গেলেন। খ্রিস্টান পাড়ার তিমথি সরকার মাটিতে পড়ে প্রণিপাত করলেন। বিড় বিড় করে বললেন, হে প্রভু যীশু, ত্রাতা আমার। তুমিই পথ, সত্য ও তুমিই জীবন। শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ননদিনী বউটিকে জড়িয়ে ধরে বলল, এই তিনি, আমার প্রাণেশ্বর। একে বিনা জেবন বৃথা। বউটি তার মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল, চুপ চুপ চুপ। উনি বিধুবাবু লাগেন। কাননবালার নাগর।

আর তক্ষুণি একটি লকেট আকাশ থেকে ঝপ করে পড়ল। সেই লকেট থেকে একটি গান ভেসে এলো--

বনের পরী আমার সনে
খেলতে আসে কুঞ্জবনে,
ফুল ফোটানো গান গেয়ে যায়
পাপিয়া বুলবুল গো--

আমি বনফুল গো, ছন্দে ছন্দে নাচি আনন্দে..।।

এই নব্যবাবুটি সত্যিকারে কোনো কোনো মানুষ না দিবাস্বপ্ন সেটা নিয়ে বিস্তর সন্দেহ করা গেলেও এ শহরের নিচুপাড়ার লোকজন বিশ্বাস করল-- ইনি আর কেউ হতে পারেন না। ইনি তাদের বিধুবাবু। কৃষ্ণ গোণে জন্মেছেন। কাননবালা তো কাননবালা, চাইলে ম্যানোকা রম্ভাও এসে হাজির হবে। এটা নিশ্চিত।

পরদিন শহরে রটে গেল, বিধুবাবু কোলকাতায় গিয়েছিলেন। বিশিষ্ট সিনেমা নায়িকা গায়িকা কাননবালা তার জন্য মুজরো গেয়েছেন। মুজরোর আসর হয়েছে কাননবালার বাড়িতে। মাধবপাশার জমিদার সত্যনারায়ণ রায় নিজে তাকে টমটম গাড়িতে করে সে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। পৌঁছে দিয়েই চলে এসেছেন। বিধুবাবু বাড়ির দরোজায় পৌঁছানো মাত্র কাননবালা নিজে তাকে হাত ধরে বাড়ির মধ্যে নিয়ে গেছেন। তক্ষুণিই দরোজা বন্ধ করে ফেলেছে। সে মুজরো সারারাত্রি চলেছে। মুজরো শেষে নিজের গলা থেকে একটি সোনার চেন পরিয়ে দিয়েছেন। চেনের সঙ্গে দিয়েছেন একটি লকেট। লেখা আছে কাননবালা।

এই খবরের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আছে। সেটা হলো, কাননবালা জীবনে আর কোনো মুজরো করেননি। বিধুবাবুর জন্যেই করা মুজরোটি তার পয়লা এবং আখেরি মুজরো। এ খবরটি এখন কোলকাতার বাতাসে উড়ে বেড়াচ্ছে।

নিচুপাড়ার নমোশুদ্ররা এই উপলক্ষ্যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে সারা শহরে মাতম তুলে দিল। এ শহরের একেমাত্র বড়ো বাবু বিজয় সিকদারের বাড়ির সামনে নেচেগেয়ে কাদামাটি করে ফেলল। সিকদার বাড়ির কেউ সারাদিন বাইরে বেরতে পারল না।

পরদিন বিজয়বাবুর ম্যানেজার থানায় কেস করলেন। সেখানে আর্জিতে লেখা হলো--

অত্র এলাকার নিচুপাড়াস্থ বিধুসুদন নামে এক নমোশুদ্র সম্প্রদায়ের লোক কোলকাতার বিশিষ্ট সিনেমার নায়িকা গায়িকা কাননবালার বাটিতে অবৈধপ্রবেশপূর্বক তাহার শ্লীলতাহানী করে। তাহাতে এই কাননবালা আত্মহত্যা করিতে গিয়াছিলেন। লালবাজার থানায় এ ব্যাপারে একটি মামলা দায়ের করা হইয়াছে। লালবাজার পুলিশ তাহাকে শিয়ালদহ জংশন হইতে পাকড়াও করিতে গেলে বিধুসূদন সুকৌশলে পলাইয়া যায়। অত্র এলাকায় অনুরূপ সমাজবিরোধী কার্যকলাপ করিতে পারে বলিয়া আশংকা রহিয়াছে। তাহাকে অনতিবলিম্বে আটকপূর্বক আইনের আওতায় আনিবার জন্য প্রার্থনা করিতেছি।

পুলিশ অতি তৎপরতার সঙ্গে সেদিন রাতে বিধুবাবুকে আটক করে থানায় নিয়ে এলো। তিনি তখন ঘুমে কাদা। সবে ফরিদপুরের অম্বিকাপুর থেকে পালা গেয়ে ফিরেছেন। প্রায় মাসখানেক তাদের সঙ্গে ছিলেন অম্বিকাপুরের বিশিষ্ট কবি জসিমউদ্দিন। কবি তার দলের জন্যএকটি নতুন পালা রচনা করেছেন। নাম সোজন বাদিয়ার ঘাট। তার একটি গানও প্রাণ ছুঁয়ে যায়। গানটি হলো, নিশিতে যাইও ফুলবনে। গানটিসহ পালা নিয়ে তারা শান্তি নিকেতনে পৌষমেলায় যাবেন ঠিক হয়েছে। পুলিশ সেটা আমলে নিল না। তারা বিধুবাবুর পালাগান বন্ধ করে দিল। আর কোলকাতার কাননবালাকে যৌন নির্যাতন করার অভিযোগে হাজতখানায় আটকে রাখল। তাকে জেলখানায় চালান করে দেওয়ার তোড়জোড় হলো। সে খবর পেয়ে তার স্ত্রী বিমলাবালা মূর্ছা গেল। সে মূর্ছা আর ভাঙেনি। এরপরে বিধুবাবুকে ছেড়ে দেওয়া হলেও তার নামটি দাগিয়ে দেওয়া হলো। মাঝে মাঝে থানায় তাকে হাজিরা দিতে হয়। তিনি মাথা নিচু করে আসেন। আবার মাথা নিচু করে ফিরে যান। কিছুদিন পরে দেশভাগ হয়ে গেলে এই হাজিরা থেকে রক্ষা পেলেন বটে। কিন্তু ফাইলটি জারি রয়ে গেল। থানায় নতুন কোনো অফিসার এলেই কাননবালার নির্যাতনকারী হিসেবে তার নামের ফাইলটি পড়া হয়। এভাবে ধীরে ধীরে লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলেন।

(চলমান...)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন