মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

শাহাব আহমেদ'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : পেরেস্ত্রোইকা, মস্কো ও মধু--পর্ব ২৫-২৯



২৫ তম পর্ব

"শুভ্রা সন্নাসিনী", একটি অপরূপা অর্কিড।
 
গুয়াতেমালার জাতীয় ফুল। নাস্তিয়া এমন একটি ফুলের মত, প্লেনে বসে অভ্রের তাই মনে হয়েছে। ওর কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে সে। ওর চুলের একটা গন্ধ আছে, ওর দেহের ও। স্বচ্ছ আলোকভেদ্য আবরণ যেমন নারীদেহের সৌন্দর্যকে বহুগুণ বিবর্ধন, তীব্র ও তীক্ষ্ণ করে দ্রষ্টাকে অন্ধ করে দেয়, এই গন্ধ তেমনি এক ঐশী মদের মাথা ঝিম ঝিম করা গন্ধ। বোধকে বিকল করে দেয়, থাকা ও না থাকার মাঝখানে কোথায় যেন নিয়ে যায়। অভ্রের ক্লান্তি অনেক কিন্তু চোখে ঘুম নেই। নাস্তিয়া ওর চেতনার কোথাও একটা গুনগত পরিবর্তন করে দিয়েছে। ঠিক যে কী ঘটছে ওর মনোজগতে, সে বুঝতে পারছে না। প্লেনের একঘেয়ে গুঞ্জন, কখনও কখনও ঝাঁকুনি, ইন্টারমিটেন্ট তন্দ্রা ও জাগরণ, দুবাই এয়ার পোর্টের চাকচিক্য আর চিক চিক করা নাস্তিয়ার রিজান আকাশি চোখের সম্মোহন এই সব অতিক্রম করে ওরা মস্কো এয়ারপোর্টে পৌঁছায়। 
মস্কোর গ্রীষ্মের সকাল বেলা। না-শীত না-গরম, ত্বক স্পর্শ করে যাওয়া অবিস্মরণীয় পৈলব।

ওর ড্রাইভার বাইরে অপেক্ষা করছিল। ওরা মস্কো ফিরে আসে। নাস্তিয়াকে নামিয়ে দেয় ওর হোস্টেলে, তারপরে হোস্টেলের নীচে টেলিফোন বুথ থেকে ২ কোপেক দিয়ে ফোন করে দালাল ভিক্টরকে।

ভিক্টর এসে ক্যাশ ডলার পে করে কম্পিউটার ও ফ্যাক্সগুলো নিয়ে যায়, রুম পর্যন্ত তুলতে হয় না।

হোস্টেলে ডাকাতি হবার ভয় থাকে তাই ও নিজে একটু লাভ কম করে দালালকে কিছু লাভ করার সুযোগ দিয়ে মাল দ্রুত বিক্রি করে ফেলে।

অভ্রর বিচার বুদ্ধি এখানে সোজা সাপ্টা, একটু বেশি লাভের আশায় জিনিস ধরে না রেখে টাকা যত বেশিবার খাটানো যায় তত লাভ বেশি হয় এবং পণ্যের ‘হোল্ডিং কস্ট্ ও রিস্ক’ কমে যায়।

ভিক্টর নিজের টাকা দিয়ে মাল কিনে নিয়ে হয়তো সেই দিনই বিক্রি করে দেয় মূল ভোক্তার কাছে নতুবা অন্য শহর থেকে আসা দালালদের কাছে। এই একই কম্পিউটার হয়তো দশ হাত হয়ে অভ্রের দামের থেকে বহুগুণ বেড়ে শেষ পর্যন্ত আসল ক্রেতার কাছে পৌঁছে। কিন্তু বাজারে কে কত লাভ করলো সেটা অভ্রের দেখার ব্যাপার নয়। “সাপ্লাই এবং ডিমান্ড” লাভের অংক নির্ধারণ করে।
 
সে হোস্টেলে গিয়ে স্নান করে কিছু মুখে দিয়ে ঘুম দেয়। দিনের শেষ বেলায় ওঠে। মাথায় কি যেন একটা অস্বস্থি, তা দীর্ঘ প্লেন জার্নি, জেট ল্যাগ, নাস্তিয়া, না অন্য কিছুর কারণে, ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। টিভি ছাড়ে, সেখানে একটা ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছে ( ১৯৮৮ সালের ) সুমগাইতের রায়টের উপর :

“নাগোরনি কারাবাখ” একটি আর্মেনিয়ান মেজোরিটি এলাকা যা আজারবাইজানের অংশ। কিন্তু এর জনগণ চায় আর্মেনিয়ার সাথে সংযুক্ত হতে। এই নিয়ে দুই রিপাবলিকের নাগরিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব।

১৯৮৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি আজারবাইজানের পার্টি নেতা আসাদভ রাখঢাকহীনভাবে ঘোষণা করে, “যে কোনো মুহূর্তে কারাবাখ আক্রমণ ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করার জন্য ১ লাখ আজারবাইজানি সদা প্রস্তুত।”

অন্য নেতা হিদায়াত অরুজভ আরও এক ধাপ এগিয়ে সুমগাইতের আর্মেনিয়ানদের বলে: “যদি তোমরা অন্ধত্বের বশে আর্মেনিয়ার সাথে নাগোরনি কারাবাখের যোগ করার দাবি ত্যাগ না করো, ১ লক্ষ আজেরি আক্রমণ করে তোমাদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দেবে, তোমাদের নারীদের ধর্ষণ করবে ও শিশুদের হত্যা করবে।”

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই সুমগাইতের রায়ট শুরু হয়ে যায়। আর্মেনিয়ানদের বাড়ি ঘর আক্রমণ করা হয়, কুড়াল ও অন্যান্য ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা, গ্যাং রেইপ ইত্যাদি চালানো হয়। নারীদের নগ্ন অবস্থায় রাস্তায় টেনে হেচড়ে বের করা হয়। লেনিন যে নতুন মানুষের স্বপ্ন দেখতেন, এতদিন ধরে লুক্কায়িত সেই নতুন মানুষের বিভৎস পুরানো মুখ বের হয়ে আসতে থাকে। তিনদিনে ওরা ৩২ জনকে হত্যা করে এবং ১৪ হাজার আর্মেনিয়ান সংখ্যালঘুকে তাড়িয়ে দেয়।

প্রত্যুত্তরে নাগোরনি কারাবাখের স্তেপানাকার্ট শহরে বন্দুক যুদ্ধ শুরু হয়, ২ জন মারা যায়, ১২ জন আহত হয়। স্তেপানাকার্ট থেকে আজারবাইজানিদের এবং “শুশা” থেকে আর্মেনিয়ানদের বিতাড়ন করা হয়। নভেম্বর থেকে বাকুর ( আজারবাইজান) লেনিন স্কোয়ারে কয়েক লক্ষ লোকের ১৮ দিনব্যাপী ডেমনস্ট্রেশন শুরু হয়। ৫ ই ডিসেম্বর সৈন্য নামিয়ে লেনিন স্কোয়ার পরিস্কার করা হয়।
 
আর্মেনিয়ার ইয়েরেভান পিছিয়ে থাকে না, ফেব্রুয়ারির ১৮ তারিখে (১৯৮৮ সাল) যে ডেমন্স্ট্রেশন ও স্ট্রাইক শুরু হয় তা ২৫ তারিখে প্রায় ১০ লাখে উন্নীত হয়। এখানে “কারবাখ কমিটি” তৈরি করা হয় আর্মেনিয়ার ভবিষ্যত (প্রথম) প্রেসিডেন্ট টের পেত্রাশিয়ানের নেতৃত্বে।
 
অভ্রের বিরক্তি লাগে। সে টিভি বন্ধ করে দিয়ে জানালার সামনে দাঁড়ায়। সীমাহীন আকাশ, কোনো পরিখা নেই সেখানে। পশ্চিমে লাল রংয়ের ছড়াছড়ি, কিন্তু রক্তের রং নয় সেটা। সে ছোটকাল থেকে কমরেডদের মুখ থেকে বা তাদের লেখা বই পড়ে জেনে এসেছে যে, লেনিনীয় ফর্মুলা ব্যবহার করে জাতিগত সমস্যার যে সমাধান সোভিয়েত ইউনিয়নে করা হয়েছে তা মানবজাতির ইতিহাসে ‘আন প্যারালাল।’ হিন্দু-মুসলমান রায়টে ভুক্তভুগী বাংলার কমিউনিস্টরা এই নিয়ে রীতিমত গদ গদ ছিলেন। কিন্তু হায় ! সর্বৈব বানানো গল্প! সোভিয়েত ইউনিয়নে জাতিগত সমস্যা সমাধানের মুখটি দেখতে প্যারিসের সেইন্ট বার্থোলেমি রাতের মতই বিভৎস !

অভ্র কেমন খাঁচায় আবদ্ধ জন্তুর মত বোধ করে। ওর পিতা সারাটি জীবন সমাজতন্ত্রের জন্য ব্যয় করেছে। সে নিজেও বোধ হবার পর থেকে সমাজতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্বে ছিল রীতিমত অন্ধ বিশ্বাসী।

হ্যাঁ, তার চিন্তা চেতনায় অনেক পরিবর্তন এসেছে তার কিন্তু আদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রকে সে এখনও পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারেনি এবং পারবেও না। 
 
এত রক্তপাত সত্ত্বেও গর্বাচভ ‘নাগোরনি কারাবাখ’ আর্মেনিয়ার কাছে ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। বরং দুই দেশের পার্টি নেতাদের বহিস্কার করে নতুন নেতা নিয়োগ করেন। আর্মেনিয়ার নতুন নেতা গর্বাচভকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তার জনগণের ইচ্ছার স্পক্ষে আর্মেনিয়ার পুরোনো জাতীয় পতাকা ( লাল- ব্লু-গোল্ড ) উড়িয়ে দেন ৭০ বছর বিরতির পরে। শুধু তাই নয় আর্মেনিয়ার সুপ্রিম কোর্ট “নাগোরনি কারাবাখ”কে আর্মেনিয়ার অংশ হিসাবে রায় দেয়।

শরতকাল শেষ হবার আগেই ইয়েরেভান থেকে ২ লক্ষ আজারবাইজানির প্রায় সবাইকে তাড়িয়ে দেয়া হয়। শতবর্ষ ধরে তাদের সুখ ও শান্তির নীড় এখানেই। তাদের মাতৃভূমি আজারবাইজান নয়, ইয়েরেভান। তারা আর্মেনিয়ানদের মতই সাধারণ মানুষ। আর্মেনিয়ার আকাশ তাদের আকাশ, আর্মেনিয়ার প্রান্তর তাদের শান্তির নিঃশ্বাস। একইভাবে উন্মূল হয় আজারবাইজানের আর্মেনিয়ানরা। অশ্রু, রক্ত, হাহাকার চারিদিকে।

নভেম্বরে ইয়েরেভানে সৈন্য নামানো হয় শান্তি রক্ষার উদ্দেশ্যে। ডিসেম্বরে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে আর্মেনিয়ার স্পিতাক ও লেনিনাকান শহর। ভগ্নস্তুপে জ্যান্ত সমাধিস্থ হয় হাজার হাজার মানুষ। গর্বাচভ এলাকা পরিদর্শন করতে এলে “নাগোরনি কারাবাখ” আর্মেনিয়ার অংশ বলে দাবী করে জনগণ ডেমন্স্ট্রেশন করে। “কারাবাখ কমিটির” নেতাদের গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়।
 
অভ্রের মাথার অস্বস্থিটা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। সে কোনো মতেই বুঝে উঠতে পারে না যে, তার পিতা এত ত্যাগী, জনগণের জন্য এত নিবেদিত, আদৌ কি জানতো এই সমাজের এই ক্ষতগুলোর কথা? তার গলা শুকিয়ে আসে। ফ্রিজ খুলে ভদকার বোতল বের করে স্তপকায় ভদকা ঢালতে যায়। ঠিক এ সময় দরজায় টুক টুক মৃদু আঙুলের শব্দ শুনতে পায়।

নাস্তিয়া!

অভ্র শুধু অবাকই হয় না, ওর মধ্যেকার অস্বস্থিটা উবে যেতে শুরু করে।

ও খুশী হয়।

হাসে, “এর মধ্যেই অভ্রের প্রয়োজন পড়লো?”

নাস্তিয়া হাসে, বলে “হ্যাঁ। একটু গোর্কী স্ট্রিটে যাবো, ভাবলাম তুমি ফ্রি থাকলে তোমাকে নিয়ে যাই। যাবে আমার সাথে?”

নাস্তিয়াকে বসতে দেয়।

“শ্যাম্পেন খাবে?”

“না”

অভ্র ভদকা না ঢেলে ফ্রিজে তুলে রাখে। “ঘুম থেকে উঠে খুব অস্বস্থি লাগছিল, টিভি খুললাম সেখানে রায়ট, ভাবলাম ড্রিংক করি, কিন্তু তুমি আসায় ভালো হলো, ড্রিংক করতে হলো না।”

“আমি বুঝি তোমার মদ?”

অভ্র হাসে, “তাই তো মনে হচ্ছে, কারণ মাথার যন্ত্রনাটা কেটে গেল তুমি আসায়।”

“তুমি কি খুব বেশি ড্রিংক করো?”

নাস্তিয়ার একটা বৈশিষ্ট্য, অভ্রকে কোন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে ওর মুখ লাল হয়ে যায়। “না, মানে প্রশ্নটা আমি কেন করলাম নিজেও জানি না। উত্তর দিতে হবে না”

অভ্রের ভালো লাগে নাস্তিয়ার মুখের এই রংয়ের খেলা।

রংয়ের খেলা আছে বলেই পৃথিবী এত সুন্দর! অভ্র পরিমিতির বেশি ড্রিংক কখনও করে না। একাও করে না। একা ড্রিংক করে এলকোহলিকরা।

“না, লুকানোর কিছু নেই। আমি ড্রিংক করার মূল আকর্ষণটা কী তা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। কদাচিৎ করি, তা ও সঙ্গি পেলে, তবে আমার এখানে অনেকেই ড্রিংক করতে আসে, গত কয়েকমাস তাও কমিয়ে দিয়েছি।”

ওরা বের হয়ে যায়। প্রথমে বাস ধরে, তারপরে মেট্রোতে ঢোকে। মেট্রো হলো মস্কোর মাটির নীচে বিশাল শহর। প্রাসাদের মত স্টেশনগুলো। ছিম ছাম পরিচ্ছন্ন। ৩-৪ মিনিট পর পর ট্রেন আসে। অন্ধকার টানেলে ছোটে দৈত্যের মত। ট্রেনের ভেতরে আলো ঝলমল করে। ওয়াগনের দুই পাশে লম্বা লম্বি বসার নরম বেঞ্চ, দুইবেঞ্চের মাঝখানে হাতল ধরে গাদাগাদি করে দাঁড়িয়ে থাকে মানুষ।

মানুষগুলোর বিভিন্ন মুখ, বিভিন্ন তাদের অভিব্যক্তি, ব্যস্ত কর্মঠ জীবন-সংগ্রামের ছাপ মাখা।

ওদের গতকালটা যত নিশ্চিত ছিল, আগামীকাল তেমন নয়।

আলোময় ভবিষ্যত ও প্রাচুর্যের সাম্যবাদী সমাজ গঠনের শ্লোগান এখন আর দেয়া হয় না ।

সেইসব শ্লোগান লেখা মলিন, বিবর্ণ বিগত দিনের বড় বড় বিলবোর্ডগুলো এখনও আছে । নামানো হয়নি। নামানোর খরচ বহন করার অর্থ রাষ্ট্রের নাই।




২৬ তম পর্ব


রোববার সুদীপের ভালো-মন্দ বাঙালি খাদ্য রান্না করার দিন। ইগর এসে পৌঁছানোর কথা সকাল ১১ টার দিকে। ক্ষুধার্ত থাকবে, ও খেতে পছন্দ করে, বিশেষ করে সুদীপের ঝাল তরকারি।

১১ টা পার হয়ে ১২ টা, তারপরে ১ টা বাজে কিন্তু ইগরের দেখা নেই। সন্ধ্যা হয়ে আসে তারপরেও ইগর নেই। সুদীপ অস্থির হয়ে পড়ে। অশুভ চিন্তায় ছটফট করতে থাকে। ইগরের কিছু হয়নি তো?

ও কি জীবিত আছে?

ফোন করে বিশ্বজিতের বাসায়।

নেই।

এক ঘন্টা পরে ফোন করে আবার।

ইগর পৌঁছে নাই শুনে বিশ্বজিত আকাশ থেকে পড়ে।

"বলো কী? টাকা-পয়সা নিয়ে পালিয়ে যায়নি তো? রুশীদের বিশ্বাস করা যায় না।”

বলে,"ও আসার সাথে সাথে আমাকে ফোন করে জানিও, চিন্তায় থাকবো।"

সুদীপের অস্বস্থি কমার চেয়ে বরং বারে।

সন্দেহ হয়, আসলেই ইগর টাকা নিয়ে পালিয়ে গেল কিনা।

ওর চরিত্রের ডিফল্ট হল কোনো মানুষকে সে প্রথমেই সন্দেহ করতে পারে না, সন্দেহের দিকে পুশ করতে হয়। ফোন করে “ভিসনি ভলাচক” ইগরের বাবা-মা’র বাসায়।

না ইগর সেখানে নেই, যায়নি।

সন্ধ্যার পরে বাসার ফোনটি ঝন ঝন করে উঠে।

বহু প্রত্যাশিত ফোন ।

ইগর।

"ইগর, তুই কোথায়?"

ওর কণ্ঠস্বর অসম্ভব দুর্বল ।

"আমি মাগিলেওভে, হাসপাতালে।"

"কি হয়েছে?"

"আমি জানি না, অজ্ঞান অবস্থায় আমাকে নাকি ট্রেন থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে।"

"এখন কেমন আছিস?"

"খুব দুর্বল।"

"টাকা? টাকা কোথায়? পিস্তল?"

"নাই, আমি জানি না কোথায় গেছে।"

"ঠিক আছে, তুই সুস্থ হয়ে ফিরে আয়, পরে কথা হবে।"

সুদীপ ধপ করে বসে পড়ে। ইগরকে ট্রেনে তুলে দিয়ে যায় বিশ্বজিৎ। সুদীপ নিজে যেমন ভদ্র, ওর বন্ধুও তাই। যথেষ্ট কদর করেছে সে। ট্রেনের প্রথম ক্লাশের ঝক ঝকে কুপেতে ওর এই প্রথম চলা। দুইদিকে দুটো বিছানা, মাঝখানে হাঁটার পথ, ট্রেনের বাইরের দিকটায় জানালার কাছে একটা ছোট টেবিল।বিছানায় সুন্দর তোষক, তার ওপরে সাদা বিছানার চাদড়, তারপরে ব্লাঙ্কেট। ইগরকে বসিয়ে দিয়ে বিশ্বজিৎ চলে যায়, ট্রেন ছেড়ে যাবার কয়েক মিনিট আগে একটি মেয়ে এসে ঢোকে। জিন্সের মিনি স্কার্ট, গায়ে চমৎকার শার্ট। বেশ লম্বা মেয়েটি, হাই হিল পড়েছে। দেশী মেয়ে কিন্তু পরনে সবকিছুই বিদেশি।

স্দ্রাসতে ! (অভিবাদন)

স্দ্রাসতে !

ছোট ব্যাগটি মাথার উপড়ে তাকে রেখে মেয়েটি পাশের বিছানায় বসে পড়ে। সুন্দর হাল্কা জ্যাকেটটি খোলে। হাসে। দাঁতগুলো ভারি ফর্সা ও সুন্দর। সম্ভবত ১৮ বা ১৯। মুসা নবী বোধহীন শিশু অবস্থায় আগুণের রূপে মুগ্ধ হয়ে নাকি হাত দিয়ে আগুন ছুঁয়েছিলেন। তাঁর হাত পুড়েছিল।

সেই আগুণের মত মেয়েটি। হাত ঠোঁট এমন কি সারা দেহ পুড়িয়ে দিতে পারে সামান্যতেই। এবং আশ্চর্য, মেয়েটি যে পাতলা জামা পরেছে তাতে দৃঢ় স্তনদ্বয় টানটান হয়ে আছে। আনার দানার মত দুটো বৃন্ত ঠিকরে বের হয়ে আসতে চাইছে। সে ব্রা পরতে ভুলে গেছে।

খুব হাসি খুশী ইউক্রেইনের মেয়ে, কথায় বোঝা যায় ।

ট্রেন দুলে ওঠে, তারপরে চলতে শুরু করে। প্রথমে পা টিপে টিপে, তারপরে দৌড়।

মেয়ে এই বছর স্কুল শেষ করেছে, তার মানে ১৭ বা একটু বেশি, দেহ ও বুকে মনে হয় আরও একটু বেশি। লেনিনগ্রাদে যাচ্ছে প্রথম, খুব উৎফুল্ল। ওরা কথা বলে, কিন্তু ইগরের চোরা চোখ ঘুরে ফিরে মেয়েটির বুকে গিয়ে আছাড় খায়।

ট্রেন চলছে দ্রুত।

বাইরে ইলেকট্রিকের বড় বড় থামগুলো দৌড়াচ্ছে পাগলা দাশুর মত দুই হাত মাথায় তুলে, সাথে ছুটছে মাঠ, ক্ষেত, গাছ-পালা সব। জানালা দিয়ে উঁকি মারছে নীল আকাশ। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে, তারপরে রাত। সুন্দর নারীর সাথে সময় হাঁটে দ্রুতির রণপায় ।

বিশেষ করে যখন দুলতে দুলতে ট্রেন চলে রাতের মায়াবী খোয়াবের টানেলে। ছোট্ট, সুন্দর, দরজা বন্ধ ট্রেনের প্রথম শ্রেণির কামরা। মেয়েটি কি একটা বিদেশি পারফিউম ব্যবহার করেছে। ততক্ষণে সে ওর পাশে এসে বসেছে। কেমন একটা ‘খাই অথবা খাও’ মনোভাব ওর।

ইগরের খুব তৃষ্ণা পায়। সে সাথে নিয়ে আসা পেপসির বোতল খোলে, পান করে। তারপরে রেস্টরুমে যায়। ফিরে এসে দেখে মেয়ে ওরই বিছানায় বসে আছে। প্রথমেই যা চোখে পড়ে তা হল ওর বুকের বোতামগুলো এখন খোলা। খোলা বলেই সেখানটায় চোখ আটকে যায়।

চোখ, গর্তে পড়া পায়ের মত।

ভীষণ শক্তিশালী মদের মত মাথায় একটা শক্ত কিক্ ধোঁয়া উড়ায়। প্যান্টের জিপারের পেছনটায় প্রদাহের স্ফীতি আন্না তান্না করে।

সাপের ফনার মত উন্মুক্ত বুক উচিয়ে বসে আছে মেয়েটি।

ছোট ও বন্ধ কামরায় নারী যদি এমন নিবিড় হয়ে আসে, পুরুষের গলায় তখন মরুভূমি খা খা করে। অথবা তার নিজেকে সামনে পিছনে ক্যাকটাসের জঙ্গলে আটকা পড়া খরগোশের মত মনে হয়। ইগরের হাতটি মেয়েটির La Llorona বুকের না দিকে গিয়ে, টেবিলে রাখা খোলা পেপসির বোতলটা তুলে ঢক ঢক করে গিলে ফেলে।

আর মেয়েটা জাত সাপ, অক্টোপাস, না অন্য কিছু, তা বুঝে উঠবার আগেই ইগর সম্পূর্ণ সংজ্ঞাহীনভাবে এলিয়ে পড়ে ওর গায়ে। যখন সে জেগে ওঠে, দেখে ট্রেন থেমেছে ছোট্ট কোনো স্টেশনে। অনম্বর বুকের সুন্দর মেয়েটি কোথাও নেই। ওর কোমরে বাঁধা টাকার থলি ও পিস্তল উধাও। সে উঠে দুলতে দুলতে কামরা থেকে বের হয়ে সাপের মত সরু ও দীর্ঘ করিডোরটিতে মেয়েটিকে খোঁজে। কী সুন্দর মেয়েটি! কোথাও নেই। ইগর বহু কষ্টে ট্রেনের দরজার দিকে যায়, ট্রেন এটেন্ডেন্ট পর্যন্ত পৌঁছেই ধপ করে পড়ে আবার সংজ্ঞা হারায়।


২৭ তম পর্ব

সুদীপের বন্ধু ভাগ্য ভালো। তাকে বন্ধুদের ত্যাগ করার বিড়ম্বনা কোনোদিন সইতে হয়নি, বন্ধুরাই আস্তে আস্তে ঝরে গিয়েছে। অবশ্য কোনো অস্বাভাবিক নিয়মে নয়, জগৎ-সংসার হাজার বছর ধরে যে সব নিয়ম সৃষ্টি করেছে, সেই নিয়ম মেনেই। বড় সোজা-সাপ্টা নিয়ম, বন্ধু রাখতে চাও? তার সাথে ব্যবসা করো না। বন্ধু কষ্টে থাকলে এবং তুমি ভালো থাকলে তাকে কিছু দান করে ভুলে যাও, কিন্তু প্রাপ্তির প্রত্যাশা রেখে টাকা ধার দিও না। সংসার অজ্ঞতাকে প্রশ্রয় দেয় না এবং অজ্ঞকে ক্ষমাও করে না।

তুমি যদি জগতের নিয়ম না জানো, সেটা তোমারই দায়, অন্যের নয়।
 
সুদীপ যখন বিশ্বজিৎকে পণ্য পাঠায়, প্রায় একই সময়ে সে পণ্য পাঠায় তার আর এক বন্ধুকে। দীর্ঘদিনের যোগাযোগহীনতার ইতি টেনে বিশ্বজিতের ফোন আসার আগেই সে নিজ থেকে খুঁজে বের করেছিল এই বন্ধুকে।

ভোলগা তীরের এক শহরে থাকতো সে। ইমরান, লম্বা চৌরা, বিশাল, অশথ্থের মত। ঢাকায় মিছিলে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ৫ লক্ষ ডেসিবেলের শ্লোগান দেবার সময় শিবিরের অতর্কিত আক্রমণে একটা ইটাংশ এসে লেগেছিল ওর মাথায়, সাথে সাথে মাথাটা ফেটে রক্তাক্ত হয়ে গিয়েছিল।

ইটটা এসে সুদীপের মাথায় ও লাগতে পারতো।

যে বন্ধুর রক্তে রঞ্জিত ঢাকার রাজপথ সে বড় কাছের বন্ধু। সুদীপের বুকে ধুকপুক করে আজব যে দমকল তার রক্ত নিয়েই তো কাজ- কারবার । বন্ধুত্ব ও ভালোবাসায় প্রাণ সিঞ্চন করে রক্তের সেই বন্ধন।

সুদীপই ওকে বাসায় নিয়ে গিয়েছিল ওর পিতার রাগকে প্রশমিত করার জন্য। চারিদিক দিয়ে কচুরি পানায় ঘেরা গাছ গাছালিতে ভরা একটি বাড়ি। বাসের সাঁকো দিয়ে হেঁটে হেঁটে গিয়েছিলো। ঝিঁঝি-ডাকা, ব্যাঙ-ডাকা ঘুট ঘুটে রাত। গোরস্তানের রাতের মত। আকাশে অগুনিত আলো-কিপটে তারা।সদ্যজাত বিড়াল ছানার চোখের মত চোখ যাদের। ইমরানের বাবা লিকলিকে একটা মানুষ, পাকিস্তানের আমল থেকে পার্টির গোপন সদস্য। তিনি রেগে হৈ হৈ করেন প্রথমে, তারপরে শান্ত হন। তারপরে হ্যারিকেনের আলোয় বসে গল্প শুরু করেন, পার্টির গল্প, তার রাজনৈতিক গুরু, প্রিয় কমরেড হাতেম আলী চাচার গল্প। কী অসম্ভব ছিল তাঁর আত্মনিয়ন্ত্রণ। কখনও হয়তো দুদিন পেটে কোনো দানা-পানি পড়ে নাই। দু’তিন রাত ঘুমান নাই। যোগীদের মত শরীর ও মন ছিল ১০০% তার অধীনে। তিনি আসতেন রাতে রাতে গোপনে, তাদের গোয়াল ঘরের খড়ের মাচার পেছনে ছোট একটা স্থান ছিল যেখানে মিটিং করতেন। খাবার পরে হয়তো মাটিতেই কাত হয়ে বলতেন,”আমি ১৫ মিনিট ঘুমাইয়া লই।”

এবং কথা শেষ হবার আগেই ঘুমিয়ে পড়তেন।

নাক ডাকাতেন না, এমন কি তার তার শ্বাস-নি:শ্বাস ছিল মাছের শ্বাস-নি:শ্বাসের মত।তার ঘুমের গভীরতায় মনে হতো কিসের ১৫ মিনিট, সম্ভবত ঘুমাবেন কুম্ভকর্ণের মত অনন্তকাল।অথচ ঠিক পনেরতম মিনিটে উঠে বসতেন।কাঁধের ঝোলা নিয়ে রওনা দিতেন।এই ছিলেন হাতেম আলী চাচা। সারাজীবন রাজনীতি করেছেন, নিজের জন্য কিছু চাননি।

সব মানুষের জন্য। সব পার্টির জন্য।

মনসুর হাল্লাজ তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বিদ্রুত হয়েছিলেন ঈশ্বরের অস্তিত্বে, আর এই মানুষগুলো পার্টির। ছিলেন শিশুর মত সরল। বঙ্কিমভাবে চিন্তা করার মন তাদের ছিল না। তাই মানবতার মহাসমুদ্র যে পার্টির কুবজলে ধারণ করা যায় না, সেই বোধও তাদের পাশ কাটিয়ে গেছে। তারা রাজনীতি করতেন কিন্তু রাজনীতিবিদ ছিলেন না। এবং সোভিয়েত পার্টির রক্ত-ইদারা আবিস্কৃত হবার আগেই তারা চলে গেছেন এই বিশ্বাসে অটুট থেকে যে মানবতা মুক্তির দেশ একটা আছে এই পৃথিবীতে, যেখানে পুঁজিবাদী ও সামন্তবাদী পাপ দূর হয়েছে। যেখানে মানুষ বুক পুরে শ্বাস নিতে পারে সাম্যের বাতাস। 
 
ইমরানের পিতার মুখেই সুদীপ প্রথম শুনেছিল মূল জনগোষ্ঠীর প্রায় অজ্ঞাত এক রোমহর্ষক ঘটনার কথা। ১৯৫০ সালের ২৪ শে এপ্রিল রাজশাহীর খাপড়া ওয়ার্ডের দরজা বন্ধ করে ২৪ টা জানলা দিয়ে ২৪টি রাইফেল গুলি ছুঁড়েছিল বদ্ধ কুঠুরিতে। ৩৯ জন রাজবন্দীর মধ্যে ৭ জন নিহত হন ঘটনাস্থলে। বিজয় সেন, দিলওয়ার হোসেন, হানিফ শেখ, কম্পরাম সিংহ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, সুধীন ধর ও আনোয়ার হোসেন। বাকিরা প্রায় সবাই আহত হন। কমরেড বিজন সেন গুলিবিদ্ধ মুমূর্ষ অবস্থায় শেষ চিৎকার করে বলেছিলেন জেলারকেঃ

“আপনারা রক্তপাতের ভয় দেখিয়েছিলেন, এবার দেখলেন কমিউনিস্টরা রক্ত ঢেলে মরতে ভয় পায় না!”

কমরেড নুরুন্নবীর গুলিবিদ্ধ ও গ্যাংগ্রেনে আক্রান্ত একটি পা কাটা যায়।

শহীদ কমরেড কম্পরাম সিং সম্পন্ন কৃষক হয়েও ৬০ বছর বয়সে তার সমস্ত বিষয় - সম্পদ কমিউনিস্ট পার্টিকে দান করে পার্টির কর্মি হয়ে গেলেন। একটি কৃষক সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছিল। প্রায় ২০ হাজার কৃষক জড়ো হবে সেই সম্মেলন। কিন্তু তার ছেলে মারা গেল সেদিনই। ভাঙাবুক নিয়ে ছেলের শেষকৃত্য সেরে শ্লোগান দিতে দিতে সরাসরি মিটিংয়ে এসে যোগ দিলেন সদ্য বিধবা পুত্রবধুকে সাথে নিয়ে…

কী বিস্ময়কর ত্যাগ!

সবটাই দেশ ও আদর্শের জন্য। 
 
অথচ আন্তর্জাতিকতাবাদ ছিল যাদের মর্মমূলে রাশিয়ার সেই বিশুদ্ধ কমরেডরা ইমরানের হবু বৌকে মেডিকেল ডিগ্রি শেষ করার মাত্র ১ বছর আগে ইনস্টিউট থেকে বহিস্কার করে দিয়েছিল। অপরাধ-বিদেশির সাথে ঘোরা-ফেরা করা। তারপরেও ওরা বিয়ে করেছে সকল রক্তচক্ষুর তোয়াক্কা না করে। পড়াশুনো শেষ করেই দেশে চলে গিয়েছিলো বিদেশি বৌকে নিয়ে। ইন্টার্নিশীপ শুরু করেছিলো কিন্তু ফিরে আসতে হয়েছিল মাত্র ১০ মাসের মাথায়।

সিঙ্গাপুরে ওরই শহরের এক ছেলের সাথে দেখা হয় সুদীপের। সে খুটিয়ে খুটিয়ে জিজ্ঞেস করে ইমরানের কথা। খবর পায় কিছুদিন আগেই বাংলাদেশ থেকে ফিরে এসেছে সে। কাজ-কর্ম নেই, শিশুসন্তান নিয়ে অর্থনৈতিক ভাবে প্রায় দেউলিয়া। সুদীপ তার থেকে টেলিফোন নম্বর নেয়।

সিঙ্গাপুর থেকে ফিরেই সে ফোন করে বন্ধুকে।

“লেনিনগ্রাদে চলে আয় কথা বলবো।”

ও আসে।

“ কিভাবে সাহায্য করতে পারি তোকে?”

“যদি একটা অফিস রেখে দিতে পারিস, তাহলে আমি সেখানে বসে টুকটাক ব্যবসা করতে পারবো।”

“কত টাকা?”

“বছরে ৫ হাজার রুবল প্লাস টেলিফোনের খরচ।”

সুদীপ টাকাটা দেয়।

সময় বদলে গেছে, জীবন হাঙর হয়ে উচ্ছলতাগুলো গিলে খেয়ে ফেলেছে। সব স্বপ্নাহত বামপন্থীর মতই, হতাশার কালো ছায়া অভিব্যক্ত ওর মুখে।

সুদীপ তখনও কম্যুনাল কোয়ার্টারে থাকে।

বৌ শাশুড়ি মেয়েকে ছোট্ট রুমটিতে ঘুমাতে দিয়ে ওরা অন্য রুমে ফ্লোরিং করে।

ইমরান শুয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। সুদীপে চোখে ঘুম আসে না, ইমরানের নাক ডাকানোর শব্দ মগজে হাতুড়ি পিটায়।

সে শুয়ে শুয়ে ভাবে গ্রামের কথা, তারপর শহর, স্কুল, ঢাকা কলেজ, রাজনীতি, মিছিল-মিটিং স্বপ্ন। ভাবতো বাংলায় পড়বে, সাহিত্য সাধনা করবে। কিন্তু বাংলার এম এ বড় ভাই বলে, “আমি বেকার ,আরও একজন বেকার নিয়ে সংসার চলবেনা রে। রাজনীতি করতে চাস, ডাক্তার হ। রাজনীতি, জনসেবা, সংসার সবই করা যাবে এই পেশায়।”

তাই সে এখন ডাক্তার, কিন্তু ডাক্তারি করছে না, করছে ধান্দাবাজি। সাদা-কালো ব্যবসা, সাদা কম, কালো বেশি। ধুতুরা ফুলও ফুল কিন্তু সেখানে মধু হয় না।কিছু অর্বাচীন অমৃতের অনুসন্ধান করে ধুতুরার জঙ্গলে।

মাথায় চিন্তাগুলো ঘুরতে ঘুরতে একটু তন্দ্রার মত আসে।

লাবণ্য।

সুদীপ যদি লাবণ্যকে পেতো জীবনটা এমন হতো কি?

প্রশ্নটা শেষ করতে না দিয়েই পরের প্রশ্নটা এসে যায়, সে কি আলিওনা কে ভালোবাসে?

অবশ্যই সমস্ত প্রাণ-মন দিয়ে। তবে কেন সে লাবণ্যের কথা ভাবে?

সে জানেনা। যদি লাবণ্য ফিরে এসে বলে, “আমার ভুল হয়েছে, আমি তোমাকে ভালোবাসি, কাছে এসো।”

সুদীপের গা কেঁপে ওঠে।

একটা অসম্ভব কালো টর্নেডোর ফানেলের মধ্যে ঘুরতে থাকে সে, যেন সে একটা লাটিম। যেন সে দান্তের ইনফের্নোতে ফ্রানসেস্কা ও পাওলোর অভিশপ্ত ঘুর্ণনে পাওলোর মুখে দেখতে পায় নিজের মুখ।

না, না, না তা হয় না, আলিওনা.. লাবণ্য … আমি কোথাও যাবো না তোমাদের ছেড়ে!

ঘাম দিয়ে জেগে ওঠে সে ।

রাত গভীর ও নিঝুম হয়েছে কিন্তু ইমরানের নাকে কামান দাগছেই। 
 
সুদীপের থেকে টাকা নিয়ে ইমরান গিয়ে অফিস খুলে বসে। দু’টো একটা ট্রানজাকশনও করে। কোন্ বিদেশির কাছে কী মাল আছে তা খুঁজে বের করা এবং ক্রেতা খোঁজা। সিম্পল ব্রোকারের কাজ। কিছুদিন পরে ফোন করে সুদীপকে।

আমার একটা “রিকো কপিয়ার” মেশিনের ক্রেতা আছে, কিন্তু এখানে কারো কাছে নেই। তোর কাছে আছে?

“আমার একটা আছে কিন্তু বেচবি কিভাবে? নাল্ না বেজ-নাল্?”

“বেজ-নাল্।”

“বেজ-নাল্ হলে আমি নাই।”

“আমি তোকে নালে দেব, তবে কয়েকদিন সময় লাগবে। আমার খুব ভালো প্রফিট হবে, এই উপকারটা কর্।”

নতুন ব্যবসায়ে, বিপদটা সে বুঝতে পারে না।

অবুঝ বন্ধু আসলে ব্যবসায়ের শত্রু, আর সুদীপই বা কতটুকু ব্যবসায়ী?

সে টলে।

“নাল” মানে ক্যাশ, “বেজ-নাল” মানে “একাউন্ট টু একাউন্ট” ট্রানসফার। সোভিয়েত সিস্টেমে কোন নাল ট্রানজাকশন বৈধ নয়। কালো ও ক্রিমিনাল জগতে “নাল”ই ছিল একমাত্র মাধ্যম কিন্ত ঐ কালো জগতটার উপস্থিতি সব সময় অস্বীকার করা হয়েছে।

বেজ-নালের টাকা যেহেতু একাউন্টে, তা ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না।প্রতিদিনের মুদ্রাস্ফীতির কারণে ঐ টাকা কাগজ হয়ে যায়। তাই বেজ-নালে কেউ কিছু বিক্রি করে না, করলেও নালে যার দাম ১০০ রুবল, বেজ-নালে তাই ১৪০-২০০ রুবল। একই রুবলের দুই রকমের মূল্য।

বেজ-নাল থেকে নাল করাটা ছিল খুবই সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ। ব্যংকের কর্মকর্তাদের সাতে ভালো কানেকশন থাকতে হয়।

সুদীপ একটি রিকো কপিয়ারের বাক্স নিয়ে প্লেনে চড়ে বসে।

ইমরানকে পই পই করে বলে আসে, টাকা একাউন্টে আসার সাথে সাথে তুলে ডলার কিনে ফেলতে। রুবল হাতে রাখা একদিনও নিরাপদ নয়। সুদীপকে ইমরানের ৩৯০০ ডলার দেবার কথা। টাকা একাউন্টে আসে কিন্তু ইমরান টাকাটা বের করে আনতে দেরি করে ফেলে। একরাতে রুবলের দাম ধপ করে পড়ে যায়। ১৮ রুবলে ১ ডলার থেকে ৩০ রুবলে ডলার হয়ে যায়, তারপরে ৩৫ রুবলে। ইমরান দু:খ প্রকাশ করে, সুদীপের টাকা জল হয়ে যায়।


২৮ তম পর্ব

অভ্র ও নাস্তিয়া মেট্রো থেকে পুশকিনস্কায়া স্টেশনে বের হয়ে আসে। এস্কালেটর বেয়ে উপরে উঠতে যেয়ে নাস্তিয়া দাঁড়ায় উপরের ধাপে ,অভ্র নীচের। নাস্তিয়া ফিরে দাঁড়ায় অভ্রের দিকে। দুজনের মধ্যে দুরত্ব মাত্র কয়েক ইন্চি। সচরাচর প্রেমিক প্রেমিকারা দাঁড়ায় এমনভাবে। প্রায়শই আলিঙ্গনাবদ্ধ অবস্থায়।

নাস্তিয়া তাকিয়ে থাকে অভ্রের চোখের দিকে।

অভ্র প্রশ্ন করে “কি দেখছো?”

“এত কালো চোখ আগে কখনও দেখিনি, তাই দেখছি।

কাল আমি রিয়াজান চলে যাবো”

“তাই? বাহ্ ,ভালোই কাটবে তোমার আপন জনের সাথে।”

“আগে কাটতো, কিন্ত এবার কাটবে কিনা জানি না।”

“কেন?”

“গত এক সপ্তায় তোমার পাশে থেকে থেকে কেমন যেন অভ্যাস হয়ে গেছে, মনে হচ্ছে মিস্ করবো।”

অভ্রের এই সহজ স্বীকারোক্তিটা ভালো লাগে, “তাই?”

নাস্তিয়া মাথা নাড়ে ।

বের হয়ে এসে ওরা গোর্কী স্ট্রিট দিয়ে হাঁটতে শুরু করে ।

চলে আসে পুশকিনের মনুমেন্টের কাছে। নাস্তিয়া বলে তুমি একটু অপেক্ষা করো ,আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবো।

অভ্র বসে একটি বেঞ্চে।

সুন্দর বিকাল।

পুশকিন দাঁড়িয়ে আছে উঁচু এক ভিত্তির উপর। একটা সাধারণ, লম্বা ওভার কোট গায়ে, ডান হাতটি কনুয়ে ভাজ করে বুকে জামার মধ্যে ঢাকা, বা হাতটি পিঠে তার মাথার টুপিটি ধরে। কোকড়ানো চুলের মাথাটা একটু হেলানো ও অবনত। গভীর চিন্তামগ্ন মুখ। সম্ভবত রাশিয়ার ভবিষ্যত তার চিন্তায়। রাশিয়ার সর্বকালের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের একজন। তার মাথার উপরে আরাম করে বসে ফৈর ফুলিয়ে ঠোঁট দিয়ে খুটছে একটি জ্যান্ত কবুতর।

মনে হয় যেন এই মূর্তিরই অংশ।
 
এখানে প্রতিদিন সকালে এসে পিতার পায়ের কাছে বেঞ্চে বসে থাকতো তার মেয়ে মারিয়া পুশকিনা। একই স্থানে প্রতিদিন, রোদ, বৃষ্টি, ঝড়, তুষার, ব্যতিক্রমহীন। দিন যেত ত্রস্ত পায়ে হেঁটে ।

১৯১৯ সালের ঘটনাবহুল সেই সব দিন। একজন মানুষের জীবনের চেয়ে একটা সমস্ত জাতির মুক্তির সংগ্রামে ব্যস্ত ও নিবেদিত দেশ। তারপরে সন্ধ্যা যখন বিছিয়ে দিত আঁধারের চাদর, সে ধীর দুর্বল পায়ে ফিরে যেত তার ছোট্ট অন্ধকার, বরফ- শীতল আশ্রয়ে।
 
সে বেশ দেরি করে ২৮ বছর বয়সে, জেনেরাল হারতুঙ্গকে বিয়ে করেছিল। কিন্তু ১৮৭৭ সালে তহবিল তসরুপ করার অভিযোগ তোলা হলে সে আত্মহত্যা করে। সন্তান সন্ততিহীন মারিয়া মাত্র ৪৫ বছরে বয়সে একা ও কপর্দকশূন্য হয়ে যায়। ভাইয়ের বাসায় থেকে তার বাচ্চাদের দেখভাল শুরু করে। ভাইয়ের স্ত্রী মারা গিয়েছিল। এরপরে জার ২য় আলেকসান্দার মাসে ২০০ রুবল পেনশনের ব্যবস্থা করে দেয়।
 
কিন্তু বিপ্লবের পরে অভিজাত শ্রেণি উৎখাতের অংশ হিসাবে তার পেনশন বন্ধ করে দেয়া হয়। কেড়ে নেয়া হয় বাসস্থান, নেড়ি কুকুরের মত নিক্ষেপ করা হয় রাস্তায়। শেষপর্যন্ত তার প্রাক্তন চাকরানীর বোন দয়া করে থাকতে দেয় তার বাসায় ছোট্ট একটা কক্ষে। যা কিছু বিক্রি করার ছিল তা বিক্রি করা হয়ে গেছে বহু আগে। ৮৬ বছর বয়েস। ক্ষুধার্ত, নি:স্ব, বলহীন। 
 
যে সময়ে জারের স্বৈরতান্ত্রিক রাশিয়ায় টু শব্দটি করা যেত না, সেই সময়ে তার পিতা ছিল রাশিয়ার মুক্তির কণ্ঠ। জারতন্ত্র যে রাশিয়ার বুকে জগদ্দল পাথর সে তা বলেছে নির্ভিক ভাবে,

“দিন আসবে যখন স্বৈরতন্ত্র চুর্ণ-বিচুর্ণ হয়ে যাবে এবং উত্তর পুরুষ তারই টুকরো দিয়ে লিখবে আমাদের নাম” চাদায়েভকে লেখা কবিতায় তিনি বলেছে দ্ব্যার্থহীন ভাবে। জার তার পিতার কণ্ঠ স্তব্ধ করাতে না পেরে কৌশলে হত্যা করিয়েছে।

এখন বিপ্লব সম্পন্ন হয়েছে, পিতার ভবিষ্যতবাণী বাস্তবায়িত করে ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়েছে

স্বৈরতন্ত্র। কিন্তু কৈ তার স্বপ্নচারী ভবিষ্যতদ্রষ্টা পিতার নাম তো কেউ নেয় না। তার পিতা ছিলেন অভিজাত ঘরের সন্তান, তার মানে শ্রেণি শত্রু। শ্রমিকের ঘরে না জন্মানো হচ্ছে আজকের রাশিয়ায় পাপ। এবং সেই পাপের ভার বহন করতে হয়েছে তার কন্যাকে জীবনের শেষ কটি বছর অচ্ছুত হয়ে।
 
১৮৮০ সালের ৮ই জুন এই মনুমেন্টের উদ্ভোধনের সময় দস্তয়েভস্কী বলেছিলেন: “না তার আগে, না তার পরে, কেউ কোনোদিন রুশজাতির মনোজগতকে এতসুক্ষ্ণ ভাবে বুঝতে পারেনি, আসতে পারেনি তার এত কাছাকাছি।”

আসলেই কি তাই?

আসলেই কি রুশ বিপ্লব ও তার আদি নেতারা সেই ঝঞ্ঝাময় দিনগুলোতে বিশ্বাস করেছেন যে, পুশকিন কোনো অভিজাত শ্রেণিশত্রু নন, তিনি মানবতা মুক্তির অনতিক্রম্য স্তম্ভ?
 
পার্টির মিটিং এ কেউ প্রস্তাব দিয়েছিল মারিয়া পুশকিনার জন্য একটা পেনশনের বন্দোবস্ত করার। কিন্তু শ্রেণিশত্রুকে সাহায্য করার পক্ষে বিপক্ষে দীর্ঘ বিতর্ক শেষ করে পেনশনের যে প্রথম টাকাটা বরাদ্ধ করা হয়েছিল, তা খরচ হয় তার সৎকারে। 
 
হঠাৎ অভ্রের মাথায় বিদ্যুতের মতো একটি প্রশ্ন খেলে যায়- বেঁচে থাকলে ১৮-১৯ সালের শ্বেত ও লোহিত সন্ত্রাসের রাশিয়ায় ঘাড় ত্যাড়া পুশকিন মুখ বুজে থাকতে পারতেন না। তিনি প্রতিবাদে গর্জন করে উঠতেন ভাতৃহত্যার বিরুদ্ধে। এবং তখন বলশেভিকরা শ্রেষ্ঠতম রুশ কবিকে নিয়ে কী করতো?
 
খুব ছোট্ট, সাধারণ একজন মানুষ অভ্র। সমাজতন্ত্রের সংগ্রামে নিবেদিত ছিল ওর পিতা। লেনিন বিপ্লব করেছিলেন কিন্তু সেই বিপ্লব বিপথে চলে গিয়েছিল। কিন্তু ওর পিতা ও পিতার মানবদরদী বন্ধুরা এ খবরটি সম্ভবত জানতেন না।তারা যে দেশটির দিকে শ্রদ্ধাভরে তাকিয়ে থাকতেন, আপাত অক্ষয় সেই দেশটি তার চোখের সামনে ভেঙে গেছে। সাথে নিয়ে গেছে মার্কসবাদ-লেনিনবাদ নামের স্বপ্ন-দিশারী সমাজ- দর্শনটিকে। 
 
পুশকিন মনুমেন্টের পাদদেশে বসে অভ্র তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।

সামনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রথম ম্যাকডোনাল্ডস, প্রায় ২ মাইল লম্বা লাইন পার্কের চারিদিক ঘুরে। কিছুদিন আগে এটি খোলা হয়েছে। মানুষ দাঁড়িয়ে আছে পুঁজিবাদী জগতের বিস্ময়, ফাস্ট ফুডের দোকানটিতে ঢোকার জন্য। ২ ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতেও কসুর করছে না। বরং তাদের মধ্যে কেমন একটা উৎসব উৎসব ভাব।

কেন?

কারণ অচেনা জিনিস। তারা দেখতে চায় আসলেই জিনিসটা কী?

স্বাদ কেমন?

কিভাবে ওরা এতজন মানুষকে সার্ভ করে এত দ্রুত?

কেন পুঁজিবাদীদের কাউন্টারের দাঁড়িয়ে সেই একই রুশ মেয়েগুলো সোফিয়া লোরেনের মত হাসে অথচ বিগত ৭০ বছর ধরে সমাজতন্ত্রের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে “বাবা ইয়াগার” মত মুখ গোমড়া করে ছিল?

ওদের বিল্ডিংয়ের ভেতরটা কেন এত ঝকঝকে তকতক করে এবং বাথরুমগুলোতে ইউরিয়ার গন্ধ নেই?

কেন তাদের দেশ এমন একটা খাবার দোকান তৈরি করতে পারেনি, এমন পরিচ্ছন্ন, মানবিক সার্ভিসসহ এত এফিশিয়েন্ট?

সমাজতন্ত্রের সাথে এই ব্যর্থতার কী সম্পর্ক?
 
অভ্রের চোখের সামনে দিয়ে বায়োস্কোপের মত বয়ে যায় শতাব্দীর এক বৃহৎ মৃত্যু; মানবতা মুক্তির স্বপ্নের মৃত্যুর দৃশ্যগুলো:

১৯৮৫ সালের মার্চের ১১ তারিখ। গর্বাচেভ পর্দার আড়ালে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী লেনিনগ্রাদের পার্টি সেক্রেটারি গ্রিগরি রমানভকে ক্ষমতার দৌড়ে হারিয়ে সোভিয়েত কমিউনিষ্ট পার্টির জেনেরাল সেক্রেটারি হয়েছেন। এত ইয়ং ও এনার্জেটিক নেতা এই দেশের জনগণ আর দেখেনি। যদিও স্ট্যালিনও একদিন যথেষ্ট ইয়ং ছিলেন কিন্তু তা এখন জন-বিশ্রুত। ব্রেজনেভকে মনে হয়েছে আজন্ম বৃদ্ধ একজন মানুষ, যে ক্ষমতার কড়িকাঠে ছত্রাকের মত চিরন্তন হয়ে গেছে।

তার পরে মুমূর্ষদের মিছিল: আন্দ্রোপভ ও চেরনেন্কো ।

সমাজের বহুযুগের সঞ্চিত অচলায়তন। তারপর দমকা হাওয়ার মত গর্বাচভ, মানুষের আশা ও উদ্দীপনার উৎস ! আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সে নিয়ে আসে নতুন ডকট্রিন, ‘পলিতিকা নভাবা মিশলেনিয়া’ বা রাজনীতিতে নতুন চিন্তা। প্রলেতারিয়েতের একনায়কত্ব নয় বরং দুই সিস্টেমের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সহযোগিতা।

এমন কথা এর আগে এত স্পষ্ট করে কেউ বলেনি।
 
দেশের ভেতরে রিফর্মের প্রথম পদক্ষেপে আসে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিবর্ধন বা “উসকোরেনিয়ে” র ঘোষণা নিয়ে। যার লক্ষ্য হলো কর্মক্ষেত্রে শৃংখলা, কর্মদক্ষতা ও শ্রমের কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ১৫ বছরে জাতীয় আয় দ্বিগুন করা। ২০০০ সালের মধ্যে কম্যুনাল কোয়ার্টার বিলুপ্ত করে প্রতিটি পরিবারকে নিজস্ব কোয়ার্টার দেয়া। “প্রতিযোগিতায় শুধুমাত্র আমেরিকার নাগাল ধরা নয় বরং আমেরিকাকে অতিক্রম করে যাওয়া।”

কি জীবন্ত ও উদ্দীপনায় উজ্জ্বল সেই প্রতিশ্রুতিগুলো!
 
১৯৮৫ সালের মে মাসে, ক্ষমতা গ্রহণের ২ মাস পরেই তিনি লেনিনগ্রাদে মদ্যপান বিরোধী অভিযান শুরু করার ঘোষণা দেন। কত মানুষ ছিল সেই মিটিংয়ে, কত স্বতস্ফুর্ততা ও আশা ছিল জনগণের মধ্যে! ছিল মানুষের ত্যাগ স্বীকারের প্রতিশ্রুতি। এলকোহল উৎপাদন কমিয়ে দেয়া হয়। এলকোহলের দোকানের সংখ্যা ও তাদের খোলা রাখার সময় কমানো হয়। রেস্টুরেন্টগুলোতে দুপুর ২ টার আগে মদ বেচা-কেনা নিষিদ্ধ করা হয়। এমনকি অফিশিয়াল মিটিংগুলোতে এলকোহলের বদলে মিনেরাল ওয়াটার সার্ভ করা শুরু হয়।

কিন্তু শিগগিরই প্রমাণিত হবে যে এটা ছিল একটি অতি প্রয়োজনীয় কিন্তু অসময়ের ভ্রান্ত পদক্ষেপ। কারণ মদ বিক্রির থেকে রাষ্ট্রের আয় ছিল বিশাল। ১৯৭৯ সালে সংখ্যাটা ছিল ২৫.৪ বিলিয়ন রুবল। সেই আয়ের বিকল্প না খুঁজে বেফাস এই ঘোষণা অচিরেই সিরিয়াস বাজেট ডেফিসিট ও মুদ্রাস্ফীতির সৃষ্টি করে। শুধু তাই নয় যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা মলদোভিয়া, আর্মেনিয়া এবং জর্জিয়ার ম্যাচিউর আঙ্গুরের বাগানগুলো ধ্বংস করে দেয় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা। সাথে সাথে গর্বাচভের নাম বদলে যায় “গেনেরালনি” (জেনেরাল) সেক্রেটারি থেকে “মিনেরালনি” (মিনেরাল) সেক্রেটারিতে।

মদ হল রাশিয়ার পবিত্র জিনিসগুলোর অন্যতম। যা পবিত্র তা স্পর্শ করার আগে চিন্তা করতে হয়। গর্বাচভ এখানে ভুল চিন্তা করেন। তার সাড়াশি রাজনীতির ফলে মদ পান কমে আসে ঠিকই কিন্তু ঘরে ঘরে অবৈধ, ‘সামাগন’ নামের নীচু মানের, কখনও কখনও বিষাক্ত মদ তৈরি হতে থাকে। আসক্ত মদ্যপের দল পান করতে থাকে কমার্শিয়াল স্পিরিট, শেভিং কলোন ইত্যাদি। হাসপাতালগুলো ভরে যেতে থাকে বিষে আক্রান্ত মাতাল মচ্ছবে। রাশিয়া বহুশত বছর ধরে তৈরি করেছে যে মদখোর মহাজাতিটিকে, বিগত ৭০ বছরে হয়েছে তাদের সংখ্যার মহা উল্লম্ফন।

১৯৮৬ সালের ফেব্রুয়ারি -মার্চ মাসে পার্টির ২৭ তম কংগ্রেসে কমিউনিজম প্রতিষ্ঠার শ্লোগান বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্রকে ত্রুটিমুক্ত করার শ্লোগান নিয়ে বের হয়ে আসতে না আসতেই, এপ্রিল মাসের ২৬ তারিখে ঘটে যায় চের্নোবিলের সর্বনাশা দুর্ঘটনা ।

গর্বাচভ ও মিডিয়া সর্বতোভাবে চেষ্টা করে তা চেপে যেতে। দেশের মানুষ গুজব শোনে কিন্তু আসলে কি হয়েছে কিছুই জানতে পায় না। তখনও মিডিয়ার ওপরে রাষ্ট্রের কন্ট্রোল ছিল একচ্ছত্র। গর্বাচভকে প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার খরচ করে এই বিপদের মোকাবিলা করতে হয়, শূন্য কোষাগার আরও বেশি শূন্যতার আওয়াজে ভরে ওঠে।

এর পরেই আসে গ্লাসনস্তের ঘোষণা।

জারতান্ত্রিক রাশিয়ায় মানুষ বিপ্লবের আগে যতটুকুই কথা বলতে, প্রতিবাদ ও মিছিল করতে পারতো, বিপ্লবের পরে ৭০ বছর সোভিয়েত ইউনিয়নে তা নেমে এসেছিল শূন্যের কোঠায়। ভিন্নমত ও প্রতিবাদের শাস্তি ছিল জারতন্ত্রের চেয়েও কঠিন।

৮০ দশকের মাঝামাঝি মানুষ ছিল নিঃস্ব, তিক্ত ও বিরক্ত। দোকানগুলো পণ্যহীন গড়ের মাঠ, অথচ ক্ষমতার করিডোরে বড় বড় প্রতিশ্রুতি। এই সময়ে হঠাৎ করে তাদের কথা বলার, সমালোচনা করার ও মিছিল মিটিং করার অধিকার ফেরত দেয়া হল। যেন কোনো অদৃশ্য ঈশ্বর, কোনো evil genius, অতি পরিকল্পিতভাবে একটির পর একটি ভুল পদক্ষেপ দিয়ে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসের দিকে।

“ভাত দে হারামজাদা নইলে মানচিত্র খাবো।”

দীর্ঘদিন কুলুপ মেরে রাখা ক্ষুধার্ত ও ক্ষিপ্ত মুখগুলো খুলে দিলে একটি শিশুও এই শ্লোগান দেয়।


২৯ তম পর্ব

১৯৮১ সালে ক্ষমতায় এসেই রোনাল্ড রিগ্যান সোভিয়েত ইউনিয়নকে “শয়তানের সাম্রাজ্য” আখ্যা দিয়ে তাকে ধংস করার উদ্দেশ্যে ম্যাসিভ যুদ্ধ প্রতিযোগিতা শুরু করেন। আমেরিকার জন্য অস্ত্র তৈরি করা লাভের বিষয় কারণ সেখানে অস্ত্রের উৎপাদনকারি হচ্ছে মুনাফালোভী কতগুলো প্রাইভেট কোম্পানি এবং কিন্তু ক্রেতা হচ্ছে রাষ্ট্র এবং বহির্বিশ্বের বান্ধব রাষ্ট্রেরা। সুতরাং বিশ্বব্যাপী যেখানেই যুদ্ধ লাগুক তাদের অস্ত্রের ব্যবসা রমরমা হয়ে ওঠে। যুদ্ধ পুঁজিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের জীয়নকাঠি।

কিন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রে বিষয়টা ছিলো অন্যরকম। সেখানে অস্ত্রের উৎপাদনকারী যে, ক্রেতাও সেই, মানে রাষ্ট্র। এখানে একটাই খাত, খরচের খাত, কোনো আয় নেই। একটু আধটু অস্ত্র তারাও বিক্রি করতো কিন্তু আমেরিকার তুলনায় তা ছিল নগন্য।
 
একটা সমাজ যার আয়ের খাতে নেগিটিভ ব্যালান্স : কৃষিতে লোকসান বলে খাদ্য আমদানী করতে হয় (বিশ্বের সবচেয়ে বড় খাদ্য আমদানীকারক দেশ), হাল্কা ইন্ডাস্ট্রি -প্রিমিটিভ পর্যায়ে, কিছুই নিজেরা তৈরি করতে পারে না, টুথ পেস্টও না, আমদানি করতে হয় সোসালিস্ট দেশগুলো বা ফিনল্যান্ড থেকে।হেভি ইন্ডাস্ট্রি-গাড়ি, ট্রাকটর, ট্যাংক, জেনেরেটর ইত্যাদির কোনো বৈদেশিক ক্রেতা নেই। একমাত্র ক্রেতা রাষ্ট্রিয় সংগঠনগুলো, কিন্তু তাদের প্রায় প্রতিটিই লোকসানের খাতায় …..

মহাকাশ বিজয়ের প্রতিযোগিতায় খরচ আকাশচুম্বী, আয় প্রায় শূন্য।
 
অন্যদিকে ব্যয়ের খাত উদারঃ শিক্ষা, চিকিৎসা, বাসস্থান, ভেকেশন, পেনশন ফ্রি। সারা বিশ্বের ভাতৃপ্রতিম কমিউনিষ্ট পার্টিগুলোকে অর্থ, বৃত্তি, চিকিৎসা, ফ্রি বই, ফ্রি জার্নাল…. বিতরণ করা।

তাহলে এই রাষ্ট্র চলে কিভাবে?

তেল...গ্যাস…ডায়মন্ড...টিম্বার বিক্রি করে

৭০ দশকে সাইবেরিয়ার তেল ছিল জীয়ন কাঠি….তেল নেই, রাষ্ট্র নেই।
 
রিগ্যানের strategic defense initiative (SDI) এর মূল লক্ষ্য ছিল সোভিয়েত মিসাইল সমূহকে শূন্যে ধরে ফেলে ধ্বংস করে দেয়া। এর মাধ্যমে তারা মনে করে নিউক্লিয়ার যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বাধ্য হয় অস্ত্র প্রতিযোগিতায় আরো বেশি খরচ করতে। কিন্তু বৈদেশিক বানিজ্যে তারা ছিল সারা দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন।

এবার রিগ্যান - সৌদী সম্মিলিত চক্র হাত দেয় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রাণ ভোমরায়। শুরু হয় তেলের দাম কমানো। সোভিয়েত ইউনিয়নের কফিনের শেষ পেরেকটি মারা হয় ১৯৮৫ সালের ১৩ই সেপ্টেম্বর, যেদিন সৌদী সরকার তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়ে তেলের দাম কমাতে শুরু করে।
 
পাশাপাশি আঘাত আসে কাজাখস্থান থেকে, অপ্রত্যাশিতভাবে। ১৯৮৬ সালের ডিসেম্বর মাসে দুর্নীতিগ্রস্ত পার্টি সেক্রেটারি কুনায়েভকে ক্ষমতাচ্যুত করে একজন রাশিয়ানকে সেক্রেটারি বানানোর সাথে সাথে আলমা আতায় রায়টের সৃষ্টি হয়। দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে তা বিভিন্ন শহরে। প্রায় ৩০-৪০ হাজার লোক অংশ গ্রহণ করে। এমন ঘটনা সোভিয়েত ইউনিয়ন কোনোদিন দেখেনি।

এতবড় আস্পর্ধা সাধারণ মানুষের! প্রায় ৫ হাজার গ্রেফতার হয়, প্রায় ২০০ জন হয় নিহত। 
 
বোঝা যায়, গ্লাসনস্ত নয়, গর্বাচভ এতকালের বোতলে আবদ্ধ জ্বীনকে মুক্ত করে দিয়েছেন।

১৯৮৭ সালের মে মাসে আল্ট্রা ন্যাশনালিস্ট গ্রুপ “পামিয়াত” মস্কোতে বিশাল মিছিল করে। এ যেন বামের বাগানে ডানপন্থী দানোর শুড় উচিয়ে শিশ্ দেয়া। কিছুদিন পরেই ক্রিমিয়া থেকে স্ট্যালিন কর্তৃক বহিস্কৃত ও নির্বাসিত তাতারদের ক্রিমিয়ায় ফিরে যেতে দেবার দাবী করে মিছিল ও শ্লোগান প্রতিধ্বনিত হয় ক্রেমলিনের দেয়ালে দেয়ালে।
 
অফিশিয়ালভাবে পেরেস্ত্রইকার ডাক আসে ১৯৮৭র জানুয়ারি মাসে। কিন্তু ততদিনে গর্বাচভ জল যথেষ্ট ঘোলা করে ফেলেছেন। তার মদ্যপান বিরোধী অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। তিনি দোদুল্যমানতায় দুলছেন, কখনও ডানে কখনও বামে, আউরাচ্ছেন পুরানো কথা, পুরানো গল্প, ফাঁকা প্রতিশ্রুতি কিন্তু প্রকৃত কোনো পদক্ষেপ নেই। জনগণ বিতশ্রদ্ধ।
 
১৯৮৮ ককেশিয়ার আর্মেনিয়া আজারবাইজানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয় “নাগোরনি কারাবাখ” নিয়ে। সোভিয়েত জমিতে যুদ্ধ ! কেউ কোনোদিন কল্পনাও করেনি।
 
১৯৮৯ ফেব্রুয়ারি মাসে আফগানিস্তান থেকে শেষ সোভিয়েত সৈন্যটিকে ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়। ক্ষিপ্ত বিক্ষুদ্ধ আহত কর্মহীন ও প্রতিবন্ধী অজস্র সৈন্য বুঝতে পারে যদিও তাদের “আফগান ভেটেরান”, বীর ইত্যাদি নাম দেয়া হয়েছে, মাতৃভূমি তাদের প্রতি খুব শীতল, তারা থাকলেও যা, না থাকলেও তাই। এবং যে জাহান্নাম তারা পার হয়ে এসেছে তা

ছিল মেধাহীন নেতাদের হঠকারি সিদ্ধান্তের ফল।

রাষ্ট্র এখন দেউলিয়া, তাদের চাকরি দেবার সামর্থ্য রাষ্ট্রের নাই। কিন্তু তাদের যুদ্ধ ও মানুষ মারার অভিজ্ঞতা লুফে নেবার জন্য আছে সদ্য আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া “নতুন রাশিয়ান” ও মাফিয়া চক্র। এই সৈন্যদের একটা বড় অংশ আস্তে আস্তে বিদ্রুত হয়ে যায় সেই দেশের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য ক্রিমিনাল ধারায়। 
 
১৯৮৯ সালের ৭ -৯ এপ্রিল জর্জিয়ার তিবিলিস ফেটে পড়ে রাগ ও প্রতিবাদে, ১ লক্ষ জর্জিয়ান স্বাধীনতা দাবী করে। সেই ডেমোন্স্ট্রেশন দমাতে সৈন্য নামানো হয়। প্রায় ২০ জন মারা যায় ।
 
আগস্ট মাসে ( ১৯৮৯ সাল ) বের হয়ে আসে ১৯৩৯ সালে সই করা নাৎসী- সোভিয়েত নন-আগ্রাসন চুক্তির ( রিবেনট্রপ - মলোতভ গোপন চুক্তি) সংবাদ। এই চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন পশ্চিম পোল্যান্ড নাৎসীদের হাতে ছেড়ে দেয়ার বিনিময়ে তিনটি বাল্টিক রাষ্ট্র, পূর্ব পোল্যান্ড এবং মলদোভিয়ার কিছু অংশ দখল করে অনুমতি পায়। বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর জনগণ রাগে বিস্ফোরিত হয়। শুরু হয় প্রতিবাদ এবং তারা নাৎসীদের সাথে যোগ সাজসে “দখলকারী” সোভিয়েত রাষ্ট্র থেকে বের হয়ে যাবার আওয়াজ তোলে।
 
পূর্ব ইওরোপে একের পর এক কমিউনিস্ট সরকারগুলোর পতন শুরু হতে থাকে জন-গণ-অভ্যুথ্থানের ধাক্কায়। নভেম্বরে (১৯৮৯) বার্লিন দেয়াল ভেঙে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে। ডিসেম্বরে রুমানিয়ায় রক্তাক্ত বিপ্লব সংঘটিত হয় এবং চওসেস্কু ও তার স্ত্রী এলেনাকে হত্যা করা হয় ফায়ারিং স্কোয়াডে।
 
১৯৯০ শুরু হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে পূর্ব ইউরোপের পরিবর্তনের ঢেউয়ের তীব্র আঘাত নিয়ে । আজারবাইজানিরা হাজারে হাজারে বার্লিন ওয়ালের মত ইরানের বর্ডার ভেঙে বুকে জড়িয়ে ধরে অন্য দিকের স্বজনদের ।

ফেব্রুয়ারি মাসে কমিউনিস্ট পার্টির গঠনতন্ত্র থেকে “নেতৃত্বদানকারী” কথাটি তুলে নেয়া হয়।

মার্চে বরিস ইয়েল্ৎসিন রাশিয়ার সুপ্রিম সোভিয়েতের প্রেসিডেন্ট নির্বাচত হয়। লিথুনিয়া ও এস্টোনিয়ার পার্লামেন্ট স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এপ্রিলে লাটভিয়া ও করে তাই।

আর্মেনিয়ার ইয়েরেভানে এন্টি-সোভিয়েত মিছিল বের হয়। জুনে রাশিয়া, উজবেকিস্থান, মলদোভিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে।

জুলাইতে কমিউনিস্ট পার্টির ২৮তম কংগ্রেসে ইয়েল্ৎসিন পার্টি ত্যাগ করে নিজেকে ডেমোক্রাট বলে ঘোষণা দেয়। গর্বাচভ- হেলমুট কোহল দুই জার্মানির একত্রীকরণের সিদ্ধান্ত নেয়, শুধু তাই নয় জার্মানিকে ন্যাটোতে থাকার অনুমতি দেয়।
 
আগস্টে আর্মেনিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে।অক্টোবরে দুই জার্মানী এক হয় এবং গর্বাচভ পারিশ্রমিক হিসেবে “নোবেল শান্তি” পুরুস্কার পান। নভেম্বরে মলদোভিয়ায় শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। জর্জিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ডিসেম্বরে রাশিয়ার পার্লামেন্ট সোভিয়েত সরকারের বাজেটে অনুরোধকৃত অর্থের এক দশমাংশ মাত্র অনুমোদন করে।
 
রাস্তা ঘাটে সর্বত্র বাজতে থাকে উচু স্বরে গর্বাচভের দোদুল্যমান চরিত্রের চিত্রন নিয়ে মিখাইল জাদরনভ লেখেন প্যরোডির গান :

দা-দু দা-দু দা দা-দু দা-দু দা

যা অতি সুক্ষ্নতার সাথে চিহ্নিত করেছে গর্বাচভ নামের ইতিহাসের এক কলংকের কদর্যতাকে। পেরেস্ত্রইকার ট্র্যাজিডি বর্ণনাকারী এই গানের ব্যাকগ্রাউন্ডে বাস্তবতার চিত্রকে প্রকট করে তুলে অশ্লীল কিছু যৌন শিৎকার ও তৃপ্তির চিৎকারে আপ্লুত এক নারীকণ্ঠ। ধর্ষিতা নারী তৃপ্তির শিৎকার তোলে না। কিন্তু সারা দেশটিই তখন ধর্ষিত হচ্ছিল দুশ্চরিত্র দুর্বিত্তদের হাতে, আর এই গান ছিল তার জীবন্ত প্রকাশ। একটি গান সারা পেরেস্ত্রইকার সারমর্ম। 
 
১৯৯১ জানুয়ারি ১৩ তারিখে সোভিয়েত সৈন্য ও কেজিবির স্পেৎজ নাজ আলফাগ্রুপ লিথুনিয়ার টিভি স্টেশন দখল নিতে গিয়ে ১৪ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করে। তাই পরিপূর্ণ করে দেয় প্রতিবাদের পেয়ালা।

স্ট্যালিন - হিটলার মৈত্রী নিপাত যাক!

দখলকারী ভাগো।

সোভিয়েত ইউনিয়ন বাল্টিক দেশসমূহ থেকে বিতাড়িত হয়। 
 
মার্চ মাসে সোভিয়েত ইউনিয়ন সংরক্ষণের রেফারেন্ডাম হয়। কিন্তু আর্মেনিয়া, জর্জিয়া, মলদোভিয়া, লিথুনিয়া, লাতভিয়া, এস্টোনিয়া বয়কট করে। বাকি রাষ্ট্রগুলোর ৭০ % জনগণ ভোট দেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন সংরক্ষনের পক্ষে। কিন্তু জনগণ কখনই সিদ্ধান্ত নেয় না, সিদ্ধান্ত নেয় তারা, যারা ছিল এতদিন কম্যুনিষ্ট পার্টির নেতা, কিন্ত এখন ডেমোক্র্যাট। অর্থাৎ মননে কম্যুনিষ্ট। এতদিন রাষ্ট্র তাদের হাতে থেকেই দেউলিয়া হয়েছে, এখনও তারাই নাম বদলে রাষ্ট্রকে পকেটস্থ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত।
 
প্রাচীন দার্শনিক অ্যানাখারসিস লক্ষ্য করেছিলেন যে, গ্রীসে “জ্ঞানী ব্যক্তিরা কথা বলে, কিন্তু মুর্খেরা সিদ্ধান্ত নেয়।" অ্যানাখারসিস ছিলেন প্রাচীন যুগের মানুষ। সোভিয়েত ইউনিয়নে মানুষ কথাই বলতে পারতো না, মার্কসবাদে জ্ঞানী ব্যক্তিরা সিদ্ধান্ত নিত। এই জ্ঞানীদের এখন স্ব স্ব দেশে রাজা হয়ে বসার সুবর্ণ সময়, তারা কেন গর্বাচভের অধীনে প্রজা হিসেবে থাকবে? তাই তাদের প্রয়োজন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙা।
 
এর পরেই আসে আগস্টের ক্যু, কেজিবি চিফ ক্রিউচকভ, আর্মি চিফ মার্শাল ইয়াজভ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী বরিস পুগোর সমর্থন নিয়ে পেরেস্ত্রইকা পূর্ববর্তী সোভিয়েত ইউনিয়নে ফিরে যাবার দিবাস্বপ্নে অন্ধ একদল কট্টরপন্থী আগস্টের ১৯ তারিখে ক্রিমিয়ায় ছুটি কাটাতে যাওয়া গর্বাচভকে ক্ষমতাচ্যুত করার ঘোষণা দেয়। ভাষ্যমতে গর্বাচভ নিজেই ছিল এই ক্যুয়ের মাস্টার মাইন্ড।

তিনদিন পরে ক্যু ব্যর্থ হয়।

ইয়েল্ৎসিন হিরো হিসেবে বের হয়ে আসে। গর্বাচভ পরিণত হয় পুতুলে। সে নতুন ইউনিয়ন চুক্তির মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে, কিন্তু ব্যর্থ হয়।
 
ডিসেম্বরে রাশিয়ার ইয়েল্ৎসিন, ইউক্রেনের ক্রাভচুক ও বেলারুশিয়ার শুশকেভিচ মিনস্কে এক গোপন মিটিংয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করে। সোভিয়েত আইনে এই ঘোষণা ছিল অবৈধ ।

কিন্তু তাদের প্রতিহত করে কে?

আমেরিকা অবিলম্বে তাদের অভিনন্দন জানিয়ে স্বীকৃতি দেয়।

২৫ শে ডিসেম্বর (১৯৯১ সাল) গর্বাচভ অফিশিয়ালী সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি ঘোষণা করে পদত্যাগ করেন।
 
২৫ শে ডিসেম্বর ১৯৯১ সাল। ইন্নালিল্লাহ ওয়া ইন্নালিলাইহে রাজিউন! শতাব্দীর বৃহত্তম মৃত্যু! মানবতা মুক্তির স্বপ্নের মৃত্যু!
 
গাছের ছায়াগুলো লম্বা হয়ে এসেছে। ম্যাকডোনাল্ডসের লাইন দ্রুত এগিয়ে চলেছে। কত মানুষ!

ছোট মাঝারি লম্বা। কেউ হাসছে, কেউ কথা বলছে, কেউ তাকিয়ে আছে।

সুন্দর মানুষ!

তারা অজানাকে জানতে ও অনাস্বাদিতকে আস্বাদন করতে চায়। যাই হোক না কেন তার মান, মানুষ নিজে তা নির্ধারণ করতে চায়। মনে নেই দস্তয়েভস্কীর কথা?

“মানুষ যা চায়, তা হলো তার নিজের পছন্দের স্বাধীনতা, সেই স্বাধীনতার মূল্য যাই হোক বা তা মানুষকে যেখানেই নিয়ে যাক না কেন”

নাস্তিয়া হেঁটে আসছে গোর্কী স্ট্রিট ধরে। অদ্ভুত সৌষ্ঠবময় ওর হাঁটার স্টাইল।

ঋজু পিঠ, দৃষ্টিবিদ্ধকারী আঠারোর বুক।

হাঁটা নয় ঢেউ।

দূরে পদ্মানদীর বুক থেকে উঠে আসা ঢেউ।

অথবা রিজানের মাঠে ইয়েসিনিনের কবিতার ছন্দের মত হাওয়া। ও অভ্রের দিকে তাকিয়ে হাসছে। অদ্ভুত সুন্দর সেই হাসি। 
 
কলেজে অভ্র ডাইরি লিখতো, দেশী বিদেশী কোন ভালো কবিতা পড়লেই টুকে রাখতো সেই ডাইরির পাতায়। নাস্তিয়ার হাসিমুখের দিকে তাকিয়ে ওর মনে পড়ে প্রাচীন প্রাচীন গ্রিক কবি অ্যানাক্রেওনের একটি কবিতার কথা। 
 
“নিজেকে বিপর্যস্ত দেখে আমার মন উচাটন
আমাকে ধরাশায়ী করেনি কোনো সশস্ত্র সেনা, না কোন নৌ জোয়ান;
অথচ ছিন্নভিন্ন আমি,
আমার হৃদয় করেছে খানখান
একটি মেয়ের মায়া বিদ্যুৎ- বাঁকা দু'নয়ন!”*
 
অভ্রের হৃদয়ে কি কোনো দোলা আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ছে ইথারের তরঙ্গের মত? অথবা পাহাড় বেয়ে ধীরে নেমে আসা কুয়াসার মত কোনো অচেতন বোধ? অনেক নারীর সংস্পর্শে সে এসেছে। কিন্তু সে যেন একটা টেস্ট টিউব এখন। তার ভেতরে কিছু কেমিক্যাল রিয়েকশন হচ্ছে, সঠিক কী, সে এখনও বুঝতে পারছে না, কিন্তু সেই রিয়েকশনের বিনির্গত উত্তাপ ঠিকই অনুভব করছে।


চলবে

*বন্ধু কবি বদরুজ্জামান আলমগীর অনুবাদটি করতে সাহায্য করেছেনH


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন