মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

সমরেশ বসুর দুনিয়া : মেজদার দোকান--১

অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়

শীতের সন্ধ্যে।কলকারখানা ঘেরা শহরতলী। মেজদার চা-ঘুগনির দোকানে আড্ডা বসেছে। আড্ডার আসল আকর্ষন মেজদা নিজেই। ঢালাই কারখানার মিস্ত্রীর আর ট্রেড ইউনিয়নের জীবন কাটিয়েছেন। পুরনো ট্রেড ইউনিয়নের ট্রাডিশনে, নেশা ছিল পাড়ার পাবলিক লাইব্রেরীর বই পড়া। কারখানা বন্ধ হয়ে যেতে এখন চা-ঘুগনি্র দোকান।

আড্ডার মাঝে এক বন্ধু প্রফেসর বলছিলেন, ‘এই বাঙলায় একসময় মহিলা টেক্সটাইল টেকনিশিয়ানদের ল্যাঙ্কাশায়ার থেকে আনা হয়েছিল। বাঙালি মহিলা শ্রমিকদের ট্রেনিং দেবার জন্যে। জেনেট হেনরি কেইলম্যান বলে এক মহিলার স্মৃতিকথাতে আছে। সে অনেককাল আগে, ১৮২০ সালের লেখা।’ অজানা দুষ্প্রাপ্য এক তথ্য।

মেজদা খদ্দেরের জন্যে টোস্টে মাখন চিনি লাগাচ্ছিলেন। মুখ ঘুরিয়ে বলেছিলেন, “এটা কিন্তু সমরেশ বসুর ‘জগদ্দলে’ আছে। ওইসব ব্রিটিশ মেয়েদের কবর, হাওড়ার বাউড়িয়া কটন মিলে আছে। কেউ কেউ বাঙালি বিয়েও করেছিল।”

এইরকমই আর এক সন্ধ্যেতে কথা উঠেছিল, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে ব্রিটেনের কমিউনিস্ট পার্টির সম্পর্ক নিয়ে। তাছাড়াও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ, কুইট ইন্ডিয়া মুভমেন্টের সময় বাঙলায় কমিউনিস্টদের সঙ্গে, সোশালিস্ট পার্টি, ফরোয়ার্ডব্লকের সম্পর্ক কি ছিল? এইসব।মানে এককথায় ৪০-৫০ এর ঝড়ঝাপটার দশকগুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস। গবেষক-প্রফেসর বন্ধুরা থিওডর ড্রেপ,ভিক্টর কিয়েরম্যান, মিনু মাসানি, রজনী পাম দত্ত,ইত্যাদি লেখক বা নেতাদের লেখা/চিঠির উল্লেখ করছিলেন। মেজদা ঘুগনিতে নারকোল কুঁচো মেশাতে মশাতে বলেছিলেন, “ওসব লেখা এই আধা শহরে কোথায় পাবেন? সমরেশ বসুর ‘খন্ডিতা,’যুগ যুগ জিয়ে’ পড়ুন বেশ কিছু সূত্র পাবেন।”

সেই ধুলো ধোঁয়া মাখা সন্ধ্যেগুলো আমার মনে আছে।আর সেই নতুন করে সমরেশ পড়ার শুরু।

সমরেশ আমাদের খাঁটি রাজনৈতিক কর্মীসমাজের মাঝে টেনে এনে ফেলে দিয়েছিলেন। দেখিয়ে দিয়েছিলেন কেমন করে ঐতিহাসিক উপন্যাস আর রাজনৈতিক উপন্যাসের মাঝের কাঁটাতারের বেড়া আলগা করে দেওয়া যায়। আমরা আস্তে আস্তে বুঝতে পারছিলুম, বাঙলার বামপন্থী উপন্যাসের বাউন্ডারি তাঁর হাত ধরে অনেক বড়ো হয়ে গেছে। বামপন্থী,প্রগতিশীল গদ্যসাহিত্যর প্রধান জমি ছিল চাষীর লড়াই, শ্রমিক সংগঠন আর মধ্যবিত্তর পিছুটান। এইভাবে সার্থক ট্র্যাডিশন যখন তৈরি হয়েছে, তখন রাজনীতির অন্যদিক, মানে তার নেতৃত্ব, দ্বন্দ্ব, রাজনীতির ঘূর্ণী, অলি-গলির দরজাটা সমরেশ বসু খুলে দিয়েছিলেন। এমনকি কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে অন্যান্য ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতাসংগ্রামীদের খুনোখুনি, অন্ধগলির চোরাগোপ্তা রাজনীতি আমাদের সামনে চলে আসে। এককথায় চল্লিশের দশকের ধূলো মাখা ঝোড়ো হাওয়াকে নির্মম আয়নার মতো সমরেশ আমাদের সামনে নিয়ে আসেন। এই দশক ভারতীয় রাজনীতির সবচেয়ে উত্তাল, রক্তাক্ত পিরিয়ড আবার একই সঙ্গে অস্বস্তিকর অধ্যায়। কমিউনিস্ট পার্টির কাছে এই যুগ এক বিতর্কিত পর্ব। উত্তরঙ্গ, জগদ্দল, শ্রীমতীকাফে, খন্ডিতা, শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে, যুগ যুজ জীয়ে রাজনৈতিক-ঐতিহাসিক কাহিনির ঐতিহ্যের আকাশটাকে অনেক বড় করে দিয়েছিল।

চল্লিশের দশকে কমিউনিস্ট পার্টির নীচুতলার মধ্যবিত্ত কর্মীদের কথা সমরেশ, পাঠকের সামনে নিয়ে এসেছিলেন এভাবে —
‘...কাস্তে হাতিড়ি ছাপ দেওয়া বই হাতে হাতে আসত, যা তখন নিষিদ্ধ। সাধারন কর্মীরা আগস্টে হঠাৎ স্ত্যালিন-হিটলার চুক্তির খবরে বিভ্রান্ত। ফ্যাসিস্ট বিরোধী আন্দোলন বন্ধ হতে শুরু হতে লাগল। তারপরে আবার হঠাৎ যখন কমিনটার্নের নীতি বদলে জনযুদ্ধের রাজনীতি এল, তখন আবার একটা ধাক্কার সামনে কমিউনিস্ট কর্মীরা পড়ে গেল। আন্ডারগ্রাউন্ড পার্টি তখনো জনযুদ্ধের ডাক গ্রহন করেনি। কমিন্টার্নের অফিসিয়াল নির্দেশ অনুযায়ী, তখনও ব্রিটিশ ফ্রান্স সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টির যারা আজমীঢ় মারোয়াড় বা দেওলি জেলে ছিলেন তাঁদের কাছে (কমিন্টার্নের নির্দেশ, ব্রিটিশ কমিউনিস্ট পার্টির মারফত ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে) জনযুদ্ধের আর ফ্যাসিস্টবিরোধী ফ্রন্টের চূড়ান্ত নির্দেশ পৌঁছে যায়। নীচুতলার কর্মীরা আবার উলটো বিভ্রান্তি তে পড়ে যায়।’

‘আন্ডারগ্রাউন্ড থেকে ফেরার কর্মীরা, নিজেদেরই পার্টির নেতাদের প্রতি তীব্র প্রতিবাদ (করেছিলেন) – ‘দে(লিডারস) আর ফলোয়িং দ্য ইম্পিরিয়ালিস্ট লাই’।

আমরা যখন প্রথম যুগ যুগ জিয়ে পড়ি এই অংশে এসে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলুম। এটাকি পড়ছি! সমরেশ এসব তথ্য পেলেন কোথা থেকে!

এই অংশের কিছ পরেই সেই সময়কার বাংলার শহরতলীর রাজনৈতিক পরিবেশ বোঝাতে একটা আড্ডার সামনে পাঠকদের নিয়ে আসেন— মুখোমুখি সবিতাব্রত পন্ডিত নামে এক উচ্চমধ্যবিত্ত কমিউনিস্ট কর্মী আর দয়াল মিশির নামে চটকলের বিহারী লাইনের ছোট ব্যবসায়ীর আদর্শবান যুবক।বিহার মুল্লুকে কাজে গিয়ে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টির মধ্যে জড়িয়ে পড়ে হঠাৎ ফিরে এসেছে।

‘দয়াল মিশির বলে, “পালিয়ে এসেছি। আমার নামে হুলিয়া আছে। এখানে বিপ্লব শুরু করতে হবে। ওরা আমাদের গুলি করে মারছে গ্রেপ্তার করছে। আমরা হরতালের ডাক দিচ্ছি, কাজ কারবার বন্ধ করে দিচ্ছি, রেল লাইন উপড়ে ফেলে ট্রান্সপোর্ট আটকে দিচ্ছি। সরকার আমাদের গয়েরকানুনি ডিকলিয়ার করেছে। কাগজে লিখেছে বোমের ভয়ে, ডকে ইউ.পি বিহারের মজুরের সংখ্যা কমে গেছে। রিকশা টানার লোকের অভাব। ভালোই হচ্ছে। সব কোলাপ্‌স হয়ে যাবে। ব্রিটিশরাজের লড়াই চলতে দেব না।’

পন্ডিতের দৃষ্টি কাগজের দিকে। কিন্তু ও কিছুই পড়ে না। মনে পড়ে যায় গত বারোই আগস্ট হ্যারি পলিটকে লেখা পি সি যোশীর চিঠির কথা, ‘আওয়ার ফেলো পেট্রিয়টস হ্যাভ বিন প্রোভোকড টু দেয়ার প্রেজেন্ট সুইসাইডাল কোর্স বাই দ্য ইম্‌পিরিয়ালিস্ট রুলারস’। সেই সঙ্গে মনে পড়ে যায়, ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির নীতি সম্পর্কে পাম দত্তের চার্চিলকে চিঠি।’

দয়াল বলে, “(সবিতাব্রত পন্ডিতকে) কিন্তু আপনি কিছু বলছেন না।’

‘তোমার সঙ্গে আমার মতের মিল নেই।’

আর তার পরেই পুলিশ আসে দয়ালকে এ্যারেস্ট করতে। ধস্তাধস্তির মাঝে দয়াল এ্যারেস্ট হয়। সবিতাব্রত দয়ালকে মারার প্রতিবাদ করে। পুলিশের ছোটবাবু সবিতাব্রতকে ধমকে ওঠে। বড়বাবু চিনিতে পেরে বলেন, ‘ওঁকে চেনেন না?আশ্চর্য! জনযুদ্ধওয়ালা। ওঁদের নিয়ে কোন ঝামেলা নেই।’

উপন্যাসের গোড়ার দিকে আবহাওয়া তৈরির পর্যায়ে এই পরিচ্ছেদগুলো এসেছে। আমরা সেদিন সন্ধ্যেবেলায় মেজদার দোকানে অনেক রাত পর্যন্ত ছিলুম। কোন সময়কার ঘটনা সরাসরি বলা হচ্ছে না। যদিও বোঝা যায়, সময়টা ১৯৪২। সবিতাব্রতর সংলাপ বা পুলিশের ‘জনযুদ্ধওলাদের’ প্রতি প্রশ্রয়, মেঠো রাজনীতিতে কমিউনিস্টদের অবস্থানকে তুলে আনছে। অপরদিকে ভারতছাড়ো আন্দোলনের কথা কলকাতার শহরতলীতে দিচ্ছেননা। যা হয়েছে তার বর্ননা বিহারের,ইউপি এলাকার। দয়াল চরিত্র খবর হিসেবে দিচ্ছে। এইখানেই অসাধারনত। ’৪২ এর আন্দোলন, সারা বাঙলায়, মেদিনীপুর ছাড়া আর কোথাও তেমন সাড়া জাগানো ছাপ ফেলতে পারেনি। কিন্তু হিন্দী বলয়ে কংগ্রেস সোশ্যালিস্ট পার্টি আন্দোলনকে তুঙ্গে তুলেছিল। অন্তত একবছরের জন্যে। জাতীয় কংগ্রেসের সমস্ত নেতারা এ্যারেস্ট হয়ে গিয়েছিলেন। এমনকি জেলাস্তরে পর্যন্ত। তাই আন্দোলন যা হয়েছিল সোশ্যালিস্টরাই করেছিল। সমরেশ,পাঠককে ইতিহাস ধরিয়ে দিচ্ছেন। খুলে বলছেন না। এখানে সমরেশ একটা সুক্ষ্মসুতোর বুনন দিয়েছেন। বিহারের আন্দোলনের কর্মী হিসেবে সমরেশ যে চরিত্রকে এনেছেন সে শুধু বিহারী নয়। সে উঁচু জাতের মানুষ,মিশির। আজকের সমাজতাত্ত্বিকরা খুঁজে বার করছেন যে ভারতছাড়ো আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন মূলত উঁচুজাতের মানুষ। আবার যেন বুঝতে পারা গিয়েছিল কেন লোকে বলে সাহিত্য, সমাজের ছবি সমাজতাত্ত্বিকদের আগেই প্রতিফলিত করতে পারে। মাঝপথে এসেছে ১৯৪২ এর হিন্দুমহাসভা আর প্রজাকৃষক পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিত্বের কথা। ইতিহাসে যা শ্যামা-হক মন্ত্রীসভা বলে পরিচিত।

উপন্যাসের শেষের দিকে আসে ফরোয়ার্ড ব্লকের কর্মীদের আক্রমণ। কমিউনিস্ট কর্মীদের মারতে মারতে নেতাজী জিন্দাবাদ বলতে বাধ্য করার চেষ্টা করে। তারা কোনমতেই রাজী হয়না। তাদের ময়লার ডাস্টবিনে ঢুকিয়ে দেয়।

প্রথমেই মনে আসে, কতজন সাধারন পাঠক এই মারামারি, খুনোখুনির ইতিহাস জানে? কতজন কমিন্টার্নের কথা জানে? কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিক সংগঠন,কমিউইনিস্ট ইন্টারন্যাশনালকে যে ছোট করে কমিন্টার্ন বলা হোত। এ শব্দ, চলতি বাজারের পরিচিত শব্দ নয়।কমিউনিস্ট পার্টির সমস্ত দলিলের ফুটনোটে লেখা থাকত, ‘সদস্য,৩য় কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিক।’ দেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের মধ্যেকার সম্পর্কের খবর,আজকের সাধারন মানুষের জানা সম্ভব নয়। আজকে কতজন পাঠক হ্যারি পলিটের নাম শুনেছে? রজনী পাম দত্তের সম্বন্ধে কতোজন ওয়াকিবহাল? এমনকি পি সি যোশীর নাম সাধারন পাঠক কি শুনেছে?সে আমলে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্রর নাম ছিল ‘জনযুদ্ধ’। এটাই বা কতজন মনে রেখেছে!

আরো একটা কথা সামনে আসে। এসব কি বাস্তব তথ্য, নাকি উপন্যাসের খাতিরে তৈরি তথ্য? যাকে তত্ত্বের ভাষায় বলে ইনভেনটিভ আর্কাইভ! ইনভেনটিভ আর্কাইভ কথাটা অনেক পরে উমবের্তো একোর নেম অফ দ্য রোস এর আলোচনার সময়ে পপুলার হয়েছে। কিন্তু সমরেশের মতো লেখক মাত্র চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর আগেকার দেশের বিতর্কিত রাজনৈতিক ইতিহাস নিয়ে ইনভেনটিভ আর্কাইভ করবেননা! আশির দশকে সমরেশ যখন ‘যুগ যুগ জিয়ে’ লিখছেন তখনো কমিন্টার্নের বেশিরভাগ দলিল প্রকাশ পায়নি। সেসব দলিল সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর নব্বইয়ের দশকে পপুলার হয়েছে। তখনো মাত্র দুটো বই পাওয়া যেত। থিওডর ড্রেপার(Theodore draper) এর দ্য স্ট্রেঞ্জ কেস অফ কমিন্টার্ন আর একটা মস্কোর পাব্লিকেশন- আউটলাইন ইতিহাস বা আউটলাইন হিস্ট্রি অফ কমিউনিস্ট ইন্টেরনাশন্যাল। ভারতের কমিউনিস্ট রাজনীতির ইতিহাসের বইও বেশি পাওয়া যেত না। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির ইতিহাস, প্রেস স্টেটমেন্ট, ডকুমেন্টস বা দলিলের যেসব সংকলন সেইসময়ে বেরিয়েছিল তার মধ্যে ১৯৪০-৪৬ এর দলিলের সংকলন থাকত না। এসব ১৯৯৫ এর আগে বেরোয়নি।

উপন্যাসের গোড়ায় সবিতাব্রতর হাতে কাস্তে হাতুড়ি লাল পতাকা দেখে, পুকুরে স্নান করে ঊঠে আসা এক সৈন্য জিজ্ঞাসা করে ‘তোমরা কমিউনিস্ট? আমি ব্রিটেন থেকে এসেছি।আমি ফ্রেডরিক।আমিও কমিউনিস্ট।চত্তুর্দশবাহিনিতে আছি। আমি ভারতের কমিউনিস্টদের আন্দোলনের কথা শুনেছি, বেঞ্জমিন ফ্রান্সিস ব্র্যাডলির কাছ থেকে। ইন্ডিয়ায় চাকরি করতে এসেছিল টুয়েন্টি ওয়ানে।’

সবিতা বলে ‘কোন ব্র্যাডলি? ওই টুয়েন্টি সেভেনে পার্টির কাজে মিরাট কন্সপিরেসি কেসে যার জেল হয়েছিল? আরে আমার বয়স তখন চার।’

সেই তথ্যের বন্ধ্যা সময়ে সমরেশ, পাঠককে অচর্চিত ইতিহাসের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। মনে হয় পাঠকের কাছে অনেক দাবি নিয়ে সমরেশ সামনে এসেছিলেন। এরকম উপন্যাস পড়তে গেলে হয় কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে পাঠককে ওয়াকিবহাল থাকতে হবে,নয়ত এ উপন্যাস পড়তে পড়তে তাকে ইতিহাসের অন্তরের হাতছানিতে সাড়া দিতে হবে।এখানেই হলো সমরেশের দিগন্ত টপকানো স্পর্ধা।

উপন্যাসের মাঝে আসে চল্লিশের বাঙলা, তার মার্কিন সৈন্য ব্যারাক। না খেতে পাওয়া। বাঁচার জন্যে রাস্তায় নেমে আসা। চাল উধাও হয়ে যাওয়া। মন্বন্তর। যুদ্ধের হাত ধরে বেড়ে ওঠা হঠাৎ নবাব। আজকে আমরা কজন জানি কালোবাজারি শব্দটার জন্ম, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময়ে?

চটকল কারখানার একপাশে সেই সময় গড়ে উঠেছে মার্কিন সৈন্যদের ব্যারাক, রুজভেল্ট টাউন। সেইসব সৈন্যরা, যুদ্ধের সাধারন নিয়ম মেনে নারীমাংসের খোঁজে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে আসে। সমরেশ একের পর এক ক্যানভাস খুলে ধরেছেন।

অন্ধকারে ঝোপের ভেতর থেকে নগ্ন সোলজার চিৎকার করে ‘হুস দেয়ার?’

‘ফ্রেন্ডস’

‘হু দ্য ব্লাডি ফ্রেন্ডস?’

‘আইঅ্যাম স্যান্টোস দ্য ম্যান অফ কন্ট্রাকটর।’

‘হেই স্যান্টোস, আই ওয়ান্ট জিগ জিগ।’ একটা মেয়ের গলা শোনা যায়, ‘নো সাহেব। হাম নেহি সেকেগা।’

সন্তোষ বলে, ‘কেরে তুলসী নাকি।’

‘আমি আসমান’।মানে হাসমাত চুনুরির বউ।

‘ছুড়ি। মাল টেনেছিস মনে হচ্ছে?’

‘না টানলে চলবে কি করে। একে সাহেব,তায় বিষ্টি,শালাদের জন্যে মাথার ওপরে কিছু জোটেনি। ঘাসের ওপর রবাটের মতন কি পেতে নিয়েছে। দ্যাখোনা কিসব করছে। ঘেন্নাপিত্তি বলে কিছু নেই। আমাকে গিলে খাবে দেখছি।’

রসীদ বলে, ‘হাসমতের না হয় কাল রোগে ধরেছে। কিন্তু হ্যাঁরে কমলা,তোর বর, পেঁচো দুলে তো গয়েসপুরে ধানজমি কিনেছিল? আউশ কাটার তো সময় এসে গেছে।’

‘তা কাটছে। সে আর কতটুকু। ওই ধানে কদিন চলবে? এখনই তো একবেলা জোটে। আর এখানে রেতের বেলা করকরে নগদ টাকা। তোমরাও তো যা পাবে,পাবেই। আমাদেরটা একটু বেশি করিয়ে দিও।’

সন্তোষ-রশীদ, দালালির টাকা পায়। কথায় কথায় উঠতি ব্যবসার কথা উঠে আসে।

রশীদ বলে ‘রুজভেল্ট টাউনের আর্মি মেসে বীরেনবাবু ডিম মাংস ভেজিটেবল,এ সব সাপ্লাই করে লাল হয়ে গেল। ভাবতে পারিস ছ পয়সা জোড়া ডিম কিনে চার আনায় বিক্রি করে।’

‘সে কিরে!’

রসীদ সন্তোষকে বলে, ‘তুই কি ভাবিস আমি জানিনা? তুই তো রোজ দেড়হাজার করে ডিম বীরেনবাবুকে সাপ্লাই দিস। ছ পয়সা দরে। চাষিদের থেকে পাঁচ পয়সা জোড়া দরে কিনিস।’ তারপরেই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ত্রিদিবেশের চোখের সামনে ভাসতে থাকে—

‘চাঁদমারি, রুজভেল্ট টাউন-বিশাল অস্ত্রাগার, গ্যারিসন, প্রচুর ভেহিকেলস, বিমানবহর, সব অন্ধকারে ছড়িয়ে আছে এবং খাদ্য রসদ। চার বছর আগে-এই জায়গা—এইখানে। ধোকড়দা গ্রাম ছিল।এই মেয়েরা উৎখাত হয়ে গেছে।’

খাদ্য রসদ থেকে স্বাভাবিন নিয়মে নির্মম ভাবে চলে আসে মন্বন্তর। আড়তদার রামচন্দ্র আর কংগ্রেসি সমর্থক চন্দ্রনাথের মধ্যে কথা চলে—

‘মড়ার গন্ধ পাচ্ছিলুম তাই দেখে এলুম। কার মড়ারে গজেন?’

‘দুলালের বউ-দুলাল আলি,চুনুরি,তার বউ ওটা।মনে লয়, বিষ ফল লতাপাতা কিছু খেইছিল মাগিটা,অনেকদিন ভাত জোটে নাই।’

‘মড়ার গন্ধ আসছে।নদীতে ফেলে দেবার ব্যবস্থা কর।’ তারপর চন্দ্রনাথকে জিজ্ঞাসা করে, ‘তুমি কি গন্ধ খুব বেশি পাচ্ছ? মড়াটার? দরজা বন্ধ করে দোব?’

চন্দ্রনাথ ঘরের চারদিকে তাকিয়ে বলেন, ‘না না দরজা বন্ধ করবেন না। আসলে আমি কোন মড়ার গন্ধ পাচ্ছি না। শুধু চালের গন্ধই পাচ্ছি। দরজা বন্ধ করলে চালের গন্ধে নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসবে।’

রামচন্দ্র হেসে উঠে বলেন, ‘রাইট ইউ আর। চালের গন্ধ। এ হল সেই তিরিশ লক্ষ মন চালের তিন লক্ষ মনের গন্ধ। ঐ তোমার পেছনের গুদামে আছে। বুঝেছ তিনদিনে তিনটে জেলা থেকে তিরিশ লক্ষ মন চাল তুলে সরিয়ে ফেলা হয়েছে।’

‘হ্যাঁ মনে হয় ফজলুল হক তিরিশ লক্ষ মন চালের কথা কোন এক মিটিং-এ ফাঁস করেছেন।’

‘ফাঁস? হোয়াট ডু ইউ মিন ফাঁস?’ কমিউনিস্টরা যে শ্যামাপ্রসাদকে গালাগালি দেয়, ঠিক করে। উনি আর ফজলুল হক হাতে হাত ধরাধরি করে সস্তাদরে খাদ্যের দাবি করছেন। আর আজ তুমি ফজলুল হক, নিজেই স্বীকার করছ,তোমার সিভিল সাপ্লাই ডিরেক্টর শ’ওয়ালেস কোম্পানির হাতে তিরিশ লক্ষ চাল তুলে দিয়েছে। আর শ’ওয়ালেস তা তুলে দিয়েছে ক্লাইভ স্ট্রিটের সাহেবদের হাতে। এই যে গভ্ররনর জনহার্বার্ট, মুসলিম লীগের ইস্পাহানীকে কুড়ি লক্ষ টাকা দিয়েছেন চাল তোলার জন্যে। শ্যামাপ্রসাদ-ফজলুল হক কি করতে পেরেছেন?’

এরকম সময় চাকর গজেন এসে জানায় একটি বয়স্কা মহিলা একটি ছোট মেয়েকে বিক্রি করতে এসেছে।

দুজনকে সামনে নিয়ে এসে গজেন বলে ‘এবার বাবুকে বল।’

‘পঁচিশ ট্যাকা।’

‘এ্যাই মাগি রসুল দশ টাকা দর দিইছে না।’

রামচন্দ্র জিজ্ঞেস করেন ‘হিঁদু না মুসলমান?’

‘হিঁদু।’

‘হিঁদু মেয়েকে মোছলমান কি করে কিনবে? কিনতে হলে হিঁদুই কিনবে।’

বয়স্কা মহিলা বলে, ‘বেশি চাই নাই বাবু।’ পেটে খেতে পেলে, তেলে জলে মাখাজোখা হলে, এই মেয়ে বাবু, দশটা মিনসের হ্যাপা পোয়াতে পারবে, বলে দিচ্ছি। ঘরেতে যা ছিল থালা ঘটি বাটি হাঁস মুরগী পায়রা ছাগল সব বেচা হয়ে গেছে। এখন ছেলেমেয়ে ছাড়া, বেচার কী আছে?’

চন্দ্রনাথের মনে পড়ে খবরে বেরিয়েছে চট্টগ্রাম আর নোয়াখালিতে দেড়-দুটাকায় ছেলে মেয়ে পাওয়া যাচ্ছে।

মহিলাকে রামচন্দ্র তাড়িয়ে দেন। ছোট মেয়েটি বসে থাকে। তাকে কাঁচা চাল আর জল খেতে দেওয়া হয়। সমরেশের ভাষায় সে মেয়ের খাওয়া ফুটে ওঠে-‘হাত পেতে চাল নেয়,মুখে দিয়ে অতি দ্রুত চিবুতে গিয়ে যেন চোয়ালে শক্তি পায়না। সহষা দুই কষ বেয়ে লালা গড়াতে শুরু করে। ওর মুঠিতে চাল, মুখ একবারের জন্যও থামে না।, দুই কষবাহিত লালা ক্রমে চালগোলার মতো সাদা দেখায়। সুখানুভূতিতে ওর দুচোখ বুজে আসে। মুখ হাঁ করে মুঠির বাকি চাল গ্রাসের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়, ঢোক গিলে চিবোতে থাকে।’

সে রাতে মেজদার দোকানে আমাদের অনেক রাত হয়েছিল। বৌদি বাধ্য হয়ে ভাত ডাল নিয়ে দোকানে চলে এসেছিলেন। রাত তখন প্রায় বারোটা। রাস্তা শুনশান। মেজদা ওপরের অংশটা পড়ে শোনাচ্ছিলেন। বৌদির চোখ ছিল শুকনো কিন্তু ভাত গলায় আটকে ছিল। গিলতে ভুলে গিয়েছিলেন।

আমরা উঠে আসছি। মেজদা বলেছিল, ‘খন্ডিতা আবার পড়ো। শারদীয়ার জন্যে ফরমায়েশি লেখা। কিন্তু সেখানে আছে দেশভাগের রাজনীতি আর হাত কেটে যাওয়া মানুষ।’

পরেরবার আমরা সেখান থেকেই শুরু করেছিলুম। আর বুঝতে চেয়েছিলুম, পয়সা রোজগার কেমন করে মহান সাহিত্যিককে ট্র্যাজেডিতে বেঁধে রাখে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন