মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

কাকলি দেবনাথের গল্প : স্বচ্ছ ভারত


সুজয়ের বউ বাপের বাড়ি গেছে।কারখানা থেকে ফিরে তাই মনটা ভালো লাগছে না।ঘরে বউ, বাচ্চারা না থাকলে বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে।লোকে ঠিকই বলে,ইট কাঠ পাথর দিয়ে বাড়ি হয়ত পুরুষ বানায় কিন্তু সেটাকে ‘ঘর’ করে তোলে নারী।বাথরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে নিল সুজয়।ফ্লাক্স থেকে চা ঢালল কাপে।দুপুরের টিফিন অফিস ক্যান্টিনেই সেরে নিচ্ছে এ ক’দিন।কাজের বউটা বিকেলে এসে চা আর রাতের খাওয়ার করে দিয়ে যাচ্ছে।স্বাতী যে কয়দিন বাপের বাড়ি থাকবে সে ক’দিনের জন্য এই ব্যাবস্থা। পাশের বাড়ির মাসীমার কাছে চাবি রাখা থাকে।
চা আর বিস্কুট নিয়ে সুজয় ছাদে এসে বসল।আজ পুর্নিমা।চারিদিক আলোয় ঝলমল করছে। ছাদের এক কোনে ছোট্ট একটা বসার বেঞ্চ আছে। চায়ে চুমুক দিয়ে জ্যোৎস্নার আলোয় পাড়াটাকে দেখছিল সুজয়।আগে পাড়াটা এরকম ছিলনা।সামনে বড় একটা পুকুর ছিল।তার চারপাশে অনেক কৃষ্ণচূড়া গাছ ছিল।পাড়ার মেয়ে বউরা বিকেলবেলায় বাঁধানো পুকুর ধারে বসে গল্প করত।অবশ্য এসব কিছুই দেখেনি সুজয়।সবই মায়ের মুখে গল্প শুনেছে।এখন তো পুকুর বুজিয়ে প্রোমোটাররা সব প্লট করে বিক্রী করে দিয়েছে।সামনে দিয়ে উড়ালপুল যাওয়ায় জায়গার দামও বেড়ে গেছে অনেক।

চা শেষ করে সুজয় একটা সিগারেট ধরাল।স্বাতী থাকলে খেতে দেয় না। বলে,শুধু শুধু টাকাগুলো পুড়িয়ে ছাই করার কোনও মানে হয় না। তবে বাড়িতে একটা দামী সিগারেটের প্যাকেট আনা থাকে।স্বাতীর জামাইবাবু এলে খাওয়ার জন্য।তাতে নাকি প্রেস্টিজ বারে।সিগারেটটা ধরিয়ে সুখটান দিল সুজয়।কানের কাছে একটা মশা সুর করে গান গাইছে।চটাশ করে এক থাপ্পড় দিয়ে মশাটাকে মারল।এই মশার জন্য একটু শান্তিতে বসার জো নেই। সুজয়ের বাড়ির পাশেই একটা প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। ওতে কচু গাছের বন হয়ে আছে ।তাতেই এত মশা।

এই কচু বন নিয়ে স্বাতী মাঝে মাঝেই চেঁচামেচি করে ।বলে, ‘এইরকম জঙ্গল পাশে থাকার চেয়ে বাড়ি ঘর কিছু একটা হয়ে গেলে বাঁচি।’ সুজয় কতদিন বলেছে, ‘আরে বাড়ির পাশে একটা ফাঁকা জায়গা থাকা অনেক ভালো।বাড়িতে রোদ হাওয়া ঢোকে।বাচ্চা কাচ্চার শরীর খারাপ কম হয়।’

‘ধ্যুস।কি যে বল,এই যে সন্ধ্যে হলেই গুচ্ছের গুচ্ছের মশা ঢুকছে সেটা কিছু নয়।ছেলে মেয়ের যদি ম্যালেরিয়া হয় তখন আলো বাতাস দিয়ে কি করবে শুনি?’

স্বাতীর অসুবিধাটা সুজয় বুঝতে পারে।আসলে বিকেলবেলায় স্বাতী চায়, দরজার কাছে দাঁড়িয়ে পাড়ার মহিলাদের সাথে একটু গল্প করতে। কিন্তু কেউই এই জঙ্গলের জন্য এখানে দাঁড়াতে চায় না।আর দ্বিতীয় কারন হল স্বাতীর মতে , বাড়ির পাশে একটা সুন্দর বাড়ি থাকলে নাকি স্ট্যাটাস অনেক বেড়ে যায়।

(দুই)


পরের দিন খুব সকালে সুজয়ের ঘুম ভেঙ্গে গেল।অন্যদিন কাজে যাওয়ার থাকে, ঘুম ভাঙ্গতে চায়না।অথচ আজ ছুটি কিন্তু সকাল সকাল ঘুম ভেঙ্গে গেল।একবার ঘুম ভেঙ্গে গেলে সুজয় আর বিছানায় থাকতে পারে না।উঠে বাথরুমে গেল।বাথরুমের লাইট জ্বালাতেই দেখল, দেওয়ালে এক মস্ত বড় বিছে।তাড়াতাড়ি পায়ের চপ্পল খুলে বিছেটাকে মারল।এই পাশের জঙ্গল থেকেই বিছেটা ঢুকেছে।সুজয়ের কি মনে হল,কাস্তে আর দা নিয়ে পাশের প্লটটা পরিস্কার করতে লেগে গেল। আস্তে আস্তে আশে পাশের লোকজন ঘুম থেকে উঠছে।সবাই জানলা দিয়ে উঁকি ঝুকি মারছে।কিছুকক্ষন বাদে অতি উৎসাহী দু একজন এসে জিগ্যেস করল কী সুজয় জায়গাটা কিনলে না কি?

সুজয় প্রথমে ভাবল বলবে,না, এমনিই পরিস্কার করছি । কিন্তু পরক্ষনেই মত বদলাল।কোন উত্তর না দিয়ে শুধু হাসল।তাতে, যে যেমন বোঝার বুঝে নাও।

সারা পাড়ার সব আবর্জনাই এই জমিটাতে ফেলা হয়।কর্পোরেশনের গাড়ি এলেও কেউ গাড়িতে ময়লা ফেলতে চায় না।বিনে পয়সায় যখন এত সুন্দর ব্যাবস্থা আছে তখন কে আর পয়সা খরচ করবে? সুজয় জায়গাটা পরিস্কার করে, দেওয়ালে লিখে দিল- ‘আবর্জনা ফেলিবেন না।’


(তিন)
এই সামান্য কাজ যে সারা পাড়া জুড়ে এমন হৈ চৈ ফেলে দেবে সুজয় কল্পনাও করতে পারে নি।প্লটের উল্টো দিকের বোস গিন্নী সকালবেলা সুজয়কে জায়গাটা পরিস্কার করতে দেখে বোসবাবুর উপর ঝাপিয়ে পড়ল, ‘দেখলে তো,কবে থেকে বলছি বাড়ির পাশের ফাকা জায়গা- কিনে নাও ,কিনে নাও। হলো তো হাতছাড়া।’

‘তা অত পয়সা পাব কোথায় আমি? মেয়ের বিয়ের লোণই তো এখনও শোধ হল না।’ বোসবাবু খিঁচিয়ে উত্তর দিল।
বোসগিন্নি ঝেঁঝিয়ে উঠল, ‘থামো তো তুমি।সারাজীবন তো তোমার শুধু নাই আর নাই।দেখ ,ঐ টুকুন ছেলে কেমন কিনে ফেলল।শেখো ওর থেকে কিছু।’

পরেরদিন দত্তবাবু বাজারে যাচ্ছিল,পথে সুজয়ের সঙ্গে দেখা। আগে রাস্তায় দেখা হলে না দেখার ভান করে চলে যেত। ‘আজ একেবারে সাইকেল থেকে নেমে জিগ্যেস করল,কি সুজয়, কেমন আছ?’
‘এই চলে যাচ্ছে দাদা।’
‘তা শুনলাম জায়গাটা কিনেছ?’
সুজয় শুধু হাসল।
‘ভালো ভালো। তা কত দাম পড়ল?’

সুজয় কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছে না। সে তো জানেই না এখন জমির রেট কত করে যাচ্ছে। 

হেসে বলল, ‘দাদা আজ একটু তাড়া আছে,স্বাতী বাড়িতে নেই। সব কাজ গুটিয়ে অফিসে বেরোতে হবে।এখন আসছি।পরে কথা বলব।’

দত্তবাবু মনে মনে বলল, ‘শালা। জায়গাটা কিনে কেমন অহংকার হয়েছে দেখো।কিন্তু এত টাকাই বা পেল কোথায়?দু নম্বরি কোন কিছু করছে নাকি?’

কোন রকমে স্নান খাওয়া সেরে তাড়াতাড়ি অফিসে বের হল সুজয়।স্টেশনে ছোটবেলার বন্ধু বিনোদের সঙ্গে দেখা।
সুজয়কে দেখে এগিয়ে এল বিনোদ। ‘কি রে তোর তো এখন ব্যাপার স্যাপারই আলাদা।তা ওই জায়গাটায় কী করবি ভাবছিস?’

সুজয় একবার ভাবল সব সত্যি কথা বলেই ফেলবে বিনোদকে।পরে মত বদলাল,বিনোদকে সত্যি কথাটা বললে ওর বউ জানবে। আর ওর বউ একবার জানলে পাড়ার আর কারও জানতে বাকি থাকবে না। তখন আবার জায়গাটায় ময়লা ফেলা শুরু হয়ে যাবে।তার থেকে চুপ থাকাই ঠিক হবে।
মুখে বলল, ‘এখনও কিছু ভাবিনি।’

বিনোদ,সুজয়ের কাঁধে হাত দিয়ে বলল, ‘বিজনেস টিজনেস করলে আমার কথা একটু ভাবিস ভাই।আমার কাছে অনেক প্ল্যান আছে। দুজনে পার্টনারসিপে একটা বিজনেস শুরু করি চল।’
সুজয় বলল, ‘এই আমার ট্রেন ঢুকছে রে,আজ আসি।’

ট্রেনে উঠে জানলার পাশে সিট পেয়ে গেল।সাধারনত ভাত খেয়ে উঠে জানলার পাশে সিট পেলে সুজয়ের দু চোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসে।কিন্তু আজ আর ঘুম আসছে না।মনের মধ্যে বার বার একটাই প্রশ্নই ঝড় তুলছে।সে যা করছে তা ঠিক করছে তো?

নিজেই নিজের মনকে প্রবোধ দিল,চারিদিকে এখন স্বচ্ছ ভারতের কাজ চলছে,সে তো শুধু নিজের পাশের জায়গাটা পরিস্কার রাখতে চাইছে।এতে তো কারও ক্ষতি হচ্ছে না।উপরন্তু পাড়ায় একটা পরিস্কার ফাঁকা জায়গা থাকাতে পাড়াটা আরও সুন্দর লাগছে।এতে অন্যায় তো কিছু নেই।

(চার)
এক সপ্তাহ বাপের বাড়িতে কাটিয়ে স্বাতী কাল রাতে বাড়ি ফিরেছে।সকাল হতেই কোমর বেঁধে কাজে লেগে পড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ বাড়ি ছিল না। তাতেই বাড়ির একেবারে ছন্নছাড়া অবস্থা।সকালে ছেলেমেয়েরা স্কুলে বেরিয়ে গেছে।সাড়ে ন’টায় সুজয় অফিসে বেরিয়ে যেতে স্বাতী একটু হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।এক কাপ চা হাতে নিয়ে পাশের জানলাটা যেই খুলেছে অমনি এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস মুখে এসে লাগল। আরে জায়গাটা পরিস্কার করল কে? ওমা! আবার লেখা রয়েছে ‘আবর্জনা ফেলিবেন না।’ তাহলে কি খুব তাড়াতাড়ি বাড়ি হবে জায়গাটায়!স্বাতী চায়ের কাপ নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে তাকিয়ে আছে জায়গাটার দিকে।মনে মনে ভাবছে কেমন ফ্যামিলি আসবে কে জানে? ওদের বয়সি কেউ আসবে কি? হয়ত ভীষণ স্মার্ট কোনো ফ্যামিলি আসবে। জায়গার এখন যা দাম!এত দাম দিয়ে যখন জায়গা কিনেছে পয়সাওয়ালা ফ্যামিলিই হবে। বেশি নাক তোলা হলেই মুশকিল।হয়ত স্বাতীদের পাত্তাই দেবে না।না দিলে না দেবে। স্বা্তীও আগ বাড়িয়ে ভাব করতে যাবে না।আচ্ছা, এমনও তো হতে পারে , কোনো বুড়ো বুড়ি এল ।ছেলে বিদেশে থাকে।বাবা মায়ের জন্য এখানে বাড়ি বানাচ্ছে।তা হলে বেশ হয় । ওরাও চাইবে স্বাতীর সঙ্গে ভাব রাখতে ।রাতে বেরাতে বুড়ো বুড়ির কখন দরকার পরে।তাছাড়া স্বাতীর খুব ইচ্ছে পড়াশোনার জন্য ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর। ঐ রকম একটা ফ্যামিলি এলে অনেক রকম সাহায্য পাওয়া যেতে পারে।

টিং টং ।কলিং বেলের আওয়াজে চিন্তায় ছেদ পড়ল স্বাতীর।এই সময় কে এল আবার।কাজের মাসী তো সাড়ে এগারোটার আগে আসে না।দরজা খুলতেই দেখল,পাড়ার দুই বান্ধবী।বিনোদের বউ নীলি আর পাশের বাড়ির মল্লিকা এসেছে।এসেই হৈ হৈ করে বলতে শুরু করল, ‘বাব্বা তুই যে একটা ছুপা রুস্তম তা তো আগে জানা ছিল না।’
‘কেন ?এ কথা বলছিস কেন?’
‘আহা ন্যাকা! এমন ভাব করছিস যেন কিছুই হয়নি?মিষ্টি খাওয়াতে হবে কিন্তু।’
‘কী ব্যাপার বলত? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘সুজয়দা যে ব্যাবসার জন্য পাশের জায়গাটা কিনেছে তুই তো আমাদের কিছুই বলিসনি?’
‘সুজয় কিনেছে? কে বলল তোদের?’

‘থাক ,আর লুকোতে হবে না।আমরা সব জানি।সুজয়দা তো বিনোদের সঙ্গে ব্যাবসা নিয়ে অনেক প্ল্যানও করেছে।খুব তাড়াতাড়ি ওরা পার্টনারশিপে ব্যাবসা শুরু করবে।’ নীলি বলল।
নীলির কথা শুনে মল্লিকার একটু মুখ ভার হল।মুখে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘এই স্বাতী ব্যবসা শুরু করলে আমায় যেন ভুলিস না।আমার হাজবেন্ডের মার্কেটে অনেক জানাশোনা আছে।সেলসের ব্যাপারটা ওই দেখতে পারবে।’

স্বাতীর মাথায় সব তাল গোল পাকিয়ে যাচ্ছে। সুজয় জায়গা কিনেছে? কই তাকে তো কিছু বলে নি। এত টাকাই বা সে পেল কোথায়্? তা হলে কি লোন তুলেছে?কিন্তু এত টাকার লোন...।না আগে এদের দুজনকে বাড়ি পাঠাতে হবে,তারপর সুজয়কে ফোন করব।

স্বাতী হেসে বলল, ‘কাল রাতে বাড়ি ফিরেছি তো,অনেক কাজ পড়ে আছে।আজ গল্প করার একদম সময় হবে না রে।কিছু মনে করিস না তোরা প্লিজ।’

‘না না।তুই কাজ কর।এই রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলাম তাই ভাবলাম, তোর খবর নিয়ে যাই।আমাদেরও অনেক কাজ বাড়িতে। আজ আসি রে ।’

রাস্তায় বেরিয়ে মল্লিকা আর নীলি মনে মনে ভাবছে, ‘জায়গাটা কিনতে না কিনতেই দেমাকে মাটিতে পা পড়ছে না।কিন্তু এখন ওকে চটানো যাবে না ।একটু তোল্লা দিয়ে চলতে হবে।বলা যায় না...।

মল্লিকা, নীলি বেরিয়ে যেতেই স্বাতী সুজয়কে ফোন করল।যদিও সুজয় কাজের সময় ফোন করতে বার বার বারন করেছে। কিন্তু স্বাতীর আর তর সইছে না।
স্বাতীর ফোন দেখে সুজয় ভাবল, বাড়িতে সব ঠিক আছে তো!এই কাজের সময় ফোন এলে ম্যানেজার রাগ করে।তবুও ফোনটা ধরল সুজয়।

‘হ্যালো।’
‘কি হল বলো?’
‘এই তুমি নাকি আমাদের পাশের জায়গাটা কিনেছ? সত্যি গো?কই আমায় তো কিছু বলোনি? টাকা পেলে কোথায়?’ এক নিঃশ্বাসে স্বাতী কথাগুলি বলে গেল।

ম্যনেজার বারবার সুজয়ের দিকে তাকাচ্ছে।সুজয় আস্তে করে বলল, ‘বাড়ি গিয়ে সব বলব।এখন রাখছি।’

উঃ! এত বড় কথাটা আমার কাছে সুজয় চেপে গেছে।স্বাতী আনন্দে কি করবে বুঝতে পারছে না।বড়দিকে খবরটা জানানো খুব দরকার। জামাইবাবু ভালো চাকরি করে বলে সব সময় অহংকার দেখায়।এখন স্বাতীর অবস্থাও যে ওর থেকে কম কিছু নয় ,সেটা বোঝানো দরকার।স্বাতী দিদিকে,তারপর দাদাকে,তারপর বন্ধু বান্ধবকে একের পর এক ফোন করতে লাগল।


(পাঁচ)


রোজ সাড়ে আটটার সময় সুজয় যখন বাড়িতে ঢোকে ছেলেমেয়ে দুটো সেই সময় ঘুমে ঢুলতে থাকে আর স্বাতী চেঁচাতে থাকে ঠিকমত পড়া করার জন্য। আজ ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে সুজয় দেখল,স্বাতী ওদের ঘুম পাড়ানোর ব্যাবস্থা করছে। সুজয় জিগ্যেস করাতে, স্বাতী একটা অর্থপূর্ণ হাসি হাসল।

সুজয় একবার খেতে বসে জায়গাটার ব্যাপারে কথা তুলতে গেল।
স্বাতী বলল ‘এখন নয়,বিছানায় গিয়ে শান্ত ভাবে সব শুনব।’
বেডরুমে ঢুকেই স্বাতী আজ সুজয়কে আদরে আদরে ভরিয়ে দিল।সুজয়ও ডুবে গেল স্বাতীর উন্মত্ততায়। ভাবল কাল ছুটি আছে। তখন সব গুছিয়ে বলা যাবে।

পরেরদিন রবিবার। সুজয় একটু বেলা করেই ঘুম থেকে উঠেছে।
‘তুমি যে আমায় এত বড় সারপ্রাইজ দেবে আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি।’স্বাতী সুজয়কে চা দিতে দিতে বলল।

‘আরে না না ।সেইরকম কোন ব্যাপার নয়,আসলে...’
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠল,
সুজয় গিয়ে দরজা খুলতেই পাড়ার একটা বাচ্চা ছেলে বলল, ‘কাকু আপনাকে ওখানে ডাকছে।’

সুজয় দেখল জায়গাটার কাছে পাড়ার অনেকে দাঁড়িয়ে আছে।চপ্পলটা পায়ে গলিয়ে সেখানে যেতেই একটা গম্ভীর প্রকৃতির লোক এগিয়ে এসে বলল, ‘জায়গাটা আপনি পরিস্কার করেছেন?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
‘জায়গাটা কার আপনি জানেন?’
‘না।’ সুজয় উত্তর দিল।
‘তাহলে জায়গাটায় হাত দিলেন কেন?জানেন আপনাকে আমি পুলিশে দিতে পারি?’

সুজয় বলল, ‘আরে মশাই, আপনার জায়গার জঙ্গলের জন্য আমার ঘরে মশা আর বিছের উপদ্রব বেড়ে গেছিল। তাই তো...’
পাশ থেকে দত্তবাবু বলল, ‘কিন্তু তুমি যে বললে জায়গাটা তুমি কিনেছ ।তুমি যে এত বড় ধাপ্পাবাজ সেটা তো জানা ছিল না!’

ছোটবেলার বন্ধু বিনোদ বলে উঠল, ‘আমার সাথেও তো এই জায়গায় বিজনেস করবি বলে কত প্ল্যান করলি।’

সুজয় মনে মনে ভাবল, প্ল্যান আমি কোথায় করলাম?যা বলার তুই তো বললি।মুখে বলল, ‘দেখুন আমি তো শুধু জায়গাটা পরিস্কার রাখার জন্য...’

পাশ থেকে বোস গিন্নী টিপ্পনি কাটল, ‘থাক বাছা, তোমাকে আর কিছু বলতে হবেনা।যা বোঝার আমরা বুঝে গেছি।কলি কালে আরো কত কিছু দেখব বাছা। আরশোলাও আজকাল নিজেকে পাখি ভাবছে!’ এই কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল।

সুজয় কি উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে পা বাড়াল। ঘরে ঢুকতেই স্বাতী রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ‘এত বড় মিথ্যে কথাটা তুমি আমায় বলতে পারলে? আমি এখন সবাইকে মুখ দেখাব কি করে?’

সুজয়ের মাথায় এখন আগুন জ্বলছে,সামান্য একটা জায়গা পরিস্কার রাখতে গিয়ে এত অপমান!

রাগে, অপমানে হাত, পা যেন অবশ হয়ে আসছে।বেডরুমে ঢুকে ফুল স্পীডে ফ্যানটা চালিয়ে দিল সুজয়।দেওয়ালে টাঙানো গান্ধীজির ছবি আকাঁ ক্যালেন্ডারটা তখন হাওয়ার তোড়ে ফর ফর করে দুলছে।যেন এক্ষুনি পড়ে যাবে।সুজয় পিঠ দিয়ে ফটোটাকে চেপে ধরে মেঝেতেই বসে পড়ল। না ,আর দুলছে না ফটোটা।এখন সুজয়ের মাথার উপর গান্ধিজী।


লেখক পরিচিতি
কাকলি দেবনাথ
জন্মঃ- দুর্গাপুর শহর।
ইউনিভার্সিটি থেকে  ইতিহাসে স্নাতকোত্তর। 
শিক্ষক।
গল্পকার।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ—আমার গল্পেরা ।

৭টি মন্তব্য: