মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত : একটি পর্যালোচনা


নান্টু রায়

সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন কৃষ্ণচরিত্র রচনায় হাত দেন, ততদিনে অধ্যাত্মজগতে তিনি পণ্ডিত হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন; ধর্মবেত্তা হিসেবে প্রসিদ্ধিলাভ করেছেন, ততদিনে তিনি বাংলার সারস্বতজগতে ঋষি হিসেবে পরিগণিত হয়েছেন। তাঁর রচনাসমগ্রের দ্বিতীয়ভাগে তাই তাঁর আধ্যাত্মিক রচনার বিস্তার দেখতে পাই। কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব, শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা, দেহতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম প্রভৃতি রচনা তাঁর সেই আধ্যাত্মিক চিন্তাধারাই ফসল। কৃষ্ণচরিত্র পুস্তকাকারে প্রকাশিত হলে বাংলার বৈষ্ণবসমাজে সাড়া জাগাতে না পারলেও সারস্বতসমাজে যে প্রভূত আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল, তার বড় প্রমাণ বইটি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের কৌতূহল ও প্রণিধানযোগ্য মন্তব্য। তিনি বলেছিলেন, ‘যখন আমাদের দেশের শিক্ষিত লোকেরাও আত্মবিস্মৃত হইয়া অন্ধভাবে শাস্ত্রের জয় ঘোষণা করিতেছিলেন, তখন বঙ্কিমচন্দ্র বীরদর্পসহকারে কৃষ্ণচরিত্র গ্রন্থে স্বাধীন মনুষ্যবুদ্ধির জয় পতাকা উড্ডীন করিয়াছেন।’ আধুনিক শিক্ষিত মানুষ, চিন্তাশীল যুক্তিশীল জ্ঞানী ও কর্মযোগী মানুষ কাহিনি-কল্পনা-কিংবদন্তিনির্ভর কৃষ্ণকথার পরিবর্তে ইতিহাসনির্ভর কৃষ্ণকথায় আস্থা রাখবেন, সেই প্রত্যাশা থেকে কৃষ্ণচরিত্রের এই সহজপাঠ পাঠকের সামনে উপস্থাপন করা হল।

পণ্ডিতেরা নানা তথ্য, যুক্তি-তর্ক ও তত্ত্ব-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের যে কাল নির্ণয় করেছেন, তা মোটামুটি ১৪৩০ খ্রিস্ট-পূর্বাব্দ। মহাভারতের যুদ্ধকালে কৃষ্ণ সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন এবং সে-সময় তিনি সত্তরোর্ধ একজন প্রবীণ পরিণত মানুষ। মহাভারত প্রধানত কুরু-পাণ্ডবের ইতিহাস, সুতরাং পাণ্ডব-সম্পর্কিত কৃষ্ণকথাই এতে বর্ণিত হয়েছে, সমগ্র জীবনকথা এখানে নেই। হরিবংশ কৃষ্ণের পূর্ণাঙ্গ জীবনবৃত্তান্ত। অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে ব্রহ্ম, পদ্ম, বিষ্ণু, বায়ু, শ্রীমদ্ভাগবত, ব্রহ্মবৈবর্ত, স্কন্দ, বামন ও কূর্মপুরাণে কৃষ্ণবৃত্তান্ত পাওয়া যায়। যে-সব পুরাণে কৃষ্ণচরিত্রের প্রসঙ্গ আছে, তার মধ্যে ব্রহ্ম, বিষ্ণু, ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্তই প্রধান। ভাগবত ও বিষ্ণুপুরাণে শ্রীকৃষ্ণ বিষ্ণুর অবতার বলে বর্ণিত হয়েছেন। এখানে বলে রাখা অপ্রাসঙ্গিক হবে না যে, মহাভারত, হরিবংশ এবং অষ্টাদশ পুরাণের সবই ব্যাসদেবের রচিত বলে বহুলপ্রচারিত। কিন্তু মনুষ্যলোক, গন্ধর্বলোক, নাগলোক, দেবলোক প্রভৃতি সপ্তলোকের জন্য সাত লক্ষ শ্লোক একজন কবির পক্ষে রচনা সম্ভব কিনা, তার ওপর হরিবংশ ও অষ্টাদশ পুরাণও একই ব্যক্তির, এমন না-ও হতে পারে। মহাভারতকারের নাম কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস। তিনি বেদ সংকলন ও চারভাগে সুবিন্যস্ত করেছিলেন বলে বেদব্যাস নামেও কথিত। ভারতবর্ষে এখনও বহু মানুষের পদবী ব্যাস। কাজেই এইসব ব্যাস একই কৃষ্ণদ্বৈপায়ন কিনা সে-বিষয়ে সন্দেহ থাকতে পারে বৈকি!

পণ্ডিতেরা বিভিন্ন যুক্তিতর্ক ও নির্ণায়ক ব্যবহার করে বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ, ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের রচনাকাল নির্ণয় করেছেন যথাক্রমে খ্রিস্টীয় চতুর্থ-পঞ্চম; খ্রিস্টীয় ষষ্ঠ; খ্রিস্টীয় সপ্তম-নবম ও খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতাব্দী। এ পর্যন্ত আদিম মহাভারতের যে কাঠামো পাওয়া গেছে, তাতে শ্লোকের সংখ্যা ২৪ হাজারের অধিক নয়। ব্যাসদেব তাঁর পুত্র শুকদেবকে ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারতই কীর্তন করেছিলেন বলে মহাভারতেই উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ৯৬ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট আধুনিককালে প্রাপ্ত মহাভারতের ৭২ হাজার শ্লোকই প্রক্ষিপ্ত। প্রক্ষিপ্ত মানে পরবর্তীকালে সংযোজিত। সনাতন চার বেদের পর মহাভারতের স্থান। এজন্য একে ‘পঞ্চম বেদ’ বলা হত। মহাভারত লোকশিক্ষার অন্যতম বাহন। লোকপরম্পরায় বাহিত হয়ে মহাভারত ও অন্যান্য প্রাচীন গ্রন্থ আমাদের কাছে এসেছে। প্রাচীন বলেই মহাভারত এবং পরবর্তীকালের পুরাণসমূহে কৃষ্ণ-আলোচনায় অনেক গল্পকথা ঢুকে গেছে।

প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জন্মগ্রহণকারী (মহাভারতের যুদ্ধকাল+কৃষ্ণের তৎকালীন বয়স=খ্রিস্টপূর্ব ১৪৩০+৭০= খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০) অনিন্দ্যসুন্দর অমিত বলশালী এবং সর্বগুণসম্পন্ন এই মানুষটিকে ঘিরে গল্পকথা-কিংবদন্তীর শেষ নেই। মানুষ চিরকালই গল্পপ্রিয়। আর বিখ্যাত মানুষদের নিয়ে মানুষের আগ্রহ-কৌতূহল বরাবরই সীমাহীন। তাই আধুনিককালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মাতৃ-আজ্ঞা পালনে ঝঞ্ঝামুখর নদী সাঁতরানোর গল্প আমাদের কাছে সত্যের অধিক। গল্পটি বিদ্যাসাগরের চরিত্রের সঙ্গে এমনই মানানসই যে, আমরা গল্পটিকে সত্য বলেই জানি। কৃষ্ণ যেহেতু অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ, পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয় কাজে সদা তৎপর- ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, ধর্মজ্ঞ, লোকহিতৈষী, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, নিরপেক্ষ, শাস্তিদাতা, নির্মম, নিরহংকার, যোগযুক্ত, তপস্বী- সর্বগুণে গুণান্বিত একজন মানুষ, একই সঙ্গে ঈশ্বরাবতারও, তাই, তাঁকে ঘিরে কাব্য-আখ্যান রচিত ও প্রচারিত হওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

অধুনা কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন লীলা এবং শ্রীরাধাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু সমালোচনাকালে আমরা ভুলে যাই যে, কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় যান, তাঁর বয়স দশ পেরিয়েছে। একাদশবর্ষীয় এক নওলকিশোরের পক্ষে কতটুকু লীলা সম্ভব, সচেতন পাঠককে ভেবে দেখতে বলি। যে রাধাকে নিয়ে এত বিতর্ক, যে রাধাকে নিয়ে ভারতবর্ষ বিশেষত বাংলা মাতোয়ারা, সেই রাধার উল্লেখ কিন্তু মহাভারতের কোথাও নেই। অর্থাৎ কৃষ্ণের জীবনের আদিমতম বিশ্বস্ত ইতিহাসে রাধা অনুপস্থিত। এমনকি বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ বা ভাগবতেও নেই। আছে শুধু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ আর জয়দেবের কাব্যে। আদিম ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অবশ্য পাওয়া যায়নি। যেটা পাওয়া গেল, সেটা অপেক্ষাকৃত আধুনিক আর এর রচনাকাল দশম-একাদশ শতাব্দী। এ কালখ-টি ভারতবর্ষের ইতিহাসেও সবিশেষ উল্লেখযোগ্য- এসময় বহিরাগত আরব এবং অন্যান্য জাতি বাণিজ্য ও ধর্মপ্রচারের জন্য স্থলপথে, এমনকি সমুদ্রপথেও শস্য-সম্পদে ভরপুর ভারতভূমিতে আসতে থাকে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বাংলার বৈষ্ণবদের ওপর খুব প্রভাব বিস্তার করেছে। কবি জয়দেব ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের নতুন বৈষ্ণবধর্ম অবলম্বন করে গীতগোবিন্দ রচনা করেন। জয়দেবের জন্ম প্রাপ্ত ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ-এর পরবর্তী শতাব্দী অর্থাৎ খ্রিস্টীয় দ্বাদশ শতাব্দীর শেষভাগে। জয়দেব তৎকালের বড় কবি ছিলেন, ছিলেন লক্ষ্মণ সেনের সভাকবি, তাঁর স্ত্রী পদ্মাবতী ছিলেন সুকণ্ঠের অধিকারিণী। জয়দেব পালা লিখতেন, পদ্মাবতী গাইতেন। রাধা-কৃষ্ণ তাঁদের জীবিকার ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। জীবিকার ক্ষেত্রে লোক-মনোরঞ্জন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফলে, কবি যে অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেবেন, সে কথা বলাই বাহুল্য। এখানে জয়দেব সম্পর্কে একটু বিশদ বলা প্রয়োজন। জয়দেব বাঙালি কবি, বীরভূমের কেন্দুলী গ্রামে জন্ম। তিনি যৌবনে কিছুকাল উড়িষ্যায় কাটান, যে-কারণে উড়িষ্যাবাসীরা জয়দেবকে উড়িষ্যার মানুষ বলে দাবী করেন। জয়দেব উড়িষ্যাবাসকালে কোনও এক মন্দিরের দেবদাসী পদ্মাবতীকে বিয়ে করে বাংলায় নিয়ে আসেন। কবিমাত্রই রসিক, স্বীকার করতেই হবে। জয়দেবের ভেতর আদিরসের প্রাবল্য কিছু বেশি ছিল বলে মনে হয়। গীতগোবিন্দ ছাড়াও তিনি রতিমঞ্জরী নামে একটি ক্ষুদ্র কামশাস্ত্র রচনা করেন। সুতরাং গীতগোবিন্দ-এ রাধা-কৃষ্ণলীলাবিস্তারে কামগন্ধ প্রকট হবে, এতে আর আশ্চর্য কী! জয়দেবের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বিদ্যাপতি, বড়ু– চন্ডীদাস প্রভৃতি মধ্যযুগীয় কবিরা যে-সব কৃষ্ণ-সংগীত রচনা করেন, তা আধুনিক রুচিবিরুদ্ধ। এই ধর্ম অবলম্বন করেই শ্রীচৈতন্য কান্তরসাশ্রিত অভিনব ভক্তিবাদ প্রচার করেছেন। এখন সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে কৃষ্ণ উপাসনার প্রধান অঙ্গ হলেন রাধা। রাধা ছাড়া এখন কৃষ্ণনাম নেই। রাধা ছাড়া কৃষ্ণের মন্দির নেই, মূর্তি নেই। বৈষ্ণবদের অনেক রচনায় কৃষ্ণের চেয়েও রাধা প্রাধান্য লাভ করেছেন। পাঠককে কী আর বলে দিতে হবে যে, রাধা চরিত্রটি কাল্পনিক! এখানে আরেকটি কথা প্রাসঙ্গিক হবে বলে মনে করি, ষোড়শ শতাব্দীতে শ্রীচৈতন্যের সমসাময়িক শ্রীমন্ত শংকরদেব আসামে যে বৈষ্ণববাদ প্রচার করেছেন, সেখানে রাধা অনুপস্থিত।

মহাভারত কৃষ্ণচরিত্রের প্রাচীনতম প্রামাণ্য দলিল। এই মহাভারতেও আবার বহু কাহিনি-উপকাহিনি প্রক্ষিপ্ত হয়ে একে ভারাক্রান্ত, কণ্টকিত করে তুলেছে। মহাভারতপ্রণেতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস তাঁর পুত্র শুকদেবকে প্রথমত ২৪ হাজার শ্লোকের মহাভারতীয় কাহিনি শুনিয়েছিলেন। সুতরাং অধুনা যে মহাভারত প্রচলিত আছে, তার কতখানি ব্যাসপ্রণীত, আর কতখানি প্রক্ষিপ্ত তা সহজেই অনুমেয়।

তিনি সকলের চিত্ত আকর্ষণ করেন বলে কৃষ্ণ; সকলের হৃদয় হরণ করেন এবং সর্ব অমঙ্গল হরণ করেন বলে তিনি হরি; তিনি নারের (জলের) আয়ন (আশ্রয়) অর্থাৎ সর্বদেহীর প্রাণ বলে নারায়ণ; তিনি সমস্ত ব্যেপে আছেন বলে বিষ্ণু, ব্রহ্ম; তিনি সর্বভূতে বাস করেন বলে বাসুদেব। কৃষ্ণস্তু ভগবান্ স্বয়ং। তিনি মানুষী শক্তি দিয়ে যাবতীয় কার্যনির্বাহ করেছেন, কিন্তু তাঁর চরিত্র মনুষ্যাতীত। এরকম মানুষী শক্তির দ্বারা অতিমানবীয় চরিত্রের বিকাশ থেকে তাঁর মনুষ্যত্ব বা ঈশ^রত্ব অনুমান করা উচিত কিনা, তা পাঠক নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুসারে স্থির করবেন। কৃষ্ণের চরিত্র ঘিরে যে অলীক কুনাট্য ঘনিয়ে উঠেছে, বঙ্কিমচন্দ্র নির্মোহভাবে সে-সব জঞ্জাল সরিয়ে পরম জ্ঞানী লোকাতীত মহিমাময় মহত্তম মানুষটির জীবনেতিহাস তুলে ধরার প্রয়াস পেয়েছেন।
[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কেমন ছিল কৃষ্ণের চরিত্র?

ভারতবর্ষের সনাতন ধর্মাবলম্বী অধিকাংশ মানুষের, বিশেষত বাঙলা দেশের সকল সনাতন ধর্মাবলম্বীর বিশ্বাস যে, শ্রীকৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার। কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং- এই তাঁদের দৃঢ় বিশ্বাস। বাঙলা দেশে কৃষ্ণের উপাসনা সবচেয়ে বেশি। গ্রামে গ্রামে কৃষ্ণের মন্দির, ঘরে ঘরে কৃষ্ণের পূজা, প্রায় মাসে মাসে কৃষ্ণোৎসব, উৎসবে উৎসবে কৃষ্ণযাত্রা, মুখে মুখে কৃষ্ণগীতি, সবার মুখে কৃষ্ণনাম। কারও গায়ে কৃষ্ণনামাবলি, কারও গায়ে কৃষ্ণনামের ছাপ। কেউ কৃষ্ণনাম না করে কোথাও যাত্রা করেন না; কেউ কৃষ্ণনাম না লিখে কোনও পত্র বা কোনও লেখাপড়া করেন না; ভিখারী ‘জয় রাধে কৃষ্ণ’ না বলে ভিক্ষা চায় না। কোনও ঘৃণার কথা শুনলে ‘রাধে কৃষ্ণ!’ বলে আমরা ঘৃণা প্রকাশ করি; বনের পাখি পুষলে তাকে ‘রাধে কৃষ্ণ’ নাম শেখাই। কৃষ্ণ এদেশে এমনই সর্বব্যাপক।

কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং- এই যদি বাঙালির বিশ্বাস, তবে সব সময়ে কৃষ্ণ আরাধনা, কৃষ্ণনাম, কৃষ্ণকথা ধর্মেরই উন্নতিসাধক। সকল সময়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করার চেয়ে মানুষের মঙ্গল আর কী আছে? কিন্তু এঁরা ভগবানকে কী রকম ভাবেন? ভাবেন, ইনি বাল্যে চোর- ননী-মাখন চুরি করে খেতেন; কৈশোরে পারদারিক- অসংখ্য পতিব্রতার ধর্ম থেকে ভ্রষ্ট করেছেন; পরিণত বয়সে বঞ্চক ও শঠ- বঞ্চনা করে দ্রোণ প্রভৃতির প্রাণহরণ করেছিলেন! ভগবৎচরিত কি এমন? যিনি শুদ্ধসত্ত্ব, যাঁর থেকে সব ধরনের শুদ্ধি, যাঁর নামে অশুদ্ধি ও পাপ দূর হয়, মানবদেহ ধারণ করে এসমস্ত পাপাচরণ কি সেই ভগবৎচরিত্রে শোভা পায়?

ভগবৎচরিত্রের এমন কল্পনায় ভারতবর্ষে পাপস্রোতই শুধু বৃদ্ধি পেয়েছে। পুরাণ-ইতিহাস আলোচনা করে দেখেছি, কৃষ্ণসম্বন্ধীয় যে-সব পাপ-উপাখ্যান জনসমাজে প্রচলিত- সবই অমূলক কুনাট্য ছাড়া কিছু নয়। এসব বাদ দিলে বাকি যা থাকে, তা অতি বিশুদ্ধ, পরম পবিত্র, অতিশয় মহৎ। তাঁর মত সর্বগুণান্বিত, সর্বপাপসংস্পর্শশূন্য আদর্শ চরিত্র আর কোথাও নেই। কোনও দেশীয় ইতিহাসে না, কোনও দেশীয় কাব্যেও না।

কৃষ্ণের ঈশ্বরত্ব সংস্থাপন করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা কেবল তাঁর মানবচরিত্রেরই সমালোচনা করব। তবে এখন সমাতনধর্মের আলোচনা প্রবল হচ্ছে। সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্বন্ধে কৌতূহল বাড়ছে। ধর্ম-আন্দোলনের এই প্রবলতার সময়ে কৃষ্ণচরিত্রের সবিস্তার আলোচনা প্রয়োজনীয়। কৃষ্ণজীবন যথাযথভাবে প্রচারিত হওয়া উচিত। আমরা জানি, মানুষের কতকগুলি শক্তি আছে। এই শক্তিগুলির নাম বৃত্তি। সেগুলির অনুশীলন, প্রস্ফুরণ ও চরিতার্থতায় মনুষ্যত্ব। এগুলিই মনুষ্যত্বের ধর্ম। সেই অনুশীলনের সীমা, বৃত্তিগুলির পরস্পরের মধ্যে সামঞ্জস্যবিধানেই সুখ। এই সমস্ত বৃত্তির সম্পূর্ণ অনুশীলন, প্রস্ফুরণ, চরিতার্থতা ও সামঞ্জস্য একাধারে দুর্লভ। এমন আদর্শ মানুষ নেই বললেই চলে। ঈশ্বরই সর্বাঙ্গীণ স্ফূর্তির ও চরম পরিণতির একমাত্র উদাহরণ। অনন্তপ্রকৃতি ঈশ্বর উপাসকের প্রথম অবস্থায় তার আদর্শ হতে পারেন না, কিন্তু ঈশ্বরের অনুকারী মানুষেরা অর্থাৎ যাঁদের গুণাধিক্য দেখে ঈশ্বরাংশ বিবেচনা করা যায় অথবা যাঁদেরকে দেহধারী ঈশ্বর মনে করা যায়, তাঁরাই সেখানে বাঞ্ছনীয় আদর্শ হতে পারেন। এজন্য যিশুখ্রিস্ট খ্রিস্টানদের আদর্শ, শাক্যসিংহ বৌদ্ধের আদর্শ। হিন্দুশাস্ত্রে এমন আদর্শের অনেক উদাহরণ আছে। জনক প্রভৃতি রাজর্ষি, নারদ প্রভৃতি দেবর্ষি, বশিষ্ঠ প্রভৃতি ব্র‏‏হ্মর্ষি- সকলেই অনুশীলনের চরম আদর্শ। তার ওপর রামচন্দ্র, যুধিষ্ঠির, অর্জুন, লক্ষ্মণ, ভীষ্ম প্রভৃতি ক্ষত্রিয়রা আরও সম্পূর্ণতাপ্রাপ্ত আদর্শ। খ্রিস্ট ও শাক্যসিংহ কেবল উদাসীন, কৌপীনধারী নির্মল ধর্মবেত্তা। কিন্তু এঁরা তা নন। এঁরা সর্বগুণবিশিষ্ট- এঁদের মধ্যে সবধরনের বৃত্তি সম্পূর্ণত স্ফূর্তিলাভ করেছে। এঁরা সিংহাসনে বসেও উদাসীন; ধনুকহাতেও ধর্মবেত্তা; রাজা হয়েও পণ্ডিত; শক্তিমান হয়েও সর্বজীবে প্রেমময়। কিন্তু এসব আদর্শের উপর হিন্দুর আরেক আদর্শ আছে, যাঁর কাছে আর সব আদর্শ খাটো হয়ে যায়- যুধিষ্ঠির যাঁর কাছে ধর্ম শিক্ষা করেন, স্বয়ং অর্জুন যাঁর শিষ্য, রাম ও লক্ষ্মণ যাঁর অংশমাত্র, যাঁর তুল্য মহিমাময় চরিত্র কখনও কোনও ভাষায় কীর্তিত হয়নি- তিনি সর্বগুণান্বিত কৃষ্ণ।

কাজেই, কৃষ্ণচরিত্র ব্যাখ্যানের আগে আমাদের জানা উচিত, আদৌ কৃষ্ণ নামে কোনও ব্যক্তি পৃথিবীতে কখনও বিদ্যমান ছিলেন কিনা! কৃষ্ণের বৃত্তান্ত যে-সব প্রাচীন গ্রন্থে পাওয়া যায়, তার মধ্যে মহাভারত, হরিবংশ ও পুরাণ প্রধান। পুরাণ ১৮টি। এর মধ্যে ব্র‏‏হ্ম, পদ্ম, বিষ্ণু, বায়ু, শ্রীমদ্ভাগবত, ব্র‏‏হ্মবৈবর্ত, স্কন্দ, বামন ও কূর্মপুরাণে কৃষ্ণবৃত্তান্ত আছে। এসবের মধ্যে ব্র‏‏হ্ম, বিষ্ণু, ভাগবত এবং ব্র‏‏হ্মবৈবর্তে বিস্তারিত বৃত্তান্ত আছে। ব্র‏‏হ্ম ও বিষ্ণুপুরাণে আবার একই কথা আছে। অতএব আমাদের আলোচনায় বিষ্ণু, ভাগবত এবং ব্র‏‏হ্মবৈবর্ত ছাড়া অন্য কোনও পুরাণের প্রয়োজন হবে না। মহাভারত আর উপরিলিখিত অন্য গ্রন্থগুলির মধ্যে কৃষ্ণজীবনী সম্বন্ধে পার্থক্য হচ্ছে, যা মহাভারতে আছে, তা হরিবংশ ও পুরাণগুলিতে নেই। এর একটি কারণ এই যে, মহাভারত পাণ্ডবদের ইতিহাস; কৃষ্ণ পাণ্ডবদের সখা ও সহায়; তিনি পাণ্ডবদের সহায় হয়ে বা তাঁদের সঙ্গে থেকে যে-সব কাজ করেছেন, তা-ই মহাভারতে আছে বা থাকবার কথা। প্রসঙ্গক্রমে অন্য দু’একটা কথা আছে মাত্র। তাঁর জীবনের বাকি কথা মহাভারতে নেই বলেই হরিবংশ রচিত হয়েছিল, তা হরিবংশে আছে। ভাগবতেও তেমন কথা আছে।

বেদব্যাস চার বেদ সংকলনের পর মহাভারত রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেন বলে কথিত আছে। মহাভারত, হরিবংশ এবং অষ্টাদশ পুরাণ- সবই মহর্ষি বেদব্যাসপ্রণীত, এমন কথা প্রচলিত। কিন্তু একজন কবির পক্ষে সপ্তলোকের জন্য সাত লক্ষ শ্লোক রচনা সম্ভব কিনা, তার ওপর হরিবংশ ও অষ্টাদশ পুরাণও একই ব্যক্তির, এমন না-ও হতে পারে। মহাভারতের ঐতিহাসিকতা প্রতিপন্ন করা গেলে কৃষ্ণচরিত্রের ঐতিহাসিকতা প্রতিপন্ন হয়। যাতে পুরাবৃত্ত অর্থাৎ পূর্বে যা ঘটেছে, তার আবৃত্তি আছে- তাই ইতিহাস। ভারতবর্ষের প্রাচীন গ্রন্থসমূহের মধ্যে কেবল মহাভারত অথবা কেবল মহাভারত ও রামায়ণ ইতিহাস বলে পরিগণিত। সত্য বটে যে, মহাভারতে এমন অনেক কথা আছে যা স্পষ্টত অলীক, অসম্ভব, অনৈতিহাসিক। সেইসব কথা অলীক ও অনৈতিহাসিক বলে পরিত্যাগ করতে পারি। কিন্তু যে-সব কথায় সারবত্তা আছে, সেগুলো অনৈতিহাসিক বলে পরিত্যাগ করব কেন? প্রাচীন ভারতবর্ষে গ্রন্থাদি প্রণীত হয়ে গুরু-শিষ্য-পরম্পরা মুখে মুখে প্রচারিত হত। তাতে প্রক্ষিপ্ত হওয়ার সুযোগ থাকে। এভাবেই ব্যাসদেবের ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারত চারগুণ বেড়ে ৯৬ হাজারে উন্নীত হয়েছে। মহাভারতের অনুক্রমণিকা অধ্যায়ে আছে যে, ব্যাসদেব প্রথমে তাঁর পুত্র শুকদেবকে ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারত অধ্যয়ন করান। শুকদেবের কাছে বৈশম্পায়ন মহাভারত শিক্ষা করেছিলেন। অতএব এই ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারতই সম্রাট জনমেজয়কে পাঠ করে শোনানো হয়।

মহাভারত বারবার পড়ে আমরা বুঝতে পারি যে, এর তিনটি স্তর আছে। প্রথম, একটি আদিম কঙ্কাল; তাতে পাণ্ডবদের জীবনবৃত্ত ও আনুষঙ্গিক কৃষ্ণকথা ছাড়া আর কিছু নেই। এটিই বোধহয়, ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট ভারতসংহিতা। দ্বিতীয় স্তরের মহাভারত অতি উচ্চ কবিত্বপূর্ণ। তৃতীয় স্তর নানা পরমার্থিক দার্শনিকতত্ত্বে ভরপুর। প্রথম স্তর বাদ দিলে মহাভারত থাকে না। দ্বিতীয় স্তর বাদ দিলে মহাভারতের কিছু ক্ষতি হয় না, কেবল কতকগুলি অপ্রয়োজনীয় অলংকার বাদ পড়ে। প্রথম স্তরে কৃষ্ণ ঈশ্বরের অবতার বা বিষ্ণুর অবতার বলে পরিচিত নন; তিনি নিজেও নিজের দেবত্ব কোথাও স্বীকার করেননি। দ্বিতীয় স্তরে তিনি স্পষ্টত বিষ্ণুর অবতার বা নারায়ণ বলে পরিচিত ও অর্চিত। তৃতীয় স্তরে লোকশিক্ষামূলক বিভিন্ন দার্শনিকতত্ত্ব, সামাজিক অনুশাসন, দাম্পত্য উপদেশ সন্নিবেশিত হয়েছে। শান্তিপর্ব ও অনুশাসনিক পর্বের অধিকাংশ, ভীষ্মপর্বের শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পর্ব-অধ্যায়, বনপর্বের মার্ক-েয়সমস্যা পর্ব-অধ্যায়, উদ্যোগপর্বের প্রজাগর পর্ব-অধ্যায়- এই তৃতীয় স্তর-সঞ্চয়কালে রচিত বলে বোধহয়।

কাজেই মহাভারতের আদিম কঙ্কালে যেটুকু কৃষ্ণচরিত্র পাই, তাই-ই আমাদের অনুশীলনের বিষয় হওয়া উচিত। সেখানে আমরা কৃষ্ণকে একজন সর্বগুণসমন্বিত আদর্শ মানুষ হিসেবে পাই। এখন বাজারে কৃষ্ণচরিত নামে মৎপ্রণীত একখানি বই পাওয়া যাচ্ছে। অনুসন্ধিৎসু পাঠককে সেটি সংগ্রহ করে পড়তে অনুরোধ করি।
[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কৃষ্ণের ঐতিহাসিকতা আছে কি?

কৃষ্ণের ঐতিহাসিকতা প্রতিপন্ন করতে হলে, আগে আমাদের মহাভারত ও পাণ্ডবদের ঐতিহাসিকতা প্রমাণ করতে হবে। কারণ পুরাণেতিহাসে আমরা কৃষ্ণকথা যতটুকু পেয়েছি, তার মধ্যে মহাভারতই প্রাচীনতম। সেই মহাভারতেও তিন-চতুর্থাংশ প্রক্ষিপ্ত, অর্থাৎ পরবর্তীকালের সংযোজন। মহাভারতপ্রণেতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস তাঁর পুত্র শুকদেবকে ২৪ হাজার শ্লোকবিশিষ্ট মহাভারত শুনিয়েছিলেন বলে মহাভারতেই উল্লেখ পেয়েছি। সুতরাং মহাভারতের আদিম কাঠামোয় যতটুকু কৃষ্ণকথা পাওয়া যায়, আমাদের আলোচনা সে-আলোকেই হবে।

কুরু ও পাঞ্চাল প্রাচীন ভারতের দুটি সন্নিহিত জনপদ। বোধহয় এককালে এই দুই জনপদবাসী মিলিতই ছিল। পরে তাদের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। মহাভারতের যুদ্ধ প্রধানত কুরু-পাঞ্চালের যুদ্ধ। পাণ্ডবদের জীবনবৃত্তান্ত এই: কৌরব অধিপতি বিচিত্রবীর্যের দুই ক্ষেত্রজপুত্র ধৃতরাষ্ট্র ও পাণ্ডু। ধৃতরাষ্ট্র জ্যেষ্ঠ, কিন্তু অন্ধ। অন্ধ বলে রাজ্যশাসনে অনধিকারী বা অক্ষম। রাজ্য পাণ্ডুর হস্তগত হল। পরিশেষে পাণ্ডুকেও রাজ্যচ্যুত ও অরণ্যচারী দেখি- ধৃতরাষ্ট্রের রাজ্য আবার ধৃতরাষ্ট্রের হাতে গেল। তারপর পাণ্ডুপুত্ররা বয়ঃপ্রাপ্ত হল, রাজ্যলাভের আকাক্সক্ষা করল, কাজেই ধৃতরাষ্ট্র ও ধৃতরাষ্ট্রপুত্ররা তাঁদের নির্বাসিত করলেন। তাঁরা বনে বনে ঘুরে শেষে পাঞ্চালরাজের কন্যাকে বিয়ে করে পাঞ্চালদের সঙ্গে আত্মীয়তা স্থাপন করে। পাঞ্চালরাজের সাহায্যে এবং তাঁদের মাতুলপুত্র প্রবলপ্রতাপ যাদবকুলশ্রেষ্ঠ কৃষ্ণের সহায়তায় তাঁরা ইন্দ্রপ্রস্থে নতুন রাজ্য স্থাপন করলেন। পরিশেষে সে-রাজ্যও ধার্তরাষ্ট্রদের হস্তগত হল।

পাণ্ডবেরা আবার বনচারী হলেন। এক পর্যায়ে বিরাটরাজের সঙ্গে তাঁরা সখ্য ও সম্বন্ধ স্থাপন করলেন। পরে পাঞ্চালরা কৌরবদের আক্রমণ করে। পূর্বশত্রুতার প্রতিশোধ নাকি পাণ্ডবদের রাজ্য অধিকারে সহায়তা, তা পরিষ্কার না হলেও পাঞ্চালরা পাণ্ডবদের পক্ষে থেকে ধার্তরাষ্ট্রদের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

বিষ্ণুপুরাণকার ঋষির মতে, যুধিষ্ঠিরের সময় সপ্তর্ষি মঘায় ছিলেন, নন্দ মহাপদ্মের সময় পূর্বাষাঢ়ায়। মঘা থেকে পূর্বাষাঢ়া দশম নক্ষত্র। যথা- মঘা, পূর্বফাল্গুনী, উত্তরফাল্গুনী, হস্তা, চিত্রা, স্বাতী, বিশাখা, অনুরাধা, জ্যেষ্ঠা, মূলা, পূর্বাষাঢ়া। অতএব যুধিষ্ঠির থেকে নন্দ ১০ ঢ ১০০ = এক হাজার বছরের ব্যবধান। তিনি বলছেন, মহাপদ্ম ও তাঁর পুত্রগণ একশতবর্ষ পৃথিবী শাসন করবেন। কৌটিল্য নন্দবংশীয়দের উৎপাটিত করবেন। তাঁদের অভাবে মৌর্যরা পৃথিবী ভোগ করবেন। কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্তকে রাজ্যাভিষিক্ত করবেন। এ থেকে বলতে পারি, যুধিষ্ঠির থেকে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ১১১৫ (১০০০+১০০+১৫) বছর। চন্দ্রগুপ্ত অতি বিখ্যাত স¤্রাট- ইনি মেসিডোনিয়ার রাজা আলেকজান্ডারের সমসাময়িক। চন্দ্রগুপ্ত ৩১৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দে রাজ্যপ্রাপ্ত হন। অতএব ঐ ৩১৫ অংকের সঙ্গে উপরিলিখিত ১১১৫ যোগ করলেই যুধিষ্ঠিরের সময় পাওয়া যাবে। ৩১৫ + ১১১৫ = ১৪৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ তবে মহাভারতের যুদ্ধের সময়।

মহাভারতে আছে, ভীষ্মের ইচ্ছামৃত্যু। শরশয্যাশায়ী হলে তিনি বলেছিলেন, আমি দক্ষিণায়নে মরব না। অতএব শরশয্যায় শুয়ে তিনি উত্তরায়ণের অপেক্ষা করতে লাগলেন। যুদ্ধের ৫৬ দিন পর মাঘমাসে উত্তরায়ণ হলে তিনি প্রাণত্যাগ করলেন। অর্থাৎ যুদ্ধটা হেমন্তকালের অগ্রহায়ণমাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সংস্কৃত বৈয়াকরণ পাণিনি কমপক্ষে খ্রি.পূ. ষষ্ঠ শতাব্দীর লোক। পাণিনিসূত্রে ভারত, পঞ্চপাণ্ডবেব নাম এবং কুন্তী, দ্রোণ, অশ্বত্থামা প্রভৃতির নাম পাওয়া যায়। তখন ব্রা‏‏হ্মণ, আরণ্যক, উপনিষদ প্রভৃতি বেদাংশও প্রণীত হয়নি। ঋক্, যজুঃ, সামসংহিতা ছাড়া আর কিছু হয়নি। আশ্বলায়ন, সাংখ্যায়ন প্রভৃতির জন্ম হয়নি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য পণ্ডিতদের সবাই একমত যে, খ্রিস্টের জন্মের সহস্রাধিক বছর আগে যুধিষ্ঠির প্রভৃতির বৃত্তান্তসংযুক্ত মহাভারত গ্রন্থ প্রচলিত ছিল। এমন কথা প্রচলিত আছে যে, পাণিনিকে মহাভারত ও যুধিষ্ঠির প্রভৃতির ব্যুৎপত্তি লিখতে হয়েছে। কাজেই তার অনেক আগে থেকেই মহাভারত প্রচলিত ছিল। কেন না, ‘বাসুদেবার্জুনাভ্যাং বুন্’ এই সূত্রে ‘বাসুদেবক’ ও অর্জুনক’ শব্দ এই অর্থে পাওয়া যায়, বাসুদেবের উপাসক, অর্জুনের উপাসক। অতএব পাণিনিসূত্র প্রণয়নের আগেই কৃষ্ণার্জুন দেবতা বলে স্বীকৃত হয়েছেন। কাজেই মহাভারতের যুদ্ধের অল্প পরেই আদিম মহাভারত প্রণীত হয়েছিল বলে যে প্রসিদ্ধি আছে, তা অমূলক নয়। শুধু পাণিনি নয়, আশ্বলায়ন ও সাংখ্যায়ন গূহ্যসূত্রেও মহাভারতের প্রসঙ্গ আছে। কাজেই মহাভারতের প্রাচীনতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার বড় একটা অবকাশ নেই।

এবার আসা যাক, কৃষ্ণের ঐতিহাসিকতা প্রসঙ্গে। আমরা জানি, ঋগ্বেদ-এর ৪টি স্তর, যথা- সংহিতা, ব্রাহ্মণ, আরণ্যক ও উপনিষদ। ঋগ্বেদসংহিতা হল ঋগ্বেদ-এর মূল অংশ। এই ঋগ্বেদসংহিতায় কৃষ্ণ শব্দ অনেকবার আছে। ঋগ্বেদসংহিতার অনেকগুলি সূক্তের ঋষি একজন কৃষ্ণ। অথর্বসংহিতায় অসুর কৃষ্ণকেশীর নিধনকারী কৃষ্ণের কথা আছে। ইনি বসুদেবনন্দন সন্দেহ নেই। পাণিনিসূত্রে কৃষ্ণের নাম নেই, কিন্তু ‘বাসুদেব’ নাম আছে। কৃষ্ণ মহাভারতে বাসুদেব নামে সচরাচর অভিহিত হয়েছেন। আবার পু-্ররাজও নিজেকে বাসুদেব বলে পরিচয় দিতেন বলে মহাভারতে উল্লেখ পেয়েছি।

কৌষীতকিব্রা‏‏হ্মণে আঙ্গিরস ঘোরের নাম আছে, এবং কৃষ্ণেরও নাম আছে। কৃষ্ণ সেখানে দেবকীপুত্র বলে বর্ণিত হননি, আঙ্গিরস বলে বর্ণিত হয়েছেন। উপনিষদ সকল বেদের শেষভাগ, এজন্য উপনিষদকে বেদান্তও বলে। বেদের যে-সব অংশকে ব্রা‏‏হ্মণ বলে, তা উপনিষদের চেয়ে প্রাচীন বলে বোধ হয়।

ছান্দোগ্য উপনিষদে একটি কথা আছে। কথাটি এই, আঙ্গিরসবংশীয় ঘোর ঋষি দেবকীপুত্র কৃষ্ণকে এ কথা বলে বললেন (শুনে তিনিও পিপাসাশূন্য হলেন) যে, ‘তুমি অক্ষিত, তুমি অচ্যুত, তুমি প্রাণসংশিত।’ ঘোরের পুত্র-পৌত্ররা অনেকগুলি ঋকের প্রণেতা বা বক্তা। কাজেই ঘোরশিষ্য কৃষ্ণ তাঁদের সমসাময়িক, সন্দেহ নেই। আগে সূক্তগুলি উক্ত হয়েছিল, তার পরে বেদবিভাগ। অতএব কৃষ্ণ বেদবিভাগকারী বেদব্যাসের সমসাময়িক, উপন্যাসের বিষয়বস্তু নন, সে-বিষয়েও সংশয়ের অবকাশ নেই। আবার, ঋগ্বেদসংহিতার অষ্টম ও দশম ম-লের অনেক সূক্তের ঋষি কৃষ্ণ। ইনি দেবকীনন্দন কৃষ্ণ কিনা, বলা শক্ত। ঋগে¦দে ব্রা‏‏হ্মণ ছাড়াও ক্ষত্রিয়-শূদ্র ঋষিদের অনেক সূক্ত আছে। কাজেই এসব সূক্তের প্রণেতা কৃষ্ণ হলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই।

সে যা হোক, ‘বাসুদেবার্জুনাভ্যাং বুন্’ এই সূত্র থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে, কৃষ্ণ প্রাচীনকালের লোক- পাণিনির সময়ে উপাস্য বলে আর্যসমাজে গৃহীত হয়েছিলেন।

কৃষ্ণজীবনের যা কিছু অতিপ্রকৃত বা অনৈসর্গিক, তাতে আমরা বিশ্বাস করব না। তিনি যদি দৈবী বা ঐশী শক্তি দিয়ে কাজ করবেন, তবে তাঁর মনুষ্য-শরীরধারণের প্রয়োজন কি? যিনি সকল কাজের কর্তা, সর্বশক্তিমান, সর্বইচ্ছাময়- তাঁর কেন অভিপ্রেত কাজ করতে মনুষ্যশরীরধারণ করতে হবে? সনাতন বিশ্বাসে ঈশ্বর এক, কিন্তু তিনি নিরাকার নন। যিনি সর্বময় কর্তা, যিনি সর্বশক্তিমান, তিনি আকার ধারণ করতে পারেন না, এমন ধারণা ঈশ্বরের সর্বশক্তিমানত্বের ধারণাকে খর্ব করে। সে-কারণে সনাতন বিশ্বাসী মনে করে, ঈশ্বর আকারনিরপেক্ষ। অর্থাৎ তিনি সাকার নিরাকার- দুই-ই হতে পারেন। আর পারেন বলেই তিনি অবতাররূপে ধরাধামে অবতীর্ণ হতে পারেন। প্রশ্ন হল, তিনি কেন অবতাররূপে অবতীর্ণ হবেন? ভগবদ্গীতায় অতি সংক্ষেপে বলা হয়েছে, ‘পরিত্রাণায় সাধূনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্।/ ধর্মসংরক্ষণার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে ॥’ অর্থাৎ ধর্ম সংরক্ষণের জন্য ঈশ্বরের শরীরধারণ। আমাদের পুরাণে বিষ্ণুর দশাবতারের কথা আছে বটে, তবে ‘পুরাণ’ মানে ‘পুরাতন কথা’, সেই পুরাতন কথার সবই বিশ্বাসযোগ্য, অভ্রান্ত, যুক্তিপূর্ণ- এমন নয়। প্রকৃত বিচারে শ্রীকৃষ্ণ ছাড়া আর কাকেও ঈশ্বরের অবতার বলে স্বীকার করা যায় না।

কৃষ্ণের যে বৃত্তান্তটুকু মৌলিক, তার মধ্যে অতিপ্রকৃতের কোনও স্থান নেই। বিষ্ণুপুরাণে তাঁর শরীরধারণ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ‘জগৎপতি হয়েও যে তিনি শত্রুদের প্রতি অনেক অস্ত্র নিক্ষেপ করলেন’- এ তিনি মনুষ্যধর্মশীল বলে তাঁর লীলা। নইলে যিনি মনের দ্বারাই জগতের সৃষ্টি ও সংহার করেন, শত্রুবধের জন্য তাঁর এত উদ্যম কেন? তিনি মানুষের ধর্মের অনুবর্তী বলেই বলবানের সঙ্গে সন্ধি এবং হীনবলের সঙ্গে যুদ্ধ করেন, সাম, দান, ভেদনীতি অবলম্বন করে দ-দান করেন, কখনও পলায়ন করেন। মনুষ্যদেহীদের কাজের অনুবর্তী সেই জগৎপতির এমন লীলা, তাঁর ইচ্ছানুসারেই ঘটেছিল।

হরিবংশে কৃষ্ণকথা আছে বটে, কিন্তু তা অতিরঞ্জনদুষ্ট। রচনাকাল বিচার করলে, এটি মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণের পরবর্তী এবং ভাগবত ও ব্র‏‏হ্মবৈবর্তের পূর্ববর্তী। আশা করি, কৃষ্ণের ঐতিহাসিকতা প্রতিপন্ন করতে পেরেছি। মহাভারতের যুদ্ধের সময় কৃষ্ণ সত্তরোর্ধ্ব প্রৌঢ় এক পরিণত প্রাজ্ঞ মানুষ। মহাভারতের যুদ্ধকাল+কৃষ্ণের তৎকালীন বয়স=খ্রিস্টপূর্ব ১৪৩০+৭০= খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০। সুতরাং আজ থেকে সাড়ে তিন হাজার বছর আগে জন্মগ্রহণকারী অনিন্দ্যসুন্দর অমিত বলশালী এবং সর্বগুণসম্পন্ন এই মানুষটিকে অনৈতিহাসিক আখ্যায়িত করা কোনও সুদূরপ্রসারী চক্রান্তের অংশ বলে আমরা মনে করি।
[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কৃষ্ণের বংশ পরিচয়, জন্মবৃত্তান্ত এবং...

বহুদিন ধরে এ উপমহাদেশে কৃষ্ণকে অনৈতিহাসিক এক পৌরাণিক চরিত্র বলে প্রতিপন্ন করার সচেতন প্রয়াস ছিল। বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বী মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে কৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমীকে ছুটি ঘোষণা করে সরকার কৃষ্ণের জন্মের ঐতিহাসিকতা স্বীকার করে নিয়েছেন, এটা কৃষ্ণপ্রেমীদের এক বড় অর্জন। এজন্যে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারকে ধন্যবাদ দিতেই হয়।

আমরা জানি, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মথুরা উত্তরভারতের একটি প্রসিদ্ধ স্থান, আজও তার অস্তিত্ব বিদ্যমান। কৃষ্ণ যেদিন জন্ম নিলেন, সেদিন ঘোর ঝড়জল- ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি। এই পবিত্র জন্মক্ষণকে সনাতনধর্মাবলম্বীরা কমপক্ষে সাড়ে তিন হাজার বছর ধরে জন্মাষ্টমী হিসেবে উদ্যাপন করে আসছে। তখন আধুনিক ক্ষণগণনা কিংবা বর্ষপঞ্জি প্রবর্তিত হয়নি, কিন্তু জ্যোতির্বিজ্ঞান ভারতীয়দের এতটাই বৃৎপত্তি ছিল যে, তারা নক্ষত্রের অবস্থান বিচার করে অভ্রান্ত ক্ষণগণনা করতে পারতেন। যেমন ধরুন, কৃষ্ণের জন্মক্ষণটির কথা। বলা হচ্ছে, ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি- ভাদ্রমাসে রেবতীনক্ষত্র কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে বছর ঘুরে একবারই আসে, পলমাত্র এদিক-ওদিক হবার যো নেই। সেই হিসেবমত নানা ঐতিহাসিক মাপকাঠি পর্যালোচনা করে বলা হচ্ছে, কৃষ্ণের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের সময় তিনি সত্তরোর্ধ্ব এক পরিণত প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব।

তাঁর পিতার নাম বসুদেব। সেজন্য তিনি বাসুদেব। কৃষ্ণ যদুবংশে জন্মগ্রহণ করেন। মহাভারতে পুরুরবা ঐতিহাসিক চন্দ্রবংশীয় রাজা। উর্বশীর সংসর্গে তাঁর আয়ু নামে এক পুত্র জন্মে। আয়ুর পুত্র নহুষ। নহুষের পুত্র যযাতি। যযাতির পাঁচপুত্র- জ্যেষ্ঠ যদু, কনিষ্ঠ পুরু। যযাতির জ্যেষ্ঠ চারপুত্র তাঁর আজ্ঞা পালন না করায় তিনি পুরুকে রাজ্যাভিষিক্ত করেন। এই পুরুর বংশে দুষ্মন্ত, ভরত, কুরু এবং অজমীঢ় প্রভৃতি ভূপতিরা জন্মগ্রহণ করেন। দুর্যোধন-যুধিষ্ঠির কৌরবেরা এই পুরুর বংশ, এবং কৃষ্ণ প্রভৃতি যাদবেরা যদুর বংশ। যযাতিপুত্র যদু থেকে মথুরাবাসী যাদবদের উৎপত্তি, পুরাণেতিহাসে এমনই বলা হয়।

মহাভারত-পরবর্তী হরিবংশের হরিবংশপর্বে যে যদুবংশের কথা বলা হয়েছে, তা যযাতিপুত্র যদুরই বংশকথন। কিন্তু হরিবংশের বিষ্ণুপর্ব অনুসারে ইক্ষাকুবংশীয় হর্যশ্ব ছিলেন অযোধ্যার রাজা। তিনি মধুবনের রাজা মধুর কন্যা মধুমতিকে বিয়ে করে কোনও কারণে মধুবনে বসতি করেন। এই মধুবনই মথুরা। এরই পুত্র যদু। যদুর পুত্র মাধব, মাধবের পুত্র সত্ত্বত, সত্ত্বতের পুত্র ভীম। মধুর পুত্র লবণকে রামের ভাই শত্রুঘœ পরাজিত করে তাঁর রাজ্য দখল করে মথুরানগর নির্মাণ করেন। হরিবংশ বলছে, রাঘবেরা মথুরা ত্যাগ করলে ভীম তা পুনরায় অধিকার করেন এবং এই যদুর বংশই মথুরাবাসী যাদবগণ।

আবার মহাভারত-পূর্ববর্তী ঋগ্বেদসংহিতার ১০ম ম-লের ৪৮-৪৯ সূক্তে যযাতি, পুরু. যদু, তুর্বসুর নাম আছে। ১০ম ম-লের ৬২ সূক্তে আবার ১০ ঋকে যদু ও তুর্বা (তুর্বসু) দাসজাতীয় রাজা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ ম-লের ৪৯ সূক্তের ৮ ঋকে ইন্দ্র তুর্বসু ও যদুকে বলবান এবং ৩ ঋকে আর্য বলে চিহ্নিত করেন। এতে বোঝা যায় না, যদু আর্য না অনার্য। আবার প্রথম ম-লের ৩৬ সূক্তের ঋকের ঋষি অগ্নির দ্বারা তুর্বসু, যদু ও উগ্রদেবকে আহ্বান করেছেন।’ আর্য ঋষি অনার্য রাজাকে দেবতার সম্মান দেবেন, এমন কি সম্ভব?

যাহোক, এ পর্যন্ত আমরা তিনজন যদুর কথা পেলাম- ১. যযাতিপুত্র; ২. ইক্ষাকুবংশীয় এবং ৩. অনার্য রাজা।

কৃষ্ণ কোন্ যদুর বংশে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, তার মীমাংসা করা কঠিন। তবে, তাঁদের যখন মথুরা ছাড়া পাইনি এবং ঐ মথুরা ইক্ষাকুবংশীয়দের নির্মিত, তখন যাদবেরা ইক্ষাকুবংশীয় নন, এমন কথা জোর দিয়ে বলা যায় না।

যে যদুবংশেই কৃষ্ণ জন্মগ্রহণ করুন না কেন, সেই বংশে মধু, সত্ত্বত, বৃষ্ণি, অন্ধক, কুকুর ও ভোজ প্রভৃতি রাজারা জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এই বৃষ্ণি, অন্ধক, কুকুর ও ভোজবংশীয়রা একত্রে মথুরায় বাস করতেন। কৃষ্ণ বৃষ্ণিবংশীয়। কংস ও দেবকী ভোজবংশীয়। কংস ও দেবকীর এক পিতামহ।

কংসের পিতা উগ্রসেন ছিলেন যাদবদের রাজা। তাঁর রাজ্যের নাম মথুরা। কৃষ্ণের পিতা বসুদেব, মা দেবকী। কংস ছিলেন ভীষণ উচ্চাভিলাষী। ইতোমধ্যে তিনি পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনচ্যুত করে নিজেই রাজা হয়েছেন এবং ক্রমে অতিশয় দুরাচারী হয়ে উঠেছেন। তিনি যাদবদের ওপর এমন পীড়ন শুরু করেন যে, অনেকে ভয়ে মথুরা থেকে পালিয়ে অন্য দেশে গিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। বসুদেব তার আরেক পত্নী রোহিণীকে যমুনা নদীর অপর তীরে অবস্থিত গোকুলনগরের ঘোষপল্লীতে নন্দ নামে এক গোপ ব্যবসায়ীর গৃহে রেখে এসেছিলেন। তিনি বসুদেবের আত্মীয়। সেখানে রোহিণী এক পুত্রসন্তান প্রসব করেন, সেই পুত্রের নাম বলরাম।

উৎপীড়কমাত্রই কাপুরুষ। কাজেই কংস ভেবেছিলেন, যাদব বংশের যে-কোন পুরুষ সন্তানই তাঁর জন্য বিপদের কারণ। বিবাহের পর প্রীতিবশত বসুদেব ও দেবকীর রথচালনা করলেও কংস আশংকা করেছিলেন, এঁদের গর্ভের সন্তানও তাঁর জন্য একদিন বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে। সে-জন্য তিনি তাঁদের কারাগারে নিক্ষেপ করেন এবং কারাগারে জন্মগ্রহণকারী তাঁদের একের পর এক সন্তানকে কারাগার থেকে নিয়ে হত্যা করেন। এভাবে তাঁদের প্রথম ৬ সন্তানকে কংস হত্যা করলেন। সপ্তম গর্ভের সন্তান গর্ভেই বিনষ্ট হয়েছিল। দেবকীর অষ্টম গর্ভে শ্রীকৃষ্ণ আবির্ভূত হলেন। সেটি ছিল রোহিণী নক্ষত্রযুক্ত ভাদ্রমাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথির রাত। সেদিন ঘোর ঝড়জলে দশদিক অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। বসুদেব কংসের দ্বারা প্রাণসংশয় হতে পারে আশঙ্কা করে সদ্যোজাত পুত্রকে রাতের অন্ধকারেই সেই ঝড়জলের মধ্যে যমুনার অপরপারে নন্দের গৃহে রেখে এলেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাঁকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে লাগলেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন।

অধুনা কৃষ্ণের জীবনের বিভিন্ন লীলা এবং শ্রীরাধাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে কিন্তু সমালোচনাকালে আমরা ভুলে যাই যে, কৃষ্ণ যখন বৃন্দাবন ছেড়ে মথুরায় যান, তাঁর বয়স দশ পেরিয়েছে। একাদশবর্ষীয় এক নওলকিশোরের পক্ষে কতটুকু লীলা সম্ভব, সচেতন পাঠককে ভেবে দেখতে বলি। যে রাধাকে নিয়ে এত বিতর্ক, যে রাধাকে নিয়ে ভারতবর্ষ বিশেষত বাংলা মাতোয়ারা, সেই রাধার উল্লেখ কিন্তু মহাভারতের কোথাও নেই। অর্থাৎ কৃষ্ণের জীবনের আদিমতম বিশ্বস্ত ইতিহাসে রাধা অনুপস্থিত। এমনকি বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ বা ভাগবতেও নেই। আছে শুধু ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ আর জয়দেবের কাব্যে। আদিম ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ অবশ্য পাওয়া যায়নি। যেটা পাওয়া গেল, সেটা অপেক্ষাকৃত আধুনিক আর এর রচনাকাল দশম-একাদশ শতাব্দী। এই সময়কালটা বিতর্কিত। আজ সে-বিতর্ক উহ্য থাক।

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


শ্রীকৃষ্ণের কৈশোর ও ব্রজগোপী প্রসঙ্গ

আমরা জানি, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বসুদেব কংসের দ্বারা প্রাণসংশয় হতে পারে আশঙ্কা করে সদ্যোজাত পুত্রকে রাতের অন্ধকারেই সেই ঝড়জলের মধ্যে যমুনার অপরপারে নন্দের গৃহে রেখে এলেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাঁকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে লাগলেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন। সে-সময় ঘোষ নিবাসে নেকড়ে বাঘের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণও নানা বিপদে পড়েছিলেন। তাই নন্দ ও অন্যান্য গোপেরা পূর্ব বাসস্থান ত্যাগ করে অধিকতর নিরাপদ সুখের জায়গা বৃন্দাবনে গিয়ে বসতি স্থাপন করলেন।

যমুনাতীরবর্তী বৃন্দাবন অতি মনোরম স্থান। বৃন্দাবনে এসে কৃষ্ণ একটি বকনা বাছুর, বক ও সাপ মেরেছিলেন বলে ভাগবতকাররা দাবি করেছেন। তবে মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ, এমনকি হরিবংশেও এমন দাবির স্বীকৃতি নেই। তবে বলবান শিশুর পক্ষে এসব কাজ অসম্ভব কিছু নয়। একবার বৃন্দাবনে দাবানলের সৃষ্টি হলে কৃষ্ণ গোপনে অক্লান্ত চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। যমুনার একটি হ্রদে কালিয় নামে এক বিষধর সাপ বংশ বিস্তার করেছিল। তাদের বিষে যমুনার জল এমন বিষময় হয়ে উঠেছিল যে, কেউ সে-জল পান করলে মারা যেত। কৃষ্ণের আঘাতে মুমূর্ষু কালিয় সবংশে অন্যত্র পালিয়ে বাঁচে। মহাভারতে অবশ্য এর উল্লেখমাত্র নেই। বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ ও ভাগবতে এটি প্রসিদ্ধ কৃষ্ণলীলা।

বৃন্দাবনের সীমানায় গোবর্ধন নামে একটি পাহাড় ছিল। এখনও আছে। পাহাড়টি দেখে মনে হয়, কোনও প্রাকৃতিক বিপ্লবে পাহাড়টি উৎক্ষিপ্ত হয়ে পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। বর্ষাশেষে নন্দাদি গোপেরা বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের পূজা করতেন। বৃষ্টিতে শস্য ভাল জন্মে। শস্য মানুষের খাদ্য। ঘাস খেয়ে গোরু দুগ্ধবতী হয়। কৃষ্ণ তাদের বোঝালেন, আমাদের গোরু-বাছুর গোবর্ধনের আশ্রয়ে লালিত-পালিত। অতএব তার পুজোই বিধেয়। এতে কূপিত হয়ে ইন্দ্র এমন বারিবর্ষণ শুরু করলেন যে, বৃন্দাবন বুঝি তলিয়ে যায়! তখন শ্রীকৃষ্ণ হাতের আঙুলে গোবর্ধনকে ছাতার মত মাথার ওপরে সাতদিন ধরে রেখে বৃন্দাবনকে রক্ষা করেছিলেন। মহাভারতে শিশুপালের কথায় এই পাহাড়পূজার প্রসঙ্গের সামান্য উল্লেখ আছে যে, কৃষ্ণ বল্মীকতুল্য গোবর্ধন ধারণ করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা এই, গোবর্ধন আজও আছে- বল্মীক নয়, পাহাড়ই বটে। যাহোক, কৃষ্ণ গোবর্ধন পূজা করে দরিদ্রদের ভুরিভোজের ব্যবস্থা করেছিলেন। আমরা সবক্ষেত্রে মহাভারতকে টানছি এ কারণে যে, কৃষ্ণচরিত ব্যাখ্যায় মহাভারতই প্রাচীনতম প্রামাণ্য গ্রন্থ।

কৃষ্ণবিদ্বেষীরা কৃষ্ণচরিত্রে কলঙ্ক আরোপের জন্য ব্রজগোপীতত্ত্ব ফেনায়িত করেন কিন্তু মহাভারতে ব্রজগোপীদের কথা কিছুই নেই। সভাপর্বে শিশুপালবধ পর্বাধ্যায়ে শিশুপালের কৃষ্ণনিন্দার সবিস্তার বর্ণনার কোথাও ব্রজগোপীঘটিত কৃষ্ণের কলংকের কথা উচ্চারিত হয়নি। যদি এ কলংক থাকত, তাহলে শিশুপাল কিংবা শিশুপালবধবৃত্তান্ত যিনি প্রণয়ন করেছেন, তিনি কখনওই কৃষ্ণনিন্দাকালে হাতছাড়া করতেন না। শুধু সভাপর্বে দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণকালে দ্রৌপদী কৃষ্ণকে সকাতরে ডাকার সময় একবার ‘গোপীজনপ্রিয়’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। সুন্দর শিশুর প্রতি স্ত্রীজনসুলভ স্নেহ থাকাটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। বিষ্ণুপুরাণে বিষয়টি পবিত্রভাবে উত্থাপিত হয়েছে। হরিবংশে কিছু বিলাসিতা দেখা যায়, ভাগবতে আদিরসের বিস্তার শুরু হয়েছে আর ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে আদিরসের স্রোত বয়ে গেছে। বিষ্ণুপুরাণের পঞ্চম অংশের ত্রয়োদশ অধ্যায় ছাড়া ব্রজগোপীদের কথা আর কোথাও নেই। সেখানে রাসলীলার উল্লেখ আছে। রাস হল নারী-পুরুষে পরস্পরের হাত ধরাধরি করে চক্রাকার ঘুরতে ঘুরতে নাচ-গান করা। বালক-বালিকারা এরকম নাচ-গান করে থাকে। সদ্যকিশোর কৃষ্ণও গোপ বালক-বালিকাদের সঙ্গে এমন নাচ-গান করেছেন। সদা ক্রীড়াশীল বালকের এমন প্রমোদে আদিরস থাকতে পারে না। কেবল কৃষ্ণের মথুরা গমনকালে তাঁদের খেদোক্তি আছে। হরিবংশেও ব্রজগোপীদের কথা বিষ্ণুপর্বের ৭৭ অধ্যায় (গ্রন্থান্তরে ৭৬ অধ্যায়) ছাড়া আর কোথাও নেই। তবে হরিবংশে ‘রাস’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়নি, তার পরিবর্তে ‘হল্লীষ’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। এই অধ্যায়ের নাম ‘হল্লীষক্রীড়নম্’। ‘হল্লীষ’ এবং ‘রাস’ একই কথা- নৃত্যবিশেষ। কবিত্বে, গাম্ভীর্যে, পাণ্ডিত্যে ও ঔদার্যে হরিবংশকার বিষ্ণুপুরাণকারের তুলনায় অনেক লঘু। তিনি বিষ্ণুপুরাণকারের রাসবর্ণনার নিগূঢ় তাৎপর্য ও গোপীদের ভক্তিযোগে কৃষ্ণে একাত্ম হয়ে যাওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারেননি। তাই বিষ্ণুপুরাণের চপলা বালিকা আনন্দে চঞ্চলা, হরিবংশে সেই গোপীরা বিলাসিনীর ভাব প্রকাশ করছে।

শ্রীমদ্ভাগবতে ব্রজগোপীদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের সম্বন্ধ শুধু রাসলীলায় সীমাবদ্ধ নেই। ভাগবতকার গোপীদের সঙ্গে কৃষ্ণের লীলার বিশেষ বিস্তার ঘটিয়েছেন। সময়ে সময়ে তা আধুনিক রুচিবিরুদ্ধ। কিন্তু এসব বর্ণনার বহিরঙ্গ রুচিবিরুদ্ধ মনে হলেও অন্তরঙ্গে অতি পবিত্র ভক্তিতত্ত্ব নিহিত রয়েছে। হরিবংশকারের মত ভাগবতকার বিলাসপ্রিয়তা-দোষে দূষিত নন। তাঁর অভিপ্রায় অতি নিগূঢ় ও বিশুদ্ধ। ভাগবতের দশম স্কন্ধের ২১ অধ্যায়ে প্রথমত গোপীদের পূর্বরাগ বর্ণিত হয়েছে। তারা কৃষ্ণের বাঁশি শুনে মোহিত হয়ে পরস্পরের কাছে কৃষ্ণের প্রতি অনুরাগ ব্যক্ত করছেন। সেই পূর্বানুরাগ বর্ণনায় কবি অসাধারণ কবিত্ব প্রকাশ করেছেন। আর সেটা ব্যাখ্যা করতে তিনি ‘বস্ত্রহরণ’ পালা ফেঁদেছেন, যার সারমর্ম হচ্ছে ভগবানকে পেতে সর্বস্ব ত্যাগ করা যায়, লজ্জা যে নারীর ভূষণ, তাও ত্যাগ করা যায়। বস্ত্রহরণের কোনও কথা মহাভারত, বিষ্ণুপুরাণ বা হরিবংশে নেই, এটি ভাগবতকারের একান্ত কল্পনাপ্রসূত।

কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং- এই যদি বাঙালির বিশ্বাস, তবে কৃষ্ণকে বাল্যে ননীচোর, কৈশোরে পারদারিক, পরিণত বয়সে বঞ্চক ও শঠ- এমন ভাবনায় কী পাপস্রোত বৃদ্ধি পায় না? পুরাণ-ইতিহাস আলোচনা করে দেখছি, কৃষ্ণসম্বন্ধীয় যে-সব পাপ-উপাখ্যান জনসমাজে প্রচলিত- সবই অমূলক কুনাট্য ছাড়া কিছু নয়। এসব বাদ দিলে বাকি যা থাকে, তা অতি বিশুদ্ধ, পরম পবিত্র, অতিশয় মহৎ। তাঁর মত সর্বগুণান্বিত, সর্বপাপসংস্পর্শশূন্য আদর্শ চরিত্র আর কোথাও নেই। কোনও দেশীয় ইতিহাসে না, কোনও দেশীয় কাব্যেও না।

বৃন্দাবনে বসবাসকালে কৃষ্ণের রাসলীলা বা হল্লীষক্রীড়া বা বস্ত্রহরণ অথবা শ্রীরাধিকার সঙ্গে প্রেমলীলা নিতান্তই কবিকল্পনা। এইসব লীলাবিস্তার করে কৃষ্ণের মহিমান্বিত চরিত্রকে অযথা কলঙ্কিত করার চেষ্টা হয়েছে। কংসবধের কথাপ্রসঙ্গে তাঁর নিজের কথা থেকে মনে হয়, কংসবধের আগে থেকেই তিনি মথুরায় বাস করতেন। ভাবুন একবার, যদি বৃন্দাবনেই না গিয়ে থাকেন, তাহলে বৃন্দাবনলীলা আসে কোথা থেকে? আসুন, পুরুষোত্তম কৃষ্ণ সম্পর্কে অপপ্রচার বন্ধ করি।

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কৃষ্ণচরিত্রে রাধা এলেন কীভাবে?

অথর্ববেদের উপনিষদসমূহের মধ্যে গোপালতাপনী নামে অপেক্ষাকৃত আধুনিক উপনিষদে কৃষ্ণকে গোপগোপীপরিবৃত দেখা যায়। কিন্তু এতে গোপগোপীর অর্থ প্রচলিত অর্থের থেকে আলাদা। এখানে গোপী অর্থে অবিদ্যা কলা। আর গোপীজনবল্লভ অর্থে ‘গোপীনাং পালনশক্তীনাং জনঃ সমূহঃ তদ্বাচ্যা অবিদ্যাঃ কলাশ্চ তাসাং বল্লভঃ স্বামী প্রেরক ঈশ্বরঃ।’ উপনিষদে গোপীর এমন অর্থ আছে, অথচ রাসলীলার কোনও কথাই নেই। রাধার নামমাত্র নেই। একজন প্রধানা গোপীর কথা আছে বটে, তবে তিনি রাধা নন, তাঁর নাম গান্ধর্বী। তাঁর প্রাধান্যও কামকেলিতে নয়- তত্ত্বজিজ্ঞাসায়। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ আর জয়দেবের গীতগোবিন্দ কাব্য ছাড়া কোনও প্রাচীন গ্রন্থে রাধা নেই।

ভাগবতের দশম স্কন্ধের ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩- এই পাঁচ অধ্যায়ের নাম রাসপঞ্চাধ্যায়। কৃষ্ণের বাঁশি শুনে গোপাঙ্গনাদের কৃষ্ণদর্শনে ধাবিত হতে এবং কৃষ্ণের সঙ্গে কথোপকথনে লিপ্ত দেখা যায়। কিন্তু সেখানে ‘রাধা’ নাম কোথাও পাওয়া যায় না। রাধা নাম বৈষ্ণবাচার্যদের অস্থিমজ্জায় ঢুকে আছে। তাঁরা টিকাটিপ্পনীর ভিতর বারবার রাধা প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন, কিন্তু মূলে কোথাও রাধার নাম নেই। গোপীদের অনুরাগপ্রাবল্যজনিত ঈর্ষার প্রমাণস্বরূপ কবি লিখেছেন যে, তারা পদচি‎হ্ন দেখে অনুমান করেছিল যে, কোনও একজন গোপীকে নিয়ে কৃষ্ণ বিজনে প্রবেশ করেছেন। কিন্তু তাও গোপীদের ঈর্ষাজনিত ভুলমাত্র। শ্রীকৃষ্ণ অন্তর্হিত হলেন, এ কথাই আছে, কাউকে নিয়ে অন্তর্হিত হলেন, এমন কথা নেই এবং রাধার নামগন্ধও নেই।

রাসপঞ্চাধ্যায় কেন, সমস্ত ভাগবতে কোথাও রাধার নাম নেই। ভাগবত কেন, বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ বা মহাভারতে কোথাও রাধার নাম নেই। অথচ এখন কৃষ্ণ উপাসনার প্রধান অঙ্গ রাধা। রাধা ছাড়া এখন কৃষ্ণনাম নেই। রাধা ছাড়া বাংলায় কৃষ্ণের মন্দির নেই, মূর্তি নেই। বৈষ্ণবদের অনেক রচনায় কৃষ্ণের চেয়েও রাধা প্রাধান্য লাভ করেছেন। যে রাধাকে নিয়ে ভারতবর্ষ বিশেষত বাঙলা মাতোয়ারা, সেই রাধার উল্লেখ মহাভারতে নেই- বিষ্ণুপুরাণ, হরিবংশ, এমনকি ভাগবতেও নেই। তাহলে এ রাধা এলেন কোথা থেকে?

রাধাকে প্রথম ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে দেখতে পাই। আদিম ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বিলুপ্ত। এখন যে ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ পাওয়া যায়, তা পুরাণসমূহের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ বলে বোধ হয়। এর রচনাপ্রণালী এখনকার ভট্টাচার্যদের রচনার মত। এতে ষষ্ঠী মনসার কথাও আছে। এখনকার ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে এক নতুন দেবতত্ত্ব হাজির করা হয়েছে। আমরা চিরকাল জানি, কৃষ্ণ বিষ্ণুর অবতার। অথচ এখানে বলা হচ্ছে, কৃষ্ণই বিষ্ণুকে সৃষ্টি করেছেন। বিষ্ণু থাকেন বৈকুণ্ঠে, কৃষ্ণ থাকেন গোলোকে রাসম-লে- বৈকুণ্ঠ তার অনেক নীচে। ইনি কেবল বিষ্ণুকে নন, ব্রহ্মা, রুদ্র, লক্ষ্মী, দুর্গা প্রভৃতি সমস্ত দেবদেবী, দানব ও জীবের সৃষ্টি করেছেন। গোলকধামে গো, গোপ ও গোপিনীরা বাস করে। তারা দেবদেবীর উপর। সেই গোলকধামের অধিষ্ঠাত্রী কৃষ্ণবিলাসিনী দেবীই রাধা। রাধার আগে রাসম-ল, রাসম-লে ইনি রাধাকে সৃষ্টি করেন। গোপীদের বাসস্থান গোলকধাম বৃন্দাবনের অবিকল নকল। এখানে কৃষ্ণযাত্রার চন্দ্রাবলীর মত রাধার প্রতিযোগিনী গোপীর নাম বিরজা। মানভঞ্জন যাত্রায় যেমন যাত্রাওয়ালারা কৃষ্ণকে চন্দ্রাবলীর কুঞ্জে নিয়ে যায়, ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণকারও তেমনি কৃষ্ণকে গোলকধামে বিরজার কুঞ্জে নিয়ে গেছেন। তাতে যাত্রার রাধিকার মনে যেমন ঈর্ষা ও কোপের সৃষ্টি হয়, ব্রহ্মবৈবর্তের রাধিকার মনেও তেমনি ঈর্ষা ও কোপের সৃষ্টি হয়েছিল। তাতে আরেক মহা গোলযোগ ঘটে যায়। রাধিকা কৃষ্ণকে হাতেনাতে ধরার জন্যে রথে চড়ে বিরজার মন্দিরে গিয়ে উপস্থিত হন। সেখানে বিরজার দ্বার রক্ষা করছিলেন শ্রীদামা বা শ্রীদাম। শ্রীদাম রাধিকাকে দ্বার ছাড়ে না। এদিকে রাধিকার ভয়ে বিরজা গলে জল হয়ে নদীতে রূপান্তরিত হলেন। শ্রীকৃষ্ণ তাতে দুঃখিত হয়ে তাঁকে পুনর্জীবন ও পূর্বরূপ প্রদান করলেন। বিরজা গোলকনাথের সঙ্গে নিত্য আনন্দ অনুভব করতে লাগলেন। ক্রমে তার সাতটি পুত্র জন্মাল। কিন্তু পুত্ররা আনন্দ অনুভবের বিঘ্ন তাই মা তাদের অভিশাপ দিলেন, তারা সাত সমুদ্র হয়ে রইল। এদিকে রাধা কৃষ্ণবিরজা-বৃত্তান্ত জানতে পেরে কৃষ্ণকে যারপরনাই ভর্ৎসনা করলেন, এবং অভিশাপ দিলেন যে, তুমি পৃথিবীতে গিয়ে বাস কর। অপরদিকে কৃষ্ণসখা শ্রীদাম রাধার এহেন দুর্ব্যবহারে অতিশয় ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে ভর্ৎসনা করলেন। শুনে রাধা শ্রীদামকে গালমন্দ করে শাপ দিলেন, তুমি পৃথিবীতে গিয়ে অসুর হয়ে জন্মগ্রহণ কর। শ্রীদামও কম যান না। তিনিও রাধাকে শাপ দিয়ে বললেন, তুমিও পৃথিবীতে গিয়ে রায়াণপত্নী (যাত্রার আয়ান ঘোষ) হয়ে জন্মগ্রহণ করবে এবং কলঙ্কিনীরূপে খ্যাত হবে।

অতঃপর দু’জনেই কৃষ্ণের কাছে এসে কেঁদে পড়লেন। কৃষ্ণ শ্রীদামকে বর দিয়ে বললেন যে, তুমি অসুরেশ্বর হয়ে জন্মাবে, কেউ তোমাকে পরাজিত করতে পারবে না। শেষে শঙ্করের শূলের স্পর্শে মুক্ত হবে। রাধাকেও আশ্বাস দিয়ে বললেন, ‘তুমি যাও; আমিও যাচ্ছি।’ শেষে পৃথিবীর ভার লাঘবের জন্য তিনি পৃথিবীতে অবতীর্ণ হলেন।

এ সব কথা নতুন এবং সব শেষে প্রচারিত হলেও এই ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণ বাঙলার বৈষ্ণবধর্মের ওপর অতিশয় প্রভাব বিস্তার করেছে। জয়দেব প্রভৃতি বাঙালি বৈষ্ণবকবি, বাঙলার জাতীয় সংগীত, বাঙলার যাত্রা মহোৎসবাদির মূল ব্রহ্মবৈবর্তে। তবে ব্রহ্মবৈবর্তকারকথিত একটা বড় মূল কথা বাঙলার বৈষ্ণবেরা গ্রহণ করেননি, অন্তত সেটা বাঙালির বৈষ্ণবধর্মে তেমনভাবে পরিস্ফুট হয়নি- রাধিকা রায়ানপত্নী বলে পরিচিতা, কিন্তু ব্রহ্মবৈবর্তের মতে তিনি কৃষ্ণের বিধিসম্মত বিবাহিতা পত্নী। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের শ্রীকৃষ্ণজন্মখণ্ডের ১৫ অধ্যায়ে বিবৃত সেই বিবাহবৃত্তান্ত জয়দেবের গীতগোবিন্দ থেকে উদ্ধৃত করছি: ‘একদা কৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে নন্দ বৃন্দাবনে গিয়েছিলেন। সেখানকার ভাণ্ডীরবনে গোরু চরানোর সময় সরোবরের স্বাদু জল তিনি গোরুদের পান করালেন, নিজেও পান করলেন। এবং বালককে বুকে নিয়ে বটমূলে বসলেন। হে মুনে! তারপর মায়াতে শিশুশরীরধারণকারী কৃষ্ণ অকস্মাৎ মায়ার দ্বারা আকাশ মেঘাচ্ছন্ন করলেন, আকাশ মেঘাচ্ছন্ন এবং কাননান্তর শ্যামল; ঝঞ্ঝাবাত, মেঘশব্দ, দারুণ বজ্রশব্দ, অতিস্থূল বৃষ্টিধারা এবং বৃক্ষসকল আন্দোলিত হয়ে ভেঙে পড়তে লাগল, দেখে নন্দ ভয় পেলেন। ‘বাছুরগুলোকে ছেড়ে কিভাবেই-বা নিজের আশ্রয়ে যাই, যদি গৃহে না যাই, তবে এই বালকেরই-বা কি হবে’, নন্দ এমন বলছেন, শ্রীহরি তখন কাঁদতে কাঁদতে মায়াভয়ে ভীত হয়ে বাপের গলা জড়িয়ে ধরলেন। এমন সময় রাধা সেখানে এসে উপস্থিত হলেন।’

রাধার অপূর্ব রূপলাবণ্য দেখে নন্দ বিস্মিত হলেন, তিনি রাধাকে বললেন, ‘আমি গর্গমুখে জেনেছি, তুমি পদ্মারও অধিক হরির প্রিয়া; আর ইনি পরম নির্গুণ অচ্যুত মহাবিষ্ণু; তথাপি আমি মানব, বিষ্ণুমায়ায় মোহিত আছি। হে ভদ্রে! তোমার প্রাণনাথকে গ্রহণ কর; যেখানে খুশি যাও। পরে মনোরথ পূরণ করে আমার পুত্র আমাকে দিও।’

এই বলে নন্দ কৃষ্ণকে রাধার হাতে সমর্পণ করলেন। রাধাও কৃষ্ণকে কোলে করে নিয়ে গেলেন। দূরে গেলে রাধা রাসম-ল স্মরণ করলেন, তখন মনোহর বিহারভূমি সৃষ্টি হল। কৃষ্ণকে সেখানে নেওয়া হলে তিনি কিশোরমূর্তি ধারণ করে রাধাকে বললেন, ‘যদি গোলকের কথা স্মরণ হয়, তবে যা স্বীকার করেছি, তা পূর্ণ করব।’ তাঁরা এমন প্রেমালাপে লিপ্ত ছিলেন, এমন সময় সেখানে ব্রহ্মা এসে উপস্থিত হলেন। তিনি রাধাকে অনেক স্তবস্তুতি করলেন। শেষে নিজে কন্যাকর্তা হয়ে যথাবিহিত বেদবিধি অনুসারে রাধিকাকে কৃষ্ণে সম্প্রদান করলেন। তাঁদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করে তিনি অন্তর্হিত হলেন। রায়াণের সঙ্গে রাধিকার যথাশাস্ত্র বিয়ে হয়েছিল কিনা, যদি হয়ে থাকে, তবে তা আগে না পরে, তা ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে সে-সম্পর্কে কোনও তথ্য নেই। রাধাকৃষ্ণের বিয়ের পর বিহারবর্ণন। বলা বাহুল্য যে, ব্রহ্মবৈবর্তের রাসলীলাও অনুরূপ।

পাঠক দেখবেন যে, ব্রহ্মবৈবর্তকার সম্পূর্ণ নতুন এক বৈষ্ণবধর্ম সৃষ্টি করেছেন। সে বৈষ্ণবধর্মের নামগন্ধ বিষ্ণু বা ভাগবত বা অন্য পুরাণে নেই। রাধাই এই বৈষ্ণবধর্মের কেন্দ্রস্বরূপ। কবি জয়দেব গীতগোবিন্দ কাব্যে এই নতুন বৈষ্ণবধর্ম অবলম্বন করেই গোবিন্দগীতি রচনা করেছেন। এই ধর্ম অবলম্বন করেই শ্রীচৈতন্য কান্তরসাশ্রিত অভিনব ভক্তিবাদ প্রচার করেছেন।

এখন দেখা যাক, এই নতুন ধর্মের তাৎপর্য কি এবং কোথা থেকে এর উৎপত্তি?

ভারতবর্ষের প্রধান ছয়টি দর্শনের মধ্যে বেদান্ত ও সাঙ্খ্যের প্রাধান্য বেশি। বেদান্তের মূল কথা হচ্ছে, এই জগৎ ও জীবসকল ঈশ্বরের অংশ। তিনি এক ছিলেন, বহু হলেন। তিনি পরমাত্মা। জীবাত্মা সেই পরমাত্মার অংশ। ঈশ্বরের মায়া থেকে জীবাত্মার সৃষ্টি এবং সেই মায়ামুক্তি ঘটলেই আবার ঈশ্বরে বিলীন হবে। বেদান্ত দর্শন এই অদ্বৈতবাদে পূর্ণ।

আধুনিককালে শংকরাচার্য, রামানুজাচার্য, মাধ্বচার্য ও বল্লভাচার্য অদ্বৈতবাদের চার ধরনের ব্যাখ্যা হাজির করেছেন। এগুলো যথাক্রমে অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ, দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও বিশুদ্ধদ্বৈতবাদ। কিন্তু প্রাচীন বৈষ্ণবধর্মে এত বিভেদ ছিল না, শুধু ছিল জগৎ ঈশ্বর বা ঈশ্বর জগৎ নন, কিন্তু ঈশ্বরে জগৎ আছে- ‘সূত্রে মণিগণা ইব’।

অন্যদিকে কপিলের সাঙ্খ্যে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই। পরবর্তী সাঙ্খ্যরা অবশ্য ঈশ্বরের অস্তিত্ব স্বীকার করেছেন। সাঙ্খ্যের মোদ্দা কথা হচ্ছে, জড়জগৎ বা জড়জগন্ময়ীশক্তি হচ্ছেন প্রকৃতি। ইনি সৃষ্টি, স্থিতি ও প্রলয়ের কর্ত্রী। পরমাত্মা বা পুরুষ সম্পূর্ণ সঙ্গশূন্য। এই পুরুষপ্রকৃতিতত্ত্ব থেকে তান্ত্রিকধর্মের উদ্ভব। সাঙ্খ্যের প্রকৃতি তন্ত্রে এসে হল শক্তি। বৈষ্ণবদের অদ্বৈতবাদ-বিরোধী মানুষের কাছে এই তান্ত্রিকধর্ম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তখন তান্ত্রিকধর্মের সারাৎসার আত্মসাৎ করে ব্রহ্মবৈবর্তকার এই শক্তিকে বৈষ্ণবীশক্তি আখ্যায়িত করে অভিনব বৈষ্ণবধর্ম প্রচার করেন। এখানে রাধা সাঙ্খ্যদের মূলপ্রকৃতিস্থানীয়া। যদিও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের ব্রহ্মখণ্ডে বলা হয়েছে, কৃষ্ণ মূলপ্রকৃতিকে সৃষ্টি করে তারপর রাধাকে সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু শ্রীকৃষ্ণজন্মখণ্ডে দেখা যায়, কৃষ্ণ নিজেই রাধাকে বার বার মূলপ্রকৃতি বলে সম্বোধন করছেন।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বেদান্তের মায়াবাদ সাঙ্খ্যে হল প্রকৃতিবাদ। প্রকৃতিবাদ থেকে শক্তিবাদ। শক্তিবাদ থেকে ব্রহ্মবৈবর্তকারের বৈষ্ণবীশক্তিবাদ। পুরাণকার লিখেছেন যে, কৃষ্ণ রাধাকে বলছেন: ‘তুমি না থাকলে আমি কৃষ্ণ, তুমি থাকলে আমি শ্রীকৃষ্ণ।’ বিষ্ণুপুরাণে শ্রী সম্বন্ধে যা বলা হয়েছে, ব্রহ্মবৈবর্তে রাধা সম্বন্ধে ঠিক তাই বলা হয়েছে। রাধা সেই শ্রী। রাধা ঈশ্বরের শক্তি, উভয়ের বিধিসম্মত পরিণয়, শক্তিমানের শক্তির পরিচয় এবং শক্তিরই প্রকাশ উভয়ের বিহার।

সুতরাং বিদ্যমান ব্রহ্মবৈবর্তে ‘রাধাতত্ত্ব’ কী, তা নিশ্চয়ই পাঠক বুঝতে পেরেছেন। কিন্তু আদিম ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে রাধা কৃষ্ণ-আরাধিকা আদর্শরূপিণী গোপী ছিলেন, সন্দেহ নেই।

উপরের দীর্ঘ আলোচনা থেকে বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, বৃন্দাবনে বসবাসকালে কৃষ্ণের রাসলীলা বা হল্লীষক্রীড়া বা বস্ত্রহরণ অথবা শ্রীরাধিকার সঙ্গে প্রেমলীলা নিতান্তই কবিকল্পনা। এইসব লীলাবিস্তার করে কৃষ্ণের মহিমান্বিত চরিত্রকে অযথা কলঙ্কিত করার চেষ্টা হয়েছে। কংসবধের কথাপ্রসঙ্গে তাঁর নিজের কথা থেকে মনে হয়, কংসবধের আগে থেকেই তিনি মথুরায় বাস করতেন। ভাবুন একবার, যদি বৃন্দাবনেই না গিয়ে থাকেন, তাহলে বৃন্দাবনলীলা আসে কোথা থেকে?

যাহোক, আবার কৃষ্ণচরিত বর্ণনায় ফিরে আসি। বৃন্দাবন পর্বে কৃষ্ণ অরিষ্ট (বৃষরূপী) এবং কেশী (অশ্বরূপী) নামে দুই অসুরকে বধ করেছিলেন বলে শিশুপালের কৃষ্ণনিন্দায় দেখা যায়। অত্যাচারী কংসের ভয়ে বসুদেব তাঁর পত্নী রোহিণী ও দুই পুত্র রাম এবং কৃষ্ণকে নন্দালয়ে গোপনে রেখে এসেছিলেন, সেকথা আমরা ইতোপূর্বে জেনেছি। কৃষ্ণের শৈশব ও কৈশোর সেখানে অতিবাহিত হয়। তিনি শৈশবে রূপলাবণ্যে ও শিশুসুলভ গুণে সকলের প্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। কৈশোরে তিনি অতিশয় বলশালী ছিলেন। বৃন্দাবনের অনিষ্টকারী পশুপাখি প্রভৃতি হত্যা করে তিনি গোপবালকদের সবসময় রক্ষা করতেন। তিনি শৈশবাবধি সকল মানুষ ও জীবের প্রতি করুণাঘন ছিলেন- সবার উপকার করতেন। সবার সঙ্গে আমোদ-প্রমোদ করতেন, সবাইকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করতেন এবং কৈশোরেই তাঁর হৃদয়ে প্রকৃত ধর্মতত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়। না হলে, রাজাকে যিনি হত্যা করেন, তিনিই রাজা হন- এটাই আমরা দেখে আসছি। কিন্তু কৃষ্ণ কংসকে বধ করার পরেও রাজা হলেন না, বরং উগ্রসেনের রাজ্যে উগ্রসেনকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেন।

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কংসবধ: কৃষ্ণের ধর্মপ্রতিষ্ঠার প্রথম প্রয়াস

আমরা জানি, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে ভাদ্রমাসের রেবতীনক্ষত্রযুক্ত কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বসুদেব কংসের দ্বারা প্রাণসংশয় হতে পারে আশঙ্কা করে সদ্যোজাত পুত্রকে রাতের অন্ধকারেই সেই ঝড়জলের মধ্যে যমুনার অপরপারে গোকূলে নন্দের গৃহে রেখে এলেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাঁকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে লাগলেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন। কৃষ্ণচরিত্রের অলৌকিক নয়, বরং আমি বলি অতিলৌকিক বিষয় হচ্ছে, আশৈশব তিনি অমিত বলশালী ছিলেন। সে-সময় ঘোষ নিবাসে নেকড়ে বাঘের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণও নানা বিপদে পড়েছিলেন। তাই নন্দ ও অন্যান্য গোপেরা পূর্ব বাসস্থান ত্যাগ করে অধিকতর নিরাপদ সুখের জায়গা বৃন্দাবনে গিয়ে বসতি স্থাপন করলেন।

মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কাছে খবর পৌঁছল, বৃন্দাবনে কৃষ্ণ-বলরাম অতিশয় বলশালী হয়ে উঠেছেন। পূতনা থেকে অরিষ্ট পর্যন্ত কংসের অনুচরদের বধ করেছেন। দেবর্ষি নারদ গিয়ে কংসকে বললেন, কৃষ্ণ-বলরাম বসুদেবের পুত্র। দেবকীর অষ্টম গর্ভজাত বলে যে-কন্যাকে কংস হত্যা করেছিলেন, সে নন্দ-যশোদার কন্যা। বসুদেব সন্তান পরিবর্তন করে কৃষ্ণকে নন্দালয়ে গোপনে রেখে এসেছিলেন। এসব শুনে কংস ভীত ও ক্রুদ্ধ হয়ে বসুদেবকে ভর্ৎসনা করলেন, হত্যা করতে উদ্যত হলেন। তিনি বলরাম ও কৃষ্ণকে আনবার জন্য অক্রূর নামে একজন যাদবপ্রধানকে বৃন্দাবনে পাঠালেন এবং নিজের বিখ্যাত মল্লদের দিয়ে দু’ভাইকে হত্যার জন্য ধনুর্মুখ নামে এক যজ্ঞের আয়োজন করলেন। বলরাম ও কৃষ্ণ অক্রূরের সঙ্গে সেখানে এসে রঙ্গভূমিতে ঢুকে কংসের শিক্ষিত হাতি কুবলয়াপীড়, লব্ধপ্রতিষ্ঠ মল্ল চাণূর ও মুষ্টিককে হত্যা করলেন। কংস এসব দেখে নন্দকে লোহার শেকলে বেঁধে রাখার এবং বসুদেবকে হত্যার আদেশ দিয়ে কৃষ্ণ-বলরামকে তাড়িয়ে দিতে বললেন। তখন যে মঞ্চে বসে কংস ও অন্যান্য যাদব মল্লযুদ্ধ দেখছিলেন, ক্রুদ্ধ কৃষ্ণ একলাফে সেখানে গিয়ে কংসকে চুল ধরে টেনে মল্লভূমিতে এনে ফেললেন এবং চোখের নিমেষে হত্যা করলেন। পরে বসুদেব-দেবকী প্রভৃতি গুরুজনদের যথাবিহিত বন্দনা করে কংসের পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনে বসালেন। নিজে রাজা হলেন না। হরিবংশ ও পুরাণসমূহে এমন কংসবধ বৃত্তান্ত বলা হয়েছে।

কিন্তু মহাভারতের সভাপর্বে জরাসন্ধবধ পর্বে কৃষ্ণ নিজের কথা যুধিষ্টিরকে বলছেন এভাবে, ‘কিছুদিন গত হলে কংস যাদবদের পরাজিত করে সহদেবা ও অনুজা নামে বার্হদ্রথের দুই কন্যাকে বিয়ে করেছিল। ঐ দুরাত্মা বাহুবলে জ্ঞাতিদের পরাজিত করে সর্বাপেক্ষা প্রধান হয়ে উঠল। ভোজবংশীয় বৃদ্ধ ক্ষত্রিয়রা মূঢ়মতি কংসের দৌরাত্ম্যে ব্যথিত হয়ে জ্ঞাতিদের ত্যাগ করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। আমি তখন অক্রূরকে আহুক-কন্যার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে জ্ঞাতিদের হিতসাধনে বলভদ্রকে সঙ্গে নিয়ে কংস ও সুনামাকে হত্যা করলাম।’

এতে কৃষ্ণ-বলরামের বৃন্দাবন থেকে মথুরায় নিয়ে আসার কোনও কথা নেই। বরং তারা কংসবধের আগে থেকেই মথুরায় বাস করতেন বলে ধারণা করা যায়। কংসবধে অন্যান্য যাদবগণ প্রকাশ্যে তাঁদের সাহায্য করুন বা না করুন, কংসকে রক্ষায় তাঁরা কেউই এগিয়ে আসেননি, এটা স্পষ্ট। কংস তাদের সবার ওপর অত্যাচার করত, এজন্য বোধহয় তারা রাম-কৃষ্ণের বলাধিক্য দেখে তাঁদের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়ে কংসবধে তৎপর হয়েছিলেন।

কৃষ্ণ কংসকে হত্যা করে কংসের পিতা উগ্রসেনকে সিংহাসনে বসান। প্রচলিত রীতি ও নীতি এই যে, যে রাজাকে হত্যা করে, সেই তার রাজ্যভোগী হয়। কংসকে হত্যা করে কৃষ্ণ অনায়াসেই মথুরার সিংহাসনে বসতে পারতেন; কিন্তু তিনি তা করলেন না, কারণ, ধর্মত সিংহাসন উগ্রসেনেরই প্রাপ্য। কংস পিতাকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজা হয়েছিলেন। কৃষ্ণ ধর্মপ্রাণ, শৈশব থেকেই ধর্মাত্মা। যাদবদের হিতসাধনে তিনি কংসবধে অগ্রসর হয়েছিলেন। কংসকে হত্যা করে করুণহৃদয় আদর্শ পুরুষ কৃষ্ণ কংসের জন্য বিলাপ করেছিলেন। কংসবধে আমরা দেখি, কৃষ্ণ পরম বলশালী, পরম কার্যাদক্ষ, পরম ন্যায়পরায়ণ, পরম ধর্মাত্মা, পরিহিতে ব্রতী এবং পরের জন্য কাতর। এখানে তাঁকে আমরা আদর্শ মানুষ হিসেবে পাই।

পুরাণে বলা হয়েছে যে, কংসবধের পর কৃষ্ণ-বলরাম কাশীতে সান্দীপনি মুনির কাছে শিক্ষাগ্রহণের জন্য গেলেন। সেখানে চৌষট্টি দিনের মধ্যে অস্ত্রবিদ্যায় সুশিক্ষিত হয়ে গুরুদক্ষিণা দিয়ে মুথরায় ফিরে এলেন। কৃষ্ণের শিক্ষা সম্বন্ধে এছাড়া পুরাণেতিহাসে আর কিছু পাওয়া যায় না। নন্দের গৃহে তাঁর কোনওপ্রকার শিক্ষা হওয়ার কোনও প্রসঙ্গ কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায় না। অথচ নন্দ জাতিতে বৈশ্য ছিলেন, বৈশ্যদের বেদে অধিকার ছিল। বৈশ্যের গৃহে তাঁদের কোনওপ্রকার বিদ্যশিক্ষা না হওয়া বিচিত্র বটে। বোধহয়, শিক্ষার সময় উপস্থিত হওয়ার আগেই তিনি নন্দের গৃহ থেকে পুনরায় মথুরায় আনীত হয়েছিলেন। ইতোপূর্বে মহাভারত থেকে যে কৃষ্ণবাক্য উদ্ধৃত করা হয়েছে, তাতে এমন অনুমানই সঙ্গত যে, কংসবধের অনেক আগে থেকেই তিনি মথুরায় বাস করছিলেন এবং মহাভারতের সভাপর্বে শিশুপালের কৃষ্ণনিন্দায় দেখা যায়, শিশুপাল তাঁকে কংসের অন্নভোজী বলে তিরস্কার করে বলছেন, ‘যস্য চানেন ধর্মজ্ঞ ভুক্তমন্নং বলীয়সঃ।/ স চানেন হতঃ কংস ইত্যেতন্ন মহাদ্ভুতং ॥ (মহাভারত, সভাপর্ব, ৪০ অধ্যায়)

অতএব বোধহয়, শিক্ষার সময় উপস্থিত হতে না হতেই কৃষ্ণ মথুরায় আনীত হয়েছিলেন। বৃন্দাবনের গোপীদের সঙ্গে তাঁর কৈশোরলীলা যে উপন্যাসমাত্র, এটা তার অন্যতর প্রমাণ। মথুরাবাসকালেও তাঁর কেমন শিক্ষালাভ হয়েছিল, তার বিশেষ কোনও বিবরণ নেই। কেবল সান্দীপনি মুনির কাছে চৌষট্টি দিন অস্ত্রশিক্ষার কথাই আছে। হয়তো তাঁরা কংসবধের অনেক আগে থেকেই মথুরায় অবস্থান করছিলেন। সান্দীপনি ঋষির কাছে ছাড়াও তিনি সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন এবং নিখিল বেদ-বেদাঙ্গ পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আঙ্গিরসবংশীয় ঘোর ঋষির কাছে একাদিক্রমে ১০ বছর বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন বলে ছান্দ্যোগ্য উপনিষদে উল্লেখ আছে।

সে-সময় শ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের উচ্চশিক্ষার উপরিভাগকে তপস্যা বলা হত। শ্রেষ্ঠ রাজর্ষিরা জীবনের কোনও না কোনও সময়ে তপস্যা করেছিলেন, এমন কথা প্রায়ই পাওয়া যায়। আমরা এখন তপস্যা অর্থে যা বুঝি, বেদের অনেক স্থানেই দেখা যায় যে, তপস্যার প্রকৃত অর্থ তা নয়। আমরা বুঝি, তপস্যা অর্থে বনে বসে চক্ষু বুজে নিঃশ্বাস বন্ধ করে পানাহার ত্যাগ করে ঈশ্বরের ধ্যান করা। কিন্তু দেবতাদের মধ্যে কেউ কেউ এবং মহাদেবও তপস্যা করেছিলেন, এও কোনও কোনও গ্রন্থে পাওয়া যায়। শতপথব্রাহ্মণে আছে যে, স্বয়ং পরব্রহ্ম বহু হবার বাসনায় তপস্যার দ্বারা সৃষ্টি করলেন। এসব জায়গায় তপস্যা অর্থে এরকমই বুঝতে হয় যে, চিত্ত সমাহিত করে নিজের শক্তিসমূহের অনুশীলন ও স্ফূরণ করা। মহাভারতে বলা হয়েছে, কৃষ্ণ দশ বছর হিমালয় পর্বতে তপস্যা করেছিলেন। মহাভারতের ঐশিক পর্বে আছে, অশ্বত্থামার ব্রহ্মশিরা অস্ত্রে উত্তরার গর্ভপাতের আশংকা দেখা দিলে কৃষ্ণ সেই মৃত শিশুকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিজ্ঞা করে অশ্বত্থামাকে বলেছিলেন, ‘তুমি আমার তপোবল দেখবে।’ আদর্শ মানুষের আদর্শ শিক্ষাই হবে। ফলও তেমন দেখি। কিন্তু সেই প্রাচীনকালের আদর্শ শিক্ষা কেমন ছিল, তা মহাভারতে বিশদ নেই, এটাই বড় দুঃখের বিষয়।

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


কৃষ্ণের বহুবিবাহ প্রসঙ্গ

আমরা জানি, দ্বাপরযুগে শ্রীকৃষ্ণ অধর্মের বিপরীতে ধর্ম প্রতিষ্ঠার জন্য মথুরার রাজকন্যা দেবকীর অষ্টম গর্ভে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বসুদেব কংসের দ্বারা প্রাণসংশয় হতে পারে আশঙ্কা করে সদ্যোজাত পুত্রকে রাতের অন্ধকারেই সেই ঝড়জলের মধ্যে যমুনার অপরপারে নন্দের গৃহে রেখে এলেন। সদ্য সন্তান হারানো যশোদাও তাঁকে পেয়ে পুত্রবোধে লালন-পালন করতে লাগলেন। সেখানে কৃষ্ণ ধীরে ধীরে বড় হতে লাগলেন। সে-সময় ঘোষ নিবাসে নেকড়ে বাঘের উপদ্রব খুব বেড়ে গিয়েছিল। কৃষ্ণও নানা বিপদে পড়েছিলেন। তাই নন্দ ও অন্যান্য গোপেরা পূর্ব বাসস্থান ত্যাগ করে অধিকতর নিরাপদ সুখের জায়গা বৃন্দাবনে গিয়ে বসতি স্থাপন করলেন।

কৃষ্ণ-বলরাম অমিত বলশালী হয়ে উঠছেন, এখবর মথুরার অত্যাচারী রাজা কংসের কাছে পৌঁছলে তিনি কৃষ্ণবধে অতি তৎপর হয়ে উঠলেন। কৃষ্ণ-বলরাম মথুরায় গিয়ে কংসকে হত্যা করে উগ্রসেনের রাজত্ব উগ্রসেনকেই ফিরিয়ে দিলেন। তারপর কৃষ্ণ-বলরাম কাশীতে সান্দীপনি মুনির কাছে চৌষট্টি দিন অস্ত্রশিক্ষার পর মথুরায় ফিরে এলেন। সান্দীপনি ঋষির কাছে ছাড়াও তিনি সমগ্র বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন এবং নিখিল বেদ-বেদাঙ্গ পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আঙ্গিরসবংশীয় ঘোর ঋষির কাছে একাদিক্রমে ১০ বছর বেদ অধ্যয়ন করেছিলেন বলে ছান্দ্যোগ্য উপনিষদে উল্লেখ আছে।

কৃষ্ণ বিদর্ভরাজ ভীষ্মকের কন্যা রুক্মিণীকে বিবাহ করেন। রুক্মিণী অতিশয় রূপবতী ও গুণবতী শুনে কৃষ্ণ ভীষ্মকের কাছে গিয়ে রুক্মিণীকে বিবাহের জন্য প্রার্থনা করলেন। রুক্মিণীও কৃষ্ণের অনুরক্তা ছিলেন। কিন্তু ভীষ্মক কৃষ্ণের শত্রু জরাসন্ধের পরামর্শে রুক্মিণীকে কৃষ্ণের হাতে সমর্পণ করতে রাজি হলেন না। তিনি কৃষ্ণদ্বেষক চেদিরাজ শিশুপালের সঙ্গে রুক্মিণীর বিয়ে ঠিক করে সমস্ত রাজাদের নিমন্ত্রণ করলেন। যাদবদের এ বিয়েতে নিমন্ত্রণ করা হল না। কৃষ্ণ স্থির করলেন, যাদবদের সঙ্গে নিয়ে ভীষ্মকের রাজধানীতে যাবেন এবং রুক্মিণীকে বিয়ে করবেন।

বিয়ের দিন রুক্মিণী দেবমন্দিরে পূজা দিতে গেলে কৃষ্ণ সেখান থেকে তাঁকে রথে তুলে নিলেন। ভীষ্মক ও তার পুত্ররা এবং জরাসন্ধ প্রভৃতি ভীষ্মকের মিত্র রাজারা কৃষ্ণের আগমন সংবাদ শুনে এমন ঘটনা ঘটতে পারে আশংকায় প্রস্তুত হয়েই ছিলেন। তাঁরা সসৈন্যে কৃষ্ণের পশ্চাদ্ধাবন করলেন। কিন্তু কেউই কৃষ্ণ ও যাদবদের পরাভূত করতে পারলেন না। কৃষ্ণ রুক্মিণীকে দ্বারকায় নিয়ে গিয়ে শাস্ত্রমতে বিয়ে করলেন।

এ ধরনের বিয়েকে ‘হরণ’ বলে। কিন্তু ‘হরণ’ কথাটা মৌলিক মহাভারতে কোথাও নেই। হরিবংশ ও পুরাণে আছে। শিশুপাল কুরুবৃদ্ধ ভীষ্মকে তিরস্কারের সময় কাশিরাজের কন্যাহরণের জন্য তাঁকে গালি দিয়েছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণকে তিরস্কারের সময় রুক্মিণীহরণের কোনও কথা তোলেননি। অতএব মনে হয় না যে, রুক্মিণীকে হরণ করা হয়েছিল। রুক্মিণীকে শিশুপাল প্রার্থনা করেছিলেন বটে, কিন্তু ভীষ্ম রুক্মিণীকে কৃষ্ণকেই সম্প্রদান করেছিলেন বলে মনে হয়। রুক্মিণীর বড় ভাই রুক্মী এতে অপমানিত বোধ করলেন। তিনি শিশুপালের পক্ষ নিয়ে বিবাদে লিপ্ত হলেন। তিনি অতিশয় কলহপ্রিয় ছিলেন। পরে অনিরুদ্ধর বিবাহকালে বলরামের হাতে পাশা খেলাজনিত বিবাদে তিনি প্রাণ হারান। কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ।

এ সময় আধুনিক বাঙলা দেশের পশ্চিমভাগে পৌণ্ড্রক বাসুদেব নামে একজন অনার্য রাজা ছিলেন। তিনি নিজেকে ঈশ্বরের অবতার ও দ্বারকা নিবাসী কৃষ্ণকে জাল বাসুদেব বলে প্রচার করতে শুরু করেন। তিনি কৃষ্ণকে বলে পাঠালেন, শঙ্খ-চক্র-পদ্ম প্রভৃতি যে-সব চিহ্নে আমার প্রকৃত অধিকার, তুমি নিজে এসে সে-সব আমাকে দিয়ে যাবে। কৃষ্ণ ‘তথাস্তু’ বলে পৌণ্ড্ররাজ্যে গিয়ে চক্র প্রভৃতি অস্ত্র নিক্ষেপ করে পৌণ্ড্রকের প্রাণনাশ করলেন। বারাণসীর অধিপতিরা পৌণ্ড্রকের পক্ষাবলম্বন করেছিল। পৌণ্ড্রকের মৃত্যুর পরেও তারা কৃষ্ণের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিল। কৃষ্ণ বারাণসী আক্রমণ করে শত্রুদের সংহার করেন এবং বারাণসীতে আগুন ধরিয়ে দেন।

দ্বারকায় কৃষ্ণ রাজা ছিলেন না। যাদববীরেরা সমাজের অধিনায়ক ছিলেন, পরস্পরের প্রতিস্পর্ধী ছিলেন। তাঁরা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রধান বিবেচনা করতেন, সে জন্য উগ্রসেনের রাজা নাম। কিন্তু এ ধরনের প্রধান ব্যক্তির কার্যত তেমন কর্তৃত্ব থাকত না। যে বুদ্ধিবিক্রমে প্রধান, নেতৃত্ব তার হাতেই থাকত। কৃষ্ণ যাদবদের মধ্যে বলবীর্য বুদ্ধিবিক্রমে সর্বশ্রেষ্ঠ, এজন্যই তিনি যাদবদের নেতাস্বরূপ ছিলেন। তাঁর অগ্রজ বলরাম, কৃতবর্মা প্রভৃতি বয়োজ্যেষ্ঠ যাদবেরা তাঁর বশীভূত ছিলেন। কৃষ্ণ সবসময় তাঁদের মঙ্গল কামনা করতেন। কৃষ্ণই তাঁদের রক্ষা করতেন এবং তিনি বহু রাজ্য জয় করলেও জ্ঞাতিদের না দিয়ে নিজে কোনও ঐশ্বর্য ভোগ করতেন না। তিনি সবাইকে সমান ভালবাসতেন; সকলেরই কল্যাণ সাধনে নিযুক্ত থাকতেন। জ্ঞাতিদের প্রতি আদর্শ মানুষের যেমন ব্যবহার কর্তব্য, কৃষ্ণ সবসময় তা করতেন। কিন্তু জ্ঞাতিভাব চিরকালই সমান। তাঁর বলবিক্রমের ভয়ে জ্ঞাতিরা তাঁর বশীভূত ছিল বটে, কিন্তু তাঁর প্রতি হিংসাশূন্য ছিল না। এ বিষয়ে কৃষ্ণ নিজে নারদকে যা বলেছিলেন, ভীষ্ম তা নারদের মুখে শুনে যুধিষ্ঠিরকে বলেছিলেন, কথাগুলো সত্য হোক মিথ্যা হোক, লোকশিক্ষার জন্য আমরা শান্তিপর্ব থেকে তা উদ্ধৃত করছি:

‘জ্ঞাতিদের ঐশ্বর্যের অর্ধেক প্রদান ও তাদের কটুবাক্য শুনে তাদের দাসের মত অবস্থান করছি। আগুনের জন্য যেমন লোকে অরণিকাঠ ঘষে, তেমনি জ্ঞাতিদের দুর্বাক্য আমার হৃদয়কে পোড়ায়। বলদেব গদাকুশলতায় এবং আমার আত্মজ প্রদ্যুম্ন অতুল সৌন্দর্যে লোকসমাজে অদ্বিতীয় বলে প্রতিপন্ন হয়েছেন। আর অন্ধক ও বৃষ্ণিবংশীয়রাও মহাবলশালী, উৎসাহী ও অধ্যবসায়ী; তাঁরা যার সহায়তা না করেন, সে বিনষ্ট হয় এবং যার সহায়তা করেন, সে অনায়াসে অসামান্য ঐশ্বর্য লাভ করে থাকে। ঐসব ব্যক্তি আমার পক্ষে থাকতেও আমি অসহায়ের মত কাল কাটাচ্ছি। আহুক ও অক্রূর আমার পরম সুহৃৎ, কিন্তু তাদের একজনকে স্নেহ করলে, অন্যে রেগে যায়; সেজন্য আমি কারও প্রতি ¯েœহ প্রকাশ করি না। আবার প্রীতিবশত তাদের ত্যাগ করতেও পারি না। তারপর আমি ঠিক করলাম যে, আহুক ও অক্রূর যার পক্ষে, তার দুঃখের সীমা নেই, আর তাঁরা যার পক্ষ নন, তার চেয়েও দুঃখী আর কেউ নেই। যাহোক, এখন আমি উভয়েরই জয় প্রার্র্থনা করছি। হে নারদ! আমি ঐ দুই মিত্রকে আয়ত্ত করার জন্য এমন কষ্ট পাচ্ছি।’

বিভিন্ন লীলাবিস্তার ও রাধিকাবিলাস ছাড়াও স্যমন্তক মণি প্রসঙ্গে কৃষ্ণের বহুবিবাহের কথা এসে পড়ে। এটি একটি বহু চর্চিত লোকপ্রবাদ যে, কৃষ্ণের ষোল হাজার একশো এক মহিষী ছিলেন। মহাভারতের প্রক্ষিপ্ত অংশ, বিষ্ণুপুরাণ ও হরিবংশে তাঁর বহুবিবাহ বিষয়ে নানা অনৈসর্গিক অলীক ব্যাপারের অবতারণা করা হয়েছে। কৃষ্ণ একাধিক বিবাহ করেছিলেন কি না, সে বিষয়ে কোনও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই। ভল্লুকদৌহিত্র শাম্বর কথা বাদ দিলে রুক্মিণী ছাড়া আর কোনও কৃষ্ণ-মহিষীর পুত্র-পৌত্রকে কার্যক্ষেত্রে কোথাও দেখা যায় না। রুক্মিণীরই একটি পুত্রসন্তানের উল্লেখ পাই, যার নাম প্রদ্যুম্ন। রুক্মিণীবংশই রাজা হল, আর কারও বংশের কেউ কোথাও রইল না। শাম্বর মায়ের নাম জাম্ববতী, তিনি ভল্লুক জাম্ববানের কন্যা। কৃষ্ণ স্যমন্তক মণি উদ্ধারকালে জাম্ববতীকে বিবাহ করেছিলেন বলে বিষ্ণুপুরাণ ও হরিবংশে উল্লেখ আছে। কিন্তু কৃষ্ণ ভল্লুককন্যাকে বিবাহ করেছিলেন, একথা বিশ্বাস করা কঠিন। বলা হচ্ছে, এই জাম্ববান ত্রেতাযুগে রামচন্দ্রের বানরসেনাদের সঙ্গে থেকে রামের পক্ষে যুদ্ধ করেছিল। ত্রেতাযুগের ভল্লুক দ্বাপরে এসে পড়ল! এমন হতে পারে, এই জাম্ববান কোনও প্রান্তিক বনবাসী মানুষ, গায়ে প্রভূত লোম থাকায় সবাই তাকে ব্যঙ্গ করে জাম্ববান বলে ডাকত।

কৃষ্ণস্তু ভগবান স্বয়ং- এই যদি বাঙালির বিশ্বাস, তবে কৃষ্ণকে বাল্যে ননীচোর, কৈশোরে পারদারিক, পরিণত বয়সে বঞ্চক ও শঠ- এমন ভাবনায় কী পাপস্রোত বৃদ্ধি পায় না? পুরাণ-ইতিহাস আলোচনা করে দেখেছি, কৃষ্ণসম্বন্ধীয় যে-সব পাপ-উপাখ্যান জনসমাজে প্রচলিত- সবই অমূলক কুনাট্য ছাড়া কিছু নয়। এসব বাদ দিলে বাকি যা থাকে, তা অতি বিশুদ্ধ, পরম পবিত্র, অতিশয় মহৎ। তাঁর মত সর্বগুণান্বিত, সর্বপাপসংস্পর্শশূন্য আদর্শ চরিত্র আর কোথাও নেই। কোনও দেশীয় ইতিহাসে না, কোনও দেশীয় কাব্যেও না।

বৃন্দাবনে বসবাসকালে কৃষ্ণের রাসলীলা বা হল্লীষক্রীড়া বা বস্ত্রহরণ অথবা শ্রীরাধিকার সঙ্গে প্রেমলীলা নিতান্তই কবিকল্পনা। এইসব লীলাবিস্তার করে কৃষ্ণের মহিমান্বিত চরিত্রকে অযথা কলঙ্কিত করার চেষ্টা হয়েছে। কংসবধের কথাপ্রসঙ্গে তাঁর নিজের কথা থেকে মনে হয়, কংসবধের আগে থেকেই তিনি মথুরায় বাস করতেন। ভাবুন একবার, যদি বৃন্দাবনেই না গিয়ে থাকেন, তাহলে বৃন্দাবনলীলা আসে কোথা থেকে? আসুন, পুরুষোত্তম কৃষ্ণ সম্পর্কে সবধরনের অপপ্রচার বন্ধ করি।

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]


যদুবংশধ্বংস এবং কৃষ্ণের মহাপ্রয়াণ

কুরুক্ষেত্রের মহারণের পর ছত্রিশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। কুরুক্ষেত্রে ভারতের ক্ষত্রিয়কুলের প্রায় সকলেই ধ্বংসপ্রাপ্ত। অবশিষ্ট ছিল যাদবগণ, এরা কৃষ্ণের স্বজন। কিন্তু এরা নিতান্ত কুক্রিয়াসক্ত ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠেছিলেন। এরা এতদূর পর্যন্ত পানাসক্ত হয়ে উঠেছিলেন যে, কৃষ্ণ-বলরাম ঘোষণা করেছিলেন যে, দ্বারকায় যে মদ তৈরি করবে, তাকে শূলে চড়ানো হবে। বৃষ্ণি, ভোজ, অন্ধক প্রভৃতি বিভিন্ন বংশজাত যাদবেরা পরস্পরের প্রতি ঘোরতর বিদ্বেষ ভাবাপন্ন হয়ে উঠলেন। তাঁরা সমস্ত ধর্ম ত্যাগ করলেন। কৃষ্ণের শতাধিক বছর বয়স হয়েছে। এদের সংযত করা তাঁর সাধ্য নয়। কৃষ্ণ যাদবদের ‘বিনাশ বাসনা’য় তাদের প্রভাসতীর্থে যাত্রা করতে বললেন।

দ্বারকার আকাশে রাহুগ্রস্ত হল সূর্য, যেমন হয়েছিল হস্তিনাপুরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে। কুরুক্ষেত্রকে উপলক্ষ করেই যদুকুলের মধ্যে হননস্পৃহা প্রজ্জ্বলিত হল। মদ চলছে পাত্রের পর পাত্র। প্রভাসতীর্থ মারাত্মক প্রমোদে মুখর- যাদবেরা আকণ্ঠ ডুবে গেছে মদিরায়। হঠাৎ সাত্যকি তীক্ষèস্বরে বলে উঠলেন, ‘হার্দিক্য, তুমি ছাড়া এমন নিষ্ঠুর আর কে আছে যে নিদ্রিতকে বধ করতে পারে?’ সেই কুখ্যাত নৈশ অভিযান, কৌরবপক্ষের শেষ দারুণ প্রতিহিংসা- তাঁর নিন্দা শুনে সরোষে উত্তর দিলেন কৃতবর্মা, ‘শৈনেয়! মনে নেই তুমি ছিন্নবাহু ভূরিশ্রবার শিরোñেদ করেছিলে? তুমি নৃশংস নও?’ তিক্ত, আরও তিক্ত হয়ে উঠল কলহ, আরও অনেক পুরনো ক্ষোভ উন্মথিত হল নতুন করে, সাত্যকি খড়্গরে আঘাতে কৃতবর্মাকে ভূরিশ্রবার পথে পাঠিয়ে দিলেন। ছড়িয়ে পড়ল জন থেকে জনে অসংবরণীয় জিঘাংসা, ভোজ ও অন্ধকদের হাতে প্রাণ হারালেন সাত্যকি ও প্রদ্যুম্ন। বেদনার সঙ্গে আমাদের মনে পড়ে রৈবতক উৎসবের সেই দৃশ্যটি, যেখানে এই ভোজ, অন্ধক, বৃষ্ণিরা প্রায় একইভাবে তাঁদের নারী ও সুরাপাত্র নিয়ে গোষ্ঠীসুখে মেতেছিলেন এবং যেখানে অর্জুন-সুভদ্রার বিবাহের এবং পাণ্ডব-যাদবের সেই মৈত্রীর সূত্রপাত হয়েছিল, যার ফলে যুদ্ধে জয়লাভ করলেন পাণ্ডবেরা, আজ তার শেষ হল- উৎসন্ন হল যদুবংশ। যুদ্ধাবশিষ্ট দশজনের মধ্যে পাণ্ডবপক্ষে পাণ্ডবেরা পাঁচভাই, সাত্যকি আর কৃষ্ণ এবং কৌরবপক্ষে কৃতবর্মা- কী দুর্ভাগ্য এঁদের, এঁরা ক্ষত্রোচিত-গরীয়ানভাবে প্রাণ দিতে পারলেন না; যুদ্ধের হাজার বিপদ থেকে বাঁচিয়ে মৃত্যু এঁদের হাতে রেখে দিয়েছিল এমন এক অবসান, যা বিলাপবেদনার ন্যূনতম উচ্চারণের যোগ্য নয়।

ব্যাপক ও ভীষণ মত্ততা যদুবংশকে আচ্ছন্ন করে দিল- শুধু কোনও কীর্তিমান অভিজাত-গৃহের অবক্ষয় নয়, কোনও একটি মহৎ বংশের বিলুপ্তিও নয় শুধু- একটি সম্পূর্ণ সভ্যতার ধ্বংস, মানুষিক বুদ্ধি ও চেতনার সার্বিক ও প্রতিকারহীন নির্বাপণ। প্রথমে নামল এক ভ্রান্তি, যাতে সুসংস্কৃত অন্নের মধ্যে দৃষ্ট হয় গণনাতীত কীট, অনুভূত হয় সুখশয়ান সুপ্তির মধ্যে মুষিকদংশন, ছাগ ডাকলে শৃগালের চীৎকার শ্রুত হয়- আর তারপর ঐসব দুর্লক্ষণ পিছনে ফেলে, কিন্তু অনতিক্রম্য কালের বশীভূত হয়ে যাদবেরা চলে এলেন সেই সমুদ্রের তীরে, যার জলে শাম্ব-প্রসূত প্রথম মুষলটি চূর্ণাকারে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। প্রচুর মদ ও মাংস, নারী ও ভোগসামগ্রী- এইসব নিয়ে পূর্বদৃষ্ট দুঃস্বপ্নগুলিকে ভুলে থাকার মরীয়া চেষ্টায়, এক উৎকট উল্লাসে তাঁরা গা ভাসিয়ে দিলেন। স্ত্রী ও পুরুষ লিপ্ত হল নির্লজ্জ যৌন ব্যভিচারে, মদ্য শুধু পান করা হল না, বানরদের মধ্যে বিলানো হল; যেন যমুনাতীরবর্তী অন্য এক অতীত প্রমোদের অনুকরণে ঘটনাস্থল ধ্বনিত হতে লাগল সুরাবিহ্বল নৃত্যে-গীতে-বিত-ায়- সবই কৃষ্ণের সামনে। এতক্ষণ নিষ্ক্রিয় ছিলেন তিনি, অবিচল ও তুষ্ণিভূত এক দর্শকমাত্র, কিন্তু সাত্যকি ও প্রদ্যুম্নর মৃত্যুর পর তিনি প্রতিশ্রুত ও পূর্বজ্ঞাত সংহারক্রিয়ায় মেতে উঠলেন। এখন তিনি রথারূঢ় নন, তাঁর হাতে নেই গদা বা কশা বা সুদর্শনচক্র, তাঁর চিত্ত এখন বীতরাগ ও বীতমন্যু- পুনরাবৃত্ত তরঙ্গের মত প্রাণোচ্ছ্বাস তিনি পেরিয়ে এসেছেন। আর তাই, মনে মনে ‘কালপর্যায়’ বুঝে নিয়ে হাতের মৃদুতম ভঙ্গিতে তুলে নিলেন সেই ঈশিকা তৃণ (শর বা কাশ), পাণ্ডবদের ধ্বংসের জন্য সৌপ্তিকপর্বে অশ্বত্থামা যা নিক্ষেপ করেছিলেন। সে-যাত্রায় পাণ্ডুপুত্রদের প্রাণ বাঁচিয়েছিলেন কৃষ্ণ, কিন্তু তাঁর জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে তিনি দয়া করলেন না। তাঁর হাতে প্রতিটি তৃণ অপ্রতিরোধ্য মুষল হয়ে উঠল। তাঁর দেখাদেখি অন্যরাও হাতে তুলে নিল তৃণ- কয়েক মুহূর্তের মধ্যে শ্মশানভূমিতে পরিণত হল রঙ্গভূমি। পিতা পুত্রের, পুত্র পিতার মস্তকচূর্ণনে নিযুক্ত- এখানে করুণার কোনও অবকাশ পর্যন্ত নেই। একজন ছিলেন বভ্রু, এই উন্মত্ততা যাঁকে স্পর্শ করেনি। যাদব বভ্রু কৃষ্ণকে বললেন, ‘জনার্দন! আপনি অনেক লোকের প্রাণ সংহার করেছেন। এখন চলুন আমরা মহাত্মা বলভদ্রের কাছে যাই।’ কুলধ্বংস হবার পর বভ্রুও এক আকস্মিক মুষলের আঘাতে নিহত হলেন- যেমন হয়েছিলেন, ঘোষিত যুদ্ধ থেমে যাবার পরে, অতর্কিতে দ্রৌপদীর পঞ্চপুত্র ও ধৃষ্টদ্যুম্ন। শুধু রইলেন প্রধানতম দুই বার্ষ্ণেয় পুরুষ- কিন্তু তাঁরাও আর বেশিক্ষণ থাকবেন না।

তিনি চেয়েছিলেন যদুবংশের ধ্বংস এবং তা সচেতনভাবে সাধন করেছিলেন। গান্ধারী ও নারদ-কণে¦র অভিশাপ তো প্রতীকী। তিনি আবার ঈশ্বরকে প্রত্যক্ষ করলেন- অদ্ভুতভাবে রূপান্তরিত এক ঈশ্বর, যিনি দিব্যবসনে মাল্যে কিরীটে অলংকৃত নন, নন সহস্র সূর্যের চেয়েও দীপ্তিশালী তেজঃপুঞ্জ, সহস্র চোখ-মুখ-বাহুবিশিষ্ট জগৎব্যাপী সত্তা আর নন- কিন্তু এক ভূষণরিক্ত জীবনক্লান্ত পুরুষ, যিনি তাঁর ঈশ্বরত্বের লক্ষণস্বরূপ গ্রহণ করেছেন প্রকট মরত্ব- যথাসময়ে, স্বেচ্ছায়। এখনও তিনি লোকক্ষয়কারী, কিন্তু তার কালাগ্নিসদৃশ রূপ এখন নির্বাপিত, তাঁর সংহারকর্মেও তিনি অনুগ্র ও উদাসীন। যেন নিজের সঙ্গে গোপন একটা চুক্তি ছিল তাঁর, কৌরব-পাণ্ডবদের উপলক্ষ করে এতদিন ধরে তা-ই তিনি পূরণ করলেন; তাঁর সেই কর্মপরায়ণ মানুষিক ভূমিকার এবার অবসান ঘটল। যুদ্ধকালে অর্জুনকে যেমন বলেছিলেন, ‘ত্রিলোকে আমার কোনও কর্তব্য নেই, তবু আমি কর্মে ব্যাপৃত আছি। যদি আমি কর্ম না করি তাহলে লোকেরা কর্মত্যাগ করবে।... লোকসংগ্রহের জন্য- সৃষ্টিরক্ষার জন্যই- কর্ম করণীয়’, এখনও কৃষ্ণ জানেন যে, বিরতিরও প্রয়োজন ঘটে মাঝে-মাঝে, মাঝে-মাঝে সন্ধিক্ষণ আসে যখন কালের ঘূর্ণনও মুহূর্তের জন্য থেমে যায় যেন- যখন সমস্ত যুদ্ধ সমাপ্ত, সব উদ্যম নিঃশেষ, পৃথিবীর বীরবংশ লুপ্ত অথবা লুপ্তপ্রায়, কোথাও নেই কোনও সংকট বা সংঘর্ষ এবং নেই কোনও সূচনারও ইঙ্গিত। এমন সময় আসে, যখন ‘সংগ্রহ’ ও সংহার সমার্থক হয়ে ওঠে, পূর্ণ হয় কোনও বৃত্ত, বিশ্বসংসারে শৃঙ্খলা ও ভারসাম্য রক্ষার জন্যই প্রয়োজন হয় ধ্বংসের। আর সে-রকম সময়ে বুঝি ঈশ্বরও অপসৃত হন- অন্তত ইতিহাস থেকে, প্রপঞ্চময় সংসার থেকে। যে-বিশাল প্রয়াসের জালে কৃষ্ণ স্বেচ্ছায় বন্দী হয়েছিলেন এবং সমগ্র ক্ষত্রকুলকে বন্দী করেছিলেন, সেটি অনেক আগে থেকেই আস্তে আস্তে গুটিয়ে আনছিলেন তিনি, এবার তাঁকেও ফিরে যেতে হবে, তিনি প্রস্তুত।

তিনি প্রয়োগ করেছিলেন সাংখ্য যোগ বেদান্ত থেকে সম্ভবপর প্রতিটি যুক্তি, নিখিলজ্ঞানের উপর তাঁর কর্মবাদকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, দেখিয়েছিলেন অর্জুনকে তাঁর বিশ্বরূপ; - কত কল্পনার দ্যুতি, কত চিত্রকল্পের ঐশ্বর্য, জীবন-মৃত্যুর কত রহস্যের কত উদ্ঘাটন; আর তবু, যেন অর্জুনের মন থেকে শেষ সংশয়বিন্দুটি বিমোচনের জন্য তিনি ঘোষণা করেছিলেন সেই মাভৈ-বাণী- অহং ত্বাং সর্বপাপেভ্যঃ মোক্ষয়িষ্যামি মা শুচঃ। ‘ধর্মক্ষেত্র’ কুরুক্ষেত্রে তিনি পাপের পর পাপে লিপ্ত করেছিলেন অর্জুন, ভীম, যুধিষ্ঠিরকে কিন্তু তিনি ছিলেন অব্যাকুল ও অব্যথিত, আদ্যন্ত একইভাবে ক্ষমতাপন্ন ও ক্ষমতার ব্যবহারকারী; যে ভীষ্ম তাঁর প্রধানতম বন্দনাকারী, তাঁর জন্য কোনও বেদনা তিনি প্রকাশ করেননি; যে-কর্ণের সঙ্গে একবার তিনি মর্ম-কথা বিনিময় করেছিলেন- বন্ধুর মত, প্রীতি¯িœগ্ধভাবে, সেই কর্ণের হত্যায় তিনি ছিলেন অনুকম্পাহীন। আর এখন এই ভয়াবহ ঘটনাপর্যায়ে- মনে হয় তাঁর প্রতিটি আবেগবিন্দু নিষ্কাশিত হয়ে গেছে, অনাচারমত্ত যাদবদের প্রতি তাঁর ক্রোধের উদ্রেক পর্যন্ত হল না, ওষ্ঠ থেকে নিঃসৃত হল না কোনও তিরস্কার- যেন নিষ্পলক চোখে চেয়ে দেখলেন সব, মুখের একটি পেশী কুঞ্চিত না করে- যেন গাছ থেকে খসে-পড়া শুকনো পাতার চেয়েও তাঁর আত্মীয়-ভ্রাতা-পুত্রের জীবন মূল্যহীন। এই-ই তাঁর প্রক্ষালন ও প্রতিদান, এই হল তাঁর প্রায়শ্চিত্ত- তাঁর স্বকৃত এবং কুরুবংশের সব পাপের জন্য- যুধিষ্ঠিরের ধরনে নয়, বিলাপের উচ্ছ্বাসে নয় (কেন না তিনি শোক ও মনস্তাপের অতীত)- এক প্রত্যক্ষ ও চরম উপায়ে, স্বহস্তে তাঁর স্ববংশকে সংহার করে। এখন তাঁর একটিমাত্র কৃত্য অবশিষ্ট আছে- কিন্তু সেটা আসলে তাঁর কোনও কর্ম নয়, সেটা কর্মের নিরসন, ঘটনা থেকে প্রস্থান।

সারথি দারুককে কৃষ্ণ হস্তিনায় অর্জুনের কাছে পাঠালেন। অর্জুন এসে যাদব কুলকামিনীদের হস্তিনায় নিয়ে যাবেন, কৃষ্ণ এমন আজ্ঞা করলেন। বিপর্যস্ত ক্লান্তক্লিষ্ট যদুপতি পিতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, ‘যতক্ষণ অর্জুন এসে না পৌঁছন, আপনি এখানে পুরস্ত্রীদের রক্ষা করুন; বলরাম বনের মধ্যে আমার প্রতীক্ষায় আছেন, আমি তাঁর কাছে যাই। বহু কুরুবীরের নিধনকা- আমি দেখেছি, আজ যদুকুলের বিনষ্টিও দেখলাম। এখন আমি বলরামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তপস্যা করব।’

বলরাম বেজায় মদ্যপান করেছিলেন। সেই অবস্থায় যোগাসনে বসলেন। ধীরে ধীরে তাঁর প্রাণবায়ু নির্গত হল। তাঁর প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তাঁর মুখ থেকে সহস্রফণা এক বিশাল সর্প নিঃসৃত হয়ে ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল সমুদ্রে। বিষ্ণুপুরাণে কবি এমন চিত্রকল্প ব্যবহার করেছেন। হয়তো তাঁর মুখ থেকে মদের ধারা নানামুখে নির্গত হচ্ছিল। তা দেখে কৃষ্ণও মর্ত্যলোক ছাড়ার বাসনায় মহাযোগ অবলম্বন করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। অপ্রহার্য অপতনীয় পুরুষ কৃষ্ণ- স্বাস্থ্য শক্তি যৌবনের এক অফুরন্ত উৎস: তিনি প্রাণত্যাগ করলেন বনের মধ্যে ভূমিশয়নে জরা নামে এক ব্যাধের নিক্ষিপ্ত একটিমাত্র বাণের আঘাতে- তাও কোনও মর্মস্থলে নয়, পদতলে! বিষ্ণুপুরাণে কৃষ্ণপ্রয়াণের এমন কথা বলা হয়েছে। কৃষ্ণপ্রয়াণের এই আশ্চর্য ঘটনায় যেন সম্পূর্ণ হল মহাভারতে তাঁর অলোকসামান্য ভূমিকা। ভগবদ্গীতায় যত উঁচুতে তিনি উঠেছিলেন, এবারে ঠিক তত নিচেই তাঁর অবতরণ ঘটল। এই মৃত্যু- মানবেতিহাসের হীনতম এই মৃত্যু- এও তাঁর ঈশ্বরত্বেরই একটি ব্যঞ্জনা; ভীষ্মের বা বলরামের মত কোনও মহিমান্বিত অবসান অশোভন হত তাঁর পক্ষে, এমনকি ঠিক রুচিসম্মত হত না; এমন একটি লৌকিক অথবা জান্তব মৃত্যুর ফলে তিনি আমাদের হৃদয়ের কাছে বিশ্বাস্য ও বাস্তব দেবতা হয়ে উঠলেন: যিনি ‘লোকসংগ্রহে’র জন্য কর্ম করে থাকেন, তিনিই ‘লোকক্ষয়কারী প্রবৃদ্ধ কাল’- গীতায় উক্ত এই সূত্রটি আমাদের সামনে দর্শনীয় হল। ছায়াছবির মত মিলিয়ে গেল তাঁর যদুবংশ, ঈশ্বরের অন্তর্ধান ঘটল।

অর্জুন দ্বারকায় এসে বসুদেবের সঙ্গে দেখা করলেন। তিনি ছিলেন তাঁর বার্ধক্যের বিশ্রাম-লালসা নিয়ে অন্তঃপুরে। সমুদ্রতীরে তার পুত্রগণ পরস্পরকে হত্যা করছে, বলরামের সর্পরূপী প্রাণ বহির্গত হল, কৃষ্ণ অরণ্যে মৃত্যুশয়ন পেতেছেন; তাঁর শ্রেষ্ঠ পুত্রদ্বয় যে মৃত, তাও বসুদেব জেনেছিলেন কিনা সন্দেহ। অর্জুনের আগমন পর্যন্ত কষ্টে-সৃষ্টে বেঁচে থাকার মত প্রাণশক্তি শুধু অবশিষ্ট ছিল তাঁর। অর্জুনকে শুধু বললেন, ‘তিনি (কৃষ্ণ) আমাকে বালকদের সঙ্গে এখানে রেখে যে কোথায় গেলেন তাও জানি না।’ অর্জুনের অপেক্ষাতেই যেন তিনি প্রাণধারণ করে ছিলেন।

কৃষ্ণ-বলরামের পারলৌকিক কর্ম সম্পাদন করে অর্জুন যাদব কুলকামিনীদের নিয়ে হস্তিনায় রওনা হলেন। পথিমধ্যে একদল দস্যু লগুড় হাতে তাঁদের আক্রমণ করল। অর্জুনের চোখের সামনেই যাদবরমণীদের হরণ করে নিল দস্যুরা- মহাবীর তাঁর দিব্যাস্ত্রসমূহের ব্যবহার বিস্মৃত হলেন। তিনি গাণ্ডীবে শরযোজনা করতে পারলেন না, তাঁর অক্ষয় তূণ নিঃশেষিত হল। যে-পীতবসন দ্যুতিমান পুরুষ তাঁর রথের আগে ছুটে-ছুটে শত্রুসৈন্যকে দগ্ধ করতেন, তিনি আর তাঁকে দেখতে পেলেন না; যে কৃষ্ণ সবই বিনষ্ট করতেন, সেই কৃষ্ণের অদর্শনে তিনি এখন অবসন্ন। তাঁর সবদিক শূন্য হয়ে গেল। তাঁর হৃদয়ের শান্তি অন্তর্হিত হল। অনেক কুলনারী স্বেচ্ছায় দস্যুদের হাতে আত্মদান করল। বেলাতিক্রান্ত সমুদ্র গ্রাস করে নিল দ্বারকাপুরীকে। পরাস্ত ও বিধ্বস্ত অর্জুন নতশিরে এসে দাঁড়ালেন ব্যাসদেবের সামনে।

কৃষ্ণ যদুবংশের ধ্বংস নিবারণে কোনও উদ্যোগ নেননি। তিনি মানবকুলের আদর্শ। তাঁর কাছে আত্মীয়-অনাত্মীয় নেই। তিনি ধর্মের রক্ষক। অধর্মের পক্ষাবলম্বন তিনি কখনই করতে পারেন না। যদুবংশীয়রা তখন অধার্মিক হয়ে উঠেছিল, কাজেই আত্মীয় হলেও তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা কৃষ্ণ করতে পারেন না।

কৃষ্ণের দেহত্যাগের কারণ কতকটা অনিশ্চিত থেকে গেল। তিনি যোগাবলম্বনে দেহত্যাগ করেছিলেন বলেই মনে হয়। যারা যোগাভ্যাসকালে নিঃশ্বাস অবরুদ্ধ করার অভ্যাস করেছেন, তাঁরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে নিজের মৃত্যু সম্পাদন করতে পারেন না, এমন কথা আমি সাহস করে বলতে পারি না। প্রাচীন বয়সে জীবনের সব কাজ শেষ হলে ঈশ্বরে লীন হবার জন্য মনোমধ্যে তন্ময় হয়ে শ্বাসরোধ করাকে আমি ‘ঈশ্বরপ্রাপ্তি’ বলেই মনে করি। এ সময় কৃষ্ণের বয়স শতবর্ষের অধিক হয়েছিল। জরা ব্যাধের শরাঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল বলে বিষ্ণুপুরাণে বলা হয়েছে। এ জরাব্যাধ, জরাব্যাধি নয় তো? এটি হয়তো সাধারণ জৈব বার্ধক্যের একটি রূপকমাত্র।

কৃষ্ণের মৃত্যু উপরোক্ত যে-কোনও কারণে হতে পারে। যারা কৃষ্ণকে মানুষমাত্র বিবেচনা করে তাঁর ঈশ^রত্ব স্বীকার করেন না, তারা এসব কারণের যে কোনওটি গ্রহণ করতে পারেন। তবে আমি কৃষ্ণকে ঈশ^রাবতার বলে স্বীকার করি। অতএব আমি বলি, কৃষ্ণের ইচ্ছাই কৃষ্ণের দেহত্যাগের কারণ। জগতে মানুষ্যত্বের আদর্শ প্রচার করা তাঁর অভিপ্রায় এবং সেই অভিপ্রায়েই তিনি মানুষী শক্তির দ্বারা সকল কাজ নির্বাহ করেন। কিন্তু তা বললেও, ঈশ^রাবতারের জন্ম-মৃত্যু তাঁর ইচ্ছাধীনমাত্র। অতএব আমি বলি, কৃষ্ণের ইচ্ছাই কৃষ্ণের দেহত্যাগের একমাত্র কারণ। কৃষ্ণের মহাপ্রয়াণে একটি মহাযুগের অবসান হল।

যদুকুল ধ্বংসের সময় কৃষ্ণের বয়স শতবর্ষ অতিক্রম করেছিল, একথা বিষ্ণুপুরাণেও উল্লেখিত আছে। কৌরবপক্ষের প্রথম সেনাপতি পদে পিতামহ ভীষ্ম যে-সময়ে বৃত হয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স অন্তত নব্বই থেকে একশো বছরের মধ্যে। মৃত্যুকালে দ্রোণের বয়স ছিল পঁচাশি, এ-কথা মহাভারতেই উক্ত হয়েছে। হরিদাস সিদ্ধান্তবাগীশের গণনা অনুসারে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সময় তিন কৌন্তেয়র বয়স হয়েছিল যথাক্রমে বাহাত্তর, একাত্তর ও সত্তর, আর মাদ্রীতনয়দ্বয়ের ঊনসত্তর।

[সূত্র: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের কৃষ্ণচরিত্র এবং বুদ্ধদেব বসুর মহাভারতের কথা]



কৃষ্ণ সর্বগুণের অভিব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল এক চরিত্র



অধর্মের বিপরীতে ধর্মমংস্থাপনের জন্য শ্রীকৃষ্ণ দ্বাপর যুগে মথুরায় কংসের কারাগারে দেবকীর অষ্টমগর্ভে জন্মহ্রহণ করেছিলেন। কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি অত্যাচারী রাজাদের নিধন, সর্বোপরি কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে নিরস্ত্র সারথীর ভূমিকায় সম্পূর্ণ মগজাস্ত্র ব্যবহার করে বিজয়লাভের ফলে কৃষ্ণ লোকোত্তর মহিমাপ্রাপ্ত হন। তিনি হয়ে ওঠেন কিংবদন্তীতুল্য- একমেব অদ্বিতীয়ম্। গোটা ভারতবর্ষ কৃষ্ণময় হয়ে ওঠে।

পুরাণেতিহাসের আলোকে যেটুকু কৃষ্ণচরিত্র আমরা পাই, তা এককথায় অনুপম। শৈশবে কৃষ্ণ শারীরিক বলে অতিশয় বলবান। তাঁর অমিত বলপ্রভাবে বৃন্দাবনে হিংস্র জীবজন্তু পরাভূত হত- কংসের মল্ল প্রভৃতিও নিহত হয়েছিল। গোচারণকালে খেলাধূলা ও ব্যায়াম করায় তিনি শারীরিক বলে বলীয়ান হয়ে উঠেছিলেন। দ্রুতগমনে তিনি কালযবনকেও পরাভূত করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে তাঁর রথচালনার বিশেষ প্রশংসা দেখা যায়।

প্রশিক্ষিত শারীরিক বলে তিনি সে-সময়ের ক্ষত্রিয়সমাজে সর্বপ্রধান অস্ত্রবিদ বলে গণ্য হয়েছিলেন। কেউ তাঁকে হারাতে পারেননি। তিনি কংস, জরাসন্ধ, শিশুপাল প্রভৃতি সে-সময়ের প্রধান প্রধান যোদ্ধা এবং অন্যান্য বহুতর রাজাদের সঙ্গে- কাশী, কলিঙ্গ, পৌণ্ড্রক, গান্ধার প্রভৃতি রাজাদের সঙ্গে যুদ্ধে নিযুক্ত হয়ে তাঁদের সবাইকেই পরাভূত করেন। তাঁর যুদ্ধশিষ্যরা, যেমন সাত্যকি ও অভিমন্যু যুদ্ধে প্রায় অপরাজেয় হয়ে উঠেছিলেন। স্বয়ং অর্জুনও কোনও কোনও বিষয়ে যুদ্ধ সম্বন্ধে তাঁর শিষ্যত্ব স্বীকার করেছিলেন।

কেবল শারীরিক বল ও শিক্ষার ওপর যে রণনৈপুণ্য নির্ভর করে, পুরাণেতিহাসে তারই প্রশংসা দেখতে পাওয়া যায় কিন্তু সে ধরনের রণনৈপুণ্য একজন সামান্য সৈনিকেরও থাকতে পারে। সেনাপতিত্বই যোদ্ধার প্রকৃত গুণ। এই সেনাপতিত্বে সে-সময়ের যোদ্ধারা তেমন পটু ছিলেন না। কৃষ্ণের সেনাপতিত্বের বিশেষ গুণ প্রথম জরাসন্ধের সঙ্গে যুদ্ধে পরিলক্ষিত হয়। তাঁর সেনাপতিত্বের গুণে ক্ষুদ্র যাদবসেনারা জরাসন্ধের সংখ্যাতীত সেনাকে মথুরা থেকে ফিরে যেতে বাধ্য করেছিল। সেই অগণনীয় সেনার ক্ষয় যাদবদের পক্ষে অসাধ্য জেনে কৃষ্ণের মথুরা পরিত্যাগ করে নতুন নগরী নির্মাণের জন্য সাগরদ্বীপ দ্বারকার নির্বাচন এবং তার সামনে অবস্থিত রৈবতক পর্বতমালায় দুর্ভেদ্য দুর্গশ্রেণী নির্মাণে যে রণনীতিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায়, তেমন পরিচয় পুরাণেতিহাসে আর কোনও ক্ষত্রিয়েরই পাওয়া যায় না। পুরাণকার ঋষিরাও তা জানতেন না, এতেই প্রমাণিত হয় কৃষ্ণেতিহাস তাঁদের কল্পনাপ্রসূত নয়।

কৃষ্ণের জ্ঞানার্জনী বৃত্তির প্রভূত পরিচয় আমরা পেয়েছি। তিনি অদ্বিতীয় বেদজ্ঞ, এটিই ভীষ্ম তাঁর অর্ঘ্যপ্রাপ্তির অন্যতম কারণ বলে জানিয়েছিলেন। শিশুপাল সে-কথার কোনও উত্তর দেননি, কেবল বলেছিলেন, তবে বেদব্যাস থাকতে কৃষ্ণের পূজা কেন?

কৃষ্ণের জ্ঞানার্জনী বৃত্তির চরম উৎকর্ষতার পরিচয় শ্রীশ্রী গীতা। এখানে তিনি এক অতুল্য ধর্মকথার প্রবর্তন করেছেন। তবে এই ধর্মকথা যে শুধু গীতাতেই পাওয়া যায়, এমন নয়, মহাভারতের অন্য স্থানেও পাওয়া গেছে। কৃষ্ণ-কথিত ধর্মের চেয়ে উন্নত, সর্বলোকের পক্ষে মঙ্গলকর, সর্বজনের আচরণীয় ধর্ম পৃথিবীতে আর কখনও প্রচারিত হয়নি। এই ধর্মে যে জ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায়, তা প্রায় মনুষ্যাতীত। কৃষ্ণ মানুষী শক্তির দ্বারা সব কাজ করেছেন, আমি তা বারবার বলেছি, প্রমাণ করেছি। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অনন্ত জ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছেন।

সর্বজনীন ধর্মপ্রচারের পর রাজধর্ম বা রাজনীতিতেও তাঁর অসাধারণ প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সম্ভ্রান্ত রাজনীতিজ্ঞ বলেই যুধিষ্ঠির ব্যাসদেবের পরামর্শ পেয়েও কৃষ্ণের পরামর্শ ব্যতীত রাজসূয় যজ্ঞে হাত দেননি। অবাধ্য যাদবেরা এবং বাধ্য পাণ্ডবেরা তাঁকে জিজ্ঞাসা না করে কোনও কাজ করতেন না। জরাসন্ধকে হত্যা করে কারারুদ্ধ রাজাদের মুক্ত করা উন্নত রাজনীতির উৎকৃষ্ট উদাহরণ- সাম্রাজ্য স্থাপনের অল্প আয়াসসাধ্য অথচ পরম ধর্মসিদ্ধ উপায়। ধর্মরাজ্য সংস্থাপনের পর ধর্মরাজ্য শাসনের জন্য রাজধর্ম নিয়োগে ভীষ্মের দ্বারা রাজব্যবস্থা সংস্থাপন করানো, রাজনীতিজ্ঞতার দ্বিতীয় উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

কৃষ্ণের বুদ্ধি লোকাতীত- তা সর্বব্যাপী, সর্বদর্শী, সকল প্রকার উপায়ের উদ্ভাবিনী। মনুষ্য শরীর ধারণ করে যতদূর সর্বজ্ঞ হওয়া যায়, কৃষ্ণ ততদূর সর্বজ্ঞ। অপূর্ব অধ্যাত্মতত্ত্ব ও ধর্মতত্ত্ব, যার উপরে আজও মানুষের বুদ্ধি যায়নি, তা থেকে চিকিৎসাবিদ্যা, সংগীতবিদ্যা, এমনকি অশ্বরিচর্যা পর্যন্ত তাঁর আয়ত্ত ছিল। উত্তরার মৃত পুত্রের পুনর্জীবন এর প্রথম উদাহরণ; বিখ্যাত বংশীবিদ্যা দ্বিতীয় এবং জয়দ্রথবধের দিন অশে^র শরীরে বেঁধা তীর-উদ্ধার তৃতীয় উদাহরণ।

কৃষ্ণের কার্যকারিণী বৃত্তিসমূহের তুলনা চলে না। তাঁর সাহস, ক্ষিপ্রতা এবং সকল কাজে তৎপরতার অনেক পরিচয় দিয়েছি। তাঁর ধর্ম ও সত্য যে অবিচলিত, এ জীবনচরিতে তার অনেক প্রমাণ দেখেছি। সর্বজনে দয়া এবং প্রীতি এ জীবনালেখ্যে পরিস্ফুট হয়েছে। বলবানদের চেয়ে বলবান্ হয়েও মানুষের কল্যাণে তিনি শান্তির জন্য দৃঢ়যত্ন ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি সকলের মঙ্গলাকাক্সক্ষী, শুধু মানুষ নয়, ইতর প্রাণির প্রতিও তাঁর অসামান্য দয়া। গিরিযজ্ঞে তা পরিস্ফুট। তিনি আত্মীয়-স্বজন, জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর কেমন হিতৈষী, তা দেখেছি, আবার এও দেখেছি, আত্মীয় পাপাচারী হলে তিনি তার শত্রু। তাঁর অপরিসীম ক্ষমাগুণ দেখেছি, আবার এও দেখেছি, কার্যকালে লৌহহৃদয়ে অকুণ্ঠিতভাবে তিনি দ- বিধান করেন। তিনি স্বজনপ্রিয়, কিন্তু মানুষের কল্যাণে স্বজনের বিনাশেও তিনি কুণ্ঠিত নন। কংস মাতুল, পাণ্ডবেরা যা, শিশুপালও তা- উভয়েই পিসির পুত্র; উভয়কেই দ-িত করলেন; তারপর, পরিশেষে স্বয়ং যাদবেরা সুরাপায়ী ও দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে উঠলে তিনি তাদেরকেও রক্ষা করলেন না।

এসব শ্রেষ্ঠ বৃত্তি কৃষ্ণচরিত্রে চরমভাবে বিকশিত হয়েছিল বলে, লোকচিত্তরঞ্জিণী বৃত্তির অনুশীলনে তিনি অমনোযোগী ছিলেন, এমন নয়। যে-জন্য বাল্যে বৃন্দাবনে ব্রজলীলা, পরিণত বয়সে সেই উদ্দেশ্যে সমুদ্রবিহার, যমুনাবিহার, রৈবতক বিহার।

কেবল একটা কথা এখনও বাকি আছে। আমার ধর্মতত্ত্ব নামক বইয়ে বলেছি, ভক্তিই মানুষের প্রধান বৃত্তি। কৃষ্ণ আদর্শ মানুষ, মনুষ্যত্বের আদর্শ প্রচারের জন্য তিনি অবতীর্ণ- তাঁর ভক্তির প্রকাশ তেমন দেখলাম কই? যদি তিনি ঈশ^রাবতার হন, তবে তাঁর এই ভক্তির পাত্র কে? তিনি নিজে! নিজের প্রতি যে ভক্তি, সে কেবল নিজেকে পরমাত্মার সঙ্গে অভিন্ন ভাবলেই আসে। এই ভাবনা জ্ঞানমার্গের চরম। একে আত্মরতি বলে। ছান্দোগ্য উপনিষদে যেমন বলা হয়েছে, ‘য এবং পশ্যন্বেবং মন্বান এবং বিজানন্নাত্মরতিরাত্মক্রীড় আত্মমিথুন আত্মানন্দঃ স স্বরাড়্ ভবতীতি।’ অর্থাৎ ‘যে এ দেখে, এ ভেবে এ জেনে আত্মায় রত হয়, আত্মাতেই ক্রীড়াশীল হয়, আত্মাই যার মিথুন (সহচর), আত্মাই যার আনন্দ, সে স্বরাট্।’ এই কথাই গীতায় কীর্তিত হয়েছে, কৃষ্ণ আত্মারাম; আত্মা জগন্ময়; তিনি সেই জগতে প্রীতিবিশিষ্ট।

কৃষ্ণ সব জায়গায় সব সময় সবরকম গুণের অভিব্যক্তিত্বে উজ্জ্বল। তিনি অপরাজেয়, অপরাজিত, বিশুদ্ধ, পুণ্যময়, প্রীতিময়, দয়াময়, অনুষ্ঠেয় কাজে সদা তৎপর- ধর্মাত্মা, বেদজ্ঞ, নীতিজ্ঞ, ধর্মজ্ঞ, লোকহিতৈষী, ন্যায়নিষ্ঠ, ক্ষমাশীল, নিরপেক্ষ, শাস্তিদাতা, নির্মম, নিরহংকার, যোগযুক্ত, তপস্বী। তিনি মানুষী শক্তি দিয়ে কার্যনির্বাহ করেন, কিন্তু তাঁর চরিত্র মনুষ্যাতীত। এ রকম মানুষী শক্তির দ্বারা অতিমানবীয় চরিত্রের বিকাশ থেকে তাঁর মনুষ্যত্ব বা ঈশ^রত্ব অনুমান করা উচিত কিনা, তা পাঠক নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা অনুসারে স্থির করুন। যিনি মীমাংসা করবেন কৃষ্ণ মানুষ ছিলেন মাত্র, তিনি স্বীকার করবেন, কৃষ্ণ হিন্দুদের মধ্যে পরম জ্ঞানী এবং মহত্তম ছিলেন। আর যিনি কৃষ্ণচরিত্রে ঈশ্বরের প্রভাব দেখতে পান, তিনি যুক্তকরে বলুন, ‘নাকারণাৎ কারণাদ্বা কারণাকারণান্ন চ।/ শরীরগ্রহণং বাপি ধর্মত্রাণায় তে পরম্ ॥’

[বঙ্কিমচন্দ্রের কৃষ্ণচরিত্র-এর আলোকে]




নান্টু রায়
লেখক। সম্পাদক।
ঢাকায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন