মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

আনোয়ার শাহাদাতের গল্প : স্মৃতি ধূসরতার প্রান্তসীমায়


বুড়ো বাড়ীর দক্ষিণ দিকে ‘দরজা’র রাস্তার কোনায় একটু উচু শুকনা জায়গায় বসা। সেখানে তাকে বসিয়ে দিয়ে গেছে তার ছোট ছেলের বউ মিনারা। মৌস্রোত খালপাড় থেকে সরু যে রাস্তাটি বাড়ির মধ্যে ঢুকেছে সেই রাস্তা, খালপাড়, রাস্তার আশ-পাশ মিলিয়ে এই ‘দরজা’। এই বাড়ি এবং দরজার রাস্তার কোনায় যেখানে অগভীর ডোবায় এখন ঘাসখিল। ধানের জন্য আবাদ উপোযোগী নয় এই অনাবাদি ঘাসাখিলে এখন দলঘাস হয়। শেষ শ্রাবণের কাল, সবকিছু কাদাময়। ঘাসখিল দরজার রাস্তার কোনা কাদাময় নয় কিন্তু টুপটুপ ভেজা। ওখানে বসলে মুহূর্তে ভিজে যাবে পরনের কাপড়। যদিও তাতে ভীমরতি পাওয়া বুড়োর অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, কারণ সে পরনের কাপড় রাখতে চায় না, বলে মোডা খাতা পিন্দনে রাহন যায় না। ছেলে বউ মিনারাকে বরাবরই ওই এক কথা, মাঘা শীতের দাদুর আমইল্যা মোডা খাতাডা পিন্দাও ক্যা ? পিঁড়ি বা জলচৌকি নয়, একখানা তক্তায় বসানো হয়েছে বুড়োকে। সে কাদামাখা বাম পা’খানি ডান পায়ের রানের নিচে দিয়ে ছড়িয়ে দিয়েছে। তার বসার প্রধান ভঙ্গিই এই, ডান দিকে বাঁশের লাঠিখানা, বাম হাতে তক্তার শেষ প্রান্তে ভর দেওয়া। তক্তাখানা ‘লোহাকাঠ’ বৃক্ষের তক্তা। বুড়োর যৌবনকালে এক পানি বন্যায় ওই তক্তা এই মৌস্রোত খালে ভেসে এসেছিল কোথা হ’তে কে জানে। বুড়ো সেই তক্তা পেয়ে হেসে উঠেছিল এই বলে ‘তিন পুরুষ চলে যাবে’। কালো রঙের লোহাকাঠী সেই তক্তাখানি দিন যায় আর কালো চকচকে হয়ে ওঠে, তিন পুরুষকালের জন্যেই হয়তো। এই ‘পুরুষ’এর এই ভীমরতি বয়সে তক্তাখানি না থাকলে মিনারা শ্বশুরকে কোথায় বসাত এই শ্রাবণ মেঘের রোদ-ছায়ায়। ঘাসখিলের আর এক কোনায় দুটো জাম গাছ সে জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ়ে জামের গাছ। জ্যৈষ্ঠের জাম পাকা হয়ে গেছে, আষাঢ়েরগুলো এখনো শেষ পাকা পাকছে। চন্দন শালিকেরা দল বেঁধে নতুন বাচ্চাগুলো নিয়ে আষাঢ়ে জামগাছে ভিড় করেছে। পাখীগুলোর ক্যাচর-ম্যাচর বুড়োর কানে ঠিকই ঢোকে তা যত কানে কম সে শুনুক না কেন ?

ঝড়-বৃষ্টি না হলে বুড়ো সারাদিন এই ঘাসখিল পাড় ও জামতলায়ই থাকবে। দুপুরে এক বাসন ভাত আর আসবে পোড়া মরিচের সঙ্গে ডাল। নিত্যদিন তা হয় না। আর সেদিন ক্ষ্যাপামো আরো বেড়ে যাবে, মাউছ্যার ঝি মাউছ্যা, কিছু কী খাইতে দিবি, না, না খাওয়াইয়া মারবি ? শ্বশুরের এই গালিতে মিনারা প্রথম দিকে লজ্জিত হতো, নিজের সঙ্গেই বলতো এ্যা ক্যামন কতা, মোর বাফে মাছের কারবার হরত কবে আবার, মাউছ্যার ঝী বোলায় কেয়া ? এসব কী কতা ? পরে অবশ্য মিনারা বুঝতে পারে শ্বশুরের গালাগালির কোনো সত্যতা বা বাস্তবতার দরকার পড়ে না। যা তার মনে হবে সে তা বলবেই। আজকাল বুড়োর খাওয়া নিয়ে বকা-ঝকাটা বেশি বেড়েছে। ও মিনারা, একটা আডার রুডি দে, এটটু গু দিয়া মাইখ্যা দে, সাইদ্যের মজা ! গু দিয়ে আটার রুটি খাওয়ার কথা প্রথম যেদিন বুড়ো বলে মিনারা মনে করে সে ভুল শুনেছে। পাল্টা প্রশ্ন করে কী কইলেন ? শ্বশুর পরিষ্কার হাসি হাসি মুখে চোখ পিট্পিট্ করে বলে গু না পাইলে এটটু মুরহার গু দিয়া দুইডা আডার রুডি দেও, রাঙ্গা মুরহার গু, চাবান লাগবে না, সাইদ্যের মজা। গু না হলে মোরগের গু মেখে রুটি খাওয়ার কথা শুনে তার গা কেমন করে উঠে বমি পেয়েছিল, এখন শুনতে শুনতে ওসব কথা সয়ে গেছে।

এই জাম গাছতলায় তার এই কাজ, রাজ্যের উল্টা-পাল্টা কথা। চোখ-কান দুটোর অবস্থাই এক। না ঠিকমতো দেখা, না শোনা, কিন্তু উল্টাটা, যা শোনার নয় তা শুনে ফেলে, যা দেখার নয় তা দেখে ফেলে। এতে অবশ্য কেউ আশ্চর্য হয় না, কারণ বুড়োদের সম্পর্কে এ ধরনের কথা চালু আছে। চন্দন শালিকদের আষাঢ়ে জামগাছের হৈ চৈ তার কানে যায়, ডান হাতে খুঁজে বাঁশের লাঠিখানা নেয়। জাম গাছের দিকে লাঠিখানা তোলে, ফের চন্দইন্যা ফের, মধুর লাহান জামডিরে শ্যাষ হরিস না। ও বউ, মিনারা-রে, হালিকাটিরে কয়ডা ভাত দেও, কই গেলে। ছেলে বউ মিনারা ঘরের পেছন থেকে শ্বশুরের ওই শালিককে ভাত দেওয়ার কথার উত্তর করে, বুইড়্যার তামশা দেহ, নিজে থাহার জাগা নাই, কেডি পালে বরগা। ঘাসখিলে রাস্তার পাশে দলঘাসের কচি পাতা খাওয়ার জন্য একটি গরু নামে। সামনের দু’পা গরুটি কাদায় নামিয়ে লম্বা জিব বের করে কচি দলঘাসের ওপর বাও করেছে, তখন বুড়ো ডেকে ওঠে, দলঘাসে মুখ দেলে কেডা, পাড় কান্দার চহিদারে নাহি ? ঘাসে মুখ দিয়েছে এ পর্যন্ত সত্য হয়। কিন্তু গরুকে না মনে করে, বুড়ো মনে করে পাড় কান্দার চৌকিদারকে। মানুষ কী ঘাস খায় ? বুড়োর ভীমরতি, সত্য আর আজগুবি মিলিয়ে ফেলেছে।

মিনারা উচু গলায় বলে যাতে আল্লাতায়ালা তার কণ্ঠ যতদূর যেতে পারে সেখান থেকে শুনতে পায়, ও আল্লা বুড়োরে এহনও নেও না ক্যা, কী এমন পাপ হরচে যে এত্তা কষ্ট হেরে দেবা। মিনারার শাশুড়ি হয় সম্পর্কে, পাশাপাশি ঘর, মিনারাকে বলে, বউ হে কতা কবা না, পুথিতে আচে আল্লায় পাপী মান্সেরে ভাল রাহে আর সুখী মান্সেরে কষ্ট দেয়, কষ্ট দেয় জানে-পরানে, মাইয়ায়-পোলায়, সবকিচুতে। এসব অইল যাইয়া তোমার আল্লার দেল পরীক্ষা। যে যত ভাল, আল্লায় হেরে তত বেশি মসিবত দেয়। তোমার পেরথম শাউরী মরে বৈশাখ মাইস্যা ঠাডায়। হে সোমায় পাকিস্তানের আমল। দুই-তিন যুগ আগের কতা। তোমার তহন জরম অয় নায়। বউ মরার পর তোমার শউরে কয় থাকমু না এই দ্যাশে, যামু ঢাকা। গ্যালে ঢাকা সাত বছইর‌্যা পোলা আকতোর মেয়ারে লইয়া ! আল্লায় আবার হের দেল পরীক্ষা করে। আকতোর মেয়া আছিল সোনার লাহান পোলা, তোমার ভাশুর।

ঘাসখিলের জামতলা থেকে বুড়ো গলা ছেড়ে ডাকে ও বউ, মিনারা আছোনি, ম্যাগ কইর‌্যা দুইন্নাই আন্ধার অইচে, দেওই নাইম্যা ভাসাইয়া নেবে সব, মোরে ঘরে নেও।

না, আকাশ মেঘে অন্ধকার হয়নি, বৃষ্টিরও সম্ভাবনা নেই। এক খণ্ড শ্রাবণ মেঘ ঢেকে দিয়েছিল খানিকক্ষণ সূর্য। বুড়ো ডাকে, আয় ম্যাগ আয়। আয় দেয়াই আয়, আয় আকতোর আয়।

শাশুড়ী সম্পর্কের পাশের ঘরের সেই মহিলা মিনারাকে আরো জানায়, তোমার আপন শাউরিকে সে বিয়া করে যুইদ্ধের পরের বছর, ঢাকার শহর দিয়া র্ফিরা আইয়া। বউ হে কতা কওয়ার না, শউরে তোমার বুক থাপড়াইয়া কেমনে কানত। মহিলা শ্বশুরের সেই কান্নার দৃশ্যের যা বর্ণনা করে ছেলে বউ মিনারাকে- আকতোর মিয়ার কথা মনে হলে তার শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে যেতো প্রথমে। কিছুক্ষণ তা প্রায় এক প্রহর পর যেন আকতোরের বাবা তার স্বাভাবিক শ্বাসটা ফিরে পেত। মনে হতো এই যে তার শ্বাস ফিরে পাওয়া এর খুব দরকার ছিল। না হলে অত অসুরের শক্তি নিয়ে এক থাপ্পড় বুকে ছন্দ করে আর এক থাপ্পড় মাটিতে কী করে দিত ? আওয়াজ করত। সেই এক আওয়াজ, সিংহের মতো। কাঁপতো আসমান, দরবারের আরশ। কে যায় থামাতে, ওর ওই কান্না দেখে সবাই কাঁদে। আমরা ভাবতাম ও মরে যাবে, মরা উচিতও ছিল, অত কষ্ট নিয়ে না বেঁচে থেকে মরা অনেক ভাল ছিল। রান্না নেই। খাওয়া নেই। তারপর সবাই ধরলে বিয়েতে রাজি হয়। তোমার শাউরিরে বিয়া হরে তহন, আর এই ঘরের পোলা অইলো যাইয়া তোমার জামাই মোক্তার মেয়া।

বুড়ো লোহাকাঠী কাঠের তক্তায় বসে ঘাড় বাঁকিয়ে কান খাড়া করে শোনে যেনো, ‘কার পায়ের ধ্বোনি হুনি, কেডা আউগাইয়া আইতাচে, আকতোর নাহি ? আকতোর মেয়া’। বুড়ো অনেকটা কাব্যিক যখন কিনা আকতোর মেয়ার পায়ের শব্দ বা আওয়াজ শোনে, তখন তার বলায় আকতোর মিয়ার ‘পদধ্বনি’ শব্দটি যোগ হয় আর নামের শেষে যোগ করে ‘মেয়া’।

ও আকতোর মেয়া, মেলা জোয়ান অইচেন না ? তা তো অইবেনই। আহ্মনে মোক্তার মেয়ার বড় ভাই না ? মোক্তার মেয়া অইল যাইয়া তোমার ছোডো ভাই। তোমার চাইতে বারো বছরের ছোডো, হয় বারো তো অইবেই। রাব্বি সাইবের ঘরে যহন আহ্মনে কাম করেন তহন আহ্মনের বয়স নয়, যে বচ্চর আহ্মনের মায় মরল হে বচ্চর বয়স অইল যাইয়া সাত। যুদ্ধের বচ্চর অইল যাইয়া আহ্মনার দশ বচ্চর। হেইয়ার পরের বচ্চরের পরের বচ্চর বিয়া হরলাম মোক্তারের মায়রে। বিয়া তো হরমুই, মায়-পোয়া মিল্যা মোরে একলা রাইখ্যা গেলে কী হরার, আয়ো আয়ো আকতোর মেয়া। বাড়ির মইদ্যে ওই মাইয়াডা অইল যাইয়া তোমার ছোডো ভাই মোক্তারের বউ, ‘মিনারা’। মাউছ্যার ঝি কইলে রাগে। আসলে অর বাফে মাউছ্যা না, ভাল মানু ; ছয়-ছোট্ট গিরাস্ত।

এইভাবে মেহেরউদ্দি বুড়ো তার এখনকার জগতে বিচরণ করে। মৃত ছেলে আকতোর মেয়ার সঙ্গে যত কথা। আকতোর ফিরে আসে তার কাছে আর যত কথা থাকে সবই আকতোর মেয়ার সঙ্গে সে বলে।

এটা বিস্তারিত পরিষ্কার নয়, কিভাবে মেহেরউদ্দি বুড়োর ছেলে মরেছিল। দেশ স্বাাধীনের অনেক দিন পরে এই মৌস্রোত খাল পারের রূপারঝোর গ্রামে ফিরে এসে প্রথমে কাঁদিয়ে মাতায়। পরে যা বলে তা থেকে কিছুই আবিষ্কার হয় না, অনেকটা অনুদঘাটিত থেকে যায় মেহেরুদ্দির ছেলে আকতোর মেয়ার মৃত্যু।

যতদূর ধারণা করা যায় তা এরকমঃ সম্ভবত ঊনসত্তুরে মেহেরুদ্দি তার ছেলে আকতোরকে নিয়ে ঢাকা যায়। তার আগের বছর মরে যায় আকতোরের মা বৈশাখের বিজলীপাতে ঘরের পাশে নারকেল গাছের গোড়ায়। সত্তুরে মেহেরুদ্দি ছেলেকে নিয়ে আবার রূপারঝোর গ্রামে ফিরে এসেছিল। পানিবন্যায় ঘর-বাড়ি ডুবে গেলে আবার ঢাকা চলে যায়। খিলগাঁওয়ের বস্তিতে রেল লাইনের পাশে থাকে আর রাজযোগাইল্যার কাজ করে। শান্তি নগরের এক সাহেবের নতুন বিল্ডিংয়ে রাজযোগাইল্যার কাজে গেলে সেই সাহেব তার ছেলে আকতোরকে বেতন দিয়ে তার ভাইয়ের বাসায় কাজে লাগিয়ে দিতে পারে বলে জানায়। বাবা আকতোরকে জিজ্ঞেস করেছে আকতোর তাতে রাজি কিনা ? আকতোর রাজি হয়েছে, বলেছে, বাবা টাহা জোমাইয়া দ্যাশে যামু আবার। আকতোরের বয়স তখন নয় বছর। বিল্ডিং সাহেবের ভাইয়ের নাম রাব্বি সাহেব। কলেজের মাস্টার। থাকেন পলাশীতে। আকতোর ভালই ছিল। তার বাবা প্রায়ই আকতোরকে দেখতে যেতেন। মনিব কলেজ মাস্টার রাব্বি সাহেবও আকতোরের বাবাকে আদর-যতœ করতেন, বলতেন যখন মন চায় তখনই আসবেন ছেলেকে দেখতে। কলেজ মাস্টার তার ছেলে মেয়েদের সঙ্গে আকতোরকেও পড়াতে বসাতেন। আকতোর গণনা শিখেছিল এক’শ পর্যন্ত, এমনকি হাজারও। কিছুটা নামতাও আকতোর শিখে ফেলেছিল, এ পর্যায়ে একদিন আকতোরের বাবা মেহেরুদ্দি গেলে রাব্বি সাহেব বললেন মেহের মিয়া, আপনার ছেলে লেখাপড়ায় ভাল, এরকম থাকলে আমি ওকে পড়াবো, বড় করে ফিরিয়ে দেবো। আকতোরের বাবা আনন্দিত হয়েছিল। কারণ রাব্বি সাহেবের ওই কথার মধ্যে মেহেরুদ্দি একটি ভাল থাকার ভবিষ্যৎ দিনকে কল্পনা করেছিল। এ সময়ে যুদ্ধ শুরু হয়। কার্যত যুদ্ধ নয় তা, পাক মিলিটারিদের হত্যাযজ্ঞ, বাঙালি নিধন অপারেশন, অপারেশন সার্চলাইট। গণহত্যার প্রথম রাত। আকতোরের বাবা খিলগাঁও থেকে দৌড়াতে থাকে, রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পাশ দিয়ে আসার সময়ে শত শত সিপাহীর লাশ সে দেখে, পলাশী যেতে ইকবাল হলে তার ভাষায় শ’য়ে শয়ে ছাত্তরের লাশও সে দ্যাখে। রাব্বি সাহেবের বাসায় পৌঁছালে রাব্বি সাহেব মেহেরুদ্দিকে সান্ত—¡না দেন, মেহের মিয়া এ সমস্যা আমাদের সকলের, পুরো জাতির ওপর এ দুর্যোগ নেমে এসেছে, ধৈর্য ধরুন, শান্ত হোন, দেখা যাক পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়।

আকতোরের বাবা মেহেরুদ্দি মিয়া দেখল ক’দিনের মধ্যে ঢাকার শহর ফাঁকা হয়ে গেল, সবাই ছুটল যার যার গ্রামের বাড়ি বা যেখানে গেলে প্রাণ বাঁচে। মেহেরুদ্দি রাব্বি সাহেবের বাড়িতে গেল, ছেলেকে নিয়ে সেও গ্রামে চলে যাবে মৌস্রোত খালপারের রূপারঝোর গ্রাম, বরিশালের দক্ষিণ মাথায়, যেখান থেকে সাগর খুব দূরে নয়। রাব্বি সাহেব বললেন, মেহের মিয়া আকতোরকে নিয়ে যেতে এসেছেন খুবই ভাল কথা, মিলিটারিদের সামনে ঢাকার শহরে কোনো মানুষই নিরাপদ নয়, আমার পরিবারও আমার কুমিল্লার গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে, ছোট মেয়েটি যাওয়ার সময় খুব কেঁদেছে আকতোরকে নিয়ে যাবে, ও গেলে আমারও ভাল লাগত, জয়ন্তীর কান্নার একটা মর্যাদা হতো । কিন্তু আমি তো আপনার অনুমতি ছাড়া আকতোরকে আমার গ্রামে পাঠাতে পারি না।

এ সময় আকতোর তার বাবাকে বলে বাবো, আমি কোনোহানে যামু না, আমি গেলে বড় সাইবে না খাইয়া মরবে, কোনো কামই হে হরতে পারে না, আম্মা কাইন্দা কইয়া গেচে তুই অইলি যাইয়া এহন তোর সাহেবের কর্তা, মুই সাইবেরে ফেলাইয়া কোনোহানে যামু না।

মেহেরুদ্দি এই ছেলে আকতোরকে নিয়ে স্বপ্ন দেখে একদিন রাব্বি সাহেবের মাধ্যমেই একটা কিছু হবে। রাব্বি সাহেব স্বীকার করেন এ কথা সত্য মেহের মিয়া, আকতোর থাকলে আমার সুবিধা হয় কিন্তু আকতোর বা আপনি না চাইলে আমি জোর করব না। চাইলে আপনি এখানে এই বাসাতে থাকতে পারেন, আমার তাতে ভালই হয়, একজন লোক অন্তত বাড়লো।

মেহের মিয়ার ছেলে যেতে চায় না তা মনিবের কষ্ট হবে বিবেচনা করে। বাবা জোর করে না, কার জন্যে জোর করবে, এমন তো নয় মা রয়েছে দেশে যে ছেলে না গেলে মা কান্নাকাটি করবে। কিন্তু মেহেরুদ্দির মন ভাল লাগে না, চারদিকে এত খুন-খারাবির মধ্যে মানুষ কী করে থাকে। যারা পাক মিলিটারিদের হাতে খুন হয়েছে তারা কেউই জানত না যে, তারা সৈন্যদের হাতে খুন হতে পারে, জানলে কী আর তারা এই ঢাকার শহরে থাকত। মেহেরুদ্দির রাজযোগাইল্যার কাজ নেই, কাজ পেলেও সাহস হয় না সেই কাজে যেতে। কে জানে কখন কোথা থেকে মিলিটারি বা তাদের পক্ষের লোকজন রাজাকার আলবদরেরা মেরে দেয়। ছেলে আকতোরকে সে দেখতে যায়, কিন্তু রাব্বি সাহেবের বাসায় থাকে না। যদিও প্রতিবারই রাব্বি সাহেব আন্তরিকতার সঙ্গে বাড়িতে থাকার অনুরোধ করে। তার ধারণা, কাজের লোকদের বাবার এতসব ধবধব করা সুন্দর বাড়িতে থাকতে নেই, তাতে ছেলে ও গৃহস্ত উভয়েরই অমঙ্গল। ছেলে ও তার মনিবের এ অমঙ্গল হওয়ার কথা সে কখনো কোথাও শোনেনি, নিজের মনেই এ আশঙ্কার কথা উঠেছে, কেন তা সে জানে না। মেহেরুদ্দি উপলব্ধি করে রাব্বি সাহেবের আচরণ এমন যেন সে তার মায়ের পেটের ভাই, কিন্তু এ কথা বলতে তার কোনোদিনই সাহস হয়নি। শত হলেও শিক্ষিত মানুষ বিরাট স্কুলের মাস্টার।

মেহেরুদ্দি রাব্বি সাহেবকে সাহস করে কথা একটি বলে ফেলেছিল, ছার কী এমন কাম যা ফেলাইয়া দ্যাশের বাড়ি যাওন যায় না, জান বাঁচানই তো ফরজ কাজ, কী কয়ন ছার। রাব্বি সাহেব তার বাসার কাজের ছেলের বাবা মেহেরুদ্দিকে বলেন মেহের মিয়া, আপনি বিশ্বাস করুন আর না করুন আমার চেয়ে আপনি সাহসী, আপনি যেমন মনে হলে পরেই ছেলেকে নিয়ে যেতে চাইতে পারলেন আমি কিন্তু তা পারলাম না। সে অর্থে আমি আপনার চেয়ে ভীরু এবং আপনি হচ্ছেন সাহসী। রাব্বি সাহেবের এ ধরনের বিনয়ে গণ্ডমূর্খ হলেও মেহেরুদ্দির মাথা অবনত হয়ে পড়ে। মেহেরুদ্দি সে প্রসঙ্গে তার ব্যাখ্যা রাব্বি সাহেবকে বলে, ছার কথাডা ঠিক এইডা না, কথাডা অইল যাইয়া আমি একজন রাজযোগাইল্যা, দিনমজুর, কাম থাকলে খোড়াক আছে। কিন্তু আফনের ছার আছে বিরাট সব দায়িত্ব। আফনেরে কাম ফেলাইয়া যাওয়া মানায় না, মোর লগে তুলনা হরাডাও পাপ মতন। রাব্বি সাহেব মেহেরুদ্দিকে ফিরিয়ে বলেন, না, না আকতোর মিয়ার বাবা, শুনুন আপনি যদি আমার জায়গায় হতেন তাহলে কিন্তু ঠিকই আপনি যেখানে ইচ্ছে চলে যেতে পারতেন। যা আমি পারিনি এবং পারবও না। মেহেরুদ্দি আরো আকৃষ্ট হয় রাব্বি সাহেবের প্রতি। মনে মনে বিবেচনা করে এই সাহেবের কলজেখানি পূর্ণিমার চান্দের মতন। এছাড়া আর কোনো উপমা তার মনে পড়ে না, আবার নিজেরই মনে হয় এই তুলনাটা বোধহয় ঠিক হলো না। যুদ্ধের নানা অসুবিধার পরেও মেহেরুদ্দির একটি জিনিস ভাল লাগে, রাব্বি সাহেবের সঙ্গে তার ওঠ্বস্ এখন বন্ধুর মতন। রাব্বি সাহেবের সঙ্গে মেহেরুদ্দির যাবতীয় কথাই হয় পরিষ্কারভাবে, কেবল যুদ্ধের বিষয়গুলো বাদে। ডিসেম্বর মাস এসে যায়, মেহেরুদ্দি পায়ে হেঁটে নিয়মিত পলাশীতে ছেলে আকতোর মেয়ার মনিব রাব্বি সাহেবের বাসায় আসে। তিনি এখন আর শুধু ছেলের মনিবই নন মেহেরুদ্দির বন্ধুর মতন। ডিসেম্বরের প্রথম দিক, বিকেলে মেহেরুদ্দি আসে, রাব্বি সাহেবকে বলে ছার মোগোরগুলি যারা ঢাকার শহর ছাইয়া গেছে, চউখ দেখলেই বুঝি হেরা কারা, খালি কয়ডা দিনের অপেক্ষা। ঠিকই বলছেন, ঠিক বলেছেন, মেহেরুদ্দি মিয়া ঠিকই বলেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুজনের মধ্যে এভাবে এপাশ-ওপাশ পিটিয়ে কথা হয়, সরাসরি কিছু নয়। রাব্বি সাহেব মেহেরকে বলেন, আমি কিন্তু প্রতিদিন কী ঘটল না ঘটল এ নিয়ে ডায়েরি লেখি। ওটা কী জিনিস মাস্টার সাহেব লেখেন সে প্রশ্ন মেহেরুদ্দি করলে তিনি বুঝিয়ে দেন, প্রতিদিনের বিশেষ সব ঘটনা চারদিকে কী কী ঘটল লিখে রাখা। মেহেরুদ্দি বোঝে এবং বলে ছার মোর এবং আকতোর মেয়ার কতাও এটটু লেইক্কেন। ছার হেইদিন খুব সুদূর না আফনার পুঁথিতে মোগোর বাফ-পোয়ার কতা দুনিয়াবাসী লোক জানবে হা-হা-হা। এমনভাবে মেহেরুদ্দি হাসে যেন পলাশীতে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এই শিক্ষকের বাসায় রাব্বি সাহেবের কোন অস্তিত্বই নেই। মেহেরুদ্দি থামে না, তবে ছার বিজয়ের পর মুই আর মোর আকতোর মেয়া মৌস্রোত খালের পার আমাগো রূপারঝোর গ্রামে ফিরা যামু। হক্কলডিরে কমু আইছি, মোরা আইছি, মোগো আকতোরেরও দান আছে এই যুইদ্ধে। ছার আপনের পরিবার না আওয়া পর্যন্ত যামু না, যে কতা কইতাচিলাম ছার, আকতোরের মা রোকেয়া বেগমের কয়বোরের উফরে পইর‌্যা কানমু এক দুই পহর, দেইক্যা গেলা না এই মোগোর দ্যাশ, নতুন সোনার দ্যাশ হা-হা-হা।

মেহেরুদ্দি আগের মতো সবকিছু অবজ্ঞা করে হাসতে থাকে, রাব্বি সাহেব অবাক হন মেহেরুদ্দির হাসি দেখে। তিনি এর আগে কখনো এমন হাসি দেখেননি। মানুষ কী করে তার সবটুকু শক্তি দিয়ে এমন হাসে তা তার কোনোদিনই জানা হতো না মেহেরুদ্দির এই হাসি না দেখলে। রাব্বি সাহেব কোথায় যেন একটু বেদনাবোধ করেন। মধ্যবিত্ত পরিবারে তার বেড়ে ওঠা, নিম্নশ্রেণীর চাষা বা মজুর দেখেননি তা নয়, কিন্তু তাঁরা এমন হাসতে পারে এমনটি তাঁর ভাবনায়ও কোনোদিন আসেনি। তাও মানুষটি হাসছে কারণ দেশ স্বাধীনের আনন্দে বজ্রপাতে মৃত্যু হওয়া স্ত্রীর কবরের উপর পড়ে কাঁদবে বলে। রাব্বি সাহেবের মন ভারী হয়ে যায় কান্না পাওয়ার মতো, কিসের এত বড় লেখক যিনি কিনা নিজ ভূমির আশি ভাগ লোকের জীবনকে জানেন না। তাদেরকে জানেননা যারা দেশ স্বাধীনের আনন্দে মৃত স্ত্রীর কবরের উপরে পড়ে কাঁদবার পরিকল্পনায় গগনবিদারী হাসি হাসতে পারে।

মেহেরুদ্দি এর পরের বার খিলগাঁও থেকে পায়ে হেঁটে পলাশীতে রাব্বি সাহেবের বাড়ি আসে ছেলে আকতোর মেয়াকে দেখতে এবং সাহেবের সঙ্গে ঢাকা শহরের সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করতে। সেই দিনটি ছিল যেই দিন রমনায় পাকিস্তানি সৈন্যরা আত্মসমর্পণ করেছিল তার আগের দিন। রাব্বি সাহেবের বাড়িতে পনেরোই ডিসেম্বর মেহেরুদ্দি এসে ঘরের সামনে দেখে শুকনো কালচে লেপ্টানো রক্ত। মেহেরুদ্দি বরিশালের দক্ষিণ প্রান্তে রূপারঝোর গ্রামের গ্রাম্যতা নিয়ে মিলিটারি কী রাজাকার কী আলবদরের ভয় ভুলে গিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠলো, আকতোর মেয়া রে’। মেহেরুদ্দির চিৎকারের শক্ত কোনো যুক্তি তখনো পর্যন্ত ছিল না, কেননা প্রথমেই সেই অবরুদ্ধ দুঃসময়ে যার রক্ত হওয়ার কথা ছিল তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক রাব্বি, অথচ মেহেরুদ্দি চিৎকার পাড়লো তার ছেলের নাম ধরে।

রাব্বি সাহেবকে এর আগের দিন বিকেল বেলা পাকিস্তনি মিলিটারির লোক রাজাকারেরা এসে ধরে নিয়ে যায়। সেই খবর সবাই জানে ও পায়, মেহেরুদ্দিও সেই খবর পায় কিন্তু তার ছেলে আকতোর মেয়ার কী হলো, তার কোনো হদিস মেহেরুদ্দি বা রাব্বি সাহেবের পরিবার করতে পারেনি। তারও একদিন পরে দেশটির কত পরিবর্তন হয়ে যায়, আনন্দের জোয়ার শুরু হয়, রাব্বি সাহেব এবং যাদের ওদিন ধরে নিয়ে যায়, তাদের জন্য কত শোক কত খবর কত লোক আসা যাওয়া করে, কিন্তু রাব্বি সাহেবের বাড়ির সামনে কালচে রক্তের উপর বসে থাকা মেহেরুদ্দি এই বিশাল ঢাকা শহরের কারো মনোযোগ আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়। তার কেন মনে হয় এটা আকতোরেরই রক্ত তা কেউ বলতে পারবে না, সম্ভবত তা মাতৃহারা সন্তানের বাবার মন। মেহেরুদ্দি কালচে লেপটানো রক্তের উপর যখন হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল সেই শব্দে প্রতিবেশীর ছিদ্রে অবরুদ্ধ নগরীর পালিয়ে থাকা অপর আর একটি মানুষের চোখ সক্রিয় হয়েছিল দেখতে, কী হচ্ছে। আবার তিনি দেখলেন রাব্বি সাহেবের কাজের লোক, আকতোর মিয়ার বাবা গড়াচ্ছে আর ছেলের নাম ধরে ডাকছে। তার চোখ ওই একই ছিদ্র দিয়ে এর আগের দিনের ঘটনাও দেখেছিল। রাজাকারেরা যখন রাব্বি সাহেবকে বাইরে নিয়ে আসে সহসা তার কাজের ছেলে বাইরে এসে রাব্বি সাহেবকে জড়িয়ে ধরে, ছার আম্মায় আপনারে দেইক্কা রাখতে কইছে। একটি রাজাকার তার বুট দিয়ে জোরে প্রচণ্ড লাথি মারলে আকতোর মেয়া ছিটকে পড়ে যায়। আকতোর আবার উঠে এসে তার মনিবকে জড়িয়ে ধরে নিয়েন না, ছাররে নিয়েন না, আম্মারে কী কমু। কিছুই তুমার আম্মারে কওন লাগবে না বলে রাজাকার কমান্ডার আকতোরকে খতম করার নির্দেশ দেয়। আকতোর খতম হলে খুব হালকা একটি লাশ রাজকারদের ট্রাকে তুলতে কষ্ট হয় না। রাব্বি সাহেবের সামনেই রাখা হয় লাশটি। প্রতিবেশীর ছিদ্র দিয়ে নির্মমতার সাক্ষী চোখ দেখে ট্রাক তখনো চলা শুরু করেনি, ট্রাকের হুডের রক্তের সঙ্গে রাব্বি সাহেব সজোরে তার মাথাখানি ঠুকলেন, সাদা পাঞ্জাবি রক্তিম হয়ে উঠলো। ঘ্যার ঘ্যার শব্দ করে ট্রাক চলে গেল হয়তো আরও একজন রাব্বি সাহেব বা তাঁর প্রিয়জনকে তুলতে।

ভ্রƒক্ষেপহীন পড়ে থাকা আকতোর মেয়ার বাবাকে এসে প্রতিবেশী বলে দেয়। তার মনে হয় আকতোরের পরিণতি তার বাবাকে না বললে লোকটির কষ্ট আরো বাড়তে থাকবে, তার চেয়ে একটি স্থির ঘটনাকে মেনে নিয়ে হয়তো তার স্মৃতি ধূসরতার দিকে যেতে থাকবে।

বুড়ো মেহেরুদ্দির কাছে ছেলে আকতোরকে হারাবার স্মতি এখন ধূসরতার প্রান্তসীমায়। তবুও সে প্রতিদিন বাড়ির সামনে দরজা ও ঘাসখিলের জাম তলায় লোহাকাঠী কালো তক্তার উপরে বাঁশের লাঠিখানা হাতড়িয়ে ছেলে আকতোর মেয়াকে আসতে দ্যাখে। তার এই দ্যাখায় মৌস্রোত খালে বাহারী রঙের পান্সি ঢোকে। মেহেরুদ্দির দরজায় সেই পানসি ভেড়ে। খেজুর গাছের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধে পানসির দড়ি। পানসির ভেতর থেকে মাথা নুইয়ে বাইরে বেরিয়ে আসে আকতোর মেয়া। পিতা মেহেরুদ্দি মেয়া টানা লম্বা দরজা দিয়ে আকতোর মেয়াকে হেঁটে আসতে দ্যাখে।

কার পদধ্বনি হুনি, কেডা আউগাইয়া আইতাছে, আকতোর মেয়া নাহি। দেশান্তপুর হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক হারুন রশিদ এগিয়ে এসে মেহেরুদ্দির হাত ধরে, না গো চাচাজান, আমি হারুনার রশিদ, মোজাফ্ফরের পোলা, দেশান্তপুর হাই স্কুলের মাস্টার। বুড়োর চিনতে কষ্ট হয় না। ও রাঙ্গা মোজাফ্ফরের পোয়া ? হয় হয়, তোমার বাপ আছিলো ছোড বয়সে হিন্দুর ফলের লাহান রাঙ্গা, হেয়া আকতোরের খবর কী পাইলা?

হারুন মাস্টার আকতোরের খবর দেয়। সে সকালের রেডিওতে শুনেছে ঢাকার মীরপুরে একটি গণকবর আবি®কৃত হয়েছে। যে গণকবরকে ধারণা করা হচ্ছে বুদ্ধিজীবীদের গণকবর। হারুন মাস্টারের মতে রাব্বি সাহেব ও আকতোর মেয়াও ওই কবরের মধ্যে থাকতে পারে। বুদ্ধিজীবীদের ছেলেমেয়েরা জড়ো হচ্ছে সেই কবরের পাশে তাদের পিতাদের হাড়গোড় খুঁজতে যদি কোনো চিহ্ন পাওয়া যায়।

বুড়োর খড়খড়া হয়ে ওঠা স্মৃতির ধূসরতা কেটে যায় যেন। আকতোর মেয়ার তো কোনো পোলাপান নাই, মোকতার মেয়ারে পাডামু নাহি যদি একখান হাড্ডিও পায়। নাইলে মোরে এটটু লইয়া লও হারুন, তুমি মোর ধর্মের বাপ। দেশান্তপুর স্কুুলের শিক্ষক এসব কোনো কথার উত্তর করে না, সে জানে এসব কথার কোনো মানে হয় না। মেহের বুড়োর আকতোর হারানোর কাহিনী বড় হয়ে হারুন শুনলে তার বরাবরই মনে হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের লাশের সঙ্গেই ওই আকতোর মেয়ার লাশ পুঁতেছে, ওর জন্য কী আর রাজাকারেরা আলাদা কবর করেছে।

হারুন মাস্টার ঠিক অজপাড়াগাঁ স্কুলের শিক্ষকদের বৈশিষ্ট্যেই গড়া কিন্তু একটু ব্যতিক্রম, চেতনাগুলো একটু বেশি। কখনো ইট গেঁথে ঠিক একুশে ফেব্র“য়ারি, প্রভাতফেরী, স্বাধীনতার আলোচনা এসব করবে। বোর্ড কমিটি কী বদলী হেডমাস্টাররা এতদিনে জেনেছে বিলের অঞ্চলের এই মাস্টার এসব করবেই, বিরোধিতা করে লাভ নেই, তাল মেলানোই ভাল। হারুন মাস্টারের সেই স্বভাব থেকেই গিয়েছিল। সকালে বাংলাদেশ বেতারের খবরে ঢাকা মিরপুরে গণকবর আবিষ্কারের কথা শুনেই তার মনে হলো এর সঙ্গে তার পাশের গ্রাম রূপারঝোরের মেহেরুদ্দি বুড়োর একটি সম্পর্ক আছে।

হারুন মাস্টার চলে গেলে মেহের বুড়ো তার ছেলে আকতোর মেয়ার স্মৃতি ধূসরতার জগতে অধিক বিচরণ শুরু করে। আষাঢ়ে জামগাছে আসা চন্দন শালিকের উদ্দেশ্যে বলে, খবরদার হালিক, মোগো আকতোর মেয়া আইতাছে। আহাজারি, কান্না বেড়ে যায় পরের দিন। বুড়ো পাগল করে ফেলে বাড়ির লোকজনকে।

মিনারার কাছে চাচী সম্পর্কের শাশুড়ি জানতে চায় পাশের গেরামের হারুন মাস্টার বুড়োর কানে এমন কী ফু’ দিয়া গেলো যে হে পাগল লাহান অইচে, গোনো কবরের পাড় যাইবে, একখান আড্ডি চায়, ছোড দেইক্কা আড্ডি। ছেলেবউ মিনারা বুড়োর কষ্ট অসহ্য রকমের বললে চাচী শাশুড়ি স্মরণ করায়, যুদ্ধের পর ঢাকা দিয়া ফিরা আইয়া এই রহম করত, তয় বোজো হে সোমায় আচিলো জোয়ান, গায়ে অসুরের শক্তি।

বুড়ো ঘাসাখিল পার জামতলা লোহাকাঠী তক্তায় বসে কাঁদে, বিলাপ করে, মিনারা একটা ছোড আড্ডি দে, আকতোরের সোমান, আকতোর মেয়ার আড্ডি, মাতার খোল, তউতো বোঝলাম বাজানরে মোর পাইছি। ওই এক কথা, উডাও আকতোরের আড্ডি উডাও। ছ্যামরা কদ্দিন অযত্নে থাকবে এল্হা। রাব্বি সাইব মরলো মাতাডা ফাডাইয়া, আয় আকতোর আয় মোরা গেরামে ফিরা যাই, তোর মায়ের কয়বরের পার। ও মেয়ারা, মোর পুত্তুর আকতোরের আড্ডিহান দেও, মাতার খোলডা।

আকতোর মেয়ার ভাই, সৎভাই মোক্তার মেয়া হারুন মাস্টারের বাড়ি যায়। মাস্টার মিয়া, বাবোরে কী কইছেন, হে দেহি মরণ লাহান অইচে, কাইন্দা মাতাইছে গেরাম, আকতোর ভাইজানের আড্ডি চায়, মাতার খোল। হারুন মাস্টার মোকতারকে বাড়ি পাঠায় এই বলে, যাও কাইল দেহি তোমার বাপরে শান্ত হরন যায় কিনা।

হারুন মাস্টার একটি কাজ করে, তা নীতিবিবর্জিত কিনা ভেবেও দেখে না। কবর স্থানে পুরনো কবর খুঁড়ে একটি মাথার খোল ও পায়ের হাড্ডি সংগ্রহ করে। পরের দিন ঘাসাখিল পার জাম গাছতলায় বুড়োর কাছে আকতোর মেয়ার হাড্ডি মিনতিকালে হারুন মাস্টার যায়। কার পদধ্বোনি হুনি, মোগোর আকতোর মেয়া নাহি।

আমি হারুন মাস্টার, রাঙ্গা মোজাফ্ফরের পোলা।

পাইছো, পাইছোনি আকতোর মেয়ার আড্ডি, বুড়ো যথারীতি প্রশ্ন করে। হারুন মাস্টার চটের বস্তা থেকে বের করে মেহের বুড়োর হাতে সে মাথার খোল ও হাড্ডিখানা দেয়। মেহেরুদ্দি পরম স্নেহের সঙ্গে মাথার খোল ও হাড্ডির উপর হাত বুলায়, আইছো বাজান শেষমাইশ। হারুন তোরে পোথ দেহাইয়া লইয়া আইছে ? অর বাপ মোজাফ্ফারও আছিলো বড় দেলের মানু।

কেমন আছো রে বাজান মোর আকতোর মেয়া, লও তোমার মায়ের কোলে হুইয়া থাকবায়ানে। মিনারা হারুন মাস্টারের বস্তা থেকে মানুষের কঙ্কাল বের করতে দেখে ভয় পেয়েছে। কিন্তু শ্বশুর এমন শান্ত হয়ে গেলে ঐ কঙ্কাল পেয়ে যে সে তার ভয় পাওয়ার কথা ভুলেই যায়।

আশ্চর্যের কথা মেহের বুড়ো শান্ত হয়ে গেল। ছেলেবউ মিনারাকে বললো মিনারা আতখান ধরো, মোর ঘরে যামু। কোনো হৈ-চৈ ছাড়া মেহের বুড়ো সেইদিনের বিকেল অতিক্রম করে নিরিবিলি নিদ্রায়। মিনারা মোক্তার মেয়া অবাক হয় হারুন মাস্টার কী এমন করলো। তারা হারুন মাস্টারের প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। কিন্তু পরের দিন কার্যত ঘাসাখিলের পার জামতলার চন্দন শালিকের চেঁচামেচি নিয়ে লোহাকাঠী তক্তার উপর বসে থাকা মেহের বুড়োর একটি পরিশ্রান্ত মৃত্যু ঘটে।

ছেলেবউ, ছেলে সামান্য কাঁদে কিন্তু তারা খুব বিচলিত হয় না। কেননা বাবার ওই কষ্ট পাওয়ার চেয়ে যে মরে যাওয়া ভাল সে রকম মনোভাব আগেই হয়েছে। হারুন মাস্টারের প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা আরো, কারণ সে তাদের বাবাকে আকতোর আসার পরিতৃপ্তি দিতে পেরেছিল।

হারুন মাস্টার খবর শুনে হেড মাস্টারকে চাপ দিতে থাকে স্কুল ছুটি দেওয়ার জন্যে। হেড মাস্টার ঔদ্ধত্য মনে করে ছুটি দেয়ার প্রস্তাবের যথার্থ কারণ জানতে চায়। হারুন মাস্টার কঠোর হয়, শহীদ আকতোরের পিতার মৃত্যুতে এই স্কুল বন্ধই থাকা উচিত। এই স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রথম লগ্নে মাটি কাটায়ও এই বুড়ো অংশ নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, তার নামাজে জানাজাও হবে এই স্কুল ময়দানে। হারুন মাস্টার যেভাবে চায় হেড মাস্টার সেভাবেই মানতে বাধ্য হয়, কারণ অন্যদের সমর্থন ছিল। হারুন মাস্টার তার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে মৌস্রোতে খালপাড়ের সেই বাড়ির সামনে যায় যেখানে ঘাসাখিল পাড় জামতলায় লোহাকাঠী তক্তায় মেহের বুড়ো বসে থেকে আকতোর মেয়াকে দেখতে পেতো, সেই কোনায় হারুন মাস্টার তার ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে একটি গ্রামীণ স্মৃৃতিসৌধ বানায়, তার নামকরণ করে শহীদ আকতোর মেয়া স্মৃতিসৌধ’।

সরকারি বা বেসরকারি স্বীকৃতি মিলুক আর না মিলুক আকতোর মেয়ার নামে ওই স্মৃতিসৌধটি বানানো হয়েছে। হারুন মাস্টার তথা এলাকাবাসী বলেছে স্মৃতিসৌধটি থাকবে। তা চিরদিন।


লেখক পরচিতি
আনোয়ার শাহাদাত
বরিশালে জন্ম। এখন নিউ ইয়র্কে থাকেন। 
গল্পকার। ঔপন্যাসিক।
প্রকাশিত বই--
গল্পের বই : ক্যানভেসার গল্পকার।
উপন্যাস : সাঁজোয়া তলে মুরগা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন