মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

অমিতরূপ চক্রবর্তীর গল্প : জন্মদিন

চোখ মেলতেই শ্রীরূপা দেখল কান এঁটো করা ঝকঝকে আয়নাটা তাঁকেই দেখছে শতচক্ষু দিয়ে। পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা যখন নরম টিস্যু চেপে চেপে শ্রীরূপার মুখ শুকিয়ে তুলল, কান এঁটো করা ঝকঝকে বিশাল আয়নাটি যেন ঝিঁঝির মতো কী একটা ভাষায় শ্রীরূপাকে বলল ‘চমৎকার!’

ফেসিয়াল শেষ করার পরেও অনেকক্ষন অনেকটা বাচ্ছাদের কাঠের ঘোড়ার চেয়ারটার মধ্যে চোখ বুজে শরীরটা আলগা করে বসে থাকল শ্রীরূপা। এসির ঠাণ্ডায় ওর শরীর শরীরের ভেতরটাও শীতল হয়ে আসছিল। ঘরটায় সোনালি রঙের সিলিংল্যাম্প জ্বলছে। তার আলো খুব নরম। ফুলের পাপড়ির মতো। প্রকাণ্ড আয়নার সামনে শ্রীরূপার ডাইনে-বাঁয়ে আরো অনেক তারই মতো মানুষ বসে আছে। যাদের গলা অবধি একটা কভার টানা। মাথাটা ব্যাকরেস্টে হেলান। মুখে ময়াম লেপা। তাদের প্রত্যেকের মাথার পেছনে আরো কেউ একজন দাঁড়িয়ে ময়ামের খোসাটাকে টেনে তুলছে বা টিস্যু চেপে চেপে, ঘষে ঘষে মুছে ফেলছে। এরপর ওরাও সবাই বন্ধ চোখ খুলে সামনের ঝকঝকে আয়নাটার দিকে তাকাচ্ছে আর আয়নাটিও সেইরকম ভাবেই ঝিঁঝিপোকার মতো ভাষায় বলে উঠছে ‘চমৎকার!’

শ্রীরূপা ভাবছিল এই একটিই টানা আয়না আসলে কি একটিই? নাকি প্রত্যেকটি মুখের কাছে একটিই আয়নাটি চুলের মতো সরু সরু ফাট দিয়ে আলাদা আলাদা করা। একটি বই যেমন বিভিন্নভাবে পড়লে বইটি অনেকগুলো আলাদা বই হয়ে যায়- এই ঝকঝকে প্রকাণ্ড টানা আয়নাটিও কি তেমন? শ্রীরূপা একবার ডাইনে-বাঁয়ে তাকাল। তারই মতো কত কে আয়নার সামনে বসে আছে পিঠ হেলিয়ে। মুখে ময়াম থাকায় কখনো এদের সবাইকে একইরকম লাগে। যেন এন্টার দ্য ড্রাগন সিনেমার কাচঘরের দৃশ্যটি। একটিই মানুষের ছায়া অসংখ্য কাচে পড়েছে। কে আসল, কে নকল বোঝাই যাচ্ছে না। বা আসল মানুষটাই তার প্রতিবিম্ব দেখে ঠকে যাচ্ছে।

কতক্ষণ এভাবে এই ঘরটার স্নিগ্ধ আরামে বসে থাকবে বা বসে থাকা সমীচীন- মনে মনে তার একটা হিসেব কষল শ্রীরূপা। ফেসিয়ালের কাজ শেষ করে শ্রীরূপার উজ্জ্বল চকচকে মুখ শ্রীরূপাকে ডেলিভারি দিয়ে বিউটিশিয়ান মেয়েটা পেছন থেকে সরে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। ইতিমধ্যে সে হয়তো অন্য কোনো কাস্টমারের মুখ পরিচর্যায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অবশ্য এই দামি পার্লারগুলোতে কাজ ফুরিয়ে গেলেও এক আধঘণ্টা একমনে বসে থাকার কোনো অসুবিধে নেই। কেউ কিছু বলবে না। বরং চাইলে চা কফি বা সফটড্রিংক্সও আনানো যেতে পারে।

ড্রাইভার লোকটি অ্যাতোক্ষণ হয়তো হাঁটতে হাঁটতে বাজারের দিকে চলে গেছে। কোনো ইলেকট্রনিক শো রুমের সামনে দাঁড়িয়ে ওয়াল টিভিতে হিন্দি সিনেমা দেখছে। নয়তো গাড়িটার দিকে নজর রাখা যায়- এমন কোনো দূরত্বে পান দোকানে দাঁড়িয়ে হাতে খৈনি ডলছে। লোকটার মুখে খৈনি পুরে রাখার কারণে ভীষণ দুর্গন্ধ। দরজা খুলে দেবার সময় শ্রীরূপার নাকে গন্ধটা লাগে। বয়স্ক, হেড়ে লোক। শ্রীরূপা কিছু বলতেও পারে না।

কাঠের ঘোড়ার মতো চেয়ারটায় দুলতে দুলতে মনে মনে একটা ছক কষল শ্রীরূপা। এখনো অনেকটা দিন হাতে না-ভাঙানো অবস্থায় পড়ে আছে। তাহলে পার্লার থেকে বেরিয়ে কোনো একটা ক্যাফেতে কিছু খেয়ে শহরের বাইরে দিয়ে ঘুরে বাড়িতে পৌঁছান যেতে পারে। অন্তত রেলস্টেশন পেরিয়ে নদীর দিকটা ঘুরে যে রাস্তাটা গভর্মেন্ট হাউসিং আর পার্ককে চক্কর দিয়ে তারপর বস্তির মতো একটা এলাকার মধ্যে দিয়ে যায়। যেখানে রাস্তার দু’পাশে জিড়জিড়ে সব চা-বিস্কুটের দোকান। সবজির দোকান। নোংরা পাড়ার গলির মুখটা। কতগুলো ততোধিক নোংরা ভাতের হোটেল। খুচরো, বদটাইপ মানুষের ভীড়, হইহল্লা। হ্যাঁ, যাওয়া যায় সেই রাস্তাটা দিয়ে। খুব শর্টকাটে ফিরে নিথর ফ্ল্যাটটার মধ্যে একা একা ওই কাচঘরের মতো নিজের নিজেরই অসংখ্য প্রতিফলন দেখতে ভাল লাগে না রোজ।

ব্যাগ থেকে কার্ড বের করে সেটা দিয়ে টিপস সহ পেমেন্ট করল শ্রীরূপা। ক্যাসটেবিলের মেয়েটাকে চেনা হয়ে গেছে শ্রীরূপার। মেয়েটা অনেকটা তার ইস্কুলবেলার বন্ধু মাধবীর মতো দেখতে। ঠিক মাধবীর মতোই চোখের নীচে বেঢপ জায়গায় একটা জড়ুল। মাধবীকে এ নিয়ে ইস্কুলে কম হ্যারাস করত না মেয়েরা। হ্যাঁ, শ্রীরূপাও সেই দলে ছিল। সমস্বরে যত রাজ্যের নোংরা কথা চালাচালি হত। এ ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ইতি। ও একদিন বলেছিল ‘শ্রীরূপার এমাসে যেদিন পিরিয়ড হবে, তা থেকে একটু নিয়ে লাগিয়ে দিস- দেখবি সেরে যাবে।‘ এই শুনে অন্য মেয়েরা ডাইনিদের মতো হিহি-হিহি করে হেসেছিল। মাধবীর সেই জড়ুলটার পাশ দিয়ে চোখের জলের ফোঁটা চারপাশ দেখেশুনে গড়িয়ে গড়িয়ে নামছিল।

মেয়েটা চাবি-দেওয়া ঢঙে হেসে বলল ‘থ্যাঙ্কিউ ম্যাম। নেক্সট উইক আবার আসছেন তো?’

শ্রীরূপা না বললেও মেয়েটি জানে আগামী সপ্তাহেও শ্রীরূপা ঠিকই আসবে। গত কয়েকমাস ধরে প্রতি সপ্তাহেই শ্রীরূপা আসছে এই পার্লারটায়। কেমন একটা তাগিদহীন তাগিদের টানে। যেমন আস্ত বিকেলে কোনো কারণ ছাড়াই মানুষ পায়ে স্যান্ডেল দিয়ে অনেকটা দূর অবধি মন্থরভাবে হেঁটে আসে, পরিচিতদের সঙ্গে সুখ-দুঃখের আলোচনা করে- অনেকটা সেরকম। পার্লারের শীতলতায় কাঠের ঘোড়ার মতো চেয়ারটায় গা ডুবিয়ে চোখ বুজলে নিজের নৈঃশব্দ্যের অতলে ধীরে ধীরে ডুবতে থাকে শ্রীরূপা। অন্তত এখানে কাচঘরের মতো নিজেরই অসংখ্য প্রতিফলন দেখতে হয় না। কোনো ভাবনাও আসে না। কেমন ভেজা নেশার মতো। বিউটিশিয়ান মেয়েগুলি মুখে ময়াম লাগিয়ে মুখ আরো উজ্জ্বল, আরো চকচকে করে তোলে। চুল আরো মসৃন আরো পশমের মতো করে দেয়। পায়ে গরম বাথ দিয়ে ঢেকে দেয় একটু চুপসে আসা গোড়ালি বা পায়ের পাতার সুষমা। পুরো ব্যাপারটিকেই যেন শ্রীরূপার মনে হয় এই মুখ, চুলের গোছ হাত বা পায়ের পাতা, গোড়ালি সবই যেন তার কখনো, কোনো সময়কার ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। বাথটবে চুবিয়ে কোমল সাবান দিয়ে তাদের চান করান হচ্ছে। থুতনি ধরে মাথা আচড়ে দেওয়া হচ্ছে। গায়ে-পিঠে পাউডার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

গাড়ির কাছে পৌঁছতেই ড্রাইভার লোকটা দৌড়ে এল। কাছাকাছিই কোথাও ছিল সম্ভবত। দরজা খুলে দেবার সময় আবারো সেই মুখের দুর্গন্ধ। গা-টা গুলিয়ে ওঠে শ্রীরূপার। জানালার কাচ তুলে দিয়ে বাইরে ছেড়ে আসা অ্যাতোক্ষণ সময় অতিবাহিত করা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে শ্রীরূপা দেখল সেটার দেওয়ালের ক্রিম রঙ সন্ধ্যার মতো হয়ে গেছে। পুশ ডোরের গ্লাস দিয়ে ক্যাসটেবিলের ছোটখাট মেয়েটিকে দেখা যাচ্ছে। মুখের খোলস তুলে আসা সবার সঙ্গে সেই চাবি-দেওয়া কায়দাতেই কথা বলছে। শ্রীরূপার মনে পড়ল ইতি একদিন মাধবীর বইয়ের ব্যাগে একটা কাঁচাকলা ঢুকিয়ে রেখেছিল। মাধবীর হাতে যখন সেটা বেরিয়ে আসে, সারা ক্লাস জুড়ে আবার সেই ডাইনিদের হিহি-হিহি হাসি।

ইতি এখন কোথায়? মাধবীই বা কোথায়? স্কুল বদলে যাবার পর আর কারোরই খোঁজ রাখেনি শ্রীরূপা। জীবনের যে অনিবার্য সত্যের প্রতীক ইতির সেই কাঁচা কলা- তা নিয়ে ওরা সুখী আছে? কীরকম সুখী আছে? সশব্দ সুখী না নীরবে সুখী?

ড্রাইভার লোকটি বলল ‘দিদিমণি, সোজা বাড়ি যাবেন তো?’

শ্রীরূপা একটু সম্বিৎে ফিরে এসে বলল ‘না, রেলস্টেশন পেরিয়ে নদীর ধার ঘেঁষে ওই রাস্তাটা দিয়ে ঘুরে চলো। রাস্তায় একটু পরেই একটা কফিশপ পাবে, সেখানে দাঁড় করিও। কফি খাব। তুমি খাবে কফি? চাইলে খেতে পার।‘

ড্রাইভার লোকটি মাথা সামান্য ঘুরিয়ে ‘নাহঃ’ করার ভঙ্গিতে হাসল।

রেলস্টেশন পেরিয়ে নদীর পাড় ঘুরে যে রাস্তাটা, এই রাস্তা দিয়ে আগেও বহুবার বাড়ি ফিরেছে শ্রীরূপা। কখনো পার্লার থেকে। কখনো শাড়ি-জামাকাপড়ের শোরুম থেকে। কখনো নিছক কিছু কেনাকাটার পর এমনিই- খেয়ালবশে। রাস্তাটিতে গভর্মেন্ট হাউসিংগুলো পেরোলে একটা বেশ বড় পার্ক মতো। তাতে গাছের আড়াল-আবডাল। সিমেন্টে বাঁধান সাদা গোল বা চৌকমতো বসবার জায়গা। এককোণে প্রবীণদের জন্য কাঠের চেয়ার। মাথায় টিনশেড। মাঝখানে একটা জলামতো। তাতে একটা সিমেন্টের আধখানা ভাঙা নৌকা কবে থেকে ডুবে আছে। ওটাকে এখন কোনো জলচর প্রাণির মতোই লাগে নৌকোর বদলে। রাস্তা দিয়ে গাড়িতে যাবার সময় প্রতিবার শ্রীরূপা দেখে অনেক ছেলেমেয়ে আলো-আঁধারি খুঁজে নিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বসে আছে। মেয়েটির মাথা ছেলেটির কাঁধের ওপরে নামান। এভাবে হয়তো ওরা ওদের ধূসর ভবিষ্যৎ-কে ভাবার বা দেখার চেষ্টা করে। একবার এখানেই একটি যুগলকে অদ্ভুত এক মূর্তিতে দেখেছিল শ্রীরূপা। ছেলেটির হাত কামিজের গলা দিয়ে মেয়েটির বুকে ঢুকিয়ে রাখা এবং ঐ অবস্থাতেই ছেলেমেয়ে দুটি মাথা নীচু করে অঝোরে কাঁদছে।

বিছানায় শ্রীরূপা ভেবেছিল, সুবাহুকে কথাটা বললে হয়তো সুবাহু খুব জোক করে এর একটা ব্যাখ্যা দেবে। বলেওছিল সুবাহুকে শ্রীরূপা কথাটা। উত্তরে সুবাহু বলেছিল ‘রুচির দিক থেকে তুমি কেমন যেন ক্যারিড অ্যাওয়ে হয়ে যাচ্ছ।‘ দেওয়ালে ঠেস দিয়ে শ্রীরূপা তখন দেখছিল সামনের দেওয়ালে ঝোলান একটা রাজস্থানি পেইন্টিং-এর দিকে। যেখানে তিনজন রাজস্থানি মহিলা ঘাগড়া উড়িয়ে নাচ করছে। দুটো লোক সারেঙ্গির মতো কী একটা যেন বাজাচ্ছে। ছবিটি ওদের বিবাহবার্ষিকীতে কেউ একজন গিফ্ট করেছিল। সেই ব্যক্তিটি কেন এই ছবিটাই কিনেছিল, তা কখনো কখনো ভাবে শ্রীরূপা সুবাহু একপাশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে। তার মনে দুটো যুক্তি উঁকি দেয়। ১. ব্যক্তিটি হয়তো ভেবেছিল নৃত্য-গীতের ছবি সাংসারিক খুশিয়ালির অনুকূল। ২. ব্যক্তিটি চেয়েছিল নিজের রুচিবোধকে একটা উচ্চতায় উঠিয়ে দেখাতে। যেভাবে কখনো কখনো শ্রীরূপার মনে হয় সুবাহু দেখাতে চায়। তখন ইতির কথা মনে হয়। ইতি মাধবীর ব্যাগে একটা কাঁচা কলা ঢুকিয়ে রেখেছিল। কী ঈঙ্গিত করেছিল তাতে ইতি, আট ক্লাসের সব মেয়েরাই বুঝতে পেরে ওরম ডাইনিদের মতো হেসেছিল। কী মানে ছিল তার? মানে, সেই কাঁচাকলাটার? মেয়েদের সুখ বা অনিবার্য পরিণতি? সুখ কিনা তা এখন আর বুঝতে পারে না শ্রীরূপা। এই আবাসনের বেসমেন্টে যেমন প্লাম্বার, ইলেকট্রিকের মিস্ত্রিরা নেমে গিয়ে সারাই-ঝালাইয়ের কাজ করে ফিরে আসে, সুবাহুর কাজও যেন তাই-ই। শ্রীরূপা শুধু তার শরীরে সবাহুর নেমে যাবার পদশব্দ শোনে, উঠে আসার পদশব্দ শোনে। ভেতরে কী কাজ হয়- তার কিছুই টের পায় না ও। কোনো কোনো দিন খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেলে শ্রীরূপা দেখে একটি চুলভর্তি মাথা তার দিকে পেছন ফিরে অকাতরে ঘুমোচ্ছে। মাথার ভেতরে একটি ঘড়ির শব্দ হচ্ছে বা কোনো কল-কারখানার কাঁটাভর্তি ছোট বড় চাকা ঘুরে যাচ্ছে বা রানওয়ে ধরে ধরে ছুটতে ছুটতে কতগুলি বিমান দু’দিকে টলমল করে আকাশে উঠে পড়ছে। তখন জানালার বাইরে কাঁচা দুধের মতো আলো। পৃথিবীতে আরো একটা নতুন দিন তার ইস্তেহারের গোছা নিয়ে একটি দীর্ঘকায় লোকের মতো হেঁটে আসছে। তার নাকের একদিক ভাঙা।

এমনটা ছিল দীপেশ। কলেজে শ্রীরূপার সঙ্গে পড়ত। অ্যাক্টিভলি ছাত্র-রাজনীতি করত। যদিও এই ছাত্র-রাজনীতি ব্যাপারটা কোনোদিনই মাথায় ঢোকেনি শ্রীরূপার। কলেজে যে রাজনীতি চলত, তা দেখে শ্রীরূপার কখনোই মনে হত না যে এর সঙ্গে ছাত্রের বা ছাত্র শব্দটার কোনো যোগ আছে। সবাই দক্ষ রাজনৈতিক কর্মীর মতো। উদভ্রান্ত, অপরিকল্পিত, দিশাহীন। প্রয়োজনে মারকুটে। দীপেশও এ থেকে আলাদা ছিল না। কলেজে ভোট গণনার দিন ও দলবল নিয়ে ছাদের কার্নিসে লুকিয়ে ইট ছুড়ত। হাতে বাঁশ নিয়ে আরেক দলকে তাড়া করত। তবে ওর মুখটা ছিল খুব সুন্দর। চুলের গুছি এসে কপালের ওপর জলের ঘূর্ণির মতো একটা ঘূর্ণি তৈরি করে লটকে থাকত। লম্বা শরীর নিয়ে কলেজের বারান্দা দিয়ে হেঁটে আসত। তখন পিলারের ছায়াগুলো জেব্রার গায়ের দাগের মতো পড়ে থাকত বারান্দার মেঝেতে, দেওয়ালে। সুন্দর একটা ছন্দে ওই দাগগুলো পার করে করে হেঁটে আসত দীপেশ।

দীপেশের কথাটা মনে হলেই বিস্ময় হয় এখনো শ্রীরূপার। কী ভয়াবহ রকমের দুর্দান্ত ছিল ও। চোখের নিমেষে শ্রীরূপাকে চুমু খেয়ে ফেলত। কখনো কখনো সবার অলক্ষ্যে বুক ছুঁয়ে দিত। কেন যে ওর এইসব অত্যাচার সহ্য করার জন্য ক্লাস ফাঁকা হয়ে গেলেও একা একা বসে থাকত শ্রীরূপা- এর উত্তর এখনো শ্রীরূপার কাছে অজানা। কখনোই দীপেশকে ভালবাসত না ও। রাজনীতি করা মানুষজনের প্রতি কেমন একটা বিবমিষা বোধ করত সবসময়ই। এই কারণে বাবার বন্ধু শ্যামল নন্দী লোকটাকেও ওর কখনোই ভাল লাগত না। লোকটি ছিল বাবার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। প্রায়ই আসত শ্রীরূপাদের বাড়ি সন্ধেবেলা। তারপর এ কথা-ও কথার পর শুরু হত রাজনীতির কচকচানি। লোকটিকে কেমন যেন ‘ঘরেবাইরে’-র সন্দীপ টাইপ মনে হত শ্রীরূপার। কখনো চা দিতে এসে শ্রীরূপা দেখেছে লোকটার চোখ মায়ের বুকের আঁচল সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে।

তবুও কোনো অজ্ঞাত কারণেই দীপেশের জন্য ফাঁকা ক্লাসঘরে বসে থাকত শ্রীরূপা। ঠিক সময়ে যেন একটা কোথাও ঘণ্টা পড়ত আর সঙ্গে সঙ্গে হাজির হত দীপেশ। তারপর শুরু হত ওর ডলাই-পেষাই। রাতে গা টনটন করত শ্রীরূপার। কোনো কোনো অংশ তো নীলও হয়ে যেত।

আশ্চর্য, কোনোদিনই দীপেশের কথা মনে লাগত না শ্রীরূপার। অথচ তথাপি কত ফাঁকা ময়দান, ক্যাফে, সিনেমাহলের চলমান আলো-আঁধারি, কোনো উঁচু সিঁড়ির ধাপে বসে কত সময়, কতদিন শ্রীরূপা ওর সঙ্গে কাটিয়েছে। কত অদ্ভুত যৌনচাহিদা সহ্য করেছে। যেমন কানের লতি কামড়ে ধরে থাকা অথবা হাতের সবগুলো আঙুল মুখে পুরে চোষা। এমনই দুর্দান্ত, খানিকটা ভালগার, উদ্দ্যেশ্যহীন, অপরিকল্পিত ছিল দীপেশ। অথচ তার পাশে সুবাহু নামের মানুষটা কত পরিমিত, সুপরিকল্পিত, উদ্দ্যেশ্যমুখী। কত নিঃশব্দে ও শ্রীরূপার ভেতরে ওঠা-নামা করে- যেন চোর।

সেদিন ম্যাসাজের সময় বিউটিশিয়ান মেয়েটি ওর দু’হাত প্রায় পৌঁছে দিয়েছিল শ্রীরূপার বহুদিন নীরব হয়ে যাওয়া স্তনে। তখুনি শ্রীরূপার মনে পড়েছিল দীপেশের কথা। কোনোরকম অয়েল ছাড়াই, স্নিগ্ধতা ছাড়াই এইভাবে শ্রীরূপাকে ডলাই-পেষাই করত ও। নাকে, গলায় দরদরিয়ে ঘামত। দুই ঊরুর মধ্যে খাঁচা বন্দি একটা বাঘ মাথা লুটিয়ে-পুটিয়ে গজরাত। এসব এখন ভাবলে কখনো খুক করে হাসি পেয়ে যায় শ্রীরূপার। ড্রাইভার লোকটি তখন চোখ তুলে আয়নায় শ্রীরূপাকে দেখে নিয়ে আবার গাড়ি চালানোয় মন দেয়।

দীপেশের পড়া উচিত ছিল ইতির পাল্লায়। শ্রীরূপা নিশ্চিত, ইতি ওকে নাকানি-চোবানি খাইয়ে ছেড়ে দিত। ইতির মধ্যে যে দুষ্টু হলোউইনটা থাকে- সে একবার হাঁ করলেই পালিয়ে কূল পেত না দীপেশ।


শ্রীরূপা একদিন পায়ে বাথ নিতে নিতে ভাবল ওর ফ্ল্যাটের ঠিক পাশের ব্লকটায় থাকা চুল ছোঁলা মাথার মধ্যবয়েসি লোকটার কথা। শ্রীরূপার একটি জানালার সইসই ছিল ওই লোকটার কিচেনের জানালা। সেখানে দাঁড়িয়ে লোকটা কখনো কখনো হয়তো ঘুটে ঘুটে কফি বানাত আর মাঝেমাঝেই তাকিয়ে শ্রীরূপাকে দেখত। এমন চলতে চলতে একসময় এর মধ্যে একটা কৌতুক খুঁজে পেয়েছিল শ্রীরূপা। অন্তত কাচঘরের অসংখ্য কাচে নিজের প্রতিফলন দেখার যন্ত্রণার চেয়ে। লোকটার সংসারে কেউই ছিল না। অন্তত শ্রীরূপা তো কাউকেই কোনোদিন দেখেনি। হতে পারে লোকটা কর্মসূত্রে পরিবারের থেকে দূরে। জানালায় শ্রীরূপা লোকটার দেখা পেত ঠিক বেলা এগারোটা-সাড়ে এগারোটা নাগাদ। কোনোদিন হয়তো ঘুটে ঘুটে কফি বানাচ্ছে, নয়তো কিচেন নাইফে কিছু কাটছে নয়তো গ্যাসের বার্নার খুলে ফুঁ দিয়ে পরিষ্কার করছে। লোকটার গর্দানে থাক থাক মাংস, যেমন ইংরেজি সিনেমার অভিনেতাদের দেখা যায় আর ভুরু বলতে কিচ্ছু নেই। বাঁ গাল জুড়ে কালো মেচেতা। মনে হত যেন মুখোশ পরে আছে।

অ্যাতোদিন তাকিয়ে থাকলেও কোনোদিন শ্রীরূপার উদ্দ্যেশ্যে কখনো হাল্কা করেও হাসেনি লোকটা। ততদিনে শ্রীরূপা লোকটাকে সাড়া দিতে শুরু করেছে। যেমন শুধু বুকের বোতাম খোলা নাইটি পরে জানালায় এসে জানালার পর্দার কুচি গুছিয়েছে। কখনো শুধু ব্রা পরে তোয়ালে জড়িয়ে এসে চকিতে তোয়ালে খুলে আবার গায়ে জড়িয়ে জানালার শার্সি টেনে দিয়েছে। কখনো জানালার দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আঙুলে ক্রিম নিয়ে সারা কলজেয় ঘসে ঘসে মেখেছে। তখন লোকটির চোখের মণি আর নড়তই না। তখন লোকটাকে দেখলে একটা স্টাফ করা শীলমাছের মতো মনে হত।

প্রতি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে লোকটার জানালা বন্ধ থাকত। রুটিন মাফিক সেক্স সেরে সুবাহু যখন মুখ ঘুরিয়ে অকাতরে ঘুমোতো, তখন লোকটার জানালার কাচের ওপারে আলো জ্বলে উঠত। কীকারণে যেন শ্রীরূপার তখন নির্ভার লাগত নিজেকে। বাথরুমে ঘুরে এসে আবার তাকিয়ে থাকত ওই আলোটার দিকে, যতক্ষণ না সেটা নিভে অন্ধকারে ডুবে যেত।

কলেজে দীপেশরা দুটি কাজ করত। মুভমেন্ট আর প্রোটেস্ট। মুভমেন্ট যেমন প্রিন্সিপালের বিরুদ্ধে হাতে প্ল্যাকার্ড-পোস্টার নিয়ে দল বেঁধে বারান্দা বারান্দা ঘুরে ঘুরে হাঁটা বা ক্লাস শুরুর আগে ক্লাসঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে কীসব বলা। আর প্রোটেস্ট ছিল কলেজের রাস্তায় প্রকাণ্ড মানুষের পাপোশের মতো বসে পড়া বা কলেজ চত্বরে বা রাস্তায় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি বা কালো বা সবুজ রঙের প্রিজনভ্যানের দরজা থেকে হাত-পা ছুড়ে কীসব বলা। শ্রীরূপা টিভিতে এমন মুভমেন্ট বা প্রোটেস্ট দেখেছে। বিদেশের মুভমেন্ট বা প্রোটেস্টগুলিতে যেমন নারী-পুরুষের হাতে প্ল্যাকার্ড-পোস্টারে ইংরেজিতে লেখা থাকে ‘উই আর এগেইনস্ট অফ রুল’ বা ‘উই আর এগেইনস্ট অফ গান’ বা ‘উই আর এগেইনস্ট অফ ওয়ার’ এমন। আর মুভমেন্টে থাকে একটা বড় চত্বর ঘিরে হাতে ছোট ছোট চারাগাছ নিয়ে হেঁটে যাওয়া বা বিশাল একটা শান বাঁধান জায়গায় হাজারে হাজারে মোম জ্বালানো। মোমের আলোয় ওদের থমথমে মুখগুলো দেখা যায়। মাংসল. পুরুষ্টু মুখ। আর এখানকার প্রোটেস্টে বাস জ্বলছে। টায়ার পুড়ছে। নারী-পুরুষ নয়, কেবল লোকজন দৌড়ে পালাচ্ছে। পেছনে নেকড়ে পালের মতো পুলিস। কিছু অংশ বাদ দিলে সবাই হাড় জিড়জড়ে লোক। চোখের নীচে কালি। প্ল্যাকার্ড-পোস্টারে লেখা ‘জবাব দাও, জবাব দাও’ বা ‘চলছে না/চলবে না’ এইসব। এইসবের মধ্যে একদিন একটা দৃশ্য দেখেই খুব ভাল লেগেছিল শ্রীরূপার। কুয়াশায় মোড়া কোনো একটা রাজপথ দিয়ে সারি সারি সাজোয়া গাড়ির মতো সব ট্রাক্টার কোথেকে আসছে। যারা চালাচ্ছে, তারা সবল সব মানুষ। তাদের ট্রাক্টারের গায়ে, মুখের আগে পোস্টারে লেখা ‘ফার্মার্স আর দ্য স্পাইন অফ কান্ট্রি’। কুয়াশার মধ্যে দিয়ে সাজোয়া গাড়ির মতো ট্রাক্টারগুলি আসছে হাওয়া ভেদ করে। কারন যারা ট্রাক্টার চালাচ্ছে, তাদের জামাকাপড় দেহের সঙ্গে সেঁটে উল্টোদিকে উড়ছে।

পরের সপ্তাহে কার্ড দিয়ে পে করার সময় ক্যাসটেবিলের মেয়েটি বলল ‘ম্যাম, আপনাকে একটা জিনিস দিতে পারি?’ স্নিগ্ধ আলো জ্বলা ছাদের নীচে তখন দু’পাশে আয়নার সামনে মুখে ময়াম মাখা অসংখ্য মানুষ চোখ বুজে মাথা হেলিয়ে বসে আছে। যেন অদ্ভুত একটা জাদুঘর। বিউটিশিয়ান মেয়েগুলি সব যেন পায়ে চাকা লাগান হাত-পা নাড়ানো একরকম পুতুল। শ্রীরূপা একটু অবাক হয়ে বলল ‘কী বলতো?’

মেয়েটির টেবিলের পাশেই রাখা ওর হাতব্যাগ। মেয়েটি সেই হাতব্যাগ থেকে খুব সলজ্জভাবে একটা চওড়া খাম বের করে আনল। খামের রঙ খয়েরি/মেরুন। মেয়েটি খামটা শ্রীরূপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল ‘ম্যাম, নেক্সট টুয়েন্টি এইটথ-তে আমার বিয়ে। তেমন কিছু নয়, পিঙ্ক টাওয়ারের সেকেন্ড ফ্লোরে জাস্ট একটা ইভনিং রিসেপশান। আপনি যদি আসেন আমার খুব ভাল লাগবে। কিছু মনে করবেন না ম্যাম, আপনাকে আমার দিদির মতো লাগে।‘

মেয়েটি মুখ নীচু করে টেবিলের দিকে তাকিয়েছিল। শ্রীরূপার গলার মধ্যে একতাল বাস্প যেন কোথেকে উড়ে এসে আলজিভে আটকে গেছে। শ্রীরূপা আর ওই মেয়েটির মধ্যে টেবিলের কাচ। মেয়েটিকে ছুঁতে গেলে শ্রীরূপাকে কাচ ডিঙিয়ে হাত বাড়িয়ে ছুঁতে হবে। কণ্ঠার কাছে যে-দুটো গলার রগ চোয়ালের নীচে গিয়ে মিলিয়ে যায়, শ্রীরূপার সেই রগদুটো খাড়া হয়ে উঠেছে। নিজেকে খানিকক্ষণ সামলে নিয়ে শ্রীরূপা বলল ‘আমি অবশ্যই আসব।‘

বাইরে পেস্ট করা হলুদের মতো রোদ। অবশ্য বাস্তবিক তা নাও হতে পারে। হয়তো শ্রীরূপারই খালি এমনটা মনে হচ্ছে। প্রতিটি জিনিসকে তো প্রতিটি মানুষ আলাদা আলাদা ভাবে দেখে। আবিষ্কার করে। যেমন যে দীপেশকে শ্রীরূপা কোনোদিন ভালবাসতে পারেনি, উল্টে ওকে উদভ্রান্ত, উদ্দ্যেশ্যহীন বা খানিকটা ভালগারই মনে হয়েছে- সেই দীপেশের সাথেই শ্রীরূপাদের মধ্যে সবচেয়ে স্কলার মেয়েটা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করল।

পিঙ্ক টাওয়ারটা কোথায়, সেটা শ্রীরূপা জানে। শপারস সিটি নামের শপিং মলটা পার হয়ে গিয়েও বন্ধ অনিমা টকিজ সিনেমা হলের পাশে। ও-দিকটার চারপাশে ভরপুর শহর। বিত্তের লাস্য। বড় বড় সব আলো জ্বলা বিলবোর্ড। তার-ই একটাতে দেখা যায় একটা উট গলা উঁচু করে মিনারেল ওয়াটার খাচ্ছে। এই উট দিয়ে কী বোঝানো হয়? মানুষ আসলে উটের মতো না উটরাই আসলে একদিন মানুষের দখল নেবে? দীপেশকে বললে ও চটপট ওর পার্টির আইডোলজি দিয়ে আর রাজ্যের ইতিহাসের রেফারেন্স মিশিয়ে এমন একটা ব্যাখ্যা দিত যে, শ্রীরূপার কাছে সেটা মনে হত একতাল জগাখিচুড়ি। অবশ্য এটাও হয়তো শুধু শ্রীরূপারই মনে হত। কারো কাছে হয়তো মনে হত ‘চমৎকার’। ‘ঘরেবাইরে’-তে বিমলার যেমন সন্দীপের কথাকে মনে হয়েছিল।

শ্রীরূপা আজও সেই ঘুরপথ দিয়ে ফিরছে। এখন হাতে আরো বেশি না-ভাঙান সময়। কারণ সবাহু কাজের সূত্রে দু’দিনের জন্য দিল্লি গেছে। আজ নির্দিষ্ট কফিশপটাতে গিয়ে ড্রাইভার লোকটিকে প্রায় আদেশ করেই কফি আর টোস্ট খাইয়েছে শ্রীরূপা। শ্রীরূপা যে টেবিলে বসেছিল, তার থেকে অনেকদূরের একটা টেবিলে বসে টোস্ট আর কফি খাচ্ছিল ড্রাইভার লোকটি। টোস্টে মাখন থাকায় লোকটি যখন তা খাচ্ছিল, লোকটির কালো ঠোঁটদুটিতে আলো পড়ে বড় দুটো জোঁকের মতো চকচক করছিল। এই ঠোঁটদুটোর ভেতরেই আছে লোকটার মুখের ভীষণ দুর্গন্ধটা। আর সেটা নিয়েই লোকটা সংসার করে। শ্রীরূপার মতোই দেহে এবং অংশত মনে একটি নারী লোকটির সঙ্গে থাকে। লোকটির সব চাহিদা সহ্য করে, মেটায়। হয়তো ভালোওবাসে। সিপ করে করে কফি খেতে খেতে লোকটাকে দেখছিল শ্রীরূপা। শ্রীরূপা ভাবল এই লোকটিই যদি কোনোদিন বিলবোর্ডের সেই তৃষ্ণার্ত উট হয়ে যায়?

পার্কের কাছাকাছি পৌঁছে শ্রীরূপা দেখল পার্কের আলোগুলি আজ জ্বলে উঠেছে। স্থির মোমশিখার মতো সব আলো। অদ্ভুত রহস্যময় মায়াময়তা ছড়িয়ে পড়েছে পার্কটায়। মজা ডোবাটার মধ্যে সেই মাথা উঁচিয়ে থাকা আধ ডোবা সিমেন্টের নৌকোটা। এমন মনে হচ্ছে নৌকোটা যেন এবার কিছু কথা বলে উঠবে বা ফড়ফড় করে খোলস ছিঁড়ে ফেলে অন্য কোনো আদল নিয়ে, চেহারা নিয়ে উঠে দাঁড়াবে। প্রবীণদের জন্য বসার জায়গাটায় পক্ককেশ সব লোকের ভিড়। ঢলঢলে শর্টস পরা, পায়ে ওয়াকিং শ্যু পরা কেউ কেউ বসে, ঝুঁকে পড়ে মোজা নামিয়ে হালকা হচ্ছে। এঁরা পৃথিবীর আরেক সময়ের মানুষ। যখন শপিংমলের বদলে ধানখেত ছিল। পার্লারের বদলে জংগল ছিল। বিলবোর্ডের বদলে ভূতুড়ে জোনাকি ছিল। টিবি, ম্যালেরিয়া, কলেরা ছিল। চ্যাপ্টা পাথরের মতো মানুষের পেট ছিল। টিপটিপে বর্ষাকাল আর জল-কাদা মাখা দেশ-বিদেশ ছিল। সেই সময়ের মানুষজন এঁরা। ডাঃ বি সি রায়, নেহেরু, খাদ্য আন্দোলন, আকাশবাণীর সময়ের।

ড্রাইভার লোকটাকে ‘একটু থাম তো’ বলে গাড়ি থেকে নেমে পায়ে পায়ে পার্কটার ভেতরে চলে গেল শ্রীরূপা। চারপাশে পীতান্ধকার সব গাছ। ছাতিম দেবদারু পান্থপাদপ এইসব গাছ। মাটি থেকে মাথা তোলা লম্বা লম্বা দোল-খাওয়া ঘাস। বিয়ের টোপরের মতো ফার্ন। একটা ভাঙা ভাঙা সিমেন্টের বেঞ্চের ওপরে বসল শ্রীরূপা। চারপাশে পরস্পর ঘন হয়ে থাকা অনেক ছায়ামূর্তি। সবাই ঝোপজংগলের মধ্যে বসে আছে এদের মাঝখানে শ্রীরূপাই যেন মিশরীয় সম্রাজ্ঞীর মতো উঁচু আসনে একা। তার দামি পিছল শাড়ির আড়লে দামি মধ্যযৌবনা শরীর। বিরাট একটা বহুতল যেন। অনেক ফ্লোর, সিঁড়ি, লিফট বা গেটের সামনে উর্দি পরা দারোয়ান। হঠাৎ হঠাৎ-ই খুব কান্না পেল শ্রীরূপার। না, ঠিক কান্নাও হয়তো নয়- বরং বলা যায় একটা আকাশ-ফাটানো চিৎকার। ওই যে ‘উই আর এগেইনস্ট অফ রুল’ বা ‘উই আর এগেইনস্ট অফ গান’ বা ‘উই আর এগেইনস্ট অফ ওয়ার’ লেখা প্ল্যাকার্ড-পোস্টার নিয়ে গলা অবধি গরম সোয়েটার পরা যেসব নারী-পুরুষেরা সমস্বরে চিৎকার করে- তেমন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন