মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

শিমুল মাহমুদ : আমার মেয়ের নাম ছিল প্রজ্ঞা


গত রাতের পবিত্র স্বপ্নটা রাকা-র মাথাটিকে আরেক বার অবশ করে ফেললো। কার্পেটে পা আটকে যাচ্ছে। বিছানাটা যেন-বা আরও খানিকটা দূরে সরে গেলো। নাভির নিচটায় ঠান্ডা এক ধরনের শিরশিরে আনন্দ। মনের ভেতর পবিত্র স্বপ্নটার একটা সরল অর্থ তৈরি হতে শুরু হয়েছে। টেলিফোন বেজে উঠতেই রাকা বিরক্ত হলো। স্বপ্নের অর্থ পরিষ্কার হয় না। বিরক্তি চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছে যাবার পর রিসিভার তুললো রাকা।
মাথাটা এবারে সত্যি সত্যি অবশ হতে হতে ফাঁকা হয়ে এলো। কোন উত্তর দিতে পারলো না রাকা। টেলিফোনের নরম কণ্ঠস্বর অনেক সময় ধরে বাজতে থাকে কানের ভেতর। হাত থেকে রিসিভার পড়ে গেলো।

জানালার পর্দায় আকাশভরা রোদ জমেছে। কণ্ঠস্বরটা চেনাচেনা লাগছে। তবুও ভয়টা দূর হচ্ছে না। সন্ধ্যা অবধি রাকা শুয়ে থাকলো। তারপর জানালায় সন্ধ্যার পর্দাটা সরিয়ে দিতেই আকাশভরা রোদের দৃশ্যটা মনের ভেতর চলে এলো। সাথে সাথে টেলিফোনে ভেসে আসা কচি কণ্ঠস্বরটা যেন-বা মাথার মধ্যে বাজতে শুরু করে,

‘মা মনি তুমি আমাকে চিনতে পারছো না কেন?’

পরমুহূর্তেই মনে হলো, না কথাগুলি এরকম ছিলো না,

‘আম্মু আমি রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি।’

কেমন অস্বস্তি বোধে কাঁপছে রাকা। আসলে কথাগুলো এরকমও ছিল না। আরেকটু দূরে তাকালো রাকা। সূর্যটা ডুবতে কতো সময় লাগবে? আরও খানিকটা পর সূর্য ডুবে যাবার মুহূর্তে রাকা গতরাতের পবিত্র স্বপ্নটার সাথে টেলিফোনে ভেসে আসা কণ্ঠস্বরের একটা যোগসূত্র খুঁজে পেলো। ঘৃণায় আৎকে উঠলো রাকা। নাভির নিচে ঠান্ডা শিরশিরে আনন্দটা খোঁচাচ্ছে।

ঘটনার নবম দিনে প্যাথলজি রিপোর্ট দেখার পর রাকা বুঝতে পারলো স্বপ্নটা কী ভয়ানক রকম কুৎসিত ছিল। অথচ তখন রাকার জরায়ুর ভেতর ভ্রণকন্যা ‘প্রজ্ঞা’ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। সে যেন-বা দেখতে অবিকল ওর মা রাকার মতো। আর এমন একটা স্বপ্নতরঙ্গ জরায়ুর গভীরে কম্পন তুলতেই রাকার নাভিমূলে ঠান্ডা শিরশিরে আনন্দটা খোঁচাতে থাকে।

জরায়ুতে প্রজ্ঞার বয়স যখন পঁয়ষট্টি দিন তখন প্রজ্ঞার বাবা ওর মা-র তলপেটে বেশ কিছু সময় ধরে টিপে টিপে প্রজ্ঞাকে যেন-বা স্পর্শ করার চেষ্টা করলো। প্রজ্ঞা বেশ শান্তি পাচ্ছে। ঘুমের অভিজ্ঞতা প্রজ্ঞার রক্তে পৃথক কোন অর্থ সৃষ্টি করতে না পারলেও গভীর ঘুমের মধ্যে যেমন একটা চিকন উষ্ণ সংগীতের চাপা সুর বিরাজ করে; প্রজ্ঞার রক্তেও যেন সেরকম কিছু একটা নেচে যাচ্ছে।

আর ওর বাবার কণ্ঠস্বরে যখন ওর মা শুনতে পেল, ‘ওটাকে নষ্ট করে ফেলো’, তখন মামনির চোখজোড়া মুহূর্তেই ঝিকমিকিয়ে উঠলো। স্বামীকে ঝাঁপটে ধরে চুমু খাবার পর বুকজোড়া স্বামীর ঠোঁটে ঠেসে ধরে ফিসফিসিয়ে বলতে থাকলো, ‘এ দুটো শুধু তোমার জন্যই’। আর যখন বুঝতে পারলো বাচ্চাটার যদি জন্ম হয় তাহলে ওর বুক দুটো ফুলে ফেঁপে সাদাটে বিশ্রি রসে বিশ্রি গন্ধে গা ঘামঘাম ঘিনঘিনে অনুভূতি। উফ্ অসম্ভব। রিয়া আপারা তো চার মাস এক বিছানায় ঘুমাতে পারেনি। শেষটায় কী বাজে অবস্থা।

রিয়ার স্বামীটা ভদ্রলোক। তারপরও রিয়ার মা হওয়াটা মেনে নিতে পারেনি। সিজার করার পরেও বাচ্চাটা বাঁচলো না। আচ্ছা রিয়া আপা যখন পাঁচহাতি পেটটা নিয়ে হেঁটে বেড়াতো; কী বিশ্রী অবস্থা। অথচ রিয়া আপা সব সময় আদুরে আদুরে গলায় ঘরভর্তি বাচ্চাদের ছবির দিকে তাকিয়ে ঘর গুছিয়ে সাজিয়ে স্বামীর অপেক্ষায় কষ্ট হলেও আধশোয়া অবস্থায় বসে থাকতো।

ওর স্বামীটা ভদ্রলোক। কিন্তু বেচারা এই আট বৎসরে বদলে গেছে অনেক। তারপর এ যাবৎ ওদের কোনো সন্তান হয়নি। সব দোষ এখন রিয়া আপার। দুলাভাইটা আজকাল মাঝে মাঝেই আর বাসায় ফিরে না। এতদিন পর ডাক্তার পরিষ্কারজানিয়ে দিলেন বাচ্চা কাচ্চা হওয়ার আর কোনও সম্ভাবনা নেই।

রাকার কনসেপ্ট করার সংবাদে রিয়া পুরো বিকেলটাই কাঁদলো। রাকা কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না আপাকে তাদের সিদ্ধান্তটা জানানো ঠিক হবে কিনা। সন্ধ্যায় সূর্য ডোবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে রাকা বলে ফেললো,

‘আপা আমরা বাচ্চাটা রাখবো না’।

রিয়া প্রথমে কিছুই বুঝতে না পেরে যেন-বা ফুঁপিয়ে উঠলো। পরমুহূর্তেই ঝট করে কান্না থামিয়ে চট করে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো রাকার গালে। তারপর সোজা দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেলো। এবং ঠিক তিন মুহূর্ত পরই টেলিফোন সেটটা বেজে উঠলো। রাকা স্বপ্নে পাওয়া বালিকার মতো খুব আস্তে করে রিসিভার কানে স্পর্শ করতেই শুনতে পেলো,

‘মামনি আমার খুব ভয় পাচ্ছে’।

রাকা কেঁপে উঠলো। চিৎকার করতে গিয়ে পারলো না। শুধু দীর্ঘদেহী কালো লম্বা নাকসহ রোকেয়া নার্সকে বলতে শুনলো,

‘আপনি পাশের রুমে বসুন’।

রাকার স্বামী একবার রাকার দিকে তাকালো। মৃদু কণ্ঠে বলতে থাকে,

ভয় নেই, দু’মিনিটের ব্যাপার; তোমার ইচ্ছে মতোই ক্লিনিকে যাচ্ছি না

আমরা; নিজেদের ঘরই চমৎকার।

আরও যেন কী বলছিল; রাকা এক বার নিজের স্বামীকে স্পর্শ করতে চাইলো; কিন্তু ততক্ষণে সে পাশের রুমে ফিরে গেছে।

খুব আস্তে করে রাকার দেহে ভয় নেমে এলো। রাকা যেন-বা নীল হয়ে যাচ্ছে। ওর স্বামীকে ডাকলো। অথচ ওর গলা থেকে জটিল আর গভীর একটা গোঙানি ভেসে এলো। বেশ কিছুক্ষণ পর ‘মাগো’ শব্দটা অনেক গভীর থেকে চাপ চাপ রক্তের মতো ওর গলা দিয়ে বেরিয়ে এলো।

রাকা জ্ঞান হারাচ্ছে। জ্ঞানের গভীরে প্রজ্ঞাকে কোলে তুলে নিলো। চেপে ধরে আদর করছে। রাকা কাঁদছে কেন! বুঝতে পারছে না। তবে এতটুকু বুঝতে পারলো এখন থেকে পঞ্চান্ন দিন আগে সে শেষ বারের মতো যে পবিত্র স্বপ্নটা দেখেছিল আবার সেটা দেখতে শুরু করেছে। কিন্তু এবারে যেন স্বপ্নটা শেষ
হতে চাইছে না।

প্রজ্ঞা শান্ত চোখে ছোট ছোট পায়ে এগিয়ে আসছে রিয়ার দিকে। নীল মায়াবী চোখ। কোঁকড়া চুল। পাউডার পাউডার গালদুটো তুলোর মতো মসৃণ। সাদা আলোর সাথে যেন হালকা লাল আভা ছড়াচ্ছে ওর সমস্ত মসৃণ ত্বক ঘিরে। কেমন যেন অনেক পরিচিত মায়া জড়ানো ওর গভীর করুণ হাসি।


প্রজ্ঞা কি ভয় পাচ্ছে? জরায়ুতে নাড়ি ছেঁড়ার মোচড় খাওয়া ধারালো টান টান ব্যথা। আর ব্যথার গভীরে যেন এক ঝটকায় বিস্ফোরণ ঘটলো। চিৎকার করতে পারছে না রাকা অথচ এতো তাজা রক্ত হঠাৎ কোত্থেকে এলো! প্রজ্ঞার পা ডুবে যাচ্ছে রক্তে। পিছলে যাচ্ছে। হাঁটতে পারছে না। বুক অবধি ডুবে যেতে যেতে হঠাৎই যেন-বা আস্তে করে প্রজ্ঞার লাল ঠোঁট মিশে গেলো লাল গভীর রক্তে। হাত উঁচু করে ভেসে উঠতে চাচ্ছে প্রজ্ঞা। বার কয়েক কেঁপে উঠলো ওর কচি সাদা আঙুল। তারপর ঠিক তিন মুহূর্ত পর রাকা জবাই করা বাছুরের মতো ফ্যাঁসফ্যাসে অথচ ভারি ধারালো চিৎকারে নড়ে উঠতেই স্বপ্নটা দ্রুত পাল্টে
গেলো।

ওদের গাড়ির চাকায় একটা লাল কুকুরছানা থেতলে গেছে। একেবারে রক্ত মাংসে কালো পিচ জুড়ে ছড়িয়ে গিয়ে থেতলে যাওয়া মাংসের টুকরাগুলো রক্তের সাথে ফোটায় ফোটায় কাঁপছে। ড্রাইভার ব্রেক করতেই গলগল করে বমি করে দিলো রাকা। বমিতে সমস্ত বুক, কোল, কোল থেকে জরায়ু ভিজে যেতেই ঠান্ডা বোঁটকা গন্ধে রাকার যেন জ্ঞান ফিরে এলো। স্বপ্নটা হারিয়ে যাচ্ছে। মাথাটা সম্পূর্ণ ফাঁকা হতে হতে অবশ হয়ে এলো। কিছুই মনে করতে পারছে না রাকা। অনেক অনেক দূর থেকে আর অনেক দিন আগের কোন এক সময় থেকে ওর স্বামী ওকে ডাকছে। ফাঁকা হয়ে আসা মাথাটা যেন-বা ওর স্বামীর কোলে ঝাঁকি খাচ্ছে। রাকা বুঝতে পারলো না ওর স্বামী এমন করছে কেন। রাকার চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো।

Abortion-এর পর ঠিক ছয় ঘণ্টা সাতান্ন মিনিটের মাথায় প্রজ্ঞার রক্তের ভেতর প্রজ্ঞার মা-র মৃত্যু হলো।

প্রজ্ঞার মা-র মৃত্যু হলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন