মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

খায়রুল আনাম'এর গল্প: চা খাবেন?




‘কি সাহেব, হবে নাকি আর এক কাপ?’

‘গপ্পো যদি শোনান, তাহলে আরো এক কাপ চলতে পারে’।  
‘তাই? তাহলে শুনুন। আমার এক পোপেচার বন্ধু আছেন, অধ্যাপক সাহেব। তাঁকে আমি বন্ধুই বলি। কিন্তু তিনি আমাকে দেখিয়ে, হোরে-নোরে-শংকরে সবাইকে বলে বেড়ান, ‘ইনি আমার বড় ভাই’। ফর্মুলাটাকে ঠিক মেলাতে পারি না। যাই হোক, আমাদের এই ভাই-বন্ধু বা বন্ধু-ভাই সম্পর্কটা এতদিনে বেশ একটা স্টেবল পজিশানে গিয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রায়ই আমাদের ফোনালাপ, দেখা সাক্ষাৎ, কথাবার্তা হয়। বিশেষ করে শুক্রবার জুম্মার নামাজের জামায়াতে। মসজিদের লাগোয়া না হলেও আমাদের বাড়ি সেখান থেকে মাত্র তিন মিনিটের ড্রাইভ। তাই আমাদের বাঙ্গালী ট্রাডিশনটা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করি। জুম্মার নামাজের পর বাড়ি ফেরার পথে ওনাকে আমাদের বাড়ি হয়ে এক কাপ চা খেয়ে যাবার জন্য একটা পার্মানেন্ট স্ট্যান্ডিং অনুরোধ দিয়ে রাখি। উনিও উপরোধে ঢেঁকি গেলার মতো নামাজের পরে আমাদের বাড়িতে আসেন। আসার পথে মসজিদেই বিক্রী হওয়া কোন একটা স্ন্যাক নিয়ে আসেন, সিঙ্গাড়া অথবা প্যাটিস।

এত উৎসাহ, মমতা নিয়ে যে লোকটা বাড়িতে আসে, তাকে আপ্যায়ন করতে এক মিনিট কালও বিলম্ব করা কি উচিৎ? বিশেষ করে ‘বড়ভাই’ এর মাখনের প্রলেপটা যখন আমার চামড়ার উপর লাগিয়ে দিয়েছে। তাই ঘরে ঢুকেই ওনার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলি, ‘রহমান সাহেব, আজকে কোন চা-টা খাবেন ?”

‘আরে দিন না। কোন একটা হলেই হলো’।

‘তা বললে কি হয় নাকি? কোনটা আজকে পচ্ছন্দ, ঠিক করে ভেবে বলুন। আচ্ছা, আমি এক এক করে নাম বলে যাচ্ছি। কোন কোম্পানী ও তার কোন ব্র্যান্ড? টী ব্যাগ না লুজ টী? দুধ সমেত না শুধু রঙ চা? চিনি চাই, না চিনি ছাড়া? সাদা চিনি না ব্রাউন সুগার? না কি স্প্লেনডা, ইকুয়্যাল, বা সুইট এন্ড লো? আজকাল ট্রুভিয়া, স্টেভিয়া এসবও বের হয়েছে, র’ এবং রিফাইন্ড দু’ধরণেরই। বাড়িতে মধুও আছে, আগাভে ন্যাচারাল সুয়েটেনারও আছে। কোনটা নেবেন? তাছাড়া দুধ নিলে, দুধও আছে। তা কি প্রকারের দুধ নেবেন? হোল মিল্ক আছে, ২% মিল্ক ফ্যাট ওয়ালা দুধ আছে, ফ্যাট-ফ্রিও আছে। আবার হাফ এন্ড হাফও আছে। আমার আত্মীয়দের মধ্যে বিচিত্র রকমের সব দুগ্ধপায়ী আছে। একজন ২% এভাপোরেটেড মিল্ক ব্যবহার করে, অন্যজন করে ফ্যাট-ফ্রি। একজন দুধ একেবারেই ব্যবহার না করে র’টি বা রঙ চা খায়। অন্যজনের আবার সুইটেন্ড কন্ডেনস্‌ড মিল্ক ছাড়া চলে না। একজন তো ওসব পাট চুকিয়ে দিয়ে কেবল মাত্র কফিমেট ব্যবহার করে। ওটাই নাকি লেটেস্ট স্টাইল।

এটা নেই, ওটা নেই বলে বদনাম হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি বাড়িতে সব গুলোই রাখি। কোন ফুলে কোন দেবতা সন্তুষ্ট হয় আগে থেকে তো বলা যায় না। তবে আমি নিজে ক্যানের মধ্যের ‘এভাপোরেটেড মিল্ক’ ব্যবহার করি। ভ্যারাইটি আমারও পচ্ছন্দ, এই অজুহাত দিয়ে কোনদিন রেগুলার, কোনদিন ২%, কোনদিন নন-ফ্যাট দুধ দিয়ে চালাই। এ লাইনে দু’তিনটে কোম্পানী আছে। তবে ‘কারনেশান’ ব্র্যান্ডটা আমার ফেভারিট। এগুলো এক এক সময়, এক একটা পরিমাণ নিয়ে চা’তে মেশাই। আচ্ছা, আমার কথা ছাড়ুন। এখন বলুন, আপনার কোনটা লাগবে এবং তার সঙ্গে কি কি চাই?”

‘কি মুস্কিল! আরে সাহেব, বললাম তো একটা হলেই হলো’।

‘আবার সেই একই কথা বার বার বললে চলবে? অন্তত ব্ল্যাক টী না গ্রীন টী সেটা তো বলতে হবে। শুনুন, শুধু ব্ল্যাক টীই আমার অনেক কোম্পানীর আছে। লিপটন, ব্রুকবন্ড, তাজমহল, ওয়াঘ বাকরী, কাজী ব্রাদার্স, আর্ল গ্রে, বিগেলো, টেটলি, টোয়াইনিং, তাজো, হাইসন, ফারলিভস, গেশয়েন্ডনার, মারিয়েজ ফ্রেরেস - এসব কোম্পানীর দার্জিলিং, আসাম, সিলেট, শ্রীলংকা, ইয়োগী, লিচি, রুইবস, ও’সুলিভান, ইন্ডিয়ান চায়, কাভা ইত্যাদি হাজার রকমের অ্যারোমা, ফ্লেভার ও টেস্টের চা আছে। কোনটা লাগবে? নাকি ব্ল্যাকটীর বদলে গ্রীন টী খাবেন? আজকাল বিগেলো, লিপটন, ব্রুকবন্ড, টেটলীর মতো বেশিরভাগ কোম্পানীই গ্রীন টী বানায়। এদের অনেকেই আবার, ব্ল্যাক-টী, গ্রীন-টী ছাড়া হোয়াইট টীও বানায়। হোয়াইট টীতেও নাকি দেদার গুণ’।

‘তাহলে ভাই, আপনি এক কাজ করুন। আমাকে বেশ লম্বা একটা কাপে ‘বিগেলো’ কোম্পানীর গ্রীনটীই দিন, দুধ চিনি ছাড়া। ওর মধ্যে লেবুর, মানে লেমন-লাইমের যে ছিটে ফোঁটা নির্য্যাস ও ফ্লেভার দেওয়া থাকে, তাতেই বেশ মজা পাওয়া যায়। আর কিছু লাগে না। গ্রীন টী’র কিন্তু অনেক গুণ, জানেন বোধ হয়’।

‘হ্যাঁ জানি। তা আপনি হঠাৎ গ্রীন টীর দিকে ঝুঁকলেন কেন? চিনিও না, এমন কি দুধ না? আপনি কি আসলে চা খাবেন না ওষুধ খাবেন”?

‘আরে স্যার, চায়ের আসল রহস্যটা আপনি জানেন না দেখছি। এই যে ব্ল্যাক টী, ফ্ল্যাক টী করছেন, চায়ের আদিতেই তো ছিল গ্রীন টী, যেটা চাইনীজরা আবিষ্কার করেছিল। তার অনেক, অনেক দিন পরে ব্রিটিশরা এর সন্ধান পায়, বিশেষ করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। তারাই একসময় এটা ভারতে নিয়ে যায়, বিভিন্ন পাহাড়ী, ঘন বৃষ্টিপাতওয়ালা এলাকায় চাষ করা শুরু করে এবং এই ব্যবসায় দারুণ লাভ করে’।

‘বলেন কি? কি রকম?’ 
 
‘শুনুন, পৃথিবীতে যত পানীয় আছে তাদের মধ্যে ব্যবহারের দিক থেকে চায়ের অবস্থান দাঁড়িয়েছে এখন দ্বিতীয়। স্বাস্থ্যের দিক থেকে চায়ের গুরুত্ব অপরিসীম। আজকাল সেলেব্রিটিদের দিয়ে তো নানা ধরনের চা ও তাদের উপকারিতার কথা বলে বিজ্ঞাপনে ভরিয়ে রাখছে, যার মধ্যে প্রধান হচ্ছে শরীরের ওজন, হার্ট ডিজিজ ও ব্লাড প্রেশার কমানো। কোন কোন খাবার প্রস্তুতকারক কোম্পানী গ্রীন টী ওয়াফল, আর্ল গ্রে জিলাটো ইত্যাদিও বানাচ্ছে। টিভি সেলেব্রিটি ‘ওপরা উইনফ্রে’ তো ‘ওপরা চায়ে টি লাটে’ নামে একধরণের চায়ের মিশ্রণ ‘স্টারবাক্‌স’ কফি চেন-এর মাধ্যমে বিক্রী করছে। জানেন, একসময় চা শুধু একটা পানীয়ই ছিল না। ওষুধ, মুদ্রা ও বাণিজ্যের নানা স্তরেও তা ব্যবহৃত হতো। 
 
আরও শুনুন, চায়ের উৎপত্তি নিয়ে একটা মজার গল্প আছে। ‘আরলিং হো’ ও ‘ভিক্টর মায়ার’-এর গবেষণা অনুযায়ী, সেটা শুরু হয়েছিল প্রায় ৪০০০ বছর আগে, প্রাচীন চীনে। বিশ্বাস করা না গেলেও এবং বাস্তবে প্রমাণিত না হলেও, ঘটনাটি নাকি সত্যি। একদিন চেন ন্যাং নামে এক ব্যক্তি এক গাছের তলায় বসে খাবার জলটা ঈষৎ গরম করে নিচ্ছিলেন। ঐ সময় গাছ থেকে একটি পাতা ঝরে ঐ জলের পাত্রের মধ্যে পড়ে। কৌতুহল বশে, পাতাটা না ফেলে, তিনি পাতার নির্য্যাস ওয়ালা সেই গরম জল পান করেন। উষ্ণ জলের পরিবর্তিত স্বাদটি তাঁর বেশ পচ্ছন্দ হয়। এভাবেই আবিষ্কৃত হয় চা। তখনও ওটা অবশ্য সবুজ চা-ই ছিল।

ক্রমশ স্বাদওয়ালা এই পানীয়ের ব্যবহার সারা চীন দেশে বেশ জনপ্রিয় হয়ে যায়। তখন চা-কে তারা রপ্তানী ব্যবসায়ের সামগ্রী হিসেবে কাজে লাগাবার চেষ্টা করে। প্রথম দিকে চায়ের ট্রেড করতে চীনারা চা-পাতা বান্ডিল বান্ডিল করে রাশিয়ায় পাঠাতো। কিন্তু সে সময় রাশিয়ানদের চায়ের প্রতি তেমন কোন আকর্ষণ দেখা যায় নি। খ্রীষ্টিয় ১৫০০ সালের দিকে সিল্ক রুট দিয়ে চীন, পারস্য ও ইসলামিক বিশ্বে চা রপ্তানি করার চেষ্টা করা হয়। প্রথমে ফারসিরা মানে ইরানিয়ানরা তো হেসেই খুন। চা যে মানুষ কেন খায় তা ভেবে তারা কোন কূল কিনারা খুঁজে পায় নি। কিন্তু কিছুদিন ব্যবহার করার পর স্বাস্থ্যের দিক থেকে এর উপকারিতা তারা অনুধাবন করে। এভাবেই ইরান এলাকায় চা প্রথম জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। 
 
এসব লক্ষ করে ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী চায়ের ব্যবসায়ে জোরেশোরে নেমে পড়ে। তারা ইন্ডিয়া ও শ্রীলংকার বিভিন্ন অঞ্চলে চা উৎপাদনও শুরু করে এবং এর উপর গবেষণা ও প্রসেসিং করে তারা রঙ এবং উন্নত স্বাদওয়ালা ব্ল্যাক টি বানায়। ঘন দুধ ও চিনি মিশিয়ে তৈরি ব্ল্যাক টী-র ঘ্রাণ যেমন অতীব মনোমুগ্ধকর, তেমন রঙও হয় মনোহর, খেতেও খুব সুস্বাদু। এভাবে এই ব্ল্যাক-টি ভারতীয় উপমহাদেশে ভীষণ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখানে চা বলতে সবাই ব্ল্যাক টী-ই বোঝে। 
 
অবশ্য বিলেত ও পাশ্চাত্তের অন্যান্য দেশে রঙ চা-ই বেশি ব্যবহার করতে দেখা যায়। তুরস্কে ও এশিয়ার অনেক দেশে দুধ না ব্যবহার করে, চা-তে কেবল চিনি মিশিয়ে খাবার পদ্ধতি আছে। আজকাল আবার গ্রীন টি, হোয়াইট টি ছাড়াও বিভিন্ন হারবাল টী বেশ পপুলার হচ্ছে, যে সবের কথা আগেই বলেছি। চা খেয়ে মজা পাবার চেয়ে বরং টনিক হিসেবে একে ব্যবহার করে স্বাস্থ্যের উপকারিতার দিকেই এখন সবার নজর’। 
 
ঠিক আছে ভাই, চা খেতে এসে আজ অনেক জ্ঞানলাভ হলো। তবে আসুন আমরা একটা সমঝোতায় আসি। আপনার এই বড় কাপে র’ ‘বিগেলো গ্রীন টী খেয়ে আমিও দীর্ঘজীবি হই আর ব্ল্যাক টীতে হাফ এন্ড হাফ দুধ আর ফুল দু’চামস চিনি মিশিয়ে খুব মজা করে খেয়ে আপনিও শতায়ু হোন। তারপর প্রায় একই সময়ে আমরা পটল তুললে ওপারে গিয়ে স্বর্গলাভ হবে। অবশ্য দুই কাঁধের দুই ফেরেস্তা আমাদের প্রতিদিনের যে কার্য্যকলাপ নোট করে রাখছে তাতে স্বর্গবাসের বদলে অনন্ত নরকবাস হবে কিনা তার ঠিক কি? 
---------------


লেখক পরিচিতি: খায়রুল আনাম প্রকৌশলী। বাংলাদেশে কর্মজীবনে কর্ণফুলী পেপারস, ইস্টার্ন রিফাইনারি, শিল্পব্যাঙ্কে কাজ করেছেন। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ছ’টি। বর্তমান শিকাগোবাসী।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন