মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

নিরঞ্জন মণ্ডলের গল্প : ইয়াস ও বাদাবনের আখ্যান

আজ সকাল থেকে আকাশটা মেঘলা। দমকা হাওয়ার দাপট। আবার ঝির ঝির করে বৃষ্টি হচ্ছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে নিমাইয়ের বুকটা কেঁপে ওঠে। গতবারের মত এবার আবার আম্ফানের মত ঝড় আবার আসবে না তো? নিমাইয়ের ভাবসাব দেখে ওর বউ বলে ‘চারিদিকি খবর হুয়েছ,গেলবারের মতন ইয়াস না আর এট্টা কি নামের ঝড় আসটেছ। সক্কুলির ফ্লাড সেন্টারে যাতি বুলতেছ।পুবপাড়ার অনেকে গেছে। টিভিতে নাকি খবর দেছে, গোন বেলা গাঙের জল বাড়বে।ঢেউ উঠপে।আমাগতো গাঙের ধারে ভিটে,ভয়ডা তো বেশী। গতবারের ঝড়ে ঘর ভাঙে পুড়েলো।আবার ধার দেনা কুরে ঘরটা আবার খাড়া করা হুয়েছ।একে তো করোনার জন্নি লকডাউন চুলতেছ,আবার সামনের ঘুরনিঝড়, সব দিকিরতে বেপদ ঘনিয়ে আসটেছ’। 

গাঁড়াল নদীর ধারে হরিদাসপুর গ্রামে নিমাইয়ের ছোট বসত বাড়ি। কয়েক বিঘে ধান জমি, সবজির বাগান, আম নারিকেল গাছ নিয়ে ভিটে বাড়ি। নিমাইয়ের বাবার আমলের নৌকা আছে। নিমাই মাঝে মাঝে গোন মুখে গাড়ালের ওপারে ঝিল্রে পীরখালির দিকে মাছ কাঁকড়া ধরতে যায়।আয়লার পর থেকে জমি নোনা হয়ে গিয়ে ভাল ধান হয় না। খোরো চাষে আর আগের মত লঙ্কা সূর্য্যমুখী, তরমুজ়, আর চাষ হয় না। গ্রামে আর কাজ জোটে না। নিমাইয়ের ভাই অশোক তামিলনাড়ুতে গেঞ্জির কারখানায় কাজ করতে গেছে।অশোক নিয়মিত টাকা পাঠাতো। তবে গতবারের লকডাউনে গাড়িঘোড়া সব বন্ধ হয়ে হেটে অনেক কষ্ট করে বাড়ি এসেছিল।করনা কমলে আবার গেছে। নিমাইয়ের বাবার অনেক বয়স, আগের মত আর কাজ করতে পারে না। ওর মার ও শরীর ভাল না। সব সময় অসুখ বিসুখে ভোগে।

নিমাই গাঙভেড়ি দিয়ে পুবপাড়ার রবির দোকানের দিকে যায়।ঝড়ের দাপট বেড়েছে। গাঙে জোয়ার লেগেছে।দোকানে দুচার জন খরিদ্দার আছে।

কয়াল বাড়ির রতন বলে ‘একে তো ভরা কোটা্লের মুখ, তার উপর নিম্নচাপের ঝড়, গোনের জল কতটা বাড়বে?কি যে বিপদ হবে।পুবপাড়ার দিকি বাঁধের অবস্থা ভাল না। পাড়ার ছাইলে গো সিমেন্টের বস্তায় মাটি পুরে রেডি হুয়ে থাকতি বলছি। ওদিকি মনসাখালি খালের মুখি সুয়েজগেটের কাজ শেষ করতি পারি নি।উকেনে বিপদ হতি পারে।নিমাইদা তোমার বাবা মাকে ফ্লাডসেন্টারে পাঠাও।কখন কি হয় বলা যায় না’।

‘ঠিক বুলেছ, বাবা বড়ি ছাইড়ে যাতি চায় না। আমি বাড়ি গে ওগো পাঠাচ্ছি।বাঁধে জল ছাপান ধরলি খড় বিচুলির সব রেডি রাখতি হবে’।রতনের কথায় নিমাই বলে।

দোকানদার বলে ‘গত আম্ফানের চাইয়ে এবার ইয়াস এর আরো জোর বেশী হবে। খবরে বুলেছে।নদীর চরে ম্যানগ্রোভ লাগানো থাকলি বাঁধ অনেকটা রক্ষা পাবে’। নিমাই বলে ‘ঠিক বুলেছ, কাকা, দক্ষিন দিকি চর ঘিরে পাটির দাদারা ফিশারি কুরেছ।এ সবের প্রতিবাদ করলি বিপদ আছে।মাঝে মঝে চরে বাইন, গরান গাছ লাগানো হচ্ছে।তবে ছাগল নাইমে সব খাইয়ে ফেলতেছ’।

রতন সবাইকে গাঙে জোয়ার বাড়লি, বাঁধের দিকি এগিয়ে আসতে বলে।ঝড় আস্তে আস্তে বাড়ছে।নিমাই পাড়ার ছেলেদের সাথে বাবা মাকে ফ্লাড সেন্টারে পাঠায়। 

যাবার সময় নিমাইয়ের বাবা বলে ‘পেরতেক বছর এরামঅত্রাযোগে ঝড়,ঝামটা নোনা জলের বুড়িবন্যে মানষি আর কত সহ্য করবে।আমাগ নোনাদেশের লোকেরা আর কত দুরদশা সহ্য করবে?গাঙের বাঁধবন্দীর অবস্থা তো ভাল না। এই পুরনেমের কোটালে, ঝড় বাইড়ে গিলি তুফনের ধাক্কায় গাঙভেড়ি আর আস্ত থাকপে? গেরামের ছাইলেগো বলি, বাঁশ তক্তা, খড়, ত্রিপল, বিচুলি দে গাঁঙের বাঁধ রক্ষে করতি হবে।এই বাঁধই আমাগো জেবন।বাঁধ ভাঙলি লোনা জলে ভিটে ঘর বাড়ি ধান জমি সব লন্ড ভন্ড হুয়ে যাবে’। 

ঘের পাড়ার হরেন বলে ‘ঠিক বুলেছ কাকা, কলকেতার বাবুরা তো বলে এই সব গাঙের কোটালের গোনে জল যতদুর ওঠে, তার থেকে তিন ফুট নীচে তুগো বাড়ি ঘর, ধান জমি। এই জন্নি নদীবাঁধ হল জীবনরেখা।এই কথাডা সব সময় মনে রাখা দরকার।তোমার কথা মত আমরা সক্কুলি মিলে চেষ্টা করব’।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সংগে ঝড়ের তেজ বাড়ছে।গাঙে এখন ভরা জ়োয়ার।বড় বড় ঢেউ গাঙভেড়িতে ধাক্কা মারছে।চরের বাইন কেওড়া গেমো গাছের মাথা নুইয়ে ঝড়ের দাপট সহ্য করছে।নদীবাঁধের গেমো গাছে ঢেউ এর ধাক্কায় মাটি ধুয়ে গেছে তবু গাছের শিকড় মাটি কামড়ে আছে। 

নিম্নচাপের মেঘে মাঝে মাঝে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।জোয়ার বাড়ছে। নদীবাঁধ ছাপিয়ে লোকালয়ে জল ঢোকা শুরু হয়েছে।নিমাই হাঁক মারে ‘রতন, তোরা এদিকি আয়। ভেড়ি ছাপিয়ে গোনের জল উঠতেছ।এদিকি তোরা ছুটে আয়’।

নিমাইয়ের ডাক শুনে রতন লোকজন নিয়ে ওদের বাড়ির দিকে চলে আসে ।ওরা মাটি ভর্তী সিমেন্ট বস্তা লম্বা করে বাঁধের উপর সাজিয়ে দেয়।এভাবে জল কিছুটা আটকায়। এরপর বস্তা সব শেষ হয়ে গেল। ওরা পলিথিনের মধ্যে খড় ঢুকিয়ে বাঁশ পুতে ছাপানো জল আটকায়।রতন নিমাইকে বলে ‘দাদা, গোনের জল তো বাইড়ে যাচ্ছে, কখন ভাটা সুরে যাবে? গাঙের ভাবগতিক তো ভাল না’।

‘চারিদিকির খবর ভাল না।মনসাখালির সুয়েজগেটের দিকি বাঁধ ভাঙ্গে হুড় হুড় করে জল ঢুকতেজ।ওদিকি পুব পাড়ায় হরেন দলবল নে খড় বিচুলি নে বাঁধের ওপর শুয়ে পড়ে জল আটকেছে।এত কিছু করেও গেরামডা রক্ষে করা গেল না। আর দু তিন জাগায় ভাঙার খবর পাবা যাচ্ছে।গাঙে ভাটা লাইগে আবার গোন হচ্ছে’। রতনের কথায় নিমাই বলতে থাকে।আস্তে আস্তে ধানখেত মাঠ জলে ভরে যায়। নিমাইয়ের বউ কেঁদে কেঁদে বলে ‘দেকতি দেখতি ভিটেবাড়ি উঠোন সব জলে ভুরে গেল।ঘরের মধ্যি এবার জল ঢুকতেছ।মাইয়েটা রতনগো কোটাবাড়িতে পাঠিয়ে দাও’। নিমাই এই দুরন্ত ঝড়ের মধ্যে মেয়েকে ঘাড়ে করে রতনদের বাড়িতে দিয়ে আসে। ভরা জোয়ারে গাঁড়াল নদী যেন ফনা তোলা গোখুরো সাপের মত ফুসে উঠেছে।বড় বড় ঢেউ প্রবল বেগে বাঁধের উপর আছড়ে পড়ে বাঁধ ভেঙে তছনছ করছে, আর হু হু করে নোনাজল ঢুকছে। শিরিষ, বাবলাগাছের ডাল মড় মড় করে ভেঙে পড়ছে। নিমাইকে মেয়ে নিয়ে উড়িয়ে বাঁধের নীচে ফেলে দিয়েছে। হামাগুড়ি দিয়ে আবার ভাঙা বাঁধের উপর উঠেছে।চারিদিকে কান্নার কলরোল।অনেকের মাটির বাড়ি জলের তোড়ে ভেঙে পড়েছে।তারা এখন জল ঠেলে ফ্লাডসেন্টারের দিকে যাচ্ছে।

নিমাই বৌকে বলে ‘ফ্লাড সেন্টারের দিকি যাবা না ইকেনে থাকপা?গাঙে ভাটি লাগেছে।জড় আস্তে আস্তে কুমে যাচ্ছে।গতবছরের আম্ফানে ফ্লাডসেন্টারে গিলি ঘরে তালা ভাঙে চুরি হুয়েছেল।এবার কি করবা বল’।

‘না আর উকেনে গে আর কাজ নি। ঘরের মধ্যি জল উঠে গেছে।চালির বস্তা, আর ও জিনিস পত্র সব ভিজেবুড়ে গেছে।চারি দিকি জল।কোন দিকি রাখপো?

বউয়ের কথায় নিমাই বলে ‘গাঙভেড়ির ওপর ত্রিপল দে টোঙ কুরে থাকি। ভাঙা বাঁধ না বাঁধতি পারলি গোন ভাটায় ভিটেয় জমিতে নোনা জল ঢোকবে আর বারাবে। আমাগ ঘর ভাঙ্গে পড়তি পারে।তার চাইয়ে ভেড়ির উপর থাকা ভাল’।

প্রবল ইয়াস ঝড়ের তান্ডবের বিভিন্ন এলাকার খারাপ খবর আসছে।গোসাবার পাখিরালা, সোনারগাঁ, সাতজেলিয়ার চরঘেরি, মোল্লাখালি, কুমিরমারি এসব এলাকায় নদীবাঁধ ভেঙে এলাকা প্লাবিত হয়েছে সুন্দরবনের ভ্যঙ্কর রায়মঙ্গল নদীর এলাকায় ক্ষতির পরিমান আর ও বেশি।প্রকৃতির তান্ডবএবার আস্তে আস্তে কমে আসছে। ভাটা হয়ে নদীর জল নেমে যাচ্ছে ।

রতন হেঁকে হেঁকে বলে ‘দাদা প্রবল জলের স্রোতে একটা হরিণ ওপারের বাদার তে ভেসে এসেছে। রবিদা দোকানঘরে রাখা হুয়েছে।বনের অফিসি খবর দেবা হুয়েছে’

নিমাই ছুটে রবির দোকানে গিয়ে দেখে রবি হরিণটা কোলে করে রেখেছে।জোয়ারে এতটা পথ সাঁতার দিয়ে এসেছে, এজন্য হাঁপিয়ে গেছে।গামছা দিয়ে হরিণের গায়ের জল মুছিয়ে দেওয়া হয়েছে।অচেনা লোকজন দেখে হরিণটা ভয়ে জড়সড়।চোখদুটো কি সুন্দর, যেন কাজল টানা।রতন ছবি তুলে বন্ধুদের পাঠালো।

আজ নিমাইয়ের ঘরে জল উঠে সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে। ফ্লাডসেন্টার থেকে ওরা খিচুড়ি খেয়ে আসল।ওদের পাড়ায় যারা ফ্লাডসেন্টারে যায় নি তারা অনেকে নদীবাঁধের উপর ত্রিপল টানিয়ে টোঙ করে আছে। 

গ্রামের চারিদিকি অনেক জায়গায় নদীবাঁধ ভেঙেছে। ঝড়ে বাড়ির বাগানের গাছপালা সব ভেঙেচুরে একাকার করে দিয়েছে।চরের বাইন গেমো গাছের মোটা মোটা ডাল দুরে নিয়ে ফেলেছে।নমিতা বাঁধের উপর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে। বাড়িতে একফোটা মিষ্টি জল নেই। চারিদিকে জলাময়।তবে সব নোনা।নিমাই ফ্লাডসেন্টার থেকে খাবার জল এনেছে।চাল যা ছিল সব ভিজেবুড়ে আর ফুটিয়ে খাবার মত নেই।একটা বোটকা গন্ধ বের হচ্ছে।নিমাইয়ের নৌকো মোটা দড়ি দিয়ে বাইন গাছের সঙ্গে বাঁধা ছিল। প্রবল ঢেউয়ে ডুবিয়ে দিয়েছে। গাঙে ভাটা লেগেছে বলে নিমাই নৌকোর জল সেচতে লেগে যায়। রাত্রে মাঝে মাঝে দমকা হাওয়ার সঙ্গে বৃষ্টি হয়েছে। 

রাত্রে নিমাই বলে ‘ গত বারের আম্ফানের মত এবার বাইরির লোক আইসে জিনিসপত্র বিলি করবে। ফ্লাডসেন্টারে কালকোর যাতি বলেছ, চিড়ে গুড় দ্যাবে। কলিকেতার বাবুরা আর কদিন পর ভটভটি কুরে মালপত্র বিলি করতি চলে আসবে।প্রেতেকবার এসব হাবিজাবি আর খ্যাতি ভাল লাগে না।পঞ্চায়েতের লোকেরা এবারের আমাগ ছাটাক ফাটাক দে ওরা পয়সা লুটে ন্যাবে।এখন কাঁকড়ার ভাল দাম আছে।কদিন আগে খটির লোক কাঁকড়া ধরিতি বুলছে।করোনার লক ডাউনি বাদায় কেউ কাঁকরা মারতি যাচ্ছে না। আমরা দুজনে নৌকে নে বাদায় সকালে গে বৈকালে ফিরে আসব।দুটো পয়সা হবে।আর সরকারী ,বাইরির সাহায্য নেবার জন্নি বাড়িতে বাবা থাকপে’।

‘তা ঠিক বুলেছ, হরির বউ ওর বরের নে বাদায় ঝড়ের আগে কাঁকড়া ধরতি গে ভাল কামাই কুরেছে।তালি কালকের আমি কাঁকড়া মারার থোপা সাইচ কুরে রাখি।তুমি কালকের গাঙের চরেরতে কাঁকড়ার চা্রের জন্নি মিনোমাছ ধুরে দেবা’ নিমাইয়ের কথায় ওর বউ উত্তর দেয়।

রায়মঙ্গল, হরিণভাঙা, গাঁড়াল নদীর ওপার থেকে অলৌকিকরঙের আভা ছড়িয়ে সূ্য্য উঠল।মরিচঝাপি ঝিলার বাদাবন ছুয়ে এক মায়াবী আলোয় চারিদিকে ভরে উঠেছে। নিম্নচাপের ঝড় বৃষ্টিতে বন্য প্রকৃতি যেন আরও সবুজ, সতেজ হয়ে উঠেছে। গতকালের জলোচ্ছাস, বির্পযয় জল জঙ্গলে কোন দৈন্যতা চোখে পড়ে নি।নিমাইয়ের বাব মা ফ্লাডসেন্তার থেকে সকালেই ফিরে এসেছে।ঘরের জল সরে গেছে।তবু উঠোনে জল এখোনো দাঁড়িয়ে আছে।নিমাইয়ের মা ঘরের জল কাঁদা সব পরিস্কার করতে লেগে যায়। 

নিমাইয়ের বাবা সবিতাকে বলে ‘বৌমা হোমসাস্তর কাঁকড়ামারা থোপা, দোন গোছাচ্ছ কেন? আকাশে তো এখনো মেঘ দেখা যাচ্ছে। দ্যাবতার অত্রাযোগ এখনো কাইটে যায় নি।তোমরা কি বাদায় কাঁকড়া মারতি যাবা’? 

‘হ্যা বাবা, তোমার ছাইলে এই গোনমুখি আমার নে সকালে একবার গাজিখালি বনের কালির খালের দিকি যাতি চাচ্ছে।ওই দিন আবার ফেরবো।এই বুড়ি বন্যেয় লোকের দান খয়রাত নে আর কতদিন চলবে।আমরা বাদাবনের এলাকার লোক।তাই প্যাটের ভাত জোটাতি বন কুরে খাতি হবে’। 

বৌমার কথায় বুড়ো বলে ‘আচালবাদার দুনে পাশখাল,ফোড়ন, গাঙগাছাল আমি হাতের তালুর মত চিনি।বনকরা লোকের আমি বাউলে ছেলাম। আমরা আট দশজনের দল বেধে কালামের সাজন কুরে বাদায় যাতাম। মা বনবিবির নাম কুরে জ্বালান, খিলে্‌ন, চালান এসব মন্ত্রদে বাঘ কুমিরির বশ করার চেষ্টা করতাম।এখনকার বন করা ছাইলেপিলে এসব সংস্কার মানে না।বনের দ্যাবতা মা বনবিবি,দক্ষিণরায়, আলিমদত তেনাদের তো ভকতি ছেরেদ্ধা করতি হবে?তোমরা যেডা ভাল বোঝ কর।আমার আজ বাদে কাল গাঙ ধারে যাবার সনয় হুয়ে আইলো।আমি আর কি করতি পারি’? 

নিমাই কাঁকড়া ধরা চার নে বাড়ি এসে সামনে বাবা কে দেখে বলে ‘আজ তোমার বৌমার নে কাছের বাদায় কাঁকড়া ধরতি যাচ্ছি।নিজি গো নৌকো, কারও নৌকোর ভাড়া দিতি হবে না।সুন্ধের মধ্যি ফিরে আসিব।তোমাগো চিন্তা করতি হবে না’।

সব শুনে ওর বাবা বলে ‘ফ্লাডসেন্টারে লোকে বলাবলি কুরেছে,এট্টা বুড়ো বাঘ পীরখালির বনে ঝড় জলে বনের মধ্যি অথর্ব হুয়ে বনের মধ্যি পুড়ে ছেল। বনের অফিসির লোকেরা ওই বাঘের জলটল খাবিয়ে ও বাঁচাতি পারলো না।মা বনবিবির বাহনটা মুরে গেল।এরাম অথর্ব হুয়ে যাবা বাঘ বনে থাকতি পারে। এজন্নি সাবধান, ওই উপোস করা বাঘ যখন তখন মরণ কামড় দিতি পারে।।

ওর মা বলে ‘তোমাগো বারন করলি তো শোনবা না।মা বনবিবির নাম কুরে কাছের বাদায় সাবধানে যাও।কাঁকড়ার থোপা পাতার সময় চারিদিকি লক্ষ্য রাখপে’। 

নিমাই থোপায় মিনু মাছের চার বাধতে থাকে।জঙ্গলের মধ্যে চরে খাল পাড়ে কাঁকড়া ধরার থোপা পাতা হয়। পাঁচ থেকে ছয় ফুট লম্বা বাঁশের কঞ্চির তৈরি থোপার সঙ্গে দশ বারো ফুট নাইলনের দড়ি বাঁধা থাকে।দড়ির মাঝখানে ছোট ইটের টুকরোবেঁধে দড়ির শেষ প্রান্তে কাঁচা বা শুকনো মাছের চার বাঁধা থাকে।আর কাঁকড়া মারা দোন হল ৫০০হাত লম্বা নাইলনের দড়ির গায়ে ঝোলানো থাকে মাছের চার।জঙ্গলের মধ্যে লম্বা খাড়ির মুখে এই দোন ফেলা হয়। 

‘গাঙে গোন লাইগে গেছে।তাড়াতাড়ি দোন থোপা সব গুছিয়ে নেও।এক্ষুনি নৌকো ছাড়তি হবে’।নিমাই বউকে এসব কথা বলে বুটে নিয়ে নৌকার দিকে এগিয়ে যায়।সবিতা মেয়েকে ওর ঠাকুরমার কাছে দিয়ে সব গুছিয়ে নিয়ে গাঙভেড়ির দিকে চলে আসে। ওরা দুজন নৌকোয় ওঠে। নিমাই নৌকোর গলুইতে লাল কাঁচা বেঁধে ধূপ ধরিয়ে মা বনবিবির নামে গড় হয়ে প্রণাম করে আর জোরে জোরে বলে,

‘জয় বাবা পাঁচপীর 

তোমার পায়ে নতশীর, 

পীরের নাম দরিয়া, বদর বদর’ ।

এবার সবিতার গলা শোনা যায় –

‘মা বনবিবি বদর বদর, 

বাবা দক্ষিণরায় বদর বদর, 

বাবা আলিমদত বদর বদর। 

ওরা নৌকা ছেড়ে দেয়।নিমাই বুটে নিয়ে নৌকোর পাছায় বসে।সবিতা দাঁড় বাইতে থাকে।গাঙভেড়িতে নিমাইয়ের মা বাবা, মেয়ে দাড়িয়ে থাকে। ওর বাবা বাদাবনের দিকে হাত যোড় করেবনবিবিকে প্রণাম করে। হরেন্‌, রতন ওরা এই পথ দিয়ে পশ্চিম পাড়ায় যাচ্ছিল। ওরা নিমাই আর ওর বূকে নৌকো নিয়ে বাদার দিকি যেতে দেখে অবাক হয়। নিমাইয়ের বাবা ওদের বলে “ওরা বিনি পাশে লকডাউনি কাঁকড়া মারতি যাচ্ছে, এ কথাডা যান সাতকান কুরো না’। 

সকালের নরম রোদ মেখে কোটালের ভাটার টানে ছইওয়ালা নৌকো বনের গভীর নির্জনতা ছুঁয়ে বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দে গাঁড়াল নদীর দিয়ে এগিয়ে যায। আবাদী এলাকা ছেড়ে এবার গাঙের দুপারে বাইন গরান গর্জন হেঁতালের আদিগন্ত সবুজের বনভুমি। প্রবল ইয়াস এর ধাক্কায় চরের কাছের অনেক গাছ ভেঙে পড়েছে। চরের দিকের নাইলনের মোটা জালের ফেন্সিং এর অনেক জায়গায় ছিড়ে গেছে।ঝড়ের পর নদীতে জেলে কাঁকড়ামারা নৌকো চোখে পড়ছে না। দু একটা শঙ্খচিলের কান্নার সুর জলজঙ্গলের নির্জনতাকে আর বাড়িয়ে তোলে।ধানীঘাসের চরে বাটাং বক, মদনটাক এসব পাখী দেখা যাচ্ছে। ওরা কালীর চরের দিকে এগিয়ে যায়। কালির চর হল গাঁড়াল নদীর পশ্চিম পারের চর। হাটু সমান কাদা,আর বাইনের জঙ্গল।তবে এই জায়গাট খুব টানালো।জেলে মৌলের এই ভাষার অর্থ হল এখানে খুব বাঘের আনাগোনা।এখানে গাঁড়াল নদী খুব চওড়া।

নিমাই বউকে বলে ‘সামনে ওই কালীর চর। ইকেনের পাশখালে থোপায় খুব কাঁকড়া ধরে।এখন গোন হচ্ছে।খালের মধ্যি নৌকো ঢোকাই’?

‘হ্যা ইকেনে গতবার কাঁকড়া মারতি আইয়েলাম।আজ সনধের মধ্যি তো ফিরতি হবে’।নিমাইয়ের কথায় সবিতা উত্তর দেয়।

নিমাই আস্তে আস্তে পাশখালে নৌকা ঢোকায়।খালের কিনারা ধরে কাকড়া, গর্জন, মঠগরান এসব গাছ ঠেসমূল ধরে দাঁড়িয়ে আছে।বাদাবনের মধ্যে ঝড়ে অনেক গাছ ভেঙে পড়েছে।

নিমাই বউকে বলে ‘তুমি সাবধানে নীচে নাইমে খালে থোপা পাত, আমি নৌকোরতে দোন ফেলি’।

নিমাই বৌকে খালের চরে নামিয়ে দিয়ে খালের মুখে কাঁকড়া মারার দোন পাতে আর বৌএর দিকে লক্ষ্য রাখে। সবিতা এক হাটু কাঁদা মেখে থোপাগুলো পেতে দেয় আর কিছু সময় পর পর জলে নেমে থোপার দড়ি টেনে ধরে জালতি দিয়ে বেশ বড় সাইজের কাঁকড়া তুলে হাড়িতে রাখে।

সবিতা হাঁক মেরে বলে ‘বেশ বড় বড় দাঁড়ওলা কাঁকড়া থোপায় পাচ্ছি।হাড়ি কাঁকড়ায় ভর্তী হতি বেশী সময় লাগবে না’।

‘সাবধানে সামনে পাছোনে তাকিয়ে কাঁকড়া তোল।এই কালীর চর জাগাডা ভাল না।ইকেনে লোকের সবসময় বিপদ হয়’।সবিতার কথায় নিমাই বলে।

সবিতা থোপা তোলার সময় লক্ষ্য করে একটু দূরে একটা বাঘের মত কিছু একটা শুয়ে আছে। ভাল ভাবে দেখে বোঝা যাচ্ছে বাঘ শুয়ে আছে।

এবার সবিতার মনে হচ্ছে ‘বাঘটা অসুস্থ। কদিনির ঝড় জলে খাবা না পাইয়ে এরামভায় শুয়ে আছে। মনে হচ্ছে ওর আর নড়ার ক্ষমতা নি। এরাম ঘটনা বনের মধ্যি ঘুটেছে।আর শ্বশুর তো খবর পাইয়েছে, আধমরা বাঘ বন অফিসির ধারে মুরে গেছে।তাই ওরে ভয় করলি আর কাঁকড়া ধরা যাবে না।খুকুরবাবার জানালি আর থোপায় কাঁকড়া ধরতি দ্যাবে না’।

সবিতা আবার থোপায় কাঁকড়া ধরায় মন দেয়। বাঘটা কিন্তু একেবারে আধমরা নয়। এবার অনেক দিন উপবাসী এই বাঘ মা্নুষ দেখে নিঃশব্দে সবিতার দিকে এগিয়ে আসে।বাইন গাছে তখন বানরগুলো টাউ টাউ করে শব্দ করে সাবধান করে দিচ্ছে। সবিতা কাঁকড়া ধরার ঝোকে, পেছন দিকে বাঘটা যে ঘাপটি মেরে আছে তা খেয়াল করে নি। বানরের ডাক ও শুনতে পায় নি। খালের জলে থোপা তুলতে সবিতা যেই নিচু হয়েছে অমনি বাঘটা ওর ঘাড়ের উপর ঝাপিয়ে পড়ে।সবিতা ‘বাঁচাও, বাঁচাও, বলে হাঁক মারে।

নিমাই ডাক শুনে নৌকা বাওয়ার বুটে নিয়ে ছুটে এসে বাঘের গায়ে এলপাতাড়ি বুটের বাড়ি মারতে থাকে,আর জোরে জোরে হাঁক মেরে বলে ‘সবিতা শক্ত হুয়ে থাক,এটাকে আমি পিটিয়ে মারব।মার শালাকে মার, মর সমুন্দির বেটা মর ’।

এত হাঁকডাক আর চেঁচামেচিতে বাঘটা শিকার ফেলে বনের মধ্যি পালায়।নিমাই ছুটে গিয়ে সবিতার কাছে যেতেই বউয়ের একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পায়।সবিতার ঘাড়ে বাঘেরদাঁতের ধারালো দাগ,অবিরাম রক্ত ঝরে নোনামাটি লালে লাল হয়ে গেল। 

‘আমাগো আজ কি সর্ব্বোনাশ হুলো। আশে পাশের কেউ তো নি, যে কাছে আসবে। ওগো শুনছ, কথা বলো,আমার কী বিপদ হুলো, মা বনবিবি, বাবা দক্ষিণ রায়,বাবা আলি মদত,আমার বউডার বাঁচাও,মা বনবিবি, থানের তে কানে শোনো। আমার বউডারে বাঁচাও----। 

নিমাই বউয়ের শরীর বুকে নিয়ে বাইন গাছের গায়ে মাথা ঠুকতে থাকে।বউ হারানো বেদনায় তীব্র যন্ত্রনায় নিমাই কেঁদে কেঁদে উঠছে। 

আকাশে রোদের তেজ বাড়ছে।নিমাই নৌকোর গুড়র পাটাতনের উপর শুইয়ে দিল বউকে।বড়মিঞার আঁচড়ে মুখ এমন বিকৃত করেছে যে চেনা যাচ্ছে না। ধারালো দাঁতের কামড়ে ঘাড় ভেঙে ফেলেছে।রক্ত বন্দ করার জন্য গামছা ছিড়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছে।নিমাই একা বউয়ের লাশ নৌকায় নিয়েআবাদের দিকে এগিয়ে যায়। 

কোটালের প্রবল জোয়ারের টানে নোনা সাগর থেকে জলগাঁড়াল মাতলা ঠাকুরান সপ্তমুখী, বিদ্যা,গুয়াসোবা নদী দিয়েপ্রবল বেগে আবাদী এলাকার দিকে ছুটে চলেছে। হাড়হাভাতের কান্নায় মাথার উপর কাঠফাটা রোদের সূর্যটা তবু নির্লজ্জের মতো রোদের তেজ বাড়াচ্ছে, ভেঙে চৌচির হচ্ছে না। দুঃখী মানুষের কান্নায় জল-জঙ্গল প্রকৃতির রাজ্যে কোন মলিনতা ছোখে পড়ছে না।

------------- 

লেখক পরিচিতিঃ নিরঞ্জন মন্ডল, জন্ম ১৯৫৫ সালেদক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবনের গোসাবা সংলগ্ন কচুখালিগ্রামে।পড়াশুনো গ্রামের পাঠশালায়, পরে এলাকার স্কুলে ওকলেজে।কর্মজীবনে ছিলেন সরকারি ব্যাঙ্কের আধিকারিক, নেশায় সাহিত্যচর্চা।সুন্দরবন এলাকার দলিত অবহেলিতজেলে মোলে বাউলে গুনিন, ওঝা,কাঁকড়ামারা,কাঠুরেজলজীবি অভাবী খেটে খাওয়া মানুষের জীবন জীবিকালৌকিক দেবদেবী, লোকসংস্কৃতি,ইতিহাস, প্রত্নতত্ব লোকায়তজীবনচর্চা, এসব বিষয়ে এ সবই লেখকের চর্চার প্রিয় বিষয়।সুন্দরবনের নিম্নবর্ণের মানুষের লোকউৎসব “বালাই শ্লোকেগাজন,বালাগান”,নিয়ে গবেষণামুলক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।‘সুন্দরবনের বালাগান গাজন,দেল’(যন্ত্রস্থ), সুন্দরবনেরআঞ্চলিক শব্দকোষ(যন্ত্রস্থ) 

লেখকের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ, ‘অফুরান অরণ্যনীল’,”বিষন্নক্যানভাস’।

গল্প গ্রন্থ ‘বাদাবনের পদাবলি’(২০১৯), উপন্যাস‘উজানভাটির কথকতা’(২০২০) কিশোর উপন্যাস ‘ঠাকুরঠাকুর ডয়রা কলা, ‘বাদাবনের কমলেকামিনী’(২০২১)উপন্যাস ‘জল জঙ্গল জীবন’(যন্ত্রস্থ) । লেখক ‘কবিকল্প’পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন