মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

ময়ূরী মিত্র'এর গুচ্ছগল্প : কতো কথা




  সুগন্ধী
 
শুরুর সে দৃশ্য :: তখনো অখন্ড দেশ | দেশের মানুষের একটাই পরিচয় তখন -- তারা সব এক দেশের | আমার বাবা মনোজ মিত্র মশাইযের তখন চার কি পাঁচ বছর | বড় হচ্ছেন খুলনা জেলার ধূলিহর গ্রামে | ঈদ আসছে গ্রামে | ঠাকুমার কাছে বিচিত্র এক বায়না জুড়লেন বাবা | ---ওদের মতো আমিও ঈদ করব মা আমাদের উঠোনে | ওরা কী সুন্দর নতুন স্টাইলের পোশাক পরে ,কী সুন্দর কাঠের পাত্রের ওপর বই রেখে দু পা মুড়ে পড়ে | আমিও ওমন পড়ব | আর তারপর ওদের সবাইকে নিয়ে গোল হয়ে বসে মাংস খাব | তুমি রাধবে মা ?
ধর্ম ধর্মগ্রন্থ কোনটাই কোনোদিন বোঝেননি বাবা | বোধহয় বুঝতে চানওনি | তাই প্রতিটি ধর্মগ্রন্থ আজো তাঁর কাছে সুন্দর গ্রন্থ | মনোজের ভু-গ্রন্থ | হ্যাঁ যে কথা হচ্ছিল ---আমার চিরপ্রসন্ন ঠাকুমা রাধারানী সেদিন ছেলের আবদার মিটিয়েছিলেন কড়ায়গণ্ডায় | পাশের সানাবাড়ির বউকে অনুরোধ করেছিলেন ছেলের জন্য একটি ফিটফাট ঈদ পোশাক বানিয়ে দিতে | ঈদ এলো | ভোর ভোর চান করে বাবা পরলেন ঈদের পোশাক |সাদা পাঞ্জাবি , চুস্ত পাজামা আর একটি সলমা জরি টুপি | ছোট মাথায় সামান্য ঢলঢলে হল টুপি | তারপরেও ঠাকুমা দেখছেন মুখ হাঁড়ি বাবার | --কী রে, দিলাম তো সব সাজিয়ে, আবার কী ! ফিক করে হেসে কানটি এগিয়ে দেন সামনে ---- কানে আতর ? ওমা ওরা উৎসবে কী সুন্দর গন্ধ ঝরায় আমরা কেন ওমন করি না মা ? পুরো মুসলিম না হতে পেরে বড় নির্ভেজাল খেদ সেদিন বাবার | কানের ফুটোয় রাধারানী ঢাললেন তাঁর চাকুরিজীবি বরের দেয়া লুকোনো সুগন্ধী |
 
ভালোলাগায় দিশাহারা হল বালক মনোজ | বড্ড হুটপাটি লাগিয়েছে আজ | মা কাকিমারা মাটির বাড়ির মাটির ওপর বিছিয়েছেন মাদুর | আর সেখানে পা মুড়ে কোরান পড়ার এক নির্ভুল ভঙ্গিমা ফুটিয়েছেন একালের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা | পাশে সার সার সুগন্ধি বন্ধু |
 
দৃশ্য শেষ ; দেশ ভেঙেছে | রান্নাঘর শোবার ঘর ,গোয়ালের গরু, সব ভাগ | গোবর ঘুঁটে শুদ্ধু ভাগ | ওপারের পশু আসতে পারবে না এপারে | বাবা রওনা দিয়েছেন স্বাধীন ভারতের পথে | নৌকায় বসে পিছু ফিরলেন | ওদিকের পাড়ে তখনো দাঁড়িয়ে আছে তাঁর প্রিয় কুকুর ভূলু | বালক ভাবছে --- চলে যাচ্ছি | ভুলুর গায়ের ধুলোমাখা ঘা পাঁচড়ায় কে বোলাবে ওষুধ ? আঁচল ধরে ফের বায়না আমার চিরকালের জেদি বাবার --- মা ,খেয়াল রেখো , কদিনের মধ্যেই চলে আসতে হবে কিন্তু ভুলুর জন্য ভালো ওষুধ নিয়ে ! বাড়ি যা রে ভূলু ! বোকার মত দ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকিস নে | আমি তো আসছি ই ই !
রাধার চোখ কাঁদে | মন কাঁদে | কান্নার ঝাঁকুনিতে স্তন ফোলে সমুদ্রসম | সুগন্ধী পুত্ররা সব হারিয়ে যাচ্ছে যে ! ছেলের মুখ জোর করে ঘুরিয়ে দেয় রাধা ! সামনে স্বাধীন ভারত ! রিক্ত ! নীরক্ত ! বালক বিব্রত |


সুতো নেই 
 
সন্ধের পর থেকে নাগেরবাজার অঞ্চল আজকাল বড় শব্দহীন লাগে | কৌতূহল নিয়ে কয়েকদিন রাতে নিচে নেমে দেখেছি ---সব ঘুটঘুটে আঁধার | রাস্তার সব আলো জ্বলছে | তবু আঁধার আর আঁধার | মনটাকে বারবার কচলে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি ----কেন আলো জ্বলা পথে সব কালো লাগে আমার ! কেন মনে হয় পৃথিবী নয় ---এক ভিন্ন গ্রহে ঘুরছি আমি ? কেন ? কেন ? 
 
তবে কি মানুষের আনাগোনায় গ্রহের নাম ঠিকানা --আলো আঁধারের ভারসাম্য নির্ধারিত হয় ? 
 
তাই তো ! পথে মানুষ যখন চলে ল্যাম্পপোস্ট আর মানুষ দেখার আনন্দ একটা নতুন রশ্মি তৈরি করে | কী সে রশ্মি বলতে পারি নে ! তবে কোভিডে সে যে নেই তা বুঝতে পারি বেশ |
 
খানিক দাঁড়িয়ে থাকি | দূরে ওষুধের দোকানে একটিমাত্র লোক বসে থাকে | ইচ্ছে করে তার সাথে দু এক কথা বলি | তারও হয়ত ----- 
 
দুপ্রান্তে দুজন | একাই দাঁড়িয়ে রই | 
 
একপাশে পরে থাকে প্রিয় কাগজওয়ালার চৌকি। সদ্য হাসপাতাল থেকে ফিরে সে বড় জীর্ণ হয়ে গেছে | রাতের আড্ডা ছেড়েছে সে | শুধু ভোরে এসে ছোট লাঠি হাতে দরজায় টোকা দেবে | পাছে দরজা ছুঁলে কাগজ নেয়া বন্ধ করে দি -- তাই হাতে এক পাটকাঠি | দণ্ড মেরে কাগজ দেয় | আজ দেখলাম হাত কাঁপছে তার | এখনো খুব দুর্বল | মাস্ক ছিঁড়ে গেছে দেখে বললাম --অল্প টাকা তো ! আমি এখন দিয়ে দি | কিনে নিন নতুন | 
 
হাতের পাটকাঠি কাঁপল | চলে গেল | বাড়তি নিল না আমার সওদাগর |
 
আমরা তিনজন -----একা |
 
সুতো নেই | গাঁথা হল না তিন ফুলের মালা ----


অল্প সূর্যে স্বল্প সবুজ

থিয়েটারের একটি কাজ সেরে সেদিন ফিরছিলাম মেট্রো চেপে | বেঁটে গুড়গুটি তো আমি | মেট্রোর রড ধরলে প্রায় ঝুলেই চলতে হয় আমাকে | সেদিনও ভিড় ট্রেনে ওভাবে ঝুলে আছি |
দেখি পাশে মায়ের কোলে মুখ গুঁজে বসে একটা বাচ্চা ---আমার ওই বিদঘুটে ঝোলাভঙ্গি দেখে খিলখিল হাসতে লেগেছে | হাসছে আর তালি দিচ্ছে মজায় |হঠাৎ বায়না, আমি মাসির মত রড ধরে ঝুলব | আন্টির বদলে মাসি শব্দে কী আনন্দ কী আনন্দ |
মা : না ঝুললে পুলিশ আসবে |
বাচ্চা : পুলিশ এলেও ঝুলব | পুলিশের কাঁধে চেপে ঝুলব |
মা : পুলিশ মারবে | ডাণ্ডা দিয়ে মারবে |
হাত পা নেড়ে ছুঁড়ে বোঝাতে লাগল মা ---এই দ্যাখ এইরকম ---দ্যাখ না এদিকে ----ঠিক এইরকম করে মারবে |
বাচ্চাটার আহল্লাদ সতত | সহজে থামে না | দুখচিন্তা যেমন তার থাকে না ---দুখের কুটিল প্যাঁচগুলোও সে জানে না | জানতে চায়ও না | মায়ের ফালতু ভয় দ্যাখোনো ফালতু থোড়াই care করে সে ! সে রড ধরে ঝুলবেই |

ক্লাইম্যাক্স |

মা : পুলিশ এলে কুত্তা লেলিয়ে দেবে রে |সেদিন দেখিস নি , মেট্রোতে কী বড় বড় কুকুর নিয়ে উঠেছিল পুলিশ | কেমন পিঙ্ক জিভ বার করছিল কুকুরগুলো |
 
পারল না বাচ্চাটা | ভয়ে চোখ বুঝে সিটের কোলে ঢলে পড়ল কেমন ----সূর্য যেমন অস্ত যাবার কালে !
আর সহ্য হলো না ময়ূরার | একদম আঁধার যে তার খোকার মুখ | ময়ূরা খপাত করে খোকা তুলে ঝুলিয়ে দিল রডে | খোকা দোল খায় | চকরাবকরা হাসে | খোকার গায়ে লেগে লেগে হাসে রডে ঝোলা আরো একটা বেঁটে মা |
গায়েব ভয় | এই তো হয় ! সুরজ ওঠার কালে | শুকনা ক্ষেতেই তখন হরিয়ালি | হুররে |



থৈ থৈ


দন্ডীরহাট | আমার গ্রাম | আমার শেষ যাওয়া ভরা বর্ষায় | চোদ্দ পনের হবে তখন আমার | পৌঁছোবার দিন থেকে সেই যে বৃষ্টি শুরু হয়েছিল থামার নাম নেই | বৃষ্টি পড়ামাত্তর ছুটতাম পুকুর পানে | প্রতিদিন মাপতাম, বৃষ্টি আজ কতটা ভর্তি করল পুকুরটাকে ! কাল যদি ফের ঝরে তো আরো কত ফুলবে রোগা পুকুর ! ঠিক কতটা বৃষ্টিদানা জমলে চোখের নিমেষে পুকুর সাগর হয়ে উঠবে !

একদিন প্রবল বৃষ্টি নামল | যতদূর মনে হয় , সেটাই ছিল সেবারের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টির দিন ! বারন্দা থেকে সামান্য দূরের রান্নাঘর অব্দি দেখা যায় না বৃষ্টির চোটে ! আমাদের বাড়ির সবচেয়ে ডাকসাইটে মহিলা আমার ছোট ঠাকুমা ! ভয়ডর কাকে বলে জানতেন না | যদি কখনো বলতাম --- আঁধারে ভয় লাগে ---খুব রেগে যেতেন ! ভয় শব্দে ঘেন্না চোখে তাকাতেন | স্বামী সন্তান নিয়ে জুত করে সংসার পেতেও একধরনের একা বাঁচার জেদ ছিলো ছোটঠাকুমার | তো আমার সেই সবচেয়ে ডাকাবুকো ঠাকুমার কাছে সেবারের সবচেয়ে বৃষ্টির দিনটিতে আমার প্রার্থনা ছিল ----আমায় নিয়ে টইটুম্বুর পুকুরে চান করতে হবে | কারণ জানতে চাননি | সাহসী plan ----বোধহয় এই যুক্তিতেই পিঠে আমায় নিয়ে সাঁতার দিচ্ছিলেন ছোটো ঠাকুমা |বাদুড়ের মত ঝুলতে ঝুলতে মুখ চোখ বুজে আসছিল বৃষ্টি ফোঁটায় | আদ্দেক শরীর ডুবে সেদিনের বাড়ন্ত পুকুরে | হাত বাড়িয়ে ধরতে চাইছিলাম ডাগর জলজ ফুল | ভাসা পুকুরের ছিপছিপে পাতালতা !

শরীর মন তখন তো আলাদা করে বুঝতাম না | কামনা ইচ্ছের তফাতও না | কেবল কেমনতর যেন একটা লাগছিল সেদিন ! কেবল মনে হচ্ছিল --দেখিই না একবার পরখ করে ! কোন জল আমায় শীতল করে ! আবেশে বুঁজিয়ে দেয় দুচোখ ! পুকুরজল নাকি আকাশজল ?

এর অনেকদিন বাদে পুরুষ এল আমার কাছে ! প্রথম পুরুষমানুষ ! আমার বারিষপুকুর ! সেও যেন সেদিনের সেই কেমনতর !

যুগ কাটে | মারী আসে | শুনতে পাই কোভিডে মরছে গণ্ডা গণ্ডা মানুষ | রাতে বাইরে কুকুর আর শিয়ালের যুগল গলা পাই | শুনতে পাই মানুষের অভাবে শিয়াল বেরোয় জোছনার রাজপথে | উল্টোচিন্তা মাথায় ঘোরে -- মৃত্যুভরা অগণিত রাত আসবে কি আরো ? চাঁদগন্ধী জোয়ানের Fanta Touch তাহলে জাগবে আরো আরো |

মড়ার পাহাড়ে টুসটুসে Satisfaction |



Only মহব্বত

বাবা কাকার দৌলতে সম্প্রতি নিউটাউনের যে বাড়িটিতে সাময়িক রয়েছি সেখানে ঘন বৃষ্টিতে চারপাশে প্রচুর ব্যাঙ ডাকে | সমবেত এবং একদম এক সুর বার করে ডাকে | ডেকেই যায় ---- থামে না মোটে | চারপাশের বাসিন্দারা কী ভাবেন এদের ডাকে আমি জানি না | আমি কিন্তু এই specific উভচরের ডাকে ঘরে বসে বুঝি আমি একা নই ---বনজঙ্গল ও জীবজগত continuous আগলাচ্ছে আমায় | মনখারাপ আস্তে আস্তে অস্তমিত হয় আমার |
 
সেরকমই মন খারাপ করে ঘরে বসেছিলাম | আমার ভাই সপ্তর্ষি এল | সঙ্গে ওর কুকুর --নাম জিরো | কুকুরকে সরাসরি কুকুর বলে পরিচয় করানোই ভালো | কারণ মানুষের মতো ওরা পরিচয় হারায়নি | তবে ইদানিং জিরোর ভালোবাসা আমাকে ওরও দিদি করে দিয়েছে |
 
জিরোকে হিসুপটি করাতে আমি আর সপ্তর্ষি বেরোলাম | টিপটিপ বৃষ্টি এবং ব্যাঙের কলরবে | অন্ধকার রাস্তায় বারবার পিছিয়ে যাই | জিরো হাগু করার বাহানা করে থামে | ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে আমি ঠিক তার সাথে আসছি তো ? নারে বাবা ! এটা Robert Frost এর Stopping By Woods On A Snowy Evening নয় |
মুরগির মতো ঝংকার দিতে দিতে জিরো আর আমায় নিয়ে ছুটছেন সপ্তর্ষি | বুঝলাম -- প্রকৃতিকে আবার করে ভালোবাসতেই তাঁর এত বাড়তি গতি আজ | আপনি মনে করলে বাড়তি | নচেৎ সেটা গভীর আনন্দের এক একটি ধাপ | সপ্তর্ষি জিজ্ঞেস করেন ---দিদিভাই তুমি সোনাব্যাঙ দেখেছ ? বলি ---ছোটবেলায় গ্রামের বাড়িতে হয়ত কখনো দেখেছি | তারপর আর দেখিনি | ছোটভাইকে বলতে লজ্জা করল যে আমি আর খুঁজিওনি |
 
আঁধার রাতের বর্ষায় সপ্তর্ষি শোনান তাঁর ছোটবেলার কোনো এক ভোরের গল্প | সকালে উঠেই আমার ছোট্ট ভাই দেখেছিলেন ---বৃষ্টির পর ভোরের মাঠ টকটকে সোনারং ব্যাঙে ভরে গেছে | সপ্তর্ষির গলার আনন্দধ্বনি আমায় বুঝিয়ে দিল ----অসংখ সোনাব্যাঙ সেদিন একটি সাধারণ মাঠে সোনার আবাস গড়েছিল | মানুষের অশ্রুহাসির আশ্রয় হয়ত !
বলতে বলতেই বেদনায় আচ্ছন্ন হলেন আমার ভাই | শুনলাম ----সোনাব্যাঙ ভারতে দুর্লভ হয়ে আসছে | সব বিদেশে ওষুধ বানানোর কাজে চালান হচ্ছে | অর্থবিদ বা চিকিৎসক তো নই | তাই ব্যাঙ চালানে দেশের লাভক্ষতি কিছুই বুঝতে পারলাম না | শুধু বুঝলাম ---যে প্রাণীকে এতদিন ভুলেই ছিলাম আজ তার চলে যাওয়ার খবরে নতুন এক কষ্ট গড়াল বুক দিয়ে | ও হ্যাঁ জিরোও গল্পটা শুনল | আচ্ছা এক প্রাণী চলে গেলে , থেকে যাওয়া প্রাণীর কষ্ট হয় ? হয় | ঠিক হয় |
 
বাড়ি ফেরার পথে জিরো সপ্তর্ষির কথায় রাস্তার জলসিক্ত বাচ্চা কুকুরগুলোকে জিভ বুলিয়ে আদর দিল | কিছু কুকুর তাদের জিরোদাদার আদরের টানে নিঝুম দশা থেকে কেমন উঠে বসল ঝট করে | ঝাঁক বেঁধে সারমেয় উড়ে এল আমাদের ক্যাম্পাসে | রাস্তার পাহারাদাররা তেড়ে বার করে দিতে এলেন বাচ্চাগুলোকে | Actually তাঁরাই এঁদের পালন করেন | বকতে যাচ্ছিলাম পাহারাদারকে |-----কেন তাড়াচ্ছেন ওদের ? হঠাৎ শুনলাম এক পাহারদার কুকুর তাড়াতে তাড়াতেই বলছেন ----ওরে বেরো বেরো | নইলে ওদের পাহারদার ( আমাদের ) তোদের মেরে তাড়াবে | ও মুহুর্তে লাঠি হাতে পাহারদার আমার আরেক ভাই হয়ে গেল |
 
এখন আমার ঘরে আমি | জিরো ভাইদের ভালোবাসা দিয়ে চলে গেছে | পাহারাদার তাঁর কুকুরদের খাদ্য দিয়েছেন হয়ত | একদম চুপ তারা | শুধু ব্যাঙ ডাকে | একটা সোনা ব্যাঙ কি গলা মেলাবে আজ কোলাব্যাঙের সাথে ?
আজ রাতের জংলা পথ আমায় দেখায় -- --মানুষ জীব কখনো দুই ভাই |

উঁচাতলা নেমে আয় |

সারমেয় তোদের lesson দেয় |
জীবেরা সদাই ভাই ভাই |
 
খোয়া গেছে তোর সোনাব্যাঙ ?
তো খোঁজ |



চ পুতুল , বাজারে খেলি

ছেলেবেলায় পুজোর বাজার করার সময় সবার আগে মনে হতো , আমার পুতুলগুলোর জন্য কিছু একটা কিনি | বাটা কোম্পানির ফাঁকা বাক্সে অপেক্ষায় থাকত আমার পুতুলখোকাখুকি |
মনে হত কিনিই | পুজো তো এসে গেল ---কিছু একটা কিনতেই হবে এদের জন্য | একটা লাল টুকটুকে ঘাগরা কিংবা ছোট একজোড়া গোলাপি পুতুলবুট ? আমাদের সময় পুতুলের জুতোর খুব চল ছিল | আমাদের স্কুলের নিউকাট জুতোর মতোই দেখতে হত সেগুলো | পুতুলের সরু সুঠাম পাগুলোকে কী easily যে ঢুকিয়ে দিতাম খেলনা নিউকাটের ফাঁকে | প্লাস্টিকের বেল্টও বেঁধে দিতাম জুতোর গায়ে | ঝটপট |

পঞ্চমীর দিন থেকেই জুতো মোজা পরে ফিট হয়ে থাকতো জুতোর বাক্সের বাসিন্দা | তখন মার হাতে বেশি পয়সা থাকত না তো | তাই পুতুলের নতুন জুতো কিনে দিলেও তাদের জরিদার ঘাগরা কোনোদিনই কিনতে পারেননি | মনে আছে ---নতুন জামা দিতে না পেরে পুতুলগুলোকেই ধরে মারতাম আর ভিখিরি বলে মুখখারাপ করতাম | অক্ষম ক্রেতার যত রাগ তখন তার পুতুলগুলোর ওপর | উৎসবে কেন কেবল তারাই পরবেসাতরাজ্যের বাসী জামাকাপড় ?

একবার মা করলেন কি ---আমারই আগের পুজোর একটি ঝকঝকে জামা ইস্ত্রি করে তার মধ্যে সব পুতুলগুলোকে বসিয়ে দিলেন | একটি জামার গলার কাটা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে আছে চারটে পুতুলের চার চারখানা প্লাস্টিক মুখ | চোখের নীল নীল মনি ,পিঙ্ক পিঙ্ক ঠোঁট | তাতেও মন ভরল না | ঘুরিয়ে দিলাম পুতুলগুলোর মুখ বিভিন্ন দিকে | অন্তত পাঁচ ছ দিকে | নাচতে নাচতে যে দিকে যাই সে দিকের পুতুল বলে ওঠে ---- এই দেখ নতুন জামা পড়েছি কেমন | গোটা জামাটাই কিন্তু পুরো আমার |

যাই ঈশান দিকে | আনন্দে নাচছে আমার ঈশানপুতুল | নাচছে আর দুলে দুলে বলছে ----- ভুল | মহাভুল | ওটা ওর কেন হবে ? এটা তো আমার ! কিনে দিলে না সেদিন ? বসিয়ে দিলে না আমায় তোমার জামার মাঝে ? ভুলে গেলে ----- ?

ময়ূর মালকিন ততক্ষণে ছুটছে পুব দক্ষিণে | কাঁদছে ঈশানী | দখিনা পুতুল হাসে !
 
পুতুল বেড়েছে শ শ | কমেছে জামার উলসুতো |
বড্ড ওরা গোটার জন্য চেঁচায় |
কান্না তার সূর্য হয়ে যায় |



কাঁদে না দজ্জাল

সেবার বহুদিন অনুপস্থিতির পর জলদি জলদিই মায়ের হাত ধরে স্কুল চলে এল দজ্জাল | গেটে ঢোকার মুখে দেখি ---স্কুলের পাঁচিলে বসে মায়ের ফোন নিয়ে কার কাছে যেন তার স্কুলকর্মের ধারাবিবরনী দিচ্ছে | তার মা বললেন ---ফোনে তার পিসি | স্কুলে এসে পিসিকে ফোন করা চাইই তার | আমি ঢুকতেই ফোনের ওপারে পিসিকে বলল ---- ওই ময়ূরী এল | আজ পড়াশুনো গেল আমাদের | বুঝুন ----
ডাক্তারি মতে ছাত্রীটি আমার " Blue Baby " | জন্মকালে অক্সিজেনের অভাবে ঠোঁট দুটো সেই যে তার নীল হয়ে গেছে তারপর সে দুটোতে আর গোলাপি রঙ ধরেনি | চামড়ায় ফলেনি ধানশীষ রঙ | তবু সে আসে | ভালোবাসে | ভালোবাসায় |

অন্যদিন এসেই শুরু করে তার Originality র খেলা | দজ্জালপনা | প্রথমে সতীর্থদের টেবিলে চেপে লাগাতার ডান্স | দাঁত কেলানো | আমার কাছে উদোম মার খাওয়া | তারপর আমারই কোলে চেপে বড়দের লম্বা লাইনটানা খাতায় এক থেকে পঞ্চাশ নির্ভুল লেখা | এবং Finally টিফিনকৌটো খুলে আমায় হাফটিফিনের লোভ দেখিয়ে আমারই থেকে ছুটি চাওয়া |

সেদিন কিন্তু এসে থেকে গুম হয়ে রইল | মাথা নিচু | চুলের ঝুটির ডগাটাও মাটিমুখে | অন্যদিন ছাদের খুঁটির মত উর্ধমুখী থাকে ঝুঁটি | জিজ্ঞেস করলাম --কী হয়েছে রে ? উত্তর নেই |

" বজ্জাত বল শিগগির | নইলে সুবহ সুবহ খুন হবি |" ---- চুপ | টিক্কিতে হাত বোলালাম | টান পড়তে পারে ভেবে রিস্ক নিল না | একদৌড়ে মাকে ডেকে আনল | মা বললেন , তিনি সিঁড়ি থেকে পিছলে গিয়ে পা ভেঙেছিলেন | তাই এতদিন আসতে পারেননি | মা কিন্তু বলেননি মেয়ের পিছনে দৌড়োতে গিয়েই তাঁর এই হাল |

অবাক হয়ে দেখলাম, যতক্ষণ মা তাঁর পা ভাঙার বর্ণনা দিচ্ছেন বজ্জাত গম্ভীর | বুড়োমানুষের মতো | মাঝে মাঝে উঠে গম্ভীরমুখেই মাইমে দেখাল কীভাবে পরেছেন মা | কোথায় কতখানি ব্যাথা জমে আছে মায়ের | নিজের পা আর কোমরে ছোট্ট হাতদুখানি চাপড়ে চাপড়ে চলল তার মায়ের ধপাস হওয়ার Acting |

স্কুল শুরুর ঘন্টা পড়ল | মা চলে গেলেন বাইরে -- যেখানে অভিভাবকরা বসেন | ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ | এক লাফে উঠল নীলমেয়ে | বন্ধ দরজাটি ধরে বসে পড়ল | একদম মেঝেতে | দুপা ছড়িয়ে হাউহাউ করে কাঁদছে মায়ের মেয়ে | কী বলছে বুঝতে পারছি না | জন্ম থেকেই পুরো বাক্য বলতে পারে না যে ! তবু অকুল পাথারে ছুটেছে তার কথা | যত বলি ---" মা তো দরজার ওপারেই বসে | স্কুল ছুটি হলেই দেখতে পাবি ---তোকে কোলে কোলে বাড়িও নিয়ে যাবে মা " ---সে তত বলে ---" খোল দরজা খোল | দেখিস না ? দরজা বন্ধ | ও আন্টি খোল | ওমা খোল |"
 
-----উফ ! দাঁড়া রে বাবা খুলছি |
বজ্জাতি হাসি তার খলখল |
আমার মাগুর মাছ ছলবল |
নহি তোর দিদিমণি |
আমরা দুই বান্ধবী |
ময়ূরী আর দজ্জালিনী |


শিশু বিষ্ণু

ভোরবেলা মনে হচ্ছে যেন কতকাল আগে ঘটেছিল ঘটনাগুলো | কতকাল আগে যেন আমাকে ঘিরে বসে থাকত উন্মুখ বাচ্চাগুলো | Differently Abled বাচ্চা তাদের different abilility প্রকাশ করতে যেন হাঁসফাঁস করত | সে কতদিন হলো ঠিক ? না হওয়া ভোরের আবছাভাব নাকি মহামারী আমার সময় ও তালজ্ঞান চুরি করল কিনা জানি না | তবে সামান্য দূরের অতীতকে যে আজকাল সুদূর অতীত মনে হয় এ সত্য স্বীকার করলাম | ভোরে চারপাশের ধ্বনি , মানুষের কথা কম থাকে | সুপ্ত সত্য বেরোয় অনর্গল | ওই যেমন ভোরে সূর্য দেখলেই মনে হয় ---এই দ্যাখো ঝটকা মেরে উঠে বসেছে গোল আলো |
 
অনেকসময় নগন্য ঘটনা জীবনে তুলকালাম ঘটায় | সেবার আমার ক্লাসরুমে তেমনি এক ঘটনা হলো | অনেকদিন ধরে মোটেই পড়াশুনো করছিল না একটি ছেলে | শাস্তি বা চকোলেট দিয়েও যখন কিছু হলো না তার বাবা মাকে ডেকে পাঠিয়েছিলাম | খানিকটা রূঢ় ভাষায় খানিক বকাবকিও করেছিলাম তাদের ----শুনুন এভাবে চললে কিচ্ছ্যু এগোবে না আপনার ছেলে | বড়ো মলিন মুখে তার বাবা চলে গিয়েছিলেন সেদিন | ব্যাথায় বিষাদে কোনোকথাই সে বলতে পারেননি|
 
পরদিন | দেখলাম খুব ভালো পড়াশুনো করে এসেছে ছেলে | ফটাফট কষে যাচ্ছে আঁক | আজ তার বাবাকে ডেকে বললাম --- খুব ভালো করেছে আপনার ছেলে | একগাল হেসে আমাকে আশ্বস্ত করলেন বাবা ----তুমি চিন্তা এত কোরো না দিদি ---তোমার ছেলে ঠিক পড়বে | কত সহজে তুমি ডেকে আমাকে তাঁর ভালোবাসার জন করে নিলেন এই অভিভাবক | নিজের চিন্তাকে দূর হটিয়ে আমায় বারণ করলেন চিন্তা করতে | আপন ছেলেকে করে দিলেন আমার | একেবারেই আমার | একটিও বাড়তি শব্দ উচ্চারণ না করে নিমেষে বুঝিয়ে দিলেন , বাচ্চার ভালোমন্দ চিন্তায় শিক্ষিকের অধিকার সবার আগে | মুখে বলতে পারিনি কারণ তখনো মহামারী শিক্ষক হওয়ার গর্ববোধ বা আভিজাত্যকে এমন করে কেড়ে নেয়নি | তবে নিভৃতে নীরবে ফাঁকা ক্লাসঘরকে কোনো এক ভাইয়ের দেয়া এ সম্মান বুক পেতে নিয়েছিলাম |
 
আভিজাত্য শব্দ নিয়ে আপত্তি হচ্ছে তো আপনাদের ? কিন্তু কী করে অস্বীকার করি শিক্ষক হওয়ার সেদিনকার শ্লাঘাটুকু ? আবার মজা দেখুন ---আমার অত অহং হটিয়ে দিত -- নীতিনিষ্ঠ কেঠো দিদিমণি হওয়া থেকে বাঁচিয়ে দিত কিন্তু আমার differently Abled বাচ্চাগুলো | একদিন ড্রইংক্লাসে আঁকতে দিলাম এক জোড়া সবুজ পাতা | মা শকুনের মত লক্ষ্য রেখেছিলাম " সেই একদিন পড়া করা আর পরদিন না পড়া " বাচ্চাটার দিকে | দেখি পাতায় সবাই দেয় সবুজ রঙ আর সে ভরছে গাঢ় বেগুনি রঙ | আচ্ছা করে কান মলে বললাম ----হতভাগা পাতায় সবুজ লাগে জানিস না ? কানে তো শুনতে পায় না এরা | তাই আমার কথা কানে নেয় আর কী করে ! বোবা কানটায় হাত বুলিয়ে একমনে ঐ বেগুনি রঙই দিতে লাগলো পাতার পর পাতা | এ বাবা ! বেগুনীর অন্ধকারে আবার দিতে শুরু করল উজ্জ্বল হলুদ | হলুদ আর কমলা | এক জোড়া সবুজ পাতা থেকে জোড়ায় জোড়ায় কমলা বেগনে পাতায় এখন ভরে উঠেছে তার খাতা | ছেলেকালে যে যে পাতায় রথ সাজাতাম ঠিক অমন রঙের ঝাড় বেঁধে বেঁধেই সাজিয়েছে সে | ঝাঁক ঝাঁক কালো ঘেঁষা পাতায় লাগা কমলা রং | পাতার মাঝে এখন টুকরো আলো রশ্মি | যেন সূর্য সাফ করছে আঁধার | অপেক্ষা একটি রথের | দেবযানে বসবে আমার জ্যান্ত বুদ্ধদেব |
 
কাল বাংলার শিক্ষক মৌসুমী গোস্বামী বললেন ---কষ্ট করে লেসন তৈরি করে দিচ্ছি অনলাইনে | ছাত্র বলল ----শরীর tired ম্যাডাম --আপনি ক্লাস করে রাখুন --পরে দেখে নিচ্ছি | ছাত্রটির কথা বলার ঢঙে ছিল --অনলাইনে মাইনে তো পাচ্ছেন --এত কথা কী ? মৌসুমী পুরোনো দিনের শিক্ষক -- মা বাবার কাছে ছাত্রের এই দুর্বিনীত ব্যবহার বললেন | সন্তানকে সামান্য না বকে ---অনলাইনে ইন্টারেস্ট পায় না তো ! আমি বললাম মৌসুমীদিকে --কেন অত কথা বলতে গেলেন আপনি ? এটা তো প্রাইভেট টিউশন | টাকা নিয়ে লেসন দিয়ে ছেড়ে দিন | মৌসুমীদি বললেন ----টাকা সব ? আমি তো মন দিয়ে বাড়তি সময় দিয়ে পড়াচ্ছি --ছাত্রের কাছে আমার বাড়তি প্রাপ্যটা কেন পাব না ? প্রাপ্য বলতে বোঝাতে চেয়েছেন --ছাত্রের দেয়া সম্মান , শ্রম মনোযোগ | কি তাই তো ? তাই তো আপনি বোঝাতে চেয়েছিলেন দিদি ?
 
হারাচ্ছে | এই অনলাইন " পাস ফেল নেই নেই " বিদ্যাচর্চায় শিক্ষক ছাত্র অভিভাবকের সেই টান টান সুরটি হারিয়ে গেছে | যাচ্ছে | হয়ত ছোঁয়াচে রোগ ছড়াবার কালে বিদ্যার্জনের এই সিস্টেম সঙ্গত ছিল ---আরো সঙ্গত হয়ে যাচ্ছে বোধহয় বিদ্যার প্রার্থনা ও অর্জনের বিনয়মাধুর্য হারিয়ে যাওয়া | 
 
খেদ করে লাভ নেই | অপেক্ষায় থাকি ---সেই ছাত্রের যে শ্রবনেন্দ্রিয়ের অসঙ্গতি নিয়েও খাতায় সঙ্গত করে তুলেছিল গাছের পাতার সম্ভাব্য প্রতিরঙ | Differently Abled বাচ্চা তার ভিন্ন বিভিন্ন প্রতিভায় শিক্ষকের কানমলাকে লঘু করে ফেলার জোরটা দেখাতে পেরেছিল | ওই বহুবরণ পাতায় ভরা ড্রইংখাতা ছিল সেদিন আমার প্রাপ্তি |
 
ফিরে আয় বুদ্ধ ---তোর মহাজ্ঞান নিয়ে |
আমি তো জেগে আছি রে |
আর কোনোদিন তোর কান্না মলবো না |
শুধু একটি ভোর আঁকা ছবির বায়না করব | তুই না দিলেও তোর বাবা সেটি আমার হাতে তুলে দেবেন রে বুধুয়া | দেখিস -----
আর কাঁদব না | তুই না আমিও না |


আনন্দে
 
আজ ভোরে গাছগুলোর সাথে হেব্বি মহব্বত জমেছিল আমার | হাওয়ার ঘাড়ধাক্কা খেয়ে গন্ধরাজের ডালটা সেই ঢুকেই পড়ল বিছানায় |ঢুকেই একদম হলায়গলায় আমার সাথে | আমাদের এই সল্টলেকের বাড়িটা গাছপালায় ছয়লাপ | রোদ জল পেয়ে পেয়ে গাছগুলো সারাক্ষণ এমন টগবগ করতে লাগে যে মনে হয় বাড়িটাই বোধহয় ক্ষেতখামার হয়ে যাবে যে। কোনো দিন | একেকটা গাছের এক একটা গল্প | ঠিক বাঁ কোনায় একটি নিমগাছ | আমার কিশোরকালে সে নিমগাছে নিয়মিত আসতো এক কাঠঠোকরা | নিজের খেয়ালে সে নিমকাঠে দাঁত ঘষটে যেত | আর নিঝুম দুপুরে সে ঠোকরানির শব্দে , চক্ষু মুদে দুলতে দুলতে ভাবতাম , এই বুঝি কোনো সুন্দরপানা যুবক দরজা ধাকাচ্ছে | চোখ খুলে দেখতাম , পাড়ার নোংরা হলুদ দাঁতওয়ালা ছেলেটা নিমডালে দুলছে | দুলছে আর হাসছে | এর ফলে হত কি , নিমগাছ ও কাঠঠোকরা দুটোকেই এনতার মুখখারাপ করতাম আমি | আমার ঠাকুরদার আবার গাছদের ঠাঁইনাড়া করার অদ্ভুত এক বাতিক ছিলো | যে গাছটা ধরুন বাড়ছে না বা অকালে শুকিয়ে বুড়ি হয়ে যাচ্ছে , তার ঘেঁটি ধরে অন্য জমিতে বসিয়ে দিতেন ঠাকুরদা | অন্য জমি মানে বেশি আলো বাতাস জলের জমি | যে জমিতে ফলে ভরে গাছ | আর সেই ফল দেখে মাটি হয় সুখী | বলে ,দাও দাও আরো যুবক প্রাণ ! কতবার দেখেছি , হাঁ হাঁ করে তেড়ে আসছে মালি |করছেন কি করছেন কি ! বার বার জমি বদলালে গাছ মরে যাবে যে | ঠাকুরদার যুক্তি, গাছ কচি শিশুর মতো | শিশু যেমন সারাক্ষণ বাড়িতে আটকা থাকতে পারে না, মাঝে মাঝেই তাকে আলো হওয়ায় খেলিয়ে আনতে হয় ,গাছও তেমনই এক খোকাবাচ্চা | তো এইসব মাটি ফুঁড়ে উঠে আসা খোকাবাচ্চার দলও নাহয় তেমনি ভাবেই বেড়িয়েচেড়িয়ে এলো |আমি এই গাছগুলোকে ডাকতাম বেদুইন বলে | আমার দার্শনিক ঠাকুরদার হাতযশে বেদুইন গাছের মরনদশা ঘনাত দ্রুত |
 
গাছ ও গাছের ফল নিয়ে অদ্ভুত এক নৈর্ব্যক্তিক বোধ ছিল তাঁর | বলতেন গাছের যেমন নির্দিষ্ট কোনো জমি নেই , সারা পৃথিবীটাই গাছের তেমনি ফলেরও কোনো একা একজন মালিক বা ভক্ষক নেই | বরং দেশছাড়া ক্ষুধার্তকেই খাবার দিয়ে নাকি বেশি পুলকিত হয় গাছ | অতএব সারা পৃথিবীর মানুষের জন্য নির্দিষ্ট হয়ে গেল আমাদের গাছের ফলফুলুরি | সবাই আমাদের বাড়ির ফুল যাতে নির্দ্বিধায় নিতে পারে , একগাল হেসে ভোর ভোরই বাগানের দুয়ার খুলে দিতেন ঠাকুরদা | ভোরের ফুলচোর লজ্জা পেত | ফুলের মালিক বেলাজ | দরাজ হাতে ভোরের ফুলের সম বিতরণ | অভাব ঘটতো বাড়ির পুজোর ফুলের | গাছের ফুল নিঃশেষে বিলিয়ে ছুটে মর ফুলবাজারে |
 
চিৎকার করে খাবার চাইত পাশের বাড়ির ক্ষুধার্ত কাজের মেয়েটি | বাংলদেশ থেকে এসেছিল সে | পথঘাট কিছুই চিনত না  ব্যবসাদার মালিকের থেকে পেটভরা খাবার না পাওয়া সত্ত্বেও পালাবার কথা ভাবতেই পারত না সে | সদরে আটকানো থাকত মস্ত দুই তালা | বন্ধ ঘরে দাঁড়িয়ে আমাদের বাড়ির দিকে কেবল তাকিয়ে থাকত ফ্যালফ্যাল রুখু চোখে | ঠাকুরদা সেবছর নিজের হাতে গড়া হিমসাগরের সবচেয়ে বেশিসংখক আমে ভরা ডালটি এগিয়ে দিলেন তার ঘরের জানলায় | অবাক হয়ে দেখেছিলাম , পড়ন্ত বিকেলে আম চুষতে চুষতে বড় কামনায় ডালেই মুখ ডলছে কিশোরী | সারা গালে আমের মাখম মাখম হলুদ রস | একদঙ্গল খুকিসাথী হয়ে আমপাতাগুলো জড়িযেছিল কিশোরীর খিদেমুখ | ওমা কী সুখ কী সুখ ! এই কি গোধূলিসুখ ?
 
 
কঙ্কাল তুই আয়

সে ছিল আর এক সময় | নাগেরবাজারে আমাদের অঞ্চলটায় তখনো উচ্চতলার খোপপঘরের সংখ্যা তখনো কম | পুরোনো দেয়ালে গাছ গজানো ঘরপাতি তখনো দেখা যায় | 
 
আজ যেথায় আমার ঘর ,তার ঠিক দশ কুড়ি পা দূরে ছিল মস্ত এক পুরানা বাড়ি | রোজ দেখতাম | ঘুরেফিরেই দেখতাম বাড়িটাকে | দিনের মধ্যে দু তিনবার করে দেখতে দেখতেই বাড়িটার প্রতি একটা ঘোর জন্মাচ্ছিল আমার | মেঘের ছায়া পড়া শীতল দুপুরে যেমন জীর্ণ কাঁথা তোষকে মানুষের একটা মায়া জন্মায় ---জন্মাতেই থাকে ---ঠিক অমনটা | 
 
মায়ায় জড়াতে জড়াতেই আধখানা ছাদ উড়ে যাওয়া বাড়িটাকে মনে করতাম পুজোর শেষের ক্লান্ত কালী --- যার বিসর্জন হয়েও হয় নি | খড় বেরিয়ে আসা কালীপুতুলটিকে যেন ফের নড়া ধরে তুলে এনে বসানো হয়েছে গঙ্গাপাড়ে ----নতুন বাহার পাবে বলে অপেক্ষায় সে কালী | ঠিক ঐরকম লাগত রঙিন ফ্ল্যাটের মধ্যে ঝুপুস বসা কেলে বাড়িটাকে | 
 
বাড়িটায় ঢোকার মুখে যে জিনিসটা আমায় প্রথম জ্বালাতন করত তা হলো বাড়িটার গাছে বসা নিশ্চুপ পাখিগুলো | বর্ণহীন এইসব পাখির দল কোথা থেকে এসে জুটত , কেনই বা কথা না বলে অনাদিকাল তারা থম মেরে থাকত কে জানে ! কিন্তু ভারী অবাক হতাম জানেন ? ---- দেখতাম সে পাখির দলে নেই একটিও হলুদ সবুজ বদরী | ক্রমশ ঐ সার সার বেমালুম চুপচাপ পাখিগুলোকে বাড়িটিরই একটি রকম বলে ধরে নিয়েছিলাম | সে তবু একরকম হলো | 
 
সবচেয়ে নিরাশ হতাম যখন দেখতাম বাড়িটার খেসটো লাল বারান্দায় বসে আছে এক হাড় জিরজিরে মিশকালো বুড়ো | ফিনফিনে মসলিন সুতোর মতো কাঠি হাতপায়ের পাহারাদারটির নাম দিয়েছিলাম মিহিকঙ্কাল | বাড়িটার সাথে সাযুজ্য রেখে লোকটার এই নামটিই যুৎসই লেগেছিল আমার | অদ্ভুত নিরাসক্ত চোখ | সে চোখ আসতেও বলে না ---এলে মানাও করে না |
 
মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে বাড়িটায় ঢুকতে লোভ লাগলেও অন্তত মিনিট পাঁচেক দেরি করে ফেলতাম লোকটির চোখে চোখ রাখতে গিয়ে | নিষেধ বা আহবান মানুষের পথ নিশ্চিত করে | হ্যাঁ বা না কোনোটাই না করে অনিশ্চিত বুড়া কঙ্কাল কেবল ধন্দই বাড়িয়ে যেত আমার | 
 
ফুটপাথের কচুরির দোকান থেকে মিহিকঙ্কাল সম্বন্ধে খবর নিলাম। এক ফাজিল কচুরিখোর বললো ----কঙ্কালের বউ তো পালিয়েছেই এবং যেদিন বৌ পালালো সেদিনও নাকি এমনি casual ছিল কঙ্কাল | পালাবার পরেও বৌয়ের প্রেমিক নাকি মিহিকঙ্কালের সাথে বসে থালাভর্তি ভাত খেয়ে গ্যাছে | বউয়ের দু নম্বর ভাতারের সাথে জোড়া থালায় ভাত খেতে খেতে জীবনে নাকি প্রথমবার লোলুপ হাসি হেসেছিল মিহি |
 
কী ঘেন্না ! কী মধুর সে গা গুলোনো | মিহিকঙ্কাল সম্বন্ধে একচুলও ভিজত না কি মন ? কতদিন রাগ করে ভেবেছি --সত্যি তো ! এক মরাকাঠে কতকালই বা শরীর ঘষবে বউ ! মিহিকঙ্কাল নিয়ে গুছিয়ে খিস্তি চালাতাম | রসে ভরতো জিভ | মনে ফুটফুটে জোছনা | আরে তখন তো আমি এক ফুটের মেয়ে ! ল্যাম্পপোস্ট খুঁজি --- গা ঠেসব তো !
 
শীতের সন্ধ্যা গড়াগড়ি দেয় | ফিরতি পথে দেখি , বারন্দায় বাল্বের কম কম আলোয় সে বসে | ধোঁয়া ধোঁয়া সে সব সন্ধ্যেতে আরো আবছা হয়ে যেত কঙ্কাল | না দেখেও বুঝতাম এখনো লাজহীন চোখদুটি সে যে মেলেই রেখেছে মেইনগেটে |
 
বাড়িটি ভাঙা পড়েছে | ভাঙা ইঁটে লাথ মেরে এখন নয়া বসত | সেখানে যেতে নেই মানা | তবু পা সরে না | সাজানো গেটে হাসিমুখে দারোয়ান | আমি খুঁজি তারে | আমার মিহিকঙ্কাল | রঙহারা কালীপুতুল |
 
দেশ ভরছে খিদে খিদে চ্যাটালো মানুষে | কঙ্কালদলে কোথায় খুঁজি আমার না হওয়া ভাতারকে ?
 
জাগ কঙ্কাল জাগ।
-------------------
 
লেখক পরিচিতি:
ময়ূরী মিত্র
গল্পকার। নাট্যগবেষক। প্রাবন্ধিক
কলকাতায় থাকেন।

১০টি মন্তব্য:

  1. অসাধারন একটা গল্প পড়লাম। মন ভরে গেল।

    উত্তরমুছুন
  2. শুভ্র মুখোপাধ্যায়৩ নভেম্বর, ২০২১ ৯:৫৫ AM

    অসামান্য অপূর্ব গল্পগুচ্ছ মনের গভীরে মাখামাখি।
    সুগন্ধী এক বহুদিনের চলে যাওয়া মানুষের ফুরিয়ে যাওয়া আতরের শিশি
    খুলে ফেলা অনুভূতি।
    থৈথৈ ডুব দেওয়ায় কোন গভীর গহীনে।
    Only মহব্বত আমায় হৃদয়ে পশিল।
    আর পড়বোনা এখুনি শেষ হয়ে যাবে যে
    এ আমার চুরি করা আচার।

    উত্তরমুছুন
  3. প্রত্যেকটা লেখা ধরে ফিরে পেলাম হারিয়ে যাওয়া দিন গুলো আর মনগুলো। " আয় রে আমার কঙ্কাল"

    উত্তরমুছুন
  4. Again I have to repeat myself.You always keep in a dillema that which I read out with one breath-- are those imaginary stories or facts which has happened!!! You always enriched me.It will be a never ending process....... Lots of Love.My Best Wishes to you.

    উত্তরমুছুন
  5. খুব খুব ভালো লাগল !! স্বল্প সবুজ বড্ড ভালো। শুভেচ্ছা তোমায়

    উত্তরমুছুন
  6. শুভেচ্ছা অনন্ত। সবগুলোই পড়ে ফেললাম। আসলে না পড়ে থাকা গেল না। খুব আপশোষ হচ্ছে,কেন আপনার মত করে অনুভব করতে পারি না। আবার এ কথা ভেবে শান্তি পাচ্ছি...আপনি তো আছেন। আমার না লেখাগুলোকে দেখিয়ে দেওয়ার জন্য। না বোঝাকে বুঝিয়ে দেওয়া আর অনুভূতিগুলো কে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। ভাল থাকবেন খুব।

    উত্তরমুছুন
  7. কানের গোড়ায় আতর না হলে শহীদ হয়ে যাবে ঈদ, আর ভুলু ফ‍্যালফ‍্যাল করে চেয়ে থাকবে খালি। এদিকে মোরা তিনজন অথচ একটা হতভাগা সুতোর অভাবে হবে না মালা গাঁথা আর রড ধরে ঝুলিয়ে ছাড়লেও কম হবেনা জীবনীশক্তি এক ফোঁটা। মনের চোখের ব‍্যাপ্তির এই সুগন্ধিতে এক এলোমেলো আচ্ছন্নতা আছে।

    উত্তরমুছুন
  8. গল্পগুলি পড়ে মনে হলো চান করে উঠলাম। কী চোখ আপনার! এগুলোর মধ্যে আপনার যে পরিচয় ফুটে উঠেছে তা এক মরমি প্রকৃতিবালিকার। Only মহব্বত গল্প আগেই পড়েছি। শ্রদ্ধা জানবেন।

    উত্তরমুছুন