মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের গল্প : চিতা

রাস্তার ধারে ঘাসের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। কে একটা ছেলে। নয়দশ বছর বয়েস। শুয়ে আছে, কিন্তু ঘুমিয়ে আছে মনে করা যায় না ।

মরে আছে।

লক্ষ্য করলেই মুস্কিল। দাঁড়াতে হয়, খোঁজ নিতে হয়, মড়া সরাবার ঝক্কি নিতে হয়। অন্তত একটু শোকার্ত ভঙ্গি করতে হয়। আর শোকার্ত ভঙ্গি করতে গেলেই তাড়াতাড়ি পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়া যায় না।

তাই সকাল থেকে পড়ে থাকলেও ভিড় হতে প্রায় দুপুরের কাছাকাছি। আর, যারা ভিড় করেছে বেশির
ভাগই তারা এমনি পড়ে থাকবার মরে থাকবার মুখে।

জায়গাটা পাড়ার এলেকায়। আদালত-ডাক্তারখানা সব এক ডাকের পথ। ঠেকনা-দেয়া খড়ের চালের ঘরের সামনে কটা উকিলের সেরেস্তা।

ছেলেটা একেবারে নির্জনে এসে মরেনি। আর সেটাই তার নির্লজ্জতা। কাছারির বেলা বাড়ছে দেখেও
ভিড় ঠেলে উঁকি মারতে হয়। একটু মায়া করতে হয়, রুদ্ধ নিশ্বাসের সঙ্গে তপ্ত একটা অভিশাপ চেপে
রাখতে হয় বুকের মধ্যে। এ এক অকারণ অস্বস্তি। ভাত খেতে-খেতে হঠাৎ কাকর চিবানো।

কেউ বলছে, কাহারদের ছেলে। কেউবা বলছে, মুচি, কেউ বা, কাপালি।

কিন্তু, সৎকারের ব্যবস্থা তো করতে হয়। কেউ বললে, মিউনিসিপ্যালিটিতে খবর পাঠানো হয়েছে, কিন্তু তাদের কারো দেখা নেই।

এতো আর মরা বেড়াল নয় যে ডোম এসে এক দরজা থেকে তুলে নিয়ে আরেক দরজায় ফেলে রাখবে। একে একেবারে কাঁধে করে নিয়ে যেতে হবে নদীর ধাপায়, শ্মশানে।

অভ্যাসবশে সন্তোষ বেরিয়ে এসেছে। পরনে স্ট্যাণ্ডার্ড ক্লথ, গায়ে খন্দরের ছিন্নাবশেষ। যেন এটুকুই তার আভিজাত্য। শরীরে অনেক জেলখাটার দাগ, ক্লান্তির গ্লানিমা। চোখে নিরাশ্রয়ের চাউনি। তবু অভ্যাসবশে, কিছু একটা না করলে নয়। চিরকেলে সেই চেষ্টার চাঞ্চল্য।

‘একটা তোমরা খাটুলি জোগাড় করতে পারলে না? কাঁধ দেবার লোক নেই তোমাদের মধ্যে? রোদ্দুরে পুড়ে মরবে ছেলেটা?

কে কার দিকে তাকায়। বেশির ভাগই ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাড়ির থেকে বের করে দেওয়া। মরা পেটে টিং টিং করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কেউ বা পেটে দড়ি দিয়ে পড়ে আছে এক পাশে। কেউ বা বসে যাচ্ছে একটু-তার মানেই, যেতে বসেছে।

মরা ছেলেটার দিকে কেউ একবার ফিরে তাকাচ্ছে না। রাস্তায় এমন অনেক তারা ছেলে দেখে এসেছে, রেখে এসেছে। ছেলেটার তবু ভাগ্য ভাল, মরবার পরে হলেও খাটে চড়বে!

কিন্তু এরাই তো সব নয়। মক্কেল-মহুরি আছে, আমলা-ফয়লা আছে, কিছ চাঁদা জোগাড় হবে না? সন্তোষ আদালতের হাতার মধ্যে এগিয়ে গেল। সাক্ষী-সাবুদ, দালাল-ফড়ে, মোড়ল-মাতব্বর-সবার কাছে সে হাত পাতলো। একখানা দড়ির খাটুলি।

দু-পয়সা চার-পয়সা করে মন্দ উঠলো না। যত ওঠে, সন্তোষ তত হাত বাড়ায়। ছেলেটাকে নতুন কাপড় পরিয়ে চন্দনকাঠ জ্বালিয়ে পোড়াবে নাকি? খাটুলি ছেড়ে যে প্রায় চৌদোলা জোগাড় হবে।

‘কি, হল কত?’ নারন জিজ্ঞেস করল।

পরনে পা-জামা, পায়ে কাবলি চটি। অনেক তাজা ও তেজী। এখানকার সাহেবের ছেলে। অগ্রপন্থী।নাম ছিল নারায়ণ। সেটা নিতান্ত হিন্দু নাম বলে নারনে বদলে নিয়েছে। নারন মানে না-রণ; যুদ্ধ নয়,আপোষ।

‘কি, পেলেন কত?’ নারন হুমকি দিলে।

প্রায় সাড়ে চারটাকা— সন্তোষ বললে হাতের মুঠি খুলে।

‘তবেই দেখুন, রাই কুড়িয়ে বেল-মেনি এ পিকল, মেকস এ মিকল!

কি হবে এত পয়সা দিয়ে? ‘খাটুলি, দড়ি, কাঠ, কলসী-অন্তত গামছা একখানা-‘

‘হ্যাঁ-শবের আবার শোভাযাত্রা । পেয়াদার আবার শ্বশুরবাড়ি। আপনাদের যত সব বাজে সেন্টিমেন্ট। দিন,পয়সাগুলো দিয়ে দিন আমাকে।

সন্তোষ যদিও বয়েসে নারনের চেয়ে এক যুগ বড়, তবু নারনেরই এখন দাবি বেশি। তারই এখন পড়তা পড়েছে। পাল্লা এখন তারই দিকে ভারি। শিষ্য-সাগরেদ এখন সব তার দিকে।

প্রায় ছোঁ মেরে পয়সাগুলি নারন তুলে নিল।

বললে, দুটো বাঁশ আর কিছু দড়ি হলেই যথেষ্ট। যে মরে গেছে তার জন্যে আবার মায়া কিসের?

‘একখানা বাঁশের দাম এক টাকা। আর দড়ি-‘

কিনবে না আরো কিছু। ওই সামন্তদের বাঁশঝাড় থেকে দুখানা কেটে নিয়ে আসব জোর করে। আর, খোঁটায় ঐ গরু বাঁধা দেখছেন? দড়ির জন্য ভাবতে হবে না আপনাকে।

‘অন্তত একখানা মাদূর-‘

আপনাদের যত সব পচা সেন্টিমেন্ট। মর্গে কেমন মড়া নিয়ে যায় দেখেন নি? তেমনি বাঁশে বেধে ঝুলিয়ে
নিয়ে যাব। মাদুর, না গালচে এনে দেবে মখমলের।

ও তো মুর্দাখানার মড়া নয়। সন্তোষ আপত্তি করে।

‘বেশ, মাদুর লাগে, মুহুরিদের কার সেরেস্তা থেকে টেনে নিয়ে আসবেন একখানা।‘

“কেন, এ পয়সা দিয়ে তুমি কি করবে?’ সন্তোষ প্রায় রুখে উঠল।

যারা এখনো মরেনি তাদের সৎকার করব।

‘তার মানে?”

‘এই যারা ভিখিরি, হাঁপাচ্ছে বসে-বসে, তাদেরকে খাওয়াব। বেলের শুকনো খোলাটা নোখ দিয়ে কেমন
আচড়াচ্ছে ঐ বুড়ো , দেখছেন? ঐ মেয়েটা কেমন পাতা চিবিয়ে খাচ্ছে?”

প্রথমটা সন্তোষ বলতে পারল না কিছুই। যেন ঠেকে গেল, হোঁচট খেল। মতের চেয়ে মুমূর্ষকেই যেন বেশি অসহায় মনে হল।

কিন্তু, না, তা কি করে হয়?

‘যারি জন্যে তুলন, পাঁচ জনের পয়সা পাঁচ জনের কাজে ব্যয় হবে। এখানে এখন এক জনের চেয়ে পাঁচ জনের দাবি বেশি।‘ নারন চিবুকটা ভারি করল।

আশ্চর্য, পাঁচজন যারা ভিড় করে দাঁড়িয়েছে তাদেরও তাই মত। যে আগেই মরেছে, তার চেয়ে যে এখনিই মরবে তার ব্যবস্থাটাই আগে।

‘ঝগড়া-বচসা করে লাভ নেই। মুরব্বি-মতন কে একজন রফানিষ্পত্তি করতে এগিয়ে এল। খাটও হোক খাওয়াও হোক।।

‘খাট হবে, না হাওদা হবে! পয়সা নিয়ে নারন চলে গেলে দোকানের দিকে।

কাঙালদের খাওয়াতে হয়, তার বন্দোবস্ত তো সন্তোষই করতে পারত। কর্তৃত্বের ভার তার হাত থেকে এমনি কেড়ে নেয়ার মানে কি! এ যে প্রায় উড়ে এসে জুড়ে বসা। উড়ুক্কু ফাজিল কোথাকার।

এক ধামা মুড়ি কিনে নিয়ে এসেছে নারন। সঙ্গে বোঁদের ছিটে। ক্ষুধার্তের দল হাউমাউ-খাউ করে উঠল।

নারন ভেবেছে কি। সন্তোষ ফের নতুন করে চাঁদা আদায় করবে। এবার বনেদি বাবর মহলে। দেখি ছেলেটার জন্যে খাটুলি হয় কি না।

যাদের পরনে কানি-নেকড় আছে, অতি কষ্টে তারি এক প্রান্ত খুলে মুড়ি নিচ্ছে দুমঠো। যাদের তাও নেই বা টেনে খুলতে গেলে ফেসে যাবে, তারা নিচ্ছে আঁজলা করে। কেউ বা কচু বা কলার পাতায়।

অনেক হুড়-দঙ্গল। কেউ বলে, বোঁদে পড়েনি এক কণা। কেউ বলে, থাবা মেরে কেড়ে নিয়েছে ও।

‘এবার কিছু, এ বেলের খোলে দাও, বাবা’ সরু ঠ্যাঙে টলতে- টলতে সেই বুড়ো আসে এগিয়ে। দেখছনা, ওরও পেট কেমন খোলে পড়ে আছে।

নারন ধমক দিয়ে ওঠে।

‘অনেক দূর যেতে হবে, বাবা। খেয়ে না নিলে গায়ে জোর হবে কেন?”

কিছু না ভেবেই পক্ষপাত করে ফেলে নারন। অনেক দূর যেতে হবে-কথাটা কেমন যেন সত্যি শোনায়। তাদের দলের কথা।

কোথায় বা খাটুলি কোথায় বা বাঁশ-দড়ি, ছেলেটা তেমনি উপড় হয়ে শুয়ে আছে। উড়ে-উড়ে বসছে কতগুলি কুকুরে-মাছি। থেকে-থেকে ঝরে পড়ছে কটা শুকনো পাতা। |

কে একটা লোক, বলা-কওয়া নেই, সরাসর ছেলেটার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। গা-পা খালি, হাঁটুর উপরে কাপড় তুলে কোমরে আঁট করে বাঁধা। মাথায় গামছার ফেটি।

‘কে, কে তুই? বেকার দর্শকের দল ব্যস্ত হয়ে উঠল।

‘আমি মুরদফরাস। মুনসিপালির ডোম।

‘দাঁড়া, খাটুলি আসছে’ বললে সন্তোষের লোকেরা।

‘দাঁড়া বাঁশ কেটে দিচ্ছি। মাদুর আর দড়িও জোগাড় হয়ে যাচ্ছে’ বললে সন্তোষের লোকেরা।

ভূষণ ডোম উসখুস করতে লাগল। বাঁশ-দড়ি নিয়ে নন্দ ডোমেরও আসবার কথা পিছু পিছু, তারো দেখা নেই। কোন দিকে কেটে পড়ল কে বলবে।

সুন্দর ছেলেটা। একেবারে হাড়-গোড় বের করা নয়। আশ্চর্য, পেটটা এখন ফোলা, যেন কত খেয়েছে। মাথায় একরাশ চল। ঠোঁটের কাছে দুদিকের দুটো টানে মুখখানা যেন মায়ায় ভরা।

কোথায় কাটা বাঁশ, কোথায় বা দড়ির খাটুলি। কোথায় বা নন্দ ডোমের কাঁধ ! ভূষণ দুহাত দিয়ে ছেলেটাকে হঠাৎ বুকে তুলে নিল। এমনি পাঁজা কোলে করেই নিয়ে যাবে শ্মশানে। হাত ব্যথা করলে কাঁধে তুলে নেবে। এক কাঁধ থেকে না-হয় আরেক কাঁধে।

তখন জল খাবার সাড়া পড়ে গেছে ভিখিরিদের মধ্যে। অনেক জল তারা খেয়েছে, কিন্তু খাওয়ার পরে খায়নি এমনি অনেকদিন। এমনি নোনতা-নোনতা মিষ্টি-মিষ্টি মুখে। জলের স্বাদ বেড়ে গেছে অনেক। | ‘দাঁড়া বাবা, আমিও খেয়ে নি’ বললে সেই বুড়ো। পুকুরের ঢাল ধরে তরতর করে নামতে গিয়ে পড়ে গেল আচমকা। তখনিই উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “কিছু না, কিছু না। গায়ে এখন জোর হয়েছে অনেক। এবার পেটে জল পড়লেই হাঁটতে পারব অনেক দূর।

প্রায় এক পো রাস্তা হেটে এসেছে ভূষণ। খানিকটা পথ কেউ-কেউ এসেছিল পিছুপিছু। সন্তোষের দল হরিধ্বনি দিতে চেয়েছিল, নারনের দল উঠেছিল শাসিয়ে। বলেছিল ডোমের হাতের মড়া, ও সব সাম্প্রদায়িক ডাক চলবে না।

ভূষণ লক্ষ্য করে দেখেনি কতদূর গড়াল সেই ঝগড়াটা। কেননা আর এগোয়নি তারা তারপর।

এতক্ষণে পুলের কাছে নন্দর সঙ্গে দেখা। বাঁশ আর দড়ি নিয়ে এসেছে নন্দ। তাও বাঁশ বলতে ঘরপোড়ার একটা খুটি, আর দড়ি বলতে কাতা।

দে, বেঁধে ফেলি এবার। মুখের বিড়িটা ফেলে দিয়ে নন্দ বললে।

‘এতক্ষণ ছিলি কোথায় ?’ ভূষণ খেকিয়ে উঠল।

‘ কাজ ছিল।‘

‘কাজ আবার কি!’

‘গাঁজা কিনতে গিয়েছিলাম’ হাসল নন্দ।

ভূষণের রাগ জল হয়ে গেল নিমেষে। জোঁকের মুখে যেন নুন পড়ল।

‘এরি মধ্যে তুই যে ঘাড়ে করে লাশ নিয়ে আসবি তা কে জানে। দে, একে বেঁধে ফেলি চটপট। আমার ট্যাক থেকে কলকে খুলে নিয়ে ততক্ষণ ধরা এক ছিলিম।‘

ভূষণ ছেলেটাকে নামিয়ে রাখছিল মাটির উপর, পিছন থেকে কে একজন বলে উঠল ব্যস্ত হয়ে,’ না না, বাঁধতে হবে না। ওকে এবার আমার কাছে দে। বাকি পথটুকু আমি নিয়ে যেতে পারব।'

অবাক হয়ে ফিরে তাকাল দু’জন। কে-একটা বুড়ো। তে-ব্যাঁকা।

ভূষণ যেন চিনতে পেরেছে তাকে। পুকুরপাড় দিয়ে যাবার সময় তাকে যেন একবার ডাক দিয়েছিল। যেন বলছিল, দাঁড়িয়ে যেতে। তারপর কখন যে-গুটিগুটি চলে এসেছে পিছুপিছু, খেয়াল করেনি।

‘খুব নিয়ে যেতে পারব। গায়ে এখন আমার অনেক জোর হয়েছে। খেয়ে নিয়েছি এক পেট। দে, বাছাকে দে এবার আমার কোলে। রোদ্দুরে বাছার মুখ কেমন আমলে গিয়েছে। কতদিন খায়নি! আর ও খায়নি বলেই তো আমরট আজ সবাই খেতে পেলাম।

ভূষণের কোল থেকে ছেলেটাকে বুড়ো দুহাত বাড়িয়ে বুকে তুলে নিল। কিন্তু দুপা হেঁটেই বসে পড়ল টলতে টলতে। প্রায় হুমড়ি খেয়ে। বললে, তোরা ততক্ষণ গাঁজা খা, আমি বাছাকে নিয়ে একটু বসি। জিরিয়ে নি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন