মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

অনিল ঘোষের গল্প : রয়াল বেঙ্গল সংবাদ



প্রথম কে দেখেছে তাই নিয়ে জোর তর্ক। কুসুমতলির হাটখোলায় নাড়ু সাধুখাঁর দোকানের সামনে পাতা ধরাটে বসে কথার ফুলঝুরি ছুটছে। হরিপদ দাস জোর গলায় বলে, বাগদার মিনভর্তি হাঁড়ি মাথায় নিয়ে সে জোর পায়ে হাঁটছিল কুসুমতলির ঘাটের দিকে। সেখানে আসাদ মিয়া ভটভটি নিয়ে অপেক্ষা করছিল। তাড়া ছিল খুব। কালুপুরার খালের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ কানে আসে জলে ছপছপ শব্দ। বড়ো মাছ ঘাই দিলে যেমন আওয়াজ হয়, সেইরকমই। মাছ ভেবে হরিপদ দাঁড়িয়ে পড়েছিল। তখন মুখ আঁধার। কালুতলির জঙ্গল ছুঁয়ে চাঁদের আলোর রেখা সবে ফুটতে শুরু করেছে। তাই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল সবকিছু। দু-পা এগোতেই অবশ্য নজরে পড়েছিল কালুতলির খাল পেরিয়ে চলে যাচ্ছে ডোরাকাটা জীবটা। তখনই সে হইচই করে উঠেছিল ‘বাঘ-বাঘ’ বলে।

এ কথা মানেনি চাঁদ গাজি। ওর দাবি, পকপকা দিনের আলোতেই দেখেছে বড়োমিঞাকে। জঙ্গল পেরিয়ে রায়মঙ্গল সাঁতরাচ্ছিল। চাঁদ তখন নদীতে জাল পেতে সবে বিড়ি ধরিয়ে ঠেস দিয়েছে গলুইতে, সেসময় সাঁতার দেওয়ার সরসর শব্দ কানে এসেছিল। রায়মঙ্গল তখন শান্ত, স্থির। তাই শব্দটা স্পষ্ট শুনেছিল সে। ধড়মড় করে উঠেই দেখতে পেয়েছিল জীবটাকে। নৌকোর পাশ গলে সাঁতরে যাচ্ছে। চাঁদকে দেখে আবার দাঁত খিঁচিয়েছে। চাঁদ দাঁড় উঁচিয়ে ‘অ্যাইও’ বলে হাঁক পেড়েছিল। তাতেই বাঘটা সরে গিয়ে কালুতলির খালের দিকে চলে যায়। ও দাঁড় তুলে হাঁক না মারলে হয়তো কুসুমতলিতেই ঢুকে যেত।

এ নিয়ে হইচই কম হচ্ছে না। হাট সরগরম। দু-পক্ষেই কিছু লোক আছে। ইন্ধন জোগাচ্ছে যে যার পক্ষে। চিৎকার, চেঁচামেচি, তর্ক-বিতর্ক জোর কদমে।

তবে বাঘের মতো হিংস্র মানুষখেকো জীব নিয়ে এত শোরগোল কেন? হইচই বা কীসের?

মোদ্দা কথা হল, রাইপাড়ায় বাঘ ধরা পড়েছে। গতকাল সন্ধেয় সে ঢুকে পড়েছিল কালুতলির অজু শেখের পাকঘরে। ওর বিবি তখন সদ্যোজাত মেয়েকে দুধ দিচ্ছিল শোওয়ার ঘরের বিছানায়। সেখান থেকেই দেখতে পেয়েছিল ডোরাকাটা জীবটা পা পা চলে যাচ্ছে পাকঘরের দিকে। অজু শেখের বিবি সুন্দরবনের মেয়ে। ভয়ডর তার কম। ডাকাবুকো বউটা কোনও কথা না বলে মেয়েকে বুকে চেপে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে। খুব ধীর পায়ে পাকঘরের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজাটা আধখোলা ছিল। সে বিদ্যুৎগতিতে দরজাটা টেনে শিকল তুলে দেয়। যেহেতু পাকঘর থেকে বেরুনোর একটাই দরজা, তাই নিশ্চিত হয়ে উঠোনে নেমে জোরে চিৎকার ছাড়ে, ওগো কে কোথাকে আছ গো, শিগগির এসো, ঘরে বড়ো মিয়া আইছে গো--।

বাঘ ধরা পড়েছে-- এ সংবাদ চাউর হতেই রাইপাড়া থেকে কুসুমতলি, সেখান থেকে চাকডাঙা, মাছখালি থেকে পিলপিল করে লোকজন ছুটে আসতে থাকে। বিরাট রোষে হামলে পড়ে লাঠি-সড়কি-বল্লম-হেঁসো নিয়ে। আগুন ধরাবার প্রস্তুতিও নেয় কেউ কেউ। রাগ, ক্ষোভ যেন ঝলকে ঝলকে উঠে আসছে বুক চিরে। আর রাগ প্রকাশের লক্ষ্য ওই ডোরাকাটা জীবটি, যে আটকে আছে অজু শেখের পাকঘরে। ঘরটি পাকা, মাথায় টিনের চাল। একটামাত্র জানলা। সেটা বন্ধ। আগুন দিলে গোটা বাড়ি, এমনকী পাড়াও পুড়ে যাওয়ার সম্ভবনা আছে। তা ছাড়া, বাঘ ধরা পড়েছে, এ খবর ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। বনপার্টির অফিসেও কি পৌঁছয়নি? নিশ্চয়ই পৌঁছেছে। ওদের কাছে মানুষের থেকে বাঘের দাম বেশি। এখন বাঘ মারলে সব দায় গিয়ে চাপবে অজু শেখের ঘাড়ে। সে গ্রেপ্তার হতে পারে। বিশাল অঙ্কের জরিমানাও হতে পারে তার। এ দায় সে কেন নেবে? অতএব সে সকলের সামনে লাঠি হাতে রুখে দাঁড়ায়। কোনওভাবেই বাঘ মারা চলবে না। সে ভাইপোর মোবাইল থেকে বাগনা ফরেস্ট অফিসে খবর দিয়েছে। অফিস জানিয়েছে, তারা আসছে। সাবধান করে দিয়েছে, কেউ যেন বাঘের কোনও ক্ষতি করার চেষ্টা না করে। ঘুমপাড়ানি ইনজেকশন দিয়ে বাঘটাকে ঘুম পাড়িয়ে খাঁচায় পুরে নিয়ে যাবে আবার জঙ্গলে। হেমনগর পঞ্চায়েত প্রধান মহীতোষ গিরিকে বলা হয়েছে তিনি যেন ব্যবস্থা নেন। মহীতোষ তাঁর দলের লোকদের নিয়ে অজু শেখের বাড়ির চারপাশে মোতায়েন করেছেন। একটা মাছিও গলবার আর উপায় নেই।

তখন থেকেই শুরু হয়েছে এক নিরবচ্ছিন্ন অপেক্ষা। গতকালকের পর আজ। দিন পার হয়ে আঁধার নামছে রাইপাড়ার শরীরে। বনপার্টির আসার কোনও খবর নেই। আসবে এই পর্যন্ত। কবে আসবে, কখন আসবে বলা মুশকিল। ততদিন অজু শেখের পাকঘর বন্ধ। ওদিকে যাওয়ার পথই বন্ধ করে রেখেছে পঞ্চায়েত প্রধান মহীতোষ গিরির দলের লোকজন। সদ্য শেষ হওয়া পঞ্চায়েত ভোটের সময় ওরা উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছিল লাঠি-বোমা-বন্দুক দেখিয়ে। একটা মাছিও গলতে দেয়নি বুথের আশেপাশে। তাতে একটা গা জোয়ারি ব্যাপার ছিল। মারপিটের গন্ধ ছিল। এখানে সেসব কিছুই নেই। কেমন ম্যাদামারা ব্যাপার সব। কোনও প্রতিপক্ষ না থাকলে লাঠিসোটা নিয়ে পাহারা দেওয়ার মানে কী! মহীতোষ গিরিকে বলেও লাভ নেই। বলে, সরকারি ব্যাপার। বলা যায় না, এখান থেকেই সর্বময়ী কর্ত্রীর কাছে খবর পৌঁছে যেতে পারে। চুকলি কাটার লোকের তো অভাব নেই। প্রশাসনিক বৈঠকে হয়তো এ নিয়ে ঝাড়ও খেতে হতে পারে। অতএব বাবারা, দিক করিস নে। বাঘটাকে বনপার্টি নিয়ে গেলে তোদের ছুটি। কথা দিচ্ছি বিলিতি মাল খাওয়াব, সঙ্গে বিরিয়ানি।

তারা মোটেই মজা পাচ্ছে না। মহীতোষ ঝটিতি ঝটিতি খবর পাঠিয়ে দিয়েছে মিডিয়ার কাছে। এটা একটা উৎসাহব্যঞ্জক ব্যাপার দলের ছেলেদের কাছে। কাগজে নাম বা চ্যানেলে ছবি উঠলে কার না ভালো লাগে! ভোটের সময় তো মুখ দেখাবার উপায় ছিল না। রুমালে বাঁধা ছিল। এখন সে সমস্যা নেই। তবে ঝামেলা একটা আছেই। খবরের কাগজে, চ্যানেলে কার ছবি উঠবে তাই নিয়ে জোর ঠেলাঠেলি শুরু হয়েছে। কেউ কেউ আবার এই সুযোগে দু-পয়সা কামাইয়ের ধান্ধা শুরু করে দিয়েছে। অজু শেখের বাড়ির আশপাশে পান-বিড়ি, লজেন্স-চকলেট-- এসবের তোলা দোকানদার দলের লোকদেরই ধরছে। তারা এই মওকায় জায়গা করে দিয়ে পকেটে মালকড়ি পুরছে। রাগে অজু শেখ হাত কামড়ায়। বিড়বিড় করে বলে, শালা আমার বাড়ি বাঘ ধরা পড়ল, আর আমারই বুকের উপর বসে কিনা ওরা ব্যবসা করছে! কিন্তু কে শোনে ওর কথা! এখন অপেক্ষাই সার। আর সেই থেকে শুরু হয়েছে হাটতলায়, ঘাটতলায় বাঘ নিয়ে জোর আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক। আর মাধেমধ্যেই রাইপাড়ায় অজু শেখের বাড়ি গিয়ে উঁকিঝুঁকি দেওয়া। কোনও সাংবাদিক, কোনও ক্যামেরাম্যান বা টিভির লোকজন এল কিনা। বাঘ এই মুহূর্তে রাইপাড়ার ভিআইপি-- কোনও সন্দেহ নেই।

##

এসবের বাইরেও অন্য ছবি আছে। রাগ-দুঃখ-আক্রোশ-কান্নার রকমফের আছে। সেসব ঝরে ঝরে পড়ছে ওই না দেখা বাঘটার উপর। যেমন হেমনগরের বিধবা বুড়ি সুবালা দাসী। সে তো এসেই আছড়ে পড়ল অজু শেখের উঠোনপাড়ে। কপাল চাপড়ে চিৎকার করে বাঘকেই উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, ওরে আমার কোন জন্মের দুশমনরে, আমার একটা মাত্র ছাবাল কী দোষ করিল তোর কাছে! তারে খাইলি ক্যানে হারামির ছা? আমার ভরা সোমসারডারে অকূল গাঙে ভাসাইলি ক্যানে? তোর কাছে কী দোষ করিলাম বল?

দলের ছেলেরা যত বোঝায়, ও দিদমা, তোমার ব্যাটারে যে বাঘ খেইছিল, এ কি সেই বাঘ?

সুবালার এক উত্তর, উ শালোরা সব সমান।

যেমন যোগেশগঞ্জের কাশেম আলি। লাঠি ঠুকঠুকিয়ে চুপটি করে বসে আছে অজু শেখের বাড়ির পাশে তেঁতুলগাছের তলায়। চোখ মুখ একটু একটু করে শক্ত হয়ে উঠছে। অশক্ত শরীর কাঁপছে থরথর করে। তবু হাতের লাঠিটা ধরে আছে, যতটা শক্ত করে ধরা যায়। মনের ভিতর ইচ্ছের আগুন জ্বলছে ধিকিধিকি। শুধু একবার, একবার ওই বাঘের মুখোমুখি হতে চায় সে। ওর নাতি বুড়ির ডাবরের খালের পাশে মাছধরার নৌকায় বসেছিল। সেখানে নিঃশব্দে ওকে তুলে নিয়ে যায়। হাড়গোড়ও পাওয়া যায়নি। কাশেম সেই থেকে চুপ করে আছে। কখনও গাঙপাড়ে, কখনও খালপাড়ে বসে থাকে হাতে লাঠি নিয়ে। দৃষ্টি ওপারের জঙ্গলের দিকে। যদি কখনও আসে, যদি তার দেখা পায়-- তবে সে হাতের লাঠিটা শুধু একবার ব্যবহার করবে। এই করে করে ওর বয়েস বেড়ে গেল। বুড়ো এখন। হাত-পা আগের মতো শক্ত নেই। কাঁপে সবসময়। সোজা হয়ে দাঁড়াতেও পারে না। তবু ওর অনন্ত প্রতীক্ষা। অপেক্ষায় অপেক্ষায় জীবনের অর্ধেক সময় চলে গেল, তবু সেই পরম শত্রুর দেখা পেল না। বুঝে নেওয়া হল না হিসেব। লোকজন যত বোঝায় ও চাচা, তুমি আর কত অপেক্ষা করবা! সে কি আর এ দেশে আছে! হয়তো গাঙ পার হয়ে বাংলাদেশ চলে গেছে। তুমি বাড়ি যাও চাচা।

কাশেম শোনে না। কথাও বলে না। সে বসেই থাকে। ওর অসীম ধৈর্য। এবার যখন ধরা পড়ছে, তখন সুযোগ সে পাবেই। দেখা যাক, হিসেব মেটে কিনা।

##

কিন্তু সুনয়নার কোনও হিসেব ছিল না, বরং কৃতজ্ঞতা আছে। বিনোদ মণ্ডল এতদিনে ওর পোষ মেনেছে। বিয়ের পর থেকে কম তো জ্বালায়নি। নেশা ভাং থেকে শুরু করে বারোভাতারি মাগির কাছে যাওয়া-- সবইই করেছে নির্বিবাদে। সুনয়না বহুবার বাঁধতে চেয়েছে বারমুখো মানুষটাকে। পারেনি। বাঘের মতো তেজ। কী মেজাজ! সুনয়না যে রক্তমাংসের মানুষ, বিয়ে করা বউ-- মানতেই চায় না। যেন সে বাড়ির দাসী-বাঁদি। তাদের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করে, সুনয়নার সঙ্গে তেমনভাবেই বলে, এই ভাত দে, জল দে--। আর পান থেকে চুন খসলে কথা কী! তখন হাতের কাছে যা পাবে, তাই নিয়ে মেরে বসে আর কী! একবার তো পিঠে জোরসে বসিয়ে দিয়েছিল কাঁচা বাবলার ডাল। ফর্সা পিঠে কালসিটে পড়ে যায়। সুনয়না আর ভুলেও ওই বাঘের সামনে যায়! কিন্তু হাজার হোক বিয়ে করা বউ। তাকে যেতেই হয়। দিনে না হোক রাতে। এমনি সময় পাত্তা দেয় না। কিন্তু রাত হোক, তখন বোধহয় শরীর কুড়কুড়ায়। তখন বউ হোক, যে-ই হোক-- একটা শরীর চাই-ই চাই। রাতবিরেতে যেদিন বাইরের মেয়েমানুষ জোটে না, সেদিন ঘরের মানুষের রেহাই নেই। মন না চাইলেও তপ্ত আগুনের তাওয়ায় শরীরটাকে মেলে ধরতেই হয়। দাঁতে দাঁত চেপে থাকে সুনয়না। সারা শরীরে যেন ট্রলার চলে ঢিক ঢিক করে। তারপর ভোঁস ভোঁস করে নাক ডাকিয়ে ঘুম। সুনয়নার দিকে ফিরেও তাকায় না।

দিনের পর দিন এভাবে অপমানিত হতে কি ভালো লাগে? কতবার মন চেয়েছে পালিয়ে যায়। ওই তো কালুতলির ঘাট। ভোরের লঞ্চে উঠলেই হল। সাহেবখালি আর কতদূর! বাপের কাছে কেঁদেকেটে পড়লে কি ফিরিয়ে দিতে পারবে? যদিও সুনয়না জানে গরিব বাপের তেমন সংগতি নেই যে পরঘরে মেয়েকে বসিয়ে খাওয়াবে। বিনোদ মণ্ডলের সংগতির কাছে সে লোক নিতান্ত ফেকলু পার্টি। সুন্দরবনের মাছের কারবারি বিনোদের ধারেকাছে কেউ নেই। চারখানা বড়ো নৌকো, একটা ট্রলার, বাজারে আড়ত, কলকাতায় মাছ চালান-- এলাহি কারবার তার। সে লোক দয়া করে সুনয়নাকে নিয়েছে বলেই না খেতে পরতে পারছে। শুধু কি সে! ওর বাপ-ভাইদেরও মাছের কারবারে বসিয়ে পয়সার মুখ দেখিয়েছে। এমন সোনার ঘোড়াকে কেউ চটায়! সুনয়নাকে ঘরে জায়গা দিলে বিনোদ রেগে যাবে। বলা যায় না, হয়তো চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে যাবে। বাধা দেওয়ার সাহস কার আছে! বিনোদ এমন লোক, পুলিশ পর্যন্ত ঘাঁটায় না ওকে। অতএব সুনয়নার চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস সম্বল। বিনোদ আদৌ মানুষ কিনা সন্দেহ হয়। এই নোনা জল-বাতাসের দেশে বাস করে বিনোদের মধ্যেও কেমন এক নোনা নোনা ব্যাপার ঢুকে গেছে। মিঠা বলতে তেমন কিছু নেই। এমন মানুষের সঙ্গে ঘর করা কি যায়! আজকাল সুনয়নার মাথায় আত্মহত্যার ভাবনা চেপে বসে। উঠোনে বেলগাছে দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়লে হয়। কিংবা ঘরে তো ফলিডল আছে, নাক টিপে খেয়ে ফেললেই হয়। শুধু দু-মিনিটের ছটফটানি। ব্যস, তারপর অপার শান্তি।

যে মানুষটার কারণে সুনয়নার মনে এত অশান্তি, সেই বিনোদ মণ্ডল বলা নেই, কওয়া নেই, গত কাল সন্ধেবেলায় উঠোনে কাটা কলাগাছের মতো আছড়ে পড়ে হাউ হাউ করে বলল, বউ, আমায় ক্ষমা কর। আমি শালা এমন পাপী যে, বাঘেও আমায় ঘেন্না করে পালিয়ে যায়! বলতে বলতে হু হু করে সে কী কান্না বিনোদের!

বিনোদের কান্নার শব্দে সুনয়না অবাক হয়ে যায়। প্রথমে জড়তা থাকলেও সে বিনোদকে ধরে। গায়ে মাথায় সান্ত্বনার হাত বুলিয়ে দিতে চায়। কী হয়েছে জানতে চায়। মোদ্দা কথা যেটা জানা গেল, বিনোদ যাচ্ছিল মোল্লাখালির বাজারে। ওখানেই তার আড়ত। মদ মেয়েমানুষ নিয়ে ফুর্তি করার জায়গা। বিনোদ জোর পায়ে হাঁটছিল। ঘাটে নৌকো বাঁধা ছিল। সন্ধের মধ্যে যাওয়া চাই, নইলে মৌতাত জমে না। কুসুমতলার মাঠপথ সবে পেরিয়েছে, সেই সময় ঘাটের দিক থেকে কী যেন একটা ওর পাশ কাটিয়ে চলে গেল হেলতে দুলতে। ভালো করে চোখ মেলে দেখতে গিয়ে ভয়ে হিম হয়ে যায় সারা শরীর। ডোরাকাটা যমদূত সামনে। কিন্তু আশ্চর্য, বিনোদকে দেখে ফোঁৎ করে নিশ্বাস ছাড়ে একবার। তারপর দু-পা এগিয়ে এসে ওর গায়ের গন্ধ শুঁকে অবহেলে পাশ গলে ঢুকে পড়ে রাইপাড়ায়।

বিনোদ মণ্ডল উঠোনে হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল, শালা, আমি হেন মানুষ, আমারেও কিনা ঘেন্না করে চলে গেল বনের বাঘ! আমি শালা এতটাই তুচ্ছ! এত খারাপ! এসব জমিজমা, টাকাকড়ি, ব্যবসাপাতি কোন কম্মে লাগবে আর! অ্যাদ্দিনে টের পেলাম আমারে কেউ ভালোবাসে না। সবাই আমারে ঘেন্না করে। আমারে মাপ কর বউ। তোর উপর অনেক দোষ করিছি রে--। বলতে বলতে সুনয়নার পা ধরতে যায় বিনোদ।

সুনয়না ছিটকে সরে যায়। কিন্তু মনে মনে হাত ঠেকায় কপালে, জয় বাবা দখিনরায়, তুমিই আমার দুখ বুঝলে।

বিনোদকে ঘরে নিয়ে যায় সুনয়না। রাতটা ওর কেটেছিল মহাসুখে। বিয়ের পর এই প্রথম সে স্বামীর ভালোবাসায়, আদরে যেন ভরা রায়মঙ্গলে ভাসতে পেরেছিল। সারাদিনটা কেটে গেল কেমন এক ঘোরের মধ্যে। বিনোদ সবসময় বউ বউ করছে। ঘরে থেকে বেরোতেই চাইছে না। সুনয়না খুশিতে কেঁদে ফেলে। বারেবারে কপালে হাত ঠেকায়। বাবা দখিনরায়ের উদ্দেশে মনে মনে বলে, তুমি ধন্য হে দেবতা। তোমার জন্য আমি সুখ ফিরে পেলাম গো। সুনয়না মনে মনে এতটাই কৃতজ্ঞ হয়ে ওঠে যে, ওই ধরা পড়া বাঘের জন্য একটা ব্যবস্থা করা দরকার। আহা বেচারা, গতকাল থেকে না খেয়ে আছে। সে তো খাবারের জন্যই মানুষের ডেরায় হানা দিয়েছিল। হয়তো এতক্ষণে নেতিয়ে পড়েছে।

একটু রাতের দিকে সুনয়না বিনোদের গা ঘেঁষে বসে। আদরকাড়া গলায় বলে, একটা ছাগলের ব্যবস্থা করে দাও না গো!

বিনোদের নেতানো ভাবটা অনেকটা ফিকে হয়ে এসেছিল বউয়ের আদর যত্নে। উঠে বসে বলে, কেন, কী হবে?

সুনয়না বলে, আহা বেচারি, গতকাল থেকে না খেয়ে আছে। খেতে না পেলে তো মরে যাবে। তখন আর এক হ্যাপা। গাঁ-সুদ্ধু সবাইকে টানাটানি করবে পুলিশ।

বিনোদ চমকে ওঠে। অবাক চোখে দেখে সুনয়নাকে। যাকে এতদিন দুরছাই করেছে, মানুষ হিসেবে পাত্তাই দেয়নি, তার ভিতরে এত বুদ্ধি! সত্যি তো, বাঘটা যদি মারা যায়, তবে আরও বড়ো হ্যাপা। পয়সাওলা বিনোদকেও কি রেহাই দেবে! পুলিশ, বনপার্টি সবার আগে ওকেই ধরবে। কত যে খসাবে কে জানে! ফালতু ঝামেলা নিয়ে লাভ আছে! মুখে বলে, ঠিক বলেছিস তো। দাঁড়া, অজু শেখরে বলে আমি ব্যবস্থা করছি। অ্যাদ্দিন অনেক আজেবাজে কাজ করিচি, এবার থে না হয় একটু ভালো কাজকামে লাগলাম।

বলে বেরিয়ে যায় বিনোদ। সুনয়না আবার হাত ঠেকায় কপালে। এবার সশব্দে বলে, জয় বাবা দখিনরায়, এমন মুখ তুলেই থেকো গো--।

##

কিন্তু এত সহজ সমাধান তো এল না করিমুনের কাছে! সে অনেক চেষ্টা করেছিল সংসারটাকে টিকিয়ে রাখার, রফিক আর মেয়ে আশমাকে নিয়ে সুখে না হোক, শান্তিতে থাকার। কিন্তু মন যা চায়, তা কি হয়! আল্লা যেন ওর কপালে অন্যরকম কিছু লিখে রেখেছে। নইলে মাছ ধরতে গিয়ে রফিকের পা কেন কাটবে কামটে! প্রায় মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে রফিকের এখন কাজকাম গেছে। দিনরাত পড়ে থাকে ঘরে। এভাবে কি সংসার চলে! ঘরে তিনটে হাঁ মুখ। সেখানে দিতে হবে কিছু। অথচ সেসব ভাবনাই নেই ওর মাথায়। এখন একটাই কাজ, করিমুনকে সন্দেহ করা। উঠতে বসতে গাল পাড়া। করিমুন কী অন্যায় করেছে! সে তো তোমাদের নেগে ঘর থেকে বাইরে পা দিয়েছে। বিনোদ মণ্ডলের ট্রলারে মাছ ধরার কাজে গেছে। এখন কত মেয়েরা ওই কাজে যাচ্ছে। করিমুন কি ইজ্জত খোয়াতে গিয়েছিল? বিনোদের চরিত্রদোষ আছে সত্যি, তবে করিমুন সেখানে পাত্তা পাবে কেন! ওর কি সেই শরীর, রূপ-যৌবন আছে! চিমসে মারা শরীরের দিকে কে তাকাবে! করিমুনকে কেউ চোখ ফেলেও দেখেনি। বরং কাজে গাফিলতি হলে তেড়ে খিস্তি দিয়েছে বাপ-চোদ্দপুরুষ তুলে।

এসব কথা রফিককে বোঝাবে কে! দিনরাত ওর মুখে একটাই কথা, তুই বারঘরে মাগি, বেবুশ্যে। আমার ঘরে আর ঠাঁই নেই তোর। দুর হ--।

দুর হ বললেই কি দুর হওয়া যায় নাকি! ঘর কি তোমার একার! এ কথা বলতে যেতেই রফিকের সে কী মেজাজ! হাতে কাটারি তুলে এই মারে কি সেই মারে! বলে, তোরে আর রাখব না। তুই দুর হ--।

করিমুনও সমান তেজে জবাব দিয়েছে, তা ভাত এনি খাওয়াবে কে! কোন নাঙ আছে তুমার? এঃ, ভাত দোবার নাম নেই কিল মারার গোঁসাই!

দিনের সেই তেজ রাতের আঁধারে ধুয়ে জল হয়ে যায়। চোখ বেয়ে হুড়হুড়িয়ে জল গড়ায়। এই তো দু-কাল পার হয়ে যাওয়া শরীর। এর জন্য এত ঝুটঝামেলা! কেউ তো ফিরেও তাকায়নি। দেখা যাক, ওই বাঘে নেয় কিনা। ওই তো অজু শেখের বাড়ি, ওই তো পাকঘর। নিশ্চয়ই সবাই এখন ঘুমে অসাড়। এই তো মওকা। পা টিপে টিপে গিয়ে ঘরের শিকল খুলে ঢুকে পড়লেই হয়। সব জ্বালা-যন্ত্রণার অবসান।

করিমুন নিঃশব্দে উঠে দাঁড়ায়। দাওয়ার কোণে রফিকের নাক ডাকছে। মেয়েটা পাশ ফিরে ঘুমিয়ে। থাক, ওরা ভালো থাক। করিমুন আর দাঁড়ায় না। শব্দহীন পায়ে বাইরে চলে আসে। পথের ধারে মোটা শিরিষ গাছের গায়ে ঠেস দিয়ে ঘুমোচ্ছে সুবালা দাসী। ঘুমের মধ্যেই বিড়বিড় করে বকছে, ওরে আমার জানের দুশমন, আমার বেটারে খাইলি ক্যানে! একটু দূরে তেঁতুলগাছের আঁধারে ঠায় বসে কাশেম আলি। হাতের লাঠিটা বাগিয়ে ধরা। ঘুমোচ্ছে না জেগে আছে, বোঝা যাচ্ছে না। তবে কারও নজর করিমুনের দিকে নেই। বাঁচা গেছে। এমনকী যারা পাহারা দিচ্ছিল, তাদের কারও দেখা নেই। করিমুন নিশ্চিন্তে এগোয়।

কুসুমতলির বাঁক ঘুরতেই রায়মঙ্গলের বিশাল শরীরটা নজরে পড়ে। রাইপাড়া সামনেই। ওই তো অজু শেখের বাড়ি। করিমুন এগোতে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ঘাটের কাছে কে যেন দাঁড়িয়ে। করিমুনের পায়ের শব্দে মুখ ফিরিয়ে তাকায়। আঁধারে ঠিকই চিনতে পারে। সুনয়না। করিমুনকে দেখে প্রায় হাউ হাউ করে কেঁদে ওঠে, আমার সব্বোনাশ হই গেছে রে করি, আমার সব্বোনাশ হই গেছে--।

করিমুন যা শুনল, তাতে নিজেও অবাক হয়ে যায়। বিনোদ মণ্ডল ছাগল নিয়ে অজু শেখের বাড়ি গিয়েছিল ঠিকই। অজু শেখও জেগে ছিল। সেও বুঝেছিল বাঘটা যদি না খেতে পেয়ে মারা যায়, তাহলে ওকেও অনেক সমস্যায় পড়তে হবে। বিনোদের কথায় সে পাকঘরের শিকল খুলে দিয়েছিল। ছাগলটাকে ঘরে ফেলে দিয়ে পাকঘর বন্ধ করার মুখে হঠাৎ দড়াম করে শব্দ। ভিতরের ডোরাকাটা প্রাণীটা হুমম শব্দে এক লাফে উঠোনে পড়ে, তারপর দ্বিতীয় লাফে রায়মঙ্গলের বুকে। মানুষের জগৎকে তুচ্ছ করে সে ফিরে গেছে নিজের ডেরায়। মুক্ত দুনিয়ায় বিনোদ মণ্ডল আর দাঁড়ায়নি। আনন্দের চোটে লাফ দিয়ে এই রাতেই পাড়ি দিয়েছে মোল্লাখালি। ওর নিজের জগতে, যেখানে আর কোনও ভয় নেই, কেউ আর তুচ্ছ করবে না।

করিমুন হতাশায় বসে পড়ে। সুনয়নার গায়ে হাত দেয়। চোখের জল কারও বাধা মানে না। পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ওরা অনুভব করে জীবনের চড়াই উৎরাই, কাঁটাভরা পথ।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন