মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

রুমা মোদকের গল্প : অকাল বর্ষণ আর সিনেমার বৃত্তান্ত


দুজনের পাশাপাশি বসতঘর। এক ছাউনির পানি অন্য ছাউনির পানির সাথে মিশে এক প্রাণ এক আত্মা গলাগলি করে দামাল ছেলের দলের মতো ভিটে ডিঙিয়ে ধানি জমিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দুজন দুপাল্লা ঘেঁষে বসে আছে বারান্দায়। বৃষ্টির বেয়াড়া ছাঁটে ভিজে যাচ্ছে তাদের উদোম গা, যত্নে গুটিয়ে রাখা মূল্যবান সম্পদের মত পরনের একমাত্র লুঙ্গিটি, বস্ত্রহীন বেহায়া পড়ে থাকা পা জোড়া। বেখেয়ালে নয়, বেমানান আয়েশী সাধে। বৈশাখের দুর্বিনীত সূর্যের তাপ ঘন্টা দুয়েক আগেও আকাশ থেকে নেমে ঘরের ছাউনি ফুঁড়ে বাঁশঝাঁড়, কাঁচা আমের থোকা তাতিয়ে, ঘরে ঢুকে হুল ফুটিয়ে গেছে শরীরে। তাল পাতার পাখা হাঁফিয়ে ওঠেছে জ্বালা মেটাতে। সেই হুল ফুটানো গায়ের জ্বালা কেমন নির্বিকার ছিটে আসা বৃষ্টির পানির স্রোতের সাথে মিশে যায় গা বেয়ে। গায়ের জ্বালা জুড়ায়।

কিন্তু পেটের জ্বালার অন্য হিসাব। সেখানে একসাথে বসে থাকা দুজনের আকুতি দুরকম। হাতের আধখাওয়া বিড়িখানা একজন অন্যজনের হাতে দিতে দিতে ভাগাভাগি করে টানাপোড়েনময় জীবনের অপ্রয়োজনের ভাব। অপ্রয়োজনীয়, কারণ এই ভাব বিনিময়ে জীবনের টানাপোড়েন কমে না। কমেনা জীবনের রূঢ় প্রয়োজনের আকাশ পাতাল ফারাকটাও। বিড়ির হাত বদলের সাথে সাথে যুদ্ধের ক্লান্তি কিছুটা হালকা হবার সুযোগ খোঁজে কেবল।

গত সাতদিন ধরে শুরু। সকালটা খাঁ খাঁ রোদ্দুরে বৈশাখের চরিত্র নিয়ে হানা দেয় ঠিক, কিন্তু দুপুর না গড়াতেই চারপাশ অন্ধকার করে ‘স্পটে’র অচেনা পর্যটকদের মতো দলে দলে মেঘেরা কোথা থেকে এসে জমা হয় আর দেখতে না দেখতে বিরামহীন নামতে থাকে আকাশ ভেঙে। আজ সকাল থেকেই ক্ষান্ত নেই। ঝরছে তো ঝরছেই। থামার নামগন্ধ নেই। গনি মিয়া বিড়িতে শেষ টান দিতে দিতে সামনে অথৈ দুঃখের সাগর দেখে, বিড়ির সুখটানের স্বাদ পুরোই বিপরীত দুখের দিকে মোড় নেয়। পানির উচ্চতা ক্রমশ বাড়ছে। গেলো বারের আকালের স্মৃতি উঁকি দিতেই বিড়িতে লম্বা টান দিয়ে জোর করে দমিয়ে দেয় তাকে। কিছুতেই স্মরণে আনতে চায়না দুঃসহ সেই স্মৃতি। মনে মনে প্রার্থনা করে আল্লাহ রহম কর, এহনো সময় আছে। 

বিড়িখানা আবার হাতে নিতে নিতে ফুল মিয়া ভাবে আর ফুট-খানেক পানি বাড়লেই এবারও জমে যাবে। গেলোবারের মতো আগাম আয়-রোজগার শুরু হয়ে গেলে আর আশ্বিন মাস অবধি ভাবনা নেই। দুজনের আধখাওয়া বিড়িটা হাত বদল হতে হতে ভেতরে চিলিক মেরে উঠা এই পরস্পর বিপরীতমুখী আকুতি সাময়িক, বছরের কয়েকমাসের সমাধান বড়জোড়। নইলে নিত্য অভাব-বালাইময় ক্লিশে জীবনের যুদ্ধটাই তাদের জন্য সমান সত্য, সবসময়। দুজনে আনমনা তাকিয়ে দেখে অবিশ্রান্ত বৃষ্টির পতন আর আধপাকা ধানগাছ ডুবিয়ে বেড়ে ওঠা পানির উচ্চতা......ফসলী জমির ক্রমে হাওড় হয়ে উঠা।

সুযোগটা নেয় লুৎফা। বৃষ্টির পানিতে পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া পিছনের বারান্দা এক লাফে পার হয়ে সে ঢুকে যায় দুজনের অন্যমনষ্ক দৃষ্টি ফাঁকি দিয়ে। শানু ঘরের কোনায় খড় পুড়ে চাল ভাজছে রাতের খাবারের আয়োজনে। চিবিয়ে খেতে সময় লাগে বিধায় কম খাওয়া হয়, চালভাজা হজমে দেরি করে, তাই খিদেও কাছে ঘেষতে পারেনা সহজে, দিনে দিনে ভেজে রাখলে রাতের তেল পোড়ানোর খরচটাও বাঁচে। গেলো বারের ‘আথকা থাডা’র বুক ধড়ফড় এখনো স্বস্তির নিঃশ্বাসের সাথে পুরো বের হবার সুযোগ পায় নি, এর মাঝেই শুরু হয়ে গেছে এবারও একই দশা। যা লক্ষণ এই বৈশাখের শুরুতেই এবারও পাকা ধানের নিয়তি পানির নিচে চিটা হবার অলঙ্ঘনীয় গন্তব্যের দিকেই যাচ্ছে। এরকম দেখে নাই সে বিয়ের বারো বছরের অভিজ্ঞতায়। 
ধান কাটা, মাড়াই, সিদ্ধ করা, শুকানো, ঝেরে-বেছে গোলায় তোলার দমহীন ব্যস্ততায় বৈশাখে যেখানে ঠিকমতো খাবারের ফুসরত মেলে না, গেল বছর সেখানে দিনভর পাকা ধানগুলোর গুচ্ছ গুচ্ছ পানিতে ডুবে আত্মহত্যার দৃশ্য বসে বসে অসহায় দেখা ছাড়া কোনো গতি ছিলোনা। আহা অপ্রস্তুতে হানা দেয়া সেই দুর্বিপাকের দিন কী কষ্টেই না গেছে অর্ধাহারে-অনাহারে। পুরোই অনাহারে যেতো যদি না ভাগ্যিস.....ভাগ্যিস বাড়তি গুনখানা না থাকতো শানুর।

এই গুনখানার ভরসাতেই লুৎফা ফিসফিসিয়ে প্রসঙ্গটা আবার ওঠায়। কাঠের পিঁড়াটা দরজার পাটের পিছন থেকে নিজেই পেতে বসতে বসতে, বুজছতনি শানু, বিয়ানে যাবি হাইঞ্জাত আইবি। দুইদিনে কাইম শেষ। এলমুনিয়ামের কড়াইয়ে বাঁশের সরু কাঠি দিয়ে চালভাজা নাড়ার শব্দ ঝরঝর করে শানুর নীরবতা জুড়ে। শানু উত্তর দেয়না। এই বিকেলে বাইরের ঘনীভূত মেঘের অন্ধকার আরো গভীর হয়ে গ্রাস করেছে ছাউনির নীচে এই আশ্রয়। মাত্র হওয়া বিকেলটা কেমন সন্ধ্যা সন্ধ্যা অবসন্নতা নিয়ে জেঁকে বসেছে মাটির মেঝে। দড়িতে ঝুলানো কয়েক গাছি মলিন কাপড়, বিছানার চটচটে কাঁথা আর দরজার সামনে ঘাপটি মেরে বসে থাকা বাচ্চাগুলোর নিষ্পাপ মুখের ভাঁজে ভাঁজে।

কোনতা কসনা ক্যারে, লুৎফা তাড়া দেয়। শানুর এলমুনিয়ামের কড়াইয়ে বাঁশের কাঠিতে তোলা ঝরঝর শব্দ এবার নীরব হয়। নিজের প্রয়োজন কিংবা লোভ কোনটাই গোপন করতে চায়না শানু, হ বুবু নিদানডা গেছে গেলবার, দশহাজার টেখা এই বাজারঅ কম নি কও? 

তুমি একটুত্তা বুঝাইবায়নি তানরে?

সর্বনাশ, এই সময়ে ফুল মিয়ার সামনে? আঁৎকে ওঠে লুৎফা। নতুন ইমামের পাল্লায় পরে কেবল হারাম-হালাল, জায়েজ-নাজায়েজ খোঁজা নতুন নেশা হয়েছে তার। পেটে ভাত নাই, সারাদিন আখেরাত আখেরাত করে কান ঝালাপালা। নেহাৎ বিপদে পড়ে লুৎফাকে স্পটে নেয় ভাত-তরকারি বেচতে। বেরিয়ে যাবার সময় ফুল মিয়া ফাঁসির আসামীর সামনে দাঁড়ানো জল্লাদের মতো পাহারা দেয় লুৎফাকে। হিজাব-নেকাব ঠিকঠাক লাগিয়েছে কী না! লুৎফার মেজাজ খারাপ হয় মাঝে মাঝে, বলতে চায়, এতোই যদি বউরে পরপুরুষে দেখে ফেলার ভয় তো ঘর থেকে বের না করলেই হয়। কিন্তু বলতে পারে না। সাংঘাতিক বদমেজাজ লোকটার, ভয় পায় লুৎফা। চ্যালা কাঠ নিয়ে বউয়ের পিঠে ভাঙে আছড়ে কাঁচা বেল ভাঙার মতো। 
তাছাড়া কথাটা বললে সত্যি তার এই ভাত-তরকারির ভাসমান ব্যবসাটা বন্ধ করে দিতে মূহুর্ত দেরি করবে না ফুল মিয়। বরং স্বস্তি পাবে তার পরকালের আরেকটা আজাব দূর হয়েছে বলে। মেয়ে মানুষের ঠিকানা তার স্বামী। কাজ তার স্বামীরে সন্তুষ্ট করা। বাইরে টাকা রোজগার পুরাই নাজায়েজ ইহকালে বউ-বাচ্চা দু/চারদিন না খেলেই কী! এখানে তো দুদিনের মুসাফির সবাই। অন্তহীন জীবন তো পরকালেই। নিজে সারাদিন বয়ান শুনতে শুনতে অভ্যস্ত লুৎফা সাবধানী হয়। কোনো অবস্থাতেই কথাটা ফুল মিয়ার কানে দেয়া যাবে না। যাও  গনি মিয়াকে বলে-কয়ে রাজি করানোর আশাটা দ্বাদশীর চাঁদের মতো উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। ফুল মিয়ার কানে গেলে এই বৈশাখের অকাল বর্ষণের মেঘের মতোই অন্ধকারে ঢেকে ফেলবে সব আশার আলো।

বৃষ্টি ধরে আসে, অস্তগামী সূর্যটার শেষ আলোর আভা প্রচণ্ড শক্তিতে লড়াই করে চলে মেঘ ফুঁড়ে একটুখানি উঁকি দেয়ার আশায়। ভাবগতি দেখেই ফুল মিয়া উঠে পড়ে, উঁচু গলায় ডাকে লুৎফাকে। ফুল মিয়ার কণ্ঠ শুনে চোখের পলকে অদৃশ্য হয়ে যায় লুৎফা। ফুল মিয়ার চ্যালা কাঠের বারিকে এই হাওড়ে গাছে ঝুলে থাকা মরণঘাতক সাপের চেয়েও বেশি ভয় লুৎফার।

গাছের গোড়ায় বাঁধা নৌকাটা ছেড়ে দিয়ে ফুল মিয়া বৈঠা নিয়ে ওঠে পড়লে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে লুৎফা, নৌকাটা দৃষ্টিসীমার বাইরে যাওয়া পর্যন্ত। এই সন্ধ্যায় পর্যটক আর আসার সম্ভাবনা একেবারেই কম। তবু যদি দু একজন পাওয়া যায় সে আশাতেই নৌকা নিয়ে বের হয়ে যাওয়া ফুল মিয়ার। সন্ধ্যা বলেই ভাত-তরকারি রেঁধে আজ সঙ্গী হতে হয়নি লুৎফার।

মূলত ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে জলার বনটি বর্ষার মৌসুমে চারদিকে থৈহীন বৃষ্টির জলে নিমজ্জিত ফসলী জমি আর হাওড়ে একাকার হয়ে অভূতপূর্ব আকর্ষনীয় হয়ে উঠে যাত্রাদলের প্রিন্সেসের মতো। ঝাঁকে ঝাঁকে মানুষ ভেঙে পড়ে এই স্পটে। প্রিন্সেসের ডানাকাটা নৃত্যের মতো উন্মত্ত রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে ফিরে যায় তারা। আড়ালের সুখ-দুঃখের গাথা দেখেনা। আগ্রহও নেই দেখার।

আগ্রহ থাকলে ঠিক দেখতে পেতো গত দুবছর ধরে যে অকাল বর্ষণ প্রবল প্রতাপে অকালে অগ্রিম সৌন্দর্য টেনে আনে তাতে কপাল পুড়ে কতো গনি মিয়া-শানুর। বাড়তি রোজগারের জন্য ফজরের নামাজ শেষ করেই ভাত-তরকারি রান্নায় হাত পুড়াতে হয় কত লুৎফার।

ভাগ্যিস, ভাত-তরকারি রান্না করে স্পটে বসে বেচার ধান্ধাটা ফুল মিয়া মেনে নেয়, করতে দেয়। নইলে ভরা মওসুমেও সারাদিন পর্যটকদের নৌকা চালিয়ে যা রোজগার তাতো অর্ধেক যায় নৌকার মালিকের পকেটেই। বাকি অর্ধেকে ভাত জুটেতো নুন জুটেনা, নুনা জুটেতো ভাত জুটেনা। এই ভাত-তরকারি বেচা টাকা আর পর্যটকদের দেয়া বখশিশটা সংসারের খরচে বাড়তি যোগ হয় বলেই কয়টা মাস একটু নিশ্চিন্তে খেতে পারে, যদিও শুকনার মৌসুমটা কাটে একেবারেই অনিশ্চিত, একবেলা খেলে অন্যবেলা যোগানের নিশ্চয়তা থাকে না।

নৌকাটা দৃষ্টির আড়াল হলে, আবার আসে লুৎফা, অ বউ না খাইয়া থাকবি, তবু রাজি হবি না? হেরা নু আবার ফোন দিছিল। বলে কোঁচড় থেকে সুতা দিয়ে বাঁধা ভাঙাচোরা মোবাইল খানা বের করে হাতে নেয় লুৎফা, হ্যা-না একডা কিছু কইয়া দে, আমিঅ জানাইয়া দেই। অত দিকদারি ভাল্লাগে না।

আসলে গতকাল স্পটে ভাত-তরকারি বেচতে দিয়েই কথা তাদের সাথে। একদল ছেলেমেয়ে। বিদেশের টাকায় এই স্পটটাকে ঘিরে একটা 'সিনেমা' বানাবে তারা। এজন্য ঠিকমতো গুছিয়ে কথা বার্তা বলতে পারে গ্রামেরই এমন একজন মহিলা দরকার তাদের। নইলে নাকি গ্রাম-গ্রাম গন্ধটা ঠিক আসে না। কথাটা শুনে প্রথমেই শানুর নামটাই মাথায় এসেছে লুৎফার। কেবল যে কাছাকাছি বসতির কারণে স্বচক্ষে দেখা দুর্দশার জীবনের কারণে তা নয়, শানুর গানের গলা, হাসান-হোসেনের কিসসা গাওয়ার ভঙ্গি সবইতো নিজের চোখে দেখা। শানুর মতো আর কেই বা আছে এমন!

সেটা শানু নিজেও জানে। বাপজান ওরে মমতাজ বানানোর স্বপ্ন দেখতো। সেই কোনকালে মমতাজের সাথে এক আসরে গান গেয়ে ছিলো বাপজান। কতো হাজারবার যে বাপজান সে গল্প করতো, ফাঁক পেলেই এক গল্প। বাপজানের প্রৌঢ় চোখেও তখনো উপচে পড়া হাবুডুবু প্রেম। মমতাজকে কী যে ভালোবাসতো বাপজান! সেই মমতাজ বিখ্যাত হয়ে গেলে, বাপজান শানুর হাতে দোতারা তুলে দিয়ে বলেছিলো- তরে কিন্তু মমতাজ হওন লাগব। বাপজানের গলার গানগুলো নিমিষেই সুর-তাল-লয়ে কন্ঠে তুলে নিতে পারতো শানু। মুগ্ধতায় বাপজানের চোখমুখ চকচক করতো আর মেয়ের মমতাজ হবার স্বপ্ন যেনো সব অসম্ভবের ধাপ লাফিয়ে লাফিয়ে পেরিয়ে যেতো...। ভাগ্যিস বাপজানের কিছু গান সুর-তাল-লয়-কথায় গলায় বেঁধে রেখেছিলো শানু। গেলবছর থেকে আকালের দিশাহারা অবস্থায় এই গানের জন্যই না বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে দুটো খেয়ে অন্তত বেঁচে টিকে থাকতে পেরেছে।

লুৎফা তাড়া দ্যায়, কসনা কেন কিছু? হেরার হাতঅ নু টাইম নাই বেশি। শানু ধন্ধে পড়ে। ‘না’ বলে দেয়াটা নিমিষের ব্যাপার। কিন্তু দুমুঠো ভাতের জন্য নির্ঘুম রাতজুড়ে গানের সাথে কী অসহ্য দুঃস্বপ্নের ধকল, সাওয়াও যায় না, কওয়া যায় না। গানের পরই ইশারা ইঙ্গিতে প্রস্তাব আসে। শানুর মতঅমতের তোয়াক্কা করে কয়জন? গানের সুমিষ্ট সুরের মগ্নতার পরই মানুষগুলা নারীদেহের সান্নিধ্যের জন্য ভদ্রতার মুখোশ খুলতে দেরি করেনা।
 'সিনেমা' করে মাত্র দুদিনে দশ হাজার টাকা হাতে আসলে অন্তত অনিবার্য অসহ্য দুঃস্বপ্নময় সময়টুকু থেকে মুক্তি পায় সে, এমন সুযোগ তো সচরাচর আসে না। সুযোগটা হাতছাড়া না করার তীব্র বাসনায় লুৎফাকে প্ররোচিত করে শানু। অ বুবু একবার তুমি নিজে কইয়া দেখবা তাইনরে।

কথাটা পছন্দই হয় লুৎফার। একবার চেষ্টা করে দেখা যেতে পারে। ঘরের বাইরে বারান্দায় পাল্লা ঘেঁষে ফুল মিয়া রেখে যাওয়া জলচৌকিটায় বসে। গনি মিয়ার চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ ঠিকঠাক গেড়ে না বসলেও, স্পষ্ট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আর দিন দুই এরকম পার হলেই তা স্থায়ী হয়ে পড়বে। খুব মোলায়েম সুরেই কথাটা পাড়ে লুৎফা, গনি মিয়ার আপত্তির উৎস লক্ষ্য করে- অ ভাইজান মাইনষের কতা কানঅ না তুললে কিতা? মাইনষে খাওয়ায় না পিন্দায়?

গনি মিয়া কী আর তা জানেনা। আকালের দিনে চেনা মানুষও না চেনার ভান করে। কী জানি টাকা পয়সা ধার চেয়ে বসে। ঘর লাগোয়া ঘর যে ফুল মিয়া, গলাগলি করে বিড়ি টানে সেও এমন ভাব দেখায় যেনো রাস্তার কোনো কুকুর পথিকের হাতের খাবারের লোভে পিছু নিয়েছে। আকালে খুব মানুষ চিনেছে সে, খুব চিনেছে। আরো জেনেছে নিজের যোগান নিজে না দিলে বাকি সব রেলগাড়ির কামরা ভর্তি যাত্রীর মতো, দীর্ঘসময় একসাথে থাকে বটে, স্টেশনে নামলেই কেউ কাউকে চেনে না।

কিন্তু কী করে সে! গ্রামের অন্য সবার কথা বাদই থাকুক, ঘরের চালে আঞ্জাআঞ্জি করা চাল যে ফুল মিয়ার, সেই তো সারাদিন ছবক দেয়, বউরে দিয়া এই হারাম কাম আর কত করাইবায় গনি মিয়া? একদিন ইমাম সাহেবের কাছেও নিয়ে গিয়েছিল সে গনি মিয়াকে। ইমাম সাহেব যা ওয়াজ নসিহত করেন, তার কিছুই নতুন নয় গনি মিয়ার কাছে। তবে এই ইমাম সাহেবের গলায় কেমন ঠাণ্ডা কিন্তু খরখরে ভয়াবহতা রোজ হাছরের পুলসিরাতের পুল পার হবার ভয় শীতল স্রোতের মতো মেরুদণ্ড বেয়ে নেমে যে কোথায় কোন অচেনা প্রান্তরে অসহায় একলা করে বসিয়ে দেয়, সামনে-পিছনে-ডাইনে-বায়ে রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায় না। ইমাম সাহেবের এই ঠাণ্ডা খরখরে ভয়াবহ কণ্ঠ গ্রামের ঘর থেকে টেলিভিশন হাওয়া করে দিয়েছৈ। সোমত্ত মেয়েদের ইউনিয়ন পরিষদের স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। সে জায়গায় শানু গায় গান! ফুল মিয়ার অশেষ রহম, কথাটা এখনো স্পষ্ট করে ইমাম সাহেবকে জানায় নাই। সম্ভবত তার নিজের বউ লুৎফাও ভাত-তরকারি বেচতে স্পটে যায়, সেই বিবেচনাই বিরত করেছে তাকে চরম থেকে নরম হতে...।

লুৎফার ফোনটা আবার বেজে উঠে। তারা আবার ফোন করেছে। লুৎফা ফোনটা রিসিভ করে জবাব দেয়, হ জানাইতাছি, জানাইতাছি। অখন অই জানাইতাছি। ফোনটা রেখে লুৎফা আবার তাড়া দেয়, অ ভাইছাব, কুনতা কইন তে!

গনি মিয়া নিরুত্তর তাকিয়ে থাকে দিশাহীন পানিময় ভবিষ্যতের দিকে, শানুর এই গান নিয়ে কতোজনের কতো কথার খোঁচা,আর সিনেমায় অভিনয় করলে তো রক্ষা নেই, গোপন রাখাই যাবে না। সালিশ-বৈঠক আরো কী কী,ভাবতেই গা হিম হয়ে আসে, গ্রামেই টিকা দায় হবে। বুঝি পেটের দায় মেটাতে পরে গাঁ ছাড়া হতে হয়। 
ভেতরের আকাঙ্ক্ষা ভিতরে হত্যা করে শিউরে উঠা ভয়ে গনি মিয়া চূড়ান্তই জানিয়ে দেয়, না গ বুজান, ইতা অভিনয়-ছবিনয় তাইরে দিয়া অইত নায়।

গনি মিয়ার চোখের পল্লবে, ঠোঁটের কাঁপনে বিপন্নতা স্পষ্টই পড়তে পারে লুৎফা, সেই সুযোগটা নিয়েই শেষ চেষ্টাটা করতে ছাড়ে না সে- অ ভাইজান ইডা ছিনেমা না ত, কী জানি কয় ডকু...ডকু।

দরজার পাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে শুধরে দেয় শানু ‘ডকুমেন্টারি’। বাপজান বলতো শানু- তর মাথাডা বড় পরিষ্কার। আজ এই পরিষ্কার মাথাটা শেষমেষ কাজে লাগায় শানু, যদি গনি মিয়া এই বিপন্নতা থেকে উদ্ধারের একটা চোরাগলিও খুঁজে পায়। আসলেই এটা ডকুমেন্টারি। স্পটটা আবিষ্কারের পর থেকেই পর্যটকদের আনাগোনা দিনে দিনে আশংকাজনক বেড়ে গেছে পাল্লা দিয়ে উচ্চস্বরে মাইক বাজানো আর চিপস-বিস্কিট-চানাচুরের প্যাকেটে পানি-জঙ্গলে বিরামহীন অত্যাচার চালায় তারা অনভ্যস্ত অনাগরিক-অবিবেচনায়।মূলত এতদসংক্রান্ত সচেতনামূলক ডকুমেন্টারি এটি।

শানুর কথায় বিপন্ন আঁখিপল্লব ক্ষনিক স্থির হয় গনি মিয়ার। হ্যাঁ, ডকুমেন্টারি। সিনেমা নয়। অভিনয় নয়। পরক্ষনেই অদূরবর্তী পরিনাম ভাবনায় সেই আঁখিপল্লব অস্থির হয় আবার। হোক ডকুমেন্টারি। শানু যা করবে সেটাকে ‘সিনেমা করাই’ তো বলবে লোকে, শানুকে দেখা যাবে টিভির পর্দায়। যে টিভি নিষিদ্ধ গ্রামে। যদি একবার ইমাম সাবের কানে যায়। ভেতরের বিপন্নতা ভেতরেই পুষে রাখে গনি মিয়া। শিকড় গেড়ে বসা পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে প্রবল লড়াইয়ের শক্তি তার নেই। মোটেই নেই। পূর্বে না বলা কথাটারই পুনরাবৃত্তি করে তার দুর্বল চিত্ত- না বুজান না অই খইরা দেইন, ফারত নায় শানু।

শেষ আশার সলতেটি এই বৈশাখের দমকা হাওয়ায় হঠাৎ নিভে যাওয়ার আগে তেতে উঠে শানু, প্রতিরাইতে গান গাইয়া হয়রান অইয়া নানান কিসিমের ভদ্দরলোকের লগে নানান কিসিমের ছিনেমা কইরা মজাইয়া রাখন লাগে। হেরার হাউশ মিডানির সময় কেউ মত জিগায় না। হেইডা কেউ দ্যাখেনা বইল্যা  হেইডার দুষও নাই। 

1 টি মন্তব্য: