মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

কাবেরী চক্রবর্তী'র গল্প : পলিউশন ফ্রি


ওপাশের ফ্ল্যাটবাড়ির দোতলার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে সূর্যপ্রণাম করছে বাদল। হাতে ঘড়ি। সেটা দেখাতেই মানসকে একেবারে রান্নাঘরে টেনে আনল পরী।

‘বাব্বা! ঘড়ি পরেই ঘুমোয় নাকি আজকাল?’ হেসে ফেলেছে মানস। জি-প্লাস-থ্রির ফার্স্ট ফ্লোরের সবচেয়ে দামি ফ্ল্যাটটা দখল করে বিরাজ করছে বাদল। ওদের জরাজীর্ণ বাড়িটা মাঝখান থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাওয়ায় এখন মানসদের ফ্ল্যাটের রান্নাঘরের জানলা থেকে স্পষ্ট ওপাশের ব্যালকনি। ওই অ্যাপার্টমেন্টটাও মানসেরই বানানো। মানসই বাদলকে ঢুকিয়েছে ওই ফ্ল্যাটে। আয়েস করুক ক’টাদিন, যতদিন ওর নিজের জমিতে মানসের নতুন প্রজেক্ট খাড়া না হচ্ছে। সেখানে অবশ্য নীচতলার পেছনদিকের ফ্ল্যাটেই এসে ঢুকতে হবে ওকে, সেই মতোই কন্ট্রাক্ট হয়েছে।

খানিকক্ষণ পরে একটা ন্যাকড়া হাতে বাদল আবার বারান্দায়। ডাস্টিং হচ্ছে। বলল পরী। ঝাড়নটা আবার কেমন স্টাইল করে বাঁহাতে ধরেছে, বুঝলে... ?

তোমারই বা ওকে নিয়ে এত চর্চা কীসের? আচমকাই রেগে ওঠে মানস। আসলে বাদলকে ইদানীং একটু বেশিই নজর করছে পরী। মজা মারছে। পরীর টাইমপাস। সারাদিনে কাজ নেই, কী আর করবে। কিন্তু মানসকে ডেকে ডেকে দেখানোর শোনানোর দরকার কী? রাগই হয় মানসের। বলে, একটা ভাঙাচোরা বাড়িতে থেকেছে এতদিন। নতুন বাড়িতে গেলে ওটুকু ইচ্ছে সবারই হয়। পরীকে চুপ করাতে গম্ভীর মুখে রোববারের খবরের কাগজটা হাতে টেনে নেয় মানস। কিন্তু ভোবি ভোলবার নয়। একটুবাদেই রান্নাঘর থেকে আবারও হাঁক দেয় পরী। পাত্তা দেয় না মানস। পরী কিন্তু নিজেই এল। হাসতে হাসতে বলল, ফ্ল্যাট কালচার রপ্ত করছে..., তুমি তো দেখতে পেলে না! একটা কফি-কাপ হাতে ব্যালকনি থেকে মুখ বাড়িয়ে আশপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে, গুডমর্ণিং সহ প্রভাতী আলাপ বিনিময় চলছিল এতক্ষণ। সে কী গল্পের ঘটা! রাস্তায় বাজার চলতি লোকেদের ডেকে ডেকে কথা বলছে। চমকে উপরে তাকিয়ে ওকে আবিষ্কার করে আরোই অবাক হচ্ছে লোকজন। হাসি আর মুখে ধরে না তোমার বন্ধুর। বলে, নিজেই হেসে একেবারে গড়িয়ে পড়ল পরী।

আহ্‌, তুমি থামবে? ধমকে ওঠে মানস। অহেতুক বাদলকে ‘তোমার বন্ধু’ , ‘তোমার বন্ধু’ বলে ওকে খোঁচা দেওয়াটা একটা বদ-অভ্যেস হয়ে দাঁড়িয়েছে পরীর।

সে নাহয় থামলাম। কিন্তু তুমি তো ওকে দেবে একতলার পেছনদিকের ফ্ল্যাট, রাস্তা নেই, ব্যালকনি নেই। মানবে? আমার কিন্তু ভাবতে খারাপই লাগছে। পাগল ছাগল যা-ই হোক, ওর খুশিটা কিন্তু এক্কেবারে নিষ্পাপ। ঠিক যেন ‘মেরা নাম জোকারে’র রাজকাপুর।

মিস্টার বিন-এর সঙ্গে হামেশাই বাদলের তুলনা টানে পরী। আজ একেবারে রাজ কাপুরে প্রোমোশন! অবাক হয় মানস। তার চেয়েও বেশি চিন্তিত হয়ে ওঠে। ইয়ার্কির ছলে কী একটা পোকা মাথায় ঢুকিয়ে দিল পরী। পেপারের খবরে আর মনই দিতে পারল না মানস। বাদলরা এখানকার পুরনো লোক। ওর বাবার কাছ থেকে জমি কিনেই এখানে বাড়ি হয়েছে মানসদের। মানসের বাবার সিনিয়র সহকর্মী ছিলেন উনি। ছোটবেলায় ওদের বাড়ি বেড়াতেও এসেছে মানস। কিন্তু মানসদের বাড়ি তৈরি হতে হতেই আচমকা মারা গেলেন জেঠু। বয়স হয়েছিল, কিন্তু তার চেয়েও বড় আঘাত বাদল। দেখতে শুনতে স্বাভাবিক ছেলেটার পড়াশুনো হল না। ওর নাকি জড়বুদ্ধি। প্রথমদিকে বিশ্বাসই করেনি কেউ। পড়া পারে না, মেধা কম, এটাই মনে হয়েছিল। পেছনে লাগত বন্ধুরা। খ্যাপাত। ইস্কুলে পাড়ায়। আগলে আগলে রাখার চেষ্টা করত ওর মা দিদি। কিন্তু একসময় ইস্কুলের হেড-মাস্টারমশাই ডেকে জানিয়ে দিলেন, ওর চিকিৎসার দরকার। বাড়িতেই রাখুন।

ট্রিটমেন্ট কিছু হয়েছিল কিনা মানসের জানা নেই। কারণ জেঠু মারা যাবার পর ওরা আর ওবাড়িতে যায়নি। গেল, যখন পড়ে গিয়ে কোমর ভাঙল জেঠিমার। মাঝখানে পার হয়ে গেছে অনেকগুলো বছর। মানসের বাবা মা মারা গেছেন। উঁকিও দেয়নি বাদলরা কেউ। অথচ জেঠিমাকে হাসপাতালে নেওয়ার সময় মানসকেই ডাকতে এসেছে বাদল। তারপর লাগাতার হসপিটাল বাড়ি করতে হয়েছে মানসকেই। তখনই জেনেছে ছেলের কারণেই পাড়ার লোকের সঙ্গে মেলামেশা করেন না জেঠিমা। বাদল কিন্তু অসম্ভব ভালোবাসত মাকে। সেবাও করেছে যথেষ্ট। আয়া রাখতে হয়নি। বাইরের সব প্রয়োজন মিটিয়েছে মানস। তখন কল্পনাতেও নেই প্রোমোটিং-এর চিন্তা। এই যাওয়া আসাতেই একসময় জেঠিমার ভরসার লোক হয়ে উঠেছিল ও। ওর হাতে ধরে বলেছিলেন, আমি চোখ বুজলে ছেলেটাকে একটু দেখ বাবা। নইলে কে যে কীভাবে ঠকিয়ে রাস্তায় বের করে দেবে..., ওর কথা ভেবে মরতেও ভয় পাই।

আমি থাকতে ওর কোনও বিপদ হবে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন জেঠিমা। বলেছিল মানস। স্তোক দেওয়া নয়, মন থেকেই বলেছিল। এটা ওর সহজাত। গদাইদের মদের আড্ডাতেও যেমন স্বচ্ছন্দ ও, তেমনি ন্যালা-খ্যাপা বাদলের মায়ের সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে যেতেও সমস্যা হয় না কোনও। কিন্তু নিজের পায়ে উঠে দাঁড়াতে আর পারেননি জেঠিমা। বিছানায় পড়েছিলেন দীর্ঘদিন। আর সেই দীর্ঘসময় ধরে অক্লান্ত সার্ভিস দিয়ে গেছে মানস। ওঁর বিশ্বাস অর্জন করেছে। উনিও বিচক্ষণ মহিলা। বুঝেছিলেন উপকারের বিনিময়ে পুরস্কার বাঞ্ছনীয়। তাই মেয়ে-জামাইয়ের আপত্তি অগ্রাহ্য করেই ওই জীর্ণ বাড়ি প্রমোটিং-এ মত দিয়ে গেছেন। বন্ধুত্বের দায়টা এভাবেই চাপিয়ে দিয়েছেন মানসের ওপর। শর্ত ছিল, ওঁর জীবদ্দশায় কিছু হবে না। অক্ষরে অক্ষরে সেটাও মেনেছে মানস। সই-সাবুদ হওয়ার পরেও ধৈর্য ধরে থেকেছে। জেঠিমার দেখাশুনোয় ফাঁক পরেনি এতটুকু। উনি মারা যাবার পর, শ্রাদ্ধশান্তি মিটলে ভাঙা হয়েছে বাড়ি। বাদলকে সিফ্‌ট করানো হয়েছে ওপাশের ফ্ল্যাটে। এই হল মানস। এমন দায়িত্ব এবং মেহনতের সঙ্গেই ও কাজ করে।


দুই

এই শোনো, বাদলের মতিগতি কিন্তু মোটেই সুবিধের ঠেকছে না আমার...। চায়ের কাপটা টেবিলে নামিয়েই কথাটা বলল পরী।

কেন, তোমাকে প্রোপোজ করেছে নাকি...? টিপ্পনি কাটে মানস।

ও..., ঠিক আছে, তাহলে বলব না। তোমাকে আগে-ভাগে জানালে যদি কোনও ব্যবস্থা নিতে পার, তাই বলতে এসেছিলাম। আমার ভারি বয়েই গেছে। আর কোনও খবরই লিক করব না।

না বললে তো পেট ফাঁপবে তোমার, ভ্যানতাড়া না করে ঝেড়ে ফেলো, আমার তাড়া আছে।

ওই আবাসনে-এ গৃহপ্রবেশ ছিল না আজ..., তুমি অফিসে বেরনোর পর তো গিয়েছিলাম! বেশ গদগদ হয়ে মানসের পাশ ঘেঁসে বসল পরী। কনুইয়ের একটা ঠেলা মেরে বলল, যাদের গৃহপ্রবেশ, তাদের ফ্ল্যাট তো বাদলের উল্টোদিকেই, দরজা খোলা থাকলে সবই তো দেখা যায়।

শর্ট করো।

আহা, শোনোই না...। দেখলাম, গম্ভীর মুখে বসে খবরের কাগজ পড়ছে বাদল।

হুঃ, বললেই হল! কাগজ কেন, কিছুই পড়তে পারে না ও...। অক্ষরগুলো চেনে। উচ্চারণও করে। কিন্তু একটা গোটা লাইন পড়ে মানে বুঝতে পারে না। ও পড়বে খবরের কাগজ..., বাজে বকার আর জায়গা পাওনি?

সেটাই তো বলছি। খুব শো হয়েছে আজকাল। কাগজ মুখে বসে আছে। পাশে রেডিও। এফ এম-এ গান বাজছে, ‘তোমাকে শোনাতে এ গান যে গেয়ে যাই..’ । কী বুঝছ? আবারও একটা কনুইয়ের ঠেলা ।

চেষ্টাই করছি না বোঝার। নির্লিপ্ত ভাব মানসের। পরীর এইসব আগডুম বাগডুম গল্পে সত্যিই কোনও উৎসাহ পায় না ও।

প্রেমের গান শুনছে...। বুঝলে না? বলতে থাকে পরী, আমি তো একটানা ওকেই লক্ষ করে যাচ্ছি। পুজো চলছে তখন। কারও আর অন্যদিকে নজর নেই। দেখি কী..., পায়ের বুড়ো আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে গান শুনছে। তারপর আচমকাই দরজাটা বন্ধ করে দিল, জানো?

বেশ হয়েছে। ওর প্রাইভেসিতে নজর দেওয়ার ফল হাতে হাতে পেয়েছ। মানস বলে। বলে খুশি হয়। বাদলকে নিয়ে দিনের পর দিন এমন চাটনি খাওয়া ওরও সহ্য হচ্ছে না। বাতিল আসবাবের মতো পাড়ার একপাশে আছে, কারও কোনও ক্ষতি তো করেনি। কিন্তু পরক্ষণেই সজাগ হয় মানস, কীসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলছিল না পরী,...কেন? পরীরও কি কোনও উদ্দেশ্য আছে বাদলকে ঘিরে? নিজের পরিকল্পনা তো ফাঁস করেনি মানস। পরী সব জেনে ফেলল, নাকি মনটাই জটিল হয়ে যাচ্ছে মানসের?

শোনোই না..., এখনও শেষ হয়নি। ধাক্কা মেরে মানসের হুঁশ ফেরায় পরী। আবারও বলতে থাকে, খানিক বাদেই সেজেগুজে ফ্ল্যাট থেকে বেরিয়ে এল তোমার বন্ধু। আমি তখন বসে প্রসাদ খাচ্ছি। সে কী সাজ...! চকচকে শার্ট প্যান্ট। তার ওপর কী বলো তো? ভানু গোয়েন্দার জহর অ্যাসিস্টেন্টের মতো নেকার-বুকার।

সেটা আবার কী? বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করে মানস।

অ, এটাও জানো না! পয়ান্টের কোমর থেকে দুটো স্ট্র্যাপ একেবারে কাঁধ অবধি, পিঠের দিকে ক্রশ করা। হ্যাঁ গো, এই স্টাইল কি আবার উঠেছে? পরতে দেখি না তো কাউকে?

আমার জানা নেই। দাঁত চেপে বলল মানস। সিনেমা দেখে দেখে মাথাটা গেছে পরীর। মিস্টার বিন থেকে রাজ কাপুর হয়ে এখন জহর রায়কে দেখছে বাদলের মধ্যে।

হুম। পালিশ করা চকচকে জুতো পায়ে, দরজায় তালা দিয়ে মশমশ করে প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে এল নেমন্তন্ন রাখতে। প্রসাদ খেয়েই আর বসল না। সঙ্গের বিগ-শপার থেকে একটা ধপধপে পানামা টুপি বের করে মাথায় দিয়ে রওনা দিল। বেহালায় যাবে। দিদির বাড়ি। ...গল্প শেষ করে বসে পা নাচাচ্ছে পরী।

হুঁ, ফ্ল্যাটে গিয়ে রাতারাতি স্মার্ট হয়ে গেছে।

ওকে তোমরা পাগল বল, বাসে ট্রামে চড়ে বেশ তো ঘুরে বেড়ায়...! তাছাড়া কেবল সাজগোজটাই তো নয়, আমার সন্দেহটা অন্যখানে। কেমন একটা ফুরফুরে ভাব ওর মধ্যে। নতুন প্রেমে পড়লে যেমন হয়, ঠিক সেরকম। দিদির বাড়ি গেল, না কি বিয়ে করবে বলে মেয়ে দেখতে গেল? ওর দিদি-জামাইবাবু হয়তো আয়োজন একটা করেই রেখেছে, কে জানে?

যাহ্‌ কী যে বল..., কে বিয়ে করবে ওকে?

আমাদের দেশের মেয়েরা যা অভাগা..., আমাদের বুলিটাই তো বসে বসে বুড়িয়ে গেল। দেখতে খারাপ, লেখাপড়া শেখেনি। টাকাপয়সার তো অভাব নেই মামার। ওই একটাই মেয়ে। বাদলের মতো পাত্র পেলে মামা কি ছেড়ে দেবে? এমনিতে তো দেখে কিছু তেমন বোঝাও যায় না।

মানে? পরীর মুখের দিকে এবার ঘুরে তাকাতেই হয় মানসকে। এতটা ভেবে ফেলেছে পরী! আর সেইজন্যেই বলছিল আগাম ব্যবস্থা নেবার কথা। নাহ্‌ এখন তো সত্যিই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না পরীর কথা। বাইরে থেকে তো সত্যিই সুপুরুষ পাত্র বাদল। প্রয়োজনীয় দু’চারটে কথা অন্যদের মতোই বলে। চা বানাতে পারে। বাজার যায়। হোম ডেলিভারির খাবার খেয়ে বিল মেটায়। বাসে ট্রামে ঘোরে, এমনকি নাম সই করতেও অসুবিধে নেই। তাহলে? ...পরীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই নতুন স্কিম ছকে ফেলে মানস। বুলিকেই ফিট করতে হবে বাদলের সঙ্গে। বুলি, পরীর মামাতো বোন, মানসের শালি। বিয়ে যদি করতেই হয়, ওকেই করবে বাদল। মালটাকে সাইজ করে ফেলতে হবে, কালই। আগামী রোববারেই মেয়ে দেখিয়ে দেবে। পরী ব্যাগড়া দিতে চাইলে, ওকেও ম্যানেজ করতে হবে, যে করে হোক।

কিন্তু সেদিন রাতে বাড়িই ফিরল না বাদল। তারপরের দিনও নয়। তারপরের দিনও..., দেখতে দেখতে সপ্তাহ পার হয়ে গেল।

দেখেছ তো, মিলে যাচ্ছে কিনা আমার কথা? এতদিনে নির্ঘাৎ বিয়ে হয়ে গেছে বাদলের। একেবারে হানিমুন সেরে ফিরবে।

থামবে তুমি? পরীকেই যেন আর সহ্য করতে পারছে না মানস। ইচ্ছে করে ওকে টেনশন দেবার জন্যেই কি এমন করে, নাকি নোটন, পটাদের মতো পরীও প্রতিদ্বন্দী ওর? বুঝে পায় না মানস। বাদল বিয়ে করলে ওর কী? কিছুই না। কিন্তু বাদলের কাছে যে গুপ্তধন আছে..., সে সন্ধান তো মানস ছাড়া আর কেউ জানে না। অত টাকা কী করবে ওই ন্যালাখ্যাপা ছেলে? ওর মা-ই সেসব সামলানোর দায়িত্ব দিয়ে গেছে মানসকে। হ্যাঁ, বাদলকে ঠকাবে না মানস। এতটুকুও ঠকাবে না। কেবল উদবৃত্তটুকু ও নেবে। কিন্তু এখন যদি সত্যিই অন্য দাবিদার চলে আসে, তাহলে তো বুড়োআঙুল চুষতে হবে মানসকে। কিন্তু এসব সিক্রেট পরীরও অজানা। তাহলে পরী কেন এভাবে উস্কায়? কোনও ভাবে কিছু কি জেনে গেছে? তাই মজা লুটছে ওকে নিয়ে? ওহ্‌, দুশ্চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়ছে মানস। জীবনে কখনও এমন সংকটে পড়েনি। সমস্যা ওকে দেখলে ভয় পায়, নিজের সম্বন্ধে বড়াই করে বলত। এই তো সেদিন, গদাই দুঃখ করছিল, মা বাবা দুজনেই একসঙ্গে বিছানা নিয়েছে। একজনকে হাসপাতাল থেকে নিয়ে ফেরে তো পরদিন আরেকজনকে নিয়ে দৌড়তে হয়। এসব দায়িত্ব কোনওদিনই নিতে হয়নি মানসকে। সেটাই যেন অভিযোগ সকলের। জবাবে মানস বলেছিল, কারও কারও ভাগ্যে এমন হয়। যারা পয়মন্ত। তাদের ঘাড়ে ঝামেলা বসতে পারে না, পিছলে পড়ে যায়।

কী বলতে চাস তুই, বাপ-মা ঝামেলা?

অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে ঝামেলা। নির্বিকার গলায় বলেছিল মানস। আগামীকাল আমি যদি অ্যাক্সিডেন্টে পঙ্গু হয়ে ঘরে বসে যাই, আমার বউও আমাকে ঝামেলাই ভাববে।

তুই শালা একটা লুজ ক্যারেক্টার। রাগের চোটে বলেছিল গদাই।

প্রমাণ করতে পারবি? একটুও না রেগে, এরপরও হাসতে হাসতেই বলেছে মানস।

গদাই কেন, আমরা কেউই পারব না। থোবড়াটাই তো নিপাট ভালোমানুষের মতো বানিয়ে রেখেছিস। বলেছিল নোটন।

তাছাড়া নাম? পাড়াতে আমরা সবাই ডাকনামে পরিচিত। নোটন, গদাই, ডন্টু, পটা..., শালা গুন্ডা মস্তানদের মতো নাম, ছোটবেলায় কে যে রেখেছিল...। ভদ্দরলোকেদের মতো একটা করে নাম আমাদেরও তো আছে। সেটা কোথায় লোপাট হয়ে গেল। মানসের কেবল একটাই নাম, বাড়িতে অফিসে পাড়ায়...

ঠিক বলেছিস..., তার ওপর সরকারি চাকুরে। না বলতেই ঘাড় পেতে লোকের বার্থ সার্টিফিকেট, ট্যাক্সের বিল নামিয়ে দিচ্ছে.., শালা সোশ্যাল ওয়ার্কার। ওকে খারাপ বললে তো সবাই আমাদেরই পাড়া ছাড়া করবে।

বেশ, এগুলো তো লোকের দেখা। তোরা এক্সট্রা কী দেখেছিস, সেটাই বল...। আগ্রহ ভরে জানতে চেয়েছে মানস।

গদাই নোটন পটা কারও মুখেই আর কথা নেই। শেষে গদাই বলল, তোর মতো শেয়ানা নই তো। গুছিয়ে কথা বলতেও পারি না। কলেজে পড়িনি। অফিস করিনি। তাই বলতে পারব না। কিন্তু লোকে তোকে যতটা ভালো বলে জানে, তুই শালা ততটা নস।

ওদের কথায় সেদিন নিজের জয়টাকেই যাচাই করে নিয়েছিল মানস। হ্যাঁ, খুব সত্যি কথাটাই সেদিন বলেছিল গদাই। গুছিয়ে বলতে না পারলেও ওর মতো করে বলেছিল। তবে ওদের সঙ্গে সামান্য হলেও তফাৎ আছে মানসের। সেটা হল, এপাড়ার ছেলে হলেও, মানস এখানে অংশত আউট-সাইডার। ওর হাফপ্যান্টের বেলা কেটেছে ভবানীপুরে। মিত্র স্কুলে পড়েছে। সেখানকার পরিবেশের কিছু ছাপ অদৃশ্যভাবেই রয়ে গেছে । যেজন্যে পরী ঝুঁকেছিল ওর দিকে। এপাড়ার সেরা সুন্দরীকে গেঁথে ফেলেছিল মানস। এই একটা সূক্ষ্ম তফাৎ থাকলেও আসল সত্যিটা হল, মানসের অব্যর্থ নিশানা, আর নিখুঁত স্কিম। মানস খাটে। একটা প্রজেক্টের জন্যে অকাতরে পার হতে দেয় দিন মাস বছর। ধর তক্তা মার পেরেকের কাজ ওর নয়। আর নিজের বাপ-মায়ের জন্যে না করলেও, বাদলের মায়ের জন্যে কম করেছে ও! ‘বাগল, বাগল’ করে তোরাই তো ওকে খ্যাপাতিস ছোটবেলায়। ইমেজ তৈরি করতে হয়। তার গুরুত্বই বুঝিস নি কোনওদিন।

নোটন আর গদাই তখন পার্টনারশিপে কন্ট্রাক্টরিতে নেমেছে। ইঁট বালি সিমেন্ট দিয়ে শুরু। পরে স্যানিটারি দোকানও খুলেছে গদাই। কিন্তু প্রোমোটারির কথা মাথায় আসতেই ডাক পড়েছিল মানসের। কর্পোরেশন থেকে প্ল্যান স্যাংশন করানোর দায়িত্বটা ওকেই নিতে হবে। মানস না করেনি। করার কারণও কিছু ছিল না। জবরদখল কলোনির বিশাল চৌহদ্দিতে ওদের সামনে তখন অঢেল টাকা ছাড়ানো। লাগাতার জি-প্লাস-থ্রি বানিয়েছে আর বেচেছে, ডন্টু, পটা, গদাই। কাঁচা টাকা কামিয়েছে। নোটন তখনও ইঁট বালিতেই আটকে। পরে ওকে পার্টনার করে নিজেদের জমিতে প্রথম প্রোমোটিং করে মানস। নাম দেয় ‘ওম কনস্ট্রাকশন’। পরীর বাবার বেদখল হয়ে যাওয়া দশকাঠা জমিতে ওঠে ওর দ্বিতীয় প্রজেক্ট। দীর্ঘদিন লেগে থাকতে হয়েছিল, সেই জমি উদ্ধার করতে। কিন্তু বানানোর আগেই যা সময়, বানানোর পর বিক্রি হতে দিন গুনতে হয়নি। দাম বেশি হওয়া সত্ত্বেও। এটাতেই ওদের রাগ। অথচ নিজেদের কাজের কোয়ালিটিটা তোল, সেটাও করবে না। ছ’শো স্কোয়ার ফুটের খুপরিতে কলোনির লোকের মন ভরতে পারে, শাঁসাল পার্টি ধরতে হলে স্পেশ বাড়াতে হবে। ওরা গুনতিতে বাড়ায়, মানস দেখায় স্বাচ্ছন্দ। বেশি লাভ করবে বলে, সস্তার মাল ঢেলেছে ওরা। বছর না ঘুরতে কমপ্লেন। এখন মার খাচ্ছে বিক্রি। ফ্ল্যাট পড়ে থাকছে। রাগ তো ওদের হবেই। কিন্তু ইচ্ছে থাকলে এখনও কি ঘুরে দাঁড়ানো যায় না? এই জন্যেই তোরা কলোনির লোক, শেখাতে চাইলেও শিখবি না, ...মনে মনে বলে মানস। কিন্তু সবকটাকে সাইজ করে শেষে কি এই পাগলা বাদলের কাছে হেরে যাবে ও? ভেস্তে যাবে ওর প্ল্যান? ভাবতেই পারে না মানস। অধৈর্য হয়ে পড়ে। ব্যাটা গেছে তো গেছেই, ফেরার নামটিও নেই। আর যত দিন যাচ্ছে, পরীর সন্দেহটা দৃঢ় হচ্ছে মানসের মনেও। দুশ্চিন্তায় অফিস ডকে উঠেছে। নতুন বোর্ড। অ্যাটেন্ডেন্স-এর কড়াকড়ি। আধ পেটা খেয়ে দৌড়োতে হচ্ছে রোজ। তার মধ্যে বাদলকে নিয়ে এই ফ্যাসাদ...।


তিন

দু’দুটো রবিবার পার করে বাবু ফিরলেন। একদিন সন্ধের পর দেখা গেল ব্যালকনির দরজা খোলা। আলো জ্বলছে বাদলের ঘরে। পরীই ডেকে দেখাল। সদ্য অফিস থেকে ফিরেছে মানস। নিজের চোখে দেখল স্যান্ডো গেঞ্জি আর ধবধপে পায়জামা পরা বাদলকে। ঘরের দিকে মুখ করে কথা বলছে কার সঙ্গে। আর পরদিন সকালেই সব সন্দেহের অবসান। দেখা গেল বাদলের ব্যালকনি থেকে লম্বা শাড়ি মেলা, নীচের তলার বারান্দা অবধি। মিলে গেছে পরীর আন্দাজ। হেরে গেছে মানস।

বাজার থেকে ফিরেই থমথমে মুখে আবারও বেরিয়ে গেল মানস। সোজা গিয়ে বেল টিপল বাদলের ঘরে। দরজা খুলে একমুখ হাসল বাদল। কী রে, আজ অফিস নেই?

হাসিতে মিশে থাকা বাড়তি পুলকটুকু নজর এড়াল না মানসের। ওকে একরকম ঠেলেই ঢুকে পড়ল ঘরে। তারপরেই সচেতন হল ঘরের অন্য বাসিন্দা সম্পর্কে। সংযত করল নিজেকে। বলল, অফিস আছে, যাব। তোর খবর নিতেই এলাম। অনেকদিন ঘর বন্ধ ছিল, গিয়েছিলি কোথায়?

দিদির বাড়ি। ওরা বলল, থেকে গেলাম ক’দিন।

ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে মানস। কারও উপস্থিতি, কোনও শব্দ, কিছুই তো টের পাওয়া যাচ্ছে না। রান্নাঘরে উঁকি দেবে, নাকি ওপাশের শোবার ঘরে? বাথরুমের দরজা তো হাট করে খোলা। শেষে মরিয়া হয়ে বলল, ব্যালকনিতে শাড়ি মেলা দেখলাম। কে এসেছে, তোর দিদি? ভেতরের রাগটা আর চাপা থাকল না বলার সময়। দাঁতের ঘসায় ধারাল হয়ে বেরিয়ে এল যেন।

না না...। বাদলের মুখে চোখে আবারও সেই পুলকিত ভাব। তার সঙ্গে মিশেছে লজ্জা। সবার বারান্দাতেই শাড়ি মেলা থাকে, তাই আমিও মেললাম। পুরনো শাড়ি। আলমারিতে ছিল। ভালো দেখাচ্ছে না...!

মানসের প্রশংসা শোনার জন্য উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে বাদল। আর বুদ্ধিমান, পরোপকারী মানস মুগ্ধ চোখে দেখে চলেছে ওকেই। দারুণ দেখাচ্ছে! উচ্ছ্বাসের চোটে বলেই ফেলল এবার। আরও বলল, রাস্তার ওপরের দোতলার ফ্ল্যাটটাই তোকে দেব ঠিক করলাম, বুঝলি? এর চেয়েও বড় ব্যালকনি থাকবে। চাইলে বউও এনে দেব। বারান্দায় বসে গল্প করবি দুজনে...!

যাহ্‌, কী যে বলিস, আমার আবার বিয়ে...। লজ্জায় সঙ্কোচে গুটিয়ে এতটুকু হয়ে গেল বাদল।

কিন্তু প্রবল আনন্দ হচ্ছে মানসের। বলে, সে তুই বিয়ে করিস আর না করিস, দোতলার ফ্ল্যাট তোর।

না না! আমি দোতলায় থাকব না। কঁকিয়ে উঠল বাদল। বুকের মধ্যে মাথাটা গুঁজে দুইহাত নেড়ে চলেছে ক্রমাগত।

কেন! তোর অসুবিধেটা কোথায়? অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে মানস।

এখানে আমার ভালো লাগছে না। তাই তো দিদির বাড়ি পালিয়েছিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটের কাজ হয়ে গেলে, ওই পেছন দিকটাতেই আমি থাকব। মনে হবে নিজের বাড়িতেই ফিরে এলাম। তুই শুধু ওদিকে একটা দরজা করে দিস। ...দিবি তো?

দেব। চুপসে যাওয়া ক্লান্ত মানস ভরসা দেয় বাদলকে। তারপর অতি কষ্টে নিজেকে বহন করে ফিরে চলে। প্রথমে বাড়ি, তারপর অফিস...


লেখক পরিচিতি
কাবেরী চক্রবর্তী
কথাসাহিত্যিক। প্রবন্ধকার।
জন্মস্থান: বর্ধমান জেলার দুর্গাপুরে। বর্তমানে কলকাতার স্থায়ী বাসিন্দা। 
শিক্ষাগত যোগ্যতা: রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি

প্রকাশিত বই: 
গোকুলবাহিনী (গল্প সংকলন)২০১৩(একুশ শতকের প্রকাশনা)
দ্বীপবাসিনী (উপন্যাস)২০১৬(একুশ শতক প্রকাশনা)
ইচ্ছেবাড়ি (উপন্যাস) ২০২০(গাঙচিল প্রকাশনা)

বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য মাঠ থেকে সরাসরি ২০২০(দে'জ পাবলিশিং)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন