মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

শচীন দাশের গল্প : ফুটকি


মেঘ করেছিল দুপুরের দিকে। শেষবেলার দিকে এসে হাওয়া ছাড়ল। ছাড়তেই বঁড়শিটা তুলে ভাঙা বাঁধের ওপরে উঠে দাঁড়াল ফুটকি। এ বাঁধটা পুরোনো। অনেককালের। ফুটকি যা শুনেছে আগে এদিকে, এই বাঁধের নীচেই নাকি ছিল একটা নদী। কালে কালে তার গতি বদলেছে। রাস্তা বদলে এখন সে, সি ওদিকি। তাও কী, অবস্থা ভালো নয়। রোগা হতি হতি হ্যাংলা মেইয়ির মতো চুপচাপ শুদু পইড়ে থাকে। তবে বর্ষায় কী যে হয়! তখন সে ভয়ংকর। বাঁধ টপকে ঘরবাড়ি ও মাঠঘাট সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ইরিগেশানের বাবুরা নতুন একটা বাঁধ দিয়েছে তাই ওদিকে।
ফুটকি দৌড়ায়। কালো কাঠি কাঠি পায়ে কোমরের ঘুনসিটা সামলে নাক টানতে টানতে ছুটতে থাকে। হাতে তার কুড়ানো ময়লা একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ। ওই তাতেই লাফাচ্ছে জ্যান্ত ব্যাং দুটো। বঁড়শিতে টোপের জন্য ধরেছিল আল ধার থেকে। ছোটো কিন্তু আচ্ছা ত্যাদড়। ধরতে গেলেই লাফাবে। তা ফুটকিও তেমনি। বুজেসুজে ঠিক ধরে ফেলবে খপাত করে। তা ধরেও ছিল। আর ধরেই খালপাড়ে গিয়ে একটাকে টকাস করে ওই বঁড়শিরই মুখে ধরে গেঁথে দিয়েছিল। আর তারপরেই ছুঁড়ে ফেলেছিল খালের জলে। জ্যান্ত টোপ। মাছেরা খায় ভালো। কিন্তু কপাল খারাপ আজ ফুটকির। ফেলতে না ফেলতেই ওই হাওয়া।

ফুটকি তাকাল। তাকিয়ে একবার আকাশটা দেখল। মেঘ ঘুরছে চারপাশে। তারই ভেতরে এই হাওয়া। এ হাওয়ায় ঝুপিটা আবার উড়ে না যায়! তা উড়তেই পারে! তালপাতা দিয়ে বানানো ঝুপি। সেই কবে বাপটা তার বানিয়েছিল। তারপর রোদে-বৃষ্টিতে পাতা পচে এলে ওই মা-ই কোত্থেকে আবার নতুন পাতা জোগাড় করে ছাউনি দিয়েছিল। ছাউনির পাশাপাশি হাত চারেক উঁচু মাটির দেওয়াল। ছন মেশানো জাবমাটি চড়িয়ে চড়িয়ে বানানো দেওয়াল। সামনে শুদু একটা ছোটো দরজা। হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকতে ও বেরোতে হয়।

বাপ নেই কিন্তু একটা লোক আসে মাঝেমাঝে তার বাপের জায়গায়। অই হামাগুড়ি পথে। রাতের অন্ধকারে দু-চারদিন ঘুম ভেঙে গেলে দেখেছে ফুটকি, হামাগুড়ি দিয়ে তাদেরই ঝুপি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে একটা লোক। পরনে লুঙি গায়ে গেঞ্জি। মাকে শুদোলে মা হাসত মিটিমিটি। সকালবেলায় খালপাড়ে গিয়ে মাঠকাজ সেরে ফিরে এলেই সে ফুটকিকে বলত। তোর বাপ রে! নতুন বাপ। একদিন তোরে নিইয়ে নদীর ওপারি ঝাবে বলেছে। খুব বড়ো মেলা হয় নাকি! চড়কির মেলা। বঁড়শির মাতায় মানুষ গাঁথে রে ফুটকি! সি যি কী দেখতি!

ফুটকি অবাক। বিস্ময়ে তার চোখের পলক পড়ত না। সে তো ব্যাং গাঁথে তার বড়শির মাথায়। চ্যাং মাছও গাঁথে বড়ো মাছ ধরার জন্য। তাই বলে মানুষ! তাহলে মানুষ গেঁথে কাকে ধরা হয়? কিন্তু জিজ্ঞেস করলেও কোনো জবাব পায়নি সে মায়ের কাছ থেকে। তবে মা না বললেও জবাবটা কিন্তু মিলল একদিন। এক সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে সব ভো ভো। মা নেই। কোথায় যে গিয়েছে। ফুটকি ভাবল রোজগারে গিয়েছে। রোজ যেমন যায়। এদিক-ওদিক করে দুটো একটা পয়সা সে নিয়ে আসে। ওই তাতেই এক ঠোঙা নুন, এক শিশি সরষের তেল ও আঁচলে বাঁধা চাল কটা। তা ফুটকি ততক্ষণে তড়বড়িয়ে সামনের ওই তালগাছে কাঠবেড়ালির মতো তড়তড় করে উঠে পড়েছে।

খালপাড়ে নিজেদের মর্জিমতোই দু-দুটো তাল গাছ কখন বড়ো হয়ে উঠেছিল। একদিন বাপ তার গলা চেঁছে হাড়ি বসাল। বসাতেই কুলকুল করে নামল রস। তা ওই রস খেয়েই তো শরীরটা হালকা করে ফেলত তার বাপ। আবার সেই রস গেঁজিয়ে তাড়িও করে খেত। ফুটকিকেও খাওয়াত। তা বাপ এখন নেই। কিন্তু না থাকলেও ফুটকি আছে। সেইই রোজ ওঠে সেখানে। রসের সময়ে রস। আবার তালের সময়ে তাল। পেকে গন্ধ বেরোলে ধুপধাপ শুধু পড়ত। আর সেই তাল নিয়েই তো স্টেশনে বসে বিক্রি করত তার মা-টা। সঙ্গে ফুটকি। কিন্তু সেবারে গাছ থেকে নেমে এসে দেখে মা নেই। বসে থেকে থেকেও মা এল না। সকাল হল, বেলা বাড়ল ও বেলা গড়াল। মাকে আসতে না দেখে খোঁজ করতে গিয়েই ফুটকি শুনল মা তার পালিয়েছে সেই লোকটার সঙ্গে। কোথায় পালাল! মাকে নিয়ে গেলই বা কোথায়! চড়কির মেলা দেকাতি! কিন্তু মা যে বইলেছ্যালো লোকটা তাকে নিয়ে যাবে। মানুষ গাঁথা দেকাবে।

বাপটা গিয়েছিল আগেই। শহরে কোন কাজ আছে বলে জানিয়েছিল মাকে। কিন্তু গিয়ে আর ফিরে এল না। মা তখন প্রায়ই বাপের খোঁজে স্টেশনে গিয়ে দাঁড়াত। খোঁজখবর করত। তা ওই খোঁজখবর করতে গিয়েই বুঝি নতুন লোকটার সঙ্গে পরিচয়।

দৌড়োতে দৌড়োতে ঝুপিতে এসে গিয়েছিল। ভাঙা বাঁধ থেকে নামতে গিয়েই টের গেল হাওয়া উধাও। আর মেঘটাও যেন উড়ে গিয়েছে। আকাশের পশ্চিম কোন থেকে এক টুকরো রোদও যেন ঝিলিক দিয়ে উঠল। বোকার মতো ফ্যালফ্যাল করে সেদিকে তাকাতে গিয়েই ফুটকি ভাবে, যাবে নাকি আবার সেখানে সে। ব্যাং দুটো তো এখনও লাফাচ্ছে।

ভাবতে গিয়েই বাঁধে উঠতে যাচ্ছিল এই সময়েই খালের জলে কীনজরে এল ফুটকির। একটা জায়গায় জলের ভেতরে যেন খুব বুজগুরি উঠছে। বড়ো মাছ নাকি! হতে পারে শোল কিংবা মাগুর। কিংবা বড়ো ল্যাঠাও হতে পারে। হাতের প্ল্যাস্টিকটা নীচে চাপা দিয়ে রেখে টোপ লাগানো বঁড়শিটা নিয়ে তরতর করে জলের কিনারায় নেমে যায় ফুটকি। এরপর জলে ফেলে বঁড়শিটা। কিন্তু ফেলতে না ফেলতেই কুউপ। টুপ করে কে সেটা খেয়ে নেয়। তখন ফুটকির আর তর সয় না। এক ঝটকায় সে ছিপটা টেনে নেয়। আর নিতেই একি! বড়ো একটা শোল। তুলতে কি আর পারে ফুটকি। ছিপ যেন বেঁকে যায়। তবু তুলল। তারপর সোজা স্টেশনে নিয়ে গিইয়ে বিক্কির।

তা ওই মাছ বিক্রি করতে গিয়েই নজরে এল মা। পরনে গোলাপি শাড়ি। মাথায় সিঁদুর। হাতে চুরি। পায়ে চটিও আছে একটা। অনেক লোকের মাঝে দাঁড়িয়ে হালুক-চালুক তাকাচ্ছে। ফুটকি দৌড়োল। দৌড়ে গিয়েই মাকে ধরে ফেলল। মায়ের আঁচল ধরে টানল। ফুটকির চোখে তখন জল।।

হাই দা....ফুটকি! মা দেখে চমকে উঠেছিল। মুহূর্তে তার চোখও ভিজে ওঠে। ঝুঁকে পড়েই ফুটকিকে সে জড়িয়ে ধরে। ফুটকির গায়ে আঁশটে গন্ধ। ছেড়া ফ্রকটার গায়ে বুকের কাছাকাছি মাছের আঁশও যেন লেগে আছে এখানে ওখানে। মা তাকিয়ে রয়েছে তার বুকের দিকে। কিন্তু মায়ের শরীরের সেই পাঁকের গন্ধটা আর নেই। ফুটকি টের পেল খুব সোন্দর বাস একটা উঠতিছে যেন মায়ের শরীর থেকে। তাবাদি মোটাসোটাও হয়েছে যেন মা-টা। কী সোন্দর যে দেখতি!

মা বলল, কেমন আছিস?

ভালো না মা। পেটি বড়ো খিদে। ফুটকি চাপা কান্নায় ভেঙে পড়ে। কান্নাভাঙা গলায়ই জানায়, খিদিয় নাড়ি চনমন করে....তুমি থাকতি তবু দুটো ভাত পড়ত পেটি....তুমি গেলে কোথায় মা?

ফুটকির কান্না দেখে মায়ের চোখেও জল।

ফুটকি হাতের উল্টোপিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে, আমারি তোমার সংগি নিইয়ে ঝাবে মা—

মা উত্তর দেয় না। দেওয়ার আগেই নজরে আসে সেই লোকটা। লোকটা না তাকে নদীর ওপারে চড়কের মেলায় নিয়ে যাবে বইলেছালো। বঁড়শি গাঁথা মানুষ দেকাবে বইলেছালো।

নাও নাও, চল। গাড়ি আসতিছে। এ গাড়িটা মিস করলি.....।

বলতে গিয়েই নজরে এল ফুটকি। আর নজরে পড়তেই সে বিরক্ত, একি এটারে আবার কোতায় পেলে? ছাড়ো ছাড়ো.....

হরন বাজিয়ে ট্রেন ঢুকে পড়েছিল। ঢুকেই আস্তে করে এসে দাঁড়াল। দাঁড়াতেই লোকজন সব ঝপঝাপ নামল। তখন গাড়িটা আবার একটু পরে সেই ভেঁপুটা বাজিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।

ফুটকি চোখে চোখে রেখেছিল। দৌড়ে গিয়েই দেখল মাকে। সেই লোকটার সঙ্গে উঠে যাচ্ছে ট্রেনের ভেতরে। কিন্তু দেখতে গিয়েই মাকে আর খুঁজে পায় না ফুটকি। ভিড়ের ভেতরে কোথায় যে গেল! ফুটকি এপাশে ওপাশে তাকাল। এলোমেলো দৌড়োল। আর ওই তখনই যেন শুনল মা তাকে ডাকছে: হাই দা.. হাই...এ ফুটকি...হাই দা, এ মেইয়ি—

ওই তখনই ফুটকি তাকিয়ে দেখল একটা জানালায় তার মায়ের মুখ। রং করা লোহার সরু রড়ের গায়ে থুতনি ঠেকিয়ে তাকিয়ে আছে। তার মুখে কান্না।

ঝুপিতি ফিরে ঝ ফুটি.... কাল কি পরশু এইসে আমি নিইয়ে ঝাবখন। হারে, খালির জলে মাচ পড়তিচে?

ফুটকি কী জবাব দেয়। মায়ের মুখ রেখে রেখে সে দৌড়ুয়। কিন্তু ট্রেনের সঙ্গে পারবে কেন! সে দৌড়োবার আগেই ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মের দোকানপাট কাঁপিয়ে ঝপ করে চলে গেল। তারপর তার পেছনে একটা বিন্দু আলো। আলোটা কেমন দপদপ কইরে কাঁপতিছে। এরপর সেটাও মিলিয়ে যায়।

ফুটকি ফিরে আসে। কোমরের ঘুনসিতে গোঁজা গোটা বিশেক টাকা। শোলটা বেচে পেয়েছে। ওই তা ভাঙিয়েই মুড়ি হল এক ঠোঙা। তেলেভাজাও পেল দুটো। দুটো চপ ও একটা বেগুনি। একবার মা এনে খাইয়েছিল। থমথমে মুখে ফুটকি স্টেশন থেকে বেরিয়ে এল। লাইন গেট পার হয়ে এরপর ডানদিকে নেমে পড়ল। এখন তাকে হেঁটে যেতে হবে কতটা! ঠোঙায় হাত ঢোকাল ফুটকি। মুড়িতে তেলেভাজার তেল লেগে গেছে। হাতে তুলতে গিয়ে সে মুড়িই এখন নাকের সর্দিতে আটকে যাচ্ছে। কচ করে তেলেভাজাটায় একটা কামড় দিল ফুটকি। শুকনো দড়ি পাকানো লালচে চুলগুলোকে একবার হাতের উল্টোপিঠ দিয়েই একবার পেছনে সরিয়ে দিল।

রাস্তা থেকে নেমে আলের গায়ে উঠে দাঁড়ায় একবার ফুটকি। আকাশের দিকেও তাকায় একবার।

আকাশে এখন আর রোদ নেই। তবে মেঘটেঘ কেটে গিয়ে আকাশটা যেন সাদা আলোয় সেজে উঠেছে। হাঁটতে গিয়ে সামান্য পরে গোলাকার সেই চাঁদটাও উঠে এল। চাঁদের সঙ্গে সঙ্গে কিছু রাত চরা পাখি। এবার সাপেরা সব বেরোবে ইঁদুরের খোঁজে। আল ধারে গিয়ে গিয়ে খুঁজবে গর্ত। তারপর সে গর্তে নিজের নরম শরীরটা পাকিয়ে পাকিয়ে একদম ভেতরে। একদিন এমনি একটা গর্তে হাত ঢুকিয়ে বেশ কিছু ধান তুলে এনেছিল না ফুটকি! মাকে দিতে মায়ের চোখে সেকি আনন্দ!

মুড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল। ঝুপিতে ফিরে বাকি তেলেভাজাটা গিলেই ঢকঢক করে জল খেয়ে নিল ফুটকি। তারপর ঘুনসি থেকে বাকি টাকাটা বার করে একটা কৌটোয় রেখে দিয়ে একবার খালপাড়ে গেল। তালগাছটাকে আড়াল করে খালের একবারে নীচে নেমে ফ্রক তুলে প্যান্ট খুলে ছিরছির করে খানিকটা জলবিয়োগ করল। পরে ঝুপিতে ঢুকে তেল চিটচিটে কথা একটা টেনে কাথার ওপরে শুয়ে পড়ল। তাল গাছের পাতায় বাইরে ফুরফুরে হাওয়া উঠেছিল। সে হাওয়াটাই নেমে এসে ঝুপির ফাঁকফোকরে ঢুকতেই ফুটকির চোখে ঘুম। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কোথায় যে গেল! একসময় দেখল মা তাকে নিতে এসেছে। সঙ্গে নতুন বাপ। ওই লোকটা তাকে নিয়ে বেরোবে। বলেছিল না চড়কের মেলায় নিয়ে যাবে তাকে?

হাই দা.....ও ফুটকি ওঠ। আর কত ঘুমোবি মা। ওই দেক কে এয়েছে—

ফুটকি তাকায়। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতেই চোখে পড়ে সেই নতুন লোকটা। তার নতুন বাপ।

ও ফুটকি ওঠ....ওঠ.....

লোকটি তাকাচ্ছে তার বুকের দিকে। বুকজোড়া এরইমধ্যে কেমন যেন উঁচু হয়ে উঠছে। ফুটকির কেমন লজ্জা হয়। সে উঠে পড়ে। তারপর সোজা দৌড়ে খালপাড়ে। মাঠকাজ না সেরে এলে মেলায় যাবে কী?

গামছা একটা নিয়ে গিয়েছিল। মাঠকাজ সেরে খালের জলে নেমে ঝুপঝাপ স্নানটা একদম সেরে এল সে। তখন ফুটকির গায়ে ভিজে জামাটা যেম লেপটে রয়েছে।

নতুন বাপ জুলজুল করে তাকাচ্ছিল। গা-টা মুছিয়ে মা তাকে একটা নতুন কিনে আনা জামা পরিয়ে দিতেই সে বেরোল। সঙ্গে তার মা ও নতুন বাপ। ফুটকির মনে তখন কী আনন্দ! মেলায় আমারি জিলিপি খাওয়াবে মা। শুনিচি মেলায় জিলিপি বিক্কির হয়--

হ্যাঁ, তা খাওয়াব না কেন? নতুন বাপের মুখে হাসি উপচে পড়ছে। জিলিপি খাওয়াব। পুতুল নাচ দেখাব—

পুতুল নাচ!

হ্যাঁ গো। সত্যনারায়ণ পুতুল নাচের দল এয়েচে ঝে। ওরা করতিচে অরণ্যে রোদন। ফুটকির খুব ভালো লাগবে—

আর বঁড়শির মুকে মানুষ গাঁতা....

হ্যাঁ, তা-ও দেকাব। ওই সব দেকেই তো পুতুল নাচ—

ঝুপির দরজাটা টেনে বেরিয়ে পড়ে ওরা।

সামনে খালপাড়। খালপাড় ধরে হাঁটতে হাঁটতেই একটা নদী। তা সে নদীর খেয়া পার হলিই তো সেই মেলা। জানে ফুটকি। মা তাকে বলেছে।

তা ফুটকি দৌড়োয়।।

তার এই নতুন বাপটা বেশ। খুব হাসিখুশি। তড়বড়িয়ে কথা বলে। কিন্তু আগের বাপটা সারাদিনই শুধু তাড়ি গিলে থাকত। আর মাঝে মাঝে টাকা না পেলে তার মাকে ধরে কী পেটানি! ওই পেটানোর সময়ই একদিন কামড়ে দিয়েছিল না ফুটকি! হাত একটা বাগে যেই কচ করে কামড়! তা কামড়টা খেয়েই খেপে গিয়েছিল বাপটা। মাকে ছেড়ে তাকে ধরতে এসেছিল। তা পারবে কেন ফুটকির সঙ্গে? সে ততক্ষণে দে দৌড়। খালপাড় ধরে দৌড়ুচ্ছে। দৌড়ুতে দৌড়ুতে তারপর কালকেন্দির ঝোঁপের পাশেই লুকিয়ে পড়েছিল ফুটকি। বাপ এসে খানিক এপাশ ওপাশে তাকিয়েই এরপর চলে গিয়েছিল হতাশ হয়ে। যাওয়ার সময়েও টলতে টলতে কামড়ানো জায়গাটা দেখছিল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে।

নাচতে নাচতেই আগে আগে যাচ্ছিল ফুটকি। পেছনে পেছনে তার নতুন বাপ ও -টা। কিন্তু খালপাড় শেষ হতেই একি! নদী কোথায়? নতুন বাপটা না বলেছিল নদী পার হয়ে তবেই মেলায় ঢুকতে হয়? মাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল সেই সময়েই হঠাৎই হোঁচট। একটা পড়ে থাকা বাবলার ডালের সঙ্গে হোঁচট খেয়েই পড়ে যাচ্ছিল ফুটকি। আর পড়তে গিয়েই টের পায় নতুন বাপটা দৌড়ে এসে তাকে ধরে তুলে নিয়েছে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। মুখে হাসি ফোটে ফুটকির।

সে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু নদীরি তো দেখতিছি না—

ওই তো নদী! তোর বাঁদিকি।

নতুন বাপটা উত্তর দেওয়ার আগেই মা দেখিয়েছিল তাকে সেই নদী।

অতঃপর সেই নদী পার হোইয়ে মেলায় ঢোকা।

জিলিপি কিনে দিয়েছিল নতুন বাপ। তা জিলিপি খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে এরপর সেই চড়োকির জায়গা। বঁড়শির মাথায় মানুষ গেঁথে তাকে নিয়ে ঘোরানো হচ্ছে।

মা বলল, না বাপু এ জিনিস আমি দেখতি পারবনি--

মা তাই সরে গেল সামান্য দূরে। আর সেই সময়েই একি! নতুন বাপ যে তাকে ধরে তুলে দিচ্ছে বঁড়শির মুখে। তার কালচে পিঠে যেন বঁড়শিটা গেঁথে গেল। আর যেতেই গলগল করে রক্ত। ফুটকি যন্ত্রণায় চেঁচিয়ে ওঠে। মা শুনে দৌড়ে আসে। কিন্তু এলেও নামাতে পারে না বুঝি ফুটকিকে। বঁড়শির কাঁটায় বিধে ফুটকি যে ততক্ষণে ঘুরতে শুরু করেছে। আর ঘুরতেই সেই লোকটার হাততালি। আশেপাশে লোকের হাততালি। ঠোঁট ফাঁক করে শিসও দিচ্ছে কেউ কেউ। কিন্তু দিলে কী হয়, ফুটকির যন্ত্রণাটা বুঝি টের পায় না কেউই। শুধু বুঝি ওই মা। মা তাই দৌড়েই এল। এবং ওই তখনই এক ঝটকা! সে ঝটকায় বুঝি ছিটকে পড়ে ফুটকি। আর পড়তেই কখন তার ঘুমটা ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে উঠে টের পায় সে স্বপ্ন দেখছিল। এবং সে স্বপ্নের ভেতরেই মেলায় ঘুরছিল এতক্ষণ!

ছেঁড়া কাঁথার বিছানাটায় উঠে বসে ফুটকি। তার গলায় ও বুকে তার জ্যাবজেবে ঘাম। তাকিয়ে দেখে বাইরের আলোও যেন ফুটে উঠেছে। তার মানে তো ভোর হয়েছে। ফুটকি ওঠে।

হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এসেছিল। এসেই মাঠে যায় ফুটকি। কিন্তু মাঠকাজ সেরে ফিরতে গিয়েই চোখে পড়ে একটা বড়ো গর্ত। গর্তের মুখে যেন ধান রয়েছে সারি দিয়ে।

ফুটকির দুচোখ ঝিকিয়ে ওঠে। ঝুঁকে পড়ে হাঁটু ভাঁজ করেই সে ধপ করে বসে পড়ে। সরু লিকলিকে হাতটা আস্তে আস্তে এরপর গর্তে ঢুকিয়ে দেয়। আর ঢোকাতেই ফস--স। সোজা গর্ত ছেড়ে উঠে দাঁড়াল একটা গোক্ষুর।

ও আচ্চা, মানসার বাহন... তুমিও ঢুকি পড়িছ? ঠিক আচে দেকাচ্ছি মজা। বিড়বিড় করে কী বলে ওঠে ফুটকি। সে জানে এবারে তাকে একটু খেলাতে হবে। গোক্ষুরটা খেলবে। আর তারপরেই আচমকা তাকে বার করে এনে তার লেজটা ধরে নিয়েই ছুঁড়ে মারবে ওই খালপাড়ের দিকে। এরপর খোলা গর্তে হাত ঢুকিয়ে ইঁদুরের জমা করা কতই না ধান। বার করে নিয়ে এসে সেদ্ধ করে নিলে....তার মাটা যেন কী করে একবার তাকে এই ধান থেকে ভাত করে খাইয়েছিল! গন্ধটা যেন এখনও লেগে আছে নাকে।

ভাতের গন্ধে ফুটকি হাত ঘোরায়। এবার তার খেলা শুরু হল। কিন্তু এ খেলায় কখন যে তার জিত হবে! এ খেলায় কখন যে তার মুখে হাসি ফুটবে! ফুটকি চোখ স্থির রাখে। হাত নাচায়।

ক্রমে বেলা বাড়ে। রোদ ওঠে। ধানকাটা মাঠের ওপরে নিঃশব্দে শুয়ে সকালের রোদ। থেকে থেকে তালগাছের মাথা থেকে হাওয়া ছাড়ে। হাওয়া খেলে। আর সে হাওয়ার পাশাপাশি কত যে খয়েরি পাখি! মাঠ জুড়ে উড়ছে। ফেলে যাওয়া ধানের লোভে লোভে এসে জুটছে। কিন্তু সেসবে এখন খেয়াল নেই ফুটকির। সে ততক্ষণে হাতের মুদ্রা ঘুরিয়ে এক থালা ভাতের জন্যে লড়ছে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন