মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

মধুময় পাল'এর গল্প: শিরদাঁড়ার ফেরিওলা

 


 

একদিন আমরা যারা ভেবেছি/ ট্রেনে ট্রেনে ঘুরে ঘুরে/ করে দেব জীবন কাবার/ আজ তারা কর্মহীন অসহায়/ কোথাও আলো নেই ভালো নেই/ ঘরে ঘরে অনাহার৷


আটফুট প্রমাণ পোস্টার অমলতাস গাছে ঝুলছে. তাতে লেখা৷ হস্তাক্ষর সুন্দর, পাকা টান৷ সাহেব আমলের যত সেগুন মেহগনি স্টেশনে স্টেশনে ছিল, সব কাটা হয়ে গেছে৷ প্ল্যাটফর্মের বাইরে অমলতাস বেঁচে গেছে রোগাসোগা আর দামনেই বলে৷

অমলতাসের নীচে বেদি৷ খৈনি আর গুটখার বেদি৷ লকডাউনে দখলদার ভেগেছে৷ সেখানে দাঁড়িয়ে শশিকান্ত ভাষণ দেবার কায়দায় বলে, বাবুসকল, গরিব মানুষের শিরদাঁড়া ভাঙতে কয়টা লকডাউন লাগে? ভাঙা মানুষের কথা বলি না৷ গরিব মানুষের কথা বলি৷ খেতে পায় না৷ কাজ নাই৷ কোথাও কাজ নাই৷ যার ছিল, তারও গেছে৷ স্কুল বন্ধ৷ কলেজ বন্ধ৷ পরীক্ষা বন্ধ৷ ট্রেন বন্ধ৷ বাস বন্ধ৷ বাজার প্রায় বন্ধ৷ দোকানেরও সেই দশা৷ মদের দোকান খোলা৷ মদের ঠেক খোলা৷ মদের চালান খোলা৷ বাবুমশায়সকল, তবু শিরদাঁড়া ভাঙে নাই৷ শির যেখানে দাঁড়ায়, তাহারে শিরদাঁড়া বলে৷ পিঠে হাত দিয়া দ্যাখেন৷ নিজেদের পিঠেও হাত দেন৷ বুঝবেন কার ভাঙা, কার অটুট৷ বাবুগণ, আমি ভাঙা মানুষের কথা বলি নাই৷ ভাঙা মানুষ জিয়ন্তে মরা৷ চলন্ত মড়া/ দামি পোশাক পরা৷ ভাঙা মানুষের চিন্তাশক্তি থাকে না, কথাশক্তি থাকে না৷ বাবুগণ, কাল দুপুরে পুলিশ আমাকে পিটাল৷ ওদের অধিকারের ডাণ্ডা দিয়া খুব পিটাল৷ কেন পিটাল? কারণ, আমি লকডাউন ভাঙি৷ আসল কারণ, আমি নিজের শিরদাঁড়া ভাঙি নাই৷ আমি রুমাল বেচি৷ বাবুদের রুমাল কিনতে বলি৷ লঙ্গরখানায় যাই নাই৷ ওদের লঙ্গরখানায় যাই নাই৷

স্টেশনে একটা ট্রেন এসে দাঁড়ায়৷ প্রায় শূন্য৷ জনা পাঁচেক যাত্রী নামে৷ এ-কামরা সে-কামরা থেকে জনাবিশেক সশস্ত্র রক্ষী৷ লকডাউনের আইন ভেঙে যেন কেউ ট্রেনে উঠতে না পারে৷ শূন্যতা বড়ো দামি, অস্ত্র লাগে, জেল লাগে৷

বাবুমশায়গণ, এই ট্রেন ছিল আমাদের অক্সিজেন৷ অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচে? বাঁচে না৷ এক সন্ধ্যায় পুরানা খুজলি চুলকাতে চুলকাতে রাজামশাই ঘোষণা দিলেন, ট্রেন বন্ধ৷ অক্সিজেন বন্ধ৷ কোথায় যেন অক্সিজেন না পেয়ে বাচ্চারা মরল, বড়রাও মরল৷ খবর হল৷ আমরা রোজ মরি৷ আমাদের মরার খবর হয় না৷ খবরদারগো শিরদাঁড়া নাই যে৷

ওভারব্রিজের সিঁড়ি বেয়ে এক যাত্রী নেমে আসে৷ টিকিট ঘর পেরিয়ে অমলতাসের কাছে দাঁড়ায়৷ পোস্টার পড়ে৷ বেদির ওপর দাঁড়ানো লোকটার কথা শোনে৷ ডাক দেয়, তুমি শাশিকান্ত? সেই শশিকান্ত? ট্রেনের কামরায় এরোপ্লেন ওড়াতে?

দাদাবাবু, আমি সেই শশিকান্ত৷ এককালে এরোপ্লেন উড়াতাম৷ এখন রুমাল বেচি৷ শিরদাঁড়ার কথা বলি৷ আপনারে যে চিনতে পারলাম না!

আমাকে চিনবে কী করে? আমি ভিড়ের লোক৷ একজন দর্শক৷ তোমার শিল্প দেখি৷ তুমি শিল্পী৷ তোমাকে ভোলা যায়?

কী যে বলেন, দাদাবাবু? ফেরি করে খাই৷ ফেরিওলা৷ হকার৷ ইস্টার্ন রেলওয়ে হকার্স ইউনিয়নের কার্ড নম্বর ফোর ওয়ান ওয়ান টু ওয়ান৷ শশিকান্ত বলে৷

যাত্রী বলে, তোমার নম্বর এককোটি একুশও হতে পারে৷ ওই সংখ্যাটা আমাদের দেশনেতাদের অপদার্থতার প্রমাণ৷ তোমার পরিচয় নয়৷ স্বাধীনতার বয়স যত বাড়ে, হকারের সংখ্যা পাল্লা দিয়া উপরে ওঠে৷ তা শরীরের এই হাল কেন? ঝুঁকে গেছ৷ কী সুন্দর স্বাস্থ্য ছিল৷ ছিপছিপে, তরতাজা, একমাথা চুল৷

ঝুঁকি নাই, দাদাবাবু৷ খেতে না পেলে শরীর বাঁক নেয়৷ দেড় বছর লকডাউন৷ ট্রেন বন্ধ৷ কোথাও কাজ নাই৷ খাবার পাই কীভাবে?

সরকার যে খাবার দিচ্ছে৷

ভিক্ষা দেয়৷ চিল্লিয়ে চিল্লিয়ে বলে, আমি দিয়েছি৷ হমনে দিয়া৷ হমনে কিয়া৷ যেন বাপের ঘরের মাল দিচ্ছে৷ আমি ভিখারি না, মানুষ৷ ভিক্ষা নিলে নিজেকে ধ্বংস করা হয়৷

সবাই তো নিচ্ছে৷

শশিকান্ত হাসে৷ কী বলি দাদাবাবু, লঙ্গরখানায় এখন বসন্ত লেগেছে৷ লতাপাতাফুলে ভরভরাট৷ শোনেন, আমাদের পাশের পাড়ায়, সব দুইতলা তিনতলা ফ্যাশনের বাড়ি, দুইজন প্রোফেসর আছে৷ তারা রেশনের লাইনে দাঁড়ায়৷ চাল নেয়৷ দুই টাকা কেজি৷ সেই চাল বাজারের দোকানে আট টাকা কেজি বেচে৷ ভিখারিরও অধম৷ ওদের সঙ্গে দাঁড়াতে মন চায় না৷ এতটা নীচে নামতে পারি না৷ কত রকম কাজ করেছি৷ একবেলা খেয়েছি৷ ভিক্ষা নেই নাই৷ ঝুঁকি নাই৷ না খেতে পেয়ে শরীর বাঁক নিছে৷

বেশি দূরে নয় মাইকে ঘোষণা হচ্ছে, আজ দুপুরে ডিম-ভাত দেওয়া হবে৷ প্রকৃত দুঃস্থরা মুক্তি সংঘের সেক্রেটারি সর্বজনপ্রিয় সুবল গুছাইতের সঙ্গে যোগায়োগ করেন৷ আর কিছুক্ষণের মধ্যে টোকেন দেওয়া হইবে৷ প্রকৃত দুঃস্থরা আসিবেন৷ এলাকার কাউন্সিলরের চিঠি আনিবেন৷ জগা, গান বাজিয়ে দে৷ আমি লাইনে যাচ্ছি৷

অমলতাসের মাথায় একটা বড়োসড়ো মেঘ দাঁড়াল৷ কয়েক ফোঁটা বৃষ্টি ঝরল৷ দূর থেকে ভেজা হাওয়া এল৷ নিম্নচাপের হাত ধরে বাংলায় বর্ষা আসছে, আবহাওয়া দপ্তর বলেছে৷ টিকিটঘরের লম্বা চাতালে একটা কুকুর শুয়ে৷ একটা কাউন্টার খোলা৷ কোনো ডাক নেই, সাড়া নেই৷ নীলসাধুর চায়ের দোকান বন্ধ৷ সাইকেল গুমটি ফাঁকা৷ অশথগাছে পাখিদের ডাকাডাকি নেই৷ রিকশাস্ট্যান্ডে একটা ভাঙা রিকশা, এপিটাফের মতো৷ আরেকটা প্রায় শূন্য ট্রেন এল৷ লকডাউনের শূন্যতা অটুট রাখতে রক্ষীরা প্ল্যাটফর্মে নামল৷ আবার উঠল৷ ট্রেন চলে গেল৷

বেশি দূরে নয় ঘোষণা হচ্ছে, আজ মুক্তি সংঘে ডিম-ভাত দিবার আয়োজন করা হয়েছে৷ প্রকৃত দুঃস্থদের বলা হচ্ছে, তারা যেন ক্লাবের সেক্রেটারি সর্বজনপ্রিয় সুবল গুছাইতের সঙ্গে যোগাযোগ করে৷ বিনামূল্যে ডিম-ভাত দেওয়া হবে৷ দুঃস্থরা নাম লেখান৷ লাইনে দাঁড়ান৷ ঠিকমত লাইনে দাঁড়ান৷ সর্বজনপ্রিয়….

শশিকান্ত চিৎকার করে ট্রেনকে বলে, শোনো, কথা দিচ্ছি, আমি আসব৷ আমরা আসব৷ কথা দিচ্ছি, আবার আসব৷ বাঁচব বলেই তোমার কাছে ফিরে আসব৷

শুভব্রত রাখাল ট্রেনের হকারদের নিয়ে কাজ করতে এসেছিল৷ কাজটা কতদূর এগোয় তা জানা যায় না৷ বড়ো কোনো মিডিয়ায় খবর না হলে এদেশে জানার উপায় নেই৷ আর বড়ো মিডিয়া কখনও ছোটো খবর নিয়ে মাথা ঘামায় না. কারণ ভা অলাভজনক৷ লাভের গন্ধ পাওয়া গেলে অন্যকথা৷ শুভব্রত রাখাল এরকম বয়ানে কাজটা শুরু করেছিল: শহরতলির ট্রেনগুলো এখন চলমান সুপার মার্কেট৷ এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতারা নিম্নমধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষ৷ এক বিশাল জনগোষ্ঠীর অন্নভূমি হয়ে উঠেছে শহরতলির ট্রেন৷ হয়ে উঠেছে প্রাণের আশ্রয়৷ এই মার্কেটে কী কী পাওয়া যায়, তাদের একটা তালিকা প্রস্তুত করছিল শুভব্রত রাখাল৷ সম্পূর্ণ করতে পেরেছে কিনা জানা যায় না৷ কারণ তা সম্পূর্ণ হবার নয়৷ নতুন নতুন আইটেম রোজ ঢোকে৷ যেটুকু জানা যায়, সেখানে ছিল ঝুরিভাজা. কাঠিভাজা, ডালভাজা, গজা, শণপাপড়ি, আমসত্ত্ব, কাজুবাদাম, কিসমিস, অম্বলের ওষুধ, দাদের মলম, দাঁতের মাজন, দাঁতের পোকার ওষুধ, ব্যথাবেদনার বিষহরি, উকুন মারার তেল, ঝালমুড়ি, ছোলাঝটপটি, মিষ্টিবাদাম, দিলখুশ, স্কচ ব্রাইট, রবীন্দ্রসঙ্গীত, বাংলার রান্না, অলৌকিক বনৌষধি, বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানীর ৭ হাজার টাকার দামের বইয়ের ৫ টাকার বাংলা সংস্করণ, খনার বচন, সিট্রানেলা, লক্ষ্মীর পাঁচালি, রেশন কার্ড হোল্ডার, মানিব্যাগ, ২ ইঞ্চির পকেট গীতা, প্লাস্টিকের টিয়াপাখি, প্লাস্টিকের ফুললতাপাতা, নেল কাটার, পিঠ চুলকোনোর হাত, সহজ ইংরাজি শিক্ষা, মোবাইল রাখার স্ট্যান্ড, ছুঁচ, বিবেক বাণী, সেফটিপিন, আলপিন, স্টেপলার, শশা, আম, কলা, মৌসম্বি, বেদানা, আঙুর, সবেদা, খেজুর, পুরাতন আমাশয় নির্মূল বটিকা, পুরাতন বাতের ব্যথার বৈদ্যুতিক মলম, জামাকাপড় মেলার দড়ি, পোকামাকড় মারার ওষুধ, লাইটিং বল, লেবুজল, আমের শরবত, ছড়ায় ছড়ায় ছড়িয়ে হাসুন, ন্যাপথলিন, ১০ টাকায় ৩টে টুথব্রাশ, ১০ টাকায় ৩টে ব্যাটারি, ওভেনের লাইটার, ১০ টাকায় ৮টা চিরুনি, ১০ টাকায় ১০টা পেন, ১০ টাকায় ৩টে হারের সেট, ৩০ টাকায় শারদীয় দেশ, ২০ টাকায় শারদীয় নব কল্লোল, ৫ টাকায় সানন্দা, ২ টাকায় আনন্দলোক, বর্ধমানের সীতাভোগ, কৃষ্ণনগরের সরভাজা, লাইটার কাম মানিচেকার, গামছা, রুমাল, মোজা, টুপি, রিমোট কভার, কানের ময়লা পরিষ্কারের কাঠি, ঘুগনি, লেবু চা, শ্যামাসঙ্গীত, ভূমিসংস্কারের ইতিহাস, বাংলার ম্যাজিক, স্মরণীয় বাঙালি ইত্যাদি৷ এটা মানতেই হবে, এ তালিকা কোনোদিন সম্পূর্ণ হবার নয়৷ শুভব্রত রাখাল নাকি বলেছিল, এই তালিকা ঘাঁটলে বাংলাভাগ, উদ্বাস্তু সমস্যা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে অবহেলা, সংস্কার ও অন্ধ সংস্কার, ভয়াবহ দারিদ্র্য, অশিক্ষা, রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি, রাষ্ট্রনেতাদের চরম অপদার্থতা বেরিয়ে পড়বে৷ শশিকান্তর এরোপ্লেন এই তালিকায় নেই৷ শুভব্রত রাখাল যখন কাজ শুরু করে শশিকান্ত তখনও এরোপ্লেন নিয়ে হাজির হয়নি৷ বাংলায় যখন জেলায় জেলায় পাড়ায় পাড়ায় সুপার মার্কেট ও রবীন্দ্র ভবন গড়ার ধুম লেগেছিল, যখন ঠিকাদারদের মহোৎসব, এবং কলকারখানা লাগাতর বন্ধ হচ্ছে, সম্ভবত সেই সময় শুভব্রত রাখাল কাজে হাত দেয়৷
 
চলে যেতে থাকা ট্পেনের দিকে তাকিয়ে যা্ত্রীর মনে হয়, হকাররা নিশ্চিতভাবেই একটা সমস্যা৷ ভিড়ের ট্রেনে মাল নিয়ে তাদের যাওয়া-আসা কখনও কখনও খুবই বিরক্তিকর৷ কিন্তু হকার ছাড়া ট্রেন ভাবা যায় না৷ এই নিত্যদিনের যাত্রায় অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তাদের উপস্থিতি৷ যাত্রী এমার্জেন্সি স্টাফ৷ লকডাউনে অফিস করা তার বাধ্যতামূলক৷ তাকে বিশেষ পাস দেওয়া হয়েছে৷ গন্তব্য স্টেশনে নেমেই গাড়ি পায়৷ বলতে গেলে, আরামদায়ক যাওয়া-আসা৷ কিন্তু এই ফাঁকা ট্রেনে কেমন যেন একটা অস্বস্তি৷ একটা ভয় কোথায় যেন ঘাপটি মেরে থাকে৷ ভিড় ট্রেনে মানুষের গায়ে মানুষ৷ ভয়ের জায়গা নেই৷ বেশ কিছু মধুর স্মৃতি আছে এই রোজযাত্রায়৷ সে মনে করতে পারে, যাত্রাশুরুর গোড়ার দিকে, কমবেশি তিরিশ বছর আগে, একটি ছেলে গান গাইত৷ জনপ্রিয় বাংলা গান৷ খালি গলায়৷ সে শেষ করত ‘মধুর আমার মায়ের হাসি’ দিয়ে৷ পয়সা চাইত না৷ যে যা দিত হাত বাড়িয়ে নিত৷ নমস্কার করত৷ মনে পড়ে, দুপুরে এক বৃদ্ধ গায়ক উঠতেন৷ হারমোনিয়ম ঝুলিয়ে৷ অতিপুরাতন, ক্ষয়ে যাওয়া রিড৷ বাংলা দেশাত্মবোধক গান গাইতেন৷ বাদাম-চটপটি-সেদ্ধছোলা-গজা ইত্যাদি চিৎকারের মধ্যে তিনি গান গেয়ে যেতেন৷ বুক পর্যন্ত ঝোলা দাড়ি উড়ত তাঁর মাথার ঝাঁকুনিতে৷ কিন্তু যাত্রীরা কথা বললে গান থামিয়ে দিতেন৷ তিনিও হাত পেতে পয়সা নিতেন না৷ যারা দেবার তারা তাঁর বুক পকেটে রেখে দিত৷ মনে পড়ে এক অন্ধ বৃদ্ধকে৷ বার চার-পাঁচেক তাঁকে দেখা গেছে৷ এক বিকেলে গেয়েছিলেন ‘যখন এসেছিলে অন্ধকারে চাঁদ ওঠেনি/ সিন্ধুপারে চাঁদ ওঠেনি/ হে অজানা তোমায় তবে/ জেনেছিলেম অনুভবে/ গানে তোমার পরশখানি বেজেছিল প্রাণের পরে”৷ কামরার এমাথা ওমাথা সব কথা মুলতবি রেখে গানের কথায় ও সুরে ডুবেছিল৷ আজ এঁরা কোথায়? এঁরা ভিখারি নন৷ শিল্পী৷ এঁরা কি লঙ্গরখানায়? নাকি চলে গেছেন অজ্ঞাত কোনো পরপারে? যে ছেলেটি ছড়া লিখত কাঁচা হাতে৷ নিজে ছাপিয়ে বিক্রি করত৷ পোলিটিকাল হিউমার৷ অজানা কোনো কারণে সে সরে যায় চকোলেটের লাইনে৷ বাংলার ক্ষুদ্রশিল্পপ্রয়াস মিশিয়ে দিত চকোলেটে৷ সেও কি অবশেষে লঙ্গরখানায়?

যাত্রী বলে, শশিকান্ত, তুমি শিল্পী৷

কী যে বলেন, দাদাবাবু! আপনারা ভালোবাসেন৷ বলতেন, এরোপ্লেন উড়াও, শশিকান্ত৷ আমি উড়াতাম৷

শশিকান্ত ট্রেনে এরোপ্লেন বিক্রি করত৷ টেনে টেনে সুরেলা করে সে বলে, উড়বে৷ উ--ড়--বে৷ উ—ড়—বে৷ উ--ড়—বে--ই৷ আমাদের ট্রেন যে পথ ধরে যাচ্ছে, তার দু পাশে কী দেখি৷ বন্ধ কলকারখানার ধ্বংসাবশেষ৷ বাবুসকল, শশিকান্ত পড়াশুনা করে নাই৷ তার বাক্যে ভুল থাকে৷ আমাদের হকার ভাইরা গলার জোরে তাদের জিনিসের নামগান করে৷ তাদের বাক্যে ভুল থাকে৷ হাসবেন না, বাবুরা৷ ওই চিৎকার আসলে ক্ষুধা৷ সেইটা নির্ভুল৷ ওই চিৎকার আসলে কান্না৷ সেইটা নির্ভুল৷ আমাদের নেতারা প্লেনে চড়ে৷ আমরাও চড়ি৷ হাওয়া পেলেই আমাদের প্লেন উড়বে৷ আকাশ পেলেই উড়বে৷ ডানাগুলা লাগিয়ে নেন৷ বাঁ হাতে বুকটা ধরেন৷ আলতো করে ধরেন৷ আদর করে ধরেন৷ ডান হাতে সুতা ধরেন৷ এইভাবে টান দেন৷ একটানে উড়িয়ে দেন৷ আপনার বাঁহাত থেকে উড়ে গেল প্লেন৷ উড়বেই৷ উ--ড়—বে--ই ৷ আমি শশিকান্ত দাস৷ বন্ধ ডানলপের শ্রমিক৷ নেতারা বলল, খুলবে, খুলবে৷ বলতে বলতে ওরা প্লেনে উড়ে গেল৷ আমরা কে কোথায় ছিটকে যাই৷ আমরা হকারি করি৷ নেতারা প্লেন থেকে নেমে কৃষিজমিতে মোটরগাড়ির স্বপ্ন বানায়৷ জমি থেকে আরও হকার আসবে৷ আমরা সবাই মিলে একদিন প্লেন উড়িয়ে দেব৷ দেবই৷

শশিকান্ত কি জানে কেমন আছে তার সহকর্মীরা? জানার কথা নয়৷ লাইনেই এদের নিত্য দেখা৷ লাইন বন্ধ৷ সুতরাং কে কার খোঁজ রাখে৷ লকডাউনের আগে মানুষ মানুষের কাছ থেকে এতটা দূরে কখনও সরে যায়নি৷ ইচ্ছে থাকলেও খোঁজ রাখা সম্ভব নয়৷ যাত্রী জানতে চায়, শশিকান্ত, ধূপকাঠির সেই ফর্সা লোকটিকে অনেকদিন দেখিনি৷ লকডাউনের বেশ আগে থেকে৷ সুন্দর গন্ধে আর সুন্দর কথায় কামরা ভরে যেত৷ কোয়ালিটি ধূপ আনত৷ সব সময় মুখে হাসি৷ ওর কাছে কথা বলা শিখতে হয়৷ এখন তো আমরা প্রতিটি শব্দের ভাঁজে খিস্তি ঢুকিয়ে দিই৷

রাজেনের কথা বলছেন? নোয়াপাড়ার রাজেন৷ কলোনির ছেলে৷ ওখানেই কারখানা করেছিল৷ নিজে মশলা বানাত৷ কয়েকজন মহিলাকে শিখিয়ে নিয়েছিল৷ তাদের রোজগার হত৷ ওরও বাজারের জিনিস নিয়ে লড়াই করতে হত না৷ রাজেনকে খেল গাঁজায়৷ মুখে রক্ত তুলে মরে গেল৷ ডাক্তার-বদ্যি করেছিল বটে৷ কাজ হয় নাই৷ শেষদিকে লাইনে বেরতে পারত না৷ রাজেনের বউ কিছুদিন চালায়৷ একে ওকে মাল দেয় বিক্রির জন্য৷ শুনি, তারা ধারে মাল নিয়ে টাকা শোধ দেয় নাই৷ এরাই আসল শিল্পী৷

রাজেনের বয়স কত হবে? চল্লিশ-বিয়াল্লিশ৷

রেলের হকার বয়সের অনেক আগে যমের দুয়ার পেয়ে যায়৷ আর, রাজেন তো গাঁজায় গেল৷ খাওয়া-দাওয়া ভালো হলে তবু টিকে যেত৷ সারাদিন বকবক বকবক৷ ট্রেনের ভিতর চিল্লানি৷ নোয়াপাড়ার আরেকটা ছেলে আছে৷ অধীর৷ বাড়িতে সিঙাড়া বানিয়ে প্যাকেট করে আনত৷ প্যাকেট বানানোর মেশিন বসায় ঘরে৷ ভালো বিক্রি ছিল ওর আইটেমের৷ আইটি-র ছেলেরাই ব্যাগ ফাঁকা করে দিত৷ বেশিদিন হয় নাই বিয়ে করেছে৷ কেমন আছে কে জানে? একমাস দুইমাস ঘরের পয়সায় টানা যায়৷ কোথাও যখন কাম নাই, বাঁচে কীভাবে?

মেঘ ঘন হচ্ছে৷ দূরে-কোথাও-বৃষ্টি থেকে হাওয়া আসছে৷ একটা আলো ছুটে গেল প্ল্যাটফর্মের ছাউনির ওপর দিয়ে৷ ঝুপ করে নেমে এল অন্ধকার৷ কোনো তরুণকে যেন তাড়া করছে বিশাল রাষ্ট্রীয় বাহিনী৷ যাত্রীর ছাতা নেই সঙ্গে৷ ভিজলে সমস্যা হতে পারে৷ যদি জ্বরজারি হয়, কেউ ছোঁবে না৷ না ডাক্তার, না হাসপাতাল, না পাড়ার লোক, না বাড়ির লোক৷ সবাই আপদ ভাববে৷ যাত্রী এই ছবিটা মাঝে মাঝে দেখে, কালারফুল ব্র্যান্ডেড ফুলসাইজ পলিপ্যাকে নিজেকে মুড়ে চিতায় উঠে যাচ্ছে সে৷ আবার মনে পড়ল৷ দু-চার ফোঁটা বৃষ্টি গায়ে পড়ে৷ আজ সে ভেজাকে ভয় করবে না৷ আসুক বৃষ্টি৷ অনেক কিছুই হারিয়েছে৷ খানিকটা যদি ফিরে দেখা যায়৷ যে দিনগুলো হেলাফেলায় চলে গেছে, অল্প হলেও যদি ছোঁয়া যায়৷ শশিকান্তদের সম্পর্কে সে কিছুই জানে না, জেনেই বা কী হবে, তবু জানতে ইচ্ছে করে৷ বাড়িতে ফিরে সেই টিভি, সেই নিউজ চ্যানেল বা সিরিয়াল, রাশি রাশি জঞ্জাল, দেখতে দেখতে নিজেও জঞ্জাল হয়ে যাওয়া৷ সে কি ইমোশনাল হয়ে পড়ছে না? কী হবে ছুঁয়ে? কী হবে জেনে? সে কী করতে পারে? শশিকান্তকে সে কী দিতে পারে? হ্যাঁ, ইমোশনাল হয়ে পড়ছে৷ সে এখনও পুরোপুরি অমানুষ হয়ে যায়নি৷ সে অনুভব করতে পারে৷ কাঁদতে পারে৷

দাদাবাবু, কত রকমের কাজ করেছি দু মুঠো ভাতের জন্য৷ ট্রেনে প্রথম পাঁচ বছর পুরানা ম্যাগাজিন বেচতাম৷ ম্যাগাজিন খুব ভারি হয়৷ টানা কষ্টের৷ একশো দেড়শো মাইল টানতে হয়৷ তারপর পেন৷ পেনে লাভ নাই৷ ভালো পেন কেউ কেনে না৷ সস্তা খোঁজে৷ খেলনার লাইন ধরলাম৷ লোকে নিল৷ যে কথা শিখি ওই ম্যাগাজিনের সময়, সেইটা খেলনায় কাজে দিল৷ কিন্তু সব শিক্ষা অচল লকডাউনে৷ ঘুরে ঘুরে বেচার চেষ্টা করি৷ খেলনায় মন নাই৷ লোকে বলল, গাছ কাটো৷ কিছু দিয়ে দেব৷ বলল, মাটি কাটো৷ বলল, ভ্যান ঠ্যালো৷ বলল, বাগানটা সাফ করে দাও৷ ঘাস কেটে দাও৷ টব পালটে দাও৷ পঞ্চাশ টাকা দিয়ে দেব৷ যদি বলি, তিনশো টাকার কাজ পঞ্চাশ টাকায়? বাবু বলে, কত লোক ফ্যা ফ্যা ঘুরে বেড়াচ্ছে৷ পোষালে কর, নাহলে পাতলা হ৷ মানুষ চিনলাম৷ যারা এইরকম কথা বলে, তাদের মাইনা তো কমে নাই৷ মাসে মাসে ব্যাংকে ঢুকে যায়৷ ছোটোদের খেলনা বেচতাম৷ এখন আমি সরকারবাহাদুর আর ক্ষুধার হাতের খেলনা৷

শশিকান্ত যা বলছে, তাতে একবর্ণ অসত্য নেই৷ আরও ভয়ংকর সত্য আছে যা সে এখনও জানে না৷ হয়তো জানে, বলেনি৷ যাত্রী ভাবে৷

কম পয়সা পেয়েছি৷ কম খেয়েছি৷ একবেলা খেয়েছি৷ আধপেটা খেয়েছি৷ দানে ত্রাণে যাই নাই৷ ভিক্ষা নেই নাই৷ ভিক্ষা মানুষকে ধ্বংস করে৷ আমরা রিফিউজির সন্তান৷ দেশভাগের বাচ্চা৷ রিফিউজি ক্যাম্পে আমাদের বাপ-কাকারা শুনেছে, তারা মানুষ না৷ ভূতপূর্ব মানুষ৷ আগে মানুষ ছিল৷ এখন ভূত৷ বসে বসে ডোল-এর মাল খায় আর তাস খেলে আর পয়দা করে৷ মনুষ্যত্বের কত বড়ো অপমানের কথা এইগুলি, বলেন?

যাত্রী সামান্য কিছু জানে দেশভাগ আর উদ্বাস্তুদের জীবন সম্পর্কে৷ এখানে সেখানে পড়েছে৷

দাদাবাবু, আমার বড়দা নিশিকান্ত৷ ছাপাখানায় কাজ করত৷ আমাদের ভাইদের মধ্যে একমাত্র সে কলেজে গেছিল৷ শেষ করতে পারে নাই৷ বাবার অসুখ৷ কাকারা অন্য জায়গায় চলে গেল৷ দুবেলা নুন-ভাত জোটাও মুশকিল৷ এক বন্ধুর সঙ্গে গিয়া দাদা ছাপার কাজ শিখল৷ মাইনা কম৷ তবু মাস গেলে কিছু হাতে আসে৷ আমিও নামলাম হকারির লাইনে৷ মোটামুটি চলে যায়৷ বউদি এল৷ সে একটা স্কুলে ফাইফরমাস খাটে৷ দু হাজার পায় মাসে৷ লকডাউনে দাদার কাজ গেল৷ বউদির কাজ গেল৷ আমার দাদা নিশিকান্ত শিবতলার মাঠে মানতের বটে গলায় দড়ি দিল৷ মরে নাই৷ লোকজন ধরাধরি করে নামায়৷ ঘাড় ভেঙেছে৷ শিরদাঁড়া পুরা ভাঙে নাই৷

মাইকের ঘোষণা ভেসে আসে৷ মুক্তি সংঘ আজ ডিম-ভাত দিবে৷ বিনামূল্যে৷ একমাত্র মুক্তি সংঘ এই ত্রাণের আয়োজন করেছে৷ একমাত্র মুক্তি সংঘ৷ একশোজনকে ডিম-ভাত দেওয়া হইবে৷ লাইনে বিঘ্ন সৃষ্টি করিবেন না৷ যারা টোকেন পেয়েছ, তারা দাঁড়াও৷ বৃষ্টি হইতে পারে৷ দুর্গামণ্ডপের মাঠে তিরপল খাটানো হইয়াছে৷ সেখানে যাও৷ ডিম-ভাত, ডিম-ভাত ডিম-ভাত৷ বিনামূল্যে৷ লাইনে গোলমাল করিবে না৷ টোকেন বাইরে বিক্রয় করিবে না৷ মাইকে ঢাক বাজে৷

বাবুমশায়গণ, শশিকান্ত এখন রুমাল বেচে৷ জাদুরুমাল না যে বিড়াল লাফ দিবে বা কবুতন উড়ে যাবে৷ এ রুমাল আশ্রমের৷ ধর্মের না, মনের আশ্রম৷ এই রুমালের সুতা মায়ামমতায় তৈরি৷ এই রুমাল হাজার মানুষের বাঁচার ইচ্ছা দিয়া গাঁথা৷ এই রুমাল হাজার মানুষের জোট৷ যাঁরা কিনবেন, তাঁরা জোট আরও বড়ো করবেন৷ প্রত্যেক মানুষের বাঁচার ইচ্ছা থেকে হাজার হাজার রুমাল জন্ম নিতে পারে৷ বাঁচার ইচ্ছা সম্মান পেতে পারে৷ বাবুমশায়গণ, আমাদের কাজের জায়গাটাই আশ্রম৷ এই আশ্রমে দান নাই, ত্রাণ নাই৷ শ্রম আছে, স্বপ্ন আছে, মায়া আছে৷ ভিক্ষার অপমান নাই৷ একদিন এই শশিকান্ত এরোপ্লেন ফেরি করত৷ সে ছিল খেলনা৷ মজা৷ এখন সে রুমাল ফেরি করে৷ মানুষের শিরদাঁড়ার মতো শক্ত বুনটে গাঁথা রুমাল৷ নিবেন?

শশিকান্ত দু হাতে একটা রুমাল তুলে ধরে৷ রুমালের ঠিক ওপরে ঘন কালো আকাশে শিরদাঁড়ার মতো বিদ্যুৎরেখা মুহূর্তের জন্য স্থির দাঁড়ায়৷ মেঘের ডাক ভেসে আসে৷


২০ জুন ২০২১


   


লেখক পরিচিতি:
মধুময়পাল
কথাসাহিত্যিক। সম্পাদক।
১ শান্তিপল্লি লাইব্রেরি রোড ভদ্রেশ্বর হুগলি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন