বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

হামিরউদ্দিন মিদ্যা'র গল্প: ডাকপুরুষ




 আশ্বিন মাস শেষ হতে গেল।মাঠে মাঠে সবুজ ধান উত্তুরে বাতাসে হিল্লোল তুলছে।ধানগাছের পেটে থোড় আসতে দেখে কুসুমডাঙার ইমামসাহেবের মাথায় চিন্তার জট।গত বছর আশ্বিন শেষেই এই গাঁয়ের মুসলমানদের কাণ্ডকারখানা দেখে মাথায় আগুন চেপে গিয়েছিল তাঁর।তখন সবে নতুন এসেছিলেন এখানের মসজিদে।গাঁয়ের সব মানুষদের সঙ্গে সেইভাবে আলাপ-পরিচয়ও হয়নি।তাই শেরেকি গোনাহ্ করতে দেখেও ফনা তুলে ফোঁস করে উঠতে পারেননি।মিনমিন করে বলেছিলেন,মুসলমান হয়ে এসব তুমরা কিসের আয়োজন করতিছো?এগুলো তো আমাদের পরব নয়! 
 
এক চাষি জবাব দিয়েছিল,বাপ দাদোর আমল থেকিই করে আসচি ইমামসাহেব।এতদিনের বিশ্বাসকে ভাঙি কেমন করে! ইমামসাহেব আর কোনও কথা বাড়াতে চাননি।এত তাড়াতাড়ি ইসলামের তরিকা,বিধান মানুষদের ওপর চাপাতে গেলে হিতে বিপরীত হতে পারে।ধীরে ধীরে এখানে থিতু হয়ে গেলে,গাঁয়ের মানুষদের মন জয় করে নিতে পারলে,তখন না হয় একে-একে সব বিধর্মী কাজকর্ম দূর করে দেবেন এখান থেকে—এমনটাই ভেবেছিলেন।কিন্তু এ-বছরেও যে দেখছেন,সে গুড়ে বালি!মুসলমান চাষিরাও প্রস্তুতি নিচ্ছে মনে মনে।চোখের সামনে এসব শেরেকি গোনাহর কাজ করতে কী করে সম্মতি দেবেন!তিনি যেহেতু এ গাঁয়ের ইমাম,মৃত্যুর পর হাসরের ময়দানে আল্লাতালা তাঁর কাছেই তো জবাবদিহি চাইবেন—কেন তুমি ওদের নিষেধ করোনি?তুমি একজন ইমানদার মানুষ।ওই না-বুঝ মানুষগুলোকে শেরেকি গোনাহর হাত থেকে বাঁচানো তোমারই কর্তব্য।এখন ওদের গোনাহর ভাগিদার তুমিও!ইমাম দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেন,যে করেই হোক এবার এই শেরেকি কাজ বন্ধ করবেনই।

যারা রোজদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে পারে না,নানা কাজে-কামে ব্যস্ত থাকে,তারা শুক্রবারে জুম্বার নামাজটা কিন্তু পড়তে কামাই করে না।তাই অন্যান্য দিনের থেকে শুক্রবারে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা একটু বেশিই হয়।বেশি মানুষ না জমলে বিধান না দেওয়াই ভালো।প্রত্যেকের কানে কথাটা পৌঁছনো দরকার।বিশেষ করে এখনকার চ্যাংড়া ছেলেপুলেরাও শুনুক।বুড়োরা সেকেলে স্বভাবের।মরণের দিন পর্যন্ত যাবতীয় ময়লা,অন্ধকারকে সঙ্গে করে হাঁটতেই পছন্দ করে।তাই আজই কথাটা তোলা দরকার।

নামাজ শেষ হলে,ইমামসাহেবের সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দরবারে দু'-হাত তুলে দোয়া করে সবাই।দোয়া শেষে এবার মুসুল্লিরা উঠে পড়বে,এমন সময় উঠে দাঁড়ালেন ইমামসাহেব।

—আরে বসুন,বসুন।এখন কেউ যাবেন না।একখান কথা ছিল।

মুসুল্লিরা একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে।কী এমন কথা বলবেন ইমামসাহেব!নিশ্চয়ই কিছু অনাচার দেখেছেন!

—শোনেন ভাইসকল—ইমাম শুরু করেন—এই গাঁয়ে আপনারা আগে মহরম মাসের আশুরাতে তাজিয়া বানিয়ে,মাটি দিয়ে ঘোড়ার মূর্তি বানিয়ে নাচগান আনন্দ-ফুর্তি করতেন।খুশির দিন মনে করে পিঠে-পায়েস খেতেন।পরে যখন জানলেন যে,মহরম মাস হল দুঃখের মাস,হাসান হোসেনের শহিদ হওয়ার মাস,আশুরা শোক পালনের দিন,তখন ভুলটা বুঝতে পারলেন।গাঁ থেকে ওইসব শেরেকি কাজ দূর করলেন।ঠিক না বেঠিক?

মুসুল্লিদের মধ্যে হালকা নড়াচড়া,কথা চালাচালি শুরু হল।ঢেউ উঠল ভিড়ে।কেউ কেউ বলল,হ্যাঁ,ঠিকই তো।আগে আমরা কত আনন্দ-ফুর্তি করেছি!কারবালার যুদ্ধকে নকল করেছি।লাঠি খেলেছি।

—শোনেন সবাই।আমার কথা এখনও শেষ হয়নি।

গুঞ্জন থেমে গেল।উৎসুক হয়ে ইমামসাহেবের মুখের দিকে চেয়ে কান খাঁড়া করে রইল মুসুল্লিরা।

—এ গাঁয়ে আরও একটি শেরেকি কাজ আমার চোখে পড়েছে।সেটা কী বলেন তো?

সবাই মহা বিপদে পড়ে গেল।ভাবনায় পড়ে গেল।কী এমন কাজ করছে তারা যার জন্য এতদিন ধরে পাপের বোঝা বহন করে চলছে?মুসুল্লিরা কেউ বলতে পারল না।ফ্যালফ্যাল করে ইমামসাহেবের মুখের দিকে চেয়ে রইল।

ইমাম এবার বললেন,গত বছর দেখেছি ডাক সংক্রান্তির সময় এ গাঁয়ের মানুষ ধান ডাকে।জমিতে নল পুঁতে দিয়ে আসে।'নল পোঁতা' তো মুসলমানদের উৎসব নয়!ওগুলো শেরেকি কাজ।

গ্রামের মধ্যে অধিকাংশ মানুষই চাষি।চাষবাস যাদের নেই তাদেরও নল পোঁতার ব্যপারটা অজানা নয়।সেখ পাড়ার ছয়দুল্লা হঠাৎ বলে উঠল,এ কি শুনলাম ইমাম সাহেব!নল পোঁতা শেরেকি কাজ?

—হ্যাঁ,এতদিন ধরে আপনারা ওই শেরেকি কাজটাই করে আসছেন।ডাক সংক্রান্তি হল লক্ষী ঠাকুরকে আরাধনা করার দিন।হিন্দুরা ওই উৎসব পালন করেন।পুজো দেন।এই গাঁয়ে একসঙ্গে থাকতে থাকতে আপনারাও দেখছি ওনাদের মতো নল পোঁতা পালন করছেন!

ইমামসাহেব খানিক থামলেন।তারপর ঢোক গিলে ফের বলতে লাগলেন,আরে,খাদ্য ও পানির ফেরেশতা হল মিকাইল।মিকাইল ঠিক করেন কার জমিতে খেত ভরা ফসল দেবেন,আর কার জমিতে পোকা পাঠিয়ে শেষ করবেন।হিজিবিজির ছড়া কেটে,জমির কোণে কোণে নল পুঁতে দিলেই,ওই নল জমিতে ফলন দেয় না।গাছের রোগজ্বালা দূর করতি পারে না।

মসজিদের মধ্যেই আলোড়ন উঠল।নিজেদের মধ্যে কথাবার্তার মাত্রা আরও বেড়ে গেল।

অবস্থা দেখে ইমামসাহেব বললেন,এটা হল আল্লার কাছে ইবাদত করার স্থান।মসজিদ শান্তির জায়গা।আপনারা বাইরে গিয়ে আলোচনা করুন।কথাটা ভেবে দেখবেন।বাপ-দাদোরা যে ভুল করে গেছে,সেটাকেই অন্ধের মতো অনুসরণ করতে হবে,এমন কোনো কথা নেই।আল্লাহতালা জগতকে দেখার জন্যে দুটো চোখ দিয়ে পাঠিয়েছেন।ভাবার জন্য মাথা দিয়েছেন।ভুলকে সংশোধন করতে হয়।যুক্তি দিয়ে খন্ডন করতে হয়।

মসজিদের বাইরে মুসুল্লিরা বেরিয়ে এলে নানান তর্কাতর্কি,আলোচনা চলতে থাকে।

হায়দার আলি বলল,এর মধ্যে ইমামসাহেব খারাপের কী দেখলেন বলো তো?আমরা তো বামুন এনে পূজো দিই না!নিজেদের বিশ্বাস থেকি নল পুঁতে আসি মাঠে।ধান ডাকার ছড়া কাটি।তাতে ধান হল হল,না হল না হল।

সাদেক শেখ বলল,তুমি কী বলতি চাও হায়দার আলি?ইমামসাহেব কি গাঁজা খেয়ি কথা বললেন?

—আমি সে কথা একবারও বলিনি।উনি নামাজ পড়াচ্ছেন পড়ান।সব ব্যাপারে নাক গলাতে যান কেনে!

পাশ থেকে আরও কয়েকজন সাদেক শেখের হয়ে কথা বলে,তুমি কি সাচ্চা মুসলমান বটো হায়দার আলি?বলতি পারলে এমন কথাটা?ইমামকে মসজিদে রেখিচি,শুধু কি নামাজ পড়ানোর জন্যি?নামাজ তো মাদ্রাসায় পড়া একজন আলেমও পড়াতে পারেন।হাদিস-কোরানের সহি শিক্ষা,ইসলামি তরিকা শিখানোর জন্যি ইমাম রাখা হয়েচে।আমাদের ভালো মুন্দ দেখার জন্যি রাখা হয়েচে।কুন পথে চললে গোনাহ্ হবে,কুন পথে চললে জাহান্নামের আগুন থেকি বেঁচে জাহান্নাতে যেতি পারব আমরা—সেই পথনির্দেশক হলেন ইমাম।

হায়দার আলি এতগুলো মানুষের মুখের ওপর কী জবাব দেবে, কোনও কথা খুঁজে পেল না।মুখ গোমরা করে ভিড় থেকে বেরিয়ে হন হন করে হেঁটে বাড়ি চলে গেল সে।

।।দুই।।

আশ্বিন মাসের শেষদিকে ধানগাছ পোয়াতি হয়।গাছ গর্ভে ধারণ করে কচি শিষ।ধানের এই গর্ভাবস্থাকে বলে 'থোড়'।মাসের শেষদিন ডাক সংক্রান্তি।ছেলে হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার আশায় পোয়াতি মেয়েকে যেমন সাধ ভক্ষণ করানো হয়,রাঢ়ের চাষিরাও এইদিন ভাল ফলনের আশায় শস্যদেবীর উদ্দেশ্যে পোয়াতি ধান গাছকে সাধ দেয়।

হায়দার আলির জমি মোটে সাত বিঘা।বাপ গিয়াসউদ্দিন অনেকটা জমি জায়গাই ছেলেদের জন্য রেখে গিয়েছিল।ভাগ হয়ে যাওয়ার পর সাত বিঘা পেয়েছে সে।অন্য ভাইয়েরা শুধু চাষবাসের উপরেই নির্ভর করে না,তাদের অন্য কাজ-ধান্দাও আছে।ছেলেপুলেরা বাইরে খাটতে যায়।শুকনো টাকা আসে মাস গেলে।হায়দার আলির অন্য ইনকামের সোর্স নেই।শুধু চাষবাসের ওপরে নির্ভর করেই ঘর-সংসার চালাতে হয়।ছেলে নেই।দুটি মেয়ে।বড়টার বিয়ে দিয়েছে বছর দুয়েক আগে।আর একটা বিয়ের উপযোগী হয়ে উঠল বলে।রজিনা মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে এখন ক্লাস এগারো।মাথায় বোঝা আছে হায়দার আলির।চাষটা তাকে যত্ন করেই করতে হয়।কোনওরকম হেলাফেলা যেন না হয়ে যায়,সেদিকে খেয়াল রাখতেই হয়।

মাসের সাতাশ,আর ক'টা দিন পরেই ডাক সংক্রান্তি।এখনও পর্যন্ত পাড়া বাখুলে কাউকে নল পোঁতার সরঞ্জাম জোগাড় করতে দেখতে পায়নি হায়দার আলি।দু'-একজনকে জিজ্ঞেসও করেছে,কী গো?তুমরা এবার নল পুঁতবেনি জমিতে?ধান ডাকতে যাবেনি?

সবার জবাব,আমাদের মুসলমানদের সব চাষি একদিকে।ইমামসাহেব যখন নিষেধ করেছেন,শেরেকি কাজটা করি কী করে বলো দিনি?

—ইমামসাহেব বললেন বলে তুমরা নল পোঁতা বন্ধ করে দিবে?এতদিন ধরে করে আসছ,তখন গোনাহ্ হয়নি?

—না জেনে তো মানুষ অনেক ভুলই করে হায়দারভাই।আজ যখন জানতে পেরিচি,জেনে-বুঝে করাটা কি ঠিক হবে?

দিন যত ঘনিয়ে আসে,হায়দার আলির মনের ভিতর ততই দ্বন্দ্ব বাড়তে থাকে। ইমামসাহেবের কথাই যদি ঠিক হয়!তাহলে জেনে-বুঝে পাপ কাজটা কি করবে সে?যে-সে গোনাহ্ নয়,শেরেকি গোনাহ্!যে-গোনাহ্ আল্লাতালা কোনও দিনই ক্ষমা করেন না।তাই গোটা গাঁয়ের সব মুসলমান চাষি নল পুঁতছে না এবার।আবার পরক্ষণেই এটাও মনে হয় হায়দার আলির,নল না ডাকলে যদি শস্যের দেবী অসন্তুষ্ট হন!অভিশাপ নেমে আসে তার জমির উপর!ফলন না হলে তখন খাবেই বা কী আর রাখবেই বা কী!বলা তো যায় না,হয়তো রাতারাতি পালে পালে পোকা এসে জমিতে বসে ধানের পোঁং কেটে শেষ করে দিল!কিংবা এমন তুষার পাত হল যে পাকা শিষ ঝরিয়ে সর্বস্বান্ত করে দিল!হতেই পারে।না হওয়ার কিছুই নেই।এই চিন্তাভাবনাগুলোই মাথার ভেতরে জট পাকাতে থাকে হায়দার আলির।এদিকে রজিনার মা ছাড়া কারও কাছে প্রকাশও করতে পারে না সে।

ফজরের আজান দিয়ে দিলেও ভোরের বেলা হায়দার আলিকে বিছানায় এপাশ-ওপাশ করতে দেখে রজিনার মা বলল,কী গো,তুমার হয়েচেটা কী!ক'দ্দিন ধরেই দেখতিচি তুমি ঘুমাও না ভাল করে।কীসব অবং-জবং চিন্তাভাবনা করো বলো তো?

হায়দার আলি বউয়ের দিকে ঘুরল।পঞ্চাশোর্ধ্ব মানুষটা এখনও যখন কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে না-পারলে,রজিনার মায়ের দ্বারস্থ হয়।রজিনার মা বয়সে বছর দশেকের ছোট হলেও জ্ঞানে বলো,যুক্তিতে বলো যথেষ্ট।যার কাছে হায়দার আলি কচি শিশু!

—বউ তুই বল দিনি,এবার কি ধান ডাকবনি?

রজিনার মা বলল,সেটা তুমি বুঝো গা।আমি কী বলব!

—'আমি কী বলব' বললে হবেক!

—দ্যাখো 'সমাজ' বলে একটা জিনিস আছে।সমাজের বাইরে বাঁচতি গেলেই তুমার অনেক শত্রু হয়ে যাবেক।বিপদে-আপদে কাওরে ডাকলে-হাঁকলেও পাবেনি।তবে এটাও ঠিক কতদিনের একটা বিশ্বাস!সেটা হঠাৎ ভেঙে দিবে!রজিনার দাদো নলের কাঠি বাঁধতে বাঁধতে সেই যে কিসসাটা শুনিয়েছেল,তুমার মনে আছে?

—নলডাকা নিয়ে কিসসা তো অনেক আছে,তুই কুনটার কথা বলতেচিস বউ?

—ওই যে গো...সেই কুন কাল আগে এক বলবান মহাপুরুষ জম্মেছিল,সে আশ্বিন মাসের সংক্রান্তির আগের রাতে,মানে আজকের দিনে লাঠি আর জ্বলন্ত মশাল হাতে বীরের মতো শব্দ করতে করতে বিধাতা পুরুষের কাছে গিয়েছিল চাষিদের দুঃখ-দূর্দাশার কথা খুলে বলতে।তারপর বিধাতার কাছ থেকে দুঃখ-দূর্দশা দূর করার উপায় জেনে আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে মর্ত্যে নেমে আসল।

—হ্যাঁ,এবার মুনে পড়েছে গল্পটা।মর্ত থেকে স্বর্গে খবর চালান করত,উ তো ডাকপুরুষ।তারপর বিধাতার কাছ থেকে উপদেশ নিয়ে এসে ডাকপুরুষ চাষিদের বলল,তুরা মাটিকে পেন্নাম কর,শস্যদেবীকে সন্তুষ্ট রাখ,চাষবাসকে কুনুদিন অবহেলা করিস না।যেদিন মাটি তুদের ওপর রেগে যাবেক,চাষ বন্ধ হবেক,সেদিন তুরা সবাই ধূলিসাৎ হয়ে যাবি।

—তাইলে শস্যের দেবীকে অসন্তুষ্ট করবে কেনে!লোককে দেখিয়ে করার দরকার নাই।চুপি চুপি ভোরের বেলা মাঠে গিয়ে নল পুঁতে দিয়ে এলেই হল।

হায়দার আলিও এখন সে কথায় ভাবছে।যেভাবেই হোক ধান ডাকতেই হবে।নল পুঁতে দিয়ে আসতেই হবে জমিতে।

সকালে উঠেই নলকাঠি বানানোর উপাদানগুলো জোগাড় করতে লেগে গেল হায়দার আলি।রজিনার মাকে বলল,তুই খুদচালটা ভিজিয়ে রাখ বউ।আমি আসছি।

লোকচক্ষুর আড়ালে জড়ুলীর পুকুরপাড় থেকে কলা পাতা তুলে আনল হায়দার আলি।কলতলার ডোবার পাশ থেকে একটা মানকচু খুঁড়ল।আউশবাড়ির মাঠে গিয়ে আনল কাঁচা হলুদ,ওল,কাঁকুড়।রায়পাড়ার সুবলের বাড়ি থেকে আনল কাঁচা তেঁতুল,সামান্য পাটের শন।এবার শুধু কলা,দুধ,আর নলগাছ জোগাড় করলেই হয়ে যাবে।

নলগাছ কুসুমডাঙায় তেমন চোখে পড়ে না।গ্রাম ছাড়িয়ে সেই ডহরের মাঠে যেতে হয়।অনেকে পাটকাঠি,কাঁচা বাঁশের কঞ্চি,সরগাছ দিয়েও নলকাঠি বানায়।হায়দার আলি ঘাস কাটার আছিলায় ডহরের মাঠে হাজির হল।নালার ধার থেকে চার-পাঁচটা নল গাছ কেটে বস্তার ভেতরে ভরে নিল।দুধের জন্য চিন্তা নেই,ঘরেই গাইগরু আছে।শুধু কলাটা তেমাথার মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনতে হবে।

বিকেলের আগেই সাধ দেওয়ার সব উপাদান জোগাড় হয়ে গেল।রজিনার মা শিলনোড়া দিয়ে ওল,কচু,কাঁকুড়,তেঁতুল,কলা,হলুদ সব একসঙ্গে বেঁটে একটা থালায় রাখল।তারপর সেই মন্ডটায় সামান্য কাচা দুধ ঢেলে মাখিয়ে নিল।হায়দার আলি বসে আছে রজিনার মায়ের পাশে।তার মোট পাঁচটা জমি।দুটো দু'বিঘা করে।বাকি একবিঘা করে তিনটে।পাঁচটা নলকাঠি বানাতে হবে।সাধ দেওয়ার জন্যও চাই পাঁচটা মোড়ক।কলাপাতার মোড়ক বানিয়ে তাতে সেই মন্ড সমান ভাবে ভরে নলকাঠির অগ্রভাগে শন দিয়ে পাকিয়ে পাকিয়ে ভালো করে বেঁধে নিল হায়দার আলি।শন হল এখানে নতুন পোশাকের প্রতীক।

কাল ডাক সংক্রান্তির দিন ভোর থেকে সূর্য ডোবার আগে পর্যন্ত মাঠে মাঠে চলবে ধান ডাকা।মাঠের ফসলকে আহ্বান করবে চাষিরা।প্র‍্যতেক জমির চারধারের আল ধরে হেঁটে হেঁটে ধান ডাকার ছড়া বলতে হবে।তারপর জমির ঈশান কোণে সেই সাধ দেওয়া নলকাঠি পুঁতে দিতে হবে।এই নিয়মই বাপ-দাদোর আমল থেকে পালন করে আসছে হায়দার আলি।তবে দেখেছে রায়পাড়া,পালপাড়া,বাড়ুজ্যেপাড়ার চাষিদের নল পোঁতার কিছু নিয়মকানুনের হেরফের আছে।ওরা বামুন এনে পুকুরপাড়ের বেল,নিম এই জাতীয় কোনও একটি গাছের নিচে কাঁচা মাটির মূর্তি করে সাঁধ দেখিয়ে পূজো দেয়।খড়গাদা,পোয়ালগাদা, তুলশীতলাতেও নলকাঠি পোঁতে।তারপর মাঠে যায় ধান ডাকতে।ধান ডেকে গৃহপ্রবেশ না করা পর্যন্ত কারও সঙ্গে একটা কথাও বলতে পাবে না চাষি।কথা বলে দিলেই আবার আগের থেকে সব নিয়মকানুন পালন করতে হয়।ধান ডাকার পর নল পুঁতে দিয়ে মাঠ থেকে ঘটি ভরে জল আনবে ওরা।সেই জল ঘরের চালে আর মড়াইয়ে ছিটবে।তারপর মাঠ-ফেরত গৃহকর্তাকে চাষি-বউ উলু দিয়ে,শাঁখ বাজিয়ে,গঙ্গাজল তড়তড়া দিয়ে বরণ করে নেবে।বরণ করার সময় গৃহিণী গৃহকর্তাকে তিনবার জিজ্ঞেস করবে,মা লক্ষী কানে কানে কী বলল?

গৃহকর্তা বলবে,খামার পরিস্কার করে রাখতে।ধান রাখার জন্য মড়াই বাঁধার দড়ি পাকাতে।গরুর গাড়ির চাকায় তেল দিতে।

নল পোঁতার পর থেকেই মাঠের ফসলকে ঘরে তোলার জন্য তোড়জোড় শুরু করে দেয় রাঢ় বঙ্গের চাষিরা।

।।তিন।।

ভোরের বেলা ঘুম থেকে উঠে পুকুরে ডুব দিয়ে এল হায়দার আলি।আলগুনিতে তুলে রাখা একটা শুদ্ধ পোশাক পড়ল সে।তারপর নলকাঠিগুলো বগলদাবা করে,হাতে মাঠ দেখতে যাওয়ার লাঠিটা নিয়ে উঠোনে নামল।

রজিনার মা দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।বলল,টর্চটা নিয়ে যাবেনি গো?আঁধারে কীসের মাথায় পা দিবে তার ঠিক নাই।

হায়দার আলি বলল,কই দিবি তো দে।

ঘর থেকে টর্চ এনে রজিনার মা হায়দার আলির হাতে দিল।আবার পিছন ডাকল,এই শোনো...

হায়দার আলি ঘুরে বলল,কী?

—তুমাকে কেউ দেখে ফেললেও তর্কাতর্কি করো না।চুপ মেরে সোজা চলে যাবে।

নামোপাড়া ছাড়িয়ে শেখপাড়া।মাঝখানে কতকগুলো ধানি জমি।আলপথ ধরে অন্ধকারকে পেছনে ফেলে হন হন করে হাঁটে হায়দার আলি।বোরো ধান হয় না জমিগুলোয়।আমনের সময় দাড়া ধরে ছোট ক্যানেল থেকে জল এসে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।মাঠগুলো ছাড়িয়ে শেখপাড়া।ছাত্তার শেখের বাড়ির পাশে একটা ইলেক্ট্রিক পোল।পোল থেকে তার টাঙিয়ে একটা বালব লাগানো হয়েছে।বালবের হলুদ আলো টিনের চালে পড়ে ছড়িয়ে পড়ছে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে।বাড়ির চারিধার রাঙচিতার বেড়া।পেঙি কুকুরটা হায়দার আলির পায়ের শব্দে ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে বারকতক।তারপর কী বুঝে চুপ করে যায়।

এই সময় কেউ দেখে ফেললে লোক-জানাজানি হয়ে যাবে।তখন মুসুল্লিরা শলা-পরামর্শ করবে তার বিরুদ্ধে।মানুষ ছি ছি করবে।পাঁচজনা পাঁচটা কু-কথা শুনিয়ে দেবে।ডাক দিয়ে বিচার করে তাকে একঘরে করে দিতেও পারে।মানুষের একতা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব।কথায় বলে না,একা না বোকা!

পাড়ার ভিতর ভয়ে ভয়ে হাঁটে হায়দার আলি।শেখপাড়ার শেষ মাথায় একটা বড় দিঘি।দিঘি পেরলেই মাঠ।ভোরের বেলা পুকুরঘাট যেতে কোনও বাড়ির বউ ঝি-ও উঠে পড়তে পারে।

না,কারও নজরে পড়ল না হায়দার আলি।পুকুরপাড়ের পথ ধরে,বাঁশবন টপকে মাঠে নামল সে।প্রথমে যেতে হবে শামুকভাঙার মাঠ।সেখানে চারবিঘা জমির ধান ডাকা হলেই,লৈট্যাগোড়ের মাঠ।সব জমিগুলো একই মাঠে নয়।

পুবের আকাশে এখনও আলো ফোটেনি।আলো ফোটার আগেই ভালয় ভালয় সবকিছু চুকে গেলেই ভাল।ঝুঁঝকি হতেই পালপাড়া,রায়পাড়া,গরাইপাড়া থেকে একে একে ধান ডাকতে মাঠে নামবে চাষিরা।আবার শেখপাড়া,মোল্লাপাড়ার কোনও চাষিও জমি দেখতে বেরতে পারে।গাছে পোকা লাগল কি না,আলের ঘাঁই কেটে কেউ জমির জল বের করে নিল কি না—এইসব রোজই খেয়াল রাখতে হয় চাষিদের।হায়দার আলি কারও চোখে পড়ে গেলে,অনেক প্রশ্নই ছুটে আসতে পারে।

বাপের কথা মনে পড়ল হায়দার আলির।মানুষটা যতদিন বেঁচে ছিল,শিরদাঁড়া সোজা করে বেঁচেছে।ন্যায্য কথা মুখের ওপর স্পষ্ট করে বলতেও কোনো দ্বিধা করত না।যতদিন ছিল,সৎভাবে জীবন-যাপন করেছে।ছোটবেলায় বাপের সঙ্গে মাঠে আসত হায়দার আলী।অন্যান্য ভাইয়েরা চাষবাসের থেকে একটু দূরে দূরেই থাকত।লেখাপড়া করেছে ওরা।হায়দার আলির স্কুলে যেতে ভাল লাগত না।মাঠ তাকে টানত।মাটির গন্ধ তার শিরায় শিরায় শিহরণ জাগাত।বাপ বোধহয় সেই কথা বুঝতে পেরেছিল।হায়দার আলিকেই শিখিয়ে গিয়েছে চাষবাসের খুঁটিনাটি। হালহকিকত।

হায়দার আলির মনে পড়ে,ধান ডাকার সময়েও বাপের পিছু পিছু মাঠে চলে আসত সে।নিয়মকানুনগুলো,মন্ত্রগুলো শিখে নেওয়ার জন্য।একবার পাশের জমিতে ধান ডাকছিল এক চাষি, লোকের জমি আলথাল,আমার ধানে শুধুই চাল।ধান ফুল...ফুল...।হায়দার আলি কান খাঁড়া করে শুনছিল মন্ত্রটা।এই মন্ত্র তার বাপের মুখে কোনওদিন শোনেনি সে।ধান ডাকার কত মন্ত্র!সব শিখে নিতে হবে তাকে।বুঝে নিতে হবে।

গিয়াসউদ্দিন ছেলেকে অন্যদিকে কান দিতে দেখে ধমকে উঠেছিল,ওই মন্ত্রটা কুনুদিন উচ্চারণ করিস না খোকা।

—কেনে আব্বা?

—সবার জমি আলথাল কামনা করে,শুধু স্বার্থপরের মতো নিজের জমিতে ভাল ফসলের আশা করতে নেই রে।চাষিরা সবার কথা ভাবে,তুইও সবার মঙ্গল চাইবি।লোকের ভাল চাইলে,তবেই দেখবি নিজের ভাল হবেক।খেত ভরা ফসল ফলবেক।

—তাইলে কি মন্ত্র পড়ব আব্বা?

গিয়াসউদ্দিন মোল্লা ধানডাকার অন্য মন্ত্র শিখিয়ে দিয়েছিল ছেলেকে।শামুকভাঙার মাঠে এসে নিজের জমির আল ধরে হাঁটতে হাঁটতে হায়দার আলি এখন সেই মন্ত্রটাই আওড়ায়ঃ

অন্ সরষে কাঁকুড় নাড়ি

যা রে পোকা ধানকে ছাড়ি

সবার ফসল উঠুক গাড়ি গাড়ি

এতে আছে খুদ চাল

আর আছে ওল

ধান ফোল ফোল...

দুটো জমির ধানডাকা হলে নলকাঠিগুলো ঈশান কোনে পুঁতে দিল হায়দার আলি।পরক্ষণেই মনে হল,নলকাঠিটা যদি পাশের জমির চাষির চোখে পড়ে যায়?তাহলে তো বুঝতে পেরে যাবে!হায়দার আলি আবার গেল জমির ঈশান কোণে।কাঠিটাকে আরও গভীরে পুঁতে,কয়েকটা ধানগাছ হেলিয়ে ঢাকা দিয়ে দিল।এবার যেতে হবে লৈট্যাগোড়ের মাঠ।

শিশির পড়ছে পিটপিট করে,সেই সঙ্গে হালকা কুয়াশার আস্তরণ।পায়ের শব্দে আলে বসে থাকা নিশাচর বাঁচকা বক আচমকা ঝটপট উড়ে যায় বুকের রক্তকে হিম করে দিয়ে।লুঙিটা সেঁটে নিলেও শিশিরের হাত থেকে রেহাই পায় না হায়দার আলি।দু'পাশের ধানগাছের গায়ে লেগে থাকা শিশির তার পা,লুঙি সব ভিজিয়ে দেয়।কেমন একটা নরম আবেশে ভরে ওঠে মন।

লৈট্যাগোড়ের মাঠে এসে তিনটে জমিরই ধান ডেকে,নল পুঁতল হায়দার আলি।

এবার ফেরার পালা।আলধরে হাঁটতে হাঁটতে হায়দার আলির হঠাৎ মনে হল সামনের জমিতে কে যেন দাঁড়িয়েছিল।কুয়াশা আর অন্ধকারে একটা কালো মূর্তির মতো মনে হল।যেন তাকে দেখেই হুট করে সরে পড়ল!মুখটা স্পষ্ট করে দেখাও যায়নি।নাকি চোখের ভুল!হায়দার আলির বুক কেঁপে ওঠে।রাত-বিরেতে কী দেখতে কী দেখেছে!কাকতাড়ুয়াও তো কেউ দেয়নি,বীজতলায় দেয় অনেকে।টর্চটা জ্বেলে পা টিপে টিপে সেই জমিটার কাছে এগিয়ে গেল।

জমিটা চিনতে পারল হায়দার আলি।এটা তো শেখপাড়ার ছয়দুলের জমি!এক পলকে দেখা জিনিসটি আসলে যাই হোক,নিশ্চয়ই ধান-জমিতেই গা ঢাকা দিয়েছে।না হলে যাবে কোথায়!টর্চটা জ্বেলে জমির চারিধার পর্যবেক্ষণ করল হায়দার আলি।ওই তো!গুটিসুটি মেরে বসে আছে।কালো মাথাটা দেখা যাচ্ছে।ধানগাছ এখনো সেই লম্বা হয়নি,যে গা-ঢাকা দেওয়া যাবে।

ডাক পাড়ল হায়দার আলি,কে?কে ওখানে?

নড়েচড়ে উঠল মূর্তিটা।

—যে বটিস সুর সুর করে বেরিয়ে আয় বলছি!

ধানজমির মাঝখানে উঠে দাঁড়াল একটা মানুষ।টর্চের আলোয় দাঁত ফেড়ে হাসল।হেসে বলল,ওহো,হায়দার আলি ভাই!আমি ভাবলাম কে না কে!

—আরে ছয়দুল!তুই এখানে কী করচিস?

জলাজমির মধ্যে দিয়েই হপর হপর শব্দ তুলে হায়দার আলির কাছে এগিয়ে এল ছয়দুল।বলল,তার আগে বলো,তুমি এখানে কী করছ?এই ভোরের বেলা!একা,একা?

—তুই যে কাজে এইচিস,আমিও সেই কাজে।হায়দার আলি হাসল।আরে ভাই এতদিনের বিশ্বাসকে,চাষবাসের মূলমন্ত্রটাকে পালটে দিলে হবেক!মন মানলনি আমার।তাই চুপি চুপি এসে ধান ডেকে দিয়ে গেলাম।

—তুমাকে দূর থেকে দেখে খুব ভয় পেয়ে গেছলাম হায়দারভাই!এত অন্ধকারে মাঠে এখন কে!যদি দেখে ফেলে!তাই বসে পড়লাম জমিতে।ভাবলাম যে বটে বটে,পেরিয়ে যাক,তারপর আমি উঠে পড়ব।

—সব জমির ধান ডাকা হয়ে গেল তুর?

—না,এবার যাব ঘুটগোড়ের মাঠে।সেই সাতকাঠা জমিটাই একটা নল পুঁতে দিয়ে আসতে হবেক।

আলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে ওরা।ছয়দুল প্যাকেট থেকে বিড়ির বান্ডিল বের করে একটা ধরাল।হায়দার আলিও নিল একটা।তার স্থায়ী নেশা নেই।তবে মাঠেঘাটে এলে,কারও কাছে পেয়ে গেলে,মাঝেমধ্যে খেয়ে নেয়।

ছয়দুল বলল,আমি ভাবছিলাম হায়দারভাইয়ের মতো একটা মানুষ হঠাৎ কী করে এতটা বদলে গেল!তুমাকে তো ছোট থেকেই দেখি আসছি,মন যেটা বলে তুমার,সেটাই করো।গিয়াসচাচাকেও একই দেখিচি।

—সুময়টা এখন খুবই খারাপ রে ছয়দুল!দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল হায়দার আলি।তারপর বলল,তুই আমি একলা কিছুই পালটাতে পারবনি।গাঁ থেকে একে একে কত পরব উঠে গেল বলত!কত আমোদ-ফূর্তি করে পেরিয়ে গেছে দিনগুলো।আর এখন?

—ঠিকই বলেচ তুমি।এখন আর আমাদের কুনু আনন্দ করার দিন নাই।দিলদিলি করি না,লাউভাসান করি না...শুধু ধর্ম আর ধর্ম করেই মলেক সব।

—ধর্ম করুক ছয়দুল,তাতে আপত্তি নাই।তবে সব ভাগ করে দিলে হবেক!নল পোঁতা হিন্দুদের পরব,এটা কুনুদিন ভেবেছিলিস?

—সারা গাঁয়ে আজ হিন্দু-মুসলমান সবার ঘরে ঘরে পিঠে,ক্ষীর,পায়েস হত।আমি তুমার বাড়ি খেয়ে আসতাম,তুমি আমার বাড়ি।সব চলি গেল একে একে!

শেষ টানটা দিয়ে বিড়িটা পায়ের তলায় পিষে দিল হায়দার আলি।বলল,নল পোঁতা কুনু হিন্দুর পরব লয়,কুনু মুসলমানের পরব লয়।নলপোঁতা হল চাষিদের পরব।চাষিদের কুনু জাত হয় না রে ছয়দুল।চাষিরা হল অন্নদাতা।সবার কথা ভাবে।খোদা উপর থেকে সব দেখছে।তুই দেখবি কুনু পাপ হবেকনি আমাদের।

দু'জনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ।তারপর ছয়দুল বলল,হায়দারভাই,তুমি এবার যাও।আমিও নলটা পুঁতে দিয়ে আসি জমিতে।আর দেরি করা ঠিক হবেকনি।পুবের আকাশ ফরসা হয়ে আসছে।এবার অনেকেই মাঠে নামবেক।

হায়দার আলি আর দেরি করল না।এক হাতে লাঠি,অন্য হাতে টর্চ নিয়ে বাড়ির পথ ধরে আলপথ দিয়ে সোজা হাঁটতে লাগাল সে।ছয়দুলও বিড়িটা শেষ করে ফেলে দিল।তারপর হেঁট হয়ে আল থেকে নলকাঠিটা তুলে নিল হাতে।ঘুটগোড়ের জমিতে নল পুঁতে দিয়ে বড় ক্যানেলের পাড় ধরে বাড়ি চলে যাবে সে।হায়দার আলির কথাগুলো এখনও তার কানে বাজছে।মনের ভেতর গুঞ্জন তুলেছে।ছয়দুল হায়দার আলির ফেরার পথের দিকে তাকাল।দেখল,একটা লম্বা মূর্তি এক হাতে লাঠি,আর অন্য হাতে আলো জ্বেলে দু'পাশের অন্ধকারকে সরাতে সরাতে বীরের মতো এগিয়ে যাচ্ছে।

---------------


লেখক পরিচিতি:
হামিরউদ্দিন মিদ্যা
গল্পকার
পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় থাকেন।




৬টি মন্তব্য:

  1. খুব ভালো লাগল। কোনও ভান নেই, আকাঁড়া বাস্তব উঠে এসেছে সহজ সুরে। ❤

    উত্তরমুছুন
  2. নলপোঁতা কুনু হিন্দুর পরব লয়,কুনু মুসলমানের পরব লয়। নলপোঁতা হল চাষিদের পরব। চাষিদের কুনু ধর্ম হয়না রে ছয়দুল!
    বড় সোজাসাপ্টা কথা বলেছেন হমিরউদ্দিন। অনেক হারিয়ে যাওয়া কথাও জানা গেল। খুব ভালো লাগল।

    উত্তরমুছুন
  3. নলপোঁতা হল চাষীদের পরব। এই কথাটাই মূল সুর গল্পের। বস্তুত ভৌগোলিক কারণে একেক অঞ্চলে একেক রীতি। তাকে জোর করে পাল্টানোই গোড়ামী। ভালোবাসা হামিরউদ্দিন ভাই।

    উত্তরমুছুন
  4. এমন গল্প পড়তে পেলে মনে জোর আসে।
    (একটা কথা - যতি চিহ্নের পরে ফাঁক থাকা লাগে যে, প্রিয় লেখক!)

    উত্তরমুছুন
  5. সত্যি, খুব প্রয়োজন এমন লেখার আজ! এই অজস্র ভেদাভেদের নীরস সমাজে, সময়ে...

    উত্তরমুছুন
  6. স্বচ্ছ দেখা । কোনটা দেখতে হবে, আমাদের দেখাতে হবে লেখক জানেন। লেখককে শুভেচ্ছা। আরো লিখুন।

    উত্তরমুছুন