বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

শাশ্বত নিপ্পনের গল্প : ধাতবকণ্ঠ


মইনুল আর আমার বোঝাপড়াটা ভাল। দুই বন্ধুই মাস্টার। আমি মাস্টারি করি স্কুলে, মইনুল স্টেশনে। স্টেশন আমার ভীষণ প্রিয়। গভীর রাতে পরিচিত স্টেশনটা খুব অপরিচিত হয়ে ওঠে। বিসমিল্লাহ্ টি-স্টলের ঝাঁপ যখন পড়ে যায়, আল মদিনা পেপার হাউজের ঝাপসা আলোর নিচে তিনটে কুকুর বিশ্রাম নেয় তখন জিআরপি পুলিশগুলো ধূর্ত শেয়ালের দৃষ্টি নিয়ে ফুটওভার ব্রিজের জমাট অন্ধকারের নিচে নিঃশব্দে আনাগোনা করে। রাত ঘন হতেই দিনের আলোয় নিষিদ্ধ মেয়েরা চলে আসে প্লাটফর্মে। কারো কারো বয়স হয়েছে, কারো কারো হয়নি, কারো কারো বয়স চলে গেছে। কিন্তু অল্প আলোতে আর কড়া মেকআপে কাউকেই আলাদা করা যায় না। ওদের মোবাইলে জমকালো গান বাজতে থাকে। জ্বলে থাকা বাতির চারপাশে পাতলা অন্ধকার জমা হয়; এক ধরনের উড়ন্ত পোকা ভীড় করে আলোর নেশায়। দূর লাইনের লাল সিগনাল বাতিটাকে মায়া মনে হয় মুহূর্তের জন্য।

মইনুলের টেবিলের উপরে রাখা নোংরা চায়ের গ্লাসে সিগারেটের টুকরোটা ফেলি গুলসমেত। তারপর জুলজুল চোখে গভীর অন্ধকারের অতসীদের মজবুত শরীর দেখতে থাকি। দুর্বল আলোতে প্লাটফর্মে ওদের ছায়া পড়ে বেঢপ। ছায়াতে শরীরের কোন খাঁজ থাকে না, ভূতের মত সব সমান। রাত গভীর হলে মানুষ ভূত হয়ে যায় নিজের অজান্তেই।

আবার সিগারেট জ্বালাই। চারপাশটা আরো ভোতা হলে মইনুল গাঁজাভর্তি স্টিক দেয়। হাতের আড়াল করে স্টিক টানি। দু’একজন মধ্যবয়সী মহিলা আমাদের ঘরের পাশে রাখা নোংরা ঠ্যাশ বেঞ্চিতে বসে পান চিবাই, অপেক্ষা করে খদ্দেরের।

ঘুমপুর স্টেশনটা পুরনো, নোংরা এবং ফাঁকা। সারাদিনে দু’টো লোকাল থামে এখানে। আর রাত নিঝুম হলে চারপাশ কাঁপিয়ে এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে ছুটে যায় আন্তঃনগর এক্সপ্রেস। স্টেশনের পুরনো লোহার বেঞ্চি, টিনের ঘর, আগুনে পোড়া লাইনম্যানের ঘর কাঁপতে থাকে। এই কম্পনকে নিশুতির হাসি বলে ভ্রম হয়।

স্টেশনটির কথা আমাকে বলেছিলেন কবিবন্ধু সাইফুল ভুঁইয়া। সাইফুল বললেন, নরকের নর্দমায় বসে সুন্দরের স্মৃতি হয় না; এই উলঙ্গ শহর এখন দানবের, এখানে আকাশ পরিবার পরিকল্পনার কন্ট্রাসেপ্টিভ বিলানো স্বাস্থ্যকর্মী ছাতার মত নীল; পাখিরা কলকাকুলি ভুলে নকল করে রিংটোন; নারীরা হয়েছে মজা পুকুরের মত নিস্তরঙ্গ; হাজার বছরের মমির মত হিমশীতল। ওদের শরীরের ভাজে ভাজে ফরমালিনের দুর্গন্ধ। আমি তখন বলি, তাহলে ঠিকানা দাও সেই বৈকুণ্ঠের, সেখানে বসে সমাপ্ত করতে পারি আমার উপন্যাস।

চলে যাও ঘুমপুর। তাড়াতাড়ি যেও কিন্ত--না হলে কোন মহাপ্লাবনে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এই নগরী। আমি রওনা হই। এই নির্ঘুম ব্যস্ত দেশে ঘুমপুর নামে কোন শহর জনপদ থাকতে পারে সেটাই আমার চিন্তায় ছিল না।

অপূর্ব এই ছোট্ট শহর ঘুমপুর। দুপুরে স্টেশনে বসে থাকি। সিগারেটের মাথায় সময়কে ধরাই আর জনশূন্য স্টেশনের আনাচেকানাচে লুকিয়ে থাকা কোলাহল শোনার চেষ্টা করি। মনে হয় পৃথিবীর সময় থমকে গেছে এখানে এসে। শরীর এলিয়ে বসে থাকি পরিত্যক্ত লোহার বেঞ্চে, অশরীরী কেউ বসে থাকে পাশে। আমার শূন্যতা যে ভরে দেয় তাকে বিস্মৃতি দিয়ে এঁকে দিই সূদুর ভবিষ্যতে।

বাতাসে একটা শব্দ ভেসে আসছে; লোহা আর পাথরের ঘষা খাওয়া শব্দ। মনে হয়, এই শব্দটা আসছে বলেই প্রমাণিত হয় যে পৃথিবীতে এখনো প্রাণ আছে। শব্দের উৎস লোকটির ঠিকানা আমাকে বলে দেয়। কিছুটা দূরে, যদিও স্টেশনে রেললাইনের দূরত্ব মাপা কঠিন। একটা লোক লাইনে কাজ করছে। হাতে মোটা শাবলের মত একটা কিছু, স্টেশনে চেনা দৃশ্য--কিন্তু আজ অচেনা মনে হয়। লোকটি নির্দয় রোদের মধ্যে কাজ করছে পা পর্যন্ত কালো রঙের হুডি জাতীয় জ্যাকেট পরে। আমাদের চারপাশে কত বিচিত্র মানুষ যে ছড়িয়ে আছে তার কোন সঠিক হিসাব নেই জনসংখ্যার জরিপে। লোকটির মাথার উপর দিয়ে তীব্র রোদে রেললাইনে তৈরি হওয়া তিরতির জলের আভা দেখতে থাকি। হাতে পুড়তে থাকে সিগারেট।

হঠাৎই আমার সম্বিত ফিরে আসে। দেখতে পাই গত রাতের পাঁচ ঘণ্টা লেইট আন্তঃনগর ‘এগারোসিন্ধু’ তার কুৎসিত নাক বের করে ছুটে আসছে বিপুল গতিতে। লোকটি বিকারহীন। ‘এগারোসিন্ধু’ ভেঁপু বাজায়, বিকট সে শব্দ ছড়িয়ে পড়ে ঘুমপুরের নিরুত্তাপ শরীরে। লোকটি নির্বিকার। আমার কি করা উচিত? উত্তেজনায় আমি দাঁড়িয়ে যাই। নিজেকে আশ^স্ত করি, লোকটি নিশ্চয় সরে যাবে নিরাপদ দূরত্বে। ‘এগারোসিন্ধু’ আবারো ভেঁপু বাজায়। আমি চিৎকার করে উঠি, অ্যাই ভাই, ওই..ই...ই...!

ধুলোর ঘূর্ণি তুলে আন্তঃনগর অবাধ্য গোয়ারের মত পার হয়ে যায় স্টেশন। স্টেশনের পুরনো টিন জংধরা পরিত্যক্ত চেয়ার, পোড়া সিগন্যাল ঘর প্রবলভাবে কেঁপে ওঠে। এই প্রথম কেঁপে ওঠে আমার বুক।

ধুলোর বলয় ভেদ করে, আকুল হয়ে মানুষটি খুঁজতে থাকি। ট্রেনটি চলে যাওয়ার পরও একটা ঘর্ষণের শব্দ এখনো যেন লেগে আছে পাশে কোথাও। গলা শুকিয়ে আসে। একটা তালগোল পাকানো রক্তের দলা দেখার আতংকে মুহূর্তেই চোখ বুজি, চোখ বুজেই দেখতে পাই, ধুলোর আস্তরণ কেটে যাচ্ছে দ্রুত, একটা ছিন্নভিন্ন রক্তাক্ত দেহকে ঘিরে রাড়ছে মানুষের ভিড়; ওদের সকলের চোখমুখ বেদনার্ত। উত্তেজিত মানুষ সামলাতে পুলিশের কর্কশ বাঁশি আমার কানে অসভ্যের মত ধাক্কা দেয়, আর তখনই কে যেন বলে ওঠে-- আপনি আমাকে ডাকছিলেন? আতঙ্কিত আমি সহসা উঠে দাঁড়াই।

কে?

আপনি আমাকে ডাকছিলেন? ধাতবকণ্ঠে লোকটা বলে। তার গায়ে এই প্রখর রোদেও পা পর্যন্ত মোটা কালো হুডি জ্যাকেট। হাতে শাবলের মত লোহার রড। আমি ওর মুখ দেখতে পাচ্ছি না। মৃত্যু একটা জীবনকে নিয়ে যেতে পারেনি জেনে আমার বুকের কম্পন কমে আসে। আমি বলি, আপনি ওখানে কি করছিরেন? লোকটি খন্্খনে রডপেটানো স্বরে উত্তর দেয়, আপনার সাথে কি কোথাও দেখা হয়েছিল? কোথায় বলুন তো?

আমি স্মৃতি হাতড়াতে থাকি। ক্রমেই তলিয়ে যাই নিজেরই ভেতরে। এই লোকটির সাথে কি আমার কোথাও কখনো দেখা হয়েছিল? আমার মাথার উপর জীবনানন্দের এক দিকভ্রান্ত চিল পাক খায় ক্লান্ত ডানায়। এক পশলা গরম বাতাস প্ল্যাটফর্মে জমে থাকা ধুলো উড়িয়ে নিয়ে যায়। আমি কালো জ্যাকেটপরা শাবল হাতে দাঁড়িয়ে থাকা আগন্তুুকের পরিচিতি খুঁজতে থাকি, ডুবুরির মতো তল থেকে অতলে।

তখুনি কতগুলো মানুষের বিছিন্ন একটা দল আসে ব্যস্ত পায়ে। ওরা এগিয়ে যায় বিলাপ করতে করতে। ওদের সস্তা সেন্ডেলের ঘায়ে ধুলো ওড়ে। আসে নারী-পুরুষ, ভদ্র-অভদ্র, বেকার-ভবঘুরে আরো অনেকে। ওরা বিলাপ করতে থাকে নিজেদের মধ্যে। আমার চিন্তায় ছেদ পড়ে। জিজ্ঞেস করি-- কি হয়েছে? যেন পুরো ঘটনাটি একমাত্র আমারই অজানা।

ওরা সমস্বরে উত্তর দেয়, ঐখানে একটা লোক এইমাত্র গাড়িতে কাটা পড়েছে।

সে কি! কিভাবে?

মানুষগুলো সামান্য থামে, তারপর প্রশ্ন করে-- আপনাকে খুব চেনা লাগছে? যেন কেথায় দেখেছি, কোথায় বলেন তো?

আমার কালো জ্যাকেটের ভেতর জমাট শীত আমার শরীরকে শক্ত শাবলের মত দাড় করিয়ে রাখে নিরুত্তর।



লেখক পরিচিতি
শাশ্বত নিপ্পন
মেহেরপুর, বাংলাদেশ।
গল্পকার। কবি।
প্রকাশিত গল্পের বই :  অনতিক্রম্য, পুনরুত্থান, অশনির ছন্দ, বৃন্তচ্যূত। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন