বইমেলা : কুলদা রায়ের বইপত্র




"মানুষের অনুভূতির যে অব্যক্ত খনি আছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তা খনন করে সূর্যালোকে এনেছিলেন। তিনি শুধু মসি-সদৃশ শাবল চালিয়ে সেগুলোকে তুলে আনেননি, তুলির আঁচড়েও রাঙিয়েছেন। বাঙালির সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, প্রীতি-ঘৃণা দিয়ে তিনি সাজিয়েছেন এক অমর আর্টগ্যালারি। সেই গ্যালারি প্রজন্মান্তরে আজও বাঙালির পদচারণায় মুখর থাকে। বাঙালির ঠোঁটে আজও খেলা করে রবি ঠাকুরের গল্প, রবি ঠাকুরের কবিতা, রবি ঠাকুরের গান।
 
কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দিকেও ছুটে গেছে প্রভূত নিন্দা-শলাকা। পাকিস্তানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলরা আসলে রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করেনি, তাঁকে খুন করতে চেয়েছে, যেমনটা তারা করতে চেয়েছিল বাংলার মানস ও মানুষকে। অন্যদিকে অন্যান্য-ক্ষেত্রে প্রগতিশীল অনেক ব্যক্তিবর্গ হয়ত অজ্ঞতা, হয়ত অসূয়া, নয়ত নির্দোষ সমালোচনার খাতিরেও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে কিছু সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন।

তাঁদের এসব সিদ্ধান্ত ও পাকমন-পেয়ারু বুদ্ধিজীবিদের দুর্বৃত্তি ব্যবচ্ছেদ করেছেন কুলদা রায় ও মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান (জালাল)। তাঁদের অণুবীক্ষণ লেন্সে ফুটে উঠেছে রবীন্দ্রনাথের কথিত প্রজা-নিপীড়ন, মুসলমানদের সঙ্গে সম্পর্ক, বঙ্গভঙ্গে তাঁর ভূমিকা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তাঁর কথিত বিরোধীতা, অন্য গীতিকারের গান হতে সুর চুরির অভিযোগ, পল্লিপুনর্গঠন, পাকিস্তানপর্বে রবীন্দ্রবিরোধিতার স্বরূপ ও অন্যান্য। অভিযোগ খণ্ডনের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের একটা সম্যক চিত্রও উঠে এসেছে এই বইতে। পাঠকই হবেন রবীন্দ্র জমিদারগিরির প্রকৃষ্ট বিচারক।" 

রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি ও অন্যান্য বিতর্ক
প্রকাশক : নালন্দা , ঢাকা, বাংলাদেশ। 
২০২৩ বইমেলার প্যাভিলিয়ন # ৫।
-----------------------------------------------------------------------




কুলদা রায় একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি। এই জন্য নয়, যে, তিনি বিপজ্জনক শব্দ লেখেন। নতুন করে আর বিপজ্জনক কিছু লেখা তো সম্ভব নয়, সব শব্দই এখন কর্তৃপক্ষের নজরদারিতে অভিধানে জমানো আছে। সব বাক্যই ব্যাকরণে বাঁধা। রবীন্দ্রগানের সব সুরই আছে স্বরলিপিতে। সব নদীই সমুদ্রে পড়ে, আর বিপ্লব শেষ করে সব পাখিই ঘরে ফেরে।

আসল বিপদ তাঁর দেখার ভঙ্গীতে। কত লোকে কত ভাবে দেখে। কেউ আড়চোখে, কেউ সোজাসুজি। কারও দৃষ্টি ঘোরালো, কেউ চোখ পাকিয়ে তাকায়। কেউ কটাক্ষ করে, কেউ রাখে নজরবন্দী। কিন্তু দেখে একই জিনিস। সামনে সুচিত্রা সেনকে পেলে, সবাই 'মহানায়িকা'ই বলবে। কিংবা মোহময়ী। কিংবা মুনমুন সেনের মা। মানে, অভিধানে যা লেখা আছে। ফিল্মফেয়ারে বা আনন্দলোকে।

কিন্তু কুলদা রায় বিপজ্জনক এই কারণে, যে, তিনি এর মধ্যে থেকে এমন কিছু দেখে ফেলবেন, যা ব্যাকরণে নেই। এ কথা সক্কলে জানে, যে, সুচিত্রা সেনকে যখন দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হল, তখন তিনি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেছেন। কাউকে দেখা দিচ্ছেন না। শোনা যায়, সুচিত্রা সেন তার দরজার নিচে দিয়ে একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলেন। লিখেছিলেন, না, তিনি এ পুরস্কারটি নিতে পারেন না। সুচিত্রা সেন সেজে থাকতে তার আর ভালো লাগছে না।

এখান থেকে কুলদা রায় প্রত্যক্ষ করেন, যে, উনি আসলে সুচিত্রা সেন নন। সেজে ছিলেন মাত্র। আসল সুচিত্রা সেন তবে কোথায়? জানার জন্য কুলদার লেখা গল্প পড়তে হবে। তাতে যাই থাক,মোদ্দা কথা এই, যে, সেটা আম পাবলিকের নজরে পড়েনি।

কুলদা বাংলায় গল্প লেখেন। কুলদার বিপজ্জনক দৃষ্টির কারণে, সে গল্প ভারত না বাংলাদেশের, বোঝা ক্রমশ দুষ্কর হয়ে যায়। তার মধ্যে আবার দুমদাম ঢুকে পড়ে সীমানাহীন ফেসবুক। জানা যায় কাবাশরীফে কারা নাকি একটা হিন্দুমূর্তি বসিয়ে দিয়েছে। প্রত্যক্ষজ্ঞানে লোকে তার ছবি দেখে। বিপদ দেখে। ষড়যন্ত্র দেখে। কী ভয়ানক এই ষড়যন্ত্র। সিসিটিভি এড়িয়ে, নিরাপত্তা টপকে, কীভাবে করল এই অপকর্ম? কে করল? ইহুদিরা? নাঃ হিন্দুরা। এইসব নানা গূঢ় সত্য। কিন্তু কুলদা দেখেন অন্য জিনিস। হিন্দু লোকটি মূর্তি আসলে বসিয়েছে ফেসবুক দিয়ে গিয়ে। সেখানে সিসিটিভি নেই। সিকিউরিটি নেই। স্রেফ একটা অ্যাকাউন্ট থাকলেই হল।

কুলদা বিপজ্জন এই কারণে, যে, ফেসবুকের মতো, তাঁরও পাসপোর্ট নেই। তিনি সীমান্তের এদিকে-ওদিকে অবাধ বিচরণ করেন। ইলিশের মতো। কালো কাউয়ার মতো। দাঙ্গার মতো। ধর্ষণের মতো। যে ইলিশ ওঠেনা, স্বপ্নেই থেকে যায়। যে কাউয়া আসলে কাপড়ের, ওড়া তার হয়নি। যে দাঙ্গা পুলিশ রিপোর্টে নেই, সব শান্তিকল্যাণ। যে ধর্ষণ কখনও হয়নি। শুধু স্বাস্থ্যপরীক্ষায় ধরা পড়ে, গ্রামের প্রতিটি মেয়ে একদিন গর্ভবতী হয়ে গেছে। কীকরে কে জানে।

কীকরে এসব হয়, কেউ জানেনা, কুলদা জানেন, তাই তিনি বিপজ্জনক। "এ গল্পগুলো বাংলাদেশের বলার চেয়ে উগান্ডা নামের কোনো দেশের বলাটাই নিরাপদ।" -- লিখেছেন তিনি। এ বিশ্বায়িত পৃথিবীতে ভারত কিংবা বাংলাদেশের চেয়ে উগান্ডা কি নিরাপদতর? আম পাবলিক তা বলবেনা। কুলদা বলেছেন। তাঁর দৃষ্টি আলাদা। যে কারণে কুলদা রায় একজন বিপজ্জনক ব্যক্তি।


গল্প হলো বর্ণিত আখ্যান। একজন গল্পকার সেটি শব্দ বাক্যে উপস্হাপন করেন। আখ্যানের এই বর্ণনা ভঙ্গিতে এক লেখক থেকে অন্য লেখকের পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যেকারণে আমাদের কথা সাহিত্যে গল্পকে দুভাবে উপস্হাপনের দৃষ্টান্ত দেখা যায়। একটি ধারায় মনে হয় লেখক বুঝি পাশে বসেই গল্পটি বলে যাচ্ছেন, পাঠক গল্পটি শব্দ-বাক্যের ভাঁজ খুলে পড়ছেন না ঠিক, শুনছেন। আর অন্য ধারায় শব্দ বাক্যের ভাঁজ খুলে খুলে গল্পের গন্তব্যে পাঠককে পৌঁছাতে হয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, হাসান আজিজুল হক, শওকত ওসমান, সৈয়দ শামসুল হক, আবদুল মান্নান সৈয়দ, সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম প্রমুখেরা প্রথম ধারার সফল কথা সাহিত্যিক হিসেবে চিহ্নিত। গল্প বলিয়ে হিসেবে এখানে আরো একটি নাম সাড়ম্বরে জায়গা করে নিতে পারে বলে মনে করি। যাঁর লেখা পড়ে অধিকাংশ সময়ই পাঠকের মনে হবে গল্পকার তার পাশে বসেই তাঁর পরিশীলিত উচ্চারণ আর ধীরস্হির ভঙ্গিতে গল্পটি বলে যাচ্ছেন। গল্পকথকের নাম কুলদা রায়।

--সাদিয়া সুলতানা



যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন
গল্প সঙ্কলন
প্রকাশক : নালন্দা ,
ঢাকা, বাংলাদেশ।
২০২৩ বইমেলার প্যাভিলিয়ন # ৫।

গুরুচণ্ডালী প্রকাশনী
কলকাতা বইমেলার স্টল নং স্টল ৫০৭ ।
-----------------------------------------------------------------------



বইয়ের নাম ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জল’। লেখক কুলদা রায়। প্রকাশক নালন্দা এবং আমার সংগ্রহের কপিটি দ্বিতীয় সংস্করণের। এই বইয়ের কিছু গল্প আমার আগেই পড়া ছিল, সেই কারণেই জানি এই বইটির বহুল প্রচার জরুরি। ভালো লেখা পাঠকের হাতে পৌঁছাতে পারেন পাঠকই। তাই পাঠক হিসেবেই আমার অনুভূতি ভাগ করলাম এখানে।
 
বইয়ের নামেই আছে ভাবনার নিড়ানী। বৃষ্টির জলেরও নানা চিহ্ন থাকে: কোথায় কোন সময়ে কাকে ছুঁয়ে দিলো তার ধরনেই জলের ধরন, স্বরের ভিন্নতা। টিনের চালে যে বৃষ্টির নূপুর, লাউয়ের ডগায় তার আওয়াজ কোথায়? আকাশ ফুঁটো হলে পুকুরে জলের বুড়বুড়ি নক্সা কাটে, বাড়ির ছাদ কিংবা কাদাগোলা খাদে তেমন মিহি তানের সুর নেই যে! ছাতা মাথায় জল ছপছপ পায়ের আওয়াজ আর কান্না-ধোয়া জলের চিহ্নের থই তো এক নয়। তবে সব জল একসময় সাগর-পানেই ধায় আর সাগরের জলও কান্নার জলের মতোই নুনে ভরা! তবে মানুষ কেবল দুঃখে নয় সুখেও কাঁদে। তাই ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জলের’ পনেরটি গল্প সেইসব দুঃখ-সুখের গল্প-কথাই।

গল্পের শুরুতে প্রাক-কথনে ১৯৩৬-৩৭ এর ফ্রেমে বাঁধাই ধূসর ছবিটি লেখকের কলমের গুণেই স্পষ্ট দেখতে পাই যেন! একটি মৃতদেহকে ঘিরে আছে কিছু মানুষ। এরা প্রায় সকলেই পস্পরের আত্মীয়। কারো কারো সাজে খানিক আড়ম্বর আছে, বোঝা যায় ছবি তোলাই তাদের লক্ষ্য। এটিই হয়তো এই এলাকার প্রথম ক্যামেরায় তোলা ছবি। ছবির মানুষদের মধ্যে দুই জন ‘বিশেষ’। আসলে একজন বলাই শ্রেয়, কেননা অপরটি ‘জন’ নেই আর। দেহ। মৃতদেহ। প্রাণ না থাকলে দেহকে ‘জন’ বলা যায় না। তবে যতক্ষণ ‘জন’ ছিলেন ততক্ষণ তাঁরও একটি গল্প ছিল নিশ্চিত। অপর বিশেষ জনটি সেই গল্পেরই ছেঁড়া সুতোর টান । তিনি মৃতের স্বামী। নাম সৃষ্টিধর রায়। লেখকের পূর্বপুরুষ। বলা ভালো আমাদেরও। কেননা মানুষই মানুষের পরম-আত্মীয়। আমরা জেনেও অজ্ঞানের মোড়কে নিজেদের ‘অহম’ জড়াই। এই জনসমুদ্রে জন্মচিহ্নে ধর্ম-ছাপ লাগার আগে আমরা সকলে ভূমিরই সন্তান ছিলাম একদা। কুলদা রায়ের এই পনের গল্পে আমাদের ভুলে যাওয়া সেই মূল তারেই টঙ্কার তোলে। বিশেষ সম্প্রদায়, বিশেষ শ্রেণি, লিঙ্গ কিংবা বয়সের আবছা বিভেদরেখা মুছে তাঁর গল্পেরা আমাদের সকলেরই গল্প বনে যায়।

বিষয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও গল্পগুলো কেমন যেন পস্পরের আঙুল ছুঁয়ে আছে। ভালো লেগেছে এদের সন্নিবেশের ক্রমও। গল্পগুলো পাঠকের কাছে খানিক আড়াল নিয়ে আসে। এই রূপ-অরূপের আড়াল ভেঙে কে কতটা দেখবে তা পাঠকের দেখন-চোখই জানে।

প্রথম গল্প ‘আমার সাহিত্য -বোধের গল্প’ শিরোনামের গল্পটি দিয়েই শুরু করি : এই গল্পে নাতির সাহিত্য-বোধ জন্মানোর পথ্য এলো গামলার ভেতরে ‘হলুদ বর্ণের ‘ফাইয়া’ হয়ে। এ নিয়ে জাদুবাস্তব-পরাবাস্তব তত্ত্বতালাশে চিত্তচঞ্চল হওয়ার আগেই কাশেম রেজার কন্যা কোকো আপার কথামতো সামান্য মধুযোগে ফাইয়া খেলে কষ লাগে না - এই সত্যতে নাড়া বেঁধে থিতু হতে হয় পাঠকের। ‘ফাইয়া’ থেকে পেঁপে হতে ধৈর্য ধারণ জরুরি, এ কথাও সত্য। তাই পেঁপে লেখা কাগজটি পাতা মেলে আকাশমুখি হওয়াও জাদু মনে হয় না। জানি মা আঁজলা ভরে জল দিয়েছেন অতএব ফাঁকি নেই, বরং আছে বীজের আশ্বাস। অতঃপর ঠাকুরদা’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে ‘গঙ্গাজল’ নয় কাশেম রেজার হাতে পেঁপের মিষ্টি রস খেয়ে বোঝেন তাঁর শেষ বাসনা পূর্ণ হয়েছে, ‘ফল ফলেছে’ । ঠাকুর দা’র চোখের কোণ উপচে দু’ফোটা জল গড়ায়। আর্দ্র হয় পাঠকও। তাঁর অন্তিম শরণের দিনটিতেই নাতির সাহিত্যে হাতেখড়ি। নাতি লেখে, ‘ পেঁপে ফল পাকিলে মিঠা লাগে। কাঁচা হইলে আনাজ’। এইখানে এসেই গল্প শেষ কিন্তু পাঠক আমার নটে গাছটি মুড়োয় না বরং বীজোদ্গম হয় যেন! জাদু এবং বাস্তবের ঘোর কাটিয়ে পরত খুলে এইবার গল্পের শাঁস খুঁজি। বুঝি সাহিত্য তেমনই বস্তু যা আনাজ থেকে মিষ্ট না হলে সাহিত্য হয়ে ওঠে না এবং জীবনের পাঠ ছাড়া সেই মিষ্টতার মন্থন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এবং এই যে ভাষার ব্যবহার ‘ফাইয়া’ কিংবা ‘পেঁপে’ এদের স্থান চিনে বসানোর জন্যেও ‘মননের পক্কতা’ জরুরি।

পরের গল্প ‘সোনার কলস’ প্রকৃতই গা- হিম করা খুনের গল্প। লাশ গুমের গল্প। চিরচরিত কালো-কন্যার যৌতুক দিয়েও শেষরক্ষা না-হওয়ার গল্প। অথচ বুননের শৈলীতে আমরাও বড়ো ঠাইরেনের নানা রঙ্গ-রস মেশানো বয়ানের মোহে পড়ি। শেষমেশ সেই বিমলাবালার ঘোড়ার পিঠে চড়ে আকাশে হাপিস হওয়ার গল্পের সঙ্গে সোনার কলসের মাটি ঘষ্টে পুকুরে নামার মিলযোগ, সত্যকে কুহকে জড়ায়। তবে রক্তকরবীর আধপোড়া ফলের বিষে সব মাছের সঙ্গে অদ্ভুত কালো কাছিমটি সত্য নিয়ে মরে ভেসে উঠলেও আমরা ধন্দে পড়ি। এই ‘জলের’ গল্পটি কনে-বদল, কনে-গুম সব ছাপিয়ে মানরক্ষার দায় নারীজীবনের চেয়েও যে অধিক মূল্যমানের সেই আদি সত্যই কাছিমটির চার পায়ে বাঁধা ঝুমঝুমিতে অনুরণন তোলে।

‘শবনম অথবা হিমিকালিপি’ গল্পের শুরু অসিতবাবুর রচনা দিয়ে। তিনি মফস্বলের ইতিহাস নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানেই বলা আছে ‘চিলে কোঠা’ বাড়ির নাম এসেছে চিলম্যান থেকে । গ্রেগরী চিলম্যান এদেশে এসেছিলেন নীলচাষের জন্যে। সে অনেক কাল আগে- ১৮০৩ সালে। গল্পটি কিন্তু চিলম্যানের নয়। তাঁকে নিয়ে বিশেষ কিছু নেইও এখানে। ১৯৭২ এ যিনি থাকতেন, সেই গণিতের শিক্ষক হুজুর স্যার? নাঃ গল্পটি তাঁরও নয়। তবে চিঠিগুলি তাঁর এবং আলমগীরের অঙ্কন-প্রতিভা তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এই গল্প আলমগীরেরও নয়। গল্পটি তবে টগরের? টগর কে? দুধফুল যা আলমগীর এঁকেছিল? নাকি সেই চিঠির অরূপ প্রেমিকা, হুজুরের স্ত্রী? গল্পটি তারও নয়। শবনমের কি? শবনম মানে ভোরের শিশির। টগরের মেয়ের নাম শবনম রাখার কথা। হিমিকার মেয়ের নাম শবনম রাখা হয়েছিল। মধুমতীর ঘাটের সেই পরী নামের দেহপসারিনীর মেয়েটিও যে শবনম! এইখানে এসে জলের মতো ঘুরে ঘুরে বলা এই গল্পের শুরুটা ভাসে। গ্রেগরী চিলম্যান! তাঁর সমাধিতে লেখা ছিল ‘a son of solitude’! তিন শবনমের জন্মসূত্রে সেই একাকী ঘোরের বিনে সুতোর মিল এবং হুজুর স্যার, আলমগীর, আনিস স্যার এরা সকলেই ভালোবেসে হয়ে গিয়েছিলেন একা ।

কুলদা রায় সময়ের আগু-পিছুর চিহ্নসূত্র সাবলীলতায় গুঁজে দেন গল্পের অনুসঙ্গে। ‘সুবোল-সখার বিয়ে বৃত্তান্তে’ সময়ের উপস্থাপন এতই প্রামাণ্য যে মনে হয় যেন এই সময়েই দর্শক আসনে বসে দেখছি ঘটমান-অতীত। ‘বেলগাছটির অবস্থান ঈশান কোণে। রুয়েছিলেন দীননাথ। সেটা পঞ্চাশ সালের ঘটনা… ‘ এই তিন বাক্যে যেন ইতিহাস পাশ ফিরে চোখ মেলে। আবার বরযাত্রীর নৌকায় শচীন নব ঘোরাচ্ছে। আকাশবাণী ধরা পড়ছে না। কাঁটা ধরল ঢাকা বেতার। খবর পড়ছেন, 'সরকার কবীর উদ্দীন’। বর্মা থেকে চাল আসবে, বন্যা হবে না। ন্যায্যমূল্যের দোকানে রক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মালামাল বিক্রি হচ্ছে-দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এই গুরুগম্ভীর তথ্যের র মধ্যেই সুলেখা রানী বলে উঠে, ‘একটা গান দ্যান, ভাবের গান। কচকচানি ভালো লাগে না।‘ পাঠকেরও ঠিক এমনই মনে হয়। ব্রেক দেওয়া যাকে বলে। গল্প গুরুগম্ভীর ভাব জমাট করে বসে যাওয়ার আগেই লঘু করে ফের গল্পে টানা --- এই শৈলীটির কারণেই গল্পের ঈশান কোণে মেঘ জমলেও গুমোট হয় না। ভাবনার জানালা খোলাই থাকে।

‘মথি উদয়ের তারায়’ এসে সত্য কী এই প্রশ্ন নতুন করেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেকে । ধর্মের ভাইরাস বড়ো সংক্রামক। যে ‘তারা’ জীবন বাঁচায় সে ‘তারা’ বিভ্রম হলেও সত্য।

‘গন্নিবিবির জুতো-পাখি’ তে গল্পের ছলে তথ্য ঠাঁসা। গল্পের নির্মোহ শুরুটি দারুণ, ‘সিকদার বাবুগো গদিঘরে গন্নি বিবি ঝনন ঝনন ঝা বলে পা দিয়া দাপানি তুলল- হ্যার আগের দিনই একজোড়া পাম্পস্যু কেনা হইছিল। কাহিনী এইটুকুই। ’- এই যে যতি তাতেই পাঠকের ঔৎসুক্য চরমে ঠেকে । গন্নি বিবি কে? কেনই বা এই পাম্প স্যু কেনা? ততক্ষণে গল্প সিন্ধুকে ঢুকে ফের বেরিয়ে ডাল-পালা ছড়িয়ে এপার ওপার, এপাড়া সে-পাড়া ঘুরে ইংল্যন্ডে পৌঁছে গেছে! এই গল্পের গরু মসৃণভাবে কবরস্থান পর্যন্ত নিয়ে যাবে পাঠককে এবং মার্কেজের মতো কুলদা রায়ও নানা তথ্যপ্রমাণের উপস্থাপনে পাঠকের বিভ্রান্তির বুদবুদ ঘোলা হওয়ার আগেই ছেঁকে ফর্সা করবেন দক্ষতায় এবং পাঠকও গল্পের গরুর দড়িটি ধরেই থাকবেন শেষ পর্যন্ত। এই গল্পেই এক জায়গায় একটা দারুণ প্রশ্ন আছে। সেন্ট মথুরানাথের সদাপ্রভু কর্তৃক শাপান্তে নিক্ষিপ্ত আদম-হাওয়ার গল্পটি শ্রবণশেষে হাড়ময় মস্তিষ্ক, ক্ষুধাযুক্ত পেটের অশিষ্ট সেইসব জনগণের মাঝ থেকে কেউ একজন জানতে চায়, ‘বাপের পাপ পোলার গায়ে চাপানো কি ঠিক হইল ফাদারবাবু? এই কামডা কি আপনের সদাপরভু ঠিক কইরেছেন?’

‘বৃষ্টিচিহ্নিত জল’ এই গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এটি আমাদের রাধারানীরই গল্প। এই গল্পের কৃষ্ণও ফেরে নি রাধার কাছে তবে তাঁর বাঁশিটি ফেলে গেছে ভুলে। এই গল্পের জমজ দুই বোনের সারা জীবন জুড়ে থাকবারই কথা ছিলো। একই সঙ্গেই কন্যা বিদায়- তাদের পিতার এমনই আশ। কিন্তু শেষতক বোনে বোনে চোখের-কাজল ভাগ হলেও চোখের-জল ভাগ হলো না। আকাশ ভেঙে যে জল অঞ্জলিকে ভিজিয়ে গেলো সেই জল বিজুলির নয়। এই গল্পের বিজুলি-অঞ্জলির বাড়ির বর্ণনা পড়তে পড়তে মনে হলো যেন বিভূতি বাবু আমাদের এদিককার কোনো আঞ্চলিক ভাষায় কথা কইছেন। গল্পটি বেদনার কিন্তু আগাগোড়াই ভাষার মিষ্টতায় টইটম্বুর। অবশ্য কুলদা রায়ের ভাষারও নিজস্ব একটা শান্তশ্রী আছে।

‘দুধকুমারের হাতি’ গল্পের হাতি কোনো মামুলি হাতি নয়। গল্পের শুরু হলো লক্ষণ দাসের হাতির বর্ণনা দিয়ে। সে হাতি আফ্রিকার হাতি। ‘হাঁটলে মেদিনী কাঁপত’ । শুকচাঁদ ঘরামীর হাতিকে নারকেল খাওয়ানোর পক্ষে দার্শনিক যুক্তি, ‘নারিকেল হলো গে মানুষের অহঙ্কারের চিহ্ন। গণেশ ঠাকুরের হাতির কাছে নারিকেল দিলেন মানে আপনার অহঙ্কারকেই দিলেন। …হাতিরূপী গণেশ ঠাকুর আপনার অহঙ্কারের শ্বাসটুক খাইল, জল্টুক খাইল। তারপর আইচাটা ছুইড়া মারল। আর আপনার মনে পাপ আসার কোনো সুযোগ থাকল না। পাপ মনে কল্যাণ আসে ক্যামনে স্যার!’ গল্প হাতি থেকে ক্রমশ সরে যায় লক্ষণ সেনের পূর্ব ইতিহাসে। বালক কালের লখাই। গল্প ফেরে দুধকুমারের দিকে। দুধকুমার এসেছিলেন ইয়েমেন থেকে। জাহাঙ্গীর বাদশাহর আমলে। বড়ই প্রত্যক্ষ পীর। এই পীরের চমৎকারেই লক্ষণদাসের হাতি হলো। সার্কেসের দল হলো। হাতির নাম মধুবালা কিন্তু একাত্তরে লক্ষণদাস কর্ণেলের মেয়ের হাতি দেখার সাধ মিটাতে যায়নি। গ্রাম পুড়েছে। মানুষ মরেছে। সেই ঘটনা স্বাধীন দেশের ডিসিও ভোলেন নাই। নথিতে এই কথা আছে। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাতি খেলা দেখতে চেয়েছে। দেখতে পায় নি। হাতির অসুখ।। তবে এমপি সাহেব দেখেছেন। এই দেখতে না-পারার জন্যে নজরবন্দি ছিলো সার্কাসের লোকেরা তাদের মালিক সহ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে: কুশীলব পাল্টায়।

‘কারবালা বিবি’ গল্পও একাত্তরের গল্প। পানঘুচি নদীতে আছে সেই কান্নার জল। এই গল্পে মেনাজ ফকির কারবালা-পালা শেষ করতে পারেন নি কখনই। কেন জানতে হলে জানতে হয় কারবালা বিবির গল্পটি। কলারণ গ্রামে ঢুকলে সব নিরাপদ। কলারণ মীর কদম পীরের গাঁও। ইয়াহিয়া খান তো বটেই আইয়ুব খানও তাঁকে ইজ্জত করে। তারপরেও নিয়তির টানে কারবালা বিবির বাচ্চাটি হারিয়ে যায়। এই শোকের গল্প বিষাদ সিন্ধুর মতোই হাহাকারের।

‘শুঁয়াচান পাখি’ এই গল্প ক্ষুদ্র ঋণ-বাণিজ্যের গল্প। এই গল্প টিভিতে দেখায় না। এই গল্প সাফল্যগাঁথার নয়, পর্দার পেছনের গল্প। এ-ও জলের গল্প। অন্য যুদ্ধের গল্প। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সহজ নয়। তবে যুদ্ধের টোপ গেলানো সহজ। স্বাধীন দেশের উন্নয়নশীল বাঘ কীভাবে বলিয়ান হচ্ছে সে কথা বিশদে প্রচার পায় তার পাশাপাশি কিস্তি ফেরতের ব্যর্থতার গ্লানি এড়াতে কেউ কেউ যে জলেও ডুবে মরে; সে কথা জল জানে আকাশ পেরিয়ে সুইডেনের রানীর কানে পৌঁছায় না।এমন কি হার্ভাডের থিসিসেও নয়। মাইক্রোক্রেডিটের ম্যাক্রোর হিসেবে টিন খুইয়ে ফেলার কথা মুন্নি গাইকে কেড়ে নেওয়ার কথা, নোলক খুলে জলে নেমে যাওয়ার গল্প - অনুক্তই থাকে। কেবল ক্যামেরার পেছনের চোখ-জোড়াই লক্ষ করে জমেলা বিবি যেন রমিজা খাতুনের চোখের তারায় ‘শুঁয়াচান পাখি’ হয়ে থমকে আছে।

‘কোমল পুষ্প’ গল্পটি পনের গল্পের মধ্যে অন্যরকম লেগেছে আমার। আখ্যান তো বটেই এই গল্পের কথক নিয়েও খানিক দ্বন্দ্ব আছে। কথক পাঁচ ভাইবোনের একজন। গল্প চলে তার বয়ানে কিন্তু সে থাকে না কোথাও। এমন কি গীতাদি’র বাড়ি বেড়ানোর পরে মেজো বোন ও দাদার মন খারাপের কথোপকথনে সে আমরা হয় কায়াটি ছাড়াই। সাহা পাড়ার গীতাদি’র রহস্য অধরাই থাকে তবে কোমলপুষ্প গানের মুখরাটি মেজো বোনের তোলা হয়ে গিয়েছিল জানালার ওপারে দাঁড়িয়েই। গল্প শেষে বাড়ির চুপচাপ ছেলেটির অনেকক্ষণ পরে খোঁজ না পাওয়ার মতোই গীতাদি’কে ছাপিয়ে আমিও কথক ছেলেটিকে খুঁজি।

‘পরীছায়া পরীমায়া’ ঘোর লাগানো গল্প। ডানা- থাকা বা না -থাকা দুইই পরীকথা। দুখি দিদির পুড়ে মরা ডানা-না থাকার জন্যে। লোকজন দেখছে ভেতরে পুড়ছে একলা মেয়ে কিন্তু জানবাজী রেখে জান বাঁচাতে এলো না কেউ। ডানা থাকলে দুখি দিদির মায়ের কানে ‘আমি পুড়ছি গো মা’ বাজতো না। ডানার কায়া নয় ছায়াটি ভুল করে নিয়ে গিয়েছিল বলেই বাসেত ভাই পুকুরের মাঝখানে মাছের মতো ভেসে উঠেছিল। ছায়া দিয়ে ওড়া যায় না। গল্প শেষে উপলব্ধি করি সব মানুষেরই একজোড়া ডানা আছে। ডানা থাকলেই ওড়া যায় না। ছায়া-কায়ার তফাৎ জানতে হয়। এবং ডানা পরতেও জানা চাই। তবেই ইচ্ছে ডানায় উড়াল দেওয়া যায়।

‘জন্মকাল’ লেখা হয়েছিল কৌশিকের। একেবারে আবহাওয়া, দিন, সন, ক্ষণের বিবরণ তো বটেই লক্ষ্মী দাইয়ের দরজা খুলে ‘উলুধ্‌বনি দ্যান গো মা…’ এর সঙ্গে মা যে পুকুর পাড়ে তারও উল্লেখ করেছিল মধু। বিনোদিনী মানে মধুর মা এই নাতির নামে অর্জুন গাছ লাগাচ্ছিলেন জন্মক্ষণে। গগন করাতি জানে সেইসব কথা। প্রথম গাছটির জন্যে সে-ই তো গর্ত খুঁড়েছিল। বিধুবাবুর ন্যাওটা হয়েছিল কৃষ্ণ-পালা শুনে। গগন এই বাড়ি ছেড়েছে মধুর নিখোঁজের পরে। এই গল্পও ভিটে ছাড়ার গল্প। এই গল্প কাঞ্চনকুমারীদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। এই গল্পে বর্ডার পার হওয়ার সূত্র ধরে কীভাবে আজন্ম ভিটে শত্রুসম্পত্তি হয়ে যায় সেইসব কূটকৌশলের গল্প। গগন করাতিও নিরাপদ নয়; সংখ্যাগুরুর অংশ হয়েও নয় । নতুন নাতির নামে গাছটি লাগানো হয় না বিনোদিনীর। ইচ্ছে ছিল তবে যে ভিটে চলে যায় সরকারের কলমের খোঁচায়, সে ভিটেতে গাছ লাগিয়ে লাভ নেই আর। গগন করাতি জানে সেই ইচ্ছের খোঁজ। ধর্মের অমিল মনের মিলকে আবিল করতে পারেনি আজও। কিছু লোক এখনও মানবসুত্রেই গাঁথা। তবে সজিনা গাছের চারা পোঁতার সময়েই মধুসূদনের বেগুনি শার্ট টিনের বাক্স থেকে বেরিয়ে আসে গল্পের ভেতরের আরেকটি গল্প সাপের মতো ঠান্ডা শ্বাস ফেলে। শার্টটি কুচিকুচি করে পুড়িয়ে ফেলে গগন। আকাশের শুকতারা দেখে ছাই হয়ে যাচ্ছে সত্য। বাবাগাছ-কাকাগাছ-পিসিগাছেরা নতুন শিশু গাছটিকে সঙ্গী করে জমিয়ে রাখে এইসব চুপকথা।

মধুসূদনের পরে আর কেউ মহাকাব্য লিখতে পারে নি, জহুর স্যার তাঁর ক্লাসে বলেছিলেন। এমন কি ঠাকুরবাড়ির ছেলেটিও নয়। এর পেছনের কারণটি অবশ্য পোক্ত ছিলো না। ৪৭ এ সূর্যকান্ত মাস্টার ভিটে ছেড়েছিলেন। মেঘনাদবধ কাব্যটি সুর্যকান্ত বাবুর সূত্রে পাওয়া। মাইকেলকে তাঁর পিতামাতা ত্যাগ করেছিল। তবে মাইকেল তাঁর স্বদেশকে বুকে নিয়ে ঘুরেছেন। জহুর স্যারের পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের নবাবের বংশধর। লর্ড ক্লাইভ তাঁদের তাড়িয়েছেন। ভুমিচ্যুত হলেই কি জন্মের দাগ মোছা যায়? (মেঘনাদ বধ)

শেষ গল্পটি নিউইয়র্কে। খানিকটা দলছুট প্লটের বিচারে। যদিও এতেও আছে দেশত্যাগ। এবারের ছাতা ধর্মগুরুর হাতে। তিনিই ঈশ্বরের সোল-এজেন্ট। অগতির গতি। পশ্চিমে যারা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কোকাকোলার মতো ব্র্যান্ড পর্যায়ে কর্ম-কোলার বাণিজ্য করেন তাঁদেরই প্রতিনিধি যেন তিনি। জ্যোতি দিদি আছেন আমেরিকাতে, আবার নেই-ও। কারণ তিনি এসেছেন কিন্তু তাঁর থাকাটি নিবন্ধিত হয় নি।জ্যোতি দিদি দেশ ছেড়েছেন ৯২ এ। কেন? নানা নথি দেখে জানা যায়, পাশের দেশে সেই সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা প্রাচীন একটি মসজিদ ভেঙে দেওয়ায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হামলায় শাঁখারিপট্টিতে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় জ্যোতি দিদির বাড়িটি পুড়ে যায়। তাঁর মেয়েটির মৃত্যু হয়। তিনি মানসিক স্থিতি হারিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। গুরু সেই সময়ে ঢাকায় ভ্রমণ করছিলেন। ম্যারাথন পিসের কর্মসূচি উপলক্ষে তাঁর সফর। কিন্তু সেটি আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বাতিল হলে তিনি ঢাকা ক্লাবে শান্তির জন্য মেডিটেশন পরিচালনা করে পরে পিজিতে হাসপাতালে যান। এবং সেখানেই জ্যোতি রানীর দেখা পান। গুরুর কৃপাতেই জ্যোতি দিদির যেমন নিউইয়র্কে আসা। তেমনি গুরুর অকৃপাতেই তাকে আমেরিকাও ছাড়তে হয়। সেও ঘটনা বটে। (জ্যোতিদিদির বিড়াল)

যে গল্পের আনন্দ কিংবা বিষণ্ণতা আমাকে স্পর্শ করতে পারে এবং পাঠ শেষে আমার ভাবনার দরজায় ধাক্কা না-হোক অন্তত জানালায় টোকা পড়ে সেই গল্পই আমার বিচারে ভালো গল্প। ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জল’ আমার কাছে ভালো বই। বইয়ের দুই মলাটে বাঁধাই করা মানব-জীবনের নানা গলি ঘুরে জেনেছি সব জল ধোয়া যায় না। এবং কোনো কোনো জলের দাগ জীবনের জলছাপ হয়ে রয়েই যায়।

--রঞ্জনা ব্যানার্জী


বৃষ্টিচিহ্নিত জল
গল্প সঙ্কলন
প্রকাশক : নালন্দা 
ঢাকা, বাংলাদেশ।
২০২৩ বইমেলার প্যাভিলিয়ন # ৫।

সোপান প্রকাশনী, 
কলকাতা বইমেলার স্টল নং  স্টল ৩১৪।
-----------------------------------------------------------------------

কুলদা রায় জাদুকরী শব্দে গল্প বলেন। যে গল্পটি তিনি পাঠককে শোনাতে বা বলতে চান, সেটির জন্য রয়েছে তাঁর নিজস্ব এক ধরন। এক মায়াময় গদ্য শৈলীর মাধ্যমে তিনি নির্মোহ এক ন্যারেটরের মতো গল্প বয়ান করেন। গল্পের ভাষায় আরোপিত কোনো চটকের বালাই থাকে না। সহজিয়া ভাষায় তিনি তাঁর গল্প পাঠককে বলেন বা বলতে চান। এটি কুলদা রায়ের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য। তাঁর এই ভাষা বৈশিষ্ট্যের সাথে সঙ্গত করে যায় লেখকের ঋদ্ধ অভিজ্ঞতা। কুলদা রায়ের পাঠক মাত্রই জানেন, সম্পূর্ণ গল্প কাঠামো বা ন্যারেটিভে পরিব্যাপ্ত অভিজ্ঞতা কী দারুণ দক্ষতায় তিনি মিশিয়ে দিতে পারঙ্গম। আর এমন অভিজ্ঞতা মুঠোবন্দী বলেই তাঁর গল্পগুলো চলতে চলতে হোঁচট খায় না। বরং তাঁর এক একটি রচনা অনন্য এক ঘরোনার বৈশিষ্ট্যে স্বাতন্ত্র্য হয়ে ওঠে। তিনি জানেন গল্পে আকর্ষণ তৈরিতে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থাকা জরুরি।

জরুরি এই ব্যাপারটা কুলদা’র মধ্যে আসনপিঁড়ি হয়ে আছে। তিনি গল্প বুনবার সময় তার ছাপ ধরে ধরে এগিয়ে যান। বুঝতে কষ্ট হয় না হারুকি মুরাকামির সাথে এই জায়গাতে কুলদা রায়ের চমৎকার একটা মিল রয়েছে। মুরাকামি তাঁর গল্প সম্পর্কে একবার বলেছিলেন – “আমার ছোটগল্পরা অনেকটা এই দুনিয়ায় আমি যে আবছা-নরম ছায়াদের বিছিয়ে চলেছি তাদের মতো, ফেলে আসা প্রায় অদৃশ্য পদচিহ্ন সব। আমার পরিষ্কার মনে আছে তাদের প্রত্যেককে কাকে কোথায় ফেলে এসেছি, আর কেমন লেগেছিল সেই ফেলে আসার সময়। ছোটগল্পরা অনেকটা আমার হৃদয়ে পৌঁছনোর পথে পথনির্দেশ ফলকের মতো।”

কুলদা রায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাথে ইতিহাস, ঐতিহ্য, গ্রামবাংলার প্রকৃতি নিবিড় একাত্মতায় সঙ্গত করে যায়। সঙ্গতে সঙ্গ দেয় তাঁর সিগনেচার কুহকময়তার চমৎকারীত্ব। সম্মিলিত সেই তুখোড় অর্কেস্ট্রায় সৃষ্টি হয় মুক্তার মতো দ্যুতিময় ফসল। দ্যুতি ছড়ানো লেখাগুলোর পেছনে রয়েছে লেখকের গভীর যত্নের আয়োজন। যার আভাস পাওয়া যায় লেখকের বয়ানে- “এ বছরে আমি তিনটি গল্প লিখেছি। তার মধ্যে দুটো প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটি প্রকাশ করিনি। কিছুদিন শুধু নিজে নিজে পড়ছি। পড়ে পড়ে তার কণ্ঠস্বরকে ঠিকঠাক করছি। সঙ্গে সঙ্গে আরো তিনটি গল্প লিখছি বেশ কয়েক মাস ধরে। কোনো গল্পলেখার শুরুতেই আমি প্লটিং করে নাম ঠিক করে নেই। তারপর সিকুয়েন্স ধরে ধরে ধীরে ধীরে লিখি। আর পড়ি। আবার পড়ি।”

এমন নিবিড় পরিচর্যায় গড়ে ওঠা গল্প নিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলা ২০২২ কুলদা রায়ের গল্পগ্রন্থ যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন নালন্দা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। শিরোনামে লেখকের স্বকীয় স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। উল্লেখ্য, একই শিরোনামে বইটি এ বছর পশ্চিমবঙ্গের গুরুচণ্ডালী প্রকাশনী থেকেও প্রকাশিত হয়েছে।

যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন বইটিতে মোট আটটি গল্প রয়েছে। শিরোনাম, আখ্যান, বয়ান ইত্যাদি শৈলী উপস্হাপনে রয়েছে লেখকের নিজস্ব জাদুকরী কৌশল আর অভিনবত্ব। এ বইয়ের এক গল্পের সাথে অন্য গল্পের সূক্ষ্ণ সাযুস্য লক্ষণীয়, একমাত্র ব্যতিক্রম আমেরিকান পটভূমিতে রচিত গল্প ‘লাদেনের জুতা’। বলাই বাহুল্য প্রতিটি গল্পের প্লটভাবনায় রয়েছে দারুণ বৈচিত্র্য।

‘দুটি হলুদ ইলিশের গল্প’ বইয়ের সূচনা গল্প। এটি আমার সবচেয়ে পছন্দের। শিরোনাম দেখে বহু পাঠকের মনে প্রশ্ন উঁকি দেওয়া স্বাভাবিক – ইলিশ তো রূপালি রঙের হয়- কুলদা রায়ের ইলিশ হলুদ বর্ণের কেন? নামকরণেই পাওয়া যাচ্ছে অন্য রকম এক ইলিশ আর তার সাথে ঘন হয়ে থাকা গল্পের আভাস। লেখক এ প্রসঙ্গে যা বলেছেন শুনি বরং-”হলুদ ইলিশ গল্পটি লেখার শুরুতেই নামটি দিয়েছিলাম। ইলিশ রুপোলী রঙের। হলুদ হয় না। কিন্তু আমার গল্পের ইলিশ দুটি হলুদ। মালতিপিসি হলুদ মাখিয়ে পাঠায়। সে ইলিশ হলুদ না হয় কী প্রকারে।”

কে এই মালতিপিসি? ইনি ঠাকুরদার পিসি, যিনি পাখিদের সাথে উড়ে কোথাও চলে গেছেন। মায়াজাল বিছিয়ে সেই পিসির গল্প করেন ঠাকুরদা। মালতিপিসির গল্প বলতে বলতে প্রায় তিনি নিজেদের পাতের দৈনতাকে দূরে ঠেলে দিয়ে পাশে বসা নাতিদের চোখে স্বপ্ন গুঁজে দেন। তারা আশায় থাকে একদিন ঠাকুরদার কথামতো তাদের দারিদ্র্যপীড়িত এই বাড়িতে অতিথি আসবে, তার জন্য ‘দীঘা ধানের ভাতের সঙ্গে ইলিশের পাতুরি হবে।’ আর সে জন্য তিনি রোজ বৌমাকে একমুঠো চাল কলসিতে তুলে রাখতে বলেন। অতিথি এলে যেন সমস্যায় পড়তে না হয়। সেই সুখাদ্যের ভাগ দিতে দরকার হলে আরো এক দুজন প্রতিবেশীকেও ডেকে নেওয়া যাবে। অভাবক্রান্ত সংসারের লক্ষ্ণীমন্ত বৌটি শ্বশুরকে প্রায় জানায় চাল সে তুলে রেখেছিল ঠিকই কিন্তু গতরাতে রেঁধে ফেলেছে। পরে আবার সে চাল তুলে রাখবে, এমন অলীক সান্ত্বনায় তাঁকে স্বস্তিতে রাখে। নাতিরা অপেক্ষা করে অতিথির। কিন্তু কেউ আসে না। অধৈর্য্য নাতিদের ঠাকুরদা প্রবোধ দেন, মালতিপিসি ঠিকই একদিন অতিথি পাঠাবেন। আশাই তো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে। কূলহীন দারিদ্র্যের ভেতর আকণ্ঠ ডুব দিয়ে ঠাকুরদার আশ্বাসে গুটি কয়েক শিশু আশায় বাঁচে। মা তাদের বাস্তবতায় টেনে আনতে চাইলেও সহসাই স্বপ্নের পলেস্তরা সরিয়ে তারা বাস্তবের মাটিতে না নেমে ঠাকুরদার সঁপে দেওয়া স্বপ্নে মন ডুবিয়েই বুঝি স্বস্তি পায়।

দুটি হলুদ ইলিশের গল্পে দারিদ্রকে হিরন্ময় চেহারায় উপস্হাপনের যে শিল্পীত রূপ, মানবিকতাকে তুলে ধরার যে একনিষ্ঠ আন্তরিকতা তা পাঠককের বুকে সুখের মতো ব্যথা হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। গল্পটি পড়তে পড়তে, ডাগর চোখের বাবরি দোলানো দুখুকবি ‘দারিদ্র্য তুমি মোরে করেছো মহান’ বলে বুঝি সামনে এসে দাঁড়িয়ে যান হুটহাট। মহত্ত্বের কথা বলা হয়ত সহজ কিন্তু তার আয়োজনে যে নিষ্ঠা প্রয়োজন সেটা আমরা দেখতে পাই এই গল্পের ঠাকুরদার ভেতর। নিজেদের পাতে খাদ্য উঠবে কী উঠবে না তার হদিশ না থাকলেও বাড়িতে আগত অতিথি যেন অভুক্ত ফিরে না যান, সেটা নিয়ে ঠাকুরদার তোড়জোড়ের ঘটাটি পাঠকের আত্মা স্পর্শ করে। বুঝতে কষ্ট হয় না একদা তাঁর অবস্হাপন্ন সময়ে তিনি ওরকম আচরণে অভ্যস্ত ছিলেন। একই সাথে পর্বটি চিরন্তন গ্রাম বাংলার অতিথিপরায়ণতার সাক্ষ্য হিসেবে উপস্হিত হয়। আজকের চাকচিক্যময় ইট কাঠের শহুরে মানুষকে কিছুটা হলেও যা বিব্রত করবে হয়ত। কিন্তু বিব্রত করতে নয়- সহজিয়া গল্পগুলো সহজ ভাষায় বলতে ভালোবাসেন কুলদা। দারিদ্র্য এই পরিবারটির নিত্যসঙ্গী। কিন্তু পরিবারের মানুষগুলোর মানবিকবোধের শক্তি দারিদ্র্যকে ছাপিয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। একই সুরের প্রতিধ্বনি শুনেছিলাম পঠিত প্রিয় একটি নভেলায়। কাহিনিটির কথা মনে পড়ে যায়।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের কর্নেলকে কেউ লেখে না। এই পাঠকের মনে হয়- সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিক এবং প্রেক্ষাপটের দুটি রচনা- অথচ রচনার আত্মা বলে যদি কিছু থেকে থাকে সেই জায়গাতে এই দুটির মধ্যে একটা যোগ রয়েছে। সেটি কী? দুই গল্পের পরিবার দুটি অভাবের সাথে যুঝতে থাকা সত্ত্বেও আশাবাদ নিয়ে জেগে থাকে, দারিদ্র্যের থাবায় তারা কেউ তাদের মানবিক শুভ্রতা হারিয়ে নিজেদের আত্মাকে মলিন হতে দেননি। কর্নেল আশায় থাকেন পেনশনের চিঠিটা এসে পৌঁছালেই তাদের যাবতীয় ভোগান্তির ইতি ঘটবে। তিনি স্বপ্ন দেখেন, মৃত ছেলে অগাস্টিন, যাকে তৎকালীন ল্যাটিন আমেরিকায় চলমান রাজনৈতিক অত্যাচারের অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়, তার পেলেপুষে বড় করা মোরগটি লড়াইয়ে নিশ্চিতভাবে জিতে যাবে। ব্যবহার্য জিনিসপত্র বিক্রির মতো দুর্দশায় পৌঁছেও মলিনতায় লীন হতে দেন না নিজের রুচিবোধ। অন্যদিকে ‘দুটি হলুদ ইলিশ গল্পে ঠাকুরদা আশায় থাকেন তার বাড়িতে অতিথি আসবে, নিজের আশা তিনি নাতিদের ভেতর সঞ্চারিত করে দেন। অবস্হাপন্ন এক বাড়িতে আগত অতিথির সাথে ইলিশ খাওয়ার ডাক পেয়েও নাকচ করে দেন, তার রুচিবোধ বাধা দেয়। অতিথি আপ্যায়নের পুরনো রীতিতে অভ্যস্ত মানুষটি দারিদ্র্যে জর্জর থাকা সত্ত্বেও ছেলের বৌকে বলতে ভোলেন না অতিথি আপ্যানের জন্য সে যেন চাল তুলে রাখে। আশায় থাকেন মালতিপিসির সহৃদয়তার। যিনি পাখিদের সাথে উড়ে দূরদিগন্তে মিলিয়ে গেছেন ভেবে নেওয়া হলেও আদতে ডাকাতেরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। বেঁচে আছেন কী মৃত্যু হয়েছে হদিশ নেই তার; সেই মালতিপিসি হলুদমেখে দুটো ইলিশ পাঠাবেন। তিনি তার তোরঙ্গে তুলে রাখা বাদশাহী পাঞ্চাবী আর ধুতি পরে অতিথি সৎকার করবেন। হামুখো অভাব দাঁড়িয়ে দুই গল্পের দুই পরিবারের আঙ্গিনায়, কিন্তু তা ঘিরে আহাজারির মাতম নেই। কল্যাণময় এক আশাবাদ মুঠোয় ভরে থাকে কেবল অপেক্ষা।

দারিদ্র্য মানেই শতেক অভিযোগে বাতাস ভারী করার আহাজারি, আত্মার শুভ্রতার জলাঞ্জলি এমন বাস্তবতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে এই দুই কাহিনির কল্যাণময় নির্মাণে মুগ্ধ পাঠকমন কুর্নিশ জানাতে নত হয়।

দ্বিতীয় গল্প ‘কাকচরিত’। কথকের মা, কাককে কেন কাউয়া বলেন কাক নয়, সে নিয়ে রসাত্মক বর্ণনার সূচনা দিয়ে গল্পের শুরু। মা কাউয়া বললেও, আজা মশাই(কথকের নানাজান) কাককে বায়সপক্ষী বলে সম্বোধন করেন। তিনি বিশ্বাস করেন এই পক্ষী ত্রিকালজ্ঞ- ঋষিপক্ষী। অতীত-ভবিষ্যৎ বর্তমান সব বলতে পারে। এই গল্পের বালবিধবা সরলাবালা বিধবা অবস্হাপন্ন- অসুস্হ বোনের আশ্রয়ে থাকেন, তিনি মোটেও কাক সহ্য করতে পারেন না। অথচ বাড়ির নতুন বউটি যে কাক সম্বোধন না করে কাউয়া ডাকে, খুব আন্তরিকতায় সে কাক বা কাউকাকে অর্ঘ্য দেয় যা দেখে ছোট ননদিনী তাকে সাবধান করে। অর্ঘ্য দেবার পরদিন জাদুমন্ত্রে সক্কাল সক্কাল বকুলগাছে একটি কাককে বসে থাকতে দেখা যায়– যে রা কাড়ে না। বাড়িতে কেন কাকটির আর্বিভাব ঘটলো সেটি রহস্যাবৃত। রহস্যময় পাখিটি শান্ত হয়ে চুপচাপ বসে থাকে। কাকটি দেখতে অদ্ভুত– পুরোপুরি কালো নয়- গলার কাছটিতে সাদা ছোপ। রোদ পড়লে রং বেগুনি দেখায়। আজা মশাই বর্ণ রহস্য ভেদের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। চলে যান স্হানীয় পাবলিক লাইব্রেরির ময়েনউদ্দিন স্যারের কাছে যিনি কাক বিষয়ে সাহায্য করতে ব্রিটানিকা খুলে দেখান বেগুনি রঙের কাক ইন্দোনেশিয়ার ব্রুনেই বাস করে। তারা বলে- ভায়োলেট করভাসা। ভায়োলেট কারভাসাই হোক কিংবা নিছক মামুলি কাক, সে কিন্তু তাকে ঘিরে চলতে থাকা কর্মকাণ্ডেও আগাগোড়া নৈঃশব্দ্যে মগ্ন থাকে। কাকটি নিঃশব্দে থাকে বলে সরলাবালা টের পাননা। এই কাক বা বায়সপক্ষী ঘিরে চলে কাহিনির উত্থান পতন। ময়েনউদ্দিন স্যারের দ্বারস্হ হয়ে আজা মশাই বায়সপক্ষীর নানাবিধ ডাকের তরজমা অনুধাবনে সক্ষম হন। কাক যদি ক্রেন ক্রেন স্বরে ডাক ছাড়ে তবে বুঝে নিতে হবে কোনো সুন্দরী রমণীর সঙ্গে সম্পর্কের সমূহ সম্ভাবনা। আজা মশাই ক্রেন ক্রেন ডাক শোনার আশায় থাকেন। ঘটা করে সে কথা স্ত্রী অর্থাৎ আজুমা(নানিজান)কেও জানান। কাক ক্রো ক্রো সুরে ডাকলে শুভলাভ আসন্ন। ইত্যাদি ডাকের সুলুকসন্ধানের পাশাপাশি বকুলগাছের কাকটিকে ঘিরে চলে মানুষেরা নানাবিধ কর্মকাণ্ড।

রা কাড়তে না জানলেও কাকটির কেরামতিতে কয়েকদিনের ভেতর কতসব তেলেসমাতি ঘটে যায়। লোকসমাগম হতে থাকে। কাকচরিতের খোলসে চলে মনুষ্যচরিতের বয়ান। সে বয়ান বড় সুরেলা। সরলাবালা যিনি অসুস্হ বোনের বাড়ির দেখাশোনার দায়িত্ব নিয়ে এতদিন সর্বময় কর্ত্রী হয়ে ছিলেন তার আসন টলে যায় ভাগ্নে বিশুর তার প্রতি বিরাগ হওয়ায়- কারণ বিশু কাক ঘিরে লোকজনের মানত পুজো দেবার ঘটাকে ক্যাশ করে ব্যবসা ফেঁদে বসার মতলব এঁটেছিল– যা পক্ষীটি উড়ে যাওয়ায় ভেস্তে যায়। তার সন্দেহ সরলাবালা যেহেতু কাক পছন্দ করেননা তিনিই পাখিটি উড়িয়ে দিয়েছেন। তার সাফ জবাব পাখিটিকে ফিরিয়ে আনতে না পারলে তার এই বাড়ির পাট চিরদিনের জন্যেই ঘুচে যাবে। নিয়তির কী পরিহাস, যে সরলাবালা কাক সহ্যই করতে পারেন না মাথার উপর থেকে ছাদ হারানোর ভয় তাকে পাখিটির খোঁজে নামতে বাধ্য করে। অসহায় সরলাবালা বায়সপক্ষীর খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। শেষমেশ কী সরলাবালা পাখির সন্ধান পেতে সক্ষম হন? সাত সকালে বাড়ির লক্ষ্ণী বৌটিই বা কেন ‘কাউয়া’ শূন্য বকুল গাছে চড়ে? আর তার নেমে আসবার পর ননদিনী(কথকের পিসি) বকুলগাছ থেকে কোন জাদুমন্ত্রে দিব্যি শুনতে পান বায়সপক্ষী ডাকছে- ক্রো ক্রো স্বরে! লেখক তাঁর জাদুবিস্তারী বর্ণনায় কাকচরিত গল্পে কাক নয় কোলাহল সর্বস্ব মানব চরিত্রের নানাদিকের নিদারুণ উন্মোচন ঘটিয়েছেন।

‘যে গ্রামের সবাই ধর্ষিত হয়েছিল’- গল্পটি আমাদের স্তব্ধ করে দেয়। মনে করিয়ে দেয় সভ্যতা, ক্ষমতার দাপট আর উন্নয়নের নামে আমাদের যাবতীয় চেঁচামেচি কতটা ফাঁপা, অন্তসারশূন্য। এ গল্পের প্রেক্ষাপট ২০১৬ ফেসবুকের একটি ফটোশপকৃত ছবি কেন্দ্র করে নাসিরনগরে সংঘটিত নজিরবিহীন নৃশংস ঘটনা। যার পেছনে কলকাঠি নাড়ায় জনৈক রাজাকার পুত্র। যে ঘটনার জেরে পুড়েছিল নিরীহ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি, মন্দির। ধর্ষিত হয়েছেন বহু নারী এমনকি নাবালিকাও। কুলদা রায় তার সিগনেচার জাদুময়তা আর বাস্তবতার মিশেলে সেই গল্প শুনিয়েছেন আমাদের। যেখানে মনোপজ হওয়া সিভিলসার্জনের স্ত্রী মঞ্জেআরা বেগম পর্যন্ত তাণ্ডবের শিকার গ্রামটির রজঃস্বলা না হওয়া কিশোরীদের সাথে গর্ভবতী হন। টেস্ট রেজাল্ট তেমনটাই জানান দেয়। সত্যিকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্যি করা যখন ক্ষমতার লক্ষ্য হয়ে পড়ে তখন ত্রাসের রাজত্ব শুরু হতে বাধ্য। কিন্তু সেসব নিয়ে ট্যাঁ-ফোঁ করার উপায় নেই। বাস্তবের এমন ঘটনাগুলো চেপে রাখাই দস্তুর। বলতে গেলেই চোখ রাঙানি। ক্ষমতাধরের কেটে দেওয়া লক্ষণরেখার ভেতর থেকে সব কথা সপাটে বলা যায় না। কিন্তু কালের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই লেখক সাহিত্যিক তথা শিল্পসংস্কৃতির সাথে জড়িত মানুষই সমাজে চলমান নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে যার যার বৃত্তে দাঁড়িয়ে প্রথম আওয়াজ তোলেন- যে না অন্যায় হচ্ছে, আমরা আঁকা ছবি দিয়ে, লেখনী দিয়ে, সংলাপ দিয়ে তার প্রতিবাদ জানাচ্ছি। ‘যে গ্রামে সবাই ধর্ষিত হয়েছিল’ কুলদা রায়ের সপাট প্রতিবাদের এক অনন্য আখ্যান।

‘যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন’ গল্পটি এক চলমান চলচ্চিত্র যেন। যার চলন ভারি অন্যরকম। গতানুগতিক গল্পের সাথে এ গল্পের বিস্তর ফারাক। কী প্লট নির্মাণ বা আখ্যানে। কুলদা রায়ের অধিকাংশ গল্পই প্রচলিত গল্পকাঠামোকে ভেঙেচুরে এগিয়ে যায়। এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এতে শুধু গল্পকাঠামো নয় স্হান-কালের সীমা ভেঙে গল্প এগিয়েছে। যেমনটা তাঁর ‘মার্কেজের পুতুল’ গল্পে ঘটতে দেখা গেছে। নানা সংশয় আর ঘটনার হাত ধরে প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে অবলীলায় গল্পের আসা যাওয়া ঘটেছে। ইতিহাসের নানা ঘটনা আলতো পায়ে হেঁটে গেছে গল্প জুড়ে, কিন্তু কোথাও এতটুকু ছন্দপতন ঘটেনি। গল্পের কেন্দ্রে থাকা রমারাণী কিংবা সুচিত্রা সেন নামটিকে ঘিরেই ঘটেছে যাবতীয় আবর্তন। যার উদ্দেশ্যে একদা স্কুল পড়ুয়া বালকের হৃদয় গচ্ছিত রাখার আকুতি ঝরে পড়েছিল-
“রমা মেরা রমা
হৃদয় দিয়েছি জমা।”

শেষধাপে একটি বিয়ের ঘটনা এবং একজনের অনন্তযাত্রার দৃশ্য দৃশ্যায়িত হয়- ব্যাকড্রপে বেজে যায় অব্যক্ত কয়েকটি লাইন।

‘রমা আমার রমা
তুমি করিও মোরে ক্ষমা।
অনেক অশ্রু রইল পড়ে জমা।’

এক না হয়ে ওঠা প্রেমের মর্মস্পর্শী অনুরণন ছড়িয়ে দিয়ে কী অসাধারণ মুন্সিয়ানায় কুলদা রায় ‘যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন’ গল্পের ইতি টেনেছেন। গল্পের নানা বাঁকের ভুলভুলয়াইতে পড়ে অমনোযোগী পাঠক খাবি খাবেন হয়ত। কিন্তু মনোযোগী পাঠকমাত্রই পাবেন সুখপাঠ্যের অমূল্য রত্ন। শিরোনামের এ গল্পটি একটি অসাধারণ প্রেমের গল্প হিসেবে পাঠক মনে রাখবেন।

‘লাদেনের জুতা’ গল্পের প্লটের জন্য লেখককে প্রথমেই সাধুবাদ জানাতে হয়। এমন একটি ইউনিক গল্পভাবনা তাঁর মাথায় কীভাবে এলো সেটা ভেবে অবাক লাগে। পাকিস্তানি শফি যে কিনা জীবিকার টানে আমেরিকায় এসেছিল। কর্মসূত্রে কথকের পরিচিত। আরেক চরিত্র আকন ভাই তিনিও একই অফিসে কাজ করেন। আকন ভাই পাকিস্তানি লোকজন একেবারেই পছন্দ করেন না। নাইন ইলেভেনের ঘটনার সময় সেই তিনিই শফির প্রাণ রক্ষায় এগিয়ে আসেন। ‘লাদেন’ আমেরিকারই তৈরি ফন্দিফিকিরের এক নাম বলে ভাবেন তিনি। শফি হিন্দি সিনেমার ভীষণ ভক্ত। কারিনা কাপূরকে তার ভীষণ পছন্দ। আটপৌরে ছেলে শফি কল্পনা করে সে কারিনার মতো কাউকে বিয়ে করবে। কল্পনায় নানাকিছু ভেবে নেবার বাতিকগ্রস্ত শফি। এক সময় সে বিয়ে করে। বন্ধুদের জানায় তার বউ দেখতে কারিনার মতো। ঠিক হয় পাকিস্তান থেকে বউ এলে বন্ধুদের দাওয়াত করবে। এক সময় শফির স্ত্রী তার চাচা সমেত আমেরিকায় চলেও আসে। বন্ধুরা দাওয়াতের আশায় থাকে। শফি তার নতুন সংসার গোছগাছের পাশাপাশি স্ত্রী কে কারিনার মতো বানানোর প্রকল্প হাতে নেয়। তারই মধ্যে ঘটে যায় এক অবিশ্বাস্য ঘটনা। যে ঘটনার হোতা আর কেউ নয় শফি। ধর্মান্ধতা এমনই এক ধাঁধা যা দুটো বাঁধাকপিকেও শক্তিশালী বিস্ফোরক ভাবতে সাহায্য করে। আর বাকিতগ্রস্ত হলে তো কথাই নেই। এ গল্প পড়া শেষে পাঠক হয়ত ভাবতে বসবেন– লাদেনের জুতা তো সীমান্ত পেরিয়ে শফির চাচা শ্বশুরের সাথে চলে গেছে গন্তব্যে– সে আবার কবে কোন অঘটন ঘটায় কে জানে!

‘অন্ধ শওকত আলী ও তার মেয়ের গল্প’, এ গল্পটিও অভিনব প্লট আর বর্ণনায় সমৃদ্ধ। কুলদার প্রায় সব গল্পেই থাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞার ছোঁয়া- এটিও তার ব্যতিক্রম নয়। এ গল্প বাবা আর মেয়ের চিরায়ত ভালোবাসার গল্প। গল্পের মেয়েটির সৌন্দর্য শহরময় চর্চার বিষয়। তাকে নিয়ে লোকের নানা কথা বাতাসে ভেসে বেড়ায়। বাবা শওকত আলী জানতে পারেন মেয়েটি তার বাড়িতে না থাকার সুযোগ নিয়ে প্রেম করছে। মেয়ের প্রেমিকটি কে সেটি অজানা। শওকত আলী মেয়ের অজানা প্রেমিককে নিজস্ব বুদ্ধি প্রয়োগ করে হত্যার আয়োজন করেন। ঘটনার পর অনুশোচনায় দগ্ধ হতে থাকেন তিনি। মেয়েটিকে নিয়ে বাতাসে উড়তে থাকা গালগল্প ‘হতে পারে আবার নাও পারের বিভ্রান্তিতে বাবাটির মতো পাঠকও পড়ে যান। কুলদা রায় তাঁর নিজস্ব ভঙ্গির যাবতীয় জাদু প্রয়োগ করে গল্পটিকে নানা অলিগলি ঘুরিয়ে চমৎকার সমাপ্তি টেনেছেন।

‘ক্রসফায়ারের পর যা যা ঘটেছিল’ গল্পটি এক সভ্য সমাজে চলমান অসভ্য আচরণের দলিল। যে গল্প পাঠে পাঠক অক্ষম এক ক্রোধে আক্রান্ত হবেন। গল্পটি এক সময় আর গল্পে আটকে থাকে না- আমাদের অনেকের অভিজ্ঞতার জীবন্ত স্বাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। মন্নান মণ্ডল, মর্জিনা, ফেলা মোল্লা, রহিম শেখ প্রমুখ আতঙ্কিত গ্রামবাসী আমাদের প্রতিনিধি হয়ে বুঝি নলবনে আবিষ্কার করে ভাসমান কারো পা। অবশ্য নিরীহ গ্রামবাসী মন্নান মণ্ডল বা তার স্ত্রী মর্জিনার প্রতিনিয়ত পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত ক্রসফায়ারে দোষী নির্দোষ নির্বিশেষে লাশ হয়ে এদিক-সেদিক ভেসে যাওয়ার খবরাখবর পাঠের অভিজ্ঞতা নেই। আর সেটা নেই বলেই প্রাথমিক পর্যায়ে তারা ভাসমান পায়ের অংশটি দেখে “ঠিক মানুষের পা নাও হতে পারে’র দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। যা এক পর্যায়ে পুলিশের উপস্হিতিতে মৃত মানুষ, আর সেটি ক্রসফায়ারেই মৃত এমন একটা ধারণা গ্রামবাসীর ভেতর চাউর হয়ে পড়ে। ঘটনাটি থানা পুলিশ ছাড়িয়ে এলিট ফোর্স পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। মৃতদেহটি ঘিরে কল্পনা-জল্পনার পাখাপ্রাপ্তি ঘটে। মৃত হিসেবে সম্ভাব্য অনেকের নাম উঠে আসে।

শেষমেশ দেখা যায় আদৌও ওটা কোনো মৃত দেহই নয়- তিন গ্রাম দূরের নয়াগ্রামে পুতুল নাচের দল এসেছিল- তাদেরই একটি পুতুল নলবনে ভেসে এসেছে। কী করে সেটি সম্ভব হলো সেই যৌক্তিক প্রশ্ন তখন খুব জরুরি নয়। জরুরি বিষয়টা হলো এলিট ফোর্সের কাছে ক্রসফায়ারের ভুয়া খবর দিয়ে পুলিশ বাহিনির মুখ ছোট হয়েছে। তৈরি রিপোর্ট তাদের বদলাতে হবে। এলিট ফোর্স এক তুড়িতে সমস্যার সমাধান দিয়ে যে ঘটনা আদৌও ঘটেনি সেটাই ঘটবার পথ তৈরি করে দেয়। ওখান থেকে গল্প আবার চলতে শুরু করে– যা শব্দ-বাক্যে কুলদা লিখেননি বটে কিন্তু পাঠকের বুঝে নিতে সমস্যা হয়না। গল্পটি পড়ে আমরা আতঙ্কগ্রস্ত হই। কারণ এটি সত্যিই ভয়ের গল্প। স্বয়ং লেখক এটিকে ভয়ের গল্প হিসেবে অকপটে স্বীকার করেছেন–

“এই গল্পগুলো ভয়েরই গল্প। আতঙ্কের গল্প। কবরের স্তব্ধতার মতো এই রকম আতঙ্কের মধ্যেই ডুবে আছে সবাই। এটাই বাস্তবতা। ক্ষমতা এই বাস্তবতার ঘটনাগুলো মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চায়। একজন লেখকের কাজ হলো মুছে ফেলার আগেই লিখে ফেলা। মানুষের স্মৃতির মধ্যে এ ঘটনাগুলোকে ফিরিয়ে আনা। এটাই হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধে এ সময়ের মানুষের লড়াই।”

গ্রামে একজনের অযাচিত মৃত্যু এবং পাশাপাশি মেরী নামের মেয়েটির দুই বছর পর গ্রামে ফেরার কাহিনি নিয়ে বইয়ের শেষ গল্প ‘গুলাবগুলি’। খুব প্রাণবন্ত ভাবে গল্পের সূচনা। পাঠক জানতে পারেন মেরী গ্রামে একা ফিরেনি, স্বামী রূপকুমার তার সঙ্গে এসেছে। এতদিন সে নরসিংদীতে পিসির কাছে ছিল। সে থাকা মোটেও স্বস্তিময় ছিল না। যেকারণে তার গ্রামে ফেরাটা বাবা যাদব হালদারের জন্য খুব আবেগের। গ্রামীণ আচার আচরণের মধ্য দিয়ে বর-কনেকে বরণ করার রীতি চলে অনেকটা অংশ জুড়ে। গল্পময় তাহাদের উৎসবে জেগে ওঠে পাড়া’র আমেজে পাঠকও সিক্ত হতে থাকেন। গ্রামীণ হিন্দু পরিবারের অচেনা অনেক আচার রীতির সাথে পরিচয় ঘটে। এই বরণকে কেন্দ্র করে আচার অনুষ্ঠানের সাথে পাল্লা দিয়ে চলে পালাগান, মুখে মুখে তৈরি পদ বা ছড়ার বয়ান। ভারী আনন্দ, আনন্দ একটা পরিবেশের মধ্যেও মেরী কেন তার স্বামীকে “গুলাব বাগানে যাবা না” বলে সাবধান করে দেয় সেটি ভেবে সামান্য হলেও পাঠকের ভ্রুতে ভাঁজ পড়ে। গুলাবগুলি এক ধরনের গুটি বা ফল যেটি ভেঙে তেল বের করা হয়। সেই তেলে গ্রামের মানুষ প্রদীপ বা পিদিম জ্বালিয়ে থাকেন। আলো বিলাতে কাজে লাগে এমন একটি বাগানে কোন গূঢ় অন্ধকার থাকার সম্ভাবনা যা নিয়ে গ্রামের কৃতি কন্যাটি ব্যতিব্যস্ত থাকে!

গল্পের সুতো যত গড়াতে থাকে ধোয়াশা কেটে কাহিনি স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়। ওই গ্রামের হিন্দু-মুসলমান আগে কতটা সুন্দর দিন কাটাতো সেই বাস্তবতা মেরী আর তার বরকে বরণের ছুতোয় সামনে আসে। একদা হঠাৎ একটি মৃত্যুর ঘটনায় যার ছন্দপতন ঘটে যায়। মেরীর জীবন থেকে দুই বছর হারিয়ে যায়। নিজগ্রামের আলোছায়া- বাবা, জ্যাঠা, জ্যাঠির স্নেহ জ্যাঠাতো বোন সোনার বেড়ে ওঠা, অনেক কিছু থেকে তাকে বঞ্চিত হতে হয়। যার পেছনে ছিল গ্রামের দুই দুষ্টকীট ছক্কু ও রঞ্জিতের কারসাজি। এমন কারসাজিগুলো বার বার অভিশাপ হয়ে সম্প্রীতিতে ভাঙন ধরিয়েছে উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রগুলোতে, ইতিহাস তার সাক্ষী। কী এমন ঘটেছিল যার জন্য গুলাবগুলির বাগান মেরীর মনে আতঙ্ক ছড়ায়? কার মৃত্যু ঘটেছিল- কীভাবে? তার জের হিসেবে ব্যাপারী জেঠীমাই বা কেন নিজেকে অপরাধী ভেবে অনুশোচনায় ভুগে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন? সব প্রশ্নের উত্তর আছে গুলাবগুলি গল্পে। এই গল্পটিতে কুলদা রায় যেন তাঁর যাবতীয় রসের ধারা উপুড় করে দিয়েছেন। ধারাটি সনাক্ত করতে হলে ‘গুলাবগুলি’ না পড়ে উপায় নেই।

যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন বইটির প্রায় প্রত্যেকটি গল্প নিয়ে আলাদাভাবে আলোচনার সুযোগ আছে। গল্পের অভিনব প্লট, আখ্যান বর্ণনা, ভাষা ও বয়ানভঙ্গি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা চালানো যায়। কুলদা রায়ের লেখালিখি বিস্তারিত পাঠের যেমন দাবি রাখে, তেমনি রাখে বিশ্লেষণের দাবি। পাঠ প্রতিক্রিয়ার স্বল্প পরিসরে সেটি সম্ভব না। আশা করবো নিশ্চয়ই এই কাজটি কেউ করবেন। পাঠক হিসেবে মনে করি এই বইয়ের কিছু গল্প নিছক গল্প নয়। রাষ্ট্র, শাসকগোষ্ঠী কিংবা সময়ের ঘা খেয়ে ওঠে আসা ভিন্নধর্মী এক একটি প্রতিবাদ। শব্দ ফুঁড়ে যা বলতে চায় যা হচ্ছে ঠিক হচ্ছে না- ‘বড়ো অন্যায় হচ্ছে।’ কিন্তু সেই প্রতিবাদও খুববেশি উচ্চকিত নয়। মারমার কাটকাটের হুল্লোড় নেই তাতে। বড় মোলায়েম ভাষায়, কল্যাণময় এক আশাবাদ আর মমতা নিয়ে কুলদার গল্পেরা উপস্হিত হয়েছে। সেগুলো পড়তে পড়তে গায়ে যেমন কাঁটা দেয়, সময়ে কিছু গল্প পাঠকের চোখ ভরে জলও আনে। গল্পগুলো পাঠ শেষে পাঠক মনে দ্রোহের জন্ম হয়, বিপন্ন বিস্ময়ে ‘মানুষ বড় কষ্টে আছে’র মর্মবেদনা হাহাকার তোলে। পাঠকমনে চলমান আনন্দ-বেদনার অনুভূতিকে লেখকের প্রতি পাঠকের কুর্নিশ ধরে নেওয়া যায়। যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন বইটির গল্পগুলো সম্পূর্ণ আউটসাইড দ্য বক্স ধাঁচের গল্প। দু একটি গল্পের বিস্তার সংক্ষিপ্তের সুযোগ ছিল। কুলদা রায়ের গল্পপাঠের অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণা জন্মেছে তিনি শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় ঘরানার লেখক। যে কারণে ‘গল্প বুঝি শেষ’ এমন সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দিয়ে তাঁর গল্প চলতে থাকে লেখকের উদ্দিষ্ট গন্তব্যে। মনে রাখা প্রয়োজন কুলদা রায় টি টোয়েন্টি ম্যাচের নন টেস্ট ম্যাচের নির্ভরযোগ্য মিডল অর্ডার ব্যাটস ম্যানের মতো কলম চালাতে ভালোবাসেন। পাঠককে তাড়াহুড়ো ছেড়ে হাতে সময় নিয়ে মনোযোগ সহকারে তাঁর গল্প পাঠের আয়োজনে বসতে হয়। হলফ করেই বলা যায় তাঁর অন্যান্য গল্পের মতো এ বইয়ের অধিকাংশ গল্প পাঠের পর পাঠক খানিকক্ষণের জন্য হলেও স্তব্ধ হবেন।

--নাহার তৃণা

মার্কেজের পুতুল ও অন্যান্য গল্প
গল্প সঙ্কলন
প্রকাশক : নালন্দা
ঢাকা, বাংলাদেশ।
২০২৩ বইমেলার প্যাভিলিয়ন # ৫।

সোপান প্রকাশনী, 
কলকাতা বইমেলার স্টল নং  স্টল ৩১৪।
-----------------------------------------------------------------------

কাঠপাতার ঘর
গল্প সঙ্কলন
প্রকাশক : নালন্দা
ঢাকা, বাংলাদেশ।
২০২৩ বইমেলার প্যাভিলিয়ন # ৫।

গুরুচণ্ডালী প্রকাশনী
কলকাতা বইমেলার স্টল নং স্টল ৫০৭ ।
-----------------------------------------------------------------------

অনলাইনে পাওয়া যায়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ