বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

আলী নূরের ধারাবাহিক স্মৃতিকথা: তুচ্ছ দিনের গান: পর্ব- ১৩-১৫




পর্ব: তের



বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারি আর একাত্তরের একুশে ফেব্রুয়ারি এবং পঁচিশে মার্চের কালরাত্রির কথা বিস্মৃতির অতলে হারাবার নয় কোনোদিন।

৫২তে আমি ক্লাস টেনে পড়ি। আমি ইকবালদের মিন্টু রোড়ের বাসায় নিয়মিত যাই ব্যাডমিন্টন খেলতে। ইকবালের বাবা হাবিবুল্লাহ বাহার তখন প্রাদেশিক সরকারের নুরুল আমীন মন্ত্রীসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাশের বাড়ি মোরশেদদের। মোরশেদের বাবা মফিজউদ্দিন সাহেব জেল ও উদ্বাস্তু মন্ত্রী। মিন্টু রোড়ের সবটাই মন্ত্রীপাড়া। ক’দিন ধরে শহরে দারুণ উত্তেজনা। মিছিল বিক্ষোভ ধর্মঘটে স্কুল কলেজ সব বন্ধ। একুশের দিনটাতে ইকবালের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে কাটাচ্ছি সকাল থেকেই। হঠাৎ দুপুরের দিকে ওর মা আমাদের ডেকে পাঠালেন। জিজ্ঞেস করলেন আমার বাসা কোনদিকে, কতদূরে? বললেন, শহরে গোলাগুলি হয়েছে, আমি যেন একলা কোনো দিকে না যাই। বিকেলে গাড়ি করে পৌঁছে দেবেন।

বিকেল গড়াতে বাড়ি ফিরে শুনি পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে অনেকে। ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণে স্তম্ভিত সবাই। মুসলীম লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল সারা দেশ। মুসলীম লীগ মন্ত্রীদের বাড়ি ঘুরে বেড়ানোটা আর তেমন ভালো লাগল না আমার। পরদিন থেকে মহা হৈ চৈ। শান্তিনগর পুরানো পোস্টঅফিসের উল্টোদিকে ছিল ‘তাজ মহল’ নামের একটি অতি সুন্দর দোতলা বিল্ডিং। সামনে বিশাল খালি জায়গা। সেজ ভাইয়ের বন্ধু ফরিদ ভাইরা থাকতেন এখানে। এই বাড়িতে তখন ফতেহ লোহানী, ফজলে লোহানী দুই ভাইয়ের খুব আসা যাওয়া। এদের সম্পাদনা এবং পরিচালনায় সেই সময়ের ভীষণ জনপ্রিয় মাসিক 'অগত্যা' এখান থেকেই প্রকাশিত হতো। তেইশে ফেব্রুয়ারির রাতে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের নির্মিত শহীদ মিনারটি ভেঙ্গে দেবার পরের দিনই এই 'তাজমহল' বাড়ির সামনে ইট কাদা দিয়ে একটা ছোটখাট শহীদ মিনার বানিয়ে ফেলা হল। তার উপর একটা কালো কাপড় চড়ানো হলো। দুটি লাউড স্পিকার রাস্তার দিকে মুখ করে বসানো হল। সকাল বিকেলে ফতেহ লোহানী মাইকে তাঁর অসাধারণ কণ্ঠে এখান থেকে নিয়মিত পাঠ করতেন পরিস্থিতির সর্বশেষ সংবাদ বুলেটিন। দারুণ আবেগ দিয়ে পড়তেন পুলিশ নির্যাতনের নিত্যনতুন ঘটনা এবং সংগ্রামের পরবর্তী কার্যক্রমের ঘোষণা। শোকের চিহ্ন হিসাবে কালো ব্যাজ পরতে লাগলাম সবাই। এই কালো ব্যাজ পরে একদিন বিকেলে যাচ্ছি নওয়াবপুরের দিকে। চারদিকে মিলিটারি আর ইপিআর। রেল ক্রসিংয়ের কাছে আসতেই একজন সেপাই ছুটে এসে আমার শার্টের হাতা থেকে ছিঁড়ে ফেললো কালো ব্যাজটা। আমার শার্টের হাতাটাও ছিঁড়ে গেল। এরপর থেকে আমি ভীষণ সরকার বিরোধী হয়ে গেলাম। মন্ত্রীপাড়ায় যাওয়া একদম বন্ধ। 

ওদিকে সলিমুল্লাহ হলের চার গম্বুজের মাথায় বাঁধা হল লাউড স্পিকার। এখানের মাইকেও লোহানী ভাইদের কণ্ঠে ঘোষণা হচ্ছে পরিস্থিতির সর্বশেষ অবস্থা। সালাম, রফিক বরকতদের শহীদ হওয়ার করুণ কাহিনি, পুলিশ বর্বরতার নির্মম সব কাহিনি। সলিমুল্লাহ হল ঘিরে জনতার ভিড়। সবার মুখে ক্ষোভ আর উৎকণ্ঠা। এখান থেকে ঘোষণা হতে থাকল রাস্ট্রভাষা আন্দোলনের সব সংগ্রামী আহ্বান। এখনকার জায়গাতেই প্রথম শহীদ মিনারটি মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের কিছু মেধাবী ছাত্ররা রাতারাতি বানিয়ে ফেলে। এটি খুব সাদাসিধা নকশার ছিল। একটা চারকোণা বর্গক্ষেত্রের মতো তার উপর পাঁচ ছয়ফুটের একটি স্তম্ভ, উপরদিকে খানিকটা সরু। খুব সহজ সরল ডিজাইন। ২৩শের রাতে এই মিনারটি ভেঙ্গে ফেলার পর পাড়ায় পাড়ায় গড়ে উঠতে লাগল শহীদ মিনার। মূল মিনারটি ভাঙার পরপরই তখনকার মেধাবী ছাত্র এবং কবি আলাউদ্দিন আল-আজাদ লিখলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা, ‘স্মৃতির মিনার ভেঙেছে তোমার, ভয় কি বন্ধু, আমরা এখনো চারকোটি পরিবার খাড়া রয়েছি তো।’ আব্দুল লতিফ গান বাঁধলেন, ‘ওরা আমার মুখের কথা কাইড়া নিতে চায়’। একুশের নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের উপর প্রথম কবিতা চট্টগ্রামের মাহবুব আলম চৌধুরীর, ‘কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবী নিয়ে এসেছি’। এই আগুনঝরা কবিতাটি ২৩শে ফেব্রুয়ারি লালদীঘির মাঠে পাঠ করা হলে সারা দেশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।

আমি যে দুবছর বাইরে ছিলাম তা ছাড়া প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে হাজির থাকিনি, প্রভাতফেরিতে হাঁটিনি এমনটি হয়নি কোনোদিন। একাত্তরের উত্তাল দিন। অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ কিছুই চলছে না। সাদু বাচ্চাদের নিয়ে গেছে চাটগাঁ বাপের বাড়ি। আমি বরিশাল থেকে সেজভাইকে জানিয়ে দিলাম, রকেটঘাট থেকে আমি সরাসরি পৌঁছে যাব শহীদ মিনারে, উনি যেন থাকেন । রকেটে করে আমার মিনি অস্টিনটাও সঙ্গে করে নিয়ে এলাম। ঢাকায় ঘোরাঘুরি করতে সুবিধা হবে। সন্ধ্যার কিছু পর শহীদ মিনারে পৌঁছে দেখি সেজভাই ঠিক হাজির সেখানে। এসব বিষয়ে সেজভাই আর আমি অভিন্ন হৃদয়। এবারকার একুশের আয়োজন বিশাল। বাঙ্গালিরা আবার একবার জানিয়ে দিতে চাইছে, তাদের ভাষা ভিন্ন, সংস্কৃতি ভিন্ন, তাদের চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙক্ষা ভিন্ন। তারা নিজেদের আর পাকিস্তানি হিসাবে, পাকিস্তানের অংশ হিসাবে ভাবতে রাজি নয়। আমরা সবাই বাঙালি এই হোক আমাদের পরিচয়। ফুলে, আল্পনায় ভরে গেছে সবটা চত্ত্বর এবং দুদিকের পথ। সামনের দেয়ালে দেয়ালে বিরাট করে আঁকা ভাষা সংগ্রামের চিত্রমালা। শহীদদের স্মরণ করার এই তো শ্রেষ্ঠ পরিবেশ। অনেক লোকের সমাগম। কিন্ত কোনো বিশৃঙ্খলা নেই কোথাও। গান গেয়ে বিভিন্ন দল আসছে, কেউ পায়ে হেঁটে, কেউ ট্রাকে করে। বরিশাল থেকে আসা দলটির নেতৃত্বে সত্যেন। ওর দরাজ গলায় গাওয়া, ‘রক্তের আখরে শপথ নিলাম’ গানটি সবাইকে মাতিয়ে দিল। সত্যেন সাগরদী খ্রিস্টান মিশনের কয়ার গায়ক। ভোর করে বাসায় ফিরলাম। তখনও চলছে প্রভাতফেরি।

মাস খানেকের মধ্যে শুরু হল পাকিস্তানিদের বাঙালি দমনের নীলনকশা। পঁচিশে মার্চের কালরাত্রে গুঁড়িয়ে দেয়া হলো  বাঙ্গালির অতি প্রিয় স্মৃতির মিনার। শহীদ মিনার আবার শহীদ হলো।


চৌদ্দ


শুনেছি আমার দাদাদের অনেক জমিজমা ছিল। উপেনদা অর্থাৎ আমাদের গ্রামের উপেন সাধু একদিন আরু মিঞা, ওসমান ভাই ও সুবলের সামনে বলছিলেন, “ওর দাদাদের নৌকা যখন ধান নিয়ে নন্দীবাড়ীর দক্ষিণ ঘাটে পৌঁছাত, তখন গ্রামের সব গরীবজনরা ভিড় জমাত ওখানে। বাড়ি আনতে যে ধান পথে পথে পড়ে থাকত তাই দিয়ে তাদের চলত বেশ কিছুদিন। শুনেছি, দাদা কোমরে দু’একটা কাঁচা টাকা গুঁজে বের হতেন। কেউ সাহায্য চাইলে যেন ফেরাতে না হয়। দাদা খুব অতিথি বৎসল ছিলেন। সন্ধ্যায় একজন মোসাফিরের আশা করতেন। তখন দূরের পথে চলতে গিয়ে সন্ধ্যা নেমে এলে কোনো গ্রামে যাত্রা বিরতি করতেন যেসব যাত্রী তাদেরকে মোসাফির বা মুসাফির বলা হতো। ভিন গ্রাম থেকে আগত মোসাফিরদের যত্নের সঙ্গে আতিথেয়তা করা গ্রামের সম্পন্ন পরিবারদের মধ্যে একটা রীতি ছিল। এক সন্ধ্যায় দাদা নামাজে ছিলেন। এমন সময় বাইরে থেকে একজন মোসাফিরের ডাক শুনে নামাজে থাকার কারণে জবাব দিতে পারেননি। নামাজ শেষ করে বাইরে এসে দেখেন কেউ কোথাও নেই। সঙ্গে সঙ্গেই বেরিয়ে পড়লেন মোসাফিরের খোঁজে। মোসাফিরকে পাওয়া গেল না। দাদা অমঙ্গল চিন্তা করে বিচলিত হলেন। না খেয়েই শুয়ে পড়লেন। ভোর না হতেই জীবনাবসান। অনেক দিনের কথা, ঠিক কারণ বলতে পারার মতো কেউ নেই।

আব্বা লোকজন খাওয়াতে ভীষণ পছন্দ করতেন। চাটগাঁয়ে চাকুরীজীবনের কালে সময় অসময়ে লোকজন নিয়ে আসতেন বাসায়। আম্মাকে বলতেন খাবারের আয়োজন করতে। আম্মা লোক খাওয়ানোর ব্যাপারে আব্বার সব বাড়াবাড়ি প্রশ্রয় দিতেন। আমার বিয়ের পর আমার শ্বশুর একদিন গল্পছলে বললেন, আব্বা ডিস্ট্রিক্ট ইঞ্জিনিয়ার থাকাকালীন আমার শ্বশুর গেছেন তাঁর বাংলো এসেস করতে। আমার শ্বশুর তখন মিউনিসিপালিটির চীফ এসেসর। দুপুর হয়ে গেল। আব্বা না খাইয়ে কিছুতেই ছাড়বেন না। দুপুরের খাওয়া-দাওয়ার পর তামাক সেবন শেষে বিকাল পর্যন্ত ঘুমিয়ে কাটালেন দুজনে। অথচ আমার শ্বশুর ছিলেন আব্বার সম্পূর্ণ অপরিচিতজন। তামাক খাওয়া, গল্প করা আর বই পড়া ছিল আব্বার প্রধান নেশা। সুন্দর কিছু ফরসি হুঁকার সঙ্গে কুমিল্লার বিখ্যাত আবলুস কালো নারকেলের ডাবা বা থেলো হুঁকোও তাঁর প্রিয় ছিল। সেইসঙ্গে কুমিল্লা মোগলটুলির বিখ্যাত খাম্বিরা তামাক, সুগন্ধিতে মৌ মৌ করত। 

আব্বার বই পড়াতে আগ্রহ ছিল ভীষণ। শরৎচন্দ্রের সব উপন্যাস একাধিকবার পড়তেন। সব চরিত্র ছিল তাঁর কাছে খুব পরিচিত। বিশেষ করে 'দত্তা'র রাসবিহারী চরিত্রের কুটিলতা বোঝাতে গিয়ে অনেক অংশ থেকে অনায়াসে উদ্ধৃত করতে পারতেন। আমি আব্বার মুখে প্রথম মেঘনাদবধ শুনি। মাইকেলের 'রেখো মা দাশে রে মনে..' পড়তে গিয়ে খুব অনুভূতিপ্রবণ হয়ে পড়তেন। 'মধুহীন করোনা গো তব মনঃকোকনদে' এই অংশটি বোঝাতে গিয়ে কোকনাদ মানে পদ্ম বলেই ক্ষান্ত হতেন না, মধু শব্দটি যে দুই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন এক অর্থে মনপদ্মকে মধুহীন না করা, অন্য অর্থে মধুসূদনহীন না করা একথাও সহজ করে বুঝিয়ে দিতেন। মনে পড়ে, আমি ম্যাট্রিক ক্লাসে পড়ার সময় পর্যন্ত যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ পড়িনি বলে তিরস্কার করেন। যখন যা পড়তেন পড়াশেষে আমাদের কাছে পাঠিয়ে দিতেন, যেমন, জরাসন্ধের 'লৌহকবাট', বিমল মিত্রের 'কড়ি দিয়ে কিনলাম', শংকরের 'কত অজানারে', 'সাহেব বিবি গোলাম', এমন আরো কত। নেহেরুর ছোটবোন কৃষ্ণা হাতিসিং এর ‘কোন খেদ নাই’ বইটি আব্বা আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। পরে মূল বইটি ‘With No Regrets’ আমি বরিশাল ক্লাবের লাইব্রেরিতে পাই। চট্টগ্রামের বিপ্লবীযুগে একটি সাপ্তাহিক ছিল ‘পাঞ্চজন্য’। এতে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনসহ সূর্য সেন, অনন্ত সিং, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতাদের সব বীরত্বগাথা প্রকাশ হতো। আব্বা এইসব বাঁধিয়ে রেখেছিলেন। আমি পড়তাম আর আম্মার কাছে গল্প শুনতাম, কেমন করে গৈরলা গ্রাম থেকে সূর্যসেনকে ধরে পটিয়া থানায় নিয়ে এলে লোকজন উপচে পড়ে এই মহান বিপ্লবীকে দেখতে। আব্বার পোস্টিং তখন পটিয়াতে। থানার একদম পাশেই বাসা। আম্মা আরো গল্প করতেন কল্পনা দত্তের। একবার ট্রেনে এক কামরায় ছিলেন দু’জনে। তখন চিনতে পারেননি। কদিন পর ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণ করার পরিকল্পনা করতে গিয়ে ধরা পড়লে সব কাগজে ছবি বের হয়। আম্মা শোবার ঘরে সেকালের সব বিখ্যাত ব্যক্তিদের ছবি বাঁধিয়ে রাখতেন; যেমন, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, আশুতোষ চন্দ্র মুখোপাধ্যায়, চিত্তরঞ্জন দাশ, সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, আর ছিল আলী ভাইদের- মৌলানা মোহাম্মদ আলী এবং মৌলানা শওকত আলীর। তখন মেধাবী ছাত্র হিসাবে হুমায়ুন কবীরের খুব নাম। আম্মা নিজের মেজ ছেলের নাম রাখলেন, হুমায়ূন কবীর।

গ্রামে থাকার সময় আব্বা প্রায়ই সন্ধ্যায় আমাদেরকে মুখে মুখে অংকের হিসাব, ধাঁধা, শুভঙ্করের আর্যা শেখাতেন- মণের দামের বামে ইলেকমাত্র দিলে ছটাকের দাম অতি সহজেই মেলে। জেবনবু’র এগুলোতে কোন আগ্রহ ছিল না। ও সবাইকে চমকে দিয়ে একদিন গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল, সেদিন বাজার থেকে বেগুন আনলাম, বলো সবাই ক’সের আনলাম।

আব্বা ছিলেন একজন মুক্তবুদ্ধির যুক্তিবাদী আধুনিক মনের মানুষ। পড়াশোনা ছিল তাঁর জন্য এক অপরিসীম আনন্দের ব্যাপার। খাটের পাশে একটা গোল টেবিলের উপর সব সময় দু’একটা বই থাকতোই। আমাদের চামেলীবাগ এলাকায় বিদ্যুৎ কিংবা পানির কল ছিল না ১৯৫৮ পর্যন্ত। সন্ধ্যা হতেই সারি বেঁধে সব হারিকেন হাজির হত পেছনের বারান্দায়। এদের তেল ভরে চিমনি মুছে সব ঘরে ঘরে পাঠানোর কাজটা ছিল শিরীবু’র। আব্বার টেবিলে আলাদা করে পাঠানো হতো একটা চিকন চিমনির উপর ঘোলাটে শেড দেওয়া ল্যাম্পের মতো। আব্বা শোবার আগে অনেকক্ষণ পড়তেন। আম্মা বিরক্ত হতেন ঘুমের সময় আলো জ্বেলে রাখার জন্য। কুমিল্লা কিংবা গ্রামে যাবার সময় আব্বার সঙ্গে দু’চারটে বই থাকবেই। সেবার কুমিল্লাতে নীনার বিয়ের পর পর আম্মাকে নতুন-বৌ মানে সাদু’কে সহ ঢাকা রওয়ানা করিয়ে দিয়ে নিজে গেলেন গ্রামে। পরম স্নেহের ভাগ্নে মদন ভাইয়ের কাছে। সেই শেষ যাওয়া । শয্যাপাশে ছিল দুটি বই - সুভাষ বসুর The Indian Struggle 1920-42 এবং Louis Fichser এর The Life of Mahatma Gandhi.





পনের



আমাদের গ্রাম ছাড়ার আয়োজন সম্পূর্ণ হলো। গ্রামের বাড়ি এবং বাড়ি সংলগ্ন উচুঁ জমি বিক্রি করে দেয়া হলো জামশেদের বাবা তালেব আলীর কাছে। জামশেদ বিমানে চাকুরী করে। আসে প্রায়ই, গ্রামের গল্প করে, ছেলেবেলার দুষ্টুমির গল্প করে। বছর কয়েক আগে হঠাৎ খুব কম বয়সেই মারা গেল। মনে পড়ে নারায়ণগঞ্জ থেকে বিয়ে করার পর নতুন বৌ নিয়ে সোজা চলে আসে আমার কাছে। আমি যখন চট্টগ্রামের লালদীঘির পাড়ে থাকতাম তখন ওর ছেলেবেলায় একবার বেশ কিছুদিন ছিল আমার সঙ্গে।

আব্বা বরাবরই ব্যাংকিং এ বিশ্বাসী ছিলেন। গ্রামের বাড়ি বিক্রির টাকা নিয়ে আমাকে সঙ্গে করে কুটির বাজারে গেলেন টিপারা মডার্ন ব্যাংকে। সব টাকা জমা দিলেন একাউন্টে। এর কিছুদিন পর যখন ঢাকা আসেন ঐ টাকা ড্রাফ্ট করে নিয়ে এসে জমা করেন জনসন রোগের মোড়ে টিপাড়া মডার্ন ব্যাংকের শাখায় । এবারও আমি সঙ্গে।

কয়েকমাস পরের কথা, আমাদের চামেলীবাগের বাড়ি কুমুদ মুখার্জীর কাছ থেকে কেনার কথা হচ্ছে। আব্বা ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বললেন, জানালেন ঢাকায় বাড়ি কেনার চেষ্টা করছেন। ম্যানেজারবাবু কী মনে করে আব্বাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে টাকাটা তুলে নিতে বললেন ঐ দিনই। আব্বা টাকাটা তুলে নিলেন। পরদিন সকালের পত্রিকা খুলেই দেখেন টিপারা মডার্ন ব্যাংক তালাবন্ধ, দেউলিয়াত্বের কারণে। আব্বা বেঁচে গেলেন, তার সর্বস্ব ছিল ঐ ব্যাংকে। সেদিন ব্যাংকের সেই ম্যানেজারবাবু নিজ দায়িত্ব কতটুকু পালন করেছিলেন তা নিয়ে প্রশ্ন করা চলে, কিন্তু এক অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধের যথাসর্বস্ব খোয়ানা থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে যে মানবিক কাজটি করেছিলেন তাও কি কিছু কম?

আইন পেশার প্রতি আব্বার খুব উচু ধারণা ছিল। তখনকার দিনের নামকরা সব আইনজীবীদের কথা বলতেন, কামিনী দত্ত, ভুদূড় দাস, ধীরেন দও, খান বাহাদুর আবদুল করিম এদের কথা। এই পেশায় যুক্তিতর্ক সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি এই সব বিষয় ছিল তাঁর কাছে খুব আকর্ষনীয়। এর পেছনে একটা প্রচ্ছন্ন কারণ ছিল। উপেনদার ছেলেবেলায় তার বাবা হাসন সাহা খুন হন। মাধবপুর বাজার থেকে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরছিলেন ছেলেকে সঙ্গে করে। বালক সন্তানের চোখের সামনে রামদা’ দিয়ে কুপিয়ে নির্মভাবে হত্যা করা হয় তার বাবাকে। উপেনদার পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচারে আব্বা প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেন কুমিল্লার উল্লিখিত আইনজীবীদের মধ্যে দু’তিনজনকে এবং চট্টগ্রাম বার থেকে খান বাহাদুর আব্দুল করীম খাঁকে নিয়োগ দিয়ে। বিচারে পাঁচজন আসামীর মধ্যে চারজনের ফাঁসি হয়, সবাই একই গ্রামের লোক। সেই থেকে উপেনদা আব্বাকে পিতৃতুল্য মানতেন, আর আব্বা হলেন আইন পেশার প্রতি পরম শ্রদ্ধাশীল। খুব ইচ্ছে ছিল আমি যেন বড় হয়ে ব্যারিস্টার হই। তাঁর ইচছা আমি পূরণ করতে পারিনি। কিন্তু ক’বছর আগে একটি দুর্নীতি দমন মামলা পরিচালনা করতে আব্বার পূর্ব কর্মস্থলের পাশেই অবস্থিত চট্টগামের বিখ্যাত লাল রঙের কোর্ট বিল্ডিং এ যাই। সেই মামলায় জয়ী হয়ে বারবার আব্বার কথা মনে করে চোখ ভিজে এসেছে। 

আব্বা চিঠি লিখতেন খুব সুন্দর। আমাদেরকেও চিঠি লেখাতে উৎসাহ দিতেন। আমি যখন করাচী যাই আব্বা একগাদা খাম নিজের ঠিকানা লিখে আমার হাতে দিয়ে বললেন, ঠিকানা-লেখা খাম দেখলে চিঠি লিখতে মনে সায় আসবে। আমি অনেক চিঠি লিখেছি আব্বাকে। দু’বছর পর করাচী থেকে ফিরে দেখি আব্বা সেসব চিঠি সযত্নে জমিয়ে রেখেছেন।  

আব্বা তীক্ষ্ণবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ ছিলেন। হৃদয়ের দিক থেকে ছিলেন কোমল, সন্তানদের প্রতি ছিলেন অতি দূর্বল। কাউকে কোনোদিন একটা ধমকও দেননি, হাত তোলা তো দূরের কথা। মনে পড়ে, চামেলীবাগের বাসায় একবার জেবনবুকে আম্মা কী নিয়ে খুব বকাবকি করেন। জেবনবুকে সন্ধ্যার পর থেকে আর পাওয়া যাচ্ছিল না। আম্মার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমি একটু দেরি করে ফিরছিলাম, দেখি আব্বা একটা হারিকেন নিয়ে কুঁয়ার ভেতর কী জানি খুঁজছেন। আমাকে দেখে খুব অপ্রস্তুত। বললেন, জেবন রাগ করে কুঁয়াতে ঝাঁপ দিলো কিনা তাই দেখছিলেন। জেবনবু’কে আম্মা ঠিকই বের করে আনেন কাপড় বোঝাই এক আলনার আড়াল থেকে। 

আব্বা সব সময় হাসি-কৌতুক করে কথা বলতেন। প্রচুর পড়াশোনা করতেন বলে অসাধারণ ছিল তাঁর রসবোধ। উইট আর হিউমার ছিল স্বভাবজাত। গল্প করতে বসলে কথা নেই। একবার কুমিল্লার রাজগঞ্জ বাজারে গেছেন মাছ কিনতে। বেশ ভিড়, ভিড়ের মধ্যে টের পেলেন বেশ কজন লোক অকারণেই চাপাচাপি করছে দুদিক থেকে। বেরিয়ে দেখেন-পকেট মারা গেছে। এমন সময় দুজন লোক এসে সহানুভূতির সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, কত গেল? আব্বা পকেট হাতড়িয়ে দেখে বললেন, এক শ টাকার নোট একটা। নিমেষের মধ্যে দুজন উধাও এবং পরমুহূর্তে দেখা গেল এই দুজন অন্য একজনকে খুব করে পেটাচ্ছে! আসলে এই দুজন পকেটমার দলেরই লোক ছিল। আব্বার আসলে খোয়া গেছিল দশ টাকার একটা নোট। একশ টাকা খোয়া যাওয়া শুনে ওরা ওদের সঙ্গীর কাছে একশ টাকার বখরা দাবী করে। কিন্তু ও যতই বলে পকেটে দশ টাকা পেয়েছে, কে শোনে কার কথা।

বছর চারেকের মতো আমাদের গ্রামে বাস। তবু এই গ্রাম ছেড়ে যেতে আমার বালক মনের কী অবস্থা ছিল তা প্রথমদিকে একবার লিখেছিলাম তারই পুনরাবৃত্তি না করে পারলাম না। ১৯৪৮ সালের ৩রা মার্চ। দিনটি আমার খবু মনে পড়ে। ক’দিন ধরেই জিনিসপত্র বাঁধাছাঁদা চলছিল। আমার কেমন উদাস লাগছিল সব। গ্রামে আমার কোনো সঙ্গী-সাথী ছিলনা। বাড়ির চারপাশের বৃক্ষরাজি, বর্ষাকালের টইটুম্বর খাল-বিল নদী-নালা, পালতোলা নৌকা, হেমন্তে ফসলের আড়ম্বর, শীতের কুয়াশা, পল্লী-গ্রামের ঋতু পরিবর্তনের এই বিচিত্র ছবি আমাকে মুগ্ধ করত। আমি একদম মিশে গিয়েছিলাম প্রকৃতির মধ্যে, নিসর্গের অপরূপ সৌন্দর্যে। এই সব ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছিল। গ্রামের পশ্চিমের ঈদগাহ ছাড়িয়ে এক বিশাল প্রাম্তর। পড়ন্ত বিকেলে ঘুরে এলাম এর পাশ দিয়ে, বলতে গেলাম, তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি, মনে রেখো। পুকুরের চারপাশটা আনমনা ঘুরলাম কয়েকবার। কী একটা গোপন ব্যথা যেন কোথায় বাজছিল। কিন্তু তা ঠিক বোঝার বয়স আমার তখন ছিল না। এলো বিদায়ের ক্ষণ। সন্ধ্যার অন্ধকার গাঢ় হতে সবাই চললাম মদন ভাইসাবদের বাড়ি। পিছনে ফেলে যাচ্ছি অপুর নিশ্চিন্দিপুরের মতোই আমার প্রিয় মকিমপুর আর একে ঘিরে আমার বাল্যের নানা রঙের দিনগুলির কথা, যা আজও অমলিন আমার স্মৃতিপটে। পরদিন অতি ভোরবেলা কসবা ষ্টেশন থেকে ট্রেন ধরে সন্ধ্যা নাগাদ পৌঁছে যাই ঢাকা শহর, ফুলবাড়িয়া স্টেশনে।
 

চলবে...

---------------------

 

লেখক পরিচিতি:
আলী নূর
পেশায় আইনজীবী।

বই পড়া, গানশোনা, ফুল ফোটানো, নাটক কিংবা ওড়িশি নৃত্য অথবা উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত, যন্ত্রসঙ্গীত এইসব নিয়েই তাঁর আনন্দযাপন। তাঁর নানা শখের মধ্যে দেশভ্রমণ, ছবি আঁকা, ফটোগ্রাফি এবং সিনেমাটোগ্রাফি অন্যতম। তিনি জীবনযাপন নয় জীবন উদযাপনে বিশ্বাসী।

বৃটিশ-ভারত, পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ এই তিন কাল তিনি দেখেছেন, দেখছেন। তুচ্ছদিনের গান কেবল তাঁর জীবনের গল্প নয় বরং গল্পচ্ছলে ইতিহাসের পরিভ্রমণ।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন