বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

সৌরভ হোসেনের গল্প: জমিনের আরশ




অফিস বিল্ডিংটার কার্নিশ ছুঁয়ে আসমানের যেখানে আজরাইল জিবরাঈল ফেরেশতা আল্লাহর ঐহি শোনেন সেখান পর্যন্ত যেন শুকনো বাঁশপাতা রঙের মেঘটা ছেয়ে আছে। আশ্বিনের মেঘ এত শুঁড় তুলে থাকে তা জানা ছিল না জুব্বারের। বয়স তো কম হল না। একাত্তরের ভাসানেই সে বিড়ি ফুঁকে বাপের জমিতে লাঙলের হাল ধরতে পারত। পুকুর ঘাটে কোন মেয়েকে বুক ছাপড়িয়ে নগ্ন অবস্থায় গোসুল করতে দেখলে তার ভেতরে তুর্কি নাচন শুরু হয়ে যেত। 
ছটা বড় বান পাঁচটা ভূমিকম্প তিনটে যুদ্ধ আর দুটো মহামারি পেরিয়ে তার হাড়গিলে শরীর এখন লাঠি ধরে তিন পেয়ে হয়েছে। সেই জুব্বার তার ছানি পড়া ঘোলা চোখ দিয়ে মেঘটাকে দেখল। যেন জুব্বার নয়, বয়স্ক ভারাক্রান্ত পৃথিবী জুব্বারের চোখ দিয়ে আকাশ দেখছে। কী আর করবে? ঘণ্টাখানেক আগে লাইনে দাঁড়িয়েছে। এই শরীর এতক্ষণ নিজের ভার ধরে আছে সেটাই বড় ব্যাপার। গেলদিন তো ফজর ভোরে লাইন দিয়েছিল জুব্বার। আজ তো তাও পেটে দুটো পান্তা ভাত পুরে এসেছে। লাইন এখনও ল্যাম্পপোস্টের কাছেই যেতে পারেনি। দপ্তরের মুখ দেখতে বিহেন বেলা ফুরিয়ে না বিকেল গড়িয়ে যায়! দিন মাটি হয়ে যাবে, একথা বলছে না জুব্বার। দিনটা কাজা হয়ে যাবে সেকথাও ভাবছে না জুব্বার। জুব্বার মগজে মগজ ঠেসে ভাবছে, লিস্টে নামটা থাকলেই হল। তাতে মেঘ আসমান ফুঁড়ে আরশেই যাক আর আরশ ফুঁড়ে আল্লাহর কাছেই যাক, তাতে তার কিচ্ছু এসে যায় না। তার আরশ যে এই দেশেই। এ দেশের ভিটেমাটিতেই। যখন বাতালে জমিতে কাদানের লাঙল ভুড়ভুড় করে ঢুকে যেত তখন জুব্বার বলত, কোন আসমান টাসমানের ফেরেশতা নয় এই জমিনের আসল ফেরেশতা হলেম আমরা। ফসল আবাদের চাষি। জলকাদার চাষাভুষো মানুষ। আল্লাহ ফসলে বরকত দেন আর আমরা সে ফসল পয়দা করি। তারপর জুব্বার বলদের লেজ মুচড়ে দিয়ে বলত, ফেরেশতাদের বোরাক কী হবে? আমার এই বলদ থাইকলেই ঠিক খোদার কাছে পৌঁছি যাব। সেই জুব্বার এখন মাথা চুলকে চুল ছিঁড়ে ভাবছে, আসমানের খোদা তো দূর অস্ত জমিনের ভিটেটুকুনকেই ধরে রাখতে পারবে কি না সন্দেহ। জুব্বার তার ঘোলা চোখের জড়সড় চামড়া টান করে দেখল, লাইনে কে নেই, খুলুপাড়ার সাব্দার খুলু, হাজামপাড়ার আব্দুল্লা হাজাম জোলাপাড়ার মাতিন আনসারি সবাই আছে। আর আছেন গাছপাতা রঙের উর্দিধারি মিলিটারির দল। কোমরে কার্তুজ। গোলা বারুদ। হাতে তাক করা রাইফেল। খাকি পরা রাজ্যপুলিশও চৌখস হয়ে আছেন পজিশন বুঝে। দেশের ভেতরে দেশ জন্মায় তাই বলে দেশের ভেতরে ‘নেই দেশ’ও জন্মায়! সেই নেই দেশের মানুষ যদি হয়ে যাই! সেই উলুক্ষনে কথাটা মনে পড়তেই তার বেটাবিটি নাতিপুতির মুখগুলো ভেসে উঠল জুব্বারের। বুড়ো হাড় চিনচিন করে উঠল। আবারও ঘোলা চোখ থির করে আসমানের দিকে তাকাল জুব্বার। চোখের মণিজোড়া যেন ভাঙা ডিমের কুসুমের মতো থলথল করছে। এত্ত বড় মুসিবত এলে তো সেই আসমানের খোদার কাছেই হাত পাততে হয়। তিনিই যে একমাত্র বালামুসিবত থেকে বাঁচাতে পারেন। যে বচ্ছর বাংলাদেশের জন্ম হল সেই জয়বাংলার বছর জুব্বার পাকিস্তান মিলিটারিকে খিস্তি দিয়ে বলেছিল, ‘হারামির ব্যাটা হারামিরা ধম্মের লেগি লিজের জাতভাইদেরকে খুন করিচিস, অর লেগি তুরাও কুকুর শিয়ালের মুতন মল্লি। আল্লা ইব্যের তোধের পাছায় জাহান্নাম বেন্ধি দিল। তুরা লিজেরা লিজেরাই জ্বলিপুড়ি মরবি। তোধের হেরো মুখে চুনকালি পড়ুক। দুনিয়া তোধের মুখে থুথু দিক।‘ সে কথা শুনে আবার খুলুপাড়ার জলিল শাহাজি তওবা তওবা করতে করতে বলেছিল, ‘ তুমি কী শরমের লোক গ জুব্বার! লিজের জাইতভাইদেরকে অ্যামুন বদদুআ দিচ্চ! তুমি তো জাহান্নাম যাবা গ। তুমার অ্যাতদিনের লমাজ রুজা সব মাটি হয়ি গ্যালো।‘ ‘লমাজ রুজা কি কাহুর বাপত্তির সম্পত্তি? কাহুর ইজারা ল্যাওয়া জমিদারিও? আল্লা দুনিয়ার কাহুকে লমাজ রুজার ঠিকি দ্যায়নি। উসব হল লিজের আমল। তুমি আমল কল্লে তুমি তার ছওয়াব পাবা। দুনিয়ার কুনু বাপের ব্যাটা সে ছওয়াব কেড়হি লিতে পারবে না।‘ পাল্টা বাঁশ ফাটার মতো বেজে উঠেছিল জুব্বার। ‘অ্যাতোদিনের কাগজদস্তাবেজ কতি কতি আছে অ কী কইরি জুগাড় করব! খুঁজতে খুঁজতে মাথার চুল উঠি গ্যালো।’ দুশ্চিন্তাটা সেদিন ধানের ভুই নিড়ানির সময় জলিলকে বলতেই ষাট সালে হাফপ্যান্ট পরা জলিল পুরোনো কথা টেনে ঠেস মেরে বলেছিল, ‘ধম্ম কাহুর ঠিকি ল্যাওয়া না থাইক, দ্যাশডা যে কাহুর কাহুর ঠিকি ল্যাওয়া আচে তা তো ইব্যার বুইঝতে পাইচ্চ, লইমুদ্দির ব্যাটা? মাথার চুল তো দূরের কথা দ্যাখা শিকড় খুঁজতে গিয়ি মাথার ছাল চামড়া না উঠি যায়!’ তারপর বিড়বিড় করতে করতে জলিল বলেছিল, ‘জাইতভাই আর ধম্ম কখনও পর কত্তে নাই। আল্লা যে ধম্মে ধম্মে থাকে গ।‘ কিন্তু জুব্বারের হক কথা, ‘আগে দ্যাশ পরে ধম্ম।‘ তার জুত প্রশ্ন, ‘দ্যাশ থাইকলেই তো ধম্ম থাকবে নাকি? দ্যাশ নাই ভিটি নাই ঘর নাই বাড়ি নাই ধম্ম লিয়ি গায়ে মাখব না খাব?’ তারপর হাত ছড়িয়ে এক বুক হাওয়া নিয়েছিল জুব্বার। সে হাওয়া ধানের থোড় ছুঁয়ে তার উদুম বুকে লেপ্টে গেছিল। নীচের বিল থেকে বয়ে আসা সে হাওয়ার মধ্যে নিজের জন্মভুমির ঘ্রাণ পেয়েছিল জুব্বার। নিজের চোদ্দপুরুষের সুঘ্রাণ নাকেমুখে মেখেছিল। যেন তারা মিনমিন করে বলেছিল, এই হাওয়া বুকে নিয়েই তো আমরা বেঁচেছিলাম রে জুব্বার। এ হাওয়ার কোন জাত ধর্ম নেই। এ হাওয়া আপনেরও আপন পরেরও আপন। আমাদের হাড় ছেঁচলে এ হাওয়াই পাবি। সে হাওয়ার সোঁদা গন্ধে জুব্বারের নাকমুখ হাড়গোস্ত ধানের পুষ্ট থোড়ের মতো আরও সতেজ আরও টাটকা হয়ে উঠেছিল।

কাগজেরও যে এত্ত বাপ থাকে তা আগে কখনও জানত না জুব্বার। সে কি একটা বাপ! বাপেরও আবার বাপ। তারও কত্ত ফাংড়ি! একটা জমি একটা কাগজ হবে তা না তো ষাট সালের কাগজ একাত্তর সালের কাগজ, সে কাগজের আবার ওয়ারিশের হিস্টিগুস্টি! দলিল আর পরচা যেন সহোদর ভাই হয়। নাড়ি রক্তে মিল থাকে। সতার ভাইয়ের মতো দুশমনি না থাকে। সেসব কাগজে আবার নামের সব ফিরিস্তি ঠিক থাকে। আগার নাম গুড়ার নাম মাঝের নাম সব নাম যেন অক্ষরে অক্ষরে মিলে থাকে। একটু এদিক ওদিক হলেই তার পিড়ির পিড়িকে কবর খুড়ে তুলে আনতে হবে। হাড় গোস্তের মানুষটা যেন কিচ্ছু নয়। দুটাকার কাগজই সব। মানুষটাই যেন কাগজ আর কাগজটাই যেন মানুষ। তা আবার যে সে কাগজ নয়, ঠোঙা কাগজ। জুব্বারকে এখন নিজেকে ঠোঙা কাগজই মনে হচ্ছে। দেশের সরকার শিরিষ গাছের মতো দঢ় পুরোনো জুব্বারকে ঠোঙা বানিয়ে দিচ্ছে! জুব্বারই সেদিন ধানের আলে দাঁড়িয়ে জলিলকে দুঃখ করে বলেছিল, ‘দ্যাশের সরকার আমাদেরকে একিবারে কাগজের ঠুঙ্গা বানি দিল রে! ফুঁ দিলেই উড়ি যাব!’ তারপর খিস্তি দিয়ে বলেছিল, ‘বাহিঞ্চতদের কি আর অন্য কুনু কাজকম্ম নাই? মানুষ খ্যাদানের পেছনে লেগিচে!’ সেদিন জলিলও দেশের সরকারের যাচ্ছেতাই গিল্লা করেছিল, ‘প্যাটের ভাত আর পাছার কাপুড় দিবার মুরেদ নাই আর কে লাগরিক আর কে লাগরিক লয় তার হিস্টিগুস্টি ঘেটি ব্যাড়াচ্চে! লেতামুন্ত্রিরা তো চুরি করি করি দ্যাশডাকে ফতুর করি দিল আবার বুলচে, আমরা দ্যাশের ঠিকি লিইচি! দ্যাশডা কাগজের লাড়ু লয়? ই দ্যাশ হল বটগাছ। শালোর ব্যাটা শালোরা সিডা কবে বুঝবে!’

জুব্বারের সাড়ে তিন কুড়ি বছরের চোখ বাপের জন্মেও ভাবেনি, একদিন এমন সব্বনেশে দিন আসবে। সব ফ্যাঁকড়া বাঁধিয়ে লণ্ডভণ্ড করে দেবে শেকড় বাকল। বাপ থেকে বেটা বেটা থেকে বাপ বংশের সব ঠিকুজি নিকুজি খুঁজে বেড়াবে। মানুষের থেকে দুটাকার কাগজের দাম বেশি হবে। জুব্বার মনে মনে বলে, এমন দিন দেখার আগে মরে গেলাম না কেন? আল্লাহ নাতিপুতিদের ছড়াদ দেখার জন্যে আমাকে এখনও দুনিয়ায় রেখে দিলেন! জুব্বার যুবক বয়সে লাঠি ঘোরানোর কায়দা কৌশল জানত ভালো। হাতে গরু চরানোর পান্ঠিটা একবার বগলে একবার পায়ের ফাঁকে একবার এ হাতে তো একবার ও হাতে স্যাৎ স্যাৎ করে পাকসাপ্টা মেরে ঘোরাত। সবাই বলত, জুব্বার লাঠির উস্তাদ। সেই জুব্বারের এখন মনে হচ্ছে, দেশটা যেন সেই লাঠি। সরকার দেশটাকে আগলে বগলে পুরে যা ইচ্ছে তাই করছে। জুব্বার ভালো হিচকি কাটতেও উস্তাদ ছিল। কাবাডি খেলায় বিপক্ষের এলাকায় ঢুকে এদিক ওদিক হিচকি কেটে মার দিয়ে পালিয়ে আসত। সেই হিচকি যেন এখন দেশের সঙ্গে কাটতে হবে। দেশের সরকারের সঙ্গে কাটতে হবে। এমন হিচকি কাটতে হবে যাতে মারও দেওয়া যায় আবার তাকে ধরতেও না পারে। জুব্বার ভালোই জানে, হিচকি কাটার তার সেই বেটে গাট্টাগোট্টা শরীরটা আর নেই। হাত পায়ের বাতায় দামড়া দামড়া গোস্তও নেই। এখন চামড়া জড়িয়ে দড়ি হয়ে গেছে। হাত পাগুলো শুকিয়ে শুকিয়ে লড়ি খড়ি। দেশের সরকার ইচ্ছে করলে তাকে এক মুঠে পুরে ফেলতে পারে। তবে মনের তেজ আছে জুব্বারের। বেটাদেরকে সাফ বলে দিয়েছে, ‘ই দ্যাশে আমার চোদ্দ পিড়ির কবর আছে আমারও ই দ্যাশের মাটিতেই কবর হবে। ই শরীলের হাড়গোস্ত ই দ্যাশের হাওয়াপানিতেই পুষ্ট হয়িচে। সুতুরাং মড়া হইক আর তাজা হইক, ই শরীলের হক ই দ্যাশের মাটির। অন্য কথু লয়, আমি মল্লে আমার লাশডাকে ই দ্যাশের মাটিতেই পুঁতি দিবি।‘ তারপর আসমানের দিকে উদাস চোখে তাকিয়ে একমুখ সুন্নত দাড়ির জুব্বার মিনমিন করে বলেছিল, ‘জ্যান্ত শরীলে এই দুনিয়ায় বেঁচি থাইকলে য্যামুন ব্যাটাবিটি লাতিপূতি আপনজন থাকে মরার পরেও যে বাপ দাদো পারদাদো দাদোর দাদো দায়েদিকুটূম থাকে রে। তাদের সাতে দুনিয়ার সুখদুখের কথা বুলি দিন কাটাতে হয়। লিজের কবরডা অন্য দ্যাশে হলে তাধেরকে কী কইরি পাব? তারা যে সব আমার লেগি কেঁদি মরবে। ই দ্যাশ যে আমার ইহকাল পরকাল দুই কালেরই।‘ জুব্বারের গলার কাছে একটা জড়ুল আছে। কালো খয়েরি রঙের সে জড়ুল সাদা দাড়িতে ঢেকে থাকে। জলিল সে জড়ুলকেও টেনে কথা বলে। বলে, ‘আমরা নাকি ই দ্যাশের হাড়গোস্ত লয়, আমরা হলেম তুমার গলার জড়ুলের মুতন জড়ুল।‘ জুব্বার সে কথা শুনে বলেছিল, ‘মাটি খুড়ে দেখুক গা, ই দ্যাশ গড়তে আমাদেরও কম ঘাম ঝরেনি। আমরা ই দ্যাশের শুদু হাড়গোস্তই লয়, আমরা হলেম ই দ্যাশের লাড়িভুড়িও। রগরক্ত। ই দ্যাশ কেহু একটুখানি আঁচড়ালে সে আঁচড়ের দাগ আমাদের গায়েও লাগে।‘ সেই জুব্বারের মাথা মগজে এখন দুশ্চিন্তা। সে দুশ্চিন্তায় হাড়েও আতঙ্কের জ্বর থাবা বসিয়েছে। জুব্বারের যেন হুট করে আরও দশ বছর বয়স বেড়ে গেছে। ঘোলা চোখগুলো আরও খুঁটলে ঢুকে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। ধান গাছের শেকড়ের মতো মাথার আলুথালু পাকা চুলগুলো আরও ফেসে হয়ে উঠেছে। যে কটা চুল শুয়ে বেকে লেপ্টে চেপ্টে আছে সেগুলো যেন এই দুশ্চিন্তায় উঠে না যায়! কপালের ওপরে কালো ঘটাটা সম্মুখের টাকটায় জ্বলজ্বল করছে। জুব্বার তার এই নামাজের ঘটাটাকে নিয়ে কত গর্ব করে, ‘ই ঘটা হল মুমিনের চিহ্নোত। বেহেশতে যাওয়ার লিশেন।‘ সে কথা নিয়েও ঠেস মারতে ছাড়েনি জলিল। জলিল বলেছিল, ‘জান্নাত বেহেশতের লিশেন তো ম্যাল্লা বড়ই কল্লে, তুমি যে ই দ্যাশের লাগরিক তার লিশেন চিহ্নোতও করো। তা না হইলে যে ভিট্যেমাটি কিচ্ছুই থাকবে না। ফুঁ হাওয়া হয়ি যাবা।‘ সেদিন জুব্বার খচ্চর জলিলের কথায় অত না খচলেও সে মনে মনে গাছ-পাথরে দেওয়াল-ঘরে তাবিজ-কবোজে তারা পিড়ির পিড়ি যে এ দেশে বসবাস করে এসেছে তার নিশান খুঁজেছে। যদিও জুব্বার জানে এসব গাছ-পাথর আর তাবিজ-কবোজের নিশান সরকারের কাগজদস্তাবেজের আইনে গ্রহণযোগ্য হবে না। সে জন্যে লাগবে কাগজের নিশান। কোর্ট-কাছারির ছাপ মারা নিশান। সে নিশান হবে দলিল দস্তাবেজের। দাগ-খতিয়ানের। জুব্বার তখন আফসোস করেছে, এত্ত বেটাবিটি আর নাতিপুতি না পেলে যদি দাগ-খতিয়ান মারা এক কাঠা জমি পালতাম তাহলে হয়ত আজ রাষ্ট্রের এই ঘাড়ধাক্কা খেতে হত না!

কেউ কাউকে কোন কথা বলছে না। সবাই যেন বুকে একখানা পাহাড় ধরে দাঁড়িয়ে আছে। তবে মাঝেমধ্যে দপ্তরের মুখ থেকে কারও কারও গলা বাজানোর শব্দ ভেসে আসছে। সে ধমকানো চমকানো গ্যাংড়ানির ধারবার শুনে মনে হচ্ছে দপ্তরের আমলাদের গলার খ্যাঁকানি। তারাও ঠিক করে নিয়েছেন, এই লাইনে যারা দাঁড়িয়ে আছে তারা কেউ মানুষ নয়। অন্য দেশ থেকে ঢুকে পড়া গরু ছাগল। কলমের খোঁচা দিয়ে এ দেশ থেকে খেঁদিয়ে দিতে পারলেই বাঁচে। লাইনের সবার হাতে বান্ডিল কাগজ। সব অরিজিনাল দস্তাবেজ। জমির দলিল পচ্চার সঙ্গে নিজেদের জীবনের সব ফিরিস্তির পচ্চা। কি নেই তাতে! ষাট সালের দলিল থেকে শুরু করে হালফিলের খাদ্য সুরক্ষা কার্ড। মাগ ভাতারের বিয়ের প্রমাণ থেকে এই সেদিনের ভোটার স্লিপ। জুব্বার তো আবার সাথে করে তার সেই ছোট্টবেলার পা ভাঙার অপারেশনের কাগজগুলোও নিয়ে এসেছে। সে চোখ খুলে দেখিয়ে দিতে চায়, ঊনসত্তরে যখন তার গরুর গাড়ি থেকে পড়ে পা ভেঙেছিল তখন সে আর তার বাপ দাদো এ দেশেরই লোক ছিল। জলিল শুনলে হয়ত ঠেস মেরে বলত, ‘শুদু পা ভাঙার কাগজগুলেন ক্যানে তুমার মুসলমানির(সুন্নত) ক্ষুরটাও সঙ্গে করি লিয়ি আসতে পাইত্তাক জুব্বার। গবমেন্টের লোকগুলেনকে কান খুলি বুলি দিতাস, আমার য্যাখুন ই দ্যাশে নুনু কাটা হয়িছিল ত্যাখুন আজকের দ্যাশের রাষ্ট্রপোধানরা জন্মানইনি।‘ জুব্বার তো কাগজগুলোকে বগলে পুরে নিয়ে এসেছে। পাছে হাত থেকে পড়ে যায়। জুব্বার এতদিনে বুঝে গেছে, এই কাগজগুলো তার শরীরের রুহুর থেকেও দামি। শরীরে জান না থাকলে শুধু তার শরীরটা মারা যাবে কিন্তু কাগজগুলো না থাকলে যে তার বংশ নির্বংশ হয়ে যাবে! বেটাবিটি নাতিপুতি সব ‘নেই দেশ’এর লোক হয়ে যাবে! জুব্বার যখন সে কথা মনে করে পৃথিবীর মানচিত্রটাকে দেখে যে আল্লাহর এত্ত বড় দুনিয়ায় কোত্থাও তার জন্যে এক কাঠাও জমি নেই তখন তার ভেতরটা ধড়াক করে ওঠে। হু হু করে কাঁদে জান। এ নিয়ে আজ চোদ্দদিন লাইনে দাঁড়াতে হল। কখনও জুব্বারের বড় বেটা নুরুল তো কখনও নুরুলের বেটা জিনার তো কখনও আবার জুব্বারের বিটি জায়রা খাতুন। তবে জুব্বারের নিজের লাইনে দাঁড়ানো আজ দ্বিতীয়। গত হপ্তায়ও সে লাইনে দাঁড়িয়েছিল। দপ্তরের ফরমান ছিল বাড়ির সবচেয়ে সিনিয়র বাসিন্দাকে হাজিরা দিতে হবে। কাগজ তার থুত্থুরে হাতে থাকলেও সে কাগজ দিনরাত এক করে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জোগাড় করেছে তার চার বেটা তিন বিটি আর সতের নাতি নাতনি। জামাইরাও হাত বাড়িয়েছে। জুব্বারের কথায়, জান খাটা হয়ে গেছিল। সেদিন জুব্বার দেখেছিল লাইনে কেউ শক্তপোক্ত লোক নেই। কেউ লাঠি হাতে তো কেউ নাতির ঘাড় ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ির সিনিয়র মেম্বার বলে কথা। সে জুবুথুবু লাইনে জুব্বার পা সোজা না করলেও ঘাড় সোজা করে দাঁড়িয়ে ছিল। জানে না এ ঘাড় আর কতক্ষণ সোজা করে রাখতে পারবে। রাষ্ট্রের ঘাড়ধাক্কা বলে কথা। সে ধাক্কায় মানুষ দেশের সীমান্ত তো দূরের কথা আল্লাহর সীমান্তেই পৌঁছে যায়। দেশবাড়ি বলে কিচ্ছু থাকে না। সব আসমানবাড়ি হয়ে যায়। জুব্বার আসমানের দিকে তাকিয়ে কি সেই আসমানবাড়িকেই দেখছে? জুব্বার মনে মনে ভাবছে, জমিনের সরকার যেমন গায়ের জোরে ঠিক করে দিচ্ছে কে ‘দেশের’ বাসিন্দা হবে আর কে ‘নেই দেশ’এর বাসিন্দা হবে তেমনি আসমানের খোদাও ঠিক করে দেবেন কে দোযকের বাসিন্দা হবে আর কে হবে বেহেশতের বাসিন্দা। আসমান জমিন কোত্থাও যেন মানুষের কোন ক্ষমতা নেই। মানুষ শুধু হুকুম তামিল করার জন্যেই জন্মেছে। সে শুধু প্রভুর দাস মাত্র। আজ জমিনের মুরগি তো কাল আসমানের মুরগি। তবুও জুব্বার সেই আসমানের খোদার ওপরেই ভরসা রাখে। প্রত্যেকবার নামাজের শেষে দুহাত তুলে মোনাজাত করে, ‘হে খোদা, আমার জীবন তো ফুরিয়েই গেল, ব্যাটাবিটি লাতিপুতিদের লেগি তুমার দুনিয়ায় এক ছটাক মাটি থুইও।‘ জুব্বার জানে, আল্লাহর কাছে দুনিয়াদারির কিছু চায়তে নেই। দুনিয়ার জীবন আর ক-দিনের। আল্লাহর কাছের সব চাওয়াপাওয়া পরকালের হওয়াই ফরজ। তবুও জুব্বার দেশে মানুষ খেদানোর আইনটা আসার পর থেকে এই দেশের এক টুকরো ভিটের জন্যে আল্লাহর কাছে দোয়া মাঙে। জুব্বার জানে, ইহকাল হল পরকালের খেতি। আর ফসল হল আমল। ইহকালে ভালো ফসল ফলাতে না পারলে পরকালে যাবে কী করে। এই ফসলই তো পরকালের বেহেশতে নিয়ে যাবে। সুতরাং জুব্বারের কাছে পরকালের জান্নাত-বেহেশত, জান্নাত-বেহেশতের একর একর জমি আর সুন্দরি সুন্দরি হুরী পাওয়ার চেয়ে আপাতত এই পোকামকড় গরুছাগল আর হিন্দু-মুসলমান সাদাকালো মানুষের দুনিয়াতে এক কাঠা মাটি দরকার। একটা নিজের ঠিকানা। পিড়ির পিড়ি ধরে চলে আসা বংশের চিহ্ন।

বেলডাঙার গরুর হাটের মতো ভিড়। যেন দুনিয়ার সব মানুষ এই সদর অফিস চত্বরে জড় হয়েছে। হ্যাঁ, গরুই তো। নিজেকে গরুই মনে হচ্ছে জুব্বারের। হারানো গরু ফিরে পেলে যেমন তার ওয়ারিশকে দাঁত নখ তুলে গায়ে রঙে পরিচয় দিতে হয় তেমনি তাকেও হাড়হদ্দ খুলে রাষ্ট্রের কাছে প্রমাণ দিতে হচ্ছে যে সে এই রাষ্ট্রেরই একজন জীব। মানুষ পরিচয় তো পরের ব্যাপার। মস্ত ফটকটায় তিল ধারণের জায়গা নেই। এই ফটকটার পেছনের দেওয়ালেই টাঙানো আছে একটা ঢাউস নোটিশবোর্ড। এই বোর্ডেই সাটানো হবে লিস্টটা। সরকারের কড়া নির্দেশ, প্রকাশ্য স্থানে টাঙাতে হবে লিস্ট। হাঁটুর গিঁটে বাতের কামড় আর বুকের ভেতরে চিনচিন ধরা হাড়গিলে শরীরের জুব্বারের কাছে এই লিস্টটাই হল ইহাকালের শেষ বিচার। আর তাতে নাম থাকা মানেই ইহকালের বেহেশত পাওয়া। বাপ-ঠাকুরদার শেকড়ের অস্তিত্ব। ঘণ্টা খানেক অপেক্ষা করে আছে জুব্বার। শুধু কি জুব্বার একা? তার সাত পিড়ির চোদ্দ গোষ্ঠি হাজির হয়েছে এই সদর অফিসে। না থাকা বলতে কেবল কুলসুম। কুলসুম গত না হলে সেও জুব্বারের হাত ধরে বলত, সারাজীবন সুখে দুঃখে একসাথে থাকনু এই শ্যাষ বিচারের দিনে আমাকেও সাতে করি লিয়ি চলো। বোম গুলি না চালাতে পারি একসাতে কাঁদতে তো পারব? হাসি না কান্না, কী আছে কপালে জানে না জুব্বার। এই লিস্টে নাম না থাকা মানে তো আল্লাহর দুনিয়াদারিতেই নাম না থাকা? জুব্বারের শোনা কথা, আল্লাহ আগে দুনিয়াতে মানুষের রুজি আর হাওয়া-পানি-মাটি পাঠান তারপরে মানুষ পয়দা করে পাঠান। তাহলে তার কেন এক ছটাক জমিন থাকবে না? মাটি কি সরকারের না আল্লাহর? আল্লাহর মাটি নিয়ে মানুষের এত ফুটেনি! আল্লাহ কিন্তু এই নাফরমানি সহ্য করবেন না। আজাব গজব দেবেনই দেবেন। তখন ঠ্যালা বুঝবে, আল্লাহর কাছে ওরাও ওই বানের জলে ভেসে যাওয়া খড়কুটো।

এখানে আসার দেড় ঘণ্টার মধ্যেই লিস্টটা নোটিশ বোর্ডে দেওয়া হল। মাইকের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই হুড়মুড় করে লোক নোটিশ বোর্ডটার দিকে ছুটে গেল। লাইন ভেঙে হাট হয়ে গেল। যেন নোটিশ বোর্ডটার ওপর আধখানা দেশ ভেঙে পড়ল! জুবুথুবু জুব্বার একটু আগেই বিড়িটা ধরিয়েছিল। ডাক্তারের কড়া নিষেধ সত্বেও এই একটিমাত্র নেশা ছাড়তে পারেনি। বললে বলে, এই বিড়ির ধোঁয়াই ভেত্তরের লাড়িভুড়িগুলেনকে চির ঘুম থেকি বাঁচি রাখে গ। সে বিড়ি আধটান দিয়েই নোটিশবোর্ডটার দিকে ছুটল। মানুষের ভিড়ে যেন পিষে যাবে। তার এমন হুটপাট করে না গেলেও হত। বাড়ির কেউ লিস্টটায় চোখ বুলিয়েই নিলেই তো হল। কিন্তু জুব্বার সে কথা শুনবে না। তার হককথা, আল্লাহর শেষ বিচার তো নিজে দেখবেই দুনিয়ার মানুষের শেষ বিচারও সে নিজের চোখে দেখতে চায়।

দুই

জুব্বারের কোনভাবেই বিশ্বাস হচ্ছে না। তার এত বছরের পুরোনো হাড়-মাংস বলছে, এ বিচার প্রহসন। কাগজের নামই কি সব? বংশের শেকড়ের কোন মুল্য নেই? চোখের জল গাল বেয়ে টপ করে পড়ল মাটিতে। সে অশ্রু মাটিকে যেন বলতে চায়ল, এই মাটি তুইই সাক্ষি দে আমি তোর বুকেই জন্ম নিয়েছি। জুব্বার এবার ভেজা চোখ খুলে হাওয়াকে বলতে চায়ল, হে হাওয়া তুইও বলে দে, পিড়ির পিড়ি ধরে তুই আমার আর আমার পূর্বপুরুষদের রক্তে রক্তে ছিলি। এই সদর অফিসের চত্বরটা মুহূর্তেই কেয়ামতের মাঠ হয়ে গেল। সবাই বুক থাবড়ে হাইহাই করছে, আমার কী হবে আমার কী হবে! এই হাওয়া বাতাস মাটি জমিন সব পর! ডুকরে উঠল জুব্বার। আল্লাহকে দুষল, হে আল্লাহ তুমি এই দুনিয়াতেই আমার ব্যাটাবিটিদেরকে জাহান্নাম দিলা! জুব্বার তার বগলের কাগজগুলোর দিকে একবার তাকাল। আর একবার আসমানের দিকে তাকাল। তারপর থপ করে বসে মাটি থাবড়াতে লাগল। আর ডহন পিটতে লাগল, “এই মাটি তুইই বল, আমি তোর বুকে জম্ম লিইছি কি না।“



লেখক পরিচিতি:
সৌরভ হোসেন
গল্পকার।
পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদে থাকেন।
প্রকাশিত দুটি গল্প গ্রন্থ: "কমরেড ও অন্যান্য গল্প"( অভিযান পাবলিশার্স) এবং ২) "জমিনের আরশ" ( সৃষ্টিসুখ প্রকাশন)।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন