বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

নলিনী বেরা'র গল্প : মেখলীগঞ্জ তিস্তাপারে



ম্যাপটার উপর ঝুঁকে পড়ে দেখছিলাম, সাদার উপর নীল খয়েরি আর হলুদ রঙের ছিট ছিট। মেখলীগঞ্জের এস ডি ও সাহেবই দিয়েছেন। বড় নদী তিস্তা যেন নীল কালির দোয়াত থেকে উপচে পড়ে গড়িয়ে চলেছে মেখলীগঞ্জের ‘মেখলী’ হলদিবাড়ির ‘ড়ি’ দেওয়ানগঞ্জের ‘ঞ্জ’ আর কুচলিবাড়ির ‘কু’-কে আবছা ঢেকে দিয়ে। তার উপর এদিক-সেদিক ইতস্তত নীল সুতোয় বাঁধা পড়ে আছে সাতঙ্গা ধরলা সেমিজান আরও সব ছোট ছোট নদী, ছোট ছোট করে লেখা। খয়েরি রঙের উপর বড় বড় করে যা লেখা-- বোলদিহাটি চ্যাঙ্গরাবাঁধা হলদিবাড়ি কুচলিবাড়ি হেমকুমারী বিবিগঞ্জ আর মেখলীগঞ্জ। বলতে কী ম্যাপের ভিতর যত সব ঢালাও রং আমাদের আর রং শূন্য সাদা শুধু বাংলাদেশ। তার মধ্যেও কোথাও কোথাও যেন হলুদগাঁদার ফুল হয়ে ফুটে আছে আমাদেরই ‘তিন বিঘা আমাদেরই ‘ছিটমহল’। শুনছি এই কনকনে শীতেও সেখানে হলকা ক্যাম্প করে চোখে ঠুলি পরে ‘বর্ডার সার্ভেয়ারের’ দল প্রফেসর শঙ্কুর মতো যন্ত্রের সাহায্যে রাতের আকাশের তারা দেখে দেখে বর্ডারের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমা নির্ণয় করে চলেছেন। হলকা ক্যাম্পের হেরিকেনের আলো আর আমাদের ছিটমহল, বাংলাদেশের পাটগ্রাম-দহগ্রামের ডিবরির আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে এখন দু-দেশের আকাশেই কালো ধোঁয়া ছাড়ছে।

আমাদের কাজটা একটু অন্যরকম। কদিন আগেই কোচবিহার থেকে সরকারি তকমাআঁটা ‘অ্যামব্যাসাডার’ আমাকে নামিয়ে দিয়ে গেছে মেখলীগঞ্জ সার্কিট হাউসে। থাকছি বটে মেখলীগঞ্জে সার্কিট হাউসে, কাজটা কিন্তু চ্যাঙ্গরাবাঁধা ইন্দো-বাংলাদেশ বর্ডারে। কাজ বলতে ‘সুপারভিশন হ্যাঁজ টু বি মেড টাইটার ইফেকটটিভলি চেক হোয়েদার রাইস ইজ মুভিং উইদাউট দা ম্যান্ডেটরি রিলিজ সার্টিফিকেট’, তার মানে এককথায় চালের চোরাচালান রোধ করা। চাল তো নয়, এখানকার লোকেরা বলে ‘চাউল’। যেমন কলাঢ্যাপা চাউল, নিনিয়া চাউল। এসব লোকাল কলাট্যাপা নুনিয়াতেও আমাদের মন ছিল না, আমাদের মন পড়ে ছিল বর্ধমান-হুগলি-দুই দিনাজপুর-বিহার-ওড়িশা থেকে আনা ‘এক্সপোর্টারদের’ চালে। ওই যারা লেভি না দিয়ে চড়া দামে চাল পাচার করে দিচ্ছিল বাংলাদেশে।

মেখলীগঞ্জ সার্কিট হাউসটা একেবারে তিস্তার পাড়ে। সামনে পুবদিকে মেখলীগঞ্জ টাউন। বাজার এলাকায় তেমন গাছপালা না থাকলেও পশ্চিমে তিস্তার পাড়ে হরেক গাছপালা,ঝোপঝাড়– নিম লালি কাটলি টুনকাওলা চাপ গামার কাঁটাকই পিপলি শিমুল অমলতাপস, নাগেশ্বর।

মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে কুয়াশার ভিতর হাঁটতে হাঁটতে থানা, ফায়ার ব্রিগেড, ফুড অফিস, রামকৃষ্ণ মঠ, মেখলীগঞ্জ হাসপাতাল, পেট্রোল পাম্প ছাড়িয়ে টায়ারের মতো পিচরাস্তায় অনেকটা দূরে চলে যাই। চোখে মুখে ঝরে পড়ে কুয়াশার জল। ফেরার সময় অবশ্য কুয়াশা কেটে আলো ফুটে যায়। তখন কত কী আবিষ্কার করে ফেলি।

রাস্তার দু-ধারে সবুজ-পীত ছোট ছোট বুনো গাছ, মাথায় পীত-সাদা থোকা থোকা ফুল। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারি ওগুলো ধুলপি ফুল। ওভাবেই চিনে ফেলি ভাটি ফুল টেকিশাক কানসিসা বা দণ্ডকলসের গাছ। সজনে গাছে ফুল এসেছে ভরভরন্ত। আমে বউল। কাঁঠালগাছে ছোট ছোট কাঁঠালের কুসি কুয়াশার ধাক্কায় ঝরে পড়ছে রাস্তায়। ধাপড়া-মেখলীগঞ্জের মিনিবাস দাঁড়িয়ে আছে, রোজই দাঁড়িয়ে থাকে, পিছনে লেখা ‘আওয়াজ do'। আওয়াজ আসছে— “হঃ হঃ ডাইন-ডাইন-”। এত ভোরেও লাঙল নিয়ে মাঠে নেমে পড়েছে চাষি। হাদলা বা ছ্যাঁচার বেড়া দেওয়া চৌচালা, মিডডারি ভাঁজের কোনো একটা বাংলা ঘর থেকে দোতরায় ভাওয়াইয়ার সুর আসছে, হয়তো ওই গানটারই সুর, ওই যেন-- ‘ও তুই কিসেত গোঁসা হলু রে— চ্যাঙ্গরাবান্ধার চ্যাঙ্গরা বন্ধু রে—’

তবু সকালটা নয়, দুপুরটা। ঠিক দুপুরটাও নয়, দুপুর-বিকেলের মাঝখানটুকুই আমাকে গ্রাস করে রাখে, কেননা ওই সময়টায় সে আসে। সে আসে ধীরে।


দুই

মেখলীগঞ্জের থেকে তেরো কিলোমিটারের পথ চ্যাঙ্গরাবাঁধা। সকাল দশটার ভিতর বর্ডারের গেট খুলে যায়। আমরাও প্রায় সাড়ে নটার ভিতর বর্ডারে পৌছে যাই। আমরা বলতে আমি, আমার সহকর্মী সৌমিত্র আর মেখলীগঞ্জ থানা থেকে পাঠানো ‘লা মানচার দন কিহোতের’ মতো দুজন শীর্ণকায় লাঠি ও দর্শনধারী হোমগার্ড।

যেতে যেতে ডাইনে-বাঁয়ে মাঝে মাঝেই হঠাৎ হঠাৎ কাঁটাতারের বেড়া। গোল গোল কাঁটাতারের ঘেরা জাল, গোলকধাঁধা আর সেই ধুলপি ভাটি দন্ডকলসের গাছ। কাঁটাতারের ওধারে বাংলাদেশ, এধারে ‘ইন্ডিয়া’। বলা বোধহয় ঠিক হল না-- কাঁটাতারের বেড়া থেকে দেড়শো গজের ভিতর পর্যন্ত আমাদের ‘ইন্ডিয়া’, আমাদেরই খেতিখামার, তামাকপাতা, আলুবাঁধাকপি-সর্ষেফুল। তারও ওধারে বাংলাদেশ। এপারে চ্যাঙ্গরাবাঁধা, ওপারে বুড়িমারী।

পুলিশ, কাস্টম, বি এস এফ, দালাল, সাদা অ্যাপ্রন গায়ে হু’-এর লোকজন, হরেক কর্মী ইউনিয়ন, নর্থবেঙ্গল মোটর কর্মী সংঘ, ওপারের লোক, এপারের লোক। তার উপর একের পর এক লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বিহার-বাংলা-ইউপি-ঝাড়খণ্ড-নাগাল্যান্ড-পাঞ্জাব-ওড়িশার মাল বোঝাই ট্রাক, ড্রাইভার-খালাসি-এক্সপোর্টার, এক্সপোর্টারের লোকজন, আশপাশের বস্তির লোকজন, তার উপরেও কুকুর-ছাগল-শুয়োর-পাখিপয়ালে জায়গাটা গমগম করে।

আমরা ট্রাক ধরে ধরে চালের স্যাম্পেল, রোড চালান, সাপ্লায়ার-এক্সপোর্টারদের নামধাম মেলাচ্ছি। মাণ্ডি ট্যাক্স, ভ্যাট জমা করেছে কী করেনি, ট্রাক ড্রাইভারের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে যাতায়াতের ‘ইন্টারস্টেট’ বা ‘ন্যাশনাল পারমিট’ আছে কী নেই, ডালখোলা দিয়ে ঢোকার সময় সিল-তারিখের ছাপ্পা পড়ল কী পড়ল না— সব ধরে ধরে মেলাচ্ছি। এক্সপোর্টারের নাম : ব্রিজকিশোর প্রসাদ; সাপ্লায়ার : মা মুণ্ডেশ্বরী ট্রেডার্স, চেনারি-তেলারি, রোহতাস, বিহার; ট্রান্সপোর্টার :কমল ট্রান্সপোর্ট, জি টি রোড, সাসারাম। ট্রাক নম্বর দেখে দেখে এইমাত্র দুটো ট্রাক ও কে করলাম। মাথার উপর বটগাছ থেকে একঝাঁক বট-ঘুঘু উড়ে গেল।

‘জিরো পয়েন্ট’ থেকে আমাদের ক্যাম্পটা একটু দূরে, ভি আই পি মোড়ের কাছাকাছি। মেখলীগঞ্জের বিডিও সাহেবই বাঁশের ছ্যাঁচারি আর বন্যাত্রাণের ত্রিপল দিয়ে একটা শেড বানিয়ে দিয়েছেন টেম্পোরারি। আমরা সেখানেই পাকাপোক্তভাবে বসে আছি। ট্রাকের পর ট্রাক আসছে-- কোনোটা চালের, কোনোটা পেঁয়াজের, কোনোটা কমলালেবুর, কোনোটা আপেলের, কোনোটা বোল্ডারের, নদী-বেড থেকে পাথর তুলে এনে চালান করে দিচ্ছে বাংলাদেশে। ট্রাক আসছে, আর আসছে চারধার আচ্ছন্ন করা ধুলোর ঝড়। আমরা কোনোমতে মাথায় টুপি,নাকে রুমাল চেপে চালান দেখে দেখে ট্রাকগুলো ও.কে করছি। আমাদের ধারেকাছেই আরও কয়েকটা ছোট-বড় চৌয়ারিঘর। কোনোটা চায়ের দোকান, কোনোটা হোটেল, কোনোটা বা ‘নর্থবেঙ্গল মোটর কর্মী সংঘের’। শ্রমিক ইউনিয়নের। একটা ‘হু’-এর। সাদা অ্যাপ্রন জড়িয়ে ‘হু’-এর কর্মীরা বেছে বেছে খালি ছুঁচ ফুটোচ্ছে ড্রাইভারদের।

ট্রাক আসছে, ট্রাক থামছে। গাড়ির জানলা খুলে ট্রাক ড্রাইভার লাফিয়ে নেমে পড়ছে। কেউ কেউ গাড়িতেই বসে থেকে জানলার পাল্লা খুলে ধরে খালি মুখ বাড়াচ্ছে। যে নামল সেতো খুপরিতে ঢুকলই, যে নামল না তার কাছে লোক চলে এল খুপরি থেকে। ‘স্লিপ’ নিয়ে ড্রাইভাররা গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছে। ততক্ষণে খুপরির কেউ না কেউ নামিয়ে নিচ্ছে ড্রাইভারের সিটের পিছনে রাখা গোটাকতক আপেল কী কমলালেবু। এত দ্রুত ও মসৃণভাবে সব কিছু ঘটে যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা এ জন্মেরও নয়, গত জন্মের।

তারপর তো এল দুপুরটা, ঠিক দুপুরটাও নয়, দুপুর-বিকেলের মাঝখানটা।


তিন

ওই একটা-দেড়টা। ওই পর্যন্তই ব্যস্ততা। তারপর তো শুনশান। শুনশান শুনশান। গাছের একটা পাতা নড়ে না, বটগাছ থেকে আচমকা ঝাঁক বেঁধে ডানা ঝাপটিয়ে উড়ে যায় না বটঘুঘু। ট্রাকগুলোও সারি বেঁধে রাস্তার দু-ধারে ঝিমোয়। কতক যাবে এখনও ওপারে, কতক ওপারে খালি করে এসে গেছে এপারে। আমি সার্কিট হাউস থেকে খেয়েই বেরিয়েছি। হোমগার্ড দুজন খেতে গেছে ফাঁড়িতে নিজেদের মেসে। সহকর্মী সৌমিত্রও এই ফাঁকে ঢুঁ মেরে আসে নিজের অফিসটায়। অন্যান্য খুপরিগুলোয় কেউ আছে বলেও মনে হয় না। সবাই আশপাশের লোক, খেতে গেছে যে যার ঘরে, দুপুরের খাবার। ক্যাম্পে একাই বসে আছি।

ছোটখাটো একটা মোষের সাইজের শুয়োর বেশ অলস ভঙ্গিতে রাস্তা পারাপার করল। কতিপয় ছাগল এ খুপরি সে খুপরির আশেপাশে ঘুরে ঘুরে ঘাড় নিচু করে কমলালেবুর খোসা চিবোচ্ছে। চোখের সামনে ওই তো একটা গ্রাম, গাছগাছালি, বাঁশবন, দড়িতে কাপড় শুকোচ্ছে। এক সাইকেলিয়া যেন শুকনো পাতার উপর খোসোর-মোসোর সাইকেল চালিয়ে অনেকদূরে চলে যাচ্ছে। কামিজে ঢাকা গৃহবধূ আচমকা ঘর থেকে বেরিয়ে উলুভুলুক চেয়ে আছে এদিকেই।

এসময়ই হাওয়াটা উঠল। উঠল কী, ‘রোল’ খেতে খেতে গড়াতে গড়াতে যেন এল। ঝরন্তি জলের মতো পিচরাস্তায় ধুলো গড়াচ্ছে এখন। ‘ধুলধুল ধুলি/তিন নোগুলে তলি।’ দুধারে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লরিগুলোর তলায় সে ধুলো ঢুকে যাচ্ছিল, আর সে ধুলোর উপর একটা ঈষৎ কালো ছায়া খেলে বেড়াচ্ছিল। ছায়াটা ট্রাকগুলোর তলা দিয়ে তলা দিয়ে খেলতে খেলতে যেন এগিয়ে আসছে। সামনাসামনি হতেই ছায়াটা স্পষ্ট হল, সে এতক্ষণ ট্রাকগুলোর নম্বর দেখে দেখে ধুলোর বিপরীতে হাঁটছিল। একজন স্ত্রীলোক, বয়েস বড়জোর তিরিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। সুশ্রী ও স্বাস্থ্যবতী।

‘এইঠে তোমারগুলার কাম কী?’
‘চালের ট্রাক ধরে ধরে চেক করা।‘
‘এই ট্রাকটা তোমরা ধইরলেন?’

বলেই সে একটা দুমড়ানো মুচড়ানো কাগজের চিরকুট বাড়িয়ে ধরল। ‘সোর্স’ ভেবে কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলাম একটা ট্রাকের নম্বর ইউ পি সিক্সটি ওয়ান এফ-7851। ‘না, কিন্তু কী ব্যাপার বলুন তো?’

মহিলা আমাদের ক্যাম্প ঘরটির খুঁটি ধরে এপাশ ওপাশ দুলতে দুলতে বলে চলল, ‘ইটা মোর সোয়ামির ট্রাক। মোর ঘরত সোয়ামি নাই। বিয়া করি ঢেল দিন আগোত মোক ছাড়ি উয়ায় পালাইলোং।’
‘কোথায়?’
‘কয় জানে, ইউ পি না বিহার!’
‘খুঁজতে গেলেন না?’
‘মুই না যাইম। এইঠে এলায় ট্রাকগিলার নাম্বার ধরি ধরি খুঁজি যাই। আইজ না হয় কাইল শালার বেটা শালা চ্যাঙ্গরাটাক পামোয় পাম্।’

বলেই মেয়েটা যেন হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, নাকি ‘নর্থবেঙ্গল মোটর কর্মী সংঘের’ শিবুবাবুকে আসতে দেখে পালিয়ে গেল ঠিক বুঝতে পারলাম না। যখন ভাবছি- আজ হোক কাল হোক, ‘ইউ পি সিক্সটি ওয়ান এফ-7851’ ট্রাকটাকে আমরা ধরবই ধরব-- তখনই শিবুবাবু বলে বসলেন, “মাইয়াটার কোনোয় শরম নাই। ফ্যাকাল্টি মাইয়া। ইউ পি-র এক ড্রাইভারের সঙ্গে তার ছিল ‘কারগিল লাভ’।”


চার

সাড়ে চারটা-পাঁচটার ভিতর বর্ডার বন্ধ হয়ে যেত। আমাদেরও আর কোনো কাজ থাকত না। হাঁটতে হাঁটতে ভি আই পি মোড় থেকে চলে যেতাম জিরো পয়েন্টের দিকে। তার আগেই বি এস এফের টহলদারি ক্যাম্প। দুজন জোয়ান বন্দুক উঁচিয়ে টহল দিচ্ছিল। একজন উত্তরপ্রদেশ, আরেকজন ছত্তিশগড়। কাঁটাতারের বেড়ার গা ঘেঁষে, সোজা চলে গিয়েছে ‘সি পি ডবলিউ’র পিচ রোড। রাস্তাটা নয়, কাঁটাতারের বেড়াই যেন টেনে নিয়ে যাচ্ছিল আমাদের। বি এস এফ-কে বলেই আমরা হাঁটতে লাগলাম। পুব থেকে পশ্চিমে। কাঁটাতারের দৈর্ঘ্য বরাবর সূর্যঅস্ত যাচ্ছিল, তার যেন একফালি এদিকে, আরেকটা ওদিকে।

আমাদের বাঁ পাশে, কাঁটাতারের বেড়ার ওদিকে দেড়শো গজের ভিতরেও আমাদের ‘ইন্ডিয়া’। বাংলাদেশের লোকেদের ওখানে চলাফেরার অধিকার নেই। তবু তো দিব্যি বসে আছে বুড়িমারীর একঝাঁক মেয়ে। যেন সব ‘উড়ানি কৈতোর’। পাখনা মেলে রোদ পোহাচ্ছে। বি এস এফ জোয়ান হাতের তালি মারলেই উড়ে উঠবে ফুড়ৎ করে। ডানধারে আমাদের চ্যাঙ্গরাবাঁধা। ঢালু জমিতে খেতের পর খেত সবুজ ফনফনে হয়ে উঠেছে তামাকের গাছ, তামাকপাতা। একেকটা হাতির কানের মতো। রোদে শুকিয়ে পাতার উপর পাতা দিয়ে থাক থাক সাজাতে হয়। এক হাজার পাতার একটা বান্ডিল একশো টাকা। হাটেও নিয়ে যেতে হয় না, ঘরে এসে মহাজনই নিয়ে যায়।।

কথা ছিল পিচরাস্তা বরাবর বেশিদূর ভিতরে না গিয়ে ফিরে আসার। চুক্তিমতো ফিরে এসে দেখি-- বি এস এফ চৌকিতে এক জোয়ানের দু-পায়ের পাতার উপর পা দিয়ে তিন সাড়ে তিন বছরের এক শিশু দাঁড়িয়ে। গলায় কালো কারে ঝুলছে একটা তাবিজ। খালি গা, পরনে একটা হাফ পেন্টুল। পেন্টুলের উপর দিয়ে ঝুলছে কোমরের ঘুনসির দড়ি। বেরিয়ে আসা অতিরিক্ত দড়িটা মুখে পুরে চুষছে ছেলেটা।

উত্তরপ্রদেশিয় জোয়ান জানাল ছেলেটার নাম ‘সানা’। বাপ নেই, মা আছে-- ওই তো থাকে ছ্যাঁচার-টাটি ঘেরা চৌয়ারি ঘরে। মা মুসলমান, বাপ কেরালিয়ান, সে এক বি এস এফ জোয়ান। এর জন্মের আগেই সে পালিয়েছে। পারমানেন্ট বিয়ের কথায় চাকরিই ছেড়ে দিয়েছে। আমাদের কথাবার্তার মাঝখানে ছেলেটা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকাচ্ছিল আমাদের মুখের দিকে। একঝাঁক বটের ঘুঘু উড়ে গেল আমাদের মাথার উপর দিয়ে ঝাটাং পাটাং।

বি এস এফ জোয়ান আরও বলল--নাকি এরকম ঘটনা তো আকছারই ঘটছে! মেয়েরাই গায়ে পড়ে ভাব জমাতে আসে। তার বলার ভঙ্গিতে আমার মনে পড়ে যাচ্ছিল, সমরেশ বসুর গল্প ‘কে নিবি মোরে’। যেন, ওই যে যারা ‘উড়ানি কৈতোরের’ মতো রোদে পাখা মেলে বসে আছে, তারা উদ্বাহু হয়ে বলছে ‘কে নিবি মোরে’ ‘কে নিবি মোরে’। শুধু এক রাতের জন্য নয়, সারারাত সারাজীবনের জন্য। কোনো রং-ঢঙে নেই, বি এস এফ জোয়ানদের সঙ্গে তারা যেন পারমানেন্ট ঘর বাঁধতেই আগ্রহী। মনে মনে ভাবছি, তাই কী? এতই সস্তা? সবই কি ‘কারগিল ভালোবাসা?’ কানের কাছে কে যেন গেয়ে উঠল, ‘ও সখী রে নাকাই তোরে গুয়ারে সখি নাকাই তোরে পান। যৈবনে না মানে সখী হেন্দু মুসলমান’।।


পাঁচ

জিরো পয়েন্ট থেকে কুড়ি কিলোমিটার পর্যন্ত রাস্তায় সূর্যাস্ত ও সূর্যোদয়ের মাঝখানের সময়টায় ট্রাক চলাচলের উপর সি আর পি সি-র ১৪৪ ধারা বলবৎ আছে। সূর্যাস্তের পরেই আমরা টহল দিতে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তাম। কোনোদিন চালের ট্রাক ধরা পড়ত, কোনোদিন পড়ত না। যেদিন পড়ত না, গাড়ি ঘুরিয়ে চলে যেতাম তিন বিঘায়। যত না তিন বিঘার প্রতি আকর্ষণ, তার চেয়েও বেশি আকর্ষণ ছিল ওই হলকা ক্যাম্প, ওই যেখানে প্রফেসর শঙ্কর মতো চোখে ঠুলি পরে যন্ত্র ঘুরিয়ে তারা দেখে দেখে বর্ডারের অক্ষাংশ-দ্রাঘিমা নির্ণয় করে। সন্ধ্যা না হলে তো আকাশে তারা ফোটে না। এখানকার লোকেরা ‘সন্ধ্যা’ বলে না, বলে ‘সৈঞ্জা’। তাই অপেক্ষা করতাম কখন ‘সৈঞ্জা’ হবে, কখন আকাশে তারা ফুটবে।

সন্ধেও হত, আকাশে তারাও ফুটত, কিন্তু কোনোদিনই দেখা হত না রহস্যময় ‘বর্ডার-সার্ভেয়ারের’ দলটার সঙ্গে। মঘা ফাল্গুনী শতভিষা অশ্বিনী ভরণী অশ্লেষা কৃত্তিকা-- কোথায় কখন কোন কোন তারা নিয়ে তারা যে ব্যস্ত থাকত! আমরাও আটকে থাকতাম তিন বিঘায়। করিডর দিয়ে পাটগ্রাম থেকে দহগ্রাম, দহগ্রাম থেকে পাটগ্রামের দিকে লোক চলাচল দেখতাম। তবে সে আর কতক্ষণ ! দহগ্রাম-পাটগ্রাম, দু-ধারের গেটেই তালা পড়ে যেত কাঁটায় কাঁটায় ছটায়। সেই বলে না, ‘হাকিম নড়ে ত্যাং হুকুম নড়ে না’।

তিন বিঘার জন্য নয়, বর্ডার সার্ভেয়ারের দলটার জন্যও নয়, আমার মন আনচান করত সন্ধ্যা-রাত্রি-সকাল পেরিয়ে সেই দুপুরটার জন্য। ঠিক দুপুরটার জন্যও নয়, দুপুর-বিকেলের মাঝখানটুকুই আমাকে যেন হাতছানি দিয়ে ডাকত। সেই বেচারা তুলার মাশুল আদায়কারী লোকটার মতোই চালের লেভি আদায়কারী আমিও যেন কী একটা নেশার জালে জড়িয়ে পড়েছি! তবে গল্পের ছেঁড়া পাতার পিছনে পিছনে এ ঘর ও ঘর ঘুরে বেড়াচ্ছি না, বরঞ্চ ছেঁড়া পাতাগুলো জুড়ে জুড়ে দেখছি গল্পটা সম্পূর্ণ হয় কী না। সম্পূর্ণ করতেই হবে। আর তা যেন এক্ষুনি।


ছয়

ক্যাম্পে বসে চালের স্যাম্পেল দেখতে দেখতে আমরা কথা বলছিলাম তুলাইপঞ্জি চাল নিয়ে। না, তুলাইপঞ্জি চাল এখানে পাওয়া যায় না। সে পাওয়া যায় দুই দিনাজপুরে। দেরাদুন রাইস বাসমতী রাইসও না, যা আসছে সবই ‘নন-বাসমতী সুপার ফাইন’। কেউ একজন বলল, ‘সুপার ফাইন না ডুপার ফাইন, এ্যাগিলা হৈলো বোল্ডার চাউল।’ সত্যি সত্যি কালো ‘মাছি’ আর লাল ‘গ্লাইনে’ ভর্তি। ‘কিন্তু বোল্ডার চাউল ? সেটা আবার কী?’ সেই লোকটাই বলল, ‘বোল্ডার চাউল পাথরের নাখান শক্ত, যা এক ঘণ্টাও সেদ্ধ না হয়।’ বললাম, ‘তাহলে খাবে কী করে বাংলাদেশের মানুষ?’ এক্সপোর্টার মূলচাঁদ বুচ্চা বললেন, ‘অরা বোল্ডারমোল্ডার সবই খায় স্যার।‘ আঁতকে উঠলাম, বলে কী লোকটা? রীতিমতো ভর্ৎসনা করে বললাম, ‘এসব বোল্ডার-মোল্ডার কালো মাছি লাল দানা ভর্তি অখাদ্য চাল চড়া দামে অভাবের বাংলাদেশে বিক্রি করে দিতে আপনাদের লজ্জা করছে না?’ ফাচারু চ্যাংড়ার মতো হাসছেন মূলচাঁদ বুচ্চা।।

আজ আবার ওপার থেকে আসছিল একটার পর একটা তুলোর ট্রাক। সব বাংলাদেশ পরিবহনের ট্রাক। প্রায় ট্রাকের ডিজেল ট্যাঙ্কে বাংলায় লেখা—‘জন্ম থেকেই জ্বলছি’। আমাদের ধুলোয় ঢেকে দিয়ে ট্রাকগুলো চলে যাচ্ছিল নগর চ্যাঙ্গরাবাঁধায়। চলে যাচ্ছিল, তুলো নামিয়ে দিয়ে ফের ফিরেও আসছিল। তারপরেও কত ট্রাক এল, কত ট্রাক গেল, কত ট্রাক যে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকল, এখনও দাঁড়িয়ে আছে! কত এক্সপোর্টার তাদের আই ই সি দেখাল, আমিও কত ট্রাক ড্রাইভারের পারমিট পরীক্ষা করলাম। ভ্যাট মান্ডি ট্যাক্স-- কিন্তু সব কিছুই যন্ত্রবৎ। আসলে আমার মন পড়েছিল সেই দুপুরটায়, ঠিক দুপুরও নয়, দুপুর-বিকেলের মাঝখানটায়। আসলে আমি মনে মনে তৈরি হচ্ছিলাম--কখন সে আসে, কখন সে আসবে!

দুপুরটা এলও। যেন শর্ত মেনে সঙ্গের হোমগার্ডদুটিও চলে গেল খেতে। জানতাম এ সময়টায় অফিসের কাজে সৌমিত্রও যাবে, চলে গেল সে। আশেপাশের খুপরিগুলোও ফাঁকা হচ্ছিল। ফাঁকা ফাঁকা। মোষের মতো নধর গতর শুয়োরটা রাস্তা পেরোল বড় অলস ভঙ্গিতে। নিধুয়া বাঁশঝাড়ের পাশ দিয়ে দ্রুত প্যাডেল করে ধুলো উড়িয়ে চলে গেল এক সাইকেল আরোহী। কাটলি গাছটার উপর কাউয়াদুটো ঝিমোচ্ছে। চিড়িক করে ডেকে উঠছে না একটা দুটো ‘টেউরি’ও। চড়া রোদে মাথা নুইয়ে দিয়েছে কানসিসা বা দণ্ডকলসের গাছগুলি। একটা হুইসলিং টিল, না টিল নয়, যেন এক ফাচারু চ্যাংড়া হারমোনিয়ামের একটাই রিড চেপে ধরে আছে, চেপে ধরে আছে তো আছেই, আর অনর্গল বেজে চলেছে হারমোনিয়ামটা। একটানা, একঘেয়ে।

ওপার থেকে একটা হাওয়া এল, এপার থেকেও একটা হাওয়া উঠল। দুটো হাওয়া জড়াজড়ি করে ধুলোর ঝড় তুলল। ধুলোর ভিতর চোখ বুজে ফেললাম। আর তখনই কানের কাছে কে যেন বলে উঠল, ‘মোর ঘরত সোয়ামি নাই’। চোখ খুলে দেখি, হাওয়াটা ‘রোল’ খেতে খেতে চলে যাচ্ছে। সেই দু-ধারে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রাকগুলো, হাওয়াটা রোল খেতে খেতে ট্রাকের তলায় ঢুকে গেল, ঈষৎ কালো একটা ছায়া রোল খেতে খেতে গড়াতে গড়াতে সামনাসামনি হয়ে ফের বলল, “সেই ট্রাকটা তোমরা ধইরলোং ?” ‘ইউ পি সিক্সটি ওয়ান এফ-7851’? না, না। “মুই কার সাথে যাঁও? কেরালা কি এইঠে?” যেন ফিসফিসিয়ে বলল হাওয়াটা। “মরদ আসিল, মিটমাট করিবার তানে দুই লাখ টাকা দিবার চাহিল, মুই রাজি না হৈলাম। সগলে মোকে কহিল ‘ডাউনিয়া’ ‘ফ্যাকাল্টি মাগি....’ হাওয়া এসেছিল, হাওয়া চলে গেল। তার মায়ের সঙ্গে সানাও এসেছিল, সানা চলে গেল।

কিন্তু সেই ফাচারু চ্যাংড়া বা ফাজিল ছেলেটা হারমোনিয়ামের রিডটা এখনও ছাড়েনি। চেপে ধরে আছে তো আছেই। টুকরোটাকরা জুড়েও গল্পটা এখনও পুরা হয়নি, হচ্ছে না। হয়তো ছেঁড়া পাতা কিছু উড়ে গেছে হাওয়ায়। হাওয়ায় রোল খেতে খেতে যখন গেছে, তখন হাওয়ায় ফের ভাসতে ভাসতেই এসে যাবে। এখন শুধু অপেক্ষা একটা পালটা হাওয়ার।

প্রার্থনা করছি, হাওয়াটা উঠুক বোলদিহাটি হলদিবাড়ি কুচলিবাড়ি হেমকুমারী বিবিগঞ্জ মেখলীগঞ্জ দহগ্রাম পাটগ্রাম তিনবিঘা বুড়িমারী চ্যাঙ্গরাবাঁধায়। হাওয়াটা উঠুক তিস্তা সাতঙ্গা ধরলা সেমিজানের কাকচক্ষু জলে। গল্পটাও পুরা হোক--পুরা হোক পুরা হোক পুরা হোক--

সত্যি সত্যিই হাওয়া উঠল। পালটা হাওয়া। জিরো পয়েন্টের ওদিক থেকে জড়ো হওয়া হাওয়া পিচরাস্তার উপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে ভি আই পি মোড়ের দিকে ছুটে চলল। তিস্তা সাতঙ্গা ধরলা সেমিজানের জল হাওয়ার ধাক্কায় সিঁড়ি ভাঙছে। ছেঁড়াখোঁড়া তাপ্পি মারা গল্পটা এবার পুরা হচ্ছে-- পুরা হচ্ছে পুরা হচ্ছে পুরা হচ্ছে--

এসময়ই তারা এল। তারা দুজন। একজন নারী একজন পুরুষ। পুরুষটা পুরোপুরি অন্ধ। “জয় রাধে জয় নিতাই” বলে তারা এসে দাঁড়াল। অন্ধ পুরুষটার হাত ধরে লাল শাড়ি পরা প্রৌঢ় হাত বাড়াল, ‘বাহে দুই-চাইরখান পয়সা দেও।‘ খুচরো পয়সা ছিল না, একটা আস্ত দশ টাকার নোটই প্রৌঢ়ার হাতে গুঁজে দিলাম। তারপর থেকে অপেক্ষায় আছি, অপেক্ষায়-- কখন তারা গদগদ হয়ে বলে উঠবে, ‘ঈশ্বর তোমার মঙ্গল করুন’ বা বলবে, ‘আল্লা তেরা ভালা করুন’। নাহ তারা ওসব মঙ্গল-টঙ্গল আল্লা-টাল্লার ধারেকাছেও গেল না, তারা বলল, ‘তোমারগুলার বেশি বেশি করি কামাই হোউক!’ প্রথমটায় ঠিক বুঝে উঠতে পারিনি, চমকে উঠে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘কী বললেন?’ ভিখারি দুজন, হেমকুমারীর নগেন রায় আর সুরবালা রায়, হাসি হাসি মুখ করেই বলে গেল, ‘তোমারগুলার বেশি বেশি করি কামাই হৈলে হামারগুলাও দুইটা পয়সা বেশি পামো।‘

হারমোনিয়ামের রিডটা আর বাজছে না, গল্পটাও পুরা হল না। হাওয়া উঠেছিল, হাওয়া আমাকে আছড়ে ফেলে চলেও গেল।।



লেখক পরিচিতি
নলিনী বেরা
জন্ম পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার গোপীবল্লভপুরের নিকট বাছুরখোয়াড় গ্রাম। ছোটবেলা থেকে দারিদ্রের সাথে লড়াই করে পড়াশোনা করেছেন তিনি। তাঁর শিক্ষা সম্পন্ন হয় মেদিনীপুর কলেজে ও পরে নকশাল আন্দোলনের কারণে ঝাড়গ্রাম রাজ কলেজে। ১৯৭৮ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্য ও সরবরাহ দপ্তরের আধিকারিক হিসাবে চাকরিতে ঢোকেন। কবিতা লেখা দিয়ে তার সাহিত্য জীবন শুরু। ১৯৭৯ সালে নলিনী বেরার প্রথম গল্প বাবার চিঠি দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তিনি পল্লীপ্রকৃতি নিয়ে সমাজসচেতন সাহিত্যরচনায় পারদর্শী। তাঁর উপন্যাসগুলি হল শবরচরিত, কুসুমতলা, ফুলকুসমা, দুই ভুবন, চোদ্দ মাদল, ইরিনা এবং সুধন্যরা, এই এই লোকগুলো, শশধর পুরাণ ইত্যাদি। চার দশকের সাহিত্যচর্চ্চায় তিনি অজস্র ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেছেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন