বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

আয়েশা খাতুনের গল্প : মন্তরট শিখলি বটে


মনের ভিতরের একটা জানালা খুলে দিয়েছে নীরালি , নামের বৃতান্ত নাইবা জানলে তোমরা শুধু এইটুকু জেনো যে তার নাম নিরালি , মেয়ে ছাড়া কাকে নিয়েই বা কবিতা আর কাকে নিয়েই বা গান গল্প বলো ! বড়ো লাচার বাবো, ইঞ গালমারা ক্যা শুনবে ? ইয়া তো লিতকার গালমারা , এই তো ধর ক্যানে চয়ত মাস্যের র‍্যোদ বটে গো মাথার অপরে বারটা চান্দুবুঙ্গা মাথাটকে ফাটিন্দিচ্ছে র‍্যোদে , মাটিটর অপরে ট্যাংট তো রেখায় যায় না ,কেন্তনা সি কুন ছুটু থেকে গোগোর তি ধরে আগুনের অপরে হ্যাটে হ্যাটে পায়ের তুলাটতে তো ঘুড়ার পারা লুহার ল্যাল পিন্দে লিয়েছি , মাটিট ক্যামুন লিজের হুয়ে যেলছে আপনি থেকেই। তো কুথা যাব্বো কুন ব্যাগে যাব্বো গো ! বাবোকুড়া কুন ব্যাগে যাব্বো ?

ভাবছিস কি, দুঃখের গালমারাট কুরতে আসেছি ? না না উটও তো লিতকার গালমারা বটে,ইঞ কথাটর খানিক ফারাক আছে বৈকি । হ্যেয় গো তুরাতো আমাদেরকে আমাদের উড়া থেকে ,জুমি থেকে , বুন থেকে , ডাহার থেকে ঘুটু থেকে গাড্ডা থেকে তাড়ীন্দিলি, আমাদের ডাঙ্গারা আমাদের কাড্ডা ,মেরম ,গেডে সগুলি ক্যাড়ে লিলি , আমাদের মরদ গুলানকে তুদের উড়ার মুনিশ করে লিলি ,আমাদের কাটিকাটি গিদরে গুলানকে তুদের ঘরের বাগাল করে লিলি , আমাদের প্যাটে আখুন তুদের গিদরে ভরে দিলি , কী দুঃখের গাল মারা আমাদের! এই গালমারাট আখন লিতক্যের আর লয়খো, ইয়াট এক মস্তবড়ো জানুমঘূটুর পারা বহু পুরোন কিসসা বটে । কুনু দিন আমাদের গিদরে যদি আমাদের প্যাটে ধরে জন্ম দিতে পারি তো তারা এই কিসসাট তালের পাতাতে ঝাড়ের পাতাতে জজোর পাতাতে ল্যাখে রেখবে ,ই গালমারা ট তুখে শুনায় তে আসেনি খো গো বাবোকুড়া!

তো যে গালমারাট আমি শুনায়তে আসেছি সিটো বুলি তুখে, শুনেছি নাকি বিনা ছুরিবুঠিতে দিকুদেরকে মারেছিস ,তু নাকি বিনা ছুরিবুঠিতে হড় দিকে ম্যারেছিস? বিনা রকতে সব দিকু হড় নাকি মর‍্যে যেলছে মোড়ে বছ্যোরের ল্যাগে? ওই মরাগুলা নাকি পচব্বে নাখো , খেরাপ হব্বে নাখো, লশট হব্বে নাখো ? ওই মরা দিকু গুলান নাকি জ্যান্ত লাশ হুয়ে ঘুরে বেড়ায়ছেয় । যে দিকু গুলান তুদের ল্যাঠ্যালছিলো আমাদেরই জ্যাত ভায় ছ্যিলো হড় ছিলো তখুন, সেই হড় গুলান দিকু হুয়ে গ্যালো , আমাদের সব ক্যাড়ে কুড়ে লিয়ে তুদের আগ্নেতে হুড়ুর তলা ব্যান্ধ্যে দিয়েছ্যেলো ,বাবালো সেকি র‍্যাগ দিকু গুলার ,যদি বুলত্যাম , হারে তু ক্যামুন করে এতয়ই খুন খারাবি কুরছিস আমাদের সাথে ! তু তো আমাদেরইপারা হড় ছিলিসর‍্যা ! এ কুথাট শুনেই তাদের কি র‍্যাগ গুসা ! বাব্বালো চড় চাপড় ম্যারেও চুপ হতোই নাখো , একট ঠ্যিঙ্গা দ্যাখ্যানে বলত কি, বিশি বিশি বুলবি যদ্দি এই ঠ্যাঙ্গাটকে তুদের পোঙ্গা দিয়ে ভরে দুব্বো ।

এ সব কুথা শুনে জানের ভ্যাতরট থরথর করে বতরে ক্যাঁপে উঠত,বাবা লো ক্যারা দ্যাশে আইলো ! মরদটকে কুথা পাব্বো সি তো ক্যার উড়াতে মুনিষ হুয়ে পড়ে আছে ? কুন শুঁড়ির মদেরসালে মাতাল হুয়ে ঘুমিন আছে! আমাদের তো দেবতা নাইখো আমাদের তো শয়তান নাই খো আমাদের তো মাটি আর নাই খো আমাদের তো সুন্মান নাই খো ,আমাদেরত গিদরে নাই খো আমাদের তো নিন্দোর বিলা নাই খো, আমরা তো শুয়োর গুলান মতো বুটি, যতই ঠ্যিঙ্গা দিয়ে মার ক্যানে মরবোই না , আমাদেরকে যতই তাড় ক্যানে আমরা আলামারা হবোই না , আমাদেরকে যতই মাটি ছাড়া কর ক্যানে মাটি আমাদেরকে ছাড়বেন না । আমরা যত দউড়ব আমাদের গতর থেকে ততই মাটির চ্যাঙ্গোড় ছ্যাড়ে ছ্যাড়ে পড়ে আমাদের মাটি হবে জুমই হবে গাড্ডা হবে ,তুরা লারবি গো আমাদেরকে তাড়িন দিতেয় ।

দ্যাখ ক্যানে কথাট সত্যিই বটে কি লয় ? আমাদের মতুন হড়দেরকে ম্যারতে ম্যারতে আমাদের উড়াকুড়ি কাড়তে কাড়তে যখুন তুরা দিকু হুয়ে আমাদের তাড়ছিলিস তখুন আমরা ঝ্যোড়ের পারা বাতাসে লিজেদেরকে উড়িন লিলাম পাহাড়ের পরবতের অপরে । আমরা যখুন জানুম ঘুটু ,জজ ঘুটু ছ্যাড়ে ,রল্কানালি ছ্যাড়ে কালো মাথামুটা মরাখোকো ডুরা গুলার পারা কালো পাথর ধরে ধরে পাহাড়ের মাথায় উঠছিলাম তখুন তুরা দাঁড়িনে আমাদের বতর দেখেছিলিস ,আমাদের ঝরে পড়া ঘাম দেখে ছিলিস আর হাসতে হাসতে মাটীতে উলটিন উলটিন পড়ছিলিস ,আমাদের কুড়িগুলান কে তখন তুরা লিছিলিস তাদের রোঃ-দায় দেখবার শুনবার সুময় ছিলই না , লিজের জানটকে বাঁচাবো বলে র‍্যা! আমাদের এই দুঃখের গান দিকুদেরকে শুনাইতে যায়নি কুনু দিন, উয়োরাতো দিকু , হড় লয়খো ,দ্যাখ ক্যানে আমাদের দুঃখের গান শুনতে শুনতে কালোকালো পাথর গুলান তাদের গতরের পাশে ঘাস জনম দিল ,মেরম ডাঙ্গারা গুলার জনম দিলো তাদের বুকে আমাদের বসতে দিইলো নিন্দোবিলা দিইলো,তিঙ্গুতে বল দিইলো, মকায় দিইল্‌ চুহা দিইলো ,মাদলের কাঠ দিইলো , চামড়া দিইলো, বাঁশের বাঁশি দিইলো, বুকে মুন দিইলো, জিভে লাগাম দিইলো আর আমদের চোখে শরম দিইলো , মাথার আগুন কাড়েলিলো মাথায় বুদ্ধি দিইলো আর বলল বাইরের ধর্ম থকে দূরে ছিলিস আর দূরেই থাকিস মুনের ধর্ম গাছটতে দাঃ ঢালিস । তাইতো করছিলোম , কেন্তনা এই কথাট শুনে আমি তুর কাছে আলোম গো বাবোকুড়া , এই কুথাট জানবার ল্যাগে জি তু কি মন্তর শিখেছিস বটে, তুদের বুঙ্গার কাছে যে বিনা ছুরিবুঠিতে দিকুদেরকে মারেছিস ,তু নাকি বিনা ছুরিবুঠিতে হড় দিকে ম্যারেছিস? বিনা রকতে সব দিকু হড় নাকি মর‍্যে যেলছে, মোড়ে বছ্যোরের ল্যাগে? ওই মরাগুলা নাকি পচব্বে নাখো , খেরাপ হব্বে নাখো, লশটো হব্বে নাখো ? ওই মরা দিকু গুলান নাকি জ্যান্ত লাশ হুয়ে ঘুরে বেড়াইছেয় । হ্যেয় গো এই মন্তরটর নাম নাকি গণ তন তর ?

বাবালো ই কথাট শুনে তো আমাদের বুকের ভ্যাতরট আবার রিমিলের পারা আঁচল পাঁছল কচ্ছে গো, হ্যায় দ্যাখ কেনে হ্যায় কথাট শুনে ক্যামুন লান্দায় লাগছে মুনে । এই মন্তরটর নাম নাকি গণ তন তর ?

দ্যাখ ক্যানে ত্যামউন করে কি আর বলার আছে ,আমাদের গোগোর মুখের কথাট কবে ভুলে গেলছি আখ্যুন মুখে ঝড়াম ঝড়াম করে বাংলা বেরেয়, ঝড়াম ঝড়াম করে হীনদি বেরেয় , আগে গুরু গুলান হড়ভাষা বোজত আখ্যুন খুবই বাংলা বোজে , আবার বাংলা গুরু গুলান ছ মাসের কাগজের সাথে গালমারা করে আমাদের অলচিকিটকে হাজম করতে শিখ্যাছে আর আমাদের অলচিকিট তে নাকি বাঙলার গুরু গুলান চাকরি করছ্যে আর ঝুড়িতে ঝুড়িতে ঘ্যাঁস না খিয়ে বড্ডই টাকা খাচে? তা ই কথাট তো লান্দাবারি কথা আছে নাকি বুলতও বাবোকুড়া !

নীরালির থামা নেই কথার শেষ নেই,এখন যেন সে এক আষাঢ় নদী । ছাপিয়ে ছাপিয়ে নদীর দুকুলকে ভিজিয়ে দিয়ে যায়।

বাবোকুড়া নিরলজের মতো বসে আছে নীরালিদের ঘর থেকে চুরি করে নিয়ে আসা সেই রাজ সিংহাসনে যার চারিবেড়ে পাহারা দিচ্ছে সেই হড় থেকে দিকু হয়ে যাওয়া খাশটে রঙের পোশাক পরা দিকুরা।

বাবোকুড়ার হাত নিসপিস করছে নীরালিকে ধরবার জন্য ,নীরালি মাটির মেয়ে তার গায়ে আছে হরিণের মাংস,যে মাংসের গন্ধ বাবোকুড়াদের মাতাল করে।বাবো কুড়ার মাঝে মাঝে ঘুম পাচ্ছিল কারন ওই হরিণের মাংস সে ক্ষণে ক্ষণে খায় আর দিকুরা যোগান দেয়। বাবোকুড়ার ঝিমুনি দেখে নীরালি খলখল করে হেসে উঠল,নীরালি এবারে প্রশ্ন তুলল । হ্যায় বাবোকুড়া আখন তো আর আমাদের উড়া-কুড়ি নাই খো কেন্তনা তুদেরতো উড়া চায় যিথা আগুন লাগাবি মুনের সুখে ,তুদের তো কুড়ি চায় যাখে নিয়ে ঠ্যিঙ্গা ঢুকাবি মুনে সখে ,তাহলে কি তুরা সি কামট কে থামিন দিলি ?

এ কথা বলে নীরালি একবার তার শরীরটাতে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল ,তাতো হতেই পারে না – তদের তো শুয়োরের জিল যায় ই চায় । তাহলে কি এবারে দিকুদের উড়াতে আগুন দিলি আর দিকুদের কুড়ি নিয়ে ঠ্যিঙ্গা গাতি কচ্চিস হে হে আমার তো লান্দায় পাছে, ইঞ ইবারে খানিক বুদ্ধি করতে পারছি । দিকুরা আখন নাকি কেবলই গুরু নিয়ে পদ্য ল্যাখছে , গুরু নিয়ে গল্পল্যাখছে, গুরুগুলানকে পেটে ধরছে , গুরুর জনম দিচ্ছে, দিকুর চেহে নাকি আখ্যন গুরুর চড়া বাজার ? হে হে আমার তো খুব লান্দায় পাছে, বাবোকুড়া এই দিকু গুলান এক দিন হড় থেকে দিকু হুয়ে গ্যালো তুদের ডরে জান বাঁচাতে। বাবোকুড়া দিকুদের একবার শুধা ক্যানে, যার তুদের ভয়ে লিজের জান বাঁচাতে হড় থেকে দিকু হুয়ে ছ্যালো আজ কি গুরুর ভয়ে জান বাঁচাতে দিকু থেকে গু---রু হয়ে যাবে ?

হড় ভাষার শব্দ গুলোর মানে (ইঞ – আমার, গালমারা- আলোচনা , চাঁন্দুবুঙ্গা- চাঁদ ও সূর্য দেবতা, গোগোর – মায়ের , তি- হাত , উড়া- ঘর, ডাহার-রাস্তা, ঘুটু- ছোট টিলা অথবা পাহাড়, গাড্ডা – নদী, ডাঙ্গারা – গরু, কাড্ডা- মহিষ ,মেরম-ছাগল ,গেডে-হাঁস, কাটিকাটি- ছোট ছোট, গিদরে- বাচ্চা ছেলে , জানুমঘূটুর- কুলেরপাহাড় , ঝাড়ের – গাছের ,জজো-তেঁতুল , দিকু- বাঙালী, হড়-মানুষ (আদিবাসী মানুষ ), মোড়ে- পাঁচ , হুড়ুর- ধানের, ঠ্যিঙ্গা- লাঠি, বতরে- ভয়ে, উড়াকুড়ি – ঘর কন্যা, নিন্দোবিলা- রাত বা ঘুমের সময় , রোঃ-দায়- চোখের জল বা কান্না , তিঙ্গুতে-পায়ে,চুহা- ইঁদুর , দাঃ- জল , বুঙ্গার- দেবতা,রিমিলের- মেঘের, লান্দায়- হাসছে, গুরু- গরু,অলচিকিট- সাঁওতালি অক্ষর , জিল-মাংস, গাতি- খেলা)



(হিউম্যান রাইটস লইয়ার )
শান্তিনিকেতন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন