বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

আফসার আমেদের গল্প : সঙ্গ



সংসারে মায়ামমতা কোথায় যেন লুকিয়ে থাকে। বেরিয়ে আসে তার সময়মত। সংসারের জীব মরিয়মের পক্ষে সেই মায়ামমতাকে আটকানো সম্ভব নয়। নিষ্ঠুরতার কাছাকাছি গিয়েও ফিরে এসেছে। বুকের পাতায় নরম ও আর্দ্রভাব আজও সে হারিয়ে ফেলে নি। সংসারে মন ও শরীরের নানা খাতে নানা খরচ হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত, তবুও স্নিগ্ধ যথেষ্ট রয়ে যায় মতিনের জন্য। মতিন তার স্বামী। বিবাহিত তিরিশটা বছর জ্বালিয়ে খাক করেছে তাকে। এখন লোকটা আরো বুড়ো, ক্ষয়াটে এবং শয়তান হয়েছে। তার সঙ্গে অভিমান বোধও সমানতালে দেখিয়ে যায়।

দুই ছেলের বউ হয়েছে। এক মেয়ের বিয়ে দিয়ে জামাই পেয়েছে। কম বয়সী আরো দুটি ছেলে ও এক মেয়ে আছে মরিয়মের। একেবারে ভরা সংসার। ঝমঝম করছে। একটুও ফুরসৎ নেই তার থেকে বেরিয়ে আসার। লোকটা সংসারের মধ্যে থেকেও কোথায় যেন হারিয়ে থাকে। পানটা সুপুরিটা অথবা একটু চা দেয়ার ভেতর মানুষটার প্রতি মায়া উসকে ওঠে এক এক সময়। আবার লোকটা এই ভরা সংসারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা পাকালে তীব্র হয়ে ওঠে মরিয়ম। তখন মনে হয়, লোকটার কোনো অধিকার নেই এই সংসারের শান্তি ভঙ্গ করবার। স্বাবাভিক ভাবেই তখন মরিয়ম খেপে যায়। আর তখন লোকটা ঝোলায় লুঙি গামছা নিয়ে হুগলির এক গ্রামের মসজিদে ইমামতি করতে চলে যায়। অভিমানবশত। গ্রামের মসজিদে পাঁচ অক্ত আজান দেয়, নামাজ পড়ায় আর বাড়ি বাড়ি খেয়ে দিনগুজরান করে। এবং গুটিকয় ছেলেমেয়েদের আলিফ বে তে পড়ায়। এসব কাজ মৌলবিরা করে। লোকটা কিন্তু মৌলবি না হয়েই এসব করে। সংসার থেকে পালিয়ে যাবার জন্যেই এসব করে। সংসারে থাকার অভ্যাস যে মানুষটির তার পক্ষে এ ব্যবস্থা বড় কষ্টকর। এ ব্যবস্থায় যায় শুধুমাত্র মরিয়মের প্রতি অভিমানবশত। সংসারে জ্বালানো-পোড়ানো মতিনের স্বভাব। মতিনের জ্বালানো-পোড়ানো মেনে নিলে সব ঠিক আছে। না নিলে, লোকটা মৌলবির বেশ ধরে পালাবে।

মরিয়ম ভাবে, একদিক থেকে মতিনকে এ সংসারে থাকতে দেয়াটা মরিয়মের ইচ্ছের ওপর নির্ভর করছে। মরিয়ম চায় থাকুক। লোকটার প্রতি মায়ামমতা দেখালই না হয়। তার জন্য মতিনের অনেক বদভ্যাস ও খারাপ আচরণ মেনে নিতে হচ্ছে মরিয়মকে। থাকুক লোকটা। তিরিশটা বছর নিয়ে তো আছে লোকটাকে!

বেলা দশটা থেকে রান্নাঘরে নানারকম রান্নাবান্না করতে করতে মরিয়ম নিজেকে সংযত করছিল। মেয়ে জামাই এসেছে। তাদের জন্য রান্নাবান্না ভালমত করতে হচ্ছে। তখন বুঝি বেলা এগারটা বেজে গেছে। গ্রীষ্মের দিন। বড় বেশি অগ্নিময়তা। একটু বাতাসের জন্য ওষ্ঠাগত হয় প্রাণটা। শরীরও আরাম পেতে চায়। দুপুরে একটু না ঘুমলেই নয়। দুই ছেলের বউয়ের দুটি ঘর। মেয়ে জামাই তাদের ঘরটা দখল করেছে। পাশের ঘরটাকে মতিন একাই দখল করে আছে। মরিয়ম নিজের স্বার্থের কথা ভাবলে, মতিন যদি চলে যেত, তাহলে দুপুরে অথবা রাত্তিরে পা ছড়িয়ে আয়েশ করে ঘুমতে পারত। তা পারছে না, তবুও লোকটা চলে যাক এটা চায় না মরিয়ম। থাক। মেয়ে জামাইয়ের জন্য খাওন দাওনের তোড়জোড় করতে বড় বেশি পরিশ্রম হচ্ছে, — তবুও।

কোথায় যেন একটা পাখি মিষ্টি সুরে ডাকছে। কোথায়? কোনদিকের গাছপালায়? রান্নাঘরে রান্না করতে করতে মরিয়ম দিগনির্ণয় করার টুকরো অবকাশ পায় না। কিন্তু পাখিটার ডাকের প্রতি এক মনোযোগ থাকে তার। পাখিটার অবস্থান নির্ণয় করতে গেলে রান্নার আয়োজন থেকে সে সরে যাবে। হয়ত তাকে রান্নাঘরের ছোট ঘুলঘুলি দিয়ে দেখতে হবে। অথবা একটু বাইরে বেরিয়ে এসে দাঁড়াবে। তাতেও যদি পাখিটার অবস্থান খুঁজে না পায়, তাহলে ঘাটের দিকে তাকে আপন মনে দাঁড়াতে হতে পারে। সে রকম ব্যাপারটা তার পক্ষে হয়ে উঠল না। কেননা মেয়ে-জামাই আসার জন্যে ভীষণরকম সে রান্নাবান্নায় ব্যস্ত। অথচ পাখিটাকে নিয়ে নিজের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালে ভালই লাগত তার।

আর কিভাবে যেন ভিজে থাকছে মতিনের প্রতি। মাঝে মাঝে মতিনের বদ অভ্যাস চোখে পড়লেও মতিনের পক্ষে সে থেকে যাচ্ছে। হয়ত তার মেয়ে জরিনা জানে না।

জামাইয়ের জন্য ডিম ভাজবে বলে, ঘর থেকে ডিম আনতে গিয়ে দেখে একটা কাঁচা ডিম চুষে চুষে খাচ্ছে। | দেখে গা জ্বলে যায় মরিয়মের। এই লোকটা কিনা মৌলবি, সে মসজিদে ইমামতি করে? নিজের রাগ দাঁতে পিষে রাখল মরিয়ম। কিছু বলল না। বরং একটু নরম স্বরেই বলে, ‘কিগো, এত বেলা হয়ে গেল, এখুনো গোসল করে এলেনি?’

‘কেন, খাবার দাবার সব হয়ে গেল নাকি?' লোভী চোখ দুটো নেচে ওঠে মতিনের। ‘অনেক ভাল ভাল রান্না করেচিস বঝি আজ? খুব খুশবু ছাড়ছে কিন্তু।’

“যাও দিকি, গোসল করে এস।’
‘যাব, একটু চাখতে দিবি ?’
দাঁত কিড়মিড় করতে করতে খামোশ খায় মরিয়ম।।
‘গোস্ত বেঁধেছিস ত ? যাব?’
মরিয়ম কিছু বলল না মানে নীরবতাই সম্মতি।।

রান্নাঘরে এসেছে। পেছন ফিরে দেখে, লোকটা পেছু পেছু চলে এসেছে। জিভে জল সরছে লোকটার। সামলে নেয় নিজেকে মরিয়ম। এক টুকরো মাংস দেয় মতিনকে।
মতিন উবু হয়ে বসে সেটা খাচ্ছে।
মরিয়ম পাশ ফিরে মতিনকে দেখে। কথা বলতে চায়। আলমকে বলে দেব, ‘তুমার জন্যে একখানা লতুন থামি এনে দিবে।’

‘আর গেঞ্জি ?’
‘গেঞ্জির কথাও বলব।'
‘জামাইকে বলেছি, জুতোর কথা।।

চমকে ওঠে মরিয়ম। জামাইকে বলেছে, জুতো কিনে দেওয়ার কথা? কি বে আক্কেলে লোক। ভেতর ভেতর প্রচণ্ড খেপে ওঠে মরিয়ম। কিন্তু প্রকাশ করে না। থমকে থাকে। গুম মেরে থাকে। জামাইয়ের কাছে মান ইজ্জত সব দিয়ে দিল।

একটু রান্নার দিকে তাকিয়েছে তো মতিন সট করে পালিয়েছে রান্নাঘর থেকে! বড় ক্লান্তি লাগে, জীবনটাকে এতদূর পর্যন্ত টেনে আনার শান্তি নেই। না আছে সুখ, না আছে স্বস্তি। মন সহসা একটু খারাপ হয়ে ওঠে মরিয়মের। নির্জনে কোনো গাছ পেলে, মনের কথা তাকেই শোনাত, এমনই তার মনের দুঃখ।

এখান থেকেই দেখা যায় মেয়ে-জামাইয়ের ঘরের ভেতরটা। রান্নাঘরে থাকা অবস্থায় মেয়ে-জামাইয়ের ঘরের দিকে তাকে লক্ষ রাখতেই হয়। ওদিকে লক্ষ রাখলে জামাইয়ের আঙিনায় বেরিয়ে আসার মহূর্তটা বুঝতে পারে মরিয়ম। তখন সে গায়ে ঢাকাটুকি দিতে পারে, মাথায় আঁচল তুলে দেবার যথেষ্ট সময় পায়। না হলে, হঠাৎ ঘর থেকে জামাই বেরিয়ে এলে লজ্জায় পড়ে সে, অপ্রস্তুত হয়ে যায়। এই তো প্রথম জামাই।

ঐ ঘরে মেয়ে জামাই দুজনেই আছে। তাদের সঙ্গে ছোট মেয়ে সাবিনাও আছে। জামাই তার ছোট শালির সঙ্গে খুনসুটি করছে। দেখল, মেজ ছেলের বউ, জামাইয়ের ঘরে গেল ঠাট্টা ইয়ার্কি করতে। সেলজ হয়। মেজ বউ কাঁচা পোয়াতি। বারো দিন হল খালাস হয়েছে। ওকে কাজ করতে দেয় না মরিয়ম। তোলা ভাত-পানি দেয়। মেয়ে বিইয়েছে। মেয়েটাকে ঘুম পাড়িয়ে ননদাইয়ের ঘরে খুনসুটি করতে গেল। করুক। যাক।।

বড় বউ পুকুরঘাটে মাজাঘষা ও ধোয়াপাকলা করতে গিয়েছিল। মরিয়ম মুখ তুলতেই দেখতে পেল বড় বউ পুকুরঘাট থেকে ফিরল। রান্নায় জোগাড় দেয় ওরা, কিন্তু কাউকেই রান্নায় বসিয়ে সুখ নেই মরিয়মের। নিজের সংসারে নিজে রান্নার কাজটা হাতে রাখলেই সুখ। বড় ছেলে পাড়ায় পাড়ায় ঘর সরা জিনিশ ফিরি করে। ফিরিওয়ালা। আর মেজ ছেলে চাষে জন খাটে। ওরা কেউ নেই এখন। সবাই কাজে।

একটা ছাগল আছে মরিয়মের। বোনের কাছ থেকে সাতদিনের বাচ্চা এনে আজ বড় করেছে। এখনো গলায় ঘুঙুর বাঁধা থাকে। উঠোনে চলাফেরা করলে বেশ শব্দ হয়। মরিয়মের ভাল লাগে। সেটা আবার পোয়াতি হয়েছে। এইসব নিয়ে তার সংসার।

সাবিনা কি বলেছে তো জামাই আলতাফ সাবিনার হাত ধরে খপ করে। সাবিনা শালিখ পাখির মত চেঁচামেচি করে। জরিনা তক্তপশে বসে পা দুটি নিচে নামিয়ে দিয়ে দোলাতে থাকে। মেজ বউ সাবিনার অন্য হাতটা ধরে টানছে। হাসির হররা আর দাপাদাপি ঘর জুড়ে।

মেজে ঘষে আনা থালা-বাসনগুলো নিয়ে রান্নাঘরে ঢোকে বড় বউ। এখনও পেটে ছেলে ধরল না। চার বছর বিয়ে হয়ে গেল। বাসন-কোসন রেখে বড় বউ গেল বাকুলের দড়িতে ধোয়া পাকলা কাপড়গুলো শুকোতে দিতে। সবদিকে নজর আছে মরিয়মের। সংসারের মধ্যে এক মনোরমতা আছে।

বাইরে থেকে মতিন সাবিনাকে ডাকে।
সাবিনা বেরিয়ে আসে জামাইয়ের ঘর থেকে।
মতিন বলে -- ‘জামাইয়ের পাকিট থেকে পয়সা লিয়ে যা ত মা বিড়ি কিনতে।’
উৎকর্ণ ছিল মরিয়ম। বুক ফেটে যায় মরিয়মের। কি বলে বে আক্কেলে লোক!

সাবিনা তার বোনাইয়ের পকেট থেকে পয়সা নিয়ে বাপের জন্যে বিড়ি কিনতে চলে গেল। বাপভাতারি মেয়ে! মনে মনে জ্বলতে থাকে মরিয়ম।

পাখিটা বুঝি আবার ডাকে। সংসারের মনোরমতাকে আরো বাড়িয়ে দেয় পাখিটা। ঘাট, আগান বাগান জুড়ে মনোরমতো ছড়ায়। পাখিটার অবস্থান খুঁজে বেড়ানোর অবকাশ নেই মরিয়মের।।

আঙিনায় বসে লোকটা বিড়ি খায়। একটু পাশ ফিরে দেখে মরিয়ম। হ্যাংলার মত জামাইয়ের কাছ থেকে পয়সা চেয়ে নিয়ে সে পয়সায় বিড়ি খাচ্ছে। একটু রাগারাগি করলেই চলে যাবে হুগলি জেলায় মসজিদে ইমামতি করতে। মরিয়ম কি চায়, লোকটা চলে যাক? না থাক। একটু উলটোপালটা করছে, করুক। কিছু বলবে না। প্রাণ যে রাগে ছটফট করে না তা নয়। গোপনভাবে রাগে নিজের কলজে নিজে ছিঁড়তে থাকে।

মরিয়ম আঙিনায় আসে। ‘শুন, তুমি গোসল করতে যাও।’
‘গোসল করে এলেই ভাত পাব ত?’ ‘
‘হ্যাঁ।’
‘রাগ করচিস, আমার উপর ?’
‘না ত।’
‘পিঠ চুলকাচ্ছে খুব, একটু ঘামাচি মেরে দিবি।’
‘এখন কী করে পারব?’
‘ও তাই ত।’ বিড়ি টানতে থাকে মতিন।

ঘামাচি মেরে দিল না বলে মতিনের মুখে সামান্য ব্যথা ফুটে উঠল। সেটা দেখতে পায় মরিয়ম। মতিনকে সে চিনবে না তো কে চিনবে! বেয়াড়া আবদার করলে কি চলে? এখন ফুরসৎ কোথায়? এই ছোটখাটো অনাদরে মতিন ব্যথা পায়, কিন্তু রাগ করে না।

মরিয়ম ঘরের ভেতর এসে পান ভাঙে। একটা পান নিজে খায়। অন্য খিলিটা নিয়ে মতিনের কাছে যায়। পানটা মতিনকে বাড়িয়ে ধরে।

মতিনের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। রান্নাঘরে ফিরতে ফিরতে মরিয়ম দেখল, মতিন গামছা কাঁধে গোসল করতে চলেছে।
সাবিনা রান্নাঘরে ছুটে এসেছে। বোনাইকে নিয়ে কাঁচা আম খাবে, নুন লঙ্কাগুঁড়ো আনতে এসেছে। ‘ও মা চাচা এল?’
‘কে এল?' সাবিনার কথায় ভাল করে কান দেয়নি বলে শুধোয় মরিয়ম।
‘বোম্বের চাচা,নিশার চাচা।’ নুন লঙ্কা নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যায় মেয়ে।

‘তাই নাকি?’ মনটা খুশিতে ভরে যায় মরিয়মের। তাদের পাশের বাড়ির মরিয়মের চাচাতো দেওর। বোম্বেতে দর্জি লাইনে কাজ করে। প্রায় আটমাস পরে ফিরল। বুকের ভেতরটা মরিয়মের কেমন ধক করে ওঠে। এই দেওরটাকে কতদিন না দেখে তাকে থাকতে হয়। আর এই দেওরটার সঙ্গে মরিয়মের ভাব। বোম্বে থেকে ফিরলে সারাক্ষণ এখানেই কাটায়। মাঝে মাঝে চা করে দেয় আর পান খাওয়ায়। মরিয়ম সংসারে কী করল, এসব গল্প শোনাতে ভালবাসে। আর নিশারও নানা গল্প শোনায়। বোম্বে থেকে এলে নিশারের সঙ্গে গল্প করে বেশ কাটে মরিয়মের। মরিয়মের মনের ভেতরটা আনন্দে ছেয়ে যায়। বেশ ফুরফুরে হয়ে ওঠে।

মনটা ভেতরে ভেতরে ছটফট করে। নিশারের সঙ্গে তার কোনো খারাপ সম্পর্ক নেই। কথা বলার সম্পর্ক। সংসারে সকলের সাক্ষাতেই তাদের কথা চলে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা। পান আসে, চা আসে। নিশারের বউ মাঝে মাঝে উঁকি দিয়েও যায়। আসলে সঙ্গ পেতে ভালবাসে মরিয়ম। অনেক সময় যেমন মতিনের সঙ্গ চায় মরিয়াম। একটু আগে যেমন চাইছিল, চাওয়ার মন সে পেতে রেখেছিল। মরিয়মের চাওয়াটা মরিয়মের ওপরই নির্ভর করে।

মেয়ে জামাই আরো দুচারদিন থাকবে। একটা ঘর মেয়ে জামাইকে দিয়েছে। বাকি ঘরটা মতিন সারাক্ষণ দখল করে রাখলে নিশারকে বসতে দেবে কোথায় ? সংসারের নানা কথা মরিয়মের পেটের ভেতর ফুটছে। নিশারেরও কত কথা জমা আছে। মেয়ে জামাই থাকলেও অবসরে কথা বলতে পারবে না কেন? তারা যখন কথা বলে চেঁচিয়ে চেঁচিয়েই বলে। মেয়েরা এসে শুনে যায়। বউরা দরজা গোড়ার আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনে যায়। কোনো গর্হিত কিছু নয়। সংসারের নানা কথা। পাড়ার লোকের নানা কাণ্ডকারখানার খবর সে দেবে। চমৎকার মন ভাল থাকবে মরিয়মের। ভেতর ভেতর অস্থির হয়ে ওঠে মরিয়ম। মন যেন তোলপাড় হয়ে চলেছে। যখনই ফেরে নিশার চেহারায় অন্যরকম হয়ে ফেরে। হয়, চুলের ধরন বদলায়। নয়ত, স্বাস্থ্য ভাল হয় অথবা রোগাপানা হয়। এই মুহুর্তেই নিশারকে দেখার জন্য মন আকুলি-বিকুলি করে ওঠে মরিয়মের। হাঁড়িতে চামচ অস্থিরভাবে নাড়ে। হাতের অস্থিরতায় থালাবাসন ঝনঝন করে পড়ে যায়। বুকের ভেতর ভারি নিঃশ্বাস ধাক্কায়।

একটু যে উঠে দাঁড়িয়ে জানালার ঘুলঘুলি দিয়ে একবার নিশারদের আঙিনায় চোখ চালাবে, তার ফুরসৎ নেই মরিয়মের। কেননা, সে তরকারি কষছে। একটু সরে গেলে তরকারি পুড়ে যাবে।

কচি কচি ছেলেপুলে নিয়ে, নিজের গতরের জোরে সংসার চালিয়ে এসেছে মরিয়ম। লোকটা সংসারের কাজে আসেনি কোনোদিন। ঝোড়া চুবড়ি বনে, তেলই পাটি বুনে, জ্বালুন কুটো কুড়িয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করেছে নিজেই মরিয়ম। নিশার জানে, তখন থেকেই নিশারের সঙ্গে কথা বলে মনে সুখ পেয়েছে মরিয়ম। এখন সংসার ভরা সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে। ছেলেরা বড় হয়ে রোজগার করছে।

কেন যে মনে হয়, সে ভাল শাড়ি পরে নেই, গায়ে বাস সাবান মাখেনি কতদিন! এখন মনে হয়, তার মন ভাল থাকার জন্য নিয়মিত গায়ে বাস সাবান মাখার দরকার। নিশার এসেছে বলে নয়। একটু ভাল শাড়ি পরলেও মন ভাল থাকে। মনকে যত্নে রাখার কথা উদয় হয় মরিয়মের মনে। মন একটু গুছনো গাছানো না থাকলে চলে!

পেছন ফিরে আঁতকে উঠতে গিয়ে থেমে যায় মরিয়ম। গায়ের কাছে মতিন কখন এসে বসেছে জানতে পারেনি। ‘তুমি আবার গায়ের কাছে এসে বসলে কেন?”

‘খেতে দিবি যে? গোসল করে এনু?’
‘এখুন? এখুন তোমাকে খেতে দোব? রান্না শেষ হয়নি, জামাইকে খেতে দিইনি, তোমাকে আগে খেতে দোব?’
‘এখেনে আর একবেলা থাকলে ত, তোর রান্নাভাত আর খাবনি? খেয়ে দেয়ে বেরিয়ে পড়ব খানাকুল।’
‘তাই যেও।’ রাগত স্বরে দাঁত কিড় কিড় করে ওঠে মরিয়ম।

মতিনের অভিমান হয়। বসে বসে পা ঘষে। মরিয়ম যখন রাগ করে তখনই এই কথা বলে, মরিয়মের রাগ কমায় সে। তখন আর রাগ করে না। কেননা, মরিয়ম তাকে চাওয়ার এক ব্যাপার আছে। সংসারে মরিয়ম তার সঙ্গ চেয়ে থাকে। কিন্তু এখন এই মুহুর্তে, মতিন হুগলির খানাকুলে মসজিদে ইমামতি করতে চলে যাবে, বলল, তাতে রাগ প্রশমিত করল না মরিয়ম। অভিমান করে মতিন। মতিন বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।

অত অভিমান বোঝার ইচ্ছে আর নেই মরিয়মের। যেটুকু পারে, তা হল মতিনকে ভাত বেড়ে এখনই খেতে দেওয়া। রান্না শেষ না করে মতিনের জন্য ভাত বাড়তে থাকে সে। মন ঘন নিবিষ্ট করে রাখে। কপালে আঁকিবুকি, ঢেউ। নিজের মনে থাকার অভিনিবেশ।

সাবিনা আসে। মরিয়মের পেছন এসে দাঁড়ায়। থমকে যায়। ‘মা, আব্বা খানাকুল চলে যাবে বলে ব্যাগ গুচোচ্ছে।’
‘ভাত বেড়ে দিয়েছি, খেতে দাও গে যাও। ‘মা, আব্বা চলে যাবে? ‘জানি নি আমি কিছু। ভাত নিয়ে চলে যায় সাবিনা।

হাতের কাজ শেষ হয় মরিয়মের। একটু পরেই সে পুকরঘাটে যাবে, এক ডেলা বাস সাবান নিয়ে, আর একটা ভোলা করা শাড়ি বগলদাবা করে। পুকুরের জলের জন্য শরীরটা ছটফট করছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন