বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

স্মৃতি ৭১ : আমি বড় হয়েছি বাবা

(১৯৭১কে আমি দেখেছি খুব কাছ থেকে। নিষ্ঠুরতা-সহৃদয়তা, সুখ-দুঃখ, ভালো-মন্দ, মানবিকতা-অমানবিকতা সবটাই ছোট্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেছি। বাস্তবতায় বলে বারো বছর বয়স মানুষকে চেনার মতো যথেষ্ট বয়স নয়; কিন্তু ১৯৭১ নামক একটা সময় আমার মতো অনেককেই সময়োপযোগী হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে। তাই যুদ্ধ না করেও লড়াইয়ের ময়দানের মধ্যে থেকে প্রতিদিনকার দুঃসহ স্মৃতি-বেদনা এখনও বেঁচে থাকার প্রেরণা জোগায়। এই ক্ষুদ্র জীবনটাকে মহান করে তোলে)।

উনিশশ' একাত্তরের ১৬ মে সারারাত জেগেছিলাম। গত বিকেলে আমাদের লালবুলি মারা গেছে। বাড়িতে আরো একটা বুলি রয়েছে, সেটা সাদাবুলি। বুলি আমাদের কুকুর। রাস্তার কুকুর যাকে বলে! আমরা ওদের পুষিনি, ওরাই আমাদের পোষ মেনেছে। বাড়িতে ছোট-বড় মিলিয়ে আটটা কুকুর। বছর দুয়েক হলো এরা একে একে বাবার সাইকেলের পেছনে ছুটে ছুটে বাড়িতে এসেছে, তারপর দিব্যি 'আমাদের' হয়ে গেছে। ব্যবসায়িক কাজে সারা বাগেরহাট শহরে বেশ কয় ঘণ্টা সাইকেল চালান বাবা। কুকুরগুলো পেছন ছাড়ে না। রাস্তায় থেমে খাবার কিনে প্রতিদিন ওদের একাধিকবার খাওয়াতে হয়। শুধু কুকুর নয়, কাককবুতরেরাও বাবাকে চেনে। সবার জন্য এক খাবার। মুড়ি আর বিস্কুট।

ক্রমে কুকুরগুলো আমাদের পরিবারেরই সদস্য হয়ে গেল। সকালবেলা উনুন ধরিয়ে আগে মা এদের জন্য খাবার তৈরি করেন। দু'তিন কেজি আটার রুটি। তারপর আমাদের খাবার তৈরি হয়। দুপুরে ছাদে কাক-কবুতরকে খাবার দেয়া হয়। ওরা খেলে তারপর আমাদের খাওয়া। কুকুর প্রভুভক্ত, সহজেই বন্ধু হয়, কবুতরও পোষ মানে। কিন্তু কাকের মতো পাখিরও যে তীব্র অনুভূতি হাতে পারে, তা বাবাকে দেখে অসংখ্য কাকের ওড়াউড়ি না দেখলে আমিও ভাবতে পারতাম না। বিনা ট্রেনিংয়ে অদ্ভুত শিক্ষিত ছিল কুকুরগুলো। এতোবড় বাড়িটায় সর্বত্র বিচরণ ছিল তাদের। মা যতক্ষণ রান্না করতেন, রান্নাঘরের দরজায় সারাক্ষণ শুয়ে থাকতো মা-কুকুর টেডি। শুধু সে নয়, অন্যরাও কখনো গণ্ডি পেরিয়ে রান্নাঘরে ঢোকার বা কোনো খাবারে মুখ দেয়ার চেষ্টা করতো না। আমাদের ছোট্ট ভাই অপুর খেলার সাথী ছিল লাল-বুলি। হামাগুড়ি দিয়ে বারবার ও বিশ্রামরত লাল-বুলির কাছে চলে যেত। লাল-বুলি উঠে গিয়ে আরেকটু দূরে গিয়ে শুয়ে পড়তো, বিরক্ত হতো না বা আক্রমণ করতো না। বাড়ির কুকুরপরিবারের কর্তা হওয়ার লড়াইয়ে বয়স্ক নিরীহ লাল-বুলি সাদা-বুলির কাছে বারবার হেরে গেছে। এবার এমন জখম হলো যে সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো। খড় বিছিয়ে তার ওপর চট পেতে বিছানা হলো বুলির। বাবা বাইরে থেকে ফিরে ওর বিছানার কাছে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেন, তারপর হাতপা ধুয়ে জামা-কাপড় ছাড়েন।

১৫ মে দুপুরবেলা বুলি মারা গেল। দাদা-ফুলদা আর আমি দুটো কাঠের তক্তা জুড়ে তারপর চটের বিছানা পেতে বুলিকে তুললাম । রাজাকার পাকসেনার আতঙ্কে অত্যাচারে নিস্তব্ধ পাড়াটার মধ্য দিয়ে নিয়ে গেলাম প্রায় পাঁচশ' মিটার দূরে ধানক্ষেতে। ফুলদা কোদাল চালিয়ে একটা গর্ত খুঁড়লো। তারপর সেখানে প্রিয় বুলিকে মাটি চাপা দিয়ে সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাড়ি ফিরে এলাম। বাসাবাটিতে আমরা যেখানে থাকি সেটা অনেক বড় পাড়া। কিন্তু এখন শূন্য, কেউ কাছেপিঠে নেই। বাড়িতে আমরা আছি আর আছে কুকুর পরিবার। দেশের পরিস্থিতি খুব খারাপ। পরিচিত মানুষের খুন হয়ে যাওয়ার খবর আসে। বুলি অসুস্থ ছিল, কিন্তু এই সময়ে ওর মৃত্যুতে খুব আঘাত লাগলো মনে। | ১৬ মে রোববার রাতেও আমার কিছুতেই ঘুম এলো না। ভোরের দিকে বাবার ডাকে উঠে এলাম। বাবা আমাকে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে নিতে বললেন। আমি প্রস্তুত হলে বাবা আমার মাথায় হাত রেখে বললেন—তুমি তো যথেষ্ট বড় হয়েছো! তোমাকে আরো বড় হতে হবে।

আমি খুব খুশি হলাম মনে মনে। আমার বারো বছর বয়স। নিশ্চয়ই বড় হয়েছি। আর তিন দাদাকে টপকে আমাকে বাবা আরো বড় হতে বললেন। বাবা আমার হাতে কিছু টাকা আর একটা লম্বা ফর্দ দিয়ে বাজারে যেতে বললেন। কোথায় গিয়ে কীভাবে কেনাকাটা করবো সংক্ষিপ্তভাবে সেটাও বলে দিলেন। বাগেরহাটে ১০ মে পাকসেনারা ক্যাম্প করে বসেছে। এর মধ্যে এখানকার বেশ। কিছু মানুষকে বেছে বেছে হত্যা করেছে তারা। এই অবস্থায় বাবা এবং দাদাদের বাইরে বেরোনো খুব বিপদের। কাজের দায়িত্ব পেয়ে মনটা আমার বেশ ভালো হয়ে গেল। এই আমার প্রথম বাজারে যাওয়া নয়, মাঝে-মধ্যে বাজারে আমাকেই যেতে হচ্ছে।

বাবার নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে আমার ঘণ্টাখানেক সময় হয়তো লেগেছিল। দু'একটা দোকান খোলা, ক্রেতা প্রায় নেই বললে চলে। ফর্দ মিলিয়ে দেখলাম সব কেনা হয়েছে। বাকি আছে কাক-কুকুরের খাবার মুড়ি আর বিস্কুট। মুড়ি-বিস্কুট কিনছি, এই সময় একটা লোক হঠাৎ আমার দিকে এগিয়ে এসে জিগ্যেস করলো—তুমি বাড়ি থেকে কখন বেরিয়েছো?

আমি বললাম—এই তো ঘণ্টাখানেক হবে।

লোকটা অদ্ভুতভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললো—তুমি তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে যাও। একটা রিকশা ডেকে লোকটাই ব্যাগগুলো তাড়াতাড়ি রিকশায় তুলে দিলো । দূর থেকে বাড়ির উঠোনে অনেক লোক দেখে আমার মনটা কেমন করে উঠলো। রিকশাওয়ালা আমার ব্যাগগুলো নিলো । আমি রিকশা থেকে লাফিয়ে নেমে ছুটতে ছুটতে এসে দাঁড়ালাম বারান্দার সিঁড়িটার কাছে । ততক্ষণে আমার বাবার বুকের রক্ত গড়িয়ে গড়িয়ে সেখানকার মাটি কাদা হয়ে গেছে। বারান্দায় যে চেয়ারটায় তিনি বসেছিলেন, তার কাছেই পড়ে আছে তাঁর নিথর দেহ। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব। দৌড়ে এসে আমি ছোড়দিকে জড়িয়ে ধরলাম । ছোড়দি আমাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরে। হাত দিয়ে ঘষে ঘষে চোখের জল মুছিয়ে দিলো। বললো—কাঁদিস না। এখন আর কাঁদবার সময় নেই।

আমার মাথা টলছে। কী হলো বুঝতে পারছি না। বাবা কোথায় গেলেন? বাবাকে ছাড়া আমি কিছুতেই থাকতে পারবো না। ছোড়দি আমাকে জোরে নাড়া দিচ্ছে। অনেক জানার ইচ্ছা, অনেক প্রশ্ন । ছোড়দি একটুও সময় দিলো না। হাতে একটা বড় বোতল দিয়ে বললো-- তোকে এক্ষুণি একটা কাজ করতে হবে। এইটা নিয়ে দোকানে যা, বিষ কিনে নিয়ে আয়। আমরা সবাই একসঙ্গে আজ বিষ খাবো। কিছু প্রশ্ন করতে পারলাম না, কোনো উত্তর জানার সময় হলো না।

সেই মুহূর্তে বোতল হাতে বাইরে বের হলাম। বাগেরহাট স্টেডিয়াম পেরিয়ে একটুখানি এগিয়ে বাঁ-হাতে কৃষি অফিস। প্রথমে গেলাম সেখানে। অফিস বন্ধ, কোনো লোক নেই। ওখান থেকে বেরিয়ে ছুটলাম রেল রোডে। দোকানপাট কিছু কিছু খোলা, প্রায় সবই বন্ধ। রেল রোডে এসে প্রথম ওষুধের দোকানে জিগ্যেস করলাম—বিষ আছে? তারপরের দোকান, তারপরের দোকান। দোকানিরা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কতক্ষণ ঘুরেছিলাম জানি না। কেউ আমাকে বিষ দিলো না। একজন বললো--বাড়ির বড়রা কোথায়? কোনো উত্তর না দিয়ে আমি বাড়ির দিকে ফিরলাম। রাস্তা আর শেষ হয় না। শরীরে কোনো শক্তি নেই। ফিরে এলাম যখন, তখন আমাদের সমস্ত পরিবার মৃত্যুর শপথ নিয়ে আমার অপেক্ষায় বাবার দেহ সামলাচ্ছে। গ্রীষ্মের দুপুর তখন, মাথার ওপর সূর্য।

মোট তিনটি গুলি লেগেছিল বাবার গায়ে, তারই একটা গিয়ে বিশাল ক্ষত করেছে বারান্দার দেয়ালে। একটা হাত এবং একটা পা বীভৎসভাবে মাংস ছিড়ে হাঁ হয়ে গেছে। শেষ গুলিটা লেগেছে বুকে। ছোট্ট একটা ফুটো। কিন্তু পেছনটা দেখে আঁতকে উঠলাম, একদলা মাংস ছিটকে এসে লেগেছে বারান্দার দেয়ালে। একটা তোশকের ওপরে বাবার ক্ষতবিক্ষত দেহটা সাবধানে তুলে নিজেরাই বয়ে নিয়ে গেলাম বেশ কিছুটা দূরে উঠোনের পাশে সমাধি দেয়ার জন্য। দরদি কারা গর্ত খুঁড়ে দিয়েছে সেখানে। বাবাকে আমরা নিজের হাতে মাটি দিলাম ।

আমরা বেঁচে রইলাম নানা অভিজ্ঞতায় জীবনকে পূর্ণ করার জন্য।


আমি বড় হলাম

বাবা বলতেন— জীবনে বড় হতে হবে।

এই বড় হওয়ার প্রকৃত অর্থ বোঝার আগেই আমাকে বড় হতে হলো। বাবা। নেই। ছোড়দা মে মাসের প্রথমে কোথায় যেন চলে গেছে। দাদা ঘরে বন্দি। কিন্তু তেরজনের একটা পরিবার রয়ে গেছে। খাওয়া নেই কিন্তু পেটে কিছু দেয়ার আছে। তাই এটা-সেটার জন্য আমাকেই রাস্তায় বেরোতে হয়। রাস্তায় একদিন দেখা হয়ে গেল জালাল কাকার (জালাল সর্দার) সঙ্গে। তিনি আমাকে বললেন, মুনিগঞ্জে সরকারি গুদামের শ্রমিক সর্দার কুদ্দুসের সঙ্গে দেখা করে বাবার নাম বলতে।

বাবার লেবার কন্ট্রাক্টরি ছিল। কুদুস সর্দার সেটা দেখাশোনা করতেন। বাড়িতে এসে মাকে বললাম। মুনিগঞ্জ বাড়ি থেকে অনেক দূর। পথে পাকসেনা, রাজাকার সবাইকে পেরিয়ে সে পর্যন্ত যাওয়াটা সহজ নয়। মা কিছুতেই যেতে দেবেন না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরুপায় মাকে রাজি হতে হলো। তখন বাগেরহাট মদন মাঠে (ওয়াপদা রেষ্ট হাউসে) পাকসেনাদের, বাগেরহাট স্কুল ও ক্লাবে পাঞ্জাবি পুলিশদের এবং ডাকবাংলোয় রাজাকারদের ক্যাম্প। রাস্তার ধার দিয়ে পাকসেনা, পাঞ্জাবি পুলিশ আর রাজাকারদের রাইফেল, বুট আর বেয়নেটের পাশ কাটিয়ে প্রতিদিন মুনিগঞ্জ যাওয়া শুরু হলো আমার। সকাল থেকে গিয়ে বসে থাকি। সব কাজ শেষ করে কুদ্দুস কাকা কোনোদিন চাল-গম, কোনোদিন পাঁচটা বা দশটা টাকা দিতেন। যেদিন অনেক দেরি হয়ে যেত, বাসায় নিয়ে গিয়ে নিজের খাবার থেকে ভাগ করে খেতে দিতেন আমাকে। আমি টাকাটা প্যান্টের পকেটে গুঁজে ভারি ব্যাগটা কখনো হাতে ঝুলিয়ে, কখনো মাথায় করে বেলা শেষে বাড়িতে ফিরতাম। প্রতিদিন ছোট-বড় বারো জোড়া চোখ বন্ধ দরজা-জানালার ছোট্ট কোনো ফুটো দিয়ে পথ চেয়ে থাকতো আমার অক্ষত ফিরে আসার আশায়। ফেরার পথে কতোদিন দেখেছি ডাকবাংলোয় প্রকাশ্য রাস্তায় লাইটপোস্টে উল্টো করে পা-বাঁধা মানুষ ঝুলছে। কেউ কেউ ফিসফিস করে বলতো—এরা মুক্তিযোদ্ধা। জোর করে সাহস রাখতাম বুকে।

কত লোকের অকপট সহযোগিতা পেয়েছি! এদের মধ্যে একজন সোবহান। ভাই লঞ্চঘাটের কেরানি। শান্তিদির দুলাভাই। খারদ্বারের মহব্বত সর্দারের মেয়ে শান্তিদিকে আমি কেন, আমরা কেউই চিনতাম না। ১৭ মের সেই দুঃসময়ে তারা ছুটে এসেছিল লোকমুখে খবর পেয়ে । আমার দিদিদের সঙ্গে করে নিয়ে যেতে চেয়েছিল, রক্ষা করতে চেয়েছিল সব বিপদ থেকে। বারো বছর বয়সে আমি কাউকে চিনতাম না; কিন্তু কী আশ্চর্য, সবাই আমাকে চিনে নিয়েছিল । সোবহান ভাই বহুদিন দেখা হলেই পকেট থেকে টাকা বের করে আমার হাতে গুঁজে দিয়েছেন, বলেছেন খাবার কিনে নিয়ে যা। আমি বাজার করে নিয়ে এসেছি।

বাবাকে স্মরণ করতে করতে রাস্তায় চলতাম। বাবা বলেছিলেন, আমাকে বড় হতে হবে। আমি জানি অকালেই আমি বড় হয়ে গেছি। সময় আমাকে বড় করে তুলেছে, অনেক কিছু বুঝতে শিখিয়েছে। আমার তিন দাদা। মেজদা কোথায় জানি না। বড়দার বয়স চব্বিশ আর সেজদার বয়স পনেরো, তারা ঘরের কোণে লুকিয়ে আছে। তিন দিদি। বড়দির বয়স বিশ, মেজদির আঠারো আর সেজদির চৌদ্দ। এছাড়া ছোট ভাই এবং ছোট তিনটি বোন রয়েছে। আর আছেন চুরাশি বছরের ঠাকুমা, মা এবং মানসিকভাবে অসুস্থ বাবার বড় ভাই--আমাদের জ্যাঠা। আরেকজনের খাবারও আমাকে জোগাড় করতে হয়, সে সাদা বুলি। বাবার প্রিয় কুকুর। ১৭ মে থেকে দরজা-জানালা বন্ধ ঘরে সবার সঙ্গে সেও আশ্রয় নিয়েছে। বাবার নিষ্ঠুর-নির্দয় মৃত্যু মা-দাদা আর ফুলদার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছিল কুকুর পরিবার। বাড়ির সবার সঙ্গে আকাশের দিকে মুখ তুলে পিতৃহারা সন্তানদের মতো তারাও আর্তনাদ করে কেঁদেছিল তখন। অন্য কুকুরগুলো কোথায় চলে গেল জানি না; কিন্তু সাদাবুলি বাবার প্রিয় কুকুর, সে অতিবান্ধব হয়ে থেকে গেল আমাদের সঙ্গে। পরিবারের অন্যতম সদস্য হয়ে।


পথ ভোলা পথিক

একাত্তরের নিষ্ঠুর-নির্মম আতঙ্কের দিনগুলোতে সবাই যখন ঘরের কোণে ঠাঁই নিয়েছে সেসব দিনে ভবঘুরের মতো বাগেরহাটের রাস্তায় এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছি, ঘুরে বেড়াতে হয়েছে আমাকে। সব রাস্তা আমার চেনা ছিল না। ঘুরতে ঘুরতে চিনে নিলাম। একদিন সাধনা ঔষধালয়ের মোড়ে দুই ব্যক্তি আমাকে ডেকে দাঁড় করালো। এদের একজনের বাড়ি ছিল বাসাবাটি এতিমখানার পেছনে। সে একজন রিকশাওয়ালা। তার সঙ্গীও তাই। দু'এক কথার পরে তারা আমার দিদিদের খোঁজখবর নিতে শুরু করলো। বেশি সময় ব্যয় না করে এতিমখানার পেছনের রিকশাওয়ালা বললো--‘এই, মাকে গিয়ে বলিস তোর দিদিকে আমি বিয়ে করবো।' কীভাবে যেন তাদের হাত ছাড়িয়ে বাড়ি ফিরলাম। আতঙ্কে হিম হয়ে গেল চেতনা। মাকে তো কিছু বলা যাবে না! কাউকে বলা যাবে না। ডা. অরুণ নাগের বাড়িতে রান্না করতো হরেন কাকা। তার মেয়েকে নিয়ে গেছে ওপাড়ার একজন-- তাকে আমি চিনি। রাধাবল্লভ গ্রাম। আমাদের বাড়ির অনেক কাছে । ঐ গ্রামের ডাক্তার বলরাম অধিকারীর মেয়ে মঞ্জুরানী অধিকারীকে দিনের বেলা শারীরিক নির্যাতন করার পরে খুন করে ফেলে দিয়েছে নদীতে। এসব ঘটনার কোনো আড়াল নেই, কিছু গোপনীয়তা নেই, আমিও জানি। রাতে শুয়ে ছটফট করি, কিছুতেই ঘুম আসে না। দু'চোখের জলে বালিশ ভেজে। সেইদিন ১৭ মে সবাই মিলে বিষ খেলেই ঠিক হতো। কেন পেলাম না বিষ!

রাস্তা দিয়ে অতি সন্তর্পণে চলি। চলার পথে চারদিকে চোখ রাখতে হয় গোয়েন্দার মতো। ঘটনা তো থামার নয়! থামেও না। পুনরায় একই রকম ঘটনার সম্মুখীন হতে হলো আমাকে। সাধনার মোড় থেকে ডান হাতে একটুখানি গিয়ে বা হাতে বাটার দোকানের পাশ থেকে চালপট্টি হয়ে বাজারের মধ্যে যাওয়া-আসা করতাম। বাগেরহাটের ভাসানী ন্যাপের সর্বজনশ্রদ্ধেয় একজন নেতার জামাইয়ের দোকান ছিল সেই রাস্তায়। একদিন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি, ঐ জামাই রাস্তা থেকে আমাকে ডেকে নিয়ে এলো দোকানে। তার চালচলন দেখে আমার কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। কোনো ভণিতা ছাড়াই সে তার কথা শুরু করলো। বললো—মাকে গিয়ে বলিস, তোর একটা দিদিকে আমি বিয়ে করবো।

রাস্তায় যেখানে দেখা হয়, ডেকে সে একই কথা বলে। একদিন তার দোকান থেকে বেরিয়ে যেন ছুটতে লাগলাম রাস্তা দিয়ে। ভয়ে-অসম্মানে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। আমি বুঝতে পারছি আমার দিদিরা ভয়ঙ্কর বিপদাপন্ন।

তখনকার ছোট্ট বাগেরহাট শহরে হিন্দু পরিবারগুলো সব পালিয়ে ভারতে না হোক, অন্তত গ্রামাঞ্চলে চলে গেছে। বাবা নেই। কোথাও গিয়ে আশ্রয় নেয়ার জায়গা নেই আমাদের! বড় বিপদ ঘনিয়ে আসছে, মাকে আমি কী করে বলি! দিদিদের কী হবে ভাবতে ভাবতে মনে পড়লো এছহাক কাকার কথা। চালপট্টিতে তখন রাজাকার কমান্ডার রজ্জব আলী রসিকলাল প্রামাণিকের বাড়ি আর ডেপুটি কমান্ডার মো, এছহাকউদ্দীন খগেন দের বাড়ি দখল করে বসেছেন। প্রতিদিন সেখানে বহু মানুষ আসা-যাওয়া করে। মোঃ এছহাকউদ্দীন। নামেই তখন আতঙ্ক। কিন্তু ভয় পেলে কিছুতেই চলবে না। এই বিপদে মন বললো--কারো সাহায্য দরকার আমার। আমি ভয়ে ভয়ে এছহাক কাকার দরবারে উপস্থিত হলাম। ভিড়ের মধ্যে দরজার কাছে একপাশে বসে পড়লাম। দুপুর চলে গেল। আমার খিদে-তেষ্টা নেই, খাবার কথা মনেও নেই। ভিড় পাতলা হতে এছহাক কাকা আমাকে দেখতে পেলেন। তিনি আমাকে ভালোভাবে চিনতেন। জানতে চাইলেন আমি কেন বসে আছি!

এতোক্ষণে বহুবার আমি মনে মনে ভেবে রেখেছি—কী বলবো তাকে!

একটুও না থমকে আমি এক নিশ্বাসে আমার বিপদের কথা বললাম। কোনো সাহায্য নয়, নেতার জামাইয়ের বিচার চাইলাম তাদের কাছে। অন্যায় স্পর্ধার বিচার। রাজাকার ডেপুটি কমান্ডার, তিনি এখন বাগেরহাটের অন্যতম প্রধান কর্তা।

এছহাক কাকা বিষয়টা দেখবেন আমাকে এই আশ্বাস দিয়ে বাড়িতে যেতে বললেন। বাড়িতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে এলো। সবাই উৎকণ্ঠিত। কিন্তু কাউকে কিছু বললাম না। চারদিকের পরিস্থিতি ক্রমশই জটিল হচ্ছে। পাকসেনা আর রাজাকারের ছোট ছোট দল শহরের এবাড়ি, সেবাড়ি ঢুকে পড়ছে। দিদিদের আর নিরাপত্তা নেই। রিকশাওয়ালা থেকে মুদিওয়ালা সবাই জেনে গেছে আমাদের কেউ নেই, আমাদের অন্যত্র যাওয়ার জায়গা নেই। দেশের দুর্দিনে। আমরা পিতৃহীন।

দু'তিনদিন পর আমি আবার গেলাম এছহাকউদ্দীনের কাছে। কী শাস্তি হলো বর্বর, পাষণ্ড জামাইয়ের দেখা দরকার। দরজার পাশেই বসে রয়েছি—তিনি। দেখতে পেয়ে ডাকলেন আমাকে, বললেন—ওকে যা বলার বলে দিয়েছি, তুই বাড়ি যা। এটুকু কথা আমার মনঃপূত হলো না। কিন্তু আমার তো কিছু করার নেই! মনের মধ্যে দ্বিধা-সন্দেহ নিয়ে ঐ পথেই বাড়ি ফিরছিলাম। ধরলো সেই জামাই। এবার তার সুর উল্টে গেছে! বললো—আরে ভাই, আমি কি বললাম, আর তুমি কি বুঝেছো!

বুঝলাম এছহাক কাকা লোকটাকে কিছু শাসন করে দিয়েছেন। আমি মনে মনে একটু স্বস্তি পেলাম। এছহাক কাকা একাত্তরের নয় মাসে বাগেরহাটে জল্লাদের ভূমিকা পালন করেছিলেন। কিন্তু তিনি ঐ দুর্দিনে আমাদের রক্ষা করেছিলেন।

সেপ্টেম্বরে বড়দা, সেজদা আর তিন দিদি বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেন। দিদিরা চলে যাওয়াতে আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। আমার শ্রমও কিছু কমলো। সংসারের পাঁচটা লোক একবারে কমে গেছে। লোকের কাছে চেয়েচিন্তে বেঁচে আছি, এ আর ভালো লাগে না। একদিন মাকে বললাম—মা আমি ঠোঙা বানাবো।

কী করে ঠোঙা বানাতে হয় শিখে নিলাম। বাজারে জলের দরে বিক্রি হচ্ছে লুট করা পুরনো বই। তার সঙ্গে সিমেন্টের প্যাকেট কিনে আনতে শুরু করলাম। রাত জেগে মা, চায়না, বিশু, আমি কেরোসিনের আলোয় অনভ্যস্ত হাতে ঠোঙা বানাতাম। মা সকালবেলা ঝুড়িতে সাজিয়ে দিতেন ঠোঙাগুলো, আমি মাথায় করে ঝুড়িটা নিয়ে যেতাম বাজারে। ঠোঙার মান ভালো না, তবুও দোকানে সেগুলো দিয়ে তেল, নুন যা পাওয়া যায় নিয়ে ফিরতাম বাড়িতে।

আশ্বিন-কার্তিক মাস ঘুড়ির ‘সিজন’। ঘুড়ি ওড়াতে খুব ভালোবাসতাম। শরতের নীল আকাশে রঙবেরঙের ঘুড়ি দেখে ঐ দুঃসময়েও ইচ্ছা হতো আমিও ঘুড়ি ওড়াই। এই ইচ্ছা থেকেই ঘুড়ি বানিয়ে বিক্রি করার কথা মনে এলো। আনোয়ার কাকার বাড়ি গিয়ে বাঁশের চটা নিয়ে এলাম । লাল নীল ঘুড়ির কাগজ কিনে ঠোঙার সঙ্গে ঘুড়ি বানানোও শুরু করলাম। মা ঠোঙার সঙ্গে ঘুড়িও সাজিয়ে দেন ডালায়। তাতে চারটা পয়সা বেশি পাওয়া যায়। | ও পাড়ার মদনদের ঘুড়ি ভালো বিক্রি হতো। আমার এই প্রচেষ্টায় আগুন জ্বললো তাদের মনে। একদিন আমাকে রাস্তায় তিন-চারজন ধরে মাটির হাঁড়ির ভাঙা চাড়ায় করে পায়খানা লাগিয়ে দিলো মুখে। চোখ ফেটে জল এলো। অসহায় নিরুপায়, একা একা রাস্তায় বসে অনেক কাঁদলাম। বাবা নেই বলে এত কষ্ট কি সবাইকে পেতে হয়! হঠাৎ মনে পড়লো বাবার সেই কথা—তোমাকে অনেক বড় হতে হবে ।

চোখ-মুখ ধুয়ে বাড়ি এলাম । একথা বললাম না মাকে। সারাদিন গা গুলিয়ে গুলিয়ে বমি এলো। রাতে শরীর খারাপ বলে না খেয়ে শুয়ে পড়লাম।

পাক সরকার দেশের অবস্থা স্বাভাবিক করার জন্য সেপ্টেম্বরের দিকে ঘোষণা করলো সব স্কুল-কলেজ খোলা রাখতে হবে, সমস্ত ছেলেমেয়েদের স্কুলে যেতে হবে। মা স্কুলে পাঠাতে শুরু করলেন। আমি তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, বাগেরহাট স্কুলের ছাত্র । স্কুলেই মিলিটারি ক্যাম্প। একদিন বাড়ি ফিরবো বলে স্কুলগেট থেকে বেরোতেই একজন মিলিটারি ডাকলো—কেয়া নাম হ্যায়?

বললাম--তারিকুল ইসলাম।

নয়া মুসলিম?

No, পুরানা মুসলিম।

ছাড়া পেয়ে দ্রুত ছুটলাম বাড়ির দিকে, মায়ের কাছে।

দড়াটানার এপারে রাজাকার ক্যাম্প। ওপারে দেপাড়া, কান্দাপাড়া, ধোপাখালী, বিষ্ণুপুর থেকে দিনের বেলাতেও গুলির আওয়াজ ভেসে আসে। মুক্তিবাহিনী যত শক্তিশালী হচ্ছে, পাকিস্তান বাহিনীর সতর্কতা আর অত্যাচার ততই বেড়ে চলেছে। মুক্তিবাহিনীর ছেলেদের যাতে চিহ্নিত করা যায় তাই শহরের নাগরিকদের আইডেন্টিটি কার্ড দেয়া হলো। মাঝে মধ্যেই শহরের মূল রাস্তাগুলোতে দাঁড়িয়ে সেনারা সেই ‘ডান্ডিকার্ড’ তল্লাশি করে। কার্ড না পাওয়া গেলে যখন-তখন নির্যাতন, কখনো মৃত্যুই প্রাপ্য। আমি সেদিন বিকেলে ঠোঙা নিয়ে গেছি বাজারে। হঠাৎ লোকের ব্যস্তসমস্ত ভাব দেখে জানতে চাইলাম, কী হয়েছে!

একজন বললো— ‘ডান্ডিকার্ড’ তল্লাশি হচ্ছে। সবার ‘ডান্ডিকার্ড'নেই। আমার তো থাকার কথাই নয়। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মার জন্য খুব চিন্তা হতে লাগলো। কী করে মাকে খবর দিই! চালপট্টির রাস্তার কাছাকাছি এসে দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ একটা রিকশা দেখে মাথায় বুদ্ধি এলো। দৌড়ে রিকশাওয়ালার কাছে গিয়ে অনুরোধ করলাম—আমার একটা কাজ করে দেবেন। সব শুনে রিকশাওয়ালা রাজি হলেন। আমি একটা কলম আর এক টুকরো কাগজ জোগাড় করে মাকে লিখে দিলাম—আজ রাতে বাড়ি ফেরা হবে না, কাল আসবো। রিকশাওয়ালাকে বাড়ির ঠিকানা আর একটা টাকা দিয়ে মাকে চিঠিটা পৌঁছে দেয়ার জন্য পাঠালাম।

রিকশাওয়ালা চলে গেলে আমার কেবলই মনে হতে লাগলো—আমি কী বোকা! রিকশাওয়ালাকে চিনি না, টাকা পেয়ে গেছে, সে কি আর মাকে কোনো খবর দেবে! রাতে ওখানে কিছু খাবার মিললো। ঘরের মেঝেতে চাটাই বিছানো। অন্যদের পাশে আমিও শুয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। ভোরবেলায় ছুটলাম মায়ের কাছে। রাস্তা তখন শান্ত। দু'চারজন লোক চলাচল করছে। ভাবতে ভাবতে আসছি মা আমার চিন্তায় পাগল হয়ে যাবেন।

ফিরে আসতে মা আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। রিকশাওয়ালা কথা রেখেছেন। বাড়ি খুঁজে মার হাতে চিরকুটটা পৌঁছে দিয়ে গেছেন; কিন্তু মায়ের মন তাতে নিশ্চিন্ত হয়নি।

এর মধ্যে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন ঠাম্মা । কিন্তু অসুস্থ ঠাম্মার খোঁজ নেয়ার অবকাশ ছিল না আমার। ১৪ নভেম্বর মাঝরাতে ঠাম্মা মারা গেলেন। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। মায়ের ডাকে উঠে বসলাম। পুবের আকাশ ফর্সা হতেই বাইরে বেরোতে হলো আমাকে। বাবা নেই, দাদারা অনুপস্থিত। কীভাবে ঠাম্মার শেষকৃত্য হবে! আনোয়ার কাকাকে খবর দিতে গেলাম। সেখান থেকে জালাল মোল্লা, এছাক মোল্লা এবং সবশেষে এছহাক কাকাকেও খবরটা জানালাম। সবাই কিছু সাহায্য করলেন। তাই দিয়ে ঠাম্মার জন্য শেষযাত্রার একটা নতুন সাদা কাপড় কিনে নিয়ে বাড়ি ফিরতে আমার অনেক বেলা হয়ে গেল। ততক্ষণে মা পরামাণিকবাড়ির আনন্দকাকা, মোরেলগঞ্জ থেকে পালিয়ে আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া আরতিদি, বোন চায়না এদেরকে নিয়ে ঠাম্মার দেহটাকে উঠোনে আমগাছটার তলায় নামিয়ে এনে আমার অপেক্ষায় বসে আছেন। আনন্দ কাকা লোক ডেকে এনে বাবার সমাধির ঠিক পাশে ঠাম্মার শেষশয্যার ব্যবস্থাও করে ফেলেছেন। গোটা বাড়ি স্তব্ধ, পাড়া স্তব্ধ আট মাস ধরে! মনে কোনো কষ্টের অনুভূতি নেই, শুধু কর্তব্য বোধ মনকে পীড়া দেয় আর তখনই বাবার কথা মনে হয় অনেক বড় হতে হবে।

তেরো দিন অশৌচ পালন করলাম নিজেরা। স্টেডিয়ামের পাশে নন্দঠাকুরের বাড়ি। তাঁকে খবর দিলাম। তিনি অত্যন্ত গোপনে দরজা-জানালা বন্ধ ঘরে, প্রায় অন্ধকারে বসে ঠাম্মার পারলৌকিক-ক্রিয়া সম্পাদন করলেন।

রোজার মাস চলছে। বাংলায় এটা কার্তিক মাস। শরতে এবার মা দুর্গা। আসেননি, কোথাও কি এসেছেন, কী জানি! ওসব আমার কেন, কারোরই মনে আসে না। তবে ছোটবেলা থেকে দেখেছি রোজা আর পুজো দুটো ছুটিতেই আনন্দ, দুটো উৎসবই উৎসব। পথ চলতে চলতে কতো কথা মনে আসে। কিছুদিনের মধ্যে আমাদের বাড়ি শূন্য হয়ে গেছে। প্রিয় আন্‌দা ছোট ভাই অপু, বাবা, ঠাম্মা চিরদিনের জন্য চলে গেছেন। তিন দাদা তিন দিদি তারা কেমন আছে, বেঁচে আছে তো! ভয়ে গলা শুকিয়ে আসে। এসব প্রশ্ন মাকে করি না, কাউকে করি না। চলতে চলতে হঠাৎ হঠাৎ চোখটা জ্বালা করে ওঠে। জামার হাতা দিয়ে চোখটা মুছে নিই। এখন আমিই দাদা। চায়না, বিশু, ছবি, বেবিকে আমি খাবার না দিতে পারলে তারা না খেয়ে থাকবে। তাই আমি ঠোঙা আর। ঘুড়ির ডালাটা মাথায় নিয়ে জোরে জোরে পা চালাই, আমার থামলে চলবে না। ছোটবেলায় ভূতের ভয় পেলে একটা ছড়া আওড়াতাম–ভূত আমার পুত, পেত্নি।আমার ঝি/রাম-লক্ষ্মণ বুকে আছে করবি আমার কি!

রাতে মাঝে মাঝে ঘুমের মধ্যে টের পাই, মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। আমি চলতে চলতে মন শক্ত করি, আমার মায়ের আশীর্বাদ আর বাবার সাহস আমার সঙ্গে, আমি কাউকে ভয় পাই না। খুনি রাজাকারকে না, জল্লাদ পাকসেনাকে না, কাউকে না।

২৮ নভেম্বর ঠাম্মার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ হওয়ার ক’দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত যুদ্ধ শুরু হলো। একা একা ‘কালকের পুকুরের’ কাছ থেকে আসছি, হঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ করে মাথার ওপর দিয়ে একসঙ্গে উড়ে গেল দুটো বোমারু বিমান। বাড়িতে ফিরলে রোজ যুদ্ধের খবরাখবর দেয় বিশু। ওর কাজ ঘরের অন্ধকার কোনায় বসে রেডিও শোনা। নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আকাশবাণী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা সব জায়গার খবর শোনে। শুধু শোনে না, অনেকটাই বোঝে। ও আমাদের মনে সাহস জোগায়। ১৬ ডিসেম্বর জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণ করলো। তার মানে যুদ্ধ শেষ।

কিন্তু কই, আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। বুঝলাম, ১৭ ডিসেম্বর দুপুরবেলা। পুরো একদিন পরে বাগেরহাটের মানুষ স্বাধীনতা কী বুঝতে পারলো। আমি একছুটে উঠোনে নেমে হ্যাঁচকা টানে খুলে ফেললাম বাঁধা বাঁশটা, সরিয়ে দিলাম বড় বড় করে উর্দুতে মুসলিম বাড়ি লিখে রাখা টিনের সাইনবোর্ডটা। আড়াআড়ি ঝোলানো আস্ত সুপারির পাতাগুলো সব সরিয়ে দিলাম একপাশে। চারদিক থেকে ‘জয় বাংলা' ধ্বনি কানে আসছে। এতদিনের বন্ধ দরজা-জানালাগুলো খুলে গেছে। লোক ছুটছে শহরের দিকে। বিশুও সঙ্গ নিলো তাদের। রাস্তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। দূর থেকে হাত নাড়তে নাড়তে একদল মুক্তিযোদ্ধা জয়ধ্বনি দিতে দিতে চলে গেল। আমি এক পা এক পা করে ফিরে এলাম বাড়িতে। শেষ অঘ্রানের পড়ন্ত রোদে দূরে সদর দরজা থেকে দেখতে পেলাম বাবার সমাধিতে মাথা ঠুকে চলেছেন আমার মা। নিজের চোখের জল মুছে দৌড়ে গেলাম মায়ের কাছে। চায়না-ছবি-বেবি সমানে কেঁদে চলেছে। আমি গিয়ে মাকে তুললাম। সবার চোখের জল মুছিয়ে দিলাম হাত দিয়ে।

ঠাম্মা মারা যাওয়ার পরে আর একবারও এখানে আসার সুযোগ হয়নি। আমার মনের সব দুঃখ বেদনা কঠিন যন্ত্রণায় স্তব্ধ হয়ে গেল। এখানে দাঁড়িয়ে কেবলই মনে হতে লাগলো, বাবা বলছেন—তোমাকে বড় হতে হবে, অনেক বড় হতে হবে।

-----------
তাপস বসু।
একাত্তরের শহীর ভোলানাথ বসুর চতুর্থ পুত্র

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন