বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

মার্গারেট মিচেলের ধারাবাহিক উপন্যাস: যেদিন গেছে ভেসে- পর্ব ২৬




ভাষান্তর: উৎপল দাশগুপ্ত

স্কারলেটদের অ্যাটলান্টা থেকে টারাতে ফিরে আসার পর দেখতে দেখতে দু’সপ্তাহ কেটে গেছে। পায়ের ওপর সব থেকে বড় ফোস্কাটা পেকে এত বড় হয়ে উঠেছে যে জুতো গলানোই অসম্ভব হয়ে পড়ল। গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে কোনও রকমে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে। বুড়ো আঙ্গুলের দগদগে ভাবটা দেখলেই তীব্র হতাশায় মন ভরে ওঠে। সৈন্যদের ক্ষতস্থানের মতোই যদি পচে ওঠে, তাহলে? যদি ও মরে যায়? এখানে ডাক্তারই বা কোথায়? জীবন যতই তিক্ততায় ভরে থাকুক, এখন এখান থেকে নড়বার উপায় নেই স্কারলেটের। ও মরে গেলে টারার দেখভাল করবে কে?

ফিরে আসার পরপর স্কারলেট আশায় আশায় ছিল যে জেরাল্ড খুব তাড়াতাড়ি শোক কাটিয়ে উঠে স্বমূর্তিতে ফিরে আসবেন এবং টারাকে চালানোর ভার নিজের হাতে তুলে নেবেন। স্কারলেট শুধু হতাশই হয়নি, বরং বুঝে গেছে জেরাল্ডের পক্ষে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসা আর কখনওই সম্ভব হবে না। টারাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার সব দায়িত্ব ওর অনভিজ্ঞ কাঁধের ওপর পড়েছে। ভালো না লাগলেও উপায় নেই কিছু। জেরাল্ড এক কাল্পনিক জগতে বিচরণ করছেন। চুপচাপ সারাক্ষণ। টারাতে থেকেও সমস্ত কর্মযজ্ঞ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। দরকারি পরামর্শ চাইতে গেলেই বলে ওঠেন, “তুমি যেমন ভালো বোঝো কর মা।” আবার কখনও বলে ফেলেন, “তোমার মা কি বলছেন?”

সত্যিটা মেনে নেবার মতো মনের অবস্থা জেরাল্ডের আর নেই। কথাটা স্কারলেট ভাল ভাবেই বুঝে নিয়েছে। বাপী জীবনের বাকি দিনগুলো এলেনের প্রতীক্ষায় কাটিয়ে দেবেন। এলেনের ডাক শোনবার জন্য মুখিয়ে থাকবেন। এখন উনি এক ঝাপসা জগতে সময় কাটাচ্ছেন। সময় সেখানে থেমে গেছে। এলেন যেন পাশের ঘরেই আছেন। একবার ডাক দিলেই চলে আসবেন। এলেনের মৃত্যুর সাথে সাথেই ওঁর বেঁচে থাকার ইচ্ছেটাই চলে গেছে। ওঁর ঔদ্ধত্য, চঞ্চল জীবনীশক্তি সবই বিদায় নিয়েছে। ওঁর জীবননাট্যে এলেনই ছিলেন একমাত্র দর্শক। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথেই সেই নাটকের যবনিকাপাত হয়ে গেছে। দর্শক আসন শূন্য। পাদপ্রদীপ নিবে গিয়ে মঞ্চ অন্ধকার। একলা দাঁড়িয়ে অভিনেতা কেবল একটি ইশারার প্রতীক্ষায়।

সেদিন সকালবেলা বাড়িটা একদম নিস্তব্ধ। স্কারলেট, ওয়েড আর অসুস্থ তিন মেয়ে ছাড়া সবাই গেছে জলাভূমি থেকে শুয়োর শিকার করে আনতে। এমনকি জেরাল্ডও উৎসাহ পেয়ে আলপথ ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে যাচ্ছেন। এক হাতে পোর্কের কাঁধে ভর, আর অন্য হাতে পাকানো একটা দড়ি। স্যুয়েলেন আর ক্যারিন কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করে ঘুমিয়ে পড়েছে। দিনে অন্তত দুবার ওরা এরকম করে। এলেনের কথা মনে পড়লেই চোখ থেকে জলের ধারা নেমে বসে যাওয়া গাল দিয়ে গড়িয়ে পড়ে। মেলানিকে প্রথমবার বালিশে হেলান দিয়ে বিছানার ওপর বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটা রিফু করা কাঁথা দিয়ে শরীর ঢাকা। দু’পাশে দুটি শিশু ঘুমোচ্ছে। বাদামি চুলওয়ালা এক শিশুর মাথার ওপর একটা হাত যত্ন করে রাখা। অন্য হাত দিয়ে সমান যত্নে ধরে আছে একটি কালো শিশুর কোঁকড়ানো চুলওয়ালা মাথা। ডিলসির বাচ্চা। ওয়েড বিছানার পাশে বসে রূপকথা শুনছে।

টারার এই অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা স্কারলেটের কাছে অসহ্য। অ্যাটলান্টা থেকে ফেরার অন্তবিহীন নির্জন পথের মৃত্যুশীতল নীরবতা ওর মনে উঁকি মেরে যায়। অনেকক্ষণ হয়ে গেল গরু আর বাছুরের ডাকও শোনা যায়নি। জানলার বাইরে থেকে পাখিদের কিচিরমিচির শব্দ ভেসে আসছে না। এমন কি ম্যাগনোলিয়ার ঝোপে অনেক বছর ধরে বসবাসকারী ময়না পরিবারও সমস্বরে কোনও গান গেয়ে উঠছে না। শোবার ঘরের জানলার ধারে একটা নীচু চেয়ারে বসে ও গাড়িবারান্দা আর সবুজ বনভূমির দিকে চেয়ে আছে। বাহুর ওপর থুতনি রেখে স্কার্টটা হাঁটুর বেশ খানিকটা ওপরে তুলে দিয়েছে। পাশে একটা বালতিতে কুঁয়ো থেকে তোলা জল রাখা। ফোসকা পড়া পা’টা মাঝে মাঝে ডুবিয়ে দিচ্ছে, যন্ত্রণায় মুখ কুঁচকে যাচ্ছে।

কাতর হয়ে থুতনিটা বাহুতে জোরে চেপে ধরল। যে সময় কিনা ওর শক্ত থাকার খুব প্রয়োজন, ঠিক তখনই বুড়ো আঙ্গুলটা এমন জ্বালাতন করছে! ওই আলসেগুলো একটা একটা করে বাচ্চা শুয়োর ধরতেই এক সপ্তাহের বেশি লাগিয়ে দিল! আর দু’সপ্তাহ পরও মা-শুয়োরটা এখনও অবাধে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এরা তো সারা জীবনেও ওকে ধরতে পারবে বলে মনে হয় না। স্কারলেট জানে ও যদি একবার দড়ি নিয়ে হাঁটু অব্দি স্কার্ট গুটিয়ে জলায় নামতে পারত তাহলে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতেই ওটাকে ধরে ফেলত।

ধরা যাক ওকে ধরা গেল! তারপর? বাচ্চাগুলো আর মা শুয়োর মেরে কয়েকদিন পেট চলত! তারপর? জীবন তো থেমে থাকবে না! খিদেও পাবে। শীত এসে যাচ্ছে। খাবার নেই। এমন কি পড়শীদের বাগান থেকে কুড়িয়েবাড়িয়ে কিছু পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই! অন্তত শুকোনো মটরশুঁটি, জোয়ার, বাজরা, চাল – ওহ আরও কত কত জিনিস থাকার দরকার ছিল! বসন্তে বপন করার মত শস্যদানা আর তুলোর বীজ দরকার ছিল। আর কিছু নতুন জামাকাপড় – সেটাও তো দরকার! কোত্থেকে আসবে? আর সেসবের দামই বা ও মেটাবে কেমন করে?

কাউকে কিছু না বলে, জেরাল্ডের পকেট আর টাকা রাখবার বাক্স তল্লাশি করে গোছা গোছা কনফেডারেট বন্ড আর কনফেডারেট হুণ্ডিতে তিন হাজার ডলার পেয়েছে। এই টাকায় ওদের সবার জন্য টেনেটুনে একবারের খাবার কেনা যাবে। আক্ষেপের সঙ্গে এটাও মনে হল কনফেডারেট ডলারের মূল্য কত নেমে গেছে – এতটাই যে এই টাকাটা এখন প্রায় মূল্যহীন। আর টাকা থাকলেই বা কী? খাবার কিনলেও সেটা টেনে টারায় কীভাবে নিয়ে আসবে? কেন যে ভগবান ঘোড়াটাকে মরে যেতে দিলেন! রেটের চুরি করে আনা সেই রুগ্ন ঘোড়াটা থাকলেও কিছু ভাবা যেত! ওহ্‌, ওদের সেই তেজী ঝকঝকে খচ্চরগুলো – যেগুলো রাস্তার গা ঘেঁষে ধুলো উড়িয়ে ছুটে যেত! গাড়ি টানবার ঘোড়াগুলো, ওর নিজের ছোট্ট মাদী ঘোড়াটা, বোনেদের টাট্টুঘোড়া আর জেরাল্ডের বিশাল মদ্দা ঘোড়া যেটা ঘাসজমির ওপর দিয়ে তীরবেগে ছুটে যেত – যে কোনও একটা থাকলেই হত। এমনকি একটা অলস খচ্চর থাকলেও চলত!

ঠিক আছে – নেই যখন আক্ষেপ করে কী লাভ? পা’টা একবার সেরে যেতে দাও, হেঁটেই জোন্সবোরো চলে যাবে। এতটা রাস্তা এর আগে কখনও হাঁটেনি । কুছ পরোয়া নেই, হেঁটেই যাবে! ইয়াঙ্কিরা যদি শহরটা জ্বালিয়ে দিয়ে থাকে, আশেপাশের মানুষের কাছে থেকে ঠিক জেনে নিতে পারবে, কোথায় খাবার পাওয়া যাবে। ওয়েডের দুঃখী মুখটা ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। বেচারা বলতেই থাকে যে ও রাঙা আলু ভালবাসে না। ও মুরগীর ঠ্যাং আর ঝোল দিয়ে মেখে একটু ভাত খেতে চায়।

হঠাৎ চোখে জল এসে যাওয়ায় সূর্যে উজ্জ্বল আলো ম্লান হয়ে গেল। গাছের পাতা ঝাপসা লাগতে লাগল। দু’হাতে মুখ লুকিয়ে প্রাণপণে কান্না রোধ করার চেষ্টা করতে লাগল। কেঁদে আর কী লাভ হবে? একমাত্র কোনও পুরুষমানুষের কাছ থেকে কিছু আদায় করতে হলেই চোখের জল কাজে আসে! কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতেই ঘোড়ার খুরের শব্দ পেল। সচকিত হয়ে উঠল, তবে মাথা তুলল না। গত দু’সপ্তাহ ধরে এই শব্দ শোনবার জন্য ব্যাকুল হয়ে রয়েছে! আর প্রতীক্ষা করেছে এলেনের স্কার্টের খসখস শব্দের। বুক ধুকপুক করতে শুরু করল। তারপর নিজেই নিজেকে ধমক লাগাল, “বোকার মত ভেবো না!”

খুরের আওয়াজ স্বাভাবিক গতিতেই ক্রমশ মন্থর হয়ে আসতে লাগল। এক সময় আওয়াজটা নুড়ি পাথরের ওপর পায়ে হেঁটে আসার মত খসখস শব্দে পরিণত হল। একটা ঘোড়াই! তাহলে কি টার্লটনদের কেউ – না ফোনটেনদের! তাড়াতাড়ি চোখ তুলল। ইয়াঙ্কি ঘোড়সওয়ার একজন।

চট করে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। পর্দার ভাঁজের মধ্যে দিয়ে অবাক হয়ে লোকটাকে দেখতে লাগল। দমবন্ধ হয়ে এল উত্তেজনায়।

লোকটা ঘোড়ার পিঠে জবুথবু হয়ে বসে আছে। রুক্ষ চেহারা। অযত্নবর্ধিত কালো দাড়ি – বোতাম খোলা নীল উর্দির ওপর লুটিয়ে পড়েছে। কুতকুতে চোখ। রোদের ঝলসানিতে আরও কুঁচকে রয়েছে। মাথায় টাইট নীল টুপি। বেশ ধৈর্যসহকারে বাড়িটা পর্যবেক্ষণ করল কিছুক্ষণ। তারপর সাবধানে ঘোড়া থেকে নামল। ঘোড়াটা একটা থামে বাঁধল।

তলপেটে আঘাত লেগে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে যেমন ব্যাথার একটা মোচড় দিয়ে আবার শ্বাসপ্রঃশ্বাস চালু হয় ঠিক তেমনি ভাবে স্কারলেট আবার নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল। একটা ইয়াঙ্কি! যে সে ইয়াঙ্কি নয় কোমরে একটা লম্বা পিস্তল গোঁজা আবার! আর সে কিনা বাড়িতে একেবারে একলা তিনটে অসুস্থ মেয়ে আর কয়েকটা বাচ্চা নিয়ে!

পিস্তলের হাতলে হাত রেখে কুতকুতে চোখে এদিক ওদিক দেখতে দেখতে লোকটা যখন অলস পায়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসছিল তখন চকিতে স্কারলেটের চোখের সামনে বেশ কিছু এলোমেলো ছবি ভেসে উঠতে লাগল। আন্ট পিটিপ্যাটকে ফিসফিস করে ‘ইয়াঙ্কি’ নামটার সাথে জুড়ে থাকা নিষ্ঠুরতা নিয়ে কত কিছু বলতে শুনেছে। অরক্ষিত মেয়েদের ওপর চড়াও হওয়া, গলা কেটে দেওয়া, বাচ্চারা কেঁদে উঠলে তাদের শরীরে বেয়নেট ঢুকিয়ে দেওয়া, মৃতপ্রায় মহিলাদের ঘরে বন্দী করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া এমন আরও কত নৃশংস অত্যাচারের কথা!

ওর প্রথম প্রতিক্রিয়া হল হয় আলমারির মধ্যে লুকিয়ে পড়া বা হামাগুড়ি দিয়ে খাটের তলায় সেঁধিয়ে যাওয়া আর নয়ত পেছনের সিঁড়ি দিয়ে পালিয়ে জলাঝোপের পেছনে চলে গিয়ে ওর হাত থেকে বাঁচা। সতর্ক পায়ের আওয়াজ থেকে বুঝতে পারল লোকটা বারান্দা হয়ে হলঘরে ঢুকেছে। অতএব পালানোর রাস্তা বন্ধ। স্কারলেট ভয়ে কাঁটা হয়ে স্থানু হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। পায়ের আওয়াজ থেকে বুঝতে পারছে যে লোকটা নীচের তলার এ ঘর থেকে ও ঘরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কোনও ঘরে কোনও মানুষ দেখতে না পাওয়ায় ওর সাহস বেড়ে গেছে, সেটা ওর হাঁটা চলার অসতর্ক ভঙ্গি থেকেই বোঝা যাচ্ছে। লোকটা এখন খাবার ঘরে। তার মানে এবার ও রান্নাঘরে ঢুকে পড়বে।

রান্নাঘরের কথা মনে হতেই স্কারলেটের বুকে যেন কেউ ছুরি মেরে দিল। নিস্ফল রাগে ওর অন্তরাত্মা জ্বলে উঠল। রান্নাঘর! ওখানে চুল্লীর ওপর দুটো পাত্রে ওদের ন’জন ক্ষুধার্ত মানুষের খাবার তৈরি হচ্ছে! পরিমাণ এতটাই কম, যে দুজন মানুষেরও পেট ভরবে না! একটাতে কিছু আপেল স্ট্যু করতে দেওয়া হয়েছে। আর অন্যটাতে টুয়েল্ভ ওকস আর ম্যাকিন্টশদের বাগান থেকে খুব কষ্ট করে সংগ্রহ করে আনা নানা রকম তরিতরকারির ঘ্যাঁট! স্কারলেট খিদে চেপে রেখে বসে আছে কখন সকলে বাড়ি ফেরে এই আশায়। আর সেই খাবার কিনা ওই ইয়াঙ্কিটা খেয়ে নেবে? স্কারলেট রাগে অন্ধ হয়ে গেল।

ঈশ্বর ওদের ধ্বংস করে দিন! এক তো পঙ্গপালের মত এসে লুটপাট করে টারাকে নিশ্চিহ্ন করে গেছে, যাতে সবাই খিদের জ্বালায় মরে যায়। আর এখন আবার এসেছে, যেটুকু পড়ে আছে,সেটাও চুরি করে নিতে! খিদের জ্বালায় ওর পেট ব্যথা করতে লাগল। হে ভগবান, অন্তত এই ইয়াঙ্কিটাকে চুরি করতে কিছুতেই দেওয়া যাবে না!

পা থেকে ছেঁড়া জুতোটা খুলে ফেলে, খালি পা টিপে টিপে বড় টেবিলটার কাছে গেল। বুড়ো আঙ্গুলের ফোসকার কথা মনেই থাকল না। সব থেকে ওপরের ড্রয়ারটা আওয়াজ না করে খুলে ভারি পিস্তলটা বের করে নিল। এটা ও অ্যাটলান্টা থেকে নিয়ে এসেছিল। চার্লস এটা সঙ্গে রাখত, কিন্তু চালাবার সুযোগ জোটেনি। দেওয়ালে ঝোলানো তলোয়ারের নীচের চামড়ার ব্যাগ থেকে একটা গুলি বের করে পিস্তলে ভরে নিল। হাত কাঁপল না। নিঃশব্দে, কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সিঁড়ি বেয়ে ওপরের হলঘর থেকে নীচে নেমে এল। এক হাতে সিঁড়ির রেলিং ধরে নিজেকে সোজা রাখল। অন্য হাতে পিস্তলটা হাঁটুর স্কার্টের ভাঁজে লুকিয়ে নিল।

কেউ একজন নাঁকি সুরে বলল, “কে ওখানে?” স্কারলেট সিঁড়ির মাঝামাঝি পর্যন্ত গিয়ে থেমে গেল। রক্ত এমন প্রবল বেগে ওর মাথা থেকে কান পর্যন্ত ছুটে এল যে প্রায় কিছুই শুনতে পারল না। লোকটা বলল, “নড়াচড়া কোরো না! নইলে গুলি চালাব!”

খাবার ঘরের দরজার সামনে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে। একটু ঝুঁকে, কিছুটা যেন সন্ত্রস্ত। এক হাতে পিস্তল, আর অন্য হাতে রোজ়উডের ছোট্ট সেলাইয়ের বাক্স, সোনার তৈরি অঙ্গুলিত্র, সোনার হাতল দেওয়া কাঁচি, সোনা দিয়ে বাঁধানো এমেরি ফল। স্কারলেটের হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে গেল। চোখ মুখ রাগে থমথম করে উঠল। এলেনের সেলাইয়ের বাক্স লোকটার হাতে! ওর কেঁদে উঠতে ইচ্ছে করল, “ওটা রেখে দাও! ওটা এখুনি নামিয়ে রাখ তোমার ওই নোংরা হাত থেকে –”, কিন্তু ওর গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বের হল না। ও শুধু রেলিঙের ওপর দিয়ে লক্ষ্য করল যে লোকটার অভিব্যক্তি থেকে সন্ত্রস্ত ভাবটা চলে গিয়ে শ্লেষমিশ্রিত লোলুপ অভিব্যক্তি ফুটে উঠল।

“তাহলে বাড়িতে কেউ আছে!” বলে পিস্তলটাকে উর্দির পেছনে গুঁজে রাখল। তারপর এগিয়ে এসে হলঘরে ঠিক ওর নীচে গিয়ে দাঁড়াল। “একলাই রয়েছ মনে হচ্ছে সুন্দরী?”

বিদ্যুতবেগে স্কারলেট পিস্তলটা বের করে এনে রেলিঙের ওপর থেকে লোকটার দাড়িওয়ালা মুখের ওপর ধরল। তারপর লোকটাকে পিস্তলটা বের করার সুযোগ না দিয়েই ট্রিগার টিপে দিল। একটা ঝটকা লেগে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল। তা সত্ত্বেও বিস্ফোরণের প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পেল। পোড়া বারুদের গন্ধও অনুভব করল। লোকটা মেঝেতে চিৎ হয়ে পড়ে গেল। ধাক্কা লেগে আসবাবপত্র ঝনঝন করে উঠল। সেলাইয়ের বাক্সটা হাত থেকে ছিটকে পড়ল। ভেতরের জিনিসপত্র চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। নিজের অজান্তেই স্কারলেট সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে নীচে নেমে এল। লোকটার সামনে দাড়িয়ে ঝুঁকে পড়ে দাড়িওয়ালা মুখটার যেটুকু অবশিষ্ট ছিল সেটার দিকে তাকাল। নাকটা যেখানে ছিল সেটা এখন একটা রক্তাক্ত ড্যালা। বারুদে বিস্ফারিত চোখগুলো জ্বলে গেছে। মেঝেতে দুটো রক্তের ধারা বয়ে যাচ্ছে। মুখ থেকে একটা ধারা, অন্যটা মাথার পেছন থেকে।

লোকটা মরে গেছে। মরেই গেছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ও একটা মানুষ খুন করেছে!

ধোঁয়া ঘুরতে ঘুরতে ছাদের দিকে যাচ্ছে। রক্তের ধারা দুটো ওর পায়ের কাছাকাছি এসে চওড়া হয়ে গেছে। সেদিনের গুমোট সকালবেলায় স্কারলেট এভাবে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল কোনও আন্দাজই নেই। চারপাশ থেকে যে সব অবান্তর আওয়াজ ভেসে আসছিল, সেগুলো বেশি বেশি কোলাহলপূর্ণ মনে হচ্ছিল। বুকের ভেতরে ধক ধক শব্দ। হাওয়ায় ম্যাগনোলিয়া পাতার সরসর শব্দ। দূর থেকে ভেসে আসা পাখির ডাকে বিলাপের সুর। জানলার বাইরে থেকে ফুলের মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে।

ও কিনা একটা মানুষকে খুন করে ফেলেছে! যে কিনা শিকার ধরা পড়লে ওটা মেরে ফেলার দৃশ্য, জবাই করার সময় শুয়োরের আর্তনাদ, ফাঁদে পড়া খরগোশের চিঁচিঁ শব্দও সহ্য করতে পারে না! খুন করে ফেলেছে! নিস্তেজ মনে ভাবল। আমি একটা খুন করে ফেলেছি! না, না, এ আমি কিছুতেই করতে পারি না!

ওর দৃষ্টি ঘুরে এসে লোকটার লোমশ হাতটার ওপর পড়ল। সেলাইয়ের বাক্সটা হাতের একেবারে কাছে পড়ে আছে। প্রাণচঞ্চল ভাবটা আবার জেগে উঠল। বাঘিনিসুলভ এক উল্লাস অনুভব করল। যেখানে এক সময় লোকটার নাক ছিল, হাঁ হয়ে থাকা সেই ক্ষতস্থানে, ইচ্ছে করল পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়, পায়ের তলায় লোকটার উষ্ণ রক্তের স্রোত অনুভব করার পৈশাচিক ইচ্ছে জেগে উঠল। বেশ করেছে! টারার জন্য – আর এলেনের জন্য – ও প্রতিশোধের আঘাত হানতে পেরেছে!

সিঁড়িতে দ্রুত পদশব্দ। কেউ যেন হোঁচট খেতে খেতে নেমে আসছে। অল্প একটু বিরতি, তারপর আবার দুর্বল পা টেনে টেনে কারও আসার শব্দ। সঙ্গে সঙ্গে ধাতব কোনও একটা ভারি বস্তু টেনে আনার শব্দ। স্কারলেট চকিতে বাস্তবে ফিরে এল। চোখ তুলে ওপরে তাকাতেই মেলানির সঙ্গে চোখাচোখি। পরনে ছেঁড়াখোঁড়া একটা শেমিজ, কোনওক্রমে গায়ে জড়িয়ে নিয়েছে। রাতের পশাক হিসেবেই ওটা পরে ও। কাঁপা কাঁপা হাতে চার্লসের তরবারি ধরা। নীচে চকিত দৃষ্টিক্ষেপ করে পরিস্থিতি আন্দাজ করার চেষ্টা। নীল পোশাক পরা একটা শরীর রক্তের স্রোতের মধ্যে পড়ে আছে। পাশে পড়ে আছে সেলাইয়ের বাক্সটা। স্কারলেট খালি পায়ে পাশে দাঁড়িয়ে, পাণ্ডুর মুখ, লম্বা পিস্তলটা হাতে আঁকড়ে ধরা।

নীরবে স্কারলেটের চোখে চোখ রাখল। সদা শান্ত চোখে সগর্ব পুলকের অভিব্যক্তি। দৃষ্টিতে নীরব অনুমোদন। ঠোঁটের কোনে উদ্যাম পুলক ঝরে পড়া হাসি। স্কারলেটের বুকের মধ্যে যে তোলপাড় চলছে, থিক যেন তারই প্রতিফলন।

“আরে – ও যে দেখছি আমারই মত! আমার মনের ভেতরে কী চলছে, ও বুঝতে পারছে!” স্কারলেট কথাটা বেশ খানিক সময় নিয়ে মনে মনে নাড়াচাড়া করল। “এমন পরিস্থিতিতে পড়লে, ও একই কাজ করত!”

দুর্বল, ক্ষীণজীবী মেয়েটাকে ও নতুন চোখে দেখল। এতদিন ধরে ওকে অপছন্দই করে এসেছে। ঘৃণার চোখে দেখেছে। এছাড়া আর কোনও অনুভূতি ওর সম্বন্ধে ছিল না।

অ্যাশলের বউ বলে মেলানিকে ঘৃণা করতে অভ্যস্ত স্কারলেটের মনে শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠল। মনে হল এমন একজন সঙ্গী, যাকে চোখ বুজে ভরসা করা যায়। ক্ষণিকের জন্য ক্ষুদ্র স্বার্থের তুচ্ছ আবেগ থেকে মুক্ত হয়ে ভাবল মেলানির ওই আপাত শান্ত কণ্ঠস্বর আর ভীরু চোখের আড়ালে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়চেতা এক নারী বাস করে।

“স্কারলেট! স্কারলেট!” বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে স্যুয়েলেন আর ক্যারিনের আতঙ্কে ভরা চাপা গলা। ওয়েডের চিৎকারও শোনা গেল, “আন্টি! আন্টি!” মেলানি তাড়াতাড়ি মুখে আঙ্গুল দিয়ে কথা না বলার ইশারা করল। তারপর তরবারিটা সব থেকে ওপরের ধাপে শুইয়ে রেখে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে ওপরতলার হলে গিয়ে রুগীদের ঘরের দরজা ফাঁক করল।

“ভয় পেয়ো না বাছারা!” খুশি খুশি ভাব করে হালকা গলায় বলল কথাটা। “হয়েছে কী, তোমাদের দিদি – চার্লসের পিস্তলে তেল লাগিয়ে জঙ সাফ করছিল। হঠাৎ হাত থেকে পড়ে গিয়ে একটা গুলি বেরিয়ে গেছে। ও খুব ভয় পেয়ে গেছিল! … হ্যাঁ ওয়েড হ্যাম্পটন, তোমার বাপির পিস্তল থেকে তোমার মামণি একটা গুলিয়ে চালিয়েছিল – এই এক্ষুণি! তুমি আরেকটু বড় হয়ে যাই, তোমাকেও চালাতে দেবে!”

“কী মিথ্যুক রে বাবা! মাথা ঠাণ্ডা রেখে কি রকম বানিয়ে বানিয়ে বলে দিল!” স্কারলেট মনে মনে তারিফ না করে পারল না। “আমি এত তাড়াতাড়ি কিছুতেই গল্প বানাতে পারতাম না! আচ্ছা, মিছে কথা বলার কী দরকার? আমি যে কাজটা করেছি, সেটা তো ওদের জানা উচিৎ!”

আরেকবার তাকিয়ে দেখল লাশটা। রাগ আর ভয়কে ছাপিয়ে গিয়ে এবার গা গুলিয়ে উঠল। হাঁটু কাঁপতে শুরু করল। মেলানি হিঁচড়ে হিঁচড়ে আবার সিঁড়ির ওপরের ধাপে নিজেকে টেনে এনে রেলিং ধরে ধরে নামত শুরু করল। মাঝে মাঝে দাঁত দিয়ে ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া নীচের ঠোঁট কামড়ে ধরছে।

“যাও, বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড় গে যাও! নইলে মারা পড়বে, বুদ্ধুরাম!” স্কারলেট চেঁচিয়ে বলে উঠল। প্রায় উলঙ্গ মেলানি অবশ্য যন্ত্রণায় মুখ বিকৃত করে সিঁড়ি বেয়ে নীচের হলঘরে চলে এল।

“স্কারলেট,” মেলানি ফিসফিস করে বলল, “ওকে তো এখান থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে মাটির তলায় পুঁতে ফেলতে হবে! কে জানে ওর সঙ্গে কারা কারা আছে, যদি ওরা ওকে এই অবস্থায় দেখে ফেলে – ” স্কারলেটের বাহুতে ভর দিয়ে টাল সামলে নিল।

“একাই এসেছে, মনে হয়,” স্কারলেট বলল। “ওপরের ঘরের জানলা দিয়ে আর কাউকে আমি দেখতে পাইনি। মনে হয় লোকটা পলাতক।”

“ধর একাই এসেছে, তবুও কাউকে জানতে দেওয়ার দরকার নেই। নিগ্রোদের মুখ থেকে কথা চালাচালি হয়ে জানাজানি হয়ে যেতে পারে। তাহলে, স্কারলেট, ওরা এসে তোমাকে নিয়ে যাবে। জলা থেকে সবার ফিরে আসার আগেই ওকে লুকিয়ে ফেলতে হবে।”

মেলানির গলার স্বরে তাড়ার আভাস পেয়ে স্কারলেটের সম্বিত ফিরল। ব্যাকুল হয়ে ভাবতে শুরু করল, কী করা যায়।

“বাগানের কোণটাতে পুঁতে দিতে পারি – ওই যেখান থেকে পোর্ক সেদিন হুইস্কির পিপেটা খুঁড়ে বের করেছিল। মাটিটা এখনও নরম আছে ওখানে! সমস্যা হল, ওকে ওখানে নিয়ে যাব কী করে!”

“আমরা দুজনে মিলে একটা একটা ঠ্যাং ধরে টেনে নিয়ে যেতে পারি,” মেলানি বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলল।

অনিচ্ছাসত্ত্বেও, স্কারলেটের মনে ওর প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেল।

“এই অবস্থায়, একটা বেড়ালকেও তুমি টেনে নিয়ে যেতে পারবে না। আমিই দেখছি,” একটু রুক্ষস্বরেই কথাটা বলে ফেলল স্কারলেট। “যাও তুমি গিয়ে শুয়ে পড়। নাহলে মারা পড়বে। আমাকে সাহায্য করার চেষ্টাও কোরো না, তাহলে কিন্তু আমি নিজেই তোমাকে পাঁজাকোলা করে তুলে ওপরে রেখে আসব।”

মেলানির পাণ্ডুর মুখে উপলব্ধি করতে পারার মিষ্টি হাসি। “তুমি আমার সোনা বোন, স্কারলেট,” কথাটা বলে স্কারলেটের গালে হালকা করে ঠোঁট বুলিয়ে দিল। স্কারলেট বিস্ময় কাটিয়ে ওঠার আগেই মেলানি বলে চলল, “তুমি যদি একা ওকে টেনে বের করে নিয়ে যেতে পার, তাহলে আমি – এই জায়গাটা – আমি পরিষ্কার করে ফেলতে পারি – ওরা ফিরে আসার আগেই, আর একটা কথা স্কারলেট – ”

“হ্যাঁ, বল?”

“ওর ঝোলার ভেতরে কী কী আছে – সেটা যদি একবার দেখে নিই – সেটা কি খুব অন্যায় হবে? খাবারদাবার থাকতে পারে।”

“একটুও অন্যায় হবে না,” স্কারলেট বলল। কথাটা ওর নিজের মাথায় কেন আসেনি ভেবে বিরক্ত হল। “তুমি বরং ঝোলাটা দেখ। আমি ততক্ষণ পকেটগুলো দেখছি।”

খানিক অরূচি নিয়েই স্কারলেট মরা লোকটার ওপর ঝুঁকে পড়ে জ্যাকেটের বাকি বোতামগুলো খুলতে লাগল। তারপর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একটা একটা পকেটে তল্লাশি চালাতে লাগল।

“হে ভগবান,” স্কারলেট ফিসফিসিয়ে উঠল। কাপড় দিয়ে মোড়া একটা পেটমোটা ওয়ালেট টেনে বের করে আনল। “মেলানি – মেলি – মনে হচ্ছে এটা ভর্তি টাকা!”

মেলানি কোনো কথা বলল না। ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হেলান দিল।

“তুমিই দেখ,” কাঁপা কাঁপা গলায় মেলানি বলল। “বড় দুর্বল লাগছে আমার।”

কাপড়টা ছিঁড়ে ফেলে কম্পিত হাতে ওয়ালেটটা খুলল।

“দেখ মেলি – একবার দেখ!”

মেলানি বড় বড় চোখ করে তাকাল। তাড়া তাড়া নোট! যুক্তরাষ্ট্রের টাকা কনফেডারেটদের টাকার সঙ্গে মিলে আছে। এগুলোর মাঝখানে দশ ডলারের একটা আর পাঁচ ডলারের দুটো স্বর্ণমূদ্রা চকচক করছে।

“এখনই গুনে সময় নষ্ট কোরো না,” স্কারলেট আঙ্গুল দিয়ে টাকা গোনার উপক্রম করতেই মেলানি তাড়াতাড়ি বলে উঠল। “হাতে আমাদের একদম সময় নেই – ”

“বুঝতে পারছ মেলানি – এই টাকাগুলো মানে – আমাদের খাবার জুটবে?”

“ঠিক বলেছ, সোনা, একদম ঠিক। আমি জানি। কিন্তু এখন আর একটুও সময় নেই। তুমি অন্য পকেটগুলো দেখ, আর আমি এই ঝোলাটা দেখছি।”

ওয়ালেটটা সরিয়ে রাখতে স্কারলেটের একটুও ইচ্ছে করছিল না। অনেক উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা মনের মধ্যে উঁকি দিতে লাগল। সত্যিকারের টাকা, ইয়াঙ্কির ঘোড়াটা, খাবারদাবার! ঈশ্বর তাহলে সত্যি সত্যিই আছেন! আর একটা হিল্লেও করে দিলেন। যদিও ওঁর হিল্লে করে দেওয়ার ধরণটা বেশ গোলমেলে। উবু হয়ে বসে, ওয়ালেটের দিকে তাকিয়ে স্কারলেট মিটিমিটি হাসতে লাগল। খাবারদাবার! মেলানি ওয়ালেটটা ওর হাত থেকে কেড়ে নিল আর –

“তাড়াতাড়ি কর!” বলে উঠল।

প্যান্টের পকেট থেকে বিশেষ কিছু পাওয়া গেল না। মোমবাতির একটা টুকরো, একটা ছুরি, এক দলা তামাক আর কিছু সুতো। ঝোলার ভেতর থেকে মেলানি পেল ছোট্ট এক প্যাকেট কফি। নাকের সামনে নিয়ে আঘ্রাণ নিল এমনভাবে যেন বিশ্বের সেরা পারফিউমের সৌরভ নিচ্ছে। পেল সস্তা দামের বিস্কুট, তারপর ওর মুখের ভাব বদলাতে শুরু করল। বের করল সোনার ফ্রেমে বাঁধানো ছোট্ট একটা মেয়ের ছবি, গারনেটের একিওটা ব্রুচ, দুটো সোনার বালা, তার থেকে ছোট ছোট সোনার শেকল ঝুলে আছে, সোনার একটা অঙুলিত্র, রুপোর তৈরি বাচ্চাদের পেয়ালা একটা, এম্বয়ডারি করার সোনার কাঁচি, হিরে বসানো আংটি, আর নাসপাতির মত হিরে বসানো একজোড়া ঝোলা দুল, আনাড়ি চোখে দেখেও ওরা বুঝতে পারল এক একটা হিরের ওজন কম করে এক ক্যারাট তো হবেই।

“চোর এক নম্বরের!” মেলানি হিসহিসিয়ে বলল। ওর শরীর মুচড়ে উঠল। “এগুলো নিশ্চিত লোকটা চুরি করেছিল, স্কারলেট!”

“সে আর বলতে!” স্কারলেট বলল। “আর আমাদের এখানে আরও চুরি করতে এসেছিল!”

“আমার খুব ভাল লাগছে যে তুমি ওকে মেরে ফেলেছ,” মেলানি শান্ত কিন্তু দৃঢ়স্বরে বলল। “নাও, এবার তাড়াতাড়ি ওকে এখান থেকে সরিয়ে ফেল, সোনা!”

স্কারলেট ঝুঁকে পড়ে লোকটার বুট পরা দুই পা ধরে টান লাগাল। কী ভারি লোকটা! হঠাৎ খুব দুর্বল মনে হল নিজেকে। ধর যদি ওকে নাড়াতে না পারে? লাশটার দিক থেকে পেছন ফিরে দুপাশের বগলের তলায় একটা করে ভারি বুট চেপে ধরে সামনে এগোনোর চেষ্টা করল। লোকটাকে সামান্য নড়ানো গেল। আবার ঝটকা দিল। উত্তেজনার মধ্যে পায়ের দগদগে ঘায়ের কথা মনে ছিল না। যন্ত্রণায় কাতরে উঠল। এবার গোড়ালির ওপর পায়ের ভার রেখে টানতে শুরু করল। টানাটানির পরিশ্রমে কপাল থেকে ঘাম ঝরতে লাগল। কোনোক্রমে লাশটা হলঘরের ভেতর দিয়ে টেনে হিঁচড়ে দরজার দিকে নিয়ে যেতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে মেঝেতে একটা লাল রঙের দাগ আঁকা হয়ে যেতে লাগল।

“উঠোনের মধ্যে দিয়েও যদি এরকম রক্ত পড়তে পড়তে যায়, তাহলে তো লুকোনো মুশকিল হয়ে পড়বে,” স্কারলেট হাঁপাতে হাঁপাতে বলল। “তোমার শেমিজটা খুলে দাও তো, মেলানি। আমি ওর মাথাটা পেঁচিয়ে নেব।”

মেলানির পাণ্ডুর মুখ লজ্জায় লাল হয়ে উঠল।

“অত লজ্জা পাচ্ছ কেন? আমি তোমার দিকে তাকাব না,” স্কারলেট বলল। “আমার পেটিকোট বা প্যান্টালেট পরা থাকলে ওটাই ব্যবহার করতাম।”

দেওয়ালের দিকে ঘুরে গিয়ে জবুথবুভাবে শতছিন্ন সুতির শেমিজটা মাথার ওপর দিয়ে গলিয়ে খুলে ফেলে নিঃশব্দে স্কারলেটের দিকে ছুঁড়ে দিল। দু’হাত বুকের কাছে জড়ো করে যতটা সম্ভব নিজের আব্রু রাখার চেষ্টা।

“এ বাবা, আমি মোটেই এত লাজুক নই,” স্কারলেট অবাক হয়ে ভাবল। মেলানির এই বিব্রত দশা যত না দেখতে পেল, তার চেয়েও বেশি অনুভবে বুঝতে পারল। ছিন্ন বিচ্ছিন্ন মুখের ওপর ছেঁড়াখোঁড়া জামাটা পেঁচিয়ে নিল।

খোঁড়াতে খোঁড়াতে বার কয়েক ঝটকা মেরে লাশটা পেছনের উঠোনের দিকে টেনে নিয়ে গেল। মাঝে মাঝে একটু থামতে হল, কপাল থেকে ঝরে পড়া ঘাম হাতের পেছন দিয়ে মোছার জন্য। মেলানির দিকে চোখ পড়ল। বেচারা দেওয়াল ঘেঁষে হাঁটু দিয়ে নিরাবরণ বক্ষ আবৃত করে বসে আছে।

এমন বিপদের সময়েও মেলানি লজ্জাশরম নিয়ে এত বিব্রত হয়ে পড়েছে! কী বোকা মেয়ে রে বাবা! একটু বিরক্তই হল স্কারলেট। ওর এই শালীনতা নিয়ে বাড়াবাড়িটাই স্কারলেটের সহ্য হয় না। কথাটা ভেবেই নিজেই লজ্জিত হয়ে পড়ল। এটা তো মানতেই হবে, আজ এই বিপদের সময়ে, মেলানিই তো ওর সাহায্যের জন্য এগিয়ে এসেছে! সবে ওর বাচ্চা হয়েছে, এখনও গায়ের জোর ফিরে পায়নি, তবুও একটা অস্ত্রও টেনে এনেছে যেটা তুলতেই ওর কত কষ্ট হয়েছে!

যথেষ্ট সাহস না থাকলে এটা করা যায় না। সেই ভয়ঙ্কর রাতে, যেদিন অ্যাটলান্টার পতন হল, বাড়ি ফেরার জন্য সেই দীর্ঘ যাত্রাপথে মেলানি বারবার ওর বজ্রকঠিন সাহসের পরিচয় দিয়েছে, আর স্কারলেট ভাল মতই জানে যে ওর নিজের ওই সাহসটা নেই। এটা হল সেই অধরা, অদর্শনীয় সাহস যা প্রতিটি উইল্কস ধারণ করে থাকে, এমন একটা স্বভাব যা স্কারলেটের কাছে দুরধিগম্য, কিন্তু অনিচ্ছুকভাবে হলেও মনে মনে শ্রদ্ধা না করে থাকতে পারে না।

“যাও, শুয়ে পড় দেখি গিয়ে,” ঘাড় না ঘুরিয়েই কথাটা ছুঁড়ে দিল। “না ঘুমোলে তুমি যে মরে যাবে। লণ্ডভণ্ড এই জায়গাটা আমিই পরিষ্কার করে নেব, ওকে কবর দিয়ে এসে।”

“একটা ছেঁড়া জাজিম দিয়ে ওটা আমি করে ফেলব,” অসুস্থ চোখে রক্তের স্রোত দেখতে দেখতে মেলানি চাপা গলায় বলল।

“মরার অত শখ হয়ে থাকলে, মর! আমি মুখ ফিরিয়েও দেখব না! আর হ্যাঁ, আমি ফিরে আসার আগেই ওরা যদি এসে পড়ে, সোজা বাড়ির ভেতরে পাঠিয়ে দিও – বোলো ঘোড়াটা পথ ভুলে এখানে চলে এসেছে।”

সকালের সূর্যালোকে বসেও মেলানি কেঁপে কেঁপে উঠছিল। উঠোনের সিঁড়ি দিয়ে নামানোর সময় মৃত মানুষের মাথায় ঠোক্কর লেগে ধড়াস ধড়াস শব্দ আসছিল। মেলানি কান ঢেকে ফেলল।

ঘোড়াটা কোথা থেকে এল কেউ জানতেও চাইল না। সাম্প্রতিক লড়াই থেকে দলছুট হয়ে একটা ঘোড়ার আবির্ভাব হওয়াটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু নয়। বরং ঘোড়াটা পেয়ে সকলেই যারপরনাই খুশি হল। স্কারলেটের খোঁড়া অগভীর খাদে আঙ্গুরের ঝোপের আড়ালে সেই ইয়াঙ্কি জওয়ানটা শুয়ে রইল। আঙুর গাছ যে মাচাকে অবলম্বন করে লতিয়ে উঠেছিল, সেটা পচে গেছিল। কিচেনের একটা ছোট চাকুর কোপ মেরে মেরে স্কারলেট ওটাকে ধূলিসাৎ করে ফেলল। ফলে গাছের লতাপাতা পড়ে কবরটা ঢেকে গেল। এটা আসলে মাচাটা মেরামত করার একটা চেষ্টা কিনা, সেটা নিয়ে স্কারলেট হ্যাঁ বা না কিছুই বলল না। নিগ্রোরাও যদি কারণটা আন্দাজ করেও থাকে, তবুও এটা নিয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করল না।

শ্রান্ত শরীরে বিনিদ্র রজনী যাপনের সময় ওই অগভীর কবর থেকে কোনও প্রেতাত্মা উঠে এসে স্কারলেটকে ভয় দেখায়নি। ভয় কিংবা অনুশোচনায় ওর স্মৃতি ভারাক্রান্ত হয়েও ওঠেনি। স্কারলেট অবাক হয়ে এর কারণ খোঁজার চেষ্টা করে। মাসখানেক আগে হলেই এমন কাজ ও করেই উঠতে পারত না। সুন্দরী, অল্পবয়স্কা মিসেজ় হ্যামিলটন, হেসে উঠলে যার গালে টোল পড়ে আর কানের ঝুমকোজোড়া দুলে ওঠে, যার হাবভাবে অসহায়তা ফুটে ওঠে, কিনা একটা লোকের বদনে গুলি চালিয়ে মণ্ড বানিয়ে দিয়েছে আর তারপরেই তাড়াহুড়ো করে একটা গর্ত খুঁড়ে পুঁতেও দিয়েছে! এই রকম উদ্ভট কোনও কথা যদি ওর চেনাশোনা কাউকে বলা যায় তবে তার চোখমুখের কী অবস্থা হবে সেটা ভাবলেই স্কারলেটের হাসি পায়।

“এটা নিয়ে আর আমি ভাবব না,” স্কারলেট ঠিক করে ফেলল। “চুকেবুকে গেছে সব, আর লোকটাকে মেরে না ফেললে খুবই বোকামি হত! মনে হয় – আমার মনে হয় – বাড়ি ফেরার পর থেকে আমি বেশ বদলে গেছি – নাহলে কাজটা করতেই পারতাম না!”

সচেতনভাবে স্কারলেট আর এটা নিয়ে মাথা ঘামায়নি, তবে কখনও যদি ওকে কোনও অপ্রীতিকর কাজ করতে হত বা কোনও কঠিন পরিস্থিতি সামলানোর দরকার পড়ত, তখন মনের অবচেতনায় ঘটনাটা উঁকি মারত আর ওকে সাহস জুগিয়ে দিত – “একটা খুন আমি যখন করতে পেরেছি, এই কাজটাও করে ফেলতে পারব!”

যতটুকু বদল স্কারলেট নিজের মধ্যে দেখতে পেয়েছিল, বাস্তবে কিন্তু ও তার থেকে অনেক বেশিই বদলে গেছিল। টুয়েল্ভ ওকসের দাসদাসীদের বাগানে শুয়ে থাকার সময় ওর হৃদয়ে কাঠিন্যের একটা আস্তরণ পড়তে শুরু করে। ধীরে ধীরে সেই আস্তরণ পুরু হয়ে চলেছে।

***

একটা ঘোড়া জুটে যাওয়ায় স্কারলেটের পাড়াপড়শিদের খবর নেওয়ার খুব সুবিধে হয়ে গেল। বাড়ি ফেরার পর থেকে অন্তত হাজারবার প্রশ্নটা মনের মধ্যে উঁকি মেরেছে – “একমাত্র আমরাই কি কাউন্টিতে পড়ে রইলাম? বাকিরা কি সব পুড়ে মরেছে? নাকি ভিটেমাটির মায়া ত্যাগ করে ম্যাকনে পালিয়ে গেছে?” টুয়েল্ভ ওকস, ম্যাকিন্টসদের বাড়ি আর স্ল্যাটারিদের খুপরিবাড়ির ধ্বংসস্তুপের স্মৃতি মনের মধ্যে এমনভাবে গেঁথে গেছে যে সত্যিটা খুঁজে বের করার ব্যাপারে ও কিছুটা আতঙ্কিতই ছিল। তবে অহেতুক জল্পনা করার চেয়ে চরম সত্যিটা জেনে নেওয়াটাই বোধহয় ভাল। প্রথমেই ফোনটেনদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। ওঁরাই ওদের সব থেকে নিকটতম প্রতিবেশী ঠিক এই যুক্তিতে নয়, বরং বৃদ্ধ ডঃ ফোনটেনের সাক্ষাৎ পাওয়া যেতে পারে এই আশায়। মেলানির জন্য একজন ডাক্তারের খুব দরকার। যত শীঘ্র ওর সেরে ওঠা উচিৎ, তত তাড়াতাড়ি ও সেরে উঠছে না, আর ওর ওই পাণ্ডুর দুর্বল চেহারাটাও স্কারলেটকে ভাবাচ্ছে।

তাই যেদিন ওর পা চপ্পল গলানোর মত সেরে উঠল, স্কারলেট ইয়াঙ্কির ঘোড়াটায় উঠে বসল। একটা পা রাখল জিনের রেকাবের ওপর, আর অন্য পা আন্দাজমত জিনের সামনের দিকে গলিয়ে দিল। তারপর তুলোর ক্ষেতের ভেতর দিয়ে মিমোসার দিকে ঘোড়া ছোটাল। বাড়িটার দগ্ধ ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়ার আশঙ্কায় মনকে শক্ত করে নিল।

গাছ পাতার আড়ালে প্লাস্টার দেওয়া হলুদ বাড়িটা নজরে আসতেই ও যতটা বিস্মিত হল, ততটাই আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠল। আগের মতই আছে বাড়িটা। ফোনটেন মহিলারা যখন হইহই বেরিয়ে এসে ওকে আনন্দে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে অভ্যর্থনা জানাল, তখন খুশিতে ওর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল।

আনন্দের প্রাথমিক আবেগ কিছুটা প্রশমিত হলে ওরা সবাই মিলে ডাইনিং রুমে এসে বসল। স্কারলেটের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। বড় রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে বলে, ইয়াঙ্কিরা মিমোসা অবধি এসে পৌঁছতে পারেনি। তাই ফোনটেনদের এখনও রসদের অভাব হয়নি। তা সত্ত্বেও, যে নৈঃশব্দ সমস্ত কাউন্টিকে গ্রাস করেছে, টারাকে ঘিরে আছে যে নৈঃশব্দ, সেই একই নৈঃশব্দ মিমোসাতেও বিরাজ করছে। ঘরে কাজ করবার চারজন দাসী ছাড়া বাকি সব ক্রীতদাস এবং দাসী ইয়াঙ্কিদের আগ্রাসনের ভয়ে পালিয়ে গেছে। স্যালি’র কোলের ছেলেটা ছাড়া বাড়িতে আর কোনও পুরুষ সদস্য নেই। এত বড় বাড়িতে আছেন গ্র্যান্ডমা ফোনটেন – তাঁর বয়স অনেকদিন হল সত্তর পেরিয়ে গেছে, তাঁর পুত্রবধু – যাঁর বয়স পঞ্চাশ পেরিয়ে গেলেও সকলেই ছোট বৌমা বলেই ডাকে, আর স্যালি – যার বয়স কুঁড়ি ছুঁইছুঁই। অন্যান্য প্রতিবেশিদের থেকে কিছুটা দূরে থাকেন বলে কিছুটা অরক্ষিত। কিন্তু হাবভাবে সেটা ওঁরা কখনও প্রকাশ হতে দিতে চান না। স্কারলেটের মনে হল স্যালি আর ছোট বৌমা নিশ্চয়ই ঠাকুমা ফোন্টেনের অদম্য ব্যক্তিত্বের সামনে মুখ খোলার সাহস পায় না। ওই বৃদ্ধা মহিলাকে স্কারলেট নিজেও যথেষ্ট ভয় করে। যেমন ওঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, তেমনি কটুভাষী। স্কারলেটের অতীত অভিজ্ঞতা খুব সুখের নয়।

এই তিন মহিলার মধ্যে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও, আর বয়সের বিস্তর ব্যবধান থাকলেও, লড়াই কিওরে যাওয়ার অদম্য মনোবল আর সাংসারিক অভিজ্ঞতা এঁদেরকে পরস্পরের নিকটে এনে ফেলেছে। তিনজনের পরনেই বাড়িতে ছোপানো শোকের পোশাক। সকলেই বিমর্ষ, বিষণ্ণ আর উদ্বিগ্ন, হাসির মধ্যে একটা তিক্ততার আভাস, কিন্তু কারও মুখেই কোনও অভিযোগের চিহ্ন ছিল না। ওঁদের ক্রীতদাসরা পালিয়ে গেছে, সঞ্চিত অর্থ বর্তমান বাজারে মূল্যহীন, জো, স্যালি’র স্বামী, গেটিসবার্গে মারা গেছে, আর ছোট বৌমা নিজেও বিধবা, কারণ তরুণ ডঃ ফোনটেন ভিক্সবার্গে আমাশার কবলে পড়ে মারা গেছেন। বাকি দুই ছেলে, অ্যালেক্স আর টোনি, ভার্জিনিয়ার কোথাও থাকতে পারে, কিন্তু ওরা বেঁচে আছে কি মরে গেছে, কারোর জানা নেই। বৃদ্ধ ডঃ ফোনটেন হুইলারের অশ্বারোহী বাহিনীর সঙ্গে কোনও অজানা জায়গায় আছেন।

“কী আর বলব, ওই তিয়াত্তর বছরের বুড়ো ভামটা – এমন ভাব করে যেন তরতাজা জওয়ান – আর এদিকে বাতের ব্যথা এমনভাবে জাঁকিয়ে বসেছে শরীরে যেরকম শুয়োরে গায়ে মাছি ভনভন করে!” স্বামী গরবে গরবিনী গ্র্যান্ডমা বললেন, কিন্তু চোখের কোণে বিষণ্ণতার ছোঁয়া।

“অ্যাটলান্টায় কী হচ্ছে না হচ্ছে সেই সব খবরাখবর আপনারা পান?” একটু গুছিয়ে বসেই স্কারলেট জিজ্ঞেস করল। “আমরা তো টারায় সব কিছু থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি।”

“অরাজকতা, বাছা, অরাজকতা,” অভ্যেস মত কথাবার্তার রাশ নিজের হাতে তুলে নিয়ে বৃদ্ধা বললেন। “আমরাও তো তোমাদেরই মত একই রকম ধন্ধে আছি। শেষমেশ শেরম্যান শহরটার দখল নিতে পারল, এইটুকুই শুধু জানতে পেরেছি।”

“তাহলে দখল নিয়ে নিতে পারল। এখন কী করছে লোকটা? কোথায় লড়াই করছে এখন?”

“তিনজন মহিলা, একা একা কাউন্টির এক কোণে পড়ে আছি, চিঠি আর খবরের কাগজের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক নেই অনেক সপ্তাহ হতে চলল, আমরা কোথা থেকে যুদ্ধের খবর জানব?” বৃদ্ধা লেডি তীক্ষ্ণস্বরে বললেন। “আমাদের একজন ডার্কি আরেকজন ডার্কির সঙ্গে কথা বলেছিল। সে আবার আরেকজন ডার্কির কাছে শুনেছিল। সেই ডার্কিটা নাকি একবার জোনসবোরো থেকে ঘুরে এসেছে। এছাড়া আমাদের কাছে আর কোনও খবর নেই। ওদের কাছে শুনতে পেলাম অ্যাটলান্টায় ওরা তাবু গেঁড়ে বসে জওয়ানদের আর ঘোড়াদের বিশ্রাম নেওয়াচ্ছে। কথাটা সত্যি কিনা সেটা যাচাই করা তোমারই মত আমারও সাধ্যের বাইরে। তবে যে কঠিন লড়াই আমরা ওদের দিয়েছি, বিশ্রাম নিতে চাওয়াটা এমন কিছুই আশ্চর্যের ব্যাপার না!”

“এতদিন ধরে তোমার টারায় আছ আর আমরা জানতেই পারলাম না, ভাবতেই পারছি না!” ছোট বৌমা মাঝপথে বলে উঠলেন। “আমারই দোষ, ঘোড়া চালিয়ে খোঁজ নিয়ে আসা উচিৎ ছিল! আসলে এত কাজে এখানে ফেঁসে আছি, কী বলব, প্রায় সব ডার্কিই চলে গেছে, আমি আর সময় করে উঠতে পারিনি। সময় বের করা আমার উচিৎ ছিল! পড়শি হিসেবে কাজটা মোটেই ঠিক করিনি। অবশ্য আমরা ধরেই নিয়েছিলাম টুয়েল্ভ ওকস আর ম্যাকিন্টশদের বাড়ির মত ইয়াঙ্কিরা টারাও জ্বালিয়ে দিয়েছে, আর তোমার সবাই ম্যাকনে চলে গেছ। ভাবতেই পারিনি যে তোমার বাড়িতেই আছ, স্কারলেট।”

“আমরাই বা জানব কেমন করে? মিস্টার ও’হারার ডার্কিরা এসে বলে গেল না – ভয়ে ওদের চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল – যে ইয়াঙ্কিরা নাকি টারায় আগুন লাগিয়ে দেবে বলেছে? গ্র্যান্ডমা বাধা দিয়ে বললেন।

“তাছাড়া আমরা দেখতেই পাচ্ছিলাম – ” স্যালি বলতে শুরু করল।

“আমাকেই বলতে দাও, প্লীজ়,” বৃদ্ধা ভর্ৎসনার সুরে বললেন। “হ্যাঁ, ওরা এসে বলল ইয়াঙ্কিরা নাকি পুরো টারা জুড়ে ওরা নাকি ঘাঁটি গেঁড়ে বসেছে আর তোমরা ম্যাকনে চলে যাওয়ার চেষ্টা করছ। তারপর সেই রাতে আমরা টারার দিকে আগুনের লেলিহান শিখা উঠতে দেখলাম – বেশ অনেকক্ষণ ধরেই জ্বলছিল – আর আমাদের বোকচন্দর ডার্কিগুলো ভয় পেয়ে চম্পট দিল। কী পুড়েছিল?”

“আমাদের সব তুলো – কিছু না হলেও দেড় লক্ষ ডলারের মাল,” তিক্তস্বরে বলল স্কারলেট।

“ভাগ্য ভাল যে তোমাদের বাড়িটা বেঁচে গেছে,” লাঠিতে থুতনি রেখে গ্র্যান্ডমা বললেন। “চাষ করে তুলো আবার ঘরে তুলতে পারবে, কিন্তু নতুন করে বাড়ি তোলা মুশকিল। যেতে দাও ওসব কথা, তোমার কি আবার তুলোর ফসল ঘরে তুলতে শুরু করেছ?”

“কই আর পারলাম,” স্কারলেট বলল, “তাছাড়া বেশিটাই তো নষ্ট হয়ে গেছে। তিন বেলের থেকে বেশি উদ্ধার হবে বলে মনে হয় না। আর সেও তো অনেক দূরে, খাঁড়ির ঢালু জমিতে – কী লাভ? আমাদের ক্ষেতমজুররা তো সবাই চলে গেছে, কে তুলবে?”

“হে ঈশ্বর, আমায় করুণা কর! আমাদের খেতমজুররা তো সবাই চলে গেছে, কে তুলবে?” স্কারলেটের দিকে একটা শ্লেষের দৃষ্টি হেনে গ্র্যান্ডমা ওকে নকল করলেন। “তোমার নিজের ওই কোমল থাবাদুটো কী অন্যায় করল, বাছা, আর তোমার বোনেদের?”

“আমি? তুলো ওঠাব?” স্কারলেট বিস্ময়ে হতবাক, যেন গ্র্যান্ডমা গর্হিত কোনও অপরাধ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। “খেতমজুরদের মত? সাদা চামড়ার ভিখিরিগুলোর মত? ওই স্ল্যাটারি মেয়েছেলেগুলোর মত?”

“সাদা চামড়ার ভিখিরি! ভালই বলেছ! আজকালকার মেয়েদের নাকি নরমসরম হতে হবে, লেডি হতে হবে! শোনো বাছা, আমি যখন ছোট ছিলাম, বাপি সব টাকাকড়ি খুইয়ে বসলেন, আমাকেও সংসারের কাজে, এমনকি খেতের কাজেও লেগে পড়তে হয়েছিল – যতদিন না বাপি কিছু টাকা জমিয়ে আরও কিছু ডার্কি কিনতে পারলেন! লাঙল চালাতে হয়েছে, তুলো তুলতে হয়েছে আমাকে, আর দরকার পড়লে আবারও করতে পারি। মনে হচ্ছে আবারও করতে হবে। সাদা চামড়ার ভিখিরিই বটে!”

“ওহ! কিন্তু মামা ফোনটেন,” ওঁর পুত্রবধু হতবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন। বাকি দুই মহিলার দিকে তাকিয়ে মিনতি করলেন যেন বৃদ্ধাকে শান্ত করতে ওরাও এগিয়ে আসে। “সে তো অনেক কাল আগের কথা, দিনকালও অন্যরকম ছিলে একেবারে। এখন তো সময় বদলে গেছে।”

“বেঁচে থাকার লড়াইয়ে মেহনত করার জন্য সময় কখনোই বদলে যায় না,” শান্ত হওয়ার বদলে বৃদ্ধা আরও তীক্ষ্ণস্বরে বলে উঠলেন। “আর সৎভাবে মেহনত করলেই যে সাদা চামড়ার ভিখিরি হয়ে যেতে হয়, তোমার মুখে এই কথা শুনে তোমার মায়ের জন্য আমার খুব দুঃখ হচ্ছে, স্কারলেট! আদম কোদাল চালাত আর ইভ তাঁত বুনত – ”

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য স্কারলেট তাড়াতাড়ি জিজ্ঞেস করল, “ টার্লটন আর ক্যালভার্টদের কী খবর? ওদের খামারও কি জ্বালিয়ে দিয়েছে? ওরা কি ম্যাকনে পালিয়ে গেছে?”

“ইয়াঙ্কিরা টার্লটনদের খামার পর্যন্ত পৌছতেই পারেনি। বড় রাস্তার থেকে একটু ভেতরেই ওদের জায়গা। তবে ক্যালভার্টদের ওখানে ওরা গেছিল, মজুদ রসদ আর হাঁসমুরগি চুরি করে নিয়ে গেছে, আর ডার্কিদেরও ওদের সঙ্গেই ভাগিয়ে নিয়ে গেছে – ” স্যালি বলতে শুরু করল।

গ্র্যান্ডমা থামালেন ওকে।

“হ্যাঁহ্‌! কালো মাগিগুলোকে ওরা রেশমের পোশাক আর সোনার দুলের লোভ দেখিয়ে ফুঁসলেছিল। ক্যাথলিন ক্যালভার্ট বলল কয়েকজন ট্রুপার নাকি কয়েকটা মেয়েকে নিজেদের ঘোড়ায় চাপিয়ে নিয়ে চলে গেছে। বাদামি রঙের কিছু বাচ্চা হবে, এই যা! ইয়াঙ্কি রক্ত মিশলে ওর জাতে উঠবে কিনা সেটা জোর দিয়ে বলা যায় না!?

“ওহ্‌ মাম্মা ফোনটেন!”

“আদিখ্যেতা কোরো না তো, জেন! এখানে আমাদের সকলেরই বিয়ে হয়ে গেছে, তাই নয় কি? আর ঈশ্বর সাক্ষী আছেন, এর আগেও আমরা দোআঁশলা বাচ্চা দেখেছি!”

“ক্যালভার্টদের বাড়ি ওরা জ্বালিয়ে দিল না কেন?

“দু’নম্বর মিসেজ় ক্যালভার্ট আর ওদের ইয়াঙ্কি ওভারসিয়ার হিল্টনের ইয়াঙ্কি উচ্চারণের দৌলতে।“ বললেন বৃদ্ধা। প্রাক্তন গভর্নেসকে উনি সর্বদা দু’নম্বর মিসেজ় ক্যালভার্ট বলেই উল্লেখ করেন, যদিও প্রথম মিসেজ় ক্যালভার্ট প্রায় কুড়ি বছর হতে চলল গত হয়েছেন।

“আমরা তো কট্টর ইউনিয়নপন্থী,” বৃদ্ধা ভেঙিয়ে বললেন, একেবারে অনুনাসিক সুরটাও নকল করে। “ক্যাথলিন বলল ওরা নাকি পাহাড় নদী সবকিছুর নামে দিব্বি গেলে বলেছিল, ক্যালভার্টদের পুরো গুষ্ঠিটাই নাকি ইয়াঙ্কি। মিস্টার ক্যালভার্ট নাকি একদম নির্বান্ধব অবস্থায় মারা গেছেন! আর এদিকে রাইফোর্ড গেটিসবার্গ আর কেড ভার্জিনিয়ার সেনাবাহিনীতে! ক্যাথলিন এতই মনঃক্ষুণ্ণ হয়েছিল যে মনে মনে চাইছিল ইয়াঙ্কিরা বাড়িতে আগুন লাগিয়েই দিক। বলছিল, কেড বাড়ি ফিরে শুনলে অপমানে জ্বলে যাবে। কী আর করা! কেউ যদি ইয়াঙ্কি মহিলাকে বিয়ে করেন, তাহলে এরকমই প্রতিদান পাবেন! গর্ববোধ জলাঞ্জলি দিতে হবে, শালীনতার ধার ধারতে পারবেন না, কেবল নিজের চামড়া বাঁচানোর ধান্ধা … ওরা টারাকে না জ্বালিয়ে ছেড়ে দিল কেন। স্কারলেট?”

জবাব দেবার আগে স্কারলেট একটু ভেবে নিল। জানে যে এর পরের প্রশ্নই হবে, “পরিবারের সকলে কেমন আছেন? আর তোমার মা?” এলেন যে চলে গেছেন, এটা কিছুতেই বলা যাবে না। এই দরদি মহিলাদের সামনে যদি এই সব কথা বলতে শুরু করে, বা যদি ভাবনাতেও এসে যায়, তাহলেই আর চখের জল সামলে রাখতে পারবে না, কাঁদতে কাঁদতে শরীর খারাপ হয়ে যাবে। কিছুতেই নিজেকে কাঁদতে দেওয়া চলবে না। বাড়ি ফেরার পর থেকে একবারের জন্যও কাঁদেনি। একবারের জন্যও যদি বাঁধ ভেঙে যায়, তাহলে নিমেষে ওর অতি কষ্টে ধরে রাখা সাহস হারিয়ে যাবে। অথচ এই বন্ধুভাবাপন্ন মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে স্কারলেট একটু বিভ্রান্ত হয়েও পড়ল। এলেনের মৃত্যুসংবাদ গোপন করলে, যখন এঁরা জানতে পারবেন, তখন ফোনটেনরা কোনোদিনও ওকে ক্ষমা করবেন না। বিশেষ করে গ্র্যান্ডমা এলেনকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। কাউন্টির খুব কম লোকই বৃদ্ধার চর্মসার আঙ্গুলের শাসানির হাত থেকে বাঁচতে পেরেছে।



“কী হল? বল কিছু,” গ্র্যান্ডমা তীক্ষ্ণ চোখে ওর দিকে তাকালেন। “নাকি তোমার জানাই নেই?”

“মানে, দেখুন, আমি তো লড়াই শেষ হওয়ার পরের দিনের আগে তো বাড়ি ফিরেই আসিনি,” স্কারলেট তাড়াতাড়ি বলল। “ইয়াঙ্কিরা ততদিনে চলে গেছে। বাপি – বাপি আমাকে বললেন উনি – উনি ওদের বাড়িতে আগুন লাগাতে দেননি, কারণ স্যুয়েলেন আর ক্যারিন টাইফয়েডে এতই অসুস্থ ছিল, ওদের পক্ষে কোথাও চলে যাওয়া সম্ভব ছিল না।”

“এই প্রথম শুনলাম যে কোনও ইয়াঙ্কি ভদ্রতা দেখাল,” গ্র্যান্ডমা বললেন। আক্রমণকারীদের সম্বন্ধে ভাল কথা শুনে মুখটা যেন একটু ব্যাজার হল। “মেয়েরা আছে কেমন এখন?”

“এখন আগের থেকে একটু ভাল, বেশ ভাল, প্রায় সেরে উঠেছে, তবে খুবই দুর্বল,” স্কারলেট জবাব দিল। পরমুহুর্তেই মনে হল যে প্রশ্নটা ও ভয়ে এড়িয়ে যেতে চাইছে, সেটাই বৃদ্ধার ঠোটের ডগায় ঘোরা ফেরা করছে। তাড়াতাড়ি আবার প্রসঙ্গ ঘোরাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

“বলছিলাম কি –কিছু খাবারদাবার যদি ধার দিতে পারেন? একদল পঙ্গপালের মত ইয়াঙ্কিরা আমাদের সব কিছু সাফ করে নিয়ে চলে গেছে। অসুবিধে থাকলে কিন্তু সঙ্কোচ করবেন না আর – ”

“ওয়াগন সমেত পোর্ককে পাঠিয়ে দিও। আমাদের কাছে যা আছে – চাল, শস্যদানা, হ্যাম, চিকেন – তার অর্ধেক তোমার পাবে,” স্কারলেটের পানে চকিত ধারাল দৃষ্টি দিয়ে বৃদ্ধা বললেন।

“ওহ – সে তো অনেক – আমি যে কী বলে – ”

“কিছু বলতে হবে না। আমি কিছু শুনতে চাই না। তাহলে প্রতিবেশী হলাম কেন?”

“আপনার স্নেহ আমি ভুলতে পারব না! আচ্ছা এবার আমায় ফিরতে হবে। বাড়িতে সবাই চিন্তা করবে।”

গ্র্যান্ডমা হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে স্কারলেটকে হাত বাড়িয়ে ধরলেন।

“তোমার এখানেই বোসো,” স্কারলেটকে পেছনের বারান্দার দিকে ঠেলে নিয়ে যেতে যেতে উনি হুকুম জারি করলেন। “ওর সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কথা আছে কিছু। স্কারলেট, আমাকে নামতে একটু সাহায্য কর।”

ছোট বৌমা আর স্যালি স্কারলেটকে বিদায় জানাল, বলল খুব শিগগিরই দেখা করতে যাবে। গ্র্যান্ডমার স্কারলেটকে কী বলার থাকতে পারে, সে নিয়ে ওদের কৌতুহলের অন্ত ছিল না। হয়ত কোনোদিনই জানতে পারবে না। বৃদ্ধা মহিলারা যে কী পরিমাণ জেদি হন সে বলার নয়, সেলাইয়ের কাজ আবার শুরু করতে করতে কথাটা ছোট বৌমা ফিসফিস করে স্যালিকে বললেন।

ঘোড়ার লাগামে হাত রেখে স্কারলেট দাঁড়াল। খুব নিস্তেজ লাগছে নিজেকে।

“এবার বল তো,” গ্র্যান্ডমা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে স্কারলেটের দিকে জানতে চাইলেন, “টারার সমস্যাটা আসলে কী? কী লুকিয়ে যাচ্ছ?

বৃদ্ধার চোখের অন্তর্ভেদী দৃষ্টি দেখে স্কারলেটের মনে হল সত্যি কথাটা ওঁকে বলা যায়, না কেঁদেও। ওঁর খোলাখুলি অনুমতি ছাড়া গ্র্যান্ডমায়ের সামনে কেউ কাঁদতে পারে না।

“মা আর নেই,” নিষ্প্রাণ গলায় স্কারলেট বলল।

বৃদ্ধার মলিন হয়ে যাওয়া চোখের ওপর জরায় পাওয়া চোখের পালক পিট পিট করে উঠল। ওঁর হাতের চাপ স্কারলেটের বাহুতে আরও চেপে ধরল।

“ইয়াঙ্কিরা মেরে ফেলেছে?”

“না, টাইফয়েডে। যে দিন আমি বাড়ি ফিরে এলাম – তার আগের দিন।”

“ওটা নিয়ে বেশি ভেবো না,” খুব কঠোর কণ্ঠে গ্র্যান্ডমা বললেন। “আর তোমার বাপি?”

“বাপি – বাপি আর নিজের মধ্যে নেই।”

“কী বলতে চাইছ? খুলে বল একটু। ওঁর শরীর ভাল নেই?”

“এই আঘাতটা – উনি কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছেন – উনি – ”

“নিজের মধ্যে নেই – ঠিক কী বলতে চাইছ? ওঁর মাথা কি কাজ করছে না?”

সত্যি কথাটা রাখঢাক না করে বলে ফেললেন! কী স্বস্তি! সমবেদনার কথা না বলে বৃদ্ধা ওকে খুব রেহাই দিয়েছেন। না হলে কেঁদেই ফেলত।

“ঠিকই ধরেছেন,” নিষ্প্রাণ গলায় বলল স্কারলেট। “ওঁর মাথা কাজ করছে না। সব সময় একটা ঘোরের মধ্যে থাকেন। মা যে আর নেই, সেটা অনেক সময় মনেই থাকে না। কখনও দেখি ঘন্টার পর ঘন্টা ধৈর্য ধরে মায়ের আসার অপেক্ষা করছেন। আপনি তো জানেনই, একজন শিশুর যতটা ধৈর্য থাকে সেটাও ওঁর ছিল না। আমি আর নিতে পারছি না, গ্র্যান্ডমা! মাঝে মাঝে আবার মনেও পড়ে যায় যে মা আসবেন না। কান খাড়া করে মায়ের পায়ের শব্দ শোনার জন্য বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ এক লাফে বাড়ি থেকে বেরিয়ে সমাধিক্ষেত্রে চলে যান। তারপর কোনও মতে নিজেকে টেনে ফিরিয়ে আনেন। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে গালের ওপর দিয়ে পড়ছে। বারেবারে বলতে থাকবেন, “কেটি স্কারলেট, মিসেজ় ও’হারা মারা গেছেন। তোমার মা মারা গেছেন।” যেন কথাটা আমি এই প্রথম শুনছি। যতক্ষণ না আমি চিৎকার দিয়ে উঠব, ততক্ষণ বলতেই থাকবেন। কখনও কখনও গভীর রাতে আমি শুনতে পাই উনি মা’কে ডাকছেন। বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে আমি ওঁকে বোঝাই, মা কোয়ার্টারের একজন অসুস্থ ডার্কির কাছে রয়েছেন। উনি খুব অসন্তুষ্ট হন, বলেন রোগিদের দেখভাল করতে করতেই মা পরিশ্রান্ত হয়ে পড়বেন। তখন ওঁকে আবার বিছানায় ফিরে নিয়ে যাওয়া যে কী শক্ত, বলে বোঝাতে পারব না। একেবারে শিশুদের মত হয়ে গেছেন। ডঃ ফোনটেন এখানে থাকলে খুব ভাল হত! উনি ঠিক বাপির জন্য কিছু করতে পারতেন! তাছাড়া মেলানিকেও একজন ডাক্তার দেখানো খুব দরকার। বাচ্চাটা হওয়ার পর যেভাবে ওর সেরে ওঠা উচিত ছিল – ”

“মেলি? বাচ্চা হয়েছে নাকি? আর তোমাদের কাছে আছে?”

“হ্যাঁ।”

“মেলি তোমাদের সঙ্গে কী করছে? আন্টি আর অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের কাছে ম্যাকনে চলে যাওয়া উচিত ছিল ওর! ওকে তুমি যে খুব পছন্দ কর, সেটা আমার জানা ছিল না! যদিও চার্লির বোন ও, সে কথা ঠিক। সব কথা খুলে বল তো আমাকে।”

“সে অনেক কথা, গ্র্যান্ডমা। তাহলে কী বাড়ির ভেতরে ফিরে গিয়ে বসে নেবেন?”

“দাঁড়িয়ে থাকতে পারব আমি,” স্কারলেটকে থামিয়ে দিলেন। “তাছাড়া তুমি যদি সবার সামনে এই সব বলতে শুরু কর, ওরা এমন হল্লা করবে যে তোমারই খারাপ লাগবে। নাও শুরু কর।”

খানিক দ্বিধাজড়িত গলায়, থেমে থেমে স্কারলেট অবরোধের কথা আর মেলানি অবস্থার কথা বলতে শুরু করল। ক্রমে ক্রমে অভিজ্ঞ অপলক দৃষ্টির সামনে কথা বলতে বলতে ওর দ্বিধা আর জড়তা কেটে গেল। বলার মত কথা, আতঙ্কের কথা নিজে থেকেই ওর মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে লাগল। সব কথা মনে পড়ে গেল। বাচ্চার জন্ম যেদিন হল সেদিনের অসহ্য গুমোট, আতঙ্কের প্রহর গোনা, লড়াই, রেটের মাঝপথে ছেড়ে যাওয়া। রাতের সেই ভয়াবহ অন্ধকারের কথা, ক্যাম্প ফায়ারের আগুনে কথা, যারা বন্ধু কি শত্রু ঠাহর করা যাচ্ছিল না, ভোরের আলোয় সারি সারি পরিত্যক্ত চিমনি নজরে আসা, রাস্তার ধারে মরে পড়ে থাকা মানুষ আর ঘোড়ার কথা, প্রবল জঠরাগ্নির কথা, টারা হয়ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে এই আশঙ্কার কথা সব একে একে বলে চলল।

“খালি মনে হচ্ছিল, একবার যদি বাড়ি ফিরে আসতে পারি – মায়ের কাছে ফিরে আসতে পারি – তাহলে উনি আমার কাঁধ থেকে সব বোঝা নামিয়ে নিজের কাঁধে নিয়ে নেবেন। আমি নিশ্চিন্ত হতে পারব! বাড়ি ফেরার পথে আমি ভেবেছিলাম চরম খারাপ দিন দেখা হয়ে গেছে। তারপর যখন জানলাম মা আর নেই, তখন বুঝতে পারলাম চরম খারাপ দিন বলতে আসলে কী বোঝায়!”

স্কারলেট মুখ নামিয়ে নিয়ে গ্র্যান্ডমা’র বলার অপেক্ষা করতে লাগল। দীর্ঘ নীরবতা। স্কারলেট ভাবছিল হয়ত গ্র্যান্ডমা ওর দুর্দশার ব্যাপারটা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেননি। বৃদ্ধা কথা বললেন অনেকক্ষণ পরে। বেদনায় ভারাক্রান্ত সেই স্বর। এমন কোমল স্বরে স্কারলেট কখনও গ্র্যান্ডমাকে কথা বলতে শোনেনি।

“বাছা, একজন মেয়ের পক্ষে এতটা দুর্যোগ সামলে নেওয়া মুখের কথা নয়। তবে যখন সে এই দুর্যোগ সামলে নেয়, তখন সে আর কিছুতেই ভয় পায় না। … তবে একজন মেয়ের পক্ষে কোনও কিছুতেই ভয় না পাওয়াটাও খুব মঙ্গলজনক নয়। তুমি হয়ত ভাবছ, তোমার অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি না – কী ঝড় তোমার ওপর দিয়ে গেছে, তাই না? না, আমি বুঝি তোমার অবস্থাটা। তোমার মতই যখন আমার বয়স, সে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা, নিজের চোখের খাড়ি অভ্যুত্থান হতে দেখেছি, ফোর্ট মিম-এর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরেই। একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়তে পেরেছিলাম। সেখান থেকে দেখতে আমাদের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিজের চোখে দেখা। দেখলাম, ইন্ডিয়ানরা আমার ভাই আর বোনদের মাথার ছাল ছাড়িয়ে নিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করল। আমার কিছু করার ছিল না, শুধু ওখানে লুকিয়ে বসে মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, যেন ওদের মশালের আলোয় আমার লুকোনোর জায়গাটা দেখতে না পেয়ে যায়। তারপর ওরা আমার মাকেও টেনে হিঁচড়ে বের করে আনল। আমি যেখানে লুকিয়েছিলাম, তার থেকে মাত্র কুড়ি ফুট দূরে খুন করে ফেলল। ওঁর মাথার ছালও ছাড়িয়ে নিয়েছিল। একটু ছাড়া ছাড়াই, একটা ইন্ডিয়ান ওঁর সামনে গিয়ে মাথায় কুড়ুলের আঘাত করে চলল। আমি – আমি ছিলাম মায়ের বড় আদরের, আর আমি অসহায়ভাবে সবই নিজের চোখে দেখলাম। সকাল হতে না হতেই আমি তিরিশ মাইল দূরের উদ্বাস্তু শিবিরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, সেটাই সব থেকে কাছের শিবির। তিনদিন লেগেছিল ওখানে পৌঁছতে। জল জঙ্গল পেরিয়ে, ইন্ডিয়ানদের চোখে ধুলো দিয়ে। সবাই ভেবেছিল আমি পাগল হয়ে যাব। ডঃ ফোনটেনকে সেখানেই প্রথম দেখি। উনি আমার দেখাশোনা কপরতেন … সে পঞ্চাশ বছর আগের কথা – আগেই বলেছি। আর তারপর থেকে, আমি কোনো কিছুতেই ডরাই না, কারণ আমি চরমতম খারাপ কী হতে পারে সেটা উপলব্ধি করে ফেলেছি। অবশ্য এই ভয়ডরহীন স্বভাবের জন্য আমাকে অনেক সমস্যায় পড়তে হয়েছে, অনেক সুখ বিসর্জন দিতে হয়েছে। ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ছিল মেয়েদের নিরীহ আর ভীরু করে সৃষ্টি করা, মেয়েদের ভয়ডরহীন হওয়াটা তাই খুবই অস্বাভাবিক ঠেকে। তাই স্কারলেট, বলি কী ভয় পাওয়ার জন্যও কিছু বাঁচিয়ে রেখো, ঠিক যেমন ভালবাসার জন্য কিছু বাঁচিয়ে রাখাটা জরুরি – ”

আস্তে আস্তে ওঁর কণ্ঠস্বর স্তিমিত হয়ে এল। ওঁর দৃষ্টি সুদূর পঞ্চাশ বছর পেছনে গিয়ে সেই দিনটি মনে করার চেষ্টা করছে যেদিন উনি আতঙ্কিত হয়েছিলেন।

স্কারলেট অধৈর্য হয়ে নড়েচড়ে উঠল। ভেবেছিল গ্র্যান্ডমা ওর অবস্থাটা বুঝতে পারবেন, হয়ত এমন কোনও পরামর্শ দেবেন, যাতে সমস্যাগুলোর একটা সমাধান খুঁজে নিতে পারে। অথচ, আর পাঁচজন বৃদ্ধ মানুষের মতই, মান্ধাতার আমলের কতগুলো ঘটনার স্মৃতিচারণ করতে লেগে গেলেন, যখন ওদের কারোর জন্মই হয়নি, যে সব ঘটনায় কারোই তেমন আগ্রহ নেই। স্কারলেটের মনে হল, ওঁকে এত কথা না বললেই হত।

“ঠিক আছে, তুমি বাড়ি যাও, বাছা, নইলে ওরা চিন্তা করবে,” আচমকাই উনি বলে উঠলেন। “পোর্ককে ওয়াগন সহ পাঠিয়ে দিও বিকেলে – আর বোঝা নামিয়ে ফেলার আশা ছেড়ে দাও, একেবারে। তুমি পারবে না। আমি জানি।”

***

গ্রীষ্মের উষ্ণতা সেই বছর নভেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘায়িত হল। টারার মানুষদের কাছে সেই সময়টা ছিল উষ্ণ আর উজ্জ্বল। দুঃসময় পেরিয়ে আসা গেছে। এখন একটা ঘোড়াও আছে ওদের, প্রয়োজনে হেঁটে না গিয়ে ঘোড়ায় চড়ে যেতে পারে। ব্রেকফাস্টের জন্য ডিমভাজা জুটে যায়, সাপারে হ্যাম থাকে, রাঙা আলু, চিনেবাদাম আর শুকনো আপেলের একঘেয়েমি কাটানো গেছে। উৎসব পরবে রোস্টেড চিকেনের বন্দোবস্তও হয়ে যায়। মা শুয়োর আর তার বাচ্চাকাচ্চাদের অবশেষে পাকড়াও করা গেছে। এখন ওরা খোঁয়াড়ে পরমানন্দে বসবাস করছে। মাঝে মাঝে ওর এমন চেঁচামেচি করতে থাকে যে বাড়িতে ওদের কথাবার্তা চালানোও দুষ্কর হয়ে পড়ে। তবে সেই হট্টগোল শুনে ওরা খুশিই হয়। ওদের থাকা মানে শীতে যখন শুয়োর জবাই করার সময় আসবে তখন থাকবে সাদা মানুষদের জন্য তাজা পোর্কের যোগান, আর কালোদের জন্য নাড়িভুড়ির। অর্থাৎ শীতের সময় খাদ্যের অভাব থাকবে না।

স্কারলেট কল্পনাও করতে পারেনি যে ফোনটেনদের সঙ্গে মোলাকাত হওয়ার ফলে ও মনে মনে এতটা খুশি হয়ে পড়বে। ডাক পড়লে প্রতিবেশীরা এগিয়ে আসতে পারবে, পারিবারিক বন্ধুরা আর সব পুরোন পরিবারই যে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি, এই অনুভূতি ওর মন থেকে নিঃসঙ্গতাবোধ আর সব হারিয়ে ফেলার যে আতঙ্ক টারায় ফেরার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল, সেটা থেকে অব্যহতি পেল। ফোনটেন আর টার্লটনরা, যাদের প্ল্যান্টেশন সৈন্যবাহিনীর যাত্রাপথে ছিল না, তারা সাহায্যের উদার হাত বাড়িয়ে দিয়ে যেটুকু রসদ বাঁচাতে পেরেছিল সেটা ভাগাভাগি করে নিল। এই কাউন্টিতে একে অপরকে বিপদের সময়ে পেছনে এসে দাঁড়ানোর একটা ঐতিহ্য আছে। ওরা এর বিনিময়ে কোনও রকম মূল্য নিতেও অস্বীকার করল। ওরা বোঝাল, পরের বছর টারা যখন আবার ঘুরে দাঁড়ায়, তখন ফসলের বিনিময়ে ফসল দিয়েই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে।

এখন পরিবারের জন্য খাবারের সংস্থান আছে স্কারলেটের, একটা ঘোড়াও আছে, দলছুট ইয়াঙ্কিটার কাছ থেকে পাওয়া অর্থ আর গয়নাগাটি তাও আছে। এই মুহুর্তে যেটার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেটা হল নতুন পোশাক। অবশ্য পোর্ককে কাপড় কেনার জন্য দক্ষিণে পাঠানো মোটেই নিরাপদ নয়। ইয়াঙ্কি হোক বা কনফেডারেট হোক ঘোড়াটা ঠিক ছিনিয়ে নেবে। তবুও, কাপড় কেনার জন্য টাকা আছে, ঘোড়া আর একটা ওয়াগনও আছে শহরে যাওয়ার জন্য, এই ভরসাটাই স্কারলেটকে পরম নিশ্চিন্ত করেছে। কে জানে হয়ত পোর্ক ধরা না পড়েই ঘুরে আসতে পারবে। নাহ্‌, দুর্দিন কেটেই গেছে।

প্রতিদিন সকালে স্কারলেট বিছানা ছাড়ার পর হালকা নীলাকাশ আর উষ্ণ সূর্যালোকের জন্য ঈশ্বরকে মনে মনে কৃতজ্ঞতা জানায়। যতদিন আবহাওয়া এমন মনোরম থাকবে, ততদিনই গরম কাপড় পরার দিনগুলোকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে। আর উষ্ণ দিন মানেই আরও তুলো – আরও বেশি তুলো দিয়ে খালি পড়ে থাকা স্লেভ কোয়ার্টারগুলোর ভরে ওঠা। এখন যেগুলো প্ল্যান্টেশনের উৎপাদন গুদামজাত করার একমাত্র জায়গা। মাঠে এখন অনেক তুলো, নিজে বা পোর্ক যতটা তুলো উঠবে বলে আন্দাজ করেছিল, তার চেয়েও বেশি, চার বেলের মত হবে মনে হয়, ক্যাবিনগুলো খুব শিগগিরই ভরে উঠবে।

গ্র্যান্ডমা ফোনটেনের পরামর্শ মত, সত্যি সত্যিই তুলো তোলার কাজে নিজে হাত লাগানোর কথা স্কারলেট মোটেও ভাবেনি। ও হল কিনা একজন ও’হারা লেডি, তার ওপর এখন টারা’র সর্বময়ী কর্ত্রী, সে কিনা নিজের হাতে মাঠ থেকে তুলো ওঠাবে! কল্পনাতেও আনা যায় না! তাহলে আর কোঁকড়া চুল মিসেজ় স্ল্যাটারি আর এমি’র সঙ্গে ওর তফাৎ কী রইল? ও ঠিক করেছিল নিগ্রোরা খেতের কাজ করবে, আর ঘরের কাজ সামলাবে ও নিজে আর সেরে ওঠার পর অন্য মেয়েরা। কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল নিগ্রোরা জাতপাত নিয়ে ওর থেকেও বেশি স্পর্শকাতর। মাঠে কাজ করতে হবে শুনে পোর্ক, ম্যামি আর প্রিসি রীতিমত হল্লা জুড়ে দিল। ওরা যে ঘরের কাজ করার নিগার, খেতমজুর নয়, সেটা বুঝিয়ে দিল। বিশেষ করে ম্যামি সদর্পে ঘোষণা করে দিল, ও কোনোদিনই খেতমজুর ছিল না। রোবিল্যারদের সম্ভ্রান্ত পরিবারে ওর জন্ম, কোনও নিগ্রো কোয়ার্টারে নয়, বৃদ্ধা মিস-এর শয়নকক্ষে থেকে বড় হয়েছে, তাঁরই পালঙ্কের নীচে মেঝেতে বিছানা পেতে ঘুমিয়েছে। ডিলসিই একমাত্র কোনও প্রতিবাদ করল না। আর প্রিসির দিকে এমন কটমটে চোখে তাকিয়ে রইল যে বেচারা ভয়ে কুঁকড়ে গেল।

স্কারলেট অবশ্য ওদের এই ওজর আপত্তি কানেই তুলল না, আর প্রত্যেককে তুলো গাছের সারিতে কাজ করতে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু ম্যামি আর পোর্ক এতই আস্তে আস্তে কাজ করে আর মাঝে মধ্যে বিলাপ গাইতে শুরু করে যে বিরক্ত হয়ে ম্যামিকে স্কারলেট আবার কিচেনে রান্নার কাজে ফেরত পাঠিয়ে দিল আর পোর্ককে জঙ্গল আর নদী থেকে খরগোশ, মাছ আর কাটবেড়ালি শিকারের জন্য পাঠিয়ে দিল। তুলো ওঠানোর কাজ পোর্কের কাছে অমর্যাদাকর মনে হলেও, শিকার করা বা মাছ ধরাকে ওর হীন কাজ বলে মনে হল না।

এবারে স্কারলেট বোনেদের আর মেলানিকে খেতের কাজে লাগানোর চেষ্টা করল। তবে সেটাও খুব একটা কার্যকরী হল না। মেলানি যত্ন করে তুলো ওঠায়, খুব উৎসাহ নিয়েই, সময়ও নষ্ট করে না, তবে রোদের তেজ সহ্য না করতে পেরে এক ঘন্টার মধ্যেই অজ্ঞান হয়ে পড়ত। সুস্থ হতে লেগে যেত প্রায় এক সপ্তাহ। স্যুয়েলেন করত গোমড়া মুখে, চোখে জল নিয়ে, আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ভান করত। স্কারলেট ওর মুখে এক খোলা জল ঢেলে দিলেই জ্ঞান ফিরে আসত আর ক্ষ্যাপা বেড়ালের মত থুতু ছিটিয়ে উঠে বসত। তবে শেষ পর্যন্ত ও কাজটা করবে না বলে একদিন মুখের ওপর জানিয়ে দিল।

“ডার্কিদের মত মাঠে নেমে কাজ আমি করতে পারব না! তুই আমাকে দিয়ে কিছুতেই করাতে পারবি না। আমাদের বন্ধুরা জানতে পারলে? ধর যদি – যদি মিস্টার কেনেডি জানতে পারেন? উফ্‌, মা যদি একবার জানতে পারতেন – ”

“আরেকবার তুই মায়ের নাম কর, স্যুয়েলেন ও’হারা, চড় মেরে তোকে শুইয়ে দেব,” স্কারলেট চেঁচিয়ে উঠল। “এখানকার যে কোনও ডার্কিদের থেকে মা অনেক বেশি প্রশ্রম করত, আর তুই সেটা জানিস ভাল করেই, লাটসাহেবা!”

“মোটেই না! অন্তত মাঠের কাজ করেনি। আর আমাকে দিয়েও তুই করাতে পারবি না! তোর নামে বাপির কাছে নালিশ করব! উনি আমাকে মোটেই বাধ্য করবেন না!”

“খবরদার বাপিকে এসব নিয়ে একদম বিরক্ত করবি না, বলে দিলাম!” স্কারলেট ভারি দোলাচলে পড়ে গেল। একদিকে বোনের ওপর রাগ, অন্যদিকে বাপির বকুনির ভয়।

“আমি তোকে সাহায্য করব, দিদি,” ক্যারিন বাধ্য মেয়ের মত আপস করার চেষ্টা করল। “আমার কাজের সঙ্গে সঙ্গে স্যুয়ের ভাগের কাজও আমি করে দেব। এখনও ঠিকমত সেরে ওঠেনি, রোদ লাগান ওর উচিত হবে না।”

স্কারলেট কৃতজ্ঞস্বরে বলল, “অনেক ধন্যবাদ তোকে, মিষ্টি বোন আমার!” তারপর একটু উৎকণ্ঠাভরেই ছোটবোনের দিকে তাকাল। বসন্তের মৃদু সমীরণে দোল খাওয়া আঙুর ফুলের গুচ্ছের মত ক্যারিনের দুধে আলতা রঙের ত্বকের সেই চিরন্তন গোলাপি আভাটাই হারিয়ে গেছে। তবুও এই ভাঙন ওর সুন্দর সংবেদনশীল মনকে স্পর্শ করতে পারেনি। জ্ঞান ফিরে আসার পর থেকে মেয়েটা নীরব হয়েই থেকেছে। এলেনের মৃত্যু, স্কারলেটের উগ্রচণ্ডী রূপ, অচেনা দুনিয়া যেখানে কঠোর পরিশ্রম ছাড়া বেঁচে থাকা অসম্ভব এই সব উপলব্ধি করে কিছুটা বিহ্বল। ক্যারিনের কোমল প্রকৃতি এই নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য মনে মনে তৈরি ছিল না। হঠাৎ কী যে ঘটে গেছে, সেটা ও ঠিক বুঝেই উঠতে পারছে না। স্বপ্নচরের মত টারার আনাচেকানাচে ঘুরে বেড়ায় আর যখন যে কাজ করতে বলা হয় সেটা ঠিক সেভাবেই করে দেয়। খুবই দুর্বল শরীর, দেখায়ও সেরকমই, কিন্তু বাধ্য মেয়ের মত কোনও কাজেই না বলে না। স্কারলেটের ফরমাস মত কাজ করে দেওয়ার পর, ওর হাতে জপমালা তৈরিই থাকে, প্রার্থনা করতে বসে যায়। মায়ের জন্য আর ব্রেন্ট টার্লটনের জন্য। ক্যারিন যে ব্রেন্টের মৃত্যুকে হালকাভাবে নেয়নি আর ব্রেন্টের শোক কাটিয়ে উঠতে পারেনি, এটা স্কারলেট ঠিক মত বুঝতে পারেনি। স্কারলেটের কাছে ও এখনও সেই ‘আদরের ছোট বোন’ রয়ে গেছে, এতই ছোট যে সত্যি সত্যি প্রেমে পড়ার বয়সই হয়নি।

চড়া রোদে তুলোর খেতে দাঁড়িয়ে থেকে ঘাড় নীচু করে তুলোর শুকনো ফল তুলতে তুলতে স্কারলেটের কোমর ভেঙে পড়তে চায় আর হাত দুটো খসখসে হয়ে পড়ে। ভাবে যে ওর যদি স্যুয়েলেনের মত শক্ত-সমর্থ আর ক্যারিনের মত মিষ্টি স্বভাবের একজন বোন থাকত তাহলে সোনায় সোহাগা হত। ক্যারিন খুব ধৈর্যসহকারে, আন্তরিকভাবে তুলো ওঠাত। কিন্তু ঘন্টা খানেক পরিশ্রম করার পর বোঝা যেত, স্যুয়েলেন নয় ক্যারিনই এই সব কাজে লাগবার জন্য এখনও যথেষ্ট সুস্থ হয়ে ওঠেনি। ফলে ও ক্যারিনকেও বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ঘরে পাঠিয়ে দিতে হল।

অর্থাৎ তুলো গাছের এই লম্বা সারিতে কাজ করবার জন্য রইল কেবল ডিলসই আর প্রিসি। প্রিসি তুলো তুলত আলসেমিভরে, মাঝে মাঝেই দাঁড়িয়ে পড়ত, পায়ে ব্যথার অজুহাত খাড়া করে, এবং দুর্বল কিংবা ক্লান্ত লাগার আরও নানা রকম বাহানা করতে থাকত। তারপর তুলোর একটা ডাল দিয়ে ওর মা যখন ওকে চাবকাতে শুরু করত, তখন ও কাঁদতে কাঁদতে আরেকটু ভাল করে কাজ করতে শুরু করত। তবে সভয়ে মায়ের নাগালের বাইরে থাকত।

ডিলসি অক্লান্ত পরিশ্রম করত, নীরবে, ঠিক যন্ত্রের মত। ধরে যাওয়া কোমর আর কাঁধের ওপর তুলোর ব্যাগের ভারে নুয়ে পড়া স্কারলেট মনে মনে ভাবত ডিলসির মূল্য সোনা দিয়েো মাপা যাবে না।

“ডিলসি,” বলল ও, “যখন আবার আমাদের ভাল দিন আসবে, তুমি কী করেছ সেটা আমি কিছুতেই ভুলে যাব না। সত্যিই তোমার কোনও তুলনা নেই।”

অন্য নিগ্রোদের মত তামাটে রঙের সেই দানবী এই প্রশংসা শুনে হেসে গলে পড়ল না। কোনও রকম চাঞ্চল্য না দেখিয়ে স্কারলেটের দিকে ঘুরে আত্মমর্যাদার সঙ্গে বলল, “ধন্যবাদ ম্যাম। মিস্টার জেরাল্ড আর মিস এলেন সব সময় আমার সঙ্গে সদয় ব্যবহার করেছেন। যাতে আমি কষ্ট না পাই, মিস্টার জেরাল্ড আমার সঙ্গে আমার প্রিসিকেও কিনে নিয়েছিলেন। সে আমি কখনওই ভুলতে পারি না। আমার শরীরে ইন্ডিয়ান রক্ত বইছে, আর ইন্ডিয়ানরা কখনওই ভাল ব্যবহার পেলে ভুলে যায় না। আমার প্রিসির জন্য খুব দুঃখিত। খুবই অপদার্থ মেয়েটা। মনে হয় ও ঠিক ওর বাপের মতই একজন নিগার। ওর বাপ খুব চঞ্চলস্বভাবের ছিল।”

বাকিদের কাছ থেকে তুলো ওঠানোর ব্যাপারে স্কারলেটকে সহযোগিতার পাওয়া নিয়ে সমস্যায় পড়তে হলেও, আর কাজ ওঠানোর জন্য নিজেকে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হলেও, যখন তুলোর ফসল মাঠ থেকে গিয়ে ক্যাবিনগুলো ভরে তুলতে লাগল, তখন মনে মনে খুব উৎফুল্ল হয়ে উঠল। তুলোতে কী যেন একটা ব্যাপার আছে যা মনে আত্মবিশ্বাস জাগায়, স্বস্তি দেয়। তুলোর থেকেই টারার রমরমা। দক্ষিণের স্বচ্ছলতার মূল কাণ্ডারিই হল তুলো চাষ। স্কারলেট মনে প্রাণে দক্ষিণের অধিবাসী, তাই ওর দৃঢ় বিশ্বাস এই লাল মাটিই টারাকে এবং সমগ্র দক্ষিণকে আবার মাথা তুলে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

যেটুকু তুলো সংগ্রহ করা গেছে, সেটাকে খুব বেশি বলা হয়ত যায় না, কিন্তু অবহেলা করার মতও নয়। কিছু কনফেডারেট মুদ্রা তো ঘরে আসবে ওই তুলো বিক্রি করে। আর ওই মুদ্রা ঘরে আসার মানে ইয়াঙ্কির ওয়ালেট থেকে যে ইয়াঙ্কি মুদ্রা আর সোনা পাওয়া গেছিল সেগুলো বাঁচিয়ে রাখা যাবে, অন্তত যতদিন না সেগুলো খরচ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়ে। পরের বছর বসন্তকালে কনফেডারেট সরকারের কাছে ‘বিগ’ স্যাম আর অন্যান্য খেত মজুরদের, যাদের ওরা হেফাজতে নিয়েছিল, তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার আর্জি জানাবে। একান্তই যদি সরকার ওদের ফিরিয়ে না দেয়, তাহল ওই ইয়াঙ্কি পত্রমুদ্রা দিয়ে প্রতিবেশিদের কাছ থেকে খেতে কাজ করবার মজুর ভাড়া করবে। পরের বসন্তে, অনেক – অনেক – অনেক চারাগাছ রোপণ করতে হবে … ক্লান্ত শিরদাঁড়া টানটান করে স্কারলেট হেমন্তের বাদামি রঙ ধরা খেতের পানে চোখ মেলল … কল্পনায় চোখের সামনে ভেসে উঠল পরের বছরের ছবি – একরের পর একর জুড়ে সবুজ সতেজ ফসল মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে।

পরের বছর বসন্ত কাল! কে বলতে পারে, ততদিনে লড়াই হয়ত থেমে যাবে, ভাল দিন আবারও ফিরে আসবে। কনফেডারেসি জিতে যাক কি হেরে যাক – ফলাফল যাই হোক না কেন, আসন্ন দিনগুলো ভাল না হয়েই যায় না। দু’তরফের সেনাবাহিনীর থেকেই অবিরত উপদ্রবের অনিশ্চয়তার থেকে নিশ্চয়ই সেটা অনেকই ভাল হবে। লড়াই থেমে গেলে, প্ল্যান্টেশন থেকে সদুপায়ে জীবিকা উপার্জনের সুযোগ বেড়ে যাবে। লড়াইটা শুধু থেমে যাক! তখন মানুষ আবার নিশ্চিন্ত মনে শস্যরোপণ করতে পারবে, ফসল তোলার ব্যাপারেও অনিশ্চয়তায় ভুগবে না!

আছে, আশা আছে! লড়াই অনন্তকাল ধরে চলতে পারে ন! ওর কাছে সামান্য পরিমাণ তুলো আছে, খাদ্য আছে, একটা ঘোড়া আছে, কিছু পরিমাণ অর্থও লুকিয়ে রাখা আছে! ঠিকই, দুঃসময় কেটে যাচ্ছে!


চলবে...










কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন