বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

বিমল লামার গল্প : একটি বাড়ির মৃত্যু

ট্রেন ধরার জন্য স্টেশনে এলেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়। ভাবি আবার ফিরতে হবে সেই একঘেয়ে বাড়িটায়। যে বাড়িটায় আমি জন্মেছিলাম। মানে আক্ষরিক অর্থেই। হাসপাতালে নয়। বাড়িতেই। তখন বাড়িটার বাইরে পলেস্তারা ছিলনা। ভেতরে ভর্তি লোক। বাবা-মা তিন ভাই তিন বোন অবিবাহিত এক কাকা ছোট পিসি আর দাদু ঠাকুমা। মানে আমার বাবার বাবা-মা। তাহলে হল বারো জন লোক। ভাত ডাল তরকারি যা হবে বার ভাগে ভাগ। রাতে অন্তত বারো গুণিত পাঁচ, মানে ষাট খানা রুটি। তরকারি ডাল, এমনকি সঙ্গে কাঁচা পেঁয়াজ খেলেও গুনে গুনে বারো টুকরো। অভাবের সংসারে ভাগের পাওনা কেউ ছাড়ে না। দাদু নাতি হাতি, কেউ না।

আশ্চর্য ব্যাপার হলো এরপরেও আমার বাবা এই বাড়িটা করেছিল। ছোট হলেও চার-চারটে ঘর। পায়খানা বাথরুম রান্নাঘর। বাইরেটা না পারলেও ভেতরে পুরো প্লাস্টার। গলি রাস্তার ধারে। সামনে এক চিলতে বাগানে তুলসী টগর গন্ধরাজ, সংসারের বাতিল জিনিস। কানা ভাঙ্গা টব। কাটা টিউব লাইট। ভাঙ্গা পায়া…। আর এই সমস্ত কিছুকে আগলে রঙ চটা গ্রিলের চার ফুট গেট। আজও আগলে যাচ্ছে বাড়িটাকে পাড়ার কুকুর ছাগল আর বখাটে ছেলেদের হাত থেকে। ফুলচোর মেয়েদের কাছ থেকে। গেটের তালাটাও পৈত্রিক। কত বছর যে হল তালার বয়েস সে আমি নিজেও জানি না। নিজের বয়স আমার পঞ্চাশ। সে আমি জানি। কারণ তা ছাপা আছে আমার কাগজ পত্রে। মানে বাড়িটার বয়েস আমার চেয়েও বেশি। বেটা বুড়ো হল বাড়িটাও। অর্থাৎ গত অর্ধশত বছর ধরে প্রতিদিন আমি ফিরেছি এই বাড়িতে। মানে দিন হিসাব করলে তিন 'শ পঁয়ষট্টি ইন্টু ফিফটি। কোথায় গেল মোবাইলটা… হ্যাঁ। আঠার হাজার দু'শ পঞ্চাশ। এতবার আমি ফিরেছি রোজ এই বাড়িতে। ভাবলে অবাক লাগে। এতবার সেই একই গেট খুলে, একই বাগান পেরিয়ে, একই সিঁড়ির তিনটে ধাপ উঠে..। একই দরজা..! উফ! অবিশ্বাস্য!

অবশ্য এতগুলো দিন সত্যিই আমি ফিরিনি। বাইরেও তো রাত কাটিয়েছি। বেড়াতে গিয়ে আত্মীয়র বাড়ি গিয়ে। সেসব যোগ করলে হয়তো গোটা জীবনে এক 'শ টা দিন বাদ যাবে।

বসে বসে আমি ভাবতে লাগলাম কবে কোথায় বাড়ির বাইরে রাত কাটিয়েছি। সেই ছেলেবেলা থেকে শুরু করে, যখন আমি মায়ের কোলে চড়েই যেতাম যেখানেই যেতাম। তখন থেকে শুরু করে। আর আমি অবাক হলাম দেখে যে আমি এক 'শ করতে পারলাম না। অনেক ভেবেও আমি এমন রাতের যোগফল এক 'শ করতে পারলাম না যা আমি বাড়ির বাইরে কাটিয়েছি।

মানে যে কোন মূল্যেই আমি আঠার হাজার বারের বেশি এই বাড়িতে ফিরেছি। কখনো বা একই দিনে বহুবার ফিরেছি নানা সময়ে নানা প্রয়োজনে বেরিয়ে। সেসব ধরলে আঠার কেন, ছত্রিশ কি চুয়ান্ন হাজারেরও বেশি বার আমি ফিরেছি এই বাড়ীতে। সেই একই গ্রিলের গেট পেরিয়ে। একই বাগান…।

এরপর যদি আমার একঘেয়ে লাগে বাড়ি ফিরতে খুব কি দোষ দেওয়া যায় আমাকে! বিশেষ করে বাড়িটা যখন আর আগের মত নেই। মানে বাড়ির ভেতরটা। ভেতরের সেই লোকেরা একে একে সবাই ছেড়ে চলে গেছে বাড়িটাকে। আমার চোখের সামনে একে একে মরেই গেছে চার চার জন। আসলে পাঁচ জন। কারণ সিলিং ফ্যান থেকে দড়ি কেটে যখন হাসপাতালে নেওয়া হলো ছোট পিসিকে, তখন সে অন্তঃসত্ত্বা। সেটা জানা গেছিল তার পোস্টমর্টেম রিপোর্টে। কিন্তু তার জন্য দায়ী কে তা কোনও দিন জানা যায়নি। কারণ গোটা পাড়ায় সন্দেহ করার মতো কেউ ছিল না। আসলে ছোট পিসি তো কারও সঙ্গে মিসত না। তার কোনও বন্ধু তো কি বান্ধবীও ছিল না। তারপরও এইসব হল। পাড়ার লোক হাসাহাসি করে বলতো, সবই নিজেদের মধ্যে ব্যাপার।

এই ঘটনার পর মেজদা এত ভেঙে পড়েছিল যেন আসলে সে-ই দায়ী। সে তখন এমএ পড়ছিল বিশ্ববিদ্যালয় যাওয়া-আসা করতো বাড়ি থেকে। ফিরতে রাত হতো। বারোটা একটা। ছোট পিসি জেগে বসে থাকতো তার খাবার নিয়ে। বাইরে গ্রিলের গেটে দেওয়া থাকতো সেই তালা। তার একটা চাবি থাকতো মেজদার কাছে। হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে ঝুলিয়ে রাখতো গলায়। নিজেই তালা খুলে ঢুকতো বাগানে। বেল বাজাতো না। যাতে অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। দরজা খুলে দিত ছোট পিসি। চুপিসাড়ে।

ছোট পিসি মারা যাওয়ার পর মাসখানেক সে আর বাড়ি থেকে বের হয়নি। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় যাচ্ছি বলে মেজদা বেরোলো। সেই যে বেরোলো আর ফিরে আসেনি। অতো রাতে কে আর তাকে দরজা খুলে দেবে, সেই ভয়েই কিনা কে জানে!

মেজদা নিরুদ্দেশ হতেই যেন হারিয়ে গেল আমার নিজেরই কায়াটা। রয়ে গেলাম শুধু একটা ছায়া মানুষ হয়ে। কারণ আমি আর মেজদা যমজ না হয়েও ছিলাম জমজের মত। অন্তরে বাইরে একরকম। মুখোমুখি দাঁড়ালে মনে হতো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। অকারণে অবাক হয়ে আমি খেলার ছলে আয়নাকে বলতাম, মেজদা তুমি!

এরপর বাবাও আর বেশি দিন বাঁচে নি। রিটায়ারমেন্ট এর আগেই। বাবার চাকরিটা পায় বড় দা। তিন দিদিকে অবশ্য বাবা নিজের হাতেই বাড়ি ছাড়া করে গেছিল। মানে বিয়ে দিয়ে গেছিল সৎপাত্রে। সৎপাত্র পেতেও কাঠ খড় পোড়াতে হয়েছিল বিস্তর। কারণ ততদিনে বদনাম রটে গেছে বাড়িটার। তাই বাধ্য হয়েই পাত্রের খোঁজ করতে হয়েছিল দূরে দূরে। যেতে পেরে দিদিরাও যেন হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল। খুব কম আসত বাপের বাড়ি। বছরে দু’ বছরে একবার। শেষ আট বছরে এই গত মাসেই আবার এসেছিল সবাই একসঙ্গে। তিন দিদি তিন জামাইবাবু আর তাদের দুটো করে মোট ছটা বাচ্চা। তিনটে ছেলে তিনটে মেয়ে। প্রত্যেকের এক সেট করে। যেন একেবারে অর্ডার দিয়ে বানানো। অবশ্য তারা কেউ বাচ্চা নেই আর। প্রত্যেকেই যুবক-যুবতী।

এসেছিল বড়দাও। তার পরিবার নিয়ে। যে বাবার চাকরিটা নেওয়ার সময় আমাকে বলেছিল, তুই বাড়িটা নে। মেজ ফিরে এলে ওকে অর্ধেকটা দিস। তারপর চলে গেছিল বাড়ি ছেড়ে। মাকে একা আমার জিম্মায় ফেলে রেখে।

আমি আর বিয়ে করিনি। মা আর বাড়ি আগলে একা বসে আছি কুড়ি বছর হলো। চাকরিও জুটিয়েছি হাফ দেশি একটা কোম্পানিতে। রাজধানী শহরে অফিস। যাওয়া আসা করি লোকাল ট্রেনে। ফিরতে রাত হয়। বুড়ো মা জেগে বসে থাকে আমার খাবার নিয়ে। তাই আমি রোজ বাড়ি ফিরি। যতই আমার একঘেয়ে লাগুক। আমি বাড়ি ফিরি রোজ। সেই একই পাড়ার আজন্ম চেনা গলিপথে একই আবর্জনা ডিঙিয়ে টপকে। চেনা জানলা দিয়ে চেনা একঘেয়ে শব্দ শুনতে শুনতে। একঘেয়ে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে। সেই চার ফুট গ্রিলের গেট পেরিয়ে। সেই একই তালা হাত গলিয়ে খুলে। গত কুড়ি বছরে একটা রাতও আমি বাইরে কাটাইনি। কারন আমার বুড়ো মা জেগে বসে আছে আমার খাবার নিয়ে। একটাই মাত্র থালায় মাত্র এক ভাগ খাবার নিয়ে। মা রাতে কিছু খায় না। তাই তার থালাটা টেবিলের উপর উপুড় করা। বাকি দশটা থালা পড়ে আছে রান্না ঘরে ধুলোয় মুখ ঢেকে। আজ কুড়ি বছর হলো। নৈঃশব্দ আর নির্জনতা বাড়িটাকে ঘিরে থাকে বারো মাস। পাশ দিয়ে কেউ গেলে শব্দ পায় না কোনও। গন্ধও না। এমনকি কখনো মানুষের মুখ দেখা যায় না খোলা জানলায় কি বাগানে। বন্ধ দরজাটা বন্ধ থাকে সারাদিন। পাশে কলিংবেলের সাদা সুইচ কালো হয়ে গেছে। কারণ দিনে মাত্র একবারই সেই সুইচে চাপ দেয় একটাই মাত্র আঙুল। আমার নিজের আঙ্গুল। যখন আমি অনেক রাতে বাড়ি ফিরি অফিস থেকে। একবার মাত্র বেল বাজাই। আর আমার বুড়ো মা ধীরে ধীরে স্খলিত পায়ে এগিয়ে আসে দরজার দিকে। আমি তার হাল্কা পায়ের শব্দ শুনতে পাই বাইরে থেকে। ছিটকিনির দিকে উঠে যাওয়া তার শীর্ণ হাত আমি দেখতে পাই দরজার কাঠ ভেদ করে। তারপর একটাই মাত্র একমাত্রিক শব্দ--খুট! যেন মায়ের নির্মোহ কন্ঠ,- আয়!

দীর্ঘ কুড়ি বছরের সেই নৈঃশব্দ্য হঠাৎ একদিন ভেঙে পড়ে অনেক রাতে। সংযম হারানো একাকী মানুষের আর্ত কন্ঠ শোনা যায় বাড়ির ভেতর থেকে। এতটাই অসংযমের সেই স্বর যে পাড়ার লোক ছুটে আসে। ভিড় করে জানলায় দরজায়। বাগানের সীমিত পরিসরে। এমনকি সেই রং চটা গ্রিলের গেট উপচে লোক জমে থাকে বিহ্বল হয়ে।

সকাল হতে না হতে লোকজন ছুটে আসে দূর-দূরান্ত থেকে। সেই কবেকার বাড়ি ভর্তি লোক গুলো যেন আবার ফিরে আসে নব অবতারে। দীর্ঘ কুড়ি বছর পর আবার কিছু ঘটেছে এই বাড়িতে। যাকে উপলক্ষ করে আবার সরগরম নিস্তব্ধ নির্জন বাড়িটা।

আসলে আরো একধাপ এগিয়ে গেছে বাড়িটা চরম নৈঃশব্দের বিকে। শেষ দুজনের একজন বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে চিরদিনের মত। মারা গেছে আমার মা।

সপ্তাহ দুয়েক পরে আবার আমি অফিসে এসেছি আজ। এরমধ্যে শ্রাদ্ধশান্তি সাঙ্গ করে সকলে ফিরে গেছে যে যার জীবনে। ফিরিয়ে দিয়ে গেছে আমাকে আমার নিঃসঙ্গ জীবন। আর আমার নির্জন বাড়ি।

সেই বাড়িতে ফিরব বলে আবার আমি ট্রেন ধরতে এসেছি স্টেশনে। দীর্ঘ কুড়ি বছরের একঘেয়েমি যেন আজ চরম আকারে পেয়ে বসেছে আমাকে। যে অজুহাতে আমি এতদিন কাটিয়ে উঠতাম আমার একঘেয়েমির বাধা, আজ সেই অজুহাত আমার হাত ছাড়া। কেউ আর জেগে বসে নেই আমার খাবার নিয়ে। কান পেতে নেই কলিং বেলটা বেজে ওঠার প্রত্যাশায়।

তাই শহরতলীর ট্রেন গুলো একের পর এক বেরিয়ে যায় আমার চোখের সামনে দিয়ে। তবু আমি একা গোঁ ধরে বসে থাকি স্টেশনে।

আজ আবার সেই পুরনো খেলাটা আমার খেলতে ইচ্ছে করে। যে খেলাটা আমি একা একা খেলতাম যখন আমার হাতে অঢেল সময় ছিল। পড়াশোনা শেষ করে বসে আছি। চাকরি পায়নি তখনও। সময় কাটত না কিছুতেই। বাড়িও তখন নির্জন হয়নি পুরোপুরি। সময় কাটানোর এক আজব উপায় আমি বার করেছিলাম। অনুসরণ। যে কোনও একজনকে বেছে নিয়ে আমি অনুসরণ করতাম তাকে। নিরাপদ দূরত্বে থেকে হেঁটে যেতাম তার পিছন পিছন। আর সে বাসে উঠলে বাসে, লঞ্চে উঠলে লঞ্চে। ট্রেনে তো ট্রেনে। কোথায় কোথায় চলে যেতাম অনুসরণ করে। তারপর শিকার তার গন্তব্যে পৌঁছে গেলে আমি ফিরে আসতাম ওখানকার কোনও দোকানে চা-বিস্কুট খেয়ে। খেলাটা তেমন রোমাঞ্চকর ছিল না। কারণ বেশিরভাগেই বাড়ি যেত। কিংবা কোনও দোকান বাজার। অথবা অফিস।

তারপর আমি শুরু করি চেনা লোককে অনুসরণ করা। সেটায় ঝুঁকি ছিল। কিন্তু মজাও হতো খুব। কারণ আমি অনুমান করতে পারতাম কোথায় আমার শিকার যেতে পারে। আর যেত হয়তো কোন অপ্রত্যাশিত জায়গায়।

এভাবেই আমি জেনেছিলাম আমাদের প্রতিবেশী সত্য কাকা সুযোগ পেলেই বেশ্যাবাড়ি যায়। সর্বজন মান্য সৎ সাত্বিক মনোরঞ্জন বাবু লুকিয়ে-চুরিয়ে বাংলা মদের ঠেকে যায়। শম্পা বৌদি দাদা বেরিয়ে গেলেই একটা অচেনা লোকের ফ্ল্যাটে গিয়ে ওঠে। এরকম আরো কত কি! পাড়ার কোন মেয়ে কার সঙ্গে প্রেম করে। কবে কে কোথায় কার সঙ্গে সিনেমা গেল। কে কার সঙ্গে হোটেলে গিয়ে উঠল। সব আমি জানতাম।

খেলাটা আমাকে নেশার মত পেয়ে বসেছিল। টিউশনির সব পয়সা আমার ওতেই বেরিয়ে যেত। হঠাৎ চাকরি পেয়ে গেলাম। তারপর চাকরির পিছনে এত সময় গেল যে খেলা আর চালানো গেল না। কারণ আমাকে নির্দিষ্ট সময়ে অফিস পৌঁছতেই হত। ফিরতেও হত মায়ের কথা ভেবে।

কিন্তু আজ আর মা বসে নেই আমার পথ চেয়ে। আর বাড়ি ফেরার একঘেয়েমি পেয়ে বসেছে চরম আকারে। তাহলে একবার সেই খেলাটা আবার…।

রাত তখন ন’টা বাজে। একটা লোকাল ট্রেন এসে দাঁড়ায়। শান্ত পায়ে হেঁটে আমি ট্রেনে উঠি। বসার জায়গা নেই। দাঁড়িয়ে থাকি ভিড়ের ভেতর। খান দশেক স্টেশন পার করার পর ট্রেন প্রায় খালি হয়ে গেল। অবশিষ্টদের মধ্যে থেকে আমি একজনকে আমার শিকার বেছে নিলাম। তার অজান্তেই।

খুব স্বাভাবিক বাছাই। কারণ আবহাওয়া যথেষ্ট গরম। অথচ লোকটা চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। চোখ মুখ ঢেকে। আত্মগোপনের একটা চেষ্টা আছে যেন। সন্দেহ হয় এর কোনও না কোনও রহস্য আছেই। জুবুথুবু বুড়োটে একটা লোক। কিন্তু সন্দেহজনক। মনে মনে একেই শিকার বেছে নিলাম আমি।

আরও আধা ঘন্টা খানেক যাওয়ার পর লোকটা ট্রেন থেকে নামলো। আর নামলো সেই…! আমি অবাক না হয়ে পারলাম না। যে স্টেশনে আমি গত কুড়ি বছর ধরে…!

মানে আমার একঘেয়েমি পিছু ছাড়লো না। যেন এই একঘেয়েমি আমাকেই তার শিকার হিসাবে বেছে নিয়েছে। আর পিছু নিয়েছে একরোখা গোঁ ধরে। যতদিন না আমার মৃত্যু হচ্ছে আমার পিছু ছাড়বে না। আসলে যেন আমি নিজেই এক বিকট অনুসরণের শিকার। নিজের ছায়ার মত এক অনুসরণকারী সর্বদা লেগে রয়েছে আমার পিছনে।

স্টেশনের বাইরে ট্রেকার দাঁড়িয়ে। শেষ ট্রেকার। আমার শিকার গিয়ে উঠল সেই ট্রেকারে। কে আসলে কাকে অনুসরন করছে, এই চরম বিভ্রান্তি নিয়ে আমিও গিয়ে উঠলাম সেই ট্রেকারে। আগের বহু হাজার বারের মতো।

কিন্ত আমি ভাবিনি আমার অবাক হওয়া তখনও এতো বাকি। আমাকে প্রায় পাগল করে লোকটা নামল গিয়ে সেই স্টপেজে, যেখানে আমি গত কুড়ি…। ট্রেকার টা চলে যেতেই দেখা গেল আমি আর লোকটা ছাড়া আর মাত্র একজন নেমেছে সেখানে।

গলির মুখে পানের দোকানে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ধীরেসুস্থে আয়েশ করে শেষ করলাম সিগারেট। তারপর হাঁটা দিলাম বাড়ির দিকে।

গলিতে পা দিতেই বিকট এক নিঃসঙ্গতায় যেন মুচড়ে উঠল আমার বুকটা। শূন্য বাড়ি বসে আছে আমার পথ চেয়ে। ভেতরে কেউ বসে নেই আমার খাবার নিয়ে। আজ আর বন্ধ দরজা খুলে দেবে না কেউ ভেতর থেকে। আমাকে নিজেই চাবি ঘুরিয়ে…।

তাইতো! চাবিটা কোথায় গেল! জীবনে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা এটা। কখনো দরজার তালা খুলে বাড়ি ঢুকেছি এমনটা আমার মনে পড়ে না। তালা থাকত গ্রিলের গেটে।

পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে আমি পৌঁছে গেলাম গ্রিলের গেটের সামনে। আর পৌঁছে চমকে উঠলাম দেখে যে গেটে তালা ঝুলছে। সেই কবেকার পুরনো তালা যা ভারি গয়নার মতো অবিরাম ঝুলে থেকে থেকে বড় করে দিয়েছে গ্রিল গেটের ফুটো। কিন্তু বেরনোর সময় এই তালা আমি দরজায় দিয়েছিলাম। খোলাই ছিল গেট।

ভেতর থেকে দেওয়া তালাটা আমি হাত গলিয়ে খুলে ফেললাম। তারপর তালা টা হাতে নিয়েই ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে। চোখ আমার কাঠের দরজার লোহার কড়ায়।

না কোনও তালা তো নেই দরজায়। রোজকার মতই দরজা বন্ধ।

বেশ কিছুক্ষণ আমি চেয়ে থাকি দরজার দিকে। ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকাই। সত্য কাকাদের জানলা খোলা। আলো জ্বলছে। জেগে আছে কাজলরাও। জীবনযাপনের টুকটাক শব্দ আসছে কানে। রাস্তার সামান্য আলো এসে পড়েছে আমার উঠোনে।

ফিরে আবার আমি তাকাই দরজার দিকে। যেন দরজাটাও পাল্টা চেয়ে আছে আমার দিকে। সমান অবাক সেও।

তিন সিঁড়ির দুই ধাপ আমি উঠলাম। জীবনে এই প্রথম, সসংকোচে। হাত বাড়িয়ে স্পর্শ করলাম দরজাটা। ভয়ে ভয়ে। তারপর ঠেলা দিলাম আলতো। খুলল না। জোর বাড়ালাম হাতে। তাও খুলল না। এবার বেশ জোরে ঠেলা দিলাম। আর বুঝতে পারলাম দরজা ভেতর থেকে বন্ধ।

কেমন যেন অনুভূতি হয় আমার। ঠিক ভয় যে পেলাম তা নয়। তবু বুকটা দুরু দুরু করতে লাগল। বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম দরজার সামনে। চেয়ে রইলাম কলিং বেলের সুইচের দিকে। না জানি এই ঘন্টি আজ কাকে ডেকে দেবে! ডাকাটাই উচিত হবে কি না কে জানে!

সশব্দে একটা মোটর বাইক চলে যায় গলি দিয়ে। খানিক সাহস দিয়ে যায় আমাকে। সেই সাহসে ভর করে আমি আঙুল বাড়াই। আঙুল বাড়াই কলিং বেলের সুইচের দিকে। সুইচে আঙুল ছুঁতেই যেন বন্ধ বাড়িটার সমস্ত শিহরণ ছুটে আসে আমার হাত বেয়ে। তীব্র এক আলোড়ন তোলে বুকের ভেতর। তবু আমি আঙুল সরাই না। তারপর সাহস যুগিয়ে চাপ দিই সুইচে।

ভেতরের জমাট নীরবতা ভেঙ্গে চাপা শব্দ ওঠে- টুং… টাং…। রোজকার মতোই। তবু যেন অন্যরকম। তারপরের ঘটনার জন্য আমি প্রস্তুত করি নিজেকে। অপেক্ষা করি রুদ্ধশ্বাসে। কান পেতে থাকি দরজায়। আর স্পষ্ট শুনতে পাই হালকা পায়ের শব্দ। স্খলিত ভঙ্গিতে এগিয়ে আসছে দরজার দিকে। বন্ধ পাল্লার কাঠ ভেদ করে যেন দেখতে পাই একটা দুর্বল হাত উঠে যাচ্ছে ছিটকিনির দিকে। আর পরক্ষনেই কানে আসে চিরচেনা সেই একমাত্রিক ধাতব শব্দ। ‘খুট’- করে যেন ছিটকিনি বলছে, মায়ের মতো আয় নির্মোহ স্বরে, “আয়!”

নিজের অজান্তেই আমি দু’ধাপ নেমে আসি দরজা থেকে। শক্ত করে আঁকড়ে ধরি লোহার তালা টা। যেন আত্মরক্ষার সেটাই শেষ অবলম্বন। মনে মনে প্রস্তুত থাকি যেকোনও রকম পরিস্থির জন্য। আর তারপরই খুলে যায় দরজা। দুটো পাল্লা দুদিকে সরে যায়। প্যাসেজের আধো অন্ধকারে প্রকট হয় প্রেত ছায়ার মতো বিকট এক মূর্তি।

একটা চাপা আর্তনাদ আপনা থেকেই বেরিয়ে আসে আমার মুখ দিয়ে। ভয়ে দৌড় দিতেই যাচ্ছিলাম পিছন ফিরে। থেমে গেলাম একটা হারানো স্মৃতির মতো কণ্ঠস্বর কানে আসায়। সেই একই রকম নির্মোহ উচ্চারণে কে যেন বলছে, “আয় ছোট! ভেতরে আয়!”

দরজায় সেই চাদর মুড়ি দেওয়া লোকটা। এখনও বিকট। কিন্তু কেমন যেন আত্মীয়তায় জড়ানো। বহুদিনের চেনা তার স্বর। বহু বছরের অভ্যাসে যা মনে গেঁথে আছে। সেই স্বর আমাকে থামিয়ে দেয়। আমি চোখ তুলে তাকাই। আর অবাক হয়ে দেখি আমি দাঁড়িয়ে আছি নিজেরই মুখোমুখি। যেন পুরনো এক আয়নার সামনে যার পারদে ক্ষয় ধরেছে।

কানে আসে আবার সেই কন্ঠ, “আয়! ভেতরে আয়।”

আমার ঠোঁট আপনিই ফাঁক হয়ে যায়। বহু বছর পর আকুল স্বরে আবার বলে উঠি, “মেজদা তুমি!”

আমার আয়না ততক্ষনে পিছন ফিরেছে। জীর্ণ চাদরে ঢাকা তার ক্ষয়। স্খলিত পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে অন্তরমহলের দিকে। সেখানে পাতা পুরনো এক ডাইনিং টেবিল। এই প্রথম কারো খাবার ঢেকে রাখা নেই সেখানে। এমনকি একটা জলের গ্লাসও নেই। ধুধু মাঠের মতো সেই টেবিলটার মাঝখানে পড়ে আছে একটা কালচে লোহার চাবি। কালো কারে কবেকার প্রাচীন গিঁটে বাধা।

মেজদা চাবিটা তুলে নেয়। দেয়ালে ঝোলানো মায়ের নতুন বাঁধানো ছবি। সেই ছবিতে মালার মতো চাবিটা পড়িয়ে দেয় সে। বিড়বিড় করে বলে, “শেষ দেখা হলো না মা! শেষ দেখা!”

দুজনে দু'ঘরে ঘুমোই সেই রাতে। বাড়িটার প্রতিষ্ঠিত নীরবতা একটুও না ভেঙে। এমনকি এত বয়সে নাকও ডাকি না কেউ।

চুপিসাড়ে রাত কখন ভোর হয়ে যায়। তারপর পাড়া ঘরের কোলাহল ঢুকে আসে জানলা দরজা দিয়ে। আমি উঠে চা করি। রোজকার মত দু কাপ। তারপর মেজদার ঘরে গিয়ে দেখি ঘর ফাঁকা। পরিপাটি গোছানো বিছানা, যেন গত কুড়ি বছর কেউ শোয় নি সেখানে। বাগানে বাথরুমে খুঁজে এলাম। বাড়ির পিছন দিকে, কবেকার সেই লুকোচুরির খাঁজে ভাঁজে। এমন কি ডাকও দিলাম সংযত গলা তুলে--মেজ দা…! অনভ্যস্ত নীরবতা ভঙ্গে চমকে উঠলাম নিজেই। সতর্ক চোখে চাইলাম এদিক ওদিক। তারপর ফিরে এলাম ঘরে। কোথাও নেই মেজদা। রোজকার মতো খাবার টেবিলে বসলাম দু কাপ চা নিয়ে। কিন্তু আজ পাঁচটা চেয়ার খালি। একটা এখনও দখল করে আছি আমি। আর আছে মেজদার চাবিটা। একা একা ঝুলছে মায়ের ফটোর ওপর। ফ্রেমের আঁধার করা কাঁচে তার কালচে ছায়া পড়েছে। বিষন্ন এক প্রেতছায়া। আসন্ন অশুভের ভয়ে যেন নীরব হয়ে আছে সেও।



লেখক পরিচিতি
বিমল লামা
কথাসাহিত্যিক।
পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়ায় থাকেন।


                                                                                

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন