বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

আবদেল আজিজ বারাকা সাকিন'এর গল্প: জন্ম



Did the armed movements swallow the bait?? .. Written by: Abdel Aziz Baraka  Sakin – IG News



অনুবাদ: ফজল হাসান

মহিলার হাঁপানোর শব্দ আমার নজর কেড়েছে। আমি ক্লান্ত ছিলাম, কারণ নতুন কাজ আমার জীবনের প্রতিটি শেষ ফোঁটা নিংড়ে নিচ্ছিল। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার ভুল ধারণা (কান্না, চিৎকার এবং কণ্ঠরোধ করা আর্তনাদের জন্য কি হবে) জীবনের কিছুটা অংশ আমার মধ্যে ফিরিয়ে দেয় এবং আমি তীরের মতো মহিলার দিকে ছুটে যাই। 
মহিলা একটি পরিত্যক্ত দোকানের সামনে খেজুর গাছের নীচে একা ছিলেন এবং নিজের দেহ থেকে নিঃসৃত আঠালো রস তার চতুর্দিক ঘিরে ছিল। যদিও সরু গলির মাঝে গাঢ় অন্ধকার ছিল, তবে প্রধান রাস্তার বাতির এক চিলতে আলো এসে তাকে যথেষ্ট আলোকিত করেছিল এবং সেই আলোয় আমি তার ধুলায় আচ্ছাদিত মুখ, ছিমছাম পেশী ও লালচে চোখ দেখতে পেয়েছি। তার চোখ দুটি যেন যান্ত্রিক উপায়ে ব্যথায়, একাকীত্বে এবং বিষণ্ণতায় একবার সংকুচিত এবং পুনরায় প্রশস্ত হচ্ছিল। তিনি তিমিরের অপদেবতার করুণা লাভের জন্য চিৎকার করছিলেন। আমার দৃষ্টি তার হাতের কাছে চলে যায়। তিনি হাত দিয়ে জীর্ণ পোশাকের নীচে স্ফীত পেটে চাপ দিচ্ছিলেন। আমাকে দেখে তিনি হঠাৎ থেমে যান এবং ফারাওদের যুগের মমির মতো শীতল ও অভিব্যক্তিহীন স্থির দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন।

একসময় সম্পূর্ণ নির্দোষভাবে তিনি বললেন, ‘আপনি কী বাচ্চাটি প্রসব করাতে পারবেন...? এটা আমাকে ভীষণ কষ্ট দিবে। আপনি না করলে আমি মরে যাবো!’

কোন কিছু না ভেবেই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি হাসপাতালে যাননি কেন?’

মহিলা গম্ভীরভাবে হাসলেন। ‘আমি হাঁটতে পারি না এবং আমার কাছে ট্যাক্সি ভাড়া নেই। তাছাড়া আমি হাসপাতালের বিল পরিশোধ করতে পারবো না। সব কিছুতেই টাকা লাগে।’

মহিলা ক্ষীণ স্বরে শব্দ করেন এবং তারপর মাতালের মতো বকবক করে যান। আমি বুঝতে পারছিলাম না, তখন আমার কি করা উচিত ছিল। আমার কাছে বাস ভাড়ার জন্য পাঁচ পাউন্ড ছিল এবং রাত তখন সাড়ে দশটা। সান্ধ্যআইন জারি হওয়ার মাত্র আধ ঘন্টা বাকি ছিল। আমি সিনেমা হলে ঝাড়ু এবং মোছামুছির কাজ শেষ করে এতটাই ক্লান্ত ছিলাম যে, তাকে তুলে আমার পিঠে বহন করার মতো শরীরে কোন শক্তি অবশিষ্ট ছিল না। এছাড়া আমি মহিলাকে বহন করে নিয়ে গেলেও হাসপাতাল তাকে ভর্তি করবে না। এই দেশে এমন কোনও হাসপাতাল নেই, যেখানে কেউ মানবিকতা থেকে চিকিৎসা করা হয়।

আমার ভেতর-জগতে একটা কণ্ঠস্বর ফিসফিস করে উঠল। আমি বলতে পারছিলাম না, কণ্ঠস্বরটি দেবদূত কিংবা রাক্ষসের কি না।

‘আপনার সঙ্গে কী আছে?’ কণ্ঠস্বরটি জিজ্ঞেস করে। ‘মহিলার প্রভু এবং সৃষ্টিকর্তা তার জন্য কোন উপায় বাতলে দিবেন। আপনি এখন কেবল নিজের চিন্তা করুন। আধ ঘন্টার মধ্যে সান্ধ্য-আইন জারি হবে। সুতরাং তাড়াতাড়ি করুন এবং শেষ বাসটিতে উঠে পড়ুন। তারপর আগামিকাল সকালে ফিরে আসুন এবং তখন আপনি দেখতে পাবেন যে, মহিলা একটি বিশাল আরশোলার জন্ম দিয়েছেন। আরশোলাটি মহিলার পাশে বসে তার অ্যান্টেনা এবং তার পুঁতির মতো চোখ দিয়ে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করছে।’

তারপর আমার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলা করে তা হলো মহিলাকে মূল রাস্তার পাশের ফুটপাথে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা। একজন টহলদার তাকে খুঁজে পাবে এবং তাকে কোন ঘরের মধ্যে নিয়ে যাবে। তারপর মহিলার জন্য একজন ধাত্রী বা ডাক্তার আনবে, যাকে সরকার অর্থ প্রদান করবে।

কিন্তু আমি সে কাজটা করার আগেই টহলদার পুলিশ আমাদের দু’জনকে আটক করে নিয়ে যায়।

ডাক্তার হয়তো আংশিকভাবে সঠিক ছিলেন। মহিলা নোংরা, এমনকি অপরিষ্কারও ছিল। যৌন সংক্রামিত রোগের কারণে তার স্রাব থেকে উৎকট গন্ধ ছড়াচ্ছিল এবং দুর্গন্ধ যেন নাকে হুল ফোটাচ্ছিল, যা ছিল অসহনীয়। তাই ডাক্তার আয়াকে নির্দেশ দিয়েছেন, সে যেন মহিলার গোপনাঙ্গের গুপ্তকেশ কেটে জায়গাটি পরিষ্কার করে, দূর্গন্ধ ও নিঃসৃত ময়লা পরিষ্কার করার জন্য হালকা গরম পানি ও কার্বলিক সাবান দিয়ে জায়গাটি ভালোভাবে ধোয় এবং সেখানে ডেটল লাগায়।

তারপর ডাক্তার বেসিনে গিয়ে তার অন্ত্রের মধ্যে জমে থাকা সবকিছু বমি করে এবং যেদিন তিনি ডাক্তারি, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই দিনটিকে অভিশাপ দিতে থাকেন।

‘দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন,’ আয়া আমাকে বলল।

‘আমি মারা যাচ্ছি,’ মহিলা বলল।

‘মরো, তাহলে! মরে যাও!’ আয়া ক্ষিপ্ত ভঙ্গিতে জ্বলে উঠল। ‘কাজটা আমাদের এবং আপনার নিজের জন্য সহজ করুন!’

মহিলার প্রসারিত বাদামী পা, ময়লা এবং ক্ষতচিহ্ন দেখা যায়। তিনি অর্ধ-চেতন অবস্থায় শুয়ে আছেন এবং প্রসব বেদনা ও কষ্টের মাঝে একধরনের আনন্দের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন।

যখন সদ্য ভুমিষ্ট আরশোলার সামনের থাবা দেখা যাচ্ছিল—ছোট, সাদা, নরম এবং মসৃণ—আয়া এবং আমি চমকে উঠি। আমরা গভীর, মোহাবিষ্ট দৃষ্টি ও অলৌকিক বিভ্রান্তিতে নিমজ্জিত হই এবং পাশের স্বাস্থ্য অফিস থেকে আসা রাগ সঙ্গীতের সুর আমাদের চেতনায় ছাপ ফেলছিল: ইঁদুরের চিঁ-চিঁ-চিঁ, সমুদ্রের গর্জন, কালো কাকের কা-কা, জানালার বাইরে উঁচু খেজুর গাছের শাখায় মৃদু ঝাঁকুনি, আচমকা বজ্রপাতের শব্দ, দেওয়ালের ছিদ্র ও বিছানার মধ্যবর্তী স্থানের মধ্যে পরিশুদ্ধ অস্পষ্ট কথোপকথন, ভারী সাদা কাপড়ের টুকরো, রক্তাক্ত তুলার প্যাড যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

যখন আমরা দেখলাম যে, আরশোলার আয়তাকার মাথাটি বেরিয়ে আসছে এবং ছোট কালো গোঁফ আঠালো, স্বচ্ছ, জেলির মতো শ্লেষ্মায় ভিজে গেছে, তখন আমরা হঠাৎ ঠান্ডা অনুভব করলাম।

আয়া পরে আমাকে বলেছে, ‘আমি সব কিছু জ্বলজ্বলে অনুভব করেছি, যেন উজ্জ্বল ছোট চাঁদ ওগুলোর উপর নেমে এসেছে।’

আমি বললাম, ‘ঘটনা যখন ঘটেছিল, তখন আমি ভয়ংকর আওয়াজ এবং গূঢ়গম্ভীর কথাবার্তা শুনে আড়ষ্ট হয়ে গিয়েছিলাম। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।’

চূড়ান্ত সংকোচনের সঙ্গে আরশোলাটি বেরিয়ে আসে, যা চঞ্চল এবং উদ্যমী, যেন রাগসঙ্গীতের স্বর তার নবজাতক ধমনীর রক্তপ্রবাহকে এক ধরনের ছন্দ দিচ্ছে।

ফৌজদারি তদন্ত বিভাগের কাছে দেওয়া আমার বিবৃতিতে আমি বলেছি যে, কুরআনের সুরেলা তেলাওয়াত, ঘুঘুর ডাক এবং আরাধনার স্তবগুলো কোনও নির্দিষ্ট উৎস থেকে আসছে না এবং আমরা সম্ভবত দাবি করতে পারি না যে, আমাদের মধ্যে কেউ সময়ের স্থবিরতাকে সঙ্গীতের মধ্যে ধরে রাখতে সক্ষম হবে।

সে সময় খেজুর গাছের পাকা ফল নিচে পড়েছিল, নাইটিঙ্গেল গান গেয়েছিল এবং একটি তারকা বিশ্বের পূর্বাঞ্চলকে আলোকিত করার জন্য পৃথিবীতে নেমে এসেছিল। আরশোলার একজোড়া উজ্জ্বল কালো চোখ খোলার পরে কয়েকবার প্রবল ঝাঁকুনিতে অবলীলায় শরীর থেকে শ্লেষ্মা ঝরে পড়ে। তারপর, অন্যরা যেন সত্যায়ন করতে পারে, আরশোলাটি আওয়াজ করে এবং জানালা গলিয়ে বাইরের ফুটপাথে লাফিয়ে পড়ে।
 
--------------



লেখক পরিচিতি: আবদেল আজিজ বারাকা সাকিন সুদানের অন্যতম বিশিষ্ট লেখক। একাধারে তিনি একজন ঔপন্যাসিক, গল্পকার এবং প্রাবন্ধিক। তার জন্ম ১৯৬৩ সালে পূর্ব সুদানের কাসালায়। তিনি মিশরের আসিয়ুত শহরে ব্যবসা প্রশাসন নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে সুদানে ফিরে যান এবং সেখানে প্রাথমিকভাবে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করেন। তারপর সাত বছর ‘প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল সুদান’ নামের এক বেসরকারী সংস্থায় কাজ করেন। তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য জুঙ্গো - স্টেকস অফ দ্য আর্থ’-এর জন্য ২০১১ সালে ‘আল-তায়েব সালেহ প্রাইজ’ লাভ করেন। বহুল আলোচিত এই উপন্যাসটিতে তিনি পূর্ব সুদানের এল-গাদারিফের মহিলা কারাগারের ভয়াবহ পরিস্থিতি তুলে ধরেন । উল্লেখ্য, প্রকাশিত হওয়ার পরে সুদানের ওমর আল-বাসার সরকার উপন্যাসটি বাজেয়াপ্ত এবং নিষিদ্ধ করে। আরবি থেকে ইংরেজি ছাড়াও উপন্যাসটি ফরাসি, স্প্যানিশ এবং জার্মান ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। তার আরেক বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য মেসিহা অফ দারফুর’, যা দারফুরের গৃহযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে রচিত, ফরাসী ভাষায় ২০৬ সালে প্রকাশিত হয় এবং ২০১৭ সালে ফ্রান্সের ‘Prix du livre engagé de la Cène Littéraire’ পুরস্কার অর্জণ করে। উপন্যাসটি জার্মান ভাষায় অনূদিত হয় ২০২১ সালের অক্টোবরে । এছাড়া তিনি ১৯৯৩ সালে ‘অ্যা ওম্যান ফ্রম কাম্পো কাদিস’ ছোটগল্প সংকলনের জন্য আরব বিশ্বের লেখক হিসেবে ‘বিবিসি শর্ট স্টোরি প্রাইজ’ পান। ইতোমধ্যে আরবী ভাষায় তার এগারোটি উপন্যাস এবং পাঁচটি ছোটগল্প সংকলন প্রকাশিত হয়েছে । তার গল্প গ্রন্থের মধ্যে ‘অ্যাট দ্য পেরিপেরিজ অফ ফুটপাথস’ (২০০৫ সালে প্রকাশিত) অন্যতম । তিনি ২০১২ সালে অস্ট্রিয়ায় নির্বাসিত হন এবং তখন থেকেই সে দেশে বসবাস করছেন।

গল্পসূত্র: ‘জন্ম’ গল্পটি আবদেল আজিজ বারাকা সাকিনের ‘বার্থ’ গল্পের অনুবাদ। গল্পটি আরবী থেকে ইংরেজিতে তরজমা করেছেন ন্যান্সি রবার্টস্। গল্পটি ‘মাই রাইটার্স সাইট’ ব্লগে ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় এবং সেখান থেকে বাংলায় অনুবাদ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, গল্পটি একাধিক জায়গায় প্রকাশিত হয়েছে, যেমন লেখকের গল্পগ্রন্থ ‘বার্থ: সিলেক্টেড স্টোরিজ’ এবং ‘দ্য শর্ট স্টোরি প্রজেক্ট’ ওয়েবসাইটে।


অনুবাদক পরিচিতি:
ফজল হাসান
অনুবাদক। ছড়াকার
অস্ট্রেলিয়াতে থাকেন।

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন