বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

ইন্দ্রাণী দত্তের গল্প: মুকুলের বাড়ি



 
ড্রোন দিয়ে আমাদের পাড়ার ছবি তুললে কেমন দেখাবে এই নিয়ে সেদিনও আমাদের কারোরই কোনো মাথা ব্যথা ছিল না। বস্তুত ড্রোন বিষয়ে বিন্দুমাত্র জ্ঞান এ' পাড়ায় আমাদের কারোর ছিল কী না সন্দেহ। অথচ আজ দু মাস হয়ে গেল, সপ্তাহে একদিন ভোরের দিকে ড্রোন এসে, খাবার , ওষুধ, কিছুপ্রয়োজনীয় জিনিষ - বাড়ির দোরগোড়ায় নামিয়ে, আবর্জনার ব্যাগ নিয়ে উড়ে যায়। প্রথম প্রথম ড্রোন দেখা গেলেই গলির কুকুররা ডেকে উঠত - আমরা দরজা খুলে ছোটো বস্তাটা ঢুকিয়ে নিতাম বাড়িতে। ইদানিং কুকুরদের কোনো শেলটারে নিয়ে গেছে খুব সম্ভব; সকালের দিকে চুপচাপ ড্রোন আসে।
পিচরাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নেমে খানিক ঘাসজমি আর আমাদের সাত নম্বর বাড়ি।সামনে একটা ঝাঁকড়া জামরুল গাছ। রাস্তার নাম আছে - কিন্তু এই মফস্সলে রাস্তার নাম, নম্বর দিয়ে কেউ কাউকে চেনে না - অমুক বাবুর বাড়ি, স্কুলের বড়দিমণির বাড়ি, সাদা বাড়ি, মাঠের পাশের ঐ গোলবাড়ি টা...

আমাদের বাড়ির ছাদ তিনকোণা- বিদেশী বাড়ির মত অনেকটা- শীতের দেশের বাড়ি যেমন হয়, একটা চিমনি নেই শুধু - এই যা; ঠাকুরদার ডিজাইন করা - নিজের হাতে কাঠের কাজ টাজ ও করতেন শুনেছি। বাবারও এই শখ - কাঠের জিনিসপত্র বানানো, মীটসেফ কি জানলার পাল্লা সারিয়ে ফেলা কিংবা পুরোনো আসবাবে টুকটাক রং।

আমাদের বাড়িটা সবাই বলত তেকোণা বাড়ি। আমার মনে হ'ত, বাড়ির আকার প্রকারের সঙ্গে বাসিন্দাদের একটা মিল রয়েছে- বাবা, মা, আমি কেউই কারোর দিকে তাকিয়ে নেই বরং তিনদিকে মুখ করে বসে আছি ; যেন- অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ। অদ্ভূত। খুবই অদ্ভূত - এই গরমের দেশে সাইবেরিয়ার বাড়ির মত- দলছুট, অথবা যেন মুকুলের বাড়ি।

মুকুলের সঙ্গে সিমিলারিটি আবিষ্কার করলাম যখন স্কুলে পড়ি। সেবার শীতে রাজস্থান নিয়ে গিয়েছিল বাবা- জয়পুর, যোধপুর, জয়সলমীর- দুর্দান্ত মুডে ছিল কটা দিন; কোত্থাও কোনো গাইড নেয় নি , রাস্তাও জিগ্যেস করেনি কাউকে- একটা ম্যাপ হাতে আমাদের নিয়ে চষে বেরিয়েছিল শহরের গলিঘুঁজি, দুর্গ, প্রাসাদ - যত্ন করে বুঝিয়ে দিচ্ছিল সব।

আমার ইন্টারেস্ট ছিল জয়সলমীরে- সোনার কেল্লায়। সেখানে কেল্লায় ঢোকার মুখে যথারীতি গাইডের দল ঘিরে ধরেছে আর বাবা পাশ কাটিয়ে আমাদের নিয়ে দুর্গের দিকে চলেছে - একটা ছেলে বলল, 'চলুন আমার সঙ্গে,সব দেখাব - কেল্লা, জৈন মন্দির, কোথায় সোনার কেল্লার শুটিং হয়েছিল, কোথায় মুকুলের বাড়ি সব দেখাব, কিস্যু খুঁজে পাবেন না নিজে নিজে'; বাবা ভ্রূক্ষেপ না করে এগিয়ে গেল আর ছেলেটা গালাগালি দিল একটা। মা ফিসফিস করে বলল, 'নিয়ে নাও না গাইড কাউকে- লোক্যাল ছেলে, ওদেরও তো এই রোজগারের সময়।' বাবা যেন শুনতেই পেল না।

বাবার সঙ্গে হাঁটছি- বাবা বোঝাচ্ছে সিল্করুট কোথা দিয়ে গিয়েছিল, কেল্লার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান, ত্রিকূট পাহাড়, কেল্লার মধ্যে ঘরবাড়ি, চন্দ্রপ্রভুর মন্দির-

আমি বললাম - 'বাবা, মুকুলের বাড়ি? মুকুলের বাড়ি দেখব।'

বাবা থতমত হয়ে চুপ করে গিয়েছিল, তারপর হাসিমুখে বলল, 'চল তবে - খুঁজে দেখি। '

মা সিঁড়িতে বসে পড়েছিল, ' এখানেই বসি বরং, তোমাদের হয়ে গেলে নিয়ে যেও।'

শীতের দুপুরে ট্যুরিস্ট, গাইড, দোকানদার, পায়রা- গমগম করছে কেল্লা - বাবা আর আমি মুকুলের বাড়ি খুঁজে চলেছি, খুঁজেই চলেছি। উঠছি , নামছি, একবার বাঁদিকে, ডানদিকে - আধঘন্টা কেটে গেছে প্রায় - বাবা বলল, 'তোর মা আর কতক্ষণ বসে থাকবে? ফিরে যাই চল। ডিভিডি তে নয় দেখে নিবি আবার'

-'কাউকে জিগ্যেস করো না বাবা। বলে দেবে'

ইতস্তত করল বাবা। তারপর ঘাগরার দোকানের লোককে জিগ্যেস করল। খদ্দের সামলাতে ব্যস্ত দোকানী হাত উল্টে না বলেছিল।

আমি রেগে গিয়ে পা ঠুকতে শুরু করেছি, কাঁদতে কাঁদতে বলছি-'কেন তুমি গাইড নিলে না? আমি এখন কি করে মুকুলের বাড়ি দেখব?'

বাবার মুখ ম্লান দেখাচ্ছিল। আমার হাত ধরে ঢালু রাস্তা বেয়ে নিচের দিকে নামতে নামতে বলেছিল- 'যা নেই তা কি করে দেখবি?'

-'নেই আবার কি? সিনেমায় আছে'

-'সেটা তো কল্পনা, একটা ছবি। তুই ভেবে নে না- এই ভাঙা পাথরগুলো যেখানে ঐটা মুকুলের বাড়ি। তুই যেখানে ভাববি সেইটাই মুকুলের বাড়ি। আরো মজা তো। কাউকে জিগ্যেস করতে হবে না, জাস্ট কল্পনা- ভেবে দেখ - মুকুলও হয়তো কল্পনা করেছিল - সত্যি মিথ্যে কেউ জানে না- সেইটা নিয়ে সিনেমা করতে গিয়ে একটা জায়্গা ভাবা হ'ল মুকুলের বাড়ি বলে- কল্পনার বাড়িঘরের আবার কল্পনা-'

-' তুমি কিচ্ছু জান না। গাইড থাকলে ঠিক দেখাত'

-' কী দেখাত গাইড? যে জায়গাটা দেখিয়ে বলত মুকুলের বাড়ি, কি করে জানতি সেই জায়গাটাই সিনেমায় দেখেছিস?'

-'ঠিক চিনতে পারতাম- সেই একটা উঁচুমত ভাঙা জানলা -মুকুল কাঁদছিল-'

-' পুরোনো কেল্লা- একই রকম কত জায়্গা থাকে- দ্যাখনা, এদিকে দ্যাখ- মুখোমুখি দুটো দেয়াল সামনে থাম- একদম একরকম - এই রকম আরো কত আছে; গাইড বলল আর যে কোনো জায়গা মুকুলের বাড়ি হয়ে গেল? একটা কল্পনার জায়গা, টুকি- কল্পনার পেটের মধ্যে কল্পনা- বাড়ির দেওয়াল অতীতের, ছাদ বর্তমানের, দরজা নেমপ্লেট ভবিষ্যতের- সত্যিই এরকম একটা বাড়ি হয়? হতে পারে?'

আমি তখন স্কুলে পড়ি- বাবার কথা শুনে মাথা গুলিয়ে যাচ্ছিল। একটা প্যাঁচালো সুড়ঙ্গের মধ্যে যেন ঢুকে যাচ্ছি মনে হচ্ছিল - আঁকা বাঁকা গোলকধাঁধা- কুলুঙ্গিতে পিদিম- কোথায় একটু আলো, কোথাও ছায়া - পথ হারিয়ে ফেলছি ; মুকুলের সঙ্গে মিলটা ঠিক তখনই বুঝতে পারি - এই যে বাবা কি সব বকতে বকতে হেঁটে যাচ্ছে, মা কোথায় যেন একলা বসে আর আমাকে অজানা সুড়ঙ্গ গিলে খেতে আসছে- আমরা তো কেউ কারোর মনের কথা জানতে পারছি না। কান্না পেতে লাগল। আর মুকুলকে ভালোবেসে ফেললাম; মুকুলের মা ছিল, বাবা ছিল, কিন্তু মুকুল জানত না ওর বাড়ি কোথায় - এই জন্মের বাড়ি টা ওর নাকি আগের জন্মের বাড়িটা। আমারও যেন তাই। মা আছে, বাবা আছে, বাড়ি নেই। ভাবলাম, এই যে সিনেমার শেষে মুকুল ছবি আঁকল, ফেলুদা তোপসেদা, আমি; কলকাতায় ফিরে ও কি আঁকবে মা বাবা আমি? সেই মা বাবা কে মুকুল কেমন করে আঁকবে? ঘাগরা, ওড়না, পাগড়ি, গোঁফ, কানে দুল? না টিপ, শাড়ি, টাক, ধুতি? মুকুল যখন রাত্রিবেলা ছবি আঁকত - সেই সীনটায় শুধুই দুটো রং আর ; সোনার কেল্লায় মুকুলের বাড়ি, আকাশ, ময়ূর - কত রঙ! ওর বাড়ির আসল রং কী?

ছোটোবেলায় অত বুঝিনি, বয়স যত বেড়েছে , দেখতাম, মা বড় উদাসীন। অপরিস্কার শাড়ি , চুল উস্কো খুসকো, নখের কোণে ময়লা, ফাটা ফাটা পা - স্কুলে যেত ঠিকই, রান্না করতে ভুলে যেত, আমাকে খেতে দেওয়ার কথা মনে থাকত না। সে না হয় একটু বড় হতে নিজেই সামলাতাম। ক্লাস এইট থেকেই বাজার করেছি, ভাত বসাতাম, ডাল, বেগুনভাজা, ডিম; ভাত বেড়ে মাকে দিয়ে নিজে খেতাম। বাবার জন্য খাবার ঢাকা দিয়ে মা মেয়ে স্কুল যেতাম। সারা পথ চুপচাপ মা, ফিরে আসার সময়ও তাই- কি হল স্কুলে, পরীক্ষা কেমন হ'ল - কোনোদিন ভুলেও জিজ্ঞাসা করে নি । যে টুকু কথা বলত- শুধুই পুরোনো রেফারেন্স- কে কবে কাকে কি বলেছিল, নিজের ছোটোবেলা, সব পুরোনো কথা। মা কেন অন্যরকম- আমার অন্য বন্ধুদের মায়ের মত নয়, বুঝতে চেষ্টা করেছি - কে জানে হয়ত মায়ের কোনো প্রেমিক ছিল, হয়ত বাবাকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিল।হয়ত বাড়িটা পছন্দ নয় মা'র। আমার কোনো মামাবাড়িও ছিল না - মা তার জেঠু জেঠির কাছে মানুষ- তাঁরাও সম্পর্ক রাখে নি , মা'ও না। আবার এমনও নয়, মা বাবা দিবারাত্র ঝগড়া করছে; দু জনে চুপচাপ যে যার নিজের ঘরে - গোটা বাড়ি থমথম করছে সর্বক্ষণ - বাবা এক এক দিন নিজে নিজেই রান্না করত , সবার জামা কাপড় কাচত - পোড়া লাগা ডাল, ভাত ধরে গেছে, দড়িতে ভেজা কাপড় থেকে জল ঝরছে - মা তখন কি সব বলতে বলতে জল নিংড়োতো, ঘষে ঘষে ভাতের হাঁড়ি মাজত। আমার ভালো লাগত না বাড়িতে। যতক্ষণ স্কুলে, টিউশনে- দিব্যি আছি , তারপর বাড়িতে ঢুকতে আর ইচ্ছে করত না।

এমনও ভেবেছি, আমি কি তবে আর কারো মেয়ে মানে কুড়িয়ে পাওয়া মেয়ে- সিনেমা টিনেমায় গল্পে যেমন হয়? মা' র মুখ দেখতাম, তারপর বাবার , আয়নায় নিজের। মিল আছে? কখনও মনে হ'ত , কপালের দিকটা মা'র মত, চুলগুলো হয়ত বাবার ধরণ- বুঝতে পারতাম না। বাবার দিকের এক বোন আসত -মনোরমা পিসি। আর বাবার মাসি- রাঙাদিদা। চা টা খেত, আমার মাথায় হাত বুলিয়ে গাল টিপে চলে যেত। এ' ছাড়া আর কাউকে আসতে দেখি নি আমাদের বাড়িতে। যত বড় হয়েছি ততই এই বাড়ি কবে ছাড়ব, কলকাতায় যাব, ওখানকার কলেজে পড়ব, চাকরি করব, গারলস হস্টেলে নিজের মত থাকব- এই সব ভেবে গেছি; কাগজে রুলার টেনে ফল ফুল নাম দেশ এর মত লাইন টানলে মা অতীত, আমি ভবিষ্যৎ।

বাবার কেসটা আগাগোড়া গোলমেলে ছিল - বাবা যে লাইনের কোন দিকে বুঝতে পারতাম না। আমার মাধ্যমিকের বছর থেকেই বাবার ভালোমত ছিটেলপনা দেখা দেয়- স্কুলে যেত না, কোথা থেকে কাঠের টুকরো, বাঁশ , তক্তা জোগাড় করে আনত- আর বাটালি, র‌্যাঁদা চালাত দিনরাত তাদের ওপর, হাতুড়ি পিটত। আমি তখন টেস্টের পরে পড়াশুনায় ব্যস্ত -

-'কী বানাচ্ছ বাবা? এত ইম্পর্ট্যান্ট? আমার পড়াশোনার অসুবিধে হয়- ভীষণ শব্দ'

- 'নৌকো বানাবো একটা - এই দ্যাখ খোল, এইটা গলুই হবে, এখানটা-'

মা এইখানে এসে চেঁচাত-

-'হ্যাঁ হ্যাঁ! তোর বাবাকে ঠাকুর দর্শন দিয়ে বলে গেছে তো নৌকা বানাতে। আর কাকে বলবে! এরপর সন্ন্যাসী হবে -আমি জানি। বংশে তো' হয় পাগল, নয় সন্ন্যাসী'

-' নোয়ার আর্ক, বাবা? কাকে কাকে তুলবে নৌকোয়?'

-' কাউকে নয়। আমার জন্য শুধু। হুঁ হুঁ বাবা, ছোটো সে তরী- এই বাড়িটা ভেঙে পড়লেই পালাবো।'

নৌকা বানিয়েছিল বাবা। ডিঙি একটা। খুদে খুদে নাম লিখেছিল- ল্যাজারাস। বাড়ির সামনে উল্টে রাখা ছিল -বারান্দার থামের সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা। সাদা রং করে চোখ এঁকেছিল।

মা বিড়বিড় করে বলেছিল -'কবে খোঁটা ওপড়ায় কে জানে!'

পালিয়েছিলাম আমিই। উচ্চমাধ্যমিক দিয়েই শহরে চলে যাই নার্সিং পড়তে; হস্টেলে থাকি। ছুটি ছাটাতেও বাড়ি আসতাম না। শুধু পুজোর সময় এক সপ্তাহ- মেস বন্ধ থাকত তখন। মাসে মাসে টাকা পাঠাত মা। দু একটা টিউশনি আমিও জুটিয়ে নিয়েছিলাম। গোল বাঁধালো বিশ্রি একটা রোগ, তাই ,বাধ্য হয়ে, অনেকদিন পরে সাত নম্বর বাড়িতে আবার থাকতে এলাম।

আসলে অদ্ভূত একটা অসুখ এসেছে সর্বত্র- প্রথম প্রথম কেউ বুঝতে পারে নি - রাস্তায় ঘাটে হঠাৎ হঠাৎ লোকজন পড়ে যাচ্ছিল আর সঙ্গে সঙ্গে শেষ - সারা পৃথিবী জুড়ে এ'রকম চলছিল। আমাদের মফস্সলে, শহরে, গ্রামে। তারপর জানা গেল বাতাসে বাতাসে এক মারাত্মক জীবাণু ঘুরে বেড়াচ্ছে - বাড়ির বাইরে বেরোলেই মানুষ ইনফেক্টেড হবে- আর ঘন্টাখানেকের বেশি বাইরে থাকলে মৃত্যু অনিবার্য। একটা ওষুধ এল প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই - এলিক্সির ওয়ান; বলা হ'ল- বেরোতে হ'লে এক ঘন্টার মধ্যে ফিরে ওষুধ খেয়ে নিতে হবে- বাড়ির বাইরে এলিক্সির ওয়ান কাজ করবে না। ফলে, প্রায় মাস দুয়েক হ'ল গোটা পৃথিবীতে সবাই গৃহবন্দী। এলিক্সির টু র হিউম্যান ট্রায়াল শুরু হয়ে গেছে - এই রকম শোনা যাচ্ছিল।

হস্টেল বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এসেছিলাম গাড়ি ভাড়া করে - আমাকে কেউ আসতে বলে নি যদিও। তেকোণা বাড়ি বাকি দুনিয়ার খবর রাখত না ।

এসে দেখি, সাত নম্বর আরো ছন্নছাড়া - বাবা সর্বক্ষণ কাঠ র‌্যাঁদা, হাতুড়ি, বাটালি নিয়ে একটা ঘরে - সে ঘরের দরজায় দাঁড়ালেও কাঠের গুঁড়ো নাকে মুখে ঢুকে যায়; মা অ্যাজ ইউজুয়াল আলুথালু, উদাসীন, রান্নাঘর কলঘরে শ্যাওলা, ঝুলকালি- বিছানার চাদর ময়লা, খুঁটখোলা মশারি ঝুলে আছে-

আগে যাওবা আশেপাশের বাড়ির লোকজনের আনাগোণা ছিল, মনোরমাপিসি , রাঙাদিদা - এখন তিনটে ঘরে শুধু আমরা। বাইরে কুকুর ডাকে না, রিক্সা চলে না, অটো নেই, রাস্তাঘাট ধূ ধূ করে - মাঝেমাঝে হুটার বাজিয়ে অ্যাম্বুলেন্স। একদিন ড্রোন এসে সপ্তাহের সাপ্লাই দিয়ে যায়। টেক্সট করে দিতে হয় একটা নম্বরে - ওষুধের নাম, বা অন্য কোনো দরকারি জিনিস - সাবান, স্যানিটারি ন্যাপকিন ট্যাপকিন আর এলিক্সির ওয়ান- বাড়িতে যত লোক সবার জন্য যেন দু চামচ করে ওষুধ রাখা থাকে - কমে গেলে, ফুরিয়ে গেলে মেসেজ করে দিতে হয়। এইভাবে চলছিল।

সেদিন ঝড় আসার কথা। রেডিওতে টিভিতে বলছিল বারবার; ড্রোন থেকেও অ্যানাউন্সমেন্ট- প্রবল ঝড় আসছে।

সকালে দিব্যি রোদ ; দুপুরের পর থেকে আকাশের চেহারা পাল্টে যাচ্ছিল- পূব দক্ষিণ কোণ থেকে কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘন মেঘ উঠতে লাগল - আকাশ ভরে যাচ্ছিল মেঘে মেঘে - একফোঁটা নীল, এক বিন্দু আলো যেন থাকতে দেবে না আর- মিনিটে মিনিটে বিদ্যুৎ আর গুমগুম শব্দ- যেন বাড়ির ছাদে ভারি লোহার বল গড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত - থরথর করছে সারা বাড়ি। ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছিল অনেকক্ষণ, এবার দেওয়াল থেকে ছিটকে পড়ল খাটের পায়ার কাছে- ফর্দাফাঁই হয়ে পরের বছরের তারিখ দেখা যাচ্ছিল; দৌড়ে জানলা দরজা বন্ধ করতে গিয়ে দেখি - গাছের পাতা, ডালপালা যেন ফণা ধরে ফুঁসছে; তারপর পাল্লার ফাঁকে চোখ রেখে দেখলাম, একসঙ্গে সমস্ত গাছ নামতা মুখস্ত করার মত দুলতে আরম্ভ করেছে আর ঠিক তখনই মিশমিশে মেঘ আকাশ ভরিয়ে ফেলে মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়ল। মনে হচ্ছিল,ঘোড়ায় চড়ে বল্লম হাতে সাত নম্বর আক্রমণ করেছে অক্ষৌহিণী সেনা; সমস্ত দরজা জানলা বন্ধ, তাও গুপ্তচরের মত হাওয়া ঢুকছিল হু হু করে, জলের বল্লম বিঁধে ফেলছিল সাত নম্বরকে, শত হস্তীর বৃংহণ চতুষ্পার্শ্বে আর কামানের গোলার মত বাজ।

আমার ঘরের আলো কাঁপছিল বহুক্ষণ , এবার নিভে গেল, নিকষ আঁধারে মা র ঘর থেকে দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল শুধু। পাশের ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে এল বাবা - ' আমার নৌকা?'

তারপর সদর দরজা হাট করে বারান্দায় এল; দড়ি খুলে উল্টোনো নৌকো হিঁচড়োতে হিঁচড়োতে দৌড় শুরু করল খালি পায়ে। ঘাসজমি পেরিয়ে বড়রাস্তায়।

-'যেও না বাবা। কী করছ?'

সহস্র অশ্বক্ষুরে আমার কথা চাপা পড়ে গেল। দৌড়োলাম বাবার পিছনে। জলের ছাঁট যেন চামড়া ছিঁড়ে নিল সঙ্গে সঙ্গে, বিদ্যুৎএর আলো ধাঁধিয়ে দিল চোখ- দূরে বাবার সাদা ডিঙি দেখতে পেলাম। হোঁচট খেয়ে পড়ে উঠতে গিয়ে দেখি, মা এসে দাঁড়িয়েছে।

কতক্ষণ দৌঁড়েছি জানি না, কতবার পড়ে গেছি - কখনও মা কখনও আমি- খেয়াল রাখি নি- শুধু ভাবছিলাম বাবাকে নিয়ে ফিরে যেতে হবে - এক ঘন্টা সময় আছে হাতে।

ফাইনালি বাবাকে পেয়ে গেলাম রেললাইনের কাছে - লাইন পেরোতে গিয়ে আছাড় খেয়েছিল সম্ভবত। ল্যাজারাস ছিটকে গিয়েছিল। শরীর থেকে রক্ত গড়াচ্ছিল না কি জল - বাবাকে টেনে তুলে বাড়ির পথ ধরলাম। আশেপাশের সমস্ত বাড়ির দরজা জানলা বন্ধ, এক বিন্দু আলো কোথাও নেই- সামনে সেনাবাহিনী বর্শাফলক নিয়ে - কুঁজো হয়ে আছাড়ি পিছাড়ি খেতে খেতে দৌড়োলাম- বাবা, মা, আমি।

দরজা হাট করে খুলে বেরিয়ে গেছি- জামরুল গাছের ডাল ভেঙে পড়ে দরজা আটকে দিয়েছে; আমাদের তিনজনেরই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেছে ততক্ষণে। ঝাঁপিয়ে পড়ল মা-ই প্রথম। দুহাতে ভাঙতে লাগল ডালপালা, সমস্ত শরীর দিয়ে ঠেলতে লাগল গাছের ভারি গুঁড়ি; আমিও হাত লাগালাম- দম আটকে আসছিল।

বাড়িতে ঢুকে - বাবা মেঝেয় শুয়ে পড়েছে, গোঙানির আওয়াজ আসছে - এলিক্সিরের শিশি হাতে দৌড়ে আসতে গিয়ে মা হোঁচট খেল চৌকাঠে - ছিপি খুলে মেঝেয় গড়িয়ে গেল তরল। দীর্ঘশ্বাস শুনলাম একটা তারপর দেখি, মা অন্ধকার হাতড়ে আঙুল দিয়ে কাচিয়ে তুলল ওষুধ, সেই আঙুল গুঁজে দিল বাবার মুখে; ভূতে পাওয়ার মত করতে লাগল মা- ওষুধ কাচাচ্ছে, বাবার মুখে দিচ্ছে, আবার তুলল আঙুল দিয়ে, ঢুকিয়ে দিল বাবার মুখে ; বাবা কথা বলছে শুনলাম- 'তুমি, তুমি...!'

মা একদম চুপ, শ্বাস নিচ্ছে বড় বড় আর মেঝে কাচিয়ে ওষুধের অবশিষ্টটুকু ঢুকিয়ে দিচ্ছে বাবার মুখে। তখনই বিদ্যুৎএর আলোয় দেখলাম সেই আশ্চর্য দৃশ্য। বাবা ওষুধ মাখা জিভ ঠোঁট দিয়ে ভয়ংকর চুমু খেলো মা কে; দীর্ঘ দীর্ঘ সে চুম্বন- জিভ দিয়ে তরল স্পর্শ করাল মা র আলজিভে।

আমি বেরিয়ে এলাম।
 
এ রকম শহর দেখি নি আগে। শহর না, জনপদ বলব। পাহাড় ঘিরে আছে, উপত্যকায় ছোট জনপদ, ছোট বাড়ি, বাঁধানো রাস্তা, সমতল ঘাসজমি। মাথার ওপর আকাশ ঠা ঠা করছে - হয়ত তারা জ্বলবে রাতের দিকে।।

এই শহরটা আমিই তৈরি করলাম। এইমাত্র। সাত নম্বরের দিকে একবার তাকালাম, তারপর ঘাড় ফিরিয়ে নতুন জনপদের দিকে- কোথাও কোনো রং নেই, অথচ সাদা কালো-ও নয়- আলোর সামনে ফিল্মের নেগেটিভ ধরলে যেমন লাগে- রংগুলো আঁচ করা যায় হয়ত, অথচ ঠিক যে হবেই তার কোনো গ্যারান্টিই নেই।
 
 


লেখক পরিচিতি:
ইন্দ্রাণী দত্ত
কথাসাহিত্যিক
কলকাতার উপকন্ঠে বেড়ে ওঠা ইন্দ্রাণী বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার বাসিন্দা। লেখালেখি শুরু প্রবাসে। নিরন্তর খুঁজে চলেছেন শব্দের অভ্যন্তরীণ স্পর্শ, পাঠকের সঙ্গে সংযোগের ম্যাজিক। প্রকাশিত ছোটো গল্পের সংকলন 'পাড়াতুতো চাঁদ'।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন