প্রতিভা সরকারের গল্প : কুহক




বাপের সঙ্গে বাধ্য মেয়ের মতো পানের বরজের দিকেই যাচ্ছিল মালতি, হঠাত তার কানে ঢোকে সেই আশ্চর্য শব্দটা যেটা আজ কদিন হলই তাকে জ্বালাচ্ছে।

যেন কেউ পায়ে পা মিলিয়ে দৌড়চ্ছে, বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। শুধু শব্দ কেন, ছায়ার মতো কী যে সরে সরে যায় গাছের আড়ালে, বাপের ভয়ে মালতি ভাল করে চাইতেই পারে না! অথচ তাদের সঙ্গে সঙ্গে সারা রাস্তা যায় সেই ছায়া, লুকোচুরি খেলে, যেন হাতছানি দিয়ে মালতিকে ডাকে। তার কল্পনায় সেই ছায়াকে কখনো দেখায় যেন ভালুকের মতো, কখনো হলদে রঙের চিতাবাঘ। ঘন কালো লোমশ শরীরে পেছনের দু পায়ে ভর দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ায়, যেন একটা পান গাছের চেয়েও লম্বা সে। আবার কখনো গাছের ফাঁকফোকরে সোনালি আগুনের শিখার মতো চারপায়ে ছোটে আর লম্বা লেজখানা মাটিতে আছাড় দেয়। এই আছে, আবার এই নেইও।

সুদিন বারুইয়ের কিন্তু কোনো ভাবান্তর নেই, সে মাথায় ঝুড়ি নিয়ে যেমন যাচ্ছিল তেমনই যায়। কিছু শোনেও না, দেখেও না। যেন তার নজর বরাবর ঝোলানো আছে এক কুয়াশার পর্দা, তার ওপারে কী যে চলছে তা তার দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না। বরং মেয়ের উসখুসানি দেখে সে ভাবে, “থাপরাইয়া দেওন লাগে। বয়স্থা মাইয়া, মাটির উপর চক্ষু থাকা লাগে, তা না, খালি দেহি উলুকঝুলুক চায়।"

বাপকে যমের থেকেও বেশি ডরায় মালতি। মা মরা মেয়ে বলে সুদিন তাকে এতটুকু রেয়াত করে না। মদ খেয়ে ঘরে এসে যদি দেখে পান থেকে চুণ খসা, তাহলে মেয়ের মাথার মোটা বেণি পাকলে ধরে হাতে, চোখ ভাটার মতো করে জিগায়,”এইডা হয় নাই ক্যান ? ঐডা করস নাই ক্যান?” ব্যাস মালতির প্রাণটা যেন উড়ে গিয়ে বরজের ছাদে বসে। বসে বসে দেখতে থাকে কেটে নেওয়া শুকনো কাশের মরা শরীর দিয়ে তৈরি বরজের ছাদ, সেই ছাদ ছুঁয়ে ফেলা আঁকশির মতো কচি সবুজ পানপাতা, বরজ ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা সুপুরির গাছ আর কোণার পুকুরটা। বাপ যতোবার তার গালে থাপ্পড় মারে, পুকুরের কাদা জলে লাফিয়ে পড়া সোনা ব্যাঙের মতো কেঁপে কেঁপে ওঠে মালতি, কিন্তু তেমন ব্যথা তার লাগে না। কারণ মনটা তখন সে নিয়ে গিয়ে ফেলতে পারে বরজের আশেপাশে। আর কে না জানে মনেরই রাজত্ব দেহের ওপর। বিধাতার রাজ্যে এও এক কুহক। যাকে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না, সেইই ছড়ি ঘোরায় তাল তাল রক্ত মাংস ঘামের ওপর।

মোদ্দা কথা পানের বরজটি মালতির প্রাণ। কেন তা সে মেয়ে নিজেও জানে না। নামের পরে বারুই শুনে বোঝা যাচ্ছে বাপ তার পানচাষিই বটে, কিন্তু নিজের বরজ তাদের কস্মিনকালেও ছিল না। অন্যের বরজে জন খেটেই দিন কাবার। ভেঙে পড়া মাটির দাওয়া আর ফুটো চালার মাটির ঘর থেকে বাপ মেয়ে রোজ সকালে পান্তা নিয়ে রওনা হয়, ফিরতে ফিরতে সূয্যি ঠাউর অস্তে বসেন।

পান বরজে কাজ কী কম ! দু সারি লতিয়ে ওঠা লাইন দেওয়া পান গাছের মধ্যে দু ফুটের মতো তফাত, সেখানে উড়েপুড়ে আসা লতাপাতা আবর্জনা পরিষ্কার করা, পান গাছের বাইতে পারার সুবিধের জন্য তাকে সরু পাটকাঠি বা বাঁশের গায়ে বেঁধে দেওয়া, গাছের গোড়ায় খোল দেওয়া, নতুন গাছ লাগাবার সময় নির্দিষ্ট তফাতে এক সাইজের গোল গর্ত করা, বরজে অনেক কাজ। গাছের গোড়া পুঁতে চারধারে ঝুরো মাটি দিয়ে সে গর্ত সুদিন বারুই বুঝিয়ে দেয় নতুন করে লতা বসাবার সময়। ঝুরো মাটিতে নতুন গজানো নরম শেকড় হাত পা আর সরু সরু আঙুল নিশ্চিন্তে মেলার অবকাশ পায়। গাছ তরতর করে বাড়ে।

তবে সবচেয়ে বড় কাজ মালতির। বড় মাটির কলসি কোমরের খাঁজে ঠিকমতো বসিয়ে তাকে মাপ মতো কাত করে পুকুর থেকে তোলা জল পাঁচ আঙুলের ফাঁকে কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে ফোঁটা ফোঁটা ফেলতে হয় পান গাছের গোড়ায়। সে এক বিশেষ কায়দা। সবাই পারে না। সব আঙুলে হয় না। কচি ঢ্যাঁড়সের মতো গোড়া মোটা, ডগা সরু আঙুল চাই, তবে পান গাছ তেষ্টার জল নেবে। চুল্লু টানা পুরুষগুলোর শক্ত কড়াপড়া কোদালের মতো হাতে অমন আঙুলও থাকে না, পান গাছ তাদের হাতে জলও খায় না। তবে মালিক পাম্প করে বরজের গাছে জল দেবার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু ধোপে টেঁকেনি। এখানে কারেন্ট বড় কমজোরি। আদ্দেক সময় থাকে না, আদ্দেক সময় থাকলেও কুপি জ্বেলে দেখতে হয় আছে কিনা। তাছাড়া পাইপের মুখ থেকে জল বেরোয় মোটা হয়ে, তাতে মালতির ছিম গাছের মতো লতানে আঙুলের নমনীয়তা আর উষ্ণ ভাপই বা কোথায়!

এইসব মাপ টাপ নির্ভুল বোঝে শোনে বলেই পানের বরজটা সর্বদা তার কলজের টুকরো মালতিকে আয় আয় বলে ডাকতে থাকে। মালতিও যাই বলে পা বাড়িয়েই আছে, কিন্তু বাদ সাধে গ্রাম থেকে বরজের দূরত্ব। ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাওয়া সরু রাস্তা, দুপাশে গাছ গাছালির উবুড় করা মাথায় দিনের বেলাতেই যেন আন্ধার ! ভুত প্রেতের ভয় আছে, দত্যিদানো, হিংস্র পশু, বদ মানুষ, কিসের ভয় নেই সেখানে! আজকাল আবার শেষটির ভয়েই গাঁ গঞ্জের মেয়েরা কাহিল হয়ে থাকে। এই সেদিন রূপপুরের মেলাফেরত মেয়েকে তার প্রেমিকের চোখের সামনে থেকে বাইকে উঠিয়ে নিল দুজন। ভোরবেলা তার ল্যাঙটো দেহটা পাওয়া গেল বরজের এক কিলোমিটারের মধ্যে। নখবোঝাই ধুলোমাটি, মুখভর্তি নুড়িপাথর, খোলা চুল খাবলে মাথা থেকে উঠিয়ে নেওয়ায় ফলে জায়গায় জায়গায় রক্তাক্ত চামড়া যেন লাল চোখ দেখাচ্ছে সবাইকে।

তবু অনেকটা পথ পার হয়ে জন খাটতে আসে মেয়ে পুরুষ এই অঞ্চলের পুরোনো রাজবাড়ি ঘেঁষা বরজে। বিশাল জায়গা জুড়ে কয়েক বিঘার ওপর প্রাসাদটা কবে থেকে দাঁড়িয়ে খুব পুরনো লোকেরা ছাড়া কেউ জানে না। বরজের জন্য একলপ্তে এতটা জমি আর কোথায়ই বা পাওয়া যেত! এতো পুরনো বরজ বলে পানচাষি বারুইদের একটি নিজস্ব পাড়াই গড়ে উঠেছে দূরের গ্রামে, যদিও হতদরিদ্র সুদিন বারুইয়ের সেখানে ঠাঁই হয়নি। সে থাকে গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে, একটেরে ছোট্ট একটু জমিতে। তাছাড়া কাজের খুব অভাব চলছে ইদানিং। যদি চলে যাওয়া যায় কেরালা, কিম্বা জরির কাজ নিয়ে সুরাত তাহলে আলাদা কথা। কিন্তু সবাই তো তা পারে না। ফলে একশ দিনের কাজ বন্ধ হয়ে গিয়ে মানুষগুলো যেন ডাঙায় তোলা শোলমাছ। খাবি খাচ্ছে, কিন্তু বেজায় শক্ত প্রাণ, বেরব বেরব করেও বেরুচ্ছে না।

পরিত্যক্ত রাজবাড়িটাকে নিয়ে এ তল্লাটে গল্প কথার শেষ নেই। বিশাল প্রাসাদের দরজা জানালা রেলিং তো অনেক আগেই কেউ চুরি করে নিয়ে গেছে, এখন সময়ের চোরাগোপ্তা চুরিতে খসে পড়ছে কার্ণিশ থেকে শুরু করে থাম, সামনের বিশাল তোরণ আর মাথার ওপরের ডানাওয়ালা বাঘের মূর্তি। সব কিছু গিলে খাওয়া অন্ধকারকে পেটের ভেতর জমিয়ে নিয়ে রাজবাড়ি একা দাঁড়িয়ে শীতে কাঁপে, গরমে ঘামে, বৃষ্টিতে ভেজে।

আশপাশের ধান খেত বা এই বরজে যারা খাটতে আসে, তারা জঙ্গল পার হয়েই আসে, কিন্তু ভুলেও জষ্টির দুপুরে তপ্ত মাথা ঠান্ডা করতে, মাঘের জাড় বা ঝড়বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে রাজবাড়িতে ঢোকে না। কিসের যে ভয়, গ্রামীণ মানুষগুলো ভালো করে বলতে পারে না, বোঝেও না। কিন্তু ভয় পায় আর কাজের সময়টুকু ছাড়া এ তল্লাটে আর এক মূহুর্তও তিষ্টোয় না। মুখ ফুটে কেউ না বললেও সবাই কী করে যেন মনে মনে জানে সন্ধের পর ডানা জোড়া খসিয়ে, সে দুটোকে বেদির নিচে রেখে, প্রাসাদের সবচেয়ে সবচেয়ে উঁচু চূড়া থেকে লাফিয়ে নামে পাথরের বাঘ। সব ভার নামিয়ে রাখায় তখন চাবুকের মতো তার শরীরের পেশি, বিদ্যুতের মতো চলার গতি আর বজ্রের মতো তার গর্জন। ভেলভেটিয়া থাবায় লুকিয়ে থাকা ধারাল ছুরির মতো সাদাটে নখ দিয়ে সে যে গাছের গুঁড়ি আঁচড়ায় সেটাই আস্তে আস্তে শুকিয়ে কংকাল হয়ে যায়।

তাই বরজে যাবার পথে কী না কী দেখে মালতি যখন চঞ্চল হয়ে উঠল, তখন তার মাথায় প্রথম এলো রাজবাড়ির কথা। যা সে আবছা দেখছে, অথচ তার বাপ দেখছে না মোটেই, তার বাস ঐ প্রাসাদের পেটের ভেতরের আন্ধারে কিম্বা ছুঁচালো চূড়ায় নয় তো ! পুকুর থেকে জল আনতে গিয়ে রাজবাড়ির ভাঙা চুড়ো নজরে আসে, মালতির সারা শরীর ভরে যায় লোমকাঁটায়। মনে হয় কেউ তাকে ওখান থেকে চোখের পাতা না ফেলে দেখছে। একজোড়া হলদেটে কটাশ মণিতে যেন তার শরীরের ছায়া স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। কখনও আলকুশি ঝোপের পেছনে কী যেন সাঁত করে সরে যায়। বরজের পাশে পাকুড় গাছের ছায়ায় খেতে বসেছে, টুপ করে একটা পাথর গড়িয়ে এলো তার পাতের দিকে। সারাক্ষণ কে যেন তাকে নজরে নজরে রাখছে আর খুব কৌশলে জানান দিচ্ছে নিজের উপস্থিতি।

তা নজরে রাখার মতোই মেয়ে মালতি। শুধু ছিম লতার মতো আঙুল নয়, তার শরীরের গড়নও বড় লক্ষ্মীমন্ত। কোমর ছাপানো চুল আর ভারী দুঃখী একজোড়া চোখ। ভরা বুকে আকছারই নজর আটকে বঁড়শিতে বেঁধা মাছের মতো ছটফটায় বরজের অন্য খাটিয়েরা। তার বদমেজাজি বাপকে ডরায় সবাই, তবুও কখনো সখনো তার পাশ দিয়ে যাবার সময় বেদের মেয়ে জোসনা থেকে কেউ কেউ এক দু কলি গান ভুল করে গেয়ে ফেলে। তবে তাদের মোটেও ভাল লাগে না মালতির। তার মা বলত জীবনের নানা কুহকের কথা। মেয়ে যেন সে সবেই ডুবে থাকতে বেশি ভালবাসে। লোকে বলে তার মায়ের মতো হয়েছে সে অবিকল। সেই মা, যে নিজে পানচাষির মেয়ে ছিল বলে পান নিয়ে কতো গল্পকথা জানত!

এখনও জোছনার ক্ষীর মাখামাখি রাতের বাতাসে মায়ের রিনরিনে গলার আভাস পায় মালতি, "পান পাতা সহজ পাতা না। দ্যাবতা আর অসুরের যুদ্ধে যখন সমুদ্র মন্থন হইল, তখন সুধার কলসি সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্য থিকা উইঠ্যা আইল বাসুকিরে প্যাঁচাইয়া দড়ি টানাটানিতে। সেই কলসি দেইখ্যা হুড়াহুড়ি পইরা গেল দুই দলে। তার ঠ্যালায় দুই এক ফোঁটা অমৃত ছিটকাইয়া গিয়া পড়ল পাতালে নাগরাজের বাসায়। সেইখানে নাগবল্লি নামে যে লতা গজাইল, হেই আমাগো পানের লতা। কত্ত যে রোগ সারে মা, মনের শোক দূরে যায় এই পাতার সেবনে, তা আর তরে কী কমু, মা।"

মনের শোক দূরে যায় কথাটা মনে পড়তে মালতি নড়েচড়ে বসে। তার মাতাল বাবা তাকে মারে, খেতে দেয় না, অকথ্য গালাগাল করে। এমন সন্দেহ বাতিকওয়ালা পুরুষ সে, অন্য কারো সামনে মেয়ে মাটি থেকে চোখ উপরে তুললেই তার মাথায় ভুত চাপে। মেয়ের অস্থানে কুস্থানে লাথি মারতেও পা কাঁপে না। চুল টেনে মাটিতে শুইয়ে দেয়। মনের শোকে মালতি পাগল হয়ে যেতে যেতে মায়ের কথা ভেবে ঘরে রাখা দু একটা শুকনো পান পাতা চিবিয়ে নেয়, তারপর আবার ভাতে ভাত রাঁধে, ছেঁড়া কাঁথা রোদে দেয়। কে যে তাকে দেখে নোনা ঝোপের আড়াল থেকে, বরজ অব্দি সবটা রাস্তা দৌড়ে যায় তার সঙ্গে সঙ্গে, জানতে পারলে দুচ্ছাই বলে মালতি তার কাছেই চলে যেত। এইসব ভাবতে ভাবতে আনচান করা শরীর আর অবশ মন নিয়ে মালতি শুঁড়িখানা থেকে বাপের ফেরার অপেক্ষায় দাওয়ায় বসে থাকে মাঝরাত অব্দি।

সে রাতে পুণ্ণিমে ছিল। শেয়ালের ডাক শেষ হলে, টুপটাপ শিশির পড়ার আওয়াজ শুনতে শুনতে মালতি ভাবে ভোর হয়ে গেল, বাপ তো এখনও ফিরল না। ছেঁড়া কাঁথা ভাঁজ করে কুলুঙ্গিতে তুলে রেখে সে বাইরে আসে। অমনি তার চোখে যেন ধাঁধা লেগে যায়। কী জোৎস্না, কী জোৎস্না গাছের পাতায়, খোড়ো চালের ওপর, যেন হাটের গর্জন তেল মাখা দুর্গা প্রতিমার গালের মতো চকচক করছে চারধার! দাওয়ার সামনে নয়নতারা ফুল গাছে এ ডাল থেকে সে ডালে বোনা সূক্ষ্ম কারুকাজের মাকড়সার জালে শিশির বিন্দু আটকে রয়েছে, যেন গল্পে শোনা রাণীমার সাতনরী হার!

নানা কুহকের কথা বলত মা, প্রকৃতির কুহক, মানুষের স্বভাবের কুহক, মনের মধ্যেকার আশ্চর্য সব কুহক। আজকের রাত মনে হয় ওমন কুহকেরই রাত, কেননা এতো সুন্দর রাত নিজের তুচ্ছ জীবনে কমই দেখেছে মালতি। দরজার বাঁশ ধরে সে শুধু চেয়েই থাকে, গঞ্জের মাগী পাড়ায় রাত কাটাবার জন্যও বাপের ওপর রাগ করতেও ভুলে যায়। প্রায়ই তো সে যায় সেখানে এবং ফিরে এসে একটুও লজ্জা না পেয়ে মেয়ের ওপর তম্বি করতে থাকে। বাপের মুখ থেকে ভকভকিয়ে বেরনো চুল্লুর গন্ধে বমি পায় মালতির। ওয়াক তোলবার সাহস না থাকায় সে দু হাঁটুতে মুখ গুঁজে নিঃশব্দে কাঁদে।

সে রাতে কিন্তু অবাক মেয়ে চাঁদ থেকে ঝরে পড়া সুধা চোখ দিয়ে চেটে নিতে থাকে, কেমন যেন মাতাল মাতাল লাগে নিজেকে। ঠিক করে ফেলে যতটুকু রাত বাকি আছে এমন বেড়ায় ঠেসান দিয়েই কাটিয়ে দেবে। কী যে একটা মনে পড়ে তার বুকের ভেতরটা ফুলে ফুলে উঠছিল, সে নিজেই ভালো বুঝছিল না। যেন এই চাঁদ, জ্যোৎস্না, ঝকঝকে আকাশ, মিঠে হাওয়া সব তার অস্তিত্বের অঙ্গ, তারই অন্তর্গত। সে নিজেকেই প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে ফেলতে ছড়িয়ে যাচ্ছিল চরাচরে জেগে থাকা কুয়াশার মতো, সন্ধে বেলা উনুন থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠা ধোঁয়ার মতো। তুলোর মতো হালকা হয়ে যাচ্ছিল মালতি, যেন তার হাত নেই, পা নেই, নাকমুখের কোনো ঠিক নেই হয়তো সে শিমূল তুলোর মতোই বাতাসে উড়ে যেত, হারিয়ে যেত, কিন্তু তখনই তার নজর যায় সবেদা গাছের ছায়ার দিকে, ছাগল বাঁধার খুটোর ওপাশ থেকে কে যেন সাঁত করে সরে গেল। একবার মনে হল অতিকায় কিছু, কালো উজ্জ্বল রেশমে ঢাকা তার বিরাট শরীর। পরক্ষণেই ভাবলো, না না, লাল হলুদ মেশানো মহার্ঘ্য ত্বক আর সরু কোমরের কিছু যেন লাফ দিয়ে চলে গেল। আগুনের খন্ডের মতো তার দুই চোখ, মেয়েকে দেখে যেন এক পলকের জন্য বড় কোমল হয়ে এসেছিল! ও কি কোনো বহুরূপী নাকি রাজবাড়ির চূড়োয় ডানা জোড়া নামিয়ে আসা বিদ্যুতের মতো লাফিয়ে নামা সেই পাথুরে বাঘ! শরীর বিবশ হয়ে আসে মালতি, আর কতকাল একা পথ চলবে সে, তার জীবনের এই আড়াল আবডাল কি ঘোচার নয়?

যেইই হোক না কেন সে, মালতির আর ভয় করছিল না। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে দেখল ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘের ফাঁকে আলো ফুটি ফুটি করছে, যেন দোল খাচ্ছে পানলতার উজ্জ্বল রঙ ধরা নতুন পাতার বাহার। কী যে গোলমাল হয়ে গেল মেয়ের মাথার ভেতর, ঠিক করে নিল এই শেষ রাতেই রওনা হয়ে যাবে বরজের দিকে। মা তাকে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেছিল কুহকেরও কুহক এক গল্পকথা। পান বা নাগবল্লি লতা নিজেই নিজেতে স্বয়ং সম্পূর্ণ। তার গাঁটে গাঁটে জোড়ায় জোড়ায় ফুটে থাকে একটি পুরুষ পাতা, আর একটি মেয়ে পাতা। একটি একটু বড়, আর একটি ছোট। এইরকম জোছনার রাতে শিশিরের আওয়াজের মধ্যে পুরুষ পাতারা আদর করে জড়িয়ে ধরে মেয়ে পাতাদের। মিঠে বাতাসে দুলে দুলে দু ধরনের পাতা সাপটে লেগে থাকে এ ওর সঙ্গে, যতক্ষণ আকাশে জোছনা থাকে ততক্ষণ। ভোরের প্রথম মোরগ ডাকের সঙ্গে সঙ্গে ছিঁড়ে যায় এই বাঁধন, দুই পাতা দুইদিকে এলিয়ে পড়লে দেখা যায় ভেতরের গাঁটে গজানো ডগা থেকে বেরিয়েছে নতুন কচি পাতার জোড়া। লালচে আর মসৃণ। ফনফনিয়ে বাড়ে তারা, খোল খেয়ে না জোছনায় লুকনো আদর খেয়ে, কেউ জানে না। ঐ সদ্য গজানো কচি পাতাদুটি পরিষ্কার কাপড়ে বাঁ হাত দিয়ে তুলে যে খাবে, শোক বিষাদ কাকে বলে সে ভুলে যাবে। পৃথিবীর সব কুহকের সত্যিকারের মানে পরিষ্কার হয়ে ধরা দেবে তার দুই চোখে। দেখা যাবে না, কিন্তু ত্রিনয়নের আভাস মিলবে তার দুই ভ্রূ-র মধ্যিখানে।

ঘুম জড়ানো দুঃখী চোখে ঘরের ভেতর মাচার নিচে হাঁটু ভেঙে বসে থাকা ছাগলছানার লটপটে কানে চুমু খায় মালতি। খুদের গুঁড়ো একমুঠো ধরে দেয় তার সামনে। তারপর ধোয়া ডুরে শাড়ি পরে বাইরে এসে দোর বাঁধে পাটের দড়িতে। ছানাটির জন্য বাঁধন আলগা রাখে সে, ইচ্ছে হলে মাথা দিয়ে ঢুঁ মেরে সে যেন বেরনোর রাস্তা করে নিতে পারে। কনুই থেকে দুহাত ভেঙে মেঘের মতো একরাশ চুল হাতখোঁপায় জড়িয়ে নেয় মালতি, তারপর হাঁটা শুরু করে পানপাতার জোড়া লাগা দেখবে বলে। জঙ্গলের ভেতরে ঢুকে পড়ে তার চেনা রাস্তায়, হনহনিয়ে হাঁটতে থাকে, চলার বেগে সরে যাওয়া ডালপালাগুলো খামোখা তার মাথায় ঝুঁকে পড়ে আলতো চুমু খায়। দুর্বা ঘাসের শক্ত বাঁধন পা জড়িয়ে ধরে।

কিছুক্ষণ পরেই মেয়ে বুঝতে পারে কে যেন রাস্তার ধারে গাছের আড়ালে চলে তার পায়ে পায়ে। সে অতিকায় না ক্ষিপ্র গতির, এসব আর ভাবেই না মালতি। তার পোষা ছাগল ছানাটির মতো যে তাকে অনুসরণ করে যাচ্ছে বনপথে, তার জন্য জীবনের সবচেয়ে আগ্রাসী চুমুটি ঠোঁটে চেপে রেখে পানপাতা হবে বলে, শোক বিষাদ ভুলবে বলে, পৃথিবীর সব কুহককে হাতের মুঠোয় সাপটে ধরবে বলে, বাতাসের আগে দুলে দুলে বরজের দিকে ছুটতে থাকে মালতি বারুই। ভোরের মিঠে বাতাস তার পরণের কাপড়চোপড়ে ঢুকে পড়ে তাকে নির্লজ্জ আদর করতে থাকে। মালতি পরিষ্কার শুনতে পায় প্রাসাদের শীর্ষ থেকে মেঘের মতো গম্ভীর অথচ কোমল আওয়াজে কেউ তাকে নাগবল্লি বলে ডাকে। সে হেসে বলে, "এই যে, যাই!"

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ