বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

শাহাব আহমেদ'এর ধারাবাহিক উপন্যাস: পেরেস্ত্রইকা মস্কো ও মধু





৩০ তম পর্ব


সুদীপের অপারেশন শেষ হবার পরের দিন খুব ভোরে সে জেগে ওঠে। বার হোল করে বেশ কিছুটা রক্ত সরাতে হয়েছে সাবডুরাল হেমাটোমা থেকে। এখন সে আই সি ইউতে আছে। তার প্রচণ্ড মাথা ঘুরাচ্ছে এবং তীব্র বমি বমি লাগছে।  
সে রাতে অনেক স্বপ্ন দেখেছে। তার প্রাক্তন দীর্ঘনি:শ্বাস লাবণ্য, মেয়ে লাবণ্য এবং আলিওনা সবাই স্বপ্নে সিনেমার মত আসা যাওয়া করেছে। সে একটা মহিষটানা গাড়িতে শুয়ে শুয়ে কোথাও যাচ্ছিল। দীর্ঘ পথ, অনেক ঝাঁকুনি লেগেছিল এবং প্রতিটা ঝাঁকুনির সাথে সাথে তার মাথায় নেমে এসেছিল নয়’শ টনি হাতুড়ি আঘাত। হাত ধরে বসেছিল কখনও লাবণ্য, কখনও আলিওনা এবং কখনও সে শুনতে পাচ্ছিল তার মেয়ের কান্না পাপা.. পাপা…. ।
 
বর্ষার জলে ডুবে থাকা ধঞ্চে গাছের কান্নার মত। সে কোথাও তলিয়ে যেতে যেতেও যাচ্ছিল না, সে কোথাও ভেসে যেতে যেতেও ভেসে যেতে পারেনি। একটা অদ্ভুত জগত, চেতন ও অবচেতনের মাঝামাঝি, আদিগন্ত কারাকুম মরুভূমির মত।

তারপরে ওর মনে হয়েছে কারা যেন ওর মাথাটি দুই ফাঁক করে খুলে ফেলেছে এবং ছিন্নমূল মানুষ যেমন খাদ্য খোঁজে ডাস্টবিনে, অথবা... পাবলো নেরুদার 'হাওকিনা মুরিয়াতি' যেমন স্রোতস্বীনিতে স্বর্নকণা খোঁজে, তেমনি কিছু একটা খুঁজছে ওর মাথার ভেতর। মানুষগুলো আসলেই মানুষ, না অন্য জগতের কেউ বোঝা যায় না। কোনো বন্ধ কামরার সিলিংয়ে বসে যেন সে দেখতে পাচ্ছিল কারা যেন ওকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে, এপ্রোন, টুপি, মাস্ক ও চশমা পড়া। হাতগুলো গ্লাভস দিয়ে ঢাকা, ওদের কোনো শরীর বা অবয়ব নেই।
 
তারা তার মগজটাকে ধুইছে ধুইছে আর ধুইছে, কত লম্বা সময় ধরে এবং আশ্চর্য ওর কোনো ব্যথা লাগছে না বরং ভীষণ একটা কৌতুহলে নিবিষ্ট হয়ে আছে। তারপরে কোথায় একটা অন্ধকার মাঠের মধ্যে যেন সে... ঘুট ঘুটে অন্ধকার, কিচ্ছু দেখা যায় না, না-মাটি, না-আকাশ এবং তা আসলেই মাঠ কিনা তাও হলফ করে বলা যায় না। সেই অন্ধকারে এক জোড়া হাত তার এক হাত এবং অন্য জোড়া হাত অন্য হাত ধরে টানছে। সে তাকায়, দেখে লাবণ্য !

কিন্তু আশ্চর্য, জলে দেখা অবয়ব একটু আন্দোলনে মুহূর্তেই যেমন মিলিয়ে যায় তেমনি তা মিলিয়ে গেলে সেখানে দেখা দেয় আলিওনার মুখ!
 
ঠিক কী হয়েছিল সব মনে করতে না পারলেও বেশ কিছু খুঁটিনাটি মনে আসছে। গতকাল সারাদিন অফিস করেছে, তারপরে সৌম্যসহ সন্ধ্যের পরে বাসায় ফিরছিল। বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামার পর ড্রাইভার ভিতালিকে বলেছে তার আর নামতে হবে না, সৌম্য রয়েছে। সচরাচর ভিতালি ওকে বাসা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। রাশিয়ার প্রায় প্রতিটি দালানের সিঁড়ির নীচে মৃত্যু ওঁত পেতে থাকে।
 
ভিতালি বেশ শক্ত সামর্থ্য। মিলিটারিতে ছিল, পেটানো শরীরl মাঝবয়সী, সুদীপের চেয়ে বয়সে বড়। কথা খুব বলে না। অবশ্য হাসে।লেনিনগ্রাদের রাস্তা ঘাট খানাখন্দে ভরা। সুদীপের রাশিয়ান গাড়ি ঝিগুলি-৬ চালানোর সময় যখন বিশাল বপুর ঝাঁকুনি খায়, ভিতালি বলে, “ রাস্তা তো নয় প্যারিসের রাজপথ।” রাশিয়ায় বহুল ব্যবহৃত এক্সপ্রেশন এটি। ইতিহাসটুকু না জানলে এর রস খসখসে। আগে রাশিয়ার অভিজাতরা যেত প্যারিসে টাকা খরচ করতে। আর প্যারিসের ব্যবসায়ি, হোটেল ও ব্রথেলের মালিকেরা অপেক্ষা করতো দরাজদিল রাশিয়ান ব্যবসায়ি ও অভিজাতদের জন্য। ওরা না করে দামাদামি, কেনে প্রচুর আর পার্টি দেয় বড় বড়। হৈ হুল্লোড় ফুর্তির ক্ষেত্রে কোনো পরিমিতি নেই। প্যারিসের নারীরা আসতো রাশিয়ান অভিজাতদের গৃহ পরিচারিকার কাজ করতে। অভিজাতদের ভাষা ছিল ফ্রেঞ্চ, রুশ-জোলা, মালো, মুচি আর ভূমিদাসদের ভাষা। সেইসব দিনে প্যারিসের রাস্তাগুলো সেইন্ট পিটার্সবুর্গের রাস্তা থেকে খারাপ ছিল এবং সে কারণেই রুশ ভাষায় খারাপ রাস্তা বোঝাতে প্যারিসের রাস্তার তুলনা করা হতো। সময় বদলেছে, কোথাকার রাস্তা এখন কত ভালো সেই বিতর্কে না গেলেও ভাষায় গেঁথে যাওয়া জোক বা স্টেরিওটাইপগুলো ঠিকই বহতা নদীর মত। অবশ্য রুশীরা সচরাচর নাক উচু, আত্মম্ভরী নয়, ওরা অন্যদের প্রশংসায়ও কৃপণতা করে না, যেমন "গ্রীসে সব কিছু পাওয়া যায়।" ওদেরই একটি প্রিয় বাক্য, স্বদেশে সবকিছু পাওয়া যায় না।“পৃথিবীর সব রাস্তা যে রোমে গিয়ে পৌঁছায়”

এ ব্যাপারেও তাদের কোনো দ্বিমত নেই।

ভিতালির দোষ একটা আছে। মাঝে মাঝে সে কয়েকদিনের জন্য উধাও হয়ে যায়। শীতে ভাল্লুক যেমন গুহার ভেতরে শীত নিদ্রায় যায়, সে যায় 'জাপোই'য়ে। অর্থাৎ দিন-দুনিয়া ভুলে ভদকার নহরে সাঁতরায়। ফোন করে না, ফোন ধরেও না। বেঁচে আছে কি নাই, তাও বোঝা মুশকিল। চাকরি থাকলো কি থাকলো

না, সে তো কোনো প্রশ্নই নয়। ভদকা আর অর্থ দুটোই নাকি মানুষকে অমানুষে পরিণত করে-চেখভের কথা। তবে কোনটা মানুষকে কতখানি অমানুষ করে তা তিনি বলেননি ।

ভদকার কারণেই ভিতালি তার বৌ-বাচ্চা রাখতে পারেনি। ওরা এখন কোথায় আছে তাও সে জানে না। থাকে একা একা। রাস্তা-ঘাট বা মদের দোকানের প্রজাপতি নারী যাকে যেখানে পটাতে পারে তাকে নিয়ে ঘুমায় মাঝে মধ্যে, যখন একান্তই প্রয়োজন বোধ করে। এছাড়া ভোর থেকে শুরু করে বেশ রাত পর্যন্ত সুদীপের গাড়ি চালায়। বসন্তে বা গ্রীষ্মে যখন আবহাওয়ায় শ্যাম্পেনের মাদকতার কণা উড়ে বেড়ায় এবং জীবন ছড়ায় সুগন্ধি ঘ্রাণ, তখন সবচেয়ে কাটখোট্টা মানুষটিও মাতাল মাতাল বোধ করে। ভিতালির তখন মুড ভালো থাকে এবং ও মাঝে মাঝে গুন গুন করে, “আবহাওয়া ফিস ফিস করছে : চাকরি ছেড়ে দাও, চাকরি ছেড়ে দাও।”

আবহাওয়া কেন এই রকম অর্বাচীন অলক্ষুনে ফিস ফিস করে তার ব্যখ্যা অবশ্য সে কখনও দেয়নি। এবং আদৌ চাকরি ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি ওর এজেন্ডায় আছে কিনা তাও বলা মুশকিল।

সুদীপ কয়েকবারই ওকে কাজ থেকে বিদায় করে দিয়েছে কিন্তু মদের মন্দাকীনি পার হয়ে আবার এসে ঘ্যান ঘ্যান করায় ফেরত নিয়েছে। যতক্ষণ কাজ করে, করে খুব বিশ্বস্থভাবে। কিন্তু সুদীপ জানে ও ব্যাটা হয়তো মরবে লিভার সিরোসিসে, নয় মেয়ে নিয়ে মাতালের মারামারিতে। তবে ভিতালি পুশকিনের স্টেশন মাস্টার স্যামসন ভিরিনের মত অত ছোট নয়, নয় গোগলের ওভারকোট হারানো আকাকি বাশমাচকিনের মত ছোটর চেয়েও ছোট, অথবা দস্তয়েভস্কির নিঃস্ব ও দীনজন, মাকার দিয়েভুসকিনের মত মনোবিকল বামন। এত ছোট মানুষ রুশ সমাজে আর নেই। এরা মদ খায় মনের সুখে, চুপ করে থাকে সুন্দর ভবিষ্যত ও আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকে। এই ধারণাই এতদিন পরিবেশন করা হয়েছে এবং বাইরের দেশ থেকে আসা অতিথি সুজন সুদীপরা একথাই বিশ্বাস করেছে। 
 
ওর ওয়ার্ডে পাশের বেডের যে মানুষটা সারা সকাল নার্স, ডাক্তারসহ সবাইকে ব্যস্ত রেখেছে, সে কিছুক্ষণ আগে মারা গেল। এইমাত্র তাকে নিয়ে গেল ওরা। নার্স এসে বিছানার চাদর, বালিশের কভারগুলো পরিবর্তন করে নতুন করে বিছানা পেতে গেল। যেন কিছুই হয়নি। অন্য রোগী আসার জন্য বিছানা প্রস্তুত। পৃথিবীটাকে এই প্রথম সুদীপের একটি হসপিটাল বেডের মত হয়, যেখানে মানুষ প্রতিটা মুহূর্ত জীবনের জন্য লড়াই করে। সে কোনোদিন ধারণা করেনি যে মৃত্যু এত কাছাকাছি হাঁটে। মৃত্যু নিকট বন্ধু বা ব্যবসায়িক পার্টনারের মত। কেমন একটা গা ছম ছম করা অপ্রীতিকর অনভূতি, অনেকটা পুরানো মঠের গায়ের গর্তে লুকিয়ে থাকা টিয়াপাখি ধরতে গিয়ে সাপের পিঠে হাত বুলানোর মত।

সুদীপ জানতো রুশরা মরতে ভয় পায় না, বাঁচেও "জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য " এই রকম একটা ড্যাম কেয়ার ভাব নিয়ে। অথচ সাল্তিকভ সেদরিন তার একটি গল্পে "পিছকার" কে এঁকেছেন সম্পূর্ণ অন্যভাবে, ভারী নিঁখুত ছোট্ট একটা বাক্যে, “পিছকার ঝিল দ্রোঝা, উমিরাল দ্রোঝা” যা বিশ্ব সাহিত্যের এক অসমান্তরাল চিত্রকল্প, অনুবাদে যদিও এর বক্তব্যটা অত তীব্র থাকে নাঃ

"পিছকার বেঁচেছিল ভয়ে কেঁপে কেঁপে, মারাও গেল ভয়ে কেঁপে কেঁপেই।"
 
কিন্তু এই লম্বা চৌরা ব্রবডিঙনাং মানুষগুলো কি আসলেই তাই? কুলিকভ যুদ্ধে মঙ্গোলদের হারিয়েছে যারা, নেপোলিয়নকে হারিয়েছে যারা, সমাজ পরিবর্তনের বিশাল স্বপ্ন নিয়ে বিপ্লব করেছিল যারা, এরা কি তাদের উত্তর পুরুষ নয়? কেন তারা নিজেদের দেশকে এমন ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে দিচ্ছে? কেন দানবের নৃত্য দেখেও তারা নির্বাক, নিস্পৃহ? কে তাদের ভেতরে "পিছকার" জিনটি অনুপ্রবেশ ঘটালো? জীবনের তিক্ত পিত্ত গলা বেয়ে উপরে উঠে আসছে আর তারা জ্যাঁ আর্তুর রেবোর কবিতার বিকৃত অর্থ বুঝে মাতাল হয়ে ভিতালি বনে গেছে।
 
গতকাল সুদীপ অফিস ত্যাগ করা পর্যন্ত ওর অফিসেই ছিল গাজী মোশতাক ভাই ও কস্তিয়া। সের্গেই দুদিন আগে যখন "ওরা তোকে পেশাব করিয়ে ছাড়বে" বলেছিল, এই কস্তিয়া ছিল "ওরা"দের মূল ব্যক্তি। “পেশাব করানো” -মাফিয়াদের মধ্যে ব্যবহৃত একটি নতুন মেটাফোর, তীব্রভাবে আঘাত করা যাতে মৃত্যু নিশ্চিত হয় অথবা সব কিছু কেড়ে নিয়ে ন্যাংটা করে ছেড়ে দেয়া বোঝানো হয়।তিন সপ্তাহ দেশে কাটিয়ে ফেরার পর দেখা করতে এসেছে কস্তিয়া কুশল বিনিময় ও ব্যবসায়িক খোঁজ খবর নিতে। কিছুক্ষণ কথা বলার পরে, গাজী মোশতাক ভাইকে বলেছিল, চলেন বাসায় যাই।

তুমি যাও, আমার আর একটু কাজ আছে।

কস্তিয়া থেকে গিয়েছিল গাজী মোশতাকের সাথে। ওকে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্রে যদি এরা সত্যই যুক্ত থেকে থাকে, তাহলে কি ওরাই খুনীদের জানিয়ে দিয়েছে যে সুদীপ রওনা হয়ে গেছে? সুদীপ কোনমতেই মানতে পারে না যে ,গাজী মোশতাক ভাই এটা করবে। প্রথমত, সে সুদীপের অনেক সিনিয়র। তাদের মধ্যে সম্পর্ক অনেক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং সুদীপ সবসময় তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করে।

গাজী ভাই ৭৯ সালে পাশ করে বৌ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। বৌ'র নাগরিকত্ব চলে গিয়েছিল। বাংলাদেশে কয়েকবছর থেকে তারপরে চলে গিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে। সেখানেই ছিলেন পেরেস্ত্রইকা শুরু হবার পূর্ব পর্যন্ত। সেখান থেকেই খবর পান যে প্রাক্তন সোভিয়েত নাগরিক যারা দেশ থেকে বের হয়ে যাবার কারণে নাগরিকত্ব হারিয়েছিল, তারা ইচ্ছা করলে নাগরিকত্ব পুনরুদ্ধার করতে পারবে।
 
তখনই তারা ফিরে এসেছিলেন। বেকারত্ব তখন অতিমারির মত। একটি স্যান্ডউইচ বিক্রির দোকান দিয়ে কোনোভাবে চলছিল। সুদীপ তাকে সিঙ্গাপুরের ব্যবসায়ের সাথে পরিচয় করায়। বার দুয়েক যায় ও এক সাথে। তখনও দুজনের পৃথক পুঁজির ছোট ব্যবসা।
 
তারপরে ইদ্রিশের পরামর্শ মত সুদীপ যখন তার কোম্পানি রেজিস্ট্রি করায় সে-ই গাজী ভাইকে প্রস্তাব করে পার্টনার হতে। তখন রানিং ক্যাপিটালের প্রয়োজন হতো না। কানেকশনই ছিল ক্যাপিটাল, কেজিবি কানেকশন সবচেয়ে বড় ক্যাপিটাল। অবশ্য সেই ক্যাপিটাল দুজনের একজনেরও ছিল না, যদিও গাজী ভাই তার স্বভাবগত মেগালোম্যানিয়ায় সুদীপকে ধারণা দিতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তার আছে।

সেই গাজী মোশতাক ভাই ওকে হত্যা করার জন্য হন্তা পাঠিয়েছে?

বিশ্বাসপ্রবনতা বা “হ্যাঁ” বলাটা নাকি অপরিণত ব্রেইনের ধর্ম, কিন্তু বিশ্বাস না করা বা “না” বলতে

চাই পরিপক্ক ব্রেইন। সে কিরে জানবে যে, তার মন যা বলে তাতে পরিপক্কতা নেই। কিসের উপরে ভিত্তি করে সে বিশ্বাসকে অবিশ্বাসে বদলাবে? 
 
গাজী ভাই যেমন আড্ডাবাজ তেমন বন্ধুত্বপরায়ন। মুখে নানান রংয়ের কথার ফুলঝুরি। যা পারেন না, তার চেয়ে তিনশগুণ বেশি প্রতিশ্রুতি দেন। সিগারেট, চা কফির হাত উদার। লোকে তাকে খুব বিশ্বাস করে। তার গোঁফগুলো সুন্দর। হাসিটা গোঁফে গিয়ে আটকে যায়।সর্বসমক্ষে কথা বলার সময় নাকে আঙুল দিয়ে ঘুটে নাক থেকে ময়লা বের করে এনে চোখের সামনে নিয়ে দেখেন, তারপরে

অষ্টাদশীর নাচের মত আঙুলে তীব্র ঝাঁকুনি দিয়ে চেয়ারের পাশে ফেলে দেন। খাবার সময় মুখে আওয়াজ করে তৃপ্তি সহকারে খান এবং খাওয়া শেষ হলে 'ঘোরর... রৎ’ করে মোগলাই ঢেঁকুর তোলেন। জনসমক্ষে অতি আয়েশে পা চুলকাতে দ্বিধা করেন না। একজন আপাদ-মস্তক সুখী মানুষ। কোনো কিছুতে বিচলিত হন না ।
“আরে অত চিন্তা কইরো না, ব্যবস্থা একটা হইয়া যাইবো” এই তার আশার বাণী, যা সুদীপের পরিশ্রম ছাড়া একবারও বাস্তবায়িত হয়নি।
 
বহু মানুষ তার কাছে সমস্যা নিয়ে আসে, তিনি তাদের মাথার চিন্তা মহূর্তে নিজের মাথায় নিয়ে নেন, “এটা কোনো ব্যাপারই নয়” বলে আশ্বস্থ করেন, তারপরে ভুলে যান। কিন্তু লোকে তাকে পছন্দ করে, এত বড় একজন ব্যবসায়ি, যে সবসময় বন্ধুত্বপরায়ন এবং যার দরজা সবসময়, সবার জন্য খোলা।
 
সুদীপ অত জনপ্রিয় নয়, বরং কিছুটা খবিশ প্রকৃতির, কাছেই যাওয়া যায় না। সবসময় ব্যস্ত থাকার ভাব করে, সব সময় তার মিটিং। সিগারেট খায় না, সিগারেট দেয় না। প্রয়োজনের বেশি কথাও বলে না। মরা মানুষের মত, আবেগ কম। পেটের ভেতরে হাত পা, নাকেও আঙুল দেয় না, পা-ও চুলকায় না। এমন কি গলা খাকারিও নেই। এই অফিসে আছে, এই নাই।

গাজী ভাই জানেন যে, তিনি ছোট খাটো ব্যবসা করার লোক নন। তিনি সোভিয়েত হেলিকপ্টার, নয় পাওয়ার প্ল্যান্ট, নয় মিসাইল বেচবেন। এটা হল রিয়েল ব্যবসা। একটা দাও মারতে পারলেই কেল্লা ফতে।

সুদীপ সারাজীবন দৌড়াদৌড়ি করে যা করতে পারবে না তিনি একবারে তা করবেন। গাজী ভাই নিশ্চিত যে, আজ হোক কাল হোক সৌভাগ্য তাকে ধরা দেবেই। অন্যকে দেয়, তাকে দেবে না কেন?

যতক্ষণ পর্যন্ত ব্যবসাটা না হচ্ছে ততদিন কোম্পানির এবং নিজেদের পেট চালানোর জন্য তো সুদীপই যথেষ্ট! সুদীপ হলো মিডিওকার। সে তো পচামালের দোকানদারী করছেই। মাল আসছে সিংগাপুর, চীন, বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া থেকে। লাইন হয়ে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের কয়েকটা ফ্যাক্টরির সাথে। কন্টেইনার ভরে ভদকা আসে খিড়কি দিয়ে। সোনার ব্যবসা। নামাতে হয় না, গোডাউনে রাখতে হয় না, যে ট্রাক নিয়ে আসে সে ট্রাকেই অবিলম্বে চলে যায়, বস্তা ভরে লাল নোট ফেলে রেখে।
 
সিংগাপুরের টেলিফোন আর রেকর্ড প্লেয়ারগুলো হটকেক। অবশ্য টেলিফোনগুলো সোভিয়েত সিস্টেমে কাজ করে না, পাওয়ারে কানেকট করলেই জ্বলে যায়। যদিও ভূয়া সার্টিফিকেট আছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নে পরীক্ষিত ও কার্যকর। চিরকালীন রদ্দিমার্কা ডিস্ক ঘুরানো ফোনের তুলনায় এই ফোনগুলো দেখতে এত সুন্দর যে, তাদের হস্তিনী যুবতীর পাশে তন্বী ষোড়শীর মত মনে হয়। যার ফোন কেনা দরকার সে লোভ সামলাতে পারে না। কিন্তু অভিযোগ আসে প্রতিদিন। এখন কন্টেইনার এলেই সাইবেরিয়া বা অন্যত্র পাঠিয়ে দেয়া হয়। লেনিনগ্রাদের লোকাল মার্কেটে বেচে না। সাইবেরিয়ায় প্রফিট বেশি, অভিযোগেরও কান খাটো। বাংলাদেশের জুতা শ' খানেক কন্টেইনার বিক্রি হয়ে গেছে।
 
২ কন্টেইনার গরুর মাংস আনা হয়েছে হল্যান্ড থেকে, ট্রায়াল হিসেবে, তাও চলে গেছে। লাভ প্রচুর কিন্তু রিস্কি ব্যবসা। কাস্টমস ছাড়াতে দেরি হলে পচে যাবার সম্ভাবনা থেকে যায়। যদিও কাস্টমস পুরোপুরি কেনা, তবুও ওখানে রদবদল হয় প্রতিনিয়ত। কাস্টমস হলো সোনার খনি, ওখানে একই জোঁক দীর্ঘদিন থাকলে, অন্যদের ভাগে ও ভাগ্যে টান পড়ে। তবে এও ঠিক, নতুন যারা আসে তারা কাঠ বা পাথরের নয়। তাদেরও ক্ষুধা আছে। তাদেরও খাদ্যনালী ও অন্ত্রগুলো পূর্ববর্তীদের মতই সমান দৈর্ঘের। সুতরাং তাদের সাথেও যোগাযোগ হতে তেমন সময় নেয় না। আদর্শ, দেশপ্রেম ও জনগণের উপকার করার জন্যই এই ব্যবসা, এটা সবসময় তোতাপাখীর মত তাদের বলতে হয় এবং তাদেও মনোযোগ দিয়ে শুনতে

হয়। কেননা কাস্টমস সবদেশেই দেশপ্রেমের মহত্তম নিরীক্ষণ কেন্দ্র।





৩১ তম পর্ব


ইন্ডিয়ান ব্যবসায়ি রাজীব পাটেলকে সুদীপ প্রথম দেখে গাজী মোশতাকের অফিসে।চোখে পড়ার মত ওর গোঁফ। যেন গাজী ভাইয়ের গোঁফের ডুপ্লিকেট। দেখতেও সে ছোট খাটো, গাজী ভায়ের মতই। খুব যে কথা বলে তা নয়, বেশির ভাগ সময়ই চুপচাপ বসে থাকে, কিছুটা বিষণ্ণ বিপন্ন ভাব। সে গাজী ভাইয়ের কাছে এসেছে বিপদে পরে, ইন্ডিয়ান ছাত্র রামের সুপারিশ নিয়ে। 
 
রাজীবের বাপ বম্বের এক বড় শিল্পপতি। সে জানতে পায় রাশিয়ায় ট্রেডিংয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এবং অনেকেই সেখানে প্রচুর কাঁচা টাকা উপার্জন করছে। সে তার ২ ছেলেকে পর্যায় ক্রমে রাশিয়ায় পাঠায়। বড় কোনো অংক এখনও ইনভেস্ট করেনি। ছেলেরা হাত পাকানোর জন্য সামান্য প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এখানে লাভ হয় ২০০-৩০০ পারসেন্ট কিন্ত রিস্কও বিশাল।

কোন এল সি খোলার সিস্টেম তখনও নেই।

বিদেশি ব্যবসায়িরা রাশিয়ায় তাদের কোম্পানির ব্রাঞ্চ অফিস খুলে তার নামে হার্ড কারেন্সির ব্যাংক একাউন্ট খোলে। রুবলে লেনদেন করতে পারে না। তাদের কাজ করতে হয় কোন স্থানীয় রাশিয়ান কোম্পানির মাধ্যমে যারা রুবলে লেনদেন করতে পারে এবং ব্যাংকে রুবলের একাউন্ট খুলতে পারে। কিন্তু ডলারের একাউন্ট খুলতে বা ডলারে বেচা-কেনা করতে পারে না।

দেশি ও বিদেশি কোম্পনীর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। বিদেশি কোম্পানি পণ্য পাঠায় এবং রাশিয়ান কোম্পানি কাস্টমস ক্লিয়ার করে বিক্রি করে রুবলে। সেই রুবল দিয়ে স্বাক্ষরিত চুক্তি এবং বিল অব ল্যান্ডিং দেখিয়ে নিজের ব্যাংকের মাধ্যমে ‘হার্ড কারেন্সির নিলামে’ ডলার কিনে বিদেশি কোম্পানিকে টাকা পরিশোধ করে দেয়। এটাকে বলা হয় কনসাইনমেন্টে বিক্রি। প্রথমে মাল, পরে টাকা। সমস্ত বিশ্বাসের ওপরে ভিত্তি করে অসম্ভব রিস্কি ব্যবসা, বিক্রেতার কোমরে জোর থাকতে হয়। শুল্ক ও কর ফাঁকি দেয়ার জন্য ‘আন্ডার এবং ওভার ইনভয়েসিং’ সর্বজনীন প্র্যাকটিস।
 
রাজীব এক রাশিয়ান পার্টির সাথে ব্যবসা করে এ পর্যন্ত কয়েক কন্টেইনার মাল পাঠিয়েছে কনসাইনমেন্টে। টাকাও পেয়েছে ঠিক মত। কিন্তু শেষ কন্টেইনারটি ওরা আটকে দিয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার ডলারের গার্মেন্টস। টাকাও দেয় না, মালও ছাড়ে না।
 
গাজী মোশতাক ভাই রাজীবকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মালগুলো ছাড়িয়ে দেবে। কিন্তু প্রায় ১০ দিন চলে গেছে অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। এবার এসেছে সুদীপের সাথে দেখা করতে।

সে কি এ ব্যাপারে কিছু করতে পারে?
রাজীব "বিল অব লেন্ডিং"সহ অন্যান্য কাগজগুলো ওকে দেখায়। সুদীপ গোটা দুই ফোন করে।"আমি অমুক জায়গা থেকে ১ কন্টেইনার মাল কিনেছি সরাসরি কন্টেইনারের মালিকের কাছ থেকে, মালটা যে গোডাউনে রাখা হয়েছে তার মালিক গণ্ডগোল করছে, মালটা ছাড়ছে না।"
সে গোডাউনের ঠিকানাটি দেয়।

তারপরে রাজীবকে বলে, “এক্ষুনি গোডাউনে যাও, আমার লোকজন ওখানে থাকবে, সমস্যা হবে না। মাল এনে তুলবে কোথায়?”

“তোমার গোডাউনে জায়গা হবে।”

“হবে, নিয়ে আসো।”

মাল চলে আসে সুদীপের গোডাউনে।
"এবার তুমি নিজে মাল বিক্রি করো।"-সুদীপ বলে।
"আমার রুবলের কোনো একাউন্ট নেই, তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে?"
সুদীপ কাজটা করে দেয়, টাকা পৌঁছে যায় ইন্ডিয়ায়, ওরও কিছু লাভ হয়। 
 
সেই থেকে রাজীব, তার ছোট ভাই গৌতম, তার বাপ, হয়ে দাঁড়ায় আপনজনের মত। বাপের সাথে কথা হয় ফোনে বেশ কয়েকবার। একবার সে লন্ডন থেকে ফেরার পথে লেনিনগ্রাদ ঘুরে যায়। ছেলেরা একটা বাসা রাখতো সারাবছরের জন্য। ভাড়া বেশি নয়, তবে নিরাপত্তার প্রশ্ন ছিল। বিদেশিদের, বিশেষ করে ভাষা না-জানা বিদেশিদের ওপর আক্রমণ হয় প্রায়ই।

সুদীপ বারকয়েক ওদের বাসায় দাওয়াত দিয়েছে। ওর শাশুড়ির ছেলেগুলোকে পছন্দ হয়। বলে, “ওরা সব সময় এখানে থাকে না, আমাদের ৫ রুমের বাসায় দুই রুমই খালি, ওরা আমাদের এখানে থাকলেই তো পারে। অন্তত ওদের খাবার কষ্টটা থাকে না। আমি তো রান্না করি প্রতিদিনই।”
 
রাজীবের ছোটভাই গৌতমের তখন মাত্র ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে। এখনও কচি, কিন্তু ব্যবসা বোঝে ভালো। সে প্রস্তাবটি লুফে নেয়, অর্থনৈতিক সুবিধার চাইতেও নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি পারিবারিক পরিস্থিতিতে থাকাও কম নয়। সুদীপের বাসা একেবারে শহরের কেন্দ্রে হওয়ায় যেখানে লোক গম গম করে চব্বিশ ঘণ্টা। অচিরেই রাজীব দেশে গিয়ে বিয়ে করে সংসার পাতে, গৌতম রয়ে যায় এখানকার ব্যবসার তদারকিতে ।
 
প্রস্তাবটি আসে রাজীব ও গৌতমের পিতার কাছ থেকে। সে সুদীপের সাথে ব্যবসা করতে চায়। তাই সে ইন্ডিয়ায় গিয়েছিল। যেহেতু এই প্রথম যাওয়া সে ১ সপ্তাহ দিল্লি আগ্রা কাটিয়ে ২য় সপ্তাহটি রাখে বোম্বের জন্য। আলিওনা লাবণ্যকে নিয়ে ওঠে দিল্লীর সিদ্ধার্থ হোটেলে। রাজীবদের এক আত্মীয় সাথে থেকে দিল্লি ঘুরিয়ে দেখায়। সময়টা অসম্ভব গরমের। আগ্রা যাবার পথে লাবণ্যের শুরু হয় বমি ও ডায়ারিয়া। আগ্রায় হোটেলে পৌঁছে আলিওনারও একই দশা। মুহুর্মুহু বমি আর মুহূর্তে মুহূর্তে ডায়ারিয়া। সাথে প্রচণ্ড পেটে ব্যথা। রাতে ডাক্তার ডেকে স্যালাইন দিতে হয় দুজনকেই। পরেরদিন সুদীপ পেটে ব্যথা ও বমি বমি বোধ করে। তাজমহল দেখা বাদ। ট্যাক্সি করে সোজা দিল্লি এয়ারপোর্ট, তারপরে বোম্বে।

সেখানে হোটেল ক্যান্সেল করে রাজীব-গৌতমের মা বাসায় নিয়ে তোলে। মা সর্বত্রই মা।

তার শুশ্রূষায় সবাই ভালো হয়ে ওঠে ৩-৪ দিন পরে কিন্তু অসম্ভব দুর্বলতা রয়ে যায়।আরব সাগরের সৈকতে ওদের বাসা। নারিকেল বীথি ও বুনো হাওয়ার মাখামাখি। উটের পিঠে চড়ে সন্ধ্যে ও সূর্যাস্তের পথে হাঁটা লাবণ্যের ভালো লাগে। ভালো লাগে আলিওনার।

ওরা অদ্ভুত আথিতেয়তায় বোম্বে ঘুরিয়ে দেখায়।

একটি পার্কে হাতি,উট, বিড়াল ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণীর আকৃতিতে গড়ে তোলা গাছগুলো দেখে খুশিতে আপ্লুত হয়ে ওঠে মা, মেয়ে ও সুদীপ। তারপরে ১৫ লাখ ডলারের পর্যায়ক্রমে কনসাইনমেন্টে চা, গার্মেন্টস ও ঔষধ পাঠানোর একটা চুক্তি স্বাক্ষর হয়। অংকটা একেবারে ছোট নয়। সুদীপের জন্য প্রথম এই অংকের চুক্তি। তার কাজ বিক্রি করে চুক্তিমত টাকা পাঠিয়ে দেয়া। এটা মাত্র শুরু, সে যদি ঠিক মত বিক্রি করে নিয়মিত টাকা পাঠাতে পারে তবে আরও বড় বিনিয়োগ হবে। 
 
সুদীপের বাপ স্বাধীনতার আগে ছিল একজন সৎ ও সফল ব্যবসায়ি। সে সবসময় বলতো সততা ব্যবসায়ে উন্নতির চাবি। যুদ্ধের সময়ে সব হারিয়ে ওরা নিম্ন মধ্যবিত্তের কাতারে চলে আসে কিন্তু সততার প্রশ্নে পিতা ছিলেন সব সময় সচেতন। পিতার অসাধারণ মানসিক ক্ষিপ্রতা এবং বাস্তবতার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা সে পায়নি। মানসিকভাবে সরল ও বিশ্বাসপ্রবণ সে। রোমান্টিক ও স্বপ্নচারী। ব্যবসা করছে একটা দেশ ভাঙনের ক্রান্তিকালে, সুযোগের হুজুগে, ব্যবসার ব্যকরণে নয়। এখনও পর্যন্ত বিশ্বাস ভঙ করেনি বলেই অনেক ব্যবসা পেয়েছে বিভিন্ন উৎস থেকে। দুর্ঘটনা পরবর্তি দুর্বিসহ রাতটি আলিওনার কেটেছে পেত্রোগ্রাদস্কায়ার কুলাকভ ফ্যাক্টরির কম্যুনাল কোয়ার্টারগুলোর একটিতে। সেখানে ওর বড় বোনের পরিবার থাকে ২ রুম নিয়ে।

দু:স্বপ্নের মত রাত।

ঘুম থেকে জেগেই চলে এসেছে হাসপাতালে। ভয়, নিরাপত্তাহীনতা, সুদীপের জীবন সংশয় ইত্যাদি নিয়ে সে ভীষণ দুশ্চিন্তায় দিশাহারা। সে জানেওনা যে সুদীপকে ক’দিন আগে সাবধান করা হয়েছিল তার ওপরে আঘাত আসবে বলে। সুদীপ নিজে বিশ্বাস করেনি, তাই চায়নি ওর মানসিক শান্তির ব্যাঘাত হোক। সময়ও পায়নি। সুদীপের বিছানার পাশে বসে আছে হাত ধরে। ওর মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা। কেমন অপরিচিত মনে হয়। লাবণ্যের কথা জিজ্ঞেস করেছে, করেছে মা ও সৌম্যের কথাও। জিজ্ঞেস করেছে আলিওনা কেমন আছে, রাতে ঘুম হয়েছে কিনা?

ওর মুখটা শুকিয়ে গেছে, চোখগুলো কোটরে। মুখে ও গালে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।

প্রতিদিন শেভ করে যে, আজ তা করতে পারেনি বলে কেমন দেখাচ্ছে।
 
অপলক তাকিয়ে আছে সে আলিওনার মুখের দিকে।কি সুন্দর যত্নে ভরা মুখটি। কচি লাউয়ের নরম খোসায় যে মসৃনতা থাকে তেমনই ওর ত্বকে। ওর মুখে সব সময় একটা আলো থাকে যার বর্ণনা সুদীপ জানে না, কী এক সম্মোহনী ত্বিষা।

এখন কিছুটা ক্লান্তির ছায়া থাকলেও আলোটি দূর হয়ে যায়নি। ওই আলো সুদীপকে উজ্জীবিত করে। অন্ধকারে বিদ্যুত ঝলকের মত আলো দেখায়।

সুদীপ এক রোদ ঝরঝরে দুপুরে মস্কোর অদূরবর্তী "রেড মে” গ্রামের উষ্ণ কাকজলের এক হ্রদে সাঁতার কেটেছিল ওর সাথে। আলিওনার বয়েস তখন মাত্র ১৯ বছর, সুইমিং স্যূট গলিয়ে উপচে পড়া বুকের যৌবনে সে ছিল অন্ধ। ত্বকে ছিল রাজহংসীর শুভ্রতা ও দীপ্রতা, আর চোখে হাল্কা নীল আকাশের প্রতিবিম্ব।
অগভীর জল বুক ও গলা পর্যন্ত। সুদীপ শুশুকের মত সাঁতরেছিল, আর আলিওনা দুহাতের মালা জড়িয়ে লেপ্টে ছিল তার পিঠে। আকাশ চেয়ে চেয়ে হেসেছিল, বাতাস দিয়েছিল শিস্, চিক চিক করছিল রাশিয়ার গ্রীষ্মের দুপুর। ছিল সোনালী ভালোবাসার যৌবন।
 
ওর মনে হয়েছিল, আর কিছু কি চাই এই জীবনের মেঠো পথে পথ হারাতে? স্বর্গের যেইসব বর্ণনা দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে রাখে, সেই সব পরীরা কি এ রকম? ওমর খৈয়ামের যে সাকী সুরা পরিবেশন করে এই কি সেই, যে খোরাসানের পথ ফেলে এসেছে পুশকিন-ইয়েসিনিনের রাশিয়ায় দুপুর কাটাতে?

এই দেশে এসে যৌবনের প্রথম নিঃসঙ্গতায় পুইয়ের ডগার মত সতেজ ও প্রিয় মনে হয়েছিল ওর লাবণ্যকে। লাবণ্যও ছিল অসম্ভব তরুন। তার চলায়, হাসায়, কথাবলায় কি একটা বন্যতা ছিল।

বাল্য ও কৈশোরের বেশকিছু সময় গ্রামে কেটেছে বলেই হয়তো ছিল সেই সহজিয়া অপরিশীলতা। গতিতে ধীর-স্থিরতার বদলে ছিল হঠাৎ চমকে দেয়ার আকস্মিকতা। হঠাৎ করে বসার থেকে এমন ভাবে উঠে দাঁড়াতো যে ওর বুকের দুলুনিতে সাড়া ঘর দুলে উঠতো মাতালের মত। আর সেই দুলুনি গিয়ে লাগতো সুদীপের বুকে। বুক দুলতোনা বরং কে যেন খপ্ করে গলা চেপে ধরতো এবং ওর শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতো। তখন আর কিচ্ছু নয়, সমস্ত পৃথিবীকেই মনে হতো লাবণ্যের দোদুল্যমান বিস্ফোটিত বিহ্বলতার বুক।

সেই বন্যতাকে প্রকাশ করতে সুদীপ ওর নামের একটা সন্ধি-বিচ্ছেদ তৈরি করেছিল: La বন্য।

“দি ওয়াইল্ড!” সে যখন ফ্রেঞ্চ, ইংরেজি এবং বাংলা মিলিয়ে লাবণ্যকে এই সন্ধি- বিচ্ছেদের ব্যাখ্যা দিয়েছিল, সমস্ত সংসারে রিন রিন করে বেজে উঠেছিল এক দির্ঘায়িত হাসির হি হি হি ….
 
সুদীপ বুক ভরে কষ্ট বহন করেছে হোস্টেলের হেমলকপূর্ণ জীবনে। বাংলার ক্ষরস্রোতা নদীর ঘোলা জলে ঘোলা হয়ে ভেসে যাওয়া দিন-রাত্রিগুলির মত হৃদ-বর্ষার ক্রন্দনে মিশেছিল অশ্রুর ধারা।




৩২ তম পর্ব


আকাশের খোলা বুকে দেখা সেই মুখ, সেই সৌম্য ও শীতল, অনেকদিন সুদীপ দেখেনি।

ওর কি দেখতে ইচ্ছে হয়?

নিজেও জানে না।

আর দেখা হলেই ওরা কী নিয়ে কথা বলবে?

আবহাওয়া নিয়ে?

“এই উতাল করা বাতাস জানিস, আমাদের পদ্মার চরে, পাগলের মত..”

“বরিশালের বাতাস বুঝি উতাল করে না?”

অথবা গাছ গাছালি ফুল বা লতাপাতার কথা?

“এই দেখ লিপা গাছের ঘন সবুজ পাতাগুলো দেখতে একেবার মানুষের হৃৎপিণ্ডের মত।”

লিপা হলো Tilia বা Linden tree.

“তোর চোখে সব জায়গায় খালি হৃদয় আর হৃদয়, এত আবেগ দিয়ে কি জীবন চলে?”

“গোছা গোছা ফুলগুলো, কি অদ্ভুত সুন্দর! লিপা ফুল নয়, যেন নাক ফুল।”

“জানিস সাদা কাণ্ডের ওই যে একনলা গাছটা, বার্চ ট্রি, তার সাথে তুলনা করে সের্গেই ইয়েসিনিন তার তন্বী প্রেয়সীকে বলেছিলেন, তি মাইয়া খাদিয়াচায়া বেরিওজা-তুমি আমার ওয়াকিং বার্চ ট্রি, কী অদ্ভুত উপমা, তাই না?”

না, এসব কথা এখন ছেলেমানুষীর মত শোনাবে।কত বছর পার হয়ে গেছে।

এখন সময় অন্য। নেভায় এখন আর সেই জল নেই। ওখানে এখন অন্য স্রোত।

লাবণ্যেরও নিশ্চয়ই এতদিনে অন্য আলো চিক চিক করে চোখে।
 
সুদীপ পরবাসী। কিন্তু ওর তা হবার কথা ছিল না। ঢাকা মেডিকেল কলেজ শেষ করে সে বাংলাদেশেই অনেক ভালো করতে পারতো। তার প্রয়োজন ছিলো না দেশ ছেড়ে চলে যাবার। মোটেও ছিলো না। বিদেশে থাকার জন্য বুকটাকে অন্য কিছু দিয়ে মুড়িয়ে নিতে হয়। ধানক্ষেতে যে বাতাস কেঁদে কেঁদে যায়, যে পাট ধঞ্চের দুমরানো মুচরানো বুকে শব্দহীন নিষ্ঠুরতার নখর আঁচড়ে দেয় শূন্যতাবোধ, সে সেই শুন্যতা বুকে নেয়া ফসিলের মত বাঁচে।

কোনো এক রাতের ভয়াল দুস্বপ্নের বিভ্রান্তিতে ছুটতে ছুটতে সে চলে এসেছিল লাবণ্যের পায়ের কাছে ধুপ করে পড়ে যাবার জন্য। তাও লেনিনগ্রাদের শীতল শহরে। যেমন পড়ে গিয়েছিল দীর্ঘ ম্যারাথন শেষে কোনো এক সৈনিক, সেই প্রাচীন গ্রীসে। অথচ সে এখন আলিওনার বোবা ভালোবাসার শিকলে আবদ্ধ, সোনার, তারপরেও -শিকল। পদ্মার হাওয়া আর হৃদয় দুলিয়ে যাওয়া লিপা ফুল এখন একই গোরস্থানে। লাবণ্য তাকে এতটা কষ্ট না দিলেও পারতো!

যখন তার মনে হয়েছিল বেঁচে থাকার অর্থ হয় না, আলিওনা, হ্যাঁ, আলিওনাই স্নিগ্ধ হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। “বাংলার স্নেহ-শ্যামলিমা দিতে পারবো না, কিন্তু শীতের দেশে তোমাকে উষ্ণ রাখতে পারবো। তোমার হৃদয় কোনোদিন অনুভব করবে না শীত, তুমি ঘুমাও এই আমার বুকের ওম নিয়ে।”

সে বলেনি, কিন্তু বুঝিয়েছে সর্বান্তকরণ দিয়ে। 
 
দুর্ঘটনার পরে সৌম্যের কী অবস্থা আলিওনা জানে না, ঘটনার আকস্মিকতা ও ব্যস্ততায় ওর খবর নিতে পারেনি। এম্বুলেন্সে সুদীপের সাথে চলে যাওয়ার সময় সৌম্য মিলিশিয়ার সাথে কথা বলছিল। পরে তাকে মিলিশিয়া সাথে করে নিয়ে যায় জিজ্ঞাসাবাদ করার জন্য। যখন আক্রমণ হয় সে দুর্বিত্তদের একজনের সাথে মুষ্ঠিযুদ্ধ চালিয়েছে কিছুক্ষণ। প্রফেশনালের সাথে আনাড়ির অসম লড়াই। ওর ডান গালে একটি ঘুষি লেগে ছিদ্র হয়ে গেছে এবং দুটো দাঁত ভেঙে গেছে।

ওর হাতে ছিল সুদীপের ব্রিফকেস।

সে ব্রিফকেসটি রক্ষা করতে পারেনি।

ব্রিফকেসে হাজার পাঁচেক ডলার, কোম্পানি সিল, ও আরও কিছু কাগজপত্র ছিল।

মিলিশিয়া অফিসে শিফটের চিফ জিজ্ঞাসাবাদ করে। ও কিছুটা নার্ভাস, ক্লান্ত, চিন্তিত এবং শীতার্ত ছিল।

“উস্তাল? ইসপুগালছা?” ( ক্লান্ত? ভয় পেয়ে গেছ?)

চিফ ড্রয়ার থেকে ভদকার বোতল বের করে পূর্ণ একগ্লাস ভদকা অফার করে।

“না, পেই ! উসপাকৈসছা!” ( নাও, পান করো। কিছুটা শান্ত বোধ করবে।)

ভদকার ছোট গ্লাস নয়, সোভিয়েত কেন্টিনগুলোর রেগুলার জল খাবার গ্লাস। সৌম্যের মাথায় চট করে ধারণা হয়, সে ভদকা পান করে মাতাল হয়ে গেলে হয়তো পুরো ঘটনাকে মাতালে মাতালে মারামারি দেখিয়ে ফাইল ক্লোজ করে দিতে পারে।

সে বলে, “স্পাসিবা, নিয়ে মাগু, পেচেন বালনায়া, পিত নিলজা।” ( ধন্যবাদ, লিভারের সমস্যা, ড্রিংক করা নিষেধ।)

টেলিফোন বুথ থেকে সে ওর বান্ধবিকে জানিয়েছিল ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা। বান্ধবির বাপ ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রফেসর এবং ডিপার্টমেন্টের চেয়ার।তার কিছু যোগাযোগ ও ক্ষমতা রয়েছে। সে মিলিশিয়ার ওখানে কল করে, বলে ওকে যত শীঘ্র ছেড়ে দিতে।

ও ট্যাক্সি নিয়ে চলে যায় তাদের বাসায়। ওরাই রাতে গালের ক্ষতটাকে পরিস্কার করে, পরেরদিন নিয়ে যায় পলিক্লিনিকে পরিচিত ডাক্তারের কাছে। বেশ কয়েকটি সেলাই লাগে ।

এন্টিবায়োটিক দেয়া হয়।
 
সে সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে বহুল প্রচলিত মাফিয়া অপারেশনগুলো ছিল এরকম। মাফিয়ারা প্রথমে লাভবান কোম্পানিগুলোর সাথে কিছু ব্যবসায়িক লেন দেন করে। সেখানে নেতৃত্বস্থানীয় ২-১ জন লোক খুঁজে বের করে টোপ দেয় যে কোম্পানির মূল ব্যক্তিকে সরিয়ে দিতে পারলে কোম্পানি তাদের হাতে চলে আসবে। জগত শেঠ, ঘষেটি বেগম, রায়বল্লভ, মিরজাফর, মোশতাকেরা সর্বত্রই বিদ্যমান, তাদের খুঁজতে ডায়াজিনিসের হ্যারিকেন লাগে না। এদের সাহায়্য নিয়ে তারা তলে তলে কোম্পানির মালিকানার কাগজপত্র অবৈধভাবে পরিবর্তন করে নেয় পরিচিত নোটারি পাবলিক ব্যবহার করে। অনেক সময় মিলিশিয়া, কোর্ট ও বিচারকদের কিনে ফেলে অর্থ-কড়ি বা ভয় দেখিয়ে। এইসব ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ি কী কী করতে পারে তার ব্যবসা ফিরে পাবার জন্য, সবকিছু তারা বিবেচনায় রেখে প্রস্তুতি নেয়। এইরকম কোনো ব্যবসায়ি খুব বেশি সমস্যা তৈরি করলে দৈহিকভাবে নির্মূল করে দেয়।
 
গাজী মোশতাকই একদিন কস্তিয়াকে নিয়ে এসে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল যে, সে বড় ব্যবসায়ি এবং তার বহু বড় বড় কানেকশন রয়েছে। সে এসেছে সুদীপর সাথে পরিচিত হতে। হয়তো ভবিষ্যতে একসাথে কোনো ব্যবসা করা যাবে। কস্তিয়া ঘন ঘন অফিসে আসতো। কালো দামী লেদার জ্যাকেট পরা লম্বা, চৌড়া পেটানো দেহ, ভারী, ত্রিকোণ চোয়াল, চোখগুলো সর্বদর্শী তীক্ষ্ণ, কথা কম বলে। আস্তে আস্তে ওর ঘনিষ্ট চারজনের একটা গ্রুপ আসা যাওয়া শুরু করে। ওরাও লেদার জ্যাকেট পরে, খুব ছোট করে কাটা চুল, অফিস ঘুরে ঘুরে দেখে। লোকজনের সাথে কথা বলে। প্রত্যেকেরই নতুন ঝকঝকে চকচকে বিদেশি গাড়ি। কস্তিয়ার অডি, ভোভার পাজেরো আর সের্গেই ও ইউরার ভলভো। বিদেশি গাড়িকে রুশীরা বলে “ইনা মার্কা”।

রাশিয়ার গাড়িগুলো ছোট “ঝিগুলি”, “জাপারোঝেৎস”, “মাস্কভিচ”- সাধারণ মানুষের মধ্যে অর্থে বিত্তে অসাধারণ যারা, তারা চলে এই গাড়িতে। ঝকঝক তক তক করে না, বেশিরভাগই পুরানো, টেপ খাওয়া, জং ধরা, কাদামাখা। কিন্তু চাকা যেহেতু ঘোরে এবং পরিবহন করে, যার এটুকু আছে, সে অন্যদের চেয়ে নিজেকে ভাগ্যবান মনে করতেই পারে।

“ভোলগা” গাড়িটি একটু বড়, পার্টির ছোট বা মাঝারি স্তরের নেতারা চলে তাতে। সাধারণের গাড়ি “ভোলগা” নয়। “চাইকা” - রাশিয়ান লিমুজিন, বেশ বড়, সুন্দর। পলিটব্যুরোর মেম্বার, পার্টি সেক্রেটারি, মন্ত্রী ইত্যাদি শ্রেণিহীন সমাজের উচু স্তরের প্রলেতারিয়েত-নেতা যারা, তাদের জন্য এই গাড়ি।

দেশের সবচেয়ে প্রেস্টিজিয়াস বাহন।

নিতম্ব উচানো ভলভো, পাজেরো, অডি, বিএমভি (বিএমডব্লিউর রুশ উচ্চারণ), মার্সিডিস ইত্যাদি বিদেশি গাড়ির মালিকদের বলা হয় “নভি রুস্কি” বা “নব্য রাশিয়ান”। এদের ৯৯.৯৯৯ % ই গলা কাটা কমরেড। এদের পিতারা বা শ্বশুরেরা একদিন শ্রেণিহীন সমাজের মুলা দেখিয়ে কয়েক লক্ষ বা কয়েককোটি মানুষ হত্যা করেছে, বুক কাঁপেনি। এদেরও বুক পাথর দিয়ে তৈরিী। প্রায় সবাই ছিল হয় কমসোমল, নয় পার্টির নেতা-নেত্রী, নয় তাদের বেয়াই বেয়াইন।

এদের শিষ্যরা হয় রাস্তায় জুলুমবাজি করে, নয় এরা কোনো সরকারি কোম্পানির অন্তঃস্থল খেয়ে অঢেল টাকার মালিক হয়েছে।এতে কোনো রাখঢাক নেই। গরিলার মত বুক চাপড়ে বলে, দেখ আমাদের, আমরা নতুন মানুষ, বিগত ৭০ বছরের ইনকুবেটরে আমাদের তৈরি করা হয়েছে।

মানুষ তাদের ভয় করে, সমীহ ও শ্রদ্ধা করে মানে মানে পথ ছেড়ে দেয়। 
 
এক গ্রুপের সাথে সুদীপর প্রথম অভিজ্ঞতাটা ছিল খুবই ভীতিকর। সে সবে তার রাশিয়ান “ঝিগুলি” গাড়িটা কিনেছে। তখনও সোভিয়েত ইউনিয়নে গাড়ির ইনস্যুরেন্স সিস্টেম চালু হয়নি। নিজের গাড়ি নিজেরই দায়িত্ব। কেউ গুতা মেরে গাড়ি ভেঙে দিলে, দোষী পক্ষের থেকে টাকা আদায় করার মত বল থাকলে আদায় করে নিতো, নইলে নিজেরটা নিজেরই ঠিক করে নিতে হতো। গায়ে খুব রাগ থাকলে বড় জোর অন্য কাউকে গুতা মেরে ঝাল মিটানো যেত। তবে গাড়ি ছিল খুব কম লোকের। শ য়ে একজনের, বা একটু বেশি বা একটু কম, মোল্লা দোপিয়াজার কাকের হিসাবের মত।

ইনা-মার্কাঅলারা নিয়ে আসে নতুন বিজনেস।

মাস্কোভস্কি প্রসপেক্ট দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিল সুদীপ। এক ট্রাফিক লাইটে থেমেছে। সামনে একটি সুন্দর “ইনা মার্কা”। গাড়িতে চারজন যুবক, চক চকে শেভ করা মাথা, কালো প্লাশ্ বা হাল্কা লম্বা শরতের কোট পরিহিত। সুন্দর রৌদ্রময় সেপ্টেম্বরের দিন, লেনিনগ্রাদের জন্য খুবই বিরল ঘটনা। হঠাৎ সামনের “ইনা মার্কাটি” ব্যাক গিয়ার দিয়ে ওর গাড়ির নাক মুখ স্পর্শ করে, সুদীপ একটু ঝাঁকুনি খায়। 
 
কারো গাড়ির কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে হয় না, কিন্তু ওই গাড়ি থেকে বাইরে ঝাঁপিয়ে পড়লো চার জন। সুদীপকে অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করতে করতে নাকে মুখে কয়েকটা ঘুষি লাগিয়ে দেয়। নাক দিয়ে দরদর করে রক্ত পড়ে। দিনে দুপুরে সবার সামনে তারা দাবী করে যে ‘নিগার’ সুদীপ গাড়ি চালাতে জানে না, সেই পিছন থেকে হিট করে ওদের দামী গাড়ি নষ্ট করেছে। একজন বলে, তিনজন তার সমর্থনে সাক্ষী দেয়।

ওদের কোটের নীচে অস্ত্র রাখ-ঢাকহীন। তারা সুদীপের থেকে তিন হাজার ডলার দাবী করে গাড়ি ঠিক করার জন্য। তা নইলে ওকে ধরে নিয়ে বেঁধে রাখবে এবং ওর গাড়ি বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে গাড়ি ঠিক করবে।

সুদীপ সাথে সাথে ওর “ক্রিশাকে” ফোন করে। বলা হয় ফোনটি ওদের একজনের হাতে দিতে। সুদীপ দেয়। কথা হয় কয়েক মিনিট। তারপরে ফোনটি ফেরত দিয়ে ওরা গাড়িতে বসে চলে যায় সুবোধ বালকের মত। সুদীপ রক্ষা পেয়েছিল ক্রিশার কারণে, ক্রিশা না থাকলে তাকে ক্রাশ করা হতো। "ক্রিশা" হল

ঘরের রুফ বা চাল। শহরের একেক এলাকায় এক একটি মাফিয়া গ্রুপ ক্রিশা’র কাজ করে। সুদীপ যখন প্রথম ব্যবসা শুরু করে, গাজী মোশতাক তখনও পার্টনার হয়নি, তার অফিস ছিলো ছোট, একজন সেক্রেটারি আর একজন কর্মচারী। ‘রিকেটিয়ার’ নামে আমদানীকৃত একটা শব্দ সে শুনেছে কিন্তু খুব একটা ধারণা ছিলো এদের সম্পর্কে। কম্পিউটার, প্রিন্টার, ফ্যাক্স, কপিয়ার, ক্যালকুলেটর ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক্স বিক্রি করতো।ওর কোম্পানির খোঁজ পাওয়া মাত্রই সোনার ছেলেদের একটি দল ইনামার্কায় করে চলে আসে। খুব দরদী ভদ্র ভাষায় বলে, “ব্যবসা খুলেছ? খুব ভালো, কিন্তু তোমাদের প্রটেকশান দরকার। নইলে যে কোনো মুহূর্তে ‘রিকেটিয়ার’রা হামলা হতে পারে এবং কাজ কর্ম বন্ধ করে দিতে পারে।”

প্রটেকশনের খরচের অংকটা শুনে সুদীপ বলে, “আমার ছোট ব্যবসা, এত টাকা দেব কোত্থেকে? আমার আপাতত ক্রিশার দরকার নেই।”

“যা ভালো বোঝ করো, তোমাকে বাস্তবতাটা জানিয়ে গেলাম।”

ওরা যেমন ঝড়ের মত এসেছিল, তেমনিই চলে যায় ভদ্র একটা দমকা হাওয়ার মত।

কিন্তু চারদিনও পার হয় না।

অপ্রত্যাশিত টর্নেডোর গতিতে দশ-বারো জনের একটা দল তার অফিসটি দখল করে নিয়ে, সুদীপের সেক্রেটারিকে একজন চড় মারে, অন্যজন সুদীপকে মেরে হাড়-মাংস পৃথক করে ক্যাশের টাকা কেড়ে নেয়, অন্যেরা জিনিসপত্র, দরজা-জানালা ভাঙচুর করে। কিছু ইলেকট্রনিক্স লুট করে নিয়ে যায়।

“চিচেন মাফিয়া, নাম শুনছস?” যাবার সময় বলে যায়।

নাম শুনে কাজ নেই, সুদীপের মাথা ঘোরে।

খবর পেয়ে ( কিভাবে আল্লা মালুম!) আগের সেই সোনার ছেলেরা ছুটে আসে। আগের চেয়ে আরও একধাপ বেশি ভদ্র।

“শুনলাম, তোমাকে মারধোর করেছে?” সমবেদনা জানায়, আফসোস ও আহা উহু করে।

“ওদের কোনো দয়া মায়া নাই। বলেছিলাম না ক্রিশা ছাড়া ব্যবসা করা অসম্ভব। এই যে দেখো আমাদের রাখলে তোমার এমন বিপদ হতো না।”

এখন তারা আগের চেয়ে বেশি টাকা চায়, “বুঝতেই পারছো, তুমি চিচেন মাফিয়ার চোখে পড়ে গেছো, ওরা তোমাকে আস্ত গিলে খাবে, ওদের ট্যাকেল করতে এখন আমাদের টাকা খরচ করতে হবে।”
 
সুদীপ বুঝতে পারে, তার পথ দুটি, হয় ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে না খেয়ে মরা, নয় প্রতিমাসে এদের চাঁদা দিয়ে বেঁচে থাকার লড়াই করা। এরা এবং ওরা একই দল কিনা, তা নিয়ে সে ভাবতেও চায় না। কিন্তু এবার আর শুধু টাকা দিয়েই রেহাই হয় না। ওর ব্যবসার নামে একটা ‘সতোভই’ বা মোবাইল ফোন নিতে বাধ্য করে। ফোনের বিল দিতে হয় তার, কিন্তু ব্যবহার করে ওরা। ডাকাতি, রাহাজানি, কিডন্যাপিং, খুন ইত্যাদির তদারকি হয় এই ফোন দিয়ে। কপাল মন্দ হলে এই ফোনের জন্যই অনেককে সারা জীবনের জন্য জেলে যেতে হয়। সুদীপের ভাগ্য ভালো। ওর নামে নেয়া ফোনের মাধ্যমে সম্পন্ন অপরাধের কোনো বিপদ এখনও ঘাড়ে এসে পৌঁছায়নি।

বনে থাকে বলেই কোনো প্রাণি ভাবতে পারে না যে, সে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারে। মাফিয়াদেরও নিজস্ব সংস্কৃতি ও নিয়ম কানুন আছে। যেই দল প্রথম কোনো ব্যবসাকে খুঁজে পায়, সে-ই সেই ব্যবসার "ক্রিশা" হবার অধিকার রাখে। এক এলাকার মাফিয়া অন্য এলাকার মাফিয়ার সাথে ভাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ থাকে। একে অন্যকে জানিয়ে দেয় কোন সংগঠন কার পাহারায় এবং কার পায়ের বুড়ো আঙ্গুল কোথায় বিস্তৃত। কারো পায়ে পা দেয়াটা ভদ্রতার বরখেলাপ।

আবার এদের মধ্যে নিয়মিত যুদ্ধও চলে। বেশি শক্তিশালি গ্রুপ তুলনামূলকভাবে কম শক্তিশালি গ্রুপের থেকে দাদনদাতা ব্যবসাগুলোকে কেড়ে নেয়। এই যুদ্ধ রক্ত ও প্রাণ দাবি করে। তাই নিয়মিতই এদের নেতা বদলায়।

 
৩৩ তম পর্ব


বিপ্লবের কবি মায়াকোভস্কি একটি কবিতায় গদগদভাবে বলেছিলেন, “আমার মিলিশিয়া, আমাকে রক্ষা করে….”

করে, কিন্তু তিনি জানতেন না যে, সবসময় নয়।

চিচেন মাফিয়ার অত্যাচারে সুদীপের ছোটব্যবসা হাঁসফাঁস করছিলো। এ সময়ে ওদের এলাকার মিলিশিয়া প্রধান হাসিখুশী, আলেক্সেই ফিওদরোভিচের সাথে পরিচয় হয় প্রিয় নিকোলাই সের্গেইভিচের মাধ্যমে।

“মাফিয়ার সাথে কাজ করিস না সুদীপ, বিপদে পড়বি, ইনি তোকে প্রোটেকশন দেবেন।”

“কিভাবে? মিলিশিয়া তো মাফিয়ার সামনে ক্ষমতাহীন।”

“ক্ষমতাহীন ঠিকই, কিন্তু ইনি যাকে নিজের আশ্রয়ে নেন, তার কাছে মাফিয়া ভেড়ে না। আমি তোর হয়ে তাকে অনুরোধ করেছি।”

তার অফিসে প্রথম মিটিংয়ে চা বিস্কুট দিয়ে আপ্যায়ন করার সময় আলেক্সেই ফিওদরোভিচ

বলে দিয়েছিলেন, “কোনো মাফিয়ার কেউ তোমার কাছে এলে, আমার নাম বলো বা এই কার্ডটি দেখিও।”

“কিন্তু চিচেন মাফিয়া? টাকা না দিলে তো ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।”

“আমি ওটা দেখবো, ওদের আর টাকা দিতে হবে না। আর ওই যে মোবাইল ফোন, ওটা বন্ধ করে দিও আজই, ওটা খুবই রিস্কি জিনিস। ওই ফোনের মাধ্যমে দেয়া কোনো “জাকাজনায়ে উবিস্তবা” বা

ভাড়াটে হত্যাকাণ্ডের মামলায় পড়লে কিন্তু তোমাকে বাঁচানো যাবে না। 
 
এরপর থেকে প্রতি মাসে সে ৩ হাজার ডলারের একটি এনভেলপ দিয়ে আসে তার হাতে। অবশ্য তাকে আর কোনো মোবাইল ফোনের জন্য পে করতে হতো না। বয়েস ষাটের কাছাকাছি। হাসির চুটকি বলতে পছন্দ করেন। সন্ধ্যার পরে অফিস বন্ধ হয়ে গেলে মাঝে মধ্যে তার অফিসে ভদকা, কালবাছা ও শসার পিকল নিয়ে আড্ডা হয়।

“সুদীপ তোমার সেক্রেটারিটা, কী যেন নাম, এলা তাই না? দেখতে তো খুব সুন্দর, দেয় টেয় নাকি?”

একবার সে গিয়েছিল অফিসে, একবার মাত্র চা খেয়েছে এলার হাতে, কিন্তু ঠিকই মনে রেখেছে।

“সে খবর তো তোমাকে দেয়া যাবে না আলেক্সেই ফিওদরোভিচ, ওটা সিক্রেট।”—বেকায়দায় হাসে সুদীপ, কিন্তু কিছুটা অস্বস্থি বোধ করে নিজের মধ্যে।

“হ্যাঁ, বুঝি, বুঝি, আমাদের বাদ দিয়ে তলে তলে পানি খাও।তোমার চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।

আমাদের প্রাচীন রুশ প্রজ্ঞার কথা জানো তো? 
 
গিদিয়ে ঝিবিওস তাম নি ইবি

গিদিয়ে ইবিওস তাম নি ঝিবি*
 
আড্ডায় নিয়ে এসো একবার।”

বলে সে ভদকার গ্লাস উঁচিয়ে, সুদীপের সুন্দরি সেক্রেটারির উদ্দেশ্যে পান করে।
 
এলা সুন্দর সন্দেহ নেই, তার মুখ না বুক কোনটা বেশি টানে বলা মুশকিল। খুব ভদ্র ও বিশ্বস্থ, প্রায় ৩ বছরের ওপরে ওর অফিসে আছে। কাজে জয়েন করার কয়েকদিনের মধ্যেই মাফিয়ার হাতে চড় খেয়েছিল ,তারপরেও কাজ ছেড়ে যায়নি। কাজের অভাব চারিদিকে। যথেষ্টই গরীব। বাপ নেই, মা অসুস্থ। তার আয়েই সংসার চলে। কিছুদিন আগে প্রচণ্ড এক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গিয়েছে। দাদা ছিল, নিঃস্ব ও দুর্বল। এলা’ই তার দেখভাল করতো, খাদ্য কিনে দিয়ে আসতো সপ্তাহে দু’তিনবার।

দাদার একটা এপার্টমেন্ট ছিল, এলারই পাবার কথা, ওর কাছে চাবিও ছিল। কিছুদিন আগে তাকে শহরের বাইরে মৃত পাওয়া গেছে। এলা যখন মাকে নিয়ে দাদুর বাসায় যায়,দেখে তালা বদলানো, চাবি কাজ করে না। কলিং বেল টেপে।

সম্পূর্ণ অপরিচিত এক লোক দম্পতি দরজা খোলে।

কী চাই?

ওদের মুখে ভাষা নেই।

জানা গেল, কোনো এক রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছ থেকে এই বাসা কিনে এই দম্পতি সদ্যই মুভ করেছে। এলা’র দাদা কে তারা চেনে না, কোনদিন দেখেও নি।

“উপ্রাভদোম” বা হাউজিং অথরিটির কাছে গিয়ে সব পরিস্কার হল, দাদা মৃত্যুর আগের দিন বাসাটি বিক্রয় করেছে রিয়েল এস্টেট কোম্পানির কাছে এবং বর্তমান মালিক যারা, তারা সেদিনই বাড়িটি কিনেছে।

সব কাগজপত্র ঠিক, নোটারি করা, সিল-ছাপ্পড় মারা, কোনো ক্রাইমের চিহ্ন নেই।

এলা কোনোমতেই বিশ্বাস করতে পারে না যে, দাদু এ কাজটি করেছে। সন্দেহ পরিস্কার হয়ে যায় সেদিন রাতেই। ওক বৃক্ষের মত বিশাল কিছু যুবক আসে ওদের বাসায়।

ন্যাড়া মাথা, চামড়ার জ্যাকেট। সমাজের অতি পরিচিত মুখ এরা।

টু শব্দ করলে, দাদুর কাছে পাঠিয়ে দেয়া হবে- খুব বিশ্বাসযোগভাবে সংবাদটি দিয়ে চলে যায় ওরা।
 
সারা দেশব্যাপী রমরমা এই ব্যবসা। নিঃসঙ্গ, দুর্বল, অসুস্থ বা মদখোর বৃদ্ধ বৃদ্ধাদের খুঁজে বের করে অপরাধী চক্র। তাদের সাথে ভাব করে, মাঝে মাঝে কিছু খাদ্য বা ওষুধ বা মদ কিনে দিয়ে বা কিছুটা সেবা-শুশ্রূষা করে বিশ্বাস অর্জন করে। তারপরে সঠিক মুহূর্তে পোষা নোটারি নিয়ে এদের বাসায় উপস্থিত হয়। কখনও অস্ত্রের মুখে, কখনও মদ খাইয়ে টাল করিয়ে বাধ্য করে বাসস্থান লিখে দিতে। এরপরে এই বৃদ্ধেরা হয় হারিয়ে যায় চিরদিনের জন্য, নয় তাদের মৃত পাওয়া যায়। জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে দেশ রক্ষা করেছিল যারা, সেই দেশ তাদের রক্ষা করতে সক্ষম হয় নাই।
 
সুদীপ এলাকে নিয়ে গিয়েছিল আলেক্সেই ফিওদরোভিচের কাছে। ওরা আড্ডা ও গালগল্প করেছে, ড্রিংক করেছে। এলা ড্রিংক করে নাই, খুবই প্রফেশনাল ও কম্র ব্যবহার করেছে।

প্রতিমাসের চেকটা এখন এলা’ই নিয়ে যায় অফিসের শেষে। আলেক্সেই ফিওদরোভিচ এলার যত্ন করে, ভদকা যেহেতু মেয়েদের ড্রিংক নয়, ওর জন্য ভালো শ্যাম্পেন রাখে। এলা নাম মাত্রই ড্রিংক করে। কিন্তু এই পরিচয়ের মাধ্যমে ওর খুব উপকার হয়। প্রতিমাসে ১০০ ডলারের দুটো নোট সে উপহার পায়। অবশ্য সুদীপ তা জানে না।

অফিসের কোনো এক নির্জন দিনে সে সুদীপকে বলে, “স্পাসিবা!” (ধন্যবাদ)

“জা স্তো?” (কী জন্য)

“জা আলেক্সেইয়া ফিওদরোভিচা (আলেক্সেই ফিওদরোভিচের জন্য)”, “আলেক্সেই ফিওদরোভিচ খুব ভালো মানুষ।” তারপরে যেন নিজেকেই শুনিয়ে বলে, “তুমি নিজের জন্য কিছুই চাও না, কিন্তু অন্যকে পাইয়ে দাও। অথচ একবার চেয়ে দেখলেই পারতে।”

কথাটা সুদীপের শ্রুতি এড়ায় না, কিন্তু ফোন বেজে ওঠে এবং এলা রিসিভার তোলে।

এলা তার প্রতি নিরাসক্ত নয়, এটা তার চোখ এড়ায়নি।

চাইলে হয়তো সে বাধা দেবে না কিন্তু আলিওনার প্রতি অনুভূতিটা তখনও মাদকতা হারায়নি।

অবিশ্বস্থ হবার মানসিকতা তখনও তৈরি হয়নি। সময়টা ছিল ভাঙনের, বিশ্বাস, ভালোত্ব, বন্ধুত্ব, আদর্শ, ন্যায়বোধ সবকিছুই দ্রুত অচল হয়ে যাচ্ছিল। সুন্দর সেক্রেটারির সাথে যৌন সম্পর্ক ছিল ব্যবসা-জগতের নতুন নর্ম্ । কিন্তু সুদীপ পিছিয়ে ছিল। 
 
আলেক্সেই ফিওদরোভিচ ঝানু লোক। শুধু এলাই নয়, যতগুলো ব্যবসায়ের সে ক্রিশা, তাদের সব সেক্রেটারিই তার কাছের মানুষ। তাদের সে আদরও করে, যত্নও করে। আর্থিকভাবেও বঞ্চিত করে না। সেক্রেটারিরা হলো প্রতিটা ব্যবসায়ের জানালা, তা দিয়েই তার জানা হয় কী পরিমাণ অর্থের লেনদেন বা কী পরিমাণ অবৈধ ব্যবসা হয় সেখানে। এই তথ্যগুলোই নির্ধারণ করে কার কাছ থেকে কত সালামী তার প্রাপ্য। অবিকল একই কাজ করে মাফিয়া চক্রগুলো। 
 
ব্যবসা ছিল তখন একই সাথে বৈধ এবং অবৈধ। বেচা-কেনা বৈধ, কিন্তু ডলারে বেচা-কেনা অবৈধ। রুবল অস্থিতিশীল এবং সাথে সাথে তা ডলারে চেঞ্জ না করলে এক মুহূর্তেরও নিশ্চয়তা ছিল না। অন্যদিকে বৈধভাবে ডলার কেনা যেতো না। সুতরাং আইনের রক্ষক কেউ কোনো ব্যবসায়ীকে ব্ল্যাকমেইল করতে চাইলে, খুব একটা পরিশ্রম করতে হতো না। প্রতিটি ব্যবসায়ী একই সাথে জিম্মি ছিল মাফিয়া ও মিলিশিয়ার হাতে।
 
কস্তিয়ার ব্যাপারে সুদীপের মনে কিছুটা সন্দেহ হলেও ঠিক নিশ্চিত ছিলো না যে, সে মাফিয়ার লোক। এতদিনে তারা একে অন্যের বাসায় যাওয়া-আসা শুরু করেছে, বৌদের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়েছে, শিশুরা একসাথে খেলা করে। মস্কোর নগিন্সক শহরে একটি ফ্যাক্টরি বিক্রি হবে পানির দামে, অনেক জমিসহ। কস্তিয়া প্রস্তাব করে জয়েন্ট ভেঞ্চার করে তা কেনার। গাজি মোশতাক প্রস্তাবটি লুফে নেয়। সুদীপেরও মনে হয় শুধু ট্রেডিংএ না থেকে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের দিকে নজর দেয়াটা সময়োচিত কাজ। ওরা “রুশ” নামে একটি জয়েন্ট ভেঞ্চার খোলে। লেনিনগ্রদের বহির্বানিজ্য ডিপার্টমেন্টের চিফ ভ্লাদিমির পুতিন খুব চৌকশ ও এফিশিয়েন্ট লোক, তার ডেস্কে ফাইল আটকে থাকে না। এক্সপোর্ট ইমপোর্ট লাইসেন্স হয়ে যায় খুব দ্রুত। সুদীপ-মোশতাক নতুন কোম্পানির একাউন্টে ৫০ হাজার ডলার সমমানের রুবল রাখে।

কয়েকদিনের মধ্যেই কস্তিয়া ফিরে এসে খবর দেয়, ফ্যাক্টরি আমাদের।

খুশীতে নেচে ওঠে সবাই।

রাতে ভদকার বোতল ও বিকিনি উন্মোচনের উৎসব চলে স্থানীয় স্ট্রিপ ক্লাবে। অনম্বর অপ্সরি নৃত্যের এই স্বর্গোদ্যান এইদেশে আগে ছিলো না। মার্কেট ইকোনমির “ডিমান্ড ও সাপ্লাই”এর নিয়ম মেনে এখন খুবই জনপ্রিয়। বড় বড় ব্যবসায়ীরা, বিদেশি ‘মানি ম্যানরা’ সারাদিনের ব্যস্ততা সেরে রাতে সুন্দরী মেয়েদের দেহসৌষ্ঠবে সময় কাটাতে চায়।

নিন্দুকেরা নিন্দা করে, কিন্তু মার্কেট থেমে থাকে না।

“চল ফ্যাক্টরি দেখে আসি”, কস্তিয়া দিন দুই পরে প্রস্তাব করে।

কস্তিয়া, মোশতাক, সুদীপ তিন বন্ধু বিএমভি’তে চড়ে বসে। কস্তিয়া ড্রাইভার। গাড়ি নয় পংখিরাজ,

ওড়ে, কোনো স্পিড লিমিটের বালাই নেই, আওয়াজ করে বিকট। ইচ্ছা করেই রাশিয়ায় আসা এইসব গাড়িতে সাইলেন্সার থাকে না। রাজা বাহাদুর আসছেন, বহুদূর থেকেই যাতে সবাই সচকিত হয়ে পথ ছেড়ে দেয়। রোড ও হাইওয়ের মিলিশিয়া দেখে কিন্তু কিচ্ছু বলে না। ইনা মার্কা তাদের স্পর্শের বাইরের স্বায়ত্ব শাসিত ইনস্টিটিউশন। আগে শ্রেণিসংগ্রাম ও শোষণমুক্তির কট্টর মিলিট্যান্ট হলেও “নব্য রাশিয়ানের” এই অমনিপটেন্ট রূপময় গাড়িতে চড়ে সুদীপের মন্দ লাগে না।

সন্ধ্যা হয়ে যায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে।

ফ্যাক্টরি নয়, এলাহি কারবার। বড় দেশ, সবকিছুই বড়। বহুদিন বন্ধ ছিল, এখনও বন্ধ। ওরা বাইরে থেকে ঘুরে দেখে। দেখে মুগ্ধ হয়। ব্যক্তি মালিকানার একটা সুপ্ত পরিতৃপ্তি বোধ হয় ওদের মধ্যে। তারপরে হোটেলে ওঠে। ডিনার ও ড্রিংক করে প্রচুর। নাচে। কস্তিয়া একটা মেয়েকে নিয়ে রুমে চলে যায়। মোশতাক, সুদীপ দুজনের কেউ খোজা নয়, ইচ্ছা তাদেরও জাগে কিন্তু জুনিয়র সিনিয়ারের সাংস্কৃতিক ব্যারিয়ারটা অতিক্রম করতে পারে না বলে রুমে গিয়ে একা একা ঘুমায়। পরের দিন ফিরে আসে বড় বড় পরিকল্পনা নিয়ে। সুদীপ-মোশতাকের মনে হয়, সাফল্যের আলাদিনের চেরাগ পেয়ে গেছে। ইওফোরিয়ার তোড়ে, মোশতাক মনে করিয়ে দেয়, কস্তিয়া তার আবিস্কার। সুদীপ অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতার হাসি হাসে।

—————-

পাদটিকা

*যেখানে বাস কর, সেখানে পরকীয়া করো না।

যেখানে পরকীয়া কর, সেখানে বাস করো না।




৩৪ তম পর্ব


কস্তিয়ার বয়েস ছিল কম, গায়ে পায়ে লম্বা। লোভ ও সাহস বেশি।

এবং মোশতাক, তা সে গাজীই হোক আর হাজিই হোক, কোন নাম নয়। মোশতাক বিশ্বাসঘাতকতা ও রক্তপাতের প্রতীক। কস্তিয়া সুদীপের ব্যবসা কেড়ে নিতে পারতো না মোশতাক সাহায্য না করলে।

সুদীপ বহু কষ্ট করে তিল তিল করে গড়ে তুলেছে এই ব্যবসা। যে তাকে সবচাইতে বেশি সাহায্য করেছে সে ছিল নিকোলাই সের্গেইভিচ। সে বার দুই মোশতাকের সাথে কথা বলেই সুদীপকে জানিয়েছিল, “আমি তোর পার্টনারকে পছন্দ করি না, ও ভালো লোক নয়।”

সুদীপ অবাক হয়েছিল ওর কথায়।

কী করে মাত্র বার দুয়েক কথা বলে সে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে। কিন্ত রুশ ভাষায় বলে “ছাবাকু ছিয়েল”, মানে “একটা আস্ত কুকুর খেয়েছে” যে সে কি কুকুর চিনবে না?

রুশীরা কুকুর খায় না এবং কুকুর খাবার সাথে এই বাক্যের অর্থের কোনো যোগসুত্রও নেই। এ দ্বারা বুঝানো হয় একজন ঝানু লোক মানুষ চিনতে পারে সহজেই।

সে ছিল একজন পুরনো চেকিস্ট (কেজিবির লোক), মানুষ চেনাই তার কাজ। একজন চেকিস্ট যদিও কোনোদিনই স্বীকার করবে না যে সে কে, সুদীপ অনেকদিন একসাথে চলা ফেরা করে ঠিকই বুঝতে পেরেছে। এদের দৃষ্টি ও শ্রুতি খুব প্রখর।

হাসপাতালের ২য় দিনে নিকোলাই সের্গেইভিচ সুদীপকে দেখতে আসে।

সে খুবই বিচলিত। তার নাকটা মাছরাঙার মত বাঁকা, চোখ দুটো প্রাচীন মিশরীয় আনুবিস দেবতার শেয়াল- চোখের মত জ্বল জ্বল, কিন্তা মনটা লাদোগা হ্রদের মত উদার। সুদীপকে সে স্নেহ করে। বিগত ৩০ বছর তার কেটেছে কামচাতকায়, একেবারে জাপানে থুতনি ছুঁয়ে একটি দ্বীপ। লেনিনগ্রাদে যখন রাত ১২ টায় রেডিওতে মিখাইল দেরঝাভিনের “প্রোগ্রামা দো ও পছলে পলুনোচি” ( “মধ্যরাতের আগে ও পরে”) অনুষ্ঠানে অদ্ভুত সুন্দর সব গান বাজতে থাকে, কামচাতকায় তখন ঝক ঝক করে সকালের রোদ।

সে মিলিটারিতে চাকরি করেছে সারা জীবন। এখন পেনশনে গিয়েছে। পেনশনের জীবনটা সুখী হবার কথা, কিন্তু যে প্রতাপশালী রাষ্ট্রের সেবা সে করেছে সমস্ত মেধা দিয়ে, তা একটি অসুস্থ ডাইনোসোরের মত মাটিতে শুয়ে শ্বাস-কষ্টে ভুগছে। তার নাকের পাতাগুলো মৃদু নড়ছে শ্বাস নি:শ্বাসের সাথে অক্সিজেনহীনতায়।

মেডিসিনে একে বলে nasal flaring, যা অশুভ ও আসন্ন মৃত্যুর চিহ্ন।

অভাব চারিদিকে ।

"পা নেকড়ের অন্ন জোগায়", রুশ ভাষায় বলা হয়।

নেকড়ে যদি না হাঁটে বা না দৌড়ায়, তবে তার মুখে সুরঙ্গ হৈ হৈ করে। ভাল্লুকের মত সেইক্ষেত্রে তার তল্পি গুটিয়ে শীতনিদ্রায় গিয়ে নিদ্রা থেকে আর না জেগে ওঠাই ভালো।
কিন্তু ক্ষুধার্ত নেকড়ে ঘুমায় কি করে?

নিকোলাই সের্গেইভিচ পেরেস্ত্রইকা শুরু হওয়ার পর থেকেই বুঝে ফেলেছে যে রিটায়ারমেন্টের আশায় গুড়ে বালি। তাকে আরও হাঁটতে হবে, যত দ্রুত সম্ভব, তত ভালো।
ভাগ্য ভালো যে চেকিস্টরা স্বাজাতীয়দের খুঁজে বের করতে পারে সহজে, সেনাবাহিনীর লোকেরাও তাই। পিতেরে ( লেনিনগ্রাদ বা সেইন্ট পিটার্সবুর্গের আদুরে নাম পিতের- পিটার থেকে) এসেই সে কানেকশান খুঁজে বের করায় নেমে পড়ে এবং তারই এক আত্মীয়, যে সুদীপের মেডিকেল ইনষ্টিটিউটের শিক্ষক, সুদীপের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়।

তার ধারণা হয় সুদীপের সাথে কাজ করা যায়, সে সরল সোজা, ঠকাবে না। কাজে নেমে যায় বিজনেস খুঁজে আনতে। রাশিয়ায় এই সময়টায় মূল ব্যবসা ছিল রাষ্ট্রিয় সম্পদ রাষ্ট্রের হাত থেকে নিজের হাতে নেয়া, বিনা পয়সায়। কখনও কখনও রাষ্ট্রের কাছ থেকে উল্টো আরও দক্ষিণা আদায় করে নেয়া হত রাষ্ট্রের বোঝা ব্যবসায়ীর নিজ কাঁধে নেয়ার জন্য।

নগদ পুঁজি যতটা না গুরুত্বপূর্ণ তারচেয়ে মিলিয়ন গুন গুরুত্বপূর্ণ হল কানেকশন, সোভিয়েত আমলে যাকে বলা হত “ব্লাত্”। “ব্লাত” হল আশির্বাদ, শাব্দিক অর্থে নয়, বাস্তবিক অর্থে।

দোকানে কিছু নেই কিন্তু দোকানের ডিরেক্টরেরর সাথে খাতির থাকলে সে “পাখির দুধ” পর্যন্ত যোগাড় করে দিতে পারবে। পাখির দুধের বাংলা সাপের পাঁচ পা। শীতের দেশে সাপ লুকিয়ে থাকে বলে পাঁচ পা দেখার উপায় নেই, তাই এরা পাখির দুধ নিয়ে সন্তুষ্ট।

এই খাতিরটুকুর নাম হল “ব্লাত”।

সে আমাকে পাখির দুধ যোগাড় দিলে আমি তাকে দেব সোনার পাথর বাটি। সেটাও ব্লাতের কারণে।

একটা পুরো সিস্টেম, পুরো সভ্যতা গড়ে তোলা হয়েছিল এই ব্লাতের ওপরে ভিত্তি করে। কিন্তু কে জানতো যে তার ভাগ্য হবে মহেন-জো-দারো বা আটলান্টিসের ভাগ্যের মত।
 
নিকোলাই সের্গেইভিচ একদিন রাতে সুদীপের বাসায় এসে উপস্থিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে।

“৫ টা ডিজেল জেনারেটর আছে, বিক্রি করতে পারবে?”

"ডিজেল জেনারেটর কী?" সুদীপ প্রশ্ন করে।
"ডিজেল চালিত বিদ্যুত উৎপাদনের মেশিন, যা দিয়ে এমন পরিমাণ বিদ্যুৎ তৈরি করা যায় যে একটা বড় গ্রাম আলোকিত করা সম্ভব।"
নিকোলাই সের্গেইভিচ ভেঙে বলে। লেনিনগ্রাদের একটা ফ্যাক্টরি এই জেনারেটরগুলো বানায়। বেশ কিছু জেনারেটর ফ্যাক্টরিতে আছে। কিন্তু ফ্যাক্টরির কাছে কিনতে গেলে বলে একটাও নাই। সরকারি জিনিস, সরকারিভাবে বিক্রি করলে ফ্যাক্টরির ডিরেক্টর এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত কোনো লাভ নেই। সময়টা হল ব্যক্তিগত লাভের। লাভের বাইরে কেউ কিছু করে না।

তারা কমার্শিয়াল পার্টনার খুঁজছে। প্রতি জেনারেটরের সরকারি দাম ১ লক্ষ রুবল। তারা চায় ১০ হাজার রুবল ক্যাশ বখশিশ।

বিদেশি পার্টনার হলে ভালো হয়। নিকোলাই সের্গেইভিচ ওদের বলেছে যে সুদীপকে বিশ্বাস করা যায়।

"কত দামে প্রতিটি বিক্রি করা সম্ভব?"
"কম পক্ষে ৪ লাখ, বেশিও হতে পারে?"
"সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্রেতা কোথায়?"
"সাইবেরিয়ায় কিছু প্রাইভেট ক্রেতা আছে যারা হন্যে হয়ে ঘুরছে। তারা কিনবে।"
"তুমি তাদের চেন?"
“আমি চিনি না তবে খুঁজে বের করা যাবে।”

ফ্যাক্টরির কমার্শিয়াল ডাইরেক্টর ক্রেতাদের ইতিমধ্যেই বলেছে, “আমাদের কাছে নেই, তবে আমরা জানি একজন বিদেশির হাতে কিছু জেনারেটর আছে।"

বর্ষায় হিজলশাখার জল স্পর্শ করতে নীচু হতে হয় না, জল নিজে নিজেই উঠে এসে শাখা স্পর্শ করে। সুদীপ বুঝতে পারে ব্যাপারটা এখানে অনেকটা তাই। সে খেলতে নামার আগেই খেলায় এগিয়ে আছে। বলে, "আমি আছি, তুমি বল আমি ওগুলো কিনবো।"
“ডিসেম্বরের ৩১ তারিখের মধ্যে ফ্যাক্টরিতে ৫ লাখ রুবল পাঠাতে হবে সরকারি দামে, ওদের বিক্রি দেখাতে হবে বছর শেষ হবার আগেই।
“তুমি ক্যাশ দিতে পারবে?”
“পারবো”

“সের্গেইভিচ, তোমার কমিশন কী?”
“তুমি যা দাও তাই সই।”

“ওদের ৫০ হাজার, তোমাকে ৫০ হাজার, চলবে?”

নিকোলাই সের্গেইভিচ এতটা আশা করেনি, ফ্যাক্টরিতে ডিরেক্টর সহ তিনজন এতে জড়িত, ওরা তিনজনে যা পাচ্ছে সে একাই পাবে তার সমান।
শুরু হয় তার ছোটাছুটি।
নেকড়ের পা, আগেই বলেছি, ক্লান্ত হয় না। পায়ের সাথে মুখ জড়িত।

কয়েকদিনের মধ্যে ক্রেতা নিয়ে হাজির।
৪ টা জেনারেটর নেবে, ৪ লাখ করে প্রতিটি, ১৬ লাখ টাকা পাঠাবে সুদীপের একাউন্টে, সেই টাকা পৌঁছার সাথে সাথে সর্বমোট ৫ লাখ পাঠাতে হবে ফ্যাক্টরিতে।
তারপরে ক্রেতা ফ্যাক্টরির গুদাম থেকে পন্য ডেলিভারি নেবে। প্রতিটি ইউনিট নিতে এক একটি ৪০ ফুট লম্বা ট্রেইলার ট্রাক প্রয়োজন। এলাহি কারবার। না, সুদীপ স্বচক্ষে দেখেনি। সে জেনারেটর না জেনোসাইডের মশলা বেচলো তাও নিশ্চিত নয়, অবশ্য তা নিয়ে তার মনে কোন প্রশ্নও উদয় হয়নি।

পঞ্চমটি ফ্যাক্টরির গুদামে থাকবে যতদিন না বিক্রি হয়। ওরাই যক্ষের ধনের মত আগলে রাখবে।


দু' তরফা চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে যায়।
 
১৯৯০ সালের ডিসেম্বরের ২৬ তারিখ বুধবার সাইবেরিয়ার ব্যাংক থেকে টাকা পাঠানো হয়।

ফ্যাক্সে চলে আসে ব্যংকের পেমেন্ট অর্ডার (যাকে বলে “প্লাতেওঝকা”)। সোভিয়েত আমলে প্লাতেওঝকা ছিল টাকাই, কেননা সব ব্যাংক ছিল সরকারি। পেরেস্ত্রেইকা শুরু হবার পরে যে প্রাইভট ব্যাংকগুলো স্থাপিত হয়েছে তাদের ১০০% ই ছিল সরকারি সম্পদের চুরি বা লুটের টাকায়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদের মালিকরা ছিল প্রাক্তন বড় বড় পার্টি নেতা। এখন বড় বড় ক্রিমিনাল গ্রুপের সর্দার বা সর্দারদের বন্ধু-বান্ধব।

মিথ্যা প্লাতেওঝকা ব্যবহার করে বহু প্রতারণা হয়েছে। সুতরাং এই কাগজটির এখন আর কোনো দাম নেই। টাকা একাউন্টে না আসা পর্যন্ত কোনো মাল রিলিজ হয় না। ব্যাংক-টু-ব্যাংক টাকার লেনদেনকে বলা হয় "বেজ-নালিচনি" বা "বেজনাল"। সোভিয়েত আমলে সরকারি সংগঠনগুলোর মধ্যে লেন-দেনের একমাত্র মাধ্যম। ক্যাশ লেন-দেন হল "নালিচনি", বা "নাল", পেরেস্ত্রইকা যুগের লেনদেনের মূল মাধ্যম। ক্যাশ ব্যবসায়ে ডলার ছিল মূখ্য 'ভাল্যুতা' বা কারেন্সি। ২৭ তারিখ বৃহস্পতিবার একাউন্টে টাকা এসে পৌঁছায় না। এক্সট্রিম টেনশনে কাটায় সুদীপ ও নিকোলাই সের্গেইভিচ। সে সাইবেরিয়ার ফোনের পরে ফোন করে ।
শুক্রবার সকালে ব্যাংকে চলে যায় সকাল সকাল। কিন্তু টাকা আসেনি। সের্গেইভিচ ডেসপারেট, সাইবেরিয়ার ফোনের পরে ফোন করে।

নববর্ষ রাশিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব।
 
আজকের মধ্যে টাকা না এলে ডিল্ শেষ, ফ্যাক্টরি একাউন্টে টাকা হিট করবে না ১৯৯০ সালে।
সারাদিন প্রচণ্ড টেনশনে কাটে। ৫ টায় ব্যাংক বন্ধ হয়ে যায়। সব শেষ!

রাত ১০ টায় সের্গেইভিচের কল, “সুদীপ সুখবর! আগামি কাল শনিবার ব্যাংক খোলা। সরকার সোমবারের কর্মদিন শনিবারে শিফট করে রবি, সোম, মঙ্গল বন্ধ ঘোষণা করেছে।”
হুররা….
 
সুদীপ এমনিতেই প্রতি সকালে ব্যাংকে যায় ফিটফাট কোট টাই পরে। দামি কলোন ব্যবহার করে।

যেখান দিয়ে হাঁটে ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে। মুখে থাকে মোরগঝুঁটির মত সচেষ্ট হাসি। ব্যাংকের কাউন্টারে কালো চোখের একটা মেয়ে সুদীপকে খুব লক্ষ্য করে। কালো ওর চুলগুলোও। হয়তো রুশ - জিপসি সংমিশ্রণের বিস্ময়! কাঁচা আপেলের বয়েস। যেন সুদীপের জন্যই সে ওখানে আছে। খুব সুন্দর হাসে। সোভিয়েত আমলের হলমার্ক, নিহাস মুখ, রুক্ষ্ণতা, অনুভূতিহীনতা ও যান্ত্রিক ব্যবহারের সংস্কৃতিকে মিথ্যা প্রমাণ করার দায়িত্ব কাঁধে নেয়া ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল সে। খুব যত্ন করে কাজ করে দেয়।

নরকের আগুনের মত জ্বলজ্বলে সুন্দর। তাকালে হৃৎপিন্ড দৌড়াতে থাকে। এবং সুদীপ জানে ওদের মধ্যে যে ফেরোমনের প্রবাহ তাতে ঐ মেয়ের বুকেও কইতর ছটফট করে।

সুদীপ শুধু হ্যান্ডসাম বিদেশি বিজনেসম্যানই নয়, খুব ভালো ও ভদ্র। কাউন্টারের সবার সাথেই খুব ভালো সম্পর্ক। সে উদারভাবে তাদের "কনফেতি" ও ফুল দেয়, প্রত্যেকের নাম জানে এবং কবে কার জন্মদিন তা-ও।

শনিবার ভোরে সে ঘুম থেকে ওঠে খুব ফুরফুরে মন নিয়ে। যেহেতু কাকতালীয়ভাবে একটি কর্মদিন পাওয়া গেছে, ও জানে এটা ওর সৌভাগ্যের চাবি। আজ টাকা আসবে। সে প্রতিটি মেয়ের জন্য লাল টুকটুকে গোলাপ ফুলের তোড়া ও বড় বড় বিদেশি কনফেতির বাক্স কিনে নেয়।
সে সুন্দর কোট পরে, বৌ টাই পরিয়ে সুগন্ধি পারফিউম স্প্রে করে দেয়। মাত্র ২৬ বছর মেদহীন এভারেজ বাংগালির চেয়ে লম্বা একজন যুবক, দেখে কেউ বুঝবেই না, যে সে আসলে পুঁজিহীন একজন ব্যবসায়ী।

ড্রাইভারকে সাথে নিয়ে হাতে তরতাজা ফুল আর কনফেতির বাক্স নিয়ে উপস্থিত হয় ব্যাংকের ফ্লোরে। এমনিতেই উৎসবের সময়, কাউন্টারগুলোতে যেন খুশির উৎরোল ছড়িয়ে পড়ে।

সবাইকে নববর্ষের অভিনন্দন ও উপহার দিয়ে প্লাতেওঝকার কপি এগিয়ে দেয়।

কালো চোখ কালো চুলের সেই যে ‘লে ফ্ল্যর দু মাল’ মেয়েটি মুখে রোদ মেখে জানায় টাকা চলে এসেছে!

হুররা ....

সাথে সাথে ৫ লক্ষ রুবল ফ্যাক্টরিতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এবং মেয়েরা সবকিছু করে ওর জন্য যাতে টাকা ফ্যাক্টরির ব্যাংক একাউন্ট আজই পৌঁছায়। অদ্ভুত গোলাপের মত মেয়েগুলো। ওরা অসাধ্য সাধন করে। সুদীপের প্রত্যেককে কোলে নিয়ে নাচতে ইচ্ছে করে। বিশেষ করে কালো চোখের সেই তাকে।
 
এরপরের কাজটা ছোট। এক লাখ রুবল ব্যাংক থেকে ক্যাশ করা হয়। কাজটি তখনও রিস্কি, কিন্তু এমন মানুষের জন্য ওই মেয়েরা এতটুকু রিস্ক নিয়ে ধন্য হতে রাজি। রাতে শ্যাম্পেন, কালো এবং লাল ক্যাভিয়ার দিয়ে উদযাপন করা হয় সোভিয়েত রাষ্ট্রের এক কণা ধূলো বিক্রির প্রথম সাফল্য।

সুদীপের শাশুড়ী চমৎকার টেবিল সাজায়। সের্গেইভিচ তার স্ত্রীকে নিয়ে আসে।
উৎসব শেষে হাতে তুলে দেয় ১ লাখ রুবল। ৫০ হাজার তার, ৫০ হাজার ফ্যাক্টরির কমরেডদের জন্য।

বুর্জোয়া শব্দ মিস্টার ব্যবহার শুরু হয়নি তখনও। বেসরকারি ক্ষেত্রে 'গসপাদিন' শব্দটি আসতে শুরু করেছে- যার অর্থ “প্রভু”। কিছুদিন মাত্র বাকি, কমরেড শব্দটি ছুড়ে ফেলে দিয়ে সুদীপ সহ সবাই “গসপাদিন” হয়ে যাবে। 
 
সুদীপর একাউন্টে এখন ১০ লক্ষ রুবল (= ৫০,০০০ ডলার) প্লাস একটি ডিজেল জেনারেটর হাতে।
আসলে এটা কোনো টাকাই নয়। অন্যেরা ঠিক এই একই সময়ে একই কায়দায় কামাই করছে মিলিয়ন- বিলিয়ন, রুবল নয়, ডলার। একটা বিশাল দেশকে টুকরো টুকরো করে ভরছে পকেটে পকেটে ।
 
কিন্তু সুদীপের জন্য সেটা অনেক টাকা। কিছুদিন আগেই ও ধপ করে নি:স্ব হয়ে গিয়েছিল প্রিয় বন্ধুদের সাথে ব্যবসা করতে গিয়ে। বিশ্বজিতের কাছে মাল পাঠিয়েছিল, টাকা ফেরত আসেনি, ইমরানকে অফিস নিয়ে দিয়ে মাল পাঠিয়েছিল, টাকা ফিরে আসেনি। অবশিষ্ট কিছু টাকা ছিল অভ্রের হাতে, কিছু ওর প্রাক্তন বন্ধুরা খেয়ে ফেলেছে, আর বাকিটা সে পিএইচডিতে ভর্তি হবার সময় খরচ করে ফেলেছিল। সুদীপ ছোট ভাই সৌম্যকে জাপানে কামিন হতে পাঠাতে পারেনি টিকিট কেনার টাকা ছিল না বলে।

অল্প খরচে ব্লাডিভস্তক দিয়ে পাচার করে দেবার একটা প্রচেষ্টাও করেছিল কিন্তু সফল হয়নি। সেই পর্যন্ত গিয়ে তাকে ফিরে আসতে হয়েছে।

ওর তখন বৌ, বাচ্চা, ভাই, শাশুড়ী নিয়ে অনাহারে থাকার অবস্থা। কিন্তু পেটে ক্ষুধা নিয়ে নেকড়ে ঘুমাতে পারে না। সে তার দুই পায়ে দৌড়ায়। মাথার চেয়েও পা চলে আগে আগে। মস্কোতে গিয়ে ইদ্রিশের সাথে।

সে আদর্শগত বন্ধু নয়, কলেজের বন্ধু। কলেজে অন্য রাজনীতি করতো। অতি চালু, বস্তু ও ভোগে বিশ্বাসী। এ পর্যন্ত কয়টি মেয়ের সাথে সে ঘুমিয়েছে, তা নিয়ে গর্ব করতে পছন্দ করে।

সুদীপ হারমোনিয়াম পার্টি করা স্বপ্নচারী খোদাই ষাঁড়।

সারা সোভিয়েত জীবনে ওদের বার তিনেক দেখা হয়েছে। এখন সে মস্কোতে বড় ব্যবসায়ি।

“শালা কম্যুনিষ্ট, শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ই নামলি কত জল ঘোলা কইরা, আমাদের কত কষ্ট দিয়া। ঠিক আছে, এই নে একটা কোম্পানির গঠনতন্ত্র দিলাম, লেনিনগ্রাদে গিয়ে এক দুই তিন একটা কোম্পানি রেজিস্ট্রি কইরা লইয়া আয়। কিছুদিন আগে সরকার প্রাইভেট কোম্পানি করার আইন পাশ করেছে।ব্যবসার অনেক সুযোগ আইতাছে।”

সে সব খুটিনাটি বুঝিয়ে দেয়। ইদ্রিশ একটি এক হাজার পৃষ্ঠার উপন্যাসের নায়ক হতে পারে। ওর গল্পই হতে পারে রুশ পেরেস্ত্রোইকার অবিনশ্বর গল্প ।


চলবে


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন