বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

স্বকৃত নোমানের গদ্য : উপন্যাসের পথে যাত্রা


দেখো, এখন সকাল। দিনের শুরুতে মানুষের অনেক কাজ থাকে। তুমি আমাকে কাজ করতে না দিয়ে এই যে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করেই যাচ্ছ, এটা কি উচিত? তবে তোমার কৌতূহল আমাকে উত্তর দিতে প্ররোচিত করছে। আমি প্রশ্নকারীকে ভীষণ ভালোবাসি। জ্ঞানপথের যাত্রীরাই প্রশ্ন করতে পারে। যার ভেতর প্রশ্ন নেই, কৌতুহল নেই, সে পিছিয়ে পড়া মানুষ। প্রশ্নহীন সমাজও মৃত সমাজ। আমার প্রথম উপন্যাস নাভি রচনার গোড়ার কথা জানতে চাইছ তুমি। তোমাকে কতবার বলেছি উপন্যাসটি নিয়ে আমি খানিকটা বিব্রত। জীবনের প্রথম উপন্যাস। শব্দচয়নে, বাক্য গঠনে দুর্বলতাগুলো আমার কাছে এখন স্পষ্ট। এখন লিখলে আমি এত দুর্বল ভাষায় এটি লিখতাম না। উপন্যাসটির কথা ভুলে যেতে চাই, অথচ তুমি বারবারই এটির ব্যাপারে প্রশ্ন করেই যাচ্ছ।

তবে বলি, শোনো। তুমি তো জানো লেখালেখির শুরুতে আমি কবিতা লিখতাম। নিজেকে মনে হতো পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ কবি। নানা পত্রপত্রিকায় কবিতাগুলো ছাপাও হতো। এখন ভাবি, কেন ছাপা হতো? যারা ছাপতেন তারা কি বুঝতেন না কবিতা-অকবিতার ফারাক? তখন গল্পও লিখেছিলাম কয়েকটি। ছাপাও হয়েছিল পত্রিকায়। দুটি গল্প ছাপা হয়েছিল অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজের ‘রবিবারের সাহিত্য’ পাতায়। গল্প দুটির একটি শিরোনাম ছিল সম্ভবত ‘কলা রহস্য’, আরেকটির ‘জনান্তিকে পথচারী।’

পত্রিকার সেই পাতাটি এখনো আমার কাছে আছে হয়ত, খুঁজলে পাওয়া যাবে। তখন আজকের কাগজের সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন কবি শামীম রেজা। ‘রবিবারের সাহিত্য’পাতাটি তিনি বা তাঁর অধীনে অন্য কোনো সাব-এডিটর হয়ত সম্পাদনা করতেন। সেই সময় শামীম রেজার একটি কবিতা পড়ে খুব মুগ্ধ হয়েছিলাম। কবিতাটির একটা পঙ্ক্তি ছিল এমন : ‘মঙ্গা লেগেছে বুকে চারদিকে ভয়ার্ত আঁধার’। ২০০৪ সালে যখন ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা আমার ওপর হামলা ও আমার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে, তখন চার সাংবাদিক সহকর্মীকে নিয়ে আমি হামলা-মামলার প্রতিবাদে মিছিল করেছিলাম। চার সাংবাদিকের মিছিল পাহারা দিয়েছিল আটজন পুলিশ। মিছিলের ব্যানারে লিখে দিয়েছিলাম কবি শামীম রেজার কবিতার উল্লিখিত পঙক্তিটি।

নিয়মিত কবিতা এবং মাঝেমধ্যে গল্প লিখে আমার লেখালেখি চলছিল বেশ। ২০০৭ সালের কথা। আমি তখন নাট্যকার সেলিম আল দীনের একান্ত সচিব। শ্রাবণের এক বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় খানিকের জন্য বৃষ্টি থামলে পরে তিনি ক্যাম্পাসের রাস্তায় সন্ধ্যাভ্রমণে বের হলেন। সঙ্গে আমিও। রোজ সকাল-সন্ধ্যায় তিনি নিয়ম করে হাঁটতেন। আমি তাঁর সান্নিধ্যে আসার পর কিছুই লিখতে পারছিলাম না। না কবিতা, না গল্প। মনে হচ্ছিল, আমি যেন শিল্পের এক মহাসমুদ্রে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। অকূল সমুদ্রে পড়ে আমার অবস্থা ত্রাহি ত্রাহি। সিন্ধুতে পড়ে যেভাবে বিন্দুর অস্তিত্ব বিলোপ হয়, আমারও সেই দশা। সেদিন হাঁটতে হাঁটতে গুরু আমাকে বললেন, ‘তুই উপন্যাস লিখতে শুরু কর, ভালো করবি। কবিতা তোকে দিয়ে হবে না। ছাড় ওসব।’

গুরুর আদেশ শিরোধার্য। আমি কবিতা লেখা ছেড়ে দিলাম। সেদিন থেকেই মূলত উপন্যাস লেখার কথা ভাবতে শুরু করি। দু-চার দিন ভেবে উপন্যাসের একটা বিষয়ও ঠিক করে ফেলি। আমার জন্মগ্রাম বিলোনিয়ায় হোনান নামে এক গুনিন ছিল। শৈশব-কৈশোরে তিনি ছিলেন আমার বিস্ময়। কী এক জাদুবলে পুকুরে ডুব দিয়ে মাছের পেট থেকে বের করে আনতেন তাবিজ-কবজ, গভীর রাতে শ্মশানে শ্মশানে ঘুরে বেড়াতেন মড়ার অপোড়া নাভির সন্ধানে। গুরুর সান্নিধ্যে আসার আগে আমি উপনিষদীয় জন্মন্তরবাদ এবং চার্বাকীয় নাস্তিকতা―এ দুটি দর্শনে প্রভাবিত ছিলাম। সেই হোনান কাকাকে কেন্দ্রীয় চরিত্র করে নাভি উপন্যাসে আমি এই কথা ব্যক্ত করতে চাইলাম যে, মানুষের মৃত্যু নেই, মানুষ অবিনশ্বর। মানুষ বারবার জন্মায়। ঈশ্বর নামক কোনো সত্তা নেই, শ্মশানের নাভির মতোই ঈশ্বর কুহেলি।

ভাবছি, নাভির গল্পটা প্রথমে গুরুকে শোনাবো, তাঁর মতামত শুনে তারপর লিখতে বসবো। কিন্তু সেই সুযোগ হয়ে ওঠে না। হলেও সাহসে কুলোয় না। কীভাবে কুলাবে বলো? এত বিশাল মহীরূহ তিনি, কীভাবে তাকে বলি, আমি উপন্যাস লেখা শুরু করতে চাই গুরু। সেদিন সন্ধ্যায় হাঁটতে হাঁটতে সাহস করে বলেই ফেললাম, ‘স্যার, অনুমতি পেলে একটা কথা বলতে চাই।’থমকে দাঁড়ালেন তিনি। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘বল, কী বলবি বল?’ বললাম, ‘একটা উপন্যাস লেখা শুরু করতে চাই।’তিনি আবার হাঁটতে শুরু করলেন। পেছনে অবোধ বালকের মতো আমিও। হাঁটতে হাঁটতেই নাভির পুরো কাহিনিটি শোনালাম তাঁকে। কাহিনিটা শেষ হলে খানিকক্ষণ চুপ করে থাকলেন। হঠাৎ ডান হাতের দুই আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘লিখে ফেল, লিখে ফেল। হ্যাঁ, চিহ্নহীনতা থেকে চিহ্নের সন্ধান। চমৎকার আইডিয়া। লিখে ফেল।’

চিহ্নহীনতা থেকে চিহ্নের সন্ধান? হ্যাঁ, তাই তো! এভাবে তো ভাবিনি আমি! মুহূর্তে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়ে গেল আমার সামনে। দ্বিগুণ বেড়ে গেল উৎসাহ। সে-রাতেই লিখে ফেললাম অন্তত ২০ পৃষ্ঠা। টানা কুড়ি কি পঁচিশ দিনে ২১৩১৩ শব্দের ছোট্ট উপন্যাসটি লেখা শেষ করে ফেললাম। গুরুকে পাণ্ডুলিপিটা দেখাতে চাই, কিন্তু সাহসে কুলোয় না। তবে মৌখিকভাবে জানাই যে, আমি উপন্যাসটি লেখা শেষ করেছি। একদিন কম্পিউটারে বসে উপন্যাসটির হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিটা কম্পোজ করছি, হঠাৎ তিনি হাজির। সামনে থেকে পাণ্ডুলিপিটা নিয়ে এক পৃষ্ঠা পড়লেন। আমি তো লজ্জায় লাল! আমার লেখা দেখে নিশ্চয় তিনি হাসবেন! ভুল হলে বকুনিও দিতে পারেন। খানিক পর তিনি কলম হাতে নিলেন। ঐ পৃষ্ঠায় একটা লাইন ছিল এমন : ‘অবেহার মাছ তাজা আর সুস্বাদু, তাই দামও প্রচুর’। তিনি ‘সুস্বাদু’র আগে ‘বিচিত্র’শব্দটি যোগ করে দিলেন। বাক্যটি দাঁড়াল : ‘অবেহার মাছ তাজা আর বিচিত্র সুস্বাদু।’আমি তা-ই কম্পোজ করে নিলাম।

উপন্যাসটির কম্পোজ শেষ হলে একটা প্রিন্ট নিয়ে কবিবন্ধু নওশাদ জামিলকে পড়তে দিলাম। তিনি তখন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এক সপ্তাহ সময় নিয়ে পা-ুলিপিটা পড়ে তিনি তাঁর মতামত জানালেন : ‘আপনার গদ্য আরও ভালো করতে হবে নোমান ভাই। আপনি সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়ের লেখা পড়ুন, শীর্ষেন্দু-সুনীলের উপন্যাসগুলো পড়ুন।’প্রাবন্ধিক ও গবেষক সাইমন জাকারিয়া তখন প্রায়ই ক্যাম্পাসে যেতেন। একদিন দেখা তাঁর সঙ্গে। নাভির কথা জানালাম তাঁকে। কোথাও ছাপানোর ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করলাম। সহৃদয় সাইমন ভাই পরামর্শ দিলেন সিলেটের সুনৃত লিটলম্যাগের সম্পাদক আহমেদ সায়েমের সঙ্গে যোগাযোগ করতে। বললেন, আপনি পাঠান, ছাপতেও পারে। সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোন দিলেন আহমেদ সায়েমের নম্বরে। তার সঙ্গে আমাকে কথাও বলিয়ে দিলেন। জানি না সেসব কথা এখন আর মনে আছে কিনা দুজনের। দুদিন পরই আমি পাণ্ডুলিপিটির একটা প্রিন্টকপি সুনৃতর ঠিকানায় পাঠিয়ে দিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি ছাপা হয়নি। হয়েছিল কি? আর খোঁজ নিইনি।

তুমি তো জানো, বই উৎসর্গ করার একটা রেওয়াজ প্রচলিত আছে। আমার প্রথম উপন্যাস, স্বাভাবিকভাবেই আমি গুরুকেই তো উৎসর্গ করব। আমার আগ্রহের কথা একদিন জানালাম তাঁকে। তিনি পুরো পাণ্ডুলিপিটা দেখতে চাইলেন। বললাম, ‘স্যার, পাণ্ডুলিপির এখনো কিছু সম্পাদনার কাজ বাকি। শেষ হলে আপনাকে দেখানোর ইচ্ছে। চূড়ান্ত সম্পাদনার আগে দেখানোর সাহস পাচ্ছি না।’তিনি হাসলেন। হাসতে হাসতে বললেন, ‘খবরদার, আমাকে উৎসর্গ করবি না। তুই যদি আমাকে উৎসর্গ করিস তোর বিরুদ্ধে আমি মামলা করে দেব। তুই আমার বন্ধুকে উৎসর্গ কর।’এই বলে টেবিল থেকে একটা সাদা কাগজে উৎসর্গপত্রটা লিখে দিলেন : ‘বাঙলা মঞ্চের যুগস্রষ্টা আচার্য নাসির উদ্দীন ইউসুফকে।’

আমি বললাম, ‘তিনি গ্রহণ করবেন তো স্যার?’ গুরু হাসলেন। বললেন, ‘তাঁকে আজীবন গুরুজ্ঞানে শ্রদ্ধা করবি।’ সেই হাসি এই জীবনে চোখের সামনে থেকে মিলাবে না কোনোদিন, সেই কথা ভুলব না আজীবন। কে জানে, হয়ত তিনি এই ভেবেছিলেন, তাঁর অবর্তমানে তাঁর শিল্পসঙ্গী নাসির উদ্দিন ইউসুফের হাত থাকবে আমার মাথার ওপর।

আমি বললাম, ‘স্যার, দৈনিক যুগান্তরের ঈদ সংখ্যার জন্য তরুণ ঔপন্যাসিকদের পাণ্ডুলিপি আহ্বান করেছে, নাভির পাণ্ডুলিপিটি পাঠাতে চাই। কিন্তু আমি তো কাউকে চিনি না, যুগান্তরের ঠিকানায় পাঠালেই কি চলবে?’ সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোন দিলেন যুগান্তরের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক মারুফ রায়হানের নম্বরে। বললেন, ‘মারুফ, আমার পুত্র স্বকৃত নোমান একটি উপন্যাস লিখেছে। সে বলেছে, তোমাদের ঈদ সংখ্যায় নাকি তরুণদের উপন্যাস ছাপবে। আমি তাকে বলে দিচ্ছি তোমার ঠিকানায় পাণ্ডুলিপিটা পাঠাতে।’ ওপাশ থেকে মারুফ ভাই কী বলেছিলেন জানি না।

পরদিনই পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়ে দিলাম মারুফ রায়হানের ঠিকানায়। অপেক্ষায় আছি কবে ছাপা হবে ঈদ সংখ্যা। অবশেষে ছাপা হলো। কিন্তু আমার উপন্যাস নয়, ছাপা হলো হরিশংকর জলদাসের উপন্যাস জলপুত্র। এটি তাঁর প্রথম উপন্যাস। উপন্যাসটির শেষে একটি ঘোষণা দেওয়া হলো। হুবহু না হলেও কথাগুলো ছিল এমন : ‘আমাদের হাতে মোট পাঁচটি পা-ুলিপি জমা হয়েছে। লেখকরা হচ্ছেন যথাক্রমে হরিশংকর জলদাস, সাইমন জাকারিয়া, রুবাইয়াৎ আহমেদ, স্বকৃত নোমান ও রাফিক হারিরি। হরিশংকর জলদাসের পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশিত হলো। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বাকি পাণ্ডুলিপিলো প্রকাশ করা গেল না বলে আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত।’

আমি পাণ্ডুলিপিটি ফেরি করে বেড়াচ্ছি। একে দেখাই, ওকে দেখাই। একদিন গুরু জানালেন যে, তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করতে একটি প্রতিষ্ঠান অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির জন্য ‘তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার’দেয়। গুরু বললেন, ‘পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়ে দে।’কী মনে করে পাঠলাম না। একদিন বন্ধু ফরিদ মাঝি নিয়ে এল সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ছবির হাটে। কবি দ্রাবিড় সৈকত তখন চারুকলার ছাত্র, অর্বাক নামে একটি লিটলম্যাগ সম্পাদনা করেন। সেদিন ছিল অর্বাকের সদস্যদের নিয়ে আড্ডা। আমার নাভির কিছু অংশ পঠিত হবে। কয়েক পাতা পড়লাম আমি। অনেকে প্রশংসা করলেন। মনে আছে, দ্রাবিড় সৈকত বলেছিলেন, ‘আপনার উপন্যাসটিতে ঈষাণ-নৈঋত-অগ্নি-বায়ু এগুলোর ব্যবহার বেশি। এত বেশি যে, মনে হচ্ছে উত্তর-দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম বলে কোনো দিক নাই।’ আমি তার সমালোচনাটি গ্রহণ করে পাণ্ডুলিপিতে কিছুটা সংশোধন করে নিয়েছিলাম। কয়েক মাস পর পাঠিয়ে দিলাম সেই পুরস্কারদাতা প্রতিষ্ঠানের ঠিকানায়।

পাণ্ডুলিপিটি প্রকাশের উদ্যোগ নিলেন আমার বন্ধু ঢাকা থিয়েটার কর্মী ওয়াসিম আহমেদ ও সুমন ইব্রাহিম। নিজ উদ্যোগে তারা উপন্যাসটি ছাপলেন। আমাকেও দিতে হলো পাঁচ হাজার টাকা। প্রকাশনার নাম দিলেন ‘ধাবমান প্রকাশ’। কিন্তু ‘ধাবমান প্রকাশ’তো শুধু আমার বইটি প্রকাশ করে বইমেলায় স্টল পাবে না। তাই বইয়ের প্রিন্টার্স লাইনে ‘বনলতা প্রকাশনী’র নামটাও দিয়ে দিলেন তাঁরা। মনে আছে, যেদিন বইটি বাইন্ডিংখানা থেকে এল, বন্ধু ওয়াসিম বিশ কপি বই শাহবাগে এসে দিয়ে গেলেন আমাকে। বইগুলো আমি কাঁধে বহন করে মেলার মাঠে বনলতার স্টলে নিয়ে গেলাম। এক ভদ্রনারী রিসিভ করলেন বইগুলো। করেই চেয়ারের নিচে ফেলে রাখলেন। তাঁকে কত অনুরোধ করলাম একটা বই অন্তত ডিসপ্লে করতে। করলেন না তিনি। উল্টো ধমকের সুরে বললেন, ‘আমাদের প্রকাশনার বই-ই তো ডিসপ্লে করার জায়গা পাচ্ছি না। আপনার বই রাখবো কোথায়?’

ইচ্ছে ছিল উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে গুরুর সামনে রাখব। তার আশীর্বাদ চাইব। কিন্তু বইটি প্রকাশের আগেই, ১৪ জানুয়ারি ২০০৮, তিনি মৃত্যুর ডাকে সাড়া দিলেন। সরে গেল আমার পায়ের তলার মাটি। স্ত্রী-কন্যাকে নিয়ে ভাসতে লাগলাম অকূল সাগরে। সে অন্য কাহিনি। এখানে অপ্রাসঙ্গিক।

বইমেলা শেষ হলো। হঠাৎ একদিন আমার কানে এল একটি কথা : ‘নাভির লেখক আমি নই, এটির লেখক সেলিম আল দীন।’ কথাটি বলেছেন গুরুপত্নী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা। আমি হাসলাম। নিজেকেই প্রশ্ন করলাম, ‘তুমি কি এতটাই ভালো লিখেছ যে তোমার লেখা গুরুর নামে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে? বাহ!’ আস্থা বেড়ে গেল নিজের ওপর। নিজেই নিজের পিঠ চাপড়ে বললাম, ‘বাহ্, তোমাকে দিয়ে হবে। চালিয়ে যাও। তুমি নিশ্চয়ই পারবে।’

পরে একদিন বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা বাংলা ভিশন টেলিভিশনের এক অনুষ্ঠানে আমার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এই অভিযোগ করলেন। ২০১৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর সেই অভিযোগের ভিডিও ক্লিপটি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ল। বিস্তর মানুষ আমাকে অভিযোগের কাঠগড়ায় দাঁড় করাল। আমি তখন একটি জবাব লিখেছিলাম, আমার টুকে রাখা কথামালা বইয়ে সেটি পাবে। তুমি এখনই শুনতে চাও? আচ্ছা, শোনো তবে। ‘বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার অভিযোগের জবাব’শিরোনামে আমি লিখেছিলাম, “ফেসবুকে একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি নাট্যকার সেলিম আল দীনের সদ্যপ্রয়াত স্ত্রী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসার একটি সাক্ষাৎকারের অংশবিশেষ। তিন বছর আগে সাক্ষাৎকারটি বাংলা ভিশন টেলিভিশনে দেওয়া। এ নিয়ে বিস্তর কথা হয়েছে আগে। ভেবেছিলাম এ নিয়ে আর কথা বলব না। কিন্তু একটা মিথ্যা এক শ বার বলা হলে সেটি সত্যি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায়। তবু ভেবেছিলাম একদম চুপ করে থাকব। কারণ, আট বছর আগে, সেলিম আল দীনের প্রয়াণের পর, যখন বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা আমার বিরুদ্ধে এই কাল্পনিক অভিযোগ তুললেন, তখন আমি শরণাপন্ন হয়েছিলাম সেলিম আল দীনের শিল্পসঙ্গী যুগন্ধর নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফের। আমার বিরুদ্ধে ম্যাডামের (মেহেরুন্নেসাকে আমি ম্যাডাম বলে ডাকতাম) অভিযোগটির কথা তাঁকে জানালাম। তিনি হাসলেন। বললেন, ‘তুই চুপ করে থাক। যা ইচ্ছে বলুক। আমরা তো জানি সেলিম কী লিখেছে আর ভবিষ্যতে কী লিখত।’আমি চুপ করে গেলাম।

কিন্তু ২০১২ সালে আমাকে কালি ও কলম পুরস্কারে ভূষিত করার পর শ্রদ্ধেয় কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের পত্নী মেহের আফরোজ শাওন সম্পাদিত ৭১ এবং পত্রিকার উদ্বোধনী সংখ্যার প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করা হলো ‘সেলিম আল দীনের লেখা চুরি!’ শিরোনামে। ঐ পত্রিকার একজন প্রতিবেদক আমাকে ফোন দিলেন। আমি তখন বলেছিলাম, ‘কেউ এই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারলে তাকে আমি আমার কালি ও কলম পুরস্কার বাবদ পাওয়া এক লাখ টাকা পুরস্কার দেব।’পুরস্কার ঘোষণার কথাটিও ঐ পত্রিকায় ছাপা হয়। মেহেরুন্নেসা ম্যাডামও পত্রিকাটি দেখেন। আমি তাকে ফোন দিলাম। বললাম, ‘ম্যাডাম, যদি প্রমাণ করতে পারেন, এক লাখ টাকা আমি আপনার পদপ্রান্তে রাখব।’তিনি বললেন, ‘আমি তোমাকে হান্টার দিয়ে পেটাব।’আর কোনো কথা না বলে ফোন কেটে দিলেন।

তারপর আমি চুপচাপ। নিজের লেখা নিয়ে ব্যস্ত। কিছুদিন পর একদিন দেখি বাংলা ভিশন টিভিতে ম্যাডাম আমাকে ইচ্ছেমতো ঝাড়ছেন। আমি সেলিম আল দীনের লেখা চুরি করেছি বলে আবারও অভিযোগ তুললেন। আরও বললেন, আমি নাকি রাজশাহীর কাজী সাঈদ হাসান দুলালের কাছ থেকে সেলিম আল দীনের লেখা বেশ কিছু চিঠি চেয়ে নিয়ে এসেছি শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর কথা বলে। আমি এ বিষয়ে জানতে কাজী সাঈদ হাসান দুলালকে ফোন দিলাম। আমার কথা শুনে তিনি ফোন রেখে দিলেন। আমি তাকে এসএমএস করলাম যে, ‘আপনি যদি বিখ্যাত হওয়ার জন্য এসব মিথ্যাচার করেন, আপনার বিরুদ্ধে আমি আইনি ব্যবস্থা নেব। আপনাকে প্রমাণ করতে হবে আমি কবে, কখন আপনার কাছ থেকে সেলিম আল দীনের লেখা চিঠি এনেছি।’এবার তিনি ফোন ব্যাক করে বললেন, ‘স্যরি, আমি ম্যাডামকে কখনো এমন কথা বলি নাই। তুমি আমার ছোট ভাই। আমি তোমার বিরুদ্ধে এসব বলব কেন?’

মূল প্রসঙ্গে আসি। আমি সেলিম আল দীনের ব্যক্তিগত সহকারী ছিলাম। স্যার বলতেন, একান্ত সচিব। ঠাট্টা করে বলতেন, বাংলা সাহিত্যে দুজন লেখকের পিএস আছে, রবীন্দ্রনাথের এবং সেলিম আল দীনের। বলেই হা হা করে হাসতেন। তাঁর দিনলিপির বহু জায়গায় একান্ত সচিব হিসেবেই উল্লেখ করেছেন আমাকে। কিন্তু তাঁর স্ত্রী এটা স্বীকার করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর ভাষায় আমি সেলিম আল দীনের কম্পিউটার অপারেটর। এতে আমার কোনো আপত্তি ছিল না। তিনি আমাকে সেলিম আল দীনের পিয়ন, বাবুর্চি, ধোপা, দাস ইত্যাদি বললেও আপত্তি করতাম না। সেলিম আল দীন আমার গুরু। গুরুপত্নীও গুরু। কিন্তু আপত্তিটা তখনই করতে হয়, যখন তিনি বলেন, সেলিম আল দীনের লেখা চুরি করে আমি লেখক হয়েছি! তার লেখা আমি নিজের নামে চালিয়েছি, চালাচ্ছি। আমার প্রথম উপন্যাস নাভি সেলিম আল দীনেরই লেখা।

অভিযোগ কিছুটা হাস্যকর। কোনটা বিখ্যাত সেলিম আল দীনের লেখা আর কোনটা অখ্যাত স্বকৃত নোমানের লেখা, তা তো সেলিম আল দীনের পাঠকরা খুব সহজেই ধরতে পারবেন। নাভি উপন্যাসটি সেলিম আল দীনের জীবৎকালেই লেখা। উপন্যাসটি আমি তাঁকে উৎসর্গ করেছিলাম। কিন্তু তিনি একটা সাদা কাগজে লিখে দিলেন উৎসর্গপত্র : ‘বাঙলা মঞ্চের যুগস্রষ্টা আচার্য নাসির উদ্দীন ইউসুফকে।’আমি ঠিক তাঁর উৎসর্গপত্রটি পাণ্ডুলিপিতে অন্তর্ভুক্ত করি। পরে আমার বন্ধু ওয়াসিম আহমেদ ও সুমন ইব্রাহিম নিজেদের উদ্যোগে বইটি প্রকাশ করেন। আমার জন্মগ্রামের হোনান নামের একজন গুনিনকে প্রধান চরিত্র করে লেখা এই উপন্যাসটির দ্বিতীয় সংস্করণ বের করতে গিয়ে আমি এই কাঁচা হাতের লেখা দেখে নিজেই লজ্জা পেয়েছি। এই জন্য যে, এত বাজে লেখা আমি লিখেছি! বিব্রত হয়েছি এই কাঁচা হাতের লেখা উপন্যাসটি সেলিম আল দীনের নামে ম্যাডাম চালিয়ে দিচ্ছিলেন বলে। ভেবেছি, কেন তাঁকে এতটা অসম্মান করা হচ্ছে!

আর সেলিম আল দীন তাঁর জীবদ্দশায় একটি লাইন লিখলেও সেটি তাঁর স্ত্রী সংরক্ষণ করতেন। সেগুলো তিনি যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করেছেন। স্যারের শেষের দিকের কিছু লেখা আমি কম্পিউটারে কম্পোজ করেছিলাম। সেলিম আল দীনের বন্ধু-বান্ধবরা জানেন, তিনি ডায়েরিতে লিখতেন। ডায়েরি থেকে আমি কম্পোজ করতাম। তাঁর মৃত্যুর পর আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো, আমি নাকি কম্পিউটার থেকে স্যারের সব লেখা চুরি করে নিয়ে এসেছি। স্যারের দিনলিপির ভূমিকায় ম্যাডাম লিখলেন, ‘একটি কালো হাত কম্পিউটার থেকে সব লেখা চুরি করে নিয়ে গেছে?’ আচ্ছা আমি যদি চুরি করেও থাকি, স্যার যা লিখেছেন তা তো তাঁর স্ত্রীর সংরক্ষণে আছে। ডায়েরিতেও আছে। তাহলে আমি চুরি করলে অসুবিধাটা কী? মূল কপি তো ডায়রিতে আছেই। এটা চুরি হলো কেমন করে? আর সেলিম আল দীন মৃত্যুর আগে কী লিখেছেন বা কী লেখেননি তার পুঙ্খানুপুঙ্খ জানেন তার শিল্পসঙ্গী নাসির উদ্দিন ইউসুফ, শিমুল ইউসুফ, অভিনেতা আফজাল হোসেন, নাট্যকার আনন জামান, নাট্যকার সাইমন জাকারিয়া, সেলিম আল দীনের ভাতিজি শাকিলা তাসমিন কাজরী, নাট্যকার রুবাইয়াৎ আহমেদ, কথাসাহিত্যিক হামিম কামরুল হকসহ তাঁর বিস্তর শুভাকাক্সক্ষী। তিনি একটা হাঁচি-কাশি দিলেও এঁরা জানতেন। তিনি কী লিখেছেন, তা এঁরা জানতেন না?

সত্য হচ্ছে, সেলিম আল দীন স্যারের সর্বশেষ নাটক ছিল পুত্র। এরপর স্যার আর কোনো লেখা লিখতে পারেননি। হাডহাড্ডি নামে একটা নাটক লিখতে শুরু করেছিলেন, কিন্তু আট পৃষ্টা লেখার পর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এই আট পৃষ্টা তার রচনা সমগ্রে প্রকাশিত হয়েছে। তাহলে তিনি কোন নাটকটা লিখলেন, যেটা আমি চুরি করে আমার নামে চালিয়ে দিয়েছি? কেউ কি বলতে পারেন? আর আমি তো নাটক লিখি না, লিখি উপন্যাস। সেলিম আল দীন কি কোনো উপন্যাস লিখেছিলেন? কেউ কি জানেন? আমার কোন উপন্যাসটা সেলিম আল দীনের, তা কেউ প্রমাণ করতে পারলে তাকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে বলে ইতোপূর্বে ঘোষণা দিয়েছিলাম। টাকার অংকটা এবার বাড়িয়ে দুই লাখ করলাম। সংবাদ সম্মেলন করে দুই লাখ টাকা প্রমাণকারীকে দিয়ে দেব। সজ্ঞানে এই ঘোষণা দিচ্ছি। আর আমি কী লিখেছি তা প্রকাশ্য। আমার বইগুলো বাজারে আছে। কারো সন্দেহ হলে পড়ে দেখতে পারেন। দেখতে পারেন, আমি যে বিষয়বস্তু নিয়ে উপন্যাস লিখেছি, সেলিম আল দীন এসব বিষয়বস্তু নিয়ে কাজ করতেন কিনা। এসব বলে আসলে প্রকারান্তরে সেলিম আল দীনকেই অপমান করা হলো। খাটো করা হলো। খুবই দুঃখজনক।

তবু ম্যাডাম, আপনার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। আপনি আমার গুরুপত্নী। সেই কারণেই সেলিম আল দীনের মৃত্যুর পর তের লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। সতের লাখ টাকার একটা গাড়ি আপনার হাতে তুলে দিয়েছিলাম। না দিলেও পারতাম। বিশেষ করে ওই তের লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র যে আমার কাছে, আপনি জানতেন না। আমি পারতাম ঐ টাকা এবং ঐ গাড়ি সেলিম আল দীনের অন্য আত্মীয়-স্বজনদের হাতে তুলে দিতে; যদিও তারা সেলিম আল দীনের রেখে যাওয়া কোনো সম্পদের লালায়িত নন। কিন্তু আমি যদি দিয়ে দিতাম, আপনি কিচ্ছু করতে পারতেন না। পারলেও অনেক ভোগান্তি পোহাতে হতো আপনাকে। কিন্তু আমি তা করিনি। বিশ্বস্ততার সঙ্গে স্বামীর সম্পদ স্ত্রীর হাতে তুলে দিয়েছিলাম। অথচ আপনিই কিনা আমাকে লেখা চুরির অভিযোগে অভিযুক্ত করলেন! এই কি বিশ্বস্ততার প্রতিদান?

আপনি কেন আমার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলেছিলেন, গত নয় বছর কেন আমার বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছিলেন, তা আমি জানি, আপনি জানেন, নাট্যকার আনন জামান জানেন, শাকিলা তাসমিন কাজরী জানেন। সেসব জানা বিষয় আমি কখনো কাউকে বলতে চাইনি। ভবিষ্যতেও বলতে চাইব না। যতক্ষণ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারি রাখব। উপায় না থাকলে শ্রদ্ধেয় নাসির উদ্দিন ইউসুফের পরামর্শ চাইব। তিনি যদি সেসব প্রকাশ করতে বলেন, করে দেব নির্দ্বিধায়। মূল দ্বন্দ্বটা আসলে কোথায়, তা বিস্তারিত লিখে ফেলব।

দুঃখ হচ্ছে এ জন্য, ম্যাডাম, আপনি একটিবার যদি আমাকে ডেকে সত্যিটা জানতে চাইতেন আমি জানিয়ে দিতাম। জানিয়ে দিতাম কে আপনাকে আমার সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়েছিল। কে আমার বিরুদ্ধে আপনার কান ভারী করেছিল। যে লোকটি আমার বিরুদ্ধে আপনার কাছে অভিযোগ করল, আপনি তা বিশ্বাস করলেন! অথচ পুত্রতুল্য আমাকে করলেন অবিশ্বাস। আফসোস, আপনি সত্যিটা না জেনেই চলে গেলেন।

আরো দুঃখ হচ্ছে, সেলিম আল দীন আমাকে গ্রাম থেকে ধরে এনে বিশ্বসাহিত্যের পাঠ দিয়েছিলেন, উপন্যাস লেখায় অনুপ্রাণিত করেছিলেন। আর আপনি আমার কাছ থেকে তা কেড়ে নিতে চেয়েছেন সবসময়। একবার ভাবলেন না, শিক্ষা যে কোনোদিন কেড়ে নেওয়া যায় না। মৃত্যুর পরও এখন ভিডিওর মাধ্যমে সেসব বিষোদগার রেখে গেছেন। তা নিয়ে এখন লোকে আমাকে মন্দ বলছে। বলুক। আমি ওই ভিডিওর কথাগুলোকে আশীর্বাদ হিসেবে নিচ্ছি। লিখতে লিখতে যখনই আমার মধ্যে ক্লান্তি আসবে, আমি ভিডিওটা দেখব। তখন আমার মধ্যে জেদ তৈরি হবে। আমি লিখতে থাকব। আমি দেখিয়ে দিতে চাই আমার লেখার শক্তি আদৌ আছে কিনা। প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আমি হাত থেকে কলম নামাব না। লোকে তখন নিশ্চয়ই বলবে, আমার বিরুদ্ধে আপনি যে অভিযোগ তুলেছিলেন তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। কারণ, চুরি করে আর যাই হোক, লেখক হওয়া যায় না।”

উপন্যাসটি প্রকাশের প্রায় সাত বছর পর একদিন এক নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানতে পারি, তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করতে যে প্রতিষ্ঠান অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির জন্য ‘তরুণ কথাসাহিত্য পুরস্কার’দেয়, যেখানে আমি পাণ্ডুলিপিটি পাঠিয়েছিলাম, সে-বছর পাণ্ডুলিপিটি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হয়েছিল। এই তথ্য কীভাবে যেন জেনে গেলেন গুরুপত্নী বেগমজাদী মেহেরুন্নেসা। জানারই কথা। পুরুস্কারটির সঙ্গে জড়িত অনেকেই তাঁর পরিচিত। কিংবা ওই প্রতিষ্ঠানের কেউ হয়ত খবরটি তাঁকে দিয়েছিল। তিনি অভিযোগ করলেন, ‘এই উপন্যাস স্বকৃত নোমানের নয়, সেলিম আল দীনের লেখা।’সঃ
তাঁর মতো মানুষ, যিনি সেলিম আল দীনের মতো প্রখ্যাত লেখকের স্ত্রী, যাঁকে লেখালেখির জগতের অনেকেই চেনে, যখন আমার বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ তুললেন, পুরস্কারদাতা কর্তৃপক্ষ তাঁর কথাটাই বিশ্বাস করল। করাটাই স্বাভাবিক। ঢাকা শহরে আমি তখন নবাগত। কেউ আমাকে চেনে না। ‘অভিযোগ ওঠা’ একটি পাণ্ডুলিপিকে পুরস্কৃত করে প্রতিষ্ঠানটি বিতর্কের মুখে পড়বে কেন? সত্যি যদি এটি ‘চুরি করা পাণ্ডুলিপি’ হয়, তখন তো প্রতিষ্ঠানটিও বিতর্কিত হবে। তাই পুরুস্কারের জন্য নির্বাচিত হওয়া আমার পাণ্ডুলিপিটি তারা বাদ দিল।



[লেখাটি স্বকৃত নোমান রচিত ‘উপন্যাসের পথে’ বই থেকে নেওয়া।]

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন