বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

শহীদুল জহিরের গল্প : ডলু নদীর হাওয়া


ডলু নদীতে এখন অনেক পানি, অথবা হয়তো পানি তেমন নাই, তবু ঐ দিক থেকে ভিজা হাওয়া বয়ে আসে, এবং এই হাওয়ার সঙ্গে আসে নদী পাড়ের বাঁশ ঝড়ের ভেতরকার গুয়ের গন্ধ; তখন আহম্মদ তৈমুর আলি চৌধুরি তার বাসার সামনে রাস্তার পাশে একটা নিচা ইজি চেয়ারের ভিতরে পোটলার মত ঝুলে বসে থাকে। হয়তো সে রোদের ভেতর ঘুমিয়ে পড়ে, অথবা ডলু নদীর সকালের বাতাসে শুকনা গুয়ের গন্ধ সত্ত্বেও আরামে এমনি তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। তখন সে তার ডান পা বাম পায়ের হাঁটুর ওপর তুলে দেয়, ফলে লুঙ্গি নিচের দিকে নেমে হাঁ হয়ে থাকে এবং এই ফাঁক দিয়ে বড় তালের আঁটির মত তার খয়েরি রঙের প্রাচীন হোলের বিচি দেখা যায়।

সাতকানিয়ার লোকেরা, যারা বাজারে যায় অথবা বাজার থেকে বোয়ালিয়া পাড়া কিংবা সতী পাড়ার দিকে ফেরে, তারা মসজিদের সামনে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় দেখে যে, তৈমুর আলি লুঙ্গি ফাঁক করে রেখে ইজি চেয়ারে বসে ঘুমায়, তাদের হয়তো মনে হয় যে, কত বড় বিচি, অথবা তারা হয়তো কিছু দেখে না,হয়তো ভাবে একই জিনিস প্রত্যেক দিন দেখার দরকার কি, তারা হয়তো কেবল ইজি চেয়ারের খোলের ভিতরে কুঁজা হয়ে বসা তার কাত হয়ে থাকা মুখের দিকে তাকায়, সেখানে হয়তো একটা দুইটা নীল কিংবা কালা মাছি বসে গালের লালা খায়; তারপর রোদ গরম হয়ে উঠলে সে ইজি চেয়ার ছেড়ে বাড়ির ভিতরে যায়, সেখানে তার স্ত্রী, বুড়া সমর্ত বানু নাস্তা বানিয়ে তার জন্য অপেক্ষা করে।

তৈমুর আলি চৌধুরি যখন ইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় তখন বোঝা যায় যে, সে খোঁড়া বা লুলা বা ভেঙ্গুর, কারণ হাঁটার সময় সে খুঁড়িয়ে বা লেংচিয়ে হাঁটে; তাকে সাতকানিয়া মডেল হাই ইস্কুলের কিছু বদমাশ ছাত্র কখনো হয়তো তৈমুরলঙ বলে ডাকে, তবে বৃদ্ধ তৈমুর আলির বৃদ্ধতর মা,গোলেনুর বেগম নিশ্চয়ই এই খঞ্জত্বের ইতিহাস জানে, কিন্তু তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাস করা হলে সে বিভ্রান্ত হয় অথবা বিভ্রান্ত করে। কথা শুনে সে প্রথমে তার অন্ধকার ঘরের ভিতরে শোয়া অবস্থা থেকে নোংরা লেপ খেতার উপর উঠে বসার চেষ্টা করে, তারপর যখন উঠতে পারে না, বিছানায় কাত হয়ে থেকে হাড়ের সঙ্গে চামড়া লেপ্টে মমির মত শুটকি মেরে যাওয়া একটা হাত নিজের চোখের সামনে উঁচা করে ধরে বাতাসে বিলি কেটে টনটনা গলায় বলে, অনে, আঁরার তৈমুরগিয়ার হত পুছাল্‌লদ্দে না, বাজি? আছেতো, চ’অন না, গরোত আছেতো!

তারপর তাকে যখন বলা হয় যে, তার ছেলে তৈমুরকে খোঁজা হচ্ছে না, বরং সে কেমন করে খোঁড়া হয়ে গেল তা জানতে চাওয়া হচ্ছে, তখনও কি গোলেনুর সে কথা শুনতে পায় না? কারণ সে বলে, আঁরাতো বার্মায় আছিলামদে, আকিয়াব না পেগু আঁই মনে করির ন ফারি, তৈমুরগিয়ার বাপে আঁরে যেয়েত্তে বিয়া গরি আনে, আঁর বয়স আছিল দুই বচ্ছর।

বিয়ের জন্য এই বয়স একেবারেই অসম্ভব মনে হলে, তাকে তা বলা হয়। এবং অবশেষে গোলেনুর বেগম দুই হাতের আঙ্গুল এবং আঙ্গুলের গিরা গুনে এটুকু মানতে রাজি হয় যে, তার বয়স তখন হয়তো ছিল নয়/দশ; তারা পাহাড় এবং পানি পার হয়ে জাহাজ এবং সাম্পানে চড়ে দোহাজারিতে শঙ্খ নদীর ঘাটে এসে নামে, তখন হয়তো দোহাজারিতে কাছেই রেল ইস্টিশন ছিল কিন্তু নদীর উপরে ব্রিজ ছিল না। সে বলে যে, তারপর তার আর মনে নাই, ভুলি গেই-য়ি বাজি! ফলে, তৈমুর আলি চৌধুরি কেমন করে লেংড়া হয়ে গেল তাকে যখন তা ৩য় বারের মত জিজ্ঞাস করা হয়, সে প্রবলভাবে এটা বোঝানোর চেষ্টা করে যে, তার এই ছেলে জন্মের সময়তো লেংড়া ছিল না, সে লেংড়া হয় পরে। তখন এই উত্তেজনা অথবা কথা বলার ক্লান্তির কারণে সে তার হাত নাচানো বন্ধ করে দেহের পাশে রেখে চোখ বুজে থাকে, তারপর বলে, কো’আলে আছিলদে, ক’আলে!

হয়তো তাই হবে, কপালেরই দোষ হবে; আহম্মদ তৈমুর আলি চৌধুরির বয়স যখন সাতাশ/আটাশ তখন তার কপালের এই চক্কর তৈরি হয়।

এখন ক্যানভাসের ইজি চেয়ারে লুঙ্গি ফাঁক করে শুয়ে ঘুম দেয়ার পর সে যখন ওঠে, তার বড় ছেলে/মেজ ছেলে/সেজ ছেলে/ছোট ছেলে/কাজের ছেলে/মেয়ের জামাই অথবা নাতিপুতিরা এবং তার ব্যক্তিগত মোটর গাড়ির ড্রাইভার বাইরের ঘরে বসে দুই দিনের পুরান পত্রিকা পড়ে অথবা গল্প করে এবং তাকে দেখে বলে, অ’নে চাটিঙ্গাঁ যাইবেন না? গাড়ি যা’র, গেলে যন।

--ছরোত যাই ক্যান কইরগাম? .

--কিয়া? অ’নে কইলেনদে না ডিসি না এসডু-রে চাইত যাইবেন?

আজিয়া ন যাইয়ুম, আজিয়া আঁতথে গম ন লা’র!

তার আজকে কেন ভাল লাগে না সে কথা সে ভেঙ্গে বলে না, অথবা তার হয়তো মনে পড়ে যে, তার এখনো নাস্তা খাওয়া হয় নাই, তাই চট্টগ্রাম শহরে ডিসি কিংবা এসডিও’র সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার বদলে সে বাড়ির ভিতরে যায়, সেখানে সমর্ত তার জন্য নাস্তা নিয়ে একা অপেক্ষা করে; কারণ বাড়িতে থাকলে তৈমুর আলিকে খাওয়ানোর কাজটার দায়িত্ব একা সমর্ত বানুর, এসময় একটা মাছিরও ঘরে থাকা নিষেধ। তৈমুর আলি মিঞা খাটের উপরে পা তুলে গুটিয়ে বসে পেঁপে কিংবা বেগুন কিংবা পটল ভাজি অথবা চিনি কিংবা গুড় দিয়ে আটার বেলা রুটি খায়; সমর্ত বানু দাঁড়িয়ে থেকে অথবা খাটের কিনারায় বসে খাওয়া দেখে, তারপর সে ঘরের কোনায় রাখা টেবিলের উপর থেকে দুই হাতে দুইটা পানি ভরা কাচের গ্লাস নিয়ে আসে। এখন বুড়া হয়ে যাওয়া তৈমুর আলি গ্লাস দুইটার দিকে দেখে, বলে, আজিয়া জ’অর ন দঅও ফানলার? এই কথা শুনে সমর্ত বানু তার দিকে ভর্ৎসনার চোখে তাকায়, সে তাকে বলে যে, সে তার বাপের মেয়ে, তার বাপের নাম ছিল জসিমউদ্দিন ওরফে জইসস্যা করাতি, আর তার মায়ের নাম ‘আরাকানের অঙমেচিং’, তার যে কথা সেই কাজ; সে বলেছে সে তৈমুর আলিকে জহর দিয়ে মারবে, এবং তা সে মারবেই -- নেহায়েত কপাল গুনে সে, তৈমুর আলি, এত দিন বেঁচে গেছে। তখন তৈমুর আলি এই খেলা অথবা নিয়তির কাছে পুনরায় আত্মসমর্পণ করে, সমর্ত বানুর দুই হাতের দুই গ্লাসের ভিতর থেকে একটাকে বেছে নিয়ে পানি খায় এবং এদিনও সে মরে না; সমর্ত তাকিয়ে থেকে দেখে, তারপর অন্য গ্লাসটা বাইরে উঠানে নিয়ে গিয়ে পানি ফেলে দেয়; এবং তখন বাড়ির অন্য লোকদের জানা হয় যে, তৈমুর আলি মিঞার নাস্তা খাওয়া শেষ হল।

তখন মনে হয় যে, অন্তত গোলেনুর বেগম হয়তো জানে এগুলা কি ঘটনা; কিন্তু তাকে জিজ্ঞাস করা হলে, সে বলে, আঁই কইর ন পারি। হয়তো তার জানা ছিল না, অথবা হয়তো সে জানতো যে, এটা একটা খেলা, সমর্ত বানুর সঙ্গে এক চুক্তির নিয়মানুযায়ী তারা এই খেলা খেলে; হয়তো কালক্রমে তৈমুর আলির এতে ক্লান্তি এসে যায়, কিন্তু সমর্ত তাকে ছাড়ে না। যৌবন এবং প্রৌঢ়ত্বের পরে বার্ধক্যের দিন গভীরতর হয় -- সমর্ত বানুর ডান হাতের মধ্যের আঙ্গুলে পরা একটা আংটি চামড়া এবং মাংসের ভিতরে গেড়ে বসে থাকে, অথবা হয়তো বুড়া হয়ে যাওয়ার পর এটা ঢিলা হয়ে আসে-- তথাপি তৈমুর আলি চৌধুরির দিন কাটে পানিতে সমর্তের হীরার আংটি ডুবিয়ে তৈরি করা বিষ খেয়ে মরা অথবা না মরার খেলায়। জসিমউদ্দিন করাতি এবং মগ রমণী অঙমেচিংয়ের মেয়ে, সমর্ত বানুর সঙ্গে পা ভাঙ্গার ভিতর দিয়ে অথবা তার আগেই তৈমুর আলি চৌধুরি জড়িয়ে পড়ে এবং তা অব্যাহত থাকে, ফলে বিয়ের আগে তৈমুর আলি সমর্তের ২য় চুক্তির শর্তে রাজি হয়। প্রথমে সে হয়তো ভাবে নাই যে, দুই গ্লাসের পানির খেলা এত ঘোরালো হয়ে উঠবে, সে ভেবেছিল যে, ছল চাতুরী করে এইসব শর্তফর্ত অকার্যকর করে দেয়া যাবে, যেমন আগেও সে করেছে; অথবা তার হয়তো মনে হয়েছিল যে, সমর্ত হয়তো সত্যি কথা বলে না, ধাপ্পা দেয়, যেমন আগেও সে দিয়েছে, -- আসলে গ্লাসের পানিতে কোন বিষটিষ নাই। এই সন্দেহ জীবনে তাকে একাধিকবার আক্রান্ত করে, তার মনে হয় যে, সমর্ত তাকে মিথ্যা ভয় দেখিয়ে মজা করে; কিন্তু সমর্ত বানু তার এই সন্দেহকে আমল দেয় না, সে এই খেলা তৈমুর আলির জীবৎকাল পর্যন্ত জারি রাখে এবং বিষ দিয়ে মারার ক্ষমতা সম্পর্কে দুইবার প্রমাণ দেয়। প্রথমবার দেয় বিয়ের রাতেই বিড়াল মেরে, যদিও পুরুষ হিসাবে তৈমুর আলিরই তা মারার কথা ছিল; বিয়ের দিন মসজিদের মৌলবি কলেমা পড়িয়ে যাওয়ার পর সে তামাশা করে সমর্ত বানুর কাছে জানতে চায় যে, সমর্ত বানু তাকে আজকেই বিষ দেবে কিনা। কিন্তু মনে হয় যে, সমর্ত এই রসিকতাকে হাল্কাভাবে নেয় না, কারণ, পরে সেদিন রাতে তৈমুর আলি যখন বাসরে প্রবেশ করতে যায় সে দেখে যে, ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ; দরজা ধাক্কানোর পর সমর্ত কপাট একটু ফাঁক করে বলে যে, ঘরে ঢুকতে হলে জামাইকে হাতে করে দুইটা বিড়াল নিয়ে ঢুকতে হবে। এই উদ্ভট আব্দার শুনে বাড়ির সকলে বিরক্ত হয়, তবু নতুন বৌ বলে লোকে বিড়ালের খোঁজে বের হয় এবং বোয়ালিয়া পাড়ায় নাপিচা আক্তারদের বাড়ি থেকে এক জোড়া বিড়াল সংগ্রহ করে আনে। তৈমুর আলি সেদিন পায়জামা এবং আচকান পরে দুই বগলে দুই বিড়াল চেপে ধরে বাসর ঘরে প্রবেশ করে দেখে যে, ঘরের এক কোনায় টেবিলের উপরে দুইটা ছোট বাটিতে ক্ষির অথবা পায়েস এবং দুইটা পিতল অথবা কাঁসার গ্লাসে পানি রাখা আছে। তার হয়তো মনে হয় যে, এই খাদ্য এবং পানীয় পরিশ্রান্ত হওয়ার পর খাওয়ার জন্য রাখা হয়েছে, কিন্তু সে ঘরে ঢুকলে সমর্ত বানু ক্ষিরের বাটিতে গ্লাসের পানি ঢেলে মেশায় তারপর বিড়াল দুইটাকে নিয়ে গিয়ে তা খেতে দেয়। ক্ষির খাওয়া হয়ে গেলে একটা পরিতৃপ্ত বিড়াল ঠোঁট চেটে ম্যাও ম্যাও করে, অন্যটা একটা লাফ দিয়ে ঘরের মেঝের উপর চারপা ছড়িয়ে ফট করে মরে পড়ে থাকে। হতভাগ্য বিড়ালের পরিণতি দেখে তৈমুর আলির হয়তো ভয় হয় এবং এই ভয়কে সে দ্রুত ক্রোধে পরিণত করে, সে তখন দরজা খুলে মরা বিড়াল উঠানে ছুড়ে ফেলে দেয় এবং যারা বিড়াল মারার পুরানো গল্প জানে তারা হয়তো খুশি হয় এই কথা ভেবে যে, তৈমুর আলি বিয়ের রাতে তাহলে বিড়াল মরলো! তবে সমর্ত বানু বিড়াল মারলেও তখন তৈমুর আলির চেহারা দেখলে মনে হতো যে, সেটা সেই মেরেছে, রাগে তার চোখমুখ থেকে ভাপ বের হতে থাকে এবং সেদিন উত্তেজনা ও ক্রোধের এই সম্মিলিত দানবীয় প্রকাশের সামনে সমর্ত বাত্যাপীড়িত তৃণের মত দলিত হয়; অতঃপর তৈমুর আলি যখন পানি খাওয়ার জন্য টেবিলের কাছে যায় সে দেখে যে, দুটো গ্লাসে পানি ভরে রাখা হয়েছে। তখন তার উত্তেজনা নেমে আসে এবং সে খেলাটাকে মেনে নেয়; একটা গ্লাস তুলে নিয়ে পান করে, অন্য গ্লাসের পানি সমর্ত জানালা ফাঁক করে বাইরে ফেলে দেয়। সেই শুরু হয়, তারপর আর যেন শেষ নাই; তৈমুর আলি হয়তো পুনরায় বিষয়টাকে ভাঁওতাবাজি ভাবতে থাকে, তখন অনেক বছর পর সমর্ত পুনরায় একটা বিড়াল অথবা কুত্তা অথবা ছাগল মেরে আহম্মদ তৈমুর আলিকে ভয় দেখায়।

তারপর অনেক সময় পার হয় এবং তৈমুর আলি চৌধুরি বুড়া হয়ে ইজি চেয়ারে বসে হাঁ করে ঘুমাতে শুরু করে; তখন একদিন রোদ চড়ে গেলে সে উঠে বাড়ির ভিতরে যায় নাস্তা করার জন্য। এইদিন হয়তো আলু অথবা চিচিংগা অথবা চাল কুমড়া ভাজি দিয়ে তার রুটি খেতে ভাল লাগে না, সে চিনি দিয়ে খেতে চায়; ফলে তখন সমর্ত চিনি আনার জন্য ঘর থেকে বের হয়ে যায়। বুড়া তৈমুর আলি বসে থেকে দেখে যে, ঘরের কোনায় টেবিলের উপরে পানি ভরতি দুইটা গ্লাস, এবং তখন ব্যাপারটা ঘটে; হয়তো এই প্রথম সমর্ত বানুর চালাকি ধরে ফেলার বিপজ্জনক বুদ্ধিটা তার মাথায় আসে অথবা হয়তো সে বেশি পিপাসার্ত হয়ে বেখেয়ালে কাজটা করে - খাট থেকে নেমে দুই গ্লাসের সব পানি খেয়ে নেয়।

এই চক্র শুরু হয় অনেক আগে, যদিও বার্মা থেকে তৈমুর আলি যখন ফিরে আসে তখন মনে হয় নাই যে, সে এরকম চক্করে পড়ার মানুষ। তবে, তখন ধান কাটা হয়ে গেলে অঘ্রান কিংবা পৌষের এক বিকালে ২য় একটা শালিখ পাখি খুঁজতে গিয়ে সমর্ত বানুর সঙ্গে তার প্রথম দেখা হয় এবং সে এই পরিস্থিতিতে পড়ে।

এক শালিখ দেখে দিশা হারা হওয়ার দশ বছর আগে তৈমুর আলি তার বাপ, মওলা বকশ চৌধুরির কাঠের সিন্দুক ভেঙ্গে উধাও হয়ে যায় ; হয়তো সে সাম্পান অথবা জাহাজে চড়ে আকিয়াব যায়, আকিয়াব থেকে রেঙ্গুন অথবা পেগু, এবং সেখান থেকে হয়তো রেলগাড়িতে করে মান্দালয়। সেখানে সে হয়তো ‘আল্লাহ মালুম’ জাতীয় কিছু করছিল -- ভালই করছিল; কিন্তু একদিন সে তার অতীত ঝেড়ে মুছে থুয়ে গ্রামে ফিরে আসে। সাতকানিয়া বা সাতকাইন্না তখন গ্রামই ছিল, কিংবা গ্রামের চাইতেও বেশি; হয়তো ডলু নদী পার হয়ে চিতা বাঘ এসে গাছে চড়ে বসে থাকতো, রাতের বেলা চরম্বার পাহাড় থেকে মাদারসার ভিতর দিয়ে নেমে আসতো বুনো হাতীর পাল। তখন একমাত্র জীবিত সন্তান, তৈমুরকে ফিরে পেয়ে তার মা খুশি হয়, হয়তো তার বাপও, কিন্তু পাড়া প্রতিবেশীরা হয় না, কারণ, তাদের ঘরের যুবতী এবং অনতি-যুবতী মেয়েদের নিয়ে সে নানান সঙ্কট তৈরি করে, হুসনেআরা/মনোয়ারা/রশেনারারা গোপনে কান্দে, তাদের মায়েরা মাথায় তুলে দেয়া নোংরা এবং ন্যাতার মত শাড়ির আঁচল দাঁতে কামড়ে ধরে চেহারা মলিন বানিয়ে রাখে, এবং তারা মওলা বকশের কাছে গিয়ে চোখের পানি ছেড়ে দেয়; বিপন্ন নারীদের দুই/চার/দশ ফোটা তপ্ত অশ্রু মাটিতে পড়ে দাগ হয়ে থাকে, তবে মওলা বকশ কিছু করতে পারে না, সে ছেলের বাপ হওয়ার সুবিধাজনক অবস্থান সম্পর্কে সচেতন থেকে বলে, আঁই ন জানি, আঁই কি কইরগাম!

তখন একদিন তৈমুর আলির জীবনে এক-শালিখ দেখার দুর্ভাগ্য নেমে আসে।

তখন হয়তো সে একা ছিল অথবা হয়তো সঙ্গে ছিল তার বন্ধু নুরে আলম অথবা ইউসুফ অথবা তারা দুই জনই; তারা হয়তো ডলু নদীর কিনারার বাঁশ ঝড়ের পাশের রাস্তা দিয়ে কোথাও যাচ্ছিল, এবং তখন বোয়ালিয়া পাড়ার প্রান্ত সীমায় তারা কোন এক জায়গায় দেখে যে, মাটির রাস্তার ঢালে ঘাসের উপরে খয়েরি রঙের একটা শালিখ মাথা নিচা করে কিছু খুঁটে খায়। এক শালিখ দেখে . তাদের খারাপ লাগে, তবে তাদের মনে হয় যে, আর একটা শালিখ নিশ্চয়ই ধারে কাছেই থাকবে; তারা হেঁটে যেতে থাকে এবং এদিক ওদিক এই পাখিটাকে খোঁজে, কিন্তু ২য় শালিখটাকে তারা দেখতে পায় না। তখন ২য় পাখিটাকে খুঁজতে গিয়ে তারা দেখে যে, দূরে নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসে আছে একটা মেয়ে এবং তার কাছেই খালি গায়ে লুঙ্গি পরা এক যুবক দাঁড়িয়ে।

তৈমুর আলি মেয়েটাকে চিনতে পারে না, তার প্রথমে মনে হয় যে, এটা হসনেআরা/মনোয়ারা/রশেনারাদের মতই একজন কেউ হবে, হয়তো জমিলা/কামিলা কিংবা আলফুন, সে বলে, ওডা ইসুইপপ্যা, মাইয়া ফোয়া ইবা কন?

নুরে আলম অথবা ইউসুফের জসিমউদ্দিন ওরফে জইসস্যা করাতির পনর বছর বয়সী পাকনা মেয়ে সমর্ত ওরফে সমর্ত বানুকে চেনা ছিল, তারা তৈমুর আলির কথা শুনে বলে, ইবা সমর্ত, জইসস্যা করাতির মাইয়া, সমর্ত বানু।

আগে ন চাই ফানলার?

তৈমুর আলি চৌধুরি বার্মায় যাওয়ার আগে সমর্ত এবং তার বাপকে হয়তো দেখে নাই, কারণ তখন আবু বক্কর করাতির ছেলে জসিম করাতিও প্রথমে বার্মা চলে যায় পরে দেশে ফিরে চিরিংগায় কাঠের গোলায় করাতির কাজ নেয় এবং মাতামুহুরির পাড়ে তার আরাকানি স্ত্রী অঙমেচিং এবং মেয়ে সমর্তকে নিয়ে বাস করে। তারপর একদিন অঙমেচিং পোটকা মাছ খেয়ে মরে যায়-- সমর্ত এবং জসিম করাতি কেন মরে না সেটা এক রহস্য; তবে মরে যাওয়ার সময় সে বালিকা সমর্তকে কাছে ডেকে নিয়ে তার কানে কানে কথা বলে এবং কাপড়ের টোপলার ভিতর থেকে একটা আংটি বের করে তার ডান হাতের মধ্যের আঙ্গুলে পরিয়ে দেয়, আংটিটার মাথায় একটা কাচের মত সাদা স্ফটিক ঝলমল করে। অঙমেচিং মরে গেলে জসিম করাতি তার নিজের গ্রামে ফিরে আসে, এখন সম্পত্তি ভাগ করে ডলু নদীর কিনারে বাড়ি বানিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকে। আরাকানি রমণী অঙমেচিংকে সাতকানিয়ার কেউ দেখে নাই অথবা হয়তো দুই/এক জন দেখেছিল, তবে তারা তা ভুলে যায়; সে ছিল সুন্দরী এবং জাদুকরী এক নারী, তার মৃত্যুর পর জসিমউদ্দিন ওরফে জইসস্যা করাতি আর বিয়ে করে না, সমদর পাড়া অথবা নদী পার হয়ে কাঞ্চনা কিংবা মির্জাখিল যায়, গিয়ে কাঠের গোলায় কাজ নেয় এবং বর্ষাকালে রাতের বেলা ভরা নদীর পানির কলধ্বনির সঙ্গে যখন অঙমেচিংয়ের গলার স্বর ভেসে আসে, সে পাড়ে বসে তার সঙ্গে কথা বলে। জসিমউদ্দিনকে অঙমেচিং আবার বিয়ে করতে মানা করে, বলে, অনে বিয়া খইরলে আঁই ন বাঁইচ্চম, মরি যাইয়ুমগৈ; আঁর মাইয়া ইবায় ন বাঁচিব, মরি যাইবোগৈ! ফলে, তখন জসিম করাতি মৃত অঙমেচিংকে বাঁচানোর জন্য বিয়ে না করে থাকে, মা মরা সমর্ত বড় ও তাগড় এবং সুন্দরী ও পাকনা হয়ে ওঠে, এবং তার কাচের আংটিটা ডান হাতের আঙ্গুলের স্ফীত গিঁটের নিচে শক্ত হয়ে চেপে বসে। তখন তৈমুর আলি চৌধুরি ২য় শালিখটা খুঁজতে গিয়ে তাকে দেখে এবং ইউসুফ অথবা নুরে আলমকে বলে, মাইয়া ফোয়া ইবারে ডাকি আন!

তখন সমর্ত বানুর আংটির বিষয়ে তৈমুর আলির জানা ছিল না, সমর্ত বানু পরে তাকে বলে যে, তার হাতের আংটির স্ফটিকটা কাচ নয়, হীরা; তার নানা, অঙমেচিংয়ের বাপ আচোরি মং, বার্মায় টিন কিংবা তামা কিংবা রূপার খনিতে কাজ করার সময় এটা কুড়িয়ে পায় এবং বাড়িতে এনে এটা দিয়ে আংটি বানিয়ে মেয়েকে দেয় এবং পরে বোঝা যায় যে, এটা হীরা-- হীরায় বিষ থাকে এবং সে তাকে, তৈমুর আলিকে, এই বিষ দিয়ে মারবে। তৈমুর আলি প্রথমে সমর্ত বানুর এই কথা বিশ্বাস করে না, সে তার কথা শুনে হাসে, বলে, আঁরে ক’নে মারিব, তুই না? প’অল না কোনো! কিন্তু পরে প্রমাণিত হয় যে, সমর্ত বানু কোন পাগল না, সে যা বলে তা হয়তো সত্য, তার আংটির কাচটা হয়তো আসলেই হীরা এবং এই হীরায় হয়তো বিষ আছে; তবে তৈমুর আলির তখন আর কিছু করার থাকে না। সে সমর্তের আঙ্গুল থেকে জোর করে আংটিটা খুলতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তারপর সে বাজার থেকে গৌরসুন্দর কামারকে ডেকে আনে, কামার গৌরসুন্দর দেখে যে, আংটির লোহার চাকতি সমর্তের আঙ্গুলের চামড়ার ভিতরে এমন শক্তভাবে বসে গেছে, এটাকে কেটে আলাদা করার কোন উপায় নাই।

এ বিষয়ে তৈমুর আলি আর কিছু বলে না, এবং তখন মনে হয় যে, গোলেনুর হয়তো বিষয়টা জানে; তাকে জিজ্ঞাস করা হলে সে পুনরায় তার বিছানায় উঠে বসার চেষ্টা করে, তারপর শুয়ে থেকে বলে, আঁর বৌয়ের কথা পুছালন্দে না, বাজি? ওর মায়তো মগ আছিলদে, আঁরা বার্মায় আছিলাম, কিন্তু আঁরা মগ ন আছিলাম। তখন তাকে হীরার আংটির কথা জিজ্ঞাস করা হলে সে বলে যে, সে হীরার আংটির কথা জানে না, তবে বোঝা যায় সে সমর্তের উপরে খুশি না।

এক শালিখ দেখার পর এইসব শুরু হয়, সেদিন তৈমুর আলির কথা শুনে ইউসুফ অথবা নুরে আলম রাস্তা থেকে নেমে ধান ক্ষেতের ভিতর দিয়ে গিয়ে সমর্ত বানুকে ডেকে আনে, গরীবের মেয়ে হওয়ায় সাহেবরা ডাকার কারণে সমর্ত কিছু জিজ্ঞাস না করেই এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়, বলে, অ’নে আঁরে ডাইক্কন কিয়া?

- আঁরে তুই চিনোদ্দে না?

-- ন চিনি, কিয়া, অ’নে ক’ন?

-- আঁই তুঁয়ারে, আঁরার বাড়িত খাম করিবার লাই রাইক্কম?

-- আই কাম ন করি!

-- কিয়া?

-- ন কইরগম!

তৈমুর আলি চৌধুরির রাগ হয় এবং তার এই রাগ সমর্ত বানুর পুরুষ সঙ্গিটার উপর গিয়ে পড়ে; সে যখন পুরুষটা কে তা জানতে চায়, মরদ ফোয়া ওডে তিয়াই রইয়ে ইবা ক’ন? তখন সমর্ত বাঁকা কথা বলে, অ’নে জানিয়েরে কি করিবেনদে, ইবার নাম সুরত জামাল, জামাইল্যা!

তৈমুর আলির কাছে ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় না, সে বলে, সুরত জামাল ইবা ক’ন? তুঁয়ার ভাই?

-- নঅয়, কিয়া?

--এ্যাডে তরা ক্যান করদ্দে?

-- ক্যান কইরগম? কিছু ন করি!

-- কিছু ন করি কি? দিনের বেলা ফ্রেম করদ্দে না ওডি?

-- অনে ইন খতা আঁরে ন কইওন!

সেদিন তারপর তৈমুর আলি আর কথা না বলে চলে যায়, সুরত জামাল জইস্যা করাতির সঙ্গে সমদর পাড়া,কাঞ্চনা অথবা মির্জাখিলে কাঠের গোলায় কাজ করে আর সুযোগ মত সমর্ত বানুকে ফুসলায়; তৈমুর আলি হয়তো বোকার মত এই কথা তার বাপ মওলা বকশকে বলে এবং তার কথা শুনে মওলা বকশ বুঝতে পারে না সে কি করবে, আঁই কি কইরগম?

তখন সমর্তের কথা তৈমুর আলি কিছুতেই ভুলতে পারে না, কিন্তু তাকে কাবু করা দুষ্কর হয়; একেতো সে জাদুকরী অঙমেচিংয়ের পাকনা মেয়ে, তার উপরে সুরত জামালের ঝামেলা, ফলে কোন আশা দেখা যায় না -- সুরত জামালের সাফল্যের কথা মনে হলে তার অন্তর জর্জরিত হয়ে যায় এবং সে বিষয়টা নিয়ে ভাবে। সে তখন ৪টা কাজ করে :

১. ডলু নদীর কিনারায় দারোগার ঘাটে বাঁশ ঝাড় কেটে কাঠের গোলার ব্যবসা শুরু করে,

২. এই কাঠের গোলায় করাতি হিসাবে রাখে জসিম করাতিকে,

৩. সুরত জামালকে চাকরি দিয়ে আলিকদম পাঠায় তাদের দুইশ বিঘা জমি দেখাশোনা করা এবং সেখানে ঘর বাড়ি বানিয়ে থাকার জন্য, এবং

৪. তারপর একদিন সকালে জসিম করাতিকে সঙ্গে নিয়ে গাছ কেনার জন্য লোহাগাড়া যায়, সেখানে টাকা কম পড়া বা অন্য কোন অজুহাতে জসিম করাতিকে কাঠের ব্যবসায়ীদের কাছে রেখে সে বিকালে একা সাতকানিয়া ফিরে আসে।

সমর্ত বানু হয়তো পাকনা হওয়া সত্ত্বেও তৈমুর আলির এইসব কাজকারবারের উদ্দেশ্য পরিষ্কার বুঝতে পারে না, ফলে তৈমুর আলি তার জাল গুটিয়ে আনে, এবং হয়তে নিজেই তাতে ধরা পড়ে; অথবা সমর্ত হয়তো দেরি করে হলেও বিষয়টা বুঝতে পারে এবং লড়াইয়ের জন্য তৈরি হয়। লোহাগাড়া থেকে একা ফিরে আসার পর তৈমুর আলি জসিম করাতির বাসায় যায়, সেখানে সমর্ত বানুকে তাদের কুঁড়ে ঘর থেকে ডেকে বের করে সে তাকে বলে যে, জসিমউদ্দিন কালকে অথব পরশু দিন ফিরবে। তারপর সে যখন বলে, আজিয়া রাতিয়া আইস্সম, পনর বছরের পাকনা মাইয়া ফোয়া সমর্ত বানুর তার কথা বুঝতে না পারার কারণ থাকে না, এবং তখন তার আংটির বিষের কথা মনে পড়ে-- সে তখন নদীর দিকে তাকায় এবং দেখে যে, বিকালের অল্প আলোয় নদীর বুকে ধূসর নীল কুয়াশা জমা হয়ে আছে। তার মনে হয় যে, হাতে সময় খুব কম এবং সে বলে, আজিয়া নঅয়, আজিয়া অ’নে যনগৈ, হালিয়া আইসসন; তখন তার কথা শুনে তৈমুর আলি চমৎকৃত হয়, থামি এবং ব্লাউস পরা এই নিরাভরণ বালিকা নারীর মুখের দিকে তাকিয়ে সে ভাবে এবং বলে, কালিয়া কিয়া? রাতিয়া ধাই যাইবা না কোনো?

একথা শুনে সমর্ত বলে যে, সে রাতে পালাবে না, তৈমুর আলি তখন পুনরায় সমর্ত বানুর মুখের দিকে তাকায়, তার মনে হয় যে, ২য় শালিখের বদলে পাওয়া এই রমণী আরাকানের জঙ্গলের মত সবুজ গভীর ও রহস্যময়; সমর্ত বলে রাতের বেলা সে ভেগে যাবে না, কিন্তু যদি যায়? সে বলে, ভাগি খডে যাইবা? আঁর নাম তৈমুর আলি, আঁই তুঁয়ারে খুঁজি বাইর কইরগম!

পরদিন রাতে তৈমুর আলি যখন জসিমউদ্দিন করাতির বাসায় আসে, তখন সে সমর্ত বানুর চালাকি বুঝতে পারে; কারণ সে দেখে যে, একদিন সময় পেয়ে সমর্ত তাদের বাড়ির ছোট ভিটার চারদিক বাঁশের কঞ্চি এবং বরইয়ের কাঁটা দিয়ে ঘিরে দিয়েছে। তৈমুর আলি যখন বাড়িতে ঢোকার পথ পায় না, তখন সমর্ত বানু তার উপস্থিতি টের পায়, সে বলে, অনে আইসসনদে না? এবং তৈমুর আলি যখন বলে যে, সমর্ত বানুই কি তাকে আজকে আসতে বলে নাই, তখন তৈমুর আলির সামনে সমর্ত তার ১ম চুক্তির প্রস্তাব দেয়। সে তাকে বলে যে, খুঁজে দেখলে ভিটায় প্রবেশ করার ৩টা পথ পাওয়া যাবে, এই ৩টা পথের একটায় গর্ত করে খরগোশ ধরার ফান্দ পাতা আছে, তৈমুর আলিকে এই ফাঁদ এড়িয়ে প্রবেশ করতে হবে; সে যদি তা না পারে, যদি সে ফান্দের গর্তের ভিতরে পড়ে যায়, তাহলে সে ফিরে যাবে এবং আর কোনদিন এমুখো হবে না।

তৈমুর আলির হয়তো মজা লাগে, সে এক কথায় রাজি হয় এবং ভিটার চারদিক চক্কর দিয়ে ভিতরে ঢোকার ফাঁক খোঁজে। সে অন্ধকারের ভিতর কয়েকবার পাক খায় কিন্তু কোন ফাঁক ফোকরই দেখে না, তার মনে হয় যে, সমর্ত বানু কাছেই আছে, কিন্তু যখন সে বলে, আঁর লগে চালাকি করদ্দে না? তখন সমর্ত বানুর কোন সাড়া পাওয়া যায় না। ফলে আহম্মদ তৈমুর আলির রাগ এবং হতাশা বাড়ে তারপর সে সত্যি কাঁটার বেড়ায় তিনটা ফোকর খুঁজে পায়ঃ যে রাস্তাটা ক্ষেতের ভিতর দিয়ে এসে ভিটায় উঠেছে তার পাশেই একটা ফোকর, দ্বিতীয়টা ভিটার পিছন দিকে এবং তৃতীয়টা ভিটার ডান পাশে নদীর দিকে মুখ করা; তিনটা ফোকর-ই এত ছোট এবং নিচা যে, তার মনে হয় কুত্তা কিংবা শিয়াল ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে এর ভিতর দিয়ে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব। তথাপি, কথা মত তিনটা ফোকর ঠিকঠিক খুঁজে পাওয়ায় সে সমর্ত বানুকে বিশ্বাস করতে শুরু করে এবং তার মনে হয় যে, এখন তার কাজ হচ্ছে ফাঁদ পাতা নাই এমন একটা পথ বেছে নেয়া অথবা আরো সহজ হয় ফাঁদ পাতা পথট খুঁজে বের করে অন্য দুইটা নিরাপদ রাস্তার যে কোন একটা দিয়ে এগোনো। সে ভিটার মূল রাস্তার কাছে ঘাসের উপরে বসে একটু জিরায় এবং বলে, তিয়া ওডি, আঁই আইর; তারপর সে তিনটা প্রবেশ পথের বিষয়ে দুইস্তর বিশিষ্ট শিকার-শিকারি খেলার একটা বিশ্লেষণ দাঁড় করায়--সে হয়তো রেঙ্গুন, পেগু অথবা মান্দালয়ে থাকার সময় এসব শেখে। তার বিশ্লেষণটা ছিল এই রকম : 
গোলেনুর যখন কপালের দোষ দেয় তখন মনে হয় যে, সে হয়তো একেবারে ভুল বলে না; কারণ, জসিম করাতির ভিটার পিছনে বাঁশের কঞ্চি এবং বরইয়ের কাটা সরিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করার চেষ্টা করা মাত্র তালাইয়ের উপরে হাল্কা করে মাটি ছড়িয়ে লেপে দেয়া আস্তরণ ভেঙ্গে তৈমুর আলি খাদের মধ্যে হুড়মুড় করে পড়ে যায়। তার কপাল খারাপ ছিল, তবে তা আরো খারাপ হতে পারতো, খাদের তলায় চোখা বর্শার মত বাঁশের টুকরা পুঁতে দিয়ে সমর্ত নিষ্ঠুরতার সঙ্গে যে মারণ ফাঁদ তৈরি করেছিল তৈমুর আলি বাঁশের সেই ফালিগুলোর ফাকের ভিতরে পড়ে; সে জানে বাঁচে, কিন্তু বেকায়দা হওয়ায় তার বাম পায়ের হাঁটুর চাকতি নড়ে যায়। গর্তের ভিতর পড়ে কয়েক মুহূর্তের জন্য হয়তো সে অজ্ঞান হয়ে থাকে, তারপর জ্ঞান ফিরলে হাচরপাচর করে ভিটায় উঠে কুঁড়ে ঘরের কাছে গিয়ে বেড়ার গায়ে থাপ্পড় দেয়-- সমর্ত বানুর চুক্তির কথা হয় সে ভুলে যায়, নয়তো মানে না। সমর্ত হয়তো তখন ঘরের ভিতর ঘুমিয়ে ছিল, কারণ সে নিশ্চিত ছিল তৈমুর আলি খাদে পড়বে; কিন্তু বেড়ার উপরে পিটাপিটির শব্দে তার ঘুম ভাঙ্গে, সে ঝাপ খুলে দেখে যে, দরজায় তৈমুর আলি দাঁড়িয়ে। সে রাতে অঙমেচিংয়ের মেয়ে সমর্ত বানু রক্ষা পায় না এবং সে রাতে আহম্মদ তৈমুর আলি চৌধুরির খঞ্জত্বের শুরু।

ভাঙ্গা পায়ের বিষয়ে আবার জিজ্ঞাস করা হলে গোলেনুর পুনরায় ভান করে, বলে, আঁই ন জানি। কিন্তু তাকে যখন বলা হয় যে, তৈমুর আলির পা কেমন করে ভাঙলো তা জানতে চাওয়া হচ্ছে না, তার পা কোন জায়গায় কতটা ভেঙ্গেছে তা জানতে চাওয়া হচ্ছে, তখন সে বলে, বহুত হষ্ট কইরগে বাজি, তঅ পুরা ন সারে।

তৈমুর আলি সেদিন গর্ত থেকে উঠে সমর্ত বানুর সামনে যখন দাঁড়ায় তার তখন ভাঙ্গা পায়ের কথা খেয়াল হয় না, তারপর সেদিন রাতে অথবা পরদিন সকালে সে যখন আবার কাঁটার ফোকরের ভিতর দিয়ে বের হয়ে আসে তখন হয়তো সে তার পায়ের ব্যথা টের পায় এবং দেখে যে, সে খাড়া হয়ে দাঁড়াতে বা হাঁটতে পারছে না, তার বাম পায়ের হাঁটু ফুলে ঢোল হয়ে আছে। গোলেনুর এবং মওলা বকশ চৌধুরি সব কথা হয়তো জানে না, অথবা হয়তো জানে, না জানার কথা নয়; কিন্তু হুসনেআরা/মনোয়ারা/রশেনারাদের মত সমর্ত বানু গোপনে কান্দে কিনা তা কাঁটার বেড়ার ভিতরে বাস করার কারণে জানতে পারা যায় না এবং তার মা না থাকায় মওলা বকশের কাছে এসে কেউ চোখের পানিও ফেলে না। সমর্তের বাপ জসিমউদ্দিন করাতি লোহাগাড়ায় দুইদিন থাকে কিন্তু তৈমুর আলিকে না দেখে আর অপেক্ষা না করে সাতকইন্ন্যা ফিরে আসে, কারিণ মা মরা মেয়ে সমর্ত বানুর জন্য তার দুশ্চিন্তা হয়; এবং সে এসে দেখে যে, বরইয়ের কাঁটা দিয়ে বাড়ির চারদিক ঘেরা দেয়া, ভিতরে ঢোকার রাস্তা নাই। তারপর সে সমর্তকে ডাকে এবং সমর্ত ঘর থেকে বের হয়ে এলে হামাগুড়ি দিয়ে কাঁটার বেড়ার ফাঁক দিয়ে ভিটায় প্রবেশ করে।

তারপর সমর্ত বানুকে কাঁটার বেড়া দেয়া ভিটার বাইরে আর দেখা যায় না, কিন্তু তৈমুর আলি মিঞার ভাঙ্গা পা পাকে এবং ফোলে, ব্যথা এবং জ্বরে অস্থির হওয়ার পর তাকে গরুর গাড়িতে করে দোহাজারির গাছবাড়িয়ায় ভাঙ্গা হাড় জোড়া লাগানোর কবিরাজ শ্যামাপদের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। শ্যামাপদ তার ঝুপড়ির বাইরের ঘরে তৈমুর আলিকে রেখে দশ/বিশ/ত্রিশ দিন ধরে চিকিৎসা করে, সে প্রথমে তোকমার পুলটিশ লাগিয়ে পেকে ফুলে ওঠা হাঁটু ফাটিয়ে পুঁজ বের করে এবং হাঁটুর চাকতিটা চেপে চেপে ঠিক জায়গায় বসিয়ে ক্ষতস্থান কালোমেঘের পাতা সিদ্ধ করা পানি দিয়ে ধোয়, তারপর মটমটি লতা বেটে ক্ষতের চারদিকে লাগিয়ে দেয়। শেষে পরিষ্কার ন্যাকড়া জড়িয়ে বেঁধে, অর্জুন গাছের ছাল, মহানিম বা ঘোড়ানিমের বিচি এবং লজ্জাবতীর শিকড় বেটে কিংবা সিদ্ধ করে বানানো অরিষ্ট তাকে দুই বেলা দেয় পান করার জন্য। প্রতিদিনের পরিচর্যায় এবং মটমটির মলম লাগিয়ে ও নিয়মিত শ্যামাপদের বানানো ওষুধ খেয়ে তৈমুর আলির পায়ের ক্ষত শুকিয়ে আসে।

গোলেনুর এসব হয়তো জানে এবং সে বলে যে, তৈমুর আলি এক শালিখ দেখার পর বড় ফাড়া থেকে বাঁচে, দোহাজারি থেকে সে দুই বোতল তিতা স্বাদের অরিষ্টসহ ফিরে আসে এবং সকাল বিকাল কাঁসার গ্লাসে করে এই ওষুধ খায় । তারপর অনেকদিন তার এই কষ্ট নিয়ে কাটে, একমাস/দুইমাস/ছয়মাস, লোকে গিয়ে শ্যামাপদের নিকট থেকে আরো ওষুধ আনে; এবং এভাবে সে তার পায়ের উপর পুনরায় খাড়া হয় বটে কিন্তু জখম কঠিন এবং চিকিৎসায় দেরি হওয়ায় অথবা যে কারণেই হোক, সে লুলা বা খোঁড়া বা ভেঙ্গুর হয়ে যায়!

তখন একদিন সমর্ত বানু মওলা বকশের বাড়িতে আসে; গোলেনুরকে জিজ্ঞাস করলে মনে হবে যে, সে এই বিষয়ে কিছুই জানে না, যদিও আসলে সে জানে-- তখন তৈমুর আলি একটু একটু করে খুঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে, এই সময় সে, সমর্ত, আসে। তার এতদিন কোন খবর ছিল না, কিন্তু তৈমুর আলির খঞ্জত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর একদিন সে এসে হাজির হয় এবং তৈমুর আলির সঙ্গে তার দেখা হয়, কারণ সেতো তাকে দেখতেই আসে, এবং সে তৈমুর আলিকে জিজ্ঞাস করে, অ’নে ক্যান আছন? অ’নেরে আঁই চাইবার লাই আইসসিদে!

তৈমুর আলি তখন দেখে যে, সমর্তের চোখে তরল আলো এবং ঠোঁটে চাপা হাসি খেলা করে, সে বলে, তুঁই আঁর লগে বেঈমানি কইরগো!

দেখা যায়, বেঈমানির বিষয়ে তাদের অভিযোগ ছিল পারস্পরিক; তৈমুর আলির কথা শুনে সমর্ত বলে যে, তৈমুর আলিই তার কথা রাখে নাই, এবং সে যে কথা রাখবে না তা সে জানতো। গোলেনুরকে হয়তো পুনরায় এসব বিষয় জিজ্ঞাস করা যায়, যদিও লাভ নাই; এসব বিষয়ে গোলেনুর যে কথা বলে তার মর্মার্থ হচ্ছে এই যে, তৈমুর আলির শালিখ দেখাটাই ছিল এক দুর্ভাগ্য এবং সে ক্রমে এই জালে জড়িয়ে যেতে থাকে। তৈমুর আলি অবশ্য নিশ্চিত ছিল যে, সমর্ত তার সঙ্গে প্রতারণা করেছিল, তার পা ভেঙ্গে দেয়ার ব্যাপারে সে বদ্ধপরিকর ছিল; তবে এখন সমর্তের কথা শুনে তার রাগ হয়তো প্রশমিত হয় এবং সে বলে, ইত্তার ক্যান করিবাদে?

এই কথার উত্তরে তখন সমর্ত যা বলে তাতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়, সমর্ত বলে যে, সে এখন আলিকদম যাবে। তৈমুর আলিরতো জানা ছিল সমর্ত আলিকদমে কোথায় যেতে চায়, তবু সে জিজ্ঞাস করে, আলিকদম খডে?

-- অ’নে ন জানন, খডে?

তৈমুর আলির প্রথমে মনে হয়েছিল, এটা তার কোন ব্যাপার না, কিন্তু অতিদ্রুত সে দেখতে পায় যে, সুরত জামালের কথায় তার অন্তর পুড়ে খাক হয়; এটা হয়তো ঈর্ষা ছিল, হয়তো বিদ্বেষও। গোলেনুর অবশ্য বলে যে, সে এসব কিছু জানে না; সে বলে, কো’য়াল বা’জি! কিন্তু তারপর সে বলে যে, সবকিছুই ছিল সমর্ত বানুর পাতা ফাঁদ, একটা মগের মূর্খ মেয়ে কেমন করে গ্রামের সবচাইতে সমর্থ ও উপযুক্ত পুরুষটাকে ধরে এটা ছিল তার একটা নমুনা; আক্ষরিক অর্থে সমর্ত বানুর পাতা ফান্দের গর্তে পড়ে যাওয়ারও আগে, যখন ডলু নদীর কিনারায় তার সঙ্গে দেখা হয় তৈমুর আলি তখনই যাদুর জালে আটকা পড়ে, কারণ সমর্ত হচ্ছে আরাকানের অঙমেচিংয়ের মেয়ে এবং তারও একটা মগ নাম আছে, এলাচিং। এই মেয়ের খপ্পরে পড়ে যায় তৈমুর আলি; সমর্ত বানু বা এলাচিং সব কিছু পরিকল্পনা করে ঘটায়; এবং গোলেনুর বলে, মাইয়া ফোয়া ইবা গম নঅয়!

ফলে সমর্ত বানুর আর একটা নাম জানা যায়, এলাচিং, তবে হয়তো গোলেনুরের অন্য কথাটা ঠিক না, এলাচিং হয়তো তেমন খারাপ মেয়ে ছিল না, কারণ, এক শালিখ দেখা থেকে এসব কিছুর শুরু এবং সমর্ত বানু বা এলাচিং তৈমুর আলিকে যাদুর জালে হয়তো আটকাতে চায় নাই। অথবা হয়তো চেয়েছিল, বোঝা মুশকিল; হয়তো গোলেনুরের কথাই ঠিক, এলাচিং ভেগে না গিয়ে তৈমুর আলির কাজকারবার সহ্য করে, কিন্তু আবার শর্ত দিয়ে তার জীবন বেঁধে রাখে, ঘুরায়, এ ছিল এক এলোমেলো ব্যাপার! তৈমুর আলি ১ম চুক্তি করার পর ল্যাংড়া হয়ে যায় এবং ২য় চুক্তি করে লম্বা রেশমের অদৃশ্য সুতার আগায় ঝুলন্ত মাকড়শার মত সারা জীবন লটকে থাকে এবং শেষে এর আগামাথা না বের করতে পেরে মরে। একদিন যখন নাস্তার সময় তার বেগুন অথবা পেঁপে অথবা পটল অথবা অন্য কিছুর ভাজিতে অরুচি হয় এবং এলাচিং যায় চিনি আনতে, সে দুইটা গ্লাসের সব পানি খেয়ে নেয়। তখন এলাচিং চিনি নিয়ে ফিরে এসে দেখে যে, তৈমুর আলি খাটের ওপর নাস্তার আয়োজনের পাশে লম্বা এবং চিৎ হয়ে শোয়া, তার চোখ বন্ধ, দুই হাত বুকের উপরে ভাজ করে রাখা; তার বুক হাপরের মত বাড়ি খায় এবং কপাল ও নাক ঘামে চিকচিক করে-- এলাচিং দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পারে।

তৈমুর আলি মনে হয় যেন ২য় চুক্তির শর্তও ভঙ্গ করে; ভাঙ্গার জন্যই চুক্তি করার বিষয়টা পরিণতিতে ভাল ফল বয়ে না আনলেও সে এলাচিংকে পায় এবং এলাচিং তাকে দেয় ১২টা সন্তানের পাশাপাশি অলৌকিক চুক্তির বেড়াজাল। তৈমুর আলি তার খঞ্জত্বের জন্য পুরাপুরি এলাচিংকে দায়ী করলেও, এলাচিং তারপর আলিকদম যাওয়ার জন্যই তৈরি হয়েছিল; তখন আর একবার তার লোভ, ঈর্ষা এবং হয়তো ক্রোধ তাকে বশ করে। এলাচিং যেদিন তৈমুর আলির ভাঙ্গা পা দেখতে আসে সেদিন বিকালে অথবা পরদিন সকালে সে জসিম করাতির নদীর কিনারার বাড়িতে যায় এবং দেখে যে, বাড়ির ভিটা আগের মতই কাঁটা দিয়ে ঘেরা, ভিতরেও যেতে হয় হামাগুড়ি দিয়ে। এই দিন হয়তো সে ভিতরে যেতে ভয় পায় অথবা হয়তো ভাঙ্গা পায়ের কারণে হামাগুড়ি দিতে পারে না; ভিটার নিচে দাড়িয়ে সে এলাচিংকে ডাকে।

তৈমুর আলি যখন বলে, কোথায় পালাবে তুমি মগের মেয়ে এলাচিং? --এলাচিং ঘরের ভিতরে চুপ করে থাকে, কথা বলে না।

তৈমুর আলি যখন বলে, আলিকদম তুমি কেন যাবে আমাকে খুলে বলল, আলিকদমতো তোমার যাওয়া হবে না, --তখনও এলাচিংয়ের সাড়া পাওয়া যায় ।

তৈমুর আলি যখন বলে, আমিতো তোমাকে ছাড়ব না মেয়ে, - এলাচিংয়ের কথা শোনা যায় না।

তৈমুর আলি যখন বলে, তোমার সঙ্গে আমার কথা আছে, ঘর থেকে বের হও,-- এলাচিং ঘরের ভিতরেই বসে থাকে।

তৈমুর আলির তখন আবার রাগ হয় এবং সে বলে, ওডি কানে ন হুনোদ্দে ? - এলাচিং তারপরও কানে না শুনে থাকে।

তখন তৈমুর আলির রাগ হয়তো আরো বাড়ে, সে বিকট চিৎকার করে, তোমার মুক্তি নাই আমার হাত থেকে, এবং তারপর সে যখন সেই কথাটা বলে, আঁই তুঁয়ারে ন ছাইড়গম, আঁই তুঁয়ারে বিয়া কইরগম, - তখন এলাচিং তার ঝুপড়ি ঘর থেকে বের হয়ে ভিটার কিনারায় কাঁটার বেড়ার কাছে এসে দাঁড়ায়। তখন পুনরায় মনে হয়, গোলেনুরের কথা হয়তো ঠিক, কারণ, তখন এলাচিংকে দেখে মনে হয় যে, সে তৈমুর আলির আগমনের জন্য তৈরি হয়ে বসে ছিল; অথবা তা হয়তো ঠিক না, তবু তখন তাকে খুব পরিপাটি লাগে, তার পরনে ছিল উজ্জ্বল হলুদ রঙের থামি এবং তার উপরে লাল ছিট কাপড়ের ব্লাউস-- পিঠের ওপর ছেড়ে দেয়া ছিল ভ্রমর কালো চুল। আকিয়াব, রেঙ্গুন এবং মান্দালয় ফেরত তৈমুর আলি কাঁটার বেড়ার ভিতর দিয়ে তাকে দেখে, এটা হয়তো ছিল এক যাদুময় ক্ষণ এবং সে তার লোভ, ঈর্ষা বা ক্রোধের বাইরে এসে হয়তো একবার সমর্ত বানু বা এলাচিংয়ের দিকে তাকায়; তখন হয়তো তার মনে হয় যে, এই মেয়ে যাবে সুরত জামালের কাছে! সেদিন, তখন বা একটু পরে এলাচিং তার পরিণতি মেনে নেয় এবং তৈমুর আলিকে তার আঙ্গুলের হীরার আংটিটা দেখায় এবং তাদের ২য় চুক্তির শর্তাবলী বর্ণনা করে। তৈমুর আলি হয়তো সব কথা ঠিক মত শোনে না, অথবা হয়তো শোনে কিন্তু এলাচিংয়ের ফান্দে পড়ে পা ভাঙ্গার কথা হয়তো তার মনে থাকে না, তাই হয়তো তার কাছে বিষয়টা ইয়ার্কি অথবা ছেলেখেলা বলে মনে হয় এবং সে বলে, আঁই রাজি আছি।

বস্তুত এলাচিংয়ের একাধিকবার বিড়াল মারা সত্ত্বেও হীরার আংটির বিষয়টা হয়তো তৈমুর আলির বিশ্বাস হয় নাই, বিশেষ করে যখন প্রায় চল্লিশ বছর যাবৎ এই খেলা চলে এবং সঠিক গ্লাসটা চিনে নিতে তার একবারও ভুল হয় না, তখন তার সন্দেহ একরকম বিশ্বাসে দাড়িয়ে যায়-- তার মনে হয় যে, কোথাও জারিজুরি আছে, এলাচিং আগেও মিথ্যা বলেছে হয়তো এখনো বলে। কিন্তু এই সন্দেহের জন্য অথবা অবশেষে ক্লান্ত হয়ে কিংবা হয়তো পিপাসার কারণেই দুইটা গ্লাসের সব পানি খেয়ে ফেলার পর যেদিন তৈমুর আলি খাটের উপরে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে, এলাচিং তস্তুরিতে চিনি নিয়ে ফিরে এসে দেখে ব্যাপারটা বুঝতে পারে; তখন সে দ্রুত বের হয়ে গিয়ে বাড়ির সকলকে খবর দেয়। তারপর থানার পাশের ডিসপেনসারি থেকে মোজাহার ডাক্তারকে ডেকে আনা হয়, কিন্তু ততক্ষণে তৈমুর আলির বুকের ওঠানামা থেমে গেছে এবং মোজাহার ডাক্তার পরীক্ষার পর তাকে মৃত ঘোষণা করে। মোজাহার ডাক্তার একটা ডেথ সার্টিফিকেটও দেয়, তাতে সে লেখে যে, তৈমুর আলি আকস্মিকভাবে প্রবল হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, ফলে এলাচিংয়ের আংটির গল্প সত্যি কিনা তৈমুর আলির মৃত্যুর পরও তার সুরাহা হয় না। কিন্তু তৈমুর আলির মৃত্যুর পর তার চল্লিশা হয়ে গেলে এলাচিং একদিন সবার ছোট ছেলে মিরাজ আলি চৌধুরিকে ডেকে বলে, আঁই আলিখদম যাই থাইক্কম, আঁরে আলিখদম রাখিয়েওে আইয়ো।

তখন ছেলেরা আলিকদম বাসস্ট্যান্ড ও বাজারের মধ্যবর্তী জায়গায় তাদের বাড়িতে একটা পাকা ঘর বানিয়ে মোটর গাড়িতে করে একজন কাজের মেয়েসহ এলাচিংকে নিয়ে গিয়ে রেখে আসে। যাওয়ার সময় এলাচিং তার বার্ধক্যপীড়িত শুকিয়ে আসা আঙ্গুল থেকে ঢিলা হয়ে যাওয়া আংটিটা খুলে মিরাজ আলিকে দেয়, বলে, রাখি দঅও, ইবা হীরা; তারপর সে, আরাকানের অঙমেচিংয়ের মেয়ে এলাচিং ওরফে সমর্ত বানু, আলিকদম রওনা হয়।

এলাচিংয়ের হীরার আংটিটা মিরাজ মিঞার কাছে থাকে, তারপর একদিন মিরাজ আলি চৌধুরি চট্টগ্রাম শহরে তার দুই বন্ধু হুমায়ুন কবির এবং গোলাম ফেরদৌস কাসেমকে সঙ্গে নিয়ে সিনেমা প্যালেস হলের কাছে হাজারি গলিতে মেসার্স এসবি জুয়েলার্সে যায়। এসবি জুয়েলার্সের মালিক, সোনারূপার ঝানু কারবারি, জ্যোতিভূষণ দাস তখন দোকানেই বসা ছিল; মিরাজ আলি এবং তার বন্ধুরা তখন গিয়ে তাকে জিজ্ঞাস করে যে, সে একটা হীরার আংটি কিনবে কিনা। জ্যোতিভূষণ তার ব্যবসার জীবনে হীরা দেখলেও তার কেনাবেচা করে নাই, তবে সে হীরা চেনে মনে হয়; হাজারি গলির এই চিপা রাস্তায় কেউ হীরা বেচতে আসবে তার তা বিশ্বাস হয় না, তবু সে বলে, ন কিন্‌নম কিয়া, এবং তখন মিরাজ আলি তার প্যান্টের পকেট থেকে সাদা টিসু কাগজে জড়ান আংটিটা বের করে দেয়। জ্যোতিভূষণ পাকা জহুরির মত আংটিটা বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করে; দরজার আলোর দিকে তুলে ধরে দেখে আলো বিচ্ছুরিত হয় কতটা, হাতলওয়ালা গোল ম্যাগনিফায়িং গ্লাসের নিচে রেখে দেখে পাথরটার প্রান্তগুলা কতটা মসৃণ, খোঁজে সেখানে কোন সূক্ষ্ম ভাঙ্গা খাঁজ আছে কিনা, তারপর শোকেসের কাচের উপর আঁচড় কেটে বলে, ইবা হীরা নয়, ইবা খাচ!

বন্ধুদের কাছে মিরাজ মিঞা চৌধুরির ইজ্জত থাকে না, তবু তারা হয়তো আরো দুই এক জায়গায় চেষ্টা করে, হয়তো আন্দরকিল্লা অথবা বিপনি বিতানে, তারপর, এটা হীরা নয় কাচ জানা হয়ে গেলে আংটিটার উপর তার মায়া দেখা দেয় এবং সে এলাচিংয়ের হীরা অথবা কাচের এই আংটি পকেটে ফেলে সাতকানিয়া ফেরে।



২০০৩

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন