বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

হাসান আজিজুল হকের একটি উপন্যাস ও গল্পের পাঠপ্রতিক্রিয়া: নাহার তৃণা




উপন্যাস :সাবিত্রী উপাখ্যান
 
মদ্র দেশের নিঃসন্তান রাজা-রানী, অশ্বপতি এবং মালবী সন্তানের আশায় সূর্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী সাবিত্রীর নামে পুজো দিয়ে এক কন্যা সন্তান লাভ করেন। দেবীর প্রতি সম্মান জানিয়ে মেয়ের নামকরণ হয় 'সাবিত্রী'। কালক্রমে সেই মেয়ে নিজের সতীত্বের বিশাল ব্যাপক নজির রাখেন। যেকারণে হিন্দু পুরাণে তিনি 'সতী সাবিত্রী' হিসেবে খ্যাত। হাসান আজিজুল হকের দ্বিতীয় উপন্যাস "সাবিত্রী উপাখ্যান" এর কেন্দ্রিয় চরিত্র সাবিত্রী'র নামকরণ সেই দেবী কিংবা রাজকন্যার নামানুসারে হয়েছিল কিনা জানা নেই। তবে সূর্যের আলো কিংবা তথাকথিত সতীত্বের অহংকারের ঠিক বিপরীতে চরিত্রটির নির্জীব অবস্হান। এই অবস্হান নিয়তি নির্ধারিত ছিল না। কিছু পশুর অধম মানুষ আর বিকলাঙ্গ সমাজ সাবিত্রীর পরিণতির জন্য দায়ী। যে কারণে, পরবর্তীতে আলোহীনতার মাঝে সাবিত্রীর স্বস্তি খুঁজে ফেরা। বিকারগ্রস্হ হয়ে মৃতপ্রায় একটা কিশোরী জীবন টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া মর্মান্তিক বার্ধ্যকের দিকে(পঁচাশি বছর বেঁচে ছিলেন সাবিত্রী)।
 
"সাবিত্রী উপাখ্যান" হাসান আজিজুল হকের মনগড়া কাহিনির ভিত্তিতে রচিত উপন্যাস নয়। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে রাঢ় বাংলার শ্রীকৃষ্ণপুরের সাবিত্রী নামের এক কিশোরীকে সদলবলে অপহরণ এবং সম্মিলিত ধর্ষণের পর তাকে অপরাধী দলের সবুর নামের এক পাপীষ্ঠের হাতে ছেড়ে দিয়ে অন্যরা সরে পড়ে। নিরাপত্তার কারণে এরপর তাকে নিয়ে সবুর শুরু করে ভ্রাম্য জীবন। ভ্রমণকালীন সময়ে সবুরের কুকর্মের সঙ্গী হয় বক ধার্মিক সৈয়দ সাহেব, সবুরের বন্ধু হুদা, হুদার আত্মীয় মওলাবখ্শ। হরির লুটের জিনিসে ভোগের আনন্দ তো ভাগেও! সাবিত্রী তখন ভিন্ন কোনো সত্তার অধিকারী নয়, কেবলি মাংসের দলা। যার উপর নিরন্তর চলে নেড়ি কুকুরের মতো কিছু পুরুষের 'মচ্ছব'। তারই পরিণতিতে একজন প্রাণবন্ত কিশোরীকে প্রায় নো ম্যান্স ল্যাণ্ডের বাসিন্দা হয়ে পরবর্তী জীবন পার করে যেতে হয়। সাবিত্রীর সেসব ক্লেদাক্ত আর মর্মযাতনায় ভরা দিনরাত্রির কাহিনি নিয়ে এ উপন্যাস।
 
হাসান আজিজুল হকের প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস "আগুন পাখি"র সাদামাটা কথক নারী চরিত্রটির সময় মতো প্রজ্ঞাময় বলিষ্ঠতায় উচ্ছ্বসিত- মুগ্ধ, এই পাঠক। তাঁর ছোটো গল্পগুলোর অধিকাংশই অনবদ্য। সেদিক থেকে তুলনা করতে গেলে এই উপন্যাসে মন ঠিক ভরেনি। এই উপন্যাসের প্রোটাগনিস্টকে প্রতিবাদী হতে দেখলে, অন্যের দোষে আজীবন নিজেকে বঞ্চিত করার বোকামিতে না গিয়ে জীবনকে সহজভাবে নেওয়ার চেষ্টাটা দেখতে পেলে হয়ত ভালো লাগতো।
 
এটি তাঁর প্রথম উপন্যাসের চেয়ে একেবারেই ভিন্ন ধারার। কাজেই প্রথম উপন্যাসের মতো কিছু পাবো’র আশায় পড়তে বসলে হতাশ হতে হবে বৈকি। কেননা পাঠকের ইচ্ছের কাছে নিজেকে গচ্ছিত রাখার দায় এড়িয়ে স্বাধীনভাবে কাহিনিকে টেনে নিয়ে গেছেন। মনগড়া বয়ানে পাঠককে তুষ্ট করার পথে হাসান আজিজুল হক কখনও হাঁটেননি- এই কাহিনিতেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সত্যি ঘটনা অবলম্বনে রচিত এই উপন্যাসে মন ভোলানো অলীক কল্পনার ছবি আঁকা হয়ত সম্ভবও ছিল না।
 
সবুর যখন তাকে স্হান থেকে স্হানান্তরে নিয়ে বেড়াচ্ছে, সেসব সময়ে সাবিত্রীর ভাবনায় যে চমক ছিল, ছিল গভীর জীবনবোধের ইশারা; জীবনের ক্ষেত্রে তার যথার্থ প্রয়োগের কোনো লক্ষণই পরবর্তীতে দেখা যায়নি। মানছি, এক্ষেত্রে সমাজ-সংসার তাকে সঙ্গ দেয়নি সেভাবে, সময়কালটাও একটা বড় ফ্যাক্টর। কিন্তু যে মানুষ নিজের উপর ঘটে যাওয়া চরম অন্যায়ে নিজেকে মৃত্যুর হাতে সঁপে না দিয়ে সাহসের সাথে ভাবতে পেরেছিল 'কেউই বাঁচা বাদ দেবে না, তাহলে সেই বা দেবে কেন?' তার সে ভাবনাকে সঙ্গী করে সে তো বাঁচার আনন্দে বেঁচে নিতে পারতো! তা সে করেনি, বরং বলা ভালো করতে দেয়া হয়নি, তাই যাপনের আগ্রহ হারিয়ে পূর্ণিমার আলোকে অচ্ছুৎ রেখেছে বাকী জীবন, নানান বিকারে হয়েছে আক্রান্ত। অন্যের পাপে নিজেকে শাস্তি দেবার এই ব্যাপারটায় মন সত্যিই ভারাক্রান্ত হয়েছে।
 
নিরন্তর ভাবনায় সাবিত্রী তার মনের ঘৃণা যথেচ্ছা উপুড় করেছে, 'পিথিমির মদ্দা কোনো শোওর যেন তার কাছে না আসে' কিন্তু ঘটনাকালে(প্রথমবার বাদে) সে প্রতিবাদহীন থেকে গেছে। তার এই প্রতিবাদহীনতা ছিল পীড়াদায়ক। সবুরের মণ্ডুটা আঁশবটি দিয়ে কোপ বসানোর জন্যেও সে হাড়িদিদির উপস্হিতি কামনা করেছে, স্বপ্রণোদিত হয়ে বটির সন্ধানে উন্মুখ হয়নি। নারীর এহেন প্রতিবাদহীনতায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আর তার কাছে মেরুদণ্ড বন্দক রাখা পুরুষ সকল যথেচ্ছা সুযোগ নিতে থাকে। সাবিত্রীকেও তাই ছাড় দেয় না সবুর বা তার পরিচিতরা।
 
একই সুযোগে ঠুলি পরা মানুষের দ্বারা তাকে নিয়ে রচিত হয়েছে মুখরোচক গান, 'সাবিত্রীর এই যাওয়াতে ছেড়েছে পতি। কী কারণে মেয়েমানুষ এমন কুকর্মে মতি।' বটেই তো। পতি পরম গুরু, সে যতই মেরুদণ্ডহীন হোক, দুকড়ি আয় উপার্জনের মুরোদ নাই থাকুক, নারীর জন্য তার চেয়ে বড় সহায় আর কে হতে পারে! সহায় কেউ হয়নি সাবিত্রীর, না স্বামী, না সমাজ না পুলিশ প্রসাশন বা বিচার ব্যবস্হা। তাই এমন অপরাধের শাস্তি হিসেবে একজনেরও মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন হয়নি। নানা মেয়াদের জেলবাসের শাস্তি সদ্য বিবাহিতা কিশোরী এক মেয়ের জীবনটা তছনছের মূল্য হিসেবে ধার্য হয়েছিল মাত্র। সাবিত্রী অপহরণ ঘটনা নিয়ে হিন্দু-মুসলমান সংঘর্ষে লাশ পড়লেও তাতে সাবিত্রীর ভাগ্যের কিস্যু হেরফের হয়নি। ভাইয়ের সংসারের এককোণে বাতিল হওয়া আসবাবের মতোই জীবনকে বরণ করে নিতে হয়, আগুন পাখি হয়ে ওঠার মন্ত্র সাবিত্রীর জানা ছিল না!
 
বিংশ শতকের গোড়ায় সাবিত্রী তার ঈশ্বরের প্রতি প্রশ্ন রেখেছিল 'হায় ভগোমান পিথিমিতে মেয়ে মানুষ কেন জন্মায়!' একবিংশ শতকেও এমন আহাজারিতে পৃথিবীর বাতাস সমানভাবে ভারী হয়। ক্ষমতার রাজনীতিতে ভারসাম্য রক্ষায় একজন পূর্ণিমা রানীর জায়গায় বসানো হয় নোয়াখালীর সুবর্ণচরের চার সন্তানের হতভাগী জননীকে। যুদ্ধ বিগ্রহ, ক্ষমতায় টিকে থাকার লড়াই, কিংবা ব্যক্তিগত আক্রোশ মিটাতে নারী আজও দুপেয়ে সারমেয়দের লক্ষ্যবস্তু। সবুরদের মতো সারমেয়রা আজীবনই পশু থেকে যায়। মানুষ হতে পারে না। তাদের থাবার নীচে নারী শরীর কেবলি মাংস পিণ্ড।
 
অত্যন্ত পছন্দের লেখকের কাছ থেকে বহুদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া "সাবিত্রী উপাখ্যান" নিয়ে যতটা আশা ছিল, তা যেন পুরোপুরি মেটেনি। কাহিনি বর্ণনার মাঝে মাঝে ঘটনার সাক্ষি সবুদের ডকুমেন্টেশনের উপস্হাপনা খুব একটা উপভোগ্য লাগেনি, বরং কোথাও কোথাও কাহিনি ছন্দ হারিয়ে বিরক্তি এনেছে। এটা সম্পূর্ণই আমার মতামত। এই উপন্যাসের সবচেয়ে বড় অলঙ্কার হাসান আজিজুল হকের নিজস্ব জাদুকরী ভাষার কারুকার্য। তাঁর অনবদ্য শব্দচয়ন আর ভাষাভঙ্গির সাথে পরিচিতি পাঠক মন নতজানু হবে এটা নিশ্চিত। ২১৫ পাতাকে বাহুল্যই মনে হয়েছে।
 
ছোটো গল্প শকুন:
 
কিছু সাহিত্য পাঠের অভিজ্ঞতা আসলে শব্দে বয়ান করা কঠিন। শুধু সাহিত্য বলছি কেন, কিছু চলচ্চিত্রকেও আমার তেমন মনে হয়। একজন আকাঠ পাঠক কিংবা দর্শক হিসেবে, মহৎ কিছু পড়ে ফেলবার বা দেখে নেবার বিপরীতে যে প্রাপ্তি সংযোগ ঘটে, সেটা পইপই করে বলতে না পারার সীমাবদ্ধতা কষ্ট দেয় বৈকি। নিজের সীমাবদ্ধতা অকপটে স্বীকার করেই একখানা জটিল গল্প পাঠের কথা নিজের মতো করে বলতে চাই। এই ভাবনার ছাঁচে অন্যদের ভাবনা খাপ নাও খেতে পারে।
 
১৯৬০ সালে 'শকুন' সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত "সমকাল" পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্যের ছোট গল্পের রাজপুত্তুর হাসান আজিজুল হকের অভিষেক ঘটে। বলাই বাহুল্য, নামকরা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রথম গল্পেই তিনি ছক্কা হাঁকিয়ে পাঠক মনে জায়গা করে নেন। বহুদিন সাহিত্যের ক্রিজে স্বমহিমায় তিনি দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২১'এর ১৫ নভেম্বর সফলতম ইনিংসের সমাপ্তি ঘটিয়ে তিনি চলে গেলেন ভুবনডাঙ্গার চিরসবুজ মাঠে।
 
হাসান আজিজুল হক পাঠে অভ্যস্ত পাঠক মাত্রই জানেন তাঁর লেখালেখির আখ্যান গড়ে ওঠে বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে। আর সে বাস্তবতার কেন্দ্রমূলে মানুষের অবস্হান। মানুষের স্বভাবজাত বিভিন্ন আচরণগুলোর যেমন দেখা পাই তার গল্পের পরতে পরতে। পাশাপাশি মানুষের সংগ্রাম, নিপীড়ণ, সমাজ রাষ্ট্র বা ধর্মের কাছে নতজানু অসহায় মানব জীবনও সপাটে ওঠে আসতে দেখা যায় তাঁর লেখনীতে। সমাজের নানা অসঙ্গতি, বিকৃতি, মানবিকবোধ শূন্যতা কিংবা রাজনীতি সচেতনতা ভণিতাহীন ভাবেই দেখা যায় আজিজুল হকের লেখায়।
 
এখন কথা হচ্ছে আলোচ্য গল্প 'শকুন' এ কি আছে? পাঠক কেন পড়বেন এ গল্প?
 
সোজা সাপ্টা ভাবে বলতে গেলে এ গল্পে মানুষের ভেতরের প্রতিহিংসাপরায়ণতা, তার ভণ্ডামি, ক্রুরতা কখনও সরাসরি, কখনও বা বিভিন্ন প্রতীকের মাধ্যমে বয়ান করেছেন হাসান আজিজুল হক। তাঁর অনেক গল্পে মানুষে-মানুষে কিংবা নারী পুরুষের সম্পর্কের অন্তদ্বন্দ্ব- ঘাত প্রতিঘাত নির্মাণে তিনি এতটা দক্ষতার সাথে ফুটিয়ে তোলেন, মনে হয় যেন তিনি সংশ্লিষ্ট চরিত্রগুলোর ভেতর বাড়িতে সপাটে হানা দিয়ে তুলে আনলেন প্রত্যক্ষের বয়ানসকল। একইভাবে 'শকুন' গল্পে একদল বালকের ভেতর বাড়িতে বসেই যেন তিনি দেখে গেছেন শিশুমনের অহেতুক কৌতূহল, ভাবনাহীন সময় খরচের আনন্দ কিংবা চরম নিষ্ঠুরতাকে। বিপাকে পড়ে যাওয়া পাখিকুলের এক হিংস্র প্রতিনিধির প্রতি বালকদের হিংস্র উন্মত্ততা, তাকে প্রতিদ্বন্দী ভেবে বঞ্চনার হিসাব কড়ায় গণ্ডায় উসুলের ছেলেমানুষি আনন্দ, পাশাপাশি শিশুমনের সরলতা, কুসংস্কারে ছেয়ে যাওয়া অবোধ ভাবনার সবটাই আজিজুল হক উপস্হাপন করেছেন তাঁর সহজাত ভঙ্গিতে।
 
'শকুন' গল্পের চরিত্রগুলোকে দিব্যি দুটো ভাগে ভাগ করা যায়। একদলে, দস্যিপনায় মেতে ওঠা সবাক একদল বালক। সে "দলের মধ্যে গরু চরানো রাখাল আছে। স্কুলের ছাত্র আছে। স্কুলের ছাত্র অথচ দরকার হলে গরু চরায়, ঘাস কাটে, বীজ বোনে এমন ছেলেও আছে।" অন্য দলে বয়স্ক, উড্ডায়নক্লান্ত, কোনো অজানা প্রতিপক্ষের কাছে মার খেয়ে পর্যদস্তু এক শকুন। যে "পারলে কোন বহু পুরনো বটের কোটরে, কোন পুরীষ গন্ধে বিকট আবাসে, কোন নদীর তীরে বেনাঝোপের নিচে শেয়ালের তৈরি গর্তে লুকিয়ে যাওয়ার মতলব"এ থাকলেও পাকেচক্রে এসে পড়ে প্রথম দলটির সামনে।
 
সন্ধ্যার ফিকে অন্ধকারে গল্পরত বালকের দল আর এই শকুনটিকে ঘিরে গল্পের আখ্যান গড়িয়েছে। পাকানো সুতার গুলটি খুলে যাওয়ার মতো গল্পের ভাঁজ যত খুলেছে, মানুষ নামে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের রাঙতার পলেস্তরা তত যেন খসে খসে পড়েছে। বেরিয়ে এসেছে তার অন্তঃসারশূন্য ভণ্ডামী। হাতের নাগালে বসে থাকা বন্ধুর প্রতি জেগে উঠছে সন্দেহবাতিক মনের ভীতি- "ধর্ সবাই ভূত আর সবাই মানুষের ভ্যাকে এয়েছে। না, না আমি ভূত লই, এ্যাদা আমি মানুষ। তাইলে আমাকে ছুঁয়ে দ্যাক, আমি যদি মানুষ না হই, আমি উড়ে মিরিয়ে যাব, ছোঁ আমাকে। আমি ছুঁতে পারব না। সবাই সবাই-এর থেকে সাবধান হয়ে ক্যানেলের পাড়ে বসল। একে অপরের দিকে তীব্র চোখে তাকাচ্ছে।"
 
বাগে পাওয়া প্রতাপশালী কাউকে সহজাত ভাবেই হয়ত মানুষ চায় তার গোমর ভেঙে মুচড়ে ধ্বংস করে দিতে। সে কাজে হিংস্রতার মাত্রা হারাতেও তার সংকোচ থাকে না। এ গল্পের শিশুরা বুঝি সেই অনুভূতির প্রতিধিনিত্বকারী। বিপর্যস্ত শকুনটা শকুনি কিনা সেটা জানতে চাওয়াতেও চিরন্তন পুরুষতান্ত্রিক মনোভাবের চিবুক নড়ে উঠতে দেখি। 
 
শকুনটাকে ধাওয়া করে জামু, রফিকের দল যখন উৎকট আনন্দে মেতে ওঠে, ফাঁদে পড়ে যাওয়া শকুনটা নিজেকে রক্ষার তাগিদে প্রাণপণ ছুটতে থাকে গাঁয়ের পথে- তাকে পাকড়াওয়ের খেলায় মেতে ওঠা শিশুদের নিষ্ঠুরতার বয়ান পড়তে পড়তে, দুম করে কেন জানিনা হাসান আজিজুল হকের দ্বিতীয় উপন্যাস “সাবিত্রী উপাখ্যান” এ সাবিত্রীকে নিয়ে সাবু গ্যাং এর পাষবিক আনন্দে মেতে ওঠার দৃশ্যটা মনে ভেসে ওঠে। এ স্মরণ এক অসহায় পক্ষের প্রতি সবল পক্ষের বীভৎস নিষ্ঠুরতার কারণে কিনা জানিনা, কিন্তু মনে পড়েছে। যদিও সাবিত্রী উপাখ্যানে সাবিত্রীর উপর আসা প্রথম আঘাতে ষোল বছরের কিশোরী মেয়েটা সাধ্যমত প্রতিবাদের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু শকুন গল্পে আগে থেকেই বিপর্যস্ত শকুনের অসহায় আত্মসমার্পণ ছাড়া গতি ছিল না।
 
শেষমেশ মানুষের নিষ্ঠুরতা আর ভণ্ডামির সাক্ষী হিসেবে পাশাপাশি মৃত শকুন আর এক সদ্যোজাত মানব সন্তানের কচি শরীরের উপস্হাপনা আমাদের মনোজগতে যে তীব্র ঝাঁকুনি দেয়, তার অভিঘাতে বিবেকবান পাঠক মাত্রই বিব্রত লজ্জিত হবেন। এই লজ্জাবোধকে আরেক দফা কানমলা দিতে লেখক যখন বলেন, “শকুন শকুনের মাংস খায় না!” অথচ জমিরদ্দি ও কাদু শেখের বিধবা বোনের অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানটির পরিণতি সাজানো মানুষের দমফাইয়ে ফাঁপানো বুদবুদ প্রচণ্ড শব্দে ফেটে গিয়ে ভিন্ন বক্তব্যেরই ইঙ্গিত দেয়। আমাদের শঠতা, নিষ্ঠুরতার চালচিত্র ফুটে ওঠে মৃতদের স্হির চোখের মণিতে। সে চোখ নিথর হলেও সেই চোখে চোখ রাখা দায়! 
 
“শকুন” মানুষের মনে ঘাপটি দিয়ে থাকা শঠতা, হিংস্রতা আর নেতিবাচক প্রবৃত্তিগুলোর মূর্ত হয়ে ওঠার গল্প যেন। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে চাইলে এ গল্প পাঠ করা প্রয়োজন।





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন