গৌতম দের গল্প : সালংকারা



-তোমার বগলে ওটা কি? সুমিতা ভ্রুজোড়া কুঁচকে জিগ্যেস করে।
-ক্যালেন্ডার। বাঁ বগলে ধরা ক্যালেন্ডারটা ডান হাতে নিয়ে সাধুচরণ চাকলাদার বেশ গর্বের সঙ্গেই বলে।
-ভালই হল। নতুন বছর পড়ে একমাস হতে চলল...ঘরে একটাও নতুন ক্যালেন্ডার নেই। বলতে বলতে সুমিতা রান্নাঘরে যায়। ওভেনে চায়ের জল চাপায়। মনটা খুশিতে ভরে ওঠে। আবার ফিরেও আসে টেবিলের কাছে।

এইসময় তারা একসঙ্গে চা খায়। সঙ্গে মুড়ি আর চপ। আজকে যেমন বেগুনি নিয়ে এসেছে সাধুচরণ। কাঁধের ব্যাগ থেকে বেগুনির প্যাকেটটা বার করে সুমিতা। ঠাণ্ডা এবং নেতিয়ে গেছে। খবরের কাগজের ঠোঙা ব্লটিংপেপারের মত তেল শুষে নিয়েছে। ডান হাতের আঙুল ক্যারিব্যাগের ফাঁসে ঝুলিয়ে রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে সুমিতা বলে-দেখে তো মনে হচ্ছে ভাল ক্যালেন্ডার...।

-হ্যাঁ ভাল...ভীষণ ভাল। তুমি কোনও দিন এমন ক্যালেন্ডার দেখনি। বলে সাধুচরণ ফ্যানের রেগুলেটরের নবে মোচড় দেয়। সিলিংফ্যানটা বনবন করে ঘুরতে থাকে। ওপর দিকে তাকিয়ে একটুক্ষণ চোখ বোজে।
আজ মারাত্মক গরম পড়েছে। স্যান্ডোগেঞ্জিটা ভিজে কাঁই। সেটাও দু'হাতের ঝটকায় খুলে ফেলে। তারপর টেবিলের সামনের চেয়ারটায় থপ করে বসে পড়ে। অমনি পাঁচ নম্বর ফুটবলের মত ভুঁড়িটা জেগে ওঠে।

-ফুলের ছবি আছে নাকি?
-না।
-পাখির ছবি?
-না।
-তবে কি ঠাকুর-দেবতার?
-তাও না।
-তাহলে!
-অত হাপাহাপির কী আছে শুনি...আন্দাজ কর! বলে সাধুচরণ গিন্নির দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসে। হাসতে হাসতে মাথা দোলায়।
 
সুমিতার এই ছেলেমানুষী স্বভাবটা তার ভাল লাগে। বিয়ের পর থেকে দেখছে সে। যেন তর সয় না কিছুতেই। এখুনি বলতে হবে সব কিছু। সে স্বামীর শরীরের ওপর প্রায় ঝুঁকে পড়ে। তারপর স্বামীর কাঁধে ধাক্কা মেরে বলে-আহা বল না...!

-খুলেই দেখ। সাধুচরণ গিন্নির হাতে ক্যালেন্ডারটা ধরিয়ে দিয়ে বলে-দেখলেই বুঝতে পারবে।
-বাব্বাঃ এতো দেখছি ঘ্যামা ক্যালেন্ডার...ভীষণ ভারী! সুমিতা ক্যালেন্ডারটা হাতে নিয়ে এদিক ওদিক করে বলে।
-হুম ঠিক বলেছ। খালি গায়ে নিজের শরীরে হাত বোলাতে বোলাতে বলে-তোমার এই ভাঙা ঘর উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। এই ক্যালেন্ডার পাড়ার কারোর বাড়িতে নেই...বুঝলে হে গিন্নি! তারপর গর্বভরে গিন্নির দিকে তাকায়। ভ্রুজোড়া বারকতক নেচে ওঠে। একটু ম্লান হাসে।

-এটা ক্যালেন্ডার না অন্য কিছু?
-তোমার সন্দেহ হচ্ছে নাকি!
-না বাপু, বাপের জন্মেও এমন ক্যালেন্ডার দেখিনি।
-হ্যাঁ, নামী কোম্পানির। আমিও কি দেখেছি ছাই...!
-ক্যালেন্ডারের আবার প্যাকেট! বলেই সুমিতা ফিক করে হেসে ওঠে। আবার ছেলেমানুষী স্বভাব ভেসে ওঠে চোখেমুখে। তারপর হাসি আর চাপতে পারে না। বেশ জোরের সঙ্গেই হেসে ওঠে। সাধুচরণ সেই হাসিতে যোগ দেয়।

-আহা অত কথা কিসের? দেখই না খুলে...চমকে যাবে!

প্যাকেটের ভিতর থেকে ক্যালেন্ডারটা বের করে সত্যি সত্যি রীতিমতো চমকে ওঠে সুমিতা। আগে এমন ক্যালেন্ডার দেখেনি সে। এমনিতে সুমিতার চোখজোড়া বেশ বড়। টানা টানা। শান্ত শান্ত। অনেকটা হরিণের চোখের মত। সারা মুখটায় ওই দুই চোখ যেন দামী গয়না হয়ে সারাক্ষণ ঝলসায় এই আধো অন্ধকার ঘরে। সাধুচরণের ভাল লাগে। ক্লান্তি জুড়িয়ে যায়।

ক্যালেন্ডারটা দেখার পর তার মনে হয়েছিল, এই গয়নাগুলো বুঝি সুমিতার জন্য। একমাত্র সুমিতাকেই মানাবে। চেনাই যাবে না। মনে হবে, সে যেন কোনও এক দূর গ্রহের এক অজানা অচেনা নারী...।
 
সত্যি কথা বলতে কি সুমিতার মত সেও প্রথমে চমকে গেছিল। এখনও তার চোখে চমকের ছটা লেগে আছে। প্রতিটা গয়নার সঙ্গে স্ত্রীকে সাজিয়ে মনের আয়নায় দেখার চেষ্টা করছিল। অফিস থেকে বাড়ি ফেরা ইস্তক। বাসে বসে। ঝিমুতে ঝিমুতে। কখনও চোখ বুজে। আবার কখনও উদাস দৃষ্টিতে।
সেই গয়নাগুলোর দিকে তাকিয়ে সুমিতা এক নিঃশ্বাসে বলে-গয়নার ক্যালেন্ডার!

-হ্যাঁ। সাধুচরণ ফিসফিসিয়ে বলে।

গয়নার ক্যালেন্ডার। দামী আর্ট পেপারে ছাপা। ছাপাও চমৎকার। ধারাল ছুরির মত চকচক করছে। প্রিন্টিঙয়ের কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। একেবারে জীবন্ত লাগছে সবকটি গয়না। একটু কাৎ করলেই অমনি গয়নাগুলো টুপ করে খসে পড়বে মাটিতে। মনোমুগ্ধকর ডিজাইন সব। নাম কি? কত গ্রাম ওজন? মূল্যই বা কত? সব লেখা আছে প্রতিটা গয়নার তলায়।

সেইসব গয়নাগুলো পরে আছে দেশের নামি দামী অভিনেত্রীরা। একেবারে দারুণ মানিয়েছে। দু'হাতের দশ আঙুল থেকে কবজি পর্যন্ত যে গয়নাটি পরে এক অভিনেত্রী উজ্জ্বল পোঁজ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পাশে নিজের আঙুলগুলো মেলে ধরে। সুমিতারও আঙুলগুলো ওই অভিনেত্রীর মত। ভরাট। টসটসে। অনেকটা কাঁঠালি কলার মত। সংসারের হাড়ভাঙা খাটুনির পরেও এখনও তেমনই আছে। মা বেঁচে থাকলে ঠিক বলতেন-এই আঙুলেই তো অমন গয়না মানায়...!
 
তা ঠিক। একদম ঠিক কথা। বিয়ের প্রথম প্রথম সাধুচরণেরও ভাল লাগত সুমিতার হাতের আঙুলগুলো। সেও দু'হাতের আঁজলায় সুমিতার আঙুলগুলো নিয়ে খেলা করত। হাত বোলাত। বার বার চুমু খেত।
-বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু...। কপট রাগে বলত সুমিতা।

-কি বাড়াবাড়ি দেখলে তুমি। বলতে বলতে সাধুচরণ স্ত্রীর দু'হাতের তালু নিজের গালে চেপে ধরত। তারপর বলত-তুমি যখন এই হাত দিয়ে ভাত বেড়ে দাও তখন বিরিয়ানির তৃপ্তি পাই তা জানো!
-হ্যাট। বলেই হ্যাঁচকা টান মারত সুমিতা।
-হ্যাট নয় গো, সত্যি বলছি। বলেই হো হো করে হেসে উঠত সাধুচরণ। সঙ্গে সুমিতাও হাসত।

সেই ক্যালেন্ডার কখনও বাঁ হাতে কখনওবা ডান হাতে ধরে নিজের আঙুলগুলো বার বার চেপে ধরে ছেলেমানুষের মত। পাতার শেষে মাস তারিখের উল্লেখ থাকলেও সেদিকে দৃষ্টি যায় না সুমিতার।

সত্যি দামী। চমৎকার সব ডিজাইন। কত তার গম্ভীর নাম। জানেও না সবটুকু সুমিতা। চোখ ঝলসে যায় তার। তবে হালকা ধরনের কম সোনার গয়না আছে। ডিজাইনও আধুনিক। হীরে আর মুক্তো বসান। দাম তো কম নয় তাও। অনেক। অন্তত সুমিতার ধরাছোঁয়ার বাইরে।

আবার ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটায়। টিকলির হরেক বাহার। কতরকমের ডিজাইন। এক অভিনেত্রী পরেছে। কপালের মাঝখান ঝলমল করছে। মানায়নি। তবুও পরেছে। সুমিতার ডান হাতের দুই আঙুল অজান্তে ছুঁয়ে যায় সেই গয়নায়। যেন টুক করে তুলে এখুনি পরবে। তারপর আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখবে মানিয়েছে কিনা...!

সত্যি এমন ক্যালেন্ডার এই পাড়ার কারোর বাড়িতে নেই। একদম ঠিক কথা। তাছাড়া এই ভাঙা ঘরে অমন ক্যালেন্ডার মানায় না। এটাও ঠিক কথা। সুমিতা নিজের মনে বিড়বিড় করে।

এইমুহূর্তে সুমিতার যাবতীয় উচ্ছ্বাস নিমেষে তলানিতে গিয়ে ঠেকে। মনটা ফাটা বেলুনের মত চুপসে যায়। মনের ভিতর যে কি হচ্ছে নিজেই জানে না। শুধু একটা তোলপাড় করে ওঠা ঝড়ের সূচনা পাক খাচ্ছে। টের পাচ্ছে। অথচ কাউকে বলতেও পারছে না ঠিকঠাক। এমন কি স্বামীকেও।

দুরছাইয়ের মত করে ক্যালেন্ডারটা টেবিলের ওপর রেখে টগবগ করে ফোটা গরম জলের কাছে যায়। অনর্থক ওভেনের নবটা ঘোরায় আর বাড়ায়। জল উথলে পড়ে। আবার সসপেনের তলানিতে গিয়ে বিজগিরি কাটে। সুমিতার দুই ঠোঁটে অমন বিজগিরি জেগে ওঠে। অথচ কথা হয়ে প্রকাশ পায় না।
-কি গো তোমার ভাল লাগেনি?

কোনও উত্তর দেয় না সুমিতা। সে গরম জলে চা পাতা দেয়। কিছুক্ষণ আগে দেখা সেই ছেলেমানুষী স্বভাবটা যেন কাটা বাল্বের মত নীরব অন্ধকারে ডুবে গেছে। সাধুচরণ আরও দু'পা এগিয়ে যায় রান্নাঘরের দিকে। তারপর জিগ্যেস করে-তাহলে বল কোথায় টাঙাব?

-ও দিয়ে আমার হবেটা কি শুনি? উলটে অনেকটা ঝাঁজ নিয়ে সুমিতা প্রশ্ন করে।
-কেন?...নতুন বছর...নতুন ক্যালেন্ডার...এই তো তুমি বললে সেদিন!
-অস্বীকার তো করছি না...।
-তাহলে?
-বাংলা তারিখ আছে কী!
-না। তা নেই। তাছাড়া এখন আর বাংলা তারিখের দরকার পড়ে না।
-আমার পড়ে।
-তাইনাকি! আগে তো জানতাম না!
-কোনও দিন জানার চেষ্টা করেছ?
-বলতো আজ বাংলা মাসের কত তারিখ?
-খুব সম্ভবত দোসরা ফাল্গুন। ওভেনের আগুন উসকে দেওয়ার মত করে ফস করে বলে সুমিতা।
-দোসরা কেন? তেসরাও তো হতে পারে!
সাধুচরণের এই কথার কোনও গুরুত্ব দেয় না সুমিতা। সে লিকার চা ছাঁকতে ছাঁকতে বলে-কদিন আগে মাঘী পূর্ণিমা গেল, আমি বুঝতেই পারিনি। পাশের বাড়ির মেজদি বললে...কি গো সুমিতা, সিন্নি কই...!
-কেন?
-পূর্ণিমা চলে গেল, তোমার শাঁখের আওয়াজ পেলাম না...কাল তো মাঘী পূর্ণিমা ছিল...আমি তো থ! চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে সুমিতা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারও বলে-পারলে বাজার থেকে একটা সাদামাঠা বাংলা ক্যালেন্ডার আমার জন্য এনো। দশকর্মা ভান্ডারে পাবে। আমার কাজে লাগবে।

-তাহলে এটা কোথায় টাঙাব?
-তোমার মাথায়।

সাধুচরণ চায়ে চুমুক দিতে দিতে গিন্নির কথায় হেসে ফেলে। গিন্নি ঠিক বলেছে, এমন ক্যালেন্ডারের দরকার নেই। কোথায় টাঙাবে? কয়েকটা ক্যালেন্ডার এদিক সেদিক দেয়ালে ঘুপচে আছে। তাও অনেক বছরের পুরানো। ফেটেফুটে গেছে। ঝাঁটারশলার মত টিনের স্টিক থেকে কয়েকটা ক্যালেন্ডারের কোণা ঝুলে পড়েছে। তারিখের পাতাগুলো নেই। সবই ঠাকুর-দেবতার ছবি। ছবির কপালে চন্দনের টিপ। টিপের ঢিবি। সুমিতা নিয়মিত ধুপধুনো দেয়। ঘণ্টি বাজায়। চোখ বুজে প্রার্থনা করে।

তাছাড়া ঘরের দেয়ালে জায়গা কোথায়? চারদিক নোনা ধরে গেছে। খসে পড়েছে প্লাস্টার। জায়গায় জায়গায় ইট ভঙ্গুর শরীর নিয়ে তাকিয়ে আছে। প্রতিদিন সুমিতা সুড়কির মত ধুলো ঝাঁট দিয়ে ফেলে ঘরের বাইরে। ষাট বছরের ওপর হবে বাড়ির বয়স। ভাগ্যিস সাধুচরণের বাবা করে গেছিলেন। তাঁর নিজের দ্বারায় হতো না। বরং আগামীকাল অমলকে দিয়ে দেবে ক্যালেন্ডারটা। ল্যাটা চুকে যাবে। মনে মনে এমনই সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় সাধুচরণ। গিন্নির কথাই ঠিক, সত্যি এমন ক্যালেন্ডার টাঙানোর মত দেয়াল নেই ঘরে। একেবারে বেমানান। টেবিলের নিচে গড়িয়ে পড়ে ক্যালেন্ডারটা। সাধুচরণ তোলেও না।



-আমার মা-বাবা খালি হাতে তোমার কাছে পাঠায়নি। সুমিতা ঘরের ডান দিকে শ্বশুর আর শাশুড়ির ছবির দিকে তাকিয়ে বলে।
-আমি তো কোনও দিন তা অস্বীকার করিনি। সাধুচরণ ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলে। তারপর টুকরো হাই তোলে। মুখের কাছে আঙুলের তুড়ি মারে।

-একটা একটা করে গয়না সংসারের গহ্বরে মিলিয়ে গেল। বলতে বলতে পাশ ফেরে সুমিতা। পাঁচ বছরের ঘুমন্ত মেয়েকে আরও বুকের গভীরে চেপে ধরে।

-তা ঠিক। সাধুচরণ জিব দিয়ে চকচক শব্দ করে। তারপর পেল্লাই হাইয়ের সঙ্গে ক্লান্ত স্বরে যুদ্ধ করতে করতে বলে-আজ অ্যাত বছর বিয়ে হল, একটা গয়না তোমাকে গড়িয়ে দিতে পারিনি। এটা একদম খাঁটি কথা বলেছ। শেষ বাক্যটা বেরুবার আগেই আবারও একটা বিরাট হাই ওঠে সাধুচরণের। হাঁউ মাঁউ খাঁউয়ের মত শোনায়। তার মধ্যেই আবারও আঙুলের তুড়ি।

এটা যে কথার কথা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না সুমিতার। তবুও টুকটুক করে সে যতটুকু করেছে সবই তার জমানো টাকায়। বাবা যখন আসত তখন মেয়ের হাতে কিছু গুঁজে দিত টাকা। এমনকি দাদাও দিত কিছু কিছু। সাধুচরণের কাছে কিছুই লুকাত না। তবে কত দিয়েছে তা বলত না সুমিতা।

সেই টাকায় গয়নার কিস্তি হত। মাসে মাসে পেমেন্ট করত। পাড়ার দোকান। রমরম করে চলে। অনেক খদ্দের আছে। আসলে ছেলেটা ভাল। ডাক নাম মিন্টু। দু'মাসে পেমেন্ট দিয়েই গয়না শোভা পেত ক্রেতার শরীরে। এইভাবে সে নাকছাবি আর কানের একজোড়া মটর ডালের দানা গড়িয়েছে সুমিতা।

-নাও...ঘুমিয়ে পড়ো। কাল তো আবার সকালে উঠতে হবে। সুমিতার কথা বলার অপেক্ষায় থাকে না সাধুচরণ। তার নাক ডাকার আওয়াজ শুরু হয়ে যায়।





অন্য দিন বিছানায় শরীর বিছিয়ে দিলেই অমনি ঘুম আপনা আপনি দু'চোখে হামলে পড়ত সুমিতার। আজ একটুও ঘুম নেই চোখে। গাঢ় অন্ধকার ঘর। অথচ কেন যে চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে! জানে না। জানে না সে! দুচোখের সাদা অংশটা যেন এক টুকরো বরফ। এবার বুঝি গলতে শুরু করেছে। সেইজন্য কি চোখের পাতা ভারী হয়ে আসছে! চোখ বুজেই টান টান হয়ে শুয়ে থাকে সুমিতা। প্রকৃত ঘুম না আসলেও একটা ঘুমের ঘোর শরীরের অনেক ভিতর থেকে উঠে আসে দুচোখে। ঠিক তখনই টের পায় আরও একটা অস্তিত্বের। ওই যে চকচকে ভারী আর দামী ক্যালেন্ডারটা না...! ক্যালেন্ডারের দামী গয়নাগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুহূর্তে। গয়নাগুলো সত্যি সত্যি জীবন্ত হয়ে উঠেছে এই সময়ে। চোখের সামনে দুলছে। ফরফর করছে। অথচ কোনও শব্দ নেই। বেমালুম বাতাসে ভাসছে। অনেকটা নৌকার পালের মত। একবার ডান দিক। আবার বাঁ দিক। সেই সঙ্গে হীরের দ্যুতিতে সারা ঘরময় আলোয় আলোয় ঝলমল করছে।

সুমিতা আর বিছানায় শুয়ে থাকতে পারে না। বিছানা ছেড়ে একলহমায় মাটিতে নেমে পড়ে। তারপর আম জাম কুড়নোর মত লাফিয়ে লাফিয়ে ভয়ানক ক্ষিপ্রতায় একটা একটা করে গয়না কোচরে ভরে নেয়। সুমিতা খুব খুশি। ভীষণ খুশি। ঘরে পাক মারে। একবার। দু'বার। বার বার। তারপর পাশের ঘরে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে একটা একটা করে গয়নাগুলো পরে।

আজ সুমিতার শরীরে একটাও সুতো নেই। কেবলই গয়নার আভরণ। সেই আভরণের দ্যুতিতে ঘর ভরে যায়। সুমিতা সারা ঘরময় হেঁটে বেড়ায়। বিছানার চারপাশে ঘোরে। আবার ড্রেসিংটেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। যত সময় যায়, হীরের দ্যুতিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ঘর। ড্রেসিংটেবিলের আয়নায় ঝাপসা লাগে সবকিছু। তারপর সারা ঘর ধোঁয়াশায় ভরে ওঠে।




পোড়া গন্ধে নিমেষে ঘুম ভেঙে যায় সাধুচরণের। বার বার নাক টানে। চেনা গন্ধ। ভীষণ চেনা। শ্মশানে মানুষ পোড়ার গন্ধ। আশপাশে তো কোনও শ্মশান নেই! পাশ ফেরে। গিন্নি বিছানায় নেই কেন? কোথায় গেল অ্যাত রাতে?

ঝট করে বিছানা থেকে নামে সাধুচরণ। তারপর পাশের ঘরে যায়। ভয়ানক অবাক হয়ে যায়। এ কি করে সম্ভব! সুমিতা বিপুল গয়নার জলুসে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে একটু একটু করে পুড়ছে। অথচ টের পাচ্ছে না। টের পাচ্ছে কেবল সাধুচরণ...!

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

7 মন্তব্যসমূহ

  1. গল্পটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে যথেষ্ট ভালো লাগলো। গৌতম দে"র গল্পে জীবন থাকে। ধন্যবাদ গৌতম।

    উত্তরমুছুন
  2. গয়নার আগুনে পুড়ছে সুস্মিতা। ভালো লাগলো।

    উত্তরমুছুন
  3. শেষ পর্যন্ত বোঝা যায় না এমনই বিস্ময়কর নির্মাণ ।

    উত্তরমুছুন