বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

মোহাম্মদ ইরফানের গল্প - রবিকাস্ট


 

অফিস থেকে বেরুতেই বাতাসের ঠান্ডা স্পর্শ অনুভব করে সুমন। শীতাতপ যন্ত্র থেকে বেরিয়ে আসা মেকি ঠান্ডা নয় এ। একেবারে মাটি থেকে উঠে আসা সোঁদা সিক্ত সমীরণ। মুখমণ্ডল ছুঁয়ে নাসারন্ধ্র ভেদ করে স্মায়ুতন্ত্রের ভেতর দিয়ে মগজের কোষে কোষে পৌঁছে স্মৃতিমেদুর করে তুলে সুমনকে আবহাওয়ার এই ক্ষণিক আর্দ্রতা। সম্বিৎ ফিরতেই টের পায় সুমন ছাতাটা নিতে ভুলে গেছে সে। আজও।

এদিকে মেঘ আর রোদ যেভাবে “আকাশময় পরস্পরকে শিকার করিয়া ফিরিতেছে” জলধরের জয় হতে পারে যেকোন মুহূর্তে। অফিসভবন থেকে গাড়ি রাখার জায়গা পর্যন্ত পথটুকু একরকম দৌড়েই পার হয় সুমন। পই পই করে বলে দিয়েছে তানিশা, “বৃষ্টি লাগিও না মাথায়। গলা বসে যাবে।“
গাড়ি চালু হতেই অডিও-তে নিজের আর তানিশার কণ্ঠ শুনতে পায় সুমন। মুচকি হাসে আপনমনে স্ত্রীর সাবধানবাণীর মর্মোদ্ধার করতে পেরে। গলার যত্ন নিতেই হবে। কণ্ঠশিল্পী ওরা এখন। যুগলবন্দী গদ্যবাচিক। দ্বৈতকন্ঠে ওদের গল্পপাঠই ধ্বনিত হচ্ছে গাড়ির শব্দযন্ত্রে। রবি ঠাকুরের গল্প। শখের প্রজেক্ট এটি সুমন আর তানিশার। আজকাল তো কেউ আর বইয়ের পাতা ওল্টাতে চায় না। তাই ওরা ঠিক করেছে পডকাস্টের মত কিছু একটা করবে রবীন্দ্রনাথের গদ্যগুলো নিয়ে। শোনা যায় রবি ঠাকুর নিজেও সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, ওনার গান বাঙ্গালী ঠিকই গাইবে, তবে গদ্য পড়ার লোক পাওয়া যাবে না ততটা।

গান গাওয়ার-শোনার ব্যাপারটা নিঃসন্দেহে উপভোগ্য। গীতে-গায়কীতে রসের আবহ তৈরি করা গেলে আস্বাদনের কাজটি সহজ হয়ে ওঠে অনেকটাই। কবিতার আবৃত্তিও শোনে লোকে বেশ। তবে গদ্যের ব্যাপারটি ঠিক তেমন নয়। কেবল কাহিনীসাগরে গা ভাসিয়ে দিলেই হয় না, মনোযোগী পাঠক কিংবা উৎকর্ণ শ্রোতা হওয়া চাই গল্পের প্রবাহ ধরে এগোনোর জন্যে। কাগজে ছাপা পুস্তক-পত্রিকার সংখ্যা যেভাবে কমছে, পাঠের জায়গা দখল করে নিচ্ছে শ্রবণ, স্বয়ং রবিঠাকুরের গল্প-উপন্যাস পড়েছেন এমন বাঙ্গালী কজন খুঁজে পাওয়া যাবে অদূর ভবিষ্যতে এনিয়ে শংকা প্রকাশ করছেন অনেকেই। রবিঠাকুরের গল্পগুলো শ্রাব্যাকারে উপস্থাপনের দায়িত্ব নিতে পেরে তাই রীতিমত আনন্দিত, গর্বিত বোধ করেছিল সুমন আর তানিশা। ২ দু’জনাই যে ওরা সাহিত্যানুরাগী এ’টি সুমন-তানিশা জেনেছিল শুরুতেই। প্রেমের বিয়ে নয় ওদের।

বিদেশে চাকুরি করা সুমন বিয়ে করার জন্য দেশে গেলে খুঁজে পেতে তানিশাকে বের করেছিল সুমনের বাড়ির লোকেরা। খালা চাচারা কথাবার্তা সারার পর সুমনকে কনের নম্বর দেয়া হলে অনেক চিন্তা ভাবনা অনেক খোঁজাখুজি করে ফোনের বোতামের সাথে ধ্বস্তাধস্তি করে একটি খুদেবার্তা তৈরি করেছিল সুমন – “কন্যার বাপ সবুর করিতে পারেন, কিন্তু বরের বাপ সবুর করিতে চাহেন না।“ “কন্যার ঋষিবাবা ধ্যানে আছেন।” ত্বরিত প্রত্যুত্তরে পুলকিত সুমন তৎক্ষণাৎ সম্মতি দেয়। বহুবার শুনে ওদের বন্ধুদের মুখস্থ হয়ে গেছে এই গল্প। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করা সুমনের এক উদ্যোক্তা বন্ধু সব শুনে বিশাল সম্ভাবনার আভাস পেয়েছে এতে। বুদ্ধি দিয়েছে প্রজাপতির নির্বন্ধ ডট কম নামে ম্যাচ বা টিন্ডারের আদলে নিখাদ বাঙ্গালী প্রেমোদ্যোগে খুলে বসার। অন্তর্জালে গড়ে উঠবে প্রেমের ফাঁদ পাতা ভুবন। রবীন্দ্র,নজরুল, জীবনানন্দ-মানিকের গল্প কবিতা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক করতে পরস্পরের সঙ্গী বেছে নেবে দেশ বিদেশে ছড়িয়ে থাকা বাঙ্গালী ডায়াস্পোরার, দুই বঙ্গের ছেলেমেয়েরা। শেষ পর্যন্ত আর উদ্যোগপতি হওয়া হয়ে ওঠেনি সুমন বা তানিশার। তারা বরং শুরু করেছে এই পডকাস্ট যাতে না আছে পাত্তি, না হবে তারা পতি। এতে কেবলই পরিশ্রম। বন্ধুদের অনেকের চোখেই পন্ডশ্রম। ৩ সুমন অবশ্য পডকাস্টে না গিয়ে ব্রডকাস্টে যেতে চেয়েছিল। ওর ধারণা ছিল গুচ্ছের টাকা দিয়ে কেনা চৌকস মুঠোফোন থাকলেই কেবল পডকাস্ট শোনা যায়; আর ব্রডকাস্ট শোনা সম্ভব নানান ভাবে - কম্পিউটারে, রেডিও-টিভিতে কিংবা সিডি-টেপে বাজিয়ে। তানিশাই ভুল শুধরে দিল ওর। পডকাস্ট আর ব্রডকাস্ট যে আদতে একই জিনিস পার্থক্য কেবল হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া-প্রযুক্তিতে অন্তর্জাল ঘেঁটে এসব তথ্য বের করে হাজির করার পর সুমন হাসতে হাসতে বলেছে, “এই না হলে কি আর তথ্যপ্রযুক্তিবিদের স্ত্রী।“ শুরু হল যুৎসই একটি বাংলা নামের খোঁজ। অভিধান ঘেঁটেঘুটে কঠিন এক নাম বের করেছিল সুমন – রাবীন্দ্রিক সম্প্রচার। শেষ পর্যন্ত অবশ্য তানিশার দেয়া একটি নামই বেছে নেয় ওরা – “রবিকাস্ট।”

তানিশার উপস্থিত বুদ্ধিতে আরো একবার মুগ্ধ হয় সেদিন সুমন। এত সুন্দর একটি নাম অভিনব এই প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আশানুরূপ সাড়া পায়নি ওরা শুরুতে। সমালোচনা হয়েছে প্রচুর। এর কতকটা অবশ্য যথার্থ এবং জরুরী। লেখকস্বত্বের ব্যাপারে বিশেষভাবে সতর্ক করেছেন দু-একজন। সদ্য স্বত্বসীমা উত্তীর্ণ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা বেছে নেয়ার এটিও একটি কারণ। এত সতর্কতা সত্ত্বেও শেষ রক্ষা হয়নি। ঠাট্টা-মশকরা সহ্য করতে হয়েছে অনেক।। পডকাস্টের নাম বিকৃত করে কেউ কেউ বলছে – “রবির কষ্ট”। কেউ বা আরো এক কাঠি বাড়িয়ে – “রবি কাষ্ঠ”। “শেষ পর্যন্ত কবিগুরুকে কাঠ বানিয়ে দিলেন?,” “কি দাদা, কোবি নিয়ে এসব হাবিজাবি আর কতদিন,” -এমন নানা টীকা-টিপ্পনি গায়ে না মেখে নিয়ম করে গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো এক এক করে রেকর্ড করে চলেছে সুমন আর তানিশা। বেসমেণ্টের ঘরে কাজ চালানোর মত করে স্টুডিও বানিয়েছে ওরা। ব্লু ইয়েতির মাইক্রোফোন আর বিনামূল্যের শব্দ-সম্পাদনা সম্ভার অডাসিটি দিয়ে রেকর্ডিং-এর কাজ শুরু করেছে। ডিম রাখার খোপ খোপ করা বাক্স অনেকদিন ধরে জমিয়ে দেয়ালে সেঁটে দিয়ে শব্দ নিরোধক করেছে কক্ষটিকে। এতসব করার পরও বিরক্তিকর একটি মৃদু ঘড় ঘড় আওয়াজ থেকেই গেছে রেকর্ড করা ট্র্যাকে। আনাড়ি হাতের চিহ্ন ঢেকে দিতে আকর্ষণীয় সব সংগীতাংশ জুড়ে দিয়েছে গল্পের নানান জায়গায়, বিশেষ বিশেষ মোচড়ে। গাড়ির অডিওতে বেজে চলেছে তাদের সেই ভালোবাসার ধন, রবিঠাকুরের বহুল আলোচিত একটি গল্প, তানিশা-সুমন যৌথ প্রযোজনা-পরিবেশনায়। তানিশার পড়ছে - উইলের বৃত্তান্ত শুনিয়া নবদ্বীপের মা ছুটিয়া আসিয়া বিষম গোল বাধাইয়া দিল- বলিল, “মরণকালে বুদ্ধিনাশ হয়। এমন সোনার-চাঁদ ভাইপো থাকিতে— ” অতঃপর সুমনের কন্ঠ- রামকানাই যদিও স্ত্রীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করিতেন— এত অধিক যে তাহাকে ভাষান্তরে ভয় বলা যাইতে পারে— কিন্তু তিনি থাকিতে পারিলেন না, ছুটিয়া আসিয়া বলিলেন, “মেজোবউ, তোমার তো বুদ্ধিনাশের সময় হয় নাই, তবে তোমার এমন ব্যবহার কেন। দাদা গেলেন, এখন আমি তো রহিয়া গেলাম, তোমার যা-কিছু বক্তব্য আছে অবসরমত আমাকে বলিয়ো, এখন ঠিক সময় নয়।”

এই মেজোবউ শব্দটি যতবার শুনে ততবারই চমৎকৃত হয় সুমন। এই একটি সম্বোধনে বাঙ্গালী পারিবারিক আবহে নারীর গৌণতা কি সুন্দর করে ফুটিয়ে তুলেছেন উনি। গল্পগুলো কি করে সাজানো হবে এই নিয়ে শুরুতে অনেক তর্কবিতর্ক করেছে ওরা। তানিশা চেয়েছিল গল্পগুচ্ছের ক্রম অনুসরণ করতে। সুমনের জোর মতামত এই গল্পটিই শুরুতে দিতে হবে। হাজার দেড়েক শব্দের এই গল্পে কি নেই? শ্লেষ, রস, মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর স্বার্থপরতা, ধূর্ততা এবং সরলতা। “বুঝলে তানি, বাঙ্গালী বাবু ব্রিটিশ প্রভুদের কাছে “নভেল পড়া থেকে উইল করা” অনেককিছু রপ্ত করে নিলেও নারীকে কিভাবে বেঁধে রেখেছে অন্তঃপুরে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপে সরস বর্ণনা দিয়েছেন তার গল্পগুরু মর্মস্পর্শী এক কাহিনীর ফাঁকে ফাঁকে।” “তা, মার্কিন প্রভুদের কাছ থেকে যে খুব একটা শিখছেন আজকালের বাংলাদেশী বাবুরা সে লক্ষণ কিন্তু দেখি না।” ফোঁড়ন কাটে তানিশা। “চেষ্টা তো করছে,” হাসতে হাসতে সামাল দেয় সুমন। চূড়ান্ত অধিকার সচেতন তানিশা। এসব ব্যাপারে সুস্পষ্ট ওর ধারণা। গুরুত্ব দিয়ে শোনার চেষ্টা করে সুমন ওর মতামত সবসময়ই। “রবি ঠাকুরের অবচেতনের নারীদ্বেষই ফুটে উঠেছে এগল্পে” - জোর গলায় বলে তানিশা। গল্পের দুটো মূল নারীচরিত্রের দুজনকেই নানান দোষে দুষ্ট করার কারণে সুমনের প্রিয় কবির ওপর রুষ্ট যেন তানিশা।

সুমন কবিগুরুর অন্য নানান গল্প উপন্যাসের মহান সব নারী চরিত্র টেনে আনার চেষ্টা করেছে কবির সমর্থনে। তানিশা ঠোঁট উলটে বলেছে - "হ্যাঁ, হ্যাঁ, ওনার নারীরা হয় মহিয়সী, গরীয়সী, রূপসী, বিদূষী নয় ত্যাগী, অভিমানী, সব সহ্য করতে করতে একেবারে মরেই যায়। তোমার তনুবিবি কই ওনার গল্পে?" কথাটা মনে ধরেছে সুমনের। সেই থেকে ভাবছে তারা একসাথে – নিরুপমা, হৈমন্তী, কুমু, মৃণাল, মৃন্ময়ী, চন্দরা ... একসাথে পড়ছে দুজনা গল্পগুলো। পডকাস্টে যোগ হচ্ছে নূতন নূতন গল্প। চমৎকার উপভোগ করছে ওরা। প্রায় একশ বছর আগে লিখা গদ্য বুঝতে অসুবিধে হচ্ছে না এতটুকু। মাঝে মাঝে দু-একটি বাক্য অবশ্য কিছুই বুঝতে পারে না দুজনেই। অনেক কষ্টে পাঠ করা সেসব বাক্যভর্তি অচেনা শব্দগুলো প্লেব্যাকের কালে মগজের এঘর থেকে ওঘরে পায়াচারি করতে থাকে বারবার, কাটা যাওয়া রঙ্গীন ঘুড্ডির মত টেনে নেয় সব মনোযোগ। ৪ গল্পে ডুবে থাকতে থাকতেই বাড়ি পৌঁছে যেতে চায় আজ সুমন। মেজাজটা আরো খচে যাবার, মেঘটা আরো ঘন হয়ে ওঠার, আগেই, হয় না। ৫ আচমকা এক জোর ধাক্কায় স্টিয়ারিং থেকে হাত ফস্কে যায় সুমনের। মাথা ঠুকে যায় পাশের জানালায়। ডান চোখের কোণায় আগুনের ফুলকি দেখে সুমন। কর্কশ ধাতব আওয়াজে ঝালাপালা হয়ে যায় কান। মনে হয় বিশাল এক ইলেক্ট্রিক ওয়েল্ডিং মেশিন দিয়ে দুটুকরো করতে চাইছে কেউ গাড়িটা । মেশিনম্যানের হাতুড়ির বাড়ি গাড়ির দরোজা জানালা ভেদ করে পৌঁছে গেছে সুমনের বুকের ঠিক মাঝখানটায়। মুহূর্তের মধ্যে এসব কিছু ঘটে যায়। ধাতস্থ হয় সুমন নিজের কণ্ঠস্বরেই। এতকিছুর ভেতরও বন্ধ হয়নি গাড়ির অডিও। অডিওর ভেতর থেকে ভেসে আসে ধীরলয়ে - "কোথা হইতে এক চক্ষুখাদিকা, ভর্তার পরমায়ুহন্ত্রী, অষ্টকুষ্ঠীর পুত্রী উড়িয়া আসিয়া জুড়িয়া বসিবে ইহা কোন্‌ সৎকুলপ্রদীপ কনকচন্দ্র সন্তান সহ্য করিতে পারে?" রবি ঠাকুরের তিরস্কারেই হোক কিংবা স্বাভাবিক প্রতিবর্তী ক্রিয়ায়, সুমনের হস্তদ্বয়ের দ্রুত প্রত্যাবর্তন ঘটে বাহনের নিয়ন্তা-চক্রে। স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে গাড়িকে সোজা করতেই চমকে ওঠে সে। গাড়ি চলছে ঠিকই, কিন্তু উলটো দিকে। পাশের গাড়ির সজোর ধাক্কা বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়িগুলোর জন্য বরাদ্দ করা সড়কাংশে তুলে দিয়েছে তার গাড়িটিকে। ভাগ্যিস কোন গাড়ি নেই উল্টো দিকে। লাল বাতি থাকায় উলটো দিকের গাড়িগুলো কাছের মোড় পেরিয়ে এসে পড়েনি তখনও। বামে মোড় নেয়ার জন্য এই মোড়ের দিকেই যাচ্ছিল সুমনও, প্রতিদিনের অভ্যেস মতই। লালবাতি সবুজ হবার আগেই নিজের গাড়িটিকে দক্ষ হাতে রাস্তার কিনারে নিয়ে এল সুমন। জীবনে এই প্রথম নো পার্কিং নির্দেশ নির্দ্বিধায় অগ্রাহ্য করে গাড়ি দাঁড় করাল রাস্তার ধারে। তাও আবার গাড়ির মুখ উল্টো দিকে রেখে। শখের গাড়ির নাকের দশা যে দণ্ডকারণ্যে শুর্পণখার মতই করুণ সেটি টের পায় সুমন গাড়ি বন্ধ করে নামতেই। গাড়ির যে পাশটায় তানিশা বসে সচরাচর সেদিকটি দুমড়ে মুচড়ে গেছে। ভাগ্যিস। ৬ নাসিকাঘাতী রামানুজের খোঁজে চারপাশে তাকাতেই সুমনের চোখ পড়ে রাস্তার মাঝ বরাবর। বামে মোড় নেয়ার লেন জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে লাল রঙের এক মস্ত জিপ। কিছুটা পুরনো হলেও শক্ত পোক্ত গাড়িটা। গাড়ির চারদিকে ঘুরে ঘুরে উচ্চস্বরে গালাগাল দিয়ে যাচ্ছে মাঝবয়সী ভারী গোছের এক ভদ্রমহিলা। গালাগালির লক্ষ্য কি বসে যাওয়া গাড়ি না গাড়িটিকে বসিয়ে দেয়া অন্য কোন গাড়ির চালক? শুরুতে সেটি বোঝা না গেলেও একটু পরই মহিলাকে সোজা তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখে হৃদস্পন্দনের গতি দ্রুত হয় সুমনের।

মুখের ভেতরটা কেমন যেন শুকনো ঠেকে। তানিশাকে একটা ফোন করা দরকার, এক্ষুণি। ৭ মহিলাকে ঠিক যেন দেখতে পায়নি এমন ভাব করে পেছনের পকেট থেকে ফোনটা বের করে সুমন। "শোন, বড় বাঁচা বেঁচেছ আজ। রবিঠাকুরের আশীর্বাদ বলতে হয়।" রসালাপের ভঙ্গিতে দুর্যোগের ঘনঘটা ঢাকার রামচেষ্টা করে সুমন। সুমনের কন্ঠকম্প মেঘে ভর করে পৌঁছে যায় ঠিকই তানিশার কানে - "কি যাতা বলছ? কোথায় তুমি? কিছু হয়নি তো তোমার?" এবারে সবিস্তার বর্ণনা করে সুমন। বর্ণনা শেষে আর্জিও পেশ করে, মহারাণী যাতে দ্রুত হাজির হয়ে গোলামকে ঊদ্ধার করে। ৮ তানিশা এসে পড়ার আগেই লাল-নীল বাতি জ্বালিয়ে দ্রুত চলে আসে পুলিশের গাড়ি। পুলিশ-কর্তা গাড়ি থেকে নেমে সুমনের দিকে এগোতে এগোতে বারা বার বলতে থাকে - "ঠিকঠাক আছ তো তুমি? লাগে নি তো কোথাও। মেডিকদের ডাকব?" তবে সুমনের কাছ পর্যন্ত পৌঁছুতে পারে না পুলিশ। তার আগেই "কোথা হইতে যেন উড়িয়া আসিয়া" পুলিশ কর্মকর্তাটিকে ছোঁ-মেরে নিয়ে যায় সেই জিপওয়ালী। পুলিশ ভদ্রমহিলাও সুমনের দিকে তাকিয়ে দুহাত ছড়িয়ে দুকাঁধ উঁচিয়ে জিপওয়ালীর পেছন পেছন রওয়ানা করে রাস্তার মাঝখানটিতে। ৯ তানিশা পৌঁছে যায় এরই মধ্যে ওর হলুদ রঙের ভোক্সওয়াগনে চেপে। ঘটনাস্থলে পৌঁছুনোর সাথে সাথেই তসুমনের সাথে কথা বলার ফুরসৎ হয়না অবশ্য তানিশার। অকুস্থলের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার আগে স্থানীয় এক বন্ধুকে ফনে জানিয়েছিল সে।

এরপর থেকেই আস্তে শুরু করেছে নানাজনের ফোন। খোঁজ-খবর নেয়ার সাথে সাথে নানা ধরনের উপদেশও থাকছে এসব ফোন আলাপে। গাড়ি টেনে নেয়ার জন্য কাদের ডাকতে হবে, কোন গ্যারেজ ইন্স্যুরেন্সের দেয়া টাকা বাঁচিয়ে কাজ করে দেবে, পুলিশের কাছে কতটুকু বলতে হবে আর কতটুকু চেপে রাখতে হবে এসব ব্যাপারে রীতিমত একজন বিশেষজ্ঞ হয়ে উঠেছে তানিশা গত কমিনিটে। ১০ বিশেষজ্ঞ উপদেশেই শেষ পর্যন্ত বীমা কোম্পানিকে ফোন করে সুমন। বীমা কোম্পানি রাজ্যের খুঁটিনাটি প্রশ্নের জবাব এক এক করে জেনে নিয়ে শেষমেষ পইপই করে বলে দেয় সুমনকে, পুলিশের কাছে দোষ স্বীকার করবে না কোনমতেই। সুমন ঠিক বুঝে উঠতে পারে না, সে তো কোন অপরাধ করে নি। দুর্ঘটনা যা ঘটেছে সেও তো তার ভুক্তভোগী, হয় তো তার ভুলে ঘটেছে কিংবা অন্যপক্ষের, কিংবা দুজনেরই। ভুল হতে পারে যে কারোরই, কিন্তু অন্যায় কিছু তো করেনি, সে অন্ততঃ করেনি। বোকার মত পাল্টা প্রশ্ন করে সে বীমাওয়ালাদের, কি ঘটেছে সেটা তো বলতে পারি, নাকি? তোমাদের যেমন বলেছি। আগের কথা কটিই আবার বলে বীমা কোম্পানীর গ্রাহক সেবক যান্ত্রিক স্বরে, “দোষ স্বীকার করবে না। করবে না তুমি। কভু নহে।” - কোন পুস্তকের পাতা পুনঃ পুনঃ পড়ছেন যেন সুকন্ঠী ভদ্রমহিলা ছোট বেলায় যেমনটি করে পড়া মুখস্থ করত সুমন ঠিক তেমন করে। ১১ জিপওয়ালীর জবানবন্দি নেয়া শেষ করে সুমন আর তানিশার কাছে চলে আসে এবারে পুলিশ কর্তা। সরাসরি সুমনের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয় - বল তো দেখি কি ঘটল? তানিশা সুমনের মাথায় হাত দিয়ে আস্তে করে বলে, ঘাবড়ে যেও না। সব বল ঠিক ঠিক। আর, শোন, দোষ স্বীকার করো না কিন্তু। তাই, হেসে ফেলে সুমন। "এক্সকিউজ মি" এর আগে তানিশার দিকে তাকিয়েও দেখে নি পুলিশ সাহেবা। অপরিচিত ভাষায় দুজনার ঘুসঘুসানি শুনেই খাড়া হয়ে যায় পুলিশ কান, কোমরের কাছে চলে যায় হাত। পূর্ণ কর্তৃত্বের সাথে আদেশ করে তানিশাকে - ম্যাম, তুমি কি একটু সরে দাঁড়াবে? আই উড লাভ টু গেট ইওর স্টেটমেণ্ট ইফ ইউ আর অ্যা পার্টি। লাল হয়ে যায় তানিশার নাকমুখ। চোখের কোণে জমে ওঠে জল। সামাল দিতে সুমন তাড়াতাড়ি বলে ওঠে- না, ম্যাডাম, ও নয়। আই অ্যাম আ পার্টী, আই অ্যাম। শি ইজ মাই - এটুকু বলে ইতস্ততঃ করে সুমন, অপরিচিত লোকের সামনে নিজেদের সম্পর্ক প্রকাশ করতে লজ্জা হয় সনাতন সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা সুমনের এতদিন এদেশে থাকার পরও। "শি কেম টু রেস্কিউ মি।" মনে যা আসে সেটিই ঝট করে ইংরেজি করে বলে দেয় সুমন অফিসারকে। "রে-স-কি-উ!" অবাকচোখে তানিশার আপাদমস্তক পোশাক-আশাক পর্যবেক্ষণ করতে থাকে এবারে পুলিশ ভদ্রমহিলা। কুণ্ঠিত তানিশা একপাশে সরে দাঁড়ালে সুমনকে নিয়ে আবারো ব্যস্ত হয় পুলিশ। সুমন বর্ণনা শুরু করে গোড়া থেকে – অফিসে ছাতা ফেলে আসা থেকে শুরু করে গল্পগুচ্ছ পেরিয়ে লেফট টার্নের লেনে পৌঁছানো পর্যন্ত চুপচাপ শুনে যায় পুলিশ অফিসার। মুখে ভাব নেই, কপালে ভাঁজ নেই। সুমনের মনে ধারণা জন্মে পুলিশ নিশ্চয়ই জিপওয়ালীর গল্পটিই বিশ্বাস করেছে। তার গল্পে উৎসাহ নেই ততটা তাই। সুমন তার রবিকাস্ট শোনার কথা বলতেই পুলিশটি শুধু বলেছিল – “ইয়েস ইট ইজ আ বিট ওভারকাস্ট টুডে। তুমি ট্রাফিক চিহ্নগুলো ঠিকমত দেখতে পাচ্ছিলে তো?” সুমনের আখ্যান শেষ হতেই পুলিশ কর্তার প্রশ্ন শুরু হয় - ওই লেনে তখন অন্য কোন গাড়ী ছিল কি? তুমি বাঁয়ে তাকিয়েছিলে লেনে ওঠার আগে? ব্লাইন্ড দেখেছ? হিসেব নিকেশ করে এসব চোখা চোখা প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে সুমন। যে প্রশ্নের আশংকায় ছিল সুমন শেষ পর্যন্ত সে প্রশ্নটিই করে পুলিশ-কর্তা – “লেফট টার্নের লেনটা যেখান থেকে বেরিয়েছে সেই দাগটা কতদূর থেকে দেখতে পেলে তুমি? সেই রেখায় পৌঁছানোর আগেই তুমি বাঁয়ে যেতে চাওনি তো? ঠিক ঠিক মনে করার চেষ্টা কর।“ সুমনের ইতস্ততঃ ভাব দেখে এবারে যোগ করে অফিসার, “তুমি আসলে আর একবার ওই জায়গাটিতে যাও। ভালমত দেখে এসে আমায় জানাও।“ ১২ সুমনের কাজ থেকে বাসায় ফেরার পথটুকুতে দুর্ঘটনাস্থলের এই মোড়টিই শেষ মোড়।

উত্তর-দক্ষিণ আর পূর্ব-পশ্চিম আড়াআড়ি দুটো রাস্তা পরস্পরকে ছেদ করছে মোড়ে। দুটো রাস্তার প্রতিটিতেই দুটো দুটো করে চারটে লেন। ডানের দু’লেন যাচ্ছে সুমনের বাড়ির দিকে, আর বামের লেন ওর অফিসের দিকে। মোড়ের কাছাকাছি এসে হলুদ দাগ দিয়ে বের করে আনা হয়েছে অতিরিক্ত একটি লেন। সোজা যেতে থাকা গাড়িগুলোর মধ্যে যাদের বামে যাওয়া দরকার সেই গাড়িগুলো বাঁয়ের এই লেনে এসে সার বেঁধে দাঁড়ায়, অপেক্ষা করতে থাকে অন্য সব ট্রাফিক বন্ধ করে বাঁয়ে ঘোরার সবুজ তীরটি জ্বলে উঠবে কখন। বাড়ির এতটা কাছে এসে নিয়ম-কানুনের এতটা বাঁধন অধৈর্য করে তোলে সুমনকে। শুধ আজ নয়, প্রতিদিনই। নিত্য যাওয়া আসায় পরিচিত হয়ে ওঠা এই মোড়ে নেব না, নেব না করতে করতে কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে ফেলে সে প্রায়শঃ। হলুদ আলোর সতর্ক সংকেত দেখেও না দেখার ভান করে কখনও, হুশ করে গাড়ির নাক ঘুরিয়ে দেয় বাঁয়ে, কখনোবা সোজা লেনের গাড়ির ভিড়ে বসে না থেকে বাঁয়ের লেন ধরার চেষ্টা করে লেনের দাগে পৌঁছুনোর আগেই। আজও তেমনটি করেছে কিনা কে জানে? ১৩ তানিশাকে ওর গাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে দুর্ঘটনার জায়গাটি পরখ করতে যায় সুমন। পুলিশ ম্যাডামের শ্যেন দৃষ্টির কথা মাথায় রেখেই হয়তোবা একা একা ছেড়ে দেয় সুমনকে তানিশা। রাস্তার দুদিক ধরে চলা গাড়িগুলোর মাঝে হওয়াতে খুব বেশি সময় দুর্ঘটনার জায়গাটিতে দাঁড়াতে পারে না সুমন। ভাল করে দেখবে কি, ব্যতিব্যস্ত চালকদের বিরক্তি ভেঁপুতে বিভ্রান্ত হয় বরঞ্চ আরো খানিকটা। ধীর পায়ে ফিরে এসে চুপচাপ বসে পড়ে তানিশার পাশে আরোহী আসনে। কি আশ্চর্য! তানিশার গাড়িতেও বেজে চলেছে একই গল্প – “হতবুদ্ধি রামকানাই যখন দেখিলেন, তাঁহার স্ত্রী পুত্র উভয়ে মিলিয়া কখনো-বা তর্জনগর্জন কখনো-বা অশ্রুবিসর্জন করিতে লাগিলেন, তখন ললাটে করাঘাত করিয়া চুপ করিয়া বসিয়া রহিলেন-- আহার ত্যাগ করিলেন, জল পর্যন্ত স্পর্শ করিলেন না।”… ১৪ গাড়ীর জানালায় টোকা পড়তেই সম্বিৎ ফিরে পায় সুমন।

পুলিশ কর্মকর্তাকে দেখে অডিওর শব্দ কমিয়ে দেয়। বোতাম চেপে জানালার কাঁচ নামায়। আবারো ছুঁড়ে ভদ্রমহিলা আগের প্রশ্নটি। সাথে আরো ক’টি- “তো? ঠিক কোন জায়গাটায় লেন বদলাতে শুরু করলে তুমি? মোড়ের কত গজ আগে? হলুদ রেখাটি কি নিরেট ছিল সে জায়গায়? নাকি ভাঙ্গা ভাঙ্গা?” প্রশ্নের তোড়ে হকচকিয়ে যায় সুমন। নিজের ওপর রাগ হয়। কেন মিছেমিছি ভাবছে সে? যা ঘটেছে সেটি বলে দিলেই তো হয়। কেন পারছে না বলতে? ইন্স্যুরেন্সের এজেণ্ট ফোনে কি বলেছিল মনে করার চেষ্টা করে। কিছুতেই মনে পড়ে না। তানিশার দিকে তাকাতেই দেখে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে সুমনের হাতের ফোনের দিকেই। পুলিশ কর্তার দিকে ফিরে সুমন। বাইরের সিক্ত বাতাস বুক ভরে টেনে নিয়ে দৃঢ় কণ্ঠে বলে ওঠে, “আই ডু দ্যাট সামটাইম ম্যাম। তবে, আজ ঠিক কি ঘটিয়াছে মনে করিয়া উঠিতে পারিতেছি না।তাই নিয়ম মানিয়া সঠিক দাগে পৌঁছিবার পরই কেবল লেন পরিবর্তনের উদ্যোগ করিয়াছিলাম এইকথা বলিলে মিথ্যা বলা হইবে।” পুলিশকর্তার প্রতিক্রিয়া ঠিক বোঝা গেল না। হলুদ রঙের ছাপানো ফর্দে খসখস করে কিসব লিখে সুমনের হাতে দিলেন তিনি। মাসখানেক পরের একটি তারিখে আদালতে যেতে বলে ফিরে গেলেন নিজের গাড়ির দিকে। ১৫ কাগজটি হাতে নিয়ে পড়ার চেষ্টা করে সুমন। ছোট ছোট অক্ষরে কি লেখা আছে কাগজে মর্মোদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে তানিশার দিকে তাকায় আবারো দ্বিধায়, দুরুদুরু বুকে। পুলিশ কর্তার মতই ভাবলেশহীন তানিশার চোখ দুটোও। সুমনের দিক থেকে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে সামনে তাকায় তানিশা। এক হাতে গাড়ির গিয়ার বদলাতে বদলাতে অডিও-র ভলিউম বাড়িয়ে দেয় অন্যহাতে। গল্পটি তখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। নাতিদীর্ঘ একটি মীড় ম্লান হতে থাকে। ধীরলয়ে প্রবেশ করে সুমনের পাঠ – “কারারুদ্ধ নবদ্বীপের বুদ্ধিমান বন্ধুরা অনেক ভাবিয়া স্থির করিল, নিশ্চয়ই বৃদ্ধ ভয়ে এই কাজ করিয়া ফেলিয়াছে; সাক্ষীর বাক্সের মধ্যে উঠিয়া বুড়া বুদ্ধি ঠিক রাখতে পারে নাই; এমনতরো আস্ত নির্বোধ সমস্ত শহর খুঁজিলে মিলে না।”…

লেখক পরিচিতি: মোহাম্মদ ইরফান ছোট গল্প লিখেন বাংলায়, অনিয়মিতভাবে। আর্থ-সামাজিক চাপে বিপর্যস্ত, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতার ক্রীড়নক, পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপন্ন মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, মহত্ত্ব-নীচতার প্রাত্যহিক কাহিনী উঠে আসে তার গল্পে। পেশায় আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষক ইরফান। গবেষণার বিষয়বস্তু দেশ-বিদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ব্যবস্থাদির পারস্পরিক সম্পর্ক, রূপান্তর আর বিকাশের বিশ্লেষণ - উপাত্ত, পরিসংখ্যান আর গাণিতিক মডেলের সাহায্যে। জন্মভূমি চাঁটগা থেকে অনেক দূরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় অভিবাসী সে গত দু'দশক ধরে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন