মিলান কুন্ডেরা : ক্ষমতাকাঠামোর হেজেমনির বিরুদ্ধে উচ্চারিত এক আপোষহীন কন্ঠস্বর


এলহাম হোসেন

চেকোশ্লাভাকিয়ার ইতিহাসে ভেলভেট বিপ্লব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই বিপ্লব ১৭ নভেম্বর ১৯৮৯ তে শুরু হয়ে ২৮ নভেম্বর ১৯৮৯ পর্যন্ত চলতে থাকে। ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ জনতা মিলেমিশে কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত চেকোশ্লাভাকিয়ার সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। রক্তপাত ও সন্ত্রাসের লেশমাত্র ছিল না এতে। মখমলের মতোই মসৃণ ছিল বিপ্লবের পথচলা গতিবিধি। বিপ্লবের অভিঘাতে ৪১ বছরের একদলের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের পতন হয়। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিপ্লবের প্রাক্কালে চেকোশ্লাভাকিয়ার কমিউনিস্ট সরকার মিলান কুন্ডেরার সব বই বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে।

মিলান কুন্ডেরা ছিলেন বরাবরই নিভৃতচারী। কোন মিডিয়ার সঙ্গে সাধারণত বাক্যালাপ করতেন না। তাঁর নাম বার বার নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য বিজয়ীদের তালিকায় এসেছে। কিন্তু পাননি। ১৯৭৫ সালে স্বদেশ ছেড়ে চলে গেছেন ফ্রান্সে। ১৯৮১ সালে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। অথচ নিজ দেশ চেকোশ্লাভাকিয়া ১৯৭৯ সালে তাঁর নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নিয়েছে। তবে ২০১৯ সালে নাগরিকত্ব আবার তাঁকে ফেরত দেওয়া হয়েছে। ১৮ বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিয়েছিলেন। কমিউনিজম তাঁর মন, মগজ জুড়ে ছিল। কিন্তু ১৯৫০ সালে কমিউনিস্ট পার্টি থেকে বহিস্কৃত হয়েছেন। প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ে সঙ্গীতের ক্লাস করেছেন। ফিল্ম নিয়ে পড়াশুনা এগিয়ে নিয়েছেন। ১৯৫২ সালে বিশ্বসাহিত্যের প্রভাষক পদে যোগ দেন প্রাগের চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ১৯৬৮ সালে চাকরি হারান যখন ওয়ারসো প্যাক্ট চেকোশ্লাভাকিয়া আক্রমণ করে বসে। ১৯৫৬ সালে কুন্ডেরা আবার কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। কিন্তু ১৯৭০ সালে দ্বিতীয়বারের মতো তিনি আবারও বহিস্কৃত হন। ১৯৬৭ সালে চেক লেখকদের চতুর্থ সম্মেলনে যোগ দিয়ে সবাইকে মুগ্ধ করার মতো বক্তৃতা দেন। বক্তৃতায় বলেন, ইউরোপীয় সব প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সংস্কৃতির বিনিময় হলেও চেকোশ্লাভাকিয়ার নিজস্ব সংস্কৃতির স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখা অধিকতর জরুরী। তিনি আরোও বলেন, মস্কো থেকে আমদানী করা দমবন্ধ করা স্ট্যালিনবাদ এবং এর ব্যাপারে প্রাগের কিছু নেতৃবৃন্দের অতি উৎসাহ চেকোশ্লাভাকিয়ার শিল্প-সাহিত্য বিকাশের পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায়।

রাজনীতি-ঘনিষ্ঠতার জন্য অনেকেই বলেছেন, কুন্ডেরা যতটা না ঔপন্যাসিক তার চেয়ে বেশী রাজনীতিক। কিন্তু কুন্ডেরা সবসময়ই বলতে চেয়েছেন, তিনি আসলে রাজনীতিক নন। আগাগোড়াই মূলত ঔপন্যাসিক। কুন্ডেরার বিরুদ্ধে এমন মনোভাবের অবশ্য কারণ রয়েছে। তাঁর প্রথমদিকের লেখালেখিতে কমিউনিজমের ঝাঁজ পাওয়া যায় বেশ ভালোভাবেই। এছাড়া তাঁর নানান ভূমিকার কথা বলে তাঁকে নানান সময় নানাভাবে সরকারের তরফ থেকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। চেকোশ্লাভাকিয়ার ভেতরে অনেকে কখনও কখনও তাঁকে কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে গুপ্তচারবৃত্তির অভিযোগ অভিযুক্ত করেছেন। এক সময় পরিস্থিতি আর তাঁর অনুকূলে থাকেনি। তখন তাঁর নিজের দেশ আর নিজের থাকেনি। ফ্রান্সের নাগরিক হয়ে গেছেন, হতে বাধ্য হয়েছেন এবং নিজেকে ফরাসী সাহিত্যিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মকে তিনি ফরাসী সাহিত্য বলে অভিহিত করেছেন। নিজের ঘর যখন বৈরী হয়ে ওঠে, আপন বন্ধু-বান্ধবই যখন শত্রু হয়ে ওঠে, তখন ঘর আর ঘর থাকে না। এটি হয়ে ওঠে কারাগার। এ প্রসঙ্গে এডওয়ার্ড সাঈদের ÔReflections on Exile’ প্রবন্ধের উদ্বৃতি অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত :

যেকোন নির্বাসিত ব্যক্তিই উপলব্ধি করেন যে, একটি অসাম্প্রদায়িক ও আপেক্ষিকতাপূর্ণ বিশ্বের গৃহ (হোম) সবসময়ই অস্থায়ী। যে সীমান্তরেখা আমাদের নিরাপত্তা বিধানের জন্য বেস্টন করে রাখে, তা-ও কারাগার হয়ে উঠতে পারে। এই কারাগারের পক্ষে আবার কোন যুক্তি ও প্রয়োজন ছাড়াই সাফাই গাওয়া হয়। নির্বাসিতরাই সীমান্ত উৎরে যায়, চিন্তার অর্গল ভাঙ্গে আর অভিজ্ঞতার দেয়াল ভেদ করে যায়।

এই যে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার অর্গল ভাঙ্গার কথা সাঈদ বলছেন, এ কাজ সহজ নয়, অত্যন্ত দূরূহ। এই দূরূহ কাজটি করেছেন মিলান কুন্ডেরা। তিনি নিজে ব্যক্তি কুন্ডেরাকে লেখক কুন্ডেরার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেননি। এ কারণেই ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকের তাঁর মার্কসবাদী চিন্তায় জারিত হয়ে যেসব লেখালেখি ছাপা হয়েছিল, তিনি তার সবগুলো পরবর্তীতে তাঁর গ্রন্থতালিকা থেকে বাদ দেন। পরিশ্রমী ও সৎ লেখক হিসেবে তাঁর জুড়ি মেলা ভার। তিনি যা লিখেছেন এবং প্রকাশ করেছেন, তা তিনি জীবনে প্রতিনিয়ত সম্পাদনা করেছেন, কাটাছেঁড়া করেছেন।

জীবনের অভিজ্ঞতাও তাঁর বড়ই বিচিত্র। নিজ দেশ চেকোশ্লাভাকিয়ার স্বৈরশাসন এবং স্বৈরশাসকদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে দেশত্যাগ করে প্রায় সারাটা জীবন শিকড় থেকে বিছিন্ন হয়ে ডায়াসপোরা হিসেবে ফ্রান্সে বসবাস করার কারণে তাঁর উপন্যাসের ধরন ও বিষয়বস্তু উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয় ফরাসী সাহিত্য দ্বারা। কুন্ডেরা যে তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম দিকের লেখা অস্বীকার করেন তার কারণ হলো- তিনি বিশেষ কোন মতাদর্শের ধারক-বাহক বা প্রচারক হিসেবে পাঠকের সামনে হাজির হতে চাননি। তিনি হতে চেয়েছেন সর্বজনীন, সব মানুষের লেখক। ভিন্ন মতাবলম্বী তো বটেই। তবে সেই ভিন্ন মত প্রকাশের জন্য যে স্বর তিনি ব্যবহার করেছেন, তা তিনি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছেন। রাখতে সক্ষমও হয়েছেন। আর তিনি তো শিল্পী, কোন বিশেষ রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রচারক নন। রাজনীতি করেছেন বটে। তবে তা তাঁর শিল্পীসত্তাকে গ্রাস করেনি, বরং শাণিত করেছে।

নিজ দেশ যখন জার্মান দখলদার বাাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে, তখন তিনি ফ্যাসিবাদ ও সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে গিয়ে মার্কসবাদের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন । হিটলারের নাৎসি বাহিনী তাঁর সর্বগ্রাসী দখলকারীত্ব কায়েম করতে চায় চেকোশ্লাভাকিয়ায় ১৯৩৮ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে। এ সময় চেকোশ্লাভাকিয়ার অনেক তরুণ মার্কসবাদের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। কুন্ডেরার ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। এই মার্কসবাদের অভিঘাতে তাঁর ভাবজগতে যে শক্তি ও গতির সঞ্চার হয়, প্রতিবাদী স্পৃহার স্ফুরণ হয়, তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে তাঁর প্রথমদিকের রচনায়। ১৯৫৩ সালে তাঁর কবিতাসংকলন Man, a Wide Garden প্রকাশিত হয়। ১৯৫৫ সালে তাঁর দীর্ঘ কবিতা ‘The Last May’ প্রকাশ পায়। ১৯৫৭ সালে আবারও কবিতা সংকলন Monologues প্রকাশিত হয়। কুন্ডেরা নাটকও লেখেন এ সময়। ১৯৬২ সালে প্রকাশিত তাঁর নাটক The Owners of the Keys মঞ্চস্থ হয় এবং এটি ভূয়সি প্রশংসা পায়। উল্লেখ্য যে, নাটকটি প্রাগের জাতীয় নাট্যশালায় মঞ্চস্থ হয়। পরবর্তীতে কুন্ডেরা প্রাদেশিকতাবাদ, জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির প্রতি সন্দিহান হয়ে ওঠেন। ফ্রান্সে থিতু হওয়ার পর তিনি একদিকে স্মৃতিকাতরতা বা নস্টালজিয়া, অপরদিকে নিজ দেশের শিকড়ের সঙ্গে থাকার বাসনা- এই দু’য়ের মধ্যে দুলতে থাকেন। এই দোদুল্যমানতা তাঁর রচনার পরতে পরতে একেবারে সেঁটে আছে।

১৯৫০ এর দশকের মধ্যভাগ থেকেই কুন্ডেরা কমিউনিস্ট চেকোশ্লাভাকিয়ার পাঠকদের কাছে একটি পরিচিত নাম। তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথমদিকের লেখাগুলোকে তিনি তাঁর রচনা-তালিকা থেকে মুছে ফেলতে চাইলেও এগুলো সমসাময়িক পাঠক-মানসে বিপুল প্রভাব ফেলেছিল। সে-সময় বিভিন্ন সাহিত্য পত্রিকার জন্য তিনি যে প্রবন্ধগুলো লিখতেন সেগুলোও পাঠকের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ Arguing about Our Inheritance - এ চেকোশ্লাভাকিয়া ও ইউরোপের আভাগার্দ কাব্যরীতির পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেছেন। তবে কমিউনিস্ট সাহিত্যসমালোচকগণ তাঁর বিরূপ সমালোচনাও করেছেন। তবুও কুন্ডেরা কমিউনিস্ট দৃষ্টিভঙ্গিতেই আঁভাগার্দ কবিতার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। কুন্ডেরা তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে তাঁর সাহিত্যকর্মের দ্বারা যদিও উল্লেখযোগ্য আলোড়ন সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, তবুও তিনি সেসব রচনাকে ‘ননসেন্স’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ১৯৮৪ সালে এক সাক্ষাৎকারে ফিলিপ রথকে বলেন, তিনি তাঁর জীবনের অর্ধেকটা সময় নষ্ট করেছেন এবং ১৯৫০ ও ১৯৬০ এর দশকের সময়টাকেও তিনি নিস্ফল বলে মন্তব্য করেছেন। ফিলিপ রথকে সাক্ষাৎকারে বলেন:

সে-সময় ওরা আমাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করেছিলেন। শ্রমিকদের সঙ্গে থাকতাম। তখন একটা জ্যাজব্যান্ডের সঙ্গে নাইটক্লাবে ট্রাম্পট বাজাতাম। (...) কবিতা লিখতাম। ছবি আঁকতাম। সবকিছু মিলিয়ে সেটা ছিল বাজে একটা ব্যাপার। উল্লেখ করার মতো আমার প্রথম কাজ ছিল একটা ছোটগল্প। সেটা অবশ্য লিখেছিলাম ত্রিশ বছর বয়সে। Laughable Loves গ্রন্থে এটি ছাপা হয়। ঠিক তখনই লেখক হিসেবে আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়। জীবনের অর্ধেকটা আমি অখ্যাত চেক বুদ্ধিজীবী হিসেবে কাটিয়ে দিয়েছি। (অনুবাদ: নিজ)

কুন্ডেরা যে একজন অখ্যাত বুদ্ধিজীবী হিসেবে নিজেকে হাজির করতে চান- এর পেছনে অবশ্য একটি কারণ আছে। সেটি হলো- তিনি গতানুগতিক লেখক বা বুদ্ধিজীবী হতে চাননি। তিনি হতে চেয়েছেন ভিন্নমতাবলম্বী বুদ্ধিজীবী, ভিন্ন ধারার সাহিত্যিক। তাঁর গাঁয়ে ততোদিনে ‘কমিউনিস্ট’- এর যে তকমা সেঁটে গিয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার প্রয়োজনীয়তা তিনি তীব্রভাবে উপলব্ধি করেছিলেন। সম্ভবত চিন্তা-ভাবনার বাঁধাছক ভেঙ্গে গোটা সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্পী হিসেবে নিজেকে নির্মাণ করার উদ্দেশ্যেই তিনি এ কাজ করেন। আর সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ শিল্পী ও সাহিত্যিক প্রচলিত ধারার সঙ্গে চলবেন কেন? তিনি তো সবসময় স্রোতের বিপরীতেই চলেন। স্রোতের বিপরীতে চলাই তো সচেতন ও প্রাণস্পন্দন বিশিষ্ট শিল্পী ও সাহিতিক্যের কাজ। বিপরীত অভিঘাত ছাড়া জ্ঞানের সৃষ্টি হয় না। দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্টি হয় নতুন উপলব্ধি ও অনুধাবনের।

এমন অবস্থানের কারণেই কুন্ডেরার কন্ঠে সাহসী ও শিকলভাঙ্গা উচ্চারণ শোনা যায় ১৯৬৭ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত চেকোশ্লাভাকিয়ার লেখকদের চতুর্থ কংগ্রেসে। কর্তৃত্ববাদী কমিউনিস্ট শাসকদের হাত থেকে মুক্তির ডাক দেন চেকোশ্লাভাকিয়ার লেখকদের। চেক ভাষা ও জাতির পুনর্জাগরণের কথা ঘোষণা করেন তিনি। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন,

চেক সাহিত্যের মানের ওপর নির্ভর করছে চেক জাতির মহত্ব বা হীনতা, এর সাহস বা কাপুরষতা, এর কুপমন্ডুকতা বা সর্বজনীনতা এবং জাতির অস্তিত্ব বিষয়ক অনেক প্রশ্নের উত্তর এর মধ্যেই লুক্কায়িত রয়েছে। জাতি হিসেবে চেকদের টিকে থাকা কতটা অর্থবহ, সেই প্রশ্নের উত্তরও এর সাহিত্যের মধ্যেই নিহীত রয়েছে। এর ভাষা টিকে থাকার প্রয়োজন আছে কি-না, তার উত্তরও এর মধ্যেই রয়েছে। ... যে তার সংকীর্ণতা, দাঙ্গাবাদী চরিত্র, সংস্কৃতি ও উদারতার অভাবজনিত কারণে আমাদের বিকাশমান সংস্কৃতির পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, সে মূলতঃ আমাদের জাতীয় জীবনকেই বাধাগ্রস্ত করে। (অনুবাদ: নিজ)

এ বছরই অর্থাৎ, ১৯৬৭ সালে তাঁর উপন্যাস The Joke প্রকাশিত হয়। এটিই তাঁর প্রথম পরিপক্ক ও শক্তিশালী উপন্যাস। উপন্যাসের আখ্যানে যেমন শক্ত দার্শনিক ভাবনা রয়েছে, তেমনি এর বয়ানের ওপরিকাঠামোতে ধ্বনিত হয়েছে কীভাবে ছোটখাটো ব্যক্তিগত বিষয় পুরো একটি জনগোষ্ঠীর জীবনাচার উপস্থাপন করে। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৬৮ সালে কুন্ডেরা প্রকাশ করেন তাঁর ছোটগল্প-সংকলন Laughable Loves এ গ্রন্থে তার ১৯৫০ এর দশকে প্রকাশিত কয়েকটি ছোটগল্পও স্থান পায়।

১৯৬৮ সালের জানুয়ারী মাসে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মুক্তির ঘোষণা দেন আলেকজান্ডার ডুবেক। ১৯৬৮ সালে ২০ আগস্টে সোভিয়েত বাহিনীর চেকোশ্লাভাকিয়া আক্রমণের মধ্য দিয়ে এই ঘোষণা শেষ হয়। এটি ইতিহাসে ‘প্রাগ বসন্ত’ নামে বিশেষভাবে খ্যাত। এ সময় কুন্ডেরা তাঁর অন্যতম প্রভাবশালী উপন্যাস Life is Elsewhere লেখা শুরু করেন। ১৯৭৩ সালে ফরাসী ভাষায় এটি প্রকাশিত হয়। ইতিমধ্যে ১৯৭০ সালে তিনি কউিনিস্ট পার্টি থেকে দ্বিতীয় ও শেষবারের মতো বহিস্কৃত হন। এই সময় কুন্ডেরা লক্ষ্য করেন, তাঁকে চেক ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি থেকে মুছে ফেলার তৎপরতায় লিপ্ত চেক সরকার। সব লাইব্রেরী ও বইয়ের দোকান থেকে তাঁর সব বই সরিয়ে ফেলা হয়। তিনি অধ্যাপনার চাকুরিও হারান। উপরন্তু Life is Elsewhere উপন্যাসটি কমিউনিস্টদের মধ্যে বিরূপ প্রভাব ফেলে। উপন্যাসের আখ্যানে যে সময়-কাঠামো ব্যবহার করা হয়েছে তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়। এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন অস্থির পরিস্থিতি ও এর পরবর্তী সময়কালকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সঙ্গে ধরেছে। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র জেরোমিল কবিতার সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছে। এই চরিত্রের মধ্য দিয়ে কুন্ডেরা অপরিপক্কতা, যৌবন ও স্বপ্রেমের বিষয়ের তীব্র সমালোচনা হাজির করেছেন। ফরাসী প্রকাশক ক্লদ গালিকামার উপন্যাসটির পান্ডুলিপি একরকম স্মাগলিং করে নিয়ে যান ফ্রান্সে এবং কুন্ডেরাকে ফ্রান্সে অভিবাসী হতে উৎসাহ দেন। ১৯৭৩ সালে উপন্যাসটি Prix Medicis পুরস্কার জেতে।

১৯৭৯ সালে মিলান কুন্ডেরার The Book of Laughter and Forgetting প্রকাশ পায়। এর আগের বছর অবশ্য কুন্ডেরা সস্ত্রীক ফ্রান্সে অভিবাসী হন। উপন্যাসটি শৈলী ও বিষয়বস্তুতে মিলান কুন্ডেরাকে একজন ভিন্ন ধারার লেখক হিসেবে পাঠক মহলে প্রতিষ্ঠিত করে। সাতটি ভিন্ন ভিন্ন বয়ান এখানে একত্রিত হয়েছে আর এদের মধ্যে প্রবাহিত হয়েছে সাদৃশ্যের অন্তঃস্রোত। ইতিহাস, রাজনীতি, ঐতিহ্যের উপকরণ একটি জাতির পরিচয় নির্ধারণ করে। এই উপষঙ্গগুলোর বিস্মৃতি তো আত্মবিস্মৃতিই বটে। যে সময় এই উপন্যাসের কাহিনী কুন্ডেরার মনে দানা বাঁধছিল, সেই সময় তিনি নিজেও তাঁর নিজ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, নন্দন ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছিলেন। ১৯৭৯ সালে চেক সরকার তাঁর নাগরিকত্ব ছিনিয়ে নেয়। তবে ১৯৮০ এর দশকে গ্রন্থটি পাঠক মহলে বেশ শোরগোল তৈরি করে। ভিন্ন ধারার উপন্যাস সৃষ্টিতে কুন্ডেরার যে আপোষহীন প্রচেষ্টা, তারই ফল এই উপন্যাস। গতানুগতিক উপন্যাসে যেমন পাঠক গল্পের ঐক্য, আখ্যানের ঐক্য, সময়ের ঐক্য এবং চরিত্রগুলোর মধ্যে ঐক্যের সূত্র আবিষ্কার করে, এই উপন্যাসে তেমন কিছুই পাওয়া যায় না। তবে বিষয়বস্তুর ঐক্যই এই উপন্যাসকে অনন্যতা দান করেছে। উপন্যাসের সাতটি অংশে সাতটি গল্পের ও নতুন নতুন চরিত্রের অবতারণা হয়েছে। তাদের জীবনের পরিস্থিতি, পরিবেশ স্বতন্ত্র। কিন্তু সবার মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় বিদ্যমান এবং তা হলো বিচ্ছিন্নতা। এরা একে অপরের কাছাকাছি থাকে। এদের মধ্যে এমনকি যৌন সম্পর্কও বিদ্যমান। কিন্তু এরা একে অপরের কাছে যতটা চেনা, তার চেয়ে অনেক অনেক বেশী অচেনা। যার ফলে এদের মধ্যকার সম্পর্ক একটি নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত এগোয়। তারপর সেটি নাটকীয়ভাবে শেষ হয়ে যায়। বিচ্ছিন্নতা ও নিঃসঙ্গতাই টিকে যাওয়া সঙ্গী হিসেবে এদের সঙ্গ দেয়। আসলে উপন্যাসের কাহিনী ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত। চেকোশ্লাভাকিয়ার ইতিহাসের এই কালখন্ড বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। যেসব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উপষঙ্গ চেকোশ্লাভাকিয়ার শরীরে আছড়ে পড়েছিল, সেগুলোর ক্ষতচিহ্ন যে কুন্ডেরার মনেও রয়ে গিয়েছিল, তার রূপকালঙ্করিক উপস্থাপনা পাঠক অনুভব করেন তাঁর এই উপন্যাসে।

নির্বাসিত জীবনে প্যারিসে বসেই কুন্ডেরা The Unbearable Lightness of Being উপন্যাসটি রচনা করেন। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৮৪ সালে। যদিও উপন্যাসের উপরিকাঠামো জুড়ে রয়েছে প্রেম ও যৌনতা, তবুও এর গভীরে প্রবাহিত হয় গভীর দার্শনিক চিন্তার অন্তঃস্রোত। নিৎসের প্রতিধ্বনী শোনা যায় উপন্যাসের গভীরে। মানুষের কোন সিদ্ধান্তকেই অধিকতর ভালো বা অপেক্ষাকৃত বেশী ফলপ্রসু বলার কোন যৌক্তিক ভিত্তি নেই কারণ, পৃথিবীতে এমন কোন ধ্রুব সত্য বলে কিছু নেই যার সঙ্গে কোন কিছুর তুলনা করে বলা যাবে যে, এটি অধিকতর ভালো বা ওটি অধিকতর খারাপ। নিৎসের বিশ্ববীক্ষায় পরম মূল্যবোধ বলেও কিছু নেই। মূল্যবোধ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে বিবর্তিত হয়। কাজেই পরম ভালো ও পরম খারাপের ধারণা অগ্রহণযোগ্য। তাঁর মতে, স্বর্গের ধারণা মানুষের কল্পনার ফল। নিৎসের বিশ্বে ঈশ্বর মৃত। কোন দেশের সরকার-ব্যবস্থাকে ঈশ্বরের ধারণা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করার প্রয়োজন নেই, বরং সেই দেশের শাসিত মানুষদের ধারণার দ্বারাই সরকার ব্যবস্থার সংজ্ঞায়ন করা উচিত বলে নিৎসে মনে করেন। বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও বিবর্তন এবং মানুষের জানার অদম্য কৌতুহলই ঈশ্বরকে হত্যা করেছে। নিৎসের এমন সব দার্শনিক ধারণার প্রতিফলন ও প্রভাব কুন্ডেরার The Unbearable Lightness of Being উপন্যাসে পাওয়া যায়। উপন্যাসের আখ্যানে দু’জন নারী, দু’জন পুরুষ ও একটি কুকুর দেখা যায়। এরা ১৯৬৮ সালের সময়টাতে চেকোশ্লাভাকিয়ার প্রাগে থাকে। এদের জীবনের নানান সংকট, ঘাত-সংঘাত ও উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে কুন্ডেরা ১৯৬০ এর দশকে চেকোশ্লাভাকিয়ার রাজনৈতিক অস্থিরতা, পরিবর্তন, সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃক চেকোশ্লাভাকিয়া আক্রমণ এবং এর পরবর্তী প্রভাব রূপকালঙ্কারিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। মানুষের জীবন একটাই এবং তাই জীবনের বড় বড় ঘটনাগুলো একবারই ঘটে। যেহেতু জীবন একটাই তাই ঘটনাগুলো বার বার জীবনে ফিরে আসতে পারে না। এই ধারণা এক ধরনের ‘হালকা-বোধ’ করতে সাহায্য করে। এই হালকা-বোধ আবার মুক্তি বা স্বাধীনতাকেও নির্দেশ করে। কিন্তু এই মুক্তি বা হালকা-বোধ জীবনের অস্তিত্ব সম্বন্ধীয় সংকটকেও মনে করিয়ে দেয়। এই মনে করার ভার অত্যন্ত অসহনীয়। কাজেই, ‘হালকা-বোধ’ অনুভব করা মানে সুখানুভূতি নয়, বরং অস্তিত্বের সংকট ও এই সংকটকে কেন্দ্র করে অসহনীয় কষ্টকেও নির্দেশ করে। এমন দার্শনিক ভাবনার সূক্ষ্ম বুনন কুন্ডেরা ঘটিয়েছেন তাঁর The Unbearable Lightness of Being উপন্যাসের বয়ানে।

তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো- ১৯৯০ সালে মিলান কুন্ডেরা Immortality নামে যে উপন্যাসটি রচনা করেন চেক ভাষায়, তাতে তিনি কোন চেক চরিত্রই রাখলেন না। এই উপন্যাসটি সাতটি অংশে বিভক্ত। এখানে গল্প সরলরেখায় প্রবাহিত হয় না। এক গল্পের মধ্য থেকে অন্য অনেক গল্পের বীজ অংকুরিত হয়। এক মানুষের সঙ্গে আরেক মানুষের যোগাযোগ হয় যারা আদৌ একে অপরের পরিচিত নয়, আত্মীয়ও নয়। একে অপরকে চেনেই না। কিন্তু তারা পাশাপাশি থাকে; একে অপরের কথা শোনে। শেষ পর্যন্ত কেউ কারোও উপর কোনরূপ প্রভাব না ফেলেই একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কেমন এক ধরনের বিমূর্ত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এরা জীবনের যাপনচিত্র এঁকে চলে। জীবনটা বাইসাইকেল রেস নয়। এটি আসলে রোলারকোস্টার রাইড। কখনও ধীরে, কখনও জোরে, কখনও উপরে, কখনও নীচে, আবার কখনও বা পুরোই মোচড় খেয়ে উল্টে যায়, উল্টো পথ ধরে চলে। উল্লেখ্য যে, Immortality কুন্ডেরার ত্রয়ী উপন্যাসের একটি। বাকি দু’টো হলো- The Book of Laughter and forgetting এবং The Unbearable Lightness of Being. এই তিনটি উপন্যাসের দার্শনিক তাৎপর্যের মধ্যে সূক্ষ্ম সাজুয্য রয়েছে

কুন্ডেরার উপন্যাসের মূল্যায়ন করতে গেলে আমাদের হেগেলের সাহায্য নিতে হবে। হেগেলের মুখ থেকে শোনা যা’ক তিনি আসলে উপন্যাস বলতে কী বুঝিয়েছেন। হেগেল তাঁর Aesthetics: Lectures on Fine Art (১৮৩৫ – ১৮৩৮) এ উপন্যাসকে আধুনিক মহাকাব্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর প্রায় আশি বছর পরে গিয়র্গি লুকাচ হেগেলের কথার সূত্র ধরে বলেছেন, উপন্যাস হলো ঈশ্বর কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত আধুনিক বিশ্বের মহাকাব্য। হেগেল তাঁর Lectures on the Philosophy of History তে নায়কের যে সংজ্ঞা দিয়েছেন, তা হলো- একজন নায়ক হলো সেই ব্যক্তি যার উত্থান ঘটে প্রাগসরমান ইতিহাসের অস্থিমজ্জা থেকে। তিনি ইতিহাসের অচেতন উদ্ভাস। তবে মিলান কুন্ডেরার নায়কের ধারণা হেগেলের ধারণার বিপরীত। কুন্ডেরার নায়কেরা যে বিশ্বে বসবাস করে সেটি পঙ্কিলতা ও প্রতিবন্ধকতায় ভরা। এরা নেপোলিয়নের মতো বিশ্বটাকে ওলোট-পালোট করে দিতে চায় না। এরা নিজেদের ব্যক্তি-আকাঙ্ক্ষার রূপায়নের উদ্দেশে যুদ্ধ করে না। এরা শোষণের নাগপাশ ছিঁড়তেও চায় না, আবার পৃথিবীটাকে বদলাতেও চায় না। এরা পৃথিবীর বুকে স্বর্গ রচনা করার পক্ষে নয়। এরা বরং ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক শক্তিগুলোকে ভয় পায়। এরা আসলে সংকটের মুহূর্তে পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যায়। প্রকৃত অর্থে এরা Lectures on the Philosophy of History . এরা সংকটে ধরা দেয় না।

সাধারণত গতানুগতিক উপন্যাসের মূলচরিত্রগুলো কাহিনীর প্রথম দিকে থাকে জগৎ-জীবনের ব্যাপারে লা-ওয়াকিফ। নানান ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে এরা জ্ঞান অর্জন করে। এরা সবাই যেন হেগেলের ভাবশিষ্য। হেগেলের মতে, ইতিহাস অগ্রসর হয় দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে। এটি সমসত্ত্বা নয়। ইতিহাস নানান বৈপরীত্যপূর্ণ উপষঙ্গের মধ্যকার প্রতিনিয়ত দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়। এই দ্বান্দ্বিক পথ বেয়ে বেয়ে ইতিহাসের স্রোতের সঙ্গে মানুষ চলে। সে কোথাও থামে না। ইতিহাসের কমেডি নাটকের সে ভাঁড় হতে চায় না। ইতিহাস তার কাছে ট্রাজেডি নাটক, আর এই নাটকের মূল চরিত্র হিসেবে সে নিয়ন্ত্রিত হয় বাহ্যিক কোন শক্তির দ্বারা যার উপর তার কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। আবার এই নিয়ন্ত্রণহীন শক্তির কাছে সে হারও মানতে চায় না। সে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ করতে করতে সমাজের গতানুগতিক কেন্দ্র থেকে সে মার্জিনের দিকে ছিটকে পড়ে। কেন্দ্র থেকে নির্বাসিত হয়। কিন্তু তাই বলে সে কেন্দ্রের সাথে সমঝোতাও করে না। সাধারণ কোন আকাঙ্ক্ষা অথবা অভিযানের প্রলোভনের ফাঁদে সে কখনই আটকে পড়ে না। সে কাফকার জগতের বাসিন্দা। এ জগতে মোটাদাগে দেখা সম্পর্কগুলো আদৌ তাকে টানে না কারণ, সে এগুলোর অন্তরালে লুকিয়ে থাকা বিভৎস স্বার্থপরতার কঙ্কালমূর্তি আবিষ্কার করে। The Unbearable Lightness of Being উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র সাবিনার মধ্যে যেমন হেগেলীয় দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায়, তেমনি কাফকার উলঙ্গ সত্য উচ্চারণও তার কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়। চেক অভিবাসীদের সভায় যোগ দিতে বাধ্য হলেও শীঘ্রই সে তার ভুল বুঝতে পারে। সে দেখে, ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্ন আসলে ফ্যাসিজমের দিকে নিয়ে যায়। সে তো থাকতে চায় নান্দনিকতার সঙ্গে। এমন মনোভঙ্গির কারণে সে সভা ত্যাগ করে যেমন সে তার বাবার পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের হেজেমনিকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে তাকে ত্যাগ করেছে আগেই। সে পালিয়ে যেতে চায় সবকিছু থেকে। একদিকে তার এই প্রবণতা তার স্বাধীনচেতা স্পৃহার বহিঃপ্রকাশ, অপরদিকে এটি আত্মপ্রবঞ্চনাও বটে। মানুষের অস্তিত্ব আসলে প্রতিনিয়ত স্থানত্যাগের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। স্থান, কাল জলের স্রোতের মতো সবসময় নতুন নতুন অভিঘাত নিয়ে মানুষের চেতনা, মনন, মনস্তত্ত্ব ও অভিজ্ঞতার শরীরে আছড়ে পড়ে। সবকিছুর অনবরত প্যারাডাইম শিফ্ট ঘটে। এই ঘুর্ণবর্তে পড়ে মানুষ যেন কোথাও স্থির হতে পারে না। স্বাধীনতার খোঁজে সে নতুন পরিস্থিতির কাছে হার মানে, পরাধীনতাকে বরণ করে। এ এক দুর্লঙ্ঘনীয় প্যারাডক্স। এর কোন সন্তোষজনক সমাধান নেই। কুন্ডেরা তাঁর প্রত্যেকটি উপন্যাসে এই প্যারাডক্সই তৈরী করেছেন।

কুন্ডেরার চরিত্রগুলো আপতদৃষ্টিতে জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ালেও তারা জীবনের চরম ও নির্মম সত্য, অর্থাৎ একাকিত্বের নিষ্ঠুর পৃথিবীকেই শেষ পর্যন্ত আলিঙ্গন করে। একাকিত্বকে বোঝার জন্য এরা সমাজ ও সামাজিক মানুষদের এড়িয়ে চলে। চলতে চলতে একসময় মনে হয় এরা স্বাধীন, জীবনের সব বন্ধন থেকে মুক্ত। একাকিত্বকে অনাকাঙ্ক্ষিত উপঢৌকন মনে করে এরা। The Book of Laughter and Forgetting উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র তামিনা তার স্বামীর সঙ্গে ইউরোপের ছোট্ট শহর প্রাগে পালিয়ে যায়। আলপ্স পর্বতে ঘেরা হোটেলে ওঠে এরা দু’জনে। চারপাশের পিনপতন নৈঃশব্দ এদের পৃথিবী থেকে যেন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরা নিজেদের বন্ধনমুক্ত মনে করে। তাঁর Immortality (১৯৯০) উপন্যাসেও তেরেজা ও এগনেস নীরবে নিভৃতে পালিয়ে যায় পৃথিবী নামক যুদ্ধক্ষেত্রের বিভিষিকাময় কোলাহল থেকে। কিন্তু মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যেই নিহীত থাকে পরাধীনতার শৃংখল। একে অপরের প্রতি মানুষ যে সহানুভূতি বা প্রেম বোধ করে, তার মধ্যেই রয়েছে শৃংখল। তাই, মানুষ কখনই মুক্ত নয়। তবে মুক্তির জন্য প্রাণন্তকর সংগ্রাম তার জীবনকে এগিয়ে নিতে প্রণোদনা দেয়। নিয়তিই শেষ কথা নয়। জীবন ফুরোনোর পূর্বেই অনেকে নিয়তির পদতলে নিজেকে অর্ঘ্য হিসেবে সোপর্দ করে। এটি তো জীবন নয়, যাপনও নয়। এটি শৃংখল। শৃংখল ভাঙ্গার প্রাণন্তকর প্রচেষ্টাই তো মানুষকে অন্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। মানুষের গর্বের জায়গাও এটি। এটিই সংগ্রাম। এর বহিঃপ্রকাশ সবসময় সশব্দে হয় না, নিঃশব্দেও হয়। কুন্ডেরার উপন্যাসের চরিত্রগুলো প্রকাশ্যেও সংগ্রাম করে, নির্জনতাতেও সংগ্রাম করে।

মিলান কুন্ডেরার উপন্যাসের চরিত্রগুলোর মধ্যকার নির্জনতাপ্রীতি সিগমান্ড ফ্রয়েডের Immortality গ্রন্থে উল্লিখিত মানুষে-মানুষে সম্পর্ক অথবা মানুষের সঙ্গে মানুষের ইন্দ্রীয়গ্রাহ্য বস্তুজগতের বাইরের কোন জগতের সম্পর্কের স্বরূপ উদঘাটনের মধ্য দিয়ে বিশ্লেষণ করা যায়। মানুষে-মানুষে সম্পর্ক একটি সামাজিক উপষঙ্গ বটে। এই সম্পর্ক আনন্দের হতে পারে। আবার এই সম্পর্কের মধ্য থেকে যে তিক্ত বিষ নিঃসৃত হয়, তা কিন্তু মানুষকেই জীবনের প্রতি বীতস্পৃহ করে তুলতে পারে; তাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে পর্যন্ত প্ররোচিত করতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে সম্পর্ক এড়িয়ে বিচ্ছিন্নতা বা নির্জনতার আশ্রয় নেওয়ার মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাবোধ অনুভব করা যায়। নির্জনতাই মানুষে মানুষে সম্পর্কের মধ্যকার তিক্ততার বিরুদ্ধে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। কুন্ডেরার The Book of Laughter and Forgetting উপন্যাসের তামিনা স্বামীর সঙ্গে প্রাগে চলে যাওয়ার কিছু দিনের মধ্যেই তাঁর স্বামী মারা যায়। জীবনের অনিশ্চয়তা ও যন্ত্রণা তাকে আত্মহননের পথ বেছে নিতে উদ্বুদ্ধ করে। আত্মহননের ব্যর্থ চেষ্টাও সে করে। পেছনে ফেলে আসা নিজের দেশে ফিরে যেতে মন চাইলেও পুনরায় আত্মীয়-স্বজনের ষড়যন্ত্রের শিকার হতে হবে- এই ভয়ে সে আর ফেরে না। অবশেষে সবার থেকে বিচ্ছিন্ন নির্জন জীবনই বেছে নেয়। এই নির্জনতাই তাকে বেঁচে থাকার রসদ সরবরাহ করে। এই নির্জনতা জোসেফ, তেরেজা, টমাস ও এগনেসকে মোহাবিষ্ট করেছে।

এই আবিষ্টতা কোন দৈব ঘটনা নয়। এর পেছনে আছে হেগেলীয় দ্বন্দ্ব। এই দ্বন্দ্ব গদ্যময় পারিপার্শ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে কাব্যিক মনের। তামিনা তাঁর স্বামীকে হারিয়ে আশ্রয় নিতে চায় স্মৃতিতে। কিন্তু সে তো প্রাগে আসার সময় তার সব ডায়েরী, নোটবুক, কাগজপত্র দেশে ফেলে এসেছে। এগুলো সে উদ্ধার করবে কিভাবে? তার অসহযোগিতাপূর্ণ শ্বাশুড়ির নজর ও শাসন এড়িয়ে সে কি পারবে তার স্মৃতি উদ্ধার করতে? তার বাবাও তো তাকে বুঝতে পারে না। আবার রাষ্ট্র তার নানান যন্ত্র দিয়ে কী বা কে দেশে ঢুকলো আর কী বা কে বেরুলো তা-ও নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু সে তো স্মৃতির দেয়াল তৈরী করে তারই পেছনে অন্তরীণ হতে চায়। এই চাওয়া ও তা বাস্তবায়নের পথে বাধাসমূহ তাকে বিষাদগ্রস্ত করে তেলে। এই বিষাদের অতলে হারিয়ে যায় কুন্ডেরার তামিনা, জ্যান, জেকব, সাবিনা, এগনেস, জেসেফ এবং ইরেনা। এরা নিজ দেশে নিষিদ্ধ এবং নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত। এরা হয় একা, অবিবাহিত, না হয় স্বামীহারা বিধবা, অথবা সম্পর্ক-ছিন্ন একাকী অথবা নির্বাসিত। এরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন, আগন্তুক, আলবেয়ার ক্যামুর আউটসাইডার। কাফকার গ্রেগর সামসা।

জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বিবেচনায় নিলে কুন্ডেরার চরিত্রগুলোকে মনে হয় ম্যাকবেথের মতো, যাদের কাছে জীবন একটা চলমান ছায়া। এর কোন কায়া নেই। কো-ইন্সিডেন্স বা অকস্মাৎ ঘটনা যার ওপর এদের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই, তা এদের জীবনকে তাড়া করে। টমাস হার্ডির চরিত্রগুলো যেমন নিয়ন্ত্রিত হয় এমন সব ঘটনার দ্বারা যেগুলো নিয়ে মানুষ তেমন গুরুত্ব দিয়ে ভাবে না। এসব তুচ্ছ, ছোট ছোট অথচ জীবনের জ্যামিতি বদলে দেওয়ার মতো ঘটনা এদের জীবনকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় সেই গন্তব্যে যেখানে এরা যাওয়ার কথা পূর্বে কখনও ভাবেইনি।

এ কথা আগেও বলা হয়েছে, মিলান কুন্ডেরা রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। ফ্রান্সে বসবাস করতে শুরু করার পর নিজ দেশের নাগরিকত্ব হারান। তবে ফ্রান্সের নাগরিকত্ব লাভ করেন। তাঁর দেশ আবার যখন তাঁকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেয়, তখন আর তার ফেরা হয়ে ওঠে না। কুন্ডেরার বাস্তব জীবনের এই উপষঙ্গটি তাঁর উপন্যাসের চরিত্রের মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। তাঁর প্রসিদ্ধ উপন্যাস Ignorance এর অন্যতম প্রধান দুই চরিত্র ইরিনা ও জোসেফ-এর মধ্যে আমরা শিকড়ে ফেরার ব্যাকুলতা দেখি। কিন্তু তারা আর ফিরতে পারে না শিকড়ে। ১৯৬৮ সালের পর ইরিনা চলে যায় প্যারিসে। জোসেফ চলে যায় ডেনমার্কে। ১৯৮৯ সালে কমিউনিজমের পতনের পর আকস্মিকভাবে এদের মধ্যে সাক্ষাৎ হয় প্যারিস এয়ারপোর্টে। এরা উভয়েই ফিরতে চায় মাতৃভূমিতে। হোমারের ইউলিসেস যেমন বাড়ি ফেরার জন্য উদগ্রীব হয়ে ট্রয় নগরী জয় করার পর দশ বছর নানান প্রতিবন্ধকতা ও ঝুঁকি মোকাবেলা করতে মরিয়া হয়ে ওঠে, Ignorance উপন্যাসের এই দুই চরিত্রও চায় ফেলে আসা মাতৃভূমিতে ফিরতে। ইউলিসেস বিশ বছর পর ঘরে ফিরেছিল। তার ঘর ততোদিনে বহিরাগতরা দখল করে রাখলেও সে তাদের উৎখাত করে ঘরটাকে তার নিজের করতে পেরেছিল। কিন্তু ইরিনা ও জোসেফ কিভাবে পারবে ঘরে ফিরতে? কারণ, ঘর তো যতটা না ইট-পাথরের, তার চাইতে বেশী স্মৃতির। স্মৃতির গাঁথুনিতেই তৈরী হয় ঘর। স্মৃতিগুলো বেদখল হয়ে গেলে তো আর ঘর থাকে না। তারা যখন নিজ দেশ ছেড়েছিল তখন যে স্মৃতি সঙ্গে করে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল, তা তো এখন আর আগের অবয়বে নেই। মাঝের সময়টাতে ক্ষমতা-কাঠামো তার নিজের মতো করে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের একটা ভার্সন তৈরী করে নিয়েছে, নিজের স্বার্থেই। কাজেই, এক চিলতে ভূখণ্ড ফিরে পাওয়া মানে তো ঘর ফিরে পাওয়া নয়। তবে ফিরে পাওয়ার অভিনয় করা যায়। সেটি করতে হয় চেতন মনের গলা টিপে ধরে। অজ্ঞতা দু’রকমের হয়। এক রকমের পেছনে সচেতন পরিকল্পনা থাকে। ইচ্ছে করেই ভুলে যেতে হয় কারণ, স্মৃতির ভার বহন করা দুর্বিসহ হয়ে ওঠে, যদি তা নিজের ঘর বেদখলের স্মৃতি হয়। রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ কবিতার উপেনের জন্যও এই স্মৃতি বহন করা কঠিন হয়ে উঠেছিল। তার ঘর ছিনিয়ে নিয়েছে যে জমিদার বাবু, সে-ই তাকে চোর সাব্যস্ত করে। সাব্যস্ত তো করতেই হবে। কাউকে ‘ডিসপ্লেস’ বা উৎখাত করতে চাইলে একটা ডিসকোর্স বা প্রপঞ্চ দরকার। এই প্রপঞ্চ ক্ষমতাকাঠামোর নির্মাণ। এটি হাজির করে সে সবাইকে ধারণা দেয় যে, তার দখলকর্ম সম্পূর্ণ জায়েজ বা সঠিক। আবার ঘরের পরিচয়ও তরল। শক্ত ও স্থায়ী নয়। যে দখল করে ঘর তো তারই হয়ে যায়। তাই তো উপেন তার ‘ঘর’কে উদ্দেশ্য করে তিরস্কারের স্বরে বলে উঠেছে:

আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগি গৃহহারা সুখহীন,
তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী, হাসিয়া কাটাস দিন।

একই ভাবে ইরিনা ও জোসেফের জন্য তাদের মাতৃভূমিতে ফেরার সুখানুভূতি বেদনায় পর্যবসিত হয়েছে কারণ, ঘর নামক একটি ভূখণ্ড থাকলেও তাদের স্মৃতিগুলো সব ক্ষমতাকাঠামো কর্তৃক হাইজ্যাক্ড হয়ে গেছে। মানুষের অস্তিত্ব তো স্মৃতিতেই। মানুষ বাঁচে স্মৃতিতে। এই স্মৃতি তার পরিচয় নির্ধারণী বয়ানও বটে। সেই স্মৃতি হারিয়ে গেলে তার আর আত্মপরিচয় থাকে না। উপন্যাসের কাহিনী শুরু হয় প্যারিসের একটি কাফেতে। সেখানে সিলভি ইরিনাকে বলছে, দেশে গণতান্ত্রিক বিপ্লব ঘটেছে। এখন তো ঘরে ফেরা যায়। কিন্তু দীর্ঘ বিশ বছর প্যারিসে কাটানোর ফলে ইরিনা তার ছেড়ে আসা চেক প্রজাতন্ত্রকে আর নিজের দেশ ভাবে না। এখান তো তার পুরোটা জীবন জুড়ে শুধুই ফ্রান্স। এখানে তার প্রেমিক আছে, মেয়েরা আছে, কর্ম আছে, বন্ধুবান্ধব আছে, এপার্টমেন্টও আছে। জোসেফের ক্ষেত্রেও একই কথা। রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়ে দেশ ছাড়া অভিবাসীদের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য হলো এরা নিজেদের দেশে ক্ষমতাকাঠামোর শত্রু বলে বিবেচিত হয়। এদেরকে এদের নিজেদের দেশ বিশ্বাস করে না। আবার নতুন যে দেশে এরা যায়, সেখানেও এরা সবার মধ্যে ‘আক্রান্ত’, ‘নিজ দেশ-খেদানো’ ‘ভাগ্যতাড়িত’ মানুষ বলে বিবেচিত হয়। শিকড়চ্ছিন্ন, সৃজনশীলতা হারানো মানুষ বলে আখ্যায়িত হয়। এরা না হতে পারে ঘরের, না হতে পারে বাইরের। এরা ‘বিং’ নয় বরং ‘নন-বিং’ বলে বিবেচিত হয়!

কুন্ডেরা নিজেও শিকড়চ্ছিন্ন মানুষ। নিজ দেশ চেকোশ্লাভাকিয়া ছেড়েছিলেন। চেক ভাষা ছেড়েছিলেন। গ্রহণ করেছিলেন ফ্রান্স আর ফরাসী ভাষা। ফরাসী ভাষায় লেখার জন্য তাঁকে কম গঞ্জনা সহ্য করতে হয়নি। কেউ কেউ আঙ্গুল তুলেছেন তাঁর সৃষ্টিশীলতার প্রতিও। শিকড়ছিন্ন হলে না-কি শিল্পীর আর সৃজনশীলতা থাকে না- তাঁকে এমন কথাও শুনতে হয়েছে। তবে কুন্ডেরা মনে করেন, মানুষের জীবন এমনই। এটি কখনই সুপ্রতিসম নয়। আগাগোড়াই অপ্রতিসম। সম্পর্কগুলোও তাই। ইরিনা ও জোসেফের মধ্যকার সম্পর্কও একই রকম। যে জোসেফ বিশ বছর পূর্বে ইরিনার সঙ্গে প্রেম করতো, আজ বিশ বছর পর এয়ারপোর্টে ইরিনাকে দেখে সে কেমন এক ধরনের জড়সড় হয়ে পড়েছে। সময়ের নিদারুণ অভিঘাতে তার স্মৃতি, সম্পর্ক, যোগাযোগ-সবকিছু কাজেই, জীবনটা কেন যেন অপরিচিত, অজানা, অচেনা ঠেকে ইরিনার কাছে। শুধু ইরিনার কাছে কেন, এমনটা সবার কাছেই জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে মনে হতে পারে। এই সত্যকে পাঠকের সামনে আনার মধ্যেই শিল্পী কুন্ডেরার শক্তি নিহীত। এখানেই তার ক্ষমতা। তাঁর উপন্যাস পড়তে পড়তে পাঠক শ্রোতা হয়ে যান। মনে হয়, তাঁরা যেন কুন্ডেরার মুখ থেকে গল্প শুনছেন। তারপর শুনতে শুনতে তাঁরা দর্শক হয়ে ওঠেন। পাঠক দেখেন কুন্ডেরা নিজে যা দেখেন। জীবনের অপ্রতিসম সম্পর্কগুলো দেখেন। সময় আর ঘড়ির কাঁটা ধরে চলছে না। সময় চলছে ক্ষমতাকাঠামোর খামখেয়ালী আঙ্গুলের ঈশারায়। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে না; শক্তিশালী হয়ে উঠছে ব্যক্তি। এই ব্যক্তির খামখেয়ালিপনা অসংখ্য ব্যক্তিমানুষের জীবনকে করে তুলছে দুর্বিসহ।

তাই সঙ্গত কারণেই কুন্ডেরা বিশ্বাস করেন, ঊনবিংশ শতাব্দীতে এসে নানান বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তির অগ্রগতির অভিঘাতে মানুষের ইতিহাস এমনই নগ্নভাবে মানুষেরই সামনে হাজির হয়েছে যে, এখন এই একবিংশ শতাব্দীতে যেকেউ সঙ্গত কারণেই আশংকা প্রকাশ করেন যে, তিনি আর সেই সময়ে মারা যাবেন না যে সময়ে তিনি জন্মেছিলেন। জন ওসবোর্ন এর নাটক লুক ব্যাক ইন অ্যাঙ্গার এর মূলচরিত্র জিমি কার্টারের মতই কুন্ডেরার উপন্যাসের পাত্রপাত্রীর উপলব্ধি। জিমি রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠানের প্রতি ক্ষ্যাপা, কারণ, তার মনে হয়, সে ভুল সময়ে জন্মেছে। তার জীবনের জ্যামিতির কম্পাসের কাঁটা স্পর্শ করছে না সেই বিন্দুকে যেটিকে সে স্পর্শ করতে চায়। সময় ধরা দিয়েছে ক্ষমতাকাঠামোর তর্জনীতে। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাশনালিটি বা জাতীয়তাবাদের গতানুগতিক ধারণা বদলে যাচ্ছে। বিশেষ করে, ঠান্ডাযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তনের কারণে মানুষের এক দেশ থেকে আরেক দেশে দেশান্তরিত হওয়ার ঘটনা এতটাই ব্যাপক ও বিস্তৃত হয়েছে যে, এখন ন্যাশনালিজমের ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। কুন্ডেরার নিজের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। ১৯৭৫ সালে তিনি দেশত্যাগ করেন। আর ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস Ignorance. এই দীর্ঘ পঁচিশ বছরে তাঁর দেশ ও ভাষা বদলে গেছে। দেশ ও জাতীয়তাবোধের সঙ্গে আবেগের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চয় রয়েছে। কিন্তু তাকে কখনও কখনও ব্যক্তির ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ছাপিয়ে যায়। এখানেই দেশ ও দেশাত্মবোধের একটি তরল ধারণা তৈরী হয়। এটি যেহেতু তরল, তাই এটি নানান পরিস্থিতিতে, নানান স্থানে নানান আকার ধারণ করে। আর দেশপ্রেম তো নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত একটি অলিখিত চুক্তিও বটে। এই চুক্তি রক্ষার দায় কি শুধুই নাগরিকের? নাকি রাষ্ট্রেরও? রাষ্ট্র এই চুক্তি ভঙ্গ করলে নাগরিক তখন বাধ্য হয় তার অবস্থান পরিবর্তনে। দেশপ্রেম একটি দ্বিরালাপের বিষয়ও বটে। এটি চলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে। এই দ্বিরালাপ সময়, পরিস্থিতি ও মনোভঙ্গির দ্বারা বিনির্মিত হয়, হতে থাকে। এটি তরল একটি ভাবানুভূতি।

ভাবানুভুতির এই যে তারল্য, তার কারণে কুন্ডেরার উপন্যাসের কাহিনীও সরলরৈখিক থাকেনি। চরিত্রগুলো দ্বিরালাপের মধ্য দিয়ে সময়ের পথ বেয়ে এগিয়েছে। এই এগোনো নিস্তরঙ্গ নয়; ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ। বহুস্বরতা তাঁর উপন্যাসের পাঠকে কঠিন করে তুলেছে। তাঁর চরিত্রগুলো প্রতিনিয়ত একচ্ছত্রবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামরত। কিন্তু এই সংগ্রাম চালিয়ে যেতে যেতে নিজেরাই কখনও যে একচ্ছত্রবাদী হয়ে ওঠে, তা তারা নিজেরাই জানে না। এটিই স্বাভাবিক। জীবনের এই স্বভাবিকতার ওপর কুন্ডেরা জোর করে নিজের চাওয়া-পাওয়া চাপাননি। এখানে তিনি অথর নন,বরং অথরিটি হয়ে উঠেছেন। তার এমন অবস্থানের মধ্যে রোলাবার্তের Death of the Author এর প্রতিধ্বনী শোনা যায়।

তবে কুন্ডেরা ২০২৩ সালের ১১ই জুলাই তারিখে মারা গেলেও শিল্পী হিসেবে তিনি পাঠকের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন বহুকাল। তাঁর শেষ উপন্যাস The Festival of Insignificance এ তাঁর চরিত্র শার্লের মুখ দিয়ে তিনি ঘোষণা করেছেন, “আমরা মরে যাই, তারপর বছর কয়েক পরিচিতদের স্মৃতিতে বেঁচেবর্তে থাকি, কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই চলে আসে একটি পরিবর্তন। অর্থাৎ একসময় এই স্মৃতির পাতা থেকেও আমরা বিলীন হয়ে যাই।” তবে এ কথা হলফ করে বলাই যায়, মিলান কুন্ডেরা বেঁচে থাকবেন স্মৃতিতে, স্মৃতির বয়ানে। ইতিহাসের বিস্তৃত ক্যাভাসে যে অল্পকিছু সংখ্যক মানুষ তাঁদের অসাধারণ সব কীর্তির গুণে মানুষের স্মৃতিতে বহু প্রজন্ম ধরে বেঁচে থাকেন, মিলান কুন্ডেরা অবশ্যই তাঁদের অন্যতম।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ