বৃহস্পতিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০২২

মোজাফ্‌ফর হোসেনের গল্প : নো ম্যানস ল্যান্ড

 
দিন পনের ধরে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে নো ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে আছে এক নারী। নিজেকে মানসিক ভারসাম্যহীন প্রমাণ করার মতো সমস্ত আয়োজন ওর পোশাকে আছে। বাড়তি একটি পা অচল হওয়ার কারণে তাকে ঢাকা কিংবা কলকাতার ফুটপাতে পড়ে থাকা ভিখারি হিসেবে ভেবে নিতেও অসুবিধা হবে না কারো। নো ম্যানস ল্যান্ডের নিচু জমির দুপাশে পানির মাঝখানে একটা বাড়ির সমান উঁচু ঢিবিতে নারীটি পড়ে আছে। কিভাবে গেল, কোনদিক থেকে গেল, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানা যায়নি।

আবিষ্কারের প্রথম দিনই দুদিক থেকে হৈচৈ পড়ে গিয়েছিল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) মধ্যে। দ্বিতীয় দিনই বিজিবি এগিয়ে যায়, রাতের অন্ধকারে তল্লাসি চালিয়ে নিশ্চিত হয় ভারতীয় স্পাই কিনা। তেমন কোনো ক্লু না পেয়ে বিরক্তি নিয়ে ফিরে আসে। পরদিন বিএসএফ বোম স্কোয়াড নিয়ে যায় ওর কাছে। ওদের ধারণা বাংলাদেশের কোনো আত্মঘাতী ইসলামি জঙ্গি ওদের ক্যাম্পে হামলার জন্য এই নাটক ফেঁদেছে। ওরা একরকম নিশ্চিত বলে বিষয়টি ওপরে জানিয়েও দেয়। কিন্তু নারীটির সঙ্গে বোমাটোমা তো দূরে থাক সন্দেহ করার মতো একটা পেরেকও ছিল না। ফলে ওপরের নির্দেশ মোতাবেক নিরাপদ দূরত্ব রেখে ওপাশ থেকে ছোটখাটো যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে বিএসএফ-এর জোয়ানরা অবস্থান গ্রহণ করে। যে কোনো সময় গুলি চালাবে, কিন্তু গুলি চালানোর জন্য যতটুকু নড়াচড়া প্রয়োজন তা না পেয়ে হতাশ হয়ে অপেক্ষা করে।

অষ্টম দিনে এসে এ নিয়ে দুই দেশের সেক্টর কমান্ডার পর্যায়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে কোনো সমাধান আসেনি। উলটো পাল্টাপাল্টি অভিযোগের মধ্য দিয়ে বৈঠক শেষ হয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ জানিয়েছে, মানসিক ভারসাম্যহীন ওই নারীকে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা করছে বিএসএফ। তারাই ওখানে রেখে গেছে। অন্য দিকে ভারতের বর্ডার গার্ডের জোর দাবি, বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনীই বাংলাদেশ থেকে তাকে ঠেলে পাঠিয়েছে।

এই মিটিংয়ের জের ধরে নো ম্যানস ল্যান্ডে পড়ে থাকা নারীটি দু’পক্ষের কাছে আরো অনাহূত হয়ে ওঠে। দুদিক থেকেই প্রহরা ও নজরদারি আরো জোরদার করা হয়। ঘটনার দশ দিনের মাথায় বিএসএফ নারীটিকে মৃত বলে ধরে নেয়। বিজিবির কাছে বার্তা পাঠায়, বাংলাদেশের ডেডবডি দেশে সরিয়ে নিতে। তখনই বিষয়টি সম্পর্কে বিজিবি আরো নড়েচড়ে বসে। এভাবেই রোহিঙ্গাদের চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর না। মৃত হোক কিংবা জীবিত, বাংলাদেশ আর এসবের মধ্যে নেই। বিজিবি থেকে সাফ সাফ জবাব, এই কেস বাংলাদেশের না, ভারতের। ভারতই তার ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের মধ্যে এই মৃদু বাদানুবাদ দুই দেশের দু’পাশের গ্রামগুলোতে চাপা উত্তেজনার সৃষ্টি করে। এই নারীকে এখন কে আনবে? মৃত হলে কথা ছিল, একটা ব্যবস্থা গ্রামের মানুষেরা করে ফেলত। কিন্তু জীবিত মানুষের ব্যবস্থা করা কি ওতো সোজা! রাষ্ট্র নিজেই যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তখন কে নেবে তার ভরণপোশনের দায়? তার ওপর পঙ্গু; সম্ভবত পাগলও।

এ অবস্থায় তার জন্য দোয়া করা ছাড়া আর কোনো উপায় দেখে না সীমান্তের দু পাশের সাধারণ লোকজন। কিন্তু দোয়ার প্রশ্ন যখন আসে, তখন চলে আসে ধর্মের প্রসঙ্গও। কে এই নারী? তার বয়স পরিচয় কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। এপাশের মানুষগুলোর প্রশ্ন: মুসলমান তো? ওপাশের জিজ্ঞাসা: যদি হিন্দু না হয়? পুরুষ হলে তো কাপড় তুলে খৎনা আছে কিনা দেখে দোয়া করার ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্ত নেয়া যেত। কিন্তু নারী হওয়ার কারণে সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। পোশাকেও ধর্ম কিংবা জাতীয়তাবাদের পরিচয় বোঝা যাচ্ছে না। পৃথিবীর সকল দুস্থ গৃহহীন লোকের ধর্ম ও জাতীয়তা বোধহয় এক। গরীব লোক গরীব হতে হতে যে জিনিসটা হারায় তা হলো নাগরিক মর্যাদা ও ধর্ম। বাকি থাকে ভাষা। মুখের ভাষা দিয়ে বোঝা সম্ভব সে বাংলাদেশের না ভারতের, হিন্দু না মুসলমান। কিন্তু কে যাবে কথা বলাতে? বিজিবি বিএসএফ নারীটির দিকে নিরাপদ দূরত্ব থেকে রাইফেল তাক করে আছে। আপাতত আর কোনো ভূমিকায় তারা যেতে চায় না। অন্যদিকে দুপাশের গ্রামের লোকজন আগ বাড়িয়ে ঝামালে বাড়াতে ভয় পায়। দুপক্ষেরই অভিমত, এটা তাদের বিষয় না—দুই দেশের মামলা।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তোমার দিদিকে ওপারে পাকিস্তান ক্যাম্পে রেখে চল আসছিলা। মনে পড়ে? ওপারে সীমান্তবর্তী গ্রামে রাতের অন্ধকারে কোনো এক বউ তার স্বামীকে বলে। চুপ থাক মাগী! স্বামী এক ধমক দিয়ে ওপাশ ফিরে শোয়। সেই অন্ধকারেই মিটে যায় সব।

তোর এক বোন ছোটবেলায় হারিয়ে গিয়েছিল; শুনেছি মেয়েদের অপহরণ ভারতে বিক্রি করে দেয়—একটু দ্যাখ না? এপারে এক ভ্যাপসা দুপুরে কোনো এক উঠোনে পরিত্যক্ত চুলায় গোবর লেপতে লেপতে মা তার ছেলেকে বলে। ভুল করেও এই কথা আর কাউকে বলিস না। মাকে শাসিয়ে দেয় সন্তান। সেদিন থেকে রাত নেই দিন নেই মার আনমনা দৃষ্টি লেপটে থাকে সীমান্তছোঁয়া আকাশে।

এরপর নোম্যানস ল্যান্ডে একজন অক্ষম অজ্ঞাত নারীর পড়ে থাকা এলাকার লোকজনের কাছে বিস্ময় থাকে না, অভ্যাসে পরিণত হয়। কোনো কোনো দিন কাক কিংবা শকুন যেতে দেখলে মাঠের লোকজন মনে করত মরে গেছে। নারীটি একা দেশহীন ঠিকানাহীন অবস্থানে পড়ে থাকলেও এবং কারো কোনো ঝামেলা তৈরি না করলেও হয়ত কেউ কেউ মুখ ফসকে বলে ফেলত, আপদ চুকেছে! কিন্তু এখন রোজ রোজ কাক আর শকুন যেতে দেখে লোকজন সেই আন্দাজটুকুও করতে পারে না। দু দিক থেকে দুটি রাষ্ট্রীয় দূরবীন জুম করে দেখে, কাকে, শকুনে আর নারীটিতে খাবার ভাগাভাগি করে কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে। কিভাবে খাবারটা ওখানে পৌঁছাচ্ছে এ বিষয়ে আগ বাড়িয়ে কোনো খোঁজখবর নিয়ে কেউ আর দায়িত্বের ফাঁদে পা রাখতে চায় না।

কিন্তু পৃথিবীতে এখনো কিছু মানুষ আছে যারা আগ বাড়িয়ে এইসব মানুষ খোঁজে। এঁদের নিয়েই তাদের কারবার। তাই তো কখনো কখনো এইসব মানুষ সৃষ্টি করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতিও তৈরি হয় কোনো অদৃশ্য ইশারায়। তাদের সম্পর্কে কিছুই জানা ছিল না গ্রামের লোকজনের। এই নারীটির গৃহহীন হওয়ার পেছনেও বায়বীয় কোনো ইশারা আছে কিনা গ্রামের লোকজন জানে না।

পঁচিশ দিনের মাথায় এসে দেশের প্রথমসারির এক মিডিয়া ঘটনাটি নিয়ে একটা মানবিক গল্প ফেঁদে ফেলল। প্রকাশের দুয়েকদিনের মধ্যেই লুফে নিল বিশ্বমিডিয়া। বিষয়টি আন্তর্জাতিক মিডিয়া হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিশ্বসংঘের সদর দফতর থেকে চিঠি এসেছে। চিঠিতে ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে নারীটির সমস্ত বিষয় দেখভাল করার জন্য সরকারকে আহ্বান করা হয়েছে। অনুরূপ চিঠি গেছে ভারত সরকারের কাছেও। এই চিঠি আসার পর বিজিবি ও বিএসএফ দ্বিতীয় বার পতাকা বৈঠকে বসে। মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয়, এবার দুপক্ষের প্রতিনিধি দল একসঙ্গে নারীটির কাছে যাবে। প্রথমে দেখবে কোনো দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র বা এ জাতীয় কোনো সনদ তার কাছে আছে কিনা। যদি না থাকে তাহলে তার কাছে কোনো টাকা পয়সা আছে কিনা দেখা হবে। এর মধ্য দিয়ে প্রাথমিকভাবে কোন দেশের নাগরিক সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দু দেশই মেনে নেবে সেটা।

বিকাল তিনটার সময় মিটিং শেষ করে পাঁচটার সময় যৌথ প্রতিনিধি দল নারীটির কাছে পৌঁছায়। কদিন কড়া রোদের পর আগের রাতে হালকা ঝড় আর বৃষ্টি হয়েছে। নারীটির চারপাশে কাদা হয়ে আছে। এর মধ্যে পায়খানা প্রস্রাব করে জায়গাটা একদম গুলিয়ে ফেলেছে। এসব দেখে প্রতিনিধিদলের একজন তো বমিই করে দিল। নারীটি অনেক দূরের কিছু দেখার দৃষ্টি নিয়ে ওদের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। শরীরের যে অবস্থা তাতে বয়স চল্লিশ না সত্তর বোঝা মুশকিল। প্রতিনিধিদলে দু দেশ থেকে দুজন নারী সৈন্যকে রাখা হয়েছিল। তারা নিজেদের নাকমুখ বেঁধে তল্লাসি চালায়। কোনো কাগজ নেই সঙ্গে। টাকা পয়সা কিছু না কিছু থাকার কথা, কিন্তু তাও পাওয়া গেল না। একটা কাগজ ছিল, বৃষ্টিতে প্রস্রাবে গলে গেছে। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে দলটি।

বিদেশি পত্রিকায় খবরটি প্রকাশের দশদিনের মাথায় দুটি বিদেশি আর একটি দেশি এনজিও এসে শহরে অস্থায়ীভাবে অফিস খুলে বসে। নারীটি যেহেতু গৃহহীন, শরণার্থী, তাই জাতিসংঘের শরণার্থীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ইউএনএইচসিআর প্রতিনিধি পাঠিয়েছে। যেহেতু পঙ্গু ও বধির বলে প্রচারিত হয়েছে, তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দুজন অটিজম স্পেশালিস্ট এসেছেন। ভুক্তভোগী মানুষটি জেন্ডার পরিচয় নারী হওয়ার কারণে দেশি বিদেশি নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও সরব হয়েছে। এসেছে মানবতাবাদী কর্মীরা।

প্রথম দিকে তাদের অসহযোগিতা করতে শুরু করে গ্রামের মানুষ। হুজুর জুম্মার খুতবায় স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন: এসব ইহুদি খ্রিস্টানদের চক্রান্ত। ওই নারী তাদের পাঠানো চর। এইভাবে ফাঁদে ফেলে মুসলমানদের ইমান আকিদা নষ্ট করে দিতে চাচ্ছে বিধর্মীরা। এতে ভারতীয় হিন্দুদেরও যোগসাজশ আছে। এভাবে চলতে থাকলে কদিন পর গ্রামে হ্যাফপ্যান্ট পরা শাদা চামড়ার নারীরা ঘুরে বেড়াবে। মদের দোকান খুলবে। নাইট ক্লাব হবে। আমাদের যুবকদের চরিত্র নষ্ট করে দেবে। মেয়েরা বেপথে যাবে। আল্লাহর পৃথিবীতে সেইটা হতে দেওয়া যায় না। আজ বিশ্বের মুসলমানের উপর এরা জুলুম করছে। ফিলিস্তিনে জোটবেঁধে বোমা ফেলছে ইহুদি নাসারারা। আমাদের জেহাদ করতে হবে এই অপশক্তির বিরুদ্ধে। তবেই আমরা কাল কেয়ামতের দিন ফুলসিরাতের সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন পিচ্ছিল পথ চোখ বন্ধ করে পার হয়ে যাবো। ইনশাল্লাহ।

হুজুরের এই খুতবা শোনার পর চাঙ্গা হয়ে সীমান্তের কাছাকাছি মাঠে বসানো প্রথম তাবুটি জ্বালিয়ে দেয় গ্রামের লোকজন। বিদেশি চ্যানেলের দেশি প্রতিবেদকের ক্যামেরা ভেঙে ফেলে। এরপর কিভাবে কিভাবে যেন দুজন বিদেশি নাগরিক আর একজন স্থানীয় এলাকার চেয়ারম্যানকে ম্যানেজ করে ফেলল। চেয়ারম্যান ইমামকে ডেকে পাঠান। তাদের মধ্যে রাতভর কি কথা হয় গ্রামের লোকদের জানা নেয়, তবে দুপুরে হুজুর জোহরের নামাজের পর বললেন অন্য কথা। আল্লাহর শেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আগের রাতে তার স্বপ্নে দেখা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, মুসলমানরা তার ব্যবহার দিয়ে বিধর্মীদের আকৃষ্ট করবে। তাদের সঙ্গে মুসলমানরা এমনভাবে পেশ আসবে যেন তারা বিস্মিত হয়ে জানতে চায় এই ধর্মের মূল কথা। রসুলে কারিম অমুসলিমদের অধিকার রক্ষায় ঘোষণা করেছেন, কোনো মুসলিম যদি অমুসলিমের প্রতি অবিচার করে তবে বিচারের দিন তিনি অমুসলিমের পক্ষে অবস্থান নেবেন। এরপর আর কোনো কথা থাকে না। তারপরও আমাদের আচরণে তাদের ভেতর হেদায়েত না আসলে তাদের আমরা অসহযোগিতা করতে পারব। কিন্তু হেদায়েত দেওয়ার মালিক আল্লাহ, তাই মানুষ হয়েও আমরা মানুষের উপর জুলুম করতে পারি না। আসেন, আমরা আমাদের অমুসলিম ভাইদের সহযোগিতা করি। তাদের চেয়ে উত্তম আখলাকের পরিচয় দিই।

হুজুরের কথায় লোকজনের মন গলে যায়। পরদিন থেকে হুজুরের ছেলেকে এই এনজিওর লোকাল কো-অর্ডিনেটরের ভূমিকায় দেখা গেলে হুজুরের প্রশংসা করেন সকলে। গ্রামের আরো কয়েকটি বেকার ছেলের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। বর্ডারে লোকজন বেড়াতে আসছে। কাছাকাছি একটা জায়গায় বেশ কিছু চায়ের দোকান ও ডাল-ভাত খাওয়ার মতো হোটেল হয়েছে। এক রাজনৈতিক নেতার অর্থায়নে একটা মনোরম কফি শপ হয়েছে লাস ভেগাস রিসোর্ট নামে। শহর থেকে তরুণ ছেলেমেয়েরা আসছে জোড়ায় জোড়ায়। রিসোর্টের সামনে একটা বিলবোর্ড বসিয়েছে একটি মোবাইল কোম্পানি। বিলেবোর্ডে শোভা পাচ্ছে মোবাইল হাতে একজন সুদর্শন নারী, বড়ো বড়ো অক্ষরে লেখা: ”৪জি নেটওয়ার্ক, দেশের সবখানে, পালাবে কোথায়?” ঘটনাস্থল থেকে দফায় দফায় লাইভ করার জন্য তিনটি টেলিভিশন ক্যামেরা পড়ে আছে রাতদিন। কেন্দ্রীয় স্টেশন থেকে আলাদা টিম পাঠানো হয়েছে।

আশেপাশের তিন গ্রামের অনেকেরই ভাগ্য খুলে গেছে। লোকজন শুরুর দিকে বলছিল, বেনামি নারীটিকে ভারতে পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। এখন তারা আর কিছু বলছে না। যারা বিভিন্ন সংগঠন থেকে পর্যবেক্ষণ করতে এসেছেন তারাও ভারতে কিংবা বাংলাদেশে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা কিছু বলেননি। প্রেস কনফারেন্স করে বিশ্বসংঘের প্রতিনিধিদল জানিয়েছেন, তাদের প্রথম কাজ এই অসহায় গৃহহীন নারীর মানবাধিকার রক্ষা করা। তার প্রয়োজনীয় ডায়েট, খাওয়ার পানি ও স্বাস্থ্যসেবা সরবরাহ করা। প্রয়োজনে তারা আপাতত নো ম্যান্স ল্যান্ডে একটা ঘর তৈরি করে তার যাবতীয় দেখাশোনা করার ব্যবস্থা করবে। এরপর ইউএনএইচসিআর-এর নিয়মানুযায়ী তার অবস্থাকে সমর্থন যুগিয়ে নিজ দেশে ফেরা বা যথোপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার জন্য ভারত এবং বাংলাদেশকে চাপ দেওয়া হবে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল থেকে আসা একজন দেশি এবং একজন বিদেশি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা বিষয়টি খুঁটিয়ে দেখেছেন, এখানে স্পষ্ট করে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। নারীটি যাতে তার মানবাধিকার সম্পূর্ণরূপে উপভোগ করতে পারে, সেই বিষয়ে আমরা কাজ করে যাব। আমরা দেখছি, মানবাধিকারের সর্বাধিক মৌলিক বিষয়গুলো থেকে নারীটি বঞ্চিত। তিনি যে অবস্থায় আছেন সেখানে আশ্রয়, খাবার পানি, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং খাদ্য অপ্রতুল। তিনি সম্পূর্ণ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। বৃষ্টি, বাতাস এবং রোদ থেকে বাঁচার জন্য তাকে যে এতদিন কোনো শেল্টার করে দেওয়া হয়নি এ জন্য আমরা দুই দেশের সরকারকে দায়ী করব। তারা মানবাধিকার চরমভাবে লঙ্ঘন করেছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। নারীটি এখন আশ্রয়হীন, গৃহহীন—আমরা তাঁর শরণার্থীর সম্মান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করব।

দেশি বিদেশি অধিকার কর্মীদের চাপে এই স্থির প্রান্তিক জীবনেও চাঞ্চল্য চলে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিজিবি এবং লোকাল প্রশাসন বেশ উদ্বিগ্ন। অধিকারকর্মীদের ভরসা নেই, তার ওপর বিদেশি মিডিয়ার খবরদারি, কখন কি বলতে গিয়ে কি বলে তাতে সরকার বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে যাবে। বিজিবি বাধ্য হয়ে একরকম সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলল, তিন দিনের মধ্যে কোনো পরিবার দাবি না করলে নারীটিকে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অব রেডক্রস বা আইসিআরসির কাছে হস্তান্তর করা হবে।

এই সিদ্ধান্তের খবর জানাজানি হলে এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। চেয়ারম্যান ও দলীয় লোকজন এমপিকে গিয়ে ধরলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলার অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে যাচ্ছে। এখন যদি ঐ নারীকে সরিয়ে নেওয়া হয় তাহলে রাতারাতি অনেকে পথে বসবে। কেউ দ্বিগুণ দামে জমি কিনে বা বর্গা নিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে দোকান দিয়েছে। কত মানুষের কত রকমের বিনিয়োগ। শেষ পর্যন্ত সীমান্ত অঞ্চল থেকে নিয়মিত চাঁদা তুলে পার্টি অফিসে দেওয়া হবে, এই শর্তে এমপি রাজি হলেন। বললেন, বিষয়টি অনেক উপরে চলে গেছে তবু তিনি চেষ্টা করে দেখবেন। এলাকার লোকজন তাতেই আশার আলো দেখতে পেল। তাদের বিশ্বাস, এমপি চাইলে পারেন না এমন কোনো কাজ নেই। আর এমপিকে খুশি করতে পারলে তিনি চাইবেন না এমন কোনো কাজ নেই।

জুন মাস। শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। টানা চার দিন বৃষ্টি থামার নাম নেই। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বিজিবি নিয়মিত খাবার পাঠিয়ে আসছে। কিন্তু এখন খাবারের চেয়ে বড়ো সংকট হলো নো ম্যানস ল্যান্ডটি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে। সামান্য একটা ঢিবি দেখা যাচ্ছে, রাতের পর তাও হয়ত টিকবে না। নারীটিকে সরিয়ে নেওয়া দরকার। কিন্তু বাংলাদেশের সীমানার মধ্যে নিয়ে নিলেই ভারতের উপর আর চাপ সৃষ্টি করা যাবে না। যদি সত্যিই ভারতের হয়, তাহলে বাংলাদেশ কেন নেবে? এই ভাবনা থেকে গ্রামের মানুষের উদযোগে মাটির দশ ফিট উপরে একটি বাঁশের মাচান করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো।

গ্রামের লোকজন হৈহল্লা করে বাঁশ কেটে মাচান বানাতে গিয়ে ঘণ্টাদুয়েক পর মুখ কালো করে ফিরে আসে। গম্ভীর হয়ে ফিরে যায় দেশি বিদেশি কর্মীরাও। হতাশ হন মিডিয়াকর্মী এবং টকশোর বুদ্ধিজীবী। তখনও সেই নারীর শরীরের একটা অংশ পানির নিচ থেকে উঁকি মারছে। ডুবে আবার ভেসে উঠবে, তাছাড়া আর যাবে কোথায়?

পোড়ানো হবে, না মাটি দেওয়া—সকালে এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো পতাকা বৈঠকে বসতে যাচ্ছে দু দেশের বর্ডার গার্ড।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন