সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

বইমেলা ২০২২'এর খোলাচত্বর: কথোপকথন/ কুলদা রায়


প্রথমবারের মতো ওয়েবজিন ‘মন-মানচিত্র’ আয়োজন করেছে ‘বইমেলার খোলাচত্বর: কথোপকথন’ শীর্ষক কবি-সাহিত্যিকদের সিরিজ সাক্ষাৎকার। এই আয়োজনের একটাই মৌলিক উদ্দেশ্য- কবি-সাহিত্যিকদের সাহিত্যকর্মের সাথে পাঠকদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

ইতোমধ্যে আমরা বাংলাদেশে অবস্থানরত কবি-সাহিত্যিকদের বেশকিছু সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছি এবং পাঠকদের প্রভূত সাড়া পেয়েছি। পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত কবি-সাহিত্যিক যাঁদের বই প্রকাশিত হয়েছে কিন্তু দেশের বইমেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেন নি তাঁদের অনুভূতি পাঠকদের সামনে তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।আজকের কথোপকথনে আমাদের সঙ্গ দিয়েছেন কথাসাহিত্যিক কুলদা রায়।

মন-মানচিত্র: গ্রন্থ মূলত দীর্ঘ একটা সময়ের সাধনার ফসল। এবারের অমর একুশে গ্রন্থমেলাকে কেন্দ্র করে আপনার কয়টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে? গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হওয়ায় আপনার অনুভূতি এবং বইটির ব্যাপারে জানতে চাই।

কুলদা রায়:  এবারে বইমেলার সময় ঢাকা এবং কলকাতা থেকে আমার একটি গল্পের বই প্রকাশিত হয়েছে। নাম যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন। বইটি এ সময়ে প্রকাশের ইচ্ছে ছিল না। আমার প্রকাশক নালন্দার জুয়েল রেদোয়ান আমার একটি গল্পের নাম দিয়ে প্রচ্ছদ করে বললেন, পান্ডুলিপি পাঠান। এই নামে বই বের হবে। ফলে অপ্রকাশিত আটটি গল্প নিয়ে পাণ্ডুলিপি করে পাঠালাম। কলকাতায় আমার প্রথম বইয়ের প্রকাশক গুরুচণ্ডালী ক’বছর ধরেই বায়না ধরেছিল তাদেরকে যেন কোনো একটি পাণ্ডুলিপি দেই। পাণ্ডুলিপি রেডি বলে তাদেরকেও ‘যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন’ পাণ্ডুলিপি পাঠাই। বইটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। নালন্দার মালিক জুয়েল মানুষটি ভালো। তিনি প্রচ্ছদটি কলকাতার গুরুচণ্ডালীকেও ব্যবহার করতে দিয়েছেন।

ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে আমি খুব ব্যস্ত ছিলাম। সে সময়ে লাদেনের জুতা নামে গল্পটি লিখছিলাম। আমি একটি গল্প কয়েক মাস ধরে লিখি। বছরে সেজন্য তিনটি বা চারটির বেশি গল্প লেখার হয় না। ব্যস্ততার জন্য মনে হয়েছিল লাদেনের জুতা গল্পটি হয়তো বইটিতে অন্তর্ভুক্ত করতে পারব না। জুয়েল আমাকে জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সময় দিয়েছিলেন। সেজন্য গল্পটি লেখা শেষ করতে পেরেছিলাম। লাদেনের জুতা গল্পটির পটভূমি নাইন ইলেভেনে ট্যুইন টাওয়ার ধ্বংসের পরবর্তী আতঙ্কজনক পরিস্থিতি।

বইটিতে মোট আটটি গল্প রয়েছে। কাকচরিত, হলুদ ইলিশ, যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন, ক্রসফায়ারের পরে যা যা ঘটেছিল, অন্ধ শওকত আলী অথবা তার মেয়ের ঘটনা, যে গ্রামে সবাই গর্ভবতী হয়েছিল, লাদেনের জুতা এবং গুলাবগুলি।

প্রথম দুটি গল্প রূপকথার আঙ্গিকে লেখা। পরের গল্প ছয়টি রাজনৈতিক ও মৌলবাদী সন্ত্রাসের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে লেখা। এই বইয়ের সাতটি গল্পই জাদুবাস্তববাদী ঘরানার।

আমার মনে হয়েছে আমরা একটি অতি অস্বাভাবিক আতঙ্কগ্রস্থ সময়ের মধ্যে আছি। নানা কায়দায় মানুষ ক্ষমতার নিপীড়ণের শিকার হচ্ছে। এ-ক্ষমতা রাষ্ট্রক্ষমতা। এ-ক্ষমতা রাষ্ট্রীয় মদপুষ্ট মৌলবাদের ক্ষমতা। মানুষ আতঙ্কগ্রস্থ হচ্ছে। এক ধরনের শ্বাসরোধী আতঙ্কজাল ঘিরে ধরেছে সবাইকে। ভেঙ্গে পড়ছে মানুষ।

গেল বছর ঢাকার একটি পত্রিকা আমার কাছে একটি গল্প চেয়েছিল। তাদেরকে দিয়েছিলাম ‘ক্রসফায়ারের পরে যা যা ঘটেছিল’– গল্পটি। পত্রিকার সম্পাদক রাষ্ট্রক্ষমতার ভয়ে গল্পটি প্রকাশ করেননি। তিনি বলেছিলেন, গল্পটি প্রকাশিত হলে তার পত্রিকাটি বন্ধ করা হতে পারে।

যে গ্রামে সবাই গর্ভবতী হয়েছিল– গল্পটি নাসিরনগরে ঘটে যাওয়া সাম্প্রদায়িক নিপীড়ণের ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে লেখা। ভারতের সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক সাদিক হোসেন গল্পটি পড়ে মন্তব্য করেছেন– আপনার গল্প পড়লাম – ‘যে গ্রামের সবাই ধর্ষিত হয়েছিল’। এই গল্পটি পাঠককে তাঁর ন্যাংটো সময়ের সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। এতো ভয়ের গল্প খুব কম পড়েছি।

আমি মনে করি কথাসাহিত্য এক ধরনের বিকল্প ইতিহাসও বটে। প্রচলিত ইতিহাস ক্ষমতাকর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হয় বলে তার বিশ্বাসযোগ্যতা কম। ক্ষমতা টিকে থাকার স্বার্থে মানুষের স্মৃতিকে ভুলিয়ে দিচ্ছে। এই স্মৃতিসমূহই হলো প্রকৃত ইতিহাসের অংশ। স্মৃতিহীন মানুষ ক্ষমতার দাসে পরিণত হয়। এই ব্যবস্থা থেকে মুক্তির উপায় হলো বিস্মৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে স্মৃতিকে ফেরত আনা। প্রকৃতপক্ষে এ লড়াইটি হলো ক্ষমতার বিরুদ্ধেই লড়াই। এ কাজটির দায়িত্ব বর্তায় কথাসাহিত্যকদের উপর। সেজন্য কথাসাহিত্য বিকল্প ইতিহাস হিসেবে আজ এবং আগামীকালের মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। আমার লেখালিখি স্মৃতিকে বিস্মৃতির কবল থেকে স্মৃতিতে ফেরত আনার কাজ করছে হয়তো। সেটা কতটুকু– আমি জানি না। জানার ইচ্ছেও নেই।

মন-মানচিত্র: বই প্রকাশিত হলো কিন্তু পারিপার্শ্বিক কারণে অংশগ্রহণ করতে পারলেন না। এ ক্ষেত্রে আপনার অনুভূতি কি জানাবেন?

কুলদা রায়: জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত বাংলাদেশে ছিলাম। ইচ্ছে করলে বইমেলা পর্যন্ত থাকা যেতো। কিন্তু মেলায় থাকার ইচ্ছে হয়নি। আমার মতো করে দেশে সময় কাটিয়েছি। কিছু পারিবারিক কাজ করেছি। নিজের মতো পাল্টে যাওয়া দেশের কিছু অংশ দেখেছি। মানুষকে বোঝার চেষ্টা করেছি। এগুলোই তো আমার প্রিয় কাজ। সেভাবে কোনো লেখকসঙ্গও করিনি। কিছু বইপত্র কিনেছি। মেলা ব্যাপারটি কী হতে যাচ্ছে সে ব্যাপারেও কোনো আগ্রহ আমার ছিল না।



নিউ ইয়র্কে দীর্ঘদিন ধরে আছি। এখানেও বইমেলা হয়। লেখকদের নানা সভাসমিতি আছে। সেগুলো আমি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি। সেভাবে আমার কোনো লেখক বন্ধু নেই আমার এই শহরে। এগুলো আমার পোষায় না।

আমার জীবনে ঢাকার বইমেলায় গিয়েছি দুবার। ১৯৭৮ সালে। তখন আমি স্কুলে পড়তাম। চোখের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় গিয়েছিলাম। যার কাছে উঠেছিলাম তিনি বইমেলায় গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। আর ১৯৯৪ সালে। তখন একজন লোককে খুঁজতে গিয়েছিলাম। কবিতা আবৃতি শুনেছিলাম বটতলায়। শামসুর রাহমানে কবিতা– স্বাধীনতা তুমি রবি ঠাকুরের অজর কবিতা/ অবিনাশী গান…..।

বইমেলায় লেখকরা শামিল হন। বিদেশ থেকেও অনেকে বইমেলার সময়ে প্রতিবছর যাওয়াটাকে নিয়ম করে নিয়েছেন। তাদের বইপত্র প্রকাশিত হয়। মেলায় এরা নানা টিভিতে কথা বলেন। কেউ কেউ মোড়ক উন্মোচন করেন। অধিকাংশই ঢাকার লেখকদের সঙ্গে মেলায় ঘুরে বেড়ান। ছবি তোলেন। ক্ষমতাধর লেখক বা কর্তাব্যক্তির সঙ্গে দেখা করেন। বুঝতে পারি এটা তাদের একটা প্লেজার ট্রিপ। মুখ দেখাদেখির জায়গাও বটে। শুনতে পাই কেউ কেউ পুরস্কার টুরস্কার পাওয়ার চেষ্টা-তদ্বির করেন। দূর থেকে এসব দেখতে আমার বেশ মজাই লাগে।

প্রকৃতপক্ষে বইমেলাটি প্রকৃত বইমেলা নয় বলেই মনে হয়। হয় লেখকদের ক্যাটওয়াক।

মন-মানচিত্র: আপনার পূর্বে প্রকাশিত সাহিত্যকর্মও কি পাঠকরা গ্রন্থমেলা থেকে সংগ্রহ করতে পারবেন?

কুলদা রায়: শুনেছি বইমেলা থেকে এ বছরে প্রকাশিত ‘যে সুচিত্রা সেন কিডন্যাপ হয়েছিলেন’ বইটি ছাড়া পূর্বে প্রকাশিত আমার আরও পাঁচটি বই কেউ কেউ সংগ্রহ করেছেন। রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আমার দুটি বইয়ের প্রকাশক বিপিএল এবারে মেলায় অংশগ্রহণ করেনি। বিপিএল কর্তৃক প্রকাশিত বই দুটি বাতিঘর ও প্রথমায় পাওয়া গেছে বলে একজন পাঠক জানিয়েছেন।

নালন্দা আমার দুটি বইয়ের দ্বিতীয় সংস্করণ করেছে।

মন-মানচিত্র: অমর একুশে গ্রন্থমেলা লেখক-পাঠকদের মধ্যে শুধু সেতুবন্ধনের কাজটিই যে করে তাই নয়, এইসময় গ্রন্থপ্রেমিকদের মধ্যে খুশির আমেজও পরিলক্ষিত হয়। গ্রন্থমেলাকে অর্থবহ করার ব্যাপারে আপনার অভিমত জানতে চাই।

কুলদা রায়: গ্রন্থমেলাকে অর্থবহ করার জন্য কোনো সুপারিশ আমার নেই। করার মতো উপযুক্ত লোক আমি নই।

এই মেলাটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ। যে কারোরই লেখক হওয়ার অভিলাষ পূরণ করার জায়গা। এটা ভালো কথা নয়। মেলায় চার পাঁচ হাজার বই বের হয়। কিন্তু ভালো বইয়ের সংখ্যা খুবই কম। কারো কারো মতে তিন চারশোর বেশি মানোত্তীর্ণ বই প্রকাশিত হয় না।

বইমেলায় দুর্বল অসম্পাদিত বইপত্র ছাপা হচ্ছে। এক ধরনের প্রকাশক লেখকদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপিয়ে দিচ্ছেন। এসব বই আবার লেখকরা পুশিং সেল করছেন অথবা আত্মীয়স্বজনদের মেলায় এনে হাতে তুলে দিচ্ছেন। একজন ব্যাঙ্কের প্রধান নির্বাহীর বই দুই দিনে ৩০০০ কপি বিক্রি হয়েছে বলে খবরে পড়েছি। তার ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখার কর্মচারি কর্মকর্তারা এই তিন হাজার বইয়ের ক্রেতাই হবে বলে মনে হয়। এ ধরনের মস্করার খবরও পাওয়া যাচ্ছে।

আওয়ামী লীগ এখন ক্ষমতায়। হাজার হাজার বই লেখা হচ্ছে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। নিউইয়র্কে একজন প্রবীণ সাংবাদিক থাকেন। তিনি আওয়ামী বিরোধী। দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি জামায়াত ঘরানায় বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতিবাচক সমালোচনা করেছেন। এখন খবর পেলাম বঙ্গবন্ধুর স্তুতি করে নিয়ে বই লিখে ফেলেছেন।

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে দুটি বই লিখেছেন একজন গ্রাম্য কবিয়াল। তিনি কায়েদে আজম, আয়ুব খান, জিয়া, এরশাদ, খালেদা জিয়া, হাসিনাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। হয়তো গোলাম আজম, খোন্দকার মোস্তাক, ইয়াহিয়া খানকে নিয়েও লেখাপত্র থাকতে পারে। তার মান সাহিত্য পদবাচ্য নয়। ব্যক্তিগতভাবে একটি খুনের আসামী হিসেবে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রাপ্ত হয়েছিলেন। জেলেও ছিলেন। কিন্তু জিয়া ক্ষমতায় থাকাকালে তার সাজা মওকুফ করে দেন। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে জিয়ার রাজনীতিতে জড়িত হন। এই কবিয়াল বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বই লেখার কারণে তার আমলা ছেলের তদ্বিরে মরণোত্তর সাহিত্যে স্বাধীনতা পদক পেয়ে গেছেন।

এই একটা হুজুগ চলছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা বইয়ের অধিকাংশই নিম্নমানের। বেশির ভাগই কপি পেষ্ট। নকল। এই নিম্নমানের বইগুলোর কোনো সাহিত্য মূল্য নেই। ঐতিহাসিকমূল্যও নেই। সরকারি সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য ধান্ধাবাজ লেখক, রাজনীতিক, আমলা, ভুয়া সাংবাদিকরা এসব বইয়ের লেখক। সরকারি টাকায় এসব বইগুলো কেনা হচ্ছে। পাঠানো হচ্ছে সরকারি গ্রন্থাগারে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতা থেকে সরে গেলেই এসব বইকে গার্ভেজ করা হবে। ঐসব ধান্ধাবাজ লেখকরা পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলের নেতাকে নিয়ে বই লিখবেন। বইমেলায় এসব বই সয়লাব হয়ে ছিল।



মন-মানচিত্র: একুশে বইমেলাকেন্দ্রিক বইপ্রকাশনা এখন একটি প্রথা হয়ে গেছে। বিদেশে অবস্থানরত স্বভাষী লেখক হিসেবে আপনি বইমেলাকে কিভাবে মূল্যায়ন করবেন?

কুলদা রায়: বইমেলা কেন্দ্রিক প্রকাশনার রেজওয়াজ ভালো কথা নয়। দরকার সারা বছর জুড়ে বই প্রকাশনা পদ্ধতি ফিরিয়ে আনা।

বইমেলাকে টার্গেট করে বই প্রকাশের জন্য লেখক, প্রকাশক, প্রিন্টারস, বাইন্ডারসসহ প্রকাশনা শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের উপর বছরের একটা সময়ে চাপ পড়ে যায়। সবার মধ্যে একটা তাড়াহুড়া দেখা যায়। তাড়াহুড়া করে বইটি লেখা সম্পন্ন করেন লেখকরা। সম্পাদনার প্রথা আমাদের দেশে এখনো সেভাবে গড়ে ওঠেনি। প্রুফ রিডিংটাও ঠিক মতো হয় না। লেখকরা তড়িঘড়ি করে একটা পাণ্ডুলিপি রেডি করেন। মান যাচাই বাছাই না করেই বইটি ছাপা হয়ে যায়। ফলে দেখা যায় চার পাঁচ হাজার বইয়ের মধ্যে পাঠযোগ্য বইয়ের সংখ্যা শত খানেকের বেশি হয় না।

প্রকাশিত বইগুলোর কোনো রিভিউ থাকে না। বইমেলার ব্যস্ত পরিসরে কোনো পাঠকই বইটি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না নিয়েই বই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে দুর্বল মানের বইপত্রই বেশি বিক্রি হচ্ছে।

বিদেশে এরকম দেখিনা। বই প্রকাশের সঙ্গে বইটির বিষয়ে রিভিউ থাকে। বইয়ের দোকানে গিয়ে সময় নিয়ে অনেকটা পড়েও নেওয়া যায়। ফলে যিনি কিনবেন তিনি বইটি সম্পর্কে পূর্ণ ধারণা নিয়েই কিনতে পারেন।

দেশে বইমেলাটি এখন মাছের বাজারে রূপ নিয়েছে। বাজারে গেলাম। ভিড় ঠেলে মাছ দেখলাম। নেড়েচেড়ে ঠিক আছে কিনা তা একটু দেখেই মূলামূলি করে কিনে ফেললাম।

মন-মানচিত্র: বিদেশে থেকে দেশে বই প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আপনি কি কি ধরণের জটিলতায় পড়েন? এ ব্যাপারে আপনার বিস্তারিত মতামত জানতে চাই।

কুলদা রায়: আমার প্রথম বইটি প্রকাশ করেছিল ‘আমার বই’ নামে একটি ব্লগভিত্তিক প্রতিষ্ঠান। লেখাগুলো ব্লগেই প্রকাশিত হয়েছিল। বইটি প্রকাশের মাঝামাঝি প্রকাশকের লোক কিছু টাকা চেয়ে বসলেন। তারা বইটির কোন বানান সংশোধন ছাড়াই বইটি বের করে। দেখে আমার মন খারাপ হয়ে যায়। কিছু দিন পরে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটিই উঠে যায়। আমি এই ভুলেভরা বইটিকে বাতিল ঘোষণা করি।

এই বইটিই আরেকটু বৃহৎ কলেবরে কলকাতা থেকে কাঠপাতার ঘর নামে গুরুচাণ্ডালী প্রকাশ করে। বইটি বেশ ভালো বিক্রি হয়েছে। কয়েকটি সংস্করণও হয়েছে। ঢাকা থেকেও দুই বছর অন্তর আমার আরো তিনটি গল্পের বই বেরিয়েছে। কলকাতা থেকেও বের হয়েছে। ঢাকার বইগুলোর প্রোডাকশন -মান ভালো। কিন্তু সম্পাদনার মানে কলকাতার থেকে ঢাকা অনেকটা পিছিয়ে। শুধু বানান ভুল নয়, ভুলভাল শব্দও ছাপা হয়। এগুলো ঠিক করার দায়িত্ব প্রকাশকের। ঢাকার প্রিন্টিং বাইন্ডিং কলকাতা থেকে উন্নত।

রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি নামে আমার একটি বই প্রকাশ করেছিল বিপিএল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি দেশের অন্যতম নিউজ পোর্টাল বিডিনিউজ২৪ ডট কমের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। বইটির কাগজ, প্রুফ, ছাপা বাইন্ডিং খুবই ভালো। বইটির নাম রেখেছিলাম ‘রবীন্দ্রনাথের জমিদারগিরি ও অন্যান্য বিতর্ক’। কিন্তু বইটি প্রকাশিত হলে দেখা গেল পুরো নামটি গ্রহণ প্রচ্ছদে নেই। আমার নিজের নামটি ভুল বানানে লেখা হয়েছে। এ নিয়ে প্রকাশককে জানালেও তারা ব্যবস্থা নেননি।

এক সময়ে আমি ব্লগ লিখতাম। সে সময়ে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ে আমার বিতর্ক হয়। এগুলো সংকলিত করে বিপিএল যৌথভাবে একটি বই ছেপেছে। কিন্তু ছাপার আগে আমার সঙ্গে প্রকাশক কোনো রকমের আলাপ আলোচনা করেননি। করার প্রয়োজনও বোধ করেননি। এগুলো তো একটা ক্রিমিন্যাল অফেন্স। আমার বিদেশে থাকার জন্য তারা এটা করতে সক্ষম হয়েছে।

এছাড়া বইপ্রকাশনা ও বিপণন সম্পর্কে লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের স্বচ্ছতা থাকা দরকার। সেটার অভাব রয়েছে বলে মনে হয়েছে।

সর্বোপরি একটি বই প্রকাশ করেই প্রকাশকের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। বই তো বুদ্ধিবৃত্তিক পণ্য। তাকে সঠিক বিপণন ব্যবস্থার মধ্যে দিয়ে যাওয়া দরকার। সেটার ক্ষেত্রেও বিস্তর ঘাটতি আছে। বইটি রিভিউয়ারদের কাছে পৌঁছানো, পত্রপত্রিকায় নিয়মিত বইয়ের তথ্য বিজ্ঞাপন, ক্যাটালগ– এগুলোও প্রকাশ করা দরকার যাতে পাঠক বইটি সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানতে পারেন। বইটির খবরই যদি কেউ জানতে না পারেন তবে বইটি প্রকৃত পাঠকের কাছে পৌঁছাবে না। লেখককেই নিজের বইয়ের প্রচারণার দায়িত্ব নিতে হয়। এটা লেখকের দায়িত্ব নয়। বিদেশে বসে এগুলো নিয়ে প্রকাশকের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ কম থাকে।

আরেকটি সমস্যা হলো– দেশে বইভিত্তিক সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এরা তাদের অনুসারীদের প্রকাশিত বইয়ের প্রমোশনাল কাজগুলো করে থাকে। পত্রপত্রিকা, ইলেকট্রোনিক মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বইগুলোর রিভিউ, লেখকের সাক্ষাৎকার প্রচার করে। বইমেলায় পুশিং সেল করে। নানা পুরস্কার দেয়। ফলে বইটি দুর্বল মানের হলেও এই সিন্ডিকেট ভিত্তিক প্রচার প্রোপাগান্ডায় বিক্রি হয়। বেস্ট সেলার হয়। পুরস্কৃত হয়। কিন্তু অধিকাংশ ভালো লেখা বা বইগুলো আলোচনার বাইরে থাকে। ক্রেতা পাঠক বিভ্রান্ত হয়ে দুর্বল বই কিনতে উদ্বুদ্ধ হয়।

মন-মানচিত্র: বইমেলার পর প্রকাশিত বইয়ের আর বিশেষ খোঁজ থাকে না। বই বাজারজাত করার বিষয়ে আপনার পরামর্শ জানতে চাই।

কুলদা রায়: বিদেশে স্কুল থেকেই ছাত্রছাত্রীদেরকে বই পড়ার আগ্রহ জাগিয়ে তোলা হয়। প্রতিটি ক্লাশেই লাইব্রেরি আছে। সেখান থেকে বই নিয়ে পড়তে হয়। সেই বইগুলো পড়ে তাদের পাঠপ্রতিক্রিয়া লিখতে হয়। স্কুল পর্যায়ে পরীক্ষার বালাই থাকে না বলে ছাত্রছাত্রীরা সাহিত্যপাঠ করে মনের আনন্দে। শিক্ষক তাদেরকে সাহিত্যের শৈলীগুলো জানিয়ে দেন। ফলে ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য নির্দিষ্ট প্রশ্নোত্তর নোট মুখস্ত করার দরকার হয় না। এভাবে পাঠের আনন্দ পেতে সারাজীবনই তাদের বই পাঠের অভ্যাস গড়ে ওঠে। দেখা এক হাতে মোবাইল ফোন, কানে হেডফোন থাকা সত্ত্বেও বাসে ট্রেনে পার্কে লোকজনকে বই পড়তে দেখা যায়। বইয়ের বিক্রি বিপুল। একই বইয়ের নানা সংস্করণ থাকে। পাঁচ ডলারেও পেপার ব্যাকে বই কেনা যায়। আবার পঞ্চাশ ডলারে সেই বইয়ের শোভন সংস্করণ কেনা যায়।

আমাদের দেশে স্কুলে পরীক্ষার পড়া মুখস্ত করানো হয় ভালো নম্বর পাওয়ার জন্য। সাহিত্য পাঠ যেন নিষিদ্ধ বিষয় হয়ে উঠেছে। ফলে পাঠরুচি ও পাঠ অভ্যাস দেশে গড়ে ওঠে না।

দ্বিতীয়ত দেশে লাইব্রেরির চল নেই। খুব অপ্রতুল লাইব্রেরি আছে। সেখানে বইয়ের সংখ্যা কম। ভালো বইয়ের সংখ্যা আরো কম। স্কুলে লাইব্রেরি থাকলেও সেটা খোলা থাকে কিনা সন্দেহ।

একটা সভ্য দেশে পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরি থাকে। লাইব্রেরিকে কেন্দ্র করে সেখানে শিল্প সাহিত্যের সকল কার্যক্রমই পরিচালিত হয়। লাইব্রেরিতে ছাত্রছাত্রীদের আফটার স্কুল কার্যক্রমে ছাত্রছাত্রীরা যোগ দেয়। তারা সেখানে হোমওয়ার্ক করে। ফ্রি কম্পিউটারের সুযোগ পায়। নানা বিষয়ে পড়ার সুযোগ পায়। নানা প্রশিক্ষণ কর্মসূচী থাকে। এমন চাকরিবাকরির তথ্যকেন্দ্র হিসেবেও লাইব্রেরি করে।

লাইব্রেরিতে নিয়মিত লেখক প্রখ্যাত ব্যক্তিরা আসেন। তাদের লেখা নিয়ে বলেন। সাহিত্যপাঠ শিল্প দর্শন নিয়ে বলেন। এভাবে পাঠরুচি গড়ে ওঠে। পাশাপাশি রয়েছে ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিষয়ক বিস্তর বইপত্র। এগুলো আমাদের দেশে নেই। পাঠরুচি তৈরি করা ছাড়া পাঠ-অভ্যাস গড়ে উঠবে না। শহরের সব বাসিন্দাই এই লাইব্রেরির সদস্য হন। ফ্রি। প্রয়োজনীয় সকল কাজই এই লাইব্রেরিতে করার সুযোগ রয়েছে।

দেশে বইমেলা চলুক। কিন্তু সারাবছর বইপ্রকাশের সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। সারা বছরে প্রকাশিত বইপত্র নিয়ে বিস্তর রিভিউ আলোচনা সমালোচনা হোক বছর ভর। তারপর সেই বইগুলোর প্রদর্শনী হোক বইমেলাতে।

বিদেশে বইমেলা বা বুক ফেয়ারে সাধারণত বই বিক্রির ব্যবস্থা থাকে না। সেখানে বই বিষয়ক আলাপ আলোচনা সভা সেমিনার লেখকের সাক্ষাৎকার রাইটার্স ক্যাম্প– এ ধরনের কর্মকাণ্ডই চলে। দেশের বইমেলাকেও বিপণন কাজটি থেকে উদ্ধার করে বৌদ্ধিক কাজে পরিণত করা দরকার।

মন-মানচিত্র: বিদেশে অবস্থানরত বাংলাভাষী কবি-সাহিত্যিকদের বাংলাদেশ সরকার “প্রবাসী” অ্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। ভাষার যদি কোন সীমান্ত না থেকে থাকে, তাহলে এই অ্যাখ্যা দেওয়া কি যৌক্তিক মনে করেন?

কুলদা রায়:দেশী প্রবাসী বলে কোনো শব্দ থাকার অর্থ নেই। এক ধরনের হীনমন্যতা অথবা ধান্ধাবাজী থেকে এই রকম শব্দের প্রচলন করা হয়েছে। এমনকি প্রবাসী কোটায় বাংলা একাডেমি একটি দ্বিতীয় মানের সাহিত্য পুরস্কারও প্রবর্তন করেছে। প্রবাসে থাকা পুরস্কারলোভী লেখকরা সেই পুরস্কার গ্রহণও করছেন। এগুলো লজ্জার ঘটনা। পুরস্কার- পদক-সম্মাননা এগুলো প্রকৃত লেখকের অন্বিষ্ট নয়। মহৎ সাহিত্য সৃষ্টিই তার লক্ষ হওয়া উচিত। ব্যক্তিগতভাবে আমি জীবনে কোনো ধরনের পুরস্কার-পদক-সম্মাননা গ্রহণ করব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

মূল কথা হলো– লেখা। ইউনিক কোনো লেখা করা যাচ্ছে কিনা সেটাই ঘটনা। অনেক লেখকই আছেন যারা বিদেশে থেকেও বাংলা সাহিত্যের পরম্পরা বজায় রেখে বিশ্বমানের লেখা লিখছেন। আবার দেশে বাসকরা অনেকের লেখায় পরম্পরা খুঁজে পাওয়া যায় না। বোঝা যায় তিনি বিদেশী সাহিত্য নকল করে লিখছেন। নিজের দেশ, মানুষ, স্মৃতিকে বাদ দিয়ে কোনো লেখা প্রকৃত লেখা হয় না।

মন-মানচিত্রকে ধন্যবাদ।

মন-মানচিত্র: 

আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

সাক্ষাৎকারটি মন-মানচিত্র ওয়েবজিনের পূর্ব প্রকাশিত



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন