সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

জর্জ স্যন্ডার্সের গল্প: সাহসী জননী


সমকালীন আমেরিকান গল্প  

অনুবাদ: বেগম জাহান আরা

 

আবার সেই ঘটনা। তাঁর প্রিয় অগোছালো রান্না ঘর গোছ গাছের জন্য আসা যাওয়া করতে করতে মূল্যবান সকালের সময় বয়ে যাচ্ছে। এগোচ্ছে না কাজ। ক্যান খোলার যন্ত্রটা হাতে ধরে আছেন কেনো তিনি?

হমম।

এটা অন্য কিছু হতে পারে।

"ছোটো বিশ্বস্ত খোলার যন্ত্রটা।" গেরার্ডের এই যন্ত্রটা খুব পছন্দের। সে এটা দিয়ে বড়ো জিনিস খুলতে চায়। অনেক বড়ো কিছু খুলতে চায়। সবচেয়ে বড়ো জিনিসও খুলতে চায়। কিন্তু অবশেষে খোলে কি? উহ, বীন? ভুট্টা? টুনা মাছ?

দিনটা কাজে লাগাবার জন্য তোমার তাকে বিশেষ কিছু দেয়া উচিত খোলার জন্য। ওশুধ? হার্টের ওশুধ? ক্যান খোলার যন্ত্রদিয়ে তুমি হার্টের ওশুধ খুলতে পারো না। টমেটো পেস্ট? বাড়ির কিছু প্রিয় মানুষ সত্যি স্প্যাগেটি খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করে থাকে। এক ধরনের পুরনো ইটালিয়ান খাবার, সবার প্রিয় খাবার। স্প্যাগেটির স্বাদ তাকে নিয়ে যায় ফ্লোরেনসের দিকে। কিন্তু আধুনিক উচ্চ প্রজুক্তি সম্পন্ন খোলার যন্ত্রটা, বাজে ঝাঁজরি এবং পচা লেটুসের সাথে নিয়ে ক্লিফ গেছে ধুম ধড়াক্কা পার্টিতে। গেরার্ড সুযোগ পেলো। যদিও তার যন্ত্রটা উনিশশো ষাট দশকের এবং সেটার হ্যান্ডেল ক্লিফের মতো ফ্যান্সি রাবারের নয়, তবু সেটাদিয়ে সে কাজ চালাতে পারতো। সেটাই এটা। তার সুযোগ ছিলো মৃত্যুর আগে মামা টিনটিকে সাহায্য করা---

উফ।

সত্যি।

মিস্টার পটস কেনো বাদামের জন্য গেইট-এর পেছনে নোংরা ঘরে গেলো? এই মাত্র তিনটে বাদাম জাতীয় জিনিস ওকে খেতে দিয়েছেন তিনি।

"অসন্তুষ্ট কুকুর।" অতৃপ্ত কুকুর কখনও খুশি থাকে না। যতোই তাকে বাদাম জাতীয় খাবার দেয়া হোক না কেনো। যখন সে ভেতরে থাকে, তখন বাইরে যেতে চায়। যখন বাইরে---

বাক্স থেকে তিনি আর একটা বাদাম জাতীয় খাবার তুলে নিলেন।

"একটা পিনাট-বাটার জাতীয় খাবার শেষ হলে বাক্সে আর একটা থাকবে।"

জিম তার বাদামের মতো শরীরটাকে ক্রমশ উঁচুতে তুলে নিলো।**জেক এবং পলি খুব মজা করে দেখছিলো। জিম কি ওগুলো খেতে চায়? যাও যাও, এসব দেখা ছাড়ো তোমরা দুজন। জিম চিৎকার করলো। যেনো বুড়ো আঙুল আর অন্য আঙুল মুখে দিয়ে বললো, উহ, কি সরু গলি। যেখানে পিনাট-বাটার দেয়া হচ্ছে সেই জায়গাটা একেবারে পতিত।

তিনি গেইট খুলে মিস্টার পটসকে বাদাম জাতীয় খাবার দিলেন। তারপর দরজার গায়ে হেলান দিয়ে ডেরেককে ডেকে বেল্ট দিয়ে বাঁধতে বললেন মিস্টার পটসকে।

কোনো উত্তর শোনা গেলো না।

“ছেলেটা উত্তর দিতে পারলো না।" এক সময় একটা ছেলে ছিলো, ডাকলে যে উত্তর দিতো না। সে কি ইচ্ছে করে তাকে অবজ্ঞা করতো? কারন তার বয়স তখন কম ছিলো? সে কি হস্ত মৈথুন করছিলো? সেটাই কি ব্যাস্ততা ছিলো? মা খুব মনোযোগ দিয়ে তার জাঙ্গিয়া এবং বিছানার চাদরে মৈথুনের চিহ্ন খুঁজেছিলেন এই জন্য যে, প্রয়োজনে তিনি শান্তভাবে তাকে বুঝিয়ে বলবেন, সব বিখ্যাত লোক এমন কি বড়ো বড়ো ঐতিহাসিক মানুষেরাও---

“এটাই নিজের সময়।" বারো বছর বয়সে জর্জ ওয়াশিংটন তাঁর বিছানায় শুয়ে ছিলেন। সেটা ছিলো চার থাম্বার বিছানা, যাতে অন্য বিছানাগুলো আড়াল হয়ে যায়। সেটা কি অলৌকিক কিছু ছিলো? কি ভাবছিলেন তিনি? তাদের প্রতিবেশি মিসেস বেটি এলকট আঁটো পোশাক পরে সেখানে গিয়েছিলেন তিন কোনা হ্যাট খোলার জন্য? না, কেউ যদি এইরকম ভেবে থাকে, সেটা "স্বাভাবিক।" যদি নিজের গা স্পর্শ করে সে মনে করে, তন্বী মিসেস এলকট অন্যমনস্ক ভাবে তাঁর সরু পালকের মতো শরীরের ঠোঁট দিয়ে তাকে ছুঁয়েছে, তাহলে অন্য ছোটো ছেলেরাও অন্যখানে অন্যসময়ে নিজেকে ছুঁয়ে এইরকম ভাবতে পারে। সুতরাং, সে যা করছে তা ভালোই করছে। হঠাত তিনি নির্ভার মনে করলেন নিজেকে। একেবারে মুক্ত হয়ে একটা নতুন ভুমির স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে সবাই নিজেকে এমন মুক্ত মনে করবে---

হায় ঈশ্বর। প্রায় দুপুর এখন।

সত্যি সত্যি এখন বসে লেখার সময়।

ডেরেক কোথায়, যদিও? সত্যি তো। তিনি চন্তিত। ছোটো বেলায় তার হার্ট ছিলো খুব দুর্বল।

ভিডিও এলো নিউ ইয়র্ক থেকে।

গত রাতে বিছানা থেকে তিনি বলেছিলেন, তুমি ভালো তো?

তুমি তাকে আরও ভিতুর ডিম বানিয়ে সর্বনাশ করছো, কিথ বলেছিলেন।

ঘর থেকে ডেরেক বলেছিলো, আমি ভালো আছি। সে তো ঠসা নয়।

কিথ বললেন, ফুসফুস ঠিক আছে?

খুব ভালো, ডেরেক বললো।

আমরা তোমাকে খুব ভালোবাসি, তাই চিন্তা করি, তিনি বললেন।

ঠিক আছে, ডেরেক বললো।

তারপর আরামের নীরবতা নেমে এসেছিলো।

পরিবার থাকাকে তিনি প্রশংসা করেছিলেন। টিভি পরিবারগুলো সবসময় খুব এলমেলো, ভাঙা। কিন্তু এখানকার কথা একেবারে আলাদা। তারা একে অপরকে পছন্দ করে, কতো মজা করে। একে অপরকে বিশ্বাস করে, আস্থা রাখে।প্রত্যেকেই প্রত্যেকের আলাদা স্বাতন্ত্রকে মেনে নেয়, তা যেমনই হোক।

সামনে থেকে বা পেছনে থেকে নয়।

আসলে গুরুতরো কি হয়েছিলো? এই অঙ্গনে সে থাকবে বলেছিলো। সে এমন একটা ছেলে, যে কথার বরখেলাপ করে না। 

"বনের মধ্যে ছেলেটার খারাপ ফুস্ফুস কাজ করা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিলো।"

“ছেলেটা শুয়ে পড়ে দুর্বল কন্ঠে তাঁর মাকে ডাকছিলো।"

“ছেলেটা মরে গিয়ে বনের একটা অংশ হতে পারতো।"

এবং মা সব সময় বনের মধ্যে ঘুরে তাঁর হারানো ছেলেকে খুঁজতো।

ইইক।

“মা ছুটে গেলেন বনে, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলেন কেমন করে হার্ট ম্যাসাজ ( সিপি আর ) করে। তারপর হঠাতই মনে পড়ে গিয়েছিলো।

হায় ঈশ্বর, হায় ঈশ্বর। তাঁর গাল খুব গরম হয়ে গিয়েছিলো।

ডেরেক কোথাও ব্যথা পেয়েছিলো। তিনি ঠিক জানতেন। মায়েরা এই সব বোঝেন।

তিনি সেল ফোন এবং ফার্স্ট এইড বক্স তুলে নিলেন, এবং---

থামো বাছা, আহা, একটু ধৈর্য ধরো।

এই রকম পরিস্থিতিতে কিথ এমন ধরনের কথা সব সময় বলে থাকেন। ভেঙে পড়েছিলেন তিনি। কাজ করতে চাইতেন তিনি। কখনও মায়েরা এইসব কাজ করতেই জানেন না। গতো মাসেই মাত্র জেনেছেন যে, বাস স্টপ থেকে ছেলেটা অপহৃত হয়েছিলো। খবর পেয়ে গোসলের পোশাকে এবং ঘরের স্লিপার পায়ে দিয়েই দৌড়ে গিয়েছিলেন তিনি। মা আসছেন দেখে ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে মা, না, না, না, বলছিলো। কিন্তু খুব দেরি হয়ে গিয়েছিলো। মায়ের দৌড় দেখে অন্য বড়ো ছেলেরাও দৌড়ে গিয়েছিলো।

এক সময় স্বপ্নে মা দেখেছিলেন, ছেলেটা ধুমপান শুরু করেছে। স্বপ্নে দেখলেন, ছোটোদের স্কাউটসে সে সিগারেট খাচ্ছে। ভঙ্গিটা ছিলো দৃষ্টি আকর্ষন করার মতো। বড়োদের গলার স্বর অনুকরন করে সে মিস্টার বেলডেনের কাছে জানতে চেয়েছিলো, এখানে সিগারেট খোরদের জন্য কোনও ব্যাজ আছে কি না। পরদিন সকালে পোশাকের গন্ধ শুঁকে সত্য ঘটনা বলার সময় সে এমনভাবে কাঁদতে শুরু করলো যার কিছুই বোঝা গেলো না।

“কেনো ধুমপান করবো আমি মা? এটা বিরক্তিকর ব্যাপার।” সে বললো।

তোমার যা করা উচিত তা হলো, আসল ঘটনা জেনে নিয়ে চিরকালীন ভয়কে বাতিল করা। পড়া শোনার মাধ্যমেই তিনি জেনেছেন উত্তম জীবনাচারের কথা। এক মহিলা আকাশে উড়তে ভয় করতেন। তাঁর চীনযাত্রার আগে বিমান দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান বিষয়ে মাস খানেক পড়াশোনা করেন। একজন পুরুষ সাপকে ভয় পেতেন। তিনি এক মন্ত্র শিখলেন, যে মন্ত্র অধিকাংশ বিষহীন সাপের জন্য প্রজোয্য। একটা প্রবন্ধে দেখা যায়, বাচ্চাদের ভালো চান, এমন বাবা মায়েরা আরো অনেক কিছু করেন। একজন মা খাবারের প্রতি খুব মনোযোগ দিয়ে নিজের কন্যাকে শারীরিক ওজনের ব্যাপারে ভীত করে তুলেছেন। একজন বাবা বেহালা বাজানোর চর্চার ব্যাপারে খুব কঠোর ছিলেন, অবশেষে তাঁর ছেলে সঙ্গীতকেই ঘৃনা করেছিলো। এমনকি বাদামি চকচকে কাঠের কোনো বাদ্যযন্ত্রের কাছে গেলে সে খুব আতংকিত হতো।

বর্তমান বিশ্বে এখন হাজার হাজার ছেলে অকারনে সময় নষ্ট করছে। অঙ্গনে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভঙ্গ করছে সেটা।

অধিকাংশ বনই বিপদ জনক ছিলো না।

সাধারনত ফুস্ফুস তাঁর কার্যকারিতা হারাতো না।

পৃথিবীটা ভয় পাওয়ার মতো প্রতিকুল জায়গা নয়। ডেরেক ছোট্ট স্মার্টছেলে এবং তাঁর কাঁধের ওপর আছে বুদ্ধিভরা একটা মাথা।

সে ভালোই আছে। তাঁর এখন উচিত বসে বসে কিছু লেখা।

আর যা করা উচিত নয়, তা হলো, জানালা দিয়ে বার বার তার কার্যকলাপ দেখতে না যাওয়া।

অনেক হয়েছে।

“যে গাছটা ভেতরে আসার জন্য অপেক্ষা করে ছিলো।" একদা একটা গাছ ছিলো, যে ভেতরে এসে কাঠের চুলোর ধারে বসার জন্য অপেক্ষা করছিলো। সে জানতো এটা অলৌকিক। সে জানতো তাঁর সঙ্গি গাছগুলোকে সেখানে নিষ্ঠুরভাবে পোড়ানো হয়েছে। কিন্তু , ঈশ্বর, রান্নাঘরটা যেনো পোড়ার জন্য আমন্ত্রন জানাচ্ছে। কারন পেইন্টিং থেকে শুরু করে সমস্ত কঠিন কাজই মাকে করতে হয়। অথচ তখন তাঁর লেখার কথা। চিমনি দিয়ে বের হওয়া ধোঁয়ার কি সুন্দর গন্ধ। তার সঙ্গি গাছগুলোর পোড়া গন্ধ একেবারে আশ্চর্যরকম মন হরন করা।

ই-ইকস।

আবার শুরু হলো।

একদা একটা গাছ ছিলো যেটা ভেতরে আসার জন্য অপেক্ষা করে ছিলো। টিম গাছটাকে লোকের সামনে আনতে চেয়েছিলো। এমন কি ছোটো বেলায় সে গাছের কথা শুনতে ভালোবাসতো। ঈশ্বর। কথাটাও জানাজানি হয়ে যায়। বাবা তাকে কি মনে করে বলেছিলেন, " গাছের ব্যাপারে তুমি খুব বাড়াবাড়ি করো।" মা-ই বা কি মনে করে বলেছিলেন, এই "বাড়াবাড়িই" তার "সুপার পাওয়ার" যা তিনি প্রতিদিনের কাজে ব্যবহার করেন? কতো শব্দ এখনও শেখা বাকি আছে! “ক্ষমা" মানে কি? “বিরক্তি" মানে কি? "প্রিয়" মানে কি? পুবদিক থেকে আসা বাতাসটা যদি তাকে একটু বামে হেলিয়ে দিতো, তাহলে বহুদিনের আধোয়া সিঙ্কের ওপরের জানালা দিয়ে রান্নাঘরের ভেতর একটু দেখতে পেতো। ঐখান দিয়েই মা তাকে দেখছেন, চিন্তিত দেখাচ্ছে তাঁকে---

আবার শুরু হলো।

বনের দিকে হেঁটে যাওয়া পথের ধারে অবস্থিত গাছটা তার নিজের স্থানকে ভালোবাসতো। ওখান থেকে সে বিভিন্ন ধরনের ছোটো বড়ো বন্য প্রানির আসা যাওয়া দেখতে পেতো, যেমন; শেয়াল, হাইকার, শিকারি, এবং আজ---

একটা আশ্চর্য ছবি।

এই ধারণাটা এখনই মাথায় এলো তাঁর। বনের দিকে হেঁটে ডেরেক যাচ্ছিলো। হোঁচট খেয়েছিলো। মুখ ভেসে যাচ্ছে রক্তে। দেখা যাচ্ছে আঁচড়ের দাগ। মনে হচ্ছে সে একটা মাতাল।

ছুটে বেরিয়ে গেলেন তিনি বাসা থেকে। পিছু পিছু মিস্টার পটস-ও গেলো পাগলের মতো ঘেউ ঘেউ করতে করতে। কুকুর আর তিনি বাগানের মাটি খুঁচে খুঁচে গেলেন। ডেরেককে পেয়ে তুলে নিলেন এবং আবার বাগানের মাটি খুঁচে ডিঙিয়ে পোর্চের সিঁড়ির ওপর এসে হাত থেকে নামিয়ে রাখলেন তাকে।

তিনি বললেন, কি হয়েছে বাচ্চা? কি হয়েছে? বলো বাবা।

সে বললো, বুড়োএকটা লোক।

বুড়ো লোক? কোন বুড়ো লোক? তিনি বললেন।

সে বললো, বুড়োটা আমার পেছনে এসে আমাকে নিচে চেপে ধরেছিলো।

তিনি বললেন, কোথায় সে?

ডেরেক বলতে চাইলো না।

সোনা বাবা কোথায় ছিলে তুমি? তিনি জানতে চাইলেন।

চার্চ স্ট্রিটে, সে বললো।

ও সেই রাস্তা, হায় ঈশ্বর, সেটা তো ডাউন টাউনের কাছে। ওদিকে যাওয়া নিষেধ।

এখন এসব কথার সময় নয়।

তিনি ডেরেককে ভেতরে নিয়ে গেলেন। নাক ভাঙেনি। দাঁত ভাঙেনি। তিনি কিথকে ডাকলেন। পুলিশ ডাকলেন। মুখ পরিষ্কার করে দিলেন ডেরেকের। দেখে মনে হলো, তার মুখ কেউ আঁচড়ে দিয়েছে।

তিনি বললেন, সে কি তোমাকে নিচে চেপে ধরেছিলো?

সে বললো, হ্যাঁ,একটা ঝোপের মধ্যে।

নিশ্চয় গোলাপ অথবা ব্ল্যাকবেরির ঝোপ।

ওহ যিশু।

দশ মিনিট পরে কিথ ভেতরে এসে বললেন, এসব কি?

মায়ের ফোন বেজেছিলো।

এরইমধ্যে পুলিশ একজনকে ধরেছে। বুড়ো মানুষ। হয়তো এর সাথে জড়িত নয়।চার্চ এবং বেলেফ্রি এলাকায় এদিক ওদিক ঘোরাফেরা করার সময় তাকে পাওয়া গেছে। তিনি কি একবার এসে এক নজর দেখে যাবেন? ছেলেকেও সাথে আনবেন যদি সে এখানে আসার মতো অবস্থায় থাকে।

ওহ, সে ঠিক আছে, তিনি বললেন।

লম্বা চূল, দাঁত পড়ে গেছে। পায়ে মোটা থ্যাবড়া স্যান্ডাল। উদভ্রান্ত চোখ চারদিকে ঘুরছে।

অবশ্যই সে অস্বীকার করেছিলো। কেনো সেএকটা বাচ্চাকে নিচে চেপে ধরবে? এই রাস্তাটা দিয়ে এখন সে যাচ্ছিলো মাত্র। তার মানে এই নয় যে, একটা বাচ্চাকে সে নিচে চেপে ধরবে। এটা মিছে অভিযোগ। গ্লেনডা কি এমন কথা বলা শুরু করেছে? গ্লেনডার একটা নেটওয়ার্ক ছিলো, যার সাথে সম্পর্ক ছিলো পুলিশের। জিমি কার্টারও তাদের সাথে যুক্ত ছিলো।

বুড়োটাকে যখন প্রশ্ন করা হচ্ছিলো, তখন সে, কিথ, ডেরেক এবং পুলিশ সবাই পুলিশের ল্যাপটপে ঘটনা দেখছিলো।

ডেরেক বললো, আমি নিশ্চিত হতে পারছিনা।

মহিলা এবং ডেরেকের দিকে তাকালো পুলিশ, যেনো বলতে চাইলো, তাকে তো নিশ্চিত হতেই হবে।

ওহ, কি এক ঝামেলা? একটা বাচ্চাকে এক বুড়ো লোক নিচে চেপে ধরেছে এবং আধঘন্টা পরে ওই বন্ধ রাস্তায় একজন বুড়োকে পাওয়া গেছে।

ঠিক আছে, এখন কিছু মুরুব্বিয়ানা কথা শোনা দরকার।

কিছু ব্যতিক্রমি নির্দেশনা।

তিনি বললেন, শোনো বাচ্চা, বুড়োটা যদি এখানে হেঁটে থাকে, তুমি কি ভাবতে পারো না যে একটা বাচ্চাকা নিচে চেপে ধরা সম্ভব তার জন্য? এবং সেই বাচ্চার মুখেও অনেকগুলো নখের আঁচড় থাকতে পারে?

কিথ বললেন, যারা এধরনের কাজ করতে পারে, তাদের জন্য কিছু সাহায্য দরকার সুইটি। আর সেই সাহায্যটা এখনই এখানে তাকে পেতে হবে।

ডেরেক বললো, জেলে থাকলে কি ভাবে এই নির্দেশনা তাকে সাহায্যটা করবে? 

তিনি বললেন, জেলে হয়তো বা সে কিছু পরামর্শ পাবে।

কিথ বললেন, একজন বয়স্ক মানুষ কোনও কারন ছাড়াই একটা বাচ্চাকে নিচে চেপে ধরবে, মানে এখানে কোনোও সমস্যা আছে।

এক ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীনতা আর কি। যাক বাদ দেন, তিনি বললেন।

ডেরেক ভেবে দেখার জন্য কয়েক মিনিট সময় চাইলো।

সোনা বাচ্চাটা আমার।

ল্যান্ড লাইনের ফোন বাজলো এবং পুলিশটা সেখানে গেলো কথা বলতে। 

“কঠিন সিদ্ধান্ত।" ছেলেটা সিল্ভার ডেস্ক চেয়ারে বসেছিলো। চেয়ারটা ঘোরাচ্ছিলো নার্ভাস হয়ে। তার হাতের ছোটো আঙুল দিয়ে মুখের আঁচড়গুলো বোঝার চেষ্টা করছিলো। তার মা একটা বুলেটিন পড়ার ভান করছিলেন। ছেলের দিকে নজর দিতে চাচ্ছিলেন না, পাছে ঐ বদমায়েশ হারামিটার জন্য তার যে অবস্থা, তা নিয়ে বাচ্চাটার মানসিক চাপ বাড়ে। ফোকলা দেঁতো শয়তান হিপ্পি। প্রশ্ন করার ঘর থেকে বেরিয়ে এসে তাকে গর্তে ফেলা উচিত ছিলো তাঁর। দেখতেন বুড়োটার কেমন লাগে এতে। সে একটা বিশালাকৃতির লোক। এবং মুখ দেখেই বলা যায়, তার শরিরে শুধু দলা দলা খারাপ মাংস।

পুলিশটা সাব-অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বের হয়ে এলো। একটা পুলিশ যতোটা দ্রুত বেরিয়ে আসতে পারে তার চেয়ে বেশি দ্রুত এলো সে। তাপর আবার ঘুরে গেলো অফিসে কার্টুন ছবির মতো। মনে করতে পারো, দ্রুত সাব অফিস থেকে বের হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পর তার টাই টিং টিং শব্দ করেছিলো।

হ্যাঁ, এটাই সেই লোক মনে হয়, সে বললো।

তিনি বললেন, কি হয়েছে?

সে বললো, আর একজন আছে।

আর একজন মানে? তিনি বললেন।

সে বললো, আর একজন বুড়ো লোক চার্চের চারদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছিলো, তাকেও ধরে এনেছে তারা। দ্বিতিয় বুড়ো লোকটা প্রথমটার মতোই প্রায় দেখতে। তারা ভাইও হতে পারে। বুড়ো হিপ্পি, লম্বা চুল, স্যান্ডাল পায়ে, একটা দাঁত নেই।

একই রকম দাঁত নয়।

কিন্তু তবুও।

হুহ! তিনি এবং কিথ পরস্পরের মধ্যে অবিশ্বাসের দৃষ্টি বিনিময় করলেন।

দ্বিতীয় বুড়োও নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছে। প্রথম জনের চেয়ে কিছু বেশি স্বচ্ছ বুড়োটা। তার হাতে ডাকটেপ ছিলো। সে এটাকে টানাটানি করছিলো। পুলিশ কেনো এটা নিয়ে নেয়নি? হয়তো ওটা তারই। হয়তো ওটা তার "অধিকারের" মধ্যেই পড়ে। হয়তো সে "অধিকারে মধ্যে থেকেই" অন্যকে বিভ্রান্ত করার জন্য দুই হাতে টেপটা উলটে পালটে দেখছিলো।

যিশু। 

এই দেশ। 

তারা প্রথম জনকে নিয়ে এসে দুই জনকে পাশাপাশি বসালো। উদবিগ্ন দুজনেই। তিনি অনুভব করলেন, দুজনেই নিজের নিজের কথা গুছিয়ে নিচ্ছে মনে যাতে একজন হিপ্পি অন্য জনের চেয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে খাঁটি কথাটা বলতে পারে।

ডেরেক প্রায় কেঁদে ফেলছিলো। তিনি বলতে পারতেন, বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে বাচ্চাটার ওপর। 

ফিস ফিস করে ডেরেক বললো, সত্যি আমি কিছু জানি না।

সুতরাং তিনি বন্ধ করে দিলেন কথা বার্তা। যা হওয়ার হয়েছে। পাগল দুজনকে ছেড়ে দেয়া হলো। জানালা দিয়ে দেখলেন তিনি, লন পেরিয়ে দ্রুত তারা দুইদিকে চলে গেলো। পানিতে হাত দিলে মাছ যেমন করে দ্রুত পালায়।

বাড়ি আসার পথে গাড়ির মধ্যে ডেরেক বললো, অন্তত আমরা ভুল মানুষকে জেলে দিইনি।

দীর্ঘ নীরবতা।

ঠিক, তবেঁ হ্যাঁ এবং না, দুই দিকেই কথাটা খাটে। তাদের মধ্যে এক জন তো অবশ্যই কাজটা করেছিলো। নিচে চেপে ধরেছিলো ডেরেককে। আসলেই এগিয়ে এসে কাজটা সে করেছিলো। স্যান্ডাল ছূঁড়ে ফেলেছিলো। খুশি হয়েই করেছিলো সে কাজটা। নিশ্চয় বাস্তবে ঘটেছিলো এমনটা। দুইজনকেই জেলে ঢোকাও তাহলে পঞ্চাশ ভাগ কাজ ঠিক হবে। কিন্তু এখন? একশোভাগই ভুল। কষ্ট পাচ্ছে কে? তাঁর ছোটো বাচ্চাটা। আর কষ্ট পাচ্ছে না কে? এঁদের মধ্যে যে করেছে কাজটা। এখান থেকে ছেড়ে দিলে, তাঁর জিত হয়েছে মনে করে নিশচয় শহরময় সে নেচে বেড়াবে। তার দৃষ্টিভঙ্গি সেই রকমই বাজে।

অবিশ্বাস্য।

ঘোড়ার ডিম।

“সাহসী জননী।" একটা বন্দুক পাওয়া খুবই সহজ ছিলো, এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। তিনি হলুদ পোশাক পরে ছিলেন। মাথায় ছিলো পনি টেইল বাঁধা। বরাবরই সুন্দর ছিলেন তিনি। স্টোরে থাকা মানুষটা তাঁকে সাধুবাদ জানিয়েছিলো। সেই দিয়েছিল তাঁকে বন্দুকটা। সে কি দেখিয়ে দেবে তাকে কেমন করে বন্দুকে গুলি ভরে? সে পারতো। সে দেখিয়েও দিলো। এখন মহিলা ধিরে ধিরে চার্চে গেলেন। ষেখানে বুড়ো হিপ্পিটা ছিলো। যেই করে থাকুক কাজটা, বন্দুক দেখলে সে স্বীকার করবে। না, তিনি তার পেছনে গেলেন। এখানেই সে আরেকটা ছোটো মেয়ের দিকে তাক করে ছিলো। নিজের এলাকার পোশাক পরে ছিলো সে। বুড়োটার একটাই কাজ ছিলো, বাচ্চাদেরকে নিচে চেপে ধরা। কে জানে কেনো? সে হয়তো নিজেকেই নিচে নামায় যেমন করে---

নাহ, কোনও আশা নেই।

সে একজন মানসিক রোগি।

তিনি গাড়ি থেকে লাফিয়ে বের হয়ে এক হাঁটুর ওপর ভর করে তাক করলেন। ব্ল্যাম। সরাসরি আঘাত । সহানুভুতিশীল হয়ে এক পায়ে গুলি করলেন। খুব ভালো তাক করেছিলেন তিনি, যদিও আগে কখনও গুলি করেননি। সব সময় তিনি ভালো খেলোয়াড় ছিলেন। আহত অবস্থায় সে নিচে নেমে গেলো এবং ক্ষমা চাইলো। কিন্তু দুঃখিত দেখাচ্ছিলো না তাকে। সে কি মহিলাকে ভুল বোঝাতে চাইলো? ক্ষমা চাওয়ার ভান করার সময় কি তার চোখে মেকি ভাব ফুটে উঠেছিলো? মহিলা এবার তাঁর ঘর্মাক্ত কপাল বরাবর বন্দুক তাক করলেন।

গি--সস, যিশু, তিনি কি করতে যাচ্ছিলেন---

তাঁরা নদীর ধার দিয়ে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। একটা ছোটো নৌকা ( কায়াক ) কেউ বেয়ে যাচ্ছিলো উজানের দিকে। বিরক্ত হয়ে সে কারো সাথে চিৎকার করে কথা বলছিলো বা ফোন করছিলো। ডেরেক ছিলো পেছনে। গাড়ির দরজার গায়ে চেপে বসেছিলো। বেশ চিন্তান্বিত এবং হতাশ দেখাচ্ছিলো তাকে। তিনি বলতে পারতেন যে, আসল অপরাধি কে, তা নিশ্চিত না হওয়ার জন্য এই অলৌকিক নীরবতা এবং উতকন্ঠা নেমে আসেনি গাড়িতে।

হঠাৎ তিনি অনুভব করলেন, এই রকম সময়ের মধ্য দিয়ে তিনি যাচ্ছেন দীর্ঘ দিন যাবত।

তিনি বললেন, তুমিই ঠিক কাজ করেছো। সেটা সহজ কিছু ছিলো না, কিন্তু তুমি চমতকার ভাবে সামলে নিয়েছো।

আমিন। কিথ বললেন।

ঠিক ঠিক, মনে হয় সে জিন্স পরেছিলো, ডেরেক বললো।

গাড়িটা তাদের পুরনো বাড়িতে এলো। মনে হচ্ছে পরিবেশটা বিষন্ন। অভিযুক্তের বাড়ি হয়েছে এটা। গতো বছরে তাঁরা বাড়ির ছাদ পুনর্নিমান করেছিলেন। নতুন পোর্চ নির্মান করেছিলেন। কি জন্য? এতো কিছুর পরে কি এমন পেলেন তাঁরা? এটা কি ভালো হলো? কোনো মানে হয় কি এর?

এতো কিছু তাঁরা করেছিলেন কিসের জন্য? কোনও পাগল তাদের ছেলেকে নিচে চেপে ধরবে, এই জন্য? এটাই সব চেয়ে বড়ো ঘটনা তাঁদের পরিবারে, যা আগে কখনও ঘটেনি।

আশেপাশের বাড়ির জানালা দিয়ে চোখ পিটপিট করে দেখছিলো প্রতিবেশিরা।

তারা ভেবেছিলো, তোমরাই ভালো আছো আমাদের চেয়ে।

“ বাড়িটা হঠাত পরিত্যাক্ত মনে হলো।"

“ কোনও দোষ ছাড়াই বাড়ীটাকে নির্জন মনে হলো।

জরাজীর্ণ। বিশ্রি। হাঁদা।

শব্দ করা গাড়িটার মধ্যে তারা তিনজন কিছুক্ষন বসেছিলো।

ডেরেক বললো, আমি জানি, ডাউন টাউনে আমার যাওয়ার কথা নয়। শুধু যাওয়ার চেষ্টা করতে চেয়েছিলাম আমি।

কিথ বললেন, অনেক হয়েছে, এবার থামো।

কি যে ভালো বাবাটা। বুঝমান। দরদী অন্তর। সব সময়ই সব কিছু তাঁর কাছে ভালো। এমন কি এই আপাত ঘটনাটাও। ডেরেক যে প্রতিজ্ঞা ভেঙেছে, সেটাও কিছু নয়। বাচ্চাদের যারা বেত দিয়ে যখন তখন যেখানে সেখানে মার ধোর করে এবং কোনও অনুতাপ ছাড়াই চলে যায়, সেটাও ভালো তার কাছে।

মহিলা ভাবলেন--- যদি নিখাঁদ সত থাকতেন তিনি? ---সেই স্টেশনের ঘটনা, কিথ আসতে পারতেন তাঁদের কাছে। অতো দুরে যেতেন না তিনি। কিন্তু পুরনো পেছনের দিনগুলোতে এমন সময় কি ছিলো না, যখন বাড়ির শক্তিশালি মানুষ হিসেবে কিথ আর এক শক্তিশালি পুলিশকে টেনে বাইরে আনতো না? ধ্বস্তাধ্বস্তি হতো না? তারপর দুই পাগোল বাইরেই শান্তভাবে কিছুক্ষন "কথাবার্তা" বলতো না? উপস, বাইরে থাকার সময় লোকটা প্রহৃত হতো না?

দুজনেই?

নিশ্চিত বলা যায়?

তবে সেটা উত্তম ছিলো না।

ছিলো না, সেটা ভালোই জানো।

অথবা অন্য কিছু।

কিন্তু ইস। তাদের কারোই কিছু হলো না, ঠিক যেনো পার্কের বাইরে বল ছোঁড়ার মতো হলো। তর্কের খাতিরে বলা যায়, কিথ এবং পুলিশ আগ বাড়িয়ে একটু ভুল করেছিলো, ( ঘটনা কিছু ছিলো ) যার ভিত্তিতে তাদের আচরন খারাপ হয়েছিলো। কাজটা যে করেছিলো, সে আর তা করবে না। কিন্তু যে করেনি, ভবিষ্যতে এমন কাজ করার ব্যাপারে সে একটু বিবেচনা করবে। যাপিত জীবন যাত্রার কথা চিন্তা করে দুবার ভাববে। ফল কি দাঁড়ালো? নিরাপদ হলো চার্চ স্ট্রিট। ডেরেকের মতো ছোটো ছেলেরা সেখানে হাঁটতে পারবে। তাঁর মতে, ডেরেক এই প্রাচীন চার্চ স্ট্রিটে চলা ফেরা করতে পারবে আরামে, নিশ্চিন্তে। পোর্চে বসে বয়সি মানুষেরা আইস-টি খেতে পারবে। স্বামী বললেন, পেছন দিকে আপেল গাছে বাঁধা দোলনায় ছেলেরা দুলতে পারবে। তাঁর স্ত্রী উল বুনতে পারবেন বসে। তুমি আমাদের ছেলের কথা মনে করিয়ে দাও। এখন একজন সফল ডাক্তার! তিনি বললেন, তারপর উলের বলটা ফেলে দিলেন। বয়স্ক মানুষটা লাফিয়ে লাফিয়ে সিঁড়ি নেমে বলটা তোলার সময় পিঠে ব্যথার কথা বলে ঠাট্টা করলেন।

ভালো মানুষ।

জগতের অপরিহার্য জিনস লবণ।

কিন্তু চার্চ স্ট্রিট তো তাদের নয়। ডেরেকেরও নয়। এটা তো ঐ পাগোল দুটোর জন্য, যারা আসলেই পাগোল, তাদের একান্ত পাগলামির জায়গা। তাদের এই স্বাধীনতায় বাধা দেয়া কেনো? সত্যিই? এটা আধুনিক চিন্তার কথা নয়। কেউ কারও অনুভবকে আঘাত করতে চায়নি, অন্যের চিন্তার কথা নিয়ে কেউ কিছু বলতে চায়নি, ঠিক বেঠিক নিয়ে কেউ কোনও শক্ত পদক্ষেপ নিতেও চায়নি।

বিষয়টা এই ভাবেই নিচের দিকে ঘুরতে থাকলো।

পাতার স্তূপের ভেতর দিয়ে তাঁরা পোর্চের দিকে গেলেন। এটা সহজ ছিলো না। অন্তত আজকে নয়। আজ আর একটা কঠিন কাজ তাদের করতে হবে, সেটা হলো রাতের খাওয়া তৈরির কাজ।

এটা বাস্তবতা ছিলো। ঘটেছিলো ঘটনাটা। একজন মানুষ তাঁর ছেলেকে আক্রমন করেছিলো এবং তাঁর ফলে কোনও রকম শাস্তিই পায়নি। ফলে সম্ভবত বড়াই করে কোনও ক্যাম্পফায়ার অথবা অন্য কোথাও হাতে তালি দিয়ে সে ঘুরে বেড়াবে। 

তিনি কি করছিলেন ডিনারের ব্যাপারে?

ভেতরে গিয়ে পাস্তা বানাচ্ছিলেন।

রাতে খাওয়ার পর তিনি কিছু লেখার চেষ্টা করছিলেন। সহজ ছিলো কাজটা। সরাসরি মন থেকে সর সর করে বেরিয়ে আসছিলো। একটা প্রবন্ধ। " বিচার" নাম দিলেন। বড়ো স্বপ্নের ক্যান খোলার যন্ত্র বিদায়; বাঙ্ময় বৃক্ষরাজি বিদায়; বিদায়, হেনরি, কর্তব্য পরায়ন আইসক্রিম ট্রাক টায়ার, সেই নগন্য কিছু যা গতো সারাটা বছর প্রায় সঞ্চরনশীল ছিলো; বিদায় আরোপিত আশাবাদ; বিদায়, রাজনৈতিক সঠিকতা। এটাই আসলে বাজে জিনিস ছিলো। তিনি জানেন, ঠিক কি ব-লতে হবে।

এটা যেনো ঠিক পায়ের নিচে কাদা পানি- পাথরের ওপর দিয়ে তাঁর হেঁটে যাওয়ার মতো। এটা উচ্চস্বরে কথা বলার মতো। কিন্তু কাগজের ওপর অন্য কথা। সেখানে সবচেয়ে বেশি সত এবং মৌলিক জিনিস তিনি লেখেছেন। এটা তাঁর কথার মতো মনে হয় না। তবু এটা তাঁরই কথা, যথার্থই তাঁর।

হুম, এটাই খাঁটি।

তিনি অনেক রাত পর্যন্ত লেখেছিলেন।

সকালে নিচে নেমে এসে দেখলেন, কিথ তার লেখা রচনাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছেন। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিলেন তিনি। হ্যাঁ, এটা নতুন এবং আলাদা ছিলো। সাধারনত কষ্টের চিহ্ন মুখে নিয়ে কিথ তাঁর লেখা পড়েন এবং তারপর বলেন, তাঁর মাথায় যতো সব " বন্য কল্পনা" এবং " স্পষ্টত বাস্তবে তিনি এর মধ্যেই থাকেন।" সম্ভবত এটা এই সব কথা " কিথের মাথায় ঘোরে ," কারন কিথ একজন সাহিত্যরসবোধশুন্য এবং সাহিত্য প্রশিক্ষন বিহীন বোকা মানুষ।

তিনি বললেন, ভালো লাগছে?

ওয়াও, কিথ বললেন।

কিথের মুখ লালচে দেখাচ্ছিলো। টেবিলের নিচে তার পাদুটো নাচছিলো।

হ্যাঁ। খুব ভালো হয়েছে। এটা প্রশংসার যোগ্য।। সকালটা ফুল্ল হয়ে উঠলো। কিন্তু তাতে কি এসে গেলো? দ্রুত রান্নাঘরে গেলেন তিনি। ছোটো লেখার টেবিলটা খাবার পরিবেশনের জন্য গুছিয়ে পরিষ্কার করে ফেললেন। তারপর কিথ জোরে ঘোষণা দিলেন, দৌড়োতে যাবেন তিনি। ওয়াও। বহু বছর দৌড়োননি কিথ। এটা এমন যে তিনি ভালো কিছু রচনা করছেন বলে তাঁরও কিছু ভালো কাজ করতে ইচ্ছে করছে। অহংকার বা বড়াই নয় এটা। তিনি অনুভব করলেন, ভালো লেখা কি করতে পারে। ভালো রচনা একটা একটা শক্তি। এবং সেই নিখাঁদ শিক্তিটা পাঠকের মনে সঞ্চারিত হয়। আশ্চর্যজনক এটা। তিনি একজন রচনাকার। 

এতো বছর তিনি একেবারে ভিন্ন ধারায় কাজ করেছেন।

এটা পরিষ্কার, ডেরেকের সাথে যে ভয়াবহ ঘটনাটা ঘটেছিলো তা তিনি পছন্দ করেননি না। কিন্তু তবু এটা ঘটলো। এখন এটাকে তাঁর মেনে নিতে হবে।

তিনি লেখতে বসেছিলেন।

তাঁর ফোন বাজলো।

তাঁর জীবনের গল্প।

তারা দ্বিতীয় ব্যক্তিকে ধরে ফেলেছে, পুলিশ বললো। সেই লোকটা যার হাতে ডাক-টেপ ছিলো এবং যে গাড়ি ভাঙতে আসছিলো। ডেরেককে নিচে চেপে ধরার কথা সে স্বীকার করেছে। পুলিশ লোকটার স্বীকারোক্তি পড়ে শোনালোঃ হ্যাঁ, আমি তাকে নিচে চেপে ধরেছিলাম। তাকে খুব অহংকারি বাজে ছেলে মনে হয়েছিলো। জানিনা কেনো আমি এমন করেছিলাম। কিন্তু সে বেঁচে গেছে। এখন হয়তো তার সেই অহংকারি ভাব নেই। বাজি ধরে বলছিনা। আপনাকে স্বাগত।

পুলিশ বললো, আসলে এটা এক রকম ফাজলামি। তারা পরস্পরের কাজিন। 

কে? মহিলা জানতে চাইলেন। 

"আপনি যদি সত্যি আবার পরিবারকে আঁকড়ে ধরতে চান, তাহলে মাথা নিচু করতে হবে আপনার ।”​​

দুটো সন্দেহ আছে, তিনি বললেন। ডিমিনি’'স-কে চেনেন? সেই আসবাব পত্রের দোকান? গাস ডিমিনি’স তাদের চাচা।

ওয়াও, ডিমিনি'স। ওখান থেকে তাঁরা টিভি কিনেছিলেন। সুন্দর জায়গা। তবে তেমন জমজমাট নয়। তাদের বিরাট ঘটনা ছিলো সেন্ট পাট্রিক 'স দিবস উদযাপন, সবুজ মোজাগুলো সেইদিন দিয়েছিলো। সেই সময় তাদের নাম হয়েছিলো, ও' ডিমিনি'স সপ্তা। সেটা ছিলো আইরিশদের পাড়া। তখন ছোটো ছিলেন তিনি। এখন কে জানে এটা কি ছিলো? সেখানে যা কিছু ছিলো সব তুলে নেয়া হয়েছে। দেখা যাচ্ছে লনে থাকা গুচ্ছের বন্ধ বাক্স। বাচ্চাদের খেলার পানির পাত্র যন্ত্রপাতিতে ভর্তি। মাঝে মাঝে কনফেডারেট ফ্ল্যাগ দেখা যায় তার মধ্যে। কিন্তু গাস ডিমিনি খুব সুন্দর। বড়ো গোল গাল মানুষ, সাদা দাড়ি। প্রশান্ত মুখে সর্বত্র ঘুরে বেড়াচ্ছেন যেনো এটা রেস্তোঁরা। মনে হয়, তাঁর দোকানের কোনো একটা বাইরের সজ্জিত ঘরে তিনি আপনাকে বসাবেন।***

বছরের পর বছর হাজার হাজার ডলারের সামগ্রি কিনেছেন , এমন একজন ক্রেতা হিসেবে তাঁর এখানে ঢুকে যাওয়া উচিত। কিছু কিনবেন তাঁর নিম্ন আয়ের ভাইপোর জন্য়। হাজার হাজার ডলারের কিছু না, শুধু একটা টিভি। তিনশো ডলারের মতো দাম। ঘটনা হলো, তিনি একজন ক্রেতা ছিলেন। এমনও হতে পারে যে ,তিনি বয়কোট করবেন তাদের। কাদের মধ্যে বয়কোট? অতীতে যখনই গাড়িতে এসেছেন এখানে তিনি, মাত্র একটাই ডেলিভারি ভ্যান দেখেছেন। কখনও বা দেখেছেন পার্কিং বাম্পারের ওপর মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন গাস।

যাই হোক, গর্ধব ভাইপোকে নিয়ন্ত্রন করা তাঁর কাজ নয়।

ভাইপো।

তিনি তাঁর কাজিন রিকির কথা ভাবছেন। সেদিন যার বিয়ে হওয়ার কথা ছিলো।সেটা ভেঙে গেলো। যেদিকে খেলাধুলার সামগ্রী আছে সেদিকের জানালা দিয়ে সে লোহার চাকা ছূঁড়েছিলো এবং ভেতরে গিয়ে ঘুমিয়েছিলো। তার দুই হাতে ছিলো কিছু ধরার দস্তানা।এক মাসের মধ্যে সে তিনটে মেয়েকে গর্ভবতী করেছিলো। মারামারি করেছিলো দুজনের বাবার সাথে। একজনের নাক ভেঙেছিলো। নিজের বুকের হাড় ভেঙেছিলো। জীবনের বহু সময়ে নানা আকাম কুকাম করেছিলো সে। যখন সে বড়ো বড়ো দুটো ছেলের বাবা, তখন একটা গাড়ি চুরি করে চালিয়ে বেড়াতো ক্যালিফোর্নিয়ার দিকে। কিন্তু ওহাইও-তে গাড়ি রাখার জায়গায় মোটর সাইকেলের সাথে লেগে মাথা উড়ে যায় গাড়ির। তারপর জাহাজে করে নিয়ে আসতে হয় গাড়িটা। এরপর এক হাসপাতালের নার্সকে মার ধোর করে আটক হয়। সেখানে আটক থাকা অবস্থায় মারা যায় স্ট্রোক হয়ে।

তিনি বা তাঁরা কেউ কি রিকির সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছিলেন? ঈশ্বর, যখনই দেখা হয়েছে, বার বার চেষ্টা করা হয়েছে। কান্নাকাটি করে নিজেকে সংশোধনের প্রতিজ্ঞা করেছে, তারপর গাড়ি মেরামতের জন্য কিছু টাকা ধার নিয়েছে। তার ধারনা, ঐ টাকা দিয়ে সে পুরো গাড়ি চেক করাবে। তিনি বুঝতে পারেন না, এটা কি ধরনের আকাংখা। যখন তাকে টাকা ধার দিতে চাইবেন না, তখন সে বলবে, আপনিও অন্য সবার মতো। তার এক সপ্তা পরে শুনবেন, সে একটা যেনো তেনো গাড়ি চুরি করে লেইকে ফেলে দিয়েছে, অথবা চার্চের কাছে গিয়ে রেসিজম সম্বন্ধে কিছু বাজে কথা বলেছে উচ্চকন্ঠে, অতিমাত্রায় ড্রাগ খেয়ে প্রায় মরেই গিয়েছিলো। মরা থেকে ফিরে এসে আবার ড্রাগ খেয়েছে বলে হাসপাতাল থেকে বিতাড়িত হয়েছে, এবং পার্কিংয়ের জায়গায় মিটার ভাঙার চেষ্টা করেছে।

এক সময় সবাই তার আশা ছেড়ে দিয়েছিলো। লেগে রইলো একমাত্র আন্টি জেনেট। তাঁর নিজেরই সমস্যা ছিলো ( অতিরিক্ত মদ্য পান, রাতের আতংক )। তবু তিনি রিকিকে ছাড়েননি, মারা যাওয়ার পরেও না। তিনি 'রিকি রজার মেমোরিয়াল রিডিং নুক' নামে লাইব্রেরিতে টাকা দিয়ে একটা কোনা- প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বই পড়ার জন্য। সেখানে পদার্থের অপব্যবহার, খৃষ্টাধর্ম এবং গাড়ি মেরামত সংক্রান্ত বই পত্র সংগ্রহ করে রেখেছিলেন। 

রিকি অন্তত কোনও বাচ্চাকে নিচে চেপে ধরেনি কখনও। এতোটুকু তিনি জানতেন। যদিও সে চার্চে একজনকে ঘুসি মেরেছিলো রেসিস্ট কথা বলার জন্য। এবং জীবনের শেষদিকে একটি উনিশ বছরের মেয়েকে গর্ভবতী করেছিলো। মেয়েটার বাবার যে মুদিখানার দোকান ছিলো তা পুড়িয়ে দিয়েছিলো। তারপর আগুনের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পেছনের ঘরের যে জিনিসপত্র তারা ছুঁড়ে ফেলতে যাচ্ছিলো, সেখান থেকে ঐ জিনিসগুলো তুলে নিতে তাকে বাধা দিয়েছিলো একজন ক্যাশিয়ার। রিকির ইচ্ছে ছিলো বিনে পসায় জিনিসগুলো বাসায় নিয়ে যাবে। সেটা না করতে পেরে দোকানের কাছে বিশটা ঘোড়া বা পোষা প্রানী দাবি করেছিলো সে।

এমনই ছিলো রিকি।

আহারে রিকি। ছোটোকালে তিনি পাগোল ছিলেন রিকির জন্য। সে মাত্র কয়েক বছরের বড়ো ছিলো জ্যানেটের চেয়ে। অনেক মজা করতো সে। সত্যি সত্যি নয়, শুধু চঞ্চলতার দুষ্টুমি। যেমন; মুরগির ঘরের দিকে এম-৮০ আতশবাজি ছুঁড়ে দেয়া, মাকড়সা ধরে এনে আন্টি জেনেটের স্যান্ডালে রেখে দেয়া, এই সব।

এখন সে মৃত।

একগুঁয়ে, হই চই প্রিয়, চিন্তা বিহীন, শিশু ধর্ষনে আগ্রহী, রেসিস্ট, বোকা মানুষটা এখন একজন মৃত ব্যক্তি।

এমন একজন মানুষের কথা যে তিনি ভাবেন, সেটাই তাঁর পরম মহত্ত্ব।

সারাটা সময় তিনি রিকির পক্ষে কথা বলেছেন। তার প্রতি সহানুভুতি প্রবন ছিলেন। জানেন ঘটনা কি? গুল্লি মারি রিকিকে। তিনি ভাবতেন সেই সতরো বছরের গর্ভবতী মেয়ের বাবার কথা, সেই মার খাওয়া উশারের কথা, যিনি খেলার সামগ্রীর দোকানের মালিক ছিলেন। জাহান্নামে যাক রিকি। অনেক আগেই ঐ গাধাটার মাথার ওপর কারও পাথর দিয়ে আঘাত করার কথা।

আমি মনে করি, হ্যাঁ মনে করি, কিছু পাথর তো তার মাথায় পড়েছিলোই। জেল, বন্ধক দেয়া সম্পত্তি, যেটুকু দিয়ে সে খুঁটে খুঁটে জীবন নির্বাহ করতো, তা নিয়ে নেয়া, আবার জেল, মোটর সাইকেল ওয়ালার আঘাত, সেই বাবা যে তার বুকের হাড় ভেঙে দিয়েছিলো, প্যারিশ চার্চের যাজক পল্লীর অধিবাসি মেরে তার সামনের দাঁত ফেলে দিয়েছিলো। চার্চের যে উশারকে সে মেরেছিলো, তার ক্যানসার হয়েছিলো, কিন্তু সে প্রিথিবির শ্রেষ্ঠ মানুষ, কারন সে প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের যাজককে একটা কিডনি দান করেছিলো, তারা সবাই তাকে ভালোবাসতো

কিন্তু এগুলো তার জন্য পর্যাপ্ত ছিলো না। কোনোটাই পর্যাপ্ত ছিলো না যা রিকিকে অসুস্থ জীবনের দিক থেকে ফেরায়।

একটা ধারণা তার মাথায় এলোঃ রিকি, নরকের রিকি, তাঁর পরনের নোংরা ভারি পোশাকসহ ( একটা অটোশপ থেকে চুরি করেছিলো, যেখানে সে মাস খানেকের কিছু বেশিদিন চাকরি করেছিলো ) আগুনে পুড়ছে, দুচোখ দিয়ে দরদর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

তাকে ছোটো দেখাচ্ছে। এতোঁই ছোটো যে তিনি হাতের তালুতে রাখতে পারবেন তাকে।

তুমি কি দুঃখিত? তিনি বললেন, জীবনে যা কিছু আকাম করেছো তার জন্য দুঃখিত? সিত্যিই দুঃখিত?

সে বললো, এখানে এতোই গরম।

তিনি বললেন, কিন্তু তুমি কি দুঃখিত?

কিসের জন্য দুঃখিত?

এখনও বোকা, এখনও গোঁয়াড়। অবশ্যই এজন্য সে নরকে আছে।

সে জন্মেছে বোকা এবং গোঁয়াড় হয়ে, এবং গোঁয়াড় এবং বোকা হয়েই থাকলো, কারণ সে খুবই খুবই বোকা এবং একগুঁয়ে। 

এটা ঠিক নয়।

তিনি রিকিকে নরক থেকে তুলে স্বর্গে রাখলেন। সব কিছু পবিত্র এবং সফেদ। তখনই সে রেগে পায়ের তেলতেলে ছাপ ফেলে চারদিকে হেঁটে বেড়াতে লাগলো। দেবদুতেরা তাঁর দিকে তাকালো। বলতে চাইলো, আপনি কি এই অদ্ভুত মানুষটাকে এখান থেকে বের করতে চান?

দুই হাত বন্ধ করে রিকিকে তিনি বন্ধ করে ফেললেন একটা ছোটো ইঁদুরের মতো। তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন। তার সমস্ত তৈলাক্ত জিনিস পুড়িয়ে ফেলে তাকে দেখতে পেলেন। তাঁর মনের ভাষা বুঝতে পেরে মনে হলো, আলোতে পোড়ার কারনে সে একজন অন্য মানুষ এখন। পুরনো সেই আসল রিকির কোনও চিহ্নই নেই তার মধ্যে।

তাকে আবার স্বর্গে রেখে হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন, রিকি ছাড়া যে কেউ হতে পারে এই মানুষটা।

তিনি শুনতে পেলেন, কিথ শব্দ করে পোর্চে হেঁটে বেড়াচ্ছেন।

লেখার জন্য এতো সময়।

কিথ ঘেমে লাল হয়ে রাগ প্রকাশ করলেন। তাঁর এক কাঁধে ছিলো বড়ো রঙিন শাল।

তিনি বললেন, দৌড়োনো ভালো হলো?

আমি দৌড়োতে যাইনি, কিথ বললেন।

সত্যিই আশ্চর্য। কিথের পরনে ছিলো খাকি পোশাক।

কিথ প্রথম বুড়ো লোকটাকে পেয়েছিলেন। যার চেহারা ছিলো জিমি কার্টারের উলটো। তিনি ডেরেকের নাম সই করা ব্যাট দিয়ে লোকোটার এক হাঁটুতে আঘাত করেছিলেন। কাজটা ভালো ছিলো না। লোকটা তার কাছ থেকে প্রায় নিয়ে নিয়েছিলো ব্যাটটা। কিন্তু তিনি ঘুঁসো ঘুসি করে সেটা কেড়ে নিতে পেরেছিলেন। সেই সময় খুলে পড়েছিলো তাঁর শালটা। হাঁটুতে হাত রেখে লোকটা তাকে চিনতে পেরে আশ্চর্য হয়ে বলেছিলো, ও, আপনি, সেই বাবা। তাইতো, প্ল্যানটা ছিলো দুজনকেই ধরা, রচনায় তিনি যেমন লেখেছিলেন। তাদেরকে আইন শৃংখলা সম্বন্ধে এবং "বিচারের প্রতি সম্মানবোধ" বিষয়ে কিছু শেখানো প্রয়োজন। সেটা কি প্রথম আঘাতের পর? ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর? পালের হাওয়া চলে গেলো। ব্রিজের ওপর থেকে নদীতে ফেলে দেয়া হলো ব্যাটটা। ডেরেককে একটা নতুন ব্যাট কিনে সই করে দেয়া হবে। কিন্তু সই করবে কে? তাঁর কি মনে আছে কে সই করেছিলো?

তিনি কৌচের ওপর ধপাস করে বসে পড়লেন। চোখ ফেটে পানি বের হলো। শুকনো আপেলের মতো হয়ে গেলো তার মুখ। নিঃশব্দে তিনি চেয়ারের হাতলে ঘুশি মারতে লাগলেন।

তাঁর রচনার মতো?

ঘোড়ার ডিম হচ্ছে?

থামো তো, তিনি বললেন, কাকে? কোন লোকটাকে তুমি আঘাত করেছো? 

প্রথম জনকে। কিথ বললেন, যাকে তারা এনেছিলো প্রথমে।

তার স্বীকারোক্তির কথা বললেন তিনি। দ্বিতিয় জন স্বীকার করেছিলো অপরাধ। কিথ ভুল ব্যাক্তির হাঁটুতে মেরেছেন। 

ইস, তাহলে তো অন্যায় করা হয়েছে তার প্রতি।

ডেরেক নেমে এলো।

বাবা কাঁদছেন কেনো? সে জানতে চাইলো।

তিনি বললেন, তাঁর আন্টি মারা গেছেন।

ডেরেক বললো, কোন আন্টি?

তাঁকে তুমি চেনো না, তিনি বললেন।

সে বললো, বাবার আন্টিকে আমি চিনবো না, তা কি করে হয়?

কিথ বেজমেন্টে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। কি করছিলেন তিনি নিচে? সেখানে শুধু কাপড় ধোয়া এবং শুকোনোর মেশিন, এবং একটা ব্যায়ামের যন্ত্র আছে। তিনি কি কাপড় ধুতে চাইছেন? সম্ভবত। মন খারাপ থাকলে কখনও তিনি এই কাজ করেন।

একটু পরেই তিনি কাপড় ধোয়া এবং শুকোনোর মেশিন চলার শব্দ শুনলেন।

ঈশ্বর।

স্বাভাবিক মানুষ নন।

ডেরেক বললো, বাবার চাচাকে একটা চিঠি লেখতে পারি?

তিনি বলতে পারতেন যে, মিছে বলেছেন তিনি।

তিনিও মৃত, গরম বাতাসে ভরা বেলুনের দুর্ঘটনায় মারা গেছেন তিনি।

আহারে চাচা, ডেরেক বললো।

তিনি বললেন, শোনো, ওপরে তোমার ঘরে যাও তো।

ডেরেক জানতে চায়, বাবা কি এই ব্যাট দিয়ে কাউকে মেরেছেন?

ঠিক তাই, তিনি বললেন।

যে আমাকে নিচে চেপে ধরেছিলো, সেই লোকটাকে? সে জানতে চাইলো।

একটু চিন্তা করে তিনি বললেন, হ্যাঁ সেই লোকটাকে।

মনে হলো সে খুব খুশি হয়েছে। মোজা পরেই মেঝের ওপর বেসবলের ভঙ্গিতে নেচে ফেললো। 

তিনি ডেস্কের ওপর লেখাটার দিকে তাকালেন।

খুশি মনে সেখানে বসলেন তিনি।

সেখানে বসে তিনি পড়তে শুরু করলেন। এটা ভালো। এটা মন্দ। খুবই বাজে নিরস। কোনও মানে হয় না এর। তিনি একজন ভালো লেখক, ব্যাস। লেখার প্রবাহ আছে। কিন্তু একবার যখন সেই প্রবাহ ভেঙে যায়, কি হয় তারপর দেখো---

ওয়াও, যিশু। 

তিনি লেখার পাতাটাকে অর্ধেক করে ছিঁড়ে ফেললেন এবং ফেলে দিলেন ময়লার ঝুড়িতে। পাত্র থেকে ব্যাগটা বের করলেন এবং ব্যাগটা নিয়ে আবার বাড়ির একপাশে গেলেন পাত্রের কাছে। 

আর লেখা নয়। 

আর কিছুই লেখা নয়।

আরও অনেক ভালো কাজ আছে প্রিথিবিতে যা তিনি করতে পারেন, যেমন; বেকিং।

তিনি পোর্চের দোলনায় বসলেন। সেই নির্দোষ লোকটার কথা ভাবলেন, কিথ যাকে মেরেছেন। জগিং করতে গিয়ে পোর্চের সিঁড়ির ওপর বসেছিলেন তিনি।

তিনি বললেন, দেখো এটা খুব বড়ো কোনও কিছু নয়, তাই না। সবই ঠিক আছে। সামান্য ঘুঁসো ঘুসির ব্যাপারের মতো। কিন্তু তোমার বাচ্চা হলে এমন কাজ তুমি করতে না।

না, তা করতাম না। আমি কখনই এমন একজনকে মারতাম না যে শুধু দোষি লোকোটার মতো দেখতে।

সত্যি কথা। তিনি বললেন, প্রশংসার্হ কথা। কিন্তু এমন করে বলা সহজ যখন তুমি থাকো পরিস্থিতির বাইরে---

এটাই মানুষের চরিত্র, কিথ বললেন।

আমি করতাম না, কিথ করেছেন, বললেন তিনি।

লোকটা ভ্রু তুলে তাকালো। কেমন করে যেনো সে এই লেখাটার কথা জানতো।

সে বললো, শব্দ গুরুত্বপুর্ন ব্যাপার।

ওহ, চুপ করো, তিনি বললেন।

এখন সে ফ্যানে বাড়ি মারতে গেলো। ভালো লোকদের মাথায় তা ভেঙে পড়তে যাচ্ছিলো। এখন পর্যন্ত যারা সব সময় ভালো কাজ করে থাকে বা করতে চেষ্টা করে।

ভেতর থেকে তাঁর ফোন বাজলো।

খুব ভালো।

সেই পুলিশ।

সে বললো, সামান্য কথা। লিও ডিমিনি এখনই এসেছে এখানে। সে বললও, ব্যাট দিয়ে তাকে একজন মেরেছেন, তিনি আপনার স্বামী। এই ব্যাপারে কিছু জানেন কি আপনি?

তিনি বললেন, ব্যাট দিয়ে? মেরেছেন?

তাঁর কণ্ঠে মিছে অবাক হওয়ার ব্যাপারটা স্বামী স্ত্রী দুজনেই বুঝতে পারলো।

পুলিশ বললো, আমি এটাকে নাকচ করে দিতে যাচ্ছি।

তিনি বললেন, কিথ খুব ভালো মানুষ।

পুলিশ বললো, তাঁকে ভালো মানুষ মনে হয়। কিন্তু বলে দেবেন, আর নয় বেসবল।

তিনি বললেন, ঠিক, আর নয় বেসবল।

আমি যদি কিছু পরামর্শ দিই ? পুলিশ বললো।

ঠিক আছে বলেন, তিনি বললেন।

পুলিশ বললও, আমরা এই অভিযোগ চাপানোর ব্যাপারটাকে বন্ধ করে দিই।

তাহলে হয়তো সহজ হয়ে যাবে বিষয়টা। পরিবারে এটা নিয়ে কথা হচ্ছে। মানেটা হচ্ছে, আপনি অভিযোগ চাপানোর বিষয়টা বন্ধ করেন, আমি ব্যাট দিয়ে মারার বিষয়টা ঢাকা দেবো। আপনি জানেন, বেবে রুথ তাহলে আরামে, খুব আরামে ঘুমাতে পারবে। আপনারাও।

এই কথা শুনে তিনি ভাবলেনঃ ঈশ্বর, তিনি জীবনকে খুবই ভালোবাসেন। হাঁসের ঝাঁক যেমন মাঝে মাঝে নিজের জায়গা মনে করে অঙ্গন দিয়ে কখনও ঘঁসে লেপটে যায়, তেমন। টেবিলের ওপর কনুই রেখে, মাথায় শীতের হ্যাট পরে ট্রাক ড্রাইভেরের মতো ডেরেক যেভাবে ডিনার খেতে শুরু করেছে। গতো সপ্তায় কাঁঁচের জানালায় গোল করে ভুট্টা ছিঁটিয়ে ছোটো ছোটো জীব জন্তুর ( জিরাফ, গরু, সারস, পেঙ্গুইন, এলকে ) ছবি এঁকেছেন কিথ। সেখানে পোস্টারে লেখেছেন “রহস্যজনক কিছু বস্তুর বন্দনা।”

কি ভাবে আমরা বিষয়টাকে বন্ধ করতে পারি ? তিনি বললেন।

সে বললো, আপনি শুধু বলেন বন্ধ করতে।

এখন? তিনি বললেন।

সে বললো, এখন কাজ চলছে।

তারপর তিনি ফোন ঝুলিয়ে রেখে বেজমেন্টে নেমে গেলেন। পুরনো একটা লন চেয়ারে বসেছিলেন কিথ। ট্রেডমিলের ওপর একগাদা ধোয়া কাপড় দেখা গেলো।

কিথ বললেন, কি ঘোঁড়ার আন্ডাটা হলো।

যতোক্ষণ না তুমি একটা ব্যাট কিনে তাকে খুঁজে বের করে মারছো, তিনি বললেন।

এটা একেবারেই ফাজলামি। তিনি দেখলেন, কিথ প্রস্তুত নন।

তিনি কিথের হাতের কাছে গেলেন। তাঁর হাতটা ধরে কিথ চাপ দিলেন।

আমাকে এক মিনিট সময় দাও।

নিশ্চয়, তিনি বললেন। 

একদিক দিয়ে তাঁরা ভাগ্যবান। এরই মধ্যে ডেরেকের মুখ ভালো হয়ে যাবে। আঁচড়গুলো হালকা হয়ে যাবে। লোকটা কিথের কাছ থেকে ব্যাট ছিনিয়ে নিয়ে ধরে ফেলতে পারতো তাকে। মাথায় বাড়ি মেরে কিথ তাকে মেরে ফেলতে পারতো। এই একটা বিষয়ে ছাড় দিলেই সব কিছু স্বাভাবিক হয়ে যাবে। 

এবং এটা হয়েছিলো।

এক সপ্তা যায়, আর এক সপ্তা যায়, মাস যায়।

এরপর খ্রিস্টমাসের ঠিক আগে তিনি ডাউন টাউনের কাছে গেলেন।

রাস্তার পাশ দিয়ে হাঁটার সময় যুদ্ধ-মনুমেন্টের কাছে সেই লোককে দেখলেন তিনি। দুইজনের একজন ছিলো সে। তিনি বলতে পারবেন না, কোন জন সে।

এই দুই বদমায়েশ দেখতে প্রায় একই রকম।

তারপর দ্বিতিয় বদমায়েশটা পেছনের একটা শেড থেকে চিতকার করে বের হয়ে এলো। তারপর কারও লন থেকে প্লাস্টিকের বল্গা হরিন ধরার মতো করে খৃস্টমাসের আলোর চেইন ধরে টানাটানি করলো।

এইতো---ওয়াও। একজন খোঁড়া ছিলো, বেশ খোঁড়া।

কোনও ভাবে সে এই রকম খোঁড়া হয়েছে।

পরস্পরের ঘাড়ে হাত রেখে দুইজন চলে গেলো বনের ভেতর সময় কাটানোর জন্য। দুজন মানুষকে একসাথে দেখে মনে হচ্ছিল তাদের একজন খোঁড়া। যেনো বল্গা হরিনটা লাফচ্ছে তাদের সাথে।

মাথার পেছনে কে যেনো জোরে শব্দ করলো। তিনি ব্রিজের চারপাশে ঘুরে দেখলেন।

লজ্জায় তাঁর মুখ লাল হয়ে গেলো। ওহ ঈশ্বর, কি বিশ্রি। তিনি এই শব্দ করেছেন।তারা একজন নির্দোষ বুড়ো মানুষকে পঙ্গু করে দিলো। তিনিই শব্দটা করেছেন। একজন দুর্ভাগা মানুষের বাজে জীবনকে আরও কঠিন করে দিলেন।

তিনি করেছেন।

যথার্থই তিনি।

ঈশ্বর, সারা জীবন তিনি ভালো থাকতে চেয়েছেন। সিংকের পাঁশে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন, প্লাস্টিকের তোফুকে যদি সিত্যিকারের তফু বানানো যেতো। সেই সময় তিনি এক কাঠবিড়ালিকে আঘাত করে পেছনে ঘুরে দেখলেন, সে পশু ডাক্তারের কাছে যেতে পারবে কি না। কাঠবিড়ালি নেই। এতে কিছু প্রমানিত হয় না। সে হয়তো হামাগুড়ি দিয়ে ঝোপের কাছে গেছে মরার জন্য। গাড়ি পার্ক করে তিনি ঝোপের নিচে দেখছিলেন। যতোক্ষন না চুল কাটার সেলুন থেকে একজন মহিলা এসে জানতে চাইলেন, তিনি ঠিক আছেন কি না, ততোক্ষন তিনি দেখেই যাচ্ছিলেন একটার পর একটা ঝোপ।

মলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় যার সাথে দেখা হয়েছে,তাদের সবার সাথেই ইতিবাচক দৃষ্টি বিনিময় হয়েছে। কুকুরের পাত্রে পানি ভরে দিলেন যেনো তার দরকার ছিলো। তবে কখনও দরকার হয়ও। পরিষ্কার পানি হয়তো ভালো তার জন্য। সবসময়? কখনও তিনি ডেরেকের সার্টে দুতিনটা ভাঁজ দেন। দেখতে চান, কি ভাবে সে খোলে ভাঁজগুলো। এটার প্রয়োজন আছে। নয় কি? যখন সে ঠিক ঠাক মতো ভাঁজ খুলতে পারবে, তখন একটা বাচ্চার আত্মবিশ্বাস বেড়ে যাবে, না?

চিন্তা ভাবনা করে কতোগুলো শার্ট আপনি আবার ভাঁজ করতে পারবেন, যেনো কারো পা আবার স্টেপল না হয়ে যায় সেজন্য কতোগুলো স্টেপলারের পিন আপনি মেঝে থেকে ওঠাতে পারবেন, কতো ঘন্টা আপনাকে স্টোরে থাকতে হবে দেখার জন্য যে, কি পরিমান মিষ্টি আছে ফলের রসের মধ্যে, বাচ্চাসহ কতো বিরক্ত তরুন মেয়েকে আপনার সামনে দিয়ে পোস্ট অফিসে যেতে দেবেন, কতো চিঠি কঠিন ভাবে বাদ দিয়েছেন উত্তর দিবেন না বলে, কতো পরিচিত খাবার একসাথে আনতে পারেন যখন আপনার মনে গল্পের প্লট বসে থাকে, বুড়ো অসহায় একটা লোকের জন্য কতোক্ষন আপনি সবকিছু দূরে ঠেলে রাখতে পারেন---

পৃথিবিটা বড়ো কঠিন। খুবই কঠিন। একটা ভুলের মাশুল দিতে হয় সারা জীবন ধরে। মেরি টিলিস-এর কথা মনে এলো। ছোটো গাড়িটা একটা সামনের গাড়ির পেছনে ধাক্কা দেয়ার ফলে তাঁর দুটো বাচ্চা মারা গেলো। মিস্টার সমারের কথাই ধরা যাক, তিনি এমন অলৌকিক কিছু করতে পারতেন হিটার দিয়ে যাতে তাঁর বয়সি বাবা মা গ্যাসের করাল থেকে বেঁচে যেতেন। বয় স্কাউটের সেই চোখে পট্টি বাঁধা লোকটা যে অন্যমনস্ক ভাবে পোড়ানোর কাঠ তুলছিলেন এবং হঠাত একটা কাঠের টুকরা এসে মহিলার কাঁচের জানালায় পড়ার ফলে গাড়ি ঘুরে গিয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিলো এবং তিনি বেল্ট বাঁধা অবস্থায় ডুবে মারা গিয়েছিলেন।

সেই লোকটার অপরাধ কি ছিলো যা জীবন ধ্বংস করে দিলো তার ? স্কাউটে তিনি প্রায় মাতালই থাকতেন এবং কাঠের গাড়ির রেসের সময় বাইরে বেরোনোর দরজা খুলতে চেষ্টা করছিলেন, যখন রেসের ছোটো একটা গাড়ি উলটে গিয়েছিলো সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা বাচ্চা মাউরিকে রেখে । একদা একজন মহিলাকে হত্যা জন্য আমার বাবা কি দুঃখিত ? 

একটা বাজে গেরো।

নয়টা বাহুল্য কাগজের পৃষ্ঠা।

গোল্লায় যাক।

এমন অনুভুতিকে তিনি ঘৃণা করেন। এমন অপরাধবোধ নিয়ে তিনি বাঁচতে পারতেন না।

তাঁকে নদী থেকে দূরে রেখে পার্কওয়ে পশ্চিমে ঘুরে গেছে এক ব্যবসাকেন্দ্রে যেখানে তিনটে বেশ বড়ো চার্চ লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে।

সেই সময় একটা কাঠবেড়ালি মেরে তিনি বাড়ি গেলেন এবং কিথকে বললেন ঘটনাটা। পরস্পরের কাছে তাঁরা নিজেদের কথা স্বীকার করেন। কিথ সবসময়য় তার অপরাধ ক্ষমা করে দেন এবং ঘটনাটা ভাষায় বলেন। কাঠবেড়ালিরা সব সময় মারা যায়। গাড়ি চালানোর সময় আমরা সব সময় হাজার হাজার কিট পতঙ্গ মেরে থাকি। তাহলে কি করবো আমরা? গাড়ি চালাবো না? একবার কিথ তাঁকে ক্ষমা করেছিলেন যখন তাঁর অপরাধবোধ ফিঁকে হয়ে গিয়েছিলো। চার্চ থেকে বেরোনোর সময় একবার এড টেমলি-র সাথে ধাক্কা খেয়েছিলেন, সেটাও তিনি স্বীকার করেছিলেন। শুনে কিথ বলেছিলেন, এড রাগি লোক, এমন কি আমিও যদি ওরকম বেহুদা লোক দেখি, একদিন দেখে আমরা গাড়ি থামিয়েছিলাম, তাহলে এই রকমই হবে আমাদের।

রান্নাঘরের টেবিলে কিথের উল্টো দিকে বসে তিনি ভাবছিলেন এই সব কথা।

ও হানি, শোন শোনো, পেয়েছি উপায়, তিনি বললেন। ঐ বুড়ো লোকটাকে আমরা একটা লিম্প দেবো যেটা সে কবরেও নিয়ে যেতে পারবে। ঠিক কি না?

আশ্চর্য হয়ে কিথ সেখানেই বসে থাকলেন।

আমরা হয়তো তার হাসপাতালের বিলও দেবো। অথবা নকল পা লাগানোর জন্য একজন হাড়ের ডাক্তারও ঠিক করে দেবো। এই রকম কিছু?

সমস্যার সমাধান তাহলে হলো। এটা হিপ্পির ইন্সিওরেনসের ব্যাপার নয়। এই অপারেশনের টাকা পকেট থেকেই দিতে হবে তাঁদের। ফলে ডেরেকের কলেজের টাকা খরচ হয়ে যাবে। সঞ্চয়ের জন্য কি কষ্ট করেছেন তাঁরা। সেটাও যথেষ্ট নয়। বর্তমানের মতো যদি তাঁরা টাকা সঞ্চয় করতে পারতেন, তাহলে নতুন বছরের জন্য হয়তো ভালো হতো। স্কুলের বিষয়টা এমন কিছু বড়ো নয়। সেখানে সীমা আছে। এই ব্যাপারে কি করতে পারে একজন? তিনি উড়িয়ে দেবেন। তারাও উড়িয়ে দেবে। কিন্তু তারা তো দেবতা নয়, মানুষ। আবেগে সীমাবদ্ধ মানুষ, যারা মাঝে মাঝে বাজে উপদেশ দেয়।

ঐ লোকের সম্বন্ধে কি জানেন আপনি?

সে তাদের টাকা পাবে না।

এটা এক ধাপ বাড়িয়ে বলা হলো। যুক্তিযুক্ত নয়। অলৌকিক কিছুর মতো। 

স্নায়বিক ব্যাপার হচ্ছে। 

খুব বেশি চাপ পড়ে যাচ্ছে।

তিনি বাড়ি গুছিয়ে ফেললেন। পরিষ্কার ঝকঝকে হয়ে উঠলো সব। আগের চেয়ে সুন্দর হয়ে উঠলো।

নিচু মেঘের ভেতর থেকে একঝাঁক হাঁস এলো, মনে হলো খুদে ডায়নোসরাস ওরা, নিজেদের ডাক ভুলে অন্যরকম শব্দ করছে। বামদিক থেকে একদল এসে এদের সাথে যোগ দিলো , ডানদিক থেকে আর একদল এসে যোগ দিলো। অনেক বড়ো ঝাঁকটা এলোমেলো ভাবে উড়ে গেলো হাই স্কুলের দিকে।

তিনি কল্পনা করলেন, একটা সাদা আলোর ছটা এসে তাঁর কপালে লাগছে। এটা ক্ষমা চাওয়ার আলো, বলতে চায় ‘আমি দুঃখিত’। সেই আলোটা চলে গেলো শহর ছেড়ে নদী পার হয়ে, এবং ঘুরতে লাগলো বনের ভেতর যতোক্ষন না সেই দুজনকে পায়। তাদের মাথার ওপোর কিছুক্ষন থামলো, কারন দুইজনের চেহারায় এতো মিল। অবশেষে নির্দোষটার কাছে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে সে তাকে চিনলো। বুঝলো তার ব্যথার কথা। ডেরেকের ফুসফুস জনিত সমস্যা নিয়ে কতো কষ্ট করে সে ক্লাসের বন্ধুদের সাথে থাকতো। সার্টের পকেটে স্টাফ করা ভালুক নিয়ে সে স্কুলে যেতো, বেচারা বাচ্চাটা ভাবতো এতে তাকে ভালো দেখাবে। তাকে ভালো করে বোঝাতো বিষয়টা। এ সবই বোঝে লোকটা। এটাই ক্ষমা। ক্ষমা এ রকমই ছিলো। কিথ ছিলেন তাঁর নিজের মানুষ। তিনি সব বুঝতে পেরেছেন। দেখেছেন কেমন করে পুরো ঘটনাটা ঘটেছে।

কেমন করে লোকটা মহিলার ওপর রাগ করবে যখন দেখবে কিথ তাঁর মানুষ?

একটা সবুজ ক্ষমার আলোর ছটা এসে লাগলো তাঁর কপালে এবং উড়ে গেলো শহরের দিকে এই ধারনা নিয়ে, সত্যটা বলতে হবে। জীবনের কাছ থেকে আমি বেশি কিছু চাইনি, এবং যা কিছু নগন্য ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আমিই দায়ী। আর একটা লিম্পের জন্য আমি মোটেই ভাবিনা। এই কষ্ট আমাকে প্রতি মুহুর্তে সচেতন থাকতে শিখিয়েছে।

আলোটা গাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়লো এবং ঝুলে থাকলো ড্যাশবোর্ডের কাছে।

যদিও আমার একটা অনুরোধ আছে , সেটা বললো।

বলে যাও, নমনীয় মনে ভাবলেন তিনি।

আলোটা বললো, আমার কাজিনকে ক্ষমা করো যেমন আমি তোমাকে ক্ষমা করেছি।

ও, কি যে বলো না, বিশ্রি কথা।

এ রকমই ঘটছে।

কোনোদিন হয়তো ঘটবে, যদিও সম্ভাবনা কম। এই অনুভবগুলো তার মধ্যে থাকবে না। একেবারেই না। তিনি ঘৃনা করবেন এই ধাক্কাকে। এবং করতেই থাকবেন।

আলো বললো, তুমি রিকিকে ক্ষমা করো।

তোমার লোক রিকি নয়, তিনি বললেন।

রিকি খুবই খারাপ, বললো আলো।

আচ্ছা, তুমি কি রিকিকে চিনতে।

আলো বললো, তুমি কি চিনতে আমার কাজিনকে।

যাই হোক, এগুলো সবই খারাপ। কোনও আলো ফালো ছিলো না। সবই তাঁর মনের কল্পনা।

আলো বললো, তুমি নিজের ফাঁদে পড়ে গেছো।

হ্যাঁ, ঠিক, কে না পড়ে? তিনি ভাবলেন।

কোনও কারনে হাঁসগুলো আবার পেছন দিকে উল্টো উড়ে যাচ্ছে।

এটাই আসলে সমস্যা, যদিও, তাই না? তিনি ভাবলেন।

আলোটা বললো, ঠিক তাই।

তিনি দেখতে পেলেন, কিথ রান্নাঘরের চারপাশে ঘুরছেন।

বড়ো ভালো মানুষ কিথ। এই ঘটনার পর থেকে ভালো নেই। রাতে প্যান্ট্রিতে কখনও তাঁকে কাঁদতে শুনেছেন তিনি।

এই সপ্তায় আবার তিনি কাজ করেছেন। লোকেরা আর তাঁকে সম্মান করেনি।

গতো খ্রিস্টমাসে প্রত্যেকেই তাঁর সাথে কতো কথা বলেছে। সেখানে প্রত্যেকেই কিথের নগন্য আকাঙ্ক্ষার প্রকল্প নিয়ে নির্দ্বিধায় ইতিবাচক ঠাট্টা তামাশা করেছে। পড়ে যাওয়া পয়েনসেটিয়া ফুলের পাতার ওপর হাত দিতে তিনি বসেছিলেন। তারা যে আঘাত করছে এবং তিনি যে কষ্ট পাচ্ছেন,সেটা কেউ খেয়ালই করেনি।

কোমল মানুষ। দুর্বল মানুষ।

তাঁর দুর্বল মিষ্টি মানুষ।

লিম্পের ব্যাপারটা তাঁকে কষ্ট দিচ্ছে সব সময়।

একজন পাপের খাদককে তিনি দয়া করতে যাচ্ছেন। 

তাঁকে এখন যা করতে হবে তা হলো, সেখানে গিয়ে লিম্পের ব্যাপারে কোনও কথা না বলা। আনন্দে থাকো, সুখে থাকো। পরিকল্পনা মতে খৃস্টমাসের বিস্কিট বানাও। প্রতি সন্ধ্যায় সব সময়, তাকে কিছু না বলার তাগাদার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো। কাল যখন আবার তাগাদার কথাটা মনে হবে, তখন মনে করতে হবে পরিবারের কল্যানের জন্য তিনি গাড়িতে এরই মধ্যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মুখে বলতে হবে না কিছুই। এই ভাবে পরদিন এবং তারপর দিনও একই ভাবনা। এমনি করে দিন যেতে যেতে কথাটা তাকে বলার ইচ্ছে মরে যাবে। এবং একদিন সারাদিন পার হয়ে গেলেও তাকে কিছু বলার কথাই মনে পড়বে না।

এবং সেটাই হবে।

প্রক্রিয়াটা শুরু করে দিলেন তিনি।

যাত্রীর বসার জায়গার ওপর একটা প্লাস্টিক ব্যাগে ছড়ানো ছিটানো তৈলাক্ত কিছু কাগজ এবং বিস্কিট কাটার তিনটে নতুন যন্ত্র ছিলো। সেখানে গিয়ে ব্যাগটা তুলে নিলেন। গাড়ির দরজা খুলে ধুসর গলা গলা বরফের ওপর পা দিলেন। 

সেটা তিনি করতে পারতেন। 

সেটাই ভালো কিছু ছিলো প্রকৃতপক্ষে যা করতে পারতেন তিনি।


 


লেখক পরিচিতি: গল্পকার ও ঔপন্যাসিক জর্জ স্যন্ডার্সের জন্ম ১৯৫৮ সনে টেক্সাসে। শৈশব, কৈশোর কেটেছে শিকাগোতে। বর্তমানে সিরাকিউজ ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক। ছোট গল্পের জন্য পেয়েছেন প্রচুর পুরস্কার, তাঁর উপন্যাস Lincoln in the Bardo ২০১৭-র Man Booker Prize পেয়েছে। তাঁর গল্প নিয়মিতভাবে The New Yorker, Harper’s ইত্যাদি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। স্যন্ডার্সের লেখার স্টাইল অনন্য – উত্তম পুরুষে লেখা, কিন্তু তার মধ্যে যেন ব্যাপকতা নেই, ইচ্ছে করেই যেন পাঠকের দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করা হয়েছে; আর আছে যাকে বলে stream of consciousness। এই দুটি বৈশিষ্ট্যই নিচের গল্পটিতে প্রতিভাত হয়েছে। গল্পটির শুরুতে এটা কোনো ভবিষ্যতের dystopia-r সমাজ মনে হতে পারে, কিন্তু ধীরে ধীরে পাঠক বুঝবেন এটি বর্তমান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরই একটি রূপের কথা বলা হচ্ছে।
 

অনুবাদক পরিচিতি:
বেগম জাহান আরা
গল্পকার। অনুবাদক। ভাষা বিশেষজ্ঞ
ঢাকায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন