সোমবার, ২৮ মার্চ, ২০২২

দেবর্ষি সারগী'র গল্প : আমি কথা রেখেছি


 
রেহানার সঙ্গে আমার সম্পর্কের পরিণতি যে খুব সুখকর হবে না, আমি মাঝেমাঝে অনুমান করতাম। ওর বাড়িতে আপত্তি ছিল, আমার বাড়িতেও। শিক্ষা মনের ভাবকে গোপন করতে শেখায়। রেহানার দাদারা শিক্ষিত, তাই ওরা সরাসরি মুখে আমাকে কিছু বলেনি বা ওদের বাড়িতে গেলে কখনও অপমান করেনি। কিন্তু আমাদের মেলামেশা যে পছন্দ করত না সেটা আমি বুঝতাম। শুকনো, বিষণ্ন মুখে রেহানাও কখনও কখনও সেটা বলত আমাকে। অবশ্য একই কলেজে পড়তাম বলে আমাদের মেলামেশা ওরা সহজে বন্ধ করতে পারত না।

ফলে আমরা মিশতাম। একটু সাহস করেই। প্রেম মানুষকে একটু বেশি সাহসী এবং সেহেতু মৃত্যুমুখী করে তোলে।

আমাদের দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ছোটখাট হিংস্রতা মাঝেমাঝেই শোনা যেত। কাজ ও ব্যস্ততা ছাড়া কোনও প্রাণীই বাঁচতে পারে না। তাহলে ক্লান্ত হয়ে, অবিরাম হাই তুলতে তুলতে সে অকালেই মারা যাবে। পরস্পরের সঙ্গে দাঙ্গা বা হাঙ্গামা করা মানুষ নামক প্রাণীর যেন একটা অনিবার্য কাজই, আমার মনে হত। একে অপরকে খুন না করলে সে মনে হয়, বাঁচতেই পারত না। সৃষ্টি করার সময় আকাশের উদ্ভট দেবতা হয়ত মানুষের কানে ফিসফিস করে বলেছিলেন, এবার বাঁচো এবং একে অপরকে হত্যা করো। ফলে সৃষ্টিলগ্ন থেকে মানুষ তাই করে যাচ্ছে। আজ পর্যন্ত। বাঁচছে এবং একে অপরকে হত্যাও করছে। এ এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা। হত্যা করতে করতে বাঁচো। বাঁচতে বাঁচতে হত্যা করো। যেন প্রাণের মূল উদ্দেশ্য বাঁচা নয়, হত্যা করা। আর বেঁচে থাকতে হয়, যাতে হত্যা করা সম্ভব হয়।

এক হেমন্তের শুরুতে ছোটখাট হিংস্রতা ভয়ঙ্কর দাবানলের চেহারা নিল। রেহানার বাড়িতে আমি প্রায়ই যেতাম। ওর দাদাদের নীরব রক্তচক্ষু পীড়িত করলে আমরা দেখা করতাম আমাদের অন্য এক সহপাঠীর বাড়িতে। সেও রেহানার বাড়ির কাছাকাছি থাকত। আমার বাড়ি একটু দূরে বলে রেহানা সেখানে যেতে পারত না। আমার বাড়ি যাওয়া ওর দাদারা পছন্দ করত না। পছন্দ করত না আমার বাড়ির লোকেরাও। খুব কষ্ট পেতাম যখন দেখতাম রেহানাকে ভালবাসি বলে আমার বোনও, যার বয়স রেহানার মতোই, আমাকে অপছন্দ করা শুরু করে। আমার বাবা তো কথা বলাই ছেড়ে দিয়েছিল আমার সঙ্গে।

দাঙ্গার আগুন হঠাৎ ছড়িয়ে পড়ল এক মহল্লা থেকে অন্য মহল্লায়। সেদিন দুপুরে আমি ও রেহানা আমাদের ওই সহপাঠীর বাড়িতে বসেছিলাম । দুজনের বুকেই উদ্বেগ, দুজনেই কথা বলতে পারছিলাম না। আকাশ একটু মেঘলা ছিল। হাওয়ায় ছিল হালকা শীতের শিরশিরানি। পরস্পরের মুখের দিকে আমরা মাঝেমাঝে তাকাচ্ছিলাম, কোনও কথা না বলে। দুজনেরই কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছিল। আমার মনে হল আমরা যেন একটাই ফুসফুস থেকে শ্বাস নিচ্ছি। ফলে আমার দম হওয়া মানে রেহানার দম বন্ধ হওয়া।

হঠাৎ কানে ভেসে এল চিৎকার, হল্লা, আর্তনাদ। বুঝলাম দাঙ্গা শুরু হয়েছে এখানেও। ছুটে গিয়ে রেহানা জানলায় কাছে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। তারপর আবার ছুটে এল আমার কাছে। সে ফোঁপাচ্ছিল। আমার একবার ইচ্ছে করল ওকে টেনে আমার বুকে গুঁজে দিই। কিন্তু সহপাঠীর সামনে ওরকম করতে লজ্জা করল।

‘এখান থেকে তুমি পালাও’, সহপাঠী, যে রেহানার সম্প্রদায়ের মানুষ, আমাকে ভীত স্বরে বলল, 'ওরা এখানে ক্ষতি করতে পারে তোমার।’

আমি রেহানার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এবং ঠিক করলাম ওর জন্য আমাকে বাঁচতেই হবে। এখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুবরণ করলে রেহানার জন্য আমার মরা হবে, বাঁচা নয়। কিন্তু ওর জন্য আমি বেঁচে থাকতে চাই। আমি দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই রেহানা কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, ‘আমাকে তুমি কখনই ছেড়ে যেইয়ো না?’

'তুমি নিশ্চিন্তে থাক, তোমাকে ছেড়ে আমি কখনও কোথাও যাব না’, আমি বললাম, তারপর বেরিয়ে গেলাম রাস্তায়।

রাস্তার দুপাশে আগুন। হাতে অস্ত্র ধরে উন্মত্ত লোকেরা দৌড়াদৌড়ি করছে। চিৎকার ও আর্তনাদের আওয়াজ আসছে। দৌড়ে আমাকে যেতে হবে আমাদের এলাকায়, যেখানে আমার বাড়ি। দাঙ্গা তো একদিন থামবেই। আবার সব শান্ত, স্বাভাবিক হয়ে যাবে। ততদিন আমাকে বেঁচে থাকতে হবে রেহানার জন্য। এর আগে একবার দাঙ্গায়-- তখন আমি খুব ছোট-- আমার বাড়ির সবাই বাড়ি বন্ধ করে মামার বাড়ি পালিয়ে যায়। আমাদের সৌভাগ্য, ফিরে এসে দেখি আমাদের বাড়িতে আগুন লাগানো হয়নি। জানি না, এবার বাবা ও দাদারা কী, সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু আমি বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না। বাড়িতে একাই থাকব। রেহানার সঙ্গে রোজ ফোনে কথা বলব।

দুপাশের আগুনের ভেতর দিয়ে জোরে জোরে হাঁটতে লাগলাম। এখানে প্রায়ই আসি বলে অনেকে চেনে আমাকে। স্থির, অদ্ভুত দৃষ্টিতে ওরা তাকাচ্ছিল আমার দিকে। আমি ভয় পাচ্ছিলাম ওদের দৃষ্টিকে, একটু হেসে চোখ নামিয়ে নিচ্ছিলাম। হেমন্তের বিকেল, ফলে তাড়াতাড়ি অন্ধকার নামে। কিন্তু এখন আগুন ও ধোঁয়ার জন্য আকাশে অনেক আগেই অন্ধকার নেমে এসেছিল। আমার বাড়ির রাস্তা সোজাই। ভাবলাম গলিটা পার হয়ে বড় রাস্তায় এসে অটো ধরে নেব, তাড়াতাড়ি হবে। অটো নিশ্চয়ই চলছে, ওদিকে নিশ্চয়ই দাঙ্গা হচ্ছে না। কিন্তু দূরে তাকিয়ে যেন একটা আগুনের পাহাড় দেখলাম। বুঝলাম এই রাস্তা দিয়ে আর যাওয়া যাবে না। অন্য একটা গলিতে ঢুকে পড়লাম। এটা দিয়ে গেলে আরও নানা ছোটবড় গলি পার হতে হবে এবং অটো পাওয়া যাবে না, কারণ এদিকে অটো চলে না। এদিকে এখনও আগুন লাগানো হয়নি, ফলে অদ্ভুত শান্ত চারপাশ, বড় বড় বাড়িগুলো থমথম করছে, আকাশ কেমন অন্ধকার, কোথাও কোনও মানুষ চোখে পড়ছে না। সবাই কি পালিয়ে গেল? সেরকম হবার তো কথা নয়, কারণ এদিকে রেহানার সম্প্রদায়ের মানুষই বেশি থাকে। এটা তো ওদেরই পাড়া। তবে এরকম থমথমে কেন চারপাশ? আমি হঠাৎ ভয় পেলাম। এই মুহূর্তে মানুষকে যেমন ভয় করছে, তেমনি নির্জনতাকেও ভয় করছে।

হঠাৎ জোরে দৌড়তে শুরু করলাম আমি। নির্জন, নিঃশব্দ, কালচে, সরু গলিটা দিয়ে। নিজেকে কোনও দিশেহারা পশুর মতো মনে হচ্ছিল, যে পথ হারিয়েছে। একবার মনে হল আমি যেন অন্য কোনও গ্রহে দৌড়চ্ছি, অনন্তকাল ধরে, সেখানকার চিরন্তন ফাঁকা, স্তদ্ধ অলিগলি দিয়ে, কোনও দুবোধ্য ত্রাসে তাড়িত হয়ে, কোথাও আশ্রয় নেবার জন্য, অথচ পাচ্ছি না এবং আমার মৃত্যুও হচ্ছে না। নানা জীবের নানা স্বভাব। জগতের কোনও গ্রহে এরকম জীব তো থাকতেই পারে, যে জন্মাবার পরের মুহুর্ত থেকে শুধু দৌড়। কোথা আশ্রয় নেবার জন্য। ওটাই তার স্বভাব, ওভাবেই সে বেঁচে থাকে। দৌড়তে দৌড়তে আমার মনে হল আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি, চেনা রাস্তাও কেমন গুলিয়ে যাচ্ছে। একটা গলি দিয়ে আর একটা গলিতে ঢুকছি, তারপর ফিরে আসছি আগের গলিটায়। আগের বড় গলিটা দিয়েই আমার যাওয়া উচিত, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ভাবলাম। ওদিকে অটোও পাব। একবার ভাবলাম, রেহানাকে অনেকবার কথা দিয়েছি, যে কোনও মুল্যে আমি তার জন্য বেঁচে থাকব, নইলে আজ এখানে এই নির্জন গলিটারই একপাশে চুপ করে শুয়ে থাকতাম ভাগ্যের হাতে নিজেকে সঁপে দিয়ে।

আগের বড় গলিটায় পা দিতেই দেখলাম আগুন, কানে এল চিৎকার, হল্লা। একটু দূরে পাহাড়ের মতো জ্বলতে থাকা আগুনটা আগের চেয়ে আরও ঘন, আরও বিস্তৃত হয়েছে, যেন ওটা কোনও কঠিন, উজ্জ্বল দেওয়াল এবং ওটার ভেতর দিয়ে এগোবার চেষ্টা করলে মাথা ফেটে যাবে। হঠাৎ মনে হল, উল্টোদিক দিয়ে হেঁটে রেহানার বাড়ির পাশ দিয়েও আমার বাড়ি যাওয়া যায়। একটু ঘুরপথ হলেও ওদিক থেকেও অটো পাওয়া যায়। . তাই করলাম। জোরে জোরে হাঁটতে হটিতে ভাবছিলাম রেহানার সঙ্গে আর একবার দেখাও হয়ে যাবে হয়ত। হয়ত ওদের একতলা বাড়ির জানলায় দাঁড়িয়ে আছে (যা সে। প্রারই করে)। হয়ত আমার কথা ভাবছে।

কিন্তু সে ছিল না। জানলা দরজাও বন্ধ। বাড়িটার দিকে আমি করুণ, আর্ত দৃষ্টিতে একপলক তাকালাম, কারণ রেহানা থাকে বলে বাড়িটাকেও আমি ভালবাসি। যেন ওটার দেওয়াল একটু ছুঁলে রেহানাকেই ছোঁয়া হয়ে যায়।

বাড়িটার পাশ দিয়ে আর একটু যাবার পরেই আমাকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে হল। স্পষ্ট দেখতে পেলাম সামনের দিক থেকে ধুপ ধুপ করে পা ফেলে হেঁটে আসছে একদল লোক, যাদের প্রত্যেকের হাতে খোলা তরোয়াল। যেন মধ্যযুগের একদল সৈনিক যুদ্ধ করতে বেরিয়েছে। আমি দাঁড়িয়ে পড়েছিলাম। ওরা আর একটু কাছে আসতেই দেখলাম ওদের ভেতর আছে রেহানার এক দাদাও। ভয়ে আমার মাথা খারাপ হয়ে গেল। এবং হঠাৎ যেন কেউ বিদ্যুৎচমকের মতে আমার কাছে ঘোষণা করল, পালাও। রেহানার দাদা তোমাকে খুন করবে।

মুখ ঘুরিয়ে আমি আবার দৌড়াতে লাগলাম। অনেক দূরে সেই দেওয়ালের মতো ঘন, ত্রিমাত্রিক আগুনটা জ্বলছিল। এবার ওটার ভেতর দিয়েই আমাকে পালাতে হবে। দৌড়তে দৌড়তে একবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছন দিকে তাকাই এবং দেখি আমার পেছনে দৌড়তে থাকা রেহানার দাদা আমার কাছ থেকে খুব বেশি দূরে নেই। আমি সটান সেই আগুনের দিকে দৌড়ে যাচ্ছিলাম এবং ভাবছিলাম এই গতিতে দৌড়ে আগুনটার ভেতর ঢুকে পড়লে আগুন পোড়াতে পারবে না আমাকে। তার আগেই ওটার বৃত্ত থেকে বাইরে বেরিয়ে যাব। কিন্তু সেটার আর দরকার হয়নি, আগুনটা পর্যন্ত আমাকে পৌঁছতেই হয়নি, কারণ হঠাৎ অনুভব করলাম আমার একটা হাত শরীল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল, পিঠটা যেন গিরিখাত হয়ে গেল, আর ঘাড় থেকে কাটা পড়া মাথাটা ডানদিকে ঝুলতে লাগল। অন্য হাতটা দিয়ে মাথাটা ঘাড়ের ওপর ধরে রাখার ছটফট করা চেষ্টা করলাম কয়েক মুহূর্ত। তারপর মাথাটা ফেলে রেখে রেহানার দাদার হাত থেকে পিছলে বেরিয়ে গেলাম অসম্ভব গতিতে। মাথা ছাড়াই আমি দৌড়ে যাচ্ছিলাম গাঢ় ধোঁয়ার ভেতর দিয়ে, হেমন্তের বাতাসের ভেতর দিয়ে,উঁচু উঁচু বাড়ির খোলা জানলার গ্রিলের ভেতর দিয়ে, কখনও এতদিনের পরিচিত অলিগলির ভেতরের কালো সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়ে, চারপাশের পোড়া মানুষ ও দুর্গন্ধের ভেতর দিয়ে। কারণ, হত্যাকারীদের হাত থেকে যে আমাকে বাঁচতেই হবে। কারণ, রেহানাকে যে আমি কথা দিয়েছি ওকে ছেড়ে কখনও কোথাও যাব না। আমি কথা রেখেছি। ওকে ছেড়ে কোথাও চলে যাইনি। এখানকার বাতাসে বাতাসে ঘুরে বেড়াই। শ্রাবণের ভিজে সন্ধ্যো কিংবা মাঘের দুরন্ত দুপুরে। কিংবা চিলের ডাকের ধাক্কায় পাক খাওয়া শনশন ঢেউয়ে। আর আছড়াতে থাকি জানলা ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেহানার শরীর ও মনে।



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন