বুধবার, ১৫ জুন, ২০২২

রঞ্জনা ব্যানার্জীর গল্প: ভ্যান গগের কান




শ্যনন

যাওয়ার আগে আমার ফ্ল্যাটে এসেছিল শ্যনন। ওর জন্যেই ছবিগুলো আনিয়েছিলাম চাটগাঁ থেকে। আমি নিজেও এদের নব্বই সনের পরে সেই দিনই প্রথম দেখলাম।মাকে এইসব ছবি নিয়ে জিজ্ঞেস করতে বাধছিল। এই ছবি বাবা দেখার পরে মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। বাবার রাগী মুখ আর মায়ের বিষণ্ন চোখ আমার মনে খোদাই করা আছে। ছবিগুলো আদৌ মা রেখেছে কি না তা নিয়েও সন্দেহ ছিল। কিন্তু মাকে বলতেই মা বলল, “আমি তো ভেবেই রেখেছিলাম এবার তোর কাছে যাওয়ার সময় ছবিগুলো নিয়ে যাব। বাড়িতে অনেক কিছুই আজ অপ্রয়োজনীয়। ছবি দুটো বাঁধাই করে রাখিস। তোর দেওয়ালে মানাবেও ভালো”। আমি খানিক দোনোমনা করছিলাম মাকে বলব কি না, শেষমেশ ছবি নিয়ে শ্যননের সন্দেহের কথাটা বলেই ফেললাম। মা শুনে অবাক, “তাই!” দুই দিন পরে মা নিজেই ফোনে জানাল সত্যিই ছবিটাতে অন্য কারো হাত পড়েছিল। কিন্তু কে? জ্যাঠিমা, দাদু আর ঠাম্মা নেই এরা তিনজন জীবনের ওপারে, বাকি সবাই আছি। সঞ্জয় দা’ দেশে ছিল না তখন। মা ছাড়া আমরা কেউই সেই সময়ে তুলিই ঠিকঠাক ধরতে পারি না। আর মা তো সারাক্ষণই আমাদের চোখের সীমানাতেই থাকতো। ছবিগুলো কীভাবে পাঠাবে মা ভেবে কুল পাচ্ছিল না। বাবা বা পিপ্‌লু ভরসার নয় মোটেই। তাছাড়া টের পেলে পিপ্‌লুর বৌ,মন্দিরা এ নিয়ে নতুন করে কাসুন্দি তুলবে। আমি যাব কিন্তু পরের মাসে তখন আবার শ্যনন থাকবে না। কী ভেবে জানি না ইব্রাহিমকেই ফোন দিলাম। আমাদের কক্সবাজারে সেই গাইড ইব্রাহিম। ও বলেছিল ঢাকায় এলে দেখা করবে। ঠিকানা দেওয়া হয়নি ওকে। ও হয়তো লজ্জায় চায়নি আর আমিও আগ বাড়িয়ে এইসব দু’দিনের পরিচিতদের জীবনে জড়ানোর পক্ষে নই বলে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। ফোন পেতেই সে খুশিতে কোনো কথাই ঠিকঠাক বলতে পারছিল না। বেশ কসরতের পরে জানলাম ও আসতে চায় ঢাকায়। ম্যাডামকে কদমবুসি করবে। জানলাম শ্যনন ইব্রাহিমের বাচ্চার জন্যে বেশ বড় অঙ্কের টাকা পাঠিয়েছে। শ্যননের সংগে আমার প্রায় প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে অথচ আমি ঘুণাক্ষরেও কিছু টের পাইনি! ইব্রাহিমকে তা বললাম না কেবল জানালাম শ্যনন চলে যাবে। ইব্রাহিম বারবার বলতে লাগল, “উনি ফেরেস্তা”! নিজের কাছে নিজেকে বড়ো বেশি ছোটো লাগছিল। লজ্জাও। ইব্রাহিমের বাড়িতে হাতে করে কিছু নেয়নি বলে আমি বিরক্ত হয়েছিলাম শ্যননের ওপর । যাই হোক ইব্রাহিমের এই ঢাকা আসার ইচ্ছেও যেন আমার প্রয়োজনের স্বার্থেই কেউ ঘটিয়ে দিলো। ওকে অনুরোধ করলাম চট্টগ্রাম হয়ে যেতে এবং টিকেটের খরচ আমিই দেবো। ইব্রাহিম এক কথায় রাজি এবং ছবি দুটো সযত্নেই নিয়ে এসেছিল। আমার বাড়িতেই ডেকেছিলাম ওদের- শ্যনন,আসিফ আর ইব্রাহিমকে। দুপুরে সবাই একসঙ্গে খেলাম । ইব্রাহিম শ্যননকে কীভাবে কৃতজ্ঞতা জানাবে যেন বুঝতে পারছিল না। ঝিনুকের গয়না, বার্মিজ কাঠের বাটি-চামচ আর ঝলমলে জড়ি পাড়ের দুটো শাড়ি উপহার হিসেবে নিয়ে এসেছিল। শাড়ি দুটোর একটা আমার জন্যে। ওর সৌজন্যবোধ আমাদের দুজনকেই মুগ্ধ করল।

আসিফ আর ইব্রাহিম চলে যেতেই আমরা ছবিগুলো নিয়ে বসি। মা কী পরম যত্নে ছবিগুলো রেখেছে! শ্যননও সাঁয় দিলো, “তিনি দারুণ কিউরেটর” ।

ছবি দুটোকে ঘিরে কেমন যেন একটা ঘোরে ঢুকে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল যা ঘটছে সবই আসলে স্বপ্ন। ঘুম ভাঙলেই ফিরে আসব এই জীবনে। শ্যননকে একথা বলতেই ও আমাকে জোরে চিমটি কেটে বলেছিল, “এটাই বর্তমান। আমরা সকলেই এক প্রাচীন কাফেলার যাত্রী, হাঁটছি তো হাঁটছিই যাত্রা ফুরোচ্ছে না। সেই অবিরাম যাত্রায় আমাদের প্রত্যেকের জীবনের অসমাপ্ত বিষয়গুলি মৃত পায়ের ছন্দ নিয়ে জেগে থাকে পরের যাত্রীর পায়ের চিহ্নে জুড়বে বলে। এই প্রবাহ চলতেই থাকে যতক্ষণ না সেইসব বিষয়ের সুরাহা হয়”। শ্যননের বিশ্বাস যে গল্পের শুরু আছে তার শেষ থাকবেই। “মাঝে মাঝে ঘুরপথে সেই শেষবিন্দুতে পৌঁছাতে হয় এই যা! আর অলৌকিক বলে কিছুই নেই। অরুণাংশু রায় আর জয়নাল শেখের মতো বেমিলে হুবহু মিল পেলেও নয়।এরা শাড়ির কুঁচির নক্সার মতোই মিল-মিল ঘটনা কেবল, যুক্ত না-থেকেও সমপাতন যাকে বলে” ।


ছবির কথা

শ্যননের মতো যুক্তি দিয়ে অবাককে সবাক করার বুদ্ধি আমার নেই তবে ওর সেই “প্রাচীন কাফেলার যাত্রী”র ভাবনাটা আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি। যেসব চিহ্ন এতকাল আমার দৃষ্টির অগোচরে ছিল তার প্রায় সবই বড় অদ্ভুতভাবে আমার সামনে হাজির হচ্ছে। শ্যনন এইসবে কিছুই অস্বাভাবিক দেখছে না, ওর ভাষায় দেখতে চাইলেই মন লাগাতে হয় চোখে আর তখনই চোখ চক্ষুষ্মান হয়। “মাইন্ডফুলনেস ডিয়ার”, ও আমার কাঁধে চাপড় দিয়েছিল, “যা তুমি খুঁজছ তাকে মন দিয়ে খুঁজলেই পেয়ে যাবে। ইচ্ছের তীব্রতার টান মহাকর্ষ-অভিকর্ষ সকল আকর্ষণ বলের চেয়ে প্রবল”। মন লাগিয়ে দেখার কথা তিনিও বলেছিলেন। এ-ও কি কাকতালীয়!

তবে শ্যননের বিশ্লেষণ ক্ষমতা দারুণ- যে ছবি নিয়ে তাঁর ফিরে আসার নতুন গল্প তৈরি হয়েছিল ছবিটা না-দেখে কেবল গল্প শুনেই ও রায় দিয়েছিল, উনি আসলে আসেননি। দ্বিতীয় কেউ আছে এর পেছনে। এবং ছবিটা হাতে পাওয়ার পরে চোখের সামনে আঙুল দিয়ে ও অসামঞ্জস্যগুলো তুলে ধরছিল। আমি কেন দেখলাম না? কিংবা মা বা অন্যেরা? শ্যননের উত্তর তৈরি: “ছবিটা যারা দেখছিল তারা ভরাট জায়গাটা দেখছিল কীভাবে ভরলো তার রহস্য খুঁজছিল না। আর আমি ছবি দেখছি না ভরাটের রহস্য খুঁজছি। আমার দৃষ্টি কেবল এই একটি জায়গায় আলো ফেলেছে। তোমাদের দেখার ক্যানভাস বড়, মনোযোগ নয়। আসলে আমাদের দুই পক্ষের উদ্দেশ্য ভিন্ন, এটা মাথায় রাখলেই সবই লৌকিক মনে হবে”। ও হাসতে হাসতে বলেছিল, “তুমিও দেখবে এখন আর সূর্যমুখির দোল দেখছ না দেখছ বিষম রঙ এবং কাঁচা হাতে আঁকা প্রজাপতি। আর এই বেমিলগুলো সর্বনাশ করবে তোমার- ছবিটাকে আর আগের মতো ভালো লাগাবে না। বরং ঐ ন্যাতানো ফুলের ছবিটা মাস্টারপিস হয়ে যাবে। যাই বল ভদ্রলোক দারুণ রসের। দেখা হলে যত বয়সই হোক আমি ঝুলে পড়ব”।আমি হেসে বলি, “আমিও”। ও হাসতে হাসতে বলে, “ঘাড় মটকেই মরে যাবে তবে”। আমি বলি, “স্বতঃস্ফূর্ত মৃত্যু”।

মায়ের জন্যে আঁকা ছবিটা আমার বিছানায় পেতে প্রায় কুড়ি মিনিটের মতো একভাবে তাকিয়ে ছিল শ্যনন। এরপর সিগারেটের ছাই আধখাওয়া কফির কাপে ঝাঁকিয়ে বলল, “এটা একটা রোমান্টিক ছবির গল্প হতে পারে। আমি কোনো একদিন সিনেমা বানাব এই গল্প নিয়ে। মিসেস ডাট্টা নিশ্চয় আমাকে অনুমতি দেবেন। আসলে নেতিয়ে পড়া ফুলের তোড়াটাই ছিল তাঁর মূখ্য ছবি। তোমারটা নিয়ে হৈচৈ করছ, ওটা কিন্তু ফাউ। এই একটা ছবি কত কী বলছে দেখ”। আমিও ঝুঁকে দেখতে থাকি। ত্রিশ বছর আগে আট বছরের বালিকাটির এই ছবিটা দেখে মনে হয়েছিল ফুলগুলি হয়রান হয়ে গেছে। ঠিক এই শব্দটাই মনে এসেছিল, ‘হয়রান’। মায়ের মুখে এই শব্দটাই শুনতাম । রাতে যখন অবশেষে আমাদের পাশে মা আসতো তখন নিজের চুলটা বাঁধারও যেন শক্তি থাকতো না। বিছানায় গা এলিয়ে মা যেন নিজেকেই শোনাতো কিংবা বাবার কাছে ছুটির আর্জি করতো অলক্ষ্যে, “হয়রান হয়ে গেলাম রে!”। আমাদের পরিপাটি বাবা তখন পাশের খাটে অপেক্ষায়, কবে মা আমাদের ঘুম পাড়িয়ে যাবে তাঁর পাশে। আমার চোখ জ্বলতে থাকে। এখন বুঝি সেটিও ছিল দায়িত্ব, ভালোবাসার টান নয়।সবার মন রক্ষা করে চলাই যেন ছিল মায়ের জীবনের ব্রত। এখনও তাই-ই করছে।

শ্যনন ছবিটা আমার দিকে ঘুরিয়ে পাতে। আঙুল রাখে পাপড়িতে, “দেখ ফুলগুলোর বাইরের কিনারায় খয়েরি ছোপ ভেতরটা অতটা ম্রিয়মান নয়। তোমার মা মানে সেই কিশোরি যাকে তিনি আবৃত্তি শিখিয়েছেন, যিনি নাচে পুরস্কার পেয়েছিলেন ছেলেবেলায়, যাঁকে আঁকা নিয়ে তোমাদের সামনেই মজা করেছেন তার সবই আসলে এক গভীর বেদনার প্রকাশ। পরে এই ছবিতে হারানো মেয়েটাকে জাগাতে চেয়েছিলেন। এত কিছুর পরেও মেয়েটা নিজের ভেতরের সেই “আমি”টাকে সজীব রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে এই সত্য তিনি দেখতে পেয়েছিলেন হয়তো”, শ্যনন যখন বলছে আমি এক অদৃশ্য পর্দায় দেখছি ছায়াছবির মতো ছুটছে দৃশ্য- সেই কিশোরী পায়ের নুপূর খুলছে। চোখের কাজল ভুলছে। গলার গান উবে যাচ্ছে সিঁথির সিঁদুরের লালে। অতঃপর সে নিজের স্বপ্নের ডানা কন্যার পিঠে বসাচ্ছে। প্রাণপণে চাইছে কন্যা বাঁচুক খোলা আকাশে। আর নিজের ছায়ার ভেতরে গুটিয়ে যেতে যেতেও দুহাতে ঠেলছে বিষণ্নতার মেঘ। মুখে বললাম, “মা বলেছিলেন উনি নিজের মুখেই বলেছেন মায়ের বিয়ের দশ বছর বাদে বাসি উপহার দিচ্ছেন- সেটাই হয়তো এই ন্যাতানোর ব্যাখ্যা”। ছবির পেছনের লেখা আছে কিছু। শ্যনন উল্টে দেখায় আমাকে, টুম্পাকে বিয়ের উপহার- পথে হলো দেরি। নিচে তারিখ,২রা নভেম্বর ১৯৯০। আশ্চর্য এই ‘পথে হলো দেরি’ বাড়তি লাইনটা শুনিনি তো। বাবার রাগের কারণ কী এই লেখা? শ্যনন কপালের পাশে টোকা দিয়ে বলল, “থিংক মাই ফ্রেন্ড। মানুষ মুখের ভাষা রপ্ত করার আগে ছবি দিয়েই মনের কথা বলত। হাজার কথার চেয়ে দামী হতে পারে একটি রেখা। আমার কথা মিলিয়ে নিও। এ ছবি কেবলই ছবি নয়, এটি মেসেজ। ফুল তোড়া বেঁধে রাখলে বাঁচে না। তাজা রাখতে হলে জল চাই। ফুলের তোড়াটি কোনো সুদৃশ্য টবেও নয়, মেঝেতেও নয়- দেখ ব্যাকড্রপ নেই। স্টিললাইফ ছবিগুলোতে একটা কিছু অবলম্বন থাকে। এটা এক্কেবারে ঝুলিয়ে রেখেছে। মূল ছবির বাইরে কোনো আঁক নেই। যেন সিদ্ধান্ত তোমার। এই ফুল ফেলবে নাকি রাখবে। এখন বিষয় হলো এই ‘তুমি’টা কে?” এবার আমি হাসতে থাকি। “এটা তো এমনও হতে পারে প্রেমিক অপেক্ষায় ছিল ফুল হাতে, দেরি দেখে চলে গেছে। তোড়াটি ফেলে দিয়েছে। প্রয়োজন নেই। পথে হলো দেরি -পাঞ্চ লাইন ভুলে যেও না” । “হুম” শ্যনন আবার দেখল ছবিটা, “এই মেসেজ হলে ফুলের পঁচনের এত ডিটেইল আঁকতেন না।” আমি আবার দেখলাম। একটা কথা মনে পড়ল- খাবার টেবিলে উনি আমার ড্রইং খাতায় আঁকা সূর্যমুখি দেখে বলেছিলেন: ওটা ড্রইং, আর্ট নয়। দীর্ঘশ্বাস চেপে ভাবলাম শ্যননের চোখ আছে দেয়ালের আলোছায়ার কুহক থেকে সেও হয়তো পায়রা খুঁজে নিতে জানে।

ছবিগুলি গোটাতে গোটাতে বলি, “মা শুনলে আমাদের দুজনকেই ঝাঁটা-পেটা করতো।”

শ্যনন বলল, “ইস্‌ তোমার মায়ের সঙ্গে যদি দেখা হতো!”

সত্যি মাকে আনতে পারলে ভালো হতো। পিপ্‌লুর ছেলের স্কুলে ফাংশন। মা, বাবা না-থাকলে বাচ্চাটা মন খারাপ করবে। নইলে মাও শ্যননকে দেখতে চেয়েছিল।

শ্যনন সেইরাত আমার সঙ্গে ছিল। সন্ধ্যায় ব্যাল্কনিতে বসে এ কদিনের ঘটনাগুলো আবার ফিরে দেখছিলাম দুজনে। আকাশে কাঁসার থালার মতো ঝলমলে চাঁদ। শ্যননকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই নতুন আয়োজনে পুরোনো কাফেলায় তোমার সংযুক্তিও তবে বিনা কারণে নয়?” ও লম্বা টান দিয়েছিল সিগারেটে। চাঁদের দিকে নিখুঁত ধোঁয়ার রিং উড়িয়ে বলেছিল, “আমি কারণ না হলেও অনুষঙ্গ তো বটে। এই নাটকে আমরা সকলেই কুশীলব, নাট্যকার নই। নাটকের কোনো দৃশ্যে গড়বড় হলে তা মেরামতও হয় স্বতঃস্ফূর্ততায়। পুণঃযাত্রার শুরু ঠিক সেইখান থেকে। এই মেরামতের একটা নিজস্ব চিহ্নও থাকে। কেউ কেউ টের পায় বেশিরভাগ সময়ই ঘটনার স্রোতই ঘটনায় টেনে নিয়ে যায় আমাদের। আমি স্বতঃস্ফূর্ততায় বিশ্বাস করি, কারণে নয়।”

“আমার পূণঃযাত্রার সেই চিহ্ন তবে ‘ভ্যানগগের কান’ মানে পরের জন, জয়নাল?”

শ্যনন হেসে উত্তর দিয়েছিল, “হতে পারে”।

ওর এই শেষ কথায় আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডাস্রোত নেমেছিল। মনে হলো অরুণাংশু রায়ের হাসিখুশি চোখজোড়া কোনো আড়াল থেকে চুপচাপ দেখছে আমাদের। মাঝখানের ত্রিশ বছর কাফেলার যাত্রাপথে তিনি কি ছিলেন? না কি শ্যনন কিংবা জয়নাল হেঁটেছে তাঁর হয়ে?

রাতে ফের সর্ষে চিঙড়ি ভাতে মাখাতে মাখাতে শ্যনন হঠাৎ বলল, “তিতলী একটা উপদেশ দিই তোমাকে।এই ভ্যান গগ সিন্ড্রোম থেকে বেরিয়ে এস এবার” । “মানে”? আমি অবাক হয়ে তাকিয়েছিলাম ওর দিকে।ও কাঁটাচামচ ঘুরিয়ে চারদিকে দেখিয়ে বলল, “তোমার ঘরে সব কিছু হলুদ আর ব্রাউন। সুর্যমুখির মতো। এখানে সাদা ঢোকাও খানিক।” আমি নিজেই অবাক হলাম নিজের চারপাশ দেখে। এভাবে দেখিনি তো! দেওয়ালের রঙ আমার দেওয়া নয়। অ্যাপার্টমেন্টের মালিকের পছন্দে। বললাম, “এখানে সাদা যোগ করলে মনে হতো না শূন্যে ভাসছি? আমার উচ্চতায় অসুবিধা আছে” । বাস্তবিকই আমি পারতপক্ষে লিফট চড়ি না। প্লেনে জানালার ধারে বসি না। সেই কারণেই আসবাবপত্রে খয়েরি এনেছিলাম এই স্পেসকে সসীম করতে। ও আমার টেবিলের থালাবাটির দিকে ফের কাঁটাচামচ তুলল, “এই হলুদ?” এবার আমি চুপ। ব্যাখ্যা নেই আমার কাছে।আমি সজ্ঞানে করিনি এটুকু বলতে পারি। হলুদ আমার প্রিয় রঙ হলো ঠিক কোন বয়সে তাও তো মনে নেই। এমনকি শ্যননের সামনে যে ফতুয়া পরে বসেছি সেটিও হাল্কা হলুদ। শ্যনন চোখে হাসি নিয়ে আমাকে দেখতে দেখতেই কাঁটাচামচে চিংড়ি গাঁথে।


ফিরে দেখা

কক্সবাজারে শ্যননের ট্যুর-গাইড হওয়ার কথা ছিল যথারীতি আসিফেরই। আসিফ আমাদের প্রতিষ্ঠানে অ্যাকাউন্টসে কাজ করে। বিদেশী ক্রেতা কিংবা বিনিয়োগকারীরা এলে তাদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয় আসিফ। ইংরেজি, ফরাসী, চিনা এবং জার্মান এই চার ভাষাতেই সে চোস্ত। দুই বছর আগে শ্যননের প্রথম সফরে আসিফই গাইড ছিল। আর সেই বছরেই আমি ‘স্বপ্নে’র রিসাইক্যালড পেপার গুডস বিভাগের সহকারি প্রোডাকশন ম্যানেজার হিসেবে যোগ দিয়েছিলাম। শ্যনন তখন সুইডেনের এক বিজনেস ম্যাগাজিনের জন্য স্বপ্নের ওপর প্রতিবেদন তৈরির কাজে এসেছিল বাংলাদেশে। সুইডেন আমাদের অন্যতম গ্রাহক। আমাদের দেশে “স্বপ্ন”ই সর্বপ্রথম পুনঃব্যবহারযোগ্য কাগজ,কাপড়, সুপুরির খোল আর কলার খোলের আঁশ থেকে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী উৎপাদন শুরু করেছিল। আমাদের মূল কারখানা যশোরে। এই যশোর থেকেই সাত বছর আগে মাত্র চার জন কর্মচারী নিয়ে আসমা খান এই প্রতিষ্ঠানের যাত্রা শুরু করেছিলেন । এখন ‘স্বপ্ন’ প্রায় তিন হাজার কর্মচারীর রুটিরুজির সংস্থান করছে ।

সেবার প্রজেক্টের কাজ সরেজমিনে দেখে আসার জন্যে আসমা আপা ওদের সঙ্গে আমাকেও পাঠিয়েছিলেন। অপারেশন ম্যানেজার নাঈম সাহেব গিয়েছিলেন ব্যবস্থাপকদের তরফ থেকে। আমাদের বিমানে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শ্যননের অনুরোধে সময়সাপেক্ষ হলেও সড়কপথেই যশোর যাওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। শ্যনন ওর ব্যক্তিগত ট্রাভেল-ভ্লগের জন্য বাংলাদেশ সফরের ভিডিও করছিল । শ্যননের কারণে সেই যাত্রা দীর্ঘ হলেও আমরা বেশ উপভোগ করেছিলাম; নিজের দেশটা যেন নতুন চোখে দেখছিলাম । খানিকক্ষণ পরপর থামছিলাম আমরা। নাঈম সাহেবের আর্থ্রাইটিস। উনি এই ফাঁকে খানিক সময় হেঁটে পায়ের মাসলের জট ছাড়াচ্ছিলেন। নাঈম সাহেব একাত্তরে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁর কাছ থেকে আমরা সেইসব যুদ্ধদিনের গল্পও শুনছিলাম। যশোরে ঢুকতেই আসিফ, মৌসুমী ভৌমিকের ‘যশোর রোড’ বাজানো শুরু করেছিল। বাংলাদেশের উত্থান নিয়ে বেশ পড়াশোনা করে এসেছিল শ্যনন। অ্যালেন গিন্সবের্গের যশোর রোডও শুনেছিল সে। আসিফের বয়ানে মৌসুমীর যশোর রোড এর তর্জমা শুনতে শুনতেই মুক্তিযুদ্ধ এবং একটা বিধ্বস্থ রাষ্ট্রের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রামাণ্যচিত্রের পরিকল্পনাটা ওর মাথায় আসে।

নাঈম সাহেব শুনে প্রস্তাব করেন কাজ শেষে সবাই মিলে বেনাপোল সীমান্ত ঘুরে আসা যেতে পারে। তিনি আসমা আপাকে ম্যানেজ করবেন। শ্যননের মতো সেটি আমারও ছিল প্রথম যশোর সফর। খুবই আনন্দ হচ্ছিল এক ঢিলে দুই পাখি মারব ভেবে। কিন্তু এপ্রিল মাসের শেষদিকের উথালপাথাল বৈশাখী ঝড়ের খপ্পরে পড়ে আমাদের শেষ দুই দিন হোটেলেই কাটাতে হয়। তবে এই দুদিনেই শ্যননের সংগে আমার বেশ বন্ধুত্ব হয় এবং পরের দুই বছরে হোয়াটস-অ্যাপ আর সামাজিক মাধ্যমের কল্যাণে তা আরও গাঢ় হয়েছে।

দুই বছর পরে এবার বাংলাদেশে নেমেই শ্যনন যশোরে ছুটেছিল। ও মজা করে বলেছিল, “রিস্কে নেই আমি আর। তোমাদের আনপ্রেডিক্টেবল কান্ট্রি, আনপ্রেডিক্টেবল পিপল, অ্যান্ড আনপ্রেডিক্টেবল মাদার ন্যাচার”। কক্সবাজারে এসেও আবার সেই আনপ্রেডিক্টেবল সমস্যায় পড়েছিল সে। যশোরে ওর গাইড হিসেবে আসিফই গিয়েছিল। শ্যনন অবশ্য একাই যেতে চেয়েছিল কিন্তু আসমা আপা ওর নিরাপত্তার ঝুঁকিতে যেতে চাননি। যেহেতু তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদনের কাজে মূলত ওর আসা, ওর নিরাপত্তা স্বপ্নের দায়িত্ত্বে পড়ে। তাছাড়া স্বপ্নের উত্থান নিয়েও কথা থাকবে জেনে আসমা আপা শ্যননের এই ব্যক্তিগত তথ্যচিত্র নির্মাণের জন্য সার্বক্ষনিক গাড়ির সুবিধা দিয়েছেন । শ্যননের সংগে আসমা আপার সম্পর্কও কাজ ছাপিয়ে ব্যক্তিগত হয়ে গেছে এই ক’বছরে। কারণও আছে- দুই বছর আগের শ্যননের করা সেই প্রতিবেদনের সূত্রেই স্বপ্নের উৎপাদিত সামগ্রীর ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল ইউরোপের দেশগুলোতে এবং সুইডেন ছাড়াও অন্তত দুটি দেশ স্বপ্নের পাটের পুতুলের গ্রাহক হয়েছে। এর পরেই শ্যনন সেই বিজনেস ম্যাগাজিনের কাজ ছেড়ে দিয়ে নারীদের ফ্যাশন এবং জীবনযাত্রা বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘অ্যাল’ এর সুইডিশ সংস্করণের প্রদায়ক হিসেবে যোগ দেয়। ও এবার এসেছে ‘অ্যাল’ ম্যাগাজিনের দক্ষিণ এশিয়ার নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে প্রতিবেদন তৈরির কাজে । দু’বছর আগের অভিজ্ঞতার সূত্রেই শ্যনন এবারেও বাংলাদেশ অংশের দায়িত্ব পেয়েছে। এবং বুদ্ধিমতি শ্যনন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠাতা আসমা খানকেই ওর প্রতিবেদনের বিষয় করেছে। এই কাজের জন্যেই গত দুই মাস ধরে সে বাংলাদেশে ছিল। অ্যালের অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে ফাঁকে ওঁর সেই তথ্যচিত্রের জন্য মুক্তিযুদ্ধের নানা স্থাপনা এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করেছিল। এই কাজে ছুটির দিনে ঢাকা শহরের ভেতরে কোথাও গেলে মাঝে মধ্যে আমিও শ্যনন,আসিফের সঙ্গী হয়েছি।

কিন্তু কক্সবাজারে শ্যননের সফরে আমার অন্তর্ভুক্তি ছিল কাকতালীয়। আসিফের মায়ের কিডনিতে টিউমার ধরা পড়ায় মাকে নিয়ে আসিফকে জরুরিভিত্তিতে ভেলোরে যেতে হয়েছিল। সত্যি বলতে কী এই সময়ে আমি স্টেশন ছাড়তেই চাইছিলাম না, কেন না সেই সপ্তাতেই রিসাইকেল্ড গুডস সেকশনের কার্ডবোর্ড বাক্স আর পেপারটাওয়েলের একটা বড় চালান যাওয়ার কথা আমেরিকায়। নর্থ আমেরিকায় এটাই আমাদের প্রথম চালান। এই কোম্পানিতে দু’বছরের চাকরিজীবনে এই কাজটি সম্পুর্ণ আমার তত্ত্বাবধানেই হয়েছে। আমি চাইছিলাম প্যাকেজিং এবং শিপমেন্টের সময় সশরীরে থাকতে। তাছাড়া চট্টগ্রামে জন্ম হলেও কক্সবাজারে আমি একবারই গেছি । সেও প্রায় কুড়ি বছর আগে, কলেজে পড়ার সময়। গাইড হওয়ার মতো জ্ঞান নেই আমার। আরও বাজে ব্যাপার হলো চাটগাঁর ভাষা আমি ভালো বুঝলেও ভালো বলতে পারি না । আমার বিশ্বাস আসিফের বিকল্প হিসেবে নয় শ্যননের সংগে আমার বন্ধুত্বের কারণেই আসমা আপা খুব সম্ভব আমাকে অনুরোধ করেছিলেন।

কক্সবাজারে শ্যননের দুই দফায় কাজ করবার কথা। মোট পাঁচ দিনের কার্যক্রম। রোহিংগা শরনার্থীদের এদেশে জীবনসংগ্রাম এবং বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় এই অতিরিক্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিফলন দেখাতে কক্সবাজারকে ওর তথ্যচিত্রে সংযুক্ত করেছে। প্রথম দফায় স্থানীয় জনগণের সঙ্গে কথা বলে রোহিংগা শরনার্থীদের প্রতি স্থানীয়দের মনোভাব এবং পরের দফায় শরনার্থী-শিবিরে গিয়ে সরেজমিনে শরনার্থীদের জীবনযাত্রার মান এবং তাদের মুখে তাদের সংগ্রাম শোনার পরিকল্পনা ছিল ওর। কিন্তু দ্বিতীয় পর্বের জন্য অনুমতি জোগার করা সম্ভব হয়নি। ইউনিসেফের স্থানীয় একজনের সংগে কথা বলে ভেতরের সহযোগিতার আশ্বাস পেলেও মন্ত্রনালয়ের অনুমতি মেলেনি। আসমা আপা ভরসা দিয়েছিলেন ব্যবস্থা হয়ে যাবে। রোহিংগা ইস্যু বাংলাদেশের জন্য এক অস্বস্তিকর ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইদানিং সরকারি মহল থেকে অনুমতি জোগাড় করা কঠিন হয়ে উঠেছে। শ্যনন নিজেও মন্ত্রনালয়ে বেশ কবার ধর্ণা দিয়েছিল। ওর বাংলাদেশে থাকার সময় বাড়ানো সম্ভব নয়। আসার আগেই ও যে ধারণা নিয়ে ওর স্কেজ্যুল তৈরি করেছিল অনুমতির গেঁড়োতে পড়ে কাজটা ওর পরিকল্পনা মতো হবে কি না তা নিয়ে আমিও শ্যননের মতো সংশয়ে ভুগছিলাম । তবে শ্যননের কাছে আমার ভাষাজনিত অস্বস্তির কথা শুনে কক্সবাজারে আসার ঠিক আগের দিন ভেলোরে বসেই আসিফ ইব্রাহিম নামের স্থানীয় এক যুবককে আমাদের সাহায্য করবার জন্য ঠিক করে দিয়েছিল। ফলে কক্সবাজারে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলা কিংবা শিবিরে কাজ করার অনুমতি পেলে সেখানেও কথোপকথনে ভাষাজনিত জটিলতার দুশ্চিন্তা দূর হয়েছিল।


* সূর্যমুখি এবং

প্রথম পর্বের প্রায় পুরো কাজ তিন দিনে শেষ হয়ে গিয়েছিল। শেষ দুই দিন তোলা ছিল রোহিংগা শিবিরের ভেতরের জন্য। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি তখনো আসেনি। বিকল্প হিসেবে ইব্রাহিম একজন রোহিংগা রিক্সাওয়ালার খোঁজ দিয়েছিল কিন্তু স্থানীয় কাউকে বিয়ে করে সে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছে,মায়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই নেই তার। টাকার টোপ দিয়েও ক্যামেরার সামনে তাকে কিছু বলতে রাজি করানো গেল না।

তৃতীয় দিনেই লোকটাকে দেখেছিলাম । ভোরের আলো ফোটার আগেই শ্যনন ইব্রাহিমকে নিয়ে হিমছড়িতে গিয়েছিল ভিউপয়েন্ট থেকে সূর্যোদয়ের দৃশ্য তুলবে বলে। আমি যাইনি। আমার ডান হাঁটুর লিগামেন্ট ছেঁড়া, পাহাড় বাইতে পারি না। শ্যনন চলে গেলে আমি আরও খানিকক্ষণ শুয়ে ছিলাম। কটেজের জানালার কাচ চুঁইয়ে আলো বিছানায় লাফাতেই আমি উঠে পড়লাম। কটেজ থেকে সৈকত পাঁচসাত মিনিটের পথ। ভোরের হাওয়া নিতে বেরিয়ে পড়লাম। জলের ধার ধরে হাঁটছিলাম। তিন-চার জোড়া অল্পবয়েসী যুগল ছাড়া তেমন কেউ নেই। লোকটাকে দেখে আমি মনে মনে বললাম, জানো কি ফাঁকা সৈকতে আমরা দুজনেই বেজোড়? সে একমনে বালি দিয়ে কিছু বানাচ্ছিল। প্যান্টের এক পা হাঁটুর ওপর ভাঁজ করে গোটানো, খালি গা। চুল দাঁড়িতে হৈচৈ অবস্থা। ভবঘুরে টাইপ। আমি একটু দূরে দাঁড়িয়ে দেখছিলাম কী অবিশ্বাস্য দ্রুততায় হাত চলছে তার। আধঘণ্টার মধ্যেই এক মৎস্যকন্যা বালি ফুঁড়ে জেগে উঠল! এতো দ্রুত সে বালি থাবড়ে জড়ো করছিল আর পাতছিল যে শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুঝবার জো ছিল না ঠিক কী তৈরি হচ্ছে। কাজ শেষ হতেই লোকটা খানিকক্ষণ তাকিয়ে রইল নিজের সৃষ্টির দিকে। আমি ভালো করে দেখবার জন্য এগিয়ে গেলাম। লোকটা মাথা ঘুরিয়ে আমাকে দেখল। এরপর হনহন করে পাড় ধরে উল্টো দিকে হেঁটে চলে গেল । আশেপাশে যুগলেরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত। কেউ কেউ ছবি তুলছে। মনটা ভারী হয়ে গেল আমার। আহা কেউ টের পেলো না কী এক অসাধারণ শিল্পকর্ম সৃষ্টি হলো ওদের চোখের সামনেই। দেখলাম ঢেউ ছুঁয়ে দিচ্ছে মৎস্যকন্যার চুল। খানিক পরেই ধুয়ে যাবে সব।আমি ঝটপট বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম।

বিকেলে শ্যনন কটেজে ফিরলে ওকে দেখিয়েছিলাম ছবিগুলো । কী নিখুঁত কাজ! মৎস্যকন্যার লেজের প্রতিটি আঁশ এমন করে ফুটে আছে যেন হাতে নয় ছাঁচে গড়া। শ্যনন বিশ্বাসই করতে চাইছিল না যে কেবল দুই হাত দিয়েই লোকটা এই কাজ করেছে। বিকেলে আমরা লোকটার খোঁজে গিয়েছিলাম সৈকতে। বেশ অনেকক্ষণ ছিলাম কিন্তু লোকটার হদিস পেলাম না। পেলাম চতুর্থ দিন।

রোহিংগা ক্যাম্পে যাওয়া সংক্রান্ত অনুমতির কোনো হিল্লে হয় নি। আসমা আপা নিজেও বিরক্ত। যার মাধ্যমে চেষ্টা করছেন সে ব্যক্তি তখনও আশ্বাস দিয়েই যাচ্ছে । শ্যনন এতসব শুনেও হাল ছাড়তে চাইছে না, না হয় আরও দু’দিন দেখি। আসমা আপা আপত্তি করলেন না। এবং আমাকে আশ্বস্ত করলেন এই বলে যে আমার নর্থ আমেরিকায় শিপমেন্টের কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবেই চলছে।

সেইদিন সারা সকাল শ্যনন “অ্যালে”র প্রতিবেদনের সম্পাদনার কাজ করল। অনুমতি জোগাড় হলে আমাদের বিকেলেই ফেরার কথা। আমি নয়নতারা সায়গলের ‘রিচ লাইক আস’ বইটার শেষ ক’পাতা পড়ে ফেললাম। শ্যনন তখনও ল্যাপটপের ওপর ঝুঁকে আছে। এগারোটার পরে শ্যনন হাই তুলতে তুলতে বলল, “আসমা খানের ফোনের অপেক্ষায় বসে থেকে তো গাছ হয়ে গেলাম, চল বেরোই। কিছু কেনাকাটা করে আসি বার্মিজ মার্কেট থেকে।” আমাদের ভাড়া গাড়ি কটেজের সামনেই থাকে সকাল নটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত। ইব্রাহিমকে ও বিকেলে আসতে বলেছিল। এখন ফোন দিলে আসতে আসতে আরও আধঘণ্টা। আমি প্রস্তাব দিলাম আমরা বার্মিজ মার্কেটে চলে যাই বরং ইব্রাহিম আসুক ওখানে। শ্যনন মানল। ইব্রাহিম বার্মিজ মার্কেটে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হলো। ইব্রাহিম থাকাতে দামাদামি করতে সুবিধা হলো আমাদের। শ্যনন ওর সুইডেনের বন্ধু-স্বজনদের জন্যে ঝিনুকের গয়না আর কাঠের ছোট ছোট স্মারক কিনল। আমিও ভাইয়ের বৌ আর মায়ের জন্যে টুকটাক কিনলাম। পেটে ছুঁচো চরছে আমার। দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে গেছে বেশ আগে। ইব্রাহিমেরও হয়তো একই দশা সে বেচারা মুখ ফুটে বলতে পারছে না । আশেপাশে ভালো খাবার হোটেল কোনটা জিজ্ঞেস করতে ইব্রাহিম খুব লাজুক গলায় জানাল যদি আমাদের আপত্তি না থাকে তবে আমরা ওর বাড়িতে খেতে পারি, ওর বাড়ি কাছেই। কিন্তু বলা নেই, কওয়া নেই ওভাবে কারো বাড়িতে যাওয়া যায়? শ্যননকে তর্জমা করে বলতেই ও এক পায়ে খাড়া। স্থানীয়দের বাড়িতে খাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করবে না কিছুতেই এবং ইব্রাহিমকে উল্টে বলল ওর কোনো আপত্তি নেই যদি ইব্রাহিম ওর বাড়িতে কাটানো সময়টা ভিডিও করতে দেয়।

ইব্রাহিমের বাড়ি আসলেই বার্মিজ মার্কেটের কাছেই। ওর বৌ খুব গোছানো মেয়ে। বছর খানেকের একটা ফুটফুটে বাচ্চা আছে ওদের। আম্রীন নাম। আমরা কিছুই নিয়ে যাইনি। শ্যননের এ নিয়ে কোনো বিকার নেই । আমিই দুজনের নাম করে কিছু কিনে দিতে টাকা গুঁজে দিলাম বৌয়ের হাতে। ইব্রাহিমের বৌয়ের হাতে জাদু আছে। আমরা আসবো জানতো না। রূপচাঁদা মাছ আর ডাল রেঁধেছিল বরের জন্য। দুবেলার রান্না। দিব্যি চারজনকে হয়ে যায় কিন্তু এত কম পদে সে আমাদের আপ্যায়ণ করবে না। ও আমাদের সামনেই রান্নাঘরের ঝাঁকা থেকে ঢেড়স বার করল। হাঁসের ডিমও । ইব্রাহিম কোন ফাঁকে বেরিয়ে ঠান্ডা কোক আর চিঙড়ি নিয়ে এলো আমরা টেরই পেলাম না। আমি ওর বৌকে বললাম, “ ইস্‌ তোমার দুবেলার খাবারেই ভাগ বসালাম, কাজ বাড়ল”। সে মিষ্টি হেসে জোরে মাথা নাড়ল। জানাল ওরই সৌভাগ্য আল্লাহ ওর বাড়িতে আমাদের রিজিক নির্দিষ্ট করেছেন। কথাটা এতই ভালো লাগল আমি শ্যননকে তক্ষুনি তর্জমা করে বললাম। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের জীবনদর্শন এমনই, অনুরোধ করলাম এই কথাটা ভিডিওতে যেন সে অবশ্যই রাখে। শ্যনন আমার কথা শুনল। ইব্রাহিমের বৌয়ের চটজলদি রান্নার আয়োজন যত্ন করে ভিডিও করল। ডিম ভাজার পরে ঢেড়স-চিঙড়ি বলে অমৃতসমান পদটি শ্যননের ভিডিওর জন্যে ও এমন চৌকসে মুখে বলে বলে প্রতিটি ধাপ দেখাল যে টিভিতে প্রচারিত যে কোনো রান্নার অনুষ্ঠান ওর কাছে ম্লান হতে বাধ্য। ক্যামেরার সামনে ওর কোনো জড়তাই নেই। মজার কি ও চাটগাঁর ভাষাতেই কথা বলছে কিন্তু ওর প্রাণবন্ত অভিব্যক্তি ভাষার সীমাবদ্ধতাকে হটিয়ে দিয়েছে। মাদুরে খাবার পরিবেশনটাও দারুণ ছিল, অনাড়ম্বর অথচ মমতামাখা। শ্যনন খুটিনাটি সবই ভিডিও করল। এবং তার মুখ দিয়েই রিজিক সংক্রান্ত কথাটাও কায়দা করে বলিয়ে নিলো ।

বেশ ভালোই খেয়েছিলাম দুজনেই। যা পারি তার চেয়ে বেশি। শ্যনন সরাসরি কটেজে ফিরতে চাইল না। একটু হেঁটে না নিলে সব গায়ে লেগে যাবে!কটেজের কাছে গাড়ি ছেড়ে আমরা সৈকতের দিকে পা বাড়িয়েছিলাম। সূর্য চলছিল আমাদের সঙ্গে তবে পশ্চিমমুখি তাই তেজ ছিল না তেমন। চারটে বাজে প্রায়। শ্যনন ছবি তুলতে তুলতে এগোচ্ছিল। আমি একটু পিছিয়ে হাঁটছিলাম। হঠাৎ কোত্থেকে এক ঝাঁক নানা বয়েসী কিশোর কিশোরী শ্যননকে ঘিরে ফেলল। একসুরে বিনবিন করতে লাগল- জুতো রাখবে ওরা। “ডলার ডলার”, দুই হাতের পাতা খুলে দশ আঙুল দেখাতে দেখাতে বলছে সবচে’ ছোটো জন।শ্যননকে দেখলে এমন হয় রোজই কিন্তু সেই বাচ্চাগুলো বেশ নাটুকে। শ্যনন ওদের কাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে নুইয়ে পড়ছে। আমরা জলে নামবো না, জুতো খুলবো না- আমি বললাম। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলাম নজর টানল শ্যননের বাম দিকে। সেই লোকটা! কোনো ভুল নেই। শ্যননের সামান্য দূরেই উবু হয়ে কিছু বানাচ্ছে আমি শ্যননকে দেখানোর আগেই শ্যনন দেখে ফেলেছে। প্রায় চেঁচিয়েই জিজ্ঞেস করল, “দ্যাটস হিম রাইট?” আমি উত্তর না নিয়ে এগোতে থাকলাম, আমার আগেই শ্যনন। হ্যাঁ সে-ই।

শ্যনন হঠাৎ বাচ্চাগুলোর দিকে ফিরে বলল, “টাকা দেবো যদি কথা শোনো”। আমি বুঝে গেলাম শ্যননের পরিকল্পনা। শ্যনন ভিডিও করতে চায় লোকটার কাজ। বাচ্চাগুলো দর্শক হয়ে ছড়িয়ে দাঁড়াবে। কী ভেবে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “তুমিও”। আমি মাথা নেড়ে অস্বীকৃতি জানালাম, ‘আমায় টেনো না” আমার তর্জমার আগেই বাচ্চাগুলো যেন বুঝে গেল শ্যননের প্রস্তাব। ঢ্যাঙা মতো ছেলেটাই ওদের সর্দার। ও চাটগাঁর ভাষায় আমার দিকে তাকিয়ে তথ্য দিলো, “ছবি তুললে ২০ টাকা আর ভিডিও করলে ৩০ টাকা”। ওর বলার ভঙ্গি দেখে হাসি চাপা দায়। আমি যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে বললাম, “দশ টাকা করে পোষালে দাঁড়া নয়তো সরে যা”। বাচ্চাগুলো বেশ সেয়ানা। বিশ্বায়নের হাওয়ার গতি ওরা রপ্ত করে নিয়েছে : টাকা ছাড়া কথা নেই। ওরা সরলো না গাঁট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শ্যনন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে জানতে চাইল। আমি ছেলেটাকে বাদ দিয়ে বাচ্চাগুলোকে বললাম, “সবাইকে দশটাকা করে দেবে। দশ মিনিট দাঁড়াবে”।বাচ্চাগুলো দলনেতার দিকে তাকিয়ে রইল, নড়ল না। আমি শ্যননকে বললাম, “চল দর্শক বাদ। তুমি লোকটার কাজের ভিডিও কর। ‘একাকী মগ্ন শিল্পী’ ক্যাপশন”। শ্যনন মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, “ সেটা বোঝাতেই তো চারপাশের হৈচৈয়ের প্রতীক হিসেবে এদের দাঁড় করাতে চাইলাম”। আমি হাঁটতে থাকলাম জবাব না দিয়ে। শ্যননও লং শটে লোকটার ভিডিও করতে করতে এগোতে থাকল। এবার ছেলেটা এগিয়ে এসে আমাকে বলল ১৫ হলে করবে। আমি বললাম দশ টাকার বেশি একপয়সাও দেবো না। আমরা লোকটার কাছে যাওয়ার আগেই বাচ্চাগুলো পৌঁছে গেল। শ্যননের নির্দেশনায় দুপাশে দুই কোণে জ্যামিতিক সামঞ্জস্যে দাঁড়িয়েও পড়ল। ব্যাপারটা আমার বড় বেশি সাজানো মনে হচ্ছিল। লোকটার শিল্পকর্মে যে ওদের কোনো কৌতূহল নেই তা ওদের শরীরের ভঙ্গিতেই ধরা যাচ্ছে। শ্যনন হয়তো এডিট করে পরে এতে স্বতঃস্ফূর্ততা আনতেও পারে, আজকাল সবই সম্ভব।

এইসব এলোমেলো ভাবতে ভাবতে লোকটার কাজ দেখছিলাম। লোকটা ঠিক কী বানাচ্ছে সেদিনের মতোই বুঝতে পারছিলাম না। তেজহীন সূর্য আমাদের ছেড়ে এবার আসন পেড়েছে ঠিক ওর মাথা বরাবর। ওর দুই হাতের ওঠানামায় হঠাৎ পাতার ওপরে শিরা-উপশিরার নিখুঁত বিন্যাস ভেসে উঠতে দেখে আমার টনক নড়ল, আমি মনোযোগী হলাম এবং খানিক পরেই অবাক হয়ে দেখলাম বালি ফুঁড়ে জেগে উঠছে সূর্যমুখির ঝাড়। আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। আমি শ্যননের পেছন থেকে অজান্তে বেরিয়ে এলাম। শ্যনন লোকটার হাতের উপর ক্যামেরা জুম করতে করতে ইতোমধ্যে বাঁদিকে সরে ওর মুখের কাছে প্রায় ঝুঁকে ভিডিও করতে শুরু করেছে । লোকটার বাঁ হাতই চলছে বেশি ডান হাতে সে কেবল বাড়তি বালি সরাচ্ছে কিংবা টানছে। ক্যামেরা লোকটার মুখের দিকে তাক করেই শ্যনন অস্ফুটে বলে উঠল, “হোয়াট দ্য ফাক!” শ্যননের আশ্চর্য হওয়া কিংবা বিভোর হওয়া এমনকি রেগে যাওয়া, সবেতেই ‘ফাক’। কিন্তু উল্‌টো দিকে দাঁড়ানো আমিও মনে মনে ওর কথারই পুনরাবৃত্তি করলাম, এমন মিল কীভাবে সম্ভব! লোকটা মাথা তুলে যেন চমকে তাকাল। শ্যনন তখনও ওর ক্যামেরা তাক করে ঝুঁকে আছে। লোকটার নাকের পাটা বুনো মোষের মতো ফুঁসছে। ওর শরীরের ভঙ্গি দেখে মনে হলো এক্ষুনি লাফিয়ে টুঁটি চেপে ধরবে শ্যননের। আমি ছুটে শ্যননকে সরানোর আগেই লোকটা এক টানে ওর হাতের ক্যামেরাটা কেড়ে নিল। হতবিহ্‌বল শ্যনন সাম্য রাখতে না পেরে চিৎ হয়ে পড়ে গেল সুর্যমুখির পাপড়ির ওপরেই। লোকটা ক্যামেরাটা উলটো দিকে ছুঁড়ে দিলো এবং সেই সূর্যমুখির ঝাড় মাড়িয়ে আমার পাশ ঘেঁষে বালিয়াড়ির ধার ধরে ছুটে উপুড় করে রাখা জেলে নৌকাগুলোর আড়ালে মিলিয়ে গেল! বাচ্চাগুলো শ্যননের পড়ে যাওয়া দেখে হেসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি শ্যননকে তোলার জন্যে হাত বাড়াতে ভুলে গেছি। আমার মাথার ভেতর কোথাও কেউ মন্ত্রপাঠের মতো আওড়ে যাচ্ছে, “ একে বলে মাইক্রোশিয়া”।

আমি উল্টো হেঁটে পৌঁছে গিয়েছিলাম আদিবিন্দুতে। মাঝখানের ত্রিশটা বছর কুঁচকে মিলে গেল যেন বর্তমানে!

আমাকে লোকটার গতিপথের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বাচ্চাদের একজন বিজ্ঞের মতো তথ্য দেয় জেলে পাড়ার পেছনে ছড়ার দিকে গেলে পাওয়া যেতে পারে।আরেকজন মাথা নেড়ে বলে না, মতিন মিস্ত্রির ডিপোতে গেলে দেখা মিলতে পারে। হঠাৎ করে সূর্যের পায়ে চাকা লাগল যেন। দ্রুত আলো কমতে লাগল। আমার মাথার ভেতর হাঁতুড়ি চলছে। শ্যননকে বলি, “চল ফিরি”। আমার কথা শেষ না হতেই বাচ্চাগুলো হঠাৎ মারমুখী জনতার মতো ঘিরে ফেলল শ্যননকে। আমরা ইংরেজিতে কথা বলছি, কিন্তু ওদের মুখ থেকে শৈশব উড়ে গেল পলকে। চোখে শত জন্মের রাগ নিয়ে হাত বাড়িয়ে আছে যেন সকলে।

শ্যনন ওর ক্যামেরা ঠিক আছে কি না পরীক্ষা করছিল। বাচ্চাগুলোর হৈচৈ এবং খানিক আগের ঘটনা সব মিলে হয়তো মেজাজ বিগড়ে গিয়েছিল ওর। এই কয়েক মিনিটের জন্য প্রত্যেককে দশ টাকা করে দিতে সে অস্বীকার করল। আমার বিষয়টা পছন্দ হলো না সময়ের হিসেবে কম কিন্তু ওদের দোষ কি তাছাড়া শ্যননের জন্য বেশি কিছু তো নয়। ভাষার ভিন্নতা সত্ত্বেও বাচ্চাগুলো জোর গলায় তর্ক করে যাচ্ছিল। আমার মুখের ভেতর জ্বরের তেতো স্বাদ ঘুরছিল প্রবল বেগে। মনে হচ্ছিল বেশিক্ষণ এখানে থাকলে আমার ভেতর থেকে সব বেরিয়ে আসবে। আমি শ্যননকে বললাম, “ঝামেলা করো না যা বলেছিলে তাই দিয়ে দাও”। শ্যনন অনিচ্ছায় আমার কথা মানে।

আমরা হেঁটেই ফিরি হোটেলে। সারা রাস্তা দুজনের কেউই কোনো কথা বলিনি। আমার পাশে শ্যনন মাঝে মাঝেই মাথা ঝাঁকিয়ে জিভ দিয়ে চকাশ চকাশ হতাশার আওয়াজ করছে। ও হয়তো অপরাধবোধে ভুগছে। আমার মনের তোলপাড়ের হদিশও জানে না ও। হোটেলে পৌঁছেই শ্যনন ইব্রাহিমকে ফোন দেয়। ইব্রাহিম তোলে না। শ্যনন বিরক্ত হয়, “এই ছেলের ডিউটি শেষ হতে কিন্তু আরও আধাঘণ্টা আছে”। বিছানায় ফোন ছুঁড়ে দিয়ে আমাকে বলে, ‘গা ধুয়ে এসে ম্যানেজারের কাছে গিয়ে লোকটার খোঁজ নেওয়ার জন্য সাহায্য চাইব। তুমি বুঝিয়ে বলবে। আমার খুব খারাপ লাগছে।শিল্পী মানুষ ভিডিও করার আগে আমার ওর অনুমতি নেওয়া উচিত ছিল”।

আমি কিছু শুনছিলাম না ত্রিশ বছর আগের সেই দিনটা পিং পং বলের মতো মগজের মেঝেতে লাফাচ্ছে।

কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম জানি না। চোখ খুলতেই দেখি শ্যনন বিছানায় বসে ক্যামেরার মনিটরের দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে। আমি জিজ্ঞেস করি, “সত্যি লোকটার কান ছিল না?” আমার কথায় শ্যনন মুখ তুলে তাকায়। ওর মুখে হাসি, “এটা ভ্লগে দেবো না। ভাবতে পার মেয়েস্ত্রো এন্ড হিস আর্ট বাই এ রুর‍্যাল আর্টিস্ট? এ নিয়ে শর্ট ফিল্ম করব।” এরপরেই আমার দিকে চকচকে চোখে তাকিয়ে বলল, “তুমি দেখেছিলে? তাই অমন সাদা হয়ে গিয়েছিলে?” আমার উত্তরের অপেক্ষা না করে ফের বিস্ময়, “কীভাবে দেখলে? আমি তো জুম করার আগে টেরই পাইনি”। আমি উত্তর দিই না। ও ভিডিও রোল করে আমার দিকে বাড়িয়ে ধরে। আমরা দুজনই দেখি- সূর্যমুখি পাপড়ি মেলছে গায়ে গা লাগিয়ে। এবং তখনই শ্যননের ক্যামেরা লোকটার হাত ছাড়িয়ে মুখে তাক করেছে। কানের দিকটা জুম করতে করতে এগোচ্ছে শ্যনন, “হোয়াট দ্য ফাক”! ওর সেই অবাক চিৎকার। আমি আবার দেখলাম ত্রিশ বছর আগের সেই দৃশ্য। কান নয় কানের জায়গায় বাদামের মতো একটুকরো মসৃণ মাংস উঁচু হয়ে আছে। শ্যননের ছবি নড়ে গেল, এরপরেই অন্ধকার।

হঠাৎ করেই শ্যনন বলল, “আমার এমন করা উচিত হয়নি। আই মাস্ট হ্যাভ অফেন্ডেড হিম”।

আমি ফিসফিস করে বললাম, “এটা ভ্যান গগের কান নয় মাইক্রোশিয়া”। শ্যনন বোঝে না। “বেগ ইয়র পার্ডন’। আমি বলি, ‘নাথিং’। শ্যনন আমার কাঁধে হাত রেখে বলে, “তিতলী আই নো সামথিং ইজ ট্রাব্লিং ইউ। আই নোটিসড দ্য চেঞ্জ। স্পিল ইট আউট।। ইউ হাভ মাই ইয়ারস”। আমি চুপ করে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। আমার দুই চোখ ভরে ফের ঘুম নামছে। মনে হচ্ছে অনেকদিন পরে আপন কেউ বাড়ি ফিরে এলো অথচ ইনি তিনি নন আমি নিশ্চিত, তাও কেন এমন অনুভব?


*জয়নাল শেখ

লোকটার পরিচয় জেনেছিলাম আমরা। তার আগে কটেজের ম্যানেজার থেকে বার্মিজ মার্কেট- সবখানে শ্যননের ভিডিও শটের স্টিল থেকে লোকটার ছবি নিয়েছিলাম। ওরা চিনতে পারেনি কিংবা বলতে চায়নি। অবশ্য ছবিতে লোকটার মুখও স্পষ্ট নয়। মতিন মিস্ত্রির কথা বলেছিল সেইদিনের বাচ্চাগুলোর একজন। অন্যেরা বলেছিল লোকটা জেলেপাড়ায় থাকে। মতিন মিস্ত্রির কথা একদম শেষবেলায় মনে পড়েছিল। ইব্রাহিমকে বলতেই ও চিনে ফেলল তাকে। আর সেইখানেই আমাদের চুড়ান্ত অবাক হওয়া। মতিন মিস্ত্রি জেলে নৌকার কারিগর। লোকটা মতিন মিস্ত্রির নৌকা রঙ করেছে তিন চার মাস। “ইবা তো জয়নাল শেখ। রোহিংগা। এক কাইন্না। কানর জাগাত গোস্তর দলা”। (ও রোহিংগা । জয়নাল শেখ। এক কানওয়ালা। কানের জায়গায় মাংসপিণ্ড।) মতিন মিস্ত্রির গলায় বিরক্তি, “কিছু না বলে আধা কাজ করে চলে গেছে। পয়সাও নিয়ে যায় নি। ফউল কিসিমর। (পাগল কিসিমের)”।

মতিন মিস্ত্রির মুখ খুলতে ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছিল। আমাদের আসার উদ্দেশ্য-বিধেয় নিয়ে ওর প্রশ্নই যেন শেষ হচ্ছিল না। পরে বুঝতে পেরেছিলাম যে জয়নাল রোহিংগা হওয়ায় ওর নাম মতিন মিস্ত্রির দিনমজুরের বেতনের খাতায় ওঠেনি। শ্যননকে সে রোহিংগা ক্যাম্পের কোনো বিদেশী পর্যবেক্ষক বলে ধরে নিয়েছিল। বারবার বোঝাচ্ছিল যে জয়নাল নিজেই উদয় হয়েছিল। শুরুতে নৌকার কাঠচেড়াইয়ে কাজ করত। সেইকাজে মন ছিল না। পরে রঙের কাজে লাগিয়েছিল। নৌকার বডি রঙে ও দারুণ চৌকস ছিল। এমনই টান যে কোথাও রঙের কম বেশি ধরা পড়তো না। মতিন মিস্ত্রি খুব ধীরে কথা বলে। চট্টগ্রামের লোক এত ধীরে কথা বলে না। আমার বারবার মনোযোগ ছুটে যাচ্ছিল। যে ঘরটায় আমরা বসেছিলাম সেই ঘরটা এমনই তেতে উঠেছিল যে আমার প্রচণ্ড অস্বস্তি লাগছিল। গুদাম ঘরের মতো বদ্ধ, টানা বারান্দার মতো লম্বা । বোঝা যায় মূল বাড়ির গা ছেড়ে বাড়ানো হয়েছে। মাটির মেঝে। এককোণে কাঠের টুকরো ডাঁই করে রাখা। আলকাতরা, রজন, রঙের কৌটা, ফুলের ঝাড়ু আগোছালো এদিক সেদিক। একটা ঝাঁঝালো গন্ধ লটকে আছে হাওয়ায়। চারপাশে টিনের ঘেরা। মাথার ওপরেও টিনের চাল; আগুনের হল্কা ছড়াচ্ছে যেন। ডানদিকে দরজার পাল্লা ভেতরের ঘরের সঙ্গে যুক্ত করেছে এই ঘরকে। সেই দরোজার ওপারে কেউ আমাদের লক্ষ করছে টের পাচ্ছিলাম। ইব্রাহিম বাইরে অপেক্ষা করছে। শুধু লোকটার খোঁজ নিতে আসা বলে ওকে আর ভেতরে আনিনি আমরা কথা বুঝতে অসুবিধা হলে ওকে ডাক দেবো বলেছিলাম। এখানে আমাদের এতটা দেরি হবে ভাবিনি। মতিন মিস্ত্রি গরুর জাবর কাটার মত পান চিবোচ্ছে। কাঁধের গামছায় মাঝে মাঝে ঠোঁট মুছছে আর শ্যননকে দেখছে আড় চোখে। অনেকক্ষণ পরপর যেন হিসেব করে মুখ খুলছে । শ্যনন সালোয়ারের ওপরে ঢোলা টিশার্ট পরেছিল। ঘামে জবজবে টিশার্ট বুকের খাঁজে লেপ্টে আছে। একটা টুলের ওপরে টেবিলফ্যান রাখা। হাওয়া ছড়াচ্ছে যত না, আওয়াজ করছে তারচে’ বেশি। আমি শ্যননকে ইশারা করলাম সোজা হয়ে বসতে। ঠিক এই সময়ে ভেতরের সেই ঘর থেকে বছর সাতেকের একটা বাচ্চা মেয়ে আমাদের দুই জনের জন্যে স্প্রাইটের বোতল নিয়ে এলো। মতিন মিস্ত্রি আমাদের ইশারায় বোতল নিতে বলল। আমি হাতে নিয়ে দেখি বোতলও গরম। আমার ভাগেরটা বাইরে ইব্রাহিমের জন্য পাঠাতে অনুরোধ করলাম। শ্যনন নিমেষেই বোতল খালি করে বাচ্চা মেয়েটার হাতে বোতল ফেরত দিয়ে দিলো । মতিন মিস্ত্রি মুখে সুপুরি পুরতে পুরতে মেয়েটাকে দেখিয়ে বলল আমার ছোটো মেয়ে। মেয়েটা পরিচয়পর্বের জন্যে অপেক্ষা করল না। খালি, ভরা দুই বোতল নিয়েই চলে গেল ভেতরে। কে জানে ইব্রাহিমকে দেবে কি না! মতিন মিস্ত্রি মেয়ের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে বিষণ্ন গলায় বলল, “আঁর মাইয়ারও মাতবোল নাই। বুবি। জইনাইল্লা আঁর মাইয়ার দিলত বউত দুঃখ দিয়ে”। (আমার মেয়েটা কথা বলতে পারে না বোবা। জয়নাল আমার মেয়ের মনেও দুঃখ দিয়েছে।) আমার বুক কেঁপে উঠল। আট বছরের আমিও তো দুই দিনেই কী আপন ভেবেছিলাম তাঁকে! কীভাবে সময় ভাঁজ করে পাটেপাট মিলে যায়!

আমরা যাওয়ার জন্যে উঠে দাঁড়াই। ঠিক তখনই সেই ছোট মেয়েটা খবরের কাগজে মোড়ানো একটা কিছু এনে মতিন মিস্ত্রিকে দেয়। মতিন মিস্ত্রি বাচ্চাটাকে দেখিয়ে জানায় সে প্রায়ই কারখানায় যেত। জয়নাল ওকে সুরুয-ফুল এঁকে দিয়েছিল। আমি থমকে তাকাই। কী ফুল? এবার খবরের কাগজটা মেলে ধরে বলে, “ইবা আর মাইয়াফোঁয়ারে দিয়েদে”। (এটা আমার মেয়েকে দিয়েছে।) আমার বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে। থোকা থোকা নিখুঁত রঙহীন সূর্যমুখি আমাদের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে। শ্যননের চোখ ঠিকড়ে বেরিয়ে আসবে যেন, “ওয়াও ইনক্রেডিবল!” আমার গায়ের রোমও খাড়া হয়েছে শ্যননের আগে। শ্যনন ছবিটা হাত বাড়িয়ে নেয়। নিউজপ্রিন্ট কাগজে চারকোলে আঁকা।অসাধারণ! এই লোক পাকা শিল্পী। শ্যনন আমার দিকে তাকিয়ে বলে। “জিজ্ঞেস কর এই ছবি কি বিক্রি করবে? করলে আমি দশ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে রাজি”। মতিন মিস্ত্রি শুনে অবাক হয়ে বলে, “ইবা কি ডঁড় মানুষ না? অঁনেরা চিনুন না?” ( ইনি কি অনেক বড়ো কেউ? আপনারা চেনেন?) আমি উত্তর দেওয়ার আগেই মেয়েটা হঠাৎ বাবার হাত থেকে টান দিয়ে ছবিটা নিয়ে ভেতরে চলে যায়। যাবার আগে ওর চোখের সেই তীব্র দৃষ্টির ভেতর থেকে ত্রিশ বছর আগের আট বছরের বালিকা “আমিই” যেন ছিটকে বেরিয়ে এলাম।

সেদিন কটেজে ফিরে শ্যননকে বলেছিলাম আমার গল্প।


*ভ্যান গগের কান

দিনক্ষণ সব মনে আছে আমার। পয়লা নভেম্বর, ১৯৯০। আমার ছোটো ভাই পিপলুর চার বছরের জন্মদিন ছিল সেদিন। প্রেসিডেন্ট এরশাদের বিরুদ্ধে জনরোষের ঘুর্ণী তখন চূড়ায় । একটাই চ্যানেল,বিটিভি। এবং তাতে হবু রাজার গবু মন্ত্রিসভার চাহিদার মাপে দর্জিসেলাই খবর সম্প্রচার করা হতো। পাড়ায় পাড়ায় সন্ধে হতেই রেডিওর নব ঘুরতো বিবিসি আর ভোয়ার স্টেশনে থিতু হওয়ার জন্যে। দেশের হালহকিকতের খবর জানাতো তারাই। আমাদের বাড়িতেও অফিস থেকে ফিরেই বাবা, জ্যেঠু দাদুর সঙ্গে চায়ের কাপ নিয়ে সেই যে ডাইনিং টেবিলে রেডিও ঘিরে বসতো একদম রাতের খাবার শেষ করে তবেই উঠতো।

ইনকিলাব পত্রিকায় বাবড়ি মসজিদ ভাঙার আগেই ভাঙা সংক্রান্ত গুজব ছাপানো হয়েছিল। তার জেরে দেশ জুড়ে সংখ্যালঘুর ওপর নির্দয় হামলা চালাচ্ছিল মৌলবাদীরা। দুদিন আগে অর্থাৎ ত্রিশে অক্টোবর মধ্যরাতে কৈবল্যধামে মন্দির এবং এর আশেপাশে হামলা হয়ে গেছে । আমাদের পরিবার রামঠাকুরের ভক্ত।প্রতিমাসে আমরা যাই ওখানে। কী সুন্দর গাছগাছালি ঘেরা আশ্রম! আমার প্রিয় জায়গা ছিল আশ্রমের বাগান, পদ্মভাসা পুষ্করিণী আর নাটমন্দিরের ঠান্ডা মেঝে। ঐ বয়েসেই অনেক পাখি চিনেছি আমি কৈবল্যধামে এসে। আমার দাদুর সংগে মোহান্ত মহারাজের ভালো চেনাজানা। কৈবল্যশক্তি নামের সেই বটগাছের শাখায় ঠাম্মা আমাদের জন্য কতশত মানসী সুতো বেঁধেছেন! কৈবল্যধামে হামলার কথা শোনার পর থেকেই ঠাম্মা খানিকক্ষণ পরপর চোখ মুছছেন।

সেদিন পিপলুর জন্মদিন উপলক্ষ্যে ঘরে কোনো আয়োজনই হয়নি। বেলুন তো নয়ই কোনো কেইকও কেনা হয়নি। জ্যাঠিমা পুডিং বানিয়েছিল। জ্যেঠু র এক সহকর্মী থাকেন পাহাড়তলীতে। সেইদিন দুপুরে তাঁদের এলাকায় উত্তেজিত জনতা হামলা করেছে। তিনি পরিবার নিয়ে এক কাপড়ে শহরে কোনো এক আত্মিয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। জ্যেঠু অফিস থেকে ফিরেছিল তাড়াতাড়ি। জ্যেঠুর মুখে পাহাড়তলিতে হামলার খবর শুনে রহিমাখালা আলো থাকতেই বাড়ি চলে গেছেন। রাতের খাবারও নেননি। জবার জন্যে একটু পুডিং দিয়েছিল মা, খালা রেখে গেছেন, “কাইল আইলে খাইবো নে”। উনার ছেলে ভাটিয়াড়িতে শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার কাজ করে। ছেলের চিন্তায় খালা কাজে মন বসাতে পারছিল না। বাড়িটা ভুতুড়ে বাড়ির মতন নিঝুম হয়ে গিয়েছিল। রান্নাঘর থেকে মায়ের রান্নার আওয়াজ আর মাঝে মাঝে দাদুর কাশি নিস্তব্ধতার তাল কাটছিল। ভয়েস অব আমেরিকার খবর শুরু হতেই গেইটে ধাক্কাটা পড়েছিল। “টুম্পা!টুম্পা!”- কেউ ডাকছিল বাইরে থেকে। বাবা রেডিওর আওয়াজ কমিয়ে দিলেন। সারা পাড়াও যেন আমাদের বাড়ির মতো হঠাৎ করে নিঝুম হয়ে গেল।আবার ধাক্কা পড়তেই সবাই নিশ্চিত হলো আমাদের গেইটেই হচ্ছে এই কাণ্ড। কলিং বেলটা পিলারের ভেতরে। হাত ঢুকিয়ে বাজাতে হয়। অচেনা কেউ না-হলে অমন পাড়া কাঁপিয়ে গেইট ভাঙতো না। ফের আওয়াজ আসতেই জ্যেঠু নেমে গেল উঠোনে, পেছন পেছন বাবাও। টুম্পা আমার মায়ের নাম। মা বুঝতেই পারেনি যে তার নাম ধরেই ডাকা হচ্ছে। মামারা ছাড়া এই নামে কেউ ডাকে না মাকে। মামারাও বছর দু’বছরে আসেন আমাদের বাড়ি।

আমাদের বাড়ির গেইট উঠোন পেরিয়ে খানিক দূরে। রান্নাঘরের বাইরে তারে ঝোলানো লাইটের আলো কলতলা পর্যন্ত কোনোমতে পৌঁছায় । এমনিতেই রাস্তার লাইটের ধার কম আর তাতে ঝাঁক বেঁধে উড়ছে উঁইপোকার দল । জ্যেঠু কারো সঙ্গে কথা বলছে আমরা শুনতে পাচ্ছি কিন্তু কী বলছে বোঝা যাচ্ছিল না। বাবা গেইট পর্যন্ত যায়নি একটু পিছিয়ে দাঁড়িয়েছে। খানিক পরেই গেইট বাঁধার আওয়াজ শোনা গেল। কেউ একজন আসছেন জ্যেঠুর সঙ্গে সমান পায়ে যেন নিজের বাড়ির চেনা পথ। বাবা আসছে পেছন পেছন। বাবা, জ্যেঠু দুজনের চেয়ে উঁচু তিনি। বারান্দার সিঁড়ির মুখে আসার আগ পর্যন্ত আমরা তাঁর মুখ দেখতে পাইনি। রাস্তার মরা আলো তাঁর ঢোলা সাদা পায়জামাতে জন্ডিসের হলুদ আভা নিয়ে ঝুলছিল । উঠোনের নারকেল পাতার ছায়া ভেঙে পড়ছে তাঁর মুখে। কাঁধে ঝোলা, গায়ে পাঞ্জাবি, বাম হাতে আরো একটা পেটফোলা ছোট ব্যাগ।মাথায় ঢুলিদের মতো ডুরে গামছা বাঁধা। কাঁধ অব্দি লম্বা চুল। সিঁড়িতে পা দিয়েই তিনি মাকে ঠিক চিনে নিলেন। হৈহৈ করে বললেন , “কী সর্বনাশ টুম্পা তুই তো আর আমাদের পুচকে টুম্পা নেই রে, বিশাল গিন্নি হয়ে গেছিস!” মা জ্যেঠিমার পেছনে সরে দাঁড়াল নিরাপদ দূরত্বে। কিন্তু এক সেকেন্ডেরও কম বিরতিতে সবাইকে অবাক করে উচ্ছ্বল কিশোরীর মতো তড়বড়িয়ে নেমে পৌঁছে গেল সিঁড়ির মুখে, “ওমা খেলু দা! তুমি দেশে এলে কবে?” তিনি হাসছেন, স্বস্তির হাসি। মায়ের থমকে যাওয়ায় হয়তোবা ভড়কে দিয়েছিল তাঁকে। তার পুরু চশমার ভেতর থেকে খুশির ঝিলিক চুঁইয়ে পড়ছে, “ আরে তুই তো সেইরকমের জিনিয়াস। দাড়ি গোঁফের জঙ্গল থেকেও ঠিক আমাকে চিনে নিলি!”

মায়ের উচ্ছ্বাস বশে আসার পরে সকলে ধীরে ধীরে জানল তিনি অরুণাংশু রায়। মায়ের পাড়াতুতো দাদা। তাঁর অমন দাড়ি আর লম্বা চুল ছিল না। সেই কারণেই মা চিনতে পারে নি। তিনি শিল্পী এবং থিয়েটার কর্মী। মায়ের বিয়ের মাস খানেক আগে জাপানে গিয়েছিলেন জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে।নানা দেশে ঘুরে প্রায় এগারো বছর পরে দেশে ফিরেছেন সবে। চট্টগ্রামে কোনো এক সাংস্কৃতিক গ্রুপের আমন্ত্রণে এসেছেন আজ সন্ধ্যায়। তিন মাস আগে এদের সঙ্গে কক্সবাজারে এসেছিলেন। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে আর্টক্যাম্প পরিচালনা করেছিলেন সেখানে। সপ্তাহখানেক ছিলেন। দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছিল। টগবগে এই তরুণদের সঙ্গে একধরনের আত্মার বন্ধন তৈরি হয়েছে সেই থেকে। এরা ঢাকা এলেই তাঁর সংগে যোগাযোগ করে। তাই দ্বিতীয়বারের ডাকে তিনি সহজেই সাড়া দিয়েছিলেন। আসার আগে বড়োমামার কাছ থেকে মায়ের ঠিকানা নিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন অনুষ্ঠান শেষে ফেরার পথে বোনকে দেখে যাবেন। কিন্তু সব গড়বড় হয়ে গেল। চাটগাঁর অবস্থা যে এত খারাপ তাঁর জানা ছিল না। ট্রেন দেড় ঘণ্টা লেট ছিল। স্টেশনে কাউকে পেলেন না। ওদের সংস্থার ঠিকানা লেখা একটা কাগজ মানিব্যাগে ছিল সেখানে ফোন নম্বরও।কীভাবে পড়ে গেল কে জানে! লাভলেইনে আবেদিন কোলোনির আশেপাশে কোথাও ওদের অফিস বলেছিল, মনে আছে। এত রাতে খোলা থাকার কথা নয়, ধারে কাছের হোটেলে উঠবেন ভেবে রিক্সা ভাড়া করতে গিয়ে জানলেন ওদিকে বিকেল থেকে গণ্ডগোল চলছে। স্টেশনেই রাত কাটিয়ে ভোরের ট্রেনে ফিরে যাবেন ভাবছিলেন তখনই টুম্পার কথা মনে পড়ল। এখানে আসার পরিকল্পনা তো ছিলই কেবল সময়টা এদিক-ওদিক। একটাই ভয়- তাঁর এই ডাকাতে চেহারা দেখে টুম্পা যদি না চেনে! তাঁর বলার ধরনে নিমেষে গুমোট পরিবেশ হাল্কা হয়ে গেল। খানিক পরেই বেশ জমে উঠল বাড়ি।

আমি যে ঘুমের সময় পার করে দাঁড়িয়ে আছি কেউ খেয়াল করেনি। ভদ্রলোকের খাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্যে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াতেই মা দেখে ফেলল, “ও মা পাকা বুড়ি তুই এখনও দাঁড়িয়ে!” তারপরে ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বললেন, “খেলুদা আমার কন্যা, রজতপ্রভা।” কানে হাত দিয়ে বেশ জোরে উনি জানতে চাইলেন, “কী নাম বললি ?” মাও বেশ চেঁচিয়ে বলল, “রজতপ্রভা”! উনি বললেন, “আরেব্বাস এ তো দাঁত কপাটি লাগার মতো নাম”। অমন জোরে উত্তর দেওয়ায় সবাই বেশ চমকে তাকাল। উনি যেন বুঝলেন।হাত জোড় করে বললেন, “আমি কানে কম শুনি”। পরক্ষণেই আমার দিকে হেসে বললেন, “ভ্যান গগের মতো আমি এক-কানা। তোমার মায়েরা ছেলেবেলায় আমায় ভ্যানগাড়ি দাদা ডাকত।তোমায় নিশ্চয় ভ্যান গগের গল্প শুনিয়েছে তোমার মা? রবিঠাকুরের, ‘‘সুন্দর বটতব অঙ্গদখানি তারায় তারায় খচিত” গানটা কি গায় তোমার মা? সেই গানের মতো রাতের আকাশের ছবি তিনি এঁকেছিলেন। সূর্যমুখি তো নির্ঘাত আঁকিয়েছে তোমায়” । নাহ্‌ মা আমাকে এই নাম বা গল্প কিংবা গান কিছুই বলেনি, শোনায়নি। তবে সূর্যমুখির ছবি সত্যিই আঁকিয়েছে। কিন্তু উনি জানলেন কীভাবে? উনি আমার উত্তরের অপেক্ষায় নেই। নিজের মনেই কথা বলছেন, “জানো তো যারা কানে কম শোনে তারা চেঁচিয়ে কথা বলে। আমার গলার আওয়াজ তাই অমন বিচ্ছিরী বাজখাঁই। রজতপ্রভা তুমি হাই তুলছ মানে ঘুমের সময় পেরিয়ে গেছে তোমার। কাল তোমার সঙ্গে গল্প করব। বড়ো অবিবেচকের মতো কাজ হলো সবার দেরি করিয়ে দিলাম।” দাদু ঠাম্মাকে বলল, “কুটুমকে খেতে দাও। রাত তো বাকি নেই বেশি”। মা রান্নাঘর থেকেই বলল, “তিতলী তোমার ড্রইং খাতার সূর্যমুখি দেখাও মামাকে”। দাদুকে উদ্দেশ্য করে বলল, “এ এখন বিছানায় গেলে পিপলুকেও জাগাবে বাবা। আমার কাজের বারোটা বাজবে”। মায়ের ওপর আমার ভয়ানক রাগ হলো। উনি একবার এর মুখ, একবার তার মুখের দিকে তাকিয়ে যেন পরিস্থিতি মাপছেন। এরপর আমার দিকে ফিরে বললেন, “নিয়ে এসো তবে”। আর জ্যাঠিমাকে বললেন, “ একটু চা হলে বেশ হয়”। জ্যাঠিমা উওর দিলেন, “হবে না মানে?” আমি ড্রইং খাতা আনতে গেলাম। বাবা ফের রেডিও চালালেন। বেশ অনেকখানি খবর বেরিয়ে গেছে। আমি ড্রইং খাতা নিয়ে ফিরে এসে দাঁড়িয়ে রইলাম। কেউ আমায় দেখছে না আর। বাবা, জ্যেঠু, দাদু সবাই কথা বলছে। সেই বিকেলের মতো চাপা স্বরে আলাপ। খানিক বুঝতে পারছি, বেশিরভাগই দুর্বোধ্য। জ্যেঠু বলছেন, জুম্মাবারে নামাজ শেষে মিছিল বেরোবে। আরও হামলা হবে। উনাকেও বেশ চিন্তিত দেখাচ্ছিল। বললেন সকালে উঠেই চলে যাবেন। লাভলেইনে দশটার দিকে যাবেন কাউকে পেলে তো ভালোই ওরাই যাওয়ার ব্যবস্থা করবে নয়তো উনি যে বাস পাবেন সেই বাস ধরেই ঢাকা ফিরবেন। বাবা তখন সোহেল চাচার ওসি ভাইয়ের কথা বলল। সোহেল চাচা বাবার ছেলেবেলার বন্ধু আর সোহেল চাচার খালাতো ভাই আমাদের কোতোওয়ালি থানার ওসি। কাল জুম্মার সময় আমাদের এলাকা ঘুরে যাবেন কথা দিয়েছেন তিনি। বাবা ভরসা দিলেন সকালে সোহেল চাচার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সব ঠিক করে নেওয়া যাবে। আর জ্যেঠু নিশ্চিত করেই বললেন সেই সংগঠনের অফিসে যাওয়ার দরকারই বা কি? খোলা পেলেও এই পরিস্থিতিতে কোনো আর্টক্যাম্প হবে না। উনি সাঁয় দিলেন জ্যেঠুর কথায়। অনেকক্ষণ পরে আমার দিকে তাঁর নজর গেল। কথা বলতে বলতেই ইশারায় ড্রইং খাতা দেখাতে বললেন। আমি সূর্যমুখির পাতাটা বার করে দিলাম। উনি এক পলক দেখেই হাসতে হাসতে বললেন, “দেখ সেই একই কাণ্ড করছে মেয়ের সঙ্গেও!” মা চায়ের কাপ হাতে বেরিয়ে এলো, “কপি করিয়েছিস না?” মা বলল, “ওদের ড্রইং টিচার তিন ধরনের ফুল আঁকতে বলল যে!” উনি চোখ কুঁচকে মাকে বললেন, “ও দেখেছে ফুলটা?” মা উত্তর দেওয়ার আগেই উনি আমাকেই জিজ্ঞেস করলেন ফের, “তুমি সূর্যমুখি দেখেছ?” আমি মাথা নাড়লাম। উনি বললেন, “তোমার দেখা তিনটে ফুলের নাম বলো ঝটপট” । আমি বললাম, “জবা, নয়নতারা আর সন্ধ্যামালতি” । উনি কানে হাত দিয়ে বললেন, “আবার বলো” । আমি আবার বললাম। উনি বললেন,’ “বাহ্‌, ওদের কাল দেখবে। চোখ খুলে মন দিয়ে। এরপরে চোখ বুজে দেখতে পাও কি না দেখবে। যদি পাও তবেই ওরা ধরা দেবে। আর্ট হবে ড্রইং হবে না” । এরপরে বললেন, “তোমার মা কেন যে সূর্যমুখি আঁকাতে গেল? ঐ সেই ভ্যান গগের টান! কী এক ভ্যান গগের ছবি দেখিয়েছিলাম ছেলেবেলায় সেই থেকে সূর্যমুখিতে আটকে রইল। অথচ সূর্যমুখি সূর্যের দিকে তাকিয়েই ঝরে যায় সূর্যের কাছে যেতে পারে না। নকল করতে হলে পাখিদের ছবি নকল কর। ওদের ডানা আছে উড়ে উড়ে সূর্যের দিকে যাওয়ার অন্তত চেষ্টা করতে পারে” । উনি হাত দুটো হেলিয়ে ওড়ার ভঙ্গি করলেন। দাদু বললেন, “আজকের মতো অঙ্কনপাঠ শেষ হোক। ঘুমাতে যাও সোনা” । আমার ওঁকে ভালো লাগতে শুরু করেছে। যেতে ইচ্ছে করছিল না। এমন অদ্ভুত কথা আমাকে কেউ বলে নি আগে। চোখ বুজে দেখতে পেলেই ছবি আঁকা যায়! নাহ্‌ একজন বলেছে একথা। জবা। রহিমা খালার মেয়ে জবা। জবা পাখির ছবি আঁকে মন থেকে। ছাদে খেলবার সময় ও ইটের টুকরো দিয়ে একটানে ফুল আঁকে। মানুষও আঁকতে পারে। না দেখেই।

খবরে চট্টগ্রামে হামলার কথা বলছে তখন। জ্যেঠু রেডিওতে প্রায় মাথা ঢুকিয়ে দিয়েছেন। উনি আমাকে কাছে টেনে নিচু স্বরে বললেন, “আমার কাছে ঘুমের জাদু আছে। চাও?” আমি মাথা নাড়লাম, উনি দেওয়ালের গায়ে আমাদের মাথার ছায়ার দিকে আঙুল তুললেন। এমন আলোছায়া থেকে যদি পাখিদের খুঁজে বার করতে পারো তবে দেখবে ম্যাজিক ঘটছে। কপি করতে হবে না তুমি যা চাও তাই-ই আঁকতে পারবে। আর সেই পাখিরাই গান গেয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে তোমাকে” । আমি বিছানায় এসে মশারির ভেতর দিয়ে দেওয়ালে আলোছায়ায় পাখিদের খুঁজতে থাকি। হঠাৎ কেন যেন বুকের ভেতর হুহু করে ওঠে! আমার ড্রইং খাতা আছে আমি আর্ট পারি না। জবার ড্রইং খাতা নেই, ও মন থেকে আঁকতে পারে।

আমার ঘুম যখন ভাঙল তখন রোদ লাফাচ্ছে বিছানা জুড়ে । পিপ্লু নেই পাশে। বাবার বিছানাও পরিপাটি। আমাকে ডাকেনি মা !তার মানে নাচের স্কুলে যেতে হবে না আজ । তারপরেই মনে পড়ল উনি আমাকে তিনটে ফুল দেখতে বলেছিলেন মন দিয়ে। তাড়াতাড়ি বাইরে এলাম। বাবা টেবিলে পেপার পড়ছেন। রান্নাঘরে উঁকি দিতেই মায়ের চোখাচোখি , “ অনেক ঘুমিয়েছ। দাঁত মেজে জামা পাল্টে এসো। ফুলকো লুচি দেবো।তারপরে অংক করবে টিভি দেখার ইচ্ছে থাকলে”। পিপ্‌লু ওর নতুন গাড়ি নিয়ে বাবার পাশে মেঝেতে খেলছে। টিভি দেখার ইচ্ছে নেই আমার। ফুল দেখতে হবে । কিন্তু উনি কোথায়? বাথরুমের দিকে পা বাড়াতেই দেখি রহিমা খালা কাপড়ধোয়ার খালি বালতি হাতে নামছে সিঁড়ি দিয়ে। পেছন পেছন জবা।

মা রহিমা খালাকে বললেন, “ হাত মুছে খাবারটা দিয়ে এসো ওপরে”। আমাকে তাড়া দিলেন, “জবার মা আজকেও তাড়াতাড়ি চলে যাবে। নতুন মামাও। খেলতে চাইলে ঝটপট খেয়ে অঙ্ক সেরে নাও”। আমার মন খারাপ হলো। জ্যাঠিমা ছুটির দিনে সহজে ঘুম থেকে ওঠে না। মায়ের কোনো ছুটির দিন নেই। আমারও নেই।

আমি নাকেমুখে গুঁজে খাওয়া শেষ করলাম। দেখলাম মা ট্রে গুছিয়ে দিচ্ছে অতিথির জন্য। তবে কি উনি সঞ্জয় দাদার ঘরে ছিলেন রাতে! সঞ্জয় দাদা আমার জ্যাঠতুতো দাদা। আমেরিকায় নাম করা বিশ্ববিদ্যালয়ে এঞ্জিনিয়ারিং পড়ে। ঐ ঘরে জ্যাঠিমা কাউকে ঢুকতেই দেয় না। মাসে একবার নিজ হাতে ঘর পরিষ্কার করেন। কিন্তু ওখানে কেন? বাবা রহিমা খালার ট্রের দিকে তাকিয়ে মাকে বললেন, “উনি কবে যাবেন? দুপুরের পরে পরিস্থিতি কেমন হয় বলা যাচ্ছে না কিন্তু। খাবার ওপরে পাঠানোর কী হলো?” মা বলল, “তুমিই তো উনাকে ওপরে নিয়ে গেলে। শিল্পী মানুষ আকাশ ছেড়ে তোমার কলতলার সৌন্দর্য দেখবে কাছারি ঘরে? বড়দি না খেপলে হয়। রহিমার কাছে চা চেয়েছে। রাতে তো তেমন খাননি হয়তো খিধে লেগেছে। চায়ের সংগে খাবারটাও পাঠিয়ে দিলাম। তা ছাড়া দাদা তো ফেরেননি মর্নিং ওয়াক সেরে” । বাবা বিড়বিড় করলেন, “ভ্যান গগগিরি করছে। বাড়ি ফিরে ছবি আঁকার তর সইছে না” । মা জবাব দিলো না। বাবার কথাটা মাথায় ঘুরছে আমার, উনি কি ছবি আঁকছেন? উনার কাঁধের ঝোলায় আঁকার জিনিসে ঠাঁসা। কাল দেখেছি। আমি খেয়ে অঙ্ক করতে ছুটলাম। জবাকে মা খেতে দিয়েছে ভেতর। খানিক্ষণ পরে জবা এল পিপ্‌লুকে নিয়ে। টেবিলের কাছ ঘেঁষে ফিসফিস করে বলল, ‘বেডা এমুন সোন্দর ছবি আঁকতাসে মনে হয় য্যান সত্য’। “কে?” “তুমার মামা। ছোট বাপির গামছা মেলতে গেসিলাম। আল্লারে! দেখি সঞ্জয় দা’র ঘর খোলা। আমি আঁতকা এমুন ডরাইসিলাম, নাইম্মা পড়সি। জ্যাঠিমারে কইলাম জ্যাঠিমা কইল তুমার নাকি মামা”। আমার আর তর সইছিল না। খানিক ঈর্ষা লাগছিল আমি দেখার আগে জবা ছবি আঁকা দেখে ফেলল!

অঙ্ক শেষ করেই ছুটলাম জবার পিছু পিছু। বাবা, জ্যাঠা, দাদু সবাই টেবিলে খাচ্ছেন। বাবা বললেন, “মামাকে গিয়ে বল দাদু ডাকছে নিচে” ।

আমরা ছাদে উঠে দেখি উনি মেঝেতে বসে একমনে আঁকছেন। মাথায় সেই ডুরে গামছাটা বাঁধা। আমাদের পায়ের আওয়াজ শুনতে পাননি মোটেই। ঝলমলে হলুদ রঙ টিউব থেকে সরাসরি ক্যানভাসে ফুটকির মতো বসাচ্ছেন চেপে চেপে। এরপরে একটা চ্যাপ্টা ছুরির মতো জিনিস দিয়ে তা থেবড়ে দিচ্ছেন। এমন অদ্ভুত কাণ্ড জবা তো নয়ই আমিও এর আগে দেখিনি। স্কুলে আমরা এখনও ক্রেয়ন, রঙ পেন্সিল আর মার্কার দিয়ে আঁকি । জবা আমাকে ইশারায় দেখাল মেঝেতে আরো একটা ছবি পাতা। একগোছা মিয়ানো সূর্যমুখি আঁকা তাতে। এটাই তিনি সকালে আঁকছিলেন। অবাক হয়ে দেখি ক্যানভাসের সেই হলুদ ফুটকি কোনো এক জাদুবলে যেন সূর্যমুখি হয়ে পাপড়ি মেলছে! এরা মেঝেতে পাতা ছবির ফুলগুলির মতো হয়রান হয়নি, হাওয়ায় দুলছে! আমাদের বিস্ময় সরেনা। উনি ঝট্‌ করে ফিরলেন। পুরু চশমার ভেতরে তাঁর চোখ জোড়া আমাদের এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেখছে। আমি ঘাবড়ে গিয়ে তড়বড়িয়ে বললাম, “বাবা ডাকছে”। জবা শুধরে দিল, “দাদু ডাকছে”। উনি অপ্রস্তুত হেসে বললেন, “আবার বল। আমি বাম দিকে শুনতে পাই না। কান নেই”।ওহ্‌ কান নেই! আমি জবা মুখ চাওয়াচাওয়ি করি। মনে পড়ে গেল রাতে বলেছিলেন উনি নাই-কানের কথা। আমি ব্যাপারটা বুঝিনি ঠিকঠাক। উনি গামছা খুলে চুল সরালেন। দেখি কানের জায়গায় বাদামের মত এক টুকরো মসৃণ মাংসপিণ্ড। আমার আর জবার চোখ গোল হয়ে গেল। “ভ্যান গগের মতো কান কাটিনি আমি। একে বলে মাইক্রোশিয়া”। আমাদের দুজনের মুখে তাঁর চোখ জোড়া ঘুরল, “ বোঝা গেল না, না?”। আমরা আসলেই বুঝিনি। উনি গামছা দিয়ে কানটা ফের ঢেকে দিলেন এবং আমাদের দিকে ঘুরে বসলেন। “ব্যাপার হলো কি তোমাদের দুজনকে ভগবান ধীরেসুস্থে সময় নিয়ে মনের মতো করে গড়েছেন আর আমার বেলায় ভগবান কানটা ঠিকঠাক বানাবার আগেই হাত ফসকে পড়ে গিয়েছিলাম পৃথিবীতে”। জবা গম্ভীর হয়ে বলল, “ আমারে আল্লাহ বানাইছে”। উনি হাসতে হাসতে বল্লেন, “ তাই? তিনিও দারুণ কারিগর”। এবার তাঁর হঠাৎ মনে পড়ল এমন ভাবে আমার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন “ভ্যান গগের কথা বলেছিলাম না কাল ?” আমি হেসে দিলাম মনে পড়ল মায়েরা উনাকে ভ্যানগাড়ি দাদা বলতেন।। উনি জবার দিকে তাকিয়ে বললেন, “ভ্যান গগ মস্ত বড়োশিল্পী ছিলেন। তাঁর আঁকা সূর্যমুখি হাওয়াতে দুলতো। তিনি নিজের কান কেটে ফেলেছিলেন” । জবা আঁতকে উঠল, “ও আল্লাহ নিজে নিজের কান কাইট্যা বয়রা হয় নি কেউ?” উনি হাসতে লাগলেন। বললেন, “আমিও বয়রা। বামদিকে একটুও শুনতে পাই না। ডানদিকেও খুব যে শুনি তা নয় কিন্তু ঠোঁট নড়লেই পড়তে পারি। মানে তুমি আওয়াজ না করে কথা বললেও আমি শুনে ফেলব”। আমি অধৈর্য হয়ে জানতে চাইলাম, “ভ্যান গগ কান কাটলো কেন?” ‘ও কানে বেশি শুনছিল। তাই ছবি আঁকতে পারছিল না”। “ওমা! কানে বেশি শোনা ভালো না?” তখনই সেই অদ্ভুত কথাটি বলেছিলেন তিনি আমি আজও ভুলিনি, “সব শোনা ভালো না।ছবি আঁকতে হলে মনের চোখ খুলতে হয়। কথা বেশি হলে মনের চোখ ঘুমিয়ে পড়ে”। উনি হাসেন। “আচ্ছা তোমার ছোট নামটা যেন কী?” আমার আগেই জবা তড়বড়িয়ে বলল, “তিতলী”। আমি জবার দিকে রেগে তাকালাম। “বাহ্‌ ভারি সুন্দর নাম তো! তুমি দেখতেও প্রজাপতির মতো।তোমরা দুজনই পরীর মতো সুন্দর।তোমার নাম কী?” তিনি জবাকে জিজ্ঞেস করলেন। এবার আমি উত্তর দিলাম, “জবা”। “আরে বাহ্‌! একজন ফুল আরেকজন প্রজাপতি! এই ফুলটাতে একটা প্রজাপতি আঁকতে হবে। কী রঙের পাখা হবে বলতো?” আমরা উত্তর দেওয়ার আগেই রহিমা খালা দাঁড়াল এসে। আমাদের দুজনের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টি দিয়ে খাবারের ট্রেতে চায়ের কাপ তুলতে তুলতে বললেন, “আপনাকে খালুজান ডাকে” “ও হো বাচ্চারা বলেছিল আমিই দেরি করলাম। কী কাণ্ড বল তো মেসো নিশ্চয় বিরক্ত হয়েছেন। বড়ো অন্যায় হয়ে গেল” বলতে বলতে উনি তুলি নামিয়ে রহিমা খালার আগেই দুদ্দাড় করে নেমে গেলেন। রহিমা খালা জবাকে বকতে লাগলেন । আমিও সিঁড়ি টপকে ঝড়ের গতিতে নেমে এলাম নিচে।

সেইদিন উনি আরেকদফা চা খেয়েছিলেন দাদুর সঙ্গে গল্প করতে করতে। জ্যাঠিমা জানতে চেয়েছিল স্নানের জন্য গরম জল চাই কি না। রহিমা যাওয়ার আগে স্নানঘরে দিয়ে আসবে। উনি মাকে ডেকে বললেন, “ এই তোর শ্বশুর বাড়ির লোকজন দারুণ কিপটে তো! দু বেলা খাইয়েই আমাকে বিদায় করতে চাইছে!” জ্যাঠিমা বলল, “ নিন্দা করে ফায়দা নেই। এ এখন দত্ত বাড়ির বৌ। রাজশাহীর মেয়ে নয় আর”। উনি হাসতে হাসতে জানালেন, “গরম জলের দরকার নেই। রাজশাহীর মানুষেরা নভেম্বরের শীতে কাবু হয় না”। এইসব হাসিঠাট্টার সব কানে যাচ্ছিল না আমার। আমি নয়নতারা, সন্ধ্যমালতি আর জবা ফুল দেখছিলাম মন দিয়ে।

বাবা সোহেল চাচাকে ফোন করার জন্যে ভেতরে গেলেন। আমি কাছারি ঘরের জানালায় উঁকি দিলাম। বিছানা তোলা হয়নি। পেট মোটা ব্যাগটা মশারি দাবিয়ে খাটের ওপরে। রাতে উনি দাদুর কাছারিতেই ছিলেন তবে। বারান্দায় উঠতেই আমি শুনলাম উনি জবাকে বলছেন ব্যাগটা ছাদঘরে পৌঁছে দিতে। জ্যাঠিমা বললেন, “ওপরে কিন্তু স্নানের ব্যবস্থা নেই”। উনি বললেন, “রঙগুলি বার করেছিলাম। এত সুন্দর পরিবেশ ওপরে! সুযোগটা হেলায় হারালাম না।ছবি আঁকলাম। ঝোলাতে তুলি, রঙ রাখা যাবে না। ও দিয়ে এলে সুবিধা হয়। একবারেই সব গুছিয়ে আনি। ছোট মানুষ পারবে কি? আমিই নিয়ে আসি বরং”। জ্যাঠিমা হাত নেড়ে তাঁকে বসতে বলে জবাকে নিয়ে গেলেন কাছারিঘরে। বাবা বেরিয়ে জানালেন সোহেল চাচা জানিয়েছেন তিনি নিজে গাড়িতে করে তাঁকে পৌঁছে দেবেন। বাস না চললেও অসুবিধা নেই। একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে। উনি সব শুনে মনে হলো খুব খুশি। মাকে ডেকে বললেন, “ তুই খাবার রেডি কর আমি আধঘণ্টার মধ্যে নেমে স্নান সেরে আলবিদা বলব । পরেরবার তোর জা যতোই বলুক বছর খানেকের আগে নড়ছি না।“জ্যাঠিমা উঠোন থেকেই চেঁচিয়ে বললেন, “ভালোই হবে এমন মজার মানুষ থাকলে আমার হাঁপানির টান থাকবে না আর”। উনি এত দূর থেকে শুনলেন কি না বোঝা গেল না। সিঁড়ির কাছে যেতে যেতে বললেন, “যাই তবে তিতলীর ছবিটা তাড়াতাড়ি শেষ করে ফেলি”। মা আমার দিকে চোখ পাকিয়ে বলল, “সে কি মামাকে এরই মধ্যে বায়না দিয়ে এসেছ?” আমি উত্তর দেওয়ার আগেই তিনি বললেন, “ তিতলী লক্ষ্মী মেয়ে। তুই তো ছেলেবেলায় আমাকে ছবি আঁকতে দেখলেই সূর্যমুখি এঁকে দাও বায়না করতি তাই তোকে এঁকে দিতাম না। তিতলীকে আমিই বলেছি একটা তিতলী এঁকে দেবো সূর্যমুখির ওপর ”, বলেই মায়ের দিকে হাসলেন। “তবে তোর বিয়ের উপহারটা পাওনা ছিল, এঁকে দিলাম। বাসি উপহার”। মাকে কেমন লাল লেগেছিল কি? এত কিছু খেয়াল করে দেখার বয়স হয়নি আমার। এই সব খুঁটিনাটি হয়তোবা আমি পরে নিজেই ভেবেছি। কিন্তু শ্যননকে বলবার সময় এমনই একটা দৃশ্য গড়াচ্ছিল আমার চোখের সামনে।

রহিমা খালা জবাকে নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। আমি দেখি নি। আমি তখন আবার নয়নতারা দেখছি মন লাগিয়ে। ছাদ থেকে নামার পরে সেদিন জবার সঙ্গে ভালো করে কথাই হয়নি আমার। ও যেন দূরে সরে থাকছিল, আর আমিও চোখ বুজে ফুলের দোলা দেখার সাধনা করছিলাম ফুল গাছগুলোর পাশে। বাড়িটা হঠাৎ করেই সুনসান হয়ে গেল।

আমার খুব ছাদে যেতে ইচ্ছে করছিল। ভগবান যেন আমার কথা শুনতে পেয়েছিলেন। এগারোটার দিকে সোহেল চাচা ফোনে জানালেন তিনি আসছেন। বাবা মা’কে বলল, “উনি তো এখনও নামলেন না?” মা বলল, “আমার হয়ে গেছে তিতলীকে পাঠাও”! আমি নিজের গরজেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়াতে বাবা বলল, “তুমি থাক আমিই যাচ্ছি” । মিনিটখানেকের মধ্যে বাবা এসে বললেন, “ওপরে তো কেউ নেই। গেলেন কোথায়?” আমরা সবাই তখন নিচে। বাবা তো সকাল থেকেই বারান্দায়। দাদু উঠোনে হাঁটছেন পিপ্‌লু খেলছে। জ্যেঠুও ছিলেন এখানে। বারান্দার সংগেই লাগোয়া ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। জ্যেঠু অবাক হলো শুনে, “ব্যালকনিতে দেখেছিস?” বাবা বলল, “সবখানে দেখেছি” । জ্যেঠু নিজেই গেল ওপরে। বাবা আর জ্যাঠিমাও গেলেন পিছুপিছু। । রহিমা খালা যাওয়ার পরে আমার সামনেই দাদু গেইট বন্ধ করেছে । জ্যাঠিমা নেমে এসে জানাল, “ মেঝেতে ছবি দুটো পাতা উনি নেই”। মা রান্নাঘরের দরোজার কাছেই হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। জ্যাঠিমা জ্যেঠুকে বলল, “একটু বাইরে রাস্তায় হেঁটে এসো। হয়তো সিগারেট বা পান কিছু একটা কিনতে বেরিয়েছেন। “

দাদু ওপরে গিয়ে সঞ্জয়দাদার ঘরে তালা দিয়ে এলেন। দাদুর সংগে আমিও গিয়েছিলাম পিছুপিছু। দরোজার মুখেই উনি আঁকছিলেন বসে। আমার জন্যে আঁকা ছবিটা শেষ হয়নি। যতটা আমি দেখেছি ততটাই। ছবির পাশে হলুদ রঙের টিউব। আমার খুব অপমান লাগছিল। কান্নাও। জবার সামনে বলেছিলেন এঁকে দেবেন। দাদু কিছু সরালেন না দরোজা টেনে তালা লাগিয়ে দিলেন।

ছাদ থেকে নেমে বাবা আর জ্যেঠুকে বললেন, “এখন আর কোথাও কেউ যেও না । সোহেল এলে ওকে বলো যে উনার লোক এসেছিল নিয়ে গেছে। আর চুপচাপ থাকো”।

মা মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। ঠাম্মা বারবার সবাইকে জিজ্ঞেস করছেন, “রাগ করে নি তো?’ দাদু রেগে গেলেন, “রাগ তো আমরা করব। অমন চেঁচিয়ে কথা বলে কানের পর্দা ফাটিয়ে দিয়েছে। নিচে উপরে দুই ঘর খুলিয়েছে” । আমার প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছিল। আমি চোখ বুজে নয়নতারা দেখতে চাইছিলাম, কিছুতেই মনে ভাসছিল না বরং ওঁর আঁকা অসমাপ্ত সূর্যমুখিটাই দোল খাচ্ছিল মনে।

খানিক পরেই সোহেল চাচা এলেন। অতিথি চলে গেছেন শুনে দেরি করলেন না,গেইট থেকেই দাদু আর ঠাম্মাকে সালাম জানালেন। জুম্মার মিছিলের সময় যেন কেউ ছাদে না থাকে মনে করিয়ে দিলেন আর গেইট বন্ধ রাখতে বললেন। আশ্বস্ত করলেন কোনো বিপদ হবে না। ঘণ্টাখানেক পরেই মিছিল বেরুলো। “নারায়ে তাকবির আল্লাহু আকবর” সেই গা হিম করা আওয়াজ তুলে পাড়া কাঁপিয়ে মিছিল চলে গেল বড়োরাস্তার দিকে। আরও ঘণ্টাখানেক পরে বাবা বড়োমামাকে ফোন দিলেন। সব শুনে মামা অবাক। মাকে বারবার জিজ্ঞেস করছিলেন ঠিক চিনেছে কি না। ঠিকানা দেওয়া দূরের কথা উনি যে বাংলাদেশে সে কথাই জানে না বড়ো মামা। “ওদের বাড়ি তো কবেই রিয়েল্টরকে দিয়ে দিয়েছে। কেউ থাকে না ওখানে। ভাইটাও দেশের বাইরে তবে বোন থাকে ঢাকায়”। তারপরেও মামা খবর নিয়ে জানাবেন বললেন।

কেউই এর মাথামুণ্ডু উদ্ধার করতে পারলো না। পরেরদিন রহিমা খালা কাপড় শুকাতে দিতে গিয়ে দেখে ছাদঘরে ভেতরে আলো জ্বলছে। বাবা আর জ্যেঠু তখনও অফিসে। দাদু, জ্যাঠিমা গেল দেখতে। মুখ গম্ভীর করে নামল সবাই। মায়ের হাতে সেই ছবি দুটো আর একটা লিফলেট দিয়ে দাদু বললেন, “কেউ এসেছিল। ব্যালকনির দরজা বাইরে থেকে টেনে বেঁধেছিল পুরো লাগেনি। আর ঐ লিফলেট পড়ে ছিল টেবিলের ফাঁকে। লিফলেটে স্বৈরাচার বিরোধী শ্লোগান লেখা আর নিষিদ্ধ এক রাজনৈতিক দলের লোগো। দাদু মাকে বলল, “বুঝেছ কেন পালাল? সোহেলের ভাই ওসি জেনেই পালিয়েছে”। মায়ের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। একটা বিপদ হতে পারতো। বাবা সরকারি চাকরি করে। ছবি দুটো মা দুপুরবেলায় খুলল। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, নতুন দুটো সূর্যমুখি যার একটার পাপড়ির সঙ্গে মিশে বসে আছে হলুদ রঙের প্রজাপতি। মাকে দেখাতেই দাদু আর জ্যাঠিমাকে দেখাল। দাদুর মনে নেই কিন্তু জ্যাঠিমার মনে আছে ছবিটাতে ফাঁকা জায়গা ছিল খানিক। আমি কাঁদতে কাঁদতে আঙুল দিয়ে দেখালাম, ‘ উনি আমাকে প্রজাপতি এঁকে দেবেন বলেছিলেন ঠিক এই ফুলটার পাপড়ির উপরে, জবাও জানে”। কেউ কিছু বলল না বিশ্বাস করলো না হয়তোবা কিন্তু মা বলল, “হ্যাঁ উনি কথা রেখেছেন। তোমাকে ফুল এঁকে দিয়ে গেছেন, প্রজাপতিও। কিন্তু উনি আমাকে ছোট করেছেন সবার কাছে তাই আমরা এই গল্প আর কারো কাছে করবো না”। বিকেলে সব শুনে বাবা আর জ্যেঠু আবার ছাদঘরে গিয়ে ব্যালকনির দিকের দরোজাতে চেয়ার ঠেকা দিয়ে এলো। মাকে দেওয়া ছবিটা একবার দেখেই বাবা মেঝেতে ছুঁড়ে ফেলল । মা দুটো ছবিই বাক্সে তুলে রাখল। জ্যেঠু সন্ধ্যার আগেই খবর আনলেন আবেদিন কলোনির আশেপাশে কোনো সাংস্কৃতিক সংগঠন নেই। সোহেল চাচা এলো বিকেলে। কিন্তু কেউ এ নিয়ে কোনো কথা বলল না।

ডিসেম্বরেই এরশাদের পতন হলো। বড়ো মামা এলেন তার পরপরই। ছবিগুলো দেখলেন। আমার ছবি সম্পূর্ণ হওয়ার গল্পটা শুনল। পোক্ত সাক্ষী পেলাম না। জ্যাঠিমা একবার বলল হ্যাঁ আরেকবার বলল মনে হয়। আমি নিজের চোখে দেখেছিলাম ছবিটা তাই জানতাম উনি এসেছিলেন। আর বড়োমামা বললেন উনি কারো সংগেই যোগাযোগ রাখেন নি, রাজনীতির ব্যাপারটা নিয়ে বড়োমামা বললেন ছাত্র থাকাকালীন নিষিদ্ধ ঐ সংঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকার গুজব ছিল। লিফলেটটা বড়ো মামা ছিড়ে ফেললেন।


*শেষ কিংবা শুরু

শ্যনন ঢাকা ছাড়ার পরে আমি ছবিটা অনেকক্ষণ ধরে দেখলাম। ফুলগুলোর রঙের তারতম্য তো বটেই ব্রাশের স্ট্রোকের তারতম্যও বেশ ধরা যাচ্ছে। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো মনে পড়ল ওর কথা। জবা! জবা ছাড়া কেউ করেনি এই কাজ। মনে হতেই আমি পিপ্‌লুকে ফোন দিলাম: জবার ঠিকানা চাই। পিপ্‌লুকে কোনো কাজ দিলে আমার অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু এবার ও আমাকে অবাক করে পরদিনই ফোন দিলো। জানাল রহিমা খালা বস্তিতে থাকে না আর। কোথায় থাকে কেউ জানে না। জবার বিয়ের খবর জানতাম সবাই। কোনো এক গার্মেন্টে কাজ করতো সেখানেরই কাউকে বিয়ে করেছিল। রহিমা খালা আমাদের বাড়ির কাজ ছেড়ে দিয়েছিল তারও আগে। বস্তিরই একজন বলেছে বাড়তি কিছু জানলে পিপলুকে জানাবে।

বাড়তি খবর পেতে পেতে প্রায় পাঁচ মাস পার হয়ে গিয়েছিল । তাও বিস্তর ঘোরাঘুরির পরে আমাদের পাড়ার এক দোকানির কাছ থেকে খবরটা জোগাড় করেছিল পিপ্‌লু। জবা অসুস্থ। টিবি হয়েছে। মেথরপট্টির ওদিকে ভাড়া বাসায় থাকে। বরের সঙ্গে বনিবনা নাই। একটাই মেয়ে। স্কুলে পড়তো। জবার টিবি হওয়ায় ওকে কাজ থেকে ছাটাই করেছে কর্তৃপক্ষ। ওর জায়গায় ওর মেয়েকে নিয়েছে ওরা। খুব মন খারাপ হলো শুনে। কদিন পরে চাটগাঁ গেলাম। পিপ্‌লুকে নিয়ে ওর বাড়িতে গেলাম। পিপ্‌লু ভেতরে গেলো না। আমি একাই ঢুকলাম। ও আমাকে দেখেই চিনল কিন্তু আমি সেই হাড়মাংসের অবয়বে কোত্থাও ছেলেবেলার জবাকে খুঁজে পেলাম না। ও বিষণ্ণ হেসে জানতে চাইল, “আপনি ভালো আছেন?” খট করে কানে লাগল। বললাম, “তুমি আমাকে আপনি করে বলতে না তো”। ও হাসল, “ছুডুকালে সক্কলে ছুডুই থাকে। বড়ো হইতে হইতেই উঁচানিচা জ্ঞান হয়। আপ্নে উঁচা তাই “আপ্নে”। আমি নিচাতেই এখনও, তুমি কইরা কওন জায়েজ”। কথার সেই তেজ! যাক কথায় অন্তত পুরনো জবা বেঁচে আছে- আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম।

ঘরে একটাই চৌকি। আমি তাতে বসেছি। সামনের জলচৌকিতে ও বসেছে মুখে আঁচল চেপে। ও যেন আমার কথা শোনার অপেক্ষা করছে।। আর আমি কোথা থেকে শুরু করব তা বুঝতে পারছিলাম না। খানিক পরে ও উবু হয়ে চৌকির তলা থেকে একটা তোরঙ্গ বার করে। আর তার ভেতর থেকে কাপড়ে মোড়ানো একটা প্যাকেট। প্যাকেট খুলতেই এক গাদা তুলি আর সেই হলুদ টিউবটা বেরুলো আগে। এই টিউব থেকে রঙের ফুটকি বসাচ্ছিলেন তিনি ক্যানভাসে! আমার গা কাঁপছিল । মনে মনে ভাবলেও চোখের সামনে এতকাল পরে ওদের দেখবো ভাবিনি আমি। ও আমার দিকে টিউবটা এগিয়ে দেয়। হাতে নিয়ে দেখি লোহার মতো শক্ত । ও চোখ নিচু করে, “ এইসব আপ্নারেই দিবো বইলা রাখসিলাম । আম্মার নজর বাঁচাইতে বাঁচাইতেই জীবন শ্যাষ। আমি ভাবসিলাম আপনি আরও আগে বুঝবেন। আপনি তো জানতেন আমি আঁকতে জানি কিন্তু উনার মতো পারার কথা না। অনেক চেষ্টা করসিলাম তারপরেও পাপড়ি মিলাইতে পারি নাই। সঞ্জয় দাদার ওইখানে পেন্সিল ছিল না। তোকাইতে গেলে আওয়াজ হইতো। ফজরে আইসা করসি তো। আলো ফুটে নাই। আম্মা মনে করসে টাট্টির লাইনে আমি। আম্মাতো আপনাগো বাড়িত সেইসব সাইরতো। লাইট জ্বালাইয়া আঁকসি।ডরে হাত কাঁপতেসিল। রাস্তায় মানুষ নামার আগেই রেলিং বাইয়া দৌড়ান দিসি। লাইট নিবাইতে ভুইল্লা ফেসিলাম। আম্মায় কাপড় ম্যালতে গিয়া দেইখা ফেলসে। বাড়িত আইয়া কইসে আব্বারে। হেরাও মহা চিন্তায় পড়সিল।হেরা তো সেই মামার চইল্লা যাওনের কথা জানত না। আব্বা তো নাই আম্মা এহনো জানে না। ধরা পইড়লে আব্বাই আমারে কতল দিত। আল্লাহ যে ক্যাম্নে বাচাইসে আল্লাই জানে।” আমি কথা বলি না। ও আবার বলতে থাকে, “উনারে আমিই বাইর কইরা দিসিলাম। সামনে দিয়াই গেসেন। আপ্নে তখন ফুল গাছের তলে। আমি ব্যাগ নামাইসি ছাদের কিনার দিয়া”। আমি অবাক হয়ে জানতে চাই, এইসব কেন করল আর ওকেই বা পেলো কীভাবে? জবা হাসল। “ঐ যে ব্যাগ দিতে গেলাম উপ্রে তখন। উনি উপ্রে আইস্যা আমারে আঁকতে পারি কি না জিগান। আমি পারি বলতেই আমারে তুলি দিয়া একটা সূর্যমুখি রঙ কইরতে দিলেন। ভালো হয় নাই আবার অইটারে রঙ দিয়া থ্যাবড়াইয়া আঁকলেন দেখাইয়া দিলেন ক্যামনে তুলিরে ঘুরাইতে হয়। তারপরে কইলেন কাউরে না কইতে। উনি থাকলে ছোট বাপির বিপদ । উনি এরশাদ বেডারে গদিছাড়া কইরবেন। কইলেন আমার অনেক সাহস। ট্যাহা দিতে চাইস্‌লেন আমি নিই নাই। তখন আমারে উনার তুলি গুলান দিলেন, রঙ দিলেন। বুঝি নাই ট্যাহারই দরকার আসিল , তুলি-রঙে পেড ভরে না”। আমার গলা বুঁজে আসে কান্নায়। ও কাশতে থাকে । আমি নিজেকে সামলে বলি, “আমি তোমার চিকিৎসা করাব। তুমি ছবি আঁকবে।তোমার মেয়েকেও আমি দেখব, পড়াব”। ও উত্তর দেয় না। মুখে কাপড় দিয়ে কাশতেই থাকে। আমি দেখি ওর চোখ ভেসে যাচ্ছে জলে।

মা একবার বলেছিল জবার যদি অন্য কোথাও জন্ম হতো ও অনেক কিছু হতে পারতো। জবার চোখে দেখতে জানে; অরুণাংশু রায় বুঝেছিলেন। আমার বুকের ভেতরে সেই আটবছর আগের স্মৃতি ঝড় তোলে। আমি আর জবা যে অসমান তা বুঝেছিলাম আমি। জবা বোঝেনি। আমার ড্রইং খাতা ছিল। ওর ছিল না। নিজেকে নিজের প্রচণ্ড ছোটো লাগে। যে জীবন আমি যাপন করছি সেই জীবনের যোগ্য কি আমি? দুজনে সমান সুযোগ পেলে আমিই হয়তো পিছিয়ে যেতাম। জবার জীবনের খানিক পরিবর্তন আমাদের পরিবার আনতে পারতো। আমি শ্যননের কথা মনে মনে আওড়াই সব গল্পেরই শেষ আছে। কোনোটা সোজা কোনোটা খানিক ঘুরপথে। অজস্র মৃত পায়ের চিহ্ন থাকলেও গল্পের শেষ আছেই। এই দীর্ঘযাত্রার কোনখানে কোন গল্পের শেষ সে কেবল বিধাতাই জানেন। আর সেই শেষ থেকেই হয়তো ফের নতুন গল্পের শুরু। আমরা কে কার পায়ের ছাপে হাঁটছি কে জানে! আপাতত এটুকুই জানি জবার সকল দায় আমার।

ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াতে জবা আমাকে মাথার আঁচল সরিয়ে দেখায় ।ওর ডান কানের চেয়ে বাম কান বেশ খানিকটা ছোট। ও হাসতে হাসতে বলল, “আগে দ্যাখসিলা?” আমি মাথা নাড়ি। কখনোই চোখে পড়েনি। ও বলে, “তিনি দ্যাখসিলেন”। তারপরে বলে, “ছুডুকাল সোন্দর” । ও আমাকে ফের তুমি বলছে! আপন ভাবছে! আমি ওকে জড়িয়ে বলি, “বড়োকালও আমরা সুন্দর বানাবো” । ও হাসে। তারপর বলে, “কান ছুডু তয় হুনি বালাই। ভ্যান গগের মতন এক -কানা না”। ও হাসে। আমি অবাক হই জবাও ভ্যান গগ মনে রেখেছে! আমরা দুজনই হাসতে থাকি। আমি জানি ওর চোখের সামনেও সেই স্মৃতি ভাসছে। আমিও যেন দেখছি জবা গালে হাত দিয়ে বলছে, “ও আল্লাহ নিজে নিজের কান কাইট্টা বয়রা হয়নি কেউ?” হাসতে হাসতে আমার চোখ দিয়ে জল গড়ায়। জবার ফের কাশি ওঠে। আমি মনে মনে বলি তোমাকে ভালো হতেই হবে।

জবার ওখান থেকে ফিরে মাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “তোমায় ভালোবাসতেন? মা বলল, “কোনোদিন বুঝিনি। বয়সে কত বড়! তবে যদি মুখ ফুটে বলতো কখনও হাত ছাড়তাম না” । আমি মাকে জড়িয়ে রাখি। মা আমার চুলে বিলি কাটে।

শ্যননকে জবার কথা আর ছবির কথা জানাই মেসেজ করে। উত্তরে ও বিশাল এক হৃদয় ইমো পাঠায়। এরপরে আমার অবাক হওয়ার পালা। ও জানায় আসিফ আর ও একসঙ্গে বাকি জীবন কাটাবে স্থির করেছে। ইব্রাহিমের সংসারে সেই দুপুরে আমাদের খাওয়াদাওয়ার ভিডিও এডিট করতে গিয়ে ওর মনে হয়েছিল এইবার থিতু হওয়ার সময় এসেছে। ভালো লাগাটা বেশ আগেই জমে উঠেছিল। খুলে বলা হয়নি কারোরই এই যা! ও বাংলাদেশেই ঘর বাঁধবে। শহর হিসেবে কক্সবাজারকে বাছছে। ওরা দুজন মিলে বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করবে। আর জয়নাল শেখকে পেলে তাকে বাচ্চাদের আঁকা শেখাতে অনুরোধ করবে।আরও অনেক পরিকল্পনা ওর, পরে বিস্তারিত জানাবে।

ওর মেসেজ পড়তে পড়তে ভাবি আমার নাকের ডগায় আরেকটা গল্পের বীজপাতা খুললো আমি টেরই পেলাম না! আমরা কে কার পায়ের ছন্দ তুলে নিচ্ছি কে জানে- -

লেখক পরিচিতি:
রঞ্জনা ব্যানার্জী
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক
কানাডায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন